| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কাজলদীঘি

Reporter Default
রিপোর্টার / ২৩৪৭ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

অষ্টম কিস্তি

সকালে মিত্রার ডাকে ঘুম ভাঙলো। সেই এক চিত্র। মিত্রা ঠাকুর ঘর থেকে বেরিয়েছে। সেই লালপাড় মটকার কাপড়। মাথায় একগাদা সিঁদুর। সারাটা শরীরে মা মা ভাব। একেবারে ঘরের নিপাট গৃহিণী।

আমি উঠে রেডি হলাম। দুজনে সেই এক মেনু লুচি-বাটিচচ্চরি খেয়ে বেরিয়ে পরলাম।

হিমাংশুর অফিসে এলাম দশটা নাগাদ। ও বললো, একবার ভালোকরে সব দেখে নে।

ডিডটা ভালোকরে পড়ে নিলাম। ওখান থেকে রেজিষ্ট্রি অফিস।

অমিতাভদা, মল্লিকদা, মিত্রা আমার হয়ে সাক্ষী দিল। আরও অনেকে ছিল। শুধু মিঃ ব্যানার্জী ছিল না।

মিত্রাকে ওই মুহূর্তে ব্যাপারটা নিয়ে জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে করেনি।

ওখানে ঘণ্টা খানেকের কাজ ছিল। কাজ শেষে হিমাংশুকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে বললাম, আমাকে একটা আছোলা বাঁশ দিলি। বেশ চলছিল তুই দাঁড়ি টেনে দিলি।

হিমাংশু হেসে বললো, সব ভালো যার শেষ ভালো। তোকে ম্যাডামের সঙ্গে জুড়ে দিলাম। নাহলে মিত্রার একার পক্ষে কনট্রোল করা সম্ভব হতো না।

ওর দিকে তাকালাম। ভালো করে বোঝার চেষ্টা করলাম।

ও আমার মিত্রার সম্বন্ধে কোনও আঁচ করতে পেরেছে কিনা। কতটুকুই বা ও জানে। মনে হচ্ছে ও অনেক কিছু জেনে ফেলেছে। ওর চোখ সেই কথা বলছে।

এরপর আমার করণীয় কি আছে?

খাতাপত্র সাজিয়ে নিই। আর একজন যে ডিরেক্টর আছে, তাকে জানাতে হবে। এখন আমার অনেক কাজ।

তোর কাজ কবে শেষ হবে?

আগামী সপ্তাহে কমপ্লিট করে ফেলব ভাবছি।

শেষ কর, কতকগুলো স্ট্র্যাটিজি নিয়ে আমি তোর সঙ্গে বসবো।

ঠিক আছে। তুই কখন যাচ্ছিস?

তোর এখান থেকে বেরিয়ে বড়োমার সঙ্গে দেখা করবো। তারপর যাব।

ফিরবি কবে?

দেখি। তুই অফিসের সম্বন্ধে সব জানিস?

ম্যাডাম কিছু কিছু বলেছে। তুই ঠিক ডিসিশন নিচ্ছিস।

মিত্রা একা পড়ে গেছে।

বুঝতে পেরেছি। তুই ওদিকটা সামলা, আমি এদিকটা সামলে দেব।

এখন যারা আছে সব বিষ মাল।

জানি।

খালি ধান্দা বাজি।

ঘুঘুর বাসা, পরিষ্কার করতে তোকে হিমসিম খেতে হবে।

ওটা সামলাতে আমার বেশিক্ষণ সময় লাগবে না।

তোর সময় নষ্ট করবো না। তুই যা। কলকাতায় ফিরলে আমায় একবার নক করিস।

ঠিক আছে।

হিমাংশুর ওখান থেকে বেরিয়ে বড়োমার কাছে এলাম।

মিত্রা আসতে চাইছিল না। আমিই ওকে জোর করে নিয়ে এলাম।

বড়োমা প্রথমে মিত্রাকে দেখে একটু অবাক হয়েছিল। ছোটোমা ক্যাজুয়েল। সবাই একসঙ্গে খেতে বসলাম। খেতে খেতে গল্পের ছলে আমরা চারজনে মিলে ঠিক করলাম পরবর্তী স্ট্রাটেজি। অমিতাভদার পাকা মাথা কয়েকটা ভালো ডিসিশন দিল। আমি মেনে নিলাম।

বুঝলাম মেন অপারেটর হবে সনাতন ঘরুই। দাদা সেরকমই ছক করলো।

মিত্রা আমি মেনে নিলাম।

আমি একটা প্রস্তাব রাখলাম।

আমি যেমন আছি তেমনই থাকব। আমার জায়গার পরিবর্তন হবে না। মিত্রা প্রথমে মানতে চায়নি।

ওকে ব্যাপারটা বোঝালাম। ও বুঝতে পারলো।

ফাইন্যাল ডিসিশন হলো। দু-সপ্তাহ পর শুক্রবার মিটিং কল হবে।

সেখানে মিঃ সনাতনের হাত দিয়েই সকলকে যার যার দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

সাইনিং অথরিটি এই মুহূর্তে মিত্রার থাকবে। মিত্রাই সোল পাওয়ারের অধিকারী।

মিত্রা মেনে নিল। এই কদিন মিত্রা দাদার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলবে। প্রয়োজন পড়লে আমায় ডাকবে। আমি চলে আসব। আমার দেখা মিলবে সেই শুক্রবার।

ছোটোমা বড়োমা এতক্ষণ নীরব দর্শক ছিল। কথা শেষ হতে ছোটোমা বললো, হ্যাঁরে অনি, তোর মা-বাবার কোনও ছবি তোর কাছে নেই?

ছোটোমা এই ভাবে কোনওদিন কথা বলেনি। আমি স্থির দৃষ্টি নিয়ে ছোটোমার দিকে তাকালাম।

আছে।

তোর মনে পড়ে ওনাদের?

না।

আমাকে ছবিটা দিবি?

কেন!

আমি বাঁধিয়ে ঠাকুর ঘরে রাখব।

হাসলাম।

তোর মতো ছেলের যিনি জন্ম দেন তিনি মহাপ্রাণ।

খাওয়ার টেবিলে সবাই নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

তোমায় এনে দেব।

তুই ওই ফ্ল্যাটটা ছেড়ে দে।

কেন!

এখানে চলে আয়। এতো বড় বাড়ি এতোগুলো ঘর।

আবার তাকালাম ছোটোমার দিকে।

তোকে নিয়ে এই কদিন আমি আর দিদি শুধু ভেবেছি।

আমিও কি মহাপ্রাণ?

এমন ভাবে কথাটা বললাম, সবাই হাসলো। মল্লিকদা চেঁচিয়ে উঠল।

বলছিলাম না, অনির বিকল্প অনি নিজেই। ওর মাথার মধ্যে আরও দশটা মাথা আছে।

আবার শুরু করলে। বলবো ছোটোমাকে।

আচ্ছা তোর সঙ্গে কি আমার কোনও প্রাইভেট টক থাকতে পারে না।

এখন শুধু চিংড়িমাছের মালাইকারি খেয়ে যাও।

মল্লিকদা হেসে উঠলো ঠিক ঠিক, কি গো দাও।

ছোটোমা মৃদু হাসলো, তোমার ভাগেরটা শেষ হয়ে গেছে, আনি আর মিত্রার ভাগেরটা আছে।

বড়োমা, ছোটোমার দিকে তাকিয়ে বললো, যা না ওবলার জন্য রাখতে হবে না।

ছোটোমা রান্নাঘরের দিকে গেল, বড়োমা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, কবে আসবি।

এই বৃহস্পতিবারের পরের বৃহস্পতিবার।

দশদিন! এতদিন কি করবি?

অনেক কাজ আছে। একবারে শেষ করে আসব।

বড়োমা চুপ করে রইলো।

আমি উঠে গেলাম বড়োমার কাছে, বড়োমা মিত্রা পাশাপাশি বসে আছে। আমি বড়োমার গলা জড়িয়ে ধরে কানের কাছে ফিস ফিস করে বললাম, কেন মিত্রাকে তো রেখে যাচ্ছি।

মিত্রা আমার কথা শুনতে পেয়েছে। আর কেউ শুনতে পায়নি।

বড়োমা আমার দিকে তাকাল। চোখ দুটো জলে ভরে উঠেছে।

ছোটোমার আনা চিংড়িমাছ সকলে ভাগ করে খেলাম। খাওয়া শেষ হতে বড়োমার ঘরে গিয়ে বললাম, টাকা দাও। বড়োমা আমার দিকে তাকাল।

এই প্রথম বড়োমার কাছে টাকা চাইলাম। এতদিন বড়োমা আমাকে দিয়েছে। কখনও নিয়েছি, কখনও নিইনি। বলেছি আমার কাছে আছে। লাগবে না।

বড়োমা আমাকে বুকে টেনে নিল। আমার শান্তির নীড়। জীবনে প্রথম বড়োমার কাছে মুখ ফুটে টাকার কথা বললাম। বড়োমা আলমারি খুলে টাকা দিল।

সেদিন সঙ্গে নিয়ে গেছিলাম। তুই রাগ করবি বলে তোকে দিতে সাহস পাইনি। তাই নিয়ে তোর দাদা বাড়িতে এসে আমার ওপর কি হম্বিতম্বি। ছোটোও নিয়েগেছিল।

আমি হাসলাম। কখন যে ছোটোমা পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল জানি না। আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো।

কি বাবুসাহেব, মচকেছেন না ভেঙেছেন।

ছোটোমার কাছে এগিয়ে এলাম, দুটো কাঁধে হাত রাখলাম, কোনটা হলে তোমার ভালো লাগবে।

দুটোই।

ঠিক আছে। এবার থেকে তাই হবে।

ছোটোমার চোখ দুটো টল টল করছে।

তোমরা সবাই এরকম করলে আমার পক্ষে লড়াই করা মুস্কিল হয়ে পড়বে।

অনি আমরা সবাই এতদিন মাঝ সমুদ্রে ভাসছিলাম। এখন একটা নৌকয় উঠতে পেরেছি। সেটাও যদি ফুটো হয়ে যায়। সেই ভয়ে আমরা সব….।

নিচু হয়ে ছোটোমার বুকে মাথা রাখলাম, অনি সেই অন্যায় কোনওদিন করবে না।

জানি বলেই, হারাবার ভয়টা বেশি।

কিচ্ছু হারাবে না।

ওই মেয়েটার চোখ দুটো দেখেছিস।

দেখেছি।

তাহলে?

সব তোমায় বলবো, সময় আসুক।

তুই কি বলবি, আমি জানি।

ছোটোমার চোখে চোখ রাখলাম।

সবাই আশ্রয় চাইবে। তুই আশ্রয় দিতে পারবি না। থাকর জায়গা দিবি এই তো।

হয়তো তোমার কথা ঠিক, হয়তো নয়। ঠিক আছে, আমায় এখন যেতে হবে। নাহলে অনেক রাত হবে পৌঁছতে।

ছোটোমা, বড়োমাকে প্রণাম করে বাইরে এলাম।

মল্লিকদা, অমিতাভদা, মিত্রা সোফায় বসে কথা বলছে।

আমি সবাইকে প্রণাম করলাম। 

মিত্রাকে বললাম, আমাকে একটু স্টেশন পর্যন্ত এগিয়ে দে।

ও উঠে দাঁড়াল।

বড়োমা এগিয়ে গেল মিত্রার দিকে, চিবুকে হাত দিয়ে বললো।

প্রতিদিন তুমি একবার করে এসো না। ভালো লাগবে।

মিত্রা আমার দিকে তাকাল।

আমার চোখের ইশারা ও বুঝতে পেরেছে। ও নিচু হয়ে বড়োমা, ছোটোমাকে প্রণাম করলো। অমিতাভদা, মল্লিকদাকে প্রণাম করলো। ওরা আজ কোনও বাধা দিল না।

অমিতাভদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। ইসমাইল গাড়ি চালাচ্ছে।

তোর কটায় ট্রেন?

আড়াইটের পর এক ঘণ্টা অন্তর।

আমায় ঘণ্টাখানেক সময় দে।

মিত্রার দিকে তাকালাম, ওর চোখ কিছু বলতে চায়।

আচ্ছা।

ইসমাইল, গড়িয়াহাট পর উস দুকানমে চলিয়ে।

জি ম্যাডাম।

কিছুক্ষণের মধ্যে গড়িয়াহাটের একটা জামাকাপড়ের দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালাম। মিত্রা আমাকে নিয়ে নামল। আমি ওর পেছন পেছন দোকানের মধ্যে ঢুকলাম। ও নীপার জন্য একটা লং-স্কার্ট আর খুব সুন্দর একটা গেঞ্জি কিনল।

আমার দিকে তাকিয়ে বললো, কিরে নীপা পরবে তো?

তুই যখন দিচ্ছিস নিশ্চই পরবে।

মিত্রা ওর জন্য একটা সাদা হাতের কাজ করা সালোয়ার কিনলো। সেদিন ও যেরকম একটা পরেছিল। কাকার জন্য ধুতি পাঞ্জাবি। আর কাকিমা আর সুরমাসির জন্য কাপড় কিনলো। আমি কোনও বাধা দিলাম না।

আমার দিকে তাকিয়ে বললো তোর জন্য একটা জিনস আর গেঞ্জি কিনি?

কেন?

ঠিক আছে থাক।

ওমনি মুখটা ভারি হয়ে গেল।

আমি সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারবো না, তোর বাড়িতে রাখবি। ফিরে এসে তোর বাড়িতে উঠবো। শুক্রবার ওই প্যান্ট গেঞ্জি পরবো।

ও আমার দিকে গভীর ভাবে তাকাল, মিটি মিটি হাসল।

হাসছিস যে।

ঠিক আছে।

মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে, পছন্দ কর।

আমি ও সব বুঝি না। তুই যা কিনে দিবি তাই পরবো।

ও নিজের মনের মতো করে একটা জিনসের প্যান্ট গেঞ্জি কিনলো। আমাকে ট্রায়াল রুমে নিয়ে গিয়ে পরিয়ে একবার দেখে নিল, ঠিক ঠাক আছে কিনা। দেখলাম বিল প্রায় বিশ হাজার টাকা হয়ে গেছে। আমি কিছু বললাম না। আমাকে বাড়ির জন্য কেনা জামা কাপড়গুলো ধরিয়ে দিল।

এইগুলো নিয়ে যা।

আমি বললাম, নিয়ে আমি যাচ্ছি, তবে তুই একটা কাজ কর, কাকার নাম করে একটা চিঠি লিখে দে।

মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।

ও কাউন্টার থেকে একটা প্যাডের কাগজ নিয়ে খস খস করে কাকার নাম করে একটা চিঠি লিখে দিল। দেখতে দেখতে তিনটে বেজে গেল। দুজনে মিলে কফি সপে বসে এককাপ করে কফি খেলাম।

এখন আমি কি করবো বল?

কেন! ক্লাবে যা।

দিন সাতেক হলো ক্লাবের দরজা মারাইনি।

কেন!

ভালো লাগে না।

বাড়ি যা। পড়াশুনা কর।

কি পড়বো।

বই পড়।

এখন আর ভালো লাগে না।

সব কিছুতেই ভালো লাগে না, ভালো লাগে না বললে চলে, ভালো লাগাতে হবে।

তুই মাস্টারি করিস না।

আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।

তোকে ছাড়া আমি একমুহূর্ত চলতে পারছি না।

ঠিক আছে, আমায় দিন কয়েক সময় দে। ওই দিকটাও দেখতে হবে।

বুঝি। মন মানে না।

মিত্রা আমার হাতটা চেপে ধরলো। জানিস বুবুন, তুই আমাকে এই কয়দিনে একটা নতুন জীবন দিয়েছিস। আমি আর অতীতে ফিরে যেতে চাই না। গতো সাত বছর জীবনটা যন্ত্রের মতো চালিয়েছি। তুই আমার জীবনটাকে একবারে ওলট পালট করে দিলি।

বুঝলাম। কিন্তু তোর ওপর অনেক দায়িত্ব। সেটা বুঝতে পারছিস।

পারছি। তুই অফিসে যাওয়া বন্ধ করে দিলি।

তোর স্বার্থে।

জানি।

তুই যদি মনে করিস অফিসে যাবি তাহলে কাল থেকে যা। মনে রাখবি তোর ওপর একটা প্রেসার তৈরি করা হবে। তুই ওটা রিকভার করতে পারবি?

পারবো।

কাল থেকে তুই অফিসে যা।

কিছু হলে আমাকে একবার জানাবি।

তুই মন থেকে বলছিস?

বলছি।

কবে আসবি?

তিনটে দিন অন্ততঃ আমায় সময় দে।

তারমানে তুই মঙ্গলবার আসবি!

হ্যাঁ।

বাড়িতে বললি!

ওটা নিয়ে ভাববি না।

স্টেশনে এসে মিত্রাকে ছেড়ে দিলাম।

মিত্রার চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো। আমি একবার তাকিয়ে আর ওর দিকে ঘুরে তাকালাম না। টিকিট কাউন্টারে এসে টিকিট কাটলাম। ট্রেন মিনিট পনের পর। তিন প্যাকেট সিগারেট নিলাম। অনাদিকে একটা ফোন করে বলে দিলাম, আমি ট্রেনে উঠলাম। তোরা স্টেশনে কাউকে পাঠা। অনাদি ওপ্রান্ত থেকে বললো, ঠিক আছে।

ট্রেনে যেতে যেতে মিত্রা তিনবার, নীপা একবার, অনাদি দুবার, চিকনা, বাসু একবার করে ফোন করেছে। লোকাল ট্রেনে খুব একটা যাওয়া অভ্যাস নেই। যাইও না, তবু নিজেকে মানিয়ে নিলাম। দেখতে দেখতে দুটো ঘণ্টা কেটে গেল। স্টেশনে নামতেই দেখলাম, চিকনা আর সঞ্জীব দাঁড়িয়ে আছে। সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পরেছে, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সন্ধ্যা হয়ে যাবে।

চিকনা আমার কাছ থেকে ব্যাগটা নিল। সঞ্জীবকে জিজ্ঞাসা করলাম, কিরে কাকার শরীর কেমন আছে? সব ঠিক আছে তো?

চিকনা খেঁকিয়ে উঠলো, ও শালা কি জানে, সকাল থেকে ওর দেখা পাওয়া গেছে। অনাদি ফোন করতে বাবু এলেন।

সঞ্জীব কিছু বলতে যাচ্ছিল, আমি বললাম, রাগ করিস কেন, আর কেউ আসে নি?

বাসু এসেছে।

কোথায়?

বাইরে আছে।

স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে এলাম। আসার সময় চিকনা টিটিকে বললো, কি, বলেছিলাম না, এই হচ্ছে অনি। ভদ্রলোক বুকের কাছে হাত তুলে নমস্কার করলেন। আমিও প্রীতি নমস্কার করলাম। চা খেতে খেতে বড়োমাকে একবার ফোন করলাম। জানালাম আমি পৌঁছে গেছি। মিত্রাকে ফোন করলাম, বললো বাড়িতে আছি, গলাটা ভীষণ ভারি ভারি।

কি করছিস?

সিনেমা দেখছি।

কি সিনেমা?

শুনবি।

মিত্রা মোবাইলটা টিভির কাছে ধরলো, বুঝলাম এক দুজেকে লিয়ে চলছে।

আমি মিত্রা জীবনে দ্বিতীয় বার সিনেমা হলে ঢুকেছিলাম। কলেজ কাট মেরে সিনেমাটা দেখেছিলাম, মিত্রাই দেখিয়েছিল। সে বছর পার্ট ওয়ানে আমি ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিলাম। মিত্রা ভীষণ ভাবে জেদাজেদি করলো, তাই যেতে বাধ্য হয়েছিলাম।

হাসলাম।

কিরে শুনলি?

হ্যাঁ।

তোর কিছু মনে পড়ে?

কলেজ কাট মারার কথা মনে পড়ছে।

বাড়িতে এসে ভেবেছিলাম ক্লাবে যাব, টিভিটা খুলে চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে দেখলাম সিনেমাটা সবে শুরু হয়েছে, বসে গেলাম।

ভালো করেছিস।

যে টাস্কগুলো দিয়ে এসেছি মন দিয়ে করিস। ফিরে গিয়ে ধরবো।

মিত্রা জোরে হাসলো।

মেঘ কাটল।

আমি বাসুর পেছনে বসলাম, ঘণ্টা খানেক লাগল বাড়িতে পৌঁছতে। আস্তে আস্তে সবার মুখেই মিত্রার প্রশংসা ঝড়ে পরছে। অতো পয়সা যার তার কোনও দেমাক নেই।

ওরা জানত না এই নার্সিংহোমটা মিত্রার হ্যাজবেন্ডের।

দূর ছাই আমিও কি জানতাম। জানলাম সেই দিন।

চিকনা বলেই ফেললো, গুরু আমার জন্য তোমার ওখানে একটা কাজ দেখ না। যদি টেবিল মোছার চাকরিও থাকে তাতে কোনও আপত্তি নেই।

আমি বললাম, আফটার অল তুই আমার বন্ধু, আজ নয় কাল কেউ না কেউ জানতে পারবে। তখন।

ও প্রায় আমার হাতে পায়ে ধরে, আমি বললাম একটু সবুর কর, সব ঠিক হয়ে যাবে।

চিকনা ধাতস্থ হলো।

বাড়ি পৌঁছলাম সন্ধ্যে মাথায় নিয়ে। রাস্তায় কোথাও দাঁড়াইনি। খামারে গাড়ি রেখে আমরা চারজন ঢুকলাম। বাইরের বারান্দায় টিভি চলছে। অনেক লোক বসে দেখছে। কাকাও আছে। আমার বন্ধু-বান্ধবরাও রয়েছে। অনাদিকে আশেপাশে দেখতে পেলাম না। আমি আসাতে কাকা চেয়ার ছেড়ে উঠে এল। আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো, তুই যা বলেছিস সব অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি।

নীপা গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।

সকালের কথা অনিদাকে বলবো। চেঁচিয়ে উঠলো।

না না বলিস না। ওইটুকু শুধু অন্যায় করেছি।

নীপার দিকে এতক্ষণ খেয়াল করিনি।

কয়েকদিন আগে দেখা নীপার সঙ্গে আজকের দেখা নীপার অনেক পার্থক্য।

বিশেষতঃ নিজেকে সাজিয়ে তোলার ক্ষেত্রে। শহুরে মেয়েরা বিকেল বেলা যেমন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে, পরিষ্কার জামা কাপর পরে নিজেকে সাজিয়ে তোলে অনেকটা সেইরকম। আমার চোখের চাহুনি নীপা ধরে ফেলেছে। নীপা মুখ টিপে হাসল।

কি করেছো। কাকার দিকে তাকালাম।

একটু জল নিয়ে মাথায় দিয়েছি।

খুব অন্যায় করেছ। ডাক্তার তোমায় বারন করেছে। চোখে যায়নি?

না।

ওষুধ ঠিক ঠিক খেয়েছো।

ওই তো নীপাকে জিজ্ঞাসা কর। ওঃ, যেন ডাক্তারনী।

কাকা এমন ভাবে কথা বললো, সবাই হেসে ফেলল।

চিকনার দিকে তাকিয়ে বললাম, ওটা নীপার হাতে দে। চিকনা নীপার হাতে ব্যাগটা দিল।

এটা আবার কি?

ভেতরে গিয়ে খুলে দেখো। কাকিমা, সুরমাসির সঙ্গে কথা বলে আমি কাকাকে বললাম ও বাড়িতে যাচ্ছি। কাকা বললো আচ্ছা।

নীপাকে বললাম, একটু বেশি করে চা করে নিয়ে এসো।

নীপা মুখ বেঁকিয়ে ভেতরে চলে গেল। সামনেই পচা দাঁড়িয়েছিল জিজ্ঞাসা করলাম—

অনাদি কই।

পচা বললো, একটু বাজারের দিকে গেছে। এখুনি এসে পরবে।

ওদের দিকে তাকিয়ে বললাম, আয়।

ওরা আমার পেছন পেছন আমার দোতলার ঘরে এলো। ঘরটা বেশ চকচকে। আগের দিনের থেকে মনে হয় কিছু একটা পরিবর্তন হয়েছে। খাটটা ঠিকই আছে। আলমাড়িটা জায়গা বদল করেছে। তাতে ঘরের জায়গাটা অনেক বেরে গেছে। একটা বসার সোফা ঢুকেছে দেখছি। মনেমনে হাসলাম।

পচা, পাঁচু, ভানু আর যারা ছিল তাদের সবারই এক কথা, মিত্রার মতো মেয়ে হয় না। আমি ওদের কথায় মুচকি হাসলাম, ভানু একধাপ এগিয়ে বললো, হ্যাঁরে অনি ও কি তোর বউ।

বউ হলে ভালো হতো, তাই না? আমি বললাম।

ভানু হেসে ফেললো।

চিকনা চেঁচিয়ে উঠলো, শালা তুমি কি কালীচরণের ঝি পেয়েছ।

আবার, কালীচরণের ঝির কথা আসছে কেন? আমি বললাম।

আরে এখনও সময় পেলে এককাট হয়ে যায়।

আমি ভানুর দিকে তাকালাম। ভানু হাসছে।

নারে অনি, ওরা মিছে কথা বলছে।

চিকনা আরও গলা চরিয়ে বললো, ওর বাচ্চাগুলো তোর, না ওর বরের বোঝা মুস্কিল।

থাম। আমি চিকনাকে বললাম।

সত্যি তোদের কোনও জ্ঞান বুদ্ধি নেই। ছেলেটা অতোদূর থেকে এলো একটু বসতে দিবি। একটু থিতু হতে দিবি। না কালীচরণের ঝি….। সঞ্জয় ঢুকলো।

কেরে সতী। চিকনা বললো।

দেখলি অনি দেখলি, তুই এর বিচার কর।

আমি ওদের কীর্তি কলাপ দেখে হাসছি। বাসু স্পিকটি নট।

অনাদি এলো। তোরা কি শুরু করেছিস বলতো। নিচ থেকে শোনা যাচ্ছে। এটা কি তেঁতুলতলা।

তেঁতুলতলা আমাদের আড্ডার ঠেক। সবাই যখন এক সঙ্গে ওখানে বসতাম, আশপাশ দিয়ে বড়রা কেউ যেত না।

অনাদি এসে আমার পাশে বসলো। কখন এলি?

আধঘণ্টা হবে। কালকের এ্যারেঞ্জমেন্ট কিছু করেছিস?

হ্যাঁ গোরাকে বলে রেখেছি। একটু বেলায় বেরবো।

কটার সময়?

এই আটটা নাগাদ।

কটা গাড়ি বলেছিস।

একটা বলেছি, ফালতু লোকজন বেশি গিয়ে লাভ নেই। ঘণ্টা খানেকের ব্যাপার।

তা ঠিক।

তারপর তোর যা ফর্মা, বেশিক্ষণ বসতেও হবে না।

হাসলাম।

সত্যি অনি তুই কিছু খেল দেখাচ্ছিস।

কি বলেছিলাম, এবার বিশ্বাস হচ্ছে। চিকনা বললো।

নীপা মুখটা বারিয়ে বললো, সঞ্জুদা একটু ধরোতো।

সঞ্জু পরি কি মরি করে ছুটে গেল।

নীপার পেছনে একটা মেয়েকে দেখলাম।

অনাদি বললো, কে এসেছে তোর সঙ্গে?

শেলিদি।

আমি অনাদির মুখের দিকে চাইলাম।

চিনতে পারলি না? অনাদি আমার দিকে তাকিয়ে বললো।

শেলি ভেতরে এসো।

মেয়েটি ভেতরে এলো।

চোখমুখ বেশ টানা টানা। চকচকে। ফর্সা মুখটা লজ্জায় বুকের কাছে নেমে এসেছে।

তুমি অনিকে আগে দেখেছ?

শেলি মাথা দুলিয়ে বললো, হ্যাঁ।

কোথায় দেখলে?

সেদিন বাজারে। নীপা পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল।

আমি খুব লজ্জা পেয়ে গেলাম।

চিকনা চেঁচিয়ে উঠলো, দেখে রাখ পরে সমস্ত ঘটনা বলবো।

মেয়েটা ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

তোমরা সত্যি না এক এক পিস। নীপা বললো।

দিদিমনি এই ভাবে বলবি না।

তুমি আগে এটা খেয়ে নাও।

কি?

নুন চিনির জল।

কেন?

জানিনা, মাকে গিয়ে বলো।

যা বলছে কর না বাবা। অনাদি বললো।

আমি নিঃশব্দে জলটা খেয়ে নিলাম। বেশ ভালো লাগল।

মুরি বেশি খাবে না।

তুই বললে, ওকে এক মুঠও দেব না। চিকনা বললো।

গেলো না প্রাণ ভরে, কে বারন করেছে। নীপা দাঁতমুখ খেঁচালো।

চিকনাটা বরো বাড়াবাড়ি করছে না-রে নীপা? অনাদি বললো।

হ্যাঁরে সে….।

বলোনা বলো, অনিদার মুখ থেকে ওই রকম ভাষা শুনেছো কখনও?

তোর পায়ে পরছি, এই কান মুলছি, আর হবে না।

নীপা হেসে ফেললো। এই নিয়ে কবার হলো?

নিরানব্বই বার, একশো হলেই তুই গলাটা ঘ্যাঁচ করে দিস। চা ঢাল।

তুমি ঢেলে নাও।

নীপা ওকে ঢালতে দিওনা, তাহলে আমরা কেউ পাব না। বাসু বললো।

নীপা একবার কট কট করে চিকনার দিকে তাকাল।

ঠিক আছে ঠিক আছে, বাসু যা বললো তাই হবে।

নীপা চা ঢাললো, চিকনা সকলকে এগিয়ে দিল।

অনিদাকে আমাদের ব্যাপারটা বলেছো?

অনাদি নীপার দিকে তাকিয়ে বললো, না। কালকের দিনটা যাক, বলবো।

কাজের মানুষ বলে কথা। আবার কালকেই বলে বসবে, বুঝলি তোরা একটু সামলা, আমার কাজ পরে গেছে। নীপা বললো।

আমি মুচকি হাসলাম।

তুই সব কথায় গেরো দিস কেন?

নীপা এলো চুল দুলিয়ে চলে গেল।

আমরা চা খেলাম। কালকে কারা কারা যাব ঠিক হলো। চিকনা, আমি, বাসু, অনাদি যাব। কোনও বাইক নিয়ে যাব না। আর সবাইকে অনাদি বললো তোরা ওই দিকটা সামলে নে। তারপর আমরা ফিরে আসছি। ওরা বললো ঠিক আছে।

আমি অনাদিকে বললাম, তোদের কি আছে?

রাস আছে।

রথ শহরের মাঠে?

হ্যাঁ।

যাক প্রাণভরে জিলিপি খাওয়া যাবে।

আচ্ছা কলকাতায় গিয়ে কি তোর কোনও উন্নতি হয়নি!

কেন!

তুই কি সেই অনি! যে মেলায় ঘুরে ঘুরে জিলিপি, ছোলাসেদ্ধ খাবি।

হ্যাঁ। আমি সেই অনি, ঠিক আছে তোদের জন্য একটা সারপ্রাইজ তোলা রইলো।

কি?

সেদিন বলবো।

মনে থাকে যেন।

সবাই চলে গেল।

আমি পুকুর ঘাটে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে কাপর জামা ছাড়লাম। আমার পেটেন্ট ড্রেস পরে খেতে বসলাম। কাকাকে জিজ্ঞাসা করলাম চোখের কোনও অসুবিধা হচ্ছে কিনা। কাকা বললো আগের থেকে অনেক ভালো দেখতে পাচ্ছে। মিত্রার চিঠিটা কাকা নিজে পড়েছে। কাকার মুখ থেকেও মিত্রার স্তুতি শুনলাম। কাকিমা, সুরমাসিও মিত্রার সম্বন্ধে একেবারে গদ গদ।

আমি মনে মনে বললাম। সত্যি মেয়েটার কি ভাগ্য। সব থেকেও কিছু নেই।

আমি বেশি কথা বারালাম না। তারাতারি খেয়ে উঠে গেলাম।

কালকের যাওয়ার ব্যপারটা কাকাকে বললাম। কখন যাব, তাও বললাম।

কাকা আমার প্রত্যেকটা কথায় মাথা দুলিয়ে গেল। কিছু বললো না।

আমি মুখ ধুয়ে ঘরে চলে এলাম।

অন্ধকার দেখতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। জানলার পাল্লাটা খুলে দিলাম। বাইরের রং আরও পরিষ্কার হলো। সত্যি কয়েকদিন পর পূর্ণিমা। চাঁদের রূপ তাই বলছে। গাছের পাতা গলান রূপোর অলংকারে সজ্জিত। সেই ঝিঁ ঝিঁ পোকার ঝিঁ ঝিঁ। জোনাকীর আলো। যত দেখছি তত যেন আমার কাছে নতুন। কিছুতেই পুরনো হতে চায় না।

প্রত্যেকটা রাতের একটা আলাদা আলাদা রূপ আছে। আমি যেন সেই রূপ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছি। একটা সিগারেট ধরালাম, দূরে কেউ যেন হেঁটে যাচ্ছে। বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে। হাতের টর্চলাইটটা একবার জ্বলছে। একবার নিভছে।

মাঝে মাঝে গাছের পাতা নড়ে চড়ে উঠছে। বুঝতে পারছি রাত পাখিরা শিকারের লোভে হানা দিচ্ছে এডালে ওডালে। এই আলো আঁধারিতে তাদের দেখা যায় না। চেনা যায় না। বোঝা যায় না। শুধু অনুভব করা যায়।

ভাবতে ভাবতে নিজে কোথায় হারিয়ে গেলাম। নীপা কখন এসেছে জানি না। পাশ ফিরতে গিয়ে ওর শরীর স্পর্শ করলাম। সংকচে উঠে বসলাম। নীপা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

কখন এসেছি জানো।

না।

আমার সব কাজ শেষ।

তাই।

হ্যাঁ।

তাহলে আধঘণ্টার ওপর হয়ে গেছে।

তুমি কি ভাবছিলে?

কিচ্ছু না।

ভাবছো এই আপদগুলো আমার সব কিছু নষ্ট করে দিতে বসেছে।

ওকথা বলতে নেই।

তাহলে বলো?

কি বলবো!

কি ভাবছিলে?

সত্যি বলবো।

হুঁ।

আমি অন্ধকার দেখতে খুব ভালোবাসি। কতরাত আমি একা একা রাতের অন্ধকারে এদিক সেদিক ঘুরে বেরিয়েছি।

তোমার ভূতের ভয় করে না?

না। তবে মানুষকে ভয় পাই।

মিত্রাদি সত্যি খুব বড়ো মনের মানুষ।

নীপার দিকে তাকালাম। নীপা মাথা নিচু করে রয়েছে।

আমি নতুন করে কি বলবো। তুমি সব শুনেছো। কালকে থেকে শুধু মিত্রাদিকে নিয়েই আধবেলা কেটে গেছে।

তোমার ব্যক্তিগত ভাবে কি মনে হলো বললে না?

বললে তুমি বিশ্বাস করবে?

হুঁ।

মিত্রাদি তোমায় ভিষণ ভালোবাসে। অন্ধের মতো। তুমি মিত্রাদির প্রথম প্রেমিক। হয়তো জানলে মিত্রাদি কষ্ট পেতে পারে। তাই তুমি আমার কোনও ক্ষতি করতে চাও নি।

কে বললো তোমায়?

মিত্রাদি নিজে।

মিত্রাদির কথায় তোমার কিছু মনে হয়নি?

প্রথমে ভীষণ মন খারাপ লেগেছিল। বিবাহিত অথচো তোমার প্রথম প্রেমিক। তারপর ভাবলাম, ওই জায়গায় আমি থাকলে আমারও একই অবস্থা হত।

তোমার হিংসে হয় না?

কি বলছো অনিদা! মিত্রাদিকে আমি হিংসে করবো!

কেন নয়?

আমি যদি মশাইয়ের কাছে না আসতাম তাহলে কোনওদিন চেষ্টা করলে তোমার আর মিত্রাদির কাছে পৌঁছতে পারতাম! এই যে তোমার পাশে বসে আছি, এই গ্রামের কতো মেয়ে স্বপ্নে দেখে তা তুমি জানো!

হাসলাম।

জানো অনিদা তোমরা দু-জন আমার কাছে আদর্শ। আর শরীরের কথা বলছো, আমি তোমার কাছে ধরা দিয়েছিলাম। তোমার আদর খাব বলে। এতদিন তোমার অনেক কথা শুনেছি। তোমার বন্ধুদের কাছ থেকে। উনামাস্টারের কাছ থেকে। মশাইয়ের কাছ থেকে। কাকে বাদ দিয়ে কার কথা বলবো। শুনতে শুনতে সব কেমন যেন আমার কাছে মিথ মনে হতো। কখন যে তুমি আমার মনটা চুরি করে নিয়েছিলে, আমি নিজেও জানতাম না।

তুমি যেন আমার স্বপ্নের রাজপুত্তুর। যখন তোমায় দেখলাম, মনেহলো আমার সেই স্বপ্নের রাজপুত্রকে দেখছি। আমি লোভ সামলাতে পারিনি। বিশ্বাস করো।

নীপা মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ চুপ চাপ বসে রইলো। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছারলো।

এই গ্রামের অনেকে আমাকে চেয়েছে। কেউ সাহস করে হাত বারাতে পারেনি। কিন্তু সেখানেও তোমাকে দেখলাম। তুমি মনের দিক থেকে কতো পবিত্র। তুমি মিত্রাদিকে ভালোবাস। সেখানে তুমি কাউকে প্রবেশ করতে দেবে না। তোমার ভালোবাসা নিখাদ সোনা। কত ভাগ্য করে জন্মালে একটা মেয়ে এইরকম মনের সংস্পর্শে আসে তা তুমি জান না। আমি মেয়ে, আমি জানি।

যদি আমি না আসতাম?

আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তুমি আসবে। তোমাকে আসতে হবেই।

তুমি এতটা মনের জোড় পেলে কোথা থেকে?

মশাইয়ের কাছ থেকে। তোমার কথা শুনে শুনে।

আমি নীপার দিকে তাকিয়ে আছি।

মিত্রাদি আজ যে কাপড় জামা পাঠিয়েছে তা দেখে মশাই কেঁদে ফেলেছিল। আমি বললাম তুমি এ কি করছো। চোখের মাথাটা খাবে নাকি। অনিদা এতো কষ্ট করে তোমার চোখটা অপারেশন করালো।

তারপর আমি অকপটে মিত্রাদির সমস্ত কথা মশাইকে বলেছি।

কাকা শুনে কি বললো।

মশাই বললো, ও দাতাকর্ণ।

হাসলাম।

দু-জনে চুপ চাপ রইলাম কিছুক্ষণ।

অনিদা।

উঁ।

তোমার বাবাকে মনে পড়ে না?

আবঝা আবঝা।

মশাইয়ের কাছে থেকে ওনার অনেক কথা শুনেছি।

ভালো না খারাপ?

ভালো না হলে তোমার মতো সন্তান পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হয় কি করে। আমায় একটা কথা দেবে।

বলো।

জানি আমি তোমাকে কোনওদিন পাব না। আমায় একটা সন্তান উপহার দেবে। আমি তাকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যাব। তাকে নিয়ে আমি আমার স্বপ্নের নীর রচনা করবো।

নীপার দিকে তাকালাম। ওর চোখে মুখে ভিক্ষার আর্তি।

কি পাগলামো করছো!

না-গো, সত্যি বলছি। তোমাকে পাব না ঠিক। কিন্তু তোমার সন্তান আমার কাছে গচ্ছিত থাকবে।

আমার সন্তানের প্রতি আমার কোনও দায়িত্ব থাকবে না।

তোমার দ্বারা তা হবে না, তুমি যাযাবর।

হাসলাম। লোকে আমাকে চরিত্রহীন বলবে।

তুমি চরিত্রহীন নও। মেয়েরা তোমার চরিত্র হনন করবে। তুমি নিজে থেকে তো চাওনা।

অন্ধকারেও নীপার মুখটা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। চোখ দুটো ছল ছল করছে।

পরদিন ঠিক সময়ে আমরা বেরিয়ে পরলাম। আজ নীপা মিত্রার দেওয়া লংস্কার্ট আর গেঞ্জিটা পরেছে। সামনে একটা ওর্না জড়িয়ে নিয়েছে। নীপাকে আজ একেবারে অন্যরকম লাগছে।

হ্যাঁরে দিদিমনি, তুই করেছিস কি। আলো ঝড়ে পরেছে। আজ তুই অবশ্যই আওয়াজ খাবি। চিকনা চেঁচিয়ে উঠলো।

নীপা চিকনার দিকে কট কট করে তাকিয়ে বললো, তুমি বউনি করলে। কালকে এটাই তুমি বয়ে এনেছিলে।

সরি ম্যাডাম, অন্যায় হয়েছে। আর একখান বাকি আছে। রাসপূর্ণিমার মেলায় আপনার মনস্কামনা পূর্ণ হবে।

সকলে চিকনার কথায় হাসে।

সত্যি চিকনা, তুইও পারিস। আমি বললাম।

এই অজ গাঁয়ে কি নিয়ে থাকি বলতো অনি, মাঠে হাড়ভাঙা খাটুনি আর অবসর সময়ে নীপার পেছনে লাগা। আমি তো আমার বাড়ির বেকার ছেলে। এই ভাবেই কেটে যাচ্ছে।

চিকনার গলা থেকে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল।

নার্সিংহোমে পৌঁছলাম সাড়েনটা নাগাদ।

রিসেপসন কাউন্টারের ভদ্রমহিলা আমাকে চিনতে পেরেছেন। আমাকে দেখেই বললেন, বসুন স্যার। আমরা সবাই বসলাম।

উনি ইন্টারকমে কার সঙ্গে কথা বললেন। একজন ভদ্রলোক ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন। পরিচয় দিলেন ডঃ দেবাশিস বসু। এও জানালেন মিঃ শ্রীধরণ থাকতে না পারার জন্য উনি ক্ষমাপ্রার্থী। তবে মিঃ শ্রীধরণ ওনাকে সমস্ত দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন।

আমার কি কি করণীয় ওনাকে জিজ্ঞাসা করলাম। উনি বললেন সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা কাকাকে ভেতরে নিয়ে গেল। আমি নীপাকে সঙ্গে যেতে বললাম। নীপা প্রথমে যেতে চাইছিল না। আমি সঙ্গে অনাদি আর বাসুকে পাঠালাম।

নীপার সঙ্গে মিনিট পনেরো পর ওরা বেরিয়ে এলো। কাকার চোখে একটা কালো চশমা দেখলাম। আমার সামনে এসে চশমাটা খুলতে দেখলাম চোখটা একটু লাল লাল।

কি হলো!

ঠিক হয়ে গেছে। কাকা বললো।

তুমি দেখতে পাচ্ছ?

তোকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। কাল আর একটা চশমা দেবে বলেছে।

ঠিক আছে তুমি বসো।

ওরা সবাই রিসেপশনের সোফায় বসলো।

অনাদি, বাসুর সঙ্গে কথা বললাম। ওরা বললো একটা চোখের রেটিনা একটু কমজোরি হয়েছে। বছর তিনেক পরে অকেজো হতে পারে। তবে কাকা চোখে বেশি স্টেইন দিতে পারবে না।

আচ্ছা।

আমি রিসেপশনে গেলাম। ভদ্রমহিলাকে বললাম, ডা. বাসুর সঙ্গে একটু কথা বলবো। উনি কাউন্টার থেকে বেরিয়ে এসে, আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন।

ডা. বাসুর চেম্বারে ঢুকতে আমাকে বসতে বললেন, তারপর কাকার বিষয়ে সব জানালেন। অনাদি যা বললো, তাইই। চশমাটা কালকে একটা সময় এসে নিয়ে যেতে হবে।

আমি বললাম, দুপুরের দিকে যদি আসি আপত্তি আছে কিনা। উনি বললেন, না। আমি রেডি করে রেখে দেব। কাকাকে সঙ্গে আনতে হবে কিনা? উনি বললেন, না আনতে হবে না। যাকে হোক একজনকে পাঠিয়ে দিন, দিয়ে দেব। আমি এবার পয়সার কথায় এলাম। টোটাল ব্যালেন্স কতো বাকি আছে? আমায় কতো দিতে হবে?

উনি আমার দিকে অবাক হয়ে তাকালেন, কেন মিঃ শ্রীধরণ আপনাকে কিছু বলেননি!

না।

আপনার কোনও ডিউ নেই, বরং আপনি যে টাকাটা জমা দিয়েছেন, সেটা রিফাণ্ড হবে।

কেন!

সে তো জানি না স্যার, ওটা মিঃ ব্যানার্জী জানেন।

উনি টেবিলে রাখা বেলটা বাজালেন। একজন বেয়ারা এলো। তাকে উনি আমার ব্যাপরটা বলতেই উনি বেরিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর একজন ভদ্রলোক এসে একটা খাম দিয়ে গেলেন। উনি খামটা আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, মনে কিছু করবেন না, এটা আমার ডিউটি। ওনাকে বললাম, কাল আমি আসবো। আপনি থাকবেন? উনি বললেন অবশ্যই।

ওখানে মিষ্টি চা খেয়ে আমরা সকলে ফিরে এলাম। ফিরতে ফিরতে বেলা গড়িয়ে গেল।

বাসুকে বললাম, তুই দোকানে থাকছিস?

হ্যাঁ।

তুই থাকবি কি করে? অনাদি বললো। ওদিককার কাজ কে সামলাবে?

ঠিক বলেছিস। মনেই ছিল না।

তুইও ওখানে চলে আয়।

না। একেবারে কাল যাব।

তুই তাহলে একটু রাতের দিকে আয়, এই সাতটা।

ঠিক আছে।

তোকে আসতে হবে না, আমরাই আসবো। অনাদি বললো।

ঘরে ফিরে এলাম। নীপা ওবাড়িতে গেছে। কিছুক্ষণ পর এসে বললো, ভাত খাবে না?

না। এখন খেতে ভালো লাগছে না। তুমি আমাকে একটু চা দাও।

আমি কিন্তু এখন তোমাকে সময় দিতে পারব না বাপু। আমার নাচের রিহার্শাল আছে।

তাই!

হ্যাঁ।

কি নাচ করবে?

চিত্রাঙ্গদা।

ওরে বাপরে। বিরাট ব্যাপার। চিত্রাঙ্গদা কে হয়েছে?

আমি মশাই, আমি। তারপর আমার কাছে ছুটে এসে জাপ্টে ধরে বললো, তুমি কাল যাবে তো?

নিশ্চই যাব।

আবার জরুরি কাজ পরে যাবে না।

হাসলাম।

কখন শুরু তোমাদের অনুষ্ঠান?

এই ধরো ছটা।

তার মানে কাল তোমার নাগাল পাওয়া যাবে না।

ঠিক তা নয়, একটার পর থেকে মাঠে চলে যাব। একটু স্টেজ রিহার্শাল করতে হবে।

ঠিক ঠিক।

দাঁড়াও তোমার চা নিয়ে আসি। নীপা এক দৌড়ে চলে গেল।

আমি জানলার ধারে। বার বার নীপার বলা কথাগুলো মনে পড়ে যাচ্ছে। কাকা, কাকিমা, সুরোমাসি, নীপা। এরা এতদিন আমার অবর্তমানে কত কথা শুনেছে। নিজেকে ভীষণ অপরাধী লাগছে। বার বার মনে হচ্ছে এ আমি কি করলাম।

হুড়ুম-দুড়ুম শব্দ করে নীপা ঘরে ঢুকলো।

আচ্ছা জানলা দিয়ে গাছ দেখা ছাড়া তোমার কোনও কাজ নেই?

আমি হাসলাম।

সবাই চলে এসেছে। আমি এখন যাচ্ছি।

যাও।

নীপা চলেগেল।

চা খেয়ে এই বাড়িতে কাকার কাছে এলাম। বললাম, আমি একটু আসছি।

কাকা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, সন্ধ্যে হয়ে আসছে। এই সময় কোথায় যাবি?

দেখি।

টর্চটা নিয়ে যা।

দাও।

কাকা আবার কাকিমাকে ডাকলো। কাকিমা টর্চ দিল। বললো, তারাতারি চলে আসিস।

আচ্ছা। নীপাকে আশেপাশে কোথাও দেখতে পেলাম না।

আমি বেরিয়ে এলাম।

আমাদের পুকুর পাড়ের পেছনের রাস্তা ধরে, বাঁশ বাগানের ভেতর দিয়ে একবারে খাল পারে চলে এলাম। নিঃঝুম রাস্তাটা পাগল অনির সঙ্গে কথা বলার জন্য যেন ওঁত পেতে বসে আছে। একদিন এই জনপদহীন রাস্তা, বাঁশবাগান, জামরুল গাছ, জাম গাছ আমার খেলার সাথী ছিল। কতো নিবিড় বন্ধুত্ব ছিল এদের সঙ্গে।

কিছুক্ষণ একা একা দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকালাম। সকলের ভালো মন্দের খবর নিলাম। চারিদিক শুকনো গাছের পাতায় ঢাকা পড়ে আছে। মাঝখান দিয়ে সরু দড়ির মত রাস্তাটা এঁকে বেঁকে সামনের দিকে এগিয়ে গেছে।

সামনেই নদী। একটু নদীর ধারে বসলাম। বর্ষাকালে গ্রামের মানুষ একে নদী বলে। তখন নদীর দু-কুল ছাপিয়ে গ্রামের মধ্যে জল ঢোকে। বাঁধ বাঁচাবার জন্য তখন গ্রামের সবাই হামলে পড়ে বাঁধের ওপর। বর্ষা চলে গেলেই গ্রামের লোকেরা বলে খাল। তখন তার রূপ শীর্ণকায়। এই খালে কতো নৌকা চালিয়েছি আমি আর ভানু। সামন্তদের নৌকা।

বিমল সামন্ত। গ্রামের লোকেরা অপভ্রংশ করে বলতো বিমল সাঁতের লৌক।

সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেলে….

অনাদিদের সঙ্গে তখনও এতোটা ঘনিষ্ঠতা হয়নি। টেনে পড়ার সময় আমরা সবাই দলবদ্ধ হলাম। ভানু ভানুর জায়গায় রইলো। ও আমাদের থেকে সিনিয়র। কিন্তু ওই যে সিং ভেঙে বাছুরের দলে ঢুকলো আর বেরতে পারলো না।

গোধুলি শেষ হয়ে এসেছে। মিহি কুয়াশার মতো চারদিকে অন্ধকার একটু একটু করে গ্রাস করে ফেলছে। আকাশের দিকে তাকাতে দেখলাম তারাগুলো মিট মিট করে জ্বলছে।

আমার দিকে তাকিয়ে চোখ পিট পিট করে বললো, কি অনিবাবু অনেকদিন পর এই রাস্তায়। কেমন আছ। নিজে নিজেই হেসেফেললাম।

পায়ে পায়ে হারু জানার কালায় এসে পরলাম।

এই কালাটা এই গ্রামের বিখ্যাত জায়গা। গ্রামের লোকেরা ছোটো পুকুরকে কালা বলে। তার চারধারে ঘনো জঙ্গল। গ্রামের সাধারণ গৃহস্থ কেউ এখানে আসে না। গ্রামের পরিভাষায় জায়গাটা খারাপ। অশরীরা থাকে।

আর রাতের বেলা? কথাই নেই।

হারু জানার কালা নিষিদ্ধ জায়গা। ছোটো থেকেই নিষিদ্ধ জায়গার প্রতি আমার টান বেশি। ক্লাস নাইন থেকে আমি উড়নচন্ডী। ছোটো সময় গ্রামের বয়স্কদের মুখে গল্প শুনেছি, হারু জানার কালায় ভূত আছে। ওখানে গেলে কেউ জীবন্ত ফিরে আসে না।

একদিন মনের অমোঘ আকর্ষণে পায়ে পায়ে রাতের অন্ধকারে চলে এসেছিলাম হারু জানার কালায় ভূত দেখতে। বিরাট বিরাট গাছ মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। গাছের তলা আগাছায় ভর্তি। কতোরকমের বুনো গাছ। সব নামও জানি না।

বনের মধ্যে কিছুটা ঢোকার পর মানুষের গলার শব্দ পেলাম। প্রথমটা একটু ভড়কে গেছিলাম। হারুজানার কালায় ভূত থাকবে? মানুষ এলো কোথা থেকে! ঝোপের আড়াল থেক লুকিয়ে দেখলাম। সেখানে যেন মোচ্ছব বসেছে। কতো মেয়ে পুরুষ গায়ে গা লাগিয়ে বসে আছে। ঠিক যেন ভানু-কালুচরণের ঝি। সবাই যে এই গ্রামের তা নয় আশেপাশের গ্রামেরও বেশ কয়েকজনকে দেখলাম।

গ্রামের ঘরে দেশী মদকে ভাকু বলে। তারমানে দেশি মদের কারখানা। খোলা আকাশের নিচে গরম গরম ভাকু খেয়ে ফুর্তির জায়গা। হাঁড়িপাড়া, ডোমপাড়া, তাঁতীপাড়া, কামারপাড়ার অনেক মেয়ে পুরুষকে দেখলাম। সে কি তাদের ঢলানি।

সেদিন চাঁদনী রাতে অনেকক্ষণ লুকিয়ে লুকিয়ে দেখলাম। কাউকে কিছু বলিনি। কলকাতা এসে হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করলাম আমাদের গ্রামের হারু জানার কালা একটা ওপেন এয়ার বার।

পায়ে পায়ে শ্মশানে চলে এলাম। শ্মশানের পুকুর পাড়টায় বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। নিঝুম, কেউ কোথাও নেই। জোনাকিগুলো আলো ছড়িয়ে উড়ে উড়ে মাথার ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। দু-একটাকে ধরার চেষ্টা করলাম পারলাম না। দু-একটা আমার গায়ে উড়ে এসে বসছে। বেশ দেখতে লাগছে। পোকাগুলোর পেছন দিকটা জ্বলছে নিবছে। মাথার ওপর বড় বড় শাল, কদম, মহানিম, শিরিষ, বাবলা, জাম হাত-পা ছড়িয়ে বিশাল বিশাল শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে। এদের যে কত বয়স কেউ তা জানে না। আমি ছোটো সময়ে এদের দেখেছি। তখন যেভাবে দেখেছি এখনও সেই ভাবে দাঁড়িয়ে আছে।

সারাদিনের পর বাসায় ফিরে আসা ক্লান্ত পাখির কিচির মিচির চারদিকের নিস্তব্ধতাকে খান খান করে একটা স্বপ্নিল পরিবেশ রচনা করেছে। একটু এদিক ওদিক তাকালাম। দূরে কোথাও শেয়াল হুক্কাহুয়া হুয়া-কা-কা-কা-হুয়া করে ডেকে উঠলো।

মিত্রাকে সকাল থেকে ফোন করা হয়নি। অফিসের কি হালচাল কিছুই জানা হয়নি। সন্দীপকে বলেছিলাম, গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পেলেই জানাবি। মোবাইলটা পকেট থেকে বার করলাম। একটা সিগারেট ধরালাম। এখানে দেখছি টাওয়ারটা ফুল।

মিত্রাকে ডায়াল করলাম।

রিং বজে উঠতেই মিত্রা ধরলো।     

হ্যালো।

তুই কোথায়?

তোর ঘরে। ছোটোমার সঙ্গে বসে গল্প করছি। আর তোর আদরে ভাগ বসাচ্ছি।

হাসলাম।

হাসছিস। তোর হিংসে করছে না?

একবারে না।

জানিস এসে চিংড়িমাছের মালাইকারি, শুক্তো, মাছের মাথা দিয়ে ডাল, ভাত খেলাম।

বাঃ বাঃ।

তোর লোভ হচ্ছে না?

চিংড়িমাছটা শুনে একটু লোভ হচ্ছে। বড়োমা আমার জন্য নিশ্চই তুলে রাখবে।

না মশাই যেটুকু আনা হয়েছিল সব শেষ করে দিয়েছি।

অফিসে গেছিলি?

না।

এখানে কখন এসেছিস?

সেই সকালে।

দাদা বাড়িতে আছে?

না।

মল্লিকদা?

দুজনেই একসঙ্গে বেরিয়েছে।

ও।

বড়োমা কোথায়?

নিচে কারা এসেছেন কথা বলছেন।

তুই এখানে আসতে চাইছিলি, কাল আসবি?

হ্যাঁ। মিত্রার কথায় উচ্ছ্বলতা। আমি ওর চোখমুখ দেখতে পাচ্ছি।

কি করে আসবি?

তুই এসে নিয়ে যাবি।

হবে না। তোকে একলা আসতে হবে।

যাব।

এখানে আসার কতগুলো শর্ত আছে।

বল।

এখানে কাপড় ছাড়া অন্য কিছু পরা যাবে না।

পোরবো।

খোলা আকাশের নিচে, খোলা মাঠে বসে বাথরুম করতে হবে। তোর টাইলস বসান এক্সিকিউটিভ বাথরুম পাবি না।

সেকিরে!

হ্যাঁ।

ঠিক আছে তাই করবো। কেউ যদি দেখে ফেলে?

দেখলে দেখবে।

তারমানে!

হ্যাঁ।

তুই এই ব্যাপারটা একটু দেখ।

হবে না।

ঠিক আছে কোরবো।

টেবিল চেয়ার পাবি না। মাটিতে বাবু হয়ে বসে খেতে হবে।

এটা পারবো।

গাড়ি নিয়ে কোথাও যাওয়া যাবে না। মাঠে মাঠে হেঁটে হেঁটে ঘুরতে হবে।

হ্যাঁ হ্যাঁ পারবো।

বড়োমা-ছোটোমার সঙ্গে কথা বল। ছোটোমাকে দে।

ছোটোমা তোর সব কথা শুনেছে।

এই তো বুদ্ধি খুলেছে। রেকর্ডিং করেছিস নাকি?

না না।

ছোটোমা হো হো করে হাসছে, সত্যি অনি তুই না একটা….।

কি বলো….।

না। ফিরে আয় বলবো।

কে এসেছে নিচে।

দাদার দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়র মেয়ে।

বয়েস কতো।

সে জেনে তোর লাভ।

প্লিজ একটু বলো না….।

বুবুন খারাপ হয়ে যাবে বলছি। মিত্রার গলা, ছোটোমা হাসছে।

সত্যিতো। বেল পাকলে কাকের কি।

দাঁড়া তোর হচ্ছে। মিত্রার গলা।

তুই এখন কোথায়, পাখির কিচির মিচির শব্দ শুনছি। ছোটোমা বললো।

সেই জায়গায়? মিত্রার গলা।

না।

তাহলে?

শ্মশানে বসে আছি।

ছোটোমা চেঁচিয়ে উঠলো, তুই এই ভর সন্ধ্যেবেলা শ্মশানে বসে আছিস! তোর কি একটুও ভয়ডর নেই?

জায়গাটা দারুণ।

তুই আগে ওখান থেকে চলে আসবি, আমি দিদিকে এখুনি বলছি।

উঃ, তোমাদের নিয়ে আর পারা যাবে না। ঠিক আছে চলে যাচ্ছি। মিত্রাকে বলো কিছুক্ষণ পর ফোন করতে।

তুই আগে চলে যা ওখান থেকে। মিত্রা বললো।

যাচ্ছিরে বাবা যাচ্ছি।

আরও কিছুক্ষণ বসে থাকলাম। অন্ধকারটা আরও গভীর হয়ে এল। পাখির কিচির মিচির শব্দটা কিছুটা ম্লান হয়ে এসেছে। এখন মাঝে মাঝে পাখির ডানার ঝটপট শব্দ। হেঁড়েগলায় দাঁড়কাকের কাবা কাবা ডাক ভেসে আসছে।

আকাশের তারাগুলোকে এখন বেশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। চাঁদ উঠেছে। তার স্নিগ্ধ আলোর পরশে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। আমাদের হাই স্কুলের টালির চালটা আবছা দেখা যায়। দূরে ওই অশ্বত্থ গাছের তলাটা পীর সাহেবের থান।

আমি প্রত্যেক দিন স্কুলে যাওয়া আসার পথে ওখানে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করতাম। ওর ঠিক পাশেই প্রচুর কুলের গাছ। শীতকালে কুল পাকার আগেই গাছ পরিষ্কার হয়ে যেত। কুল খাওয়ার যোম ছিল পুনি আর সৌমি।

ওরা এখন কোথায় হারিয়ে গেছে জানি না। অনাদিকে একবার জিজ্ঞাসা করতে হবে।

ফোনটা বেজে উঠলো। মিত্রার ফোন।

হ্যালো।

অনুমতি পেয়ে গেছি। তুই বড়োমার সঙ্গে কথা বল। কথা বলো, বলোনা ও ঠিক শুনতে পাবে।

বুঝলাম মিত্রা ভয়েস মুডে দিয়ে রেখেছে।

হ্যাঁরে তুই নাকি শ্মশানে বসে আছিস?

হ্যাঁ।

এখনও!

ওখান থেকেই তোমার সঙ্গে কথা বলছি।

তোর কি কোনও ভয়ডর নেই!

গ্রামের ছেলের ভয় থাকতে নেই।

পাকামো করতে হবে না। এখুনি বাড়ি যা। ছোটোমার গলা।

যাব। মিত্রার সঙ্গে কথা হয়েছে?

ও একটা মেয়ে, কি করে একা যাবে। বড়োমার গলা।

আফটার অল ও একটা কোম্পানীর মালিক এটা ভুলে যাচ্ছ কেন? সব সময় ল্যাংবোট সঙ্গে নিয়ে ঘুরলে চলবে?

ঠিক আছে ঠিক আছে। আমি যেতে পারবো। তুই নার্সিংহোমের কাছে চলে আসবি, আমি ওই রাস্তাটা পর্যন্ত চিনে চলে যেতে পারবো। মিত্রার গলা।

আচ্ছা।

কখন যাব বল?

একটা ফোন এসেছে। পরে বলছি।

মিত্রাকে ছারতেই সন্দীপের গলা ভেসে এলো।

হ্যালো, হ্যালো, অনি—

বলছি, কি হয়েছে?

কখন থেকে তোকে ট্রাই করছি, কিছুতেই পাচ্ছিনা।

কেন!

এখানে সব গজব হয়ে গেছে।

কি হয়েছে?

মালকিন নাকি তোর সঙ্গে ভেগেছে।

আমার সঙ্গে!

হ্যাঁ। সেরকমই শুনছি।

এই খবর কোথা থেকে পেলি?

কাল সব পাকা খবর পাব। তোকে বিকেলের দিকে ফোন করবো। আমার সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে।

কেন!

সুনিত যা বারাবারি শুরু করেছে, কি বলবো। সব নয়া নয়া মাল এ্যাপয়েন্টমেন্ট দিচ্ছে।

খাতা কলমে না মৌখিক।

মৌখিক। ম্যাডাম নাকি ওকে সমস্ত পাওয়ার দিয়ে তোর সঙ্গে ভেগে গেছে। সকালে শুনলাম লণ্ডন, এখন শুনছি তোর দেশের বাড়ি।

তোর কি মনে হয়?

সে তো আমি বুঝতে পারছি। মন মানে না।

বাড়িতে গিয়ে মাথায় সিঁদুর আর হাতে চুরি পরে বসে থাক।

দূর তোকে মন খুলে দুটো কথাও বলতে পারবো না।

বলবিনা। অন্য কি খবর আছে বল?

সুনিত অফিসের মধ্যে হল্লা লাগিয়ে দিয়েছে। পদে পদে ঘরুইয়ের সঙ্গে ঝামেলা করছে। চম্পকদা ওর সঙ্গে আছে। অন্যান্য ডিপার্টমেন্টের কিছু কিছু মাথাও রয়েছে।

আমার সঙ্গে মালকিন ভেগেছে এই খবরটা কে দিল?

আজ ক্যান্টিনে গিয়ে কানে এল। কমপিউটার ডিভিশনের ছেলেরা হাঁসাহাঁসি করছে।

নিউজটা কোথা থেকে বেরোল, খবর নিলি?

কি নেব, তবে অনেকেই জানে দেখছি।

কাল লেটেস্ট নিউজ চাই।

আচ্ছা।

(আবার আগামীকাল)

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “কাজলদীঘি”

  1. Abhik says:

    একটা suggestion। প্রতিটি পোস্টের প্রথমে আগের ও পরের পোস্টটির লিংক দিলে আমাদের পড়তে সুবিধা হবে।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev