জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
সপ্তম কিস্তি
আজকের আসরটা তারাতারি ভেঙে দিলাম। সঞ্জীবের ছেলেটি সব গুছিয়ে তুলে রাখল। বললাম কাল আসিস একটু সন্ধ্যে বেলায়, লাগিয়ে দিস।
কাকা বললো, না ঘরেরে ভেতর জায়গা করেছে তোর কাকিমা, এখুনি লাগিয়ে দিক।
আমি ওকে ইশারায় তাই করতে বললাম, ও সবকিছু ঠিকঠাক করে চলে গেল।
রাতে খাওয়ার সময় কাকাকে সব বললাম।
কাকা বললেন, দু-দিন পরে করলে হতো না।
আমি বললাম, না। আমি সব ব্যবস্থা করে ফেলেছি।
কাকিমা বললেন হ্যাঁরে অনি, তুই সবার জন্য অতো জামাকাপড় কিনেছিস কেন?
আমি কাকিমার দিকে তাকালাম। পছন্দ হয়নি?
হ্যাঁ।
তাহলে!
অতো দাম দিয়ে কিনতে গেলি কেন?
জীবনে এই প্রথম তোমাদের কিছু দিলাম। দামের কথা জানি না।
নীপা আমার দিকে তাকাল।
কালকে একটা পরে যেও।
কেন!
আমার ভালো লাগবে।
ঠিক আছে।
নীপা বলে দেবে কোনটা পরে যাবে।
কাকিমা কোনও কথা বললো না।
সবাই চুপচাপ।
কাকিমা সকালের সেই চিংড়িমাছের টক একটু পাওয়া যাবে?
কাকিমা আমার দিকে তাকাল।
নীপার জালায় কিছু রাখার জো আছে।
নীপা গম্ভীর হয়ে গেল।
আমি হাসলাম।
তারাতারি খেয়ে উঠে পরলাম। ওঠার আগে বললাম, কালকে অনেক সকালে উঠতে হবে ওখানে সাতটার মধ্যে পৌঁছনোর কথা।
কাকা বললেন, বাড়িতে কে থাকবে?
তোমাকে এই ব্যাপার নিয়ে ব্যস্ত হতে হবে না। আমি সব ব্যবস্থা করে দিয়েছি।
বেশ। তাই হবে।
আমি মুখ ধুয়ে চলে এলাম। নীপা প্রায় একঘণ্টা পরে এলো।
আজ ওর পরনে সালোয়ার কামিজ। যেটা পরে খেতে বসেছিল সেটাই পরা রয়েছে। একটু অবাক হলাম। আমি আজ নীপার কথা মতো খাটের এক কোনে রাখা একটা পাটভাঙা ধুতি আর গেঞ্জি পরেছি। জানিনা এটা কার। তবে কাকার নয় এটা বুঝলাম।
আমি পাশ ফিরে শুয়ে পরলাম। নীপা কোনও কথা বললো না। বুঝলাম নিঃশব্দে ও কিছু কাজ করছে। বাইরে বেরিয়ে গেল। নিচের দরজায় ছিটকিনি দেওয়ার শব্দ পেলাম। সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসারও শব্দ পেলাম। বাইরের বারান্দায় বিছনা করার শব্দ পেলাম। আমি শুয়ে আছি।
কি বাবু ঘুমিয়ে পরলেন নাকি?
আমি কোনও কথা বললাম না। মাথাটা আজও যন্ত্রনা করছে। নীপাকে বলা যাবে না। আমিও একটা মানুষ। তনুর সঙ্গে একবার ভুল করে ফেলেছি। আর নয়।
কেন বার বার আমার সঙ্গেই এরকম ঘটনা ঘটবে। আমি কখনই মন থেকে চাই না।
জীবনের শুরু সৌমি, পুনিকে দিয়ে। তাদেরও আমি চাইনি।
দূর যত সব বাজে চিনতা। নিজে নিজেই বললাম, অনি তুই ঘুমিয়ে পর। সারাদিন বেশ ধকল গেছে। নীপার কোনও সাড়াশব্দ নেই। লাইটটা নিভে গেল। ঘরটা আধো অন্ধকার। কারেন্ট চলে গেল নাকি? বুঝতে পারলাম না। সাত পাঁচ ভবতে ভাবতে পাশ ফিরলাম।
ডিমলাইটটা মিটি মিটি জ্বলছে। নীপা মিটসেফের কাছে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে। একটা নাইটি পরেছে, অপূর্ব দেখতে লাগছে। মিত্রাকে এই ধরনের একটা নাইটি পরতে দেখেছি। কিন্তু মিত্রা, নীপা দুজনে এক নয়।
নীপাকে এই মুহূর্তে রাত পরির মতো লাগছে। এই আবঝা অন্ধকারেও বেশ পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি নীপার কপালে চাঁদের মতো বিন্দির টিপ। গাঢ় মেরুণ কালারের। ঠোঁটে লিপস্টিকের প্রলেপ। তাও আবার হাইলাইট করা। চোখের পাতায় রং। চোখগুলো স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ বড়ো লাগছে।
নীপা সাজেনি তবু যেন সেজেছে। পরনের নাইটিটা ওকে এই মুহূর্তে স্বপ্নিল করে তুলেছে। এলো চুলের রাশি পিঠময় ছড়িয়ে পরেছে। দুটো ফিতের ওপর নাইটিটা ওর কাঁধ থেকে ঝুলে পরেছে। বুকটা প্রায় অনাবৃত। আমার চোখের পলক পরছে না। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না। নীপা এই কানা রাতে সাজতে গেল কেন! তাও আমার ঘরে দাঁড়িয়ে। তাহলে কি আজকে…. জোড় করে!
মেয়েদের মন বোঝা সত্যি মুস্কিল। লাইটটা হঠাৎ জ্বলে উঠলো।
বুঝলাম সত্যি কারেন্ট গেছিল। একটু আগে ডিম লাইটের আধা অন্ধকারে নীপার রূপ দেখেছি, এখন পূর্ণ আলোয়, নীপার রূপ যেন ঠিকরে বেরুচ্ছে।
আমি খাটের ওপর বসে, আবাক হয়ে তাকিয়ে আছি।
কিছু বলছো না যে।
চুপ করে রইলাম। আমার চোখের ভাষা নীপা বোঝার চেষ্টা করছে।
ভাবছো নীপাটা কি পাগলি। এই কানা রাতে….ধ্যুস।
আমি নির্বাক।
তুমি নাকি লেখক—মানুষের মন নিয়ে কারবার করো।
মনে পড়ে গেল আমার এক সিনিয়ার লেখকের কথা, কাঁচা কাঁচা গালাগাল দিয়ে আমাকে বলেছিলেন, কটা মেয়ের সঙ্গে রাত কাটিয়েছিস। কটা মেয়ের সঙ্গে সঙ্গম করেছিস। নিত্য নতুন মেয়ের সঙ্গে সঙ্গ কর। তাদের সঙ্গে মেলা মেশা কর। ওদের মনের গভীরে ডুব দে। পারলে সঙ্গম কর।
মেয়েরা যতক্ষণ তোর উরুর তলায় ততক্ষণ তোর। যেই তোর উরুর থেকে উঠবে তোর নয়। ওরে ওরা মায়াবিনী, সমুদ্রের মতো তল খুঁজে পাবি না। তখন দেখবি লেখা আপনা থেকেই তোর হাত থেকে বেরুচ্ছে। তুই লিখছিস না। লেখা নিজে থেকেই লিখছে।
চুপ করে রইলে?
না নীপা আমি লেখক নই, সাংবাদিক।
ওই হলো। লিখতে গেলেও ফিলিংস লাগে।
অস্বীকার করছি না।
এই নাইটিটা আজ তোমার পয়সায় কিনে এনেছি।
ওর দিকে তাকিয়ে আছি।
অনেক দিনের শখ ছিল। তোমার পছন্দ?
আস্তে আস্তে ঘার দোলালাম।
হটাত নীপার মাথায় এরকম ভূত চাপল কেন! তাহলে কি কালকের ব্যাপারটা ও ঠিক মেনে নিতে পারে নি? আমার সামনে প্রলোভনের হাতছানি?
আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি।
ও আস্তে আস্তে মিটসেফের কাছে গিয়ে ঘুরে দাঁড়াল।
মিট সেফে হেলান দিয়ে কোমর ভেঙে দাঁড়াল। আমার দিকে তাকাল।
নীপা চোখ দিয়ে হাসছে। অনিদা আজ আমার জন্ম দিন। আজ আমি সাবালক হলাম।
এতদিন আমার কেউ জন্মদিন পালন করে নি। বলতে পার সে সুযোগ বা সামর্থ আমাদের ছিল না। কাল তোমার কথা শোনার পর লোভ সামলাতে পারলাম না। আমি নিজে হাতে এগুলো কিনে এনেছি। প্রাণভরে সাজলাম। দিনের বেলা সাজতে পারি না। লোকে বলবে যাত্রাপার্টির মেয়ে। তাই রাতে সেজে তোমাকে দেখালাম।
ধরা গলায় বললো, মা জানে না। নীপা মুখ নিচু করল।
অনিদা তুমি রাগ করনি? নীপার চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল পড়ছে।
আমি শুধু বিস্মিত নই, কয়েক সেকেন্ড স্থানুর মতো বসে রইলাম।
দাঁড়াও। কথাটা বলতে গিয়ে আমার গলাটা কেমন বুঁজে এলো।
আমি মিটসেফের কাছে এগিয়ে গেলাম। প্যান্টের পকেট থেকে সিম কার্ডটা বার করলাম। আমার মোবাইলটা খুলে ফেললাম। নতুন সিম কার্ডটা ভরে অন করতেই সুন্দর একটা গান বেজে উঠলো। ম্যাসেজ ঢুকলো তার মানে নীপার সিমটা এ্যাকটিভেট হয়ে গেছে। নীপা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার কীর্তিকলাপ দেখল। আমি ধীর পায়ে ওর দিকে এগিয়ে গেলাম।
নীপার চোখ জলে টল টল করছে।
আমি ওর দু-কাঁধে হাত রাখলাম। নীপাকে এই পোষাকে দেখেও আমার মধ্যে কোনও অনুভূতি আসছে না। আমি ওর চোখে চোখ রাখলাম।
এই নাও। ওর হাতে মোবাইলটা দিলাম।
হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ।
আমি নীপার কাপালে ঠোঁট ছোঁয়ালাম।
নীপা আমাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদে উঠলো। আমি ওর মাথায় হাত রাখলাম।
কাঁদে না। আজ আনন্দের দিন। আমি তোমার বার্থডে সেলিব্রেট করছি। নাও ধরো।
যাঃ। নীপা কাঁদতে কাঁদতে হাসছে। সত্যি!
হ্যাঁ।
তোমার মোবাইল, আমি নেব কেন?
এটা আমার নয়। আজ থেকে তোমার।
সত্যি বলছো!
হ্যাঁ।
ওকে সমস্ত ঘটনাটা বললাম, ওর চোখের পাতা আরও ভাড়ি হয়ে এলো।
তুমি আমাদের জন্য এতো ভাবো।
এতদিন ভাবিনি। এখন ভাবছি।
নীপা আমাকে জড়িয়ে ধরলো, জান অনিদা তুমি আমাদের কাছে দেবদূত।
কেন!
মশাই কোনওদিন ভাবতে পারেনি চোখে আবার দেখতে পাবে।
আমি নীপার বাঁধনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে গেছি।
আমাদের অতো পয়সা কোথায় বলো।
নীপা কাঁদছে।
প্রায়ই বলতো ঊষা আমি জীবনে অনেক ভুল করেছি। তার মধ্যে বড়ো ভুল অনিকে আমি ঠিকমতো যত্ন করতে পারিনি। যা করেছ তুমি। যে টানটার জন্য ও আমাদের কাছে ফিরে আসার কথা, সেই টানটাই ওর মধ্যে জন্ম দিতে পারিনি।
আমি অনেক ভুল করেছি নীপা, বিশ্বাস করো। এই ভুলের কোনও ক্ষমা নেই। আমাকে আমার এই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।
নীপা আমার বুকে মাথা রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
অনেকক্ষণ পর কান্না থামিয়ে, কান্নাহাসি মাখা সুরে বললো।
আজ তুমি সকালে কি করেছো?
কখন!
সকাল বেলা?
কিছুতেই মনে করতে পারলাম না। বিস্ময় চোখে বললাম,—কিছু না।
দুপুরে এক দঙ্গল বাচ্চা এসেছিল তোমায় খুঁজতে। ওরা সব হাঁড়িপাড়া, কামারপাড়া, ভাটপাড়ার ছেলে।
কেন!
তোমায় আঁখ খাওয়াতে এসেছিল।
হেসে ফেললাম, সকালের কথাটা মনে পড়ে গেল।
বুড়ো বয়সে যদি হাত-পা ভাঙতে কে দেখত?
তুমি।
নীপা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
ফোনটায় একটা মিষ্টিসুর বেজে উঠলো।
আবার ম্যাসেজ এলো দেখো। নীপা মোবাইলটা আমার সামনে তুলে ধরলো।
ভালোই তো তুমি এখন মোবাইল উয়মেন।
আমাকে একটু শিখিয়ে দেবে না?
দেব।
টিভির ব্যাপারটা?
কি!
টিভিটা, নেকু।
ওই তো ঠিক আছে। এক ঢিলে সব পাখি মারলাম।
জানো অনিদা, সঞ্জীবদাকে মশাই আজ থেকে একবছর আগে টিভির কথা বলেছিল। মশাই বলেছিল, আস্তে আস্তে পয়সা দিয়ে দেবে। তারপর থেকে সঞ্জীবদা এই বাড়ির চৌকাঠ পর্যন্ত মারায় নি।
জানি।
তুমি সব জান!
হ্যাঁ, জানতে হয়েছে।
আজ টিভি দেখে মশাই কেঁদে ফেললো। আমার খুব খারাপ লাগছিল। আবার ভীষণ আনন্দ লাগছিল।
কেন?
এপাড়ায় সকলের মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছি।
কি রকম?
আমাদের টিভিটা সবচেয়ে দামী এবং বড়ো।
আমি ওকে এই টিভিটাই দিতে বলেছিলাম।
কত দাম নিল?
তুমি জেনে কি করবে।
বলোনা।
না।
মা সকাল বেলা কাপরগুলো দেখে কেঁদে ফোললো। মনিমা বললো কাঁদছিস কেন। অন্য কেউ দেয়নি, অনি দিয়েছে। ও তো আমাদের ছেলে, পেটে ধরিনি এই যা।
ঠিক বলেছেন কাকিমা।
নীপা আমার দিকে ডাগর চোখে তাকিয়ে।
কাকিমা আমার মার থেকেও বড়। মা জন্ম দিয়েছিলেন। মনাকাকা-কাকিমা আমায় জীবন দিয়েছেন। আমিতাভদা-বড়োমা আমায় কর্ম দিয়েছেন।
অনিদা তোমায় একটা জিনিস দেখাব। দেখবে।
মাথা দোলালাম।
আমি ওর দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছি। নীপার কোনও বিকার নেই। ও একটা প্যাকেট থেকে একটা প্যান্টি আর ব্রেসিয়ার বার করলো। আমি ওর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। ব্রসিয়ারটার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। প্লাসটিকের ফিতে।
এটা কি প্লাসটিকের?
সত্যি অনিদা তুমি কি বলোতো—
হাসলাম।
এগুলোকে ট্রান্সপারেন্ট ব্রা বলে।
আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালাম।
জানো অনিদা আমার কোনও ভালো ব্রেসিয়ার নেই। এতদিন ইজের পরতাম। কোথাও প্রোগ্রাম থাকলে, শেলির কাছ থেকে প্যান্টি চেয়ে পরতাম। আজ তোমার পয়সায় তিনটে প্যান্টি কিনেছি। তিনটে দামী ব্রেসিয়ার কিনেছি। নীপা অত্যন্ত সহজভাবে কথা বলে যাচ্ছে।
আমি নীপাকে দেখছি। ওর না পাওয়ার বেদনাগুলো একদিন আমারও ছিল, আমি সেই বেদনা আমার বুকের মধ্যে গলা টিপে মেরে ফেলেছি। কাকার কাছে হাত পেতে কোনও জিনিস চাইতে পারিনি। যদিও আমার অভাব ছিল না। তবু কোথায় যেন আমি বড়ো একা ছিলাম। নীপার তবু বলার মতো একটা অনিদা আছে।
তোমায় অনেক বিরক্ত করলাম। নাও শুয়ে পরো, কাল সকালে আবার উঠতে হবে। গুডনাইট। নীপা দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে ভেতর বারান্দায় চলেগেল।
আমি স্থানুর মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম তারপর বিছানায় বোবার মতো অনেকক্ষণ শুয়ে থাকলাম।
বার বার নীপার মুখটা ভসে আসছে। ও সেজেছে। আমাকে ওর মনের না পাওয়া বেদনার কথা বলেছে। এর মধ্যে দিয়ে ও কি বার্তা পৌঁছে দিতে চায় আমাকে? নানা চিনতা মাথার মধ্যে কিলবিল করছে। কখন ঘুমিয়ে পরেছি জানি না।
সকালে সবাই ঠিক ঠাক সময়ে এসেছে। শুধু দিবাকর আসেনি। আমরা সকলে বারান্দায় বসে চা খাচ্ছি। নীপা চা দিয়ে গেছে।
চিকনা বললো, অনাদি, দিবাকর কোথায়?
আমি কি জানি, কালকে সকলের সামনে কথা হলো।
হারামী।
আমি চিকনার দিকে তাকলাম। কালকে ও আমাকে বলেগেছে, আসতে পারবে না।
সরি, তুই বল অনি, আজকে ওর গাদন দেবার দরকার পরলো। অনাদি বললো।
ওকি তোর কথা বুঝতে পারবে—সঞ্জীব বললো।
ঠিক বলেছিস। ভানুর দিকে তাকিয়ে অনাদি বললো, গোরা এসেছে।
কাল রাত থেকে এখানে এসে বসে আছে।
আরও কয়েকট নতুন ছেলে এসেছে। আমি চিনতে পারলাম না, চিকনাকে বললাম, ওরা কারা।
অনাদির কালেকশন।
আমি কথা বারালাম না। অনাদিকে বললাম, বাড়িতে কারা থাকবে।
তোকে চিনতা করতে হবে না।
ঠিক আছে।
গাড়িটা মোরাম রাস্তায় আছে। অনাদি বললো তিনটে বাইকে করে কাকিমা, সুরমাসি, কাকাকে পাঠিয়ে দিই, তারপর আমরা যাব।
তাই কর।
কয়েকজন হেঁটে চলে গেল। আমি অনাদি, চিকনা, সঞ্জীব, বাসু বেঞ্চে বসে আছি। ওরা সবাইকে একে একে নিয়ে গেল। নীপাকে বললাম, মোবাইলটা একটু দাও। নীপা মোবাইলটা দিয়ে গেল।
চিকনা বললো, কিরে তুই রেডি হলি না?
নীপা বললো, এখুনি হয়ে যাবে।
নীপা ভেতরে চলে গেল, আমি সঞ্জীবের দিকে তাকিয়ে বললাম—
সিমটা খুলে এই সিমটা লাগা।
এ্যাকটিভেট হয়ে গেছে?
হ্যাঁ।
দেখছিস, এই হচ্ছে সঞ্জীব।
চিকনা খিস্তি দিল।
বুঝলি অনি এদের কাছে ভালো কাজ করে ভালো কথা শুনবি না, শুধু খিস্তি। সঞ্জীব বললো।
আমি হাসলাম।
হায় হায় কত মিসকল।
কার।
তোর।
দেখি দে।
দেখলাম অনেক মিশকল। তার মধ্যে বড়োমা, মিত্রারও আছে। বুঝলাম ওরা বেরিয়ে পড়েছে।
তোদের বাইকগুলো কে চালাবে?
কেন!
ভাবছিলাম ওই ছেলেগুলো যদি বাইক নিয়ে যেত তাহলে আমরা একটা গাড়িতে সবাই যেতাম।
বাসু আমার মনের কথা বুঝতে পারল। ও অনাদিকে বললো বাইকে করে ওদের চলে যেতে বল। ভানুকে কাকার গাড়িতে বসতে বল। নীপা কি ওই গাড়িতে যাবে?
না। আমাদের সঙ্গে যাবে। আমি বললাম।
ঠিক আছে। চিকনা তোর বাইকটা?
পাকাটাকে দিস না, বিশুকে দে।
বাসু বললো, ঠিক আছে।
অনাদি, বাসুর কথা মতো সব ব্যবস্থা করলো। নীপা আজ নতুন শালোয়ার পরেছে। বেশ সুন্দর দেখতে। চিকনের কাজ করা। বাসু যে এত সুন্দর শালোয়ার রাখতে পারে আমার জানা ছিল না। নীপাকে মানিয়েছেও বেশ। বাসন্তী কালারের ওপর বেদনা রংয়ের শুতো দিয়ে কাজ করা।
বহুত মাঞ্জা দিয়েছিস। চিকনা বললো।
নীপা চিকনার দিকে একবার তাকাল।
না দিদিভাই, অন্যায় হয়েছে, আর হবে না।
হ্যাঁরে সঞ্জু, চিকনাটা সবার পেছনে লাগে? আমি বললাম।
হারামী।
তোর বাপ ঘরামী।
তোরা কি এখনও সেই ফাইভের ছেলের মতো….।
কী করি বল অনি, সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি আর এই টুকু….।
নীপার দরজায় তালা দেওয়া শেষ হলো। চিকনার দিকে তাকিয়ে বললো, আমি রেডি। অনাদি বললো চল। আমি অনাদির দিকে তাকিয়ে বললাম, তোর লোক কোথায়?
তোকে বলেছি না, ঠিক সময় চলে আসবে।
আমরা পায়ে পায়ে মোরাম রাস্তার কাছে চলে এলাম। অনাদি একটু আগে আগে হাঁটছে, আমার পাশে নীপা, বাসু। পেছনে চিকনা, সঞ্জীব।
চিকনা, সঞ্জীব খুনসুটি করেই চলেছে। বাসু আমার দিকে তাকিয়ে বললো, হরিহর আত্মা একদিন দেখা না হলে দু-জনে পাগল হয়ে যাবে। ওরা আমাদের অক্সিজেন।
হাসলাম।
গাড়ির ওখান থেকে একটু হই হই আওয়াজ পাচ্ছি। বাসু বললো স্যারের গলা। খেপেছে। পা চালিয়ে তারাতারি গাড়ির কাছে এলাম।
ওই তো অনি এসেছে। অনাদি বললো।
এসেছে। কাকা আমার আসায় আশ্বস্ত হলো।
কি হলো?
স্যার তখন থেকে শুধু অনি অনি করছে।
আমি কাকাকে বললাম, কি হয়েছে?
কিছু হয়নি। তুই আসলি না, এরা কি এসব পারবে?
খুব পারবে। ওরাও তোমার ছাত্র। আমারই মতো।
ফ্যাল ফ্যাল করে কাকা আমার দিকে তাকাল।
ঠিক আছে, তোমাকে ব্যস্ত হতে হবে না। আমি নীপাকে নিয়ে পেছনের গাড়িতে বসছি, ভানু, পাঁচু তোমার গাড়িতে বসছে।
ঠিক আছে।
গাড়ি ছারলো। আমি নীপা পেছনে, মাঝে বাসু, সঞ্জীব, অনাদি। সামনে চিকনা, পচা।
ক্যালভার্ট পেরিয়ে লাল মোরাম ফেলা রাস্তা দিয়ে তীর বেগে গাড়ি ছুটে চলেছে।
সামনের গাড়ির চাকার ঘর্ষণে চারিদিকে লাল ধুলো।
দুপাশে সবুজ মাঠ। এলোমেলো অনেক চিনতা মাথার মধ্যে কিলবিল করছে। আমি জানলার দিকে মুখ ফিরিয়ে সবুজ মাঠের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
কিরে অনি তোর কি টেনশন হচ্ছে? অনাদি বললো।
কেন!
চুপচাপ।
এমনি।
নীপা ফিক করে হাসল।
কিরে নীপা হাসলি কেন? চিকনা বললো।
বীরপুরুষ।
কে?
কে আবার।
কেন কি হয়েছে?
আমি নীপার দিকে তাকালাম। চোখ পাকাচ্ছে। মুচকি মুচকি হাসছে। কাল সারারাত বারান্দায় পায়চারি করেছে। আর সিগারেট খেয়েছে।
টেনশন একটু থাকবেই। অনাদি বললো।
ফোনটা বেজে উঠলো। দেখলাম অমিতাভদার ফোন। কানে দিলাম।
হ্যাঁ হ্যাঁ আমি অনি বলছি, কোথায় তোমরা?
পৌঁছেগেছি।
তার মানে!
গাঢ়ল কোথাকার, একটা কাণ্ডজ্ঞান নেই। কটা বাজে দেখেছিস ঘড়িতে।
ঘড়ি নেই।
সেই জন্য। ধর কথা বল।
বড়োমার গলা পেলাম।
কিরে কোথায় তুই?
কাল সারারাত ঘুমোও নি!
খুব ভালো ঘুমিয়েছি।
তাহলে এত সকালে পৌঁছলে কি করে?
অনাদি, বাসু, নীপা আমার দিকে তাকিয়ে।
আমরা কাল রাতে এসেছি।
তার মানে!
তুই আয় সব বলবো।
ঠিক আছে।
ফোনটা পকেটে রাখলাম।
আচ্ছা পাগলদের নিয়ে পড়েছি।
কি হলো?
দাদারা কাল রাত থেকে এসে আছে, বোঝ।
অনাদি আমার দিকে তাকাল।
কাল রাতে! থাকল কোথায়?
থাকার জায়গার অভাব।
অনাদি স্বগতোক্তির সুরে বললো, ঠিক বলেছিস।
আমি মানিপার্স থেক অনাদির হাতে চারটে পাঁচশো টাকার নোট দিয়ে বললাম।
এটা রাখ। প্রয়োজনে চেয়ে নিবি।
পৌনে সাতটা নাগাদ পৌঁছলাম। চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম কেউ কোথাও নেই। দাদারা তারমানে আসেনি? বড়োমা কি করে বললো চলে এসেছে?
অনাদির সাগরেদরা আমাদের বেশ কিছুক্ষণ আগেই পৌঁছে গেছে। অনাদি নেমে আগে চলে গেল। রিসেপসনিস্ট কাউন্টারে গিয়ে বলতেই, ভদ্রমহিলা কাউন্টার ছেরে ছুটে ভেতরে চলে গেলেন।
নার্সিংহোমের ক্যামপাশটা বেশ বড়ো। কালকে তাড়াহুড়োর চোটে কিছু দেখা হয়নি। পেছনের দিকে স্টাফ কোয়ার্টার আছে। এই রকম অজ জায়গায় সাজান গোছান একটা আধুনিক নার্সিংহোম থাকতে পারে আগে কখনও ভাবিনি। তবে এই যা হাইরোডের একেবারে গায়ে।
কমিউনিকেশন খুব সুন্দর। অনাদি কাল যেতে যেতে বলেছিল, এই নার্সিংহোমটা এখন এই এলাকার হাসপাতাল। নীপা আর চিকনা কাকাকে ধরে ধরে ভেতরে আনল। সোফায় বসাল।
অনাদি বললো ভদ্রমহিলা গেলেন কোথায় বলতো?
কিছুক্ষণ পরে দেখলাম, ভদ্রমহিলা একজন স্যুট টাই পরা ভদ্রলোকের সঙ্গে বেরিয়ে এলেন। ভদ্রলোক এসে আমার নাম ধরে খোঁজ করলেন। আমি এগিয়ে গেলাম। আমার হাত ধরে বেশ কিছুক্ষণ ঝাঁকিয়ে ইংরেজিতে আমাকে জানালেন, উনি এখানকার সিইও, নাম মিঃ মুরলী শ্রীধরণ।
আমি আমার নাম আবার বললাম, বুঝলাম উনি সাউথ ইন্ডিয়ান। বাংলার ব-ও জানেন না। কিন্তু কালকে এই ভদ্রলোক ছিলেন কোথায়?
উনি আমাকে জানালেন, উনি আমাকে বিলক্ষণ চেনেন, তবে নামে, আমার লেখার উনি ভীষণ ভক্ত।
কিছু বললাম না, আমি লিখি বাংলায়, ও বেটা পড়ে কি করে? সন্দেহ ঠেকলো, মুখে তার কোনও বহিঃপ্রকাশ করলাম না। হেঁসে হেঁসে আমিও তার প্রতি উত্তর দিলাম ইংরেজিতে।
আমার সঙ্গে কুশল বিনিময়ের পর, কিছুক্ষণ ওনার সঙ্গে কাকার ব্যাপার নিয়ে কথা বললাম। কাকার ব্যাপারটা উনি পঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে আমার কাছে জানলেন। মনে হলো ওনাকে ঠিক সেটিসফায়েড করতে পারলাম না। বললাম আপনি কাকার সঙ্গে কথা বলতে পারেন।
উনি মাথা দুলিয়ে বললেন, ওটাই ঠিক, যা কথা হচ্ছে সব ইংরেজিতে, নীপা আর বাসু আমার দুপাশে, তার পাশে অনাদি আর চিকনা। ওরা আমার দিকে বিষ্ফারিত চোখে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে।
কাকার সামনে গিয়ে কাকাকে দেখলেন, ইংরেজিতে দু-চারটে কথা জিজ্ঞাসা করলেন, আমি দোভাষীর কাজ করলাম। তারপর রিসেপসন কাউন্টারে গিয়ে রিসেপসনিস্ট ভদ্রমহিলাকে কি যেন বললেন, উনি একটা হুইল চেয়ার নিয়ে এলেন। কাকাকে চেয়ারে বসিয়ে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ওনার কেবিন নম্বর এস-৬।
অনাদিকে বললাম, এরা টাকার কথা কিছু বলছে না। কালকে বলেছিল, ব্যালেন্স টাকাটা ভর্তি হওয়ার আগে দিয়ে দিতে হবে। ব্যাপারটা ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না।
অনাদি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
কি হলো!
দাঁড়া হজম করতে বেশ কষ্ট হচ্ছে।
কেন!
তুই শালা পেঁয়াজ।
কি করে বুঝলি?
খোসা ছাড়িয়ে যেতে হবে, আসল মালটা অনেক ভেতরে।
নীপা হাঁ করে তাকিয়ে আছে। আমার একটা হাত চেপে ধরে আছে।
ছার ওসব কথা। কলকে এই ভদ্রলোক ছিলেন কোথায়?
আমিও বুঝতে পারছি না।
মনে হচ্ছে এর মধ্যে কোনও একটা খেলা চালু হয়েছে।
বাসু আমার দিকে তাকাল।
তুই আমাদের থেকে ভালো বুঝতে পারবি।
চিকনার দিকে তাকিয়ে বললাম, ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে আছিস কেন, ছেলেগুলো এসেছে অদ্দূর থেকে, ওদের কিছু খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা কর।
ওই দায়িত্বে পচা আছে, তোকে ভাবতে হবে না। আমি তোর কাছছাড়া হচ্ছি না।
সঞ্জীব কোথায়?
বাইরে আছে।
চল একবার গিয়ে কেবিনটা দেখে আসি।
রিসেপসনিস্ট কাউন্টারের ভদ্রমহিলাকে গিয়ে বললাম, উনি বললেন একটু দাঁড়ান আমরা কিছু পরীক্ষা করে নিই, তারপর।
অগত্যা কাকিমা, সুরমাসির পাশে এসে সোফায় বসলাম। কাকিমার চোখ দুটো ছল ছল করছে। আমার হত দুটো ধরে বললো, অনি।
আমি বললাম কাঁদছ কেন, দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। নীপা আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছ। কিছুক্ষণ পর সেই ভদ্রমহিলা এসে বললেন, এবার যেতে পারেন।
পায়ে পায়ে ভেতরে এলাম। করিডোরের সামনের ঘরটাই এস-৬ কেবিন। কালকে কেবিনের পয়সা আমার কাছ থেকে নেয়নি। যাক এখন এই নিয়ে ভাবতে চাইলাম না। কাকা বিছানার ওপর চোখ বন্ধ করে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে। কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত তোলা।
কাকিমা কাকার পাশে গিয়ে বসলো।
কাকা বললো, আমার চোখে ওষুধ দিয়ে গেল, বড়ো বড়ো মাইক্রস্কোপ দিয়ে কি সব পরীক্ষা করলো, ইঞ্জেকসন দিয়ে গেল, বললো সাড়ে নটায় অপারেশন। কাকিমা আমার হাত দুটো মুঠো করে ধরলো, ও অনি….কাকিমার চোখে জল।
কাঁদছ কেন। দেখবে কাকা এবার চশমা ছাড়াই দেখতে পাবে। এখানে কাঁদতে নেই।
অনাদি বললো, অনেক দিন আগে এই রুমটায় ঢুকেছিলাম, হরেকৃষ্ণদাকে দেখতে, এটা ভিআইপিদের রুম।
আমি ঘরের চারিদিকে একবার চোখ বোলালাম, ঘরের ডেকরেশন তাই বলে। কিন্তু অমিতাভদারা গেল কোথায়! বললো কাল রাত থেকে এসে বসে আছে। ঘরটা এসি। বেশ ঠাণ্ডা লাগছে। কাকা কেমন গুটি-সুটি মেরে আছে। রুমসার্ভিস বেলটা বাজালাম, সঙ্গে সঙ্গে একজন নার্স এসে হাজির।
ইংরাজীতেই তাকে বললাম, এসিটা একটু বন্ধ করে দিতে।
মেয়েটি বললো, কমিয়ে দিচ্ছি স্যার, বন্ধ করা যাবে না।
ঠিক আছে। মেয়েটি এসির টেম্পারেচার বারিয়ে দিয়ে চলে গেল।
পাঁচু ছুটতে ছুটতে ঘরে এলো।
অনি অনি শিগগির চল।
কেন!
পঙ্খীরাজ গাড়ি করে কারা যেন এসেছে। তোকে খোঁজা খুঁজি করছে।
বুঝলাম সাহেবরা এসেছে। কাল চলে এসেছে বললো! তাহলে এত দেরি!
নীপা আমার হাতটা শক্ত করে ধরেছে। চিকনাকে দেখতে পেলাম না।
অনাদি, বাসু সঙ্গে আছে।
কাকাকে বললাম, আমি একটু বাইরে থেকে আসছি।
কাকা বললেন, যাও।
আমি ঘরের বাইরে এলাম, দেখলাম শ্রীধরণ ওদের সঙ্গে করে নিয়ে আসছেন। সামনে মল্লিকদা, সবার পেছনে মিত্রা। মিত্রার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলাম।
ধব ধবে সাদা চিকনের সালোয়ার। মনে হচ্ছে কোনও বুটিক থেকে আনানো। সচরআচর এগুলো চোখে পড়ে না। ওকে আজ সৌম্য শান্ত দেখাচ্ছে। সেজেছে কিন্তু সেই সাজার মধ্যে মনহারিণী ব্যাপার আছে।
আয়া পরসি। মল্লিকদা বললো।
নিচু হয়ে প্রণাম করলাম। আমার দেখা দেখি, সকলে প্রণাম করলো।
অনি লাইফে প্রেথম প্রেণাম পেলাম তোর কাছ থেকে।
প্রেথম না প্রেথ্থম। বাঙাল ভাষাটাও সঠিক ভাবে বলতে পারো না।
সবাই হাসে।
দিলি তো গ্যামাকসিন মেরে।
আমার আশেপাশের সবাই হাসছে।
আমি সবার সঙ্গে একে একে পরিচয় করিয়ে দিলাম। মিত্রা, নীপাকে কাছে টেনে নিল। ছোটোমার দিকে তাকিয়ে নীপার গালে হাত দিয়ে বললো, কি মিষ্টি দেখতে।
বড়োমা আমার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, কিরে এরই মধ্যে মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে।
এই শুরু করলে আবার। এই জন্য আসতে বারন করেছিলাম।
ঠিক আছে, ঠিক আছে, আর বলবো না।
ছোটোমা চোখে মুখে কথা বলছে। নীপার দিকে তাকিয়ে ইশারায় বললো, এখানে এসেও সখী জুটিয়ে নিয়েছো।
হাসলাম।
ভেতরে গেলাম। কাকা, কাকিমা, সুরমাসির সঙ্গে সবার পরিচয় করিয়ে দিলাম। ওরা সকলে সকলের কুশল বিনিময় করলো। মিত্রা সবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো। ওরা কেউ প্রণাম নিতে চায়নি। মিত্রাও ছাড়েনি। শেষে অমিতাভদা বললেন, অনি যেমন আপনাদের ছেলে ও তেমনি আপনাদের একটা মেয়ে। ও যখন প্রণাম করতে চাইছে ওকে করতে দিন।
আমি বললাম, এবার চলো। এখানে বেশি ভিড় করে লাভ নেই।
নার্সিংহোমের অন্যান্য পেসেন্ট পার্টিরা আজ কেমন যেন অচ্ছুত। সবার কনসেনট্রেসন যেন আমাদের দিকে। করিডরে বেরিয়ে এলাম। মিঃ শ্রীধরণ আমায় ছুটতে ছুটতে এসে বললেন, স্যার আপনার একটা ফোন আছে।
আমার!
হ্যাঁ স্যার। মিঃ ব্যানার্জী করেছেন।
মিঃ ব্যানার্জী!
শ্রীধরণের সঙ্গে মিত্রার চোখাচুখি হলো। আমি লক্ষ্য করলাম।
ফোনটা এসে ধরলাম।
হ্যালো।
অনি।
হ্যাঁ।
তুমি খুব রাগ করে আছো মনে হচ্ছে?
কেন!
সরি, আজ আমি তোমার পাশে থাকতে পারলাম না।
তাতে কি হয়েছে?
আরে না না….।
আপনাকে কে খবর দিল?
মিত্রা কাল আমায় সব বলেছে।
এই নার্সিংহোমের ফোন নম্বর পেলেন কোথায়?
হাসলেন, এটা আমার নার্সিংহোম।
তাই নাকি! বাবা তাহলে তো….।
হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি ওদের সমস্ত ব্যবস্থা করতে বলে দিয়েছি। একটুও টেনশন করবে না।
না না আমি টেনশন করছি না।
কলকাতা থেকে মিঃ শ্রীধরণকে পাঠিয়েছি, উনি কাকাবাবুর অপারেশন করবেন। তোমার কাছে আমি অনেক ঋণী। এটুকু ঋণ আমায় শোধ করতে দাও।
এ আপনি কি বলছেন!
সাক্ষাতে সমস্ত কথা বলবো।
ঠিক আছে।
একেবারে রাগ করবে না।
এ-মা রাগ করবো কেন!
ফোন রাখলাম।
মিত্রা আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ওর মুখের দিকে তাকালাম। চোখদুটো হাসি হাসি।
আমি গম্ভীর হয়ে গেলাম।
অনাদিকে বললাম, দাদাদের জন্য একটু খাবার ব্যবস্থা কর।
আনাদি আমার দিকে তাকাল। আমি কেবিনে গেলাম, কাকাকে নিয়ে যাবার তোড়জোড় চলছে। পোষাক পরানো হয়ে গেছে। কাকা আমাকে ডাকল, সোফায় সবাই লম্বা হয়ে বসে আছে। আমি কাকার কাছে গেলাম, কাকা আমার হাত দুটো চেপে ধরলো।
অনি সারাজীবন শিক্ষকতা করেছি, তোদেরও পড়িয়েছি, এতদিন জানতাম রক্তের সম্পর্ক পৃথিবীতে সবচেয়ে বড়ো সম্পর্ক। আজ অনুভব করছি। তার থেকেও বড়ো সম্পর্ক আছে। তুই তা প্রমান করলি।
কাকা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো।
কাকাকে সান্তনা দেবার ভাষা আমার নেই। চারিদিকে চোখ ঘোরালাম। থমথমে পরিবেশ। কাকিমা, সুরমাসি, নীপা কাঁদছে। মিত্রার একটা হাত নীপার কাঁধে।
ট্রলি এসে গেছে, ওরা কাকাকে নিয়ে যাবে।
আমি বললাম, এবার তোমরা সবাই বাইরে গিয়ে বসো। ওরা ঘর থেকে সবাই বেরিয়ে গেল। নার্সকে কাছে ডেকে আস্তে করে বললাম, কাকা ইংরেজি ভালো বোঝেন, কিন্তু ফ্লুএন্টলি বলতে পারেন না, আপনারা একটু সাহায্য করবেন। নার্স মাথা দোলাল।
ওরা কাকাকে নিয়ে অপারেশন থিয়েটারে চলে গেল।
আমি কাকিমার দিকে তাকিয়ে বললাম, চলো কিছু খেয়ে নিই।
মিত্রা বললো, চলো ওপোরে একটা রুম ঠিক করা আছে, ওখানে গিয়ে বসি।
তোরা যা, আমি একটু খাবার ব্যবস্থা করে আসি।
ও অনি, আমরা খাবার নিয়ে এসেছি। বড়োমা বললো।
বড়োমার দিকে তাকালাম!
কাল রাতে করেছি।
তোমরা কি ঘুমোও নি?
হ্যাঁ।
করলে কখন?
মিত্রা আর ছোটো করেছে।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম, মিত্রা নীপার হাত ধরেছে শক্ত করে।
তুই বিশ্বাস কর….।
ঠিক আছে, আমি ওদের একটু খাবার ব্যবস্থা করে আসি। তোমরা ওপরে যাও।
আচ্ছা।
দাদা গেল কোথায়?
ওই তো রিসেপশনে বসে আছে। মিত্রা বললো।
দাদাদের ডেকে নিয়ে যাও।
মল্লিকদা, দাদা রিসেপশনে বসে আছে। দাদা কার সঙ্গে ফোনে কথা বলছে। আমি কাছে যেতে বললো, একটু ধর, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, হ্যাঁ বল।
কি খাবে।
একটু চা বিস্কুট।
বড়োমা খাবার নিয়ে এসেছে।
হ্যাঁ হ্যাঁ কালকে ওরা কি সব করছিল। তুই খাবি না?
গ্রামের ছেলেরা এসেছে, ওদের একটু দেখে আসি। তুমি ওপরে যাও, ওরা গেছে।
যা তাহলে।
একটু মিষ্টি পাঠিয়ে দিই।
দে।
দাদা আবার ফোনে কথা বলতে শুরু করলো।
আমাকে জিজ্ঞাসা করলি না? মল্লিকদা বললো।
তোমারটা আমি জানি।
মল্লিকদা হাসছে।
আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম।
অনাদি সমস্ত ব্যবস্থা করেছে। বাইরে বেরিয়ে এসে দেখলাম, তিনটে গাড়ি। তার মধ্যে একটা গাড়ি আবার সরকারি তকমা মারা। মানে এখানে এসে ফোনটোন করা হয়ে গেছে। আমাকে দেখেই চিকনা এগিয়ে এলো। গুরু তোমার পায়ের ধুলো একটু দাও।
গ্রামর ছেলেরা আমার মুখের দিকে তাকায়। ওরা এরইমধ্যে সব শুনে ফেলেছে, আমি চিকনার দিকে তাকিয়ে বললাম, একটা সিগারেট খাওয়াবি?
চিকনা ছুটে চলে গেল। অনাদি কাছে এলো। বাসু আমার ছায়া সঙ্গী। পচা, সঞ্জয় আমার কাছ ঘেঁসে দাঁড়িয়ে মিটি মিটি চোখে আমায় দেখছে।
ভানু কোথায়রে? আমি বললাম।
অনাদি বললো আশে পাশে আছে কোথাও। চিকনা একটা প্যাকেট নিয়ে এসেছে।
এক প্যাকেট! সঞ্জয় বললো।
এই শুরু করলি। আমি বললাম।
আচ্ছা আচ্ছা পরে হবে।
ঠেকে গিয়ে। চিকনা বললো।
ঠিক আছে।
একটা সিগারেট নিয়ে চিকনার হাতে প্যাকেটটা দিলাম। সঞ্জয় বললো, একটা দে।
না।
কেন।
গুরুর প্রসাদ। এখন নয় ফেরার সময়। এখন বিড়ি খা।
অনাদিকে বললাম, তুই বাইরেটা সামাল দে। আমি ভেতরটা সামাল দিই। আর শোন, দাদা আর মল্লিকদার জন্য কয়েকটা মিষ্টির ব্যবস্থা কর।
অনাদি আমার দিকে তাকিয়ে বললো, পাব কোথায়?
বাসু বললো, স্টেশনের ধারে মা লক্ষীতে পাবি।
ফাণ্ড আছে? আমি বললাম।
অনাদি মাথা দোলাল। আছে।
শেষ হলে চেয়ে নিস।
আচ্ছা।
অনাদি চিকনাকে সঙ্গে নিতে চাইল। চিকনা বললো, আমি গুরুর পাশে আছি। তুই সঞ্জয়কে নিয়ে যা।
ঠিক আছে।
চিকনাকে বললাম, চল একটু চা খাই।
আমি, চিকনা, পাঁচু, পচা, বাসু সবাই এসে সামনের দোকানটায় বসলাম। বেশ চকচকে দোকানটা। একটা নার্সিংহোমকে কেন্দ্র করে জায়গাটা বেশ জমজমাট। চিকনা চায়ের কথা বললো, ভদ্রলোক বললেন, একটু অপেক্ষা করুণ। বানিয়ে দিচ্ছি।
বাসু বললো, হ্যাঁরে অনি, ওই ভদ্রমহিলা কাগজের মালিক!
হ্যাঁ। আর অমিতাভদাকে দেখলি, উনি এডিটর।
সত্যি কথা বলতে কি আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।
না হওয়ারি কথা। ওর মধ্যে একটা ব্যাপার আছে, দেখন দারি নেই।
একেবারে খাঁটি কথা বলেছিস। কোটি কোটি টাকার মালিক….।
কোটি টাকা নয়, ঠিক এই মুহূর্তে ওর এ্যাসেটের ভ্যালু দু-তিনশো কোটি।
কি বলছিস!
ঠিক বলছি।
কি সাধারণ!
সবাই আমার কথা শুনছে, আর চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে।
অনাদি আর সঞ্জয় এলো। পাশে বসলো।
অনাদি বললো। মিষ্টিটা কি করবো।
দিয়ে আয়।
অনাদি, সঞ্জয়ের দিকে তাকাল।
তুই যা। ওখানে সব….।
অনাদি গজ গজ করতে করতে বেরিয়ে গেল।
দুটো করে মিষ্টি বল না। সকলে খাই। আমার মুখ থেকে কথা সরলো না, তার আগেই চিকনা অর্ডার দিল। কিছুক্ষণ পর দেখলাম, নার্সিংহোমের গেট পেরিয়ে অনাদির সঙ্গে নীপা আর মিত্রা আসছে। আমি উঠে দাঁড়ালাম।
বাসুও আমার দেখা দেখি উঠে দাঁড়াল। অনাদি হাত দেখাল, বুঝলাম বিশেষ কিছু নয়।
ওরা রাস্তা পেরিয়ে দোকানের ভেতরে এলো।
কি হলো?
মিত্রাদি বললো তোমার কাছে আসবে। নীপা বললো।
এসো।
আমার পাশ থেকে বাসু উঠে গেল। মিত্রা আমার পাশে এসে বসলো। আর একপাশে নীপা বসলো। টেবিলের অপরজিটে বাসু, অনাদি, সঞ্জয়। চিকনা একটা চেয়ার টেনে এনে বসলো।
আর একটা টেবিলে ওরা সবাই বসলো।
খেয়েছো?
ছোটোমা জোড় করে লুচি আলুরদম খাইয়েছে। নীপ বললো।
মিত্রাদি?
মিত্রাদিও খেয়েছে।
মিষ্টি খাবি। মিত্রার দিকে তাকালাম।
নিয়ে আয়।
চিকনাকে ইশারা করতে ও বলে দিল।
সকলের টেবিলে মিষ্টি আসল। বাসু, অনাদি মিত্রাকে একাপেয় অনেক কথা বলার চেষ্টা করলো। মিত্রা কিছু উত্তর দিল। বাকিটা আমায় দেখিয়ে দিল।
মিত্রা নীপার দিকে তাকিয়ে বললো, নীপা আমার ব্যাগটা দাও।
নীপা মিত্রার ব্যাগটা দিল, ব্যাগ খুলে মিত্রা মোবাইল বার করলো।
এইনে তোর মোবাইল।
আমি হাতে নিলাম। দেখলাম সঞ্জয়ের চোখ জুল জুল করছে।
এত দাম দিয়ে কিনলি কেন?
তুই মোবাইল আনতে বলেছিস, দামের কথা কিছু বলিসনি?
তা বলে….!
মিত্রা মাথা নিচু করে মিষ্টি ভেঙে খাচ্ছে। পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম আমার মোবাইল নেই।
আমার চোখ মুখ দেখে চিকনা বললো, মোবাইল তো?
হ্যাঁ।
আমার পকেটে।
তোর পকেটে মানে?
তুই যখন কেবিনে গেলি তখন আমার হাতে দিলি। তারপর অনেকবার ফোন বেজেছে ধরিনি। শেষবারেরটা ধরলাম। হিমাংশু না কে ফোন করেছিল। পরে ফোন করুণ বলে কেটে দিয়েছি। তারপর দেখলাম অনবরতো ফোন আসছে। বন্ধ করে পকেটে রেখে দিয়েছি।
সঞ্জয় চেঁচিয়ে উঠলো গান…. বাসু ওর মুখটা চেপে ধরলো। সরি বলে সঞ্জয় হেসে ফেললো।
মিত্রা, নীপা মাথা নিচু করে ফিক ফিক করে হাসছে।
তোলা থাকল। চিকনা বললো। এই অপমান আমি সইব না, মনে রাখিস।
হ্যাঁ হ্যাঁ। পারলে করে দেখাস।
আমি তাকালাম। ওরা থেমে গেল।
সঞ্জয়কে বললাম ওই মোবাইল থেকে সিমটা এই মোবাইলে ভরে দে। সব কপি করে ট্রান্সফার করে দিবি। পকেট থেকে আর একটা সিম বার করে বললাম, এই সিমটা এতে ভরে দিয়ে নীপাকে দে।
মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম, চার্জ দিয়ে নিয়ে এসেছিস।
হ্যাঁ।
চা খাবি?
মিত্রা হাসল। আমিও হাসলাম।
হাসছিস কেন?
এমনি।
চিকনার দিকে তাকাতে, দুটো এক্সট্রা বলা হয়ে গেল।
দাদা, মল্লিকদা কি করছে?
দাদা এখানের সকলকে ফোন করে ফেলেছে। সব চলে এলো বলে।
মানে!
মানে আর কি, তুই জিজ্ঞাসা করবি।
আমি!
হ্যাঁ।
তুই সম্পাদক, আর আমি জিজ্ঞাসা করবো।
মিত্রা আস্তে করে আমার থাইতে চিমটি কাটল।
থেমে গেলাম। কানের কাছে মুখটা নামিয়ে এনে বললো, নীপা আছে, তুই একটু বাইরে চল। কথা আছে।
আমি ওর দিকে তাকালাম। মিত্রা আমার চোখের ইশারা বুঝতে পারল।
চা খাওয়া হতে সঞ্জয়ের কাছ থেকে মোবাইলটা নিলাম।
সঞ্জয় গদগদ হয়ে বললো, গুরু অনেকদিনের সখ ছিল একটু ঘাঁটব, ঘাঁটা হয়ে গেল।
কি!
ই সিরিজের ফোন।
কি বুঝলি?
এটা লেটেস্ট মডেল মাস খানেক হলো লঞ্চ করেছে। নেট-ফেট সব পেয়ে যাবি।
ও।
তুই এক কাজ কর, নীপাকে একটু এই মোবাইলের অপারেটিং সিস্টেমটা শিখিয়ে দে। আমি একটু বাইরে যাচ্ছি। নীপাকে ইশারায় বললাম, বসো।
মিত্রাকে নিয়ে বাইরে এলাম। রাস্তা পেরিয়ে মিত্রার গাড়ির কাছে গেলাম।
ইসমাইল ছিল, গাড়ির দরজা খুলে দিল।
আমি মিত্রা গাড়ির ভেতরে বসলাম। সবাই দেখছে। দেখুক এখন আমার আর কিছু যায় আসে না।
ইসমাইল বললো কোথায় যাবেন স্যার?
কোথাও না। তুমি খেয়েছো?
হ্যাঁ স্যার। ওই বাবুরা খাইয়েছেন।
তুমি একটু চা খেয়ে এসো।
আচ্ছা স্যার। ইসমাইল আমার ইশারা বুঝতে পারল।
ইসমাইল চলে গেল।
মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম, তোকে আজ খুব মিষ্টি দেখতে লাগছে।
যাক তুই সুন্দর বলেছিস, আমার কপালটা সত্যি ভালো।
আমি ওর দিকে জুল জুল করে তাকিয়ে আছি।
তাকাস না, হিমাংশু কাল ডেট ঠিক করেছে।
কি বলছিস!
আমি ওকে অনেক বার বারন করেছিলাম, ও শোনে নি।
আমি চুপচাপ।
কি সব প্রবলেম আছে, বললো তুই ওর সঙ্গে একবার কথা বলে নে।
তুই সব নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছিস।
তোকে এই মুহূর্তে নিয় যেতে মন চাইছে না, আমার কিছু করার নেই।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম, মিত্রা মাথা নিচু করে আছে।
তুই বরং সই করে কাল চলে আসবি।
হিমাংশুকে ফোন করলাম।
হ্যালো।
কাকা কেমন আছে?
এই তো অপারেশনের জন্য নিয়ে গেছে।
কি হয়েছে?
ক্যাটারাক। লেন্স বসাতে হবে।
দু-চোখেই?
মনে হয় এক চোখে বসাবে প্রয়োজন পরলে দু-চোখে বসাবে।
মাইক্রোসার্জারি?
হ্যাঁ। আজই ছেড়ে দেবে।
ম্যাডামের মুখ থেকে সব শুনেছিস?
এই তো শুনছি।
তুই কালকে কয়েকঘণ্টার জন্য চলে আয়।
ঠিক আছে। ফোন রেখে দিলাম।
মিত্রাকে বললাম, দাদাকে সব কথা বলেছিস?
দাদা সব জানে।
মিঃ ব্যানার্জী।
ও বলেছে তুই যা করবি, তাই হবে।
তোরা সব আমার ঘারে ঠেলে দিচ্ছিস কেন, নিজেরা কিছু কর।
তুই বইতে পারবি তাই।
কথা বারালাম না। বললাম, ঠিক আছে। যাব।
বাসু জানলায় টোকা দিল।
দু-জনে গাড়ি থেকে নেমে এলাম।
ভেতরে ডাকছে, অপারেশন হয়ে গেছে।
গাড়ি থেকে বেরিয়ে নার্সিংহোমের ভেতরে এলাম।
এখনও কেবিনে দেয়নি। সবাই নিচে চলে এসেছে, মিঃ শ্রীধরণ আমাকে ডাকলেন, বললেন, সব ঠিক আছে, আমি যা করার করে দিয়েছি। তবে কাকাকে নতুন করে চশমা নিতে হবে। দীর্ঘদিন ক্যাটারাক থাকার ফলে একটা চোখ একটু কমজোরি হয়ে গেছে আমি একটা লেন্স বসিয়ে দিয়েছি। চিনতা করার কিছু করান নেই। বাহাত্তর ঘণ্টা পরে ওরা পাওয়ার এবং চশমা দেবে।
আমি বললাম, ভয়ের কিছু নেই। উনি বললেন, একেবারে না, তবে বয়স হয়েছে, এটা আপনাকে মানতে হবে, আমি ওনার কথায় সম্মতি দিলাম, আর একটা কথা। এই কদিন স্নান করা মাথায় জল দেওয়া চলবে না, আর দুপুরের দিকে উনি ছেড়ে দেবেন।
আমাদের কথা বলার ফাঁকেই কাকাকে কেবিনে নিয়ে আসা হলো।
কেবিনে এলাম, কাকাকে স্বাভাবিক দেখলাম, ছোটোমা কাকাকে বললো, এই যে অনি এসেছে।
আমি কাকার কাছে গেলাম। কাকার চোখ ব্যান্ডেজ করা আছে। কালো চশমা লাগানো। আমার গায়ে মাথায় হাত বোলাল। হাতদুটো থর থর করে কাঁপছে, ঠোঁটটা কেঁপে উঠল। কোনও কথা বলতে পারল না। নিজের খুব খারাপ লাগছিল, শক্ত হলাম। এই সময় ভেঙে পরলে চলবে না। আমার একপাশে নীপা আর একপাশে মিত্রা। কাকার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম।
এরা তোমায় বিকেলে ছেরে দেবে।
মল্লিকদা পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, কি হে শক্তিমান, লুজ হয়্যা যাইতেছ মনে হইতাছে।
না ঠিক আছি।
ব্যাশ বুইঝা ফেলাইছি।
বড়োমা আমার হাতদুটো ধরে বললো, দেখিস সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমি বড়োমার দিকে তাকালাম।
আমার ভাগ্যটা সত্যি খুব ভালো। না হলে এদের মতো এতো বড়ো বড়ো মানুষ আমার পাশে থাকবে কেন। চোখ দুটো জ্বালা জ্বালা করছে।
কেবিনের বাইরে এলাম। মিত্রা এসে পাশে দাঁড়িয়েছে। অনাদিরা সব কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। আমাকে দেখে এগিয়ে এলো।
কেমন আছেন স্যার?
এখন ঠিক আছে। যা ভেতরে গিয়ে দেখে আয়।
পায়ে পায়ে করিডর দিয়ে এগিয়ে নার্সিংহোমের বাইরে এসে দাঁড়ালাম।
চিকনাকে বললাম একটা সিগারেট দিবি।
চিকনা একটা সিগারেট দিল। কোনও কথা বললো না। অনাদিরা কাকাকে দেখে চলে এলো।
বাসু, অনাদি আমার পাশে এসে দাঁড়াল। মিত্রা আমার পাশেই আছে।
অনাদি।
বল।
আমর একটা উপকার করতে হবে।
কি বল।
আমায় আজ কলকাতা যেতে হবে। একটা জরুরি কাজ আছে।
এই সময়!
হ্যাঁ। মিত্রা খবরটা নিয়ে এসেছে। কিছু করার নেই।
নীপা কখন এসে পাশে দাঁড়িয়েছে, জানি না।
অনাদি মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললো, ম্যাডাম অনি কয়েকদিন পরে গেলে হতো না।
মিত্রা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।
অনি আমাদের বল ভরসা। ও পাশে থাকলে কোনও কাজই আমাদের কাছে কঠিন বলে মনে হয় না।
মনে মনে হাসলাম। ওরা জানে না, মিত্রারও একই অবস্থা।
বাসু বললো, ওতো আজ গিয়ে কাল আবার ফিরে আসছে। আমরা….।
চিকনা আর সঞ্জয় বললো কয়েক ঘণ্টার তো ব্যাপার আমরা পালা করে….।
সেটা নিয়ে ভাবছি না। যদি কোনও প্রবলেম হয়। অনাদি বললো।
গোড়ার গাড়িটা রেখে দে। সঙ্গে সঙ্গে এখানে নিয়ে চলে আসবি। আমি বললাম।
মিত্রা বললো, আমার গাড়িটা রেখে যাব।
অনাদি বলে উঠলো, পাগল নাকি, আপনার গাড়ি পাহারা দেওয়ার লোক ঠিক করতে হবে। গাঁইয়া ভূত সব।
ভানু বললো, ওটা নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না।
নীপা বললো, অনাদিদা, দাদা যখন বলছে যাক না। আমি তো আছি।
তোকেই তো সব করতে হবে। আমরা সব পাহাড়াদার।
ওরা সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।
স্যারকে বলেছিস? অনাদি বললো।
বলিনি। বলবো।
স্যার তোকে ছাড়া এই মুহূর্তে কারুর কথা শুনবে না।
সব বুঝলাম, কিন্তু আমি না গেলে হবে না।
নীপা বললো, তুমি যাও অনিদা। আমি বলছি। সব সামলে নেব, তুমি দেখবে। নাহলে তোমার নাম করে ভয় দেখাব, তাতেই কাজ হয়ে যাবে।
সবাই নীপার কথায় হাসছে।
একটু বেলায় অনেকেই এসেছিল অমিতাভদার সঙ্গে দেখা করতে। এখানকার জেলা সভাধিপতি, এসপি, ডিএম। তারাও কাকাকে দেখে গেলেন। আমার সঙ্গেও পরিচয় হলো। আমি যে এই জেলার ছেলে, সকলে আজ প্রথম জানলো।
ভেবেছিলাম কাকা আমাকে কিছু বলবে। দেখলাম কাকাই আমাকে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে যেতে বললো। সুরমাসি, কাকিমা একটু কিন্তু কিন্তু করছিল। কাকা ধমকে উঠলো।
আমি ঠিক আছি। ওর কি কোনও কাজকম্ম নেই। এখানে বসে থাকলে চলবে।
কেউ আর কিছু বললো না।
বেড়তে বেড়তে বিকেল হয়ে গেল। কাকাকে এবার কাউকে ধরতে হলো না। কাকা নিজে নিজেই এলো। মনের দিক থেকে কাকাকে অনেক বেশি ফিট মনে হলো। ওদের ছেড়ে দিয়ে আমরা বেরলাম। আমি মিত্রার গাড়িতে উঠলাম। অমিতাভদারা নিজেদের গাড়িতে।
কলকাতায় পৌঁছলাম সাতটা নাগাদ। দাদার বাড়িতে দুজনে কিছুক্ষণ কাটিয়ে মিত্রার রিকয়েস্টে ওদের বাড়িতে এলাম। মনটা ভীষণ ভারাক্রান্ত কিছুই ভালো লাগছে না। বার বার কাকার মুখটা চোখের সামন ভেসে উঠছে। বিগত পাঁচ বছরে শয়নে স্বপনে কাকার মুখটা একবারও মনে পড়ে নি। তাহলে হঠাৎ আজ কেন বার বার মনে পড়ে যাচ্ছে।
আজও সেই দিনটার কথা মনে পড়ে।
তখন আমার পাঁচ বছর বয়স। বর্ষার সময় ঠাণ্ডা লেগে ধূম জ্বর। গ্রামে তখন অমূল্যদাদু ছিলেন একমাত্র ডাক্তার। কাকা অমূল্যদাদুকে অমূল্যকাকা বলে ডাকত। আবঝা আবঝা কাকার সেই কথা মনে পড়ে যায়। কাকা, দাদুকে বলেছিল।
ওর বাপ গেছে, মা গেছে যে কোনও শর্তে ওকে তোমায় বাঁচিয়ে তুলতে হবে। আমি ওকে কিছুতেই হারাতে চাই না।
অমূল্যদাদু আমাদের বাড়িতে পরপর তিনদিন ছিল।
আমার মাথায় ধারা দেওয়া হয়েছিল, জ্বর নামানোর জন্য। গ্রাম শুদ্ধ লোক উপচে পরেছিল সেই কটাদিন। যে যেমন ভাবে পেরেছিল কাকাকে এসে সাহায্য করেছিল। আমি যেন গ্রামের সম্পদ, কাকার একলার নয়।
জ্বর সেরে যাবার পর। কাক আমাকে পীরবাবার থানে নিয়ে গেল। আমাকে বললো প্রণাম কর। তোর বাপ এখানে পীরবাবাকে দেখেছিল। তারপর আমাকে নিয়ে গেল, বীরকটার শিব মন্দিরে। গ্রামের লোকেরা বলে বুড়োশিবের থান। এর মাটি গায়ে মাখলে নাকি শরীর খারাপ হয় না। কাকা আমাকে মাটি মাখিয়ে মন্দিরের সামনে ঝিলের জলে স্নান করিয়ে পূজো দিল। সত্যি বলতে কি তারপর থেকে আমার সেই ভাবে কোনও শরীর খারাপ করেনি।
সেই দিন প্রথম কাকার চোখে জল দেখেছিলাম। আমার বাবার নাম ধরে বার বার বলেছিল এ কি গুরুদায়িত্ব তুই আমাকে দিয়ে গেলি অধীপ। বাবা শিব আমি অনিকে তেমার পায়ে রাখলাম। আজ থেকে ওর বাঁচা মরা তোমার ওপর নির্ভর। তুমি যা ভালো বুঝবে করবে।
আমার ছোট্ট শরীরটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাকা হাপুস নয়নে কেঁদেছিল।
কিরে এখনও বসে আছিস? বাথরুমে যাবি না।
সম্বিত ফিরে পেলাম।
বাথরুমে গেলাম। ফ্রেস হয়ে দুজনে রাতের খাওয়া খেয়ে নিলাম। মিত্রা আসার সময় দোকান থেকে বিরিয়ানী কিনেছিল। আমি বারন করলাম। বললো, এখন গিয়ে আর রান্না করতে ভালো লাগবে না। বরং চল কিনে নিয়ে যাই খেয়ে নেব। তাই করলাম।
বিরিয়ানী আর বাটার চিকেন ফ্রাই। খাওয়ার পর দেখলাম শরীর আর বইছে না। মিত্রার ঘরে বসে নিউজ চ্যানেল দেখছিলাম। কটা বাজে? বারটা হবে। এরই মধ্যে বার কয়েক নীপাকে ফোন করে খবর নিয়েছি। কাকার সঙ্গেও কথা বলেছি।
নীপার একটু অভিমান হয়েছে। কি আর করা যাবে। মিত্রা এলো আরও আধঘণ্টা পরে।
বুঝলি সারাদিন ছিলাম না, একবারে সব লণ্ডভণ্ড করে রেখেছিল। লোক দিয়ে কাজ করান যে কি ঝকমারি তোকে কি বলবো।
মিত্রার দিকে তাকালাম। সকালের মিত্রা আর এখনকার মিত্রার মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য। ফিনফিনে একটা ব্ল্যাক কালারের নাইট গাউন পরেছে। পরা না পরা দুই সমান। আমি ওর দিকে তাকালাম। ও আমার পাশে এসে বসলো।
কি দেখছিস?
বিবিসি, সিএনএন অল্টারনেট করে দেখছি। আমার বিছানা রেডি?
তোর! কেন!
কোথায় শোব?
এখানে, আপত্তি আছে!
ওর দিকে তাকালাম।
ওসব নিয়ে কিছু ভাবিস না।
মিত্রা আমার কাঁধে মাথা রাখল।
তোর সোফাটা বেশ আরামদায়ক। তুই সোফার ওপাশে একটু হেলান দিয়ে বোস তো।
কেন?
বোস না।
মিত্রা সরে গিয়ে হেলান দিয়ে বসলো। আমি ওর নরম কোলে মাথা দিয়ে শুলাম।
এই জন্য, বদমাশ।
মাথাটা একটু টেপ, ভীষণ যন্ত্রনা করছে।
পারবনা যা, আমি কি তোর বউ।
তোর সমস্ত দায়িত্ব আমাকে অর্পন করা হয়েছে।
মিত্রা একবার আমার দিকে তাকাল, পারবি আমার ভার বইতে। গলাটা ভারি হয়ে গেল।
দিয়েই দেখ না।
দিয়ে তো দিয়েছি, তুই নিচ্ছিস কোথায়?
নেব নেব, এত তারাহুরো করছিস কেন।
আমার বেলা যে বয়ে যায়।
ধরে রাখার চেষ্টা কর।
এ কি ধরে রাখা যায়।
যাবে যাবে, সময়ে সব হয়।
মিত্রা মাথায় বিলি কাটতে আরম্ভ করল, আমার চোখ বুজে আসছে।
একটা কথা বলবো।
বল।
রাগ করবি না।
না।
সারাদিন খুব স্টেইন গেল, একটু ড্রিংক করবি।
মিত্রার মুখের দিকে তাকালাম।
তোকে রিকোয়েস্ট করছি। দেখবি উপকার পাবি।
মিত্রার চোখে চোখ রাখলাম।
আমি জানি তুই এসব পছন্দ করিস না। তবু তোকে বলছি। আর কোনওদিন বলব না।
ওর বলার মধ্যে এমন একটা জোর ছিল, আমি না বলতে পারলাম না।
মিত্রা হেসে ফললো।
মুহূর্তের মধ্যে সব রেডি করে ফেললো।
বেশি দিস না।
মাত্র দু-পেগ।
তুই জানিস, আমি এর বিন্দু বিসর্গ কিছু বুঝি না।
ঠিক আছে, অসুবিধে হলে বলবি।
আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি।
জানিস বুবুন, তুই যেদিন শেষ এসেছিলি, সেইদিন থেকে আমি আর ছুঁইনি।
তাহলে আজ খাচ্ছিস কেন?
ইচ্ছে করছে।
ঠিক আছে, আর নয়।
প্রমিস করছি যদি কখনও খাই, একমাত্র তোর সঙ্গেই খাব। একা কোনওদিন খাব না।
ও গ্লাসে করে সাজিয়ে দিল, দুজনে গ্লাসে গ্লাস ঠেকিয়ে শিপ করলাম। হেসে ফেললাম।
মিত্রা মুচকি হাসল। কেমন যেন একটা লাগল, কোনও দিন খাইনি। কেমন ওষুধ ওষুধ গন্ধ। কিন্তু বেশ মিষ্টি মিষ্টি স্বাদ। মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। আমার এক পেগ শেষ হতে না হতেই, ওর দু-পেগ খাওয়া হয়ে গেল।
কিরে এতো তারাতারি! আর খাবি না।
আর একটা। প্লিজ।
মিত্রা সোফার অপজিট থেকে এসে আমার কাছ ঘেঁসে বসলো।
এসি চালাতে দিলি না। পাখাটা একটু চালাই।
আস্তে করে।
মিত্রা ফিরে এলো। একটু টাল খেল যেন। আমি উঠতে যাচ্ছিলাম। ও হাত দেখিয়ে বসতে বললো। এমন ভাবে বসলো যেন আমার কোলে বসে পরবে। দুহাত দিয়ে আমার গলা জরিয়ে ধরলো।
জানিস বুবুন, আমার হাজবেণ্ডটা একটা বাস্টার্ড।
চমকে উঠলাম। আমি ওর চোখে চোখ রাখলাম। মিত্রার চোখ অন্য কথা বলছে।
আমার কোনও তাপ-উত্তাপ নেই।
ও আর একটা মেয়েকে নিয়ে থাকে, আমি ওর কেপ্ট।
থামবি।
মিত্রা হাসছে। ভাবছিস আমি মাতাল হেয়ে গেছি তাই না? ও তোর আমার ব্যাপারে সব জানে। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। সেই জন্য তোকে সেদিন ওমনি ভাবে সব কথা বলেছে। তোর শেষ হয়ে গেছে। আর একটা পেগ তোকে দিই।
না।
প্লিজ তুই না করিস না। মাত্র একটা। তুই একটা আমি একটা। ব্যাশ।
আমি হার মনলাম। মিত্রার এরইমধ্যে চারটে খাওয়া হয়ে গেছে।
মিত্রা ঠোঁটে গ্লাস ছোঁয়াল।
আবার আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পরলো।
ও কি ভাবে, ওর দয়ায় আমি বেঁচে আছি। ওর যা কিছু প্রতিপত্তি দেখছিস, সব আমার বাবর জন্য। ওকে বিয়ে করে তোকে ভোলার চেষ্টা করেছিলাম। পারিনি। তবু মানিয়ে চলার চেষ্টা করলাম। ছয় মাসের মধ্যে সব জানতে পারলাম। বাবাকে সব জানালাম। বাবা বললেন, বল মা তুই কি করতে চাস, আমি তোর কথায় না বলবো না।
মিত্রার চোখদুটো আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কি যেন খুঁজছে।
সেই সময় তোকে অনেক খুঁজেছি। পাইনি। আমার বাবা-মা আমার কথা ভেব ভেবে মারা গেলেন। এক মাত্র মেয়ের এ কি হাল। তবু বাবার অনেক পয়সা ছিল। তাই বেঁচে গেলাম। তারপর পরিবেশ পরিস্থিতি আমাকে তৈরি করে দিয়েছে। বাবা তোকে খুব ভালোবাসতেন। মারা যাবার আগে আমায় বলেছিলেন, অনি যদি তোর কাছে কোনওদিন ফিরে আসে, ওকে ফিরিয়ে দিস না। মা নয়, বাবা তোকে চিনেছিলেন।
মিত্রা থামল।
আবার একটা গ্লাস সাজিয়ে মুখে তুলে নিল। এক নিঃশ্বাসে জলের মতো ঢক ঢক করে বেশ কিছুটা খেল। তারপর গ্লাসটা টেবিলের ওপর ঠক করে নামিয়ে রাখলো।
অল আর ডিসগা….।
মিত্রা আমার কাঁধে মাথা রাখলো।
বেশ কিছুক্ষণ দুজনে চুপচাপ বসে রইলাম। কেউ কোনও কথা বললাম না।
কাঁধটা ভিঁজে ভিঁজে ঠেকলো, মিত্রা কাঁদছে।
ওর মাথাটা আমার কোলে রাখলাম, মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম।
ও আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে।
আমার এখন দু-চার পেগে কিছু হয় না বুঝলি বুবুন। আকন্ঠ খেলে তবে তৃপ্তি পাই।
আমার মাথাটা ঝিম ঝিম করছে। আমি ওকে ধরে ধরে বিছানায় নিয়ে গেলাম। বালিশটা ওর মাথার নিচে রেখে শুইয়ে দিলাম। এই মুহূর্তে মদ খাওয়ার কোনও ফিলিংস আমার মধ্যে নেই। আমি মিত্রার পাশে আধ শোয়া অবস্থায়। মিত্রা আমার আরও কাছে এগিয়ে এল। বুকের কাছে মুখটা নিয়ে এসে বললো, একটু আদর করবি।
ওর চোখ ভাসা ভাসা, আমি ওর কপালে চুমু খেলাম, ও ঠোঁট দেখিয়ে ইশারা করছে।
থাক না আজ।
বিশ্বাস কর বুবুন, আমি মাতাল হইনি। তাকে দেখলেই শুধু সেক্স করতে ইচ্ছে করে।
এই নেশাটা তোকে ত্যাগ করতে হবে। মাথায় রাখবি আমিও একটা মানুষ।
জানি। মন মানে না।
মানাতে হবে। তোকে আমি বিজনেস ম্যাগনেট হিসেবে দেখতে চাই।
ওর জন্য তুই আছিস।
আমি কতক্ষণ।
আগে বল, তুই আমাকে ছেরে যাবি না। মিত্রা আমার হাত দুটো চেপে ধরলো।
কেন এসব কথা বলছিস?
অনেকদিন পর আমার ভালোবাসাকে কাছে পেয়েছি। মিত্রা জড়িয়ে ধরলো।
আমি তোর কাছেই আছি।
আমি জানি। আমি যেমন তুইও ঠিক তেমনি।
কিরকম?
আমাদের মনের মধ্যে একটা যাযাবর লুকিয়ে আছে।
সেটা তো ভালো।
ঠিক। তার খারাপ দিকও আছে।
শোধরাতে হবে।
তুই পাশে থাকলে হয়ে যাবে।
সে তো আমি জানি।
ও আমার ডান হাতটা ধরে বুকে রাখলো।
জানিস বুবুন বিগত আট বছরে ওর সঙ্গে আট দিন ঘর করিনি।
আমি মিত্রার মুখের দিকে তাকিয়ে।
এই বাড়িটা এক সময় আমার মামার বাড়ি ছিল। মামাদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে রিপিয়ার করে নিয়েছি। বাবার খুব সখ ছিল এই রকম একটা বাড়িতে থাকবে।
ছিলেন?
হ্যাঁ, শেষের কয়েকটা দিন।
আর ওই বাড়ি।
জ্যেঠুদের ভাগে পরেছে।
নিয়েছে, না দিয়ে দিয়েছিস।
ওই হলো।
মিত্রা আমার মাথাটা টেনে নিয়ে জোর করে ওর ঠোঁটে রাখল, উষ্ণ ঠোঁটের তীব্র স্পর্শে আমার গাছের পাতায় ঝিরঝিরে বাতাস লাগল।
মিত্রা আমার ঠোঁট থেকে মুখ তুলে বললো।
তোর ঠোঁটটা ভীষণ মিষ্টি, মনে হয় সর্বক্ষণ তোর ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে শুয়ে থাকি।
তোর ঠোঁটটাও কম কিসে।
মিত্রা হাসল। ছেলেদের ঠোঁট এরকম হয় আমার জানা ছিল না।
জেনে নিলি।
এটা অনেকদিন আগে জানা উচিত ছিল, সেই কলেজ লাইফে।
মুহূর্তের মধ্যে আমি কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে পরলাম।
সেই দিনের কথাগুলো মনে পরলে হাসি পায়। একটা আনকোরা গ্রামের ছেলে শহরে এসেছে পড়াশুনা করতে। হাত ধরাধরি করে ঘুরছে শহুরে আধুনিকার পাশে। বেপরোয়া ঝড়ের মতো ওই কয়েকটা মাস মিত্রা আমার সমস্ত কিছু ওলটপালট করে অগোছাল করে দিয়েছিল। অনেক দিন মিত্রা নিজে থেকে সুযোগ দিয়েছে আমাকে, কিন্তু আমি ওর দেহ স্পর্শ করিনি। মনের মধ্যে একটা দ্বৈত্বতা খেলা করত সব সময়। আমি গ্রাম থেকে এসেছি। আমায় কিছু করতে হবে। নিজের পায়ে নিজেকে দাঁড়াতে হবে। এই পৃথিবীতে আমার কেউ নেই। সবুজ মনে তখন অনেক সোনালি স্বপ্ন।
তুই পাঞ্জাবীটা খোল আমি নাইট গাউনটা খুলে নিই।
চমকে উঠলাম।
মিত্রা উঠে বসলো। এখন ওর মধ্যে কোনও সঙ্কোচ নেই, যেন আমরা দুজন স্বামী-স্ত্রী।
পাখাটা বন্ধ করে দে। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছে।
আমি উঠে গিয়ে পাখাটা বন্ধ করে দিলাম। একটা মিষ্টি গন্ধ চারদিকে ম ম করছে। বিছানায় উঠে এলাম। ওর পাশে শুলাম। মিত্রা আমার বুকে উঠে এল।
তোর শরীরটা ভীষণ চার্মিং।
সব মেয়েরাই তাই বলে।
মিত্রা এক ঝটকায় উঠে বসলো। আর কারা কারা বলে, বল।
সে কি মনে আছে, যাদের সান্নিধ্যে আসি তারাই বলে।
নাম কি বল। তাদের ফোন করে আমি বলে দেব, আমার জিনিষে তারা যেন ভাগ না বসায়।
হাসলাম।
ভাগ বসালে কি হয়েছে। খয়ে যাবে, না কমে যাবে?
ওরে শয়তান, গাছেরও খাবে আবার তলারও কুরবে।
গাছ আর তলা যদি দুই পাওয়া যায় ক্ষতি কি।
মিত্রা হঠাত গম্ভীর হয়ে গেল।
ঠিকই তো, আমার কি আছে, যা দিয়ে তোকে ধরে রাখবো। যা পাওয়া যায়, তাই লাভ।
মিত্রা আবার আমার শরীরে আশ্রয় নিল। আমার বুকটা ওর বালিশ। আমার ঘাড়ের তলা দিয়ে দুহাতে আমাকে সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরে আছে।
নিস্তব্ধ ঘর। আমরা দুটো প্রাণ শরিরী স্বপ্নে মেশামিশি। ঘরের মিহি আলো বড়ো মায়াবী। মিত্রার এলো চুল চাদরের মতো আমার বুকের ওপর দিয়ে দুপাশে ছড়িয়ে পরেছে। মিত্রার চোখ এই আধো অন্ধকার ঘরেও তারার মতো জ্বল জ্বল করছে।
কিরে ঘুমিয়ে পরলি? আমি বললাম।
না। তোর বুকের লাব ডুব শব্দ শুনছি।
আবার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। মিত্রা আমার বুকে ওর শরুশরু আঙুল দিয়ে ছবি আঁকছে।
তোকে এতদিন খুব মিস করেছি। মিত্রা বললো।
আমি তারিয়ে তারিয়ে মিত্রার নগ্ন শরীরটা দেখছি। ঠিক নেশা ধরেনি। তবে মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছে। মনে হচ্ছে আমি যেন কোথাও ভেসে বেরাচ্ছি।
মিত্রা পরস্ত্রী। এ আমি কি করছি?
পরক্ষণেই মনে হলো, কেন? মিঃ ব্যানর্জী নিজে বলেছেন, তোমরা স্বামী-স্ত্রীর মতো মিশতে পার।
কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে ঠিক ভাবতে ইচ্ছে করছে না।
মিত্রাকে কাছে টেনে নিলাম, চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিলাম, ওর নরম বুকে হাত রাখলাম মিত্রার মাখনের মতো নির্লোম শরীরটা কেম যেন নেশা ধরাচ্ছে।
তুই সেভ করিস নাকি।
হ্যাঁ, সপ্তাহে একদিন, প্রিয়েডের কয়েকদিন বাদ দিই।
তোদের প্রিয়েড কদিনে হয়।
নেকু , জানেনা যেন।
জানবো কি করে, আমার কি বউ আছে।
বউ করে নে। আমার গালটা টিপে দিল।
আমি ওর মুখের দিকে ফ্যাকাশে চোখে তাকালাম।
আমার গালটা টিপে দিয়ে আমার বুকের ওপর শুলো।
এমনিতে তিন দিন, এক্সটেণ্ড করে চার-পাঁচ দিন পর্যন্ত।
নেক্সট ডেট কবে।
কামিং উইকের প্রথম দিকে।
বাঃ।
বাঃ কেন।
তার মানে এখন সেফ প্রিয়েড।
ওরে শয়তান ডুবে ডুবে জল খাওয়া।
ডুবে ডুবে কোথায় জল খেলাম, আমি তোর বিছানায় তোর শরীরের সঙ্গে লেপ্টালেপ্টি করে শুয়ে আছি।
মিত্রা হাসছে।
আমার মাথাটা আবার ঝিমঝিম করছে, এই ঝিম-ঝিমানিটা যন্ত্রনাদায়ক নয়।
মিত্রা সোজা হয়ে উঠে বসে আমার কোমরের কাছে চলে গেল।
আমি হাসছি।
মিত্রা হাত বাড়িয়ে দিল, আমি ওকে বুকে টেনে নিলাম।
কিছুক্ষণ দুজনে নিস্তব্ধে শুয়ে রইলাম। মাথার ওপর পাখাটা স্থির কিন্তু সেই ভাবে গরম লাগছে না। বেশ আরমদায়ক পরিবেশ।
কি রে অসুবিধে হচ্ছে?
মিত্রা আমার বুকে মুখ ঘষে জানাল, না।
আমি ওর মাথায় হাত রাখলাম, ওর এলো চুল আমার বুকে, মুখে ছরিয়ে পড়েছে, মিত্রার নিটোল বুক আমার বুকে ছুঁচের মতো বিঁধে আছে, ওর গভীর উষ্ণ নিঃশ্বাস আমার বুকে জ্বালা ধরাচ্ছে।
মিত্রা ঠোঁট বারিয়ে আমার ঠোঁটে ঠোঁট রাখল, ওর শরীরটা ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধীরে ধীরে উষ্ণ হয়ে যাচ্ছে, মিত্রা ঠোঁট থেকে ঠোঁট সরিয়ে নিয়ে মৃদু হাসলো, ওর চোখ দুটো ফ্যাকাসে, সামান্য জল টল টল করছে।
কি হলো!
তোকে এতদিন সত্যি খুব মিস করেছি।
ওর মুখটা চেপে ধরে ওর দুচোখে জিভ ছোঁয়ালাম।
থামলি কেন।
আমি ওর দিকে স্থর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি, ওকে জাপ্টে ধরে একপাক ঘুরে গেলাম, ও আমার নিচে আমি ওর ওপরে, মিত্রা হাসছে, মাঝে মাঝে মাথাটা তুলে আমার ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াচ্ছে, আমার শরিরী কম্পনে মিত্রার উন্মুক্ত বুক কেঁপে কেঁপে উঠছে, নরম মাটি, কর্ষণ করতে দারুন মজা, মিত্রা আমার শরীরের তলায় শুয়ে আধো চোখে পরিপূর্ণতার স্বাদ খুঁজছে, মাঝে মাঝে ওর দুচোখ আবেশে বুঁজে আসছে, মিত্রা আমার হাত দুটো চেপে ধরলো। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হিস হিসিয়ে বলে উঠলো।
বুবুন।
বল।
আর পারছি না।
মিত্রা আমার হাত দুটো ভীষণ শক্ত করে চেপে ধরলো। হঠাৎ মাথাটা তুলে আমার ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ওর বুকে টেনে নিল, আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে থর থর করে কেঁপে উঠলো। আমিও ওর কাঁপুনিতে সারা দিয়ে কেঁপে কেঁপে উঠলাম, আমার আপাত উষ্ণ দেহটা মিত্রার নিভৃত বুকে আশ্রয় পেয়েছে। ঠিক এই মুহূর্তে আমার বুকের ঘন ঘন লাব ডুব শব্দটা আমি নিজেও শুনতে পাচ্ছি।
কতক্ষণ দুজনে নিস্তব্ধে শুয়েছিলাম জানি না, শুধু দুজনে দুজনের নিশ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ শুনেছি, একে অপরের বুকের লাবডুব শব্দ শুনছি, মিত্রার নরম হাত আমার চুলে বিলি কাটছে, মাথার ঝিম ঝিমানি ভাবটা এখন সম্পূর্ণ উধাও।
কি রে এই ভাবে শুয়ে থাকবি। আমি নিস্তব্ধতা ভাঙলাম।
আর একটু।
উঠবি না।
উঠতে ইচ্ছে করছে না।
কাল অনেক কাজ।
এই মুহূর্ত টুকু চেষ্টা করলেও ফিরে পাব না।
তোর ভালো লেগেছে?
তোর এতো রস আগে ভাবিনি?
কেন!
আমার ভেতরটা একেবারে পুকুর হয়ে গেছে।
হাসলাম।
মিত্রার বুক থেকে মুখ তুললাম। ওর চোখ চক চক করছে।
ঘেমে গেছিস।
স্বাভাবিক, আমি কষ্ট করলাম, তুই এনজয় করলি।
শয়তান। মিত্রা আমার নাকটা টিপে দিল।
ওঠ।
কেন।
ওই যে বললি কাল সকালে অনেক কাজ।
(আবার আগামীকাল)