জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
৫৮ নং কিস্তি
সুজিতদা চোখ বড়োবড়ো করে বললো, অনি আজকাল এসব করছে নাকি!
পুরো দমে। এগুলোকে দেখেছিস।
মিলি, অদিতি, টিনা, দেবাদের দিকে তাকিয়ে বললো।
টিনাইতো ভেতরে ডেকে এনে সবার সঙ্গে আলাপ করাল।
এগুলো কোথায় কোথায় ছিল তুই জানিস?
হ্যাঁ জানি।
সবকটাকে তুলে এনে কাগজে জড়ো করেছে। বুঝতে পারছিস ব্যাপারটা। ভাই আমাকে একটা চাকরি দিস, না হলে বৌ-বাচ্চা নিয়ে না খেতে পেয়ে মরে যাব।
হাসি থেমে নেই।
সুজিতদা মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললো।
কিরে মিত্রা চম্পক যা বলছে সত্যি?
ওটা চম্পকদা আর বুবুন জানে।
বুবুন আবার কেরে।
তুই এটাও জানিস না। চম্পকদা বললো।
না।
ম্যাডাম অনিবাবুকে এই নামে ডাকেন, সেই কলেজ লাইফ থেকে। আর আমরা এখন অনিকে ছোটোবাবু বলে ডাকি।
দাঁড়া দাঁড়া চম্পক, আমার মাথাটা কেমন পাক খেতে শুরু করেছে।
বৌদির দিকে তাকিয়ে।
কিগো বুলা তুমি কিছু জান।
বৌদি হাসছে।
কি সাংঘাতিক তুমি, কই আগে কখনও আমাকে বলোনি!
আহা, সব বলা যায়। কি বল মিত্রা।
বৌদি এমন ভাবে বললো, সবাই হাসছে।
কি সনাতনবাবু আমি যা বললাম একবর্ণও মিথ্যে? চম্পকদা বললেন।
একবারে না।
দাদাও হাসে, মল্লিকদাও হাসে।
তোকে কি বলবো সুজিত, আমরা কোন ছাড়, অনি আজকাল দাদাকে পর্যন্ত হুকুম করে। চম্পকদা বললো।
করবে না। তোমরা সব এক গোয়ালের গরু। বড়োমা খেঁকিয়ে উঠলো।
কাম সেরেছে। চম্পক এবার তুই চুপ কর। ছেলের নামে বলে ফেলেছিস, গায়ে লেগে গেছে। দাদা বললো।
সবাই হাসা হাসি করছে।
কইরে ওকে জামাকাপরটা দে।
বড়োমা মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললো।
তোমরা একটু বোসো। আমি আসছি।
আজ একটু গায়ে সেন্ট দিস। চম্পকদা চেঁচিয়ে উঠলো।
আবার হাসি।
আমি বড়োমার ঘরে এলাম। সারা বাড়িতে যেন হাট বসে গেছে। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিলাম। মিত্রা আমাকে রাজ বেশ পরাল। সুরো এসে একবার পাঞ্জাবী ঠিক করে একবার চোস্তা ঠিক করে। নীপা সামনে দাঁড়িয়ে। দারুন সেজেছে সব। কাকে বাদ দিয়ে কাকে দেখবো।
একে একে সবাই আসতে আরম্ভ করেছে। অনিমেষদা এলেন, বিধানদা এলেন। আমার পেছনে কিছুটা লাগলেন। বিধানদা একরাশ বই আমার জন্য নিয়ে এসেছে।
আমি হলফ করে বলতে পারি এগুলো তোর পড়া হয়নি।
আমি সবাইকে প্রণাম করে বাইরে বেরিয়ে এলাম। ভেতরে তখন তুমুল আড্ডা শুরু হয়ে গেছে।
একফাঁকে গিয়ে আমি ইসলামভাই, আবিদ, রতন, সাগির, অবতার, নেপলাদের সঙ্গে দেখা করে এলাম। ওরা ভীষণ খুশী। সবাই যে যার দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছে। সবার পরনে নতুন কুর্তা পাঞ্জাবী। এ যেন মিত্রার হুকুম।
সুরো, নীপা, মিনতি সাজগোজ করে ঘুরছে। জ্যাঠিমনির চোখে প্রশান্তি। যে যেরকম পারছে ছবি তুলে যাচ্ছে। ইসলামভাই বাড়িটাকে বেশ সুন্দর সাজিয়েছে। চারিদিকে রুচির ছাপ স্পষ্ট। বড়োমা, ছোটোমা, বৌদি সবার মধ্যমনি। বাইরের অতিথিদের সামলাচ্ছেন।
ভেতরের অতিথি সামলাচ্ছে লক্ষ্মী, কবিতা, দামিনীমাসি। দেখলাম মিত্রাও তার ক্লাবের কিছু বান্ধবীকে নিমন্ত্রণ করেছে। তাদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল। আমাকে আজকে যা রাজবেশ পরিয়েছে, তাতে আমার মাথা খারাপ। আমি এদিক ওদিক ঘুরছি।
আমি বাগানের পেছনে ছিলাম। চিকনা ছুটতে ছুটতে এসে বললো। তোকে এখুনি বৌদি ডাকছে। তোর স্যার এসেছে।
আমি তাড়াতাড়ি এলাম। ড. রায় ওনার স্ত্রী সুনন্দাদি ও শুভঙ্করবাবু। কলকাতায় আজ যাঁদের জন্য আমি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছি। কাছে গেলাম।
মিত্রা দাঁড়িয়ে আছে মাথা নীচু করে। স্যারকে ঘিরে অনিমেষদা, বিধানদা, ডাক্তারদাদা, দাদা, মল্লিকদা সবাই। আমি সবাইকে প্রণাম করলাম।
যাক বাবা, শেষ পর্যন্ত অনি মিত্রাকে খুঁজে পেয়েছে, কি বলো সুতপা। ড. রায় বললেন।
আমি মিত্রা মাথা নীচু করে। সবাই হাসছে।
আমি নিশ্চিন্ত হলুম, আমার একটা চিন্তা দূর হলো বুঝলে অনিমেষ, কি পাগলামোটাই না করছিল তখন দুজনে। শুভঙ্কর আমার মাথা খেয়ে ফেলে। সুনন্দাকে বলি তুমি অনি এলে চেপে ধরো।
আর বলবেন না স্যার। গত সপ্তাহের কথা একবার ভাবুন। বৌদি বললো।
আর মনে করিয়ে দিও না সুতপা। সেদিনটা বড়ো কষ্ট পেয়েছি।
কি মিনু তুমি যে আমার ছাত্রী, সেটা অনিকে বলেছো?
স্যার বড়োমার দিকে তাকিয়ে বললেন।
না স্যার।
ওকে বলো।
আমি অবাক হয়ে তাকালাম বড়োমার দিকে।
এ কথাটা আগে কোনওদিন জানতাম না। আজ প্রথম শুনলাম।
অনিমেষ।
হ্যাঁ স্যার বলুন।
এবার ওকে তোমরা একটু জব্দ করো।
ওর মাথায় অনেক বড়ো বড়ো বুদ্ধি, বুদ্ধিগুলোকে একটু ঘসে মেজে তোমরা ছোট করে দাও।
বিধানবাবুকে সব কথা বলেছি।
বিধানবাবু আপনার সঙ্গে আলাপ ছিল না। এই মুহূর্তে আলাপ হলো। আপনাকে আর কি বলবো। আমার ছাত্রটিকে একটু দেখুন।
বিধানদা হাসছেন।
যাও আমরা বুড়োরা একটু গল্প করি। তোমরা অতিথিদের দেখ।
আমি মিত্রা ভিড় থেকে বেরিয়ে এলাম। মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে। পরিতৃপ্ত চোখ। ইসি পাশে।
জানিস অনি ড. রায় কোথাও কোনওদিন যান না। ইসি বললো।
জানি।
তোর বিয়েতে এসেছে, আমি ভাবতেই পারছি না।
মিত্রা, অনিমেষদার সঙ্গে ইসিতার আলাপ করিয়ে দিয়েছিস।
দিয়েছেরে দিয়েছে। সত্যি অনি এখন নিজের খুব খারাপ লাগছে। সকালে জেদ ধরে যদি না আসতাম খুব মিস করতাম।
ইসি সকালেও কথাটা একবার তোকে বলেছি, আমার কাছে অতীতটা অতীতই। আমি তার কাছ থেকে শিক্ষা নিই। চলি বর্তমান আর ভবিষ্যত নিয়ে। বরুণদা কোথায়?
কাজ খুঁজছিল, ইসলামদা ওকে অতিথি আপ্যায়ন ঠিক হচ্ছে কিনা তার দায়িত্ব দিয়েছে।
পিকু?
সে কোথায় খেলে বেরাচ্ছে গুবলুর সঙ্গে। তার মহা আনন্দ।
পায়ে পায়ে তিনজনে এগিয়ে এলাম, কনিষ্করা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে। নীরুর পেছনে কিছুটা লাগলাম। নীরুর বৌ হেসে গড়িয়ে পরে।
অনিদা তুমি ওকে নিয়ে যা করো না। নীরুর বৌ বললো।
আর টেলাতে হবে না। তোমরা সব বেইমান, আসার আগে বলেছিলে আমার পাশে থাকবে, এখন অনির দলে ভিড়ে গেছ। নীরুর কথায় সবাই হাসছে।
ওই তো অনিদা।
শুধু এই কথাটা কানে এলো। চোখের পলক পড়তে না পড়তেই দেখলাম একটা মেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে গালে গাল ঘসে দিল। এরপর তিনজন একইভাবে।
পিঙ্কি, চুর্ণী, তিয়া, রিমঝিম।
মিনাক্ষীদেবীকেও দেখলাম। বুঝতে পারলাম নীরুর চোখ কপালে উঠে গেছে। আমি সবার সঙ্গে ওদের আলাপ করিয়ে দিলাম, মিত্রাকে ওরা জড়িয়ে ধরলো। এক একজন যা পোষাক পরেছে। সবাই তাকিয়ে আছে। চিকনা, সঞ্জুর চোখ যেন আগুনে ঝলসে গেছে।
কনিষ্ক আমার দিকে তাকিয়ে।
তোরা একটু দাঁড়া আমি আসছি।
আমি ওদের নিয়ে বড়োমা, ছোটোমাদের কাছে এলাম। আসার সময় নীরুর দিকে তাকিয়ে চোখ মারলাম।
ওদের সবার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলাম। মিনাক্ষীদেবী এদিক ওদিক তাকালেন যেখানে অনিমেষদা, স্যার, দাদারা বসে আছেন সেদিকে চোখ যেতেই বললেন, ড. রায় না।
হ্যাঁ। আপনি চেনেন নাকি?
উনি এগিয়ে গেলেন।
ছোটোমা আমার সঙ্গে এই কচি কচি সখীদের দেখে মুচকি হাসছে।
মিত্রাকে ইশারা করে বললো ওরে ওকে সামলে রাখ। আমি হাসছি।
সুজিতদা এক দৃষ্টে ওদের দেখছে।
মিনাক্ষীদেবী স্যারের কাছে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন।
তুমি কোথা থেকে?
অনি কাল ফোন করেছিল। ও নাকি একটা বিয়ে করেছে।
সবাই হাসছে।
ওরাও চারজনে প্রণাম করলো সকলকে।
মীনাক্ষীদেবী নিজেই পরিচয় করালেন রিমঝিমদের সঙ্গে। ওদের বললেন আমার স্যার।
অনিমেষদা হাসতে হাসতে বললেন তাই বলি, আমাদের সরকার, অথচো আমাদের পার্টি মুখপত্রে কেন বিজ্ঞাপন নেই। সব বিজ্ঞাপন কেন অনির কাগজে।
আমাদের কাগজের সার্কুলেশন বেশি তাই আমরা সরকারি বিজ্ঞাপন বেশি পাব। টিনা, মিলি, অদিতি একযোগে বলে উঠলো।
দেখছেন বিধানবাবু দেখছেন, অনির গ্রুপবাজি।
সবাই হাসছে।
ওরা চারজন মিত্রাকে যেন চেটে খাবে। এমন অবস্থা।
আমি ওদের রেখে আবার কনিষ্কদের কাছে এলাম।
যেতেই চিকনা আর সঞ্জু আমাকে জড়িয়ে ধরে গালে গাল ঘোষলো।
কনিষ্ক হেসে মাঠে গড়িয়ে পরে। নীরু আমার দিকে কট কট করে তাকিয়ে।
কি হলোরে!
আমরা অভাগা, এরকম ছোঁয়া স্বপ্নে দু-একবার পাই। তাই তোর গালে গাল ঘোষলাম। চিকনা বলে উঠলো।
কনিষ্ক তখনও হাসছে।
মিত্রারা কাছে এলো। সবাই তখনও হাসছে।
চিকনা, সঞ্জু গিয়ে মিত্রার হাত ধরলো।
কি হলো চিকনা।
দাঁড়ান ম্যাডাম, একবারে কথা বলবেন না।
বটা, কনিষ্ক, মৈনাক, দেবা হেসেই চলেছে।
কি হলো কনিষ্ক ব্যাপারটা কি! মিত্রা তাকাল কনিষ্কর দিকে।
বুঝতে পারছেন না?
মিত্রা অবাক চোখে তাকিয়ে আছে কনিষ্কর দিকে।
ওই যে চার পিশ আপনাকে আর অনিকে….।
মিত্রা এবার হেসে ফেললো।
অদিতি, ইসিরাও হাসছে।
আমরা চেষ্টা করলেও পাব না ম্যাডাম। তাই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটালাম। চিকনা বললো।
নীরু কিন্তু রাগে ফুঁসছে অনি। কনিষ্ক বললো।
কেন।
তোর বৌ থাকতেও কচি কচি মেয়ে তোর গালে গাল ঘসলো, ওর বৌ থাকতেও পেল না। ও বলছে আজকেই শ্রীপর্ণাকে ডিভোর্স করবে।
আমি হাসছি। অনাদি, বাসুর হাসি থামে না।
ঠিক আছে নীরুকে দুঃখ করতে হবে না।
তুই এককাজ কর অনি, ওদের পেসেন্ট বানিয়ে দে। কনিষ্ক বললো।
কনিষ্ক খুব খারাপ হয়ে যাবে। মিত্রা চেঁচিয়ে উঠলো।
দেখলি অনি। কনিষ্ক বললো।
তুমি বটা একটা একটা করে নিয়ে নাওনা। মিত্রা বললো।
ফিট করে দিন।
মিলি, টিনা আড়চোখে একবার বটা, কনিষ্কর দিকে তাকাল।
তাহলে মৈনাককে বাদ দিলি কেন। আমি বললাম।
ওর চেন খুলে যাবে। মিত্রা এমন ভাবে বললো। আবার সকলে হেসে উঠলো।
দেখলি দেখলি কনিষ্ক, মিত্রা কি থেকে কি বললো।
মৈনাক মিত্রার দিকে তাকিয়ে।
একবার পরিচয় করিয়ে দে। আজই নীরুর পেসেন্ট বানিয়ে দেব।
দে মৈনাক তাই দে আমার আত্মা একটু শান্তি পাক। নীরু বললো।
সবাই হাসছে।
আমি তাহলে অনিদার কাছে চলে যাব। শ্রীপর্ণা বললো।
ম্যাডামকে দেখেছ, ঝেঁটিয়ে বিষ ঝেড়ে দেবে।
মিত্রা, ইসি হাসতে হাসতে দুজনে দুপাশ থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে।
মিলিরা হাসতে হাসতে মাঠে বসে পরেছে।
এ কি মিলি ম্যাডাম এরকম চকমকি পোষাক পরে মাঠে বসলেন। চিকনা এমন ভাবে বললো। আবার হাসি।
অনিদা। মিলি আমার দিকে তাকিয়ে ইশারা করলো।
পেছন ফিরে তাকালাম। ওরা চারজন এদিকে আসছে।
অনিরে তোর পায়ে পরি একটু কথা বলিয়ে দে। চিকনা দাঁতে দাঁত চিপে বললো।
আমি বাদ যাই কেন। নীরু বললো।
তাহলে পেসেন্ট দেব না। মৈনাক বললো।
ঢ্যামনা।
মিত্রা কট কট করে তাকাল, নীরুর দিকে।
ওরা কাছে এলো।
অনিদা তুমি তোমার বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলে না।
তোমাদের সঙ্গে তো আলাপ করিয়ে দিলাম, কথা বলো।
হায় বলে ওরা শুরু করলো। সবার সঙ্গে হাতে হাত মেলালো। আমি লক্ষ্য করছি সবার মুখ। এক একজনের এক একরকম জিওগ্রাফি।
চিকনাকে হায় বলে হাতে হাত রাখতেই চিকনা সিঁটিয়ে গেল। দেঁতো হাসি হেসে বললো, হেয়।
সঞ্জু একবার কট কট করে তাকাল চিকনার দিকে।
মৈনাক ওদের সঙ্গে ইংরাজীতে কথা বলা শুরু করেছে।
কনিষ্ক আমার পাশে এসে দাঁড়াল। আসতে করে বললো। এরা মডেল নাকিরে?
মিত্রা শুনতে পেয়েছে। আমার দিকে তাকাল।
আমি মাথা দোলালাম।
সেই জন্য।
কি সেই জন্য?
সব ট্রান্সপারেন্ট পরেছে।
মিত্রা মুখের কাছে হাত নিয়ে হাসল।
হারামী। লক লক করছে।
আজ মনে হচ্ছে কুমার থেকে লাভ নেই বুঝলি অনি।
মিত্রা, কনিষ্কর দিকে তাকাল।
রিমঝিম আমার দিকে এগিয়ে এলো।
অনিদা, বৌদিকে কিন্তু তোমার থেকেও কিউট লাগছে।
আমার যে আবার বৌদির থেকে তোমাকে বেশি মিষ্টি লাগছে।
দুষ্টু।
মিত্রা, রিমঝিমের কথায় হাঁসবে না কাঁদবে। ওর চোখের ভাষায় তাই বোঝাচ্ছে।
তুমি আমাদের কবে ক্লাস নেবে।
দেখি। একটা সপ্তাহ আমাকে একটু সময় দাও।
তিয়া এগিয়ে এলো। ডাগর চোখে আমার দিকে তাকাল। ওদের পেছনে চিকনা। চিকনা বুকে হাত দিয়ে অভিনয় করছে।
আমার বুক ফেটে গেল রে অনি।
আমি না পারছি হাসতে না পারছি গম্ভীর থাকতে। মৈনাক, দেবা সবাই আমাকে ইসারা করছে ওরে তুই এদের নিয়ে কোথাও যা। মিলি, টিনার চোখের ভাষাও তাই।
আমি বললাম চলো, তোমাদের সঙ্গে একজনের আলাপ করিয়ে দিই, তোমাদেরই ফিল্ডের।
তাই! কি সুইট তুমি অনিদা। চুর্ণী বললো।
চলো সেই ভালো। তোমাকে তো কিছুক্ষণ একা পাওয়া যাবে।
আমি সুজিতদাকে খুঁজে বার করলাম। সুজিতদা দেখেই হেসে ফেললো।
জোগাড় করে ফেলেছিস।
হ্যাঁ। তোমার পছন্দ।
পছন্দ মানে। তোকে একা পেলেই কথা বলবো ভেবেছিলাম।
কথা বলো সবার সঙ্গে। তোমার ভিজিটিং কার্ড দেবে। তারপর তোমার সঙ্গে আমি আলাদা করে কথা বলে নেব। সকলকে নিয়ে আমার আলাদা আলাদা পরিকল্পনা আছে।
ওদের দিকে তাকালাম। সুজিতদার পরিচয় দিলাম।
ওরা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে।
আমি বললাম, আমি ওদের একটু সময় দিই, তোমরা কথা বলো।
কথা বলেই তোমার কাছে যাচ্ছি।
আচ্ছা এসো।
আমি আবার ফিরে এলাম।
আসার সঙ্গে সঙ্গে চিকনা সাষ্টাঙ্গে মাঠে শুয়ে আমাকে প্রণাম করলো। তারপর উঠে পাঞ্জাবীটা ঝেড়ে নিল।
এটা কি হলো চিকনা। কনিষ্ক বললো।
গুরু প্রণাম। যদি প্রসাদ পাওয়া যায়।
মিত্রা বড়ো বড়ো চেখ করে কনিষ্কর দিকে তাকাচ্ছে।
তোকে কি সুন্দর দুষ্টু বললো, আমাকে বলেনা কেন অনি।
চিকনার কথায় ওরা হেসে গড়িয়ে পরে।
তুই এগুলোকে কোথা থেকে জোগাড় করেছিস বলতো। মিত্রা বললো।
ওই যে মীনাক্ষী ম্যাডামকে দেখলি, সেইদিন টিনাদের পাঠিয়েছিলাম।
হ্যাঁ।
রিমঝিম ওনার মেয়ে, আর একটা ঝিমলি ভাইজ্যাকে আছে। আর তিনটে রিমঝিমের বন্ধু।
ওরে বাবা তুই তো অনেক হিসেব নিকেষ করে জাল ফেলেছিস। কনিষ্ক বললো।
কনিষ্কের কথায় ওরা হাসছে।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে। চিকনা আমার হাতটা শুঁকে মিত্রার দিকে তাকাল।
একবার হাতটা শুঁকুন ম্যাডাম ওই মেয়েটার গন্ধ এখনও পাবেন।
মিত্রা হাসছে, ইসিও হেসে গড়িয়ে পরে।
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো। পকেট থেকে বার করলাম।
ওদের ইসারায় বললাম এক মিনিট। একটু দূরে চলে গেলাম।
হ্যালো।
ঠাট হিন্দিতে ভেসে এলো কঠিন কন্ঠস্বর, (শালে রেন্ডি কা আওলাদ, সাধি কারকে মস্তিমে হ্যায়, সুবে তেরে কো ঠোক দেঙ্গে) শালা বেজন্মার বাচ্চা, বিয়ে করে খুব মজমা নিচ্ছ। কালকেই তোমার ভবলীলা সাঙ্গ করবো।
আমাকে কথা বলার কোনও সুযোগই দিল না। লাইনটা কেটে গেল।
মুখটা কঠিন হয়ে গেল। এই ভাবে আমাকে এখনও পর্যন্ত কেউ কোনওদিন বলে নি। ভাবলাম একবার রিং ব্যাক করি। নিজেকে নিজে সামলালাম। না ঠিক হবে না। কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। এই সময় মোটেই মাথা গরম করা চলবে না। সব পণ্ড হয়ে যাবে। স্রেফ অভিনয় করে যেতে হবে। কিন্তু সুযোগ হাতছাড়া করলে চলবে না। পাখি একবার হাত থেকে উড়েগেলে বিপদ। হতে পারে কিছুই হবে না। তবু আমাকে এখন অনেক অঙ্ক কষে চলতে হবে। ফিরে দাঁড়ালাম। হাসি হাসি মুখ করে বললাম, তোরা একটু দাঁড়া আমি আসছি।
তুই কোথায় যাচ্ছিস? মিত্রা কাছে এগিয়ে এলো। সরাসরি আমার চোখে চোখ রেখেছে।
একটু আসছি।
কে ফোন করেছিল?
ওর চোখে গভীর জিজ্ঞাসা।
চিনবি না, বাইরের লোক।
তাহলে তুই ওইদিকে যাচ্ছিস?
পাঁচ মিনিট, এখুনি চলে আসব।
আমাকে বলবি না।
বলার হলে বলে দিতাম।
আমি দাঁড়ালাম না। মনে হয় অভিনয়টা ঠিক হলো না। ধরা পড়ে গেলাম। কারুর প্রতি দুর্বলতা জন্মালে সব কিছু গোপন করা যায় না।
সোজা চলে এলাম রতনের কাছে। ইশারায় ওকে কাছে ডেকে নিলাম।
কি হয়েছে অনিদা! কোনও গড়বড় ?
না। সেরকম কিছু না।
তাহলে! তোমাকে হঠাৎ কেমন ফিউজ দেখাচ্ছে।
তুই এই নম্বরে একটা ফোন কর।
কি হয়েছে আগে বলো।
এই নম্বর থেকে এখুনি একটা ফোন এলো।
কি বলেছে বলো।
কি বলতে পারে, বুঝতে পারছিস না।
শুয়োরের বাচ্চা। দাও নম্বরটা।
আমি মোবাইল দেখে ওকে নম্বরটা বললাম।
গলা নামিয়ে বললাম, চেঁচামিচি করিস না। বাড়ি ভর্তি লোক।
ও নম্বরটা ডায়াল করতেই ওর মোবাইলে একটা নাম ভেসে এলো।
এ তো আজিজের এসটিডি বুথের নম্বর। কাশীপুরে থাকে।
জিজ্ঞাসা কর পাঁচ মিনিটের মধ্যে কারা এই নম্বর থেকে ফোন করেছে। ভয়েজ অন কর। মাথা গরম করবি না, খুব আসতে কথা বলবি।
হ্যালো।
আজিজ।
হ্যাঁ।
রতনদা বলছি।
বলো গুরু।
তোর ওখানে এখুনি কে এসেছিল?
কেউ না।
শুয়োর, সত্যি কথা বল?
খুব চেঁচা মিচি হচ্ছে গুরু, কিছু শুনতে পাচ্ছি না।
চল ওইখানে যাই। আমি বললাম।
দুজনে বাগানের শেষপ্রান্তে চলে এলাম। দেখলাম আবিদ, নেপলা পেছন পেছন এসে হাজির।
কি হয়েছে রতনদা! আবিদ বললো।
দুজনেরি চোখের রং মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেছে।
মনে মনে বললাম, এরা গন্ধও পায়।
দাঁড়া একটু।
বল আজিজ কে এসেছিল তোর এসটিডি বুথে।
কেউ না।
এখুনি কে এসে ফোন করছিল তোর এসটিডি বুথ থেকে।
দু-জন এসেছিল। চলে গেল।
তুই চিনিস।
না।
সত্যি কথা বল?
তুমি বিশ্বাস করো।
তুই আমাকে দে রতনদা। তোর দ্বারা হবেনা।
আবিদ ফোনটা কেরে নিল রতনের হাত থেকে। প্রথমেই মা, মাসি উদ্ধার করে দিল। এবার বল আজিজ। আমি আবিদ।
তুই বিশ্বাস কর আবিদ। আমি চিনি না।
ঝাঁপ বন্ধ করে এখুনি তুই ওদের পাত্তা লাগা, আমি যাচ্ছি।
ওরা পাশের একটা রেস্ট হাউসে আছে। কাশীপুর গানসেল ফ্যাক্টারির সামনে।
নজর রাখ। কজন এসেছিল?
দু-জন। গুরু সেরকম কিছু। মাল পত্র সব বার করবো?
ওরা যখন ফোন করে, কিছু শুনিস নি।
বললো কাল কাকে ওরাবে।
কোন নম্বরে ফোন করেছিল?
দাঁড়া দেখে বলছি।
আজিজ নম্বরটা বললো।
আমার মোবাইলেরই নম্বরটা বললো।
ওরে খান…. ছেলে। তুই এখুনি মালপত্র বার কর। আমি যাচ্ছি। পাখী যেন উড়ে না যায়। তাহলে তোকে ঝেড়ে দেব।
আমি কি করলাম!
কাঁচা কাঁচা খিস্তি, কি করলি। যা বলছি কর।
এখুনি ঝাঁপ বন্ধ করছি।
পেছন ঘুরে দেখলাম চিকনা পাশে দাঁড়িয়ে। ওর চোখ মুখের চেহারা বদলে গেছে।
আবিদ ওগুলোকে যে কোন প্রকারে গ্যারেজ কর। মনে হচ্ছে এখনও কিছু বাকি আছে। কথা শুনে মনে হলো ইউপির লোক। মন বলছে রাজনাথের চেলুয়া, ইউপি থেকে এসেছে।
সেরকম বুঝলে উড়িয়ে দেব।
ঘাউড়ামি করবি না।
আবিদ মাথা নীচু করলো।
ওমপ্রকাশ কোথায়?
ও বাড়িতে আছে।
আর কে আছে।
আরও লোক আছে, তোমাকে ভাবতে হবে না।
ওমপ্রকাশকে আগে ওখানে পাঠিয়ে দে। তোর যেতে যেতে ওম পৌঁছে যাবে। ওই বাড়ি থেকে স্পটটা কাছে। অনিমেষদাকে এখন কিছু জানান যাবে না।
তুমি পাগল হয়েছো।
ইসলামভাই কোথায়?
ওখানে আছে।
রতন বাইরেটা ভালো করে দেখে নে একবার। নেপলা ভেতরে থাকুক।
বাইরে সব লোক আছে, এই বাড়ি নিয়ে তোমাকে একটুও ভাবতে হবে না। তাছাড়া থানা থেকেও লোক এসেছে।
আচ্ছা।
যা বেড়িয়ে যা, আমাকে একটা ফোন করবি।
আচ্ছা।
আমি যাব আবিদ। চিকনা বললো।
না দাদা এইকাজ তোমার নয়। দাদাকে দেখছ না। কতো কুল।
আবিদ বেরিয়ে গেল।
নেপলা একটা ঠান্ডা আনতো।
নেপলা দৌড় লাগাল। ওখানে গিয়ে কিছু বলিস না যেন।
তুমি পাগল পেয়েছো আমাকে।
চিকনা একটা সিগারেট দে। সাগির, অবতার কোথায়?
দাদার কাছে। ব্যাটারা পুরো চেঞ্জ।
হাসলাম।
ঠিক হয়ে যাবে দেখিস রতন। একটা ধাক্কা ওদের দরকার ছিল।
নেপলা একটা ঠান্ডার বোতল নিয়ে এলো। আলগোছে কিছুটা ঢক ঢক করে খেলাম। তারপর রতনের হাতে দিলাম। ওরা তিনজন ভাগাভাগি করে খেল।
তোমাকে কি বললো? রতন বললো।
কয়েকটা খারাপ কথা বললো।
ঠিক আছে তুমি যাও। তোমার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলো। দাদা নাহলে সন্দেহ করবে। চোখ তো নয় চারদিকে বনবন করে ঘুরছে।
হেসে ফেললাম।
পায়ে পায়ে আবার ওদের কাছে চলে এলাম। তাল কেটেছে বুঝতে পারছি, তবু হাসি মস্করা চালিয়ে গেলাম।
মিত্রা একদৃষ্টে আমাকে দেখে যাচ্ছে।
দেখলাম গেট দিয়ে নিরঞ্জনদা, অনুপদা, রূপায়ণদা ঢুকলো।
আমি এগিয়ে গেলাম। মিত্রা আমার পেছন পেছন। কাছে গিয়ে সবাইকে প্রণাম করলাম।
বাবাঃ অনিবাবুকে আজ চেনাই যাচ্ছেনা তাই না অনুপ। রূপায়ণদা বললেন।
বিয়ে বলে কথা।
যাঃ বিয়ে হয়ে গেছে। নিরঞ্জনদা বললো।
আমি হাসছি।
কি ম্যাডাম, এখন নো টেনসন, ডু ফুর্তি। অনুপদা বললো।
মিত্রা হাসলো।
আমি ওদের সঙ্গে করে অনিমেষদাদের কাছে এলাম। তারপর ঘুরে ঘুরে যারা যারা খাচ্ছেন তাদের কাছে গেলাম। কুশল বিনিময় করলাম। ওরা সবাই পাশে আছে। নীপা, সুরোকে দেখলাম রিমঝিমদের সঙ্গে বেশ জমিয়ে গল্প করছে। আমায় দেখে হাত নারলো। আমিও হাত নারলাম। আমি একটু এগিয়ে গেছি। পেছনে মিত্রা, চিকনা কথা বলছে। বুঝলাম মিত্রা চিকনাকে চেপে ধরেছে। চিকনা হাসছে। মিত্রার সঙ্গে ফাজলাম করছে।
ড. রায় চলে গেলেন রিমঝিমরাও চলে গেল। আসতে আসতে মিত্রার ক্লাবের বন্ধুরাও চলে গেল। যাওয়ার সময় হেসে বললো, আপনার সঙ্গে ঠিক ভাবে কথা বলা হলো না। তবে আপনার বন্ধুরা ভীষণ লাইভ।
হাসলাম।
একদিন ক্লাবে আসুন না।
মিত্রা মুখ বেঁকিয়ে বললো। ক্লাবে! হয়েছে তাহলে।
একজন বললো, কি আপনি যাবেন না?
আমি কোনওদিন যাই নি আপনাদের ক্লাবে। মিত্রা নিয়ে গেলেই যাব।
যাস নি মানে! তাহলে আমাদের ক্লাবের এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ম্যানেজার তোর কে হয় ?
ঠিক আছে ঠিক আছে, আগামী সপ্তাহে অনিন্দিতার বার্থডে, তুই ওনাকে নিয়ে আয়।
গেলেই নিয়ে যাব।
আমি হাসলাম। সময় পেলে অবশ্যই যাব।
গেট পর্যন্ত আমি মিত্রা এগিয়ে দিলাম।
ওরা চলে গেল। দেখি একটা ট্যাক্সি থেকে হিমাংশু, রেবা নামলো।
ওদরকে ভতরে নিয়ে এলাম। কনিষ্কদের সঙ্গে জমে গেল।
মনটা ঠিক নেই, কথাটা মনে পড়ে গেলেই মনটা কেমন খচ খচ করছে।
একে একে নিমন্ত্রিত যারা ছিল সবাই কম বেশি চলে গেল। এখনও কিছু আছে। তারা অফিসের লোকজন। দাদা যে এতো জনকে বলবে আশা করিনি। কাকা, কাকীমা, সুরোমাসি খেয়ে নিয়েছে। ওরা এই রান্না খাবে না, তার জন্য সুরোমাসি আলাদা রান্না করছে, ওরা তাই খেয়েছে। ওরা ডাক্তারদাদার বাড়িতে শুতে গেল। নীপা সব দেখিয়ে দিয়ে এলো। আমি রান্নার জায়গায় এলাম। ইসলামভাই-এগিয়ে এলো।
দারুন সার্ভিস দিলে।
জীবনে প্রথম, বিশ্বাস কর। ভয় করছিল।
কেন।
যে সে লোকের বিয়ে নয়। অনির বিয়ে বলে কথা। গেস্ট কারা দেখতে হবে।
এই আবার শুরু করলে।
কিরে মামনি, আমি ভুল কথা বলেছি।
একেবারে না। আমরা সব চুনপুঁটি। ও বাবু বলে কথা।
ইসি হাসছে।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম। মাথায় রাখিস কথাটা।
তুই একটুতেই কেমন আজ রাগ করছিস। এরকম তো ছিলি না। তোর কিছু হয়েছে?
ওর চোখের দিকে তাকালাম। মিত্রা এখন অনেক বেশি পরিণত। হয় তো ছিল। আমাকে এতদিন বুঝে নিল। এবার খোলস থেকে নিজেকে আসতে আসতে বার করছে।
দেখো ইসলামভাই আমার দিকে কেমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন আজ প্রথম দেখছে।
ঠিকই তো। তোকে আজ ও প্রথম দেখছে। ইসলামভাই হাসছে।
আমি হাসলাম।
পকেটে মোবাইলাটা ভাইব্রেট করছে। রিং অফ করে ভাইব্রেসন মুডে দিয়ে রেখেছি। বুঝছি কেউ ফোন করছে। বার করতে পারছি না। মিত্রা ধরে ফেলবে। এদিক ওদিক তাকালাম রতন ধারে কাছে নেই।
তোমার মামনিকে একটা ঠ্যাং এনে দাও বসে বসে চিবোক।
তুই কোথায় যাবি?
বাবু বলে কথা, নিমন্ত্রিতদের দেখা শোনা করতে হবে না? অতিথি আপ্যায়ণ ঠিক মতো হচ্ছে কিনা, কার কিছু অসুবিধে হচ্ছে কিনা….।
মিত্রা হেসে ফেললো। আমাকে জড়িয়ে ধরে গাল ফুলিয়ে বললো, কি রাগ তোর।
দেখলে ইসলামভাই, কোথায় রাগ করলাম বলো।
ইসলামভাই হাসছে।
সাগির দুটো প্লেটে করে মুরগীর ঠ্যাং এনে দিল। সবাই একটা একটা করে তুলে নিল। আমিও একটা তুলে নিয়ে হাঁটা দিলাম। ওরা সবাই ওখানে দাঁড়িয়ে রইল। মিত্রা একবার আমাকে আড়চোখে দেখলো। সোজা গেটের বাইরে চলে এলাম। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলাম কেউ দেখছে কিনা। আমি মিত্রার চোখের আড়ালে চলে এসেছি। ঠ্যাং খাওয়া মাথায়। ফোনটা পকেট থেকে বার করে দেখলাম আবিদের ফোন। রিং ব্যাক করলাম।
আবিদ ধরলো।
বল।
আমি আসার আগেই ওম গ্যারেজ করে দিয়েছে।
ক-জন ছিল?
চারজন ছিল।
আজিজ কোথায়?
আমার পাশে।
ও আমাকে চেনে?
না। তোমার নাম শুনেছে। ও তোমার নম্বর জানলে ওখানেই পুঁতে দিত।
এখন কোথায়?
আজিজের ডেরায়।
ওখানে রাখিস না। তুলে এনে তোদের ডেরায় ঢুকিয়ে দে।
ঠিক আছে।
কি বুঝলি কথা বলে?
শেয়ানা ছেলে বলে মনে হচ্ছে। সঙ্গে কোনও মালপত্র নেই।
তাহলে!
এদের মধ্যে একজন বলছে রাজনাথের ভাইপো।
আমার নম্বর পেল কি করে?
প্রবীরদা এসেছিল বিকেলে। ওরা তাই বলছে।
প্রবীরদা!
হ্যাঁ।
শোন তুই এখুনি চলে আয় ওদের রেখে। তুই এলে খেতে বসবো। চারদিকটা বেঁধে আসিস।
আচ্ছা।
সঙ্গে সঙ্গে তিনটে ফোন করলাম। অরিত্র, অর্ককে ম্যাসেজ করে বললাম সজাগ থাকবি।
ভেতরে চলে এলাম। দেখলাম মিত্রা গেটের মুখে একলা। আমাকে দেখেই এগিয়ে এলো।
প্লিজ বুবুন তুই বল কি হয়েছে। ফোনটা আসার পর থেকে দেখছি তুই তোর মধ্যে নেই। আজ এই আনন্দের দিনে কেন তুই ঝামেলা করছিস। আমার একটুও ভালো লাগছে না।
তোর কি আমাকে দেখে তাই মনে হচ্ছে!
তাহলে তুই আমাকে লুকচ্ছিস কেন?
আমি ওর দিকে তাকিয়ে।
চিকনা সব শুনেছে। ওকে জিজ্ঞাসা করলেই পিছলে বেরিয়ে যাচ্ছে। কি সব বিচ্চু তৈরি করেছিস সকলকে। আমি ইসলামভাইকে গিয়ে এখুনি বলবো।
কি হবে। একটা ক্যাওশ হবে, তুই সেটা চাস।
তাহলে বলছিস না কেন?
সারারাত পরে আছে। আমি কি পালিয়ে যাচ্ছি।
কোনও খারপ খবর?
ভালো খবর থাকলে আমাকে উতলা দেখায়।
গলা নামিয়ে বললাম।
একমাত্র তুই ধরতে পেরেছিস। আর কেউ ধরতে পারে নি।
কনিষ্ক কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছে।
ও বহুত শেয়ানা ছেলে।
শেয়ানা মানে। আমি এতদিন তোর পাশে শুয়ে যা বুঝতে পারি না ও বুঝে যায়।
মিত্রার গালটা ধরে একটু নেড়ে দিলাম।
এই যে স্যার আমরা এসে গেছি।
পেছন ফিরে তাকালাম। দেখলাম মিঃ মুখার্জী তার গ্যাং গেটের মুখে।
পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। মিত্রা আমার পিছনে। মিঃ মুখার্জী হাত বাড়িয়ে দিলেন।
আমিও হাত বাড়িয়ে দিলাম। মিত্রা বুকের ওপর হাত তুলেছে।
ওদের দেখতে পেয়ে অর্ক, অরিত্ররা ছুটে এলো। আমার দিকে তাকিয়ে একবার সিগন্যাল করলো পেয়েছি।
কি অর্ক বাবু? বসের বিয়ে খাচ্ছ?
মিঃ মুখার্জির কথায় অর্ক মুচকি হাসলো।
নায়েক।
হ্যাঁ, স্যার।
সেদিনের মূল সোর্স।
এই বাচ্চাটা।
এরা বাচ্চা নয়, অনিদার পাল্লায় পড়ে এরা এক একটা চৌবাচ্চা।
নায়েক এগিয়ে এসে আমার হাতে হাত রাখলো।
সত্যি অনিদা।
মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম, কনিষ্কদের একবার ডাক।
আবার হই হই শুরু হয়ে গেল। সবাই আজ সাধারণ পোষাকে। কিন্তু দেখেই বোঝা যাচ্ছে প্রত্যেকের কোমড়ে সাঁটান আছে, দলে প্রায় পনেরো জন। প্রত্যেকেই মুখার্জির দৌলতে আমাকে কম বেশি চেনে।
আমাদের হই হই শুনে বিধানদা, অনিমেষদা, অনুপদা, রূপায়ণদা বাইরে বেরিয়ে এলেন। আমি সকলের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলাম। সকলের সঙ্গে কুশল বিনিময় হলো।
ওরা চারটে বড়ো বড়ো ফুলের বুকে নিয়ে এসেছে। আর একটা ব্যাগ। একে একে সবাই কাছে এসে দাঁড়াল। সবাই এখন বাগানে। আমি আলাপ করিয়ে দিলাম মিত্রার সঙ্গে। ওরা ফুলের বুকেগুলো মিত্রার হাতে দিল। ব্যাগটা আমার হাতে দিল।
এটা কি মুখার্জীবাবু?
আপনার এনজিওর জন্য আগাম ডোনেশন। আমার ছেলেপুলেদের আপনার এনজিওর ব্যাপারে সব বলেছি, ওরা বলেছে অনিবাবু ভালো কাজ করছেন, আমাদের যদি সাহায্য লাগে আমরা সাহায্য করবো। পারলে সপ্তাহে একদিন ফ্রি সার্ভিস দেব।
অনুপ, মুখার্জীবাবুর কথা শুনলে। ডোনেশন চলে এলো। তোমার বাড়ি এখনও ঠিক হলো না। অনিমেষদা বললেন।
হয়ে গেছে। ঝামেলাটা শেষ হলেই অনিকে নিয়ে যাব। দামিনীমাসিকে দেখিয়েছি। ওনার পছন্দ।
তাহলে আমার দেখার কি আছে। কাজ তো ওরা করবে। আমি শুধু জোগাড় যন্ত্র করে দেব। আমি বললাম।
সে বললে হয় বাবা, শুধু গা বাঁচিয়ে চললে হবে। অনিমেষদা বললো।
একচোট হাসা হাসি হলো।
মুখার্জীবাবু তার দল বল অনুরোধ করলো দামিনীমাসিকে দেখবে, কথা বলবে। ওদের অনুরোধ রাখলাম। মিত্রা সমস্ত ব্যাপারটা সামলালো।
সন্দীপ এলো ওর বউকে নিয়ে, সে তো মিত্রার সামনে কিছুতেই দাঁড়িয়ে কথা বলবে না। মিত্রা আমার স্ত্রী নয় ওর মালকিন। শেষমেষ দাদা এসে রফা করলো।
বেশ হাসা হাসি হলো।
ওরা সবাই বেশ হই হই করে তৃপ্তি সহকারে খাওয়া দাওয়া করলেন। তারপর একে একে সবাই বিদায় নিলেন। আমি মিত্রা মাঝে মাঝে গেট পর্যন্ত যাই আর এগিয়ে দিই।
এখন লনটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা। চারিদিকে আলোর রোশনাই। বসার ঘরে এলাম।
সবাই গা এলিয়ে দিয়েছে। বৌদি, অনিমেষদা পাশাপাশি বসে গল্প করছে।
আর একদিকে বিধানদা, অনুপদা, রূপায়ণদা, নিরঞ্জনদা।
এই যে ড্যাবা-ডেবী, বাইরের দিকে কোথায় যাওয়া হয়েছিল? অনিমেষদা বললেন।
আমি হাসলাম।
অনিমেষদা হাসছে।
ফটোটা দেখেছিস।
দারুণ গিফ্ট। আমার জীবনের সেরা।
আমি গিয়ে অনিমেষদা, বৌদির মাঝখানে বসলাম।
দেখলে দেখলে ছেলের কাণ্ড। উনি আর কোথাও জায়গা পেলেন না। বৌদি বলে উঠলো।
তোমরা তো কিছু খাও নি। খিদে পায় নি?
বুঝেছি তোর খিদে লেগেছে। ও ছোটো দেখ তোর ছেলে কি বলে। বৌদি চেঁচিয়ে উঠলো।
মিত্রা খিল খিল করে হেসে উঠলো।
ছোটোমা রান্নাঘর থেকে একবার মুখ বার করলো।
দেখ বেচারার মুখটা খিদেয় একেবারে আমসি হয়ে গেছে।
অনিমেষদার দিকে তাকালাম।
ব্যাগটা নিয়ে গেছিলে সেদিন।
ঠিক মনে করিয়েছিস। তুই কতো দিয়েছিলি?
জানিনা। মিত্রাকে বলেছিলাম, তোমাকে ব্যাগটা দিতে।
গুনিস নি।
না।
অনেক বেশি ছিল।
ফেরত দাও।
দিয়ে গেছি, তোকে মিত্রা বলে নি?
মিত্রা আমাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।
কিরে তুই বলিস নি? অনিমেষদা বললো।
তুই সব বলিস।
দেখলে দেখলে বৌদি।
বেশ করেছে, তোর বেশি আছে একটু যাওয়া ভাল।
না গো কাজের জন্য সুজিতদা ওটা দিয়েছে।
মিত্রা হাসছে।
আমি ওকে বলেছিলাম, অনিমেষদারটা দিয়ে বাকিটা তুই রেখে দিস।
দেখলাম অনুপদার ফোনটা বেজে উঠলো অনুপদা উঠে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো। তারপর বিধানদাকে বাইরে ডেকে নিল। মুখটা গম্ভীর।
ছোটোমা একটা প্লেটে করে মিষ্টি নিয়ে এসে আমার মুখে একটা দিল একটা মিত্রার মুখে দিল।
এখন মিষ্টি খাওয়াচ্ছিস খেতে দিবি না? বৌদি বললো।
তুমি একটা খাও।
বৌদি হাঁ করলো। ছোটোমা মুখে দিয়ে দিল।
দাদা আপনি একটা তুলে নিন।
নাগো অনেক মিষ্টি খেয়ে ফেলেছি, আর না।
ছোটোমা নিরঞ্জনদাকে দিল, রূপায়নদাকে দিল।
ছোটোমা অনিমেষদার দিকে তাকাল।
দাদা, বিধানদা, অনুপ গেলো কোথায়?
বাইরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছে।
ছোটোমা বাইরে গেল। ঘরে ঢুকে বললো, দাদা আপনাকে বিধানদা একবার ডাকছেন।
অনিমেষদা উঠে চলে গেল।
মিত্রা ঝুপ করে বৌদির পাশে এসে বসলো।
বৌদি হাসছে। তুই এতক্ষণ সুযোগ খুঁজছিলি না।
মিত্রা মাথা দোলাল।
মিত্রা কনিষ্কদের দেখতে পাচ্ছি না। আমি বললাম।
তোর ঘরে জোড় আড্ডা চলছে। সুরো দু-বার এসে বলে গেছে, কনিষ্কদা অনিদার গল্প বলছে, শুনবে যদি চলে এসো। বৌদি বললো।
কনিষ্কটা কি পাগল বলো। আমি বললাম।
কনিষ্ক পাগল না তুই পাগল। ওদের পাগল বানাল কে?
বাবাঃ তুমি যে ছক্কা হাঁকিয়ে দিলে।
হাঁকাব না।
বিধানদা, অনিমেষদা, অনুপদা ভাবলেশহীন মুখে ঘরে ঢুকলেন।
ওরা অপরজিট সোফায় বসলেন।
তিনজনেই নীচু স্বরে কথা বলছে। আমাকে আড়চোখে দেখছে। আমি বৌদির সঙ্গে গল্প করছি।
ডাক্তারদাদা ঘরে ঢুকলো, চেঁচিয়ে বললো অনিমেষবাবু খাওয়া দাওয়া হবে না। বেশ রাত হয়ছে।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। দাঁড়াও দেখে আসি বাইরে না ভেতরে কোথায় ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আজ ভেতরে খাব না। সকলে মিলে একসঙ্গে বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খাব। ডাক্তারদাদা বললো।
বড়োমার ঘরে একবার উঁকি মারলাম। দেখলাম বেশ জমিয়ে গল্প হচ্ছে। আমাকে দেখে বড়োমা বললো, আয় ভেতরে আয়।
ডাক্তারদাদার খিদে লেগেছে।
মরন, সন্ধ্যে থেকে এটা নয় সেটা শুধু খেয়ে যাচ্ছে, কোন পেটে খিদে লাগে শুনি।
কথা বলতে বলতে বড়োমা খাট থেকে নেমে এলো। কাছে এসে বললো।
ডাক্তার কোথায়।
ডাক্তারদাদা সামনেই ছিল।
আমি এখানে।
তোমার নাকি খিদে লেগেছে।
সবাই হেসে ফেললো।
তুমি কোন পেটে খাবে বলো। সন্ধ্যে থেকে তো মুখ থেমে নেই।
ওগুলো টুক টাক এবার পেট ভর্তি করে খেতে হবে।
বড়োমা, ডাক্তারদাদার কথায় বিধানদা, অনিমেষদা হাসছে।
ও ছোটো, এখানে ব্যবস্থা করবি, না বাইরে খাবি।
আজ ঘরে খাব না। বাইরে খাব। ডাক্তারদাদা বললো।
দেখ কাণ্ড, বুড়ো হয়েছো এখনও সখ যায় নি।
ইসলামভাই গেটের মুখে এসে দাঁড়াল।
কিগো তোমার সব ব্যবস্থা হয়েছে। ডাক্তারদাদা বললো।
আমি সেই জন্য এলাম এখানে না বাগানে।
বাগানে ব্যবস্থা করো। ডাক্তারদাদা বললো।
বড়োমার ঘর থেকে সবাই বেরিয়ে এসেছে। দামিনীমাসিকে আজ ভীষণ ভালো লাগছে। দেখে কেউ বলবে না দামিনীমাসি ওই পাড়ার মেয়ে। আমি কাছে গিয়ে আসতে করে বললাম, খুশি।
মাসি পরিতৃপ্ত চোখে আমার গালে হাত বুলিয়ে দিল।
আমি ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলাম। দেখলাম বারান্দার এক কোনে রতন, আবিদ, নেপলা দাঁড়িয়ে। ইসারায় বললাম এখন কোনও কথা বলিস না।
নেপলাকে বললাম যা আমার ঘর থেকে সবাইকে ডেকে আন।
নেপলা চলেগেল। আমি মাঠে নেমে এলাম।
একে একে সব বাগানে আসছে। তিনটে টেবিল পাতা হয়েছে।
যার যেরকম প্রয়োজন, দাঁড়িয়েও খেতে পারে আবার বসেও খেতে পারে। সার্ভিসের ছেলেগুলো আমাকে দেখে হাসলো।
অনিদা এতদিন আপনার নাম শুনেছি, দেখার সৌভাগ্য হয়নি। আজ দেখলাম।
আমি হাসলাম।
সুরো ছুটতে ছুটতে এলো।
অনিদা অনিদা আজ আমি তোমার পাশে বসবো।
কোনও বসা বসির সিন নেই, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাড় চিবোবি।
ওরা সবাই টেবিলের কাছে এসে পরেছে, হাসছে।
বুফে।
হ্যাঁ।
কি মজা নিজে নিজে নিয়ে খেতে হবে।
পারলে নিবি নাহলে ওরা দিয়ে দেবে।
ওর দিকে একবার ভালো করে তাকালাম।
একটু আগে খোঁপা বাধাঁ ছিল এখন খোঁপা খুলে এলো চুল। ওকে বললাম।
কি রে!
এই নিয়ে ফোর্থ টাইম ড্রেস চেঞ্জ হলো।
সুরো হাসছে।
একরাতে চারবার ড্রেস চেঞ্জ!
হ্যাঁ। একটা বড়োমা, একটা ছোটোমা একটা ইসলামভাই, একটা মাসি। তুমি তো কিছু দিলে না।
ওরা হাসছে। হাসির চোটে ইসির শরীর কাঁপছে।
আমি দিলাম না মানে!
মিত্রাকে দেখিয়ে বললাম।
এরকম একটা জলজ্যান্ত বৌদি দিলাম তোকে। তুই বললি সেদিন, অনিদার বিয়েতে সাজবো। তাই বাধ্য হয়ে বিয়ে করলাম, আর তুই বলছিস কিছু দিলাম না! নেমকহারাম, মনে রাখিস নোট পাবি না।
চাই না। বৌদি দিয়ে দিয়েছে।
তারমানে!
তুমি তখন নিচে ছিলে, আলমাড়ি থেকে বার করে তোমার সব খাতা দিয়ে দিয়েছে।
অনিমেষদা, বিধানদা পর্যন্ত সুরোর কথায় হাসছে।
তোকে ওইই জব্দ করতে পারবে। অনিমেষদা বললো।
ইসি এগিয়ে এসে বললো, তোর ওপর ওর কি জোর।
ওকে যখন প্রথম দেখি তখন ওর দশ বছর বয়স, এখন ও লেডি, আমার সব অলিগলি ওর ঘোরা হয়ে গেছে।
সুরো লাফাতে লাফাতে চলেগেল। ইসলামভাই-এর ওখানে গিয়ে হল্লা শুরু করে দিল। নীপাও ওর পেছনে। বড়োমা, ছোটোমা, বৌদি জ্যেঠিমনি কথা বলছে।
পিকু কোথায় ইসি?
বড়োমার খাটে ঘুম দিচ্ছে।
বেচারার আজ খুব পরিশ্রম হয়ে গেছে।
পরিশ্রম মানে। সুরো চারটে চেঞ্জ করেছে ও সাতটা।
হাসলাম।
খাবার এলো।
ছেলেগুলো সব ঝপাঝপ দিচ্ছে। খাওয়া শুরু হয়েছে। হাসি মস্করা চলছেই। কনিষ্ক, বটা, নীরুর পেছনে কন্টিনিউ লেগে রয়েছে। শ্রীপর্ণা হেসেই চলেছে। ওদিকে সঞ্জু, চিকনার ডুয়েট চলছে। আমরা সবাই গোল করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খাচ্ছি। অনিমেষদা খেতে খেতে বললো।
অনি তোকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো?
অনিমেষদার দিকে তাকালাম।
আমি জানি তুই কোনও ভনিতা পছন্দ করিস না। কাজের ব্যাপারে তুই ভীষণ রাফ এবং টাফ।
মিত্রা আমার দিকে তাকাল। চোখে জিজ্ঞাসা সবাই আমাকে দেখছে।
অনিমেষদার কথা বলার ভঙ্গিতে দাদা কিছু আঁচ করতে পারল।
কেন অনিমেষ ও কি আবার কোনও গণ্ডগোল পাকিয়েছে।
সেরকম কিছু নয়। আবার বলতে পারেন একটু পাকিয়েছে।
কিরে অনি ঠিক বলছি?
অনিমেষদা আমার দিকে তাকাল।
আমি কি করে বলবো। তুমি বললে কিছু একটা জিজ্ঞাসা করবে। এখনও করলে না।
সরাসরি অনিমেষদার চোখে চোখ রাখলাম।
আগে তোমার প্রশ্নটা কি বলো তারপর উত্তর দেব।
আমি কি বলতে চাই তুই বুঝতে পেরেছিস। আমি বড়দি, ছোটো, দাদা, মল্লিক, ডাক্তারবাবু, তোর বৌদি আমরা যারা এখানে আছি তাদের সবার হয়ে তোকে রিকোয়েস্ট করছি ওদের ছেড়ে দে। একটা ভুল করে ফেলেছে। এবারটার মতো মাফ করে দে। ওরা আর এ ভুল করবে না। আমি বিধানবাবু যা বলার বলে দিয়েছি।
কি হয়েছে দাদা! ইসলামভাই বললো।
দেখলাম সবাই গুটি গুটি পায়ে আমাদের চারপাশে এসে ভিড় করেছে। তা বলে খাওয়া বন্ধ নেই খাওয়া চলছে।
তুমি কিছু জান না! অনিমেষদা বললো।
না দাদা!
তাহলে তোমার থেকেও অনির ক্ষমতা বেশি।
অস্বীকার করবো না। ও এখন মাঝে মাঝে আমাকেই ধমকায়।
রতনের দিকে তাকিয়ে।
কিরে রতন, কি হয়েছে?
কিছু না।
তাহলে দাদা কি বলছে।
বুঝতে পারছি না।
ইসলামভাই হেসে ফেললো।
দাদা এরা এখন আমার হাতের বাইরে।
তাহলে দেখছো ইসলাম, তোমার লোকজন তোমাকে কিছু বলে না।
কিরে অনি তুই কিছু বলছিস না চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছিস। দাদা ধমক লাগাল।
যা বাবা, আমি কি করে বলবো!
অনিমেষদা খোলসা করে বলুক আগে ব্যাপারটা কি। তারপরে আমি বলবো।
জানেন দাদা আমরা প্রশাসন চালাই, আমরা যে কাজটা করতে ঘণ্টা পাঁচেক সময় নেব ও সেটা একঘণ্টাতে করে দেয়। বুঝুন ওর নেটওয়ার্ক।
আমাদের টুকরো টুকরো কথা চলছে। সবাই খেয়ে যাচ্ছে আর শুনে যাচ্ছে। মিত্রা আমাকে প্রবল ভাবে মেপে চলেছে। ইসি, বরুণদা বুঝতে পারছে কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে। চোখে মুখে একরাশ বিস্ময়।
আমি ইচ্ছে করে বললাম, দাদা তুমি একটা অন্যায় করেছ।
আমি আবার কি অন্যায় করলাম!
বড়োমা দাদার দিকে তাকাল।
তুমি সবাইকে নেমন্তন্ন করলে প্রবীরদাকে নেমন্তন্ন করলে না।
অনিমেষদার দিকে তাকালাম। অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে। শেয়ানে শেয়ানে কোলা কুলি চলছে বিধানদা, রূপায়ণদা, অনুপদা, নিরঞ্জনাদার চোখ স্থির।
করিনি মানে! তুই অনিমেষকে জিজ্ঞাসা কর, আমি নিজে গিয়ে বলে এসেছি সকলকে।
অনিমেষদা ফিক করে হেসে ফেললো।
টোপ দিচ্ছিস, চার ফেলে দেখছিস, মাছ খায় কিনা। তোর বুদ্ধির কাছে মাঝে মাঝে আমিও হার মেনে যাই। অনিমেষদা বললো।
কনিষ্ক স্থির চোখে আমাকে দেখছে। নীরু, বটারও চোখ স্থির। ওরা আমার এরকম পারফর্মেন্স প্রথম দেখছে।
কি হলো তুমি হাসলে কেন? নিজেরা চলে এলে প্রবীরদাকে আনতে পারলে না?
আমি কথাটা রূপায়নদাদের দিকে ছুঁড়ে দিলাম।
বৌদি একবার আমার দিকে তাকায় একবার অনিমেষদার দিকে তাকায়।
লজ্জায় আসে নি। দুম করে একটা অন্যায় করে ফেললো। রূপায়নদা বললো।
আমি হাসলাম।
যখন সবই জানিস তখন ছেড়ে দে।
মহা মুস্কিল তখন থেকে শুধু ছেড়ে দে ছেড়ে দে করছো। ধরলে তো ছাড়বো। আমি হাসতে হাসতে বললাম।
দেখছো ইসলাম তোমার ওই পাঁচটা সাগরেদকে দেখো কিরকম চুপ চাপ খেয়ে যাচ্ছে। যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না।
অনিমেষদা, রতনদের দিকে তাকিয়ে বললো। ওরা নির্বিকার।
সত্যি দাদা বিশ্বাস করুণ। ইসলামভাই বললো।
আমি জানি তুমি কিছু জানো না।
সাতটার সময় বুবুনের মোবাইলে একটা ফোন এসেছিল। মিত্রা বলে উঠলো।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম। সবাই মিত্রার দিকে তাকিয়ে।
বল তো মা, তুই বল। ওকে জব্দ করতে তুই আর সুরো পারবি।
তোদের দুজনের প্রতি ওর দুর্বলতা আছে। আর সবার প্রতি ও কর্তব্য পালন করে। তা বলে এই নয় তাদের কিছু হলে ও নাকে সরষের তেল দিয়ে ঘুমবে। অনিমেষদা বললো।
আমরা তখন গেটের মুখে দাঁড়িয়ে গল্প করছিলাম।
তখন কটা হবে?
সাতটা।
তারপর?
ও বললো একটু দাঁড়া আমি আসছি। আমি ওকে জিজ্ঞাসা করলাম। ও কিছু বললো না। মুখটা কেমন ফ্যাকাশে লাগছিল।
অনুপ তুমি এগুলো মাথায় রাখ। কালকে আলোচনা করবো মিটিং-এ। অনিমেষদা বললেন।
আবার মিত্রার দিকে তাকিয়ে, তারপর বল মা।
ও ওখান থেকে চলে আসে। আমি চিকনাকে বলি দেখোতো তোমার গুরুর কি হয়েছে। চিকনা সব শুনেছে। ও তারপর সব সময় বুবুনের পেছন পেছন ছিল। চিকনাও তারপর আমাকে বলেছে ও কিছু জানে না।
কি বুঝছেন অমিতাভদা সব কটা মাস্টার ডগ। অনিমেষদা বললো।
মাস্টার ছাড়া কারুর কাছে মাথা নোয়াবে না। অনুপদা বললো।
অনিমেষদা চিকনার দিকে তাকাল।
বাবা চিকনা এবার বলে ফেলো ম্যাডামের পরের কথাগুলো।
অনিমেষদা এমনভাবে বললো সবাই হাসছে। চিকনা হাসতে হাসতে আমার দিকে তাকাল।
ও তোমাকে কোনওদিন বলতে বলবে না। আমি তোমাকে বলছি তুমি বলো। অনি কিছু বলবে না।
আমি কিছু জানিনা। আমি শুনেছি। রতনদা সব জানে।
কি ইসলাম কিছু বুঝতে পারছো।
ইসলামভাই হাসছে।
দেখনা কোথাকার জল কোথায় গিয়ে গড়ায়।
মিত্রার দিকে তাকিয়ে অনিমেষদা বললো।
আচ্ছা মা, তুই অনিকে কখন আবার স্বাভাবিক দেখলি।
সাড়ে আটটা পৌনে নটা থেকে।
যখন মুখার্জী বাবুরা এলেন।
হ্যাঁ।
তারমানে দেড়ঘণ্টা। দেড়ঘণ্টায় ও কাজ শেষ করে দিল।
ওরা সবাই মুচকি মুচকি হাসছে।
আমি পুলিশ কমিশনারকে ফোন করলেও দেড়ঘণ্টায় কাজ শেষ করতে পারতো না। কাল সকাল পর্যন্ত লাগিয়ে দিত।
তুমি লেবু নিগড়তে নিগড়তে তেঁতো করে ফেললে।
বৌদি, অনিমেষদার দিকে তাকিয়ে বললো।
সুতপা লেবু আমার হাতে এখনও এসে পৌঁছয়নি নিংড়বো কি করে। আমি, বিধানবাবু এখনও অন্ধকারে। একটু আগে অনুপের ফোনে প্রবীর ফোন করে বললো, অনি চারটে ছেলেকে তুলে নিয়ে গেছ এখুনি যেন ছেড়ে দেয়।
আমি দপ করে জ্বলে উঠলাম।
(আবার আগামীকাল)