জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
চতুর্দশ কিস্তি
ওদের বিদায় দিয়ে, ওখান থেকে বাসে করে এলাম গঙ্গার ধার। আমার পরিচিত জায়গা। ঠিক জায়গায় এসে বসলাম। চারিদিক শুনশান। আমি জানি কখন আমার দূত এসে আমার পাশে বসবে। একটা সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছিল। খেলাম না। ইসলামভাই জানে আমার কোনও নেশা নেই। মাঝে সাঝে দু-একটা খাই।
ইসলামভইয়ের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল দামিনীমাসি। সোনাগাছিতে যার কাছে আমি একসময় কাটিয়েছি। এখনও গেলে মাসির হাতে এটা ওটা গুঁজে দিয়ে আসি। মাসি প্রথম প্রথম নিত না।
একদিন বললাম, তোমার তো নিজের কোনও সন্তান নেই মাসি। একমাত্র ভজু ছাড়া। ভজুকে তুমি মানুষ করেছো। আমি যদি তোমার ছেলে হতাম তুমি কি নিতে না। মাসি কেঁদে ফেলেছিল। তারপর থেকে মাসি না বলে না। প্রথম মোবাইল হাতে আসার পর মাসিকে নম্বর দিয়ে এসেছিলাম। যদি কখনও প্রয়োজন হয়, আমাকে ডেকে নেবে।
কেন জানিনা আজ সকাল বেলা অফিস থেকে বেরবার পর থেকেই মনে হচ্ছে আমাকে কেউ ফলো করছে। ইসলামভাইকে ব্যাপারটা বলতে হবে। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। কাউকে সেই ভাবে দেখতেও পাচ্ছি না। তবু কেন যেন মনে হচ্ছে।
অনেক লোক আশপাশ দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে। কাউকেই সেইভাবে মনে পড়ছে না। বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর আবিদ এলো। এই ছেলেটি খুব ভালো। বাদাম বিক্রি করে। কিন্তু খদ্দের চেনে, কারা ওর কাছ থেকে নেশার দ্রব্য কিনবে।
ওই যে কথায় আছে না—রতনে রতন চেনে শুয়রে চেনে কদু।
আমার কাছে এসে আবিদ বললো, তুমি বসে বসে বাদাম খাও। দাদার আস্তে দেরি হবে।
কেন?
দাদা একটা কাজে গেছে।
বলবি না।
তোমায় না বলার কি আছে। তুমি দাদার খাস লোক।
হাসলাম।
তোমার কি খুব জরুরি দরকার আছে?
না। অনেক দিন আসিনি। তাই এলাম।
তোমার নম্বরটা দাও, দাদা এলে ফোন করতে বলবো।
দাদার কাছে আছে।
আমি বাদাম নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। খেতে খেতে হাঁটতে আরম্ভ করলাম।
সনাতনবাবুকে একটা ফোন করলাম। সনাতনবাবু প্রথমে ঠিক বুঝতে পারেন নি। না বোঝাই স্বাভাবিক। আমার নম্বর ওনার কাছে নেই। পরিচয় দিতেই বললেন, আরে অনিবাবু যে। ওঃ আজ মিটিংয়ে যা দিলে না, আমার শরীর জুড়িয়ে গেল।
কেন?
জানো এই ক-দিনে এরা আমার রক্তচাপ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
এবার আপনি শান্তিতে কাজ করতে পারবেন।
আচ্ছা অনি তোমাকে যদি ছোটোবাবু বলি খুব অন্যায় হবে?
আপনার ছেলেক যদি আপনি ছোটোবাবু বলে খুশি হন, আমার আপত্তি নেই।
এই তো তুমি একটা ছোট্ট লেজুর জুড়ে দিলে।
ঠিক আছে, যেজন্য ফোন করেছিলাম।
বলো।
আপনার হাতের কাছে কাগজ পেন আছে।
আছে।
লিখে নিন।
এক মিনিট।
কিছুক্ষণ থেমে সনাতনবাবু বললেন, বলো।
এক, কামিং সিক্সমান্থের বাজেট। দুই, লাস্ট সিক্সমান্থের ইনকাম এ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার। তিন, এ্যাড, কত টাকার এসেছে এবং এ্যাড ডিপার্টমেন্টর পেছনে আমাদের কতো খরচ হয়েছে। চার, প্রত্যেক ডিপার্টমেন্টের পেছনে আমাদের কি খরচ হচ্ছে। ডিপার্টমেন্ট ধরে ধরে আমাকে একটা লিস্ট বানিয়ে দিন।
ঠিক আছে।
এবার সার্কুলেসন। এর ডিটেলস।
নেক্সট।
আমাদের কতগুলো নিজস্ব গাড়ি আছে?
২৫টা।
কতগুলো ভাড়ার গাড়ি আছে?
প্রায় ২৫০ টা।
এদের ডিটেলস।
আচ্ছা।
প্রেসের স্ক্র্যাপ কারা কেনে। কত দামে কেনে। কত টাকার স্ক্র্যাপ বিক্রি হয় তার কোনও বাজেট আছে কিনা। এমনকি প্রেসের পেছনে আমাদের কতো খরচ হয়।
ঠিক আছে।
এই কয়েকটা জিনিস কাল ১২টার মধ্যে মিত্রার টেবিলে পৌঁছে দেবেন।
ম্যাডাম কাল কখন আসবেন?
বলতে পারবো না।
তাহলে কি ম্যাডাম এলেই দেবো।
তাই দিন।
ফোনটা কেটে দিলাম।
ময়দান পেরিয়ে প্রেস ক্লাবের সামনে আসতেই, দূর থেকে চম্পকদাকে প্রেস ক্লাবের লনে দেখলাম। একটা কম বয়েসি ছেলের সঙ্গে কথা বলছে। ছেলেটাকে দেখে মনে হলো না এর সঙ্গে চম্পকদার কোনও সম্পর্ক থাকতে পারে। আমি আড়ালে চলে গেলাম, একটু ফলো করলাম। চম্পকদা কিছু টাকা দিলেন।
ফোনটা বেজে উঠলো। টিনার নামটা ভেসে উঠেছে।
এরই মধ্যে টিনার ফোন! এই তো কয়েক ঘণ্টা আগে দেখা হলো? ধরলাম।
হ্যালো।
বলো টিনা।
তুমি কোথায়?
মনুমেন্টের তলায়।
তাই এতো চেঁচামেচি। তুমি কি এখন ফ্রি আছ?
কেন!
তাহলে আমার অফিসে আসতে পারবে একবার। যদিও তোমাকে বলা উচিত নয়।
প্রথমে বলো, বলা উচিত নয় কেন?
তুমি একজন ওই রকম বিগ হাউসের ওয়ান অফ দেম ডিরেক্টর।
এই সংকোচ থাকলে তোমাদের সঙ্গে কথা বলা যাবে না।
রাগ করো না। তোমার জায়গায় অন্য কেউ হলে হয়তো ফোনই করতাম না।
এই তো ঠিক কথা বলেছো। আমার যে কতগুলো ছোটো ছোটো কাজ আছে।
একটু থেমে।
তুমি কটা পর্যন্ত অফিসে থাক?
ছ-টা পর্যন্ত।
আমি যদি পাঁটচার পর যাই, অসুবিধে আছে?
একবারে না।
ঠিক আছে, আমি চলে আসবো। কিন্তু তোমার অফিসটা যে চিনি না।
শান্তিনিকেতন বিল্ডিং, থারটিনথ ফ্লোর, রুম নং ফোর।
ঠিক আছে।
রাস্তা পেড়িয়ে ওয়াইএমসিএর গেটে এলাম। কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। আবার ফোনটা বেজে উঠলো। দেবাশিস।
কি হলো-রে?
গুরু তোমার গপ্প গুলো দারুন। তুমি যে এতটা তিলুয়া হারামী ছিলে তখন জানতাম না। তুমি আমার বৌয়ের পাছা টিপে দিয়ে বলেছিলে, মা আমাদের কলেজে, অনেক বড় বড় মনিষীরা লেখাপড়া করেছেন, তোমার এই পোষাক যদি তারা দেখতেন, লজ্জা পেয়ে যেতেন।
তারপর থেকে ও কোনও দিন আর অডলুকিং জামা কাপড় পরে কলেজে আসেনি।
হাসলাম।
আচ্ছা গুরু মুতে কখনও নিজের নাম লেখা যায়?
হো হো করে হেসে ফেললাম। কে বলেছে নির্মাল্য।
সত্যি গুরু তোমার জবাব নেই। তোমার কাছে গিয়ে ক্লাস করতে হবে।
চলে আয়।
মিলিরটা ক্লাসিক।
আমরা মালটাকে এখনও চুমু খেতে পারলাম না, আর তুমি ওই সময়, অতো লোকের সামনে আবার সাক্ষী রেখে। গুরু তোমার পায়ের ধুলো একটু দিও মাদুলী করব।
তোর সামনে কে আছে?
কেউ নেই, আমি একা। বাই দা বাই তোমার কাজ করে দিয়েছি। কবে আসবে?
হঠাৎ তুই থেকে তুমিতে চলে গেলি। একটু বেশি সম্মান দিয়ে ফেলছিস মনে হচ্ছে।
না গুরু এবার এটা মেইনটেন করবো। পারলে অনিদা বলবো।
হারামী।
দেবাশিস হাসলো।
কালকে তোমার নামে অফিসে একটা চিঠি পাঠাব।
না। আমি গিয়ে তোর কাছ থেকে কালেক্ট করবো।
কবে আসছো?
দেখি যদি পারি আগামীকাল যাব। তবে সেকেন্ড হাফে। যাওয়ার আগে একটা ফোন করে নেব।
আচ্ছা।
টুক করে সদর স্ট্রীটে ঢুকে পরলাম। সোজা চলে এলাম, মির্জা গালিব স্ট্রীট। এগুলো আমার পুরনো ঠেক। আমার উত্তরণ এখান থেকে। আমাকে বছরের পর বছর এরা নিউজ দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে। রতনের চায়ের দোকানে এলাম। রতন ওর আসল নাম নয়। ওর আসল নাম সইদুল ইসলাম। আমি আমার জায়গায় গিয়ে বসলাম।
রতন কাছে এসে গলা নামিয়ে বললো, অনিদা গজব হয়ে গেছে।
ওর দিকে তাকালাম। ইশারায় আমাকে অপজিটে ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে যেতে বললো। আমি চেয়ার ছেড় উঠে গেলাম, রতন আমার আসার একটুক্ষণ পর এলো।
বল কি হয়েছে?
বান্টি।
কি হয়েছে বান্টির!
পুলিশ নিয়ে গেছে।
কেন!
রোজ হোটেলে চারজনকে এনে রেখেছিল, ওরা ইসলামভায়ের জন্য মাল নিয়ে এসেছিল। ঢ্যামনারা টিপ দিয়ে দিয়েছে। বান্টি সমেত ওদের তোলতাই করে নিয়ে গেছে।
ইসলামভাই কোথায়?
থানায়।
রফা হয়েছে?
না।
তাহলে?
অনেক চাইছে।
ওই চারটে গ্যারেজ হবে। ইসলামভাই, বান্টি ছাড়া পেয়ে যাবে।
এখানকার ওসিটা হারামী, বহুত খাঁই।
মাল?
আমার দোকানে।
ওরা পায়নি?
কিছু পেয়েছে।
ঠিক আছে যা। রতন এগিয়ে গেল।
শোন।
রতন আবার ফিরে এলো।
একবার ইসলামভাইকে খবর দে, আমি এসেছি।
রতন চলে গেল। সন্দীপকে একটা ফোন করলাম।
বল।
খবর কি?
ফাইন।
আর কিছু।
মাঝে সুনিতদা কার একটা লেখা নিয়ে অমিতাভদার সঙ্গে ক্যাচাল বাধিয়েছিল। দাদা যেই বলেছে, ওটা অনির ব্যাপার ওর সঙ্গে কথা বলে নাও। আমার এক্তিয়ারের মধ্যে নয়। ব্যাশ চুপ।
শোন একটা ফোন কর লালবাজারের নারকটিকস ডিপার্টমেন্টে, বল এখুনি একটা ঘটনা ঘটেছে, মির্জা গালিব স্ট্রীটের রোজ হোটেলে, ঘটনাটা কি?
তারপর।
কি বলে শুনবি। ফিডব্যাকটা এখুনি দে।
তুই কোথায়?
যা বলছি কর।
আচ্ছা।
রতন এলো।
কি হলো?
ইসলামভাই আসছে।
ঠিক আছে।
সন্দীপের ফোন এলো।
কি হলো?
ফোন করেছিলাম। বললো, এরকম ঘটনা ঘটেনি।
চেপে যাচ্ছে। ঠিক আছে। ফোনটা বিজি রাখবি না।
আচ্ছা।
কিছুক্ষণের মধ্যে ইসলামভাই চলে এলো। আমাকে দেখেই একগাল হেসে বুকে জড়িয়ে ধরলো। তুই কতদিন পরে এলি, প্রায় একমাস।
ছিলাম না। তোমার খবর?
সাল্টে দিয়েছি।
বান্টি?
দুদিন ভেতরে থাকুক। বার করে নেব। অসুবিধে নেই। চল চা খাই।
রতনের দোকানে এসে বসলাম। রতন নিজে হাতে চা বানিয়ে দিল।
চা খেতে খেতে ইসলামভাই বললো, তোকে টেনশন নিতে হবে না। এসব ছোটোখাটো ব্যাপার, বড় ব্যাপার হলে তোকে জানাব। তুই একটা নিউজ মারতো।
কি হয়েছে বলো?
চা খেয়ে নে তোকে নিয়ে যাব। কিন্তু তোকে নিয়ে গিয়ে লাভ কি, তোর কোনও ভালো ফোনও নেই যে তুই লুকিয়ে ছবি তুলবি।
আছে নতুন একটা কিনেছি।
তুই ঘাটে গেছিলি কেন?
তোমার সঙ্গে দেখা করতে।
তোর পেছন পেছন কে গেছিল?
জানিনা!
তোর অফিসে কোনও গন্ডগোল হয়েছে?
তা একটা হয়েছে।
কি হয়েছে?
তোমায় পড়ে বলবো।
ইসলামভাই জানে।
হাসলাম। জিজ্ঞাসা করছো কেন?
তোর মুখ থেকে শুনতে চাই। কবে বিরিয়ানি খাওয়াবি।
যেদিন বলবে।
তোর পেছনে ওরা টমি লাগিয়েছে। তুই কোথায় যাচ্ছিস, কি করছিস, এইসব।
তুমি কি করে জানলে?
তুই যেমন সাংবাদিক, এটা আমার ব্যবসা। আবিদ ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ভুল খবর যাবে। কিছু টাকা কামিয়ে নিই তোর অফিসের।
হাসলাম।
নাহলে রফা করলাম কি করে।
তুমি ছেলেটার সাথে আলাপ করিয়ে দেবে?
দেব। এখন না।
কেন!
সবে লাইনে নতুন এসেছে। তোকে চেনে না।
ও।
তুই যেদিন লোকটাকে ছাঁটবি, ফোন করবি ওর সঙ্গে কথা বলিয়ে দেব। ও এখন থেকে সব ভুল নিউজ দেবে।
চুপকরে থাকলাম।
তুই মালিক হয়ে অনেক কাজ শুরু করে দিয়েছিস।
আমি ইসলামভাইয়ের দিকে তাকালাম, ইসলামভাই জানে আমার এই তাকাবার অর্থ কি।
তুই লোকটাকে ছাঁটতে চাস?
হ্যাঁ-না কিছুই বললাম না।
ছেঁটেদে।
একমাস সময় দিয়েছি।
দেখেছিস কি হারামী, তোর মতো একটা ছেলের পোঁদেও লোক লাগিয়েছে।
তোমার কাছে এইজন্য এসেছিলাম। জানিনা সকালবেলা অফিস থেকে যখন বেরচ্ছিলাম তখনই মনটা কু গাইছিল।
তাজে কেন গেছিলি?
আমার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে। ওরা এ্যাড ওয়ার্ল্ডের এক একটা ফিগার।
ইসলামভাই যতদিন থাকবে তোর ক্ষতি কেউ কোনওদিন করতে পারবে না। আল্লা কসম অনি। আজ দশ বছর তোকে দেখছি। তুই কোনওদিন ইসলামভাইয়ের কাছে হাত পেতে কিছু চাসনি। বরং তুই যা দিয়েছিস, এই জীবনে তোর ঋণ শোধ করতে পারবো না।
সব শুয়োরের বাচ্চা ধান্দাবাজ। ধান্দা ছাড়া আমার কাছে কেউ আসে না। শুধু তুই আসিস নিউজ নিতে, ভালোমন্দের খবর নিতে, সুবিধা-অসুবিধায় তুই এখনও আমার পাশে থাকিস। একদিন আমি মাগী নিয়ে ফুর্তি করছি। কেউ ছিলনা সেদিন, দামিনীর কথায় তুই মালের বোতল এনে দিয়েছিস। মাল খাবার চার্ট এনে দিয়েছিস। সেদিন তোকে প্রথম চিনেছিলাম। তারপর তুই আমাকে অতো বড়ো একটা কেশের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলি।
আজ তুই মালিক হোস আর যাই হোস, তুই আমার কাছে পত্রকার অনি। সেই অনি। আজ তোর সঙ্গে বসে কথা বলছি। কাল আমি নাও থাকতে পারি। আমাকে নিয়ে একটা লেখা লিখিস।
ইসলামভাই খুব ইমোশন্যাল হয়ে পরলো। আমি ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলাম না, মাথা নিচু করে নিলাম। চায়ে চুমুক দিলাম।
চল যাই।
চলো।
ইসলামভাই আমাকে মিউজিয়ামে নিয়ে এলো পেছনের দরজা দিয়ে। যেখানে ট্যাক্সিডার্মি সেকসন, অফিস তখন শুনশান। এই সেকসনে মৃত পশুদের চামড়া দিয়ে মডেল তৈরি হয়। তৈরির পর মিউজিয়ামে দর্শকদের জন্য সেখানে রাখা হয়। একজনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল। মনে হয় কেয়ারটেকার। ঘুরে ঘুরে সব দেখলাম। কিভাবে নষ্ট হচ্ছে নাম করা সব পশুদের চামড়া। যারা একসময় চিড়িয়াখানয় মারা গেছিল। আমরা তাদের নিউজ করেছিলাম। ছবি সব মোবাইলে তুললাম। কাকপক্ষী কেউ টের পেল না।
কাজ শেষে ইসলামভাই চলে গেল। ঘড়ির দিকে তাকালাম। অনেক বেজে গেছে। টিনার কাছে যাবার সময় চলে গেছে। তবু টিনাকে একবার ফোন করলাম। টিনা ফোন ধরেই হেসে ফলল।
ভুলে গেছিলে নিশ্চই?
না। একটা কাজে আটকে গেছিলাম।
এখন কোথায় আছ?
মিউজিয়ামের সামনে।
তুমি এক কাজ করো, বিড়লার সামনে দাঁড়াও আমি তোমাকে গাড়িতে তুলে নেব।
ঠিক আছে।
আমি বাস ধরে তারাতারি বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের সামনে চলে এলাম।
বেশ কিছুক্ষণ পর টিনা এলো। নিজেই ড্রাইভ করছে। ছোট্টগাড়ি।
আমি দরজা খুলে সামনের সিটে বসলাম।
আমার ফল্যাটে চলো।
কোথায় তোমার ফল্যাট?
নিউটাউন।
বাবা অতদূরে!
অফিস দিয়েছে।
তুমি কি এখানে একা থাক নাকি?
দোকা পাব কোথায়?
হাসলাম।
তুমি বললে কালকেই জোগাড় করে দিতে পারি।
তুমি কেন, আমি চাইলেই লাইন পড়ে যাবে।
তাহলে আর অসুবিধা কিসের?
আমার মতো কেলটি মেয়েকে কে পছন্দ করবে।
দেবাশিসের কথাটা মনে পড়ে গেল, তাহলে কি টিনা….।
কালো জগতের আলো।
ওটা তুমি বলছো, লোকে বলে না।
তুমি এতো বড়ো পোস্টে রয়েছো। ছেলের অভাব হবে না একটু চেষ্টা করো।
টিনা গাড়ি চালাচ্ছে।
বাবা-মাকে বলছো না কেন?
বাবা মারা গেছেন, মা আর দাদা আছেন। ওরা দিল্লীতে থাকে। দাদা ওখানে সিফ্ট করেছে। মা দাদার কাছেই থাকেন।
তুমি ট্রান্সফার নিয়ে চলে যাচ্ছ না কেন?
ছোটো থেকে কলকাতায়। সব কিছু এখানে। যেতে ইচ্ছে করে না।
তারমানে রান্নাবান্না সবই তোমায় করতে হয়।
একজন কাজের মাসি আছে। ওই-ই সব করে দেয়। রাতে আমি গরম করে নিই।
সময় কাটে কি করে?
অফিসে কাজের চাপ থাকে, রাতে ইন্টারনেট, চ্যাট।
তোমার কাছ থেকে নেটটা শিখতে হবে। শিখিয়ে দেবে?
কেন দেব না! তোমাকে শেখাব এটা আমার সৌভাগ্য।
শেখাবার জন্য কত দিতে হবে?
টিনা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। ওটা সময় মতো চেয়ে নেব।
কালকে থেকে ক্লাস নাও।
ঠিক আছে।
কথা বলতে বলতে কখন টিনার ফল্যাটে চলে এলাম বুঝতে পারলাম না।
গাড়ি পার্কিং প্লেসে রেখে দুজনে হাঁটতে হাঁটতে আসছিলাম।
বেশ কয়েকজনের সঙ্গে টিনা আলাপ করিয়ে দিল। তাদের হাব ভাবে বুঝলাম তারা আমার সঙ্গে আলাপ করে গদ গদ। কেউ কেউ ট্যারা চোখেও তাকাল।
লিফট বক্সের সামনে এসে টিনা বোতামে হাত রাখল। আমরা লিফটে উঠলাম। টিনা সাত নম্বরটা টিপল। বুঝলাম আটতলা। বাবাঃ অনেক উঁচু। টিনা নিজের ঘরের লক খুলে আলো জাললো।
এসো আমার স্যুইট হোমে।
ভেতরে এলাম। ছোট্ট কিন্তু ভীষণ সাজানো-গোছানো। মেঝেতে নারকেল দড়ির কার্পেট। দেয়ালে পুরুলিয়ার ছৌনাচের মুখোশ। টিনার রুচি আছে। আমার ফল্যাটের মতো। একটা বসার ঘর আর শোয়ার ঘর। আমি বাইরে রাখা সোফায় গা এলিয়ে দিলাম, যাও তুমি চেঞ্জ করে নাও।
কি খাবে?
কিচ্ছু না।
প্রথম দিন এসেছো তোমায় কিছু না খাইয়ে ছারছি না।
চা খাওয়াও।
ওটা আছেই, আর।
ভালো লাগছে না।
টিনা ভেতরের ঘরে চলে গেল। আমি বসে বসে সেন্টার টেবিলে রাখা ভোগ ম্যাগাজিনটা তুলে নিলাম। ব্যাক কভারে টিনাদের কোম্পানীর এ্যাড চোখে পড়লো।
কনটেন্ট দেখে একটা আর্টিকেল পড়ছিলাম। সিটি অফ ক্যালকাটা বাই রঘু রাই। রঘু রাই-এর ছবির ওপর আর্টিকেলটা। পড়া শেষ হতে দেখলাম, নিচে লেখা আছে অনুলিখন টিনা মজুমদার। দারুন টান টান লেখা।
বাবাঃ তোমার চোখ আছে।
কেন!
ঠিক ওই আর্টিকেলটা বেছে নিয়েছো।
হাসলাম।
এবার বলো, তুমি কবে থেকে এতো ভালো লিখতে শিখলে?
টিনা আমার দিকে তাকিয়ে চোরা চহুনি হানলো, তোমার থেকেও ভালো লিখি!
হাসলাম। অবশ্যই।
ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে, ওর ভেতরটা দেখার চেষ্টা করলাম।
কি দেখছো?
তোমায়।
টিনা টেবিলের বইগুলো একটা হাত দিয়ে সরিয়ে, প্লেটটা রাখলো। অনেক মিষ্টি।
এতো খাব না টিনা।
একটুও বেশি না, খেয়ে নাও। সেই দুপুরে আমাদের সঙ্গে খেয়েছ। তাই তো?
আমি একটা নিয়ি নিচ্ছি, তুমি চা খাওয়াও।
না তোমাকে সব খেতে হবে।
খাওয়া কি পালিয়ে যাচ্ছে, আমি আবার আসবো।
টিনা চলে গেল। আমি চারদিক চেয়ে চেয়ে দেখছি।
একটা মিষ্টি নিয়ে মুখে দিলাম, ভীষণ ঠান্ডা, বুঝলাম ফ্রিজ থেকে বার করা।
কি হলো খাও নি?
টিনা চায়ের কাপ হাতে হাজির। টেবিলে রেখে আমার অপরজিট সোফায় বসলো। কিছুক্ষণ আগে দেখা টিনার সঙ্গে এখন দেখা টিনার অনেক পার্থক্য। একটা ঢলঢলে রাজস্থানী স্টাইলের ঘাঘরা পরেছে। বেশ জমকাল। কালার কম্বিনেশন এতো ভালো ওর কালো রংকে আরও উজ্জ্বল করেছে। টিনা, নীপা-মিত্রার থেকে একটু ভারী। কিন্তু দেখলে বোঝা যায় না। দেবাশিসের কথাটা বারে বারে মনে পড়ে যাচ্ছে।
আর একটা খাও প্লিজ।
না। মিষ্টি বেশি খাই না। তুমিও কিছু খাওনি। তুমি বরং একটা খাও।
আমি অফিস থেকে ফিরে এসে কিছু খাই না। একটু কমপ্লান বা হরলিকস খাই, এমনিতেই যা মোটা। আবার মিষ্টি খেতে বলছো।
কোথায় তুমি মোটা?
তুমিই প্রথম বললে আমি মোটা নয়।
চায়ের কাপটা তুলে ঠোঁটে ছোঁয়ালাম।
টিনা আমার দিকে তাকাল। মিষ্টি ঠিক আছে?
বুঝি না।
তার মানে!
ওই আর কি, আমি মনে করি গরম জল খাচ্ছি।
তুমি কি গো!
আমি আমার মতো।
তুমি জিজ্ঞেস করলে না, তোমায় কেন ডেকেছি।
কি করে জানব, তুমি ডাকলে, দেখলাম আমার হাতে সময় আছে, চলে এলাম।
দেবাদা তোমায় পয়সার কথা বলেছে?
কেন!
বলো না।
তোমাদের প্রফেসনে ব্যাপারটা রয়েছে।
অস্বীকার করছি না।
তাহলে? অন্যভাবে নিও না, তুমিও কোনও ইতস্ততঃ করবে না।
একি বলছো অনিদা! তুমি আমাকে ভুল বুঝো না।
কেন ভুল বুঝবো। তোমাদের যেটা প্রফেসন সেটাকে মানতে হবে।
আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা।
কিরকম! সঙ্কোচ করার কিছু নেই। বলো—
আমার ওপরে যিনি বস আছেন, তিনি টাকাও চান আবার এনটারটেনমেন্ট চান।
অসুবিধে নেই। কিন্তু কি রকম এনটারটেনমেন্ট, সঙ্কোচ না করেই বলো।
আমি মেয়ে, কিন্তু কি করবো, চাকরি করি, কালো ধুমসি বলে বেঁচে গেছি। শুধু কাজটা ভালো মতো করতে পারি বলে এখনও টিঁকে আছি।
হেসে ফেললাম।
তুমি হেস না। এরা এইরকম। কলকাতায় আমার বস একজন ছেলে। আমি তোমার ফাইলটা আজই পাঠিয়েছি। চব্বিশ কটির বাজেট দিয়ে, কামিং তিন মাসে। তোমার খরচ পরবে লাখ তিরিশেক।
এটা তোমাকে ফেস করতে হবে, না আমাকে?
তোমাকে ফেস করতে হবে। সেই জন্যই তোমায় মুম্বাই যেতে বলছিলাম।
বিপদে ফেললে, এ কাজ কোনওদিন করিনি।
ঠিক আছে আমি দেখছি কি করা যায়।
তোমায় টেনসন নিতে হবে না, কাজটা করতে গেলে, আমারও একটা নতুন জগত দেখা হবে। শেখা হবে।
না না আমি ব্যবস্থা করবো।
তুমি আমার জন্য আর কতো করবে।
আমার বসকে বলবো। দেখি না কি করে।
তোমার বন্ধুরা জানে।
না জানার কি আছে। দেবাশিসদা ধোয়া তুলসী পাতা নাকি।
অদিতি, মিলি, নির্মাল্য?
সব এক গোয়ালের গরু, আপার লেবেলে শরীরটা কিছু নয়, সেখানে টাকাটাই সব।
তার মানে আমাকেও সেইরকম হতে হবে নাকি!
তোমার মধ্যে সেই প্রটেনসিয়ালিটি আছে, কিন্তু তুমি তা নও।
কি করে জানলে?
তোমার মুখের মধ্যে তার একটা ছাপ থাকত।
তুমি এতো বোঝো!
বুঝতে হয়েছে।
তুমি এগিয়ে যাও, আমি ঠিক সামলে দেব।
পারবে?
দেখি না সামলাতে পারি কিনা। তুমি কবে খবর দেবে?
কামিং উইকে।
আমার নেট শেখার ব্যাপারটা?
তুমি এলেই হয়ে যাবে।
তোমায় ফোন করবো। রবিবার ফাঁকা আছো?
আছি।
দেখি বিকেলের পর আসবো। অসুবিধে নেই?
না। একটা ফোন করে নিও।
ঠিক আছে।
টিনার কাছ থেকে উঠে চলে এলাম। টিনা নিচ পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেল। ভাগ্যভালো নিচে একটা ট্যাক্সি পেয়ে গেলাম। উঠে পরলাম। অমিতাভদার বাড়িতে যখন এলাম রাত দশটা বেজে গেছে। পা দিতেই দেখলাম, তিনজনে বসে গল্প করছে। আর হাসাহাসি করছে। আমি ঢুকতেই ছোটোমা বললো, আসুন স্যার, আপনার কথাই হচ্ছে।
আমি বড়োমাকে, ছোটোমাকে প্রণাম করে বড়োমার পাশে বসলাম। মিত্রা একটা সোফা দখল করে আছে। ছোটোমাও একটা সোফা দখল করে আছে।
দাদারা আসেনি?
সবে অফিস থেকে বেরিয়েছে। বড়োমা বললো।
হ্যাঁরে তুই কিরে? বড়োমা আমার মুখের দিকে তাকিয়েছে।
আমি মানুষ। খুব সাধারন মানুষ।
দাওনা ওর কানটা মূলে। ছোটোমা বললো।
মিত্রা চোখবন্ধ করে হাসছে।
তোর কীর্তি কলাপ শুনছিলাম মিত্রার মুখ থেকে।
মিত্রার দিকে তাকালাম। আমার! নতুন কি। আগেও অনেকের মুখে শুনে থাকবে।
একাট মেয়েকে নিয়ে গেছিস, থাকার জায়গা পর্যন্ত ঠিক করিসনি।
আমি নিয়ে যাবার আগে কন্ডিশন করে নিয়েছিলাম, ছোটোমাকে জিজ্ঞেস করো।
মিথ্যুক একবারে বাজে কথা বলবি না। তুই আমায় বলেছিলি ওখানে বাথরুম নেই?
সেটা আবার বলতে হয়, গ্রামে আলাদা বাথরুম থাকে নাকি, পুরো গ্রামটাই বাথরুম।
সবাই হেসে উঠলো।
বাঁচা গেল, তোমরা আর বিরক্ত করবে না যাবার জন্য।
বিরক্ত করবো না মানে, এক মাসের মধ্যে বাথরুম ঠিক করবি। অতো সুন্দর জায়গা, শুধু একটা বাথরুমের জন্য যেতে পারবো না। ছোটোমা বললো।
একটু চা খাওয়াবে।
মিত্রা ফ্লাক্সটা নিয়ে আয়। ছোটোমা বললো।
মিত্রা উঠে চলে গেল রান্নাঘরের দিকে। বুঝলাম মেয়ে কয়েক ঘণ্টায় করিতকর্মা হয়ে উঠেছে।
অনি পীরসাহেবের গল্পটা একবার বলবি। বড়োমা বললো।
কেন, শোনো নি?
মিত্রা ঠিক মতো বলতে পারে নি।
যখন যাবে তখন দেখিয়ে দেব।
মিত্রা ফ্ল্যাক্স আর কাপ নিয়ে এলো।
টেবিলের ওপর তিনটে কাপ রেখে চা ঢাললো। বাইরে গাড়ির হর্ন বাজলো।
এইরে এলেন সব। ছোটোমা বললো।
মিত্রা আরও দুটো কাপ নিয়ে এলো। আমি উঠে খাওয়ার টেবিলের ওখান থেকে দুটো চেয়ার নিয়ে এলাম।
মল্লিকদা ঢুকলো।
আসুন আপনার জন্য জায়গা খালি আছে এবং কাপে চাও রেডি। ছোটোমা বললো।
মল্লিকদার সে কি হাসি, এতো সৌভাগ্য আমার।
অমিতাভদা ঢুকলো, সুপার্ব নিউজ, তুই কোথা থেকে খবর পাস বলতো?
সবাই আমার দিকে চাইল। এমন কি মল্লিকদা পর্যন্ত।
তোর নিউজটা সন্দীপ ফলো আপ করলো, তারপর সত্যি সত্যি প্রেস রিলিজ করলো।
তুমি ওটা ছেপেছো!
কেন!
ওটা উইথড্র করো। ওই নিউজ কেউ ছাপে নাকি।
তুই কি করে বুঝলি?
আমি বলছি, পরে সব কথা বলবো, তুমি আগে তোলো ওই নিউজটা।
কাগজ ছেপে বেরিয়ে গেল।
দাঁড়াও আসছি, সোফা থেকে উঠে বাইরে এলাম।
ওরা একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে। ইসলামভাইকে ফোন করলাম। সব কথা বললাম। বললো ঠিক আছে। তুই বেটা সবেতেই ঘাবরে যাস। আমি নিজের ঘারে দোষ না নিয়ে অন্যের ঘারে চাপিয়ে দিয়েছি। বেশ করেছে ছাপুক। আমার বরং ভালো হবে।
আবার নিজের জায়গায় এলাম।
কি হয়েছিল!
কিছু না।
কিছু না বললে হবে, তুই উঠে চলে গেলি, কার সঙ্গে ফুসুর ফুসুর গল্প করলি। মল্লিকদা বললো।
আর একটা নিউজ আসার কথা ছিল তাই জানলাম এসেছে কিনা।
কি নিউজ।
এখানে বলতে হবে।
বল না।
বললে আপত্তি কোথায় আমরা কি নিউজের বাইরের লোক। অমিতাভদা বললেন।
মধুচক্রে মন্ত্রীপুত্র।
অমিতাভদা আমার দিকে তাকালেন। কোন মন্ত্রীরে।
তোমায় জানতে হবে না।
তুই নিউজ দিলেই আমি ছেপে দেব নাকি?
আজকেরটা ছেপেছ কেন? নাও চা খাও।
দেখেছিস মল্লিক, কেমন সাসপেন্স।
বড়োমা মুচকি হেসে মাথা দোলাতে দোলাতে বললো, যেমন বুনো ওল তেমনি বাঘা তেঁতুল।
সবাই মুখ নিচু করে হাসছে। আমি গম্ভীর।
তুমি চেয়ারে গিয়ে বসো। অনি এখানে বসুক। বড়োমা ঠেলে অমিতাভদাকে উঠিয়ে দিল। আমি বড়োমার পাশে গিয়ে বসলাম।
কি ঠিক বলিনি বলো, সব একদিনে হয়ে গেলে চলবে কি করে। বড়োমার দিকে তাকিয়ে বললাম।
একবারে দিবি না। তুই আসার পর থেকেই তোকে অফিস থেকে ঠেলে বার করে দিয়েছে, তাই না?
না।
না!
হ্যাঁ আজ আমি নিজের ইচ্ছায় বেরিয়েছি, কিছু কাজ ছিল।
অমিতাভদা কাপটা রেখে হাততালি দিয়ে উঠলো। কি এবার বলো। খালি আমি, না।
এই দেখে মিত্রার কি হাসি, ফুলে ফুলে উঠছে।
ওরে থাম থাম, বিষম লেগে যাবে। ছোটোমা বলে উঠলো।
নাও রেডি হয়ে নাও, খেতে বসে আবার সেকেন্ড ইনিংস শুরু করবো।
তার মানে? মল্লিকদা বললো।
আরে বাবা সবে টস করে ফার্স্ট ইনিংস খেললাম, এবার সেকেন্ড ইনিংসটা খেলতে হবে না।
আমি নিজের ঘরে চলে এলাম। জামাকাপড় ছেড়ে বাথরুমে গেলাম। দেখলাম ঘরটা আজ বেশ পরিষ্কার। মনে হচ্ছে কোনও মহিলার হাত পড়েছে।
তারাতারি রেডি হয়ে নিচে চলে এলাম।
দেখলাম সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
তুই মেয়েরও বেহদ্দ। ছোটোমা বললো।
মিত্রা মুচকি হাসলো।
আমি কথাটা গায়েই মাখলাম না, এমন ভাব করে বড়োমার পাশে এসে বসলাম।
ছোটোমা খাবার পরিবেশন করছে।
আমি বললাম, একসঙ্গে নিয়ে চলে এসো।
তারপর বলবি আজকের খাওয়াটা ঠিক জমলো না।
না আজ আর বলবো না। নতুন গেস্ট আছে।
আবার ওর পেছনে কেন। বড়োমা হাত তুললো।
মিত্রা জোড়ে হেসে উঠলো।
সবাই একসঙ্গে এক টেবিলে বসলাম।
মল্লিকদা শুরু করে দিয়েছে।
আমিও হাত লাগালাম।
তুই তাহলে নিউজটা দিবি না। অমিতাভদা প্রথম কথা বললো।
সন্দীপকে ফলোআপ করতে বলো।
মল্লিকদা জোরে হেসে উঠলো।
কি তেঁয়েটে দেখেছিস। ভালো নিউজ। যদি কেউ তোর আগে করে দেয়।
দেবে।
তাহলে আমাদের কাগজের ক্রেডেনসিয়াল কমে যাবে।
অনি, দিয়ে দে অতবার করে বলছে। বড়োমা বললো।
হাসলাম।
সাতদিন পরে পাবে। ছবি হোক।
কাকে পাঠাবি।
কি!
ফটো তুলতে?
আমাদের হাউসের।
হ্যাঁ।
তুমি সত্যি। আমাকে জেলে পুরবে নাকি!
তুই সঠিক নিউজ করলে জেলে পুরবে কেন?
ঠিক আছে তোমায় ভাবতে হবে না। বড়োমা যখন বলেছে, ঠিক সময়ে পেয়ে যাবে।
বড়োমা একটা চিংড়িমাছ নিজের পাত থেকে আমার পাতে তুলে দিল।
আমি মিত্রার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলাম।
তোকেও দিচ্ছি।
দিওনা পেট খারাপ করবে। অভ্যেস নেই।
বলেছে। তোর যেন কতো অভ্যেস আছে। খাসতো ওই চুনো মাছের টক আর পান্তা।
ওই খেয়ে কি বলেছিলি, বলবো সবার সামনে।
মিত্রা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
ছোটোমা হেসে উঠলো।
বোস বোস, আমি তোর মতো অকৃতজ্ঞ নই।
ছোটোমা মিত্রার কানের কাছে মুখ নিয়ে কি বললো, মিত্রাও ফিস ফিস কের বললো, তারপর ছোটোমার ফুলে ফুলে সে কি হাসি। বুঝলাম ছোটোমার কাছে মিত্রা পেট খালাস করেছে।
কেউ ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারলো না, আমি বুঝেছি।
তুই কি বলবি বলেছিলি। মিত্রা বললো।
মিত্রার দিকে তাকালাম, অফিস সম্বন্ধে তুই কতটুকু জানিস?
এতদিন আমি দেখিনি, বকলমে সুনিতদা দেখতো। যেহেতু সম্পর্কে ওর ভাগ্নে হয়।
এখন যদি কাগজের স্বার্থে ওই লোকটাকে তাড়াই তোর কোনও আপত্তি আছে।
কেন তাড়াবি। সুনিত কাজ জানে। অমিতাভদা বললো।
তোমার কাছে পড়ে আসছি, তবে এই উত্তরটা তোমায় দিচ্ছি।
বল।
তোমার পেটে যদি পাঁচশো গ্রাম সাইজের একটা টিউমার হয়, তুমি হোমিওপ্যাথিক ট্রিটমেন্ট করবে না অপারেশন করে কেটে বাদ দেবে।
অপারেশন করবো।
আমিও তাই চাইছি।
সবাই চুপ। মল্লিকদার হাত থেমে গেছে।
তুই কি করে বুঝলি?
আমি যদি প্রমাণ করে দিই। আর চম্পকবাবু?
তুই ওদের একমাস সময় দিয়েছিস।
না জেনে অনেক বেশি সময় দিয়ে দিয়েছি।
তুই সনাতনবাবুকে ফোন করেছিলি। মিত্রা বললো।
হ্যাঁ।
ওই ডকুমেন্টসগুলো কালকের মধ্যে দিতে পারবেন না।
জানি। তোকে ফোন করেছে কেন। আমাকে বলতে পারতো।
তোকে বলতে পারছেন না।
কেন। আমি বাঘ না ভাল্লুক।
তা জানি না।
জানবিনা মানে! তুই মালিক—তোর জানা উচিত। তুই এর জন্য পয়সা দিচ্ছিস মাসে মাসে।
এভাবে কখনও ভাবিনি।
তুই কি বলেছিস?
ঠিক আছে, আমি অনিকে বলে দেবো।
ব্যাস সাতখুন মাপ।
ওনাকে কাল সকালে ফোন করে বলেদিবি, আমি যা চেয়েছি সেটা কালকেই ওনাকে দিতে হবে। সব ঘুঘুর বাসা।
তুই ওকে বলছিস কেন, তুই নিজে বল। অমিতাভদা বললো।
ও নিজে দায়িত্ব নিয়েছে, তাই ওকে বলতে বলছি। ঠিক আছে, এরপর থেকে আমার কোনও ব্যাপারে তুই ফোন রিসিভ করবি না। তুই হচ্ছিস ওদের সেল্টার। ওরা সব পেয়ে বসেছে।
অমিতাভদার দিকে তাকিয়ে বললাম, তুমি মিত্রার বাবার আমল থেকে আছো। তুমি কতটুকু জানো হাউস সম্বন্ধে।
কিছুই জানি না।
তার মানে! অফিসে গেছ, নিজের চেয়ারে বসেছ, কাজ করেছ, চলে এসেছ!
তা বলতে পারিস।
মরন। বড়োমা খেঁকিয়ে উঠলো। আমাকে যে রাতে শুয়ে শুয়ে গল্প বলতে, এটা করেছি সেটা করেছি।
সবাই হাসছে।
এখন ও যখন জিজ্ঞেস করছে বলতে পারছ না। ও নিশ্চই কোনও কিছু বুঝতে পেরেছে।
তুমি ঠিক বলেছো। এটা আমার মাথায় আসেনি।
এই সব ঘটনা তোমার কাছ থেকে পরে নেব। এখন বলো চম্পকবাবুর সম্বন্ধে কি ডিসিসিন নিলে।
আমরা চাইছি ওরা একটা মাস থাকুক। কি মা তুমি কি বলো।
মিত্রা মাথা দোলাল।
মল্লিক তুই বল।
মল্লিকদা মাথাও দোলায় না, মুখও তোলে না। চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে।
একচুয়েলি তোমরা চাইছ ওদের রাখার জন্য, আর আমি দাবি করছি, না রাখার জন্য। চাওয়া আর দাবি করার মধ্যে অনেক পার্থক্য।
আমার কথা বলার মধ্যে এমন কিছু ব্যাপার ছিল, সবাই আমার মুখের দিকে তাকাল।
আমি আর বসলাম না। মুখ ধুয়ে ওপরে চলে এলাম।
বুঝতে পারলাম বড়োমা, ছোটোমার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।
নিজের ঘরে ঢুকে আলোটা জ্বালতে ভালো লাগল না। রাস্তার নিওন লাইটের মিহি আলো বাগানের আম গাছটার ফাঁক দিয়ে আমার ঘরে এসে পড়েছে। সেই মিহি আলোয় ঘরের অনেকটা অংশ আলোকিত। জানলার সামনে দাঁড়ালাম। হাজারো চিন্তা মাথার মধ্যে কিল বিল করছে। বিশেষ করে চম্পক, সুনিত এই দুটোকে যে করেই হোক ছেঁটে ফেলতে হবে।
চম্পক এতদূর এগিয়েছে সুনিতের সাহায্য ছাড়া নয়। এতদিন অনেক কিছু ভোগদখল করেছে। কিছুতেই ওরা দুজন সহজে ছেড়ে দেবে না। বিষধর সাপকে একটা আঘাতেই আধমরা করে দিতে হবে। তারপর মেরে পুরিয়ে দিতে হবে।
এই দুটোকে বেশিদিন রাখলে, আরও কয়েকটা জন্মে যেতে পারে। আবার তাদের পেছনে সময় নষ্ট করতে হবে। না কোনও বাধা আমি মানব না। আগামী শুক্রবার মিটিং কল করতে হবে। তার আগে ইসলামভাই-এর কাছ থেকে লাস্ট আপডেট নিতে হবে। ও বলেছে ও সব জানে। মিত্রার কি সুনিতের ওপর কোনও দুর্বলতা আছে? থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। যতই হোক ওর হাজবেন্ডের ভাগ্না বলে কথা।
পিঠে নরম হাতের স্পর্শে ফিরে তাকালাম। মিত্রা আমার পেছনে।
তুই শুধু শুধু আমার ওপর রাগ করছিস। আমি জানি তুই সারাদিন অনেক খবর জোগাড় করেছিস। তাই তুই এই কথা বলতে পারছিস। কিন্তু তোকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে হবে। তুই ভাবিস না আমরা তোর কাজে বাধা দিচ্ছি।
যা শুয়ে পর। আমাকে একটু একা থাকতে দে।
আমি এখানে থাকব। বড়োমা বলেছে।
বড়োমা বললে সব হয় না, এটা আমার বাড়ি নয়। তাছাড়া অমিতাভদা, মল্লিকদা আছে।
ওরা সবাই নিচে বসে আছেন।
কেন!
তুই কথা শেষ করিসনি।
আজ আর কথা বলতে ভালো লাগছে না। যা বলার আগামী শুক্রবার বলবো।
আজ কেন নয়?
যা বলছি শুনে যা। শুক্রবার মিটিং কল করবি। জানাবি সোমবার। আমি তোকে কিছু হোম টাস্ক দেব। ভালো করে কাজগুলো বোঝার চেষ্টা করবি। মাথায় রাখবি। তোর অফিস একটা ঘুঘুর বাসা। অমিতাভদা সহজ সরল। দাদার দ্বারা এ্যাডমিনিস্ট্রেশন চলবে না। তোকে তৈরি হতে হবে। যদি কাগজ বাঁচাতে চাস। আর এই কদিন আমাকে একবারে বিরক্ত করবি না।
মিত্রা আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এই অনির সঙ্গে ওর পরিচয় নেই।
ব্যাঙ্কের সিগনেচার অথরিটি কে?
আগে ও ছিল মাস কয়েক হলো আমি করছি।
তোর কিংশুক, অরিন্দম ভালো ছেলে বলে মনে হয়?
এটাও ওর রিক্রুটমেন্ট।
সবই ও ও ও, তুই কি শিখন্ডি? শেয়ারটা কার তোর না ওর?
তুই বৃথা রাগ করছিস আমার ওপর।
চুপ করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
আমি কি করবো বল, সব বুঝে শুনে চুপ থাকতাম। তুই আসার পর একটু বুকে বল পেয়েছি।
আমাকে কেন জড়ালি এর মধ্যে। মনে হয় তোর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ভেঙ্গে যাবে।
কি বলছিস বুবুন! মিত্রা চমকে আমার মুখের দিকে তাকাল।
আমি ঠিক বলছি। কাল থেকে টের পাবি।
সব শেষ হয়ে যাক। তুই আমাকে ছেরে যাস না।
মিত্রা আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
আমার টাকাটা কে দিয়েছে?
আমার নামে একটা প্রপার্টি ছিল সেইটা ওদের দিয়ে দিয়েছি। তার বিনিময়ে ওরা ট্রান্সফার করেছে।
আমাকে জানিয়েছিলি?
সেই সময় তুই দিসনি।
ঠিক আছে এখন চলে যা।
মিত্রা আমাকে ছেড়ে দিল।
ঘরের লাইটটা জলে উঠলো। পেছন ফিরে তাকালাম। সবাই ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। বুঝতে বাকি রইল না। ওরা সব শুনেছে।
দাদা কাছে এগিয়ে এলো। আমার কাঁধে হাত দিয়ে মুখটা তুলে বললো, আমাকে বল আমি তোকে সাহায্য করতে পারি।
তুমি পারবে না।
আচ্ছা তুই বলেই দেখ না।
আগামী শুক্রবারের পর সব দেখতে পাবে নিজের চোখে।
মিত্রার দিকে তাকালাম।
তোকে বলে রাখলাম আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে কোনও চেকে সই করবি না।
আচ্ছা। মিত্রা মৃদু স্বরে বললো।
বড়োমা বললো, বল না তুই। কিছু একটা নিশ্চই হয়েছে, যা তুই জানিস এরা কেউ জানে না।
তুমি ঠিক ধরেছো। আমি এখন কিছু বলবো না। এরা মাইন্ড গেম খেলবে। আমি খেলবো পাওয়ার গেম। তোমরা যাও আমাকে একটু ভাবতে দাও।
তোমরা তিনজনেই এই কয়টা দিন দশটার মধ্যে অফিসে যেও আর চোখ কান খোলা রেখো। প্রয়োজনে আমি তোমাদের ফোন করবো। তোমরা কেউ ফোন করবে না।
ঠিক আছে। দাদা বললো।
কাল আমি খুব ভোর ভোর বেরিয়ে যাব।
আমি উঠে পরবো, বল তুই কখন যাবি। বড়োমা বললো।
আমার জন্য ব্যস্ত হবে না।
বড়োমার মুখটা শুকিয়ে গেল।
আমার চাল-চলন কথাবার্তা শরীরী ভাষায় ওরা বুঝলো আমি এই মুহূর্তে ঠিক নেই।
ওরা সবাই চলে গেল। মিত্রা আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো।
আমি অনেকক্ষণ জানলার ধারে দাঁড়িয়েছিলাম, ঘুম এলো না। মিত্রা অনেকক্ষণ আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদল। আমি কোনও পাত্তা দিলাম না। সকাল হতেই বেরিয়ে এলাম। আমাকে একমাত্র দোতলার বারান্দা থেকে মিত্রা দেখল। বুঝতে পারছি মিত্রা খুব কষ্ট পাচ্ছে। তবু আমি পেছন ফিরে তাকালাম না। সোজা গেট পেরিয়ে চলে এলাম। বড়োমাকে দেখতে পেলাম না।
এই কদিন অফিসের সঙ্গে আমার কোনও যোগাযগ রইলো না। সাতদিনে সাতঘণ্টা গিয়েছি কিনা সন্দেহ। রবিবার অনাদিরা এসেছিল। ওদের সঙ্গে বসতে পারিনি। মিত্রার বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছি। মিত্রা ওদের সঙ্গ দিয়েছে। আমার সঙ্গে ফোনে একবার কথা হয়েছে। সনাতনবাবু খেপে খেপে সমস্ত কাগজপত্র দিয়েছে। একবারে দিতে পারেনি।
হিমাংশুকে কাগজ দিয়ে বলেছি, এই বছরের পরিস্থিতি জানা। ও কাগজপত্র দেখে অবাক হয়ে গেছে। বলেছে অনি আমার পক্ষে একে রিকভার করা সম্ভব নয়। তবে চেষ্টা করবো।
অমিতাভদার বাড়িতে যাইনি। বড়োমা বার বার ফোন করেছে। একটা কথাই বলেছি, বিরক্ত করবে না। এই কদিন ইসলামভাই-এর সঙ্গে থেকে সমস্ত ডকুমেন্টস জোগাড় করলাম। সমস্ত খোঁজ খবর নিলাম। রাতে কয়েক ঘণ্টার জন্য আমার ফল্যাটে থেকেছি।
ইসলামভাইকে এরইমধ্যে একদিন অভিমান করে বলেছিলাম, তুমি সব জানা সত্ত্বেও এই কাজ করলে কেন?
ইসলামভাই হাসতে হাসতে বলেছিল, তোর মালিক হওয়ার আগেই কাজগুলো সাল্টেছি। তুই মালিক হওয়ার পর একটাও অন্যায় কাজ করিনি। জানি তুই আমার কাছে আসবি, জিজ্ঞাসা করবি। আমি তোর চরিত্রটা জানি। তবে তোকে কথা দিচ্ছি ওরা এগুলো কোনওদিন পাবে না। সব অরিজিন্যাল আমার কাছে। এখনও আমার টাকা বাকি, দিলে পাবে। তুই যা ভালোবুঝবি এবার কর। আমি তোর মতে মত দেব।
আমি তাজ্জব বনে গেলাম সুনিত-চম্পকবাবুর কান্ডে। মাঝে একদিন দামিনীমাসির কাছে গেছিলাম। আমার পৌঁছবার আগেই ইসলামভাই গিয়ে দামিনীমাসীকে সব বলে এসেছে। দামিনীমাসী বলেছে ও যদি তোর কাজ না করে আমাকে বলবি, আমি ঝাঁটামেরে ওকে কলকাতা থেকে বিদায় করবো। ওর মতো কত ইসলামকে আমি জন্ম দিলাম।
আমি মাসির কথায় হেসেছি।
টিনা, অদিতি, দেবাশিস, নির্মাল্য, মিলি সবাই ওদের কোম্পানি থেকে আমায় কামিং ছয় মাসের জন্য ১২০ কোটির টাকার এ্যাডপ্যাকেজ জোগাড় করে দিল।
ওদের বললাম, তোরা আমাকে অন্যান্য এ্যাডহাউসের ব্যাপারে সাহায্য কর। ওরা কথা দিয়েছে সাহায্য করবে।
যত দিন এগিয়েছে আমাকে দেখে মিত্রার চোখমুখ শুকিয়ে গেছে। আমার কান্ডকারখানা দেখে শেষে ও ভয় পেয়ে গেছে। একদিন রাতে ওর বাড়িতে আমাকে জড়িয়ে ধরে প্রচন্ড কাঁদল। আমি চলে এলাম।
মিত্রা আমার কথা মতো কাজ করেছে। এই কয়েক দিনে ও যেন পাঁচবছরের অভিজ্ঞতা অর্জন করে ফেলেছে। মিত্রার কাছে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, সুনিতদা এবং চম্পকবাবু রেগুলার অফিসে এসেছে। আমি ওকে চুপচাপ থাকতে বলেছি।
শুক্রবার আমি মিটিং আরম্ভ হওয়ার এক ঘণ্টা আগে অফিসে ঢুকলাম। বুঝতে পারলাম অফিসে একটা চাপা উত্তেজনা। চারিদিকে ফুসফুস গুজগুজ। নিউজরুমে গেলাম, মল্লিকদা কাছে এলো।
কিরে সব ঠিক আছে?
মল্লিকদার দিকে তাকালাম।
ওরা মলদের (মলরা আমাদের হাউসের ৫ পার্সেন্ট শেয়ার হোল্ডার) হাত করেছে।
হাসলাম।
তুই হাসছিস কেন?
তুমি হাসির কথা বললে তাই।
ওরাও শেয়ার হোল্ডার।
তো।
আমার মাথায় কিছু আসছে না।
সব আসবে, এতদিন বহাল তবিয়েতে ছিলে। তাই কিছু বোঝার দরকার পরেনি।
তুই ঠিক থাকলেই সব ঠিক।
আমি বেঠিক কোথায়?
কি সব করেছিস, তোর ওপর সবাই খেপচুয়াস। দেখে নেবো, প্রয়োজনে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেব ভাব।
মউচাকে ঢিল পড়েছে। একটু আধটু হুল ফুটবেই। তাই বলে কি মধু খাব না।
হেঁয়ালি রাখ। দাদার প্রেসার বেড়ে গেছে। কাল ভীষণ শরীর খারাপ হয়েছিল।
আমাকে খবর দাওনি কেন?
দাদা বারন করলো।
তাহলে বলছো কেন?
তোর বড়োমা, ছোটোমা কাঁদছে ঠাকুর ঘরে গিয়ে বসে আছে।
আজকের পর আর বসতে হবে না।
ফোনটা বেজে উঠলো। দেখলাম মিত্রার ফোন।
কি হলো?
তুই কি অফিসে এসেছিস?
হ্যাঁ।
একবার আসবি।
এখন না এগারটার সময়।
আমার কিছু কথা ছিল তোর সঙ্গে।
কি বিষয়ে?
আজকের মিটিং-এর বিষয়ে।
নিজে নিজে ঠিক কর।
মিত্রা চুপ করে গেল।
ফোনটা কেটে দিলাম। নিজের কয়েকটা কাজ করে নিলাম। সন্দীপ আমার ধারে কাছে এলো না। অন্যান্য ছেলেগুলোর কোনও বালাই নেই। তারা জানে কাজ করছি, মাসে মাসে মাইনে পেলেই হলো।
হিমাংশুর ফোন।
তোদের অফিসে ঢুকছি।
মিত্রার ঘরে গিয়ে বোস।
তুই কখন আসছিস?
জাস্ট দশমিনিট পর। সব রেডি।
হ্যাঁ।
ঠিক এগারটায় আমি মিত্রার ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম।
দেখলাম আমার জায়গাটা মিত্রার ঠিক পাশেই। আমার দিকে মল্লিকদা, আর মিত্রার দিকে অমিতাভদা। আমার ঠিক অপজিটে মুখোমুখি মল, চম্পকদা, সুনিতদা আর সবাই এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। সবার চোখে মুখেই চাপা টেনসন।
প্রথমে সনাতনবাবু কামিং সিক্স মান্থের বাজেট কি হবে তা পড়ে শোনালেন।
তাতে এ্যাডের বাজেট দেখে চম্পকদার মুখ শুকিয়ে গেল।
পর পর সব ডিপার্টমেন্টের কি কি টাকা ঠিক করা হয়েছে। তা পরে শোনান হলো।
সবারই মুখ শুকিয়ে গেছে। মিত্রা প্রথমে মলকে বাজেটের ওপর বলতে বললেন।
মলবাবু বললেন, ম্যাডাম আমি মাত্র পাঁচভাগ শেয়ার হোল্ড করে আছি। আমার কোনও কথা নেই। আপনি বরং বলুন আমরা মেনে নেব।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, আপনার কিছু বলার আছে।
আমি শুরু করলাম।
আমি পনের দিন হলো কোম্পানীর মালিক হয়েছি। তাতে হিসাবে অনেক গরমিল দেখলাম, আপনারা দুজনে কেউ তা জানেন।
মল এবং মিত্রা দুজনেই অস্বীকার করলো।
সনাতানবাবু।
সনাতানবাবু আমার মুখের দিকে তাকালেন।
ইনটারন্যাল অডিটে কিছু ধরা পড়েছে?
সনাতানবাবু চুপ করে রইলেন।
আরে হ্যাঁ না কিছু বলুন?
ধরা পড়েছে।
সেই ব্যাপারে কাউকে কিছু বলেছিলেন?
এই মিটিংটা হুট করে হবে জানতাম না। তাহলে আনিয়ে রাখতাম।
সাত দিনের নোটিস দেওয়া হয়েছিল।
আপনি নিজে চোখে সব দেখেছেন।
আমি পনেরো দিনের মালিক। আপনি বলুন, কে কি নিয়েছে?
মল বাবু অনেক বেশি টাকা তুলেছেন।
মল হই হইকরে উঠলো।
আমি মলের দিকে তাকালাম।
আমার বরফঠান্ডা চোখের দিকে তাকিয়ে মল কেন জানিনা ঘাবড়ে গেল।
আপনি নতুন এসেছেন আপনি কিছু জানেন না। চিল্লিয়ে উঠলো।
মলকে পাত্তাই দিলাম না।
চম্পকবাবুর দিকে তাকালাম।
চম্পকবাবু গত ছয়মাসে আমাদের এ্যাডের যা বাজেট ছিল তার কত এসেছে।
টার্গেট ৯০ ছিলো ৫০ এসেছে।
কত কমিশন বাদ গেছে।
তের কোটি।
এনটারটেনমেন্টের পেছনে কত খরচ হয়েছে।
ছয়কোটি। তুমি কি এই জন্য মিটিং ডেকেছ নাকি।
আপনি এত উত্তেজিত হচ্ছেন কেন?
তুমি উত্তেজনার সৃষ্টি করছো।
এ্যাডডিপার্টমেন্ট গত ছয় মাসে ছয় কোটি টাকা এন্টারটেনমেন্টের পেছনে খরচ করেছে। এই বিষয়ে আপনার কোনও বক্তব্য আছে।
না।
আচ্ছা আগামী ছয় মাসের বাজেট ধরা হয়েছে ৩০০ কোটি। এটা এখুনি সনাতনবাবু পড়ে শোনালেন।
এই বিষয়ে আপনি কি বলবেন?
এ্যাবসার্ড।
আপনার রেসিও অনুযায়ী এই এ্যাড যদি পাওয়া যায় তাহলে একশো কোটি কমিশন।
চম্পকদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে, সকলে একটু নড়েচড়ে বসলো।
এনটারটেনমেন্টের পেছনে খরচ হবে লাম-সাম ১৫ থেকে ২০ কোটি। তাই তো?
সবাই চুপচাপ।
চম্পকবাবু উত্তর দিন।
এব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই। তোমরা আমাকে না জিজ্ঞেস করে বাজেট করেছ।
আপনি বাজেট করে যা এনেছেন তা কি ঠিক।
তুমি কি বলতে চাও?
গত সপ্তাহে আপনি এনটারটেনমেন্টের নামে, দেড় লাখটাকার একটা বিল জমা দিয়েছিলেন। খেপে খেপে সাতদিনের মধ্যে সেই টাকা আপনি নিয়ে নিয়েছেন। টাকাটা আপনি কোথায় খরচ করলেন?
তোমাকে তার কৈফিয়ত দিতে হবে নাকি?
মালিক হিসেবে আমি আপনার চাকরিটা খেতে পারি। শুধু তাই নয়। এই ঘর থেকে আপনাকে শ্রীঘরে ঢোকাতে পারি। জামিন অযোগ্য মামলায় আপনাকে ফাঁসাতে পারি। সাংবাদিক হিসাবে কালকে কাগজে সুন্দর করে একটা আর্টিকেল লিখতে পারি। উইথ ফটোগ্রাফ। যাতে আপনার সাধের সংসার ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এই সমাজে আপনি আর কোনওদিন মুখ তুলে দাঁড়াতে পারবেন না। আপনি কোন অপশন বেছে নেবেন?
সবাই দেখলাম আবার একটু নড়েচড়ে বসলেন। মল আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। সুনিতবাবুর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। দাদা মল্লিকদার মাথা নিচু।
আমার হিসেব অনুযায়ী কোম্পানী আপনার কাছে ছ-কোটি টাকা পায়।
এটা অন্যায় ভাবে আমার ওপর প্রেসার করা হচ্ছে।
তারমানে আমি যা বলছি তার কিছুটা মেনে নিচ্ছেন। পুরোটা নয়।
চুপচাপ।
তাহলে আর একটা কথা বলি।
অনি থাক। মিত্রা বললো।
কেন। থাকবে কেন? তুই বল, আমার শোনার দরকার আছে। অমিতাভদা বললেন।
উনি আমাদের হাউসের এ্যাড অন্য কাগজে দিতেন। সেখান থেকে বেশি কমিশন পেতেন।
চম্পকবাবু চমকে আমার মুখের দিকে তাকালেন।
আমার কাছে তার প্রমাণ আছে, আমি কখনও ইয়লো জার্নালিজম করি না।
কি চম্পক অনি ঠিক কথা বলছে। অমিতাভদা বললো।
চম্পকদা চেয়ার ছেড়ে অমিতাভদার কাছে ছুটে এসে পায়ে ধরে ফেললেন।
আমায় ক্ষমা করুণ দাদা। আপনার ওপর অনেক অন্যায় করেছি। আমি সত্যি বলছি। মল আর সুনিতের পাল্লায় পরে এসব করেছি। ওরাও সব ভাগ পেয়েছে দাদা। আমি একা নিই নি।
আপনি অনির হাত থেকে আমাকে বাঁচান। আমি জানি ওর কাছে সব ডকুমেন্টস এসে গেছে। আপনি এই হাউসের সবচেয়ে সিনিয়র পার্সন আপনার কথা অনি ফেলতে পারবে না। ম্যাডাম মেনে নেবেন।
কি হে মল। চম্পক কি বলে। দাদার গলাটা গম গম করে উঠলো।
উনি প্রমান করতে পারবেন?
তাই নাকি মলবাবু। আমি বললাম।
আপনি কোনও কথা বলবেন না। আমি চম্পকের সঙ্গে কথা বলছি।
আপনার বাড়ি তো রাজস্থানে, চৌমহিনি, ট্যাঙ্করোড, এ্যাকাউন্ট নম্বর….। আপনার ব্যাঙ্ক এ্যাকাউন্ট এতক্ষণে সিল হয়ে যাবার কথা। একটা ফোন করুণ আপনার ব্যাঙ্কে। দেখুন এ্যাকাউন্টের পজিসন কি।
এটা আপনি কি করছেন অনিবাবু!
তাহলে সত্যি কথা বলুন।
কিছু দিয়েছে, যৎ সামান্য।
বাইপাসের প্রমোটিংয়ে কত ঢেলেছেন?
ওটা আমার মাদার বিজনেস।
হিমাংশু জেরক্সটা মলের হাতে দে। অরিজিন্যাল আমার কাছে।
হিমাংশু জেরক্সটা এগিয়ে দিল।
মল উঠে এসে আমার হাত জড়িয়ে ধরলো। পারলে আমার পায়ে পড়ে যায়। আপনি আমার এতো বড় ক্ষতি করবেন না। আমি একেবারে মরে যাব। আমি বুঝে গেছি সব।
ব্যবসায়ী মানুষ, তারাতারি আপনাকে বুঝতেই হবে।
অমিতাভদা, মল্লিকদা, মিত্রা সব মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে, ব্যাপারটা কি হলো। মল এরই মধ্যে এতটা ডিগবাজী খেয়ে যাবে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না। ঘরের অন্য ডিপার্টমেন্টর সকলের মুখ থমথমে।
আপনি যা বলবেন আমি করে দেব। এটা শো হলে আমার ৬০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়ে যাবে।
আমার দুটো জিনিস চাই। মির্জা গালিব স্ট্রীটের জায়গাটা। আর আপনার ৫ পার্সেন্ট শেয়ার।
সুনিতদা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আবার চেয়ারে ধপ করে বসে পরলো। সবাই দেখল ব্যাপারটা। কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারলো না।
একটা বিশ্রী ক্যাওস হৈ হট্টোগোল শুরু হয়েগেল।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
হিমাংশু চল থানায় যাব।
না না এটা কোনও সমাধান হলো। আপনি জোর জবরদস্তি করছেন। মল আমার হাতটা চেপে ধরলো।
কি সুনিতদা জোর জবরদস্তি না হকের জিনিস। কোনটা?
সুনিতদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
আমি বেশি সময় দিতে পারব না। আমার কথা মানবেন, না তিনজনকেই ভেতরে পুরবো।
অমিতাভদা উঠে দাঁড়াল, তুই কি আরম্ভ করেছিস বলতো?
আমি কে, সঙ্গে কি নিয়ে ঘুরছি। গত বাহাত্তর ঘণ্টায় এরা তা জোগাড় করে ফেলেছে। তোমার মাথায় এসব ঢুকবে না।
সুনিতদা, চম্পকদা, মল আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
সেটার প্রমাণ তোমাকে নতুন করে দেখাতে হবে না।
দাদা, মিত্রা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
আমি চাইলেও, এরা এই ঘর থেকে আমাকে বেরতে দেবে না। ওই দরজায় লম্বা হয়ে শুয়ে থাকবে তিনজনে। ওদের প্রাণের পাখি আমার কাছে। তোমরা আমাকে কিছু বলতেই দিলে না। এরাও এই ছকটা কষেছিল। আমি কিন্তু এদের একটাকেও ছারবো না। খাবি খাইয়ে ছেড়ে দেব।
সুনিতদা এগিয়ে এলো, তুই যা বলবি তাই করবো। তুই বল কি করতে হবে।
শুধু সই করতে হবে।
আজকেই করতে হবে?
হ্যাঁ। ডিড তৈরি আছে। পড়েনাও সই করো।
ওরা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
হিমাংশু ডিড ওদের হাতে দিয়ে দে।
হিমাংশু চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে দাদার পাশে রাখা এ্যাটাচি থেকে ডিড বার করে ওদের এগিয়ে দিল।
দাদা, মল্লিকদা, মিত্রা আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে।
আপনি এটা ঠিক কাজ করছেন না অনিবাবু।
আমি মলের দিকে তাকালাম।
মিঃ মল তোমার কাছে এখনও ৫০ কোটির হিসাব চাইনি।
সেটাও কি আমি একা লিয়েছি। সবাই লিয়েছে। মল এবার নিজের ফরমায় এলো, বাংলা-হিন্দী।
কারা কারা নিয়েছে?
চম্পক আছে, সুনিত আছে, কিংশুক আছে, অরিন্দম আছে, ডঃ ব্যানার্জী আছে, ম্যায় সনাতন ভি আছে।
আমি আপনার থেকে বুঝে নেব, আপনি ওদের কাছ থেকে বুঝে নিন।
এটা কি বলছো অনি! সনাতনবাবু বললেন।
কেন?
সনাতনবাবু কোনও কথা বলতে পারছেন না।
নোওয়ার সময় অনির কথা মনে পড়ে নি?
সবাই মাথা নিচু করে বসে আছে।
সই না করলে সবকাটাকে তোলতাই করাবো। হিমাংশু দুটো ডিড আছে দেখে শুনে সই করাবি।
হিমাংশু মাথা নিচু করে কাজ করে চলেছে।
রেজিস্টারার ম্যাডাম এসেছে?
হ্যাঁ।
এখানেই রেজিস্ট্রী করাবি। সাক্ষী অমিতাভদা, মল্লিকদা, মিত্রা। আমি নিউজরুমে গিয়ে বসছি। আধাঘণ্টা সময় দিলাম। তারপর আবার মিটিং স্টার্ট হবে।
মল আমার কাছে এসে দাঁড়ালো। তুমি ক্যাশ লাও।
আমার এক কথা।
তাহলে হামিও তোমায় বললাম, হামি ভি তোমাকে ছেড়ে দেব না।
আমি পকেট থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে ডায়াল করলাম, ভয়েস অন করলাম।
ইসলামভাই-এর গলাটা গম গম করে উঠলো।
কিরে অনি। মল নাকুর নুকুর করছে। ও শালা মেড়ো আছে। ও জানে না তোর বুদ্ধির কাছে ওরা বাচ্চা।
কারগলা শুনতে পাচ্ছেন।
মল আমার দিকে ফ্যাকাসে চোখে তাকিয়ে আছে, ও যার ওপর নির্ভর করে এতক্ষণ দাপাদাপি করছিল সেটা যে এই ব্যাক্তি সেটা ও বুঝে ফেলেছে।
তুমি কথা বলো।
মলের গালে, চম্পকদার গালে, সুনিতদার গালে কে যেন কোষে থাপ্পর মারল।
দে।….কি মল বাবু।
হ্যাঁ বলো ইসলামভাই।
অনি যা বলছে চুপচাপ করে দিন। আপনার ভালো হবে। অনিকে আপনার থেকে বেশি দিন চিনি। ও খারাপ ছেলে নয়।
আর শুনুন চম্পক আর সুনিতকেও বলে দিন। আজ থেকে অনি যা বলবে ওরা যেন শোনে, না হলে ওদের ক্ষতি হবে।
আমি অনিকে রিকয়েস্ট করেছি। ওদের চাকরি যাবে না। অনিকে দিন।
হ্যাঁ বলো।
তুই কাল দামিনীর কাছে গেছিলি।
হ্যাঁ।
কেন ইসলামভাই-এর ওপর বিশ্বাস ছিল না।
মনটা ভালো ছিল না।
ইসলামভাই জোরে হেসে উঠলো।
আজ গিয়ে বলে আসবি।
ঠিক আছে।
ফোনটা বন্ধ করলাম। সবাই কথা শুনলো। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
দামিনীমাসির গল্পটা একমাত্র মিত্রা জানে। ও মাথা নিচু করে আছে।
আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।
ঘরের বাইরে দেখলাম প্রচুর লোক। আমায় দেখতে পেয়ে, পরি কি মরি করে পালাচ্ছে। আমি সোজা ক্যান্টিনে চলে গেলাম। চায়ের কথা বলতেই বটাদা তুরন্ত চা নিয়ে চলে এলো।
আমি ফোনটা বার করে, বড়োমাকে ফোন করলাম।
হাঁপাচ্ছ কেন।
ঠাকুর ঘর থেকে দৌড়ে এলাম। জানি তুই ফোন করবি।
তোমার ঠাকুর কি বললো?
তুই জিতবি।
তাই হয়েছে।
হ্যাঁরে অনি সত্যি তুই জিতেছিস?
হ্যাঁ।
তুই ছোটোর সঙ্গে কথা বল।
দাও।
জানিস অনি, এই কটা দিন মনটা ভীষণ খারাপ ছিল। তুই ভালো আছিস, মনটা খালি কু গাইত।
আমি কোনও অন্যায় কাজ করিনি।
জানি। কাল দাদার শরীরটা ভীষণ খারাপ ছিল।
জানি।
তুই জানিস!
হ্যাঁ।
তুই কি সাংঘাতিক ছেলেরে।
পরে ফোন করবো।
সন্দীপ কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারিনি। মিটি মিটি হাসছে। তুই সত্যি বস।
কেন।
বোড়ের চালে রাজা কিস্তি মাত।
হাসলাম।
ফোনটা বেজে উঠল।
হিমাংশুর ফোন।
সই কমপ্লিট।
হ্যাঁ।
তোকে সই করতে হবে।
যাচ্ছি।
তুই নিউজরুমে থাক। সেকেন্ড ইনিংসটা খেলে আসি।
সন্দীপ হাসলো।
(আবার আগামীকাল)