| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কাজলদীঘি

Reporter Default
রিপোর্টার / ১৯৫৫ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ১ মার্চ, ২০২০

জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

দশম কিস্তি

ঘাটের দিকে তাকালাম। নীপা, মিত্রাকে নিয়ে শেষ ধাপিতে দাঁড়িয়ে। আমি বাড়ির ভেতরে এলাম। আমার পেছন পেছন ওরাও এলো।

বাইরের বারান্দায় এসে সবাই বসলাম। অনাদি বললো, তোর পেটে পেটে এতো কিছু ছিল আগে জানাস নি কেন?

জানালে মজাটাই নষ্ট হয়ে যেত।

তা যা বলেছিস। চিকনা বলে উঠলো।

তুই ম্যাডামকে পুকুরে নামাতে গেলি কেন?

আমি নামাতে যাব কেন! কাকিমা বারন করলো, আমি বারন করলাম, বললাম বালতি করে জল তুলে দিচ্ছি, না আমি নামব, নাম। মাঝখান থেকে….।

চিকনা চোখ মেরে হো হো করে হাসছে।

তোরা সবাই চলে এলি ওখানে সামলাচ্ছে কে?

লোক আছে। অনাদি বললো।

তোরা খবর পেলি কি করে?

চিকনা প্রথমে খবর পেয়েছে।

চিকনা!

হ্যাঁ।

বাসুর দোকানের ছেলেটা ফোন করেছিল চিকনাকে।

বুঝেছি। তোরা।

চিকনা, নীপাকে নিয়ে রুদ্ধশ্বাসে মেলা থেকে বাইক নিয়ে বেরল। বাসুকে ফোন করলাম ব্যাপার কি। ও সব বললো। সবাই চলে এলাম।

ডি এইচ এ এম এন এ, বাসুর দিকে তাকিয়ে বললাম। বাসু হাসছে।

অনাদি বললো, কি বললি?

আমি বানান করে বললাম তুই উচ্চারণ কর।

চিকনা বিড় বিড় করেই ঢক করে আমার পায়ে কপাল ঠেকাল। গুরু একি শেখালে।

হাসলাম।

চিকনা আমার পা ধরেই বললো, গুরু আর একবার বলো?

কি!

ওই যে যেটা বললে?

কি বলবি তো?

ওই যে বাসুকে বললে না।

ধ্যাত।

আর একটা এখনও বলি নি। বাসু বললো।

বাসুর দিকে কট কট করে তাকালাম। বাসু হাসছে।

অনাদি বললো, কিরে বাসু?

ওটা এখন বলা যাবে না।

বলতেই হবে।

না।

চিকনা বাসুকে দু-হাতে জাপ্টে ধরলো।

পাঁচু, পচা ওর প্যান্টের বোতাম খুলতে আরম্ভ করেছে। সঞ্জয়, বাসুকে কাতাকুতু দিচ্ছে। বাসু মাটিতে পড়ে গিয়ে ছটফট করছে। ওর প্রাণ যায় যায়।

বুঝলাম বাসু বেশিক্ষণ আটকে রাখতে পারবে না। সে এক হুলুস্থূলুস কাণ্ড। বাধ্য হয়ে বাসু অনাদিকে কানে কানে বলে দিল।

অনি ওই কোম্পানীর একজন মালিক।

অনাদি ছুটে এসে আমাকে কোলে তুলে নাচতে শুরু করেছে। ওদের পাগল প্রায় অবস্থা দেখে কাকা চেঁচিয়ে উঠল, তোরা করছিসটা কি বলতো! বয়স দিনে দিনে বারছে না কমছে?

অনাদি আমাকে মাটিতে নামিয়ে রেখে, কাকার কাছে ছুটে গেল। কানে কানে কাকাকে বলতেই, কাকা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, আবার বসে পড়লো। নীপা ভেতর থেকে ছুটে এসেছে।

কি হয়েছে গো চিকনাদা?

মিত্রাও, নীপার পেছন পেছন এসেছে। তার পেছনে কাকিমা, সুরমাসি।

চিকনা নীপার কানে কানে বললো খবরটা।

নীপা ছুটে এসে আমাকে জরিয়ে ধরলো। তারপর ছুটে গিয়ে মিত্রাকে জড়িয়ে ধরে ওর গালে চুমু খেতে আরম্ভ করলো।

কাকা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ওরে ও হচ্ছে নীলকন্ঠ।

আমি কাকার কাছে গিয়ে প্রণাম করলাম, তোমার অপারেশনের দিন হয়েছে।

আমি জানিরে জানি। নাহলে তুই ওই সময় আমাকে ছেড়ে যেতিস না।

মিত্রা এবার ব্যাপারটা ধরতে পেড়েছে, ওর চোখে খুশির ছোঁয়া। পাশে এসে দাঁড়াল, কাকাকে প্রণাম করলো। কাকা আমাদের দুজনকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

কাকিমা, সুরমাসি ব্যাপারটা ধরতে পারেনি। তবে কিছু একটা ঘটেছে, সেটা জানলো।

অনাদি, মিত্রার কাছে গিয়ে বললো, এর জন্য আমরা কালকে একটা পার্টি দেব।

মিত্রা মুচকি মুচকি হাসছে।

পান্তা খাওয়া নিয়ে নীপার সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ ঝগড়ার পর মিত্রা হাসতে হাসতে বললো, নীপা আমি বুবুনকে বলেছি, খাব।

নীপা মিত্রার কথা শুনে ব্যাপরটায় ইতি টানল, তবু বলতে ছারলো না, তুমি আমাদের বাড়িতে প্রথম এলে, তোমায় গরমভাত না খাইয়ে পান্তা খাওয়াব।

মিত্রা হাসলো, আমি কি পালিয়ে যাচ্ছি নাকি। এখন থাকবো কয়েক দিন।

তাই!

এসেছি ওর ইচ্ছেয়, যাব আমার ইচ্ছেয়।

পান্তা খেতে বসলাম। মিত্রা বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে খেল, তারপর সুরমাসির দিকে তাকিয়ে বললো, আর নেই?

সুরমাসি লজ্জা পেয়ে গেল।

অভ্যাস নেই মা, বেশি খেলে শরীর খারপ করবে।

মিত্রা হেসে ফেলল।

খাওয়া শেষে আমি উঠে বাইরের বারান্দায় চলে এলাম, অনাদিরা বসে চা খাচ্ছে।

কোন ফাঁকে নীপা এদের চা করে দিয়েছে, বারান্দার ঘরিতে দেখলাম চারটে দশ।

আনাদির পাশে বসে বললাম, মিত্রা এক পেটি বাজি নিয়ে এসেছে।

তুই সব ষঢ়যন্ত্র করেই ব্যাপারটা ঘটিয়েছিস।

বিশ্বাস কর, কাল শ্মশানে বসে মিত্রার সঙ্গে কথা হলো। ও আসতে চাইল। বললাম আমি কাকার চশমা আনতে যাব, তুই চলে আয়। বাজির ব্যাপারটা অবশ্য আমি আনতে বলেছি।

কেন?

ছোটোবেলায় এই মেলাতেই বাজি ফাটানর জন্য কতো কথা শুনেছি।

তাই মিত্রাকে আনতে বলেছিলাম। এখানকার জন্য কিছু রেখে দে, বাকিটা মেলায় নিয়ে গিয়ে বাচ্চাদের দিয়ে ফাটা।

সকলে চুপ করে গেল। অনাদি চুপ করে আছে।

না জেনে তোকে হার্ট করে ফেলেছি।

দূর পাগল। আমি এত সহজে হার্ট হই না। হলে বাঁচতে পারতাম না।

ঠিক আছে ঠিক আছে, তুই যা বলবি তাই হবে। চিকনা।

চিকনা কাছে এলো। অনাদি ওকে সব বুঝিয়ে দিল।

মেলায় যেতে হবে।

মিত্রা, নীপা গেল কোথায়?

ওবাড়িতে। পচা বললো।

কোনদিক দিয়ে গেল?

পেছন দিক দিয়ে।

নীপা নাচছে না কি করছে যেন?

চিকনা বললো, হ্যাঁ।

কটায় আরম্ভ।

বাঙালীর কথা ছটা বলেছে, সাতটায় শুরু হবে।

শেষ হবে কখন?

রাত একটা ধরে রাখ।

শোবো কখন!

শুতেই হবে তোকে।

আমি চিকনার কথা শুনে হাসলাম।

নীপা বারান্দা থেকে আমার নাম ধরে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে। আমি পচার দিকে তাকিয়ে বললাম, দেখ তো কেন চেঁচাচ্ছে। পচা গেল হাসতে হাসতে, ফিরে এলো গুম হয়ে।

কি হলো?

তোর জন্য ঝার খেলাম।

তোরা কিছু বলতে পারিস না?

আমরা! আনাদি বললো।

কেন!

চিকনা হাসছে।

হাসছিস কেন?

এখানে যে কটাকে দেখছিস, সেগুলো ছাড়া, সবাই কম বেশি ওর কাছে ঝাড় খায়, দিবাকরকে একদিন থপ্পর কষিয়েছিল।

কেন!

সে অনেক ব্যাপর।

অনাদি গ্রামসভা ডেকে মিটমাট করে। না হলে তো দিবাকরকে ও গ্রামছাড়া করে দিত।

আনাদি চিকনার দিকে তাকিয়ে বললো, এখনই এই সব কথা আলোচনা করতে হবে।

থাম তো তোরা। বাসু খিঁচিয়ে উঠলো।

দাঁড়া আমি ঘুরে আসি।

আমি এই বাড়িতে এসে ওপরে এলাম।

নীপা, মিত্রা দুজনে শাড়ি পরেছে। দুজনকে এত সুন্দর লাগছে চোখ ফেরাতে পারছি না। আমাকে দেখেই নীপা বললো, এই প্যান্ট গেঞ্জিটা পরে ফেল। আমি একটু আসছি।

নীপা বেরিয়ে গেল। আমি আজ কোনও কথা বললাম না।

মিত্রার দিকে তাকালাম, দারুন মাঞ্জা দিয়েছিস আজ রাতে তোকে চটকাব।

এখন চটকাস না প্লিজ, সাজগোজ নষ্ট হয়ে যাবে।

দে কোনটা পরতে হবে।

খাটের ওপর আছে।

হঠাত হই হই শব্দ।

কি হলো বলতো!

ও তুই বুঝবি না।

আমি কোনও কথা না বলে প্যান্টটা খুললাম, মিত্রা এগিয়ে এলো।

একদম না। নীপা এখুনি চলে আসবে।

আসুক আমার জিনিসে আমি হাত দেব।

খাটে বসে জিনসের প্যান্টটা গলালাম, সেদিন মিত্রা গড়িয়াহাটের ওই দোকান থেকে কিনেছিল, গেঞ্জিটাও।

আলামাড়ির আয়নাটায় নিজেক দেখলাম। খারাপ লাগছে না।

আসতে পারি। নীপার গলা।

আসুন।

ঢুকেই আমার গায়ে ফস করে একগাদা সেন্ট ছিটিয়ে দিল।

এটাও সঙ্গে নিয়ে এসেছিস! কে দেখবে বলতো?

দেখার অনেক লোক আছে। চলো না মেলায়। নীপা বললো।

তারাতারি কর। ওরা বেচারা আমাদের জন্য বসে আছে। মেলায় ওদের অনেক কাজ।

তুই যা, পাঁচ মিনিটের মধ্যে যাচ্ছি।

মিত্রা ভুরুতে শেষ টান দিচ্ছে।

আমি নিচে চলে এলাম। চারিদিকে সেন্টের গন্ধ ম ম করছে।

ওই জন্য তোরা তখন চেঁচাচ্ছিলি।

তুই জানিস অনি, মেয়েটা আজ আমাদের মারবে।

কেন!

একটু ভালো করে কান পাত, শুনতে পাবি, নাম ধরে ধরে কেমন ডাকছে।

কে আছে ওখানে?

তুই চিনতে পারবি না, শান্তনু বলে একটা ছেলে আছে। পলাকে দায়িত্ব দিয়ে এসেছি।

রথ কখন বেরবে?

সাতটা নাগাদ।

অনেক দিন রথের দড়িতে হাত দিইনি, চিকনা ঠাকুরকে একটু মিষ্টি কিনে দিস।

কেন তুই যাবি না?

আমি হাসলাম।

মিত্রা নীপা নিচে নেমে এলো।

ওদের চোখের পাতা আর নড়ছে না। সবাই অবাক হয়ে ওদের দেখছে।

চিকনা আমার হাত ধরে দাঁতে দাঁত চিপে বললো, অনি আমি ম্যাডামের বডি গার্ড হবো।

আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, আমি কোথায় থাকবো।

নীপা দেখে ফেলেছে।

চিকনাদা কি বলছে গো অনিদা?

তোমরা দারুন মাঞ্জা দিয়েছ তাই।

নীপা একবার কট কট করে চিকনার দিকে তাকাল।

চিকনা ইশারা করে দেখাল, মেলায় গিয়ে গলাটা কাটিস। নীপা হাসছে।

মিত্রা আমার পাসে এসে দাঁড়াল, বল ঠিক আছে?

আমি হাসলাম।

চল। আমরা রেডি। আমার ব্যাগ দুটো নিয়ে যেতে হবে।

কিসের ব্যাগ!

ক্যামেরা আর, সাজগোজের।

কেন?

নীপাকে সাজাব, সিডি বানাব।

ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলে?

কেন কারেন্ট নেই!

মেলায় হ্যাচাক পাবি। কারেন্ট পাবি না।

দেখেছো অনাদি ও আমাকে কেমন করে।

ঠিক আছে চলুন ম্যাডাম, আপনার কোনও অসুবিধে হবে না, সব ব্যবস্থা করে দেব।

চিকনা, মিত্রা আর নীপাকে নিয়ে তুই যা। আমি বললাম।

আমি!

হ্যাঁ।

না।

তুই যা। আমি বরং ব্যাগ বই। চিকনা, অনাদির দিকে তাকাল।

পেছন ফিরে দেখলাম দুজনেই হাওয়া।

ওরা আবার গেল কোথায়?

ভেতরে গেল।

সত্যি অনি তোর ধৈর্য আছে। বাসু বললো।

আরও নিদর্শন পাবি, চল একবার মেলায়, দেখতে পাবি।

অনিদা কি বলছে গো বাসুদা। নীপা ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে বললো।

কিচ্ছু না।

আমি মিত্রাকে বললাম, তুই অনাদির বাইকের পেছনে নীপাকে সঙ্গে করে চলে যা।

মিত্রা কিছুতেই বাইকে উঠবে না।

অগত্যা অনাদিকে বললাম, তোরা এগিয়ে যা।

ট্রলি পাঠাব।

যাবে?

আমার বাড়ির সামনে থেকে যাবে।

না থাক। তোরা যা। আমি হেঁটে যাচ্ছি।

অগত্যা ওরা বেরিয়ে গেল।

আমি, বাসু, আর মিত্রা হাঁটতে আরম্ভ করলাম।

বাসুর বাইক পাঁচু চালিয়ে নিয়ে গেছে।

সন্ধ্যে হয়নি। তবে বেশি দেরি নেই। ঘরির দিকে তাকালাম। পাঁচটা পাঁচ। প্রায় আধ ঘণ্টার পথ। তারমানে মেলায় পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যে হয়ে যাবে। মিত্রাকে দেখাতে দেখাতে নিয়ে যাচ্ছি। এইটা বড়মতলা, ওই যে সেই পেয়ারা গাছ। ওটা তাঁতীপাড়া, ওটা চন্দ্রপাড়া, ওই দিকটা হাঁড়িপাড়া। ওই যে দূরে জঙ্গলটা দেখছিস, ওইটা দীঘাআড়ি। মিত্রা আমার হাতটা শক্ত করে ধরলো।

কাল আমায় নিয়ে আসবি?

আসবো।

তোর মুখ থেকে গল্প শুনেছি, একবার নিজের চোখে দেখবো।

আমি মিত্রার মুখের দিকে তাকালাম। চোখ দুটো চক চক করছে।

মেলায় যেতে কতক্ষণ লাগবে?

বাসুর দিকে তাকালাম। বাসু, এইভাবে হাঁটলে কতক্ষণ লাগবে।

আধঘণ্টা।

আমি বললে বিশ্বাস করতিস?

তুই সব সময় হেঁয়ালি করিস, তাই বিশ্বাস করতাম না।

বাসু হাসলো।

হ্যাঁগো বাসু, জাননা তোমার বন্ধুকে। কি চিজ। আমি ওর সঙ্গে মিশেছি আমি জানি।

দীঘাআড়ির কাছে আসতে একটা হৈ হল্লা শুনতে পেলাম, মিত্রাকে বললাম, ওই দূরে আলোর রোশনাই দেখতে পাচ্ছিস।

হ্যাঁ।

ওইটা মেলা।

এতোটা যেতে হবে এখনও!

হ্যাঁ।

মেলায় গিয়ে একটা ঠাণ্ডা খাওয়াস।

ঠাণ্ডা!

বল সেটাও পাওয়া যাবে না। কঁত কঁত করে জল গিলতে হবে।

ঠিক আছে আপনি চলুন, ব্যবস্থা করে দেব। বাসু বললো।

দেখ, তোর মতো ঢেপস নয়।

বাসু হাসলো।

আমি মিত্রার হাতটায় একটু চাপ দিলাম।

মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে চোখ মারলো।

মেলার কাছাকাছি এসে সন্ধ্যে হয়ে গেল। আমি টর্চ জ্বাললাম, মিত্রা আমার হাত শক্ত করে ধরলো।

ও মাগো।

কি হলো!

পায়ে কি জড়িয়ে গেছে।

মিত্রা তারস্বরে চেঁচাচ্ছে আমাকে জড়িয়ে ধরে। আর লাফাচ্ছে।

আমি ওর পায়ে টর্চের আলো ফেললাম, দেখি একটা খরের টুকরো। নিচু হয়ে জুতোর ফাঁক দিয়ে খড়ের টুকরো বার করলাম।

বাসু হাসছে।

তোকে নিয়ে আমর বড় জ্বালা।

কি করবো। আমি ইচ্ছে করে জড়িয়েছি। খর না হয়ে যদি সাপ হতো।

আমি ওর দিকে কট কট করে তাকালাম।

ঠিক আছে চল। মিত্রা আমার বাম হাতটা চেপে ধরে আছে। ওর সুডৌল বুকের স্পর্শ পাচ্ছি। বুঝতে পারছি ইচ্ছে করে করছে। ওর দিকে তাকালাম। চোখে মুখে দুষ্টুমি।

আস্তে করে বললাম, সামনে বাসু আছে।

থাক।

কি ভাবছে?

ভাবুক। এরকম অন্ধকার রাস্তায় এলি কেন।

তোর জন্য লাইট পাব কোথায়?

অনাদিকে বল। ওতো পঞ্চায়েত।

শেষের কথাটা বাসুর কানে গেল। বাসু ঘুরে একবার হাসল।

ম্যাডাম দেখছেন তো আমরা কিভাবে বেঁচে আছি।

দেখছি।

এই অন্ধকারে অনি কালকে একা শ্মশানে ছিল।

ওরে বাবা।

কি হলো!

বাসু আবার থমকে দাঁড়াল।

দেখ পায়ে কি ঢুকেছে।

আমি আবার ওর পায়ের কাছে বসলাম। টর্চ জ্বালালাম। চোর কাঁটা। শাড়ির পারটা চোর কাঁটায় ভরে গেছে। ওকে কিছু বললাম না।

চল, মেলায় গিয়ে ব্যবস্থা করছি।

কি বলবি তো?

উঃ পা ঝারিস না। এগুলো বার করতে সময় লাগবে।

বলনা কি আছে?

চোর কাঁটা।

বাসু শব্দ করে হাসলো।

এই অন্ধকারেও মিত্রার মুখটা দেখতে পেলাম, পাকা আপেলের মতো রং।

মেলার মুখে ওরা সবাই দাঁড়িয়ে।

আমরা যেতেই চিকনা বললো, নীপার হুকুম, ম্যাডামকে গ্রিনরুমে নিয়ে যেতে হবে।

আমি বললাম, তুই নিয়ে যা।

তুইও চল। মিত্রা বললো।

ওই মহিলা মহলে গিয়ে কি করবো—তুই সেলিব্রেটি, দেখনা, ওখানে গিয়ে মালুম পাবি।

মিত্রা এমন ভাবে আমার দিকে তাকাল, বাসু, চিকনা পর্যন্ত হেসে ফেলল।

ঠিক আছে চল, চিকনা আর কে কে আছে?

ওই সব মিউজিশিয়ান মেকআপ ম্যান আর পলা আছে।

ও কি করছে ওখানে?

ফাংশনের ইনচার্জ।

বাবাঃ।

সাজানো-গোজানো, ড্রেস পরানো….।

কসটিউম ডিজাইনার। মিত্রা বললো।

ছাগল। দর্জি থেকে কসটিউম ডিজাইনার!

সবাই হেসে ফেলল।

চল পলাকে একটু চাটতে হবে।

তুই পারবি অনি, আমরা বললে আজ সব্বনাশ। চিকনা বললো।

কেন!

নীপা দিদিমনি।

মিত্রার ক্যামেরার ব্যাগ কোথায়?

ওখানে। নীপার জিম্মায়।

কয়েকটা পাঁপড় আর জিলিপি নিয়ে আয়।

চল সব ব্যবস্থা আছে।

তুই কি রাক্ষস? মিত্রা বললো।

কেন!

এই তো একপেট ভাত গিলে এলি।

ভাত নয় পান্তা। এতটা যে হাঁটালি।

আমি হাঁটালাম কোথায়, তুই তো হাঁটালি।

মিত্রা আমার দিকে হাসি হাসি চোখ করে তাকিয়ে।

তুই চিকনার বাইকের পেছনে বসলেই হাঁটতে হতো না। তার ওপর উপরি বোনাস, দুবার পা ধরালি।

বুবুন খারপ হয়ে যাবে বলছি।

আমাদের দুজনের কথা-বার্তায় চিকনা, বাসু হাঁসতে হাঁসতে প্রায় মাটিতে গড়িয়ে পরে।

স্টেজের পাশে গ্রিনরুম। চিকনা পর্দা সরিয়ে নীপা বলে চেঁচাতেই নীপা ছুটে এলো। আমাদের দুজনকে দেখে একগাল হাসি। মিত্রাকে হিড়হিড় করে টানতে টানতে ভেতরে নিয়ে গেল।

আরে থাম থাম, শাড়িতে পা জড়িয়ে উল্টে পড়ে যাব।

কে কার কথা শোনে। নীপা আজ হাতে চাঁদ পেয়েছে।

আমি আমের আঁটি, আমে-দুধে মিশে গেছে। আঁটি গড়াগড়ি খাচ্ছে। কি আর করবো। পকেট থেকে সিগারেটর প্যাকেট বার করে চিকনাকে একটা দিলাম। বাসুকে একটা দিলাম। নিজে একটা ধরালাম। একটা ছেলে একটা স্প্রাইটের বোতল নিয়ে এসে হাজির।

বাসুর দিকে তাকালাম, এটা কি?

ম্যাডামের জন্য।

তোর কি মাথা খারাপ?

কেন!

একা খাবে নাকি?

তাহলে!

এখুনি হুকুম করবে। আর নেই, ওদের জন্য নিয়ে আয়।

এখন কি করবো?

আগে স্টক দেখ কত আছে। তারপর পাঠাবি।

ম্যাডাম বললো ঠাণ্ডা খাবে।

এমনি সাদা জল নিয়ে আয়।

তুই শালা একদম….। বাসু বললো।

চিকনা খিল খিল করে হেসে ফেললো। বেশ জমেছে মাইরি।

বাসু অগত্যা ছেলেটিকে বললো, কটা বোতল আছে।

বড়ো বোতল গোটা কুড়ি হবে।

ঠাণ্ডা হবে?

বরফ দেওয়া আছে।

ছোটোবোতল কি আছেরে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

থামস আপ, স্প্রাইট, পেপসি….।

একটা স্প্রাইটের ছোটো বোতল নিয়ে আয়। খুলবি না। দেখি কতটা ঠাণ্ডা।

ছেলেটি চলে গেল।

এখান থেকেই বুঝতে পারছি মিত্রার প্রাণ ওষ্ঠাগত। সত্যি কথা বলতে গেলে আজ ও-ই এই মেলার সেলিব্রিটি। অনেক বড় বড় আর্টিস্ট আমাদের কাগজে স্থান পাওয়ার জন্য সম্পাদককে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে যায়। আর আজ ও যেচে এই অজ পাড়াগাঁয়ের একটা মেলায় এসেছে।

একটা ফোন করলেই কালকের কাগজের ফ্রন্ট পেজে একটা কলম লেখা হয়ে যাবে। কিন্তু কেউ জানেনা ও এখন এখানে।

আমি তারিয়ে তারিয়ে ব্যাপারটা উপভোগ করছিলাম। ও বেশ সামলাচ্ছে, কেউ হাত মেলাচ্ছে ওর সঙ্গে, কেউ পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করছে। কেউ জড়িয়ে ধরছে। নীপা খুশিতে ডগমগ, ওর মাইলেজ আজ অনেক বেড়ে গেছে।

বাসুদা নিয়ে এসেছি। দেখলাম আর একটা ছেলে।

তুই!

ও গিয়ে বললো, অনেক লাগবে তাই জানতে এলাম।

ভালো করেছিস।

যা ওই ভদ্রমহিলাকে গিয়ে দিয়ে আয়। বাসু দেখিয়ে দিল।

ছেলেটি ভির ঠেলে ওর কাছে পৌঁছতেই মিত্রা গেটের দিকে তাকাল। বুঝলাম ও কিছু বলছে ওদের, তারপর এগিয়ে এলো।

বাসু, ঠেলাটা বোঝ এবার।

বাসু আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।

মিত্রা এদিকেই এগিয়ে আসছে, আমি মিটি মিটি হাসছি। কেছে এসেই, ওর প্রথম কথা, তোর মতো বে-আক্কেলে ছেলে আর দেখিনি।

কেন? আমি কি দোষ করলাম!

আমি কি একা একা খাব?

এখানে তোর জন্য অনেক কষ্টে একটা বোতল জোগাড় করা হয়েছে।

সবার জন্য পারলে আন নাহলে আমার চাই না।

কি বাসুবাবু, পালস বিটটা দেখেছো?

মিত্রা আমার দিকে কটকট করে তাকিয়ে আছে।

ঠিক আছে তুই খা, ওদের জন্য আনছে।

না। সবার জন্য আনুক তারপর খাব।

তাহলে আমি খাই। বলে ছেলেটির হাত থেক বোতলটা নিলাম, মিত্রা ছোঁ মেরে আমার কাছ থেকে বোতলটা ছিনিয়ে নিল, তুইও খাবি না। এটা চিকনাকে দে।

চিকনা তুই খা। তোর ভাগ্য ভালো। আমার কোমরে চিমটি পরলো, আমি উ করে উঠলাম।

ছেলেটিকে বললাম, কটা বোতল আছেরে।

গোটা পঞ্চাশ হবে।

সব গুলো নিয়ে আয়। ঠাণ্ডাতো?

বরফের পেটিতে আছে।

যা বাবা, বাঁচা।

চিকনা, বোতলটা শেষ করে, আমাদের টিমটাকে একটু খবর দে।

চিকনা হাসছে।

পলাকে দেখতে পাচ্ছিনা?

ভেতরে আছে। বাসু বললো।

মিত্রাকে মনেহয় দেখে নি?

লাইটিং নিয়ে বিজি। চিকনা বললো।

ম্যাডাম, বলুন কেমন বুঝছেন? বাসু বললো।

সত্যি এখানে না এলে খুব মিশ করতাম।

একটা ছোট্ট থ্যাঙ্কস যদি পোরাকপালে জুটতো। আমি বললাম।

একটি থাপ্পর। দেখছো বাসু তোমার বন্ধুকে, খালি টিজ করবে।

এটা টিজ হলো।

তাহলে কি হলো, প্রেম হলো।

চিকনা হাসতে গিয়ে বিষম খেল। মিত্রা ওর দিকে এগিয়ে গেল। বাসু হাসছে। চিকনা, মিত্রাকে খক খক করে কাশতে কাশতে কাছে আসতে বারন করছে। ইশারায় বলছে কিছু হয়নি। মিত্রা আমার দিকে তাকাল। ব্যাপারটা এরকম, তোর জন্য দেখ কি হচ্ছে।

চিকনার বিষম থামল। ছেলেটি একটা আইস্ক্রীমের গাড়ি নিয়ে এসে হাজির।

এটা কিরে!

এর মধ্যেই আছে।

ভালো করেছিস। আমি খাব না, চিকনা আমার জন্য পাঁপড় আর জিলিপির ব্যবস্থা কর।

আমিও খাব। মিত্রা বললো।

এটাও কি সবার জন্য?

হলে ভালো হয়।

ঠিক আছে আগে জল খা।

ওদের ডাকি?

ডাক।

মিত্রা, নীপা বলে ডাকতেই নীপা ছুটে এলো।

মিত্রা বললো, ওদের ডাক, কোলড্রিংকস খাবে।

নীপা আমার দিকে তাকাল, অনেক লোক।

তোরা যারা পার্টিসিপেন্ট তাদের ডাক।

সেও তিরিশ জনের ওপর।

তোমায় পাকামো করতে হবে না, মিত্রাদি স্পনসর করছেন, পারলে মেলার সবাইকে খাওয়াতে পারেন।

অনিদা খারাপ হয়ে যাবে বলে দিচ্ছি।

তুই ওর কথায় কান দিস না, ও ওইরকম।

নীপা ছুটে ভেতরে চলে গেল।

মেয়েগুলোকে ছুটে আসতে দেখে পলা এদিকে তাকাল, আমাদের দেখতে পেয়েই পরি কি মরি করে ছুটে এলো।

কি গুরু কতক্ষণ?

বাসু বললো অনেকক্ষণ। তুই কাজে ব্যস্ত।

আরে বলিস না, মেয়েগুলো জ্বালিয়ে পুরিয়ে মারল।

কি বললে পলাদা। নীপা চেঁচাল।

একবারে কথা বলবি না। দেবো মুখে কালো ডিমার মেরে বুঝতে পারবি। তারপর এই ম্যাডাম এসে আরও সব গুবলেট করে দিল।

বাসু হাসছে। মিত্রা হাসছে। নীপা হাসছে।

হাসছিস কেন?

চিকনা একটা ঠাণ্ডার বোতল এনে পলাকে দিল।

তুই খাওয়াচ্ছিস। আমার দিকে তাকিয়ে।

না ম্যাডাম। চিকনা বললো। আয় এদিকে।

পলা গেল। চিকনা পলার কানে কানে কি কথা বললো।

পলা ছুটে এসে মিত্রার কাছে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে পরলো। আমায় ক্ষমা করুণ, আমি বুঝতে পারিনি। এখুনি কি ভুল করছিলাম।

মিত্রা হাসছে।

পলা আমার দিকে তাকাল।

নীপাটা কি ছাগল বল। আগে বলবে তো।

তুমি বলার সময় দিয়েছ। নীপা বললো।

সবাই মিলে ঠাণ্ডা খাচ্ছি আর কথা বলছি।

ফোনটা বেজে উঠলো।

পকেট থেকে বার করতেই দেখি সন্দীপের ফোন। মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম, আমি আসছি দাঁড়া। ওখান থেকে বেরিয়ে এলাম। বাসুও আমার পেছন পেছন বেরিয়ে এল।

তুই রাখ, আমি তোকে রিংব্যাক করছি।

মেলা থেকে অনেকটা দূরে চলে এলাম, সেই স্কুল বাড়ির কাছে। একটা কলোরোল কানে ভেসে আসছে, আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ, চারিদিকে আলোর চাদর বিছিয়ে রেখেছে। কে বলে অন্ধকার। খেতের আল ধরে সোজা চলে এলাম টেস্ট রিলিফের ছোটো বাঁধে। বাসু সঙ্গে আছে।

জায়গাটা মেলা থেকে প্রায় তিনশো মিটার দূরে। এখানে মেলার আওয়াজ ম্রিয়মান। বাসুকে বললাম, দেখতো আমার ফোনে রেকর্ডিংটা কোথায় আছে। বাসু বুঝতে পারলো, কিছু একটা হয়েছে। বললো দে দেখিয়ে দিচ্ছি। আমি ভয়েস মুড আর রেকর্ডিং মুড দেখে নিলাম। দুটোই অন করে সন্দীপকে ফোন করলাম।

হ্যাঁ বল।

তুই এখন কোথায়?

আমার বাড়িতে।

মেলায় ঘুরে মজমা নিচ্ছ।

সন্দীপ ঝাঁজিয়ে উঠলো। আমি ততধিক ঠাণ্ডা গলায় বললাম।

তুই জানলি কি করে?

এখানে ব্রডকাস্ট হচ্ছে।

তাই নাকি!

তাহলে বলছি কি করে তোকে। ম্যাডাম তোর সঙ্গে আছে। তুই একটা প্লে-বয়, ওদের ফ্যামিলির দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছিস।

ওদের ফ্যামিলিতে প্রবলেম আছে, এ-খবর জানাজানি হলো কি করে?

সুনিতদা রটাচ্ছে।

বাঃ ইনফর্মারটা বেশ গুছিয়ে খবর পাঠাচ্ছে বল।

করিতকর্মা ছেলে। ওকে নাকি চিফ রিপোর্টার বানাবে সুনিতদা।

তাই!

অফিসের খবর বল?

আজ সনাতনবাবুর ঘরে তুমুল হট্টোগোল হয়েছে। সন্দীপের গলায় চাপা টেনশন।

কারা করেছে?

চম্পকদা লিড করেছে। সুনিতদা আর ওর চেলুয়াগুলো ছিল।

পুরনো কারা কারা আছে?

এখন বোঝা মুস্কিল। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো সকলে সুনিতদার শিবিরে ভিড়ে গেছে।

বেশ।

তুই গেলি ঠিক আছে, ম্যাডামকে সঙ্গে নিলি কেন।

কি হয়েছে বলবি তো?

ম্যাডামের সঙ্গে তোকে জড়িয়ে হুইসপারিং ক্যাম্প চলছে। তোকে ফোটাবার ধান্দা। তুই হচ্ছিস চম্পকদা আর সুনিতদার পথের কাঁটা।

সে তো সেইদিন থেকে, যেদিন মিত্রার ডাকা মিটিংয়ে ওদের ঝেরেছিলাম।

ম্যাডামের সঙ্গে তোর সম্পর্ক কিরে অনি?

জেনে লাভ।

বলনা। জানতে ইচ্ছে করছে। সন্দীপ অনেকটা স্বাভাবিক।

কি হবে জেনে?

আমার চাকরি যায় যায়, কালকে আমাকে শোকজের নোটিস ধরাবে শুনতে পাচ্ছি।

কেন?

এখনও জানি না। তবে পর্শুদিনের এডিটোরিয়াল পেজে একটা ভুল খবর ছাপা হয়েছিল।

ওই পেজের দায়িত্বে এখন কে আছে?

নিতাই হারামীর বাচ্চা।

ওই বয়স্ক ভদ্রলোক?

হ্যাঁ।

তোকে কেন শোকজ করবে?

নিউজটা আমি করেছিলাম।

ভুল নিউজ করলি কি করে? কপি কোথায়?

খুঁজে পাচ্ছি না। নিউজটা ভুল নয়, অনেক পুরনো।

ছাপা হলো কি করে?

সেটাই আমি বুঝতে পারছি না।

ইনফর্মার ছেলেটি কে, নাম জানতে পেরেছিস?

আমাদের পরিচিত কেউ নয়।

থাকে কোথায়?

তোদের গ্রামেই থাকে মনে হচ্ছে।

কি করে বুঝলি?

তোদের মেলা থেকে ভয়েজ অন করে কথা বলছে।

নাম বল।

তুই আমাদের প্রেসে চিফ মেসিনম্যান অতীশবাবুকে চিনিস?

সন্দীপকে সত্যি কথা বললাম না।

হয়তো চিনি এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না।

অতীশবাবু ছেলেটির পিসেমশাই।

ও।

কি বলেছে?

সব কি জানতে পারছি। তবে তোরা ওখানে আছিস।

হাত ধরাধরি করে ঘোরা ঘুরি করছি সেই নিয়ে একটা কেচ্ছা। ম্যাডামের ক্ষতি হচ্ছে এতে। তাই না?

ছারতো। ওরা বড়লোক। তোর মতো দু-চারটে ছেলেকে ওরা কেপ্ট হিসাবে রাখে। তারপর প্রয়োজন ফোরালে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। কোটি কোটি টাকার মালিক ওরা।

ঠিক বলেছিস। আমি এতটা বুঝি নি। ম্যাডাম আসতে চাইল তাই নিয়ে এলাম।

শালা।

সত্যি আমি জি এ এন ডি ইউ।

আমরটা আমাকে ঝারলি।

আমার ভীষণ ভয় করছে সন্দীপ, চাকরি গেলে খাব কি?

দূর শালা তুই ম্যাডামকে নিয়ে ঘুরছিস আবার বলছিস চাকরি গেলে খাব কি।

সত্যিরে।

দাঁড়া তুই ধরে রাখ। আমার একটা ফোন এসেছে। কিছু নতুন নিউজ পাব।

ঠিক আছে।

আমি ধরে রইলাম। বাসু আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। ও কিছুই বুঝতে পারছে না। তবে সামথিংস হ্যাপেন এটা বুঝে নিতে ওর অসুবিধে হচ্ছে না। যতই হোক ও একজন ব্যবসায়ী। থট রিডিংটা ও জানে।

হ্যাঁ। শোন।

বল।

ছেলেটার নাম দিবাকার মণ্ডল। ও অতীশবাবুর শালার ছেলে। পড়াশুনায় বেশ ভালো। রেজাল্টও ভালো। বিদ্যাসাগর ইউনিভার্সিটি থেকে বাংলায় এমএ করেছে।

তোর ইনফর্মার কে?

সুনিতদার ঘরেই কাজ করে।

ঠিক ঠিক খবর দিচ্ছে, না এডিটোরিয়াল পেজের মতো হবে?

তুই এভাবে বলিস না, তোর কথা আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করছি।

বল।

সুনিতদা ওর বায়োডাটা নিয়ে আজ সনাতনবাবুর সঙ্গে ঝামেলা করেছে। ওকে আজই এ্যাপয়েন্টমেন্ট দিতে হবে।

সনাতনবাবু কি বলছে।

ম্যাডাম এলে সব হবে, বলে এড়িয়ে গেছেন।

কাগজ বেরচ্ছে?

গত সাতদিনে এক লাখ সার্কুলেশন পরেছে।

কেন?

ডিউটাইমে বেরোয় নি। বিটে কাগজ যাচ্ছে না।

সনাতনবাবু কি করছে?

সনাতনবাবুকে মানলে তো।

ও।

আর দুজন নতুন এসেছে কিংশুক আর অরিন্দম বলে। যেহেতু ম্যাডামের এ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার ওদের কাছে আছে, তাই কেউ কিছু বলে ওঠার সাহস পাচ্ছে না। তবে ওরা এক সাইড হয়ে গেছে।

পার্টিগত দিক থেকে কোনও ফর্মেশন।

একটা হয়েছে। তবে এখনও প্রকাশ্যে নয়।

তোকে যেখানে যেতে বলেছিলাম, গেছিলি।

গেছিলাম। কিছু কাজ হয়েছে। সেই জন্য পার্টি ইনভলভ হয়নি। ফর্মেশনও হয়নি। তুই এলে তোর সঙ্গে কথা বলে ব্যাপারটা ঠিক হবে।

তুই আজকের লেটেস্ট নিউজ আমায় দে, যত রাতই হোক। তোর আজ কি ডিউটি?

নাইট।

গুড। তুই এখন কোথায়?

ময়দানে। প্রেসক্লাবের লনে।

প্রেসক্লাবে ব্যাপারটা চাউর হয়েছে নাকি?

আমাদের হাউসের ছাগলগুলো আছে না। কম পয়সায় মাল খেয়ে বাওয়াল করেছে।

ঠিক আছে। ছেলেটার নাম কি বললি, দিবাকর মন্ডল?

হ্যাঁ। তুই মালটাকে খুঁজে বার কর। শুয়োরের বাচ্চা এক নম্বরের….।

খিস্তি করিস না।

খিস্তি করছি সাধে। একটা ছেলের জন্য হাউসটার আজ সর্ব্বনাশ হতে বসেছে।

ঠিক আছে ঠিক আছে। তুই ফলো আপ কর। রাত একটার পর তোকে ফোন করবো।

আজ কাগজ ছাড়তে দেরি হবে।

ট্রেন ধরাবি কি করে?

এই কদিন ফার্স্ট ট্রেন ধরছে না।

কেন?

সুনিতকে জিজ্ঞাসা কর।

ঠিক আছে।

রেকর্ডিংটা সেভ করলাম। বাঁধের ওপর ঘাসের ওপর থপ করে বসে পড়লাম। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে। বাসুর দিকে তাকালাম।

অনাদিকে খবর দেব?

ওর দিকে হাত দেখিয়ে বললাম, না।

ও আমার পাশে বসে আমার কাঁধে হাত রাখল।

অফিসে কোনও গন্ডগোল।

মাথা নারলাম।

দিবাকরের ব্যাপারে কি বলছিল!

আমিও ঠিক বুঝতে পারছি না। আমায় একটু একা থাকতে দে। তুই চলে যা। মিত্রা খুঁজলে বলবি আমি একটু ঘুরতে গেছি। আমি এখানেই থাকব। না হলে অন্ধকারে ওই স্কুল ঘরে।

আচ্ছা।

বাসু হন হন করে চলে গেল। আমি পকেট থেকে সিগারেট বার করে ধরালাম। অনেকক্ষণ ভাবলাম। একবার উঠে গিয়ে সামনের একটা চায়ের দোকান থেকে চা খেয়ে চলে এলাম। পাশ থেকে দু-চারজন হেঁটে চলে গেল।

এটুকু আমার দৃঢ় বিশ্বাস খাতা কলমে পাওয়ার আমার হাতে। কোম্পানীর সম্বন্ধে আমারও কিছু বলার থাকতে পারে। কিন্তু চাইলেই এখুনি বলতে পারব না। সময় চাই।

মিত্রাকে জানাব কি করে?

যেটুকু সন্দীপ বললো তা যদি সত্যি হয়, তাতেই ওর লাইফটা শেষ। হিমাংশুকে একটা ফোন করবো? না থাক। আমারও পছন্দ অপছন্দ বলে কিছু থাকতে পারে। এই কদিনে যা ঘটলো তাহলে কি সব মিথ্যে!

মিঃ ব্যানার্জী, অমিতাভদার বাড়িতে আমার ঘরে দাঁড়িয়ে যা যা বলেছেন, তা অভিনয়!

হতে পারে।

সেদিন মিত্রা মিঃ ব্যানার্জীকে বাস্টার্ড বলেছে। নিশ্চই এমন কিছু আছে যাতে একথা বলতে মিত্রার মতো মেয়ে বাধ্য হয়েছে। কথায় কথায় মিত্রা বলেছিল মিঃ ব্যানার্জীর যা কিছু প্রসার তা মিত্রার জন্য।

মিত্রা আমার শরীরে শরীর মিশিয়ে মিঃ ব্যানার্জীকে বাস্টার্ড বললো। সেটাও অভিনয়!

না আমি মনে হচ্ছে মনে মনে দুর্বল হয়ে পড়ছি। এসব ফালতু চিনতা করছি। মিত্রা জোর করে আমাকে কোম্পানীর শেয়ার হোল্ডার করিয়েছে। সত্যি যদি তাই হতো তাহলে আমার পেছনে মিত্রা ১৫০ কোটি টাকা খরচ করতো না। তাও আবার সাদা কালো মিশিয়ে। আমি চেষ্টা করলেও সারা জীবনে এত টাকা ইনকাম করতে পারব না। একটা গুডনিউজ আমার মালিকানার খবর এখনও ওরা জানতে পারেনি।

আমি যদি কোনও ড্রাস্টিক স্টেপ নিই মিত্রা নিশ্চই বাধা দেবে না। তবু মন মানছে না। সন্দীপ ঠিক কথা বলেছে। ওদের পয়সা আছে। প্রোয়োজন ফোরালে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। তবু জীবনে অনেক মানুষ দেখেছি। আমার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না।

কাঁসর ঘণ্টা বেজে উঠলো। রথ বের হচ্ছে। খুব ইচ্ছে করছিল। কিন্তু ভালো লাগল না। বাজি ফাটছে। মিত্রার আনা বাজি পোড়ান হচ্ছে। আকাশে বাজির রং ছড়িয়ে পরছে।

সত্যি ছোটো সময়ে এই বাজি ফাটাবার জন্য কতো আগ্রহ ছিল। উনামাস্টার এই মেলার প্রেসিডেন্ট। কাকা সেক্রেটারি। একটা বাজি চেয়েছিলাম বলে একটা থাপ্পর জুটেছিল। তারপর থেকে আর কোনওদিন বাজি ফাটাবার নাম মুখে আনিনি। লোকে ফাটিয়েছে। আমি দেখেছি। অনাদিরা বাজি ফাটাবার কথা বললে বলেছি আমার ভয় করে।

দিবাকর মন্ডল আর আমার বন্ধু দিবাকর মন্ডল কি একব্যক্তি?

এটা আমাকে প্রথমে জানতে হবে। সন্দীপ যা বায়োডাটা দিচ্ছে তাতে দিবাকরের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। কাকে দিয়ে খবরটা নেব। তিনটে ছায়া মূর্তি আমার পাশে এসে দাঁড়াল। চমকে তাকালাম, অনাদি, বাসু, চিকনা। ওরা আমার পাশে এসে বসলো। ভাবলাম ওদের কিছু বুঝতে দেব না। ক্যাজুয়েল থাকার চেষ্টা করলাম। ওদের দেখে হাসলাম।

কিরে তোরা এই সময়? ফাংসন আরম্ভ হয়েছে?

কোনও কথার উত্তর নেই। চোখগুলো সব চিতাবাঘের মতো জ্বলছে। আমি এই চাঁদনী রাতেও ওদের পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি।

কিরে কথা বলছিস না কেন, মিত্রা কোথায়?

পায়ের তলাটা দেখেছিস। অনাদির গম্ভীর গলা।

আমি দেঁতো হাসি হেসে অনাদির দিকে তাকালাম। বিকেলের দেখা অনাদি আর এখনকার অনাদির মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য। নিচের দিকটা একবার দেখে নিয়ে অনাদির চোখে চোখ রাখলাম। গনগনে আগুনের কয়লার টুকরো।

কেন?

এইটুকু সময় কটা সিগারেট খেয়েছিস?

হ্যাঁ শেষ হয়ে গেছে। চিকনা একটা সিগারেট দিবি।

তুই এতো সিগারেট খাস না!

খাই না, আজ খেতে ভালো লাগছে।

চিকনা প্যাকেটটা এগিয়ে দিল। একটা সিগারেট বার করে নিলাম। তারপর আবার প্যাকেটটা ফেরত দিলাম।

চিকনা বললো, তোর কাছে রাখ। আমি পাশে রাখলাম।

ফোনটা বেজে উঠলো। সন্দীপ।

হ্যাঁ আমি তোকে পরে ফোন করছি। আমার কথা বলা শেষ হলো না, অনাদি ফোনটা ছোঁ মেরে আমার হাত থেকে নিয়ে নিল। কানে তুলে বললো, আপনি কে বলছেন?

এরই মধ্যে ও ভয়েসমুড অন করে দিয়েছে, রেকর্ডিং বটম টিপে দিয়েছে।

আমি অনির বন্ধু সন্দীপ বলছি।

এখুনি অনির গলা পেলাম, আপনি কে?

আমি অনাদি, অনির বন্ধু।

অনি নেই।

ধরুন।

অনাদি ইশারায় কথা বলতে বললো।

হ্যাঁ বল।

শোন পাক্কা খবর। দিবাকর মন্ডল তোর বন্ধু। তোর সঙ্গে ও এক সঙ্গে পড়েছে। এমনকী তোর ডিটেলস পর্যন্ত এখানে দিয়ে দিয়েছে। আর কি বলবো তোকে, কথাটা বলতে তোকে খুব খারাপ লাগছে। সুনিতদার মন পেতে বলেছে, তোর বাপ-মার ঠিক নেই।

এখন এখানে লাইভ রেকর্ডিং চলছে। ছেলেটি মনে হয় ম্যাডামের খুব কাছাকাছি আছে। এমন কি ম্যাডামের গলাও শুনতে পাচ্ছে এরা।

কোথায় চলছে রেকর্ডিং?

সুনিতদার ঘরে।

আর কে আছে?

যারা থাকার তারাই আছে। তুই এর একটা বিহিত কর অনি।

আমি অফিসে ঢুকছি। দেখি লাস্ট আপডেট কি হয়।

ঠিক আছে। তুই ফোন কর। আমার ফোন অন থাকবে।

লাইনটা কেটে গেল।

অনাদি আমার দিকে তাকিয়ে। চিকনা চেঁচিয়ে উঠলো, অনাদি তুই একবার পার্মিশন দে, আমি ওকে কাল সকালের মধ্যে গাইপ করে দেব।

ঘাউরামি করিস না। আমি বললাম।

বাসু চুপচাপ, শুধু বললো, ওকে হাতে মেরে কিছু হবে না, ভাতে মারতে হবে।

ঠিক বলেছিস।

ও এখন কোথায়রে চিকনা। অনাদি সিংহের মতো হুঙ্কার দিয়ে উঠলো।

উঃ তোরা থাম না। আমি বললাম।

থামার সময় এখন নেই। মালটা আমি বুঝতে পেরেছি।

কিছুই বুঝিসনি।

তুই বোঝা। চিকনা বললো।

কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকলাম। চোখ দুটো কেমন জ্বালা জ্বালা করছে। জীবনে বাবা-মাকে ঠিক মনে পড়ে না। কিন্তু জ্ঞানতঃ কোনওদিন বাবা-মাকে আমি অশ্রদ্ধা করিনি। কিন্তু আজ প্রথম বাবা-মার সম্বন্ধে কোনও খারাপ কথা শুনলাম।

বুকের ভেতরটা ভীষণ যন্ত্রনা করছে। মনে হচ্ছে দম বন্ধ হয়ে আসবে।

তিনজোড়া চোখ আমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। ওদের বুঝতে দেওয়া যাবে না। তাহলে একটা বিচ্ছিরি কান্ড ঘটে যাবে। আমি মাথা নিচু করে বসে আছি।

অনি শরীর খারাপ লাগছে। বাসু আমার পিঠে হাত দিল।

আমি বাসুর মুখের দিকে তাকালাম। হয়তো চোখটা ছল ছল করে উঠেছিল।

অনাদি আমার দিকে তাকিয়ে নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। চিকনার দিকে তাকিয়ে বললো, আজ রাতেই কাজ হাসিল কর।

কথা বলতে গিয়ে আমার গলা ধরে এসেছে। আমি অনাদির হাত চেপে ধরে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। না এরকম করিস না। প্লিজ।

তোকে যে অপমান করে, সে আমাদেরও অপমান করেছে।

ঠিক আছে। তার জন্য….।

তুই জানিস না এই গ্রামটাকে ও জ্বালিয়ে দিচ্ছে। আমাদের বন্ধু বলে ও পার পেয়ে যাচ্ছে।

দূর বোকা। হিংসার রাজনীতি করতে নেই। ঠাণ্ডা মাথায় চিনতা কর। সব ঠিক হয়ে যাবে।

অনাদি একটু ঠাণ্ডা হলো।

আমি চিকনার দিকে তাকিয়ে বললাম, একটু চা খাওয়াবি।

চিকনা ছুটে চলে গেল।

অনাদি আমার হাত চেপে ধরলো।

অনি তুই বল। তুই একা চাপ নিস না। আমি জানি তোর সমস্যা তুই একলাই সলভ করবি। আমরা যদি তোকে কিছুটা হেল্প করতে পারি।

আমি অনাদির মুখের দিকে তাকিয়ে।

ব্যাপরটা আমাদের এখানকার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। তুই এখান থেকে ১০ বছর ডিটাচ। এখানে আমূল পরিবর্তন হয়েছে। তুই দিন চারেকে তার কিছুই জানতে পারবি না। ওপর ওপর সবাই ভালো। ভেতর থেকে ছুঁরি চালাবর লোক প্রচুর। তুই অনেক কষ্ট করে এখানে এসে দাঁড়িয়েছিস। আমরা তোকে হারাতে চাই না।

মিত্রা কোথায়?

সামনের চেয়ারে বসে ফাংসন দেখছে।

ছবি তুলছে না।

সব ব্যবস্থা করে দিয়েছি। উনি আমাদের গেস্ট, তুই আমাদের ওপর বিশ্বাস রাখ, ওনার কোনও অসুবিধে হবে না।

দিবাকর কোথায়?

ওর ব্যবস্থা করছি।

এখন নয়।

ঠিক আছে তুই বল।

চিকনা চা নিয়ে চলে এলো।

আমি ওদের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত কথা বললাম। ওদের গায়ের লোম খাঁড়া হয়ে গেল।

অফিসিয়াল ব্যাপারটা এত জটিল ওরা কিছুতেই ধরতে পারছে না। আমি চিকনাকে বললাম, মেলার মজাটা আজ করতেই পারলাম না। তুই এক কাজ করবি।

বল।

এমন কোনও বিশ্বস্ত লোক আছে, যে দিবাকরকে ফলো করবে।

এই কাজ, তোকে চিনতা করতে হবে না। তোকে আধঘণ্টার মধ্যে ডিটেলস দিয়ে দিচ্ছি।

না। ওকে মনিটরিং কর। যেন কিছু বুঝতে না পারে। ফাংসন কখন শেষ হবে।

১২টা বাজবে।

মিত্রার আশে পাশে কারা আছে আমাকে একটু জানা। দিবাকরেরও কিছু লোকজন এখানে আছে। ওরা আমাকে খুঁজে বেরাচ্ছে নিশ্চই।

তোরা এখানে বোস। আমি যাচ্ছি।

খুব সাবধান।

তোকে ভাবতে হবে না।

শোন, মিত্রা যদি খোঁজ করে বলবি আমার সঙ্গে তোর দেখা হয়নি।

আচ্ছা। চিকনা চলে গেল।

অনাদি ভীষণ খিদে পেয়েছে।

কি খাবি বল।

একটু ছোলা সেদ্ধ আর মুড়ি।

পাটালি। অনাদি হেসে বললো।

এখন ভালো লাগছে না।

বুঁচিকে ফোন করে দিচ্ছি দাঁড়া।

কে বুঁচি।

তুই চিনবি না পার্টি করতে গিয়ে অনেক কিছু শিখতে হয়, সঙ্গে রাখতে হয়।

অনাদি ফোনটা হাতে নিল।

থাম দাঁড়া। তুই একটা কাজ করতে পারবি।

বল।

তুই নিজে যা। ওদের নাচ কি শুরু হয়েছে?

হ্যাঁ। প্রায় একঘণ্টা হয়ে গেছে।

তার মানে এবার শেষের পথে।

হ্যাঁ।

মিত্রা নিশ্চই মেলা ঘুরতে চাইবে। তুই নীপা ওদের বন্ধুদের সঙ্গে মিত্রাকে ভিড়িয়ে দে।

সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। বাসু বললো।

ঠিক আছে। শেষ হলে আমায় ফোন কর। আমি যাব।

বুঁচিকে দিয়ে মুড়ি চা পাঠিয়ে দিচ্ছি। বাসু তুই কিন্তু অনিকে ছেড়ে যাস না।

আচ্ছা।

বাসুর ফোনটা বেজে উঠলো।

চিকনা ফোন করেছে, তুই কথা বলবি।

দে।

হ্যালো।

বাসু।

অনি বলছি।

শোন সব ব্যবস্থা পাকা, শুয়োরের বাচ্চা ম্যাডামের সঙ্গে বসে জমিয়ে গল্প করছে।

ঠিক আছে। তুই ডিস্টার্ব করিস না। ওদের গল্প করতে দে। পারলে শোনার চেষ্টা কর। আমার ফোনে রিং কর আমি রেকর্ডিং করবো। মাথায় রাখবি এই কাজ যে করে সে খুব শেয়ানা ছেলে।

আচ্ছা।

বাসু আমার দিকে তাকাল, তোর মাথায় কতো চাপ। তুই চলিস কি করে?

চলতে হয় বাসু। না হলে চালাব কি করে।

আমার তোর মাথাটা মাঝে মাঝে দেখতে ইচ্ছে করে। আমরা হলে এতক্ষণে কোনও অঘটন ঘটিয়ে দিতাম।

এই যে তুই কিছুক্ষণ আগে বললি, হাতে নয় ভাতে মারব।

বাসু মাথা নিচু করে হাসল।

অনাদির ছেলেটা মুরি চা দিয়ে গেল। দুজনে বসে বসে খেলাম। ভেতরে ভেতরে তোলপাড় চলছে। আমাকে মিত্রাকে নিয়ে কেচ্ছা, অন্য হাউস রসালো গল্প করবে। একদিন হয়তো উপন্যাসেও স্থান পাব। ভাবতেই গা শিউরে উঠছে।

চিকনার ফোন।

বাসুকে দিলাম, ও ভয়েস মুডে দিয়ে রেকর্ডিং করছে।

….আপনার সঙ্গে অনির অনেক মিল আছে। মিত্রার গলা।

না না কি বলছেন আপনি। অনি আপনার হাউসের একজন স্টার রিপোর্টার। ওর সঙ্গে আমার তুলনা।

আচ্ছা অনির সঙ্গে আপনার পরিচয় কি ভাবে, কাগজে কাজ করতে করতে?

না, আমরা কলেজ লাইফ থেকে একে অপরের সঙ্গে পরিচিত।

বাবা তার মানে প্রয় দশ বছর।

হবে।

অনি কি আপনার কাছে থাকে না অন্য কোথাও থাকে।

আমার কাছে থাকবে কেন, ওর নিজস্ব ফ্ল্যাট আছে।

আমি শুনলাম কলকাতয় ওর কোনও থাকার জায়গা নেই বলে আপনার বাড়িতে থাকে।

আপনি ভুল শুনেছেন।

সত্যি আপনাদের নিগূঢ় বন্ধুত্ব দেখলে হিংসে হয়।

কি করে দেখলেন?

মেলায় আসার পথে আপনাদের পেছন থেকে দেখলাম।

কলেজ লাইফেও আমাদের অনেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধব আমাদের দেখে হিংসে করতো।

এখানকার সবাই কানা-ঘুসো করছে আপনার সঙ্গে ওর একটা এ্যাফেয়ার আছে।

কারা বলে?

অনির বন্ধুরা।

আপনি বলছেন। না আর কেউ বলছে?

কেন। অনাদি, বাসু, চিকনা কতজনের নাম বলবো।

হতেই পারে না। ওরা অনির খুব ভালো বন্ধু, নার্সিংহোমে ওদের সকলকে দেখেছি।

আমি স্যারের অপারেশনের দিন যেতে পারলাম না, খুব খারাপ লাগছে।

সেদিন আপনাকে দেখতে পাইনি।

আপনি নার্সিংহোমে এসেছিলেন?

আমি একা নয় অনির বড়োমা, ছোটোমা….।

বাবা ওখানে গিয়ে এতোসব পাতিয়ে ফেলেছে!

পাতাবে কেন। একজন আমার কাগজের এডিটরের স্ত্রী আর একজন আমার কাগজের চিফ এডিটরের স্ত্রী।

অনি আসে নি?

এসেছে। কোথায় ঘুরে বেরাচ্ছে। ও একটা ভবঘুরে।

পোষ মানাবার চেষ্টা করুণ।

করছি তো, পারছি কোথায়।

সত্যি ওর কোনও রেসপনসিবিলিটি নেই। আপনার মতো একজন সেলিব্রিটিকে নিয়ে এরকম ছেলেখেলা করার কোনও রাইট ওর নেই।

কোথায় ও ছেলেখেলা করলো। আমিই এখানে আসতে চেয়েছি, ও না করেছিল। তবু এলাম। সত্যি না এলে আমার অনেক কিছু অদেখা থেকে যেত।

ফোনটা কেটে গেল।

বাসু আমার দিকে তাকিয়ে হাসল।

আমার ফোনটা বেজে উঠলো, দেখলাম মিত্রার ফোন।

হ্যালো।

কিরে তুই কোথায়?

শ্মশানে।

শ্মশানে মানে!

চুপ করে থাকলাম।

আবার ওখানে গেছিস?

জায়গাটা আমায় খুব টানেরে। তুই যেন কাউকে বলিস না।

কি বলছিস তুই! এখুনি ফিরে আসবি।

কেন?

আমাকে এখানে রেখে ওখানে গিয়ে বসে থাকতে তোর লজ্জা করছে না।

কই তোকে একা রেখে এসেছি, নীপা, ওর বন্ধুরা আছে, অনাদি, বাসু, চিকনা আর কতজনকে চাই।

তোর গলাটা ভারি ভারি লাগছে কেন?

ফাঁকে মাঠে বসে আছি, একটু ঠাণ্ডা লেগেছে বোধ হয়।

তুই এখুনি আয়।

ফাংসন শেষ?

আর একটু বাকি আছে।

ঠিক আছে আমি অনাদিকে বলে দিচ্ছি। তোকে সঙ্গ দেবে।

তোর এক বন্ধুর সঙ্গে আলাপ হলো।

কার সঙ্গে?

দিবাকর।

দিবাকর মন্ডল?

হ্যাঁ।

কোথায় আলাপ হলো?

এই তো আমার পাশে বসে আছে।

তাই। দে ওকে।

দিচ্ছি।

হ্যালো। দিবাকরের গলা।

বল।

তুই এখন কোথায়?

পুরীকুন্ডী শ্মশানে।

মিথ্যে কথা বলছিস।

তুই চলে আয়।

কোথায়?

আমি যেখানকার কথা বললাম।

আমার এত শখ নেই।

তাহলে আর সত্য মিথ্যার যাচাই করে লাভ।

আমি তোর মতো পাগল নই।

তুই পাগল নয়। শেয়ানা।

কেন একথা বলছিস?

তুই সেদিন বললি, তোর কাজ আছে তাই নার্সিংহোমে আসতে পারবি না।

সত্যি তুই বিশ্বাস কর অনি, একটা কাজ পড়ে গেছিল।

ইন্টারভিউ কেমন হলো?

তোকে কে বললো!

সাংবাদিকের কাজ খবর সংগ্রহ করা। আমি নিশ্চই মিথ্যে বলিনি?

না। এটা তুই সত্যি কথা বলেছিস।

কোন কাগজে ইন্টারভিউ দিলি।

এটাও কি জেনে ফেলেছিস!

না। জানতে পারিনি। দেখ, সত্যি কথা বললাম।

মেলায় কখন আসছিস। তোর মিত্রাদেবী তোকে দেখার জন্য পাগল।

ওটা বড়লোকেদের খেয়াল।

কি বলছিস!

কেন বিশ্বাস হচ্ছে না?

একেবারে না।

তুই পাশে বসে আছিস, জিজ্ঞাসা কর।

এতটা ধৃষ্টতা দেখাতে পারব না।

আমাদের কাগজে কার কাছে ইন্টারভিউ দিয়ে এলি।

কি পাগলের মতো বকছিস!

আরে আমি বদ্ধ পাগল।

সেটাই মনে হচ্ছে।

কেন এটাও কি মিথ্যে বললাম?

পুরোটা।

মিত্রাকে ধর একটা হিল্লে হয়ে যাবে।

বলেছি।

বাঃ এই তো করিতকর্মা ছেলে। মেলায় থাক। আমি আসছি।

কতক্ষণের মধ্যে আসবি?

এখান থেকে যেতে ঘণ্টা খানেক লাগবে।

নারে আমি তারাতারি ফিরে যাব। কাল সকালে একবার কলকাতা যেতে হবে।

হাসতে হাসতে বললাম, জয়েনিং।

বোকা বোকা কথা বলিস না।

ফোনটা কেটে দিলাম। বাসু আমার দিকে তাকিয়ে আছে। রেকর্ডিংটা সেভ করেই অনাদিকে ফোন করলাম।

(আবার আগামীকাল)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev