জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
৫৬ নং কিস্তি
দরজাটা ভেজিয়ে বেরিয়ে এলাম। বাইরে এসে লক করে দিলাম। সোজা নিচে নেমে এলাম। এখনও ঠিক ঠিক আলো ফোটে নি। রাস্তার নিওন আলোগুলো সমান তেজে জ্বলছে। গেটের মুখে সেই ছেলেটি। ঝিমচ্ছে। ওর গায়ে হাত দিতেই চমকে উঠে পরলো।
দাদা আপনি! এত সকালে?
একটু বেরবো দরজাটা একবার খুলে দাও।
ছেলেটি চাবি নিয়ে এসে দরজা খুললো। আমি বেরিয়ে এলাম। হাঁটতে হাঁটতে সোজা চলে এলাম গড়িয়াহাট। সকালে সবাই মর্নিং ওয়াক করতে বেরিয়েছে। মোটা মোটা থল থলে চেহারার মানুষ। সব বয়সের। কেউ কেউ আবার গোল পার্কের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। হয়তো লেকে ঢুকবে। সকাল হতে না হতে কতো লোকের কতো কাজ। আমি যেমন চলেছি মানুষ খুঁজতে।
নিজের মনে নিজে হাসলাম। একটু জোরে হেসে ফেলেছি। একবার পেছন ফিরে দেখলাম। না, আমার আশে পাশে কেউ নেই।
চায়ের দোকনটার সামনে এসে দাঁড়ালাম। এককালে রোজ এখানে চা খেতাম। এখন খাই না। তাই আমাকে চেনার বালাই নেই। জলের মগটা নিয়ে ঢক ঢক করে কিছুটা জল খেলাম। তারপর একভাঁড় চা একটা বিস্কুট সহযোগে মারলাম। বাড়িতে থাকলে একটু আতিথেয়তা পেতাম, এখানে তার বালাই নেই।
পয়সা ফেকো তামাসা দেখো। ভাঁড়টা সঠিক জায়গায় ফেলে একটা সিগারেট কিনলাম। কালকের কেনা বেশ কয়েকটা ক্যান্ডি পকেটে পরে আছে। সিগারেট ধরালাম। এতো সকালে কোনওদিন সিগারেট খাই না। গলায় লাগলো, খক খক করে কেশে উঠলাম। দুর শালা বলে সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলদিলাম। আবার হাঁটতে শুরু করলাম। দেশপ্রিয় পার্কের মুখে এসে বাসে উঠলাম। কণ্ডাকটর টিকিট চাইল। বললাম ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি।
কলকাতার বিখ্যাত কালীবাড়ি। আমাদের কলেজের সামনে।
বলতে গেলে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে। মিত্রা আমি দু-একবার এখানে এসেছি। পূজোও দিয়েছি। ঘণ্টাখানেক লাগল এখানে আসতে। বাস থেকে নামলাম। বিশেষ ভিড় নেই। মন্দিরে ঢুকে প্রণাম করলাম। আমার খুব একটা ধর্মে মতি নেই। তবু মনকে প্রশ্ন করলাম আজ এলাম কেন? উত্তর পেলাম না। যেটুকু আচার-ধর্ম পালন করার দরকার, তাই করলাম।
তিনটে প্যাকেটে পূজো দিলাম একটা মিত্রা আমার নামে, একটা বড়োমা, দাদার নামে, আর একটা ছোটোমা, মল্লিকদার নামে। ব্রাহ্মণ মশাই গোত্র জিজ্ঞাসা করলেন বলতে পারলাম না। পূজোর প্রসাদী আমার হাতে দিলেন। আমি নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম।
ঠিক পাশেই বীণা সিনেমা। হলের নীচের শিঁড়িতে একটু বসলাম। হুড়মুড় করে কতো কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। নিজের মনেই হেসে বললাম, থামনা বাপু। অনেক হয়েছে। আর ভালো লাগছে না। তবু চোখের সামনে মিত্রা আমার হাত ধরে বুকে রেখেছে, বোঝার পর আমার হাত সরিয়ে নেওয়ার স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠলো। মনে মনে হাসলাম। দূর, উঠে পরলাম। আমার চেনা রাজপথ। আমার কলেজ জীবন কেটেছে এই রাজপথে। অলিতে গলিতে কত স্মৃতি আঁকি বুকি কাটা হয়ে রয়েছে।
সোজা কলেজ পেড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে শ্যামবাজার চলে এলাম। গোলবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বড়ো ঘরিতে দেখলাম সোয়া সাতটা বাজে। এতক্ষণে বাড়িতে হুলুস্থূলুস কাণ্ড বেঁধে গেছে। ইসলামভাই-এর সাপ-সাপান্তর চলছে। শ্যামবাজার বাটার সামনে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। এই প্রথম আমি মনে হয় ঈশ্বরের স্মরণাপন্ন হচ্ছি।
চোখ বন্ধ করতেই ঠনঠনিয়া কালীমার মুখটা ভেসে উঠলো। মনে মনে বললাম আজ আমি যেখানে যাচ্ছি, আমাকে সেখানে জিততেই হবে। তুমি আমার সঙ্গে থেকো। মায়ের হাসি হাসি মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো।
যেন মনে হচ্ছে ভেতরে ভেতরে বল পাচ্ছি। কেন এমন হচ্ছে? এটা হওয়ার কথা নয়। এর আগে বহু সমস্যা সঙ্কুল কাজ আমি করেছি। তখন এমন মনে হয়নি।
তাহলে আজ কেন হচ্ছে? পায়ে পায়ে হাঁটতে শুরু করলাম।
গলি পথ পেরিয়ে সেই বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ালাম। না এখনও সেই রকম আছে। গত দশ বছরে তার কোনও পরিবর্তন হয়নি। হয়তো পলেস্তরা খসিয়ে দেয়ালে নতুন পলেস্তরা পরেছে। সেই দরজা। কড়া দুটোও সেই রকম। আমি আসতে করে কড়া নারলাম। একবার, দুবার, তিনবার। দরজা খুলে গেল।
বছর চারেকের একটা ছেলে। এক মাথা ভর্তি চুল। কি মিষ্টি দেখতে।
তুমি কাকে খুঁজছো?
আমি ওর দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছি।
বলো না আংকেল, তুমি কাকে খুঁজছো?
কি বলবো এই দুধের শিশুকে। আমি কিসের টানে এই বাড়িতে সাত সকালে ছুটে এসেছি।
কে-রে পিকু কার সঙ্গে কথা বলছিস—
ভেতর থেকে মহিলা কন্ঠ ভেসে এলো। আটবছর আগে এই গলার স্বর শুনেছি। মেলাবার চেষ্টা করলাম। সে-ই কিনা।
একটা আংকেল এসেছে। কথা বলছে না। বোবা।
হেসে ফেললাম।
আবার হাসছে দেখো না।
মুখ বাড়িয়ে ভেতরে তাকালাম। না কারুর দেখা নেই। আমি পকেট থেকে একটা ক্যান্ডি বার করলাম। পিকুর চোখের সামনে ধোরলাম।
আমি খাই না। দাঁতে পোকা হবে।
হাসলাম। মনে মনে বললাম কি পাকা পাকা কথা রে বাবা।
নাও না এটা খেলে পোকা হবে না। সব পোকা মরে যাবে।
মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে বললো, তুমি কথা বলতে পার।
হাসলাম।
মা বকবে।
বকবে না। আমি মাকে বকে দেবো।
তুমি আমার মাকে চেনো।
হুঁ।
কেরে পিকু।
দরজার সামনে এই মুহূর্তে যে এসে দাঁড়াল তাকে আমি আট বছর আগে দেখেছি। মুখশ্রীর কোনও পরিবর্তন হয়নি। সিঁথির সিঁদুর বেশ ঝকঝকে। এখুনি স্নান করে উঠে এসেছে, গায়ার রং আগের মতোই। মাজা মাজা। আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে, আমিও তাকিয়ে আছি। চোখের দৃষ্টিতে বিষ্ময়। চেনা চেনা মুখ, তবু যেন অচেনা।
আংকেল তুমি যে বললে মাকে চেন।
ইসিতা পিকুকে হাত ধরে ভেতরে টেনে নিল। মুখের রং বদলে গেল। কঠিন কিছু কথা বলতে গিয়েও থেমে গেল।
কেন এসেছিস?
ইসিতা গলার কাঠিন্য তবু লোকাতে পারলো না।
মা তুমি আংকেলকে বকছো কেন?
থামো, পাকা পাকা কথা বলতে হবে না।
কে-গো ইসিতা। ভেতর থেকে পুরুষের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
ইসিতা আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে। কিছু বোঝার চেষ্টা করছে।
বাইরে দাঁড়িয়েই সব কথা বলবো।
আমি খুব মৃদু স্বরে ইসিতার দিকে তাকিয়ে বললাম।
পেছনে একজন বছর পঁয়ত্রিশের ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালেন।
স্টাউট ফিগার। একটা বাটিক প্রিন্টের লুঙ্গি এবং পাঞ্জাবী পরা।
কাকে চান আপনি?
ইসিতা মাথা নীচু করে আসতে করে বললো, ও অনি।
অনি! তোমাদের সেই অনি।
হ্যাঁ।
আশ্চর্য, ওনাকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছ কেন, ভেতরে আসতে দাও।
পিকু আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে।
আসুন আসুন।
ইসিতা গেট থেকে সরে দাঁড়াল, আমি ধীর পায়ে ভেতরে এলাম। নিচের বসার ঘরটা সেরকমই আছে। সেই টেবিল। এখানে কতো স্মৃতি আঁকা হয়ে রয়েছে। এই দু-বোনের সঙ্গে কতো কথা বলেছি এই টেবিলে বসে। হুড়মুড় করে সব চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আমি চারিদিকে একবার তাকালাম। আট দশবছর আগেকার স্মৃতি। ফাইন্যালের রেজাল্টটা নিয়ে আমি শেষবারের মতো এই বাড়িতে পা রেখেছিলাম। সেদিন মিত্রার তথাকথিত মা আমার সঙ্গে খুব একটা ভালো ব্যবহার করেন নি। তারপর দু-একবার মিত্রার সঙ্গে দেখা হয়েছিল মাস খানেকের মধ্যে। তারপর আমি হারিয়ে গেলাম।
বসুন।
ইসিতা নিশ্চই আপনার সহধর্মিনী।
আমি বরুন মুখার্জী।
আমি অনি….।
আপনার গল্প বহু শুনেছি ইসির মুখ থেকে। তাছাড়া আপনি একজন রিনাউন্ড পার্সেন। আপনাকে কলকাতায় একডাকে সকলে চেনে। দাঁড়িয়ে রইলেন কেন বসুন।
উনি টেবিলের অপর পাশের চেয়ারে বসলেন। আমি একটা চেয়ারে বসলাম। আগেকার দিনের কাঠের চেয়ার। অযত্নে মলিন।
বাড়ি থেকে কখন বেরিয়েছিস। ইসিতা বললো।
গতকাল সন্ধ্যায়।
তার মানে!
হাসলাম।
এতো সকালে কোথা থেকে আসছিস!
এই তো, ঘুরতে ঘুরতে এসে পরলাম।
সেতো দেখতে পাচ্ছি।
আমি বেশ ভালো করে লক্ষ্য করছি। ভদ্রলোক আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। পরিষ্কার মাপছে।
ব্যাপারটা ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না।
আটবছর সময়টা নেহাত কম নয়। একটু অপেক্ষা কর, বোধগম্য হবে।
ইসিতা আমার কথায় চমকে উঠলো।
যাও তুমি চা করে নিয়ে এসো। উনি….।
প্লীজ বরুনদা আমাকে আপনি আজ্ঞে করবেন না। আমি ইসিতার সমবয়সী।
প্রথম প্রথম হবে না। একটু সময় লাগবে।
পিকুকে দেখতে পেলাম না।
ইসিতা বেরিয়ে গেল। এই বাড়ির নিচেরটা বসারঘর, খাবারঘর, রান্নাঘর, গেস্টরুম, ওপরে সব থাকার ঘর। বেশ মনে আছে। ওপরে আমি দু-বার উঠেছি। তিনতলায় মিত্রাদের পড়ার ঘর।
আপনার লেখা আমি পড়ি।
বরুনদার দিকে তাকালাম।
সরি। তোমার লেখার হাতটা দারুণ।
হাসলাম।
কাগজে চাকরি করি। যে যেভাবে বলে লিখে দিই।
তুমি চাকরি করো!
হ্যাঁ।
তাহলে যে লোকে বলে তুমি ওই কাগজের মালিক!
লোকে বলে। আমি বলি না। আমায় দেখে কি তাই মনে হয়?
সেটা ঠিক বলেছো। তোমাকে দেখে কিন্তু সেটা মনে হচ্ছে না।
তাহলে।
আমি আমার অফিসের কাজে প্রায় তোমাদের কাগজের অফিসে যাই।
তাই! কেন?
আমাদের কোম্পানীর কাজে।
আপনি কোথায় আছেন?
আইবিএম। তোমাদের কমপিউটার ডিভিসনটা আইবিএমকে মেনটেনান্সের দায়িত্ব দেওয়া আছে।
সফটওয়ার না হার্ডওয়ার।
সফটওয়ার।
তার মানে আপনি সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার।
বরুণদা হাসলেন।
ওটা আপনাদের কাগজ।
শুনেছি, একসময় ছিলো। এখন নেই।
কে বললো।
এদের মুখ থেকেই শুনি।
একটু খানি নাড়া চাড়া করেই বুঝতে পারলাম ভদ্রলোক খুব অমায়িক। রাখঢাক নেই।
ইসিতা ট্রেতে করে চায়ের কাপ নিয়ে ঢুকলো।
আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
ইসিতা সকালে ঠনঠনিয়াতে গেছিলাম। প্রসাদ আছে। জ্যেঠিমনিকে দিয়ে আয়। পিকুকে দেখতে পাচ্ছি না।
ইসিতা আমার দিকে তাকিয়ে। বুদ্ধিমতী মেয়ে। বোঝার চেষ্টা করছে অনি কি ভাবে অন্দরমহলে প্রবেশ করতে চাইছে। আমি ওর চোখ দেখে বুঝতে পারছি। ও কিছুতেই আমাকে অন্দরমহলে প্রবেশ করতে দেবে না।
মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম অনি তুই যখন একবার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতে পেরেছিস। তোকে জিততেই হবে। যে করেই হোক। কারুর বাধা তুই শুনবি না।
মা পূজো না করে কিছু খান না।
জানি। এটা কিন্তু পূজোরই প্রসাদ।
ইসিতা একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলো।
নাও চা খাও। বরুণদা বললো।
হ্যাঁ নিচ্ছি।
একটা কাপ এগিয়ে নিলাম। চায়ে চুমুক দিলাম।
প্রশ্ন করলি না এতোবছর পরে হঠাৎ কেন এতো সকালে এসে উপস্থিত হলাম।
ইসিতা আমার চোখে চোখ রেখেছে। শেয়ানে শেয়ানে কোলাকুলি।
বিয়ে করছিস তাই নেমন্তন্ন করতে এসেছিস। ইসিতা ট্যারাট্যারা কথা বলা শুরু করলো।
বৌভাতের দিন কেউ নেমন্তন্ন করতে আসে।
তোর আজকে বৌভাত!
কেন তুই জানতিস না?
বরুণদার দিকে তাকালাম।
দাদা, ইসিতার সামনে আপনি একটা সত্যি কথা বলবেন?
বলো।
আমি অনি। এই নামটা আপনি শুনেছেন। হয়তো আমার সম্বন্ধে অনেক গল্পও আপনি ইসিতার মুখ থেকে শুনে থাকবেন। ভালো, খারাপ দুটোই। এটা কি আপনি শোনেন নি আমি পর্শুদিন বিয়ে করেছি, ইসিতার আর এক বোন মিত্রাকে? আর আজ আমার বৌভাত।
বরুণদা মাথা নীচু করে চুপ করে বসে রইল।
ও কিছু জানে না।
ইসি বরুণদার থেকেও তুই আমাকে ভাল করে চিনিস। কেন আমি এসেছি এই সাত সকালে, নতুন করে বলতে হবে?
আমাদের সঙ্গে মিত্রার কোনও সম্পর্ক নেই।
সেটা আমি জেনেছি পর্শুরাতে। কেন নেই সেটাও জেনেছি।
ইসিতা চুপ করে রয়েছে। চায়ে চুমুক দিল।
আমি মিত্রাকে বিয়ে করছি এটা জানলি কি করে?
আমি চায়ে চুমুক দিলাম। নিস্তব্ধ ঘর। পিন পরলে শব্দ হবে। বরুণদা আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। চোখের পলক পড়ছে না।
তোকে বলতে হবে না। আমি বলছি।
ইসিতা আমার দিকে মুখ তুলে তাকাল। চোখ দুটো জিঘাংসায় পরিপূর্ণ। পারলে আমাকে এখুন ছিঁড়ে খাবে যেন।
বুড়ীমাসি এসে বলেছে।
বুড়ীমাসি এ বাড়িতে আসে না। ইসিতা চেঁচিয়ে উঠলো।
বরুণদা মুখ নামিয়ে নিল।
আমি কিন্তু এ বাড়িতে এসেছি, তোদের নিয়ে যেতে।
কোনওদিন হবে না।
আমি এই কাজ করবই।
আমার গলার স্বরে ঘরটা গম গম করে উঠলো।
তুই কি বলতে চাস!
আমি এই পরিবারের আত্মীয়। একজন সদস্য। বরুণদার মতো আমিও এই বাড়ির জামাই। সেই দৃষ্টিকোন থেকে আমারও কিছু অধিকার আছে। আমি আমার সেই অধিকারটুকু জানাতে এসেছি।
জানাতে এসেছিস জানালি, এবার চলে যা।
আমি চলে যেতে আসি নি ইসি।
ইসির চোখে প্রতিহিংসা।
কাল সারাটা রাত না ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। ছটফট করেছি। জ্যেঠিমনির সঙ্গে আমাকে দেখা করতেই হবে।
করুণা দেখাতে এসেছিস। বেরো এখান থেকে।
ইসিতা দপ করে জ্বলে উঠলো।
বরুণদা উঠে দাঁড়াল
এ কি বলছো ইসি। অনি আমাদের….।
রাখো। আট বছর কোথায় ছিল অনি। কে খোঁজ খবর নিয়েছে, আমরা কেমন আছি।
ইসিতা রাগে কাঁপছে।
তুই এখুনি আমাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবি। ইসিতা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
আমি যাব না ইসি। তুই আমাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বার করে দিলেও আমি যাব না। আজ থেকে দশবছর আগে আমি যেটা মুখ বুঁজে মেনে নিয়েছি। আজ আমি কিছুতেই সেটা মানব না।
তুই মানিস কি না মানিস তোর ব্যাপার, তুই এখুনি এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবি।
ইসিতা ছুটে এসে আমার হাত শক্ত করে ধরলো।
এই ইসি, এ তুমি কি করছো! তুমি অনির হাত ছাড়ো।
ও এখুনি বেরিয়ে যাবে, আর একমুহূর্ত এই বাড়িতে ওর থাকা হবে না।
ঠিক আছে, ঠিক আছে। তুমি ওপরে চলো। অনি তুমি একটু বসো।
বরুণদা ইসিতাকে ধরে ওপরে নিয়ে চলে গেল।
আমি বসে রইলাম। একা।
কতক্ষণ বসে আছি জানি না। নানা কথা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। ইসিতা যে ব্যবহারটা আমার সঙ্গে করলো, আমি তাতে একটুও দুঃখ পাইনি। কেননা আমি মন থেকে বিশ্বাস করি, আমি যদি ওর জায়গায় থাকতাম, তাহলে এর থেকেও খারাপ ব্যবহার করতাম। মিত্রার বাবা ইসিতাদের ফাঁকি দিয়েছে। তার লক্ষ্য চরিতার্থতার জন্য। অতএব বাবার কৃতকর্মের ফল মিত্রাকে ভোগ করতে হতেই পারে।
যতো সময় যাচ্ছে আমার মধ্যে তত জেদ চেপে বসছে। আমাকে যে ভাবেই হোক জ্যেঠিমনিকে নিয়ে যেতে হবে। আমি এই কাজ করবই। এইটুকু কথা বলে যেটুকু বুঝলাম ইসি সব জানে না যা মিত্রা জানে। বরুণদাও জানে না। পারিবারিক এমন কিছু ব্যাপার থাকে যা জামাইদের জানান যায় না। এমনকি তাদের পরিবারের কেউ জানতেও পারে না। সময়ে সেটা আগুনের স্ফুলিঙ্গের মতো দাউ দাউ করে জলে ওঠে তারপর একসময় সেই আগুন ছাই চাপা পরে যায়। কালের নিয়মে তা মাটিতে পরিণত হয়।
মিত্রা আমাকে যা জানিয়েছে, তা ইসি জানে কিনা আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। মিত্রা তার বাবার দিনলিপি পড়ে সব জেনেছে। ইসি তা কোনওদিন হাতে পায়নি। এমনকি জ্যেঠিমনি পর্যন্ত মিত্রার বাবার দিনলিপির হদিস জানতেন না। ওদের অনেক কিছুই অজানা। আমার হাতে প্রচুর অস্ত্র। যে কোনও অস্ত্রের বিনিময়ে আমাকে জিততেই হবে।
অনি।
বরুণদার ডাকে মুখ তুলে তাকালাম।
দরজার সামনে যিনি দাঁড়িয়ে তাঁকে আমি আজ থেকে আট বছর আগে শেষ দেখেছি। সেই পাকা গমের মতো গায়ের রং এখনও অটুট। সেই বুদ্ধিদীপ্ত চোখ, টিয়াপাখির ঠোঁটের মতো টিকলো নাক। মাথার চুলে এখনও সেইভাবে পাক ধরেনি। দু-একটা রূপালি তার এদিক সেদিক উঁকি ঝুঁকি মারছে।
সাদা ধবধবে কালো লাইন পাড় শাড়ি পরা। গালদুটো সামান্য ভেঙেছে।
আমি এগিয়ে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম।
থাক বাবা থাক।
আমায় চিনতে পেরেছ জ্যেঠিমনি?
ইসি না বললে পারতাম না। বয়স হয়েছে, চোখের দৃষ্টি শক্তি কমেছে।
তুমি কেমন আছ?
ভালো।
আমি মিত্রাকে বিয়ে করেছি।
ইসি বললো।
আমি জ্যেঠিমনির চোখের দিকে তাকিয়ে আছি। বুঝতে পারলাম জ্যেঠিমনি সত্যি বলছে না। উত্তেজনা হীন চোখ। পোর খাওয়া মানুষ।
এসো।
আমি হাত ধরে ভেতরে নিয়ে এলাম। চেয়ারটা এগিয়ে দিলাম। জ্যেঠিমনি বসলো।
তোমরা কথা বলো। আমি একটু চা নিয়ে আসি।
বুঝলাম বরুণদা আমাকে কথা বলার সুযোগ দিয়ে গেলেন।
তোমার জন্য পূজোর প্রসাদ নিয়ে এসেছি, খাবে?
জ্যেঠিমনি আমার দিকে তাকাল। অনেক না বলা কথা এই চোখে।
রাখো, পরে খাচ্ছি।
বরুণদা বেরিয়ে গেল।
পিকু কোথায়?
ওর কথা আর বোলো না। ওপরে দুষ্টুমি করছে।
আমার আজ বৌভাত, তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি।
জ্যেঠিমনি আমার দিকে তাকাল। এ চোখে অনেক জিজ্ঞাসা।
আমি কোথাও বেরোই না বাবা।
আজ বেরবে, শুধু মাত্র আমার জন্য বেরবে। মাত্র দশমিনিটের জন্য আমার সঙ্গে যাবে। আমি তোমায় আবার পৌঁছে দিয়ে যাব।
না বাবা থাক, আর একদিন যাব।
ইসিতা, বরুণদা ঘরে ঢুকলো। মিষ্টিরপ্লেট এবং চা হাতে। ইশিতা মুখ নীচু করে আছে। বুঝলাম ওপরে গিয়ে খুব কান্নাকাটি করেছে। মুহূর্তের উত্তেজনা। তার রেশ ওর চোখের পাতায় মুখণ্ডলে।
আমি তাকালাম না।
আমি কিছু খাব না ইসি, শুধু চা খাব।
কেন বাবা, তুমি আজ প্রথম আমাদের বাড়িতে এলে।
আজ প্রথম নয় জ্যেঠিমনি, এর আগেও বহুবার এসেছি। তোমার হাতের তৈরি বাটি চচ্চড়ি, লুচি খেয়ে গেছি।
সে তো বহুকাল আগে।
আজ আমি এ বাড়িতে নতুন নয়।
তুমি নতুন জামাই বলে কথা।
এটা তুমি স্বীকার করে নিচ্ছ না জ্যেঠিমনি। ইসি মানতে চাইছে না।
জ্যেঠিমনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
যদি তাই হতো আমার সঙ্গে একবার যেতে।
না বাবা তা হয় না।
কেন হয় না জ্যেঠিমনি, আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না….।
সে তুই জানিস না। তোকে তো বলেছি আমাদের সঙ্গে ওর কোনও সম্পর্ক নেই। ইসিতা খুব নীচু স্বরে বললো।
আমি ইসিতার দিকে তাকালাম। চেয়ার থেকে উঠে পায়ে পায়ে এগিয়ে এলাম। ওর চোখে চোখ রাখলাম।
আমার ওপর তুই রাগ করতে পারিস, অভিমান করতে পারিস। আমি হয়তো তোকে অনেক ছোটবড়ো কথা বলে ফেলেছি। কিন্তু তুই তোর বোনের ওপর রাগ করতে পারিস না।
কে বলেছে ও আমার বোন। একটা নোংরা মেয়ে। বাজারের….। ইসি দপ করে জ্বলে উঠলো।
আমি ততধিক নরম, খুব আস্তে ধীরে বললাম।
ঠিক বলেছিস। এটা ওর প্রাপ্য।
ইসি—
জ্যেঠিমনির গলার কঠিন স্বরে ঘরটা গম গম করে উঠলো।
তোমার মুখ থেকে ওর সম্বন্ধে আর কোনও কথা যেন না শুনি।
মা! তুমিই তো….।
জ্যেঠিমনির স্থির চোখে শাসনের ছোঁয়া।
ইসি চুপ করে গেল।
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে।
নাও বাবা খাও। সকাল থেকে কিছু খাওনি।
জ্যেঠিমনির গলা থেকে স্নেহ ঝরে পড়ছে।
না জ্যেঠিমনি, আমি চা ছাড়া কিছু খাব না।
কেন!
খেতে আমি পারি জ্যেঠিমনি একটা শর্তে।
জ্যেঠিমনি আমার চোখের দিকে তাকাল। বোঝার চেষ্টা করলো আমি কি বলতে চাই।
আমাকে তোমার ঘরে একবার নিয়ে যেতে হবে।
সে যাবে খোন। এটা আবার বলতে হয় নাকি।
তাহলে চলো। তোমার ঘরে যাই। তারপর নিচে নেমে এসে নতুন জামাই হিসেবে মিষ্টি মুখ করে আমি বেরিয়ে যাব। অনি তোমাদের কাছে আর কোনওদিন আসবে না।
ঠিক আছে তুমি চা-টা খাও।
এখন খাব না। ওই যে বললাম তোমায়।
ইসিতা আমার দিকে তাকিয়ে।
ইসি আমি যদি জ্যেঠিমনিকে নিয়ে কিছুক্ষণ ওপরে সময় কাটাই তোর আপত্তি আছে?
এ-মা ওর আপত্তি থাকবে কেন। তুমি তো আমার ঘরে যাবে। জ্যেঠিমনি বললো।
হয়তো থাকতে পারে। যদি থাকে তাহলে যাব না। আমি এখান থেকেই ফিরে যাব।
পাগল ছেলের কাণ্ড দেখ। ঠিক আছে তুমি চলো আমার সঙ্গে।
ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। বরুণদা ইসি নিশ্চল ভাবে দাঁড়িয়ে। আমি জ্যেঠিমনির পেছন পেছন ওপরে উঠে এলাম। ইসি আমার দিকে একবার ড্যাব ড্যাব করে তাকাল। বুঝতে পারছি, ওর চোখের আগুন আমাকে পুরিয়ে মারবে।
দশ বছর আগের স্মৃতিটাকে একবার ঝালিয়ে নেবার চেষ্টা করলাম। জ্যেঠিমনির ঘরে তিনটে ছবি আছে একটা মিত্রা আর ইসির বছর দশেক বয়সের। আর দুটো ইসির বাবার আর মিত্রার বাবার। এই তিনটে ছবি ছাড়া দু-একটা ক্যালেন্ডার, আর ঠাকুর দেবতার ছবি। এছাড়া আছে একটা পুরনো দিনের খাট দুটো কাঠের আলমাড়ি।
আমি পায়ে পায়ে জ্যেঠিমনির ঘরে এসে ঢুকলাম। অবাক হয়ে গেলাম। দশ বছর আগে যেখানে যে ভাবে দেখে গেছি ঠিক সেই ভাবেই আছে। সব কিছুই মলিন। ঝকঝকে তকতকে নয়। সেই ইজিচেয়ার। আমার ঘরে যেরকম একটা আছে। আমি চারিদিক একবার ভাল করে লক্ষ্য করলাম। আমার মুখ থেকে কোনও কথা সরছে না।
পায়ে পায়ে আমি মিত্রা আর ইসির ছবিটার কাছে এসে দাঁড়ালাম। ফ্রক পরে দু-বোন ছাদে দাঁড়িয়ে। দুজনেরই মুখ অনেক ভেঙেচুড়ে গেছে। কিন্তু আদলটা এখনও সেই রকম। শুনেছি ইসির থেকে মিত্রার বয়সের ডিফারেন্স বেশি নয়। পিঠো পিঠি।
বোসো।
ফটোর সামনে থেকে ঘুরে দাঁড়ালাম। কোথা থেকে শুরু করবো। মনে মনে ঠিক করার চেষ্টা করলাম। মনকে বোঝালাম অনি তোর এটা শেষ সুযোগ। তুই এখন একা জ্যেঠিমনির সামনে। তোকে বোঝাতেই হবে কেন তুই এখানে ছুটে এসেছিস, কেন তুই আজই জ্যেঠিমনিকে নিয়ে যেতে চাস। তোকে জ্যেঠিমনির দুর্বল জায়গাটায় দারুণ ভাবে আঘাত করতে হবে। অনেক দিনের জমান আক্রোশ তোকে একধাক্কায় টুকরো টুকরো করে ভেঙে দিতে হবে। তবেই তুই জিতবি। এবার তোর খেলা। তুই এই খালায় দারুণ পটু।
জ্যেঠিমনি।
জ্যেঠিমনি আমার মুখের দিকে তাকাল।
আমি আবার ছবিটার দিকে ঘুরলাম।
আচ্ছা। এই ছবিদুটো (মিত্রার বাবার ছবিটারও উল্লেখ করলাম) তুমি আজও টাঙিয়ে রেখেছ কেন?
আছে, থাক। জ্যেঠিমনি খুব আসতে কথা বললো।
কেন থাকবে? এদের সঙ্গে তোমাদের সম্পর্ক নেই—
অতো উঁচু থেকে কে নামাবে বলো। লোকের অভাব।
আমি নামিয়ে দিই।
না। ওরা ছবিতেই থাকুক।
আমি দরজার কাছে এগিয়ে গেলাম। দরজাটা চেপে ভেজিয়ে দিলাম। ফিরে এসে জ্যেঠিমনির সামনে দাঁড়ালাম। জ্যেঠিমনি আমার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। বুঝতে পারছি ভেতরে ভেতরে অসীম যুদ্ধ চলছে। আমি আবার মিত্রা আর ইসির ফটোটার সামনে এসে দাঁড়ালাম।
জ্যেঠিমনি আবার সেই অতীতে ফিরে যাওয়া যায় না। দুই বোন একসঙ্গে তোমার কাছে আসবে, থাকবে, খুনসুটি করবে। তুমি তাদের সন্তানদের সঙ্গে খেলা করবে গল্প করবে, যেমন তুমি পিকুর সঙ্গে করো।
সে হয় না অনি।
অনি!
মনে মনে বললাম, বন্ধ দুয়ার খুলছে অনি। স্টেডি, স্টেডি ইন ইওর প্রসেস।
কেন হয় না জ্যেঠিমনি। একটা ভুলকে গেড়ো দিয়ে রেখে লাভ কি।
ভুল সেটা ভুল, তাকে শোধরান যায় না।
কেন যায় না জ্যেঠিমনি, আমি শুনেছি মেনে নেওয়া, মানিয়ে নেওয়া মানুষের সবচেয়ে বড়ো ধর্ম। আমি যদি সব জানার পর মেনে নিতে পারি, তোমাদের আপত্তি কোথায়?
তুমি কি জান?
মনে মনে বললাম, এই সুযোগ অনি, তুই হাত ছাড়া করিস না। তোর কথার ফাঁদে জ্যেঠিমনি পা দিয়ে ফেলেছে। এই সুবর্ণ সুযোগ তুই আর পাবি না।
নিজেকে উজার করে দে। তুই জিতে যাবি।
আমি ওই ফটোর দিকে মুখ করেই ধীরে ধীরে শুরু করলাম। একে একে সমস্ত কথা বলতে শুরু করলাম। কখনও গলা ভাড়ি হয়ে আসছে কখনও ধরে যাচ্ছে। কখনও গলা বুঁজে আসছে। আমি থামিনি। থামলাম না। কতক্ষণ বলেগেছি জানি না। নিজের কথা বলেছি। অফিসের কথা বলেছি। মিত্রার কথা বলেছি। মিত্রা কোথা থেকে কোথায় তলিয়ে গেছিল তা বলেছি। সেখান থেকে কিভাবে তাকে উদ্ধার করে এনেছি তা বলেছি। বুঝতে পেরেছি কথা বলতে বলতে কখনও আমি ভীষণ ইমোশনাল হয়ে পড়েছি।
শেষে পর্শুরাতে মিত্রার বলা সমস্ত কথা আমি উগড়ে দিলাম।
একটু থামলাম।
এরপরও কি তুমি বলবে জ্যেঠিমনি যে মেয়েটা তার সবচেয়ে আনন্দের দিনে তার গর্ভধারিণী মাকে একটিবার দেখতে চায়, সে খুব অপরাধ করেছে। তার তো কোনও অপরাধ নেই। কেন সে অন্যের অপরাধ নিজের ঘারে সারাজীবন বয়ে বেরাবে? তাই যদি হয়, কেন তুমি ন-মাস দশদিন তাকে গর্ভে ধারণ করেছিলে? কিসের লোভ, কিসের লালসা? কি জন্য নিজেকে আত্মবলিদান দিয়েছিলে? কেন তুমি তার জন্মের পর তাকে মেরে দাও নি? কেন তুমি সেই নবজাতক শিশুর কচি ঠোঁটে তোমার স্তন গুঁজে দিয়েছিলে? কেন তুমি তাকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছিলে? কি তার অপরাধ?
আবার একটু থামলাম।
আমি জানি জ্যেঠিমনি, আমার এত প্রশ্নের উত্তর তুমি দিতে পারবে না। গলাটা বুজে এলো।
আমি মিত্রার অনুরোধে তোমার কাছে আসিনি। মিত্রা জানেও না আমি এখন তোমার কাছে, তোমার ঘরে। আমি এসেছি নিজের মনের তাগিদে। এক মাতৃহারা স্ত্রীকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেব। ও জানে না আমি কোথায় এসেছি। কখন এসেছি। ওর মুখ থেকে সব কথা শোনার পর। মনটা ভীষণ ছটফট করছিল তোমার সঙ্গে দাখা করার জন্য। সুযোগ খুঁজছিলাম। কিছুতেই বাড়ির বাইরে আসতে পারছিলাম না। ছোটোমার কথায় সুযোগ পেয়ে গেলাম। ছোটোমা বললো, আজ কালরাত্রি আমাদের দুজনকে এক ভিটেতে একসঙ্গে থাকতে নেই। সেই যা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছি। জ্যেঠিমনি আমি তোমার কাছে আসিনি, আমি এসেছি মিত্রার জন্মদাত্রী মায়ের কাছে।
আমার মাকে আমি ছবিতে দেখেছি। জ্ঞানতঃ তার কথা মনে পড়ে না। যাক, সব যখন জেনেই ফেললাম তাই মেয়ের কাছে মাকে নিয়ে যেতে এসেছিলাম। মনে হয় এতোটা সৌভাগ্য মিত্রার কপালে লেখা নেই। তোমায় আজকে যা বলে ফেললাম, কথা দিচ্ছি এ কথা কেউ কোনওদিন জানতে পারবে না। অনি যে এ বাড়িতে এসেছিল তাও কেউ কোনওদিন জানতে পারবে না। তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পার।
কতক্ষণ দুই বনের ফটোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়েছিলাম জানি না। ফটোর দিক থেকে আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। চোখে হয়তো জল এসে গেছিল। মানুষ এই জায়গাটায় ভীষণ দুর্বল। আবঝা দেখতে পেলাম গেটের কাছে ইসি আর বরুণদা। স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। ওরা কখন এসেছে! আমি দরজা ভেজিয়ে দিয়েছিলাম? জ্যেঠিমনি স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।
হাতের তালু দিয়ে চোখ মুছে হন্তদন্ত হয়ে আমি গেটের কাছে এগিয়ে গেলাম।
তুই যাবি না। তুই এবাড়ি থেকে এভাবে যেতে পারিস না।
ইসির কথায় মাথা নত করলাম।
না ইসি। আমাকে যেতে হবে। ওরা আমার জন্য ভীষণ চিন্তা করছে। আমি যদি কোনও অপরাধ করে থাকি। তার জন্য আমাকে শাস্তি দিস। আমি মাথা পেতে নেব।
পিকু আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে। পকেট থেকে একটা ক্যান্ডি বার করে ওর হাতে দিলাম।
নাও, এটা খেলে দাঁতে পোকা হবে না।
পিকু আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
বরুণদা কেমনভাবে যেন আমাকে দেখছে।
ওরা কিছুতেই গেট ছেড়ে সরে দাঁড়াচ্ছে না।
ইসি আমায় ছাড়, আমি যাই।
ইসি আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে। চোখে জল টল টল করছে।
বড়কি আমি অনির সঙ্গে ছুটকির কাছে যাব। তোরা যাবি?
জ্যেঠিমনির কান্নাভেঁজা গম্ভীর কণ্ঠস্বরে ঘরটা গম গম করে উঠলো। বরুণদা চমকে তাকাল আমার দিকে।
আমার কাঁধটা ধরে বার কয়েক ঝাঁকিয়ে দিল।
ইসি ছুটে গিয়ে জ্যেঠিমনিকে জড়িয়ে ধরে ঝড় ঝড় করে কেঁদে ফেললো।
আংকেল তুমি মাকে বকলে কেন।
পিকুর কথায় বুকের ভেতরটা মোচর দিয়ে উঠলো। ওর বয়সে আমি আমার মা, বাবাকে দেখিনি। একদিন ও বড়ো হবে। যদি এই স্মৃতিটুকু ওর মনে থেকে যায় সেদিন ও নিজের বোধ বুদ্ধি দিয়ে বিবেচনা করবে, ওর আংকেল কতটা সত্যের দাসত্ব করে।
আমি পিকুকে কোলে তুলে নিলাম। শিঁড়িদিয়ে নিচে নেমে এলাম।
বাইরের গেটে তালা দিতে দিতে ইসি বললো, কিরে তোর গাড়ি কোথায় রেখেছিস?
হাসলাম।
হাসছিস যে।
আমার গাড়ি নেই। আমি বাসে চড়ি। প্রয়োজনে অটোতে, ট্যাক্সিতে।
তারমানে! কাগজের মালিক হয়েছিস, গাড়ি নেই। লোকে শুনলে কি বলবে।
আমি মালিক নই। মন থেকে আমি এখনও কর্মচারী। তোর বোন জোর করে আমার গলায় মালিকের মাদুলি ঝুলিয়ে দিয়েছে।
তোমায় একদিন অফিস থেকে এসে এই কথাটা বলেছিলাম ইসি, তোমার খেয়াল আছে। তুমি তখন বলেছিলে, ছাড়ো, বড়ো লোকেদের বড়ো বড়ো খেয়াল। আজ প্রমাণ পেলে।
সত্যি তোর গাড়ি নেই!
চল না, এই টুকু তো, গলির মুখ থেকে ঠিক একটা ট্যাক্সি পেয়ে যাব।
আমার একহাতে পিকু আর একহাতে জ্যেঠিমনির একটা হাত। ওরা দুজনে সামনে। পিকু তরতর করে কথা বলে চলেছে। ওর অনেক প্রশ্ন। তার অর্ধক উত্তর আমার জানা অর্ধেক জানা নেই। ওর মহা আনন্দ, আংকেলের সঙ্গে মাসির বিয়ের নেমন্তন্ন খেতে যাচ্ছে।
ইসিকে বললাম, কটা বাজে?
ইসি ঘড়ি দেখে বললো, দেড়টা বাজে।
মনে মনে বললাম সাড়ে ছ-ঘণ্টা ধরে যুদ্ধ করে অনি তুই জিতলি, এটা মনে রাখিস।
তোর মাবাইল নেই? ইসি জিজ্ঞাসা করলো।
আছে, পকেটে স্যুইচ অফ অবস্থায়।
খোল।
অসুবিধে আছে।
কিসের?
তুই বুঝবি না।
ইসি চুপ করে গেল।
গলির মুখে এসে একটা ট্যাক্সি ধরলাম। বললাম ট্র্যাংগুলার পার্ক। এককথায় রাজি হয়ে গেল। আমি সামনে পিকুকে নিয়ে বসলাম। পেছনে ওরা তিনজন। আসার সময় পিকুকে দেখাতে দেখাতে নিয়ে এলাম সব কিছু। ওরা তিনজনে পেছনে বসে আমার কথা শোনে আর হাসে।
মাঝে মাঝে ইসি বললো, তুই তো পিকুর সঙ্গে বেশ জমিয়ে গল্প করছিস। আমাদের মাথা খারাপ হয়ে যায় ওর সঙ্গে বক বক করতে।
দুজনেই ক্যান্ডি মুখে দিয়েছি। চিবচ্ছি।
বাড়ির গেটে যখন গাড়ি এসে দাঁড়াল, তখন আড়াইটে বাজে। আমি ট্যাক্সির গেট খুলে প্রথমে নামলাম। দেখলাম আজ বাড়ির গেট খোলা। ভতরে অনেক লোকজন। চিকনা প্রথম আমাকে দেখতে পেয়েছে। ছুটে গেটের বাইরে চলে এলো।
তারপর আমার সঙ্গে অপরিচিত লোক দেখে থমকে দাঁড়াল। আমি ওর দিকে তাকিয়ে হাসলাম। ও হাসলো। কোনও কথা বললো না। ট্যাক্সিভাড়া মেটালাম। জ্যাঠিমনিকে হাত ধরে আসতে আসতে নামালাম।
গেটের মুখে আসতেই ছগনলাল বললো, ছোটাবাবু বহুত গজব হো গায়া।
কেন ছগনলাল।
তুমি সকাল থেকে নেই আছো।
হাসলাম।
দেখলাম মিত্রা বারান্দা থেকে নেমে তীরবেগে বাগানের পথে ছুটে আসছে। দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য।
আমার একহাতে পিকু অন্য হাতে জ্যেঠিমনি। কাছে এসে থমকে দাঁড়াল। হাঁপিয়ে গেছে। ওর বুক ওঠা নামা করছে। চোখদুটো কেমন যেন হয়ে গেল। এক অব্যক্ত যন্ত্রণা ওর চোখে মুখে ফুটে উঠলো। না পাওয়ার বেদনার মধ্যে আনন্দ।
চিকনা ছুটে ভেতরে চলে গেল। একটা হই হই শব্দ ভেতর থেকে ভেসে এলো। বুঝলাম আমার আসার আগমন বর্তা পৌঁছলো। মিত্রা, জ্যেঠিমনিকে জড়িয়ে ধরে হাপুস নয়নে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। ইসিতা, মিত্রাকে জড়িয়ে ধরেছে। আমি স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে।
বরুণদা কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে।
এখান থেকেই দেখতে পাচ্ছি সকলে পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছে।
কাকে বাদ দিয়ে কার কথা বলবো। বরুণদা অপ্রস্তুত।
বেশ কিছুক্ষণ পর জ্যাঠিমনি কথা বললো। চোখের দু-কোল বেয়ে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পরছে।
কাঁদিস না। আমি এসেছি। অনি আমার সব রাগ, যন্ত্রণা ভুলিয়ে দিয়েছে।
মিত্রা জ্যেঠিমনির বুকে মুখ ঘসছে।
সেই তুমি এলে, এতো দেরি করে এলে কেন।
কোথায় দেরি করলাম। দেখ আমি ঠিক সময়ে এসে পরেছি। আজ আনন্দের দিন, তুই কাঁদিস না। ওই ছেলেটার দিকে একবার তাকা। জানিস না ও সকাল থেকে কতো লাঞ্ছনা গঞ্জনা সহ্য করেছে।
আংকেল চলো নেমন্তন্ন খাই।
মিত্রা, জ্যেঠিমনির বুক থেকে মুখ তুললো। আমার দিকে তাকিয়ে একবার হাসলো। এ হাসি কোটি টাকা দিলেও পাওয়া যায় না। মিত্রা পিকুর গাল টিপে দিল।
কোথায় নেমন্তন্ন খেতে যাবে?
মাসির বিয়ে। গাল থেকে মিত্রার হাতটা সরিয়ে দিল।
সবাই ঘিরে ধরেছে। আমার দিকে কেমন ভাবে যেন তাকাচ্ছে। বড়োমা এগিয়ে এলো। চোখা চুখি হলো জ্যেঠিমনির সঙ্গে। বুঝতে পারলাম দুজনে, দুজনকে কোথায় যেন দেখছে চিনি চিনি করেও চিনতে পারছে না। বত্রিশ বছর আগের একরাতে কয়েক ঝলকের দেখা। স্মৃতি ফিকে হয়ে গেছে। তবু ফিরিয়ে আনার চেষ্টা।
জ্যেঠিমনি, বড়োমা। বড়োমা ইনি মিত্রার জ্যেঠিমনি।
দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরলো।
ভাবগম্ভীর পরিবেশ।
আমি সবার সঙ্গে একে একে আলাপ করিয়ে দিলাম। দাদা, ডাক্তারদাদা, মল্লিকদা কাউকে দেখতে পেলাম না। ছোটোমা সন্দেহের চোখে আমাকে দেখছে। অনি মিত্রার জ্যেঠিমনিকে কোথা থেকে ধরে আনল। এর গল্প আগে কখনও শুনি নি। ছোটোমার চোখ তাই বলছে। আমি এমন ভাবে হাসলাম, যেন কেমন দিলাম এক্সক্লুসিভ নিউজ।
ছোটোমা হেসে চেখের ইশারায়, আমার গালে থাপ্পর মারল।
ভেতরে এলাম। ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম বারান্দায় আমার ঘরের সামনে আমার বন্ধুরা। সবাই আমাকে মাপছে। ভেতরে এসে দেখলাম দাদারা বসে। কাকা, উনা মাস্টারও আছে।
আমি সবার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলাম জ্যেঠিমনি, ইসিতা আর বরুণদার সঙ্গে। ওরা প্রথমে একটু অবাক হলো। চোখ দেখে বুঝতে পারলাম। পিকু বলে উঠলো।
আংকেল আমরা কোথায় নেমন্তন্ন খেতে বসবো। মাসিকে দেখাও।
ঘর ভর্তি সবাই হেসে উঠলো। ইসিতা আমার হাত থেকে পিকুকে নিয়ে মিত্রার কোলে তুলে দিল।
এই যে তোর মাসি। নে হয়েছে।
সবাই পিকুর গাল টেপে। ও হাত সরিয়ে দেয়। বক বক করছে।
তাহলে এডিটর, কথাটা তাহলে সত্যি।
কি।
যার বিয়ে তার হুঁস নেই, পারাপড়শির ঘুম নেই।
ডাক্তারদাদার কথায় জ্যেঠিমনি পর্যন্ত হেসে ফেললো। আসতে করে বললো।
ওর দোষ নেই। ও সকাল থেকে অনেক যুদ্ধ করছে।
কি অনিবাবু মনে হচ্ছে যুদ্ধটা তাৎক্ষণিক সময়ের মধ্যে মাথায় এসেছিল।
ডাক্তারদাদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
দেখলে তো তোমার মাথাও মাঝে মাঝে তোমায় কেমন বিট্রে করে।
আমি হাসছি।
তোমরাই বা কেমন বাপু এক কথায় চলে এলেই হতো। তাহলে ওকে যুদ্ধ করতে হতো না। বড়োমা বললো।
আমি পায়ে পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। আমে দুধে মিশে গেছে, আমি আঁটি এবার গড়াগড়ি খাব। চিকনা আমার পেছন পেছন। বাসু, অনাদিকে দেখলাম শিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখে মুচকি হাসলো। আমি ওপরে উঠে এলাম। দেখলাম কনিষ্ক, বটা, নীরু বারান্দায় দাঁড়িয়ে।
কিরে আর সব কোথায়?
তোর বিয়ে বলে কি হাসপাতাল বন্ধ থাকবে।
হাসলাম।
ঘরে এলাম।
মনে হচ্ছে একটা এক্সক্লুসিভ মারলি। কনিষ্ক বললো।
ওদের দিকে হাসি হাসি মুখে তাকালাম।
একটা সিগারেট দে।
চিকনা তোমার গুরুকে একটা সিগারেট দাও।
চিকনা হাসতে হাসতে এগিয়ে এলো।
খুব জমিয়ে নিয়েছিস বলে মনে হচ্ছে।
বুঝলি অনি, চিকনা হচ্ছে ফ্রেস এয়ার। নিলে হার্টের জোড় বারে।
কিরে চিকনা, কনিষ্ক কি বলে।
কনিষ্কদা বাড়িয়ে বলছে।
চিকনা সিগারেট বার করে সবাইকে দিল। আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
হাসলি যে।
তোর কাউন্টার আমার।
সঞ্জু কোথায় রে?
নিচে। ইসলামদার সঙ্গে কাজ করছে।
তুই।
আমি হাওয়া খাচ্ছি।
মিনতিকে দেখতে পেলাম না।
এতো ভিড়ে দেখবি কি করে।
সবার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিস।
কাছে এলে তো।
কনিষ্ক।
বল।
কাকাকে দেখলি।
দেখলাম। তার থেকেও বড়ো সরেষ জিনিষ তোর উনা মাস্টার।
হেসে ফেললাম।
চিকনা একটু চা হবে।
দাঁড়া, বলে চিকনা হন হন করে হেঁটে চলে গেল।
তোদের খাওয়া হয়েছে?
তোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
কিরে নীরু।
দাঁড়া তোকে একবার ভালোকরে দেখি।
কেন।
গেট পেরিয়ে বাগানের লনে এসে দাঁড়ালি, তোকে দেখা মাত্রই ম্যাডামের হান্ড্রেড মিটার স্প্রিন্ট। একেবারে প্রথম স্থান।
আমি হাসছি।
মনে হলো অলিম্পিকে সোনা জিতেছে। তারপরেই ভদ্রমহিলাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়া। তুই….।
বটা ঝেড়ে একটা লাথি কষালো নীরুর পেছন দিকে।
তুই মারলি কেন?
তোর কমেন্ট্রি শুনে।
সবাই হাসছে।
অনি ব্যাপারটা তোলা রইলো মনে রাখিস। নীরু বললো।
অনাদির দিকে তাকালাম।
কখন এলি?
আটটা।
বাড়ি থেকে কখন বেরিয়েছিস?
সাড়ে চারটে।
ওখানে কাকে রেখে এলি?
তোর এতো চিন্তা কিসের। কনিষ্ক খেঁকিয়ে উঠলো।
তুই গিয়ে পাহাড়া দিবি। বটা বললো।
অনাদি হাসছে।
বলুনতো ওকে।
মিলি গেটের মুখে এসে দাঁড়াল। আমাকে দেখে ফিক করে হেসে বললো। তোমার সঙ্গে পরে একচোট ঝগড়া হবে। কনিষ্কদা, ছোটোমা সবাইকে নিচে খেতে ডাকছে।
কনিষ্ক আমর দিকে তাকাল।
সকাল থেকে কিছু পেটে পরেছে।
না।
খালি পেটে লড়ে গেলি।
হ্যাঁ।
এসেই দেখলাম তুই নেই। বড়োমার মুখ হাঁড়ি। কিছুক্ষণের মধ্যে সবাইকে চাঙ্গা করলাম। ছোটোমার মুখ থেকে সব শুনলাম। বুঝলাম নিশ্চই কারুর সঙ্গে বোঝাপড়া করতে গেছিস। জিজ্ঞাসা করিস বড়োমাকে, আমি এই কথা বলেছি কিনা।
ঠিক বলেছিস কনিষ্ক, এই বোঝাপড়াটা আমার জীবনের একটা মাইলস্টোন।
জানি, আবহাওয়া তাই বলছিল। ম্যাডামের এ্যাকসন, রি-এ্যাকসনে তার প্রতিফলন ঘটলো।
আর কথা নয়, এবার চলো। মিলি বললো।
ওরা নিচে চলে গেল।
বাসু বললো, তুই আবার কোথাও বেরবি নাতো?
হেসে ফেললাম।
ওরা চলে গেল। আমি টেবিলের কাছে গেলাম। মোবাইলটা পকেট থেকে বার করলাম। স্যুইচ অফ। নিজে থেকেই জিভ বার করলাম। মোবাইলটা অন করলাম। দেখলাম পঞ্চাশটা মিস কল। আর দেখার ইচ্ছে হলো না। সবাই একবার করে টিপেছে। মনে হচ্ছে কেউ বাদ যায় নি। মনটা হাল্কা, কিন্তু মনে হচ্ছে যেন এখনও পাথর চাপা।
আর একটা সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছে। টেবিলের ওপর পরে থাকা প্যাকেট থেকে সিগারেট নিয়ে জানলার সামনে এসে দাঁড়ালাম। আমগাছে ছোট ছোট আম ধরেছে। এখন আর আমের বোল একটাও চোখে পড়ছে না। গাছের ডালে আলো লাগানো হয়েছে। ওপর থেকে নিচের দিকে তাকালাম। সারা বাগানে ছোট ছোট ছাতা লাগান হয়েছে। এক একটা ছাতার তলায় দুটো করে চেয়ার। মনে হয় ইসলামভাই বুফে সিস্টেমে খাওয়াবে।
এইনে, ধর।
পেছন ফিরে তাকালাম।
চিকনা চায়ের কাপ হাতে।
নিজে বানালাম।
হাসলাম।
খেয়ে গালাগালি করবি না। সিগারেটটা দে। দু-টান মেরে নিবিয়ে দিই, পরে খাবো।
কেন!
সবাই ছোটোমার ঘরে ঢুকেছে, এবার তোর ঘরে আসবে, আমি কেটে পরি।
আমি চিকনার কথায় হাসছি।
চিকনা এই ক-দিনে কতো বোঝদার হয়ে গেছে। ভাবতেই ভালো লাগছে।
জানলার সামনে দাঁড়িয়েই চা খাচ্ছিলাম। আবার ভাব সাগরে ডুবে গেলাম।
মানুষের জীবন নদীর মতো, কোথা দিয়ে যে বইবে কেউ জানে না। উপন্যাসে বহু চরিত্র পড়েছি। আমার জীবনটাই যেন একটা উপন্যাস হয়ে যাচ্ছে। যতো ভেতরে ঢোকো তত রস।
কিরে ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কোথায় ডুব মারলি। ছোটোমার গলা।
ও বুঝি মাঝে মাঝেই এরকম ডুব মারে। জ্যেঠিমনি বললো।
ফিরে তাকালাম।
গেটের মুখে সবাই। বড়োমা, ছোটোমা, জ্যেঠিমনি, বৌদি, মিত্রা, ইসিতা।
দিদি এইটা ছোটোবাবুর ঘর। আগে মাসের পর মাস বন্ধ থাকত, মিত্রা আসার পর থেকে মাসের মধ্যে কুড়িদন বন্ধ থাকে বাকি দশদিন খোলা হয়। ছোটোমা বললো।
আমি তাকালাম। ছোটোমার মুখে বাঁকা হাসি। মিত্রার দিকে তাকালাম। ওর ডাগর নবীন চোখে বিশ্বজয় করার হাসি।
আমার দিকে তাকিয়ে মুখ নীচু করলো।
ভাবতেই পারেনি ওর বুবুন এইরকম একটা কাণ্ড ঘটাতে পারে।
কিরে সকলকে প্রসাদ দিয়েছিস। জ্যেঠিমনি কিন্তু আমার হাত থেকে নেয়নি।
মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম।
জ্যেঠিমনি আমার দিকে এগিয়ে এলো। আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো।
আমি জ্যেঠিমনির থেকে একহাত লম্বা।
তুমি আমার সব বাঁধ ভেঙে দিলে আজকে।
কই পারলাম, চেষ্টা করলাম মাত্র। সফল হই আগে।
এখনও তোমার সন্দেহ আছে।
সন্দেহ না, এখনও অনেক কাজ বাকি আছে।
সে তুই তোর মতো করিস।
এইবার ঠিক কথা বলেছো।
কেন!
এতক্ষণ তুমি আমাকে সম্মান দিচ্ছিলে, তুমি সম্বোধন করছিলে। যতই হোক আমি মিত্রা নই। সম্মান পেতেই পারি। চ্যাটুজ্জে বাড়ির ছোটো জামাই বলে কথা।
দেবো কান মূলে, আবার বড়ো বড়ো কথা। ছোটোমা বললো।
ইসিতা ফিক করে হেসে উঠলো।
ও ছোটো আজ থাক, ওর বৌভাত। সখ করে বিয়ে করলো। বৌদি বললো।
বড়োমা হেসেও হাসে না।
হ্যাঁরে তোর আবার ধর্মে মতি গতি কবে থেকে হলো। ছোটোমা বললো।
কেন।
তুই নাকি ঠনঠনেতে গেছলি।
হ্যাঁ।
কেন।
মানত করেছিলাম।
কিসের!
মিত্রাকে বিয়ে করলে পূজো দেব।
ও হরি দেখেছো ছেলের কাণ্ড। বড়োমা বলল।
তুই কবে মানত করেছিলি শুনি। ছোটোমা বললো।
সে তুমি বুঝবে না।
বোঝার আর কি বাকি রেখেছিস শুনি।
ছোটোমার কটকটে কথায় ইসিতা হেসে গড়িয়ে পরে।
জ্যেঠিমনি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে।
তুই কি আজ সারাদিন এই জামাকাপর পড়ে কাটাবি ঠিক করেছিস। বৌদি বললো।
চসসোর কোথাকার। ছোটোমা দাঁতে দাঁত চিপে বললো।
আমি হাসছি।
বড়োমার কাছে এগিয়ে গেলাম। শুধু শুনলে হবে, কিছু বলো।
দাঁড়া বাপু সকাল থেক বড়ো জ্বালিয়েছিস।
নির্জলা।
তাহলে কি মন্ডা মিঠাই খাবে। ছোটোমা ছেঁচকিয়ে উঠলো।
ইসিতার দিকে তাকালাম।
কি ইসি ছুটকির বাড়িতে তোদের নিয়ে এসে অন্যায় করেছি।
ইসিতা মাথা নীচু করলো। বুঝলাম চোখ ছল ছল করে উঠেছে।
ছুটকি আবার কার নাম রে। ছোটোমা বললো।
আমি হাসছি।
জ্যেঠিমনি হেসে ফেললো। ছোটোবেলায় ওদের দুজনকে বড়কি আর ছুটকি বলে ডাকতাম।
ছোটোমা চোখ বড়ো বড়ো করে, কিরে মিত্রা আগে বলিসনি কখনও?
ছোটোমার কথার ধরণে ইসিতা কাঁদতে কাঁদতে হেসে ফেললো।
দু-বোন দুজনকে জড়িয়ে ধরেছে।
এখনও আর তোর কি কি বাকি আছে। ছোটোমা আমার দিকে তাকাল।
কিসের।
বুঝতে পারছিস না।
একটুও না।
বোঝাচ্ছি।
ছোটোমা এগিয়ে এলো আমি ছোটোমার হাতদুটো ধরে জড়িয়ে ধরলাম।
আপনি ও ভাবে তাকাবেন না দিদি, ওর কীর্তি কলাপ শুনলে আপনার সারাটা শরীর হিম হয়ে যাবে। ও যা চিজ না।
আমি হাসছি।
ওর সঙ্গে কাল যদি কেউ না থাকত, তাহলে আমরা কেউ জানতেও পারতাম না ও কোথায় গেছে। কাজের বাড়ি আপনি একবার ভাবুন।
জ্যেঠিমনি হাসছে।
আধ ঘণ্টার মধ্যে রেডি হবি। ওদের খাওয়া হলে খেতে বসবো।
তথাস্তু।
আর একটা কথা, নিজের পছন্দ মতো জামা কাপর পরা চলবে না।
আমি হাসছি।
ছোটোমার শাসনে ওরাও হাসে।
তাড়াতাড়ি রেডি হ। আমি ছোটোমাকে ছারলাম।
ওরা সবাই চলে গেল।
আমি দরজাটা ভেজিয়ে জামা প্যান্ট খুলে টাওয়েলটা কাঁধে চাপিয়ে বাথরুমে ঢুকলাম। ভালো করে স্নান করলাম। দেহের সমস্ত ময়লা যেন ধোয়া হয়ে গেল। মনে মনে ভাবলাম সত্যি আমার জীবনটা যেন কি রকম। নিজের কাছে নিজে যে কিছু প্রত্যাশা করবো, তার কোনও উপায় নেই।
(আবার আগামীকাল)