জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
বিংশ কিস্তি
ও ভেবেছিল তোর গলায় মালিকানার লকেট ঝুলিয়ে দিয়ে ও পেছন থেকে খেলবে। তুই একটা গ্রামের ছেলে, গর্ধভ, ওর কাজ গোছাতে অনেক সুবিধা। আমি তোকে জানতাম, তোর সঙ্গে যে আমার একটা রিলেসন ছিল, তা ওকে বলিনি, তুই আমার খুব ভালো বন্ধু এটাই ও জানতো।
তবে সব বলেছি ফাইন্যাল হওয়ার পর। আমিও সেই সুযোগটা নিলাম। আমিই জোর করে তোর নামে শেয়ার ট্রান্সফার করিয়েছি। এছাড়া আমার বাঁচার আর কোনও পথ ছিলনা বুবুন।
মিত্রা আমার বুকে মুখ চাপা দিয়েছে।
কাঁদবি না, কান্নাকে আমি ঘৃণা করি। পৃথিবীটা কেঁদে ভাসাবার জায়গা নয়। এখানে তোকে লড়ে অর্জন করতে হবে। সোজা আঙুলে না উঠলে, বাঁকা আঙুল দেখাতে হবে।
কাউকে আমার বুকটা দেখাতে পারি না। তাই কাঁদি। তুইও মাঝে মাঝে অবুঝপনা করিস।
বল আমায়। না বললে আমিই বা বুঝবো কি করে, কোনটা আমার ভুল, কোনটা ঠিক।
তুই শুনবি আমার কথা।
শোনার মতো হলে নিশ্চই শুনবো। আমি কাজ করতে চাই। প্রথমে ঘর গোছাব, তারপর শেষ করবো।
তুই কেন মলকে সরাতে গেলি।
এছাড়া উপায় ছিল না।
ও তোর প্রতি রিভেঞ্জ নেবে।
নেবার আগে দশবার ভাববে।
আমি ওকে চিনি। এতদিন আমাকে দেখিয়ে ওরা ব্যাবসা করেছে। ক্লাবে কি আমি ইচ্ছে করে গেছি। তুই দেখেছিস কোনওদিন? সেই লাইফস্টাইল কি আমার ছিল?
জানি।
ওরা আমাকে যেদিন টোডির বিছানায় তোলার চেষ্টা করলো, সেদিনই আমি সব বুঝতে পারলাম। নিজেকে বাঁচাতে ওরা যা যা বলেছে, তাতে সই করেছি। ওরে ঘর শত্রু বিভীষণ, আমি কি করবো।
মিত্রা কাঁদছে।
আমি মিত্রার মুখটা বুক থেক তুললাম, টোডি কে?
বম্বেতে থাকে প্রচুর ক্ষমতা।
কি করে বুঝলি?
সেন্ট্রালের অনেক মিনিস্টারের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক।
ব্যাশ। সেই কারনে তার প্রচুর ক্ষমতা। পাগলী।
আরও আছে। বড়ো বড়ো অর্থনৈতিক সংস্থার মেম্বার।
তোকেও বানিয়ে দেব। তুই জানিস না, একটা কাগজের কতটা ক্ষমতা।
এখন বুঝছি। আগে বুঝতাম না। তুই সেদিন যেভাবে মন্ত্রীটার সঙ্গে কথা বললি, সেদিন একটু একটু বুঝলাম।
তোর কি মনে হয় আমি পারবো?
মিত্রা আমার বুকে চুমু খেল, তোর জন্য আমার বুকটা মাঝ মাঝে ফুলে ওঠে।
বেশি ফোলাস না দেখতে বাজে লাগবে।
দেখেছিস, তুই কেমন।
হাসলাম।
আজকে তার জন্যই এক জ্যোতিষির কাছে গেছিলাম সবাই।
আমার জন্য! জ্যোতিষি! সে আবার কি করবে?
তোর ভবিষ্যত জানতে।
কার কালেকসন?
আমার।
জ্যোতিষি আমার কি ভবিষ্যত বলবে, ও নিজের ভবিষ্যত বলতে পারবে?
এই কথা সেও বললো।
কি বললো, ভেরি ইন্টারেস্টিং।
বড়োমা বারন করেছে তোকে বলতে।
তাহলে বলিস না।
তোকে না বললে আমার পেট ফুলে যাবে।
তাহলে বল।
তোকে কেউ আটকাতে পারবে না। তুই যে কাজ করবি, সেই কাজে সাকসেস হবি। তুই একগুয়ে, গোঁয়াড়, কারুর কথা শুনবি না।
আর।
তোর প্রচুর শত্রু। কিন্তু সবাই তোর কাছে মাথা নোয়াবে।
তাহলে আমি রাজা লোক বল।
দেখছিস, তুই কিছুতেই সিরিয়াস নোস, দেখ তুই কি ভাবে কথা বলছিস।
তোর বুক দুটো কি ভাড়িরে, বুক ফেটে যাচ্ছে।
দেখ দেখ তুই কি রকম।
আচ্ছা নিজেরটা গুছিয়ে নিয়ে তোকে ছেড়ে কবে পালিয়ে যাব?
তুই আমাকে ছেড়ে কোনওদিন পালাতে পারবি না।
কেন!
আলাদা ডেকে জিজ্ঞাসা করেছিল, আমার সঙ্গে তোর ফিজিক্যাল রিলেসন হয়েছে কিনা।
তুই বোকার মতো সত্যি কথা বললি।
যা হয়েছে তাই বলেছি, বোকার মতো কেন!
তুই বলতে পারতিস হয়নি। তাহলে দেখতিস বেটা অন্য কথা বলছে। সব বুজরুকি।
ঠিক আছে বুজরুকি, তোর ভূত ভবিষ্যত বললো কি করে।
সেটা কি রকম!
তোর মা-বাবা নেই, তুই পড়াশুনায় দারুন। অনেক কষ্টে মানুষ হয়েছিস।
আর্লি লাইফে এটা সকলের হয়। কষ্ট করেই মানুষ বড়ো হয়। কে আর শুয়ে-বসে মানুষ হয়েছে। হ্যাঁ বলতে পারিস মা-বাবা সকলের থাকে আমার ছিল না।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে।
বলেনি আমি গ্রেট মাগীবাজ।
সত্যি কথা বলবো।
বল।
আমাকে সে কথাও বলেছে। তোর বহু নারীসঙ্গ আছে, আমি যদি তোর সঙ্গে থাকতে চাই তাহলে আমাকে এইটা মেনে নিতে হবে।
বুকটা ধড়াস করে উঠলো, মিত্রা আমাকে বুঝতে চাইছে, নাকি জ্যোতিষের গল্প ফেঁদে….।
নারীসঙ্গ হয়েছে না হবে।
তা বলতে পারলো না। তবে তোর নারীসঙ্গ আছে।
এই তোর সঙ্গ যেমন উপভোগ করছি।
মিত্রা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
দিনরাত যখনই সুযোগ পাই তোকে চটকাতে ইচ্ছে করে।
দেখেছিস তুই। এই সম্বন্ধেও বলেছে।
কি বলেছে?
তোকে বোঝা খুব মুস্কিল। কিন্তু তুই যাকে একবার ভালোবাসবি, তারজন্য তুই জীবন দিবি।
তোর জন্য অবশ্যই এই কাজ করবো না।
সেই জন্য দু-রাত জেগেছিস। রবীনের পেট থেকে কথা বার করে, আমার পৌঁছবার আগে বাড়িতে পৌঁছেছিস। আমাকে তেঁতুল খাইয়ে বমি করিয়েছিস। বুড়ীমাসিকে দাঁড় করিয়ে বমি পরিষ্কার করেছিস। সকালে আমার হাতে একটা ঠেসে থাপ্পর খেয়েছিস। নিজে কেঁদেছিস, আমাকে কাঁদিয়েছিস। জ্বর হয়েছে রাত জেগেছিস। সারারাত জেগে জেগে মাথায় জল পট্টি দিয়েছিস। আমাকে সুস্থ করে তোলার জন্য নিচ থেকে তেল গরম করে এনে আমার সারা শরীর মালিশ করেছিস।
আমি মিত্রার মাথাটা ধরে বুকে চেপে ধরলাম। ছাড় আমাকে, বলতে দে, আমারও কিছু বলার থাকতে পারে। আমারও কিছু চাওয়ার থাকতে পারে তোর কাছে। সেটা কোনওদিন বোঝার চেষ্টা করেছিস।
কিছুক্ষণ চুপচাপ।
এরপর কাঁদলে বলবি কাঁদবি না। আমি কান্নাকে ঘেন্না করি। কান্না ছাড়া একটা মেয়ের বলবার কি আছে বলতো। বড়োমাকে, ছোটোমাকে দেখেছিস। তারা তোর সামনে কাঁদে না। তোর আড়ালে তারা বালিশ ভেঁজায়। তোর চোখ আছে সে সব দেখার। কেন, কেন, কেন তারা কাঁদবে তোর জন্য। তুই কে?
আমি মিত্রার মুখটা বুকে চেপে ধরে আছি। বুঝতে পারছি মিত্রার চোখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল পরছে। কিছু বললাম না, একটা কথাই ভাববার চেষ্টা করলাম, আমি কি আমার অজান্তে এদের কোথাও আঘাত করে ফেলেছি। যার জন্য ওদের রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসাবে মিত্রা এসব কথা বলছে। খেয়াল করতে পারছি না।
এদিকটা এত দিন ভাবিনি। আমি দাদা মল্লিকদার সেফ্টির কথা ভেবেছি। ওদের আশ্রয় পাকা করেছি। আমি থাকতে ওদের কোনও অসুবিধে হবে না। মিত্রাকে এই মুহূর্তে একটা জায়গায় নিয়ে এসে দাঁড় করিয়েছি। আরও অনেক কাজ বাকি।
ওপর তলার কিছু লোককে ছাঁটতে হবে। এই মুহূর্তে নয়, আমাকে আরও ছ-মাস অপেক্ষা করতে হবে। তার আগে ওখানে দুটো উইং বার করে নিতে হবে। অনাদি, চিকনা সেটা পারবে বলে মনে হচ্ছে। প্রত্যেক মানুষের একটা স্বপ্ন থাকে। অনাদির রাজনৈতিক কেরিয়ারের স্বপ্ন আছে। আমাকে সেটা কাজে লাগাতে হবে।
কিরে আবার নিজের মধ্যে ডুবে গেছিস।
মিত্রার দিকে তাকালাম। চোখের পাতা ভেঁজা ভেঁজা। আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে।
হাসলাম।
তোর এই বিচ্চু হাসিটাই সকলকে হিপনোটাইজ করে দেয়।
তোকেও?
দেয় বলেই মরেছি। তোর ওপর ভীষণ রাগ হয়, মনে হয় তোকে আঁচড়ে কামরে…।
মেনি বেড়ালের মতো….।
মিত্রা হাসলো, বুকে মুখ লুকিয়ে বললো যখনই তুই হেসে ফেলিস আর কিছু বলতে পারি না।
এই হাসিটুকু ছাড়া আমার কি আছে বল। দেবার মতো কিছু নেই। আমি পরিবারের মধ্যে বড় হয়ে উঠিনি। আমার মধ্যে কিছু প্রবলেম থাকবেই। এটা তোদের মেনে নিতে হবে।
আমরা সকলে তোকে মেনে নিয়েছি, মানিয়ে নিয়েছি। তুই খারাপ ছেলে নোস।
নারে মিত্রা, সেটা বলতে পারবো না। নিজের আয়নায় নিজের মুখ দেখার সৌভাগ্য আমার এখনও হয়নি। এবার সেটা চেষ্টা করবো। একদিন মন খারাপ হলে আমি দীঘাআড়িতে গিয়ে সময় কাটিয়েছি। পাখিদের সঙ্গে কথা বলেছি। গাছের সঙ্গে কথা বলেছি। না হলে শ্মশানে গিয়ে বসে থেকেছি। মনে মনে কাউকে খোঁজার চেষ্টা করেছি। সব শেষে পীরসাহেবের থান।
আমার শান্তির নীড়। ওখানে গেলে আমি অনেকটা শান্তি পেতাম।
একসময় তোর মতো কতো কেঁদেছি। আমার কান্নার মূল্য এই পৃথিবীতে কেউ দেয়নি। একদিন নিজেই নিজেকে আবিষ্কার করলাম। কেঁদে কিছু লাভ নেই। চোখটা পাথরের মতো করতে হবে। দেখিস না, দেবতার চোখে জল নেই। সব সময় হাসি হাসি মুখ। ওখানে বসে থাকলে ভারি মনটা অনেক হাল্কা হয়ে যেত।
নিজের মনকে বোঝাতাম, অনি তুই পৃথিবীতে একা। তোকে লড়ে উঠতে হবে। এক ফোঁটা জমি বিনা যুদ্ধে কাউকে ছারবি না। হকের জিনিস কোনওদিন আপোষ করবি না।
কলেজ লাইফে তোকে পেলাম। তোকে আঁকড়ে ধরে অনেক স্বপ্ন দেখলাম। তারপর তুই হারিয়ে গেলি। খড়কুটোর মতো ভাসতে লাগলাম।
অমিতাভদা আমার মধ্যে কি দেখেছিল জানি না, আমাকে এই বাড়িতে স্থান দিল।
ভালোলাগল না, চলে গেলাম। তারপর আবার তুই ফিরে এলি। আমার জীবনটাকে একেবারে ওলোট পালট করে দিলি।
তুই আসার পরই দেখলাম বড়োমা, ছোটোমাও আমাকে একটু একটু করে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইছে। এরকম সিচুয়েশনে আগে কোনওদিন পরিনি।
তারপর দেখলাম তোকে, বড়োমাকে, ছোটোমাকে, মল্লিকদাকে, দাদাকে আঘাত করার জন্য সবাই কেমন মুখিয়ে আছে।
নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। দাদা, মল্লিকদা না বললে হয়তো ইসলামভাই আমার কথায় ওদের দুনিয়া থেকেই সরিয়ে দিত। কেউ কোনও দিন হদিস পেত না।
বুবুন কি বলছিস তুই!
আমি ঠিক কথা বলছি মিত্রা। আমি মলের খোঁজ খবর দিন পাঁচেক রাখিনি। যদি এর মধ্যে ও সত্যি কিছু করে থাকে। গেমটা আমার হাতের বাইরে চলে যাবে। ইসলামভাই ওকে রাখবে না। আমি হয়তো ওকে রাখতে চাই। ওদের থিয়োরি আলাদা, যে ওদের পথের কাঁটা তাকে ওরা গোড়া থেকে উবরে ফেলে দেয়।
বুবুন তুই থাম, আমি আর সহ্য করতে পারছি না।
বিশ্বাস কর মিত্রা। তোকে তোর প্রতিষ্ঠান বাঁচাতে গেলে কিছু নোংরা খেলা খেলতেই হবে। একে এক কথায় বলতে পারিস রাজনীতি।
এইজন্য তোদের কিছু বলি না। আমি জানি তোর মতো বড়োমা, ছোটোমা, মল্লিকদা, দাদা একই কথা বলবে। তোরা বস্তুবাদে বিশ্বাসী। সাধারণ গেরস্থ। এ সব সহ্য করতে পারবি না।
তার থেকে নিজের টেনসন নিজের কাছেই রাখি। এই টেনসন তোদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে কেন তোদের আনন্দটুকু শুষে নেব।
তুই কি করে জানলি বড়োমা, ছোটোমা কিছু বোঝে না।
বোঝে, ওপর ওপর, ভেতরের ব্যাপারটা বোঝে না।
দেখলি না সেদিন কাজ শেষ হয়ে যাবার পর নিজেকে কনফেস করলাম। আমি আগে যদি সব ব্যাপারটা তোদের বলতাম, তোরা কাজটা করতে দিতিস?
মিত্রা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
আমি জানি বলেই তোদের কিছু বলিনি। আমার একটা বদ অভ্যাস আছে মিত্রা। আমি যে ভূমির ওপর দাঁড়িয়ে সাধনা করি, সেই ভূমি পর্যন্ত জানে না আমি কি করছি। এটাকে তন্ত্র সাধনা বলে। তন্ত্র পড়েছিস?
না। তুই পড়েছিস?
সম্পূর্ণ নয়, যতটা পড়েছি তার থেকে এই নির্যাস টুকু পেয়েছি, এটুকু শিক্ষা নিয়েছি।
আমাকে পড়তে দিবি?
চাইলে পড়তে দেব।
কোথায় আছে?
আমার ফল্যাটে।
তোর ফল্যাটে একদিন নিয়ে যাবি?
যাব।
ফিরে এসে যাব।
মিত্রা আমার চোখের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে।
জানিষ বুবুন, জ্যোতিষি ভদ্রলোকেরও প্রচুর পড়াশুন। দাদা-মল্লিকদা অনেক ভাবে ক্রস করেছে। উনি কিন্তু সব অঙ্ক করে করে বলে দিচ্ছিলেন।
দাদাদের সম্বন্ধে কি বলেছেন?
ওটা তোকে বলবো না, ওরাই তোকে বলবে। আমি আমারটা তোকে বলতে পারি।
তোকে কি বললো?
আমার জীবনে যে ঝড়টা গেল, সেটা আর এ জীবনে আসবে না। শুধু তোর জন্য। আমার এখন সুখের জীবন।
মিত্রার চোখ মুখটা চিক চিক করে উঠলো।
সবার সামনে বললো।
না। আমি, বড়োমা, ছোটোমা ছিলাম।
আচ্ছা আমি যদি তোদের প্রয়োজনে কোনও খারাপ কাজ করি তোরা মেনে নিবি?
এটাও বলেছে। তুই নিজের জন্য কোনওদিন কিছু করবি না। যা করবি সব আমাদের জন্য।
তোরা বিশ্বাস করিস?
করতাম না এখন করছি। তুই যে মলেদের ব্যাপারটা ঘটিয়েছিস সেটাও ভদ্রলোক বলেছে।
দাদাদের সামনে।
হ্যাঁ। দাদার কিউরিওসিটি সবচেয়ে বেশি। দাদা, মল্লিকদা ব্যাপারটা ডিটেলসে জানতে চেয়েছিল।
উনি কোনও নাম ধাম বলেননি। তবে এই রকম একটা ঘটনা তোর জীবনে এই প্রিয়েডে ঘটতে পারে সেটা বলেছিল। দাদা বলেছিল ঘটেছে না ঘটবে।
উনি কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে কি ভাবলেন। তারপর বললেন নব্বইভাগ চান্স ঘটে গেছে।
দাদা তারপর ঘটনাটা বললেন।
উনি মুচকি মুচকি হাসলেন।
তোর গ্রহ নক্ষত্র বিচার করে বললেন, তুই ধূমকেতুর মতো কামিং আঠারো মাসে আরও অনেক কাজ করবি। তারপর তুই থামবি। আমাদের শত বাধাতেও তুই থামবি না। তোকে আমরা কেউ থামাতে পারব না। তোর উত্তরণ শুরু হয়েছে।
কি হিসেব টিসেব করে বললো এই ফেজটা তোর চলবে কামিং চল্লিশ বছর। তোর যে তিনটে স্টার সবচেয়ে স্ট্রং তারা পর পর সব কাজ শুরু করছে।
হাসলাম।
মিত্রা আমার নাকটা টিপে নাড়িয়ে দিয়ে বললো, আবার বিচ্চু হাসি।
আমার প্রথম আঠারো মাসের কাজের দিনক্ষণ ঠিক করে দিয়েছে, জ্যোতিষমশাই।
আবার শয়তানি।
না, এতই যখন বললো, এটাও বলে দিতে পারতো।
তোর কি একটুও বিশ্বাস নেই?
আমি বিশ্বাস অবিশ্বাসের কোনও কথা বলিনি।
তাহলে তুই এরকম বলছিস কেন?
আমি মিত্রার দিকে তাকিয়ে আছি। মিত্রা আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। ওর চোখের পলক পড়ছে না। ও আমার চোখে চোখ রেখে আমার মনের কথা বোঝার চেষ্টা করছে।
আমার জীবনের একটা ঘটনা তোর সঙ্গে শেয়ার করবো। শুনবি।
বল।
আমি তখন ইউনিভার্সিটিতে, যতদূর মনে পড়ছে ফাইন্যাল ইয়ার। বড়ো একা। বলতে পারিস নিঃসঙ্গ। পড়শুনো ছাড়া ইউনিভার্সিটি লাইফটা ঠিক এনজয় করতে পারিনি। এর মূল কারণ তুই। তোকে আমি অন্ধের মতো ভালোবেসেছিলাম।
মাঝে মাঝে মনের তাগিদে কয়েকটা জায়গায় যেতাম।
সেটা আরও বেশি উপলব্ধি করলাম ইউনিভার্সিটিতে এসে। দু-একজনের কথা বাদদিলে আমার ইউনিভার্সিটি লাইফে কোনও বন্ধুর নাম আমি বলতে পারবো না। নিজের পড়াশুন লেখা নিয়ে ব্যস্ত। তুই যা এতক্ষণ বললি, আমি প্রবলভাবে তখন তা বিশ্বাস করি।
বলতে পারিস অন্ধের মতো।
ইউনিভার্সিটিতে অনুপ আমার একমাত্র বন্ধু। ওর অবস্থা আমার থেকে একটু ভালো। একদিন বললো, অনি একজায়গায় যাবি।
কোথায়?
ভদ্রমহিলার ভর হয়। উনি নাকি ভরের সময় সব বলে দিতে পারেন।
আমি বললাম চল।
অনুপ ওর প্রেমিককে সঙ্গে নিল। আমরা তিনজন। ওদের সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন ছিল। সঙ্গে দুটো কমবয়সী মেয়েও ছিল। আমরা প্রায় দশজনের একটা গ্রুপ।
ডানকুনি স্টেশন থেকে প্রায় তিনমাইল ভেতরে একটা গ্রামের শীতলামন্দির।
একবারে গ্রামের মেঠো পথ। যাওয়ার সময় ভীষণ ভালোলাগছিল। কাজলদীঘির কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। যেতে যেতে একটা বড় ঝিল পরলো। ওটা একটা মাছের ভেঁড়ি। সেই ভেঁড়ির এমাথা থেকে ওমাথা দেখা যায়না বললেই চলে।
তোদের দীঘাআড়ির থেকেও বড়?
ওইরকম তিনটে হলে একটা। তবে ওই বিউটি নেই।
বাবা।
আমাদের যেতে প্রায় একঘণ্টার ওপরে সময় লাগলো।
আমরা যখন পৌঁছলাম তখন এই দশটা সাড়েদশটা হবে। বয়স্ক মহিলা, এলেন প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পর। সধবা। আমাদের যিনি নিয়ে গেছিলেন তিনি একজন স্কুলের মাস্টার। অনুপের পরিচিত। ভদ্রলোকের সঙ্গে ভদ্রমহিলার বেশ দহরম মহরম দেখলাম। উনি আগেভাগে ওনাকে মা বলে প্রণাম করে সব বলে এলেন।
পূজো আরম্ভ হলো। আমরা শুধু নয় সত্যি আরও অনেকে এসেছে। প্রায় একশো দেড়শো লোক। বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছে। সবারই দেখি সমস্যা।
তুই বলবি আমি কি করতে গেছিলাম?
আমি ভবিষ্যত জানতে গেছিলাম। আর তোর সঙ্গে আমার আর দেখা হবে কিনা।
মিত্রার চোখের পাতা কেঁপে উঠলো। মুখে সামান্য হাসির ঝিলিক খেলেই আবার মিলিয়ে গেল।
পূজোর মধ্যেই ভদ্রমহিলা দেখলাম মাথার চুল এলো করে চোখ বন্ধ করে মাথা দোলাতে আরম্ভ করলেন। ঢাক বাজছে, কাঁসর বাজছে, ঘণ্টা বাজছে। একটা সম্মোহনি পরিবেশ।
তারপর ভদ্রমহিলা নিজের পা-টা পূজার ঘটের ওপর রেখে বলতে আরম্ভ করলেন। যারা নোংরা কাপর পরে এসেছো তারা বাইরে চলে যাও। যাদের এখনও পর্যন্ত তিনদিন হয়নি তারা ঘরের বাইরে গিয়ে বসো। আমার কষ্ট হচ্ছে।
এরই মধ্যে দু-একজন চেঁচিয়ে উঠলো। সত্যি যদি কারুর হয়ে থাকে আপনারা বসে থাকবেন না, মায়ের কষ্ট হচ্ছে।
আমি খুব ভালোকরে ভদ্রমহিলাকে দেখছিলাম।
দেখলাম পাঁচ ছ-জন মহিলা ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল।
মিত্রা আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। ওর গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। চোখ স্থির।
এরপর একে একে সবাই লাইন দিয়ে গিয়ে ওনার কাছে গিয়ে বসছে। যার যা সমস্যা বলছে উনি উত্তর দিচ্ছেন। কউকে বলছেন হয়ে যাবে এমনকি দিনক্ষণ পর্যন্ত বলে দিচ্ছেন। আবার কাউকে বলছেন, হবে না। তুই নামটা লিখে যা দেখছি কি করা যায়।
আমাদের ডাক এলো। একে একে সবাই গেল। আমি আর একটা মেয়ে সবার শেষে গেলাম। অনুপ আর ওই মাস্টার মশাই ভদ্রলোক ঘরের মধ্যেই ছিলেন। আমরা গিয়ে বসতেই উনি বললেন, তোরা অনেক দিন থেকে মিশছিস যা তোদের বিয়ে হবে।
মেয়েটি আমার মুখের দিকে তাকাল। আমিও মেয়েটির মুখের দিকে তাকালাম।
যাকে জীবনে প্রথম দেখলাম তার সঙ্গে অনেকদিন মিশছি!
আমি আকাশ থেকে পরলাম। কিছু বললাম না। তারপর মেয়েটি তার পরীক্ষার কথা, চাকরির কথা জিজ্ঞাসা করলো। উনি সঠিক উত্তর দিলেন।
এবার আমার পালা। মাস্টারমশাই ভদ্রলোক বললেন, অনি এবার তোমার কথা বলো।
আমি ওনার দিকে একবার তাকালাম ভালো করে। উনি চোখ বন্ধ করে আছেন।
আমি বললাম আপনি আমার সম্বন্ধ সব জানেন, আমি নতুন করে কি জিজ্ঞাসা করবো, আপনি আমার ভালো মন্দ বলুন।
উনি দ্বিতীয়বার আমার সঙ্গে ওই মেয়েটির বিয়ের কথা রিপিড করলেন।
তারপর বললেন তুই যার বাড়িতে এখন সবচেয়ে বেশি যাস সেই বাড়ির গৃহকর্তী তোকে ওষুধ করেছে। তুই এক কাজ কর ওষুধটা তুলে নে।
কথাটা শোনার পর মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। চুপচাপ বসে রইলাম।
তুই বাইরে যা, দেখ তোর জন্য লোক বসে আছে। তোর ওষুধটা তুলে দেবে।
তখন আমি একটা ক্লাস থ্রির মেয়েকে পড়াতে যেতাম বুঝলি। তাদের সঙ্গে আমার রিলেসন খুব ভালো। তাদের বাড়িতেই আমি রেগুলার যেতাম। তারা আমাকে ওষুধ করেছে, কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না। মনটা সত্যি খুব খারাপ হয়েগেল।
ওখান থেকে উঠে চলে এলাম।
বাইরে একজন ভদ্রলোক বসেছিলেন। জটাজুটধারী। দেখেই আমাদের গুণীণ কাকার কথা মনে পড়ে গেল। ওখানে এলাম। বলতে গেলে সবাই ধরে নিয়ে এলো।
ভদ্রলোক বললেন তুমি শুয়েপরো। আমি শুয়েপরলাম। জামা তুলতে বললেন। তুললাম। উনি একটা ছোটো বাটিতে করে কিছুটা সরষের তেল আমার নাভির মধ্যে ঢাললেন তারপর ডলতে শুরু করলেন। কি সব বিড় বিড় করছে আর ফুঁ দিচ্ছে। আমর ভীষণ শুর শুর করছে।
বেশ কিছুক্ষণ ডলার পর নাভির ওপর মুখ দিয়ে চুষে চুষে একটা শেকড় আর একটা কয়লার টুকরো বার করলেন। তুই বিশ্বাস করবিনা মিত্রা তখন আমার মনের পরিস্থিতি কি।
মিত্রা আমার মুখের দিকে বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে আছে। চোখের পাতা পড়ছে না।
আমাদের সঙ্গে যারা ছিলেন তারা সব দেখলেন, আরও যারা ভিড় করেছিল তারাও দেখল। সেই জটাজুটধারী ভদ্রলোক শেকড় আর কয়লা দুটো জলে ধুয়ে আমার হাতে দিলেন।
তারপর আবার ঠাকুরঘরে এলাম। উনি বসেছিলেন। আসতেই বললেন এসেছিস। এইনে।
উনি একটা হাড় কয়েকটা শেকড় আর গোল গোল কালো কালো গুলিরমতো কয়েটা ওষুধ দিলেন। মনে হয় পাতাবাটা কিছু হবে। বললেন তিনদিন খাবি। আজকে তোর শরীরটা একটু খারাপ লাগবে। তারপর দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।
পয়সা মেটালাম। বিকেল হয়ে সন্ধ্যা হলো। আমরা গ্রামের পথ দিয়ে ফিরছি। আমি সবার শেষে। অনুপ আমার আগে। ছেঁড়া ছেঁড়া কিছুকথা অনুপের সঙ্গে হচ্ছে। মাথার মধ্যে একটাই কথা ঘুর পাক খাচ্ছে ভদ্রমহিলা আমাকে ওষুধ করবে কেন? কি তার স্বার্থ। নানান কথা মনে ভিড় করছে।
সেই ঝিলটার পাশে যখন এলাম। তখন ঘনো অন্ধকার। ঝিলের গা দিয়ে শরু আইল পথ। আমরা হাঁটছি। নিজের মনের সঙ্গে নিজে যুদ্ধ করছি। প্রবল যুদ্ধ। একদিকে বিশ্বাস আর একদিকে অবিশ্বাস। দু-এর দ্বন্দ্ব। হাঁটতে হাঁটতে কেন জানিনা হঠাৎ মনেহলো, সব শালা বুজরুকি। আমার পেট থেকে কয়লা আর শেকড় বেরলো, আর আমি এতদিন কিছু বুঝতে পারলাম না।
বার করার সময় একটুও লাগল না। একটা ইঞ্জেকসন গায়ে ফুঁরলে লাগে আর ও ব্যাটা সাধু আমার পেটের থেকে চুষে কয়লার টুকরো শেকড় বার করলো। তাও আবার আমার নাভী থেকে?
থাক শীতলা মা আমার মাথায়। পকেট থেকে খামটা বার করে ঝিলের জলে ফেলেদিলাম। মনটা হাল্কা হয়ে গেল। যেন একটা বোঝা নিয়ে হাঁটছিলাম।
কলকাতায় ফিরে বিন্দাস দামিনীমাসির ডেরায় চলে এলাম। আমার ঘরে চলেগেলাম। এর ঘরে তার ঘরে কিছুটা ফাই ফরমাশ খাটলাম। দুটো পয়সা এলো। রাতে ভাত ফুটিয়ে খেয়ে আমি আর ভজু শুয়ে পরলাম। তোর বুবুন কিন্তু দেখ এখনও বেঁচেবত্তে আছে।
তুই ওটা ফেলে দিলি!
তা নয়ত কি, আমার পকেটে রেখে যন্ত্রণা বারাব।
দাঁড়া আমি বড়োমাকে তোর কীর্তি বলবো।
বলনা, বয়েই গেছে।
ভদ্রলোক তাহোলে ঠিক কথা বলেছে!
কি!
তুই যাচাই না করে কাউকে বিশ্বাস করবি না। অবিশ্বাস তোর জীবনের মূল মন্ত্র। তার মধ্যেই বিশ্বাসের বিজ লুকিয়ে রয়েছে।
বাবা তুই হেভি ভাষণ দিলি?
আমিও পারি। এটা স্বীকার কর।
ওটা বোঝার জন্য চোখ আর মন থাকা দরকার।
আমার নেই?
আছে। আরও তীক্ষ্ণ করতে হবে।
তুই আছিস তো।
আমি ওর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালাম।
ওইভাবে তাকাবি না চোখ গেলে দেব। জানিষ তোর সম্বন্ধে আর একটা কথা বলেছে।
কি।
না থাক ওটা তোকে বলবো না বড়োমা বারন করেছে।
খারাপ না ভালো।
তোর কোনও খারাপ নেই। তোকে সাহায্য করার জন্য প্রচুর লোক বসে আছে। তুই চাইলেই পেয়ে যাবি।
ঘড়িতে ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজলো। তাকিয়ে দেখলাম, সাড়ে তিনটে।
কটা বাজল দেখেছিস।
দেখেছি।
আর মাত্র এক ঘণ্টা বাকি, তারপর দরজায় কড়া নরবে।
থাক আর ঘুমবো না, একটু করি।
খেপেছিস। আমার দম নেই।
কাকে করেছিস।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম, চোখে হাসি।
দেখেছিস তুই কি শয়তান, কোনওদিন সত্যি কথা বলবি না।
বললে কষ্ট পাবি তাই বলি না।
একটুও কষ্ট পাব না, বল।
ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে….।
কাকে বল।
তোকে।
শয়তান।
মিত্রাকে বুকের ওপরে টেনে নিলাম, ওর ঠোঁটে চুমু খেয়ে বললাম।
একটু ঘুমিয়ে পর।
ভালো লাগছে না, কাল যেতে যেতে গাড়িতে ঘুমব।
বড়োমা কিছু বলবে না, ছোটোমা ছোটো ছোটো ভাসন দেবে।
দিক। একটু….।
না মন চাইছে না।
কেন।
জানি না আজ তোকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকতে ভালো লাগছে।
তাহলে তোর ওপর উঠে শুই।
শো।
আমার ভার বইতে পারবি।
পারবো।
আবার বলবি না দেড়মনি বস্তা।
না।
মিত্রা আমার ওপর উঠে এলো। আমার গলা জড়িয়ে কাঁধের কাছে মুখ রাখলো, ওর গরম নিঃশ্বাস আমার ঘাড়ে। আমার একটা হাত ওর পিঠে। একটা হাত ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
বুবুন।
উঁ।
তুই আমায় খুব ভালোবাসিস, তাই না?
আমি চুপ করে রইলাম।
কিরে বল।
আমি চুপ।
আমার কাঁধ থেকে মুখ তুলে, আমার ঠোঁটে ঠোঁট রাখল, চুপ করে আছিস কেন, বলবি না।
সব ব্যাপার মুখে বলা যায় না, অনুভূতি দিয়ে বুঝতে হয়।
তোর অনুভূতিটা কোথায় এখানে, না এখানে।
মিত্রা আমার বুকে হাত দিল, আর কোমর দুলিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করলো।
আবার দুষ্টুমি করছিস।
বেশ করছি। তোর কিছু করার আছে।
বুঝলাম মিত্রা তার অভিষ্ট সিদ্ধির উদ্দেশ্যে ধীরে ধীরে এগচ্ছে। আমি মনে মনে ঠিক করলাম, আজ কিছুতেই হবে না। চোখ ঘুরিয়ে ঘড়ির দিকে তাকালাম, দেখলাম চারটে বাজতে দশ। একটু পরেই ঘড়ের দরজায় ধাক্কা পরবে।
কিরে শয়তান, মনে মনে কি ফন্দি আঁটছিস।
কই কিছু না।
তোর চোখের মনি স্থির হয়ে গেল কেন?
আমি কি করে বলবো।
চোখ গেলে দেব।
মিত্রা আবার কোমর দোলাচ্ছে, হাসছে, আমিও মিটিমিটি হাসলাম।
দেব ঠোঁট ফাটিয়ে। ঘুসি তুললো।
ব্যাথা লাগবে। তুই চাস ফোলা ঠোঁট নিয়ে এতটা রাস্তা যাই।
তোকে যন্ত্রণা দিতে পারলে আমার খুব আনন্দ হয়।
দে, কে বারন করেছে। আমি একটু সেবা শুশ্রুষা পাব।
না না তুই এরকম বলিস না, তোর কিছু হলে আমি পাগল হয়ে যাব।
মিত্রা আমার মুখটা চেপে ধরলো।
ঘড়ির দিকে লক্ষ্য করলাম, চারটে বাজে।
বুবুন।
কি।
আমাকে একটা ব্লু-ফ্লিম দেখাবি, তুই ভালো কমপিউটার শিখে গেছিস।
কে বললো তোকে?
টিনাকে একদিন ফোন করেছিলাম।
মিত্রার দিকে তাকালাম।
মাঝে মাঝে তুই ওর কাছে কম্পিউটার, ইন্টারনেট শিখতে যাস। এখন তুই ভালো শিখেছিস।
এই তো তুই করিতকর্মা হয়ে উঠেছিস। খবর জোগাড় করতে শিখে গেছিস।
না-রে তোর কনসেনট্রেশন দেখে আমি অবাক হয়ে যাই।
টিনাকে ফোন করার পর সেদিন বড়োমাকে বলছিলাম।
কি বললো বড়োমা?
বললো অন্য কোনও মেয়ে হলে ভুল বুঝতো। মিত্রা তুই ওকে ভুল বুঝিস না।
আমি বললাম, এ-কি বলছো বড়োমা, বুবুন আমার কাছে চিরকাল বুবুন থাকবে। ওকে আমার কাছ থেকে কেউ কোনওদিন ছিনিয়ে নিতে পারবে না।
বড়োমা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেল।
মিত্রা কোমর দোলাচ্ছে, চোখের চেহারা আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে।
অনি। ও মিত্রা এবার ওঠ, কি ঘুমরে তোদের বাবা।
মিত্রা আমার দিকে চমকে তাকাল।
ওরে সাড়ে চারটে বাজলো। রেডি হতে হবে। বড়োমার গলা।
মিত্রা তড়াক করে উঠে বসলো। আমি ইশারায় ওকে বললাম চুপ। ও আমাকে ঘুসি দেখাচ্ছে।
আমি চোখ ছোটো করে ওকে বললাম, আমি কি করবো, বড়োমা এসে যদি ডাকে।
ও আমার বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পরে আমার বুকে কামর দিয়ে বললো, সব সময় দুষ্টু বুদ্ধি। তাই তুই বার বার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলি। দাঁড়া আজ ওখানে চল তোকে দেখাচ্ছি।
আমি তোকে বারন করেছিলাম।
ও আমার মুখ চেপে ধের আমার বুকে দাঁত বসাল।
বল আর এরকম করবি, শয়তান।
আমি জোড়ে হাসতে পারছি না, বড়োমা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে।
কিরে মিত্রা ওঠ। অনি।
হ্যাঁ বড়োমা উঠি। মিত্রা চেঁচিয়ে উঠল।
উঃ তোদের ঘুম বটে। সব কুম্ভকর্ণ হয়েছিস।
মিত্রা আমার বুকে শুয়ে আছে।
ওঠ।
না উঠবো না।
ঠিক আছে, আজ রাতে সারারাত।
হুঁ-উ ওখানে নীপা আছে।
ঠিক আছে নীপাকে ওবাড়িতে শুতে বলবো।
ঠিক।
আমি কথা দিচ্ছি।
মনে থাকে যেন।
তুই বল এই সময় ছাড়তে ইচ্ছে করে, তুই কি শয়তান দেখ।
ও আবার আমার বুকে শুয়ে পরলো।
অনেক কষ্টে ওকে ওঠালাম।
এরমধ্যে ছোটোমা একবার দরজা হাঁকরে গেছে।
আমি দরজা খুলে বলেছি, মিত্রা বাথরুমে। বেরলেই যাচ্ছি।
আমি দাঁত মেজে ফ্রেশ হলাম। স্নান করলাম না। জামা প্যান্ট পরলাম, বারান্দায় এসে দেখলাম সবে পূব আকাশের রং কমলা হয়েছে, অনাদিকে একটা ফোন করলাম।
হ্যালো।
কোথায়রে চেঁচামিচির আওয়াজ পাচ্ছি, বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করছিস নাকি?
না-রে একটা ঝামেলা হয়ে গেছে। থানায় আছি।
থানায়! কি করছিস?
তোর আশে পাশে কে আছে?
কেন বল!
বলনা।
কেউ নেই।
ফোনের ভয়েস অফ করা?
হ্যাঁ।
আমি অনাদির গলা শুনেই বুঝতে পেরেছি কিছু একটা হয়েছে, আমি রেকর্ডিংটা অন করলাম।
শোন তোকে আমি ফোন করতাম, আর একটু পরে।
কি হয়েছে বলবি তো! তোর কোনও সমস্যা?
না। আমরা সবাই ঠিক আছি।
তাহলে!
শেলি কালকে সুইসাইড করেছে।
শেলি! কখন?
বিকেল বেলা।
তুই কখন জানতে পেরেছিস?
সাতটা নাগাদ।
দিবাকর কোথায়?
বেপাত্তা।
শেলির বডি কোথায়?
থানায় রাখা আছে, পোস্টমর্টেম হবে, টাউনে নিয়ে যাবে।
অমূল্য কি বলছে?
থানায় বলেছে আমার ঘনিষ্ট বন্ধু, পুরোটা আমার ঘারে চাপিয়ে দিয়েছে।
ঠিক আছে তোকে পরে ফোন করছি। তোর সঙ্গে আর কে কে আছে?
বাসু আছে।
চিকনা?
ওকে রেখে এসেছি তোর বাড়িতে।
থানার ফোন নম্বরটা দে।
অনাদি থানার ফোন নম্বরটা দিল।
মিত্রা কখন যে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে দেখতে পাইনি, ও আমার মুখের দিকে ফ্যাকাশে চোখে তাকিয়ে আছে।
তোর আবার কি হলো, ওরকম ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছিস কেন?
কাকে ফোন করলি। গম্ভীরগলা।
হেসে ফেললাম। বাবাঃ একেবারে ঠানদিদির মতো কথা বলছিস।
সত্যি করে বল, আবার কি হলো?
কিছু হয়নি।
আমি তোর মুখ দেখে বুঝতে পেরেছি তুই যতই লোকাবার চেষ্টা কর। মিত্রা এবার একটু গলা চড়িয়ে বললো।
নিচ থেকে বড়োমা চেঁচিয়ে উঠলো, কি হয়েছেরে মিত্রা।
দেখলি দেখলি, তুই সত্যি সব গোলমাল করে দিবি।
আমরা এখন বেরবো। তোর কোথাও যাওয়া হবে না। পৃথিবী উল্টে গেলেও না।
অবশ্যই বেরবো। আমি একঘণ্টা বেশি টাইম নেব।
তোকে আমাদের সঙ্গে এখুনি বেরতে হবে। মিত্রা আমার গেঞ্জিটা খামচে ধরলো।
বেরবো। সত্যি বলছি, গেঞ্জি ছাড়।
আগে বল কে ফোন করেছিল, কোন থানার ফোন নম্বর চাইলি।
মিত্রা চেঁচামিচি শুরু করে দিল।
দেখলাম সিঁড়িদিয়ে চার মূর্তিমান উঠে এলো।
দেখলি দেখলি। আমি কথা দিচ্ছি, তোদের সঙ্গেই যাব।
কি হয়েছেরে মিত্রা? বড়োমা বললো।
বড়োমা, ছোটোমা দুজনেই আজ জমপেশ একটা শাড়ি পরেছে। মনে হচ্ছে ঢাকাই জামদানি।
লালাপাড় খোলটায় লালের আভাস। দারুন দেখতে লাগছে।
মাথায় ডগডগে লাল সিঁদুর। একেবারে মা মা।
আমি সবাইকে প্রণাম করলাম।
বড়োমা আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো, মিত্রা কি বলছে, তুই সত্যি কথা বল।
ঠিক আছে তোমরা দুজনে চা করে নিয়ে এসো। দাদা আর মল্লিকদা আমার ঘরে আসুক।
মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম, আয় তুইও শুনবি, কি হয়েছে। ছাগল কোথাকার।
বড়োমা নড়ল না, ছোটোমা দৌড়ে নিচে চলে গেল। মিত্রা মুখ টিপে হাসলো।
জয়ের হাসি।
ওরা এসে ভেতরে বসলো।
আমি দাদার দিকে তাকিয়ে বললাম, আমি এখুন একটা ডিসিসান নিয়েছি। বলতে পার ইনস্ট্যান্ট। তোমরা বলো আমি ঠিক না ভুল।
তোমরা যদি না বল, আমি এখুনি প্রমান করে দেব আমার ডিসিসান ঠিক। তোমাদের ঠিক পাঁচ মিনিট সময় দেব। না হলে পাখি উড়ে যাবে।
তুই কি বলছিস, মাথা-মুন্ডু কিছু বুঝতে পারছি না! কাল রাতে ঠিক মতো ঘুম হয়নি?
আমার মাথা আন্টারটিকার মতো ঠান্ডা।
ছোটোমা চা নিয়ে ঘরে ঢুকলো।
বল শুনি। দাদা বললো।
তুমি চিনবে না। মিত্রা চেনে। মিত্রার সঙ্গে আলাপ আছে। ছোটোমা, বড়োমা হয়তো ওর মুখ থেকে শুনে থাকবে। আমি গেইজ করছি।
আমার গ্রামের একটা মেয়ে কাল বিকেলে সুইসাইড করেছে। আমি বলছি সে সুইসাইড করেনি। তাকে মার্ডার করা হয়েছে। তার নাম শেলি। সে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে লটঘট করেছিল। সেই ছেলে, যার নাম দিবাকর।
বড়োমা, ছোটোমা, মিত্রার চোখ গোলগোল, ওরা এই সাত সকালে আমার মুখ থেকে এই কথা শুনে অবাক।
কি বলছিস তুই!
এখুনি আমি অনাদিকে ফোন করেছিলাম, বলতে চেয়েছিলাম আধঘণ্টার মধ্যে রওনা দিচ্ছি। ও এই কথা শোনাল। দিবাকরের সঙ্গে সুনিতদার ভালো রিলেশন।
দাদা আমার দিকে বোবা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে।
সুনিতদা, দিবাকরের কথায় মিত্রাকে নিয়ে রিউমার রটিয়ে একটা বিচ্ছিরি অবস্থা তৈরি করেছিল আমাদের হাউসে। দেখেছো কি ভাবে আমি তা সামাল দিয়েছি।
তোমার কথায় আমি তাকে সেই সময় ছেরে দিয়েছিলাম। দিবাকর এখন ফেরার। অনাদি থানায়। যেহেতু দিবাকর আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
আমি সন্দেহ করছি, অতীশবাবু আমাদের হেড মেশিনম্যান কাল আসেন নি। আমি সন্দেহ করছি, সুনিতদা কাল খুব তারাতারি অফিস থেকে বেরিয়েগেছে। সুনিতদার ব্যাপারটা তুমি বলতে পারবে। আমি ঠিক কথা বলছি কিনা।
হ্যাঁ, সুনিত কাল একটু তারাতারি বেরিয়েগেছে। মুখটা একটু শুকনো শুকনো ছিল।
আমি এক্সপেক্ট করছি, ওরা দিবাকরকে মলের কাছে শেল্টার দিয়েছে। ওরা নিশ্চই দিবাকরকে এ পৃথিবীতে রাখবে না। ওরা শেষ করে দেবে। দিবাকর ওদের অনেক কিছু জানে। এই দেড় মাসে দিবাকরকে ঘুটি করে ওরা অনেক কিছু করেছে।
তুই কি করে জানলি?
আমার থার্ডসেন্স বলছে। বলো তারাতারি কি ডিসিসান তোমাদের, আমি অপেক্ষা করতে পারব না। আমার খেলা এই মুহূর্তে শুরু করতে হবে।
মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম, ব্যবসা করছিস। আমার টেনসন ভাগ করে নিবি বলেছিলি, বল কি করবি?
আমি জানি না। আমার কোনও ডিসিশন নেই।
মল্লিকদা তোমার?
জানিনা, দাদা যা বলবে তাই হবে।
দাদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। আমি কি বলবো বল, তোর কথা ঠিক মতো হজম করতে পারছি না।
তোমাদের দ্বারা কিছু হবে না।
মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম, এই সাত সকালে তুই সিনক্রিয়েট করলি কেন। আজ শেষবারের জন্য বললাম, আমার কাজে তোমরা কেউ বাধা দেবে না। আমি তোমাদের ছেড়ে চলে যাব। এবার চুপচাপ আমার খেলা দেখে যাও। কোনও কথা বলবে না।
দাদার দিকে তাকিয়ে বললাম, তোমার ঘরের চাবি কার কাছে।
একটা আমার কাছে আছে, আর একটা সন্দীপের কাছে।
সন্দীপকে ফোন লাগালাম। ভয়েস অন করে রেকর্ডিং চালু করলাম । সবাই শুনুক।
গুডমর্নিং স্যার।
তুই কোথায়?
তোর গলাটা এরকম কঠিন কঠিন কেন।
ফালতু কথা রাখ। যা বলছি তার উত্তর দে।
জাস্ট বেরবো অফিস থেকে, গোছাছি।
আমার সঙ্গে যে ছেলেগুলো সেদিন আড্ডা মারছিল ওরা আছে।
আছে।
কজন আছে।
দুজন আছে। আর সব বেরিয়ে গেছে।
ওদের থাকতে বল, আমি এখুনি আবার ফোন করবো, এখন অফিস থেকে বেরবি না।
আচ্ছা।
আর্ট ডিপার্টমেন্টে কে আছে?
দ্বীপায়ন আছে। ও এখন আমাদের কাছে, সব এক সঙ্গে বেরবো।
দ্বীপায়নকে থাকতে বল।
আচ্ছা।
দেখ তো সুনিতদা কাল কখন বেরিয়েছে? আর অতীশবাবু কাল এসেছিল কিনা?
গুরুত্বপূর্ণ কিছু।
কথা বলতে বারন করেছি।
আচ্ছা আচ্ছা।
ওরা সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কারুর মুখে কোনও শব্দ নেই। মিত্রা আমার পাশে এসে আমার হাতটা চেপে ধরেছে। ওর হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা। আমার মুখের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে।
আমি আবার ডায়াল করলাম।
ভয়েজ অন, রেকর্ডিং অন।
ইসলামভাই?
বিকট একটা হাসি। আমি জানি তুই ফোন করবি।
কি করে বুঝলে?
তুই খবরের গন্ধ পেয়েছিস।
মালটাকে কোথায় রেখেছো?
তুই বিশ্বাস কর আমার হাতে এখনও আসেনি। ভোররাতে মল আমাকে ফোন করে সেল্টার দেবার কথা বলেছে।
তুমি দেবে?
আমি তোকে আর একটু পর ফোন করতাম। মার্ডার কেস। তুই বল।
আমার কাছে খবর আছে। ও কোথায় আছে?
তুই আমার গুরু। আজ থেকে সত্যি তোকে আমি গুরু বলে মানছি অনি, আল্লা কসম, আমি তোকে গত দেড়মাস ফলো করলাম। তুই আমার থেকে অনেক দূরে বেড়ে গেছিস। একদিন আমি তোর গুরু ছিলাম। আজ তুই আমার গুরু।
তুমি তোমার আল্লার নামে দিব্যি কাটছো। আমি এই সুযোগ হাত ছাড়া করবো না।
তুই বল আমি কি করবো, তুই যা বলবি, আমি তাই করবো।
মল তোমার অনেক ক্ষতি করেছে, এই সুযোগে ওকে….।
তুই বললে আজই সাঁটিয়ে দেব। তোকে আগেও বলেছি, তোর কেউ ক্ষতি করবে আমি মেনে নেব না। তুই বলেছিস, তোর দাদা তোকে বারন করেছে, তাই ছেড়ে দিয়েছি।
ঠিক আছে, ফোন বন্ধ করবে না, আমি একটু বাদে তোমায় ফোন করবো।
আচ্ছা।
ছোটোমা আমার পায়ের কাছে এসে বসলো, অনি তুই আমার মাথায় হাত দিয়ে শপথ কর, তুই কোনও অন্যায় কাজ করছিস না।
আমি তোমাদের সামনে আমার কাজ করছি, কোনও লুকিয়ে চুরিয়ে নয়।
ছোটোমার চোখ ছল ছলে।
কি করি শেষ পর্যন্ত দেখো, তারপর বলো আমি কোনও অন্যায় করছি কিনা।
ওই মেয়েটার মুখের দিকে তাকা।
ওর দিকে তাকাবার সময় নেই, ওর জন্যই তোমাদের সামনে ফেস করছি। ও শক্ত না হলে ওকে শেয়ালে কুকুরে খাবে। তোমরা এটা চাও।
আমরা সবাই সব জানি, তুই একটু ঠান্ডা হ।
ঠান্ডা হওয়ার সময় নেই।
আমি তোর পায়ে ধরছি।
একি করছো ছোটোমা! তুমি আমার মা!
আমি ছোটোমার হাত ধরে গলা জড়িয়ে ধরলাম, আমার প্রতি তোমরা বিশ্বাস হারিও না।
তোর বড়োমার দিকে তাকা।
সবাইকে দেখা হয়ে গেছে, আমাকে জিততে হবে, আমি হারব না।
ছোটোমা আমার কোলের ওপর মাথা রেখে ঝড় ঝড় করে কেঁদে ফেললো।
আমি আবার সন্দীপকে ফোনে ধরলাম।
কি খবর?
তোর প্রেডিকসন ঠিক, দাদা কাল তারাতারি বেরিয়ে গেছে, তার আগেই সুনিতদা ভাগইলবা।
কখন?
সাতটা নাগাদ, এ্যাকুরেট বলতে পারছি না।
গুড। অতীশবাবু?
কাল অতীশবাবু আসে নি।
ঠিক আছে।
তুই এক কাজ কর। দ্বীপায়ন ওই ছেলেদুটো তোর পাশে আছে?
হ্যাঁ।
দাদার ঘরের চাবি তোর কাছে?
হ্যাঁ।
দাদার ঘর খোল। দাদার টেবিলের ডানদিকের নিচের ড্রয়ারটা ভীষণ নোংরা। একেবারে পেছন দিকে তিনটে খাম আছে। ওটা বার কর। দেখবি ওপরে লেখা আছে, অনি কনফিডেনসিয়াল। এক, দুই, তিন, তিনটে খাম একটা কালো গার্ডারে আটকান আছে। শোন কেউ যেন তোর সঙ্গে না যায়। তুই দাদার ঘরে গিয়ে খোঁজ, আমি তোকে পড়ে ফোন করছি।
আচ্ছা।
তুই আমার ঘরে কবে ঢুকেছিলি! দাদা আমার দিকে তাকিয়ে।
আজ থেকে দেড়মাস আগে। ওটা বোমা রাখা আছে। তোমায় সব বলে দেব, কালকের কাগজটা আমার মতো করে বের করবে, এটা আমার রিকয়েস্ট তোমার কাছে।
দাদা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তকিয়ে।
রাখবে?
তুই বলছিস যখন রাখবো, তোর ওপর বাজি ধরে আমি কোনও দিন হারিনি।
বড়োমা রেগে টং।
মরন, ছেলেটা কি করছে দেখতে পাচ্ছ না, তুমি হলে হার্টফেল করতে।
ছোটোমা চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে কেঁদে, বড়োমার কথা শুনে হেসে ফেললো।
আমি অস্বীকার করছি না বড়ো। কালকে তুমি সব নিজের কানে শুনে এসেছো। আমি এইসময় ওকে বাধা দিলে ও শুনবে। ওর যে এতো সোর্স কি করে জানবো। আমি তো কখনও লোক লাগাইনি ওর পেছনে।
দ্যাখো দ্যাখো কি করে চালাতে হয়, এই পাঁচকড়ি ছেলের কাছে।
সত্যি আমি শিখছি বড়ো।
বড়োমা আমার কাছে এসে মাথায় হাত রাখল।
তুই ঠান্ডা মাথায় কাজ কর। আমি তোকে বলছি। তুই জিতবি।
মিত্রা লজ্জার মাথা খেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। ওর মাথা আমার কাঁধে। বড়োমা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
আমি সনাতনবাবুকে ফোনে ধরলাম।
কোথায় আছেন?
ছোটোবাবু বাড়িতে, সবে ঘুম থেকে উঠলাম।
এখুনি গাড়ি নিয়ে দাদার বাড়িতে চলে আসুন। প্রশ্ন করবেন না কেন। ঠিক আছে। আধাঘণ্টা সময় দিলাম।
না মানে….।
এই মুহূর্তে আমার সময় কম। মনে রাখবেন এটা আমার হুইপ।
আচ্ছা।
ফোনটা কেটে দিলাম।
সন্দীপকে ফোন করলাম।
হ্যাঁ বস পেয়েছি।
যা যা বলেছিলাম, ঠিক সেই রকম।
হ্যাঁ।
ল্যাপটপ তোর কাছে।
হ্যাঁ।
সবাইকে নিয়ে দাদার বাড়িতে চলে আয়। আধাঘণ্টার মধ্যে। শোন অফিসের গাড়ি নিয়ে নয়। একটা ট্যাক্সি করে।
আচ্ছা।
কখন যে ভজু এসে ঘরের এক কোনে বসে আছে জানিনা। ও আমার দিকে জুল জুল করে তাকিয়ে, হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে বসে আছে। ভজুর দিকে তাকিয়ে হাসলাম। ভজুও হাসলো। ভজু আমাকে এই অবস্থায় বহুবার দেখেছে।
আমি আবার ফোন করলাম।
মিঃ মুখার্জী।
আরে অনিবাবু এত সকালে! গুড মর্নিং।
মর্নিং। এতদিনে আপনার খাবার রেডি করলাম।
তাই নাকি?
খুব তারাতারি, দশটার মধ্যে কজ সেরে ফেলতে হবে। না হলে পাখি ওড়াং হয়ে যাবে।
বলেন কি!
ঠিক বলছি।
(আবার আগামীকাল)