জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
দ্বাদশ কিস্তি
শুক্রবার বেলা এগারোটা। চম্পকবাবু।
হ্যাঁ ম্যাডাম।
এমাসের টার্গেট কতো ছিলো?
১৫ কোটি।
কত ফুলফিল হয়েছে।
১ কোটি।
বাকিটা।
হয়ে যাবে।
গাছ থেকে পড়বে?
চুপচাপ।
কি হলো চুপ করে আছেন কেন?
না ম্যাডাম, বাজারের অবস্থা….।
অন্য হাউস পাচ্ছে কি করে। আমার কাগজের হাল কি এতই খারাপ নাকি?
না ম্যাডাম, নিউজ কোয়ালিটি….।
সুনিতবাবু?
ম্যাডাম।
চম্পকবাবু কি বলছেন?
ম্যাডাম। মানে আমি….।
চম্পকবাবু।
হ্যাঁ ম্যাডাম।
কত টাকা মাইনে পান?
চুপচাপ।
যদি কাল আপনাকে দূর করে দিই। ওই মাইনে কলকাতার কোনও হাউস আপনাকে দেবে? আপনিও শুক্রবার অফিসে এসে দেখা করবেন। সমস্ত ডকুমেন্টস নিয়ে।
আচ্ছা ম্যাডাম।
কিংশুকবাবু?
হ্যাঁ ম্যাডাম।
আপনাকে যা দায়িত্ব দিয়ে এসেছিলাম তা পালন করেছেন, না সনাতনবাবুর মত অবস্থা?
চুপচাপ।
বুঝেছি।
চম্পকবাবু আপনার দায়িত্বগুলো আপাতত কিংশুকবাবুকে বুঝিয়ে দিন।
ঠিক আছে ম্যাডাম।
সনাতানবাবু?
বলুন ম্যাডাম।
সার্কুলেশনের ভদ্রলোক এসেছেন।
হ্যাঁ ম্যাডাম আমি এসেছি।
গত ১০ দিনে কাগজের সার্কুলেশন ১ লাখ পড়ে গেছে কেন?
না মানে! ভদ্রলোক ত ত করছেন।
দেরি করে বেরিয়েছে এই কারন দেখাবেন না, সব বিটে কাগজ ঠিক সময় পৌঁছয়নি।
না ঠিক তা নয়। প্রেসে একটু প্রবলেম ছিল।
আমি ১০ দিন অফিসে যাই নি। এ তো দেখছি চারিদিকে শুধু প্রবলেম আর প্রবলেম।
অতীশবাবু আছেন ওখানে?
হ্যাঁ ম্যাডাম।
কি অতিশবাবু সাপের পাঁচ পা দেখেছেন?
চুপচাপ।
সুনিতবাবু?
বলুন ম্যাডাম।
দিবাকর মন্ডলকে চেনেন।
দিবাকর মন্ডল….!
অতিশবাবুর দিকে তাকাচ্ছেন তাই তো—। চিনতে পারছেন না? একটু আগে আপনাকে ফোন করলো।
না ম্যাডাম ও-তো ফোন করেনি।
এই তো এখুনি বললেন, ওকে চিনি না।
না মানে….।
আপনার গলার রেকর্ডিং শুনবেন?
না মানে….।
ত ত করছেন কেন?
চুপচাপ।
পয়সা দিয়ে আমি গরু পুষবো, ছাগল নয়, এটা মনে রাখবেন। আমাকে নিয়ে হাউসে অনেক আলোচনা হচ্ছে। এটা আমার কানে এসেছে। একটা কথা মনে রাখবেন, আমার অনেক পয়সা আমার পক্ষে দু-দশটা কেপ্ট পোষা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। এটা বড়লোক মানুষদের খেয়াল। আপনার মামাকে আমাকে ফোন করতে বলুন।
সনাতনবাবু—
বলুন ম্যাডাম।
ওখানে আর যারা আছেন, তাদের শুক্রবার আসতে বলুন। আমার কথা বলতে ভালো লাগছে না। আপনারা এতোটা নিচে নেমে গেছেন?
আর শুনুন, আমি ইসমাইলকে বলে দিচ্ছি, গাড়িটা অমিতাভদার বাড়িতে পাঠিয়ে দিন। আজ থেকে কাগজের দায়িত্ব অমিতাভদার হাতে থাকবে। আমি কলকাতা ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত। সমস্ত ডিসিশন উনি নেবেন। আপনি শুধু ক্যারিফরোয়ার্ড করবেন।
আচ্ছা ম্যাডাম।
আর আপনারা সবাই শুনে নিন, অনি আপনাদের অনেক ক্ষতি করেছে। তাই না।
ঠিক বলেছেন ম্যাডাম।
আমি ওকে পানিশমেন্ট দিয়েছি।
এটা ভালো কাজ করেছেন ম্যাডাম। আমরাই বা শুধু ভুগবো কেন। ওর জন্য জুনিয়র ছেলেরাও আমাদের কথা শুনতে চাইছে না।
ঠিক বলেছেন। আপনারা না এক একজন দিকপাল সাংবাদিক। এ্যাডমেনেজার, সিইও, এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ম্যানেজের, আরও কত কি। সব গালভরা নাম, তাই না।
চুপচাপ।
আপনাদের জ্ঞাতার্থে একটা কথা জানিয়ে রাখি অনি বর্তমানে এই কাগজের ২০ পার্সেন্ট শেয়ার হোল্ড করছে। দু-এক দিনের মধ্যেই নোটিশ বোর্ডে নোটিশ পড়ে যাবে। যাকে যা দায়িত্ব দিলাম সেই দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ করুণ। শুক্রবার ১১টার সময় দেখা হবে।
সবাই চুপচাপ।
আমি লাইনটা কেটে দিয়ে সেভ করলাম। মিত্রা মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। আমি ইশারায় দিবাকর, চিকনাদের সবাইকে বাইরে যেতে বললাম।
সবাই উঠে চলে গেল। নীপা বসেছিল। আমি বললাম, তুমি একটু গরম দুধ নিয়ে এসো। আর ওদের একটু চা-এর ব্যাবস্থা করো।
নীপা ছুটে বেরিয়ে গেল।
নীপা চলে যেতেই মিত্রা আমাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠলো।
কাঁদিস না। অ্যাতো ইমোশন্যাল হলে ব্যাবসা চালাবি কি করে?
আমি আর পারছি না বুবুন।
তোকে পারতে হবে।
ও আমার ঘাড় থেকে মাথা তুলছে না। এই দেখো। এখনও কত কাজ বাকি আছে, দাদাকে ফোন করতে হবে। কাগজটা বার করতে হবে।
তুই কর।
নীপা ঘরে ঢুকলো।
কি বোকা বোকা কথা বলছিস। চোখ খোল, ওই দেখ নীপা তোকে দেখে হাসছে।
মিত্রা আমার ঘার থেকে মাথা তুললো। নীপার দিকে তাকাল। নীপা গরম দুধ নিয়ে এসেছে। নে এটা খেয়ে নে, দেখবি ভালো লাগবে।
তুই খা। ওরা সবাই কোথায় গেলো?
আমরা প্রেম করবো, সবাই দেখবে, এটা হয়।
ধ্যাত। তুই না।
নীপা হাসছে।
মুখপুরী, তুই হাসছিস কেন?
নীপা মিত্রার কোলে মাথা দিল।
তোর আবার কি হলো?
তোমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিও না, আমি তোমার বাড়িতে রান্নার কাজ করবো।
কি পাগলের মতো কথা বলছিস!
নীপা মিত্রার কোলে মুখ গুঁজে রইলো।
ওঠ। তোকে তোর অনিদার মতো হতে হবে।
আমি পারব না মিত্রাদি।
পারতেই হবে।
নে ফোন কর দাদাকে। আমি বললাম।
কি বলবো?
স্পিরিটটা মাঝে মাঝে হারিয়ে ফেলিস না।
দে।
আমি আমার ফোন থেকে ডায়াল করেই ওর হাতে দিলাম।
হ্যালো।
কিরে তুই কেমন ছেলে, একটা ফোন করলি না কালকে। বড়োমাকে ভুলে গেছিস?
বড়োমা, আমি মিত্রা।
তোর গলাটা এরকম শোনাচ্ছে কেন! কিছু হয়েছে?
কিরকম?
কেমন ভারী ভারী লাগছে।
কোথায়!
অনি তোকে কিছু বলেছে?
না।
মর্কটটা কোথায় রে?
আমর কাছে বসে আছে।
দে তো কানটা মুলে।
দেব।
না থাক। ওর অনেক চাপ। বুঝি, কিন্তু মন মানে না।
সত্যি বড়োমা, ফিরে গিয়ে তোমাকে সব বলবো।
কেনরে, আবার কি হলো!
সে অনেক কথা।
ওর কাকার শরীর ভালো আছে?
হ্যাঁ।
ওই নে তোর দাদা চেঁচাচ্ছে, কে ফোন করল? সত্যি কি মিনষেরে বাবা, তোদের সঙ্গে একটু দু-দন্ড কথা বলবো সহ্য হচ্ছে না।
মিত্রা হেসে ফেললো।
হাসিস না। পঁচিশ বছর ঘর করা হয়ে গেল, হারে হারে চিনেছি।
দাদাকে দাও।
ধর। অনি আমার সঙ্গে কথা বলবে না?
আমার সামনে বসে আছে।
ওর গলাটা একটু শোনা না।
তোমাকে পড়ে দিচ্ছি।
আচ্ছা।
হ্যালো।
দাদা, আমি মিত্রা।
হ্যাঁ বলো মা। তোমরা কেমন আছ?
ভালো নেই।
কেন! অনির কাকার কোনও নতুন সমস্যা?
না। আপনাকে যেজন্য ফোন করছি।
আগে বলো ওখানকার সবাই ভালো আছে?
হ্যাঁ এখানকার সবাই ভালো আছে, আমরাও ভালো আছি।
বলো কি বলছিলে?
আজ থেকে আপনি অফিসে যান। আমি ইসমাইলকে বলে দিয়েছি। ও আপনাকে, মল্লিকদাকে নিয়ে যাবে। আর যাদের যাদের আপনার দরকার তাদের তাদের আপনি ডেকে নিন। শুক্রবার সকালে আমি আর বুবুন কলকাতা যাব।
কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে বলে মনে হচ্ছে?
মিথ্যে কথা আপনাকে বলবো না, হয়েছে।
কি হয়েছে বলো?
আপনি অফিসে গেলেই সব বুঝতে পারবেন। বাকিটা পরে ফোন করে আপনাকে বলবো।
ঠিক আছে।
ওখানে কিছু হয়েছে?
না।
সত্যি কথা বলছো?
হ্যাঁ।
নাও ছোটোর সঙ্গে কথা বলো।
কিরে কেমন আছিস?
ভালো। তুমি কোমন আছ।
ভালো, ওই ছাগলটা কোথায়?
আমার দিকে জুল জুল করে চেয়ে আছে।
দে তো ওকে।
ধরো।
মিত্রাকে ইশারা করে বলে দিলাম ইসমাইলকে ফোন কর।
মিত্রা ইসমাইলকে ফোন করছে।
বলো।
কিরে ছোটোমা-বড়োমাকে ভুলে গেলি?
কি করে ভুলবো।
তাহলে ফোন করিস নি কেন?
সব গিয়ে বলবো, ফোনে এতকথা বলা যাবে না।
খারাপ না ভালো?
খারাপ ভালো মিশিয়ে।
কবে আসছিস?
শুক্রবার রাতে তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে।
কেনরে!
আজ রাতেই মল্লিকদার কাছ থেকে সব শুনতে পাবে।
ধর দিদির সঙ্গে কথা বল।
কিরে। তোর কি হয়েছে বলতো?
তুমি রাগ করো না। একটু ঝামেলায় জড়িয়ে পরেছি।
সেই জন্য বড়োমাকে ভুলেগেছিস?
তাহলে ওই বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দেবো।
না না ঠিক আছে। আর বলবো না। তুই কবে আসবি?
ছোটোকে বলেছি।
ওই দেখ মল্লিক ফোনটা চাইছে, তোর সঙ্গে দু-দন্ড কথা বলবো কেউ তা চায় না।
ঠিক আছে আমি গিয়ে এবার কয়েকদিন দিনরাত তোমার কাছে থাকব।
কবে বল?
আগে মল্লিকদাকে দাও পরে বলবো।
মিথ্যুক, ধর বলতে হবে না।
কিরে, বড়োখেলা খেললি ডুয়েটে।
তুমি খবর পেলে কোথা থেকে?
হাওয়ায়।
বুঝেছি।
সত্যি অনি। হ্যাটস অফ।
দাদাকে বলেছো?
বলিনি। যাওয়ার আগে বলবো।
তোমায় কে জানাল?
তোর ইনফর্মারকে ভাঙিয়ে নিয়েছি।
সন্দীপ!
ও এখন অফিসে। তোর ফোন বিজি। তাই আমাকে ফোন করলো, তুই ফোন করেছিস কিনা।
তুমি নিশ্চই ওর পেটে একটা কিল মারলে?
ঠিক ধরেছিস।
আর ও তোমায় গড়গড় করে সব বলে দিল।
মল্লিকদা বলে বললো, না হলে বলতো না। একটা আনন্দের খবর শেয়ার করবে না।
দাঁড়াও ওকে দেখাচ্ছি মজা।
জানিস অনি, এই বারোটা দিন মনে হলো বারো বছর।
আবার শুরু করলে।
বিশ্বাস কর। মিত্রাকে একবার দেনা, আমার মা অনেক দিন গত হয়েছেন, ওকে একবার মা বলে ডাকি।
ভয়েস অন করা আছে, ও সব শুনতে পাচ্ছে।
মিত্রা।
বলুন।
চুপচাপ।
কি হলো?
মিত্রা আমার দিকে তাকাল।
ছোটোমা কথা বললো।
কি হয়েছে বল না? ওর চোখ দুটো ছল ছল করছে। ওকে আমি কোনও দিন….।
তুমি আধঘণ্টা অপেক্ষা করো, সব জানতে পারবে। কাল সারারাত আমরা দুজনে ঘুমোই নি। মিত্রা বললো।
সেকিরে!
দাদা কোথায়?
বাইরে ফোনে কথা বলছে।
কার সঙ্গে কথা বলছে?
জানিনা। কাছে যাওয়ার সাহস আছে। অনি ছাড়া কাউকে পাত্তাই দিচ্ছে না।
ঠিক আছে, পরে কথা বলছি।
আচ্ছা।
ফোন পর্ব শেষ হলো।
মিত্রা এর মধ্যে দুধটা খেয়ে নিয়েছে। আমি বললাম, চোখ মুখের অবস্থা দেখেছিস যা একটু জল দিয়ে আয়। ওরা নিচে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের ওপরে ডাকি। তুই এসে ওদের সামলাবি। আমি নিচে গিয়ে একটু কথা সেরে আসবো কয়েকজনের সঙ্গে।
কাদের সঙ্গে।
ও তুই বুঝবি না।
আমি মালিক বুঝবো না।
হাসলাম। আমার হাসিতেই সব কথা বলা ছিল।
সরি।
এখুনি চলে আসিস।
ঠিক আছে।
নীপা ওদের ওপরে পাঠিয়ে দাও।
মিত্রা নীপার সঙ্গে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল, সিঁড়িতে ধুপ ধাপ আওয়াজ। ম্যাডাম আপনি চলে যাচ্ছেন নাকি? অনাদির গলা পেলাম।
কেন!
এক মিনিট একটু আসুন।
যাচ্ছি।
অনাদি এসে ফোনটা আমায় দিল, কথা বল।
কে?
কথা বলনা।
হ্যালো।
অনি আমি নিরঞ্জনদা বলছি, এই জেলার সভাধিপতি।
হ্যাঁ হ্যাঁ, সেদিন নার্সিংহোমে আপনার সঙ্গে দাদা আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন।
ঠিক ধরেছ। শোনো অমিতাভদা ফোন করেছিলেন।
দাদা! আপনাকে! কেন?
তোমার কি কোনও সমস্যা হয়েছে?
দাদাকে নিয়ে আর পারা যাবে না।
শোনো আমি সব শুনেছি, অমল ওখানে গেছে, কোনও সমস্যা হলে ওকে একবার ফোন করবে। টেনশন নেবে না।
ধন্যবাদ দাদা।
রাখছি।
আচ্ছা।
অনাদিকে ফোনটা বারিয়ে দিলাম। এই নিয়ে চারবার ফোন হলো।
মানে!
প্রথমে অমলদাকে ফোন করে সব জানল, তারপর আমাকে ফোন করে সব জানল, তারপর তোর সঙ্গে কথা বলতে চাইল।
কে ফোন করেছিল? মিত্রা বললো।
আবার কে, এখানকার জেলাসভাধিপতি। দাদা ফোন করে ডিটেলস জানাতে বলেছে। দাদাকে নিয়ে আর পারা যাবে না। তুই আবার এলি কেন?
অনাদি ডাকলো।
যা তুই। তারাতারি আয়।
মিত্রারা বেড়িয়ে গেল।
অনাদি ওদের সকলকে ওপরে ডাকল।
সিঁড়ির মধ্যে হুড়ুম দুড়ুম আওয়াজ। ঘর ভড়ে গেল।
বাসু আমার পাশে এসে বসলো।
অনাদি আপনাদের ডেকে এনে আমাকে সারপ্রাইজ দিল।
অমলবাবু হাসলেন।
অনি আমি বাধ্য হয়েছি ডাকতে, তুই বিশ্বাস কর। অনাদি বললো।
ওর নামে রিটিন কমপ্লেন জমা পরেছিল। অমলবাবু বললেন।
কে করেছিল!
এই যে শ্রীমান। দিবাকরের দিকে তাকাল।
দিবাকর মাথা নিচু করে বসে আছে।
তুই কি শুরু করেছিস?
ওরা আমাকে চাকরি দেবে বলেছে।
যে কাজের কথা তোকে বলেছে তার জন্য কতটা এলেম লাগে তুই জানিস?
তুই বিশ্বাস কর এই সুনিতবাবু আমার ইন্টারভিউ নিয়েছে বলেছে ম্যাডাম ফিরে এলে চাকরি পাকা। আমি মুখ ফস্কে বলেফেলেছিলাম, ম্যাডাম আমাদের ওখানে। তুই বিশ্বাস কর ওরা মোবাইল দিয়েছে, টাকা দিয়েছে, বলেছে নিউজ ঠিক মতো করতে পারলে চাকরি পাকা।
নীপা চা-এর ট্রে নিয়ে ঢুকলো, পেছনে মিত্রা।
নীপা, চিকনা চেঁচিয়ে উঠলো। তারপরই জিভ বার করে ফেললো মিত্রাকে দেখে।
ষাঁঢ়ের মতো চেঁচাচ্ছ কেন।
আমি আছি কিনা।
তুই আছিস সবাই দেখতে পাচ্ছে, সঞ্জু বললো।
তুই এর মধ্যে ঢুকলি কেন। কথাটা আমার সঙ্গে….।
গলা টিপে দেব।
সঞ্জু। বাসু চেঁচাল।
থাম তোরা, যেন সাপে নেউলে। আমি বললাম।
অনাদির দিকে তাকিয়ে বললাম, এবার পার্টিটা হোক।
সকলে হই হই করে উঠলো। মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে একবার মুচকি হাসল।
শালারা যেন গরুর পাল। আস্তে করে কানের কাছে এসে বললো, কিরে ম্যাডাম শুনতে পায় নি? অনাদি বললো।
না মনে হয়।
মিত্রা সকলের দিকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিল।
আমার কাছে এসে বললো, রাতে বাঁশবাগানে।
অনাদি কথাটা শুনলো।
তাই হবে ম্যাডাম।
টাকা আমি দেব।
অনির অনারে পার্টিটা আমরা দেব। অনাদি বললো।
বাসু হাসতে হাসতে বললো, আমি অনাদিকে এ ব্যাপারে সাপোর্ট করছি।
ঠিক আছে। তোরা ৪০ ভাগ দে, মিত্রা ৬০ ভাগ দিক। কিছু খসা না। অনেক আছে।
বুবুন খারাপ হয়ে যাবে। মিত্রা চোখ পাকালো।
অমলবাবু আমাদের কথা শুনে হাসছেন।
চা পর্ব শেষ হলো।
ঠিক হলো, বাঁশবাগানেই রাতে পিকনিক হবে।
সবাই চলে গেল, থাকলাম আমি বাসু, অনাদি, চিকনা।
অনাদির দিকে তাকিয়ে বললাম, আমি একটা রিকোয়েস্ট করবো তোদের, রাখবি।
বল।
আমি দুপুরবেলা ঘণ্টা তিনেক ঘুমবো। আর টানতে পারছি না।
তোকে কেউ ডিস্টার্ব করবে না।
ওরা সবাই চলে গেল।
মিটসেফের ওপর থেকে সিগারেটের প্যাকাটটা নিয়ে এলাম, টান টান হয়ে বিছানায় শুলাম। আঃ কি আরাম, প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে ধরালাম।
দেবাশিসকে একটা ফোন করলাম, ও রিলায়েন্সের সিইও।
সন্দীপকে ফোন করে অফিসের খবর নিলাম। ও তো ফোন ছাড়তেই চায় না। কলকল করে সব কথা বলে যাচ্ছে। শুধু বললাম দাদা এসেছেন কিনা।
ও বললো, এসেছে কিরে, যেন আফ্রিকান লায়ন, গলার স্বর পর্যন্ত চেঞ্জ।
সুনিতের চেলুয়াগুলো?
এই দশদিনে যারা রাজ করেছিল, তারা সব শুয়োর হয়ে গেছে।
গিয়ে সব শুনবো। ফোনটা কেটে দিলাম।
আমি জীবনের প্রথম একটা মাইলস্টোনে পৌঁছলাম। বেশ ভালোলাগছিল।
জানিনা পরে আমার কপালে কি লেখা আছে। আরো কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবকে ফোন করলাম। ক্লান্তি সারা শরীরে। কখন ঘুমিয়ে পরেছি খেয়াল নেই। একটা নরম হাতের স্পর্শে চোখ খুললাম। একটা প্রতিমার মতো মুখের ছবি আমার চোখের সামনে। আমায় দেখে মিটি মিটি হাসছে। সিঁথিতে লালা সিঁদুর, কপালে সিঁদুরের টিপ। পরনে লালাপার শাড়ি।
আমার কপালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
ওঠ অনেক বেলা হলো। ধড়ফর করে উঠে পরলাম। মিত্রা আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ওকে দেখে অবাক হয়ে গেলাম। এখানে এগুলো পেলো কোথা থেকে! তারপরে ভাবলাম হয় তো নিয়ে এসেছে।
যা স্নান করে আয়। খিদে পেয়েছে।
আমি টাওয়েলটা নিয়ে বেরতে যেতেই মিত্রা আমার হাত চেপে ধরলো।
বললিনা কেমন লাগছে।
হাসলাম।
কাকিমা দিলো। পরলাম।
আমি স্নান করে এখুনি আসছি, কাপর ছাড়বি না।
আচ্ছা।
আমি বেরিয়ে এলাম।
নীপা ঘাটে জামা কাপড় কাচা কাচি করছে। আমি পাশ কাটিয়ে নেমে গেলাম। নীপা একবার আমার দিকে তাকাল। অন্য সময় হলে নীপাকে বলতাম এখন যাও। বললাম না। গামছাটা কাছা দিয়ে বেঁধে জলে ঝাঁপ দিলাম। বেশ কিছুক্ষণ সাঁতার কাটলাম। নীপা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। এইকদিন জলে নেমেছি, তবে পাড়ে বসেই স্নান করেছি।
তুমি সাঁতার জান!
তোমার কি মনে হয়?
তাহলে পাড়ে বসে স্নান করতে যে?
জলে নামতে ভালো লাগত না।
গা মুছে পুকুর ঘাট থেকে ঘরে চলে এলাম।
মিত্রা বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। কার সঙ্গে ফোনে কথা বলছে।
আমায় দেখেই বললো, ওই তো অনি এসেছে।
কে?
কথা বল।
অনিবাবু।
আরে দাদা আপনি, বলুন।
ওয়াইজ ডিসিশন।
এভাবে বলবেন না। আপনি এখন কোথায়?
মুম্বাই।
কলকাতায় কবে আসছেন?
দেখি, আগামী মাসের প্রথমে।
ডা. ব্যানার্জী ফোনটা রেখে দিলেন, কেমন যেন খটকা লাগল।
মিত্রা আমার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে নিল।
তুই হেজাতেও পারিস।
আফটার অল তোর বিয়ে করা বড়।
কচু।
তার মানে!
সময় করে একদিন তোকে সব বলবো। আমি কাউকে বিয়ে করিনি। আমায় বিয়ে করা হয়েছিল।
এর আগেও তুই এই কথাটা একবার বলেছিস।
আয় ঘরে আয়।
আমি ঘরে এলাম। মিত্রা আমার পেছন পেছন ঢুকলো। আমি আলনা থেকে একটা পাজামা পাঞ্জাবী বার করলাম। দেখলাম মিত্রা ঘরের দরজায় খিল দিচ্ছে।
কিরে!
ওর চোখে মুখে দুষ্টুমি।
তুই কাপর ছাড়তে বারন করেছিলি কেন।
একটু দাঁড়া।
আগে বল। আমার কাছে এগিয়ে এসে টাওয়েলে হাত রেখেছে।
ছাড়। বলছি।
ছাড়বো না।
ঠিক আছে ধরে দাঁড়া যেন খুলে না যায়।
আমি আলমাড়ির কাছে গেলাম, আলমাড়ির মাথার থেকে চাবিটা নিলাম। আলমাড়িটা খুললাম। অনেকদিন আগে এই বাক্সতে হাত দিয়েছিলাম। কত দিন হবে। প্রায় দশ বছর।
যেদিন কলকাতায় পড়াশুনার জন্য গেলাম। সেইদিন। বাক্সটা বার করে আনলাম। মিত্রা বুঝতে পেরেছে। ও আমার টাওয়েল থেক হাত সরিয়ে নিয়েছে। আমি ওকে বাক্সটা খুলে মায়ের ছবিটা দেখালাম। ও হাতজোড় করে প্রণাম করলো। তারপর হাতে নিয়ে মাথায় ঠেকাল।
এটা নিয়ে যাব।
মায়ের এই একটাই এরকম ছবি আছে।
ঠিক আছে এই দায়িত্বটা আমি নিলাম।
কি দায়িত্ব নিলি?
এই ছবির থেকে অনেক গুলো ছবি করবো।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।
মায়ের বাক্সের মধ্যে একটা সোনার চেন ছিল। ওটা বার করলাম।
সোনা বলে এখন আর বোঝা যায় না। কেমন পেতল পেতল দেখতে হয়ে গেছে। মিত্রা আমার কাছে এগিয়ে এলো। চোখ দুটো ছল ছলে।
এটা পরার যোগ্যতা আমি এখনও অর্জন করিনি বুবুন। তুই মনখারাপ করবি না। আমি ঠিক সময়ে তোর কাছ থেকে এটা চেয়ে নেব।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম। ওর চোখ মিথ্যে কথা বলছে না।
ওটা তুলে রাখ।
আমার কাছে এগিয়ে এসে আমার কাঁধে হাত রাখলো, তুই রাগ করলি না?
না।
মনখারাপ করলি না?
চুপ করে থাকলাম।
আমার দিকে তাকা?
ওর দিকে তাকালাম।
চোখে চোখ রাখ?
ওর চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলাম।
আমি জানি। তবে এও তোকে বলছি, আমি তোর ছাড়া আর কারুর নয়। অন্য কেউ হলে নিয়ে নিতাম। তোর মার জিনিস। তোকে দেখে তাঁকে আমি শ্রদ্ধা করতে শিখেছি। তুই আমার ওপর রাগ করলি না?
সত্যি বলছি।
এটা আমার, সম্পূর্ণ আমার। এটা তুই কাউকে কোনওদিন দিবি না।
সেই জন্যই বার করেছিলাম।
দে আমি তুলে রাখি। তোকে যখন চাইবো, তুই আমাকে দিবি।
মিত্রা মায়ের ছবিটা বার করে নিল। বাক্সটা নিজে হাতে যেখানে ছিল সেখানে তুলে রাখল। আমি আলমাড়িটা বন্ধ করলাম।
তোর বাবার কোনও ছবি নেই?
আছে।
কোথায়?
বাবা-মার একসঙ্গে একটা ছবি আছে। কলকাতায়, আমার ফল্যাটে।
ঠিক আছে।
কি ঠিক আছে?
সব কথা ছেলেদের বুঝতে নেই।
আচ্ছা। এবার পাজামা পাঞ্জাবী পরে নিই।
পর।
তুই কাপর ছাড়বি না?
না।
নীপা নিচ থেকে ডাকল। চলে এলাম। সবাই একসঙ্গে বসে খেলাম। হাসি ঠাট্টা হলো।
খাওয়া শেষ হতে মুখ ধুয়ে আমি আগে চলে এলাম।
পাঞ্জাবীটা খুলে আলনাতে রাখলাম। সত্যি শরীরে ক্লান্তি জড়িয়ে আছে। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে। মিত্রা ঘরে ঢুকলো। দরজাটা ভেতর থেকে খিল দিল।
কিরে খিল দিচ্ছিস কেন?
কেন সবাইকে দেখিয়ে সব কিছু করতে হবে।
ওর কথা শুনে হাসলাম। জানলার দিকে মুখ করে শুলাম।
আজকের রোদটা বেশ কড়া, বাঁশঝাড়ের তলায় একটা কুকুর শুয়ে আড়মোঢ়া ভাঙছে।
সর, চিত্তাল হয়ে শুলে আমি শোব কোথায়?
আমি জানলার দিক থেকে ওর দিকে ফিরলাম। ও ব্রা আর সায়া পরে এসেছে।
কিরে এরকম অর্ধনগ্ন!
ওই টুকু তোর জন্য রেখেছি। সর না।
আর কতোটা জায়গা লাগবে তোর?
মিত্রা পাদুটো ওপর দিকে তুলে শায়াটা থাই পর্যন্ত তুলে নিল।
কি হলো?
এতক্ষণ কাপর পরা অভ্যাস আছে। তোর পাল্লায় পরে তবু কাপরটা গুছিয়ে পরতে শিখলাম।
যাক তাহলে কিছু একটা শিখলি।
মিত্রা মুচকি হাসল।
দাঁড়া জানলাটা বন্ধ করি।
এটা বন্ধ কর। মাথার শিয়রেরটা বন্ধ করিস না। খুব সুন্দর হাওয়া আসছে।
এসিকেও হার মানায়।
আমি ওর দিকে ঘুরে শুলাম। তোর জায়গাটা ভালো লাগছে।
দারুন। আমি যা এক্সপেক্ট করেছিলাম তার থেকেও।
তখন দাদা কি বলছিল?
দুর ওই ধ্বজভঙ্গটার কথা ছাড় তো, ও একটা পুরুষ নাকি।
এতো বড় একটা বিজনেস।
ওটাও আমার। ফিফটি ওর ফিফটি আমার।
আচ্ছা তুই এতোটাকা পেলি কোথায়?
এখুনি জানতে ইচ্ছে করছে?
মাথা দোলালাম।
আমার অন্য কিছু করতে ইচ্ছে করছে, সাতদিন হয়ে গেল।
হাসলাম। আচ্ছা এটাই কি জীবনের সব?
সব নয় তবে এটার জন্যই পৃথিবীটা টিঁকে আছে। তোর ভালো লাগে না!
আমি সেই কথা বললাম।
মিত্রা আমার বুকে উঠে এলো।
কলেজ লাইফটা বাদ দিলে, তোর সঙ্গে আমার প্রায় ছয় বছর পরে দেখা।
তুই মনে রেখেছিস?
ধ্যুস ফিতেটা খোল তো একটু ফ্রি হয়ে শুই।
মিত্রা উঠে বসে পিঠ ঘোরাল। আমি ওর ব্রার হুকটা খুলে দিলাম। ওর বুকের অর্গল খসে পরলো।
কি বলছিলাম?
ছয় বছর।
জানিস বুবুন তোর জন্য আমি বুড়ো বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করতাম।
মিত্রা আর একটু কাছে সরে এলো।
কেন?
আমার বাবা একমাত্র তোকে চিনেছিলেন। বাবার কথাটা আমি এখনও অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলি।
ওর চোখ দুটো ভারি হয়ে এলো।
আমি ওর চোখটা মুছিয়ে দিলাম।
লোকে ভাবে আমার কিসের অভাব, জানিস আমি পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র মানুষ।
মিত্রা বুকে মুখ গুঁজে রয়েছে।
পয়সা পৃথিবীর সব নয়। মাঝে মাঝে কলেজ লাইফের কথা মনে পড়ে যায়। তোর পোষাক তোর চালচলন। এখনও চোখ বন্ধ করলে ছবির মতো ভেসে ওঠে।
তোকে যে কখন ভালোবেসে ফেলেছিলাম নিজেই জানিনা।
আমি ওকে জড়িয়ে ধরলাম।
মিত্রা আমার বুকের মধ্যে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল।
আমার বুকটায় আঙুল দিয়ে বললো, তোর এইখানটা আমার সবচেয়ে শান্তির জায়গা। তাই মাঝেমাঝে পগলাম করি।
আমি মিত্রার মুখ বুক থেকে সরিয়ে এনে ওর ঠোঁটে ঠোঁট রাখলাম।
মিত্র আমার বুকে উঠে এলো। চোখের কোল ভিজে ভিজে।
আমি মিত্রার দিকে তাকিয়ে আছি।
একটা পুরুষমানুষ নারী ছাড়া বাঁচতে পারে, কিন্তু একটা মেয়ে পুরুষ ছাড়া বাঁচতে পারে না। ওটাই যে তার সব চেয়ে বড় অবলম্বন, তুই ছাড়া আমার কে আছে বল।
মিত্রা আমার ঠোঁটে ঠোঁট ডোবাল।
মিত্রার শরীরটা ধীরে ধীরে উষ্ণ হচ্ছে, ঠোঁটে ঠোঁটে আলিজ্ঞন।
আমি খাটে শুয়ে মিত্রা আমার বুকে।
ওরে বুকটা ফেটে যাবে।
যাক তবু মনে করবি মিত্রা আমার বুক ফাটিয়েছিল।
হাসলাম।
মিত্রা আমার নাকটা জোড়ে টিপে ধরে নাড়িয়ে দল।
কখনও মিত্রা খুনসুটি করেছে আমি হেসেছি। কখনও আমি খুনসুটি করেছি মিত্রা সীৎকার দিয়ে উঠেছে।
কতোক্ষণ এই ভাবে দুজনে শরীরে শরীর মিশিয়েছিলাম জানিনা, ঘামে ভিঁজে জ্যাব জ্যাব করছি।
উঠতে চাইলাম।
উঠিস না।
মিত্রা চোখ বন্ধ করেই বললো।
আর একটু এই ভাবে থাকি।
বেশ কিছুক্ষণ ওই ভাবে ছিলাম, তারপর জানি না।
প্রচন্ড জোরে দরজায় ধাক্কা দেবার শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল।
মিত্রাদি ও মিত্রাদি, অনিদা ও অনিদা। কি ঘুমরে বাবা।
চোখ মেলে তাকালাম ঘরের ভেতরটা অন্ধকার ঘুটঘুট করছে। বাইরে কোথাও বক্সে তারস্বরে গান বাজছে। একটা হইহই শব্দ। চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছি না। আস্তে আস্তে বাইরের আলোয় ঘরটা আলোকিত হলো। মিত্রা আমাকে জাপ্টে ধরে শুয়ে আছে। ওর গায়ে এক ফোটা কাপড়ও নেই। আমিও উদম অবস্থায়। ওর হাঁটু আমার থইয়ের ওপর। যেন আমি ওর পাশ বালিশ।
আমি মিত্রার চিবুক ধরে নারলাম, ফিস ফিস করে ডাকলাম, মিত্রা এই মিত্রা।
উঁ।
কেলো করেছে।
কি হয়েছে।
শোননা।
দূর ভালো লাগছে না।
আরে সবাই চলে এসেছে।
বেশ হয়েছে।
দূর বেশ হয়েছে। ওঠ।
উঠবো না।
হায় রাম রাম। তুই নেংটো হয়ে।
দিলাম চিমটি। মিত্রা নড়ে চড়ে উঠলো।
তুই উঠে আমায় বাঁচা। সব কেলোর কীর্তি হয়ে গেল।
মিত্রা চোখ চাইলো। জড়িয়ে জড়িয়ে বললো, কি হলো?
সন্ধ্যে হয়ে গেছে। সব্বনাশ হলো। দেখ সবাই চলে এসেছে।
মিত্রা এবার তরাক করে উঠে বসলো। কটা বাজে?
মিত্রা নিজের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেললো। বুকের কাছে হাত ঢাকলো।
দুজনের শরীরে একফোঁটা কাপর নেই।
ও আমার গলা জড়িয়ে আদো আদো কন্ঠে বললো, উঠবো না।
দেরি করিস না। তারাতারি কাপরটা পর। ওদের মুখের কোনও ট্যাক্স নেই।
আজ নয় কাল সবাই জানতে পারবে।
যখন জানতে পারবে তখন পারবে। তুই এক কাজ কর, কাপরটা পরে নিচে গিয়ে দরজা খোল। নীপা ডেকে ডেকে গলা ফাটিয়ে ফেললো।
তুই।
আমি নিচে মাদুর পেতে মটকা মেরে শুয়ে আছি।
মিত্রা হাসছে।
আমি পাজামা পাঞ্জাবী গায়ে চাপিয়ে, মাদুরটা নিচে পেতে একটা বালিশ নিয়ে শুয়ে পরলাম।
মিত্রা আমার কথা মতো কাজ করলো।
একটুপরে শিঁড়িতে ধুপধাপ শব্দ। বুঝলাম নীপা, মিত্রা একলা নয়, আরও কয়েকজন আসছে।
অনিদা ওঠেনি। নীপার গলা।
ও এখনও ঘুমচ্ছে।
সত্যি, কি ছেলেরে বাবা। তুমি আলো জ্বালাও নি কেন!
কোনটা কোন সুইচ জানি না। অন্ধকারে দেয়ালে ধাক্কা খেলাম, কনুইটাতে কি লাগল।
কোথায় দেখি!
লাইট জোললো। বুঝলাম অনাদি আর বাসু এসেছে।
এ মা অনিদা নিচে শুয়ে ছিলো নাকি! আগে জানলে বিছানা করে দিয়ে যেতাম। নীপা বললো।
তুইও আছিস। ছেলেটা কখন থেকে নিচে শুয়ে আছে, ঠান্ডা লেগে যাবে। অনাদি বললো।
আমি ওকে ওপরে শুতে বললাম। ও শুলো না। মিত্রা বললো।
তোর ঘটে একটুও বুদ্ধি নেই।
সত্যি অনাদিদা, আমার ভুল হয়ে গেছে।
দেখ ম্যাডামের কনুইতে কোথায় লেগেছে। একটু জলটল দে। অন্ধকারে পড়েটরে গেলে একটা কেলোর কীর্তি হতো এখুনি।
দাঁড়াও আমি ছুটে গিয়ে ওবাড়ি থেকে বাম নিয়ে আসি।
থাক। এখন যেতে হবে না। তুই বুবনকে ডাক। মিত্রা বললো।
না এখন ডাকিস না, একটু ঘুমোক। বেচারার অনেক টেনশন। কাল থেকে ওর ওপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেছে, আমরা হলে হাপিস হয়ে যেতাম। তুই বরং চা করে নিয়ে আয়।
নীপা বেরিয়ে গেল, বাসুরা সোফাতে বসেছে। মিত্রা খাটে এসে বসেছে।
ওখান থেকে কোনও ফোন এসেছিল ম্যাডাম? অনাদি জিজ্ঞাসা করলো।
বুবুন ফোন করেছিল। আমি ঘুমিয়ে পরেছিলাম।
সত্যি সেই ছোটো থেকে ও শুধু সবার জন্য করেই গেল।
মিত্রা অনাদির দিকে তাকাল।
সত্যি ম্যাডাম, আপনি ওকে কলেজ লাইফ থেকে দেখেছেন, আমরা ওকে সেই ছোটো থেকে দেখেছি। বাসুকে জিজ্ঞাসা করুণ, এই গ্রামের একজনকেও আপনি পাবেন না, যে অনিকে ভালোবাসে না।
দেখছি তাই।
কালকে যা হয়েছিল, আপনি ওর চোখ মুখ দেখলে ভয় পেয়ে যেতেন। অনাদি বললো।
আমরাই ভরকে গেছিলাম। ছোটো থেকেই ওর মাথাটা ঠান্ডা। ও রাগতে জানে না। বাসু বললো।
কিন্তু রেগে গেলে সাংঘাতিক। তোমরা সেই দৃশ্য দেখ নি। আমি দেখেছি। মিত্রা বললো।
না ম্যাডাম, সেই সৌভাগ্য আমাদের হয়নি।
অনি, অনি ওঠ এবার, তোর জন্য….। অনাদি ডাকল।
অনাদির ঠেলায়, আমি আড়মোড়া ভেঙে চোখ তাকালাম, খাটে মিত্রা বসে আছে, ও জুল জুল করে আমার দিকে তাকিয়ে। ওর চোখের ভাষা হাসবো না কাঁদবো? আমি উঠে বসলাম।
তাকিয়ে দেখ। তোর আগে আমি উঠেছি। ঘুম কাতুরে। মিত্রা বললো।
মিত্রার দিকে তাকালাম, নাঃ কাপরটা ঠিক ঠাক পরেছে। অনেকটা সাধারণ গৃহস্থ বাড়ির মেয়ের মতো। আটপৌরে।
আমি মাথা নিচু করে হাসলাম। তোরা কখন এলি?
এই তো কিছুক্ষণ আগে।
নীপা চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে ঘরে ঢুকলো।
বাবাঃ কি ঘুম তোমার, যেন কুম্ভকর্ন। আচ্ছা তুমি যে নিচে শোবে আগে বলনি কেন?
আমি নীপার দিকে তাকালাম। ওর চোখের ভাষা বোঝার চেষ্টা করলাম। না ও ধরতে পারে নি।
মালকিনের সঙ্গে একঘরে শুচ্ছি, এটাই অপরাধ। তুমি আবার এক বিছানায় শুতে বলছো। তাহলে চাকরিটাই চলে যাবে।
মিত্রার দিকে তাকালাম। ও মুচকি মুচকি হাসছে।
ঠিক আছে বাবা, আমার অপরাধ হয়েছে। এখন মুখেচোখে জল দিয়ে নাও। নীপা বললো।
জল দিতে হবেনা, চা দাও, হাই তুললাম।
এ মাগো, ঘুমের মুখে। যাও মুখটা ধুয়ে এসো।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে মিটসেফের ওপর থেকে জলের মগটা নিয়ে বাইরে গেলাম। দেখলাম মিত্রাও শুর শুর করে আমার পেছন পেছন এলো। অন্ধকারে আমার পাঞ্জাবীটা চেপে ধরে আছে।
ইশারায় বলছে নিচে চল।
আমি হাসছি। ফিস ফিস করে বললাম।
টানাটানি করলে পাঞ্জাবীটা ছিঁড়বে।
দেরি করিস না। কাপর নষ্ট হয়ে যাবে।
ভিঁজিয়ে ফেলেছিস নাকি।
না। অনেকক্ষণ চেপে রয়েছি।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলাম। খিড়কী দরজা খুলে বাইরে এলাম।
কখন থেকে টন টন করছে, তুই ওদিকে মুখ কর।
আমার পাঞ্জাবীটা ছাড়।
দাঁড়া। আমি এখানেই বসে পরি।
মিত্রা কোনওপ্রকারে একহাতে কাপর তুলে বসে পরলো। আমি ওর অবস্থা দেখে হেসে মরি। কি করবো অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
জলটা দে।
কেন!
উঃ সব কথা তোকে বলতে হবে। ওদিকে মুখ করে থাক।
মিত্রা চোখমুখ ধুলো।
চল।
আমি মুখটা ধুই। এবার পাঞ্জাবীটা ছাড়।
না। তুই মুখ ধো, বুঝতে পারছিস না, অন্ধকার।
ভূত এসে তোর পেটে ঢুকে যাবে।
কথা বলিসনা, ভেতরে চল।
ভেতরে এসে ছিটকিনি দিলাম। মিত্রা আমার গালে একটা চুমু দিয়ে বললো, তুই পারিসও বটে, সেই সময় যা হাসি পাচ্ছিল।
আমি ওর গালটা ধরে একটু নেরে দিলাম।
দুজনে ঘরে এলাম। নীপা চা ঢেলে দিল। পাঁপড় ভাজা চা। বেশ খেতে লাগল।
মিত্রা, বাসুর দিকে তাকল।
বাসু সকালে যা অবস্থা ছিল তোমাকে বলতে পারি নি, আমার জিনিস?
বাসু বললো, ম্যাডাম সত্যি বলছি একবারে ভুলেগেছি, বিশ্বাস করুণ।
তুমি এখুনি নিয়ে এসো। দাঁড়াও তোমাদের কার কার এখনও পর্যন্ত হয়েছে?
তুই ঠিক, হেসে ফেললাম….।
তোকে আর বক বক করতে হবে না।
কার কার এখনও পর্যন্ত হয়েছে মানে? অনাদি বললো।
বাসু ইসারা করলো।
অনাদি হো হো করে হাসছে।
নীপা আমার মাথার চুলগুলো নিয়ে বিলি করছিল।
মিত্রাদি দেবো পিঠে একটা গুম করে।
জোরে দে।
মিত্রা এমন ভাবে দাঁত খিঁচিয়ে বললো, সবাই হেসে ফেললো।
আমার, বাসু আর ভানুর ছাড়া কারুরি হয়নি। আমার দুটো বাসুর একটা। আর ভানুর দুটো। অনাদি বললো।
যাও পাঁচটা নিয়ে এসো, ওরা এখুনি আসবে আমি ওদের হাতে দেব।
থাক না, কালকে দেবেন।
কাল কোথা থেকে দেব!
কালকে বাজার বার আছে, আপনি হাটে যাবেন ওখান থেকেই কিনে দেবেন।
আমি তো ওদের দেখতে পাব না।
ঠিক আছে আমরা সবাই সঙ্গে করে নিয়ে আসবো। হয়েছে। অনাদি বললো।
মনে হলো কথাটা মিত্রার মনে ধরলো।
ঠিক আছে। মনে থাকে যেন।
তোমরা এবার তোমাদের শরীরটা গোছাবে তো। নীপার দিকে তাকিয়ে বললাম।
তোমাকে না পিট্টি।
দে না দে, মুখে বলছিস কেন, আমি তো আছি। মিত্রা বললো।
বাঁশবাগানকে এখন বাঁশবাগান বলে মনে হচ্ছে না, চারিদিকে আলোর রোশনাই।
সঞ্জয়বাবুর হাত যশ।
জেনারেটর চলছে। একদিকে রান্নার আয়োজন। চিকনা সব দেখা শোনা করছে।
আমাকে দেখে এগিয়ে এলো, গুরু সব মনপসন্দ হয়েছে।
এর থেকে ভালো হয় না।
একটা সিগারেট।
আমি একা।
ও শালারা হার হারামী, বলে কিনা সিগারেট যে যার নিজের ফান্ডে খাবে।
তোরা আমায় খরচ করতে দিলি না, সিগারেটটা আমি দিই।
না। ওটা আমি স্পনসর করছি। চিকনা বললো।
তাহলে ওদের দে।
দেখলি কি ভাবে ঘুরিয়ে ঝারলো। অনাদি বললো।
নে খা।
অনাদি, বাসু হাসছে।
গুরু ওইটা দেখেছো। চিকনা বললো।
কোনটা!
ওই যে দিবাকর কেশ।
মনেই ছিল না।
সত্যি তুই একটা মাকাল ফল। এই সব মাল কেউ ছাড়ে। দে তোর মোবাইলটা।
রেখে এলাম। তুই নিয়ে আয়।
চিকনা একটা ছুট লাগাল। অনাদি বললো, পাগল একটা।
জানিস অনাদি, ওর মোনটা এখনও বিষিয়ে যায়নি।
হ্যাঁ। তুই ঠিক বলেছিস। আমাদের মধ্যে ও এখনও ঠিক আছে। তারপর পরিবেশ পরিস্থিতি মানুষকে অনেক পরিবর্তন করে দেয়।
একবারে ঠিক কথা।
চিকনা ফিরে এলো। হাঁপাতে হাঁপাতে বললো, তুই এখুনি আমাকে কেস খাওয়াতিস।
কেন!
আগে বলবি তো ওটা এখন ড্রেসিং রুম। ভাগ্যিস দরজা বন্ধ ছিল।
পেয়েছিস?
হ্যাঁ। তোরা দেখবি।
বাসু হাসছে। তুই দেখ।
হ্যাঁরে সেগো, তোরা সব সতী হয়ে গেছিস কিনা, যা তোদের দেখতে হবে না, আমি আর সঞ্জু দেখি। বাসু হাসছে।
চিকনা চলে গেল।
দিবাকর আসবে না? অনাদির দিকে তাকালাম।
আসবেনা মানে, চলে এলো বলে।
ওই মেয়েটা আসবে।
আসবে হয়তো, নীপার সঙ্গে ওর খুব ভাব।
নীপার সঙ্গে কারুর ইন্টু মিন্টু আছে নাকি?
এখনও পর্যন্ত যতদূর জানি নেই। ও খুব তেজি ঘোঁড়া, ওকে পোষ মানান খুব মুস্কিল। তাছাড়া, আমাদের গ্রামের সবচেয়ে ভালো রেজাল্ট করা মেয়ে। ওই দেমাকটাও আছে।
এই দেমাক থাকা ভালো।
দিবাকর একবার লাইন লাগিয়েছিল। তারপর থাপ্পর খেলো। বাসু বললো।
এ্যাঁ!
সেই নিয়ে কত জল ঘোলা হলো। খালি স্যার বললো বলে।
তোরা কিছু বলিস নি?
ভাবলি কি করে বলিনি, তারপর ওই মেয়েটা ফেঁসে গেল। অনাদি বললো।
এখন কি ওকে বিয়ে করবে, না ফুর্তি করে ছেরে দেবে।
তা হয়তো পারবে না। বাসু বললো।
তুই কি বলিস? অনাদি বললো।
যদি মেয়েটাকে বিয়ে করে তাহলে আমি মিত্রাকে বলে ওর একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারি। তবে কলকাতা নয়। এখানেই থাকতে হবে। ওকে ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেস করে দেব। হাজার সাতেক টাকা মাইনে পাবে।
তাহলে খুব ভালো হয়। বাসু বললো।
তুই কথা বল।
তুই চিকনার জন্য একটা ব্যবস্থা কর।
ওর জন্য আমার মাথায় একটা প্ল্যান আছে। শুক্রবারটা আমার খুব ভাইট্যাল।
অনাদি।
বল।
তুই রবিবার বাসু আর চিকনাকে নিয়ে আমার ফল্যাটে চলে আয়। অসুবিধে হবে?
না। সেদিনই ফিরে আসব।
সকাল সকাল চলে আসিস, বিকেলের ট্রেনে ফিরে আসবি।
সেটাই ভালো, বাসু বললো।
কাকা আমায় ডেকেছিল আমার জমি-জমার ব্যাপার নিয়ে, সেটা নিয়েও আমার একটা পরিকল্পনা আছে, সেটাও আলোচনা করে নেওয়া যাবে।
তুই কি প্ল্যান করেছিস? অনাদি বললো।
আয় না, জানতে পারবি। হ্যাঁরে বাসন্তী পুজো এখনও হয়?
না হওয়ার কি আছে, গ্রামে ওই একটা পূজো, সবাই সারা বছর অপেক্ষা করে থাকে।
দশবছর পূজো দেখা হয়নি। জানিনা কলকাতা গিয়ে আমার কপালে কি লেখা আছে, যদি সময় বার করতে পারি, অবশ্যই আসবো এবার।
আসবো মানে! তোকে আসতেই হবে, উইথ ম্যাডাম। জানিস আমরা এরই মধ্যে কতো পরিকল্পনা করে ফেলেছি। অনাদি বললো।
শোনা যাবে?
নে তোর মোবাইল ধর। চিকনা এসে মোবাইলাটা দিল।
দেখলি? অনাদি বললো।
চিকনা এমন ভাবে তাকাল, অনাদি হেসে ফললো।
খাসা মাল, তুললো কি করে বলতো?
যেমন ভাবে তোলে। আমি বললাম।
শালা দেখলে বোঝাই যায়না ওরকম নেওবাই আছে।
চিকনা। আমি ইশারা করলাম।
চিকনা পেছন ফিরে তাকাল। মিত্রা, নীপা আসছে।
চিকনা কান-নাক মুলছে। বড়জোড় বেঁচে গেলাম। জেনারেটর চলছে বলে।
হাসলাম।
এখন থেকে মুখ সামলিয়ে। অনাদি বললো।
সে আর বলতে।
মিত্রা, নীপা দুজনেই আজ শালোয়ার কামিজ পরেছে, অনেকটা কাশ্মীরি স্টাইলের। দারুন লাগছে দুজনকে। আমার সামনে এসে মিত্রা চোখ নাচিয়ে বললো, বল কেমন দিয়েছি।
ওর বলার ধরনে বাসু মুচকি হাসলো।
অনাদি, আর সবাই কোথায়? কাউকে দেখছি না। মিত্রা বললো।
সবে সাড়েছটা, সাতটা নাগাদ সবাই চলে আসবে।
অমলবাবু আসবেন না? আমি বললাম।
অবশ্যই। আজরাতে থাকবে, বাসুর বাড়ির একটা ঘর ফিট করেছি। ওখানে রাতে পুরে দেব। কাল সকালে একটা মিটিং আছে বাজার কমিটিকে নিয়ে, তারপর বিকেলের দিকে যাবেন।
মিত্রা বললো, মেনু কি?
ফ্রাইড রাইস, চিকেন, চাটনি, দই, মিষ্টি।
কাকা চিকেনের পার্মিশন দিয়েছে? আমি বললাম।
ভিটেতে উঠছে না। চিকনা বললো।
কাকাদের জন্য?
মাছের ব্যবস্থা করেছি, সুরমাসি রাঁধবে।
গন্ধটা দারুন বেরিয়েছে। আমরা একটু টেস্ট করবো না। মিত্রা বললো।
একটু অপেক্ষা করুণ। অনাদি বললো।
দই কি, মিষ্টি না টক? আমি বললাম।
মিষ্টি দই।
আমার জন্য একটু ওই দইয়ের ব্যাবস্থা কর। চিকনার দিকে তাকালাম।
তুইনা সত্যি….।
খই মুড়ি দিয়ে পইড়্যা ঘরের সেই দই, এখনও মুখে লেগে আছে।
চিকনা বললো, ঠিক আছে, তোর জন্য, আর কেউ ব্যবস্থা করুক আর না করুক আমি করবো।
হাসলাম।
আমায় খাওয়াবে না? মিত্রা বললো।
ঠিক আছে হবে।
আপনার জন্য? চিকনা, নীপার দিকে তাকাল।
আমি দুজনের থেকে ভাগ বসাব।
দুঃখিত। অনির ভাঁড়টা আমার। আমার পেছনে সঞ্জু।
তাহলে মিত্রাদির।
হতে পারে, যদি অবশিষ্ট থাকে।
তুই ওর পেছনে এতো লাগিস কেন? আমি চিকনার দিকে তাকালাম।
কি করবো বল, এই গ্রামে ওর সঙ্গেই একমাত্র কথা বলি। জিজ্ঞাসা কর। ও আমায় ভাইফোঁটা দেয়, তুই তো জানিস আমার কোনও বোন নেই। চিকনার গলাটা কেমন ভারি হয়ে এলো।
মিত্রা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে।
সঞ্জু কোথায় বলতো, ধারেকাছে দেখতে পাচ্ছি না।
জেনারেটরের পেছনে কাঠি মারছে। আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর সবাইকে পেয়ে যাবি।
সত্যি সত্যি আধ ঘণ্টার মধ্যে সকলে চলে এলো, দিবাকর এসেছে। এসেই সেই এক কথা, অনি আমাকে ক্ষমা কর। আমি আর জীবনে এ ভুল করবোনা, তুই যা বলবি তাই শুনবো।
আমি কিছু বললাম না। যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করলাম।
নীপা আর মিত্রা দুজনে আজ অতিথি সামলাচ্ছে।
নীপা কিছুক্ষণ পর শেলিকে নিয়ে এলো। শেলি আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো। আমি ওকে বোঝালাম, তুমি দিবাকরকে ক্ষমা করে দাও। আমি কলকাতা যাই ওর একটা ব্যবস্থা করে দেব। আমি অনাদিকে কথা দিয়েছি।
মেয়েটি সত্যি খুব ভালো।
সবার সঙ্গে কথা বলছি।
একে একে কাঞ্চন, ললিতা এসেছে। মিত্রা হাত ধরে দুজনকে আমার কাছে নিয়ে এলো।
দেখ কি নিয়ে এসেছে।
এগুলো আবার কি? অনাদি আর বাসুর দিকে তাকিয়ে বললাম।
তোকে কিছু দেওয়ার নেই, একটা পাজামা পাঞ্জাবী, আর ম্যাডামের জন্য একটা কাপর।
ভালো করেছিস। আজকের দিনে আমি কিছু ফিরিয়ে দেব না।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
কাকা, কাকিমা, সুরমাসি এসে একবার দেখে গেছে।
সবাই আমাকে মিত্রাকে ঘিরে, আমি নীপার দিকে তাকিয়ে বললাম, দেখ মিত্রা সবার একটা একটা আছে, খালি নীপার ভাগ্যে কিছু জুটলো না।
কেনো আমার ভাগ্যে তুমি আছ।
মিত্রা সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলো। ও তোর দাদা না।
ও সঙ্গে সঙ্গে মিত্রাকে জড়িয়ে ধরে বললো, সরি সরি আমার ভুল হয়ে গেছে।
চিকনা দৌড়তে দৌড়তে এলো, গুরু খেল জমে গেছে।
কেনরে! অনাদি বললো।
দেখোনা এখুনি।
দেখলাম, সঞ্জুর পাশে নীপার মতো ছোটোখাটো একটা মেয়ে হেঁটে হেঁটে আসছে। সঞ্জু কাছে এসে বললো, তোর জন্য অনেক ঝক্কি পোহাতে হলো। শুধু তোর নাম বলতে ছেড়েছে। নাহলে আজ আমার কপালে শনি ছিল।
মিত্রা মুচকি মুচকি হাসছে। নীপা এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে গালে গাল ঘসছে।
মেয়েটা সত্যি দেখতে খুব মিষ্টি। কাপর পরে এসেছে। সাধারণ সেজেছে, কিন্তু তার মধ্যেও দারুন লাগছে।
তোর চয়েস আছে সঞ্জু। মেয়েটি আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো। মিত্রাকেও প্রণাম করলো। অনাদি আমাকে বললো, চিনতে পারলি না।
আমি অনাদির দিকে মাথা দুলিয়ে বললাম, না।
আরে মিনতি, উনা মাস্টারের মেয়ে।
আমি মেয়েটিকে কাছে টেনে নিলাম, ওর কাঁধে হাত রাখলাম, ওর মুখটা হাতে তুলে ভালোকরে দেখলাম, মিত্রাকে কাছে ডেকে নিয়ে বললাম, এই মেয়েটাকে কতো কোলে নিয়েছি জানিস, লাস্ট ওকে যখন দেখি তখন টেপফ্রক পরে ঘুরতো, আজ একেবারে লেডি।
সবাই হেসে ফললো, মিনতি লজ্জা পেয়েগেছে।
চিকনা বলে উঠলো, তুই বল অনি, শেষ পর্যন্ত সঞ্জু কিনা….।
সঞ্জু পায়ের জুতো খুলে চিকনাকে তাড়া করলো। হাসতে হাসতে আমাদের প্রাণ যায়।
সত্যি সন্ধ্যেটা দারুন কাটল। শুতে শুতে রাত একটা বাজল।
নীপা দুজনের জন্য বিছানা করে গেছে, নিচে আমার বিছানা। ওপরে মিত্রার বিছানা। মিত্রা দেখে হেসে ফললো, নীপা আজ আর আসে নি।
দেখেছিস। ঘরে ঢুকেই মিত্রা বললো।
হুঁ।
তোর অভিনয় ক্ষমতা অপরিসীম। এ্যাকটর হতে পারতিস।
তুই প্রোডিউসার, ক্যামেরাম্যান, নায়িকা তিনটে রোল যদি প্লে করতে পারিস তাহলে হয়ে যাবে।
কি ভাবে?
আমরা অভিনয় করবো আর ক্যামেরায় ছবি হয়ে যাবে।
মিত্রা আমার পিঠে একটা ঘুসি মারলো। খুব সখ না। এমনি খাঁদির বিয়ে হচ্ছে না তায় আবার তত্ত্ব আর পান্তা।
হেসে বললাম, মানেটা কিরে?
জানিনা যা।
মিত্রা জমাটা খুলেছে, কামিজের ফিতেটা খুলছিল, আমি ওকে জড়িয়ে ধরলাম।
আগে হুকটা খুলে দে।
আমি নিচু হয়ে হুকটা খুললাম। একটু হাত ছোঁয়ালাম।
দাঁড়া না। এটা খুলি।
দড়িটা খুলেদে। এমনিই কোমর থেকে খসে পরে যাবে। যা ঢলঢলে। বলনা মানেটা কি?
জ্যেঠিমনি বলতো। মানেটা হচ্ছে, করে সখ মিটছে না, আবার ছবি তোলার সখ।
আমি গেঞ্জি খুললাম। খাটে হেলান দিলাম।
দারুন এনজয় করলাম আজ। আমার ক্লাবের পার্টির থেকেও দারুন।
আমি মিত্রার দিকে তাকিয়ে আছি।
জানিস বুবুন, আমাদের পার্টিতে জৌলুস আছে, কিন্তু প্রাণ নেই।
সেই জন্যই এখানে তোকে ডেকে নিলাম। একটা ব্রেক। আবার সেই একঘেয়েমি জীবন। এখানে অন্ততঃ হাত-পা ছড়িয়ে কিছুটা আনন্দ করতে পারলাম।
ঠিক বলেছিস।
মিত্রা খাটে এসে আমার গলা জড়িয়ে ধরলো।
আর কিছু পড়তে ভালো লাগছে না। এই ভাবে শুলে কোনও আপত্তি আছে তোর।
একেবারেই না।
হ্যাঁরে শেলি কেসটা কি।
আর বলিসনা, দিবাকরটা শেলিকে নিয়ে একটা নীল ছবি তুলেছে।
তোর মোবাইলে এখনও আছে?
চিকনা তখন মোবাইলটা নিয়ে গেল না?
হ্যাঁ।
ওইটা দেখবে বলে।
আমাকে দেখা।
আমি পারি না। তুই পারলে দেখ।
তুই দেখবি না।
বোকার মতো কথা বলিস না, তুই দেখবি আর আমি দেখবো না তা হয়।
তোর মোবাইলটা কোথায়?
মিটসেফের ওপর।
মিত্রা এগিয়ে গেল।
তার আগে একটা কাজ কর। দাদাকে একবার ফোন কর। সকাল থেকে একা লড়ছে।
তুই ফোন করিস নি!
আমি দুবার করেছিলাম, একবার সন্দীপকে। একবার মল্লিকদাকে। দাদা তখন প্রেসে ছিল।
ও।
ভয়েস অন কের কথা বলিস। আমিও দাদার গলাটা শুনে নেব। বোকার মতো আবার বলিসনা যেন আমি এই ঘরে তোর সঙ্গে শুচ্ছি।
সে বুদ্ধিটুকু আমার আছে।
আমি খাটে বালিস দুটোকে দেয়ালের দিকে রেখে হেলান দিয়ে পা দুটোকে দুপাসে ছড়িয়ে দিলাম। মিত্রা মোবাইলে ডায়াল করে আমার দুপায়ের মাঝখানে, আমার বুকের ওপর ওর নিরাভরণ পিঠ রেখে হেলান দিয়ে বসলো। বেশ সুন্দর একটা গন্ধ ভেসে আসছে মিত্রার শরীর থেকে। আজকের গন্ধটা কালকের গন্ধ থেকে আলাদা। মনে হচ্ছে জুঁই ফুলের গন্ধ।
হ্যালো—বল— সকাল থেকে একটা ফোন করতে পারিস না।
দাদা, আমি মিত্রা।
ও বলো মা।
আমি মিত্রার বুকে হাত দিয়ে একটু দুষ্টুমি করলাম।
উঃ।
কি হলো!
এখানে কি মশা, মিত্রা আমার হাতটা খিমচে ধরলো।
ওরা তোমায় মশারি টাঙিয়ে দেয় নি।
দিয়েছে। আমি এখনও শুই নি।
অনি কোথায়?
ও বাড়িতে।
তোমায় একলা ছেড়ে পালিয়েছে!
না। নিচে লোকজন আছে। আমি ওপরের ঘরে।
এটা অনির মোবাইল না।
আমার মোবাইলটায় চার্জ নেই, বাজারে নিয়ে গেছে চার্জ দিতে। কাল দেবে।
কেন!
সে অনেক কথা, গিয়ে বলবো। এ যে কি অজ গ্রাম, না দেখলে বিশ্বাস করবেন না।
এখন শুয়ে পরো। কাগজ নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। আমি সামলে দিয়েছি।
ঠিক আছে দাদা।
ফোনটা কেটেই মিত্রা আমার দিকে ঘুরে ক্ষিপ্ত বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পরলো।
শয়তান খালি খুচখুচানি।
আমার ঠোঁটে একটা কামর দিল। আমি উ করে উঠলাম।
কি হলো!
ও আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
ঠোঁটটা ফুলিয়ে দিলি।
তুই ওরকম করছিলি কেন।
মিত্রা আমার ঠোঁটে হাত রাখল।
দু-জনে শুলাম, মিত্রা পাশ ফিরে শুলো আমি ওকে পাশ বালিশের মতো জাপ্টে ধরলাম।
বুবুনরে কেমন শীত শীত করছে।
একটু অপেক্ষা কর, একটু পরেই দেখবি গরম লাগবে।
আমি মিত্রাকে বুকের সঙ্গে লেপ্টে ধরে আছি।
জানিস বুবুন, যার সঙ্গে যে কথাই বলি সেখানেই তুই।
গ্ল্যামারটা কেমন বানিয়েছি বল।
শুনতে খুব ভালো লাগছে, তাই না। মিত্রা ভেঙচি কাটল।
তোর ভালো লাগে নি?
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
ড্যাব ড্যাব করে কি দেখছিস?
তোকে।
কেন?
তোর বোনটা যা, সব সময় আগলে রাখে।
হাসলাম।
দুই সখীতে স্নান করতে গিয়ে কি কথা হলো।
খালি মাথায় বদ বুদ্ধি। শুনবি।
আমি মাথা দোলালাম।
এখানে খোলা আকাশের তলায় কাপর ছাড়তে গেলে যা হয় তাই হলো। কতো ঢেকেরাখা যায়।
গ্রামের মেয়ে কতটা মর্ডান দেখেছিস।
ওকে গ্রামের মেয়ে বলে মনে হয় না।
কেন।
যেভাবে শরীরের যত্ন নেয়।
নাচে-টাচে সেই জন্য হয়তো।
তোকে বলেছে।
হ্যাঁরে।
শুয়ে শুয়ে মিত্রার বাড়ির কথা, আমার কথা, কলেজ লাইফের নানা কথা বলতে বলতে কখন ঘুমিয়ে পরেছিলাম জানি না, সকালে অনেক বেলায় উঠলাম। জানিনা আজ কেউ ডেকে ছিল কিনা। তবে উঠতে উঠতে বেলা আটটা বাজলো। দুজনে রেডি হয়ে এবাড়িতে এলাম। নীপা রান্না ঘরে কাকিমার সঙ্গে ছিল, আমাদের দেখে মুচকি হাসলো।
আজ কিন্তু কোনও ডিস্টার্ব করিনি।
মিত্রা হাসলো।
তোমরা পুকুর ঘাটে যাও আমি যাচ্ছি।
আমি মিত্রাকে বললাম, পেস্ট নিয়ে এসেছিস।
দুর নিমডাল ভাঙ।
আমি নিমডাল ভেঙে দাঁতন করলাম। মিত্রা আমি দুজনে পুকুর ঘাটে পা ছড়িয়ে বসে দাঁত মাজলাম।
হ্যাঁরে বুবুন এই পুকুরটায় মাছ নেই?
আছে।
ধরা যায় না?
যায়, তবে জাল ফেলতে হবে।
ছিপ দিয়ে?
ছোটো ছোটো বাটা মাছ পাবি।
ধরবি?
নীপাকে বলিস, ও বড়সির ব্যবস্থা করে দেবে, তখন ধরিস।
আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বললো, একবার শ্মশানে যাবি?
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।
কাউকে বলিস না। চা খেয়ে দুজনে পালাব।
নীপা এলো।
ফিস ফিস করে কি কথা হচ্ছে শুনি।
আমি গম্ভীর হয়ে বললাম, বড়দের কথায় কান দিতে নেই।
নীপা মুখ বেঁকিয়ে পা দাপাতে দাপাতে চলে গেল।
মুখ ধুয়ে চলে এলাম, আমি ঘরে ঢুকে জামা প্যান্ট পরে নিলাম।
ওরা দুজনে একসঙ্গে ঢুকলো, দেখলাম ট্রেতে ঘি নারকেলকোড়া দিয়ে মুড়ি মাখা। আর চা। খিদে খিদে পাচ্ছিল, আমি আর অপেক্ষা করলাম না, নিজেই নিয়ে খেতে আরম্ভ করলাম।
বুবুন একটা কথা বলবো?
বল।
নীপা যেতে চাইছে।
আমি মুখ তুললাম। নীপা মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে। একবার মুখটা তুলে আবার নামিয়ে নিল। মিটি মিটি হাসছে।
বাঃ চালটা ভালোই চেলেছ, মালকিন বললে কমর্চারী না করতে পারবে না।
ঠিক আছে, যাবনা যাও।
উরিবাবা এইটুকু শরীরে রাগ দেখেছিস!
মিত্রা হাসছে।
কেউ যেন জানতে না পারে।
আচ্ছা।
তুই আয় জামাকাপড় পরে। আমি রেডি হয়ে নিই। মিত্রা বললো।
নীপা লাফাতে লাফাতে চলে গেল।
ঘণ্টা দুয়েক ধরে ওদের গ্রাম ঘোরালাম, দূর থেকে শ্মশান, বুরো শিবের মন্দির দেখালাম, শেষে এলাম পীর সাহেবের থানে।
মিত্রা বললো কোথায় তোর পীর সাহেব।
আমাদের স্কুল থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে পীর সাহেবের থান।
আমি বললাম, ওই যে অশ্বথ গাছটা দেখা যাচ্ছে, ওটা পীর সাহেবের থান।
অশ্বত্থ গাছটা দেখতে পাচ্ছি, পীর সাহেবকে দেখতে পাচ্ছি না?
তুই দেখতে পাবি না। সাদা চোখে দেখা যায় না।
তোর যতো সব আজগুবি কথা।
নারে আমার বাবা দেখেছিলেন।
আমি অশ্বত্থ গাছটার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম।
জানিস মিত্রা, কাকার মুখ থেকে শুনেছিলাম।
সেদিনটা পূর্ণিমা ছিল। চারদিকে আলো থইথই করছে। কিন্তু গাছের তলাটা সামান্য অন্ধকার। ঝাঁকড়া অশ্বত্থ গাছ। তাছাড়া জায়গাটা দেখ কেমন ঝোপ জঙ্গলে ভড়া। বাবার ভয়ডর বলে কিছু ছিল না। গ্রামের ঘরে সাতটা বাজলেই সকলে খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সেদিন বাবা স্কুলের একটা মিটিং সেরে ফিরছিলেন এগারটা নাগাদ। গ্রামের ঘরে এটাই মধ্য রাত।
মনাকাকা সেদিন স্কুলে আসেনি। স্কুলের কি কাজে সদরে গেছিলেন। বাবা-মনাকাকা একই স্কুলের মাস্টার মশাই ছিলেন। রাস্তা দিয়ে আস্তে আস্তে বাবার চোখটা হঠাৎ ওই দিকে চলে যায়। তখন দেখে একজন পক্ককেশ থুরথুরে বৃদ্ধ ভদ্রলোক ওই গাছের তলায় বসে তার সাদা ধবধবে দাড়িতে হাত বোলাচ্ছে। বাবা প্রথমে নিজের চোখকে বিশ্বাস করে নি। তাছাড়া কাকার মুখ থেকে শুনেছি বাবা এসব ভূত-পেত মানতেন না।
দেখলাম নীপা আমার একটা হাত চেপে ধরেছে, মিত্রাও আমার আর একটা হাত চেপে ধরেছে। দুজনেরই মুখের দিকে তাকালাম। দমবন্ধ হয়ে যাবার পরিস্থিতি।
বাবার খুব সাহস ছিল। বাবা দাঁড়িয়ে পরে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুতেই সেই ভদ্রলোক বাবার দিকে তাকায় না। বাবা অস্থির হয়ে দু-তিনবার চেঁচিয়ে ডাকল, কে ওখানে কে ওখানে।
কোনও সাড়াশব্দ নেই। শেষে বাবা হাতের চারশেলের টর্চলাইটটা জেলে ওই অশ্বত্থ গাছের তলায় আলো ফেলল। দেখল কেউ বসে নেই। বাবা আবার লাইট অফ করল, দেখল সেই বৃদ্ধ একইভাবে গাছের তলায় বসে দাড়িতে হাত বুলোচ্ছে। চাঁদনী রাতে ওই আলো ছায়া মাখা রাতে বাবা তাঁকে যেমনটি দেখেছিলেন, ভদ্রলোককে নাকি অসম্ভব সুন্দর দেখতে, ফর্সা টুকটুকে গায়ের রং। পরণে একটা সাদা ধব ধবে আলখোল্লা।
বাবা আবার ডাকলেন, কোনও সারা শব্দ নেই।
তারপর বাবা আর ডাকা ডাকি করেনি, কারুর মুখ থেকে বাবাও মনে হয় গল্পটল্প শুনেছিলেন। এইখানে প্রণাম করে বাবা বাড়ি চলে যান।
রাতে বাড়িতে ফিরে কাকাকে সমস্ত ব্যাপারটা বলে। কাকা বলেছিল, অধীপ তোর ভাগ্যটা ভালো। ওই মানুষের বড় একটা দেখা পাওয়া যায় না। আমাদের সামন্ত কাকা, ঠিক ওই জায়গাতেই ওনাকে দেখেছিলেন। উনি পীরবাবা, বাবা সেই থেকে এইপথে স্কুল যাওয়ার সময় এই পুকুর ঘাটের ধারে প্রণাম করে স্কুলে যেতেন। আবার ফেরার পথেও প্রণাম করতেন। আমিও কোনও একদিন কাকার হাত ধরে এসে প্রণাম করেছিলাম। এই স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকে আমিও যাওয়া আসার পথে প্রণাম করি, বলতে পারিস একটা ট্র্যাডিসন।
(আবার আগামীকাল)
কাজলদীঘি উপন্যাসের প্রথম খন্ড অনেক চেষ্টা করে ও পুরোটা পাওয়া যাচ্ছেনা।