জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
ঊনবিংশ কিস্তি
না করলে আমার চলবে কেমন করে।
ওরা হাসছে।
আমি স্যারের কাছ থেকে আর লাইব্রেরী থেকে বই জোগার করতাম। তিনটে নোট বানাতাম। স্যারকে বলতাম স্যার আপনি মার্ক্স দেবেন কোনটায় কত পেতে পারি। স্যার যেটায় বেশি মার্ক্স দিতেন সেটা আমি রেখে দিতাম, বাকিটা ওদের বিক্রী করতাম।
বড়লোকের মেয়ে বাবার পকেট কেটে ফাঁক করতো। আমি কিছুটা নিতাম।
অদিতি মিলি দুজনেই হেসে গড়িয়ে পরে আমার কথা শুনে।
তারপর।
আমরা হলঘরের মেন গেটে আসতেই দেখলাম, অদিতি গেট দিয়ে ঢুকছে, আজকে অদিতি যে ড্রেস পরেছে, অনেকটা সেরকম, দারুন স্মার্ট লাগছিল। অদিতি যেন উড়তে উড়তে আসছে, মিত্রার দিকে তাকিয়ে হাসতেই, ও দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বললো চোখ একেবারে গেলে দেব।
তোমার সঙ্গে তখন মিত্রাদির ইন্টুমিন্টু চলছে। মিলি বললো।
ঠিক বুঝতাম না ব্যাপারটা বুঝলে, ও আমার খুব ভালো বন্ধু ছিল। তবে মিত্রা একদিন কলেজে না এলে মনটা খারাপ লাগত।
ওর বাড়ি চিন্তাম না, যেতেও পারতাম না। হেঁদুয়ায় গিয়ে বসে থাকতাম। না হলে ওর এক বোন প্রেসিডেন্সিতে পড়তো আমি সেখানে যেতাম।
তার সঙ্গে দেখা হলে জিজ্ঞাসা করতাম। না হলে ব্যার্থ মনোরথ হয়ে ফিরে আসতাম। আর আমি যেদিন কলেজে না যেতাম, ও সিধে ডাফ হস্টেলে চলে যেত।
একচ্যুয়েলি থার্ড ইয়ারে এসে বুঝলাম ওর সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
আমি তখন পড়াশুন নিয়ে খুব ব্যস্ত। পার্টওয়ানে ফার্স্টক্লাস পেয়েছি। মিত্রা প্রথম ওদের বাড়িতে নিয়ে গেল। সেই ওদের বাড়িতে যাওয়া আসা শুরু। ভালোছেলে বলে কলেজেও একটা খ্যাতি হলো।
সত্যি বলছি অনিদা তখন আমরাও অনেকে তোমাকে পাওয়ার জন্য পাগল ছিলাম। কিন্তু দেবা একদিন বলেছিল, তুমি মিত্রাদি ছাড়া কলেজে কাউকে পাত্তা দাও না। আমি চ্যালেঞ্জ করে তোমায় চিঠি লিখেছিলাম। সত্যি তোমার দম আছে।
অদিতির দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
জানো অদিতি মিত্রার বাবা আমাকে পছন্দ করলেও ওর মা কোনওদিন সেই ভাবে আমার সঙ্গে কথা বলতেন না। হাবে ভাবে বুঝতাম। তাই আমিও খুব বেশি যাওয়া আসা করতাম না। শেষ যেদিন কলেজ হলো, সেদিন দুজনে হেঁদুয়াতে বসে খুব কেঁদেছিলাম।
কেন!
আর দেখা হবেনা বলে।
ওরা দুজনে মুচকি মুচকি হাসছে।
কলেজলাইফ শেষ হলো। ওর তখন বিয়ের কথা চলছে।
মিত্রাদির কি সেই সময়েই বিয়ে হয়।
হ্যাঁ, মাস দেড়েকের মধ্যে। পরে শুনেছিলাম ও যাদবপুরে এমএ-তে ভর্তি হয়েছে। তখন কিন্তু ওর বিয়ে হয়ে গেছে।
তারপর।
আমার জীবনের এই সময়টা খুব টাফ টাইম গেছে। কলেজের পাঠ চুকে বুকে যাওয়ায় হস্টেল ছাড়তে হয়েছে। কলকাতায় মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই।
আমি তখন এমন একটা জায়গায় থাকতাম। নামও বলতে পারতাম না, কাউকে সেখানে যেতেও বলতে পারতাম না।
কোথায়?
সোনাগাছিতে।
কি বলছো অনিদা!
এক গণিকা মাসির আশ্রয়ে।
এই গল্পটা পরে শুনবো। অদিতিরটা বলো।
আমার মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছে। বুঝতে পারছি না কেন। সেদিন মিত্রার বাড়িতে ড্রিংক করেছিলাম। তখন মাথাটা যেরকম ঝিম ঝিম করছিল অনেকটা সেই রকম। বার বার এদের সঙ্গে সেক্স করতে ইচ্ছে হচ্ছে।
হাসলাম।
তারপর মিত্রাকে বললাম একটা মজা করি।
ও বললো তুই একবারে কিছু করবি না।
তবু আমি ওর কাছ থেকে ছিটকে চলে গেলাম। তখন ভরা কলেজ, চারিদিকে ছাত্র-ছাত্রীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আমি ঠিক সিঁড়ি দিয়ে ওঠার মুখটায় দাঁড়ালাম। অদিতি আমায় দেখল। আমি ওর দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছি। যেই ও আমার কাছাকাছি এলো, আমি ওর পাছুতে হাত দিয়ে একটু টিপে দিলাম। ও সজোরে একটা থাপ্পর তুললো। আমি ওর হাতটা চেপে ধরে ভাবলেশ হীন মুখে বললাম, দেখো মা, তুমি যে কলেজে পড়ো সেই কলেজে নেতাজী পড়েছেন, বিবেকানন্দ পড়েছেন আরও কতো মনিষী পড়েছেন হাতে গুনে শেষ করা যাবে না। তাঁরা যদি তোমার এই পোষাকটা দেখতেন লজ্জা পেয়ে যেতেন।
মিলি হো হো করে হাসছে।
তারপর মনে হয় অদিতিকে হাত জোড় করে বলেছিলাম, আমার এই ব্যবহারের জন্য ক্ষমা করো। সেদিন অদিতির মুখটা আমার চোখের সামনে আজও ভাসে।
অদিতির মুখটা রাঙা হয়ে উঠলো।
এরপর কলেজে আমার কিন্তু বেশ নাম ফেটেছিল।
অদিতি মুচকি মুচকি হেসে আমাকে থাপ্পর দেখাচ্ছে।
আমারটা বললে এবার মিলিরটা বলো।
আমি হাসতে হাসতে আড়মোড়া ভাঙলাম।
মিলিরটা চ্যালেঞ্জ করেছিলাম মিত্রা, সুপ্রিয়, কল্লোল, সুমিতার সঙ্গে।
ওরা বার খাওয়াল। একদিন মিলিকে দেখিয়ে বললো, ভালো ছেলে, এই মেয়েটাকে চুমু খেতে পারবি।
আমি বললাম হ্যাঁ।
পারলে একটা মোগলাই।
একদিন মিলির পেছন পেছন শেয়ালদায় গেলাম। দূর থেকে মিলিকে ট্রেনে উঠতে দেখলাম, মিত্রাকে বললাম, তুই এক কাজ কর, মিলি যে কামড়ায় উঠে বসবে ঠিক সেখানে দাঁড়াবি। কোথায় বসছে সেটা ইশারা করে জানাবি।
মিলিও সেদিন জানলার ধারে বসেছিল। বলতে পার কাকাতালীয়।
না মশাই আমি জানলার ধারেই বসতাম। আসার সময় প্রতিদিন প্রথম থেকে তিন নম্বর কামড়া, যাওয়ার সময় শেষের থেকে তিন নম্বর কামড়া।
এখনও তোমাদের আদি বাড়ি ওই পাশে?
হ্যাঁ। শরিকি বাড়ি। দাদারা থাকে। আমি কলকাতায় সেটেল্ড।
মিলি তখন মিত্রাদিকে চিনত না? অদিতি বললো।
বলতে পারব না, তবে এক কলেজে পড়তাম মুখ চেনা অবশ্যই ছিল। তোমরা তখন আমাদের জুনিয়র। ইলেভেন থেকে সবে টুয়েলভে উঠবে কিংবা উঠেছ। আমরা থার্ড ইয়ার। আউট গয়িং।
হ্যাঁ। মিলি বললো।
তারপর, অদিতি আমার দিকে চেয়ে মিটমিট করে হাসল।
আমি ট্রেনের সামনে এসে দেখলাম কোন ট্রেন। দেখলাম লেখা আছে, শান্তিপুর।
মিত্রা যেখানে দাঁড়িয়ে তার দুটো কামড়া আগে থেকে জানলার ধারে যারা বসে আছে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করতে করতে এগোলাম। দাদা ব্যারাকপুর। না শান্তিপুর।
মিলির কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলাম। ব্যারাকপুর মিলি বললো শান্তিপুর মনে হয়ে মিলি পুরো কথাটা বলতে পারেনি। আমি মিলির মাথাটা ধরে জানলার মধ্যে দিয়েই একটা চুমু খেয়ে সেই যে দৌড় দিলাম। তারপর ডিএস বিল্ডিংয়ের ভেতর দিয়ে একবারে শিয়ালদা ক্যাফের সামনে। কিছুক্ষণ কুত্তার মতো হাঁফালাম। তারপর হাঁটা, দৌড়, হাঁটা, দৌড় করতে করতে একটা হোস্টেলে এলাম।
তোমার?
না আমার অন্য একদল বন্ধুদের হোস্টেলে।
মিত্রাদিরা? অদিতি বললো।
পরদিন ওরা গিয়ে আমার হস্টেলে দেখা করেছিল।
অদিতি মিলি হাসতে হাসতে গড়িয়ে পরে। মিলি দুবার আমার কোলেই শুয়ে পড়লো। ওর শরীরটা বেশ গরম গরম লাগছে। অদিতি চোখ মুছে বললো—
এখন তোমার ইচ্ছে করছে না মিলিকে চুমু খেতে।
ইচ্ছে করলেই হবে না।
অনিদা।
উঁ।
তুমি মিত্রাদিকে কোনও দিন সেক্স করেছো?
কি বলবো এদের, একবার ওদের মুখের দিকে তাকালাম। দুজনেরি মুখ কেমন যেন লাগছে চোখ দুটো সামান্য ঘোলাটে। নিজেকে নিজে বললাম, আমি কি ভুল দেখছি?
না।
মিত্রাদি তোমায় পেলে ভীষণ সুখী হবে।
আমি হাসলাম।
অদিতি, মিলির দিকে তাকিয়ে ইশারা করলো মিলি আমার শরীরে শরীর মিশিয়ে কাঁধে হাত রাখলো।
আজ তোমাকে আমায় চুমু খেতেই হবে। সেদিন সত্যি বলছি অনিদা আমি তোমার চুমুর স্বাদটা ঠিক উপভোগ করতে পারিনি, আজ তোমাকে খেতেই হবে। মিলি বললো।
মাথার ভেতরটা সমানে চক্কর মেরে চলেছে। এদের দুজনের চোখ মুখ দেখে কেমন যেন লাগছে।
নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করলাম।
অদিতি হাসতে হাসতে গেঞ্জিটা এমন জায়গায় উঠিয়েছে, সেটা খুলে ফেললেই চলে।
মিলি আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। ওর নরম বুক আমার বুকের সঙ্গে লেপ্টে আছে আমি ওর দিকে চেয়ে আছি, মাথার ঝিম ঝিমানিটা মুহূর্তে যেন বেরে গেল। ভীষণ সেক্স করতে ইচ্ছে করছে, ভাবছি মিলির ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াবো কিনা, মিলি তৃষিত নয়নে আমার ঠোঁটের কাছে ঠোঁট নিয়ে এসেছে, চোখে তৃষ্ণা।
এই মুহূর্তে আমার পক্ষে নিজেকে ধরে রাখা সত্যি খুব অসম্ভব মনে হচ্ছে, মিলির ঠোঁটের কাছে ঠোঁট নিয়ে গিয়ে সরিয়ে আনলাম, মিলি নিজের বুকের সঙ্গে আমাকে আরও নিবিড় করে জড়িয়ে ধরোল। ওর নরম বুক আমার বুকের সঙ্গে একেবারে মিশে গেছে, মিলি আমার ঠোঁটে ঠোঁট রাখল, নিজে থেকেই লজেনসের মতো চুষতে শুরু করলো।
অদিতি উঠে দাঁড়ালো, ও এগিয়ে আসছে, মিলি আমার ঠোঁট কিছুতেই ছাড়ছে না মাঝে মাঝে আওয়াজ করে চুমু খাচ্ছে। অদিতি কাছে এসে আমার দুপায়ের মাঝখানে বসলো।
কিছুক্ষণ এক দৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বললো, কিরে তুই একাই সব খাবি আমাকে খেতে দিবি না।
ধীরে ধীরে আমি অদিতি মিলির নাগপাশে বন্দী হলাম। দুজনে আমার ওপর ক্ষিপ্ত বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পরলো। আমাকে অবাক করে দিয়ে দুজনে আমার শরীরটাকে নিয়ে ছেলেখেলা শুরু করল। আমি স্থবীরের মতো ওদের হাতের পুতুল হয়ে গেলাম। আমাকে দুজনে ড্রইংরুমের সোফা থেকে বেডরুমে টেনে নিয়ে এল।দারুন একটা সুন্দর চাদর মিলির বিছানায় টান টান করে পাতা। খাটটা বেশ বড় আট বাই সাত। তিনজনে আরমসে শোয়া যায়। ঘড়ের একদিকে একটা টেবিলে ল্যাপটপ রাখা। একটা বোন চায়নার ফুল দানি বাহারি ফুলে ভর্তি। জুঁই ফুলের গন্ধ চারদিকে ম ম করছে। কিন্তু জুঁইফুল কোথাও দেখতে পেলাম না। মনে হচ্ছে রুম ফ্রেসনারের গন্ধ।
প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ওরা আমার শরীরটাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেললো। বাধা দেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও কেন জানি পারলাম না। খেলা শেষ হতে আমি বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে মাথাটা একটু টাল খেল। ঘরে এসি চলছে। তবু আমি কুল কুল করে ঘেমে যাচ্ছি।
ওদের বুঝতে দিলাম না। তিনজনে একসঙ্গে বাথরুমে গেলাম, আধুনিক বাথরুম বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই। একটু ফিচলেমি করলাম ওদের সঙ্গে। একটু হাসাহাসি, তারপর জামা-প্যান্ট পরলাম। বাইরের সোফায় এসে বসলাম, মিলি গরম গরম কফি করে নিয়ে এলো সঙ্গে ভুট্টার কর্ন।
কফি খেতে খেতে গল্প হলো।
মিলিরা নিজেদের কথা কিছু কিছু বললো।
মিলি তার হাজবেন্ডের সঙ্গে থাকে না। সেপারেসনের জন্য ফাইল করেছে। হাজবেন্ড দিতে চাইছে না। অদিতি দেবাশিসকে নিয়ে মোটেই সুখী নয়। থাকতে হয় তাই থাকছে। মিলি-অদিতি দুজনেই সময় পেলে সেক্স প্র্যাক্টিশ করে এই ফল্যাটে এসে।
তারমানে ওরা লেসবি! সমকামী! অবাক হলাম।
টিনার কথাটা মনে পড়ে গেল। কথায় কথায় সেদিন বলেছিল ওরা লেসবি জানো অনিদা। অবাক হয়েছিলাম।
তোমরা কিছু চাইলে না আমার কাছে।
এরপরও চাইবার কথা বলছো। অদিতি বললো।
জীবনে চরম পাওয়া তোমার কাছ থেকে পেলাম।
মিলির চোখদুটো ভারি হয়ে গেল। আমার কাছে এসে আমার কাঁধে মাথা রেখে বললো।
তোমায় না জানিয়ে একটা অন্যায় করেছি অনিদা।
অন্যায় করেছো! কোথায়?
তোমায় সরবতি লেবুর সঙ্গে শিলাজিত খাইয়ে দিয়েছিলাম।
আমি অবাক হবার ভঙ্গি করে বললাম, তাই! আমি কিছু বুঝতে পারিনি।
তোমার খুব কষ্ট হয়েছে, বিশ্বাস করো, আজ দুজনে মিলে প্ল্যান করেছিলাম, তোমাকে নিয়ে এনজয় করবো।
আমি মিলির দিকে তাকালাম।
সেদিন তোমার বাড়িতে তোমার শরীরটা দেখে ঠিক থাকতে পারিনি।
এই ভাবে এনজয় করে তোমরা সেটিসফায়েড?
এ প্রশ্ন করো না, উত্তর দিতে পারব না। কাম পাগল মেয়েদের কাছে সেটিসফেকশন।
হাসলাম।
আবার কবে দেখা হবে? অদিতি আমার চোখে চোখ রেখেছে।
তোমরা চাইলেই।
আমি সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালাম।
চলি তাহলে।
চলি বলতে নেই অনিদা, আসি বলো। অদিতি বললো।
মিত্রাদি খুব ভাগ্য করে জন্মেছে, তোমার মতো একটা পুরুষ পেয়েছে। মিলি বললো।
ওদের ব্যাবহারে মনটা ভীষণ খচখচ করছে। কিন্তু মুখে তার কোনও প্রতিক্রিয়া দেখালাম না। যতোই হোক এককথায় কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছে। অতোগুলো টাকা বলে কথা।
প্রমিস করেছে, আগামী মাসে ওদের দুজনের কোম্পানীতেই সিক্স মান্থের বাজেট। আমাকে যতটা বেশি সম্ভব পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে।
দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালাম। সাড়ে পাঁচটা।
ওদের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে নিচে এলাম। দুজনের কেউ নামল না।
আজকের এই ব্যাপারটা নিজের মন থেকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। এই রিলেসনের ব্যাপারটা স্বতঃস্ফূর্ত নয়। তবু মিশতে হলো। আমিও ধোয়া তুলসীপাতা নই। তনু, মিত্রার সঙ্গে সেক্স করেছি। কিন্তু ওরা আমার জীবনে দুটো মাইলস্টোন।
মিলি, অদিতি সেই জায়গায় কোনওদিন পৌঁছতে পারবে না। তা ছাড়া অদিতি আমার বন্ধুর স্ত্রী। এইরকম একটা অভিজ্ঞতা জীবনে হতে পারে ভাবতে পারছি না। এককথায় বলতে গেলে এদের হাতে আমি ধর্ষিত হলাম।
মনে মনে নিজেকে বোঝালাম। অনি ওরা ক্যাশে কোনও দিন সন্তুষ্ট হবে না, সবসময় কাইন্ডের প্রত্যাশী। সামান্য এটুকু মেলামেশায় যদি দুজনের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা পাওয়া যায়, ক্ষতি কি?
ক্যাশ হলে দেবাশিসের মতো টেন পার্সেন্ট ছাড়তে হত। তোর অফিসের একটা ডিপার্টমেন্টের এক মাসের মাইনে। ভাবতেই বুকটা কেমন ধড়াস ধড়াস করে উঠলো।
অদিতি, মিলি দুজনেই আমাকে কথা দিয়েছে, এ্যাডের ব্যাপারে তোমাকে কিছু ভাবতে হবে না। আগামী মাসের প্রথম উইকেই তুমি নেক্সট তিন মাসের কনফার্মেশন পেয়ে যাবে। আস্তে করে বলেছে, দেবাশিস, টিনা, নির্মাল্যকে বলার দরকার নেই। ওদের সঙ্গে তুমি আলাদা ভাবে বুঝে নিও। তবে টিনা যে ভীষণ প্রিজার্ভ এটা দুজনেই স্বীকার করেছে। সত্যি মানুষের মন?
দাদা যাবেন নাকি?
একটা ট্যাক্সি আমার সামনে দাঁড়িয়ে, ড্রাইভার জানলার কাছে এসে মুখ বারিয়ে বলছে।
কখন যে বাই পাসের এই ব্যস্ততম রাস্তা পাড় হয়ে এপাশে চলে এসেছি মনে করতে পারছি না।
চলো।
উঠে বসলাম।
পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম। সুইচ অফ। অন করলাম। প্রচুর মিস কল আর ম্যাসেজ ঢুকলো। দেখতে ইচ্ছে করলো না। মনটা কেমন ভাড়ি ভাড়ি লাগছে। বার বার বুকের ভেতরটা কেমন খচখচ করে উঠছে।
ওরা নিজেরাই স্বীকার করে নিয়েছে, আজকের ব্যাপারটা স্বতঃস্ফূর্ত নয়। শেষপযর্ন্ত এরা আমাকে শিলাজিত খাইয়ে এই কারবার করবে আমি ভাবতেই পারিনি। সেই জন্য তখন লেবুর রসটা একটু তিতকুটে স্বাদ লাগছিল।
কোথায় যাবেন?
রাস্তার দিকে মুখ ঘুরিয়ে দেখলাম, পার্কসার্কাস।
অফিসে যেতে ভালো লাগছে না। ঘড়ির দিকে তাকালাম, সাড়ে ছটা বাজে। বললাম ট্রাংগুলার পার্ক।
সোজা অমিতাভদার বাড়ি চলে এলাম।
ট্যাক্সি থেকে নামতেই ভজু ছুটে এলো। অনিদা এসেগেছো?
কেনরে!
বড়োমা, ছোটোমা, দিদিমনি এখনও আসেনি।
তাই?
রান্না করবো?
দাঁড়া।
আমি ভেতরে এলাম। ভজু সব আলো জ্বালায়নি। আমি ভজুকে বললাম।
সব আলো জ্বালিয়ে দে। অন্ধকার অন্ধকার লাগছে।
ভজু পটাপট সব আলো জ্বালিয়ে দিল।
কাজের মাসি এসেছিল?
হ্যাঁ। সব বাসন মেজে দিয়ে গেছে।
তুই কিছু খেয়েছিস?
না।
কেন!
খিদে পায়নি।
ঠিক আছে। দাঁড়া আমি স্নান করে নিই, তারপর এসে রান্না বসাচ্ছি।
এখন স্নান করবে?
আজ অনেক ঘোরা হয়ে গেছে।
আমি আলু, পেঁয়াজ কেটে রাখি।
বেশি কাটিস না, কম কম করে কাট।
আমি ওপরে চলে এলাম। মনের ভেতরটা এখনও কেমন খচখচ করছে। আমাকে আমার কেম্পানীর জন্য এতটা নিচে নামতে হবে ভাবতে পারিনি। নিচে যখন নামতেই হলো তখন ঘোমটা দিয়ে আর লাভ নেই। এবার আমাকে অন্যখেলা খেলতে হবে। আমার আরও টাকা চাই।
বাথরুমে গিয়ে অনেকক্ষণ সময় নিয়ে ভালো করে স্নান করলাম। যেন দেহের সমস্ত আবর্জনা ডলে ডলে পরিষ্কার করছি।
হঠাৎ আজকে এরকম মনে হচ্ছে কেন? অনেকক্ষণ ভাবলাম। আমি স্ব-ইচ্ছায় মিত্রা ছাড়া সেইভাবে কারুর সঙ্গে শরীরে শরীর মেশাইনি। এদিক থেকে আমি সতী।
তনুর প্রবল ইচ্ছাতে তনুর শরীর স্পর্শ করেছি। তখন মিত্রা আমার থেকে বহু দূরে।
নীপা, টিনা আমার প্রতি দুর্বল। সেটা ওদের চোখে মুখের চাহুনিতে পরিষ্কার। মনে হচ্ছে নিজেই নিজেকে জটিল আবর্তের মধ্যে জড়িয়ে ফেলছি। তাহলে কি আমার শরীরটা প্লে-বয়ের মতো? মেয়েরা দেখলেই গলে যায়? সেক্স পার্টনার করার জন্য পাগল হয়?
অনিদা আমার আলু কাটা শেষ।
বাথরুম থেকেই চেঁচিয়ে বললাম, একটু বোস। যাচ্ছি।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে পাজামা পাঞ্জাবী পরে নিচে নেমে এলাম।
ভজু চা করছে। আমায় এককাপ দিল। নিজে এককাপ খেল। বাইরে গেটে গিয়ে ছগনলালকে দিয়ে এলো। ছগনলালের সঙ্গে ভজু বেশ জমিয় নিয়েছে।
চা খাওয়া শেষে হতে ভজুকে বললাম, তোদের জন্য কিছু খাবার কিনে নিয়ে আয়। আর মুরগীর মাংস কিনে আন। ফ্রাই-এর মতো করে কাটবি, আট পিসের বেশি করবি না। মোট ষোলো পিস করবি। আর একটা মুরগী চিলি চিকেন করবো সেই ভাবে পিস করে আনবি। সঙ্গে যা যা দরকার কিনে নিয়ে আয়।
ঠিক আছে।
আমি ওকে টাকা দিলাম।
দেশি পেলে আনবি, না হলে পোলট্রি।
আচ্ছা।
ভজু চলেগেল।
আমি রান্নাঘরে ঢুকলাম। তেল মশলা সব গোছালাম। ওরা কখন আসবে জানিনা। ফোন করতে ইচ্ছে করছে না। বার বার দুপুরের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। চেষ্টা করছি ভুলে যাবার জন্য। কিছুতেই মাথা থেকে সরিয়ে দিতে পারছি না।
গ্যাস জ্বালিয়ে গরম জল বসালাম। ভজু খুব তারাতারি ফিরে এলো।
ভজুকে বললাম, ক-পিস নিয়ে এসেছিস?
দুটো ভালো মুরগি পেলাম, বুঝেছ অনিদা, একেবারে দেশি। ষোলো পিস ফ্রাই-এর মতো বার করলাম। বাকিটা চিলি চিকেনের মতো টুকরো করে নিয়ে এসেছি। হাড় বাদ দিয়ে।
ঠিক আছে, সব কিছু মনে করে নিয়ে এসেছিস।
হ্যাঁ হ্যাঁ।
তুই এদিকটা কেটেকুটে রেডি করে দে। আমি ওদিকটা দেখি।
আচ্ছা।
ফোনটা বেজে উঠলো।
রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এসে টেবিলের ওপরে রাখা ফোনটা ধরলাম। মিত্রার ফোন।
তুই কোথায়?
বাড়িতে।
বাড়িতে! এই সময়! তুই কবে থেকে এত ভালোছেলে হলিরে?
কখন আসছিস?
কি করছিস আগে বল?
রান্না করছি।
কি মজা, কি রান্না করছিস?
আলুভাতে, ভাত, ডাল।
তোকে কষ্ট করতে হবে না। আমরা গিয়ে করে নিতে পারবো।
ঠিক আছে।
ছাড়িসনা ছাড়িসনা ধর ধর।
কিরে অনি তুই এই সময় বাড়িতে, শরীর খারাপ? বড়োমার গলা।
না।
তোর গলাটা কেমন কেমন লাগছে।
আজ কাজ করতে ইচ্ছে করছিল না, চলে এলাম।
তোকে কিছু করতে হবে না, আমি ছোটো গিয়ে সব করবো।
ঠিক আছে, চলে এসো।
ফোনটা কেটে দিলাম।
অনিদা আমি সব গুছিয়ে নিয়েছি।
ভালো করে ধোয়া ধুয়ি করে মাখ।
আচ্ছা।
বলে দিতে হবে?
না।
অনেক দিন সেদ্ধ ডাল খাই নি, মুসুরডাল সেদ্ধ করলাম। শুধু মাত্র একটু তেল-লঙ্কা দিয়ে, বেশ ভারি ভারি করে। তারপর চিলি চিকেন বানালাম।
ভজুকে বললাম, ডাল বাট।
কেন অনিদা।
পকোরা তৈরি করবো।
ভজু ডাল বাটতে গেল, আমি ড্রইংরুমের ঘরিটার দিকে তাকালাম, সাড়েনটা বাজে।
একটা ওভেনে চিকেন বাটারফ্রাই করতে আরম্ভ করলাম। ভজুর ডাল বাটা শেষ হলে আর একদিকের ওভেনে পকৌরা তৈরি করতে শুরু করলাম।
বাইরের গেটে গাড়ির আওয়াজ পেলাম। বুঝলাম সবাই এলেন।
ভজু বাইরে বেরিয়ে গেছে। আমি রান্নাঘরে ভাজাভাজি করছি।
মিত্রা এসে ঝড়ের মতো ঢুকলো।
আরিব্বাশ কি করছিসরে?
একটা গরম পকৌরা ছোঁ মেরে তুলে নিল। গালে পুরেই চিল্লিয়ে উঠল, বুবুন বুবুন ফুঁ-দে ফুঁ-দে।
আমি ওর দিকে তাকালাম, ও হাঁ করে রয়েছে। হেসে ফেললাম।
লোভী।
আমি ওর হাঁ করা মুখে ফুঁ-দিলাম, বড়োমা এসে রান্না ঘরের গেটে দাঁড়াল।
কি করছিস!
ফুঁ-দিচ্ছি। গরম মুখে তুলেছে ছ্যাঁকা লেগে গেছে।
মিত্রার চোখ জলে ভড়ে উঠেছে। বড়োমা হাসতে হাসতে চেঁচাল, ও ছোটো দেখবি আয়।
আমি তখনো মিত্রার মুখে ফুঁ-দিচ্ছি।
ছোটোমা আমার আর মিত্রার অবস্থা দেখে হেঁসে কুটি কুটি খাচ্ছে।
হলো।
এতো গরম রান্না করে কেউ।
তোকে কে খেতে বলেছে।
ছোটোমা একটা খাও, দেখ কি দারুন বানিয়েছে।
মিত্রা একটা তুলে ছোটোমার মুখে গুঁজে দিল। একটা বড়োমার মুখে।
আমি চিকেন ফ্রাইটা একটু উল্টে পাল্টে দিচ্ছি।
বুঝলি মিত্রা তুই একটা ফাউ পেলি। ছোটোমা হাসতে হাসতে বললো।
তা বলতে। রান্নার হাত থেকে বাঁচলাম।
তা বাবুর্চি সাহেব আজকের মেনু।
ছোটোমাকে বললাম।
করেছিস কি তুই! সব শেষ।
হ্যাঁ শেষের পর্যায়।
স্যার আমাদের একটু যদি চা দেন।
রান্নাঘর থেকে উঁকি মেরে দেখলাম মল্লিকদা, দাদা সোফায় বসে আছে।
আরিব্যাস! আজ দেখছি একবারে রাজযোটক। সবাই একসঙ্গে। ব্যাপার কি? মনে হচ্ছে কিছু একটা স্ক্যাম করে ফিরলে।
তোর জেনে লাভ। তোকে দুপুরে ডেকেছিলাম। তুই যাসনি। মল্লিকদা বললো।
একটা চিকেন দিবি। দারুন ভাজছিস। রংটাও হেভি লাগছে। মিত্রা বললো।
খাওয়ার সময় একটা কম পাবি। সব গোনা গুনতি।
তুই একটা কম খাস।
কেন!
যে রান্না করে সে খায় না, বড়োমাকে দেখিস না।
ভাগ এখান থেকে।
ছোটোমা যাওনা একটা নিয়ে এসো না।
তুই যা।
একবারে আসবি না, দেবো গরম খুন্তির ছেঁকা, বুঝতে পারবি।
সে কিরে! নিজে যখন তুলে খাস।
আমি পকৌরা ভাজা শেষ হতে কড়া নামিয়ে গরম জল বসালাম।
ওটা কি করবি।
তোমরা চা খাবে বললে।
বাবাঃ তোর এতো টনটনে জ্ঞান। ছোটোমা বললো।
যা এবার বের, আমি করে নিচ্ছি। বড়োমা আমার পাশে এসে দাঁড়াল, মিত্রা একটা ঠ্যাংতুলে নিয়ে খাচ্ছে। বিউটিফুল।
সেটা কিরে। বড়োমা তাকাল।
ঠ্যাংটা।
আমি ভাত বসাই নি। শেষে বসাব ঠিক করেছিলাম।
ঠিক আছে আমি দেখে নিচ্ছি। আমার গালে হাত দিয়ে বললো, তুই একেবারে ঘেমে গেছিস। যা যা জামা ছার। বড়োমা বললো।
শুরু হলো। মিত্রা টিপ্পুনি কাটলো।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।
তুই এতো ভালো রান্না কবে থেকে করতে শিখলি?
তোর জেনে লাভ।
তোকে দিয়ে মাঝে মাঝে রান্না করাব। বড়োমা আর একটা দেবে।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম, রেওভাটের মতো খেয়ে চলেছে।
কিরে। বড়োমা বললো।
আর একটা ঠ্যাং।
নে ওখান থেকে।
সর সর বড়োমা পার্মিশন দিয়েছে।
মিত্রা আমাকে ঠেলে রান্নাঘরের ভেতরে চলে গেল।
আর খাবি না।
তুই এত ভালো রান্না করেছিস কেন। না করলে খেতাম না।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে না হেসে পারলাম না, এতো পরিতৃপ্তি সহকারে খাচ্ছে, সমস্ত অভিব্যাক্তি ওর চোখে মুখে ফুটে উঠেছে।
রাতে আর খাবিনা।
উঁ-উ বলেছে। সেই বিকেল থেকে কিছু খাইনি।
হ্যাঁরে মিত্রা….! বড়োমা অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়।
ওটা খাওয়া হলো নাকি, কয়েকটা কচুরী আর মিষ্টি। মল্লিকদাটা কিপ্টা, বললো অতো খেলে বাড়িতে গিয়ে আর খেতে পারবে না।
বড়োমা ওর কথা শুনে হেসেই চলেছে। আমার দিকে তাকিয়ে বললো ফ্রিজে কিছু আছে।
সকালের একটু তরকারি, আর মাছ আছে।
বড়োমা আমার জন্য দু-পিস।
কিসের দু-পিস। ছোটোমা বললো।
ছোটোমা রেডি হয়ে চলে এসেছে।
সকালের মাছ, মল্লিকদা তখন বললো না। মিত্রা বললো।
রেখেছিস? ছোটোমা আমার দিকে তাকাল।
আমি রাখিনি। ভজুকে বলেছিলাম। ও খায়নি।
তুই ওকে খেতে দিসনি!
কেন দেবনা। আমি ও একসঙ্গে খেয়েছি। তারপর বেড়িয়েছি।
ছেলেটাকে না খাইয়ে মারবি নাকি?
মহা মুস্কিল।
ভজু পেছনে দাঁড়িয়ে হাসছে।
আমি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। সোফায় এসে বসলাম।
অমিতাভদা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, কিরে চা কোথায় গেল?
আসছে।
তুই কি করছিলি?
আমি চুপ থাকলাম। মিত্রা প্লেটে করে পকৌরা নিয়ে এলো। সেন্টার টেবিলে রাখল। একটা তুলে নিয়ে বললো, এটা তোর ভাগেরটা নিলাম। তুই একটা কম খাস।
মিত্রা আজ বেশ খোশ মেজাজে আছে। ওকে দেখেও ভালো লাগছে। অনেক বেশি ঝরঝরে। বেশ ফুরফুর করছে।
দাদা একটা পকৌরা তুলে নিয়ে মুখে দিল।
টেস্টটা ভালো এনেছিস, কি দিয়ে বানালি?
স্রেফ ডাল বাটা।
মিত্রা কয়েকটা নিয়ে এসে ভজুর হাতে দিল। ভজুর মহা আনন্দ।
মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললো, দিদিমনি অনিদা যখন চিলি চিকেন বানাচ্ছিল দারুন গন্ধ বেরিয়েছিল।
তাই, দাঁড়া একটু চেঁখে দেখি। কে মেখেছিল?
আমি।
মিত্রা রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
ছোটোমা চা নিয়ে এলো।
হ্যাঁরে ডালে সম্বার দিস নি।
না। অজকে ওই ভাবে খেয়ে দেখো।
তোর বড়োমাও তাই বললো।
আমার মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বললো, তুই সবেতেই এক্সপার্ট।
সবাইকে আজ খুশি খুশি দেখছি। সবাই যখন একসাথে ঢুকলো, তারমানে একসাথেই সবাই কোথাও গেছিল। এদের দুজনের কথাবার্তায় মনে হচ্ছে বেশ খোশ মেজাজেই আছে।
আমি চায়ে চুমুক দিয়ে দাদাকে বললাম, কাগজ দিয়েছে ওরা।
হ্যাঁ হ্যাঁ, সনাতনবাবু সব দিয়ে গেছে। তোর ঝাড় খাওয়ার পর, ঠাকুর না কে এসেছিল। আমি চিনি না। আমাকে বললো গাড়ির ব্যাপারটা দেখে।
কি বললো।
সনাতনবাবু বললো, সে নাকি স্যারেন্ডার করেছে। ব্যাপারটা কি বলতো। তুই পটা পট বিজ্ঞদের মতো সব বলেগেলি, ওরাও মেনে নিল।
আমি এবার অমিতাভদাকে গল্পটা বললাম।
প্রত্যেকটা গাড়ি পিছু তেল এবং কিলোমিটার মিলিয়ে মাসে পাঁচশো টাকা কিংশুকের পকেটে আসে। আমাদের তিনশো গাড়ি আছে। তাহলে বোঝ কতটাকা মাস গেলে ওর পকেটে আসছে। পেমেন্ট যেহেতু ওর হাত দিয়ে যাচ্ছে, অতএব টাকা ওর কাছেই আসবে।
তুই ধরলি কি করে। আমি কাউকে বলবো না। তোর কাছ থেকে গোয়ান্দাগিরিটা শিখি।
আমি হেসে ফেললাম, মিত্রা বড়োমা এসে আমার দু-পাশে বসলো। দু-জনের হাতেই চায়ের গ্লাস।
সর না, দুকাঠা জায়গা নিয়ে বসে আছিস কেন। মিত্রা বললো।
আমি একটু সরে বসলাম।
হ্যাঁরে তুই পকৌরাতে কি দিয়েছিস?
কেন!
বেশ ভালো গন্ধ ছাড়ছে।
তোমার ওখানে চাউমিনের মশলা ছিল একটু দিয়ে দিয়েছি।
বড়োমা হাসছে।
এই বুদ্ধিটা কোনও দিন খাটাইনি।
দিলে সব মাটি করে।
আ-মরন, আবার কি হলো?
আমি অনির কাছ থেকে গোয়েন্দাগিরি শিখছিলাম।
বুড়োবয়সে! বড়োমা আমার দিকে তাকাল।
অনি একবারে বলবিনা। ও যেমন অখাদ্য আছে তেমন থাক।
দাদা বিড় বিড় করছে।
ছেলেটা আগুনের সামনে থেকে সবে তেতেপুরে উঠে এলো, ওমনি খোঁচান শুরু হয়ে গেছে। শেখার আর সময় পেলে না।
দেখলি অনি, তুই এবার বল, কার দোষ।
ছোটোমা আর চা আছে?
ছোটোমা রান্নাঘর থেকে বললো, কেন?
একটু নিয়ে এসো তিনজনের জন্য।
দেখো দেখো কে কাকে দেখে। তুমি নিজে এক গ্লাস নিয়ে এসে বসেগেলে।
কেন তুমি খাও নি, তোমায় না দিয়ে গিলছি নাকি।
অমিতাভদা চুপ করে গেল।
মাসে দেড় লাখ টাকা মানে বছরে আঠারো লাখ সরাতো! অমিতাভদা বললো।
এবার ওটা ব্যাঙ্কে যাবে, ঋণ শোধ হবে।
বড়োমা আমার দিকে তাকাল।
এই ভাবে তুমি যদি সব ডিপার্টমেন্টের দিকে চোখ দাও, তাহলে মাসে ড্রেনেজ মানি প্রায় ৫০ লাখ টাকা। বছরে কতো।
দাদা আমার দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে।
৬ কটি।
বলিস কি!
এটা খুব সাধারণ ব্যাপার। এরপর এ্যাডের ব্যাপারটা যদি তোমায় ডিটেলসে বলি, তুমি হার্ট ফেল করে যাবে।
কি রকম?
আমি এই কদিনে কত কোটি টাকার এ্যাড কালেকসন করেছি।
১২৫ কোটি।
এর ৩০ শতাংশ আমার কমিশন। তাহলে কত কোটি হলো।
যাঃ তুই গাঁজাখুরি গল্প বলছিস।
না দাদা ও ঠিক বলেছে, আমি ওর ঋণ কোনওদিন শোধ করতে পারব না।
মিত্রা মাথা নিচু করে বললো।
চম্পকদা, সুনিতদা এই করে ওই জায়গাটা কিনেছিল। বকলমে মলের সঙ্গে পার্টনারশিপ করে। নতুন কাগজ বার করবে। কতদিয়ে কিনেছিল শুনবে?
কতো?
৭৫ কোটি টাকায়, তিনটে ফ্লোর ৩০০০০ স্কয়ার ফিট।
ছোটোমা কখন এসে চেয়ার নিয়ে বসেছে, জানিনা।
ওরা সবাই অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বসে আছে।
এতো টাকা এরা পেল কোথায় বুঝে দেখো।
কাগজ কে করবে?
সুনিতদা এডিটর, চম্পকদা এ্যাড দেখবে। তোমার হাতের তৈরি ছেলেগুলোকে নিয়ে পালিয়ে যাবে। কাগজ তৈরি হয়ে যাবে।
দাদা আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
মিত্র আমাকে মালিক বানাবার আগে, আমার কাছেই অফার ছিল। আমি চিফ রিপোর্টার বা পার্টনারশিপেও যেতে পারি। যখন দেখল আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না। তখন ফোটাবার ধান্দা করলো। মিত্রা যে আমার পূর্ব পরিচিত, এটা ওরা আগে থেকে বুঝতে পারেনি। বুঝতে পারলে অন্য স্কিম করতো।
তাছাড়া তুমি গত বছর একবার ওদের ক্লাবের একটা প্রোগ্রামে আমাকে পাঠিয়েছিলে। সেই দিন ওকে দেখলাম। ওর হাজবেন্ডের সঙ্গে আলাপ করাল। ওর বাড়িতে গেলাম। প্রায় ছ-বছর পর দেখা।
ছয় না আট বছর। মিত্রা বললো।
এরপর মিত্রা যে ডিগবাজি খেতে পারে, ওরা ভাবেনি।
আমার মালিক হওয়ার সংবাদ যখন পাকা হয়ে গেছে মিত্রার সৌজন্যে, তখন ওরা তড়িঘড়ি ঘর গোছাতে গেল। ব্যাশ ফাঁদে পা দিল। আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলাম।
দেখলাম ওরা টোপ গিললো।
ইসলামভাইকে সব বললাম, মেন অপারেটর ও। আমি জানতাম ও বিগড়লে ভজুর মা দামিনীমাসি আছে। কাজ আমি বার করে নেবই। ইসলামভাই আমাকে ভালোবাসে, সে মযর্দাটুকু রেখেছে। ওকে একসময় আমিও ভীষণ হেল্প করেছিলাম।
মেরিনাদি যখন ছিল তাইনা অনিদা। ভজু বললো।
তোর মনে আছে?
হ্যাঁ।
ভজু আমার অনেকদিনের সঙ্গী।
ছোটোমা উঠে গিয়ে ভজুর মাথায় স্নেহের হাত দিয়ে চুল গুলো ঘেঁটে দিল। ভজু হাসছে।
নাও অনেক গল্প হলো, এবার খাবার বন্দবস্ত করো। মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম, কিরে তুই কাপর ছাড়বি না?
খেয়ে নিই।
পেট ঠিক আছে?
খারাপ হতে যাবে কেন!
হাসলাম।
তুই সবসময় কথা শেষ করিস না, খালি ছুঁয়ে রেখে দিস। অমিতাভদা বললো।
কেন বলবে কেন শুনি—তুমি আমায় কোনওদিন পুরো কথা বলো?
আমার দিকে তাকিয়ে।
নারে অনি, একবারে বলবিনা। নিজে থেকে জানুক। বড়োমা বললো।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে।
কিছু বলবি?
সনাতনবাবু আবার আজকে আমায় ফোন করেছিল।
কেন?
তোকে বলতে বারন করেছে। তুই হয়তো তাড়িয়েই দিবি।
কিসের জন্য বল!
কিংশুকের চেকটা বাউন্স করেছে। বলেছে কয়েকদিনের মধ্যে দিয়ে দেবে।
তুই দায়িত্ব নে। নাহলে তোর এ্যাকাউন্ট থেকে আমি নিয়ে নেব।
মিত্রা হাসছে।
দাদাকে বল। দাদাও জানে।
আমি অমিতাভদার দিকে তাকালাম।
না ও বললো, আমি বললাম আমি অনিকে বলে দেব।
তাহলে আর একটু বলি তোমাদের। তাহলে হয়তো তোমাদের ঘুম ভাঙবে।
বল।
প্রেসের যে স্ক্র্যাপ মাল বের হয়, এটা অতীশবাবু কোনওদিন ঠিক হিসাব দেয়নি। উনি ওইখান থেকে টাকা সড়ান। সবার সঙ্গে সবার সাঁটগাঁট আছে।
বাবা তুই এসব করলে, লিখবি কখন!
তোমরা আমার সাংবাদিক জীবনটা নষ্ট করে দেবে। মাথা নিচু করে বললাম।
ঠিক আছে, তোকে আমি কথা দিচ্ছি, এবার থেকে আমি এটা দেখব।
বড়োমা বললো এতদিন পর ঘুম ভাঙছে।
ঘুমিয়েছিলাম কোথায় যে ঘুমভাঙবে।
সিনিয়ার কে তুমি না অনি।
আরে বাবা আমি সিনিয়ার হলেও এগুলো অফিসিয়াল ব্যাপার, আমার জানার কথা নয়। অনি সব ঘাটে জল খায়, তাই পটাপট জেনে ফেলছে।
মরন, তোমায় বারন করেছিল কেউ জল খেতে।
আমি বড়োমার কথায় হাসছি।
প্রেসের কাগজের ছাঁট, রঙের টিন, বস্তা, স্ক্র্যাপ প্লেট আরও অনেক কিছু নিয়ে মাসে প্রায় দু-লাখটাকা চোখে দেখা যেত না। আমি ওখানে হাত দিলাম। দেখলাম সেখানেও বড় ঘোটালা। অতীশবাবুর কলকাতায় কতো প্রপার্টি আছে জানো?
অমিতাভদা আমার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে।
উনি যা মাইনেপান তাতে ওই প্রপার্টি করতে পারেন না। আমি প্রথমে ওঁর কলকাতায় সম্পত্তির পরিমান দেখলাম। তারপর খোঁজ খবর নিতে শুরু করলাম। সব জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। তোমার থেকেও অতীশবাবু, সুনিতদা, চম্পকদার প্রপার্টি বেশি।
তোর সোর্স কে?
তোমায় বললে মাথা খারাপ হয়ে যাবে।
হোক তুই বল।
ওঃ কত উৎসাহ দেখ। একবারে বলবিনা। বড়োমা বললো।
হাসলাম। দাদা জানতে চাইছে বলি।
কেন বলবি, তোর সময় লাগেনি।
ছোটোমা, মল্লিকদা, মিত্রা মুখটিপে হাসছে। অমিতাভদার মুখটা করুণ।
তোমরা এইজগত সংসারে যাদের ক্রিমিকীট বলো তারাই আমার সোর্স। বলতে পার ভজুও আমার একটা সোর্স।
অমিতাভদা ভজুর দিকে তাকিয়ে আছে। ভজু মাথা নিচু করে বসে।
অজ গর্বকরে বলছি দাদা, যদি আমি পতিতা পল্লীতে আঠারো মাস না থাকতাম, তাহলে হয়তো আমার জীবনটা অন্য খাতে বইতো। ওই পল্লী আমাকে অনেক শিক্ষা দিয়েছে।
সত্যি কথা বলতে কি ভজু বোকাহাবা কিন্তু ও তোমার থেকে বেশি মানুষ চেনে। বলবে কেনো? ও যে প্রতিদিন তোমার থেকে বেশি নতুন নতুন মানুষ দেখে। আর সে মানুষগুলো তোমার মতো সাধারণ নয়। কি বললাম বুঝতে পারছো?
দাদা আমার দিকে তাকিয়ে থম মেরে বসে আছে।
আমি উঠে দাঁড়ালাম, দাদা পায়ে পায়ে আমার কাছে এগিয়ে এলো। আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। আমার পিঠে চাপর মারতে মারতে বললো—
আমি এতদিন যা স্বপ্ন দেখেছি মনে হচ্ছে তুই তা সফল করতে পারবি। তুই আরও বড় হবি। আমার সর্বশক্তি দিয়ে তোকে সাহায্য করবো।
ওরা চারজনে আমাদের দু-জনকে ঘিরে ধরলো। মিত্রা দাদার পেছনে। ওর স্বপ্নমাখা চোখদুটো চোখে পরে গেল।
সবাই একসঙ্গে খেতে বসলাম। আমি মাঝখানে। আমার একপাশে মিত্রা একপাশে বড়োমা। আর আমাদের মুখো মুখি ছোটোমা, মল্লিকদা, অমিতাভদা। নিচে ভজুর আসন করা হয়েছে, ভজু নিচ ছাড়া কোথাও বসবে না। সকালেও আমি টেবিলে বসে খেয়েছি ভজু নিচে। আজ বুফে সিস্টেম যে যার ইচ্ছে মতো নিয়ে খাও। তবে বড়োমা, ছোটোমা সব দিচ্ছে।
আমি মিত্রার পাতের দিকে তাকালাম।
একবারে হাত দিবি না। নিজেরটা সামলা।
মিত্রা আমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে।
তখন দু-পিশ মেরেছিস।
বেশ করেছি, তোর কি। পারলে তুইও খা।
হাগুড়ে।
মিত্রা ডালে চুমুক দিল।
ডালটা দারুন বানিয়েছিস। বড়োমা একবাটি আলাদা করে সরিয়ে রাখো।
কেন গিলবি?
তুই কথা বলবি না, আমি বড়োমার সঙ্গে কথা বলছি।
ছোটোমা, মল্লিকদা মুচকি মুচকি হাসছে। দাদা গম্ভীর হওয়ার অভিনয় করছে, বড়োমা চুপচাপ।
কাল যেতে হবে, রাস্তায় যদি গাড়ি থামাতে বলিস….।
খুব আস্তে চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম। তবে সবাই শুনতে পেয়েছে।
আচ্ছা তুই খা না, ওকে বিরক্ত করছিস কেন। বড়োমা বলে উঠলো।
কোথায় বিরক্ত করলাম!
ওকে ওর মতো খেতে দে। ওর খুব খিদে পেয়েছে আজ। অমিতাভদা বললো।
মিত্রা আমার দিকে তাকাল, ভাবটা এরকম, বোঝ এবার।
হ্যাঁরে অনি তুই চিলি চিকেন তৈরি করা শিখলি কোথা থেকে? বড়োমা বললো।
আমরা দুজনে রামবাগানে কৃষ্ণদার হোটেলে কাজ করতাম।
ভজু নিচ থেকে চেঁচিয়ে উঠলো।
বড়োমা আমার মুখের দিকে তাকাল! মিত্রার হাতে চিকেন বাটারফ্রাই ধরা আছে। মুখে তুলতে গিয়ে থমকে গেছে। সকলের খাওয়া থেমে গেছে। একবার আমার মুখের দিকে তাকায়। একবার ভজুর মুখের দিকে তাকায়। আমি ওর পাত থেকে একটা মাংসের টুকরো সরিয়ে দিলাম। ছোটোমা দেখে মুখ টিপে হাসলো।
তোর আর কি অভিজ্ঞতা আছে বলতো। বড়োমা ভাতে ডাল মেখে বললো।
সব একদিনে হয় কি করে বলো, তুমি মিত্রাকে আলাদা করে মুরগীর ঠ্যাং খাওয়াবে আমার জন্য কিছু রাখবে না।
শয়তান, তুই আমার পাত থেকে তুলে নিয়েছিস। আমি এখানে রেখেছিলাম দে আগে।
আমি তখন মিত্রার পাত থেকে তুলে নেওয়া ঠ্যাংটা সাঁটাতে আরম্ভ করেছি। ও আমার মুখ থেকে ওটা কেরে নিয়ে বাকিটা খেয়ে নিল।
ওর রকম সকম দেখে সবাই হাসছে।
যাই বল চিলি চিকেনটা বেশ বানিয়েছিস। মল্লিকদা বললো।
ছোটোমা ভাত।
আমার পাতে ভাত পরলো।
কিগো ডালের কোনও কমেন্টস পেলাম না। বড়োমার দিকে হেলে বললাম।
তোর কাছ থেকে রান্নাটা শিখতে হবে।
শুধু আমি শিখতে গেলেই বয়েস হয়ে যায়, তাই না? অমিতাভদা চোখেমুখে ঢেউ তুলে বললো।
চুপ করো। জীবনে নিউজ ছাড়া কিছু শিখেছো।
আমি মুচকি মুচকি হাসছি, কিগো মাছ কোথায় গেল?
বড়োমা জিভ বার করলো। ছোটোমা দেখে হেসে ফেললো।
একবারে আনবে না। ওটা আমাদের তিনজনের জন্য, সকালে ওরা খেয়েছে। মিত্রা চেঁচালো।
তুই একা খা না। বুঝেছি আজ তোর শরীর ভালো হয়ে গেছে।
ওষুধ পড়ছে। খিদে পাবেই।
ওখানে চল পান্তা গেলাব।
চিংড়িমাছের টক?
সব।
আমাদের কথায় মল্লিকদা মুচকি মুচকি হাসছে।
ছোটোমা উঠে মাছের বাটি নিয়ে এলো।
উঃ সাইজ কি পাবদা মাছের। দাদাকে একটা মল্লিকদাকে একটা দিয়ে দাও, বাকিটা তোমার ও পাশে রেখে দাও। একবারে এপাশে নয়, তাহলে কপালে কিছু জুটবে না।
বড়োমা হেসে ফেললো। ও ছোটো তোরা তখন ওকে বেশি করে কচুরি খাওয়াতে পারতিস।
ভাত নিবি না?
না।
কেন।
এগুলো খেতে হবে না।
এতো খাবি! নির্ঘাত আজ রাতের ঘুমটা ভালো হবে না।
না হোক।
অনি তুই তোর অভিজ্ঞতা গুলো লিখে রাখিস? অমিতাভদা বললো।
হ্যাঁ।
একটা কাজ কর।
একবারে কাগজের জন্য লিখবি না। বড়োমা বললো।
সবাই হাসে।
তোমরা ওকে পয়সা দেবে।
শুনলি অনি তোর বড়োমার কথা। কার সঙ্গে ঘর করলাম বল তিরিশ বছর।
অমিতাভদা এমন করে বললো, সবাই হাসছে।
আমায় একটু চিলি চিকেন দেবে। বড্ড ভালো রেঁধেছে অনি। অমিতাভদা বললো।
মিত্রা মাথা নিচু করে মুখ টিপে হাসছে।
ছোটোমা, অমিতাভদার পাতে দিল।
মল্লিকদা নিস্তব্ধে খেয়ে যাচ্ছে।
আমি কবিতা আওড়ালাম, ‘আমসত্ব দুধে ফেলি তাহাতে কদলি দলি/হাপুশ হুপুশ শব্দ, চারিদিক নিস্তব্ধ/পিঁপড়া কাঁদিয়ে যায় পাতে’।
এটা আবার কে রে। বড়োমা বললো।
মল্লিকদার গলা পেলাম।
বুঝলে না, আমায় আওয়াজ দিল।
আমি চুপ।
বুঝলি অনি ভালো জিনিষের কদর করতে হয় নিস্তব্ধে।
ছোটোমা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।
শোনো বড়ো, অনির একটা আলাদা পাঠক আছে, তারা অনির লেখা পড়তে ভালোবাসে। ও লিখতে শুরু করলেই কাগজের সার্কুলেশন বারবে। সার্কুলেশন বারা মানেই এ্যাড আসবে। এ্যাড আসা মানে, ঋণ শোধ হবে।
ও বাব এতো আছে! তাহলে তুই লেখ অনি।
আবার সকলে হাসে।
কাল কখন বেরবে।
পাঁচটা।
তারমানে চারটে থেকে তোড়জোড় চলবে।
কাকে যেতে বলেছিস? মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম।
তুই যেরকম বলেছিস, সেরকম ব্যবস্থা করেছি।
কি রকম?
রবীন যাবে, বড় গাড়ি আসবে।
অনাদিকে ফোন করেছিলি।
আমি করিনি। সকালে নীপা ফোন করেছিল। বলে দিয়েছি।
বেশ।
তোমাদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা। অমিতাভদার দিকে তাকালাম।
ভজু আছে।
কিরে ভজু পারবি।
খুব পারবো।
ও বাড়ির কি ব্যবস্থা করলি।
বুড়ীমাসি আসবে। সব তালা দিয়ে দিয়েছি। ওরা আছে।
কিছু খুলে রেখে আসিসনি?
ছোটোমা তালা দিয়েছে। আমি দিইনি।
যাক রক্ষে, না হলে তোর তালা লাগান।
কেন? ছোটোমা তাকাল।
তালা তালার মতো ঝুলবে, কিন্তু দেখা যাবে কেউ এসে ঢুকে পরেছে।
তোকে বলেছে। মিত্রা বললো।
খাওয়া শেষ হলো।
আমি ওপরে উঠে এলাম। মিত্রা এলো একটু পরে।
যাই বল বুবুন তুই আজ দারুন রান্না করেছিস, সবাই খুব তৃপ্তি করে খেল।
তুই।
আমার কথা বাদ দে। আমি তো হাঘড়ে।
হাসলাম।
মিত্রা কাপর খুলছে, ব্লাউজ খুললো, দে ফিতেটা একটু আলগা করে।
আমি ওর পেছনে দাঁড়িয়ে ফিতেটা খুলে দিলাম, বুক থেকে খসে পরলো। দুষ্টুমি করতে ভুললাম না।
তুই শুরু করলি মনে থাকে যেন।
না আজ কিছু নয়।
মিত্রা এগিয়ে এসে আমার পাজামার দড়িতে হাত দিল।
ঝামেলা করবি না।
মিত্রা হাসতে হাসতে মুখটা কেমন করে উঠলো।
কি রে!
পেটটা কেমন করছে।
ছোটোমার কাছ থেকে কার্মোজাইম খেয়ে আয়।
খেয়ে এসেছি।
বাথরুমে যাবি?
যা খেলাম পটি না করলে হজম হবে না।
যা বাথরুমে যা। আমি শুলাম।
এখন ঘুমবি না। আমি ঘুরে আসি তারপর।
মিত্রা টাওয়েলটা নিয়ে বাথরুমে দৌড়লো। আমি আমার কাগজ পত্র গুছিয়ে নিলাম। চিকনার ডিডটা দেখলাম। হিমাংশু বাংলায় লিখে পাঠিয়েছে। অফিসের কাগজ উল্টে পাল্টে দেখে নিলাম। সব ঠিক আছে। ওখানে গিয়ে মিত্রাকে অনেক কাজ শেখাতে হবে, না হলে আমার অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে।
মিত্রা বাথরুম থেকে বেরলো, বুকের ওপর টাওয়েলটা কোনওপ্রকারে বেঁধে বেরিয়ে এসেছে। আমি ওর দিকে তাকালাম।
তাকাস না তাকাস না। অনেক দেখেছিস।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
বুবুন খারাপ হয়ে যাবে বলে দিচ্ছি, একবারে কাছে আসবি না।
তখন খামচে ধরেছিলি না।
ঠিক আছে, ঠিক আছে, আর করবো না, প্রমিস।
মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে বললাম, প্রমিস। প্রমিস দেখান হচ্ছে।
আমি চেঁচাব।
চেঁচা। দেখি কত গলার জোর তোর।
আমি বাথরুমে ঢুকে যাব।
ছিটকিনি দিয়ে দেব, সারারাত থাকতে হবে।
ঠিক আছে, ঠিক আছে, আর কোনওদিন হবেনা।
ছেড়ে দিলাম মনে রাখবি।
হোলডোলটার ওপরের চেন টেনে আমার ম্যাক্সিটা দে।
নিজে নিয়ে নে।
দে-এ-এ-এ না।
আমি ম্যাক্সিটা বার করে ওর দিকে ছুঁড়ে দিলাম।
খাটের ওপর গিয়ে বসলাম। কাগজগুলো গুছিয়ে একটা ফাইল টেনে নিলাম।
মিত্রা ম্যাক্সিটা পরে চুল আঁচড়াচ্ছে।
এগুলো কি আজ বুঝবি, না ওখানে গিয়ে বুঝবি।
কি বলতো?
চিকনার ব্যাপারটা।
ওখানে গিয়ে।
টাকা তুলেছিস?
হ্যাঁ।
কতো।
২ লাখ। তুই তাই বলেছিলি।
ঠিক আছে। লাগলে আবার এসে নিয়ে যাব।
সনাতনবাবু ব্যাঙ্কে টাকা জমা দেওয়ার স্লিপগুলো তোকে দিয়ে সই করাচ্ছে।
করাচ্ছে।
তুই লিখে রাখছিস ডাইরিতে।
তুই যা যা বলেছিস আমি তাই করছি, একেবারে অক্ষরে অক্ষরে।
আমি টেবিলে গিয়ে ফাইলটা রাখলাম। মিত্রা মুখে লোসন লাগাচ্ছে।
শুলাম, কালকে রেডি হয়ে ডাকবি। তার আগে ডাকবি না।
দাঁড়া তোকে শোয়াচ্ছি।
আবার শুরু করলি।
আমি কিন্তু এখন টাওয়েল পরে নেই।
হাসলাম।
মিত্রা নিজের কাজ শেষ করে বিছানায় এলো, সরে শো।
বিরক্ত করিস না, তুই ওই পাসে গিয়ে শো।
না আমি ধারে শোব, তুই সরে যা।
আমি সরে গেলাম, ও শুলো।
অনেক দিন থেকে লক্ষ্য করছি মিত্রা এখন মাথায় আর সিঁদুর দেয় না। মাঝে মাঝে ভাবি ওকে একবার জিজ্ঞাসা করি, তারপর আর জিজ্ঞাসা করা হয় না। যদিও ওর ডিভোর্সের খবরটা বুড়ীমাসির কাছ থেকে পাওয়া হয়ে গেছে।
এখন ও চুলটা উল্টে আঁচড়ায়। বয়সটা যেন কয়েক বছর কমিয়ে ফেলেছে। মিত্রা আমার দিকে ফিরে শুলো, আমার বুকে ওর মুখটা রাখল।
বুবুন।
উঁ।
তুই কি ভাবছিস বলতো। অনেকক্ষণ থেকে তোকে লক্ষ্য করছি।
কি ভাববো, কিছু না।
তুই লোকাচ্ছিস কেন। বল না।
সত্যি আমার ভাবার আর কি আছে, কে আছে আমার, কার জন্য ভাববো।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে।
তোর কোম্পানীর কথা ভাবছি। যা জটিল পরিস্থিতি, যত ঢুকছি, তত যেন গাড্ডায় পড়ে যাচ্ছি।
আজকে কোথায় গেছিলাম জিজ্ঞাসা করলি না?
মিত্রার দিকে তাকালাম, আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। চোখে অনেক প্রশ্ন। আমার কপালে হাত দিল। চোখের পাতায় হাত দিল।
তোকে অনেক কষ্ট দিচ্ছি। কি করবো বল, তুই ছাড়া আমার কে আছে। আমাকে সবাই ঠকিয়েছে।
আবার মন খারাপ করে?
তুই বিশ্বাস কর, অনেক চেষ্টা করি, পারি না। তোকে না পেলে হয়তো জীবনটা শেষই করে ফেলতাম।
কেন। এতটাই দুর্বল তুই। আগে এরকম ছিলি না।
সত্যি, চাপ কি জিনিস জানতাম না, শয়তান গুলোর হাতে খেলার পুতুল হয়ে গেছিলাম, কেউ তখন আমার পাশে এসে দাঁড়ায় নি। যাকেই বিশ্বাস করেছি, সেইই সব কিছু নিয়ে ভেগে পড়ার ধান্দা করেছে। এমন কি শরীরটাকে পর্যন্ত বাদ দেয়নি।
কে সে, বলতে পারবি। আমার চোখে মুখে বিষ্ময়।
তুই তাকে শাস্তি দিবি, কিন্তু আমার ছ-টা বছর ফিরিয়ে দিতে পারবি।
অন্ততঃ শাস্তি পেয়ে সে এইটুকু বুঝুক এটা তার অন্যায়।
পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে জানিস, তারা এই জন্য পৃথিবীর আলো দেখে।
কে সেই ব্যক্তি বললি না?
আবার কে ওই অমানুষটা।
সেদিন তুই ওর কাছে গেছিলি কেন?
আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিল।
কেন?
(আবার আগামীকাল)