| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কাজলদীঘি

Reporter Default
রিপোর্টার / ২৪০৮ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

ষষ্ঠ কিস্তি

পূব দিকের আকাশটা সবে ফর্সা হয়ে এসেছে। মাঝে মাঝে সাদা সাদা ছেঁড়াছেঁড়া মেঘ ভেসে যাচ্ছে। আমি পাজামা পাঞ্জাবী পরে সিগারেটের প্যাকেট মোবাইলটা পকেটে ঢোকালাম। নীপা আমার দিকে তাকাল। ওর আয়ত চোখ দুটি ভিঁজে কাদা হয়ে গেছে।

আমি কিছু বললাম না, বেরিয়ে এলাম। নিচে নেমে দরজাটা ভেতর থেকে টেনে বন্ধ করলাম। খামারে এসে দাঁড়ালাম, পেছন ফিরে তাকালাম, নীপা জানলা থেকে মুখ সরিয়ে নিল, আমি মাঠের পথ ধরলাম।

প্রথমে পড়বে চন্দ্রপাড়া, তারপর তাঁতীপাড়া, তারপর কামারপাড়া, একবারে শেষে হাঁড়িপাড়া, হাঁড়িপাড়া পেরিয়ে আমার গন্তব্য স্থল দীঘাআড়ি।

আমার এক সময়ের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।

আমি ওখানে গেলে কেমন যেন নিজের মধ্যে নিজে হারিয়ে যাই। সোনাঝড়া রোদ কচি ধান গাছের শরীরে সোনালী রং লেপে দিয়েছে। এরই মধ্যে কেউ কেউ মাঠে নেমে পড়েছে। এখন বাছার (আগাছা পরিষ্কার করা) সময়। কয়েকদিন পর ধানগাছের বুকে শীষ আসবে দুধ জমবে। এই সময় চারাগুলোকে একটু যত্ন আত্তি করতে হয়।

আমি এই ধু ধু মাঠে একা পথের পথিক। কেউ আমার দিকে তাকাল। কেউ তাকাল না। সাঁওতাল মেয়েগুলো নিচু হয়ে ওদের ভাষায় মিহি সুরে উঁ উঁ করে গান করছে। ওদের শরীরগুলো সত্যি দেখার মতো। কালো কষ্টি পাথরে কোনও শিল্পী যেন কুঁদে কুঁদে সৃষ্টি করেছে। আদল গায়ে বুকের ওপর কাপরটাকে পেঁচিয়ে পরেছে। নিচু হয়ে কাজ করায় ওদের অনাবৃত বুকের কিছুটা দেখা যাচ্ছে। আমি আড় চোখে মাঝে মাঝে ওদের দেখতে দেখতে এগিয়ে চলেছি।

হাঁড়িপাড়া পেরিয়ে চলে এলাম দীঘাআড়ি।

আঃ যেমন দেখেছিলাম আজ থেকে দশ বছর আগে ঠিক তেমনি আছে। কাঁচের মতো স্বচ্ছ জলে মৃদু হাওয়ার দোলায় কাঁপন ধরেছে। সূর্যের নরম আলো পড়ে তা আরও মোহনীয় হয়ে উঠেছে। প্রকৃতির কোনও পরিবর্তন নেই, বরং দিনে দিনে সে লাস্যময়ী হয়ে উঠেছে। বর্ষার সময় দুকুল ছাপিয়ে জলের ঢল নামে। এখন জল অনেকটা মরে গেছে, তবু যে টুকু আছে তা নয়নাভিরাম। ছেঁড়াছেঁড়া মেঘের মতো চারপাশে পানকৌড়ি আর সরাল পাখির হুটোপুটি। আকাশ থেকে ডানা মেলে মাঝেমাঝে ঝুপ করে জলে নেমে আসছে বক। কোকিলের কুহু কুহু স্বর চারিদিকে ম ম করছে। এত গভীর নিস্তব্ধতা যে নিজের নিশ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ নিজে শুনতে পাচ্ছি।

কালীচরণের ঝিকে নিয়ে ভানুর সেই কীর্তি কলাপের জায়গায়টায় একটু থমকে দাঁড়ালাম। চোখ বন্ধ করলে এখনও সেই দৃশ্য আমি দেখতে পাই। পায়ে পায়ে আমার সেই চেনা ঝোপের ধারে এসে বসলাম। এখান থেকে দীঘিটার একটা অংশ পুরো দেখা যায়। জায়গাটা এখন অনেকটা নোংরা হয়ে গেছে। কেউ আসে না হয়তো। আমার মতো পাগল কজন আছে। আমি একটু পরিষ্কার করে নিয়ে বসলাম। পেছনটা ভিজে গেল। বুঝলাম, সারারাতের শিশির স্নাত ঘাস আমাকে স্নান করিয়ে তার কোলে স্থান দিল।

দীঘির জল কাঁচের মতো স্বচ্ছ, স্থির। মাঝেমাঝে একটা দুটো মাছ লেজের ঝাপটায় দীঘির জলে কাঁপন তুলছে। কাঁপা কাঁপা ঢেউ কিছু দূরে গিয়ে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। সূর্যের আলো এসে পরেছে দীঘির জলে। তার আলো ছায়ার স্পর্শ গাছের ডালে, তার পাতায়।

ঝন ঝন করে ফোনটা বেজে উঠলো, মনেই ছিল না। পকেট থেকে ফোনটা বের করলাম। মিত্রার ফোন।

হ্যালো।

কখন ঘুম থেকে উঠলি?

চারটে।

যাঃ।

হ্যাঁরে।

এখন কোথায়?

আমার স্বপ্নের সেই জায়গায়।

কোথায় বসে আছিস বলতো, পাখির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি।

সে অনেক কথা। ফোনটা অফ করিস না কথা না বলে শুধু শুনে যা। আমি ভয়েজ অন করলাম। মিত্রা মনে হয় গাড়ি করে কোথাও যাচ্ছে, গাড়ির হর্নের আওয়াজ পাচ্ছি।

কিরে কোথায় হারিয়ে গেলি?

হারিয়ে যাই নি, হারায়ে খুঁজি।

বাবাঃ কবি কবি ভাব, ছন্দের অভাব।

শুনলি।

লাইভ।

সত্যি তাই। আমি সেই ঝিলের ধারে একা।

একা একা কেন, দোকা করে নে।

কে আসবে বল?

চাইলেই পাবি।

সব চাওয়া পাওয়া হয়ে ওঠে না।

ঠিক বলেছিস বুবুন।

জানিস মিত্রা এখানে এই সকালটা এতো ভালো লাগে, তোকে বোঝাতে পারবো না। পৃথিবীতে অনেক কিছু আছে যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। তাকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়। সেই অনুভবটাও তোর অন্তরের অন্তরে সঠিক ভাবে আসা চাই।

কবে আসছিস?

ঠিক নেই।

তারমানে!

মিত্রাকে এখানকার সমস্ত ব্যাপারটা পঙ্খানুপুঙ্খ রূপে বললাম।

বুঝেছি তুই অনেক সমস্যায় পড়ে গেছিস। দাদাকে বলেছিস?

এখনও বলিনি।

তুই বড়োমাক ফোন করিস নি?

কেন!

গতকাল বড়োমা আমায় প্রায় পনেরোবার ফোন করেছে, তোর খবর নেওয়ার জন্য। ভেবেছে আর কাউকে তুই ফোন করিস আর না করিস আমাকে অবশ্যই করবি।

বড়োমার ধারণাটা অন্যায় না। সবাইকে ফাঁকি দিতে পারি, বড়োমা, ছোটোমার চোখকে ফাঁকি দেব কি করে।

কাকার ব্যাপারে কি ডিসিশন নিলি?

আজ দুপুরের দিকে জানতে পারব।

আমাকে জানাস।

জানাব।

ভুলে যাবি।

না-রে বিশ্বাস কর, এখানে মাঝে মাঝে টাওয়ার থাকে আবার চলে যায়। তোরা বরং ফোন করিস না। আমিই তোদের ফোন করবো। ওদিককার খবর কি?

হিমাংশু সমস্ত এ্যারেঞ্জ করে দিয়েছে। তুই এলে ফাইন্যাল হবে।

তুই এখন কোথায়?

সকালে কি মনে হলো একটু গঙ্গার ধারে গেছিলাম। গঙ্গা স্নান করলাম, অনেক পাপ করেছি।

এখন ফিরছিস?

হ্যাঁ।

একা।

আমি তোরই মতো। তুই ঝিলের ধারে একা, আমি গঙ্গার থেকে একা ড্রাইভ করে ফিরছি।

অফিসে গেছিলি?

তুই বারন করেছিস। অমান্য করতে পারি।

আমি কে?

শুনতে ইচ্ছে করছে, বাঁদর।

হাসলাম।

হাসছিস। তোর লজ্জা করে না?

না।

হ্যাঁরে টাকা পয়সা সঙ্গে আছে?

খুব বেশি নেই।

তোর ঠিকানা বল।

তুই বাড়ি ফিরে যা। প্রয়োজন হলে বলবো।

উঃ তুই মচকাবি, তবু ভাঙবি না।

এই টুকু নিয়েই বেঁচে আছি। এই পৃথিবীতে আমার নিজের বলতে কে আছে বল।

চোখ মেলে তাকা, বুঝতে পারবি।

হাসলাম।

আবার বোকার মতো হাসছিস।

আসবি এখানে?

তুই বললেই ছুটে চলে যাব।

থাক।

থাক কেন?

উঃ, তুই বড়ো জ্বালাতন করিস।

মিত্রা কোনও কথা বলছে না। খালি গাড়ির হর্নের আওয়াজ, ক্যাঁচ করে ব্রেক চাপার শব্দ, বুকটা ধরাস করে উঠলো।

কিরে কথা বলছিস না কেন, মিত্রা, এই মিত্রা!

এখন রাখি। গলাটা ধরা ধরা।

কি হয়েছে বলবি তো।

তোর এই সময়….।

কি পাগলামো করছিস!

আমি কি তোর পাশে থাকতে পারি না?

কাঁদছিস কেন!

কই কাঁদলাম।

আমি দেখতে পাচ্ছি।

ধ্যুস।

ঠিক আছে, এখানে ডেটটা ফাইন্যাল করে তোকে জানাব।

জানাবি ঠিক?

বললাম তো জানাব।

বিকেলে একবার ফোন করিস। বড়ো একারে।

আচ্ছা।

মিত্রা ফোনটা রেখে দিল।

কয়েকজন লোক দীঘির পাড়ে এসেছে। ওরা মনে হয় মাছ ধরবে। ওদের কাঁধে জাল দেখছি। কলকাতার ভেঁড়িতে মাছ ধরা দেখেছি। আর এখানকার দীঘিতে মাছ ধরা দেখেছি দুয়ের মধ্যে কতো তফাৎ। না আর বসে থাকা যাবে না। সূর্যের রং বলছে অনেক বেলা হয়েছে। মোবাইলটা পকেট থেকে বার করে সময় দেখলাম আটটা বাজতে যায়। নিশ্চই কাকা চেঁচামিচি শুরু করে দিয়েছে।

ধীরে ধীরে দীঘির পার ধরে ছোটোবাঁধে নেমে এলাম। আগে এটা আইল পথ ছিল একবার পঞ্চায়েত থেকে মাটি ফেলে আইলকে চওড়া করল। নাম হলো ছোটোবাঁধ। ফেরার পথে অনেকের সঙ্গে দেখা হলো। কাউকে চিনতে পারলাম, কাউকে পারলাম না। স্মৃতি থেকে মুছে গেছে। চন্দ্র পাড়ায় অনাদির বাড়ির কাছে এলাম। দুটো বাচ্চা ওদের খামারে খেলা করছে। ধুলোয় মোড়া শরীর। ওদের দেখে হাসি পেল।

আমিও একসময় এরকম ছিলাম, গ্রামের ছেলেরা ধুলো ঘাঁটতে খুব ভালোবাসে। মেয়েটা মনে হচ্ছে বড়। কত বয়স হবে চার কি পাঁচ, ছেলেটা দুই কিংবা তিন। একজন আর একজনের মাথায় ধুলো দিচ্ছে। আমি খানিকক্ষণ দাঁড়িয় দাঁড়িয়ে ওদের খেলা দেখলাম। ওরা মাঝে মাঝে আমার দিকে জুল জুল করে তাকাচ্ছে। ছেলেটা লেংটো, মেয়েটার পরনে একটা জাঙ্গিয়া। উদমগায়ে দুজনে ধুলো মাখামাখি করছে।

অনাদি বাড়ি আছিস—আমি চেঁচিয়ে উঠলাম।

বছর চব্বিশের আটপৌরে একটি মেয়ে উঁকি দিয়েই আবার ভেতরে চলে গেল।

বেশ কয়েকটা গরু খামারের একপাশে বাঁধা। চোখ বন্ধ করে খড় চিবচ্ছে। মুখ দিয়ে লালা গড়িয়ে পড়ছে। একটা বোকনা বাছুর তার মায়ের পেটের তলায় গুতিয়ে গুতিয়ে বাঁট থেকে দুধ টেনে খাচ্ছে। লেজ দুলছে তার খেয়ালে। কতো আর বয়স হবে, দিন পনেরো।

অনাদিরা এই গাঁয়ের সম্ভ্রান্ত চাষী পরিবার। বেশ ভালো পয়সা আছে। তাছাড়া এখন অনাদি গ্রামপঞ্চায়েত হয়েছে। নিশ্চই কিছু পয়সাগড়ি করেছে। একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। প্রথমে ঠাহর করতে পারিনি। পরে বুঝলাম মদনকাকা, অনাদির বাবা।

আমি এগিয়ে গেলাম, পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম। কাকা থাক থাক করলেন।

কে বাবা?

আমি অনি।

সঙ্গে সঙ্গে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। এ কী করলি অনি এই সাত সকালে—

কী করলাম!

তুই আমাকে পেন্নাম করলি।

কেন!

তোরা ব্রাহ্মণ, আমরা নমশুদ্র। কায়েতের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে নেই।

তোমরা আমার গুরুজন।

কাকা আমার গায়ে মাথায় হাত রাখলেন। চেঁচিয়ে উঠলেন বড়োবৌ দেখবে এসো কে এসেছে।

কাকার চোখে বিষ্ময়ের কাজল চক চক করছে।

জানিস বাবা, কাল তোর ঘরে গেছিলাম। তোকে একবার দু-চোখ ভরে দেখতে।

কেন!

তুই কত বড়ো হেয়েছিস। চারিদিকে তোর কত নামডাক।

এই তো আমি তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। কোথায় বড়ো হয়েছি?

কথা বলে নিজেই হাসছি।

কাকিমা ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন। কে এসেছে গো, কে এসেছে?

অনি এসেছে গো, দেখো দেখো।

তাকিয়ে দেখলাম, বারান্দা থেকে সেই ভদ্রমহিলা উঁকি দিয়ে আমাকে দেখছেন। ঘোমটার আড়ালে তার মুখ ঢাকা। বাচ্চাগুলো পায়ে পায়ে আমার কাছে এসে হাজির।

কাকিমা কাছে এলেন। আমি নিচু হয়ে প্রণাম করতে গেলাম। কাকিমা হাত ধরে ফেলেছেন, না বাবা তুই প্রণাম করিস নি, তোর বাপ-মাকে মন্যে প্রণাম করতি। আজ বাঁইচা থাকলে তান্যে দেখতন তানকার অনি কততো বড়ো হছে।

মাথা নিচু করলাম, ও কাঞ্চন আয় ইদিকে আয় দেখা যা অনিকে।

কেন! আমি কি দেখার মতো বস্তু।

নারে, তোর কথা প্রায় আলোচনা হয়। ওরা তোকে সেইভাবে দেখেনি। দেখলেও হয়তো মনে নাই, ভাবে লোকটা কে?

মেয়েটি কাছে এগিয়ে এলো, বেশ দেখতে। অযত্নে মরচে পড়ে গেছে। ঘোমটা দেওয়া। আমায় প্রণাম করতে চাইল। আমি বললাম থাক থাক, প্রণাম করতে হবে না।

কাকিমা বললেন, অনাদির বউ।

তাই নাকি?

ওই দেখ দুটিতে কেমন খেলা করছে, একটা ছেলে, একটা মেয়ে।

মাথা নিচু করে হাসলাম।

একটু চা করি বসুন। কাঞ্চন বললো।

এখন না, আর একদিন এসে খাব। অনেক সকালে বেরিয়েছি। কেউ জানে না।

কোথায় গেছিলি? কাকা জিজ্ঞাসা করলেন।

দীঘাআড়ি।

কাঞ্চন আমার দিকে অবাক হয়ে তাকাল। ওর আয়তো চোখে বিস্ময়। এই লোকটা ওই বন বাদাড়ে কি করতে গেছিল? ঘোমটা সরে গেছে, মাথার সিঁদুর ফিকে। এলোমেল চুল মুখের ওপর এসে পড়েছে।

কাকা। অনাদি কোথায়?

ও আর দিবাকর রাত থাকতে বেরিয়েছে, বললো একটু টাউনে যাবে কি কাজ আছে।

ঠিক আছে, আমি আসি।

অনাদির বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিষই পাড়ার গা দিয়ে, দাসের ঘরের কলাবাগানের ভেতর দিয়ে বড়মতলায় এসে পরলাম। বড়মতলার পুকুর ঘাটে সেই পেয়ারাগাছটা এখনও অটুট। বেশ কয়েকটা বাচ্চা গাছটার ডাল ধরে দাপা দাপি করছে। পেয়ারা ছিঁড়ে খাচ্ছে।

গ্রামের ভাষায় ইজমালি গাছ। এ গাছ কারুর একার নয় তাই সবার অধিকার। এক সময় এর ডালে কত নাচানাচি করেছি, গ্রীষ্মের দুপুরে এই গাছের ডাল থেকে, পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছি। মনটা কেমন আনচান করে উঠলো। আরে দাঁত মাজা হয়নি। আমি পেয়ারা গাছের কাছে যেতেই বাচ্চাগুলো ছুটে একটু দূরে চলে গেল।

আমি একটা শরু পেয়ারা ডাল ভেঙে নিয়ে দাঁতনের মতো করে নিলাম। কিছুক্ষণ গাছটার তলায় দাঁড়ালাম, মগডালে কয়েকটা পেয়ারা রয়েছে। কিছুতেই লোভ সামলাতে পারলাম না, বাচ্চা গুলোকে ইশারায় কাছে ডেকে নিলাম।

ওরা প্রথমে কিছুতেই আসতে চায় না, তারপর আমার ওপর বিশ্বাস জন্মাল। কাছে এগিয়ে এল। আমি গাছে উঠলাম, মগডাল থেকে পেয়ারা ছিঁড়ে ছিঁড়ে ওদের দিকে ছুঁড়ে ফেললাম। ওদের সে কি আনন্দ, কি চেঁচামিচি, আমি দুটো পেয়ারা ওদের কাছ থেকে পারিশ্রমিক হিসাবে চেয়ে নিলাম। কে আমাকে পেয়ারা দেবে তার কমপিটিশন লেগে গেল। আমি এদের কাউকে চিনি না জানি না। সবাই একসঙ্গে তারস্বরে চাঁচাল, কাকু আমারটা নাও, কাকু আমারটা নাও, আমি দুজনের কাছ থেকে দুটো পেয়ারা নিলাম। বড়মতলার পুকুর ঘাটে মুখ ধুলাম। বাড়ির পথ ধরলাম।

খামারে উঠতেই নীপার গলা শুনতে পেলাম।

ওই উনি আসছেন। যাও ভাইপোর কাছে হিসাব চাও। তিনি কখন কোথায় গেছিলেন?

কাকা আমতা আমতা করছে নীপার কথায়।

আমি দাওয়ায় পা রাখলাম।

দীঘাআড়ি ছাড়া তোমার কি আর যাবার জায়গা নেই। নীপা ফরফর করছে।

চারিদিকে চোখ বোলালাম, আরও অনেকে বসে আছেন, কাউকে চিনি না।

কাকিমা ভেতর থেকে বাইরে এলো।

ওঃ গিন্নী হয়ে গেছেন, ধমক্কাচ্ছে দেখ ছেলেটাকে কেমন।

কাকিমা আমার কাছে এসে বললো, হ্যাঁরে বাবা চা-টা কিছু না খেয়ে কোথায় গেছিলি?

দীঘাআড়ি।

সে তো আমি এখুনি শুনলাম, কালিচরণের ঝির কাছ থেকে।

চমকে উঠলাম। কালিচরণের ঝি!

হ্যাঁ। ও তো বাইশটিকীর কাছে মাঠে কাজ করছিল, তোকে দেখেছে।

ও।

কি খাবি?

কিচ্ছু না।

তার মানে!

কলকাতায় এত সকালে খাওয়া জোটে না।

তুই তো তোর সাহেবের বাড়িতে থাকিস।

থাকতাম। এখন থাকি না।

কাকিমা একটু অবাক হলো।

নীপা তোর জন্য আলুভেজে রেখেছে, মুড়ি দিয়ে মেখে দেবে?

নীপার দিকে তাকালাম। ভেঙচি কেটে মুখটা ঘুরিয়ে নিল।

দাও একটুখানি, বেশি না।

নীপা ছুটে ভেতরে চলে গেল।

তুই চিনতে পারিস এদের। কাকা বললো।

না।

এরা রামপুরা থেকে এসেছে।

আমি কাকার পায়ের কাছে বসে থাকা সারিবদ্ধ মুখ গুলোর দিকে তাকিয়ে হাঁ করে থাকলাম। প্রণাম করতে আর পারছি না। কালকে থেকে প্রণাম করতে করতে কোমর ব্যাথা হয়ে গেছে। কেবলা কেবলা চোখে সবার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলাম।

তোমার কথা অনেক শুনিগো ছোটোবাবু।

বুঝলাম কাকা বড়বাবু, আমি ছোটোবাবু।

তা বউমাকে সঙ্গে আনলেনি কেনে?

কাকা ধমকে উঠলো, ছুঁচ্চা কাই করার ও এখনও বিয়েই করেনি, বউমা।

তা কী করে জানব বলো বড়বাবু।

নীপা মুড়ির বাটি দিতে এসে ফিস ফিস করে বললো, ওপরের ঘরে এসো, কথা আছে।

আমি ওর দিকে তাকালাম।

মুড়ি খেলাম। চা খেলাম। অনাদি আর দিবাকর বাইক নিয়ে খামারে এলো। খামার থেকেই আমাকে দেখতে পেয়েছে। পায়ে পায়ে দাওয়ায় এলো।

কে এলো?

স্যার, আমি অনাদি। দিবাকর কাকার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো।

কে।

স্যার, আমি দিবাকর।

বাবাঃ অনি এসেছে, তাই তোদের দেখা পাই।

দিবাকর মাথা চুলকোচ্ছে। নীপা ছুটে চলেগেল। ব্যাপরটা বুঝলাম না। অনাদি বললো, চল একটু কথা আছে।

আমি কাকাকে বললাম, কাকা আমি যাই, ওরা এসেছে, ওদের সঙ্গে কথা বলি।

যা।

এ বাড়িতে এলাম, ঘরে ঢুকতেই নীপা কট কট করে আমার দিকে তাকাল। ঘর গোছাচ্ছিল। আমার পেছন পেছন অনাদি, দিবাকর ঢুকলো।

এই নীপা একটু কড়া করে চা বানা।

সে আর বলতে, সব চা খোর এক সঙ্গে জড়ো হয়েছো।

ঠিক বলেছিস।

মুড়ি খাবে?

সকাল থেকে পেটে কিছু পরেনি।

কি রাজকাজে গেছিলে শুনি।

সে অনেক কাজ, তুই বরং আগে একটু চা নিয়ে আয়, পরে মুরি আনবি।

নীপা চলে গেল।

অনাদি প্যাকেট থেকে সিগারেট বার করলো, আমি বললাম রাখ, আমি এক প্যাকেট সখ করে কিনে এনেছি, কটা আর খাব তোরা খা। প্যাকেটটা টেবিলের ওপর থেকে নিয়ে এলাম।

আরি ব্যাস! অ্যাতো দামি সিগারেট! খাব না।

এটা কি দামি সিগারেট?

হ্যাঁ।

জীবনে প্রথম নিজের হাতে কেনা। বলতে পারবো না।

কলকাতায় তোকে সাংবাদিক বলে কেউ চেনে?

আমি চুপ করে থাকলাম।

অনাদি একটা সিগারেট বার করল। দিবাকরকে একটা দিল। আমিও একটা সিগারেট ধরালাম।

তুই শালা বললি সিগারেট খাস না। যেভাবে খাচ্ছিস এ তো পাক্কা সিগারেট খোরের মতো টান।

আমার বসের নকল করা।

ওরা হাসলো।

শোন অনি সব ব্যাবস্থা করেছি। মাইক্রোসার্জারি হবে। খরচ একটু বেশি। তবে কয়েকঘণ্টার ব্যাপার, স্যারকে নার্সিংহোমে ঘণ্টা পাঁচেক থাকতে হবে। তারপর ছেড়ে দেবে।

খুব ভালো।

কিন্তু ভাই রগঢ়াটা অনেক বেশি।

কতো?

পঁয়ত্রিশ চাইছে।

এখানে এটা ঠিক আছে, কলকাতা হলে হাজার পঁচিশের মধ্যে হয়ে যেত।

তুই এর রেট জানিস?

হ্যাঁ। অমিতাভদার করিয়েছি।

এই নার্সিংহোমটা এখানে খুব নাম করেছে। ইকুইপমেন্টও বেশ ভালো।

কোথায়? স্টেশনের থেকে একটু এগিয়ে হাইরোডের ধারে।

তাহলে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করতে হবে।

সে হয়ে যাবে।

নীপা মুড়ির বাটি নিয়ে ঢুকলো, সরাসরি আমার দিকে তাকাল।

তুমি তো এক পেট গিললে আবার হবে নাকি?

না। একটু চা হলে ভালো হয়।

হবে। অনাদিদা চা কি এখুনি আনব না পরে?

তোর আনতে আনতে মুড়ি টেনে দেব, চাষার ছেলে।

আমি হাসলাম।

অনাদি আমার দিকে তাকাল।

তোকে খুব শাসন করছে না?

সে আর বলতে, আমি এরইমধ্যে খুব ভয় পেতে শুরু করেছি।

তুই জানিস না এ তল্লাটের দিদিমনি বলে কথা।

অনাদিদা ভালো হচ্ছে না বলে দিচ্ছি। নীপা চেঁচিয়ে উঠলো।

তুই শুধু সাপ্লাই লাইনটা ভালো রাখ। তাহলে তোর কোনওগুণের কথা অনিকে একটাও বলবো না।

নীপা পা দাপাতে দাপাতে বেরিয়ে গেল, দিবাকর বললো দাঁড়া একটু আসি বলে নীপার পেছন পেছন বেড়িয়ে গেল। অনাদি হাসলো।

মুড়ি খেতে খেতে অনাদি বললো, তুই রাজি হলে আজই গিয়ে বুক করতে হবে।

কত লাগবে?

পাঁচ লাগবে।

পাঁচ কি হাজার না পাঁচশো?

হাজার হাজার।

চল তাহলে দিয়ে আসি।

অনি আছিস নাকি?

নিচ থেকে একজন চেঁচিয়ে উঠল।

বাসুর গলা মনে হলো। অনাদির দিকে তাকিয়ে বললাম, কে বলতো?

আবার কে বাসু হারামজাদা।

ওকে দুপুরে আসতে বললাম।

শালার এই কদিন ব্যবসা লাটে। অনাদি বললো।

অনাদি বাইরের বারান্দায় বেরিয়ে গেল। এসো সেগোরা এসো, একটু মেরে দিয়ে যাও।

বুঝলাম বাসু একলা না। আরও অনেকে এসেছে। সিঁড়িতে হুড়ুম দুড়ুম আওয়াজ, আমার ঘর ভরে গেল। কালকে যারা দলে ছিল না, তারাও এসে হাজির। সকলেই আমাকে দেখে খিস্তির বন্যা বইয়ে দিল।

চেঁচামিচি একটু থামতে, অনাদি বললো সঞ্জীব এখন বড়ো বেওসায়ী।

সঞ্জীব অনাদিকে তেরে খিস্তি দিল, হারামী বাঁধে মাটি ফেলা নিয়ে কত কামিয়েছিস বল। বুঝলি অনি একবার বন্যা হলেই হয়, অনাদির কামাই শুরু।

আমি বললাম, থাম থাম।

কেন থামবো বল অনি, যখনই দেখা হবে তখনই আমাকে এই ভাবে ঠেস মেরে কথা বলবে।

আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। তোর এখনও মাথাটা….।

নীপা ঢুকলো। সবাইকে দেখে ও চোখ দুটো কেমন করলো….।

আমি আর চা করতে পারব না।

চিকনা উঠে দাঁড়াল, এই কথা, চল দেখিয়ে দে চায়ের জায়গাটা, তারপর বাকিটা আমি সামলে নিচ্ছি।

চলো না, মনিমা আছে দেখতে পাবে।

ওরে বাবা, তাহলে আমি নেই, ভানু তুই যা।

স্যার বুইসে আছন।

আমি নীপার দিকে তাকালাম, নীপা যাও একটু কষ্ট করো আমার জন্য….।

তোমার জন্য করতে আমার একটুও অসুবিধা নেই। এদের জন্য পারব না।

দেবী দেবী কেন তুমি ক্রোধান্বিত আমাদের ওপর, আমরা তোমায়….।

পলার কথায় সবাই হেসে উঠলাম।

শালা যাত্রার ডায়লাগ আওড়াল। চিকনা বললো।

নীপা কট কট করে পলার দিকে তাকাল। আমাদের ড্রেস রেডি।

রেডি ম্যাডাম, যখন যাবেন পেয়ে যাবেন।

নীপা চলে গেল। অনাদি বললো দাঁড়া অনির একটা ব্যাপার নিয়ে আমি আর দিবাকর সকালে কিওর নার্সিংহোমে গেছিলাম, এই আসছি।

সবাই চুপ করে গেল। অনাদি সমস্ত ব্যাপারটা বললো।

স্যারের এরকম অবস্থা আমরা কেউ জানি না! বাসু বললো।

তোরা কেউ খোঁজ খবর রাখিস না। আমি বললাম।

আমাদের হাটের কানা সামন্তকে দেখিয়েছিল। চিকনা বললো।

ছাড় ওসব কথা। বাসু বললো।

কাজের কথায় আসি। পর্শু যদি অপারেশনের ব্যবস্থা করি তোদের সবাইকে পাবো? অনাদি বললো।

এটা আবার জিজ্ঞাসা করতে হয়, নেতা হয়েছিস না ঘর মোছার ন্যাতা। চিকনা বললো।

ঠিক আছে, ঠিক আছে। ভানু গাড়ির ব্যাপারটা।

চল যাচ্ছি, ফেরার পথে গোড়ার সঙ্গে কথা বলে চলে আসব।

কখন বেরবি? চিকনা বললো।

তাহলে ঘণ্টা খানেকের মধ্যে বেরিয়ে যাই চল।

ঠিক হলো আমরা ছ-জন যাব, বাসুর একটা বাইক, অনাদির একটা বাইক আর সঞ্জুর একটা বাইক। সঞ্জীব ভানু আর আমি। দিবাকর বললো আমি যাব না বিকেলে কাজ আছে।

ঘণ্টা আছে। চিকনা বললো।

এই আবার শুরু করলি। অনাদি বললো।

কেন একদিন না গেলে কি মহাভারত অশুদ্ধি হয়ে যাবে। চিকনা বললো।

তোকে ভাবতে হবে না।

তুই ওটাকে নিয়ে গেছিলি কেন, বাসুকে নিয়ে যেতে পারিসনি।

বাসুর একটা কাজ ছিল।

আমাকে ডাকতে পারিসনি।

ঠিক আছে ঠিক আছে। ওর কাজ থেকতে পারে না।

চিকনা চুপ করে গেল।

হাতের কাজ শেষ করে নে, আগামীকাল ওখানে সবাইকে যেতে হবে। সারাদিন লেগে যাবে।

সবাই মেনে নিল অনাদির কথা। নীপা চা নিয়ে এলো, হাসি ঠাট্টা ইয়ার্কি ফাজলাম কত কি হলো। সবার মধ্যমনি নীপা। আমাদের আড্ডায় কিছুক্ষণ অংশগ্রহণ করলো। চিকনা ধমকে বললো, বড়দের আড্ডয় ছোটোদের থাকতে নেই।

আমি এখন এ্যাডাল্ট।

নীপা এমন ভাবে কথা বললো, সবাই হাসলো।

নীপা চলেগেল।

সঞ্জীবের দিকে তাকিয়ে বললাম, হ্যাঁরে তোর দোকানে টিভি আছে।

আনাদি বললো আছে মানে, কি চাই বল।

দেখলি ব্যবসার কথা হলেই অনাদি কেমন টোকে।

সব কথা গায়ে মাখিস কেন। আমি বললাম।

এই হলো কাল। বাসু বললো।

তোর কথা ভাঙিয়ে কত কাজ বাগায় জানিস সঞ্জু। অনাদি বললো।

তুই করিস না।

হ্যাঁরে ছুঁচ্চা আমি করি, তুই করিস না—

সঞ্জীব হেসে বললো, করি। কম।

নিজেই হেসে ফেললো।

একটা কথা কি জানিস অনি তোকে সবাই বেশ ধ্বসে।

কি রকম। আমি সঞ্জুর দিকে তাকালাম।

সেদিন ভানুর একটা ব্যাপারে বিডিওর কাছে গেলাম, শালা কিছুতেই করবে না, যেই বললাম ঠিক আছে আমার বন্ধুকে তাহলে একবার ফোন করতে হবে।

শালা তোর নাম শুনেই বলে কিনা আপনি একটু ঘুরে আসুন আপনার কাজ হয়ে যাবে।

সত্যি বলছি অনি কাজটা হয়ে গেল। তুই শালা এখন মিনিস্টার বনে গেছিস।

আবার সবাই হাসলো। সিগারেটের প্যাকেটে মাত্র দুটো সিগারেট পড়ে আছে। চিকনা একটা আমাকে দিয়ে বললো, এটা কাউন্টার হবে। ভানু বললো আমি ফার্স্ট, চিকনা বললো, ইঁট পাতো। আমি হেসে ফেললাম।

বাসুকে আলাদা করে বললাম, নীপা তোর দোকানে আজ যাবে কিছু জামা কাপড় কিনতে, তুই থাকবি না, তাহলে কি হবে?

বাসু খিস্তি করে বললো, তোকে চিনতা করতে হবে না।

সঞ্জীবকে বললাম, তোর দোকানের সবচেয়ে ভালো টিভি যদি থাকে আজ একটু লাগিয়ে দেবার ব্যবস্থা কর।

সঞ্জীব আমার দিকে তাকল, চুয়াড়।

আমি মুচকি হাসলাম।

সবাই চলে গেল। ঠিক হলো এখান থেকে বারোটার সময় বেরবো। ওরা বাইক নিয়ে যে যার চলে আসবে। আমি ওবাড়িতে গিয়ে কাকার সঙ্গে সব আলোচনা করলাম। নীপা, কাকিমা, সুরোমাসিও ছিল। ওরা আমার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে আছে। আমি কাকাকে বললাম তুমি অনুমতি দাও আমি এখানে থাকতে থাকতে সব কাজ সেরে যেতে চাই।

কাকা কেঁদে ফেললো। চশমা লাগিয়েও আমি দেখতে পাই না অনি। যার চোখ নেই, পৃথিবী তার কাছে অন্ধকার। তোর লেখা আমি পড়তে পারি না। নীপা পড়ে পড়ে শোনায়, ঘরে একটা টিভি আনতে পারলাম না। মেয়েটা সারাদিন কি করে বলতো, সন্ধ্যায় খাল পেড়িয়ে চিকনাদের বাড়িতে যায়, একটু টিভি দেখার জন্য।

আমি গুম হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলাম। কাকিমার দিকে তাকিয়ে বললাম, পান্তা খেয়ে বেরবো।

সেকিরে, মেয়েটা তোর জন্য সেই সাত সকাল থেকে রান্না করলো।

নীপার দিকে তাকালাম, ওর মুখটা কেমন থমথমে।

ঠিক আছে, আমি স্নান সেরে আসি, ওরা এসে পরবে এখুনি।

আমি ও-বাড়ি হয়ে পুকুর ঘাটে চলে গেলাম। স্নান সেরে ঘরে এসে দেখি নীপা দাঁড়িয়ে আছে খাটের কাছে। কি যেন করছে। আমাকে দেখেই মুখটা গম্ভীর করে নিল।

কি হলো আবার?

কি হয়নি তাই বলো।

আমি ওর দিকে তাকালাম।

তুমি যে এরই মধ্যে এতো সব প্ল্যান ভেঁজেছো, আমাকে জানিয়েছ।

সময় পেলাম কোথায়।

কেন কাল থেকে সময় পাও নি?

হাসলাম।

আমি কি তোমার কেউ নই?

কে বলেছে তুমি কেউ নও।

তাহলে।

আচ্ছা আচ্ছা ঘাট হয়েছে।

আমায় একটা জিনসের প্যান্ট আর গেঞ্জি এগিয়ে দিল।

আমি বললাম এটা নয় পাজামা পাঞ্জাবী দাও। এগুলো কলকাতার জন্য।

না।

কেন!

এটা পরলে তোমাকে দারুন স্মার্ট লাগে।

হাসলাম। দাও।

জাঙ্গিয়াটা পরতে গিয়ে ওর দিকে তাকালাম। ও হাসছে।

তুমি যাও।

ভেবেছিলাম তোমার সঙ্গে কথাই বলবো না।

সে কি!

নীপা বেরিয়ে গেল। আমি জামা প্যান্ট গলিয়ে নিলাম।

আসবো।

এসো।

নীপা ভেতরে এলো। ওর দিকে তাকালাম। চোখ মুখ বলছে কিছু বলবে। উসখুস করছে অনেকক্ষণ থেকে।

অনিদা তোমায় একটা কথা বলবো?

বলো।

কালকে আমি খুব বড়ো একটা অন্যায় করে ফেলেছি।

আমি নীপার দিকে তাকিয়ে আছি। বুঝে ফেললাম ও কি বলতে চায়।

তুমি কোনও অন্যায় করোনি।

একথা বলছো কেন—

অন্যায়টা তোমার বয়স করেছে।

তুমি আমাকে খুব খারাপ মেয়ে ভাবলে।

একবারে না।

কি জানি, তখন কি যে হলো।

দেখো নীপা ওটা বয়সের ধর্ম। আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে, তোমায় গ্রহণ করতো।

নীপা আমার কাছে এসে মুখ নিচু করে দাঁড়াল। আমাকে ক্ষমা করে দাও অনিদা।

আমি ওর কাঁধে হাত রাখলাম। নীপা মাথা নিচু করে আছে।

আমি ওর চিবুকটা ধরে মুখটা তুললাম। চোখের পাতা দুটো চিক চিক করছে। আমি ওর চোখের পাতায় আঙুল ছোঁয়ালাম।

নীপা আমাকে জাপ্টে ধরলো।

তুমি বিশ্বাস করো অনিদা মেশো, মনিমা গ্রামের সকলের কাছে তোমার কথা শুনে, শুধু ভাবতাম তুমি আমার, আর কারুর নয়। আমায় যদি তোমার জন্য আবাহমান কাল অপেক্ষা করতে হয় আমি করবো। কিন্তু তুমি আমার।

আমি তো তোমার। একথা ভুল নয়। এই তো তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।

নীপা আমার দিকে চোখ মেলে তাকাল। ওর ডাগর চোখে অনেক জিজ্ঞাসা।

একদিন তোমার ভুল ভাঙবে নীপা। তখন দেখবে আমি যা করেছি ঠিক করেছি।

নীপা আমাকে আরও জোরে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো।

তুমি কখনও আমাদের ছেড়ে যাবে না।

কেন যাবো!

নীপা আমাকে জড়িয়ে ধরে বেশ কিছুক্ষণ কাঁদলো। আমি ওর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে অনেক করে বোঝালাম। নীপা আমাকে ছারলো।

আমি মিটসেফের কাছে গিয়ে আয়না চিরুনিটা নিয়ে চুলটা কোনওপ্রকারে আঁচড়ালাম। নীপা আমায় তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখছে।

কি দেখছো?

তোমাকে যত দেখছি, হিংসে হচ্ছে।

কেন!

আজ যারা এই বাড়িতে এসেছিল, জানো তারা কেউ এই কয় বছরে আসেনি। একমাত্র চিকনাদা ছাড়া।

জানি। ওরা স্বীকার করেছে।

তাও ওদের সঙ্গে তুমি রিলেশন রাখবে!

পৃথিবীতে একটা পিঁপরের কিছু না কিছু অবদান আছে।

রাখো তোমার তত্ত্ব কথা।

এবার দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।

নীপা আমাকে আবার জড়িয়ে ধরে ঝড় ঝড় করে কেঁদে ফেললো। তুমি কিছুদিন আগে আসনি কেন অনিদা। তাহলে আমাদের এই দূরবস্থা হতো না। মনিমা, মশাইকে কতো লাঞ্চনা গঞ্জনা শুনতে হয়েছে সকলের কাছে। কেন তুমি এরকম করলে।

ঠিক আছে ঠিক আছে। আমি এসে গেছি। সময় কখনও একইভাবে চলে না।

নীপার কান্না থামে না।

আমি ভীষণ অপ্রস্তুতে পড়ে গেলাম। নীপা কাঁদুক, কিছুক্ষণ কাঁদলে ও বরং হাল্কা হবে। নীপার চোখের জলে আমার বুক ভিঁজেছে। আমি ওর চোখ মুছিয়ে দিলাম। এবার চলো।

ওরা ঠিক সময়ে চলে এলো। আমি ওদের সঙ্গে বেরিয়ে এলাম।

আমি বাসুর বাইকে বসেছি।

যেতে যেতে বাসুর সঙ্গে টুকরো টুকরো অনেক কথা হলো। এও জানলাম বাসুর দোকানে কাকার প্রায় হাজার পাঁচেক টাকা ধার আছে।

বাসুকে বললাম এখানে এসবিআই-এর এটিএম আছে।

ও বললো, আছে।

আমি বললাম তুই প্রথমে ওখানে আমাকে একবার দাঁড় করাবি। তারপর নার্সিংহোমে যাব।

ও বললো ঠিক আছে।

এটিএম থেকে একবারে টাকা তুলতে দিল না। তিনবারে পঞ্চাশ হাজার টাকা তুললাম। নিয়ে এসেছিলাম দশ হাজার টাকা। বেশ কিছু টাকা খরচ হয়েছে। কি আর করা যাবে। নার্সিংহোমে পৌঁছলাম প্রায় দেড়টা নাগাদ। ওখানে সব কাজ মিটতে প্রায় সাড়ে তিনটে বাজলো।

অনাদির সঙ্গে বেশ চেনা পরিচয় আছে দেখলাম। আমার কোনও পরিচয় এখানে দিলাম না। ওদেরও বারন করে দিয়েছিলাম। নার্সিংহোমে পঁচিশ হাজার টাকা জমা দিলাম।

ভানু গাড়ির ব্যবস্থা করলো। দুটো টাটা সুমো, ওখানে টাকা মেটালাম।

মোবাইলের টাওয়ারটা দেখলাম বেশ ভালো। অমিতাভদাকে ফোন করে সব জানালাম। অমিতাভদা বড়োমাকে দিলো। আমি বড়োমার সঙ্গে কথা বললাম।

বড়োমার ঘুরে ফিরে সেই এক কথা আমি যাব, তুই না করিস না।

বহুবার বারন করলাম, শুনল না, বাধ্য হয়ে ঠিকানা পত্র সব দিলাম।

মিত্রাকে ফোন করলাম, মিত্রাকে সব জানালাম, নেচে উঠলো আমি যাব। ওকেও বললাম, এসে কি করবি, শুধু শুধু এতদূরে আসবি, আবার ফিরতে হবে।

কিছুতেই আমার কথা শুনল না, বাধ্য হয়ে বললাম, বড়োমারা আসবে, তুই বড়োমার সঙ্গে চলে আয়। আর যখন আসবি আমার একটা উপকার কর।

বল কি করবো।

তুই আমার জন্য একটা মোবাইল কিনে আনিস, এই মোবাইলটা কাকার কাছে রেখে যাব।

আমি এখান থেকে একটা সিম কার্ড নিয়ে নিচ্ছি। আসার সময় মোবাইলটা ফুল চার্জ দিয়ে নিয়ে আসবি।

ঠিক আছে।

আমি আমার মতো ওদের সঙ্গে কথা বলছিলাম। খেয়াল করিনি বাসু আমার পাশে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে আমার কথা শুনছিল। ঘুরে তাকাতেই দেখলাম ওর চোখেমুখে বিস্ময় ফুটে উঠেছে।

হ্যাঁরে অনি, বড়োমা কে!

ওকে সব বললাম, শুনে ওর মাথা খারাপ।

জিজ্ঞাসা করলো, মিত্রা?

বললাম সব কথা। হাসতে হাসতে বললো, তুই শালা তোর মালকিনকে তুই তুই করে বলছিস।

কি করব বল, ভাগ্যচক্রে ওর সঙ্গে আমি এক সাথে পড়াশুনা করেছি।

উরি শালা, তুই তো বড়োগাছে মই বেঁধেছিস!

আমি বললাম, নারে। ও বিবাহিত ওর স্বামী এশিয়ার রিনাউন্ড একজন ডাক্তার।

শুনে ওরা থ। কথাটা ভানু, অনাদি, সঞ্জীবের কাছে পৌঁছতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না।

ওরা তো এই মারে সেই মারে।

অনাদি বললো তুই শালা কিরে, নীলকন্ঠ?

আমি হাসলাম।

সঞ্জীবকে বললাম, তুই তো ইলেকট্রনিকসের ব্যবসা করছিস, আমায় একটা সিম জোগাড় করে দে।

কেন?

দরকার আছে।

তোর তো আছে।

কাকাকে দিয়ে যাব।

সেট।

ওই তো আনতে বলে দিলাম। কাল এসে যাবে।

তোরটা কি?

এন সেভেন্টি টু।

আরি বাবা এই তল্লাটে কারুর নেই। চল আমার বস মগার দোকানে।

সেটা আবার কে?

আমার মহাজন। আমি কলকাতা যাই না, ওর কাছ থেকেই মালপত্র নিয়ে যাই।

কলকাতা থকে মাল নিয়ে এসে ব্যবসা করতে পারিস। আমি ঠেকগুলো সব চিনিয়ে দেব। দেখবি দুটো পয়সার মুখ দেখতে পাবি।

বুঝলি অনি, ক্যাপিটেল চাই।

মহাজন দেবে।

কি বলছিস তুই!

হ্যাঁ।

তোকে মাল পাঠাবে তুই যদি ঠিক ঠাক বিক্রি করে পয়সা দিস, আর কোনও অসুবিধা নেই। ধান্দা ভালো।

ঠিক আছে, তোর কাজ মিটুক, বসে কথা বলা যাবে।

ওর বস মগার দোকানে এলাম। সঞ্জীব প্রথমেই ট্রাম্প কার্ড খেললো।

মগাদা এই সেই বিখ্যাত অনি।

উনি চেয়ার ছেড় উঠে দাঁড়ালেন। জোড় হাত করে নমস্কার করলেন।

বসুন বসুন আপনার লেখা কাগজে পড়ি, তাছাড়া সঞ্জীবের মুখ থেকে আপনার কথা অনেক শুনেছি।

ভদ্রলোক একবারে গদ গদ।

সঞ্জীব বললো একটা সিম চাই অনির, আমাদের এখানে যার টাওয়ার সবচেয়ে ভালো সেটা দাও।

কার নামে হবে।

স্যারের নামে।

কাগজপত্র চাই।

কি লাগবে।

ভোটার আইডি, এ্যাড্রেস প্রুফ।

তোমাকে অনাদি দিয়ে যাবে।

ঠিক আছে।

সেট।

কলকাতা থেকে আসছে।

কেন। আমার কাছে আছে, কলকাতার দামেই…..।

যে সেট ওর দরকার তা তোমার কাছে নেই।

কি।

লেটেস্ট মাল ই-সিরিজ।

ভদ্রলোক লজ্জায় পড়েগেলেন। সত্যি আমার কাছে নেই।

এ্যাকটিভেশন কি আজ হয়ে যাবে। আমি বললাম।

হ্যাঁ রাতের দিকে আপনি একটা ম্যাসেজ পাবেন।

ঠিক আছে।

কাজ শেষ হতে হতে প্রায় পাঁচটা বেজে গেল, চকে এসে পৌঁছলাম পৌনে ছটা নাগাদ। পরিদার দোকানে একটু আড্ডা মারলাম। পরিদার সঙ্গে দেখা হলো। সেই ছেলেটি আজ আমায় দেখে চিনে ফললো। আরও অনেকে এলো। যারা আমার লেখার ভক্ত। বেশ উপভোগ করছিলাম ব্যাপারটা।

ওখানে বসে কাল সকালের সমস্ত ব্যাপার চক আউট করে নিলাম। দুটো গাড়ি তিনটে বাইক। আমি অনাদির হাতে টাকা দিলাম। তেল কেনার জন্য।

সঞ্জীব তেরে খিস্তি করলো, টাকা ফেরত নিয়ে নিলাম।

সঞ্জীব আমার কানের কাছে এসে বললো, খবর এলো, তোর বাড়িত টিভি লাগানো হয়ে গেছে। আমার পোলাটা এখনও ঘণ্টা খানেক তোর ওখানে থাকবে। ট্রেনিং পর্বো চলছে।

আমি সঞ্জীবের দিকে তাকালাম। তুই এতো প্রম্পট জানতাম না।

ও হাসলো।

তোর টাকাটা।

তোর কাজ শেষ হোক, তারপর দিস।

ঠিক আছে।

সবাই এক সঙ্গে বেরলাম। আমি অনাদির বাইকে উঠলাম।

চারদিক অন্ধকার, জ্যোৎস্না রাত বিশেষ অসুবিধা হচ্ছে না। অনাদি আমাকে টেস্ট রিলিফের বাঁধের কাছে নামাল।

আমি অনাদির গাড়ি থেকে নামলাম।

সারাদিন তোর সঙ্গে থাকলাম, তুই একটা কথা আমাকে বললি না।

কি—

সকালে তুই আমার বাড়ি গেছিলি?

লজ্জা পেয়ে গেলাম।

তুই কাঞ্চনকে চিনতে পারিসনি—

কাঞ্চন!

শালা, সামন্ত ঘরের কাঞ্চন। উনামাস্টারের কাছে পড়তো।

হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে, আমাদের থেকে কয়েক ক্লাস জুনিয়র ছিল।

হ্যাঁ। তুই এককাপ চাও খাসনি।

অনাদিকে জড়িয়ে ধরলাম, আমি কাকাকে কথা দিয়েছি, একদিন গিয়ে চা খেয়ে আসব।

বাবা বলেছেন। বাবা তোর আগেকার কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেছিলেন।

আমি মাথা নিচু করলাম।

তোকে এই গ্রামের সকলে ভালোবাসে।

দেখছি তাই। আমি কি সেই ভালোবাসার মর্যাদা রাখতে পারব?

কেন পারবি না। তুই আমাদের গর্ব। সঞ্জীব তখন মিথ্যে কথা বলেনি।

আমি অনাদির চোখে চোখ রাখলাম।

কাঞ্চনকে একটু যত্ন নে। মরচে পরে গেছে।

তুই বলিস গিয়ে।

হাসলাম।

হ্যাঁরে, তুই বললে কাজ হবে।

আচ্ছা কাকার ব্যাপারটা মিটুক। যাব।

অনাদি চলে গেল।

সন্ধ্যে হয়ে গেছে। দূরের ঘর গুলোয় এখনও লম্ফ জ্বলে। কারুর কারুর ঘরে লাইট জ্বলছে। তাও মিট মিট করে। জ্যোৎস্না রাতটা দারুন সুন্দর লাগছে। কয়েকদিন পরেই পূর্ণিমা। কাকা যদি পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে পায় তাহলে আমার এই পরিশ্রম সার্থক।

আরও কত কথা মনে পড়ছে, সত্যি কলকাতা আমায় এই ভাবে কখনও আপন করে নেয় নি। নেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু কলকাতাই আজ আমাকে এই আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে, আর অমিতাভদার কথা মনে পড়ছে, উনি না থাকলে আজ কোথায় ভেসে যেতাম।

বড়োমা আমার মায়ের থেকেও বড়ো। কাকে বাদ দিয়ে কাকে ধোরবো। কখন যে বাড়ির গেটের কাছে পৌঁছে গেছি জানি না। দরজাটা হালকা করে ভেজানো। একটু টানলে খুলে যায়। আমি খুব সন্তর্পনে দরজাটা খুলে ভেতরে এলাম। মনে হচ্ছে ওপরে কেউ আছে। ঘরের লাইটটা জ্বলছে।

আমি আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠলাম। ঘরের ভেতরে উঁকি মারতেই অবাক হলাম। নীপা আমার জিনসের প্যান্ট গেঞ্জি পরে বড় আলমারির সামনে যে আয়নাটা আছে, তার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নাচ প্র্যাকটিশ করছে।

নীপাকে দেখতে দারুন সুন্দর লাগছে, আমার গেঞ্জিটা ওর বুকে বেশ টাইট হয়ে বসে আছে। আমি কোনও শব্দ করলাম না, নীপা গুণ গুণ করে গান গাইছে। কোনও একটা পপুলার হিন্দী গানের সুর।

আমি ঠায় দাঁড়িয়ে আছি, মাঝে মাঝে নীপা হাতদুটো ওপরে তুলে শরীরে হিল্লোল তুলছে। গেঞ্জিটা কোমর থেকে সামান্য উঠে যাচ্ছে। অনাবৃত অংশে ভাঁজ পড়ছে। ঘরের মধ্যে এলাম।

আমাকে দেখে নীপা ভীষণ লজ্জা পেয়ে গেল। ও বুঝতে পারেনি আমি এই সময় হঠাৎ চলে আসতে পারি। হাত দিয়ে মুখ ঢাকছে। আলমাড়ির পাশে গিয়ে লুকনোর চেষ্টা করলো।

নীপা এই নীপা, নিচ থেকে সুরোমাসি ডেকে উঠলো।

নীপা লাফিয়ে খাটের ওপর উঠে জানলা দিয়ে মুখ বারাল।

কি হয়েছে মা?

অনিকে দেখেছিস?

অনিদা তো সেই দুপুরে বেরিয়েছে।

সে তো আমি জানি।

ফিরে এসেছে?

হ্যাঁ। দিবাকর এসেছে। কি দরকার।

তাহলে দেখ আবার কোনও বনবাদারে গিয়ে বসে আছে।

তুই কি করছিস ওপরে?

নাচ প্র্যাকটিস করছি।

অনি এলে ওকে একবার ওবাড়িতে পাঠাস।

আচ্ছা।

নীপা খাট থেকে নেমে কোমরে হাত দিয়ে আমার দিকে কট কট করে তাকাল।

আমি হাসছি।

এখুনি একটা বিপদ ডেকে আনছিলে।

আমি ওর দিকে তাকালাম।

শোনো সামনের দরজা দিয়ে নয় পেছনের দরজা দিয়ে বেরোও। তারপর বাকিটা তুমি ম্যানেজ করবে। বারান্দায় অনেক লোকের ভিড়। সবাই তোমার কীর্তি কলাপ দেখছে।

আমার কীর্তি কলাপ!

হ্যাঁ। কাকা বলেছে, আর টিভি চলে এলো।

হাসলাম।

আমি নিচে নেমে এসে খিড়কি দরজা দিয়ে বেরলাম। চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। স্টেশনের ওখান থেকে দু-প্যাকেট সিগারেট কিনে এনেছি। চাঁদের আলো বাঁশ ঝাড়ের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে নিচে এসে পরেছে। জানাকির আলো নিভছে জ্বলছে। একটা স্বপ্নিল পরিবেশ। পানা পুকুরের ধারে একটা বাঁশঝাড়ের তলায় শুকনো পাতার ওপর বসলাম।

একটা সিগারেট ধরালাম। ঝিঁ ঝিঁ পোকার তারস্বর ডাক। আকাশটা পুকুরের জলে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। পুকুরের স্থির জলের দিকে তাকিয়ে আমি তারা গুনলাম। কলকাতার আকাশে এত তারা দেখা যায় না। হঠাত একটা স-র স-র আওয়াজে চমকে তাকালাম।

একটা সাপ বাঁশ গাছ থেকে নেমে পাশ দিয়ে চলে গেল। একটু ভয় পেলাম। যতই আমি গ্রামের ছেলে হই আজ দশ বছর কলকাতায় আছি।

না, থাকাটা ঠিক নয়। পায়ে পায়ে পেছনের পথ ধরে বারান্দায় এলাম। ওখানে তখন তারস্বরে টিভি চলছে। একটি ছেলে টিভির সামনে বসে আছে। বাকি সবাই টিভির দিকে মুখ করে।

ওখানে তখন হুলুস্থূলুস কাণ্ড একদিকে টিভি, আর একদিকে দিবাকরকে সবাই গাল মন্দ করছে। এমন কি নীপাও ছেরে কথা বলছে না। দিবাকার বার বার বোঝাবার চেষ্টা করছে। ও অনাদির সঙ্গে এসেছে।

তবু কে বোঝে কার কথা। অনাদিরও শ্রাদ্ধ শান্তির ব্যবস্থা চলছে। আমাকে দেখে সকলে চুপ। নীপা গলা চড়িয়ে বললো, কোথায় যাওয়া হয় শুনি। বাড়িতে লোকজন বলে তো কিছু আছে।

আমি আস্তে আস্তে বেঞ্চের ওপর এসে বসলাম।

দেখছিস আমার অবস্থা। দিবাকরের মুখ শুকনো।

কি হয়েছে?

তুই ফিরিসনি।

কাকা কোথায়?

তোকে খুঁজতে খামারে গিয়ে বসে আছে।

আমি উঠে গেলাম, খামারে গিয়ে কাকাকে নিয়ে এলাম।

কোথায় গেছিলি?

হারুজানার কালাতে।

ওখানে কি করতে গেছিলি?

দেখতে।

এই রাতর বেলা! জায়গাটা ভালো নয়।

ঠিক আছে, আর যাব না।

কাকা বারান্দায় এসে নিজের চেয়ারে বসলো।

দেখেছো আমার ভাইপোর হাল, কোথায় দীঘাআড়ি কোথায় হারুজানার কালা, এই সব করে বেরাচ্ছে সকাল থেকে।

আমি কাকার কথায় কান দিলাম না।

কাকিমার দিকে তাকিয়ে বললাম, একটু চা খাওয়াবে।

কেন কাকিমা বুঝি চা দেন, এইবার থেকে কাকিমাই দেবেন। নীপা বললো।

আমি চুপচাপ থাকলাম। দিবাকরকে জিজ্ঞাসা করলাম, কি হয়েছে বল?

একটু খামারে চল।

আমি ওর সঙ্গে পায়ে পায়ে খামারে এলাম।

তোকে একটা কথা বলি, মনে কিছু করিস না।

কি হয়েছে বলবি তো?

কাল আমি যেতে পারব না।

কাজ পড়ে গেছে?

ভীষণ জরুরি।

তাতে কি আছে, ওরা আছে।

তুই মনে কিছু করিস না। বন্ধু হিসাবে তোর পাশে থাকতে পারলাম না।

দিবাকর চলে গেল।

(আবার আগামীকাল)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev