জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
নবম কিস্তি
সন্দীপের ফোনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। তাহলে কি ঘরুই, কিংশুক, অরিন্দম নতুন করে ঘোঁট পাকাল? না সুনিতের নতুন চাল?
নাঃ একটা কিছু করতে হবে। কাল সন্দীপের কাছ থেকে নিউজটা নিই আগে। তারপর।
কে রটাল? মিত্রাকে না বলে দিই আসার জন্য। তারপর ভাবলাম ওর মনটা খারাপ হয়ে যাবে। তার থেকে যেমন আছে থাক। শেষপর্যন্ত দেখা যাবে কার দৌড় কতটা।
পায়ে পায়ে শ্মশানের একেবারে ভেতরে চলে এলাম।
কয়েকদিন আগে কাউকে হয়তো দাহ করা হয়েছে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পোড়া কাঠের টুকরো। ছেঁড়া কাপর। মাটির হাঁড়ি। শহুরে শ্মশানের মতো নয়। চারিদিকে শ্মশানের সেই ঘনো জঙ্গল আর নেই। অনেক পরিষ্কার হয়েছে। কাকার মুখ থেকে এই শ্মশান সম্বন্ধে অনেক গল্প শুনেছি। অনেক মিথ এই শ্মশানকে নিয়ে তৈরি হয়ে আছে। সেই মিথের খোঁজেই আমি প্রথমে শ্মশানে আসি।
তখন আমি ক্লাস টেনের ছাত্র। মা-বাবাকে এই শ্মশানে একই সঙ্গে দাহ করা হয়েছিল পাশাপাশি চিতায়। সেই জায়গাটা খোঁজার অনেক চেষ্টা করেছি। কাকা কখনও বলতেন পুকুরের পূবপাড়ে যে অশ্বত্থ তলা আছে। তার কোলে দাহ করা হয়েছিল।
আমি সেই অশ্বত্থ গাছ খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু তার কোল খুঁজে পাইনি। এখনও সেই গাছটা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আমি পায়ে পায়ে সেখানে এলাম। মা বেঁচে থাকলে তার ছেলের কীর্তি হয়তো দেখে যেতে পারতেন। মনটা ভাড়ি হয়ে গেল।
পারদপক্ষে এই সব চিনতা করতে ভালো লাগে না। তবু এখানে এলেই পরিবেশ পরিস্থিতি মেনে সব কথা হুরমুর করে মনে এসে যায়।
একটা সিগারেট ধরালাম। মিত্রাকে ফোন করতে ইচ্ছে করছে। পকেট থেকে ফোনটা বার করে ডায়াল করলাম।
হ্যাঁ বল।
কোথায়?
ফিরছি।
গাড়ির আওয়াজ পাচ্ছি।
তুই এখনও ফিরিস নি!
কি করে বুঝলি?
ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শুনতে পাচ্ছি।
হাসলাম।
কেন এরকম করিস বুবুন, ফিরে যা না। রাত-বিরেতে কোথায় কি হবে।
নারে, আমার কিছু হবে না দেখবি। বড়োমা কি বললো?
বললো সাবধানে যাস। ও একটা পাগল, তুই ওর পাল্লায় পরে পাগল হোস না।
তুই কি বললি?
আমি হাসলাম, মনে মনে বললাম তুমি ওর পাগলামর কি দেখেছো, কলেজ লাইফে আমি ওর পাগলাম চাক্ষুষ দেখেছি।
কালকে তুই বড় গাড়িটা নিয়ে আসিস না।
কেন!
এখানে রাখার জায়গা হবে না।
তাহলে?
ছোটো গাড়িটা নিয়ে আসিস। তোর সঙ্গে কে আসবে?
আমি একা ড্রাইভ করে যাব।
না। বাইরুটে একলা আসিস না। ইসমাইলকে নিয়ে আসিস।
আচ্ছা।
দাদার সঙ্গে দেখা হলো?
হ্যাঁ। আমি যখন বেরচ্ছি তখন দেখা হলো। দাদা ঢুকছেন।
বলেছিস?
না। বড়োমা বলেছেন।
ঠিক আছে।
আসার সময় তুই একটা কাজ করবি?
বল।
কিছু বাজি কিনে আনবি?
কোথায় পাব!
ক্যানিং স্ট্রীটে।
এখন অনেক রাত হলো। দোকান সব বন্ধ হয়ে যাবে।
কটা বাজে?
আটটা। ঠিক আছে দেখছি।
কাল এখানে একটার মধ্যে পৌঁছনোর চেষ্টা করিস।
আচ্ছা।
ফোন কাটতে না কাটতেই অনাদির ফোন।
তুই কোথায়?
হাসলাম। কেন?
আমরা কখন থেকে এসে বসে আছি।
আমি শ্মশানে।
একা!
দোকা পাব কোথায়—
সত্যি তোর মাথায় কি ছারপোকা আছে?
তা একটু আছে বইকি।
ঠিক আছে তুই বোস। অনাদির গলায় টেনশনের সুর।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই দেখি বাইকের আওয়াজ।
হেডলাইটটা প্রথমে ক্ষীণ তারপর উজ্জ্বল হলো। আমি অশ্বত্থ তলায় বসে আছি। বাইকে দুজন আরহী। চাঁদের আলোয় যেটুকু দেখতে পাচ্ছি চিকনা আর সঞ্জীব বলে মনে হচ্ছে। ওরা আমায় দেখতে পাচ্ছে না। তারপর কাছাকাছি এসে অনি, অনি বলে চিৎকার শুরু করলো।
আমি সাড়া দিলাম।
তারাতারি আয় ভাই। জীবনে এখনও অনেক কিছু পাওয়ার আছে। মরতে চাই না।
ওদের গলার স্বরে যে কাকুতি মিনতি ছিল তা শুনে আমি হেসেফেললাম।
আমি ধীর পায়ে ওদের কাছে এলাম। বাইকে শুধু বসার অপেক্ষা।
চিকনা বাইক ছোটাল রুদ্ধশ্বাসে। আমি মাঝখানে সঞ্জীব আমার পেছনে।
মিনিট তিনেকের মধ্যেই পৌঁছেগেলাম।
দেখলাম খামারে একটা জটলা। আমি গাড়ি থেকে নামতে চিকনা চেঁচিয়ে উঠলো। খিস্তি বাদে যা যা বিশ্লেষণে আমাকে আবাহন করার দরকার তাই করল। সঞ্জীবও বাদ গেল না। নীপা আরও গলা চড়িয়ে যা নয় তাই বলে গেল।
আমি মাথা নিচু করে শুনে গেলাম। কোনও উত্তর দিলাম না। অনাদি শুধু কাছে এসে আমার কাঁধে হাত দিয়ে বললো, চল ঘরে চল।
আমি পায়ে পায়ে ঘরে এলাম। আমার পেছন পেছন ওরা সবাই।
সবাই কেমন গুম হয়ে আছে। চিকনা ঘরের সোফায় মাথা নিচু করে বসে আছে। আমি নিস্তব্ধতা ভেঙে চিকনার কাছে একটা সিগারেট চাইলাম। চিকনা উঠে এসে আমার পা ধরে ফেললো।
এ-কী করছিস তুই!
অনি সত্যি বলছি আমি ভুল করে ফেলেছি।
আমি ওর হাত ধরে দাঁড় করালাম। তুই ভুল করিস নি। ঠিক করেছিস।
আমি তোকে অনেক বাজে বাজে কথা বলেছি।
তুই একটুও বাজে কথা বলিসনি। তোর জায়গায় আমি থাকলে, আমিও তোর মতো ব্যবহার করতাম।
চিকনা চোখ মুছছে।
তোরা আমাকে ভীষণ ভালোবাসিস। আমাকে তোদের হারাবার ভয়। এই তো?
চিকনা মাথা দোলাচ্ছে। সঞ্জীব অপরাধীর মতো আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
শ্মশানটা পবিত্র জায়গা। ওখানে ভয়ের কিছু নেই। ভয় করলেই ভয়।
শালা অনাদিটার জন্য। চিকনা চেঁচিয়ে উঠলো।
অনাদি মাথা নিচু করে আছে।
তখন বাসুর দোকানে যাওয়ার ব্যাপারটা ফাইন্যাল করলেই সব ল্যাটা চুকে যেত।
অনাদির দিকে তাকিয়ে, তুই ওখানে কি ছিঁরলি এতক্ষণ, বল। কয়েকটা পার্টির লোকের সঙ্গে কপচালি। লোকের পেছন মেরে চা-সিগারেট খেলি….।
আমি হেসে ফেললাম।
অনাদি মুখ নিচু করে হাসছে।
দোষ করলি তুই, ঝাড় খাচ্ছি আমি, দেখছিস? অনাদি আমার দিকে তাকিয়ে বললো।
চিকনা কাঁচা কাঁচা খিস্তি করলো, পার্টি করছে। তোর জন্য অনিকে আমি….।
নীপা চায়ের মগ নিয়ে ঘরে ঢুকল। গম্ভীর। কোনও কথা না বলে চায়ের ট্রে রেখে চলে গেল। বুঝলাম, চিকনার মতো ওরও চোখ ছল ছল করছে।
অনাদি সবাইকে চা ঢেলে দিল। চা খাওয়া হলো। আমি মেলার খবর নিলাম। শুনে মনে হচ্ছে বেশ বড়ো ফাংশন হবে। অনাদি মেলা কমিটির সেক্রেটারি। সঞ্জয় অনাদির অধস্তন। বাসু প্রসিডেন্ট।
আমি অনাদিকে বললাম, হ্যাঁরে প্রসিডেন্টের কোনও কাজ কর্ম নেই তোদের প্রোগ্রামে?
আছে। হাল্কা।
ওই জন্য বাসু ওই পোস্টটা নিয়েছে। চিকনা বললো।
বাসু হাসছে।
তোকে কি পোস্ট দিয়েছে। চিকনাকে জিজ্ঞাসা করলাম।
ফাংশন।
আরি ব্যাস এ তো গুরু দায়িত্ব।
আমি সঞ্জয়কে দিয়ে দিয়েছি। বলেছি এই দায়িত্ব তুই নে, আমি মাঠের দায়িত্বে থাকব।
মাঠের আবার কি দায়িত্ব!
দেখবি কাল, ডাবুর বোর্ড বসবে।
জুয়া!
হ্যাঁ।
তোরা এ্যালাও করবি!
অনাদিকে বল।
আনাদির দিকে তাকালাম।
ওরাই মেলার সিংহভাগ খরচ দেয়।
আরও আছে শুনবি। চিকনা বললো।
আমি চিকনার দিকে তাকালাম।
ভাকুর ঠেক বসবে। ভানুর দিকে তাকিয়ে, হাঁড়িয়ার ঠেক বসবে, আরও কতো কি হবে। তেড়ে হাতের সুখ করতে হবে।
যে রকম আমায় করে ফেলছিলি আর একটু হলে।
চিকনা অপরাধীর মতো চোখ করে বললো, তুই আর ওই কথা মনে করাস না।
হ্যাঁরে অনাদি, দিবাকর কোথায়?
শালা কলকাতা গেছে। কি ইন্টারভিউ দিতে। চিকনা বললো।
থাকবে না কালকে?
থাকবে না আবার। একটু হামবরাক্কি ভাব করতে হবে না। দেখবি কাল, খালি স্টেজের পাশে। মেয়েদের পেছন পেছন ঘুর ঘুর করছে। চিকনা বলে চলেছে।
ও এখনও বিয়ে করে নি?
সেদিন যে মেয়েটা এসেছিল, ওটাকে পটিয়েছে। ভানুকে জিজ্ঞাসা কর ডিটেলস পাবি। চিকনা বললো, ভানু মুচকি মুচকি হাসছে।
তোকে ও দু-চোখে দেখতে পারে না। সেদিন তুই বাজার থেকে চলে এলি। আমায় বললো, অনিকে দেখে অতো আদিখ্যাতার কি আছে। চিকনা বলে চলেছে।
দিলাম শালা বাপ তুলে দু-চারটে। শুর শুর করে কেটে পরলো।
ওর একটা জেলাস কাজ করে সব সময়। বাসু বললো।
সব সময় খিস্তি দিস না। বয়স হয়েছে।
দেখ অনি খিস্তির কি মহিমা, আগামীকাল বুঝতে পারবি।
হাসলাম।
অনাদির দিকে তাকিয়ে বললাম, কাল বাসুকে আমার সঙ্গে একটু ছারবি?
তুই ওকে নিয়ে স্যারের চশমা আনতে যাবি?
হ্যাঁ।
ও থাকা যা না থাকাও তা। সঞ্জয় বললো।
তারাতারি চলে আসিস। আজকে যা খেল দেখালি।
আমি হাসছি।
হাসিস না। জানিস গত সপ্তাহে হাঁড়ি পাড়ার একটা মেয়ে সকালে ঘাস কাটতে গেছিল। ওকে ভূতে ধরেছিল। গুনিনকাকার কাল ঘাম ছুটে গেছে ভূত তাড়াতে।
দূর। যত সব আজগুবি। কই আমাকে ভূতে ধরলো না।
জানিনা। তোর সঙ্গে তর্ক করে পারবো না।
নারে অনি আমিও শুনেছি ব্যাপারটা। বিশ্বাস হয়না, তবু বিশ্বাস করি। বাসু বললো।
আমি মিটসেফের কাছে উঠে গেলাম। মানিপার্টস থেকে কুড়ি হাজার টাকা বার করলাম। সঞ্জয় আর বাসুকে ভাগ করে দিয়ে বললাম, ব্যালেন্সটা আমায় বলিস কাল দিয়ে দেব।
ওরা না গুনেই টাকাটা পকেটে ঢুকিয়ে নিল।
আমি বললাম, গুনে নে।
সঞ্জয় আমার দিকে তাকিয়ে হাসল, তুই কি কম দিবি।
না। তবু টাকা পয়সার ব্যাপার গুনে নে।
না থাক, বাড়িতে গিয়ে গুনব।
ওরা চলে গেল।
আমার শ্মশানে যাওয়াটা যে খুব অন্যায় হয়েছে। রাতে খেতে বসে তা হাড়েহাড়ে বুঝলাম। কাকিমা স্নেহের বকাবকি করলো। সুরমাসি মুখে কিছু না বললেও, ভূতের গুনাগুণ সম্বন্ধে বিচার করলো। নীপা বার কয়েক সুরমাসির দিকে বিরক্তি পূর্ণ ভাবে চাইল। কাকাও অনেক কথা বললো। বোঝাল।
বোবার শত্রু নেই। আমি গোগ্রাসে গিলে চলে এলাম।
বসা মানে কথা বারবে। সোজা নিজের ঘরে এসে খাটের পাশে গোছান আমার কাপর গেঞ্জি পরে টান টান হয়ে শুয়ে পরলাম।
আমি ঘুমইনি। ঘুমনোর ভান করে পরেছিলাম। নীপা ঘরে এলো। তার কাজ সারছে। আর ফুঁপিয়ে যাচ্ছে। আমি কোনও কথা বললাম না। তারপর নীপা দরজাটা ভেজিয়ে বাইরে চলেগেল।
বেশ বুঝলাম আজ আমি ভীষণ অন্যায় করে ফেলেছি। এ ভুলের সংশোধন আমাকেই করতে হবে। শ্মশান নিয়ে এতো কুসংস্কার এই গ্রামের মানুষের মধ্যে আছে তা কল্পনার অতীত। বেশ মনে পড়ে একবার আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি কাকার কাছে বেধড়ক মারও খেয়েছিলাম। সেটাই মনে হয় কাকার কাছে আমার শেষ মার খাওয়া।
বিছানা ছেড়ে উঠলাম। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলাম নীপা ওর বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে ফুলে ফুলে কাঁদছে। আমার ভীষণ হাসিও পাচ্ছে। আবার করুণাও হচ্ছে। একটা ছোট্ট ব্যাপার নিয়ে এতবড়ো একটা ঘটনা ঘটতে পারে আমার জানা ছিল না। অনাদি যদি ফোনটা না করতো তাহলে কিছুই হতো না। আমিও মিথ্যে বলতে পারতাম।
দরজাটা আস্তে করে খুলে নীপার পাশে গিয়ে বসলাম। ওর পিঠে হাত রাখলাম। ফোঁপানিটা আরও বেরেগেল। আমি জোরকরে ওকে বুকে টেনে নিলাম। ও আমার বুকে মুখ ঢাকল।
আমি ওকে বুকের সঙ্গে জাপ্টে ধরে উঠে বসলাম, তারপর পাঁজা কোলা করে তুলে ঘরে নিয়ে এসে খাটে শোয়ালাম।
কি ভারিরে বাবা। এইটুকু একটা মেয়ে এতো ভারি হতে পারে আমার জানা ছিল না। যাক ফাঁকতালে কোলে চরা হয়ে গেল।
আমি কথাটা এমন ভাবে বললাম, নীপা ফিক করে হেসে ফেললো। তরাক করে উঠে বসে আমার বুকে দু-চারটে ঘুসি মারল।
আমি ওর হাত দুটো ধরে হাসতে হাসতে বললাম, বুকটা ভেঙেগেলে নীপার জন্য যে জায়গাটুকু আছে সেটুকুও চলে যাবে।
যাও আমার দরকার নেই।
জিভ দিয়ে চু চু চু করে বললাম ও কথা বলতে নেই। দেখো অতো সুন্দর মুখটা কেমন ভাতের হাঁড়ির পেছনের মতো লাগছে।
নীপা আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পরলো। দাঁত বসালো। আমি উঃ করে উঠলাম। নীপা আমার গেঞ্জিটা তুলে দাঁত বসানো জায়গাটায় হাত বোলাচ্ছে।
জুতে মেরে গরু দান।
নীপা আমার দিকে তাকাল। তুমি ভীষণ স্বার্থপর। নিজেরটা ছাড়া কিছু ভাব না।
আরি বাবা, আমি ভগবান নই। আমিও অন্যায় করতে পারি….।
তুমি কেন ওখানে গেছিলে?
ভালোলাগে বলে।
তোমার ভালোলাগার আর কোনও জায়গা নেই?
না।
দিনের বেলা মানুষ যেতে ওখানে ভয় পায় আর তুমি রাতে….।
আচ্ছা বাবা, আর হবে না। এবার গেলে তোমরা জানতেও পারবে না।
আমার গা ছুঁয়ে কথা দাও তুমি আর যাবে না। গেলে আমি মিত্রাদিকে বলে দেব।
শুঁড়ির সাক্ষী মাতাল।
কি বললে?
না কিছুনা।
নীপা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি তোমার গা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করার পর যদি যাই তাহলে কি হবে।
আমি মরে যাব।
আর আমি ঢোল বাজিয়ে লোককে বলে বেরাব, নীপা মরিয়া গিয়া প্রমান করিল সে মরে নাই।
উঃ তোমাকে নিয়ে পারা যাবে না।
মেঘ কাটল। নীপাকে বললাম জলের জগটা নিয়ে এসো, আকন্ঠ জল খাই।
আমি ওর দিকে তাকালাম।
নীপা আজ একটা হাতকাটা ম্যাক্সি পরেছে। কোমর দুলিয়ে চলেগেল মিটসেফের কাছে, জলের জগটা নিয়ে এলো, জল খেলাম, নীপা জলের জগটা নিচে নামিয়ে রেখে আমার পাশে বসলো।
জানো নীপা খুব ছোটোবেলার একটা কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।
কি?
তোমার মেঘনাদ পন্ডিতকে মনে পড়ে।
হ্যাঁ।
আমরা শেষের একবছর পন্ডিতমশাইয়ের কাছে পড়েছিলাম। আমাদের খুব মারতো। সংস্কৃত ঠিক মতো উচ্চারণ করতে পারতাম না বলে।
একদিন সন্ধ্যে বেলা কাকার সঙ্গে দেখা করতে এলো, আমি তখন ওই বাড়ির বারান্দায় বসে পড়ছিলাম, খুব জোড় বাথরুম পেয়েছে, কিন্তু নিচে নামা যাবে না, কাকা আছেই তার ওপর পন্ডিতমশাই, কি করা যায়, পা টিপি টিপে, বারান্দার কোনায় গেলাম।
দেখলাম মেঘনাদ পন্ডিত ঠিক চালের তলায় দাঁড়িয়ে, দিলাম মুতে, চাল থেকে জল গড়িয়ে মেঘনাদ পন্ডিতের গায়ে, মেঘনাদ পন্ডিত হঁ হঁ কের উঠল। দেখলে আমার সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে দিলে।
কাকা অবাক হয়ে বললেন, কে!
কে আবার এতগুলো বেড়াল পোষ কেন, ওদের খাওয়ার খরচ লাগে না।
নীপা হেসে কুটি কুটি খাচ্ছে, একবার আমার গায়ে ঢলে পরে একবার বিছানায় শুয়ে পরে।
তুমি এ্যাতো দুষ্টু ছিলে!
দুষ্টু বললে ভুল হবে, সেই মুহূর্তে আমার কিছু করার ছিল না।
অনিদা তুমি তখন খুব রাগ করেছিলে তাই না।
একদম নয়।
আমি তোমার সমস্ত কথা বাইরে দাঁড়িয়ে শুনেছি। তোমার জায়গায় অন্য কেউ হলে….।
আমি নীপার দিকে তাকালাম, যাও এবার শুয়ে পরো।
না আর একটু গল্প করি।
কাল তোমার প্রোগ্রাম আছে, রাত জেগে বেশি গল্প করলে, চোখের কোলে কালি পরে যাবে।
ঠিক আছে। গুড নাইট।
গুড নাইট।
পরদিন সকালে নীপা এসে যখন ডাকল, তখন সাড়েনটা বেজে গেছে, আমি হুড়মুড় করে উঠে বসলাম, নীপা মিত্রার দেওয়া সেই লং-স্কার্ট আর গেঞ্জিটা পরেছে, গোল গলার গেঞ্জিটা নীপাকে দারুন মানিয়েছে।
কি দেখছো।
তোমাকে। দারুন মানিয়েছে।
মিত্রাদির চয়েস আছে, কি মোলায়েম।
আমি খাটে বসে আছি, নীপার স্নান হয়ে গেছে, মাথায় শ্যাম্পু করেছে, চুলটা কালো মেঘের মতো ফুলে ফেঁপে আছে।
মিত্রাদি ফোন করেছিল?
তোমায়!
হ্যাঁ।
কি বললো।
তোমার কথা জিজ্ঞাসা করলো, আর বললো ওকে গুঁতিয়ে তোল, না হলে ওর ঘুম ভাঙবে না।
হাসলাম।
হাসলে যে—
শেষের কথাটা বাড়িয়ে বললে।
ঠিক আছে, তুমি মিত্রাদিকে ফোন করে জেনে নাও।
থাক।
ওঠো বিছানাটা গুছিয়ে দিই, তুমি দাঁত মেজে নাও।
ঘুটের ছাই আছে?
কেন!
অনেক দিন ঘুটের ছাইয়ে দাঁত মাজিনি।
তুমি সত্যিই গাঁইয়া।
আমি শাঁইয়া কে বলেছে।
কি বললে?
শাঁইয়া। গ্রামের লোকেরা যদি গাঁইয়া হয়, শহরের লোকেরা শাঁইয়া।
সত্যি তোমার মাথা বটে।
আমি দাঁত বার করে হাসছি।
তুমি কেবলার মতো হেসো না।
আমি কেবলা?
তা নয় তো কি।
বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম।
তোমার সারপ্রাইজের কথা বললে না—
কি করে জানলে?
কাল রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে তোমাদের সমস্ত কথা শুনেছি।
আমি মাথা নিচু করলাম।
দিবাকরদা তোমায় একেবারে সহ্য করতে পারে না।
এটা ওর স্বভাব। সেই ছোটো থেকে।
কেন?
ও স্কুলে ফার্স্ট হতো, আর আমি সেকেন্ড, কিন্তু ফাইন্যালে গিয়ে ওকে বিট করলাম।
মশাই বলেছে, তুমি স্টার পেয়েছিলে। সাতটা বিষয়ে লেটার। আমাদের স্কুলে এখনও তোমার নম্বরটা রেকর্ড। আচ্ছা অনিদা, তুমি বাংলায় লেটার পেলে কি করে?
কি করে জানবো, হয়তো ভালো লিখেছিলাম।
তোমার পর এই গ্রামে কেউ এখনও পর্যন্ত বাংলায় লেটার পায়নি। উনামাস্টার পদে পদে সবাইকে শোনায়।
স্যার আমাকে খুব ভালোবাসতেন।
তোমার মাথাটা আমার ফাঁক করে দেখতে ইচ্ছে করে।
ঠিক আছে একদিন দেখাব।
আমি বিছানা থেকে উঠে নীপার কোমরে একটা খোঁচা মারলাম।
আ।
কি হলো।
আমার হাত ধরে ঘর থেকে ঠেলে বের করে দিয়ে বললো, যাও মুখ ধুয়ে এসো।
আমি বেরিয়ে এলাম।
পুকুর ধারে একটা কচি বাঁশের ডগা নিয়ে দাঁতন বানালাম। বেশ কিছুক্ষণ ভালো করে রগড়ে পুকুরে মুখ ধুয়ে চলে এলাম।
আমার ঠিক পেছন পেছন নীপা চা বিস্কুট নিয়ে হাজির।
চা খেতে খেতে নীপাকে বললাম, তুমি কখন বেরবে?
একটা নাগাদ।
তাহলে তোমার সঙ্গে আমার সেই বিকেলে দেখা হবে।
আজকে না গিয়ে যদি কালকে যাও?
কেন!
তাহলে তুমি আমার সঙ্গে যেতে।
তাহলে কি হতো?
আমার বুকটা ফুলে যেত।
তোমার বুকটা এমনি ফোলা ফোলা দেখছি। আর ফুলিয়ো না খারাপ দেখাবে।
নীপা ছুটে এসে আমার মাথাটা ধরে বললে, একেবারে মাথাটা ভেঙে দেব। খালি মাথায় কু-বুদ্ধি। দাঁড়াও মিত্রাদিকে ফোন করছি।
আমি চায়ে চুমুক দিলাম।
সকাল বেলা চিকনাদা এসে একবার তোমার খোঁজ করে গেছে। আমাকে বললো এককাপ চা দে, চা খেয়ে চলে গেল। তুমি আজ না গেলে নয়।
আরে বাবা যেতে আসতে যতটুকু টাইম লাগে।
ঠিক আছে, যাও।
নীপা মিটসেফের কাছে চলে গেল, কি যেন খোঁজা খুঁজি করছে মিটসেফের ওপরে।
আমি ডাকলাম, নীপা।
নীপা ফিরে তাকাল।
আমার মানিপার্সটা নিয়ে এসো।
নীপা আমার মানিপার্সটা হাতে করে নিয়ে এলো। আমি ওখান থেকে তিনটে একশো টাকার নোট বার করে ওর দিকে এগিয়ে দিলাম। রাখো।
কি হবে!
রাখো না।
না।
আমি একদিন মেলায় গিয়ে কষ্ট পেয়েছি এটার জন্য, আমি চাই না তুমি কষ্ট পাও।
নীপার চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো।
নাও।
নীপা টাকাটা হাতে নিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরলো। তুমি এতো ভাব?
ভাবি না, অনুভব করি।
নীপা চুপ করে আছে।
কেঁদোনা। কান্না দুর্বলতার প্রতীক। দাঁতে দাঁত চেপে লড়বে সব সময়, কাউকে এক তিলার্ধ জমি বিনাযুদ্ধে ছেড়ে দেবে না।
নীপা আমার দিকে তাকাল, আমার চোখের আগুনে ও পরিশুদ্ধ হলো।
আমি পারবো অনিদা?
নিশ্চই পারবে, আমি তোমার পাশে আছি।
নিচ থেকে কাকার গলা পেলাম, আমার নাম ধরে ডাকছে, আমি জানলা দিয়ে মুখ বার করে বললাম, কি হয়েছে?
তোর কাকিমা জিজ্ঞাসা করলো কখন বেরবি?
স্নান করেই বেরিয়ে যাব।
খাবি না?
এসে খাব।
তা হয় নাকি।
ঠিক আছে, তুমি যাও, আমি যাচ্ছি।
নীপা আমার দিকে তাকাল। কাছে এসে আমায় প্রণাম করলো।
এটা কিসের জন্য?
তোমার সম্মানটা যেন আজ রাখতে পারি।
নিশ্চই পারবে। যাও।
আমিও নীপার সঙ্গে বেরিয়ে এলাম।
স্নান করে রেডি হলাম, ও বাড়ি থেকে এ বাড়িতে এসে বাইরের বারান্দায় বসলাম। কাকিমা খাওয়ার কথা বললো, আমি বললাম, তারাতারি ফিরে আসবো, তুমি চিনতা করো না, পারলে একটু মুড়ি আর চা দাও।
সুরমাসি মুড়ি আর চা নিয়ে এলো, আমি সুরমাসিকে জিজ্ঞাসা করলাম, চিংড়িমাছের টক আছে।
সুরমাসি হাসলো। কেন?
এসে চিংড়িমাছের টক দিয়ে পান্তা খাব।
আছে।
বাসু ঠিক সময় এলো। মোবাইলের ঘড়ির দিকে তাকালাম। সাড়ে এগারোটা বাজে। বাসুকে বললাম, চা খাবি?
বানাতে হবে নাকি?
বলতে পারব না। ঠিক আছে সুরমাসিকে জিজ্ঞাসা করি দাঁড়া। সুরমাসিকে ডাকলাম।
সুরমাসি বললো, আছে। নিয়ে আসছি।
বাসু আমার দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হেসে বললো, অতো বেলা পর্যন্ত ঘুমচ্ছিলি কেন?
তোকে কে বললো!
চিকনা।
নীপা বলছিল, চিকনা আমায় খোঁজ করতে এসেছিল। কেন বলতো?
একটা চিঠি লিখে দিতে হবে।
কিসের জন্য?
কোথায় একটা ইন্টারভিউ দিতে যাবে।
তার মানে বায়োডাটা।
হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে।
ওর কি চাকরির খুব দরকার?
মাঠে খেটে আর কত দিন চালাবে বল। অতগুলো পেট। কতই বা ধান হয়।
তোর কাছে গেছিল নাকি?
হ্যাঁ।
আমি হাসছি।
আমি বললাম, অনাদির কাছ থেকে লিখে নে। দিল গালাগালি।
কাকে?
তোকে, আমাকে দুজনকেই।
আমি বাসুর কথায় হাসছি।
তোকে একটু কম, আমাকে বেশি।
বাসুর চ খাওয়া হয়ে গেছে, বললাম চল এবার বেরোন যাক।
চল।
নীপাকে দেখছি না। বাসু বললো।
বাবাঃ, সে তো আজ পৃথিবীর ব্যস্ততম মানুষ।
বাসু হাসল। আমি ভেতরের ঘরে গিয়ে কাকাকে বলে বেরিয়ে এলাম।
বাসু বেশ সুন্দর বাইক চালায়। বাঁধের এবরো খেবরো পথ কাটিয়ে খুব স্মুথলি বাইকাটা চালিয়ে নিয়ে এলো।
মোরাম রাস্তায় উঠতেই পচার সঙ্গে দেখা। বাসু বাইক দাঁড় করাল। মাঠে কাজ করছে। দেখা হতে, মাঠ থেকে উঠে এলো, বললো, আর ঘণ্টাখানেক কাজ করে চলে যাবে। আমাদের জিজ্ঞাসা করলো, নার্সিংহোমে যাচ্ছি কিনা। আমি বললাম, হ্যাঁ।
বেরিয়ে এলাম, আসার সময় বাসুকে সমস্ত ব্যাপারটা টুক টুক করে বললাম।
সর্বনাশ। তুই ম্যাডামকে কোথায় রাখবি?
আমার ঘরে।
ওরে থাকবে তো! না পালিয়ে যাবে?
আমি যতটুকু ওর সঙ্গে মিশেছি। মনে হয়না ওর কোনও অসুবিধে হবে।
থাকলেই ভালো।
তোকে একটা কাজ করতে হবে।
কি?
গাড়িটা রাখার একটা ব্যবস্থা করতে হবে।
বাজারেই রাখা যাবে, আমার দোকানের সামনে।
বাজার পর্যন্ত রাস্তা হয়ে গেছে?
কবে।
তাহলে কোনও চিনতা নেই। তুই কি যেখানে থাকতিস সেখানেই আছিস।
হ্যাঁ। তবে বাজারের শেষ প্রান্তে একটা ঘর করেছি। বাড়িতে সমস্যা। তাই বউ ছেলে নিয়ে এখানে চলে এসেছি।
কাকা-কাকী?
বাড়িতেই আছেন। প্রত্যেক দিন সকাল-বিকেল যাই।
ভাইরা?
মেজভাই, ছোটোভাই আর ওদের বউরা ওই বাড়িতেই থাকে। বুঝিসইতো সব। মেজভাইয়ের বউটা সুবিধার নয়। প্রতিদিন অশান্তি আর ভালো লাগছিল না।
কি করে?
জমি জমা সব ভাগ হয়ে গেছে। চাষ করছে খাচ্ছে।
তোর ভাগে দোকান।
হ্যাঁ। শ্বশুরের কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়েছিলাম। আর জমি বেচেছি। তাই দিয়ে দোকান। কিছুটা জমি চিকনা চাষ করে।
ব্যবসা কেমন চলছে?
চলে যায় আর কি। এখানকার পরিস্থিতি জানিস। সব ধারে বিজনেস। কিস্তিতে মাসে মাসে টাকা। তাই তুলতেই কালঘাম ছুটে যায়। আজ নয় কাল দিচ্ছি। এই সব।
আমার ব্যালেন্সটা তোর বলার কথা ছিল।
তোর কাছ থেকে আর কিছু পাব না।
সে কি করে হয়। কাকার পাওনা, আমার পাওনা। সব মিলিয়ে….।
আর দু-একশো টাকা হয়তো পাব।
সেটাও টাকা, নাকি টাকা নয়।
তুই এতো হিসেব করিস না।
মনে করে নিয়ে নিবি।
ফোনটা বেজে উঠলো।
বাসু বাইক থামাল। পকেট থেকে বার করে দেখলাম মিত্রার ফোন।
হ্যালো।
তুই কোথায়?
আমি পৌঁছেগেছি।
এতো তারাতারি!
আয় বলবো। তুই এখন কোথায়?
আমার যেতে আরও মিনিট পনেরো লাগবে।
ঠিক আছে।
ম্যাডাম পৌঁছে গেছেন! বাসু বললো।
আর বলিস না, আমার অনেক জ্বালা, সংসার নেই তবু ভড়া সংসার।
সত্যি তুই ছিলি, না হলে স্যারের কি যে হতো।
দুর ওই সব নিয়ে ভাবি না।
নারে অনি, ললিতাকে তোর কথা বলতেই, ও বিস্ময়ে আমার দিকে তাকায়।
তোর বউকে এর মধ্যে একদিন দেখতে যাব।
কবে যাবি?
কথা দেব না। হুট করে চলে যাব।
তুই বাইক চালাতে জানিস না?
না।
সাইকেল চালাতে পারিস তো?
পারতাম। এখন পারবনা। অভ্যাস নেই।
দাঁড়া তোকে বাইকটা শিখিয়ে দেব।
আর দরকার পড়বে না।
কেন?
কলকাতায় অফিসের গাড়ি চড়ি, কোথাও গেলে প্লেন কিংবা ট্রেন। বাইক চালাব কখন।
তাও ঠিক।
কথা বলতে বলতে পৌঁছে গেলাম। নার্সিংহোমের দোরগোড়ায় মিত্রার গাড়িটা রাখা আছে। বাসু বাইকটা একটা সাইড করে রাখল। আমরা দুজনে ভেতরে এলাম, সেই রিসেপশনিস্ট ভদ্রমহিলা ছিলেন, আমাদের দেখে বললেন, দাঁড়ান ম্যাডামকে খবর দিই।
আমার চশমা?
ওটা রেডি আছে। ম্যাডাম বলেছেন, আপনি এলেই খবর দিতে।
মেয়েটি ভেতরে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এসে বললো, আপনাকে একবার ভেতরে ডাকছেন।
আমি ভেতরে গেলাম, বাসুও আমার সঙ্গে এলো। বুঝলাম এটা মালিকের বসার ঘর। আরও দু-তিনজন বসে আছেন, আমি কাউকে চিনতে পারলাম না, তবে ডা. বাসুকে চিনতে পারলাম। আমাকে দেখে মুচকি হেসে মিত্রা বললো, বোস।
মনে হচ্ছে মিটিং চলছে। আমরা বাইরে অপেক্ষা করছি।
তোকে নিয়ে আর পারা যাবে না। মিটিং নয় একটু কথা বলছি।
ঠিক আছে তুই কথা বল, আমি থাকলে এঁদেরও কিছু সমস্যা হতে পারে।
তোর সঙ্গে আলাপ করাবার জন্য ওনাদের ডেকেছি।
বাধ্য হয়ে বসলাম।
মিত্রা একে একে সবার সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিল। বুঝলাম এরা সবাই ডাক্তার। এও জানাতে ভুললো না, আমি কোম্পানীর ওয়ান অফ দেম শেয়ার হোল্ডার।
বাসু আমার দিকে একবার তাকাল। বিস্ময় ওর চোখে ঝড়ে পড়ছে।
সত্যিতো আমি এই কথাটা ওদের গোপন করেছি। বাসুই প্রথম জানল।
বাসুর চোখে যেমন বিস্ময়, ঠিক তেমনি যারা এখানে বসে আছেন তাদের চোখেও বিস্ময়। ওরা যেন ভূত দেখছে। এরা নিশ্চই ভেবেছিল, আমি মিত্রার খুব পরিচিত তাই সব ফ্রি করে দিয়েছে।
ডাক্তাররা সবাই এবার আমাকে চেপে ধরলেন। আমি শুধু একটা কথাই বললাম, মিত্রা আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তাই এই কথা বলছে। মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে একবার হাসল।
বুবুন তুই এতবড় মিথ্যে কথাটা বলতে পারলি! আমি ওকে ফোন করবো?
এই উপকার তোকে আর করতে হবে না।
ওঁদের দিকে তাকিয়ে বললাম, ফেরার দিন সময় নিয়ে আসব, জমিয়ে গল্প করা যাবে।
একটু কফি খা।
এখানে এসে এই ঘরে বসে কফি খেতে ভালো লাগবে না। তার থেকে বরং বাইরে কোথাও বাঁশের বেঞ্চিতে বসে চা খাব।
সবাই হেসে উঠলো।
আসর ভাঙল। আমি সবার আগে বেরলাম, কাউন্টারে এসে চশমাটা চাইতেই মেয়েটি দিয়ে দিল। আমি ডা. বাসুর চেম্বারে একবার গেলাম, উনি বসেছিলেন। আমি দরজাটা ফাঁক করে বললাম, আসতে পারি।
দেখলাম ডা. বাসু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, এ-কী বলছেন স্যার। ভাবটা এরকম পারলে আমার চেয়ারে আপনি বসুন। আমি চশমার ব্যাপারে ওনাকে জিজ্ঞাসা করলাম, উনি সব বলে দিলেন, বললেন কোনও অসুবিধে হবে না। দিন সাতেক রেসট্রিকশনে থাকতে বলুন, আর ওষুধ গুলো পনেরদিন কনটিনিউ চলবে। পনের দিন পর একবার দেখাতে হবে।
ঠিক আছে।
উনি একবার দেঁতো হাসি হাসলেন। বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি, মিত্রা কাউন্টারের কাছে দাঁড়িয়ে। আমি কাছে এসে বললাম, চল।
দাঁড়া রবিন একটু বাইরে গেছে।
ইসমাইল আসে নি?
ওর বাচ্চাটার শরীর খারাপ। রবিন এই এলাকার ছেলে, বললো সব চিনি।
কিছুক্ষণ পর রবিন এলো, ধোপদুরস্ত পোষাক, অফিসের ড্রেস কোড।
মাথায় টুপি কোমরে বেল্ট আমায় দেখে হেসে ফেললো, স্যার।
তুমি!
হ্যাঁ স্যার।
তুই চিনিস?
চিনবো না মানে! ওকে সারাজীবন মনে রাখব।
কেন!
তোর বাড়িতে প্রথম দিন ও-ই আমাকে ঢুকতে দেয়নি।
রবীন মাথা চুলকচ্ছে।
না স্যার, মানে তখন….।
চিনতে না। এখন চিনে ফেলেছ।
হ্যাঁ স্যার।
বাসু আমার কীর্তিকলাপ দেখে হাসছে, মিত্রা হাসতে গিয়েও গম্ভীর হতে চাইছে, ওর মুখটা অদ্ভূত লাগছে।
চল তাহলে।
তুই ওকে বলে দে।
গাড়িতে উঠি আগে।
আমরা বেরিয়ে এলাম, দু-চারজন ডাক্তার পেছন পেছন এসেছিল গাড়ির কাছ পর্যন্ত, আফটার অল মালকিন বলে কথা।
মিত্রাকে বললাম, তুই তো গাড়ি চালাতে পারিস, এই টুকু রাস্তা তুই চালিয়ে নিয়ে চল।
মিত্রা আমার দিকে একবার কট কট করে তাকাল।
পেছন দিকে বসার জায়গা রেখেছিস।
মিত্রা অপ্রস্তুত হয়ে পরলো।
রবীন বাসুর বাইকে বসুক। আমি সামনের সিটে বসি। তুই ড্রাইভ কর।
মিত্রার চোখে দুষ্টুমির হাসি খেলে গেল। বাসু আমার দিকে একবার তাকাল।
আর একটা কথা বাসু, আনাড়ি ড্রাইভার, সামনে তুই থাকবি, একটু আস্তে চালাস।
বাসু হাসল।
আমি উঠে বসলাম। মিত্রা গাড়ি স্টার্ট দিল। বাসু সামনে সামনে যাচ্ছে। আমরা পেছনে।
মিত্রা আজ একটা ঢাকাই জামদানী পরেছে, লাইট তুঁতে কালারের। তারসঙ্গে ম্যাচিং করে তুঁতে কালারের ব্লাউজ, কপালে তুঁতে কালারের বিন্দির টিপ। মাথায় সিঁদুরের অস্পষ্ট রেখা। ওকে দারুন লাগছে। অনেক দিন পর ওকে শাড়ি পরা অবস্থায় দেখলাম, মিত্রার চোখ সামনের দিকে। সব জানলার কাঁচ বন্ধ, ভেতরটা হাল্কা ঠাণ্ডা।
এসিটা চালাব?
চালা।
মিত্রা সুইচ অন করলো।
ট্যাঙ্কি ভরে এনেছিস?
কেন!
এখানে পঁচিশ কিমির আগে কোনও পেট্রল পাম্প পাবি না।
সেকিরে!
সেকিরে না। গ্রাম দেখার সখ এবার মিটে যাবে। আর আসতে চাইবি না।
তোকে বলেছে। রবীন আছে, ঠিক ব্যবস্থা করবে।
পেছনে এত কি নিয়ে এসেছিস।
একটা আমার জামা কাপড়ের ব্যাগ, আর একটায় ক্যামেরা, আর তোর বাজি।
এতো কী বাজি নিয়ে এসেছিস? বাজার শুদ্ধু তুলে এনেছিস নাকি!
আমি জানি না যা, ইসমাইলকে বললাম, ওর কোন পরিচিত দোকান থেকে নিয়ে এসেছে।
কত টাকার নিয়ে এসেছিস?
পয়সাই দিই নি।
তার মানে!
ইসমাইল বললো, ম্যাডাম ফিরে এসে দেবেন। ওরা এখন দোকান বন্ধ করছে।
আমি সামনের দিকে তাকিয়ে আছি। গাড়িটা যে চলছে বুঝতেই পারছি না। কোনও জার্কিং নেই, খুব স্মুথ চলছে, মিত্রার হাতটাও ভালো। বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছে। বাইরে রোদ ঝলমল করছে। কটা বাজে? রোদ দেখে মনে হচ্ছে দুটো কিংবা আড়াইটের মাঝা মাঝি।
কিরে বললি না, আমায় কেমন লাগছে?
মিত্রার দিকে তাকালাম, ফিচলেমি করার খুব ইচ্ছে হচ্ছে, কিন্তু ও গাড়ি চালাচ্ছে, ওর তলপেটের অনেকটা অংশ নিরাভরণ আমার চোখ ওদিকে চলে গেল।
কি ভাঁজ ফেলেছিসরে, কামরে খেতে ইচ্ছে করছে।
ধ্যাত।
মিত্রা ব্রেক কষলো।
যেখানে ব্রেক কষলো গাড়ি সেখানেই থামলো। আমার কপাল সামনের বোনেটে ধাক্কা খেল। চেখে জল এসে গেল। কপালে হাত রেখে মুখ তুললাম। মিত্রা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। আমার হাতটা চেপে ধরেছে।
দেখলাম বাসু বাইক থামিয়ে নেমে আসছে। রবীন ওর পেছন পেছন। মিত্রা আমার দিকে কাঁচুমাচু মুখ করে তাকিয়ে। কানে এলো।
কি হলো?
ওই ছাগলের বাচ্চাটা।
ম্যাডাম খুব সাবধান, এখানে মানুষ চাপা দিলে কেশ খাবেন না। তবে ছাগল চাপা দিলে আপনার জরিমানা হবে। বাসু আমার দিকে তাকাল।
তোর আবার কি হলো?
আর বলিশ না প্রাণ হাতে নিয়ে এই সিটে বসেছি।
আমি এমন ভাবে বললাম, ওরা হাসছে।
চল। পড়েছি যবনের হাতে খানা খেতে হবে সাথে।
কি বললি?
না কিছু নয়।
খুব খারাপ হয়ে যাবে বলছি বুবুন।
হাসতে হাসতে ওরা আবার গিয়ে বাইক স্টার্ট দিল। মিত্রা গাড়ি চালাচ্ছে।
খুব লেগেছে।
একটুও না। বোনেটটা আমার কপালে একটু চুমু দিল।
ঠিক আছে চল গিয়ে বরফ লাগিয়ে দেব।
বরফ! কোথায় পাবি?
কেন ফ্রিজ নেই!
ফ্রিজ! এমন ভাবে বললাম, মিত্রা হাসলো।
সত্যি বল না।
এখানে ফ্রিজ বলতে পানাপুকুরের পচা পাঁক।
তুই সত্যি….।
নিজের চোখে দেখবি চল। আমি সত্যি না মিথ্যে।
কি করবো বল, ছাগল বাচ্চাটা লাফাতে লাফাতে….।
দেখ এখনও আমি বিয়ে করি নি, বাপ হই নি….।
বিয়ে করার অত শখ কিসের, পরের বউকে নিয়ে রয়েছো, তাতে শখ মিটছে না।
যতই হোক পরের বউ। নিজের তো নয়।
মিত্রার গলাটা গম্ভীর হয়ে গেল, নিজের বউ করে নে।
চুপ চাপ থাকলাম।
মিত্রার চোখ সামনের দিকে। চোখে জল টলটল করছে। আমি ওর কাঁধে হাত রাখলাম।
এরকম করলে এখানে আসার মজাটাই নষ্ট হয়ে যাবে।
মিত্রার হাত স্টিয়ারিংয়ে একবার ডান দিক একবার বাঁদিক করছে।
তুই ওরকম বললি কেন?
আচ্ছা বাবা, আর বলবো না।
চকে এসে বাসু দাঁড়াল, আমরাও দাঁড়ালাম। পরিদার দোকানে চা খাওয়া হলো, মিত্রা তাকিয়ে তাকিয়ে চারিদিক দেখছে, বিস্ময়ে ওর চোখের পাতা পরে না। বাঁশের তৈরি বেঞ্চে বসে চা খেলাম। মিত্রা এক চুমুক দিয়ে আমার দিকে তাকাল।
সত্যি বুবুন তোর কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে।
আমি মিত্রার দিকে চেয়ে হাসলাম। রবীন একটু দূরে দূরে।
বাসু বললো, ম্যাডাম এবার রবিন চালাক, আর মিনিট পনেরোর পথ।
মিত্রা বললো, কেন আমি পারবো না।
পারবেন। তবে রবিন চালাক।
তাই হোক। মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, তুই কোথায় বসবি?
আমি বাসুর পেছনে বসছি।
ওর মনপসন্দ হলো না। মুখ দেখেই বুঝতে পারছি। কিন্তু মুখে কিছু বললো না। রবিন স্টিয়ারিংয়ে বসলো। মিত্রা সামনের সিটে। আমরা আধাঘণ্টার মধ্যে পৌঁছেগেলাম।
বাসু মনে হয় ফোন করে সব ঠিক করে রেখেছিল। গাড়ি থামতেই সবাই ঘিরে ধরলো। আমি বললাম, বাসু ব্যাগগুলো পৌঁছবার ব্যবস্থা করতে হবে।
তোকে ভাবতে হবে না। বরং চল তোদের পৌঁছে দিয়ে আসি।
তোর বাইকে তিনজন?
মিত্রার দিকে তাকালাম।
মিত্রা ঘার নাড়ছে। যাবে না।
রবীন বললো ম্যাডাম আমাকে যদি ছুটি দেন কালকেই চলে আসবো।
মিত্রা বললো, ছুটি মানে! তুমি কোথায় যাবে?
রবীন বললো, পাশের গ্রামেই আমার আত্মীয়ের বাড়ি। তাছাড়া এখান থেকে গাড়ি আর কোথাও নিয়ে যাওয়া যাবে না। আপনাকে পায়ে হেঁটেই….।
আমি হাসলাম।
ঠিক আছে যাও। কালকে সকালে চলে আসবে। মিত্রা আমার দিকে তাকাল।
এখান থেকে মিনিট কুড়ি হাঁটতে হবে।
তাই চল।
রাসপূর্নিমার মেলা বলে আজ এই জায়গাটা ফাঁকা ফাঁকা। সবাই আজ মেলায় ভিড় করেছে। বাজারের দোকান পাট সব মেলায়। নাহলে এতক্ষণ ভিড় হয়ে যেত।
আমরা হাঁটতে আরম্ভ করলাম, সত্যি মিনিট কুড়ি লাগল। বাসু তার আগেই বাড়িতে সব পৌঁছে দিয়েছে, কাকা ওকে জিজ্ঞাসা করেছে, এত ব্যাগ কার। বাসু কোনও জবাব দেয়নি, চলে এসেছে। রাস্তায় আমার সাথে দেখা হতে শুধু বললো, সারা পাড়া মনে হয় রাষ্ট্র হয়ে গেছে। তোর সারপ্রাইজ রসাতালে যাবে।
তুই তারাতারি খেয়েদেয়ে আয়।
যতো তারাতারি সম্ভব আসছি।
দুজনে মিলে খামারে এসে দাঁড়াতেই কাকা, কাকিমা, সুরমাসি ছুটে এলো।
সবাই অবাক মিত্রাকে দেখে, মিত্রা সবাইকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো। কাকা চেঁচামিচি আরম্ভ করে দিয়েছে।
আমি বললাম, তুমি থামো, ওরজন্য তোমায় ব্যস্ত হতে হবে না।
আমরা দুজনে ভেতরে ঢুকে ঠাকুর প্রণাম করলাম। কাকার পরিবারের গৃহদেবতা। জোড়া রাধা কৃষ্ণের মূর্তি। বিগ্রহ দেখে মিত্রার হাজার প্রশ্ন। এই ঠাকুর কোথা থেকে এলো। এইরকম ঠাকুর নবদ্বীপে দেখেছি। আরও কত কি।
কাকিমা ছুটে গিয়ে সরবত নিয়ে এলো। এক হুলুস্থূলুস ব্যাপার।
মিত্রা আরাম করে বেঞ্চিতে বসেছে। পায়ে ধুলো জড়িয়ে আছে।
আমি বললাম, দেরি করিস না। বেলা গড়িয়ে গেছে। হাত-মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে নিই। মেলায় যেতে হবে। মিত্রা চোখের ইশারায় বাথরুমের খোঁজ করছে।
বাধ্য হয়ে বললাম, চল আমার ঘরে।
আমি ওর ক্যামেরার ব্যাগ আর জামাকাপরের ব্যাগ হাতে নিয়ে এ বাড়িতে এলাম। মিত্রা আমার পেছন পেছন। আমি ওপরের ঘরে এলাম। লাইট জ্বালালাম। মিত্রা ঘরে ঢুকেই বললো, আগে বাথরুম কোথায় বল।
বাথরুম!
ন্যাকা আমার পেট ফেটে যাচ্ছে।
এই গ্রামের গোটাটাই বাথরুম। তুই যেখানে খুশি বসে ব্যবহার করতে পারিস।
সত্যি বল না বুবুন।
সত্যি বলছি।
আমি কষ্ট পাচ্ছি। তুই মজা করছিস।
আচ্ছা আয় আমার সঙ্গে।
নিচে নেমে এসে পেছনের খিড়কি দিয়ে পুকুর ধারে এলাম। এখানে কর।
ধ্যাত।
তোকে কালকে বলেছিলাম।
তুই মিথ্যে বলেছিলি। ওদিক দিয়ে যদি কেউ দেখে ফেলে।
ওদিকটা জনমানব শূন্য, পুকুরের ধারেই খাল, যার পাশ দিয়ে বাঁধে বাঁধে এতক্ষণ এলি।
আচ্ছা তুই ভেতরে যা।
কেন!
যা না।
মিত্রা আমাকে ঠেলে ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। খিড়কি দরজা ভেজিয়ে দিল। আমি ওপরে চলে এলাম। ব্যাগ গুলো ঠিক ঠাক ভাবে গুছিয়ে রাখলাম।
বুবুন বুবুন বুবুবুন। মিত্রা তারস্বরে চিৎকার করে ডাকল।
কি হলো!
কোথায় তুই?
এই তো ওপরে।
তুই শিগগির নিচে আয়।
পরি কি মরি করে দৌড়ে নিচে এলাম।
মিত্রা খিড়কি দরজার ওপারে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দু-হাতে কাপর তুলে ধরেছে। হাঁটুর ওপর কাপর উঠে গেছে। খিড়কি দরজা হাট হয়ে খোলা। চোখ মুখ ভয়ে কাঠ।
কি হয়েছে!
ওই দেখ।
চোখের ইশারায় নিচটা দেখাল। দেখলাম একটা বড়সড়ো গিরগিটি ওর দিকে জুল জুল করে তাকিয়ে আছে। আমি হ্যাট করতেই গিরগিটিটা দৌড় লাগাল, মিত্রা পরি কি মরি করে আমার বুকে এসে ঝাঁপিয়ে পরলো। থর থর কাঁপছে।
আমি হাসছি।
তুই হাসছিস! বাঁদর।
কি করবো, কাঁদবো।
ওটার চোখ দুটো দেখেছিস, যদি কামরে দিত।
সিনেমায় গ্রাম দেখিস, এবার অরিজিন্যাল গ্রাম দেখ।
অনি ও অনি। বাইরে থেকে কাকিমার গলা।
কাকিমা ডাকছেন।
হ্যাঁ যাই কাকিমা। চেঁচালাম।
মিত্রা তখনও হাসি হাসি মুখে আমাকে জড়িয়ে ধরে রয়েছে।
সাবানটা নিয়ে নে, হাত মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে নিই।
কি খাওয়াবি?
পান্তা আর চিংড়িমাছের টক। খাবি?
কোনও দিন খাইনি।
খাসনি। খাবি।
কেমন খেতে?
খেলেই বুঝতে পারবি।
ওপরে এলাম, ও ব্যাগ খুলে ওর লিকুইড সোপ বার করলো।
কাপর খুলবো না?
এখন নয় খাওয়া দাওয়ার পর।
পেন্টিটা ভিজে গেছে।
উঃ তোকে নিয়ে আর পারা যাবে না।
তুই আসতে বললি কেন।
আমি বললাম কোথায়, তুই তো নাচলি।
খুলে ফেলি।
খোল।
তুই ওদিকে তাকা।
কেন দেখে ফেলবো।
তাকা না। আমায় ঠেলা মারলো।
আমি পেছন ফিরলাম।
রাখবো কোথায়?
ওই তো আলনাটায়।
কেউ দেখে ফেলে যদি।
দেখলে কি হবে?
তুই কিছু বুঝিস না।
বোঝার দরকার নেই। চল।
মিত্রা কাপরটা একবার ঠিক ঠাক করে নিল।
ওকে নিয়ে এবাড়িতে এলাম। কারা যেন এসেছে, আমাদের দেখল, কাকা চেয়ারে বসে আছে। আমরা ভেতরবাইর (বাড়ির ভেতরের উঠান) দিয়ে পুকুর ঘাটে এলাম। সুরমাসি, কাকিমা পেছন পেছন এলো।
পুকুরে নামবি, না বালতি করে জল এনে দেব?
পুকুরে নামব।
ওকে বালতি করে জল এনে দে অনি, হড়কা আছে কোথায় পরেটরে যাবে, বেটক্কর লেগে গেলে আবার বিপত্তি। সুরমাসি বললো।
লাগুক।
তুই রাগ করছিস কেন। মিত্রা বললো।
আমি ওর দিকে তাকালাম।
সুরমাসি হাসছে।
সখ হয়েছে যখন নামুক। কিরে নামবি?
তুই হাতটা ধর।
ওই নিচের ধাপিটায় উবু হয়ে বসতে পারবি?
পারব।
দেখ ওইটুকু জায়গা। খুব স্লিপারি।
আমি সাঁতার জানি।
আমি মিত্রার হাত ধরলাম, মিত্রা আস্তে আস্তে নামছে।
জুতোটা খুলিস নি?
কেন।
ওটা কি জলে ভেঁজাবি?
খুলে আসি তাহলে।
যা।
তুই আয়।
আমি কি তোর সঙ্গে ওপর-নিচ করবো?
আয় না।
চল।
আমি কাছে আসার আগেই ওপরে উঠতে গিয়ে মিত্রা পা হরকালো, কাকিমা ওপর থেকে ধর ধর ধর করে চেঁচিয়ে উঠলো, কোনও প্রকারে মিত্রাকে জাপ্টে ধরে টাল খেয়ে পুকুরে পরলাম। আমার হাঁটু পর্যন্ত জলে ভিজলো। ও দুহাতে চোখ ঢেকেছে। ওপর থেকে সুরমাসি ছুটে এলো।
কেউ যেন তার স্বরে চেঁচাচ্ছে।
বুদ্ধি দেখো, নিজে পুকুরে ঠিক মতো নামতে পারে না, মিত্রাদিকে সঙ্গে করে নেমেছে।
সম্বিত ফিরতে পুকুর পারে তাকিয়ে দেখলাম, অনাদি, বাসু, চিকনা, পচা, পাঁচু, সঞ্জয়।
নীপা ঘাটে নেমে এসেছে। ওপরে দাঁড়িয়ে ওরা সবাই হো হো করে হাসছে।
নীপা চোখমুখ পাকিয়ে প্রথমেই আমার ওপর একচোট চেঁচামিচি করে নিল।
তারপর মিত্রাকে আমার কাছ থেক ছিনিয়ে নিয়ে বললো, সত্যি অনিদা তোমার কোনও বুদ্ধি নেই। মিত্রাদিকে নিয়ে কখনও এই পিছল ঘাটে নামে।
আমি চুপচাপ। মিত্রার দিকে তাকালাম, ও চোখ মেরে হাসছে। মাথা নিচু করে, মুখ-হাত-পা ধুয়ে ঘাট থেকে উঠে এলাম।
অনাদির দিকে তাকিয়ে বললাম, কখন এলি?
অনাদি হাসছে।
চিকনা বললো, তোর সারপ্রাইজটা জব্বর দিয়েছিস। চোখ মারল।
(আবার আগামীকাল)