জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
৬৪ নং কিস্তি
ইসলামভাই বাইরে বেরিয়ে গিয়ে আবিদের সঙ্গে কথা বললো। আবিদ মাথা দুলিয়ে যাচ্ছে। আমরা সবাই ওপরে উঠে এলাম। সবাই ইসির ঘরে এসে বসলো। ঘর ভড়ে গেছে। বড়োমাকে দেখতে পেলাম না। বুঝলাম সেই যে ওপরে এসে জ্যেঠিমনির ঘরে ঢুকেছে আর বেরোয়নি। আমি ওই ঘরে গেলাম। দেখলাম বড়োমা খাটে থম মেরে বসে আছে। কাছে গেলাম।
এই জন্য আসতে বারন করেছিলাম।
ছোটোমা পাশে এসে দাঁড়াল
ওঠো ডাক্তারদাদা ডাকছে।
বড়োমা উঠে দাঁড়াল, আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
একবারে ঝামেলা করবে না। কাজ মিটিয়েছ?
বড়োমা মাথা দোলাল।
তুমি জ্যেঠিমনি ছাড়া কেউ জানতে পারেনি?
বড়োমা মাথা দোলাল, না।
ওই ঘরে চলো, মাথায় রাখবে ডাক্তারদাদার চোখে মাইক্রোস্কোপ ফিট করা আছে। তার ওপর দামিনীমাসি। তোমাদের নিয়ে বড়ো সমস্যা।
কিরে তুই বড়োমার সঙ্গে কি ফুস ফুস করছিস।
ইসি ঘরে ঢুকলো। কাছে এগিয়ে এলো। বড়োমার থমথমে মুখ।
কিগো বড়োমা, অনি তোমাকে বকাবকি করছে?
ওর আর কাজ কি বল। আমাদের ওপর ছাড়া কার ওপর হম্বিতম্বি করবে। ছোটোমা বললো।
দাঁড়া আমি মাকে গিয়ে বলছি।
বলনা, ঝামেলা করবে আবার বললে মন খারাপ করবে।
তুই যখন করিস।
আমার কথা ছাড়।
তোর কথা ছাড়বো কেন।
ও তুই বুঝবি না।
মিত্রা ঘরে ঢুকলো।
ওকিরে দুজন কি করছিস?
ছোটোমা মুচকি মুচকি হাসছে।
বড়োমাকে ধমকাচ্ছে। ইসি বললো।
ও এই কথা, দিদিভাই এর মধ্যে মাথা গলাস না। এখন এই দেখছিস, একটু পরেই দেখবি বুবুন ছাড়া বড়োমা অন্ধ হয়ে যাবে। তখন তুই আমের আঁটি।
বড়োমা হেসে ফেললো।
তুই সার কথা বুঝেছিস। ছোটোমা বললো।
জ্যেঠিমনির ঘর থেকে ইসির ঘরে এলাম। এতো লোকজন দেখে পিকু খুশীতে কি করবে ভেবে উঠতে পারছে না।
এই যে বান্ধবী তোমার ছেলের কীত্তি শুনেছ।
বড়োমা, ডাক্তারদাদার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলো।
হাসলে হবে না। আমার আর দামিনীর বয়স তিরিশ বছর কমিয়ে দিয়েছে। এবার একটা মেয়ে দেখ। বিয়ে করে ফেলি।
তোমার নয় মেয়ে দেখলাম, দামিনীর ছেলে পাবো কোথায়?
সবাই হাসে।
দামিনীমাসি এমনভাবে আমার দিকে তাকাল আমিও হেসে ফেললাম। মাসি এই পরিবেশের সঙ্গে এখনও সরোগরো হতে পারেনি।
শোন অনি, মামনি যে ব্যাগটা দিয়েছিল খালি হয়ে গেছে। ব্যাগ ভর্তি করার ব্যবস্থা কর।
কবে লাগবে বলো?
যত তাড়াতাড়ি দিবি তত ভালো।
ইসলামভাই হেসে ফেললো।
ইসলাম তুমি শুধু হাসো কেন বলো তো?
ওর টাকার অভাব। আপনি বললেন, দেখবেন কেউ না কেউ কালকে আপনাকে আবার একটা ব্যাগ দিয়ে যাবে।
ভিআইপি মানুষ ভিক্ষা করতে বেরলে সকলে কম বেশি দেয়।
বড়োমা ফিক করে হেসে ফেললো।
কিগো বান্ধবী তুমিও দেখছি শুধু ফিক ফিক করে হাসছো।
হাসছে কেন বলোতো? মিত্রা বললো।
কেনোরে?
আসার সময় বড়োমা ওকে ভিআইপি বলেছিল, সে কি রাগ, বাবু গাড়ি থেকে এই নামে তো সেই নামে। তোমরা যাও। এই জন্য বলেছিলাম….।
ইসি হেসে গড়িয়ে পরে।
ওই ঘরে বড়োমাকে কেমন ধমকাচ্ছিল বল।
ওতো আবার গাড়িতে চড়ে না। অটো, বাস, ট্যাক্সিতে চরে। ডাক্তারদাদা বললো।
সবাই হাসছে।
তা এরকম মালিককে কে ভিক্ষা দেবে না বল। কোথা কার কে শ্যাম সেও ওকে মধু, মহুয়া দিয়ে যায়। আমি ডাক্তার কতো জায়গায় গেলাম, কেউ এক ফোঁটা মধু দিল না। বান্ধবীর কাছ থেকে নিয়ে একটু খেলাম, ওমা ঘেমে গেলাম। তুই চেষ্টা করলে পাবি।
জ্যেঠিমনি খিদে পেয়ে গেছে, এবার কিন্তু বদহজম হয়ে যাবে। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম।
তোর বদ হজম হবে না। কর্পোরেসনের জল খাওয়া পেট। নীরু বলে উঠলো।
আবার সবাই হেসে উঠলো। বড়োমার মুখের দিকে তাকালাম। এখন অনেকটা পরিষ্কার।
মেঘ আসতে আসতে কেটে যাচ্ছে। আমার চোখে চোখ রাখলো। বড়োমা ইশারা বুঝতে পারলো। ছোটোমা একমাত্র লক্ষ্য করলো আর কারুর চোখে পরলো না।
দিদি খাবার ব্যবস্থা কোথায় করবেন? বড়োমা, জ্যেঠিমনির দিকে তাকিয়ে বললো।
ওপরের ঘরে করো, একসঙ্গে সকলের হয়ে যাবে।
ওরা সবাই একে একে ওপরে ঘরে চলে গেল, পিকু, নীরুকে নিয়ে পড়েছে। নীরুর হাত ধরে টানতে টানতে জ্যেঠিমনির ঘরে নিয়ে গেল। এ ঘরে আমি ডাক্তারদাদা, ইসলামভাই, দামিনীমাসি, প্রবীরদা।
ও প্রবীর। ডাক্তারদাদা বললো।
বলুন দাদা।
তোমার ওই বাড়িটায় কয়েকটা সমস্যা হচ্ছে।
কিসের বলুন।
একটা এ্যামবুলেন্স রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
কেন নিচে থাকবে।
আমি দামিনী অনেক চেষ্টা করলাম। একটা ঘর নষ্ট হয়ে যাবে।
তোমরা কি ওই বাড়িই রেখে দেবে, ভেঙে নতুন করবে না? আমি বললাম।
তুই দেখেছিস?
কোথায় দেখলাম। সেদিন অনুপদা তোমাদের দেখিয়ে নিয়ে গেল, বললো তোমাদের পছন্দ হয়েছে, ব্যাশ।
তুই দেখ। বাড়িটা পুরনো হলেও খারাপ নয় এখনও মজবুত আছে, বেশ বড়ো বড়ো ঘর। একটু সারিয়ে নিলে টেঁকসই হবে। আর তুই যদি ভেঙে নতুন করতে চাস অনেকটা জায়গা নষ্ট হবে।
তোমরা যা ভালো বোঝ করো। আশে পাশে কোথাও এ্যামবুলেন্স রাখার ব্যবস্থা করা যায় না।
কে দেবে জায়গা? মাসি বললো।
তাহলে একটা গ্যারেজ মতো কিনে নিতে হবে।
সেটা একটা যুক্তির কথা। তাছাড়া যে ডাক্তাররা আসবে তারা গাড়ি করে আসবে, তাদের গাড়ি রাখার একটা প্যাসেজ দিতে হবে। ওদের জীবিকার ক্ষতি করে তুমি উপকার করতে পারবে না।
আমি মাথা নীচু করে রইলাম।
কিরে কিছু বল।
আগে দেখি। না দেখে কিছু বলতে পারবো না। মাসি কি বলছে?
তোর মাসি আবার এক কাঁটা ওপরে। সব সময় এক কথা আপনি যা ভালো বোঝেন করুন। তারপর অনি আছে।
ইসলামভাই-এর দিকে তাকালাম।
আমাকে কিছু বলিস না। আমি রি-মডেলিংয়ের ব্যাপারে যাবতীয় হেল্প করবো বলে দিয়েছি।
কাজ কি শুরু করেছো?
কাল থেকে শুরু হয়ে গেছে।
চলো খেয়ে নিই। খেয়ে বেরবো।
ডাক্তারদাদাকে আমারটা বল। প্রবীরদা বললো।
তুমি বলো।
এখুনি ডাক্তারদা আমাকে উদ্ধার করে দেবে।
ডাক্তারদাদা, দামিনীমাসি হাসছে।
আমার সমস্যা ডাক্তারদাদাকে বোঝাতে পারবো না।
আমি ডাক্তারদাদাকে ইসির ব্যাপারটা সংক্ষেপে বললাম।
প্রবীরদা এখানকার পার্টিগত সমস্যা মিটিয়ে দিয়েছে। বাকিটা ডাক্তারের হাতে।
রথীন না দিতে চাইলে অন্য কোথাও করুক। আমার অতো বড়ো বাড়িটা ফাঁকা পরে রয়েছে।
সে তো করাই যায় কিন্তু এখানকার স্কুলটা বন্ধ হয়ে যাবে।
ওটা কি রানিং।
হ্যাঁ। আপাততঃ বন্ধ।
কি-হে প্রবীর বাপের জম্মে শুনিনি একটা শিশুদের স্কুল এভাবে বন্ধ করা যায়।
অপরাধ নেবেন না।
অপরাধের প্রশ্ন আসছে না। তোমরা কতটা অধঃপাতে নেমেছ বুঝতে পারছো। আমরা একসময় যারা পার্টিটাকে ভালোবাসতাম তারা কেন সরে এসেছি এবার নিশ্চই ধরতে পারছো। তোমরা সব ধরাকে সরাজ্ঞান করেছ। রথীন তো খারাপ লোক নয়। ওকে নিশ্চই তোমরা ধমকা ধমকি করেছো।
তা করেছে।
সেই জন্যই ও বেঁকে বসেছে।
ছোটোমা এসে দরজার সামনে দাঁড়াল
কি ছোটোবান্ধবী।
দাদা খাবার জায়গা হয়ে গেছে।
ছোটোমা একবার পরিবেশটা লক্ষ্য করার চেষ্টা করলো। বুঝলো সামান্য হলেও গণ্ডগোল কিছু একটা হয়েছে।
চলো খেয়ে নাও, তারপর তোমাকে আর ইসিকে নিয়ে যাব।
আমরা উঠে দাঁড়ালাম। সবাই বেরিয়ে এলাম, দেখলাম বরুণদা দুজনকে নিয়ে শিঁড়ি দিয়ে উঠছে। পোষাক দেখে মনে হচ্ছে এরা নিশ্চই কোনও হোটেলের ডেলিভারি ম্যান।
ওপরের ঘরে সকলের আসন পাতা হয়েছে।
আমরা একে একে সব বসলাম। দেখলাম আজ ইসি, মিত্রা, ছোটোমা সবাইকে খেতে দিচ্ছে।
কিরে তুই বসবি না? মিত্রার দিকে তাকালাম।
পরে বসছি।
ছোটোমা হাসলো। পেছনে না লাগলে হচ্ছে না।
বুঝেছি, খাবারটা মনে হয় সেরকম জুতসই নেই। তাই না ডাক্তারদাদা।
ডাক্তারদাদা আমার দিকে তাকাল।
আমাকে আবার এর মধ্যে টানছিস কেন।
না-রে অনি গোলবাড়ির কষামাংস। অনেকদিন খাইনি। নীরু বললো।
তুই তো আজকে শান্তিতে খাবি।
তা বলতে, কব্জি ডুবিয়ে।
রিপোর্ট কার্ড রেডি করছি।
দেখছো বড়োমা, ওমনি শুরু করে দিল।
বড়োমা হাসছে।
বুঝলি নীরু, আজ বড়োমা, জ্যেঠিমনি দু-জনেরটা জমপেশ করে খাওয়া যাবে।
তুই একা!
তাহলে কি দোকা।
ম্যাডামের জায়গায় আমাকে চান্স দে।
এই নীরু।
মিত্রা চেঁচিয়ে উঠলো।
না না আমি চান্স নেব না। যা পাই তাই ভালো।
পিকু এসে আমার কোলে বসে পড়েছে। নেমন্তন্ন খেতে বসেছে।
কিরে তুই ওখানে!
ইসি, পিকুর দিকে তাকিয়ে বললো।
আমি আঙ্কেলের সঙ্গে নেমন্তন্ন খাব।
পিকুর পাকা পাকা কথা শুনে সবাই হাসে।
খাওয়া-দাওয়া হলো। ডাক্তারদাদা আজ ফোর ফন্টে ব্যাট করলো। বড়োমা, জ্যেঠিমনি শুধু হাসে। মিত্রারা শেষের দিকে বসে পড়লো। মিত্রা এসে আমার আর বড়োমার পাতের সামনে বসলো।
একিরে তুই এখানে!
বড়োমার শেষেরগুলো নিতে হবে না। তুই তো মাংস খাস না।
শুঁকি। মাংস তোর মিষ্টি আমার।
তুই মাংস খা আমি মিষ্টি খাই।
আমি থেমে গেলাম।
ডাক্তারদাদা চিত্তরঞ্জন থেকে মিষ্টি নিয়ে এসেছে। আমি নকুর দোকান থেকে। বড়োমার সঙ্গে একচোট হলো নকু ভার্সেস চিত্তরঞ্জন। আমরা দর্শক, দুজনের ডুয়েট উপভোগ করা ছাড়া আমাদের কিছু বলার নেই।
প্রবীরদা এই প্রথম এইরকম পরিবেশে আমাদের সঙ্গে খেতে বসেছে। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত হেসে গেল।
খাওয়া শেষ। ডাক্তারদাদা, ইসলামভাই, দামিনীমাসি, প্রবীরদা সারাটা বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখল। বরুণদা ওদের ঘুরে ঘুরে দেখাল। আমি নিচে এসে কয়েকটা ফোন করলাম, তার মধ্যে দাদার সঙ্গে একবার ফোনে কথা বললাম। দাদা এখানকার অবস্থার কথা জিজ্ঞাসা করলো। সব বললাম। মিলিকে ফোন করলাম।
কোথায়?
অফিসে। জোর কাজ করছি।
টিনা কোথায়?
ওর ঘরে। ওর সঙ্গে আজ প্রেস ম্যানেজারের এক চোট হয়েছে বুঝলে।
তারপর!
ও মেমো ইস্যু করেছে। সনাতনবাবু প্রথমে দিতে চান নি। যেই বলছে ঠিক আছে অনিদাকে ফোন করে জানাচ্ছি। অমনি প্রেস ম্যানেজারের ঘরে মেমো পাঠিয়ে দিয়েছে।
তারপর?
তারপর আর কি ম্যানেজার মশায়ের মুখ কালো। বাহাত্তর ঘণ্টা সময় দিয়েছে টিনা।
দাদা জানে?
ম্যানেজার দাদার কাছে গেছিল। দাদা বলে দিয়েছে, ওর মধ্যে আমি ইন্টারফেয়ার করবো না।
তোমার ডিপার্টমেন্ট?
তোমার সঙ্গে একবার বসবো। প্রচুর জল মেশান আছে। বুঝতে পারছি, ঠিক জায়গাটা ধরতে পারছি না।
কেন!
বলবো গিয়ে।
আজ রাতে আসছো নাকি?
আজ আমি টিনা আমার ফ্ল্যাটে থাকবো। তোমায় পরে সব ঘটনা বলবো।
কোনও সমস্যা?
সামান্য।
শুনি কি রকম?
এখন না।
অদিতি?
ভালো আছে। সনাতনবাবু সব ফাইল ওর ঘরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। বলে দিয়েছে ম্যাডামের ডিসিসন ছাড়া আমি একপাও নড়তে পারবো না।
দেবা, নির্মাল্য কোথায়?
তোমার সেই এডিটর রুমের নতুন একটা ঘরে। দুজনে তোমার এ্যাড কোম্পানী নিয়ে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে। ও হ্যাঁ শোনো সুজিতদা লোক পাঠিয়েছিল। একটা নতুন ক্যাম্পেন আছে। এই টিনা এসেগেছে। আমি টিনার গলা শুনতে পেলাম।
কার সঙ্গে কথা বলছিস?
অনিদা।
দে দে আমি একটু কথা বলি।
আমি বলেছি।
অনিদা।
বলো।
ভাল করিনি, বলো।
একবারে সঠিক স্টেপ। একটুও পাত্তা দেবে না। দিলেই গাড্ডায় ফেলে দেবে।
এ মাসের স্ক্র্যাপের হিসাব দিয়েছে এক লাখ।
মাত্র!
হ্যাঁ। আমি সব হিসাব পেয়ে গেছি।
কি করে পেলে।
সুতনুবাবুকে বললাম, এমাসে কতো কালি লেগেছে কটা রিল লেগেছে। কয় বান্ডিল প্লেট লেগেছে। হিসেব পেয়ে গেলাম।
আমি হাসলাম।
হেসো না, বলো না ঠিক করেছি কিনা।
একেবারে ঠিক করেছো। তোমার হিসাবে কি আসছে।
সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ।
মেমোতে কি লিখেছো?
লিখেছি আপনার হিসাবে আমি খুশি হতে পারলাম না, আপনার দেওয়া হিসাবটা ক্লারিফাই করে দিন।
কি বলছে?
মেমো হাতে পেয়েই দাদার কাছে গেছে, সনাতনবাবুর কাছে গেছে। মাঝে একবার চম্পকদা এসে বলেছিল এবারটার মতো ছেড়েদে টিনা।
আমি বলে দিয়েছি ওটা অনিদার ব্যাপার। আমি অনিদার হুকুম মতো কাজ করছি। অনিদা ছেড়ে দিতে বললে, ছেড়ে দেব।
তখন কি বললো?
একবারে চুপ। বলে কিনা তুই তো সিংহের মুখে ফেলে দিলি।
মিলি হাসছে।
কেমন লাগছে?
তোমার ফ্লেভারটা বশ উপভোগ করছি। তুমি নেই তবু তুমি সব জায়গায় আছ।
ঠিক আছে কাল অফিসে যাব।
তোমরা সব ঠিক আছো?
এখান থেকে বেরিয়ে একটু দামিনীমাসির ওখানে যাব। কাজটা শুরু হয়েছে। দেখব।
ইসলামভাই বললো যে এখনও শুরু করিনি—
আমাকে বললো করেছি। দেখি গিয়ে কি শুরু করেছে। হাতের কাজ তাড়াতাড়ি গুছিয়ে নাও। এদিকটায় সময় দিতে হবে। ধরো মিলি কি বলবে।
বলো মিলি।
সুজিতদার ব্যাপারটা কি করবো?
তুমি টিনা চলে যাও। না হলে এক কাজ করো।
বলো।
আমরা এবারে ওই এ্যাড এজেন্সীর থ্রু দিয়ে বিজ্ঞাপন নেব। সেইরকমই তো প্ল্যান করেছিলাম।
হ্যাঁ।
দেবা, নির্মাল্যকে পাঠিয়ে দাও। ওরা হ্যাণ্ডেল করুক।
দেবাদা আজকে ওর পুরনো অফিসে প্রপোজাল পাঠিয়েছে।
রি-অ্যাকসন।
জানিনা।
তোমকে আর ডিস্টার্ব করেনি?
তুমি কি গো, এর পর কেউ আর ডিস্টার্ব করে। বলে কিনা তুমি আমার ভালো বন্ধু হতে পার না।
হয়ে যাও।
দেখছো টিনা কিরকম হাসছে।
হাসতে দাও। কাল দেখা হচ্ছে।
আচ্ছা।
ফোনটা পকেটে রাখলাম। আবার ওপরে এলাম। দেখলাম বেশ জমিয়ে গল্পের আসর বসেছে। মধ্য মনি ডাক্তারদাদা। আমাকে দেখেই বললো—
কিরে সব খোঁজ খবর নেওয়া হলো।
হ্যাঁ। তুমি বেরবে বললে যে?
যেতে হবে না।
কেন?
রথীন বললো তুই থাক আমি যাচ্ছি। গল্প করতে বসে গেলাম। তুই আমার একটা উপকার কর।
তোমার? আমি!
সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
আমি বড়োমার পাশে ছোট্ট জায়গাটায় নিজেকে গুঁজে দিলাম। মিত্রা ইসিকে কনুইয়ের গোঁতা মেরে ইশারা করে দেখাল।
ব্যাপারটা এরকম, কি বুঝছিস? ইসি হাসছে।
বড়োমা আমার মুখের দিকে বাঁকা চোখে তাকাল।
কিরে আমার উপকারটা তাহলে করবি না।
বলবে তো কি উপকার করতে হবে?
ওই ছেলেটাকে আর ওখানে দরকার নেই, সরিয়ে নে।
ইসলামভাই, প্রবীরদা অবাক হয়ে ডাক্তারদার দিকে তাকাল! দামিনীমাসি মুখ নীচু করে মুচকি মুচকি হাসছে।
ঘরের সবার চোখে হাজার পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে।
আমি প্রথমটায় একটু অবাক হওয়ার ভান করলাম। যেন ব্যাপারটা কিছুই জানি না। এই প্রথম শুনলাম। ডাক্তারদাদা আমার চোখে এমন ভাবে চোখ রাখলো যে আমি অস্বীকার করতে পারলাম না। এও বুঝলাম এই কাজের সাক্ষী হিসাবে দামিনীমাসিকে ডাক্তারদাদা রেখেছে।
না সরান যাবে না। এখনও অনেক কাজ বাকী আছে।
কি দামিনী, তোমায় কি বলেছিলাম তখন।
মাসি আমার দিকে তাকাল। মুখে হাসি।
কিগো সামন্ত, ওকি আবার গণ্ডগোল পাকাচ্ছে? বড়োমা বললো।
গণ্ডগোল নয়, গণ্ডগোল যাতে না হয় তার আটঘাট বাঁধছে।
আবার!
হ্যাঁ, এই যেমন ধরো প্রবীর, ইসলাম, দামিনী ওরা এতদিন একটা স্রোতে চলছিল, এখন কিছুটা হলেও স্রোতের উল্টো মুখে চলছে। বলতে পার ভালো হতে চাইছে বা অনি ওদের ভালো করার চেষ্টা করছে। অনেকে এটা ভাল চোখে দেখছে না। মনে মনে মেনেও নেবে না। ওদেরও শত্রু আছে। সেগুলোকে অনি একটু দরিটরি দিয়ে বেঁধে দিয়েছে।
ডাক্তারদাদা আমার দিকে তাকাল। কিরে ঠিক বলছি?
আমি চুপচাপ।
বুঝলে বান্ধবী এখন যারা কাজ করছে তার সব অনির চতুর্থ ধাপের লোক। দ্বিতীয়, তৃতীয়, প্রথম ধাপের লোক জনের দেখা পাইনি। হয়তো আশে পাশে ঘুরে বেরাচ্ছে, বুঝতে পারছি না। তখন একজনকে দেখে কেমন যেন সন্দেহ হলো, দামিনীকে বললাম, তুমি চেন নাকি। দামিনী বললো না। কিন্তু ছেলেটার হাবভাব বলছে ও আমাদের সকলকে চেনে।
ইসলামভাই আমার দিকে তাকিয়ে!
তুমি কি ভাবছো ইসলাম ওর কাছে কোনও খবর নেই। সব খবর আছে। ডাক্তারদাদা ইসলামভাই-এর মুখের দিকে তাকাল।
ইসলামভাই হাসছে।
তুমি কখন এই তল্লাটে এসেছো, কি কি কাজ করেছো। তোমাকে কেউ ফলো করছে কিনা, সব। ম্যায় প্রবীরের পেছনেও ওর খাশ লোক আছে।
কিরে অনি! প্রবীরদা আমার মুখের দিকে তাকাল।
নাগো, ডাক্তারদা সব মন গড়া কথা বলছে।
তাহলে তুই বললি কেন এখন সরান যাবে না! ডাক্তারদাদা বললো।
সম্ভব নয়, তাই বললাম।
ছেড়েদাও প্রবীরদা, ওর কাজ ওকে করতে দাও, আমদের কাজ আমরা করি। ইসলামভাই বললো।
না ইসলাম তাহলে আমাদের সোর্স ফেল, এটা ধরে নিতে হবে।
ঠিক আছে আমি একটু খোঁজ খবর নিই, তারপর বলবো। ইসলামভাই বললো।
ওতো আমার ওখানকার সব কটা মেয়েকে হাত করে নিয়েছে। কেউ সঠিক কথা বলে না। দামিনীমাসি বললো।
কি বুঝছো প্রবীর, তুমি হয়তো ওদের সকলকে চেনোও না। ডাক্তারদাদা বললো।
একবারে ঠিক কথা বলেছেন।
ইসলাম চেনে, জিজ্ঞাসা করো ও পর্যন্ত সকলকে চেনে না। কি তোমরা পার্টি পলিটিক্স করবে।
তুমি চিনলে কি করে? বড়োমা বললো।
ব্যাটা আমার কাছ থেকে ….। না থাক অনি ওকে সরিয়ে দেবে।
আমি হাসলাম।
কিরে হাসছিস কেন?
যা বাবা, একটু হাসতেও পারবো না।
তুই ওকে সরিয়ে দিয়েছিস, তাই না?
ডাক্তারদাদা আমার দিকে তাকিয়ে এমনভাবে বললো সকলে হেসে ফেললো।
মহা মুস্কিল। তুমি বেশ রসিয়ে রসিয়ে গল্প দিচ্ছ।
আমি যদি মিথ্যে কথা বলি তুই প্রতিবাদ কর।
তোমার কাছ থেকে লাইটারটা না চাইলেই পারতো।
দামিনীমাসি হো হো করে হেসে উঠলো। বড়োমা মুখ টিপে হাসছে। ছোটোমা ড্যাব ড্যাব করে আমার দিকে তাকিয়ে বললো।
ওরে বাবা তুই কি সাংঘাতিক ছেলেরে!
আচ্ছা এবার একটা সত্যি কথা বল। এখন মনে হচ্ছে আমার ইনটরোগেসনটা একেবারে কারেক্ট।
বলো।
তুই কি আমাকে টোপ দিলি। আমি ধরতে পারি কিনা।
আমি এবার সত্যি সত্যি হেসে উঠলাম।
দেখলে বান্ধবী দেখলে, তোমার ছেলের বুদ্ধির দৌড় দেখলে।
রাখো তোমার হেঁয়ালী, খোলসা করে বলো।
তুমি বুঝলে না?
কি করে বুঝবো।
তোমার দ্বারা কিছু হবে না। অনিকে তুমি আটকাতে পারবে না।
ও কথা বলছো কেন?
ও একটু নারাচারা দিয়ে দখলো ক-জোন ধরতে পেড়েছে, সেই ভাবে পরবর্তী ঘুঁটি সাজাবে। হয়তো এতক্ষণে সাজিয়ে ফেলেছে। দূর কি বোকার মতো ওকে বলে ফেললাম। না বললেই পারতাম। ওর কাছ থেকে কিছু শেখা যেত। দামিনীটাও মাথা মোটা।
আমি কি করবো বলুন। দামিনীমাসি হাসছে।
এতদিন তাহলে ওকে তোমরা কি চিনলে?
দামিনীমাসি মুখ নীচু করে আছে।
বড়োমা আমার দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে। ব্যাপারটা এইরকম তুই এতো মিটমিটে।
হ্যাঁরে তুই কি এর মধ্যে আবিদ আর রতনকেও রেখেছিস? ইসলামভাই সরাসরি আমার চোখে চোখ রাখলো।
ওরা তোমার লোক।
সে ঠিক, আজ আবিদ এলো তোর সঙ্গে একটা কথাও বললো না। আমি যা বললাম হ্যাঁ হুঁ করে ছেড়ে দিল। মনে হলো ওর তাড়া আছে।
পর্শু রাত থেকে সাগির, অবতারের দেখা নেই। সেই যে বলে গেল মাসি আমরা একটু কয়েক দিনের জন্য বাইরে যাচ্ছি, দিন পাঁচেক পরে ফিরবো। দামিনীমাসি হাসতে হাসতে বললো।
ওকে জিজ্ঞাসা করো বলবে আমি তো বাড়ির বাইরে বেরোইনি। আমি তোমাদের চোখের সামনেই আছি। তাহলে আমাকে সন্দেহ করো কেন বাবা। ডাক্তারদাদা ইনিয়ে বিনিয়ে বললো।
সবাই মিটি মিটি হাসে। প্রবীরদা আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে। পকেট থেকে ফোনটা বার করলো। কাকে যেন রিং করলো।
ফোন করে কোনও হদিস পাবে না প্রবীর। ও তোমাদের মতো নয়। অনেক দূর ভেবে তারপর কাজে হাত দেয়। ডাক্তারদাদা বললো।
একটু দাঁড়ান। বলছি। প্রবীরদা কানে মোবাইল গুঁজে বলে উঠলো।
আমি প্রবীরদা বলছি।….
হ্যাঁরে রাজনাথকে কি ছারাবার কোনও বন্দোবস্ত হয়েছে।….কি বললি….
সবাই প্রবীরদার মুখের দিকে তাকিয়ে। প্রবীরদার মুখের ভাব ভঙ্গি লক্ষ্য করছে।
কবে ছারবে….ঠিক আছে তুই ফলো আপ কর….এ্যাঁ….
প্রবীরদা কানে ফোনটা আরও জোড়ে চেপে ধরলো, কেউ যেন কিছু শুনতে না পায়। মুখের ভাব ভঙ্গিটা আসতে আসতে পাংশু হয়ে যাচ্ছে। চোখ দুটো কেমন যেন ঠাণ্ডা মেরে যাচ্ছে। প্রবীরদা ফোনটা পকেটে রেখেই উঠে দাঁড়াল সোজা আমার সামনে এসে আমার হাতটা চেপে ধরলো।
প্লিজ অনি তুই একাজ করিস না। আমি তোর থেকে সিনিয়ার। জগতটা তোর থেকে একদিন হলেও বেশি দেখেছি।
তুমি বৃথা চেষ্টা করছো।
আমার গলার স্বর, চোখের কাঠিন্যে, প্রবীরদা চুপ করে গেল।
ও কিছু করতে পারবে না।
ঘরের সবাই চুপ।
তুমি ওকে যতদিন চেন তার থেকে আমি বেশিদিন চিনি।
ঠিক আছে, আমি সব মেনে নিচ্ছি। আমার এই অনুরোধটুকু তুই রাখ। তোকে আমি কথা দিচ্ছি, আমার কোনও ক্ষতি ও করতে পারবে না।
বিশ্বাস করতে পারছি না।
ঘরের পরিবেশ থম থমে। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে।
কি হয়েছে প্রবীর, জল অনেক দূর গড়িয়ে গেছে মনে হচ্ছে! ডাক্তারদাদা বললো।
দাঁড়ান ডাক্তারদাদা আমি একটু অনিমেষদাকে ফোন করি, অনিমেষদা, বিধানদা ছাড়া ওকে কেউ আটকাতে পারবে না। আমাদের ও চুনোপুঁটি মনে করে। এতোদূর ও যখন এগিয়ে গেছে, ও অনেক কিছু করতে পারে। ওর যে কতো প্লাস পয়েন্ট কল্পনা করতে পারবেন না। প্রবীরদা মোবাইলের বোতাম টিপতে টিপতে আপন মনে কথা বলে চলেছে।
কি হয়েছে তুমি বলবে তো! ডাক্তারদাদা বললো।
পড়ে বলছি।
প্রবীরদা আবার রিং করলো। এবার মনে হয় ভয়েজ অন করে রিং করলো। সকলে যাতে শুনতে পায়। অনিমেষদার ফোনে রিং হওয়ার আওয়াজ।
বলো প্রবীর, ওখানকার কাজ মিটলো।
আর্ধেক হয়েছে। অনি আবার একটা গণ্ডগোল পাকিয়েছে।
কেন! আবার কি হলো?
ফোনে বলা যাবে না। আপনি কোথায়?
আমি এখন বরাহনগরে।
আমরা অনির শ্বশুর বাড়ি, বাগবাজারে।
মিত্রাদের পুরনো বাড়িতে?
হ্যাঁ।
তোমরা কি করতে গেছো?
সে অনেক কথা, এখানে না এলে জানতে পারতাম না।
আমার এখানে কাজ সারতে আরও ঘণ্টা খানেক লাগবে। ফেরার পথে যাব।
কোথায় বসবেন?
অনি কোথায়?
আমার সামনে বসে আছে। কোনও কথার উত্তর দিচ্ছে না। চুপ করে আছে।
ওকে দাও।
আপনার কথা শুনতে পাচ্ছে। বড়দি, ছোটদি, সামন্তদা সবাই আছে।
অনিমেষদা হেসে ফেললো, তারমানে বড়ো ভোজ ছিল বলো দুপুরে। ঠিক আছে, তুমি গিরিশমঞ্চে এসো ঘণ্টা খানেক বাদে। ওখানে একটা সমস্যা আছে, মিটিয়ে যাচ্ছি।
আচ্ছা।
প্রবীরদা আবার নিজের জায়গায় গিয়ে বসলো। আমি চুপচাপ বসে আছি।
কিরে তুই আবার গণ্ডগোল পাকিয়েছিস। বড়োমা আমার দিকে তাকিয়ে বললো।
তোমার বিশ্বাস হয়।
এতো কথা হলো, অবিশ্বাস করি কি করে।
গণ্ডগোল ছাড়া জীবন বৃথা।
তারমানে তুই পাকিয়েছিস।
আমি পাকাই নি, ওরা পাকাল। আমি চেক দিলাম।
তোর চেকগুলো এতো কঠিন আমাদের ত্রাহি ত্রাহি রব উঠছে। প্রবীরদা বললো।
ও কি একেবারে কাস্টডিতে হাত মেরেছে! ইসলামভাই বললো।
হ্যাঁ। সেদিন রাতের মিটিংয়ে ও এই কথা বলেই রাজনাথকে ধমকেছিল। আমি কথাটার গুরুত্ব দিইনি। ভেবেছিলাম ওর মতো এরকম বড়ো বড়ো কথা অনেকেই বলে। এখন দেখছি সত্যি। দুবার এ্যাটেম্পট হয়ে গেছে।
ইসলামভাই আমার দিকে ফ্যাকাশে চোখে তাকাল। একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো।
কেউ বুঝতে পারেনি। প্রবীরদা স্বগতোক্তির সুরে বললো।
দূর সব ফালতু আলোচনা। আমি জ্যেঠিমনির ঘরে গিয়ে ঘুমোই।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
নিচে বেলটা বেজে উঠলো।
ডাক্তারদাদা ইসির দিকে তাকাল।
দেখতো মা রথীন এলো মনে হয়।
আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। জ্যেঠিমনির ঘরে ঢুকলাম। জ্যেঠিমনির বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে পরলাম। নিচে দু-তিনজনের গলার আওয়াজ পেলাম, বুঝলাম ডাক্তারদাদার বন্ধু একা নয়, আরও কয়েকজন আছেন।
ওরা ওপরে উঠে এলো। ডাক্তারদাদা হই হই করে উঠলো। সবার সঙ্গে একে একে পরিচয় করিয়ে দিল। আমি এ ঘর থকে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। অনেকদিন পর বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে যা হয়। আমি মোবাইলটা বার করে পটাপট কয়েকটা ম্যাসেজ করে দিলাম। পকেটে ফোনটা রেখে দিলাম।
মিত্রা ঘরে ঢুকলো। মুখটা সামান্য ভার ভার।
কিরে তুই আবার ভেটকে গেলি কেন।
কোনও কথা বললো না। আমার পাশে উঠে এলো। আমার চোখে চোখ।
কিরে আবার কোনও সমস্যা?
তোর বড়টা বহুত গণ্ডগোল পাকাচ্ছে।
কোনটা, বর্তমান না প্রাক্তন?
দুটোই।
মিত্রা হেসে ফেললো।
রাজনাথকে কি ছেড়ে দেবে?
তার তোরজোড় চলছে।
তুই জানলি কি করে?
তোকে এসব নিয়ে ভাবতে হবে না।
ভাবছি না, আমার অভ্যেস হয়ে গেছে, বড়োমা, ছোটোমা, জ্যেঠিমনি টেনসন করছে।
এতদিন বড়োমা, ছোটোমা ছিলো, এবার সঙ্গে লেজুর জ্যেঠিমনি।
বরুণদাও খুব একটা ভালো নেই।
বড়ো বড়ো কাজ করতে গেলে একটু টেনসন নিতে হবে। না হলে পাতি চাকরি করতে হবে।
টিনা আজ প্রেস ম্যানেজারকে মেমো ধরিয়েছে।
খবর পেয়েছি।
তোকে ফোন করেছিল।
আমি করেছিলাম।
এখানে আসার পর দাদার সঙ্গে কথা বলেছিস।
বলেছি।
বড়োমার সঙ্গে জ্যেঠিমনির বোঝাপড়া হয়েগেছে।
হ্যাঁ।
আর কেউ জানলো।
বরুণদা মনে হয় কিছু একটা আঁচ করতে পেড়েছে।
করুক। আজ না হয় কাল জানতে পারবে।
কেউ না বললে জানতে পারবে না।
তবু।
বললে তুই পেট খোলসা করবি, আমি তো আর করবো না।
আমিও করবো না।
কথাটা মাথায় রাখিস তাহলেই হবে।
কিরে দুজনে কি ফুসুর ফুসুর গুজুর গুজুর করছিস।
ছোটোমা ঘরে ঢুকলো। চকচকে চোখ, ঝকঝকে মুখ, দুজনের মুখের দিকে এক ঝলক তাকাল। বোঝার চেষ্টা করলো পরিবেশের গতি প্রকৃতি।
কিরে অনি রাজনাথ আবার গণ্ডগোল করেছে?
শুধু রাজনাথ নয়, সঙ্গে ডাক্তারও আছে। হাতটা ছোটো নয়তো।
অনিমেষদা কি করছে তাহলে?
খবরটা পৌঁছতে সময় লাগে।
তোর লাগে না?
আমার লোক যে ওর আশেপাশে ঘুরছে। প্রয়োজন আমার।
দিদি আমাকে ইশারায় গ্রীণ সিগন্যাল দিয়ে দিয়েছে।
তোমরা ঠিক থাকলে আমার কোনও অসুবিধে নেই।
আমরা ঠিক আছি।
তোমাদের নতুন সখী।
আমাদের থেকে এক কাঁটা ওপরে। তোর কোনও চিন্তা নেই। তোর যাতে কোনও ক্ষতি না হয় তার ব্যবস্থা কর।
আমার ক্ষতি করতে গেলে ওরা দু-বার ভাববে।
তাহলে এই যে আবার শুরু করেছে।
আমার কথার অবাধ্য হয়েছে, তাই ধমক দিয়েছি।
এটা তোর ধমক!
ওদের জন্য।
তারমানে তুই প্রত্যেকটা লোকের জন্য আলাদা আলাদা ধমকের ব্যবস্থা করেছিস!
মিত্রা, ছোটোমার কথা শুনে হাসছে।
তুই ভেবে দেখ! বাপের জম্মে এমন কথা শুনিনি। নতুন শুনলাম। দিদিকে বলতে হবে। তা কোথায় ধমকালি?
শুনতে হবে না।
প্রবীর থম মেরে বসে আছে। আর ওই দুটোর সঙ্গে ফুস ফুস করছে।
কার সঙ্গে।
ওই যে ডাক্তারদার বন্ধুর সঙ্গে এসেছে এই এলাকার লোকাল কমিটির সেক্রেটারি, আর জোনাল কমিটির সেক্রেটারি।
কিগো, তুমিও এসে জমে গেছো। ইসি ঘরে ঢুকলো।
কেন? ছোটোমা ইসির দিকে তাকাল।
ডাক্তারদাদা অস্থির হয়ে পড়ছে।
হোক। একটা পুঁচকে ছেলের সঙ্গে আলাপ করতে হবে না।
ইসি হেসে ফেললো।
পুঁচকে বলো না। কি সব কাণ্ডকারখানা করছে বলো।
এটা নস্যি, আগেরগুলো দেখিসনি। তিনজনে কতোবার কাপর বদল করেছি কে জানে। মিত্রা বললো।
আমি একটায় সাক্ষী।
শেষেরটা। ছোটোমা বললো।
হ্যাঁ।
তাহলে এবার বোঝ।
কিরে শুয়ে আছিস কেন ওঠ। ইসি আমার দিকে তাকিয়ে বললো।
খাওয়াটা বেশ জোরদার হয়ে গেছে।
ডাক্তারদাদা ডাকছে।
কেন!
তোর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবে। ভিআইপি মানুষ বলে কথা।
আবার শুরু করলি।
বারে ভিআইপি মানুষকে কি বলে ডাকবো।
তোর চ্যাপ্টার ক্লোজ।
এক মিনিটে।
তারমানে!
ডাক্তারদাদার মুখ থেকে সব শুনে বললো, ও তুমি যখন আছো তাহলে আমার আর কোনও চিন্তা নেই। তারপর ডাক্তারদাদার মুখ থেকে তোর কাণ্ড কারখানা শুনে বললো, ছেলেটাকে একটু দেখাও, আমাকে তাহলে তোমার সঙ্গে জুড়ে নাও। আমিও একটু শেষ বয়সে ভালো কাজ করি।
আমি উঠে বসলাম। মিত্রার দিকে তাকালাম।
আজ মাথাটা যন্ত্রণা করবে, রাতে টিপে দিবি।
কেন তোকে দেয় না। ছোটোমা কট কট করে উঠলো।
জিজ্ঞাসা করো।
মিত্রা মুখ টিপে হাসছে।
জ্যেঠিমনির ঘর থেকে চারজনে ইসির ঘরের দরজার সামনে এলাম।
ডাক্তারদাদা বেশ জমিয়ে বন্ধুর সঙ্গে গল্প করছে।
জ্যেঠিমনি, দামিনীমাসি, বড়োমা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। আর একদিকে প্রবীরদা, ইসলামভাই আর সেই ভদ্রলোক দুজন। আর একদিকে বরুণদা, নীরু কথা বলছে। ভজুরামকে দেখতে পেলাম না। বুঝলাম পিকুর সঙ্গে ছাদে খেলা করছে।
আয় আয়। ভেতরে আয়। ডাক্তারদাদা বলে উঠলো।
সকলের দৃষ্টি এবার আমার দিকে। ডাক্তারদাদার বন্ধু রথীনবাবু আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকালেন, প্রবীরদার সঙ্গে যে দুজন কথা বলছিলেন তারাও অবাক।
রথীন এই হচ্ছে অনি।
এই টুকু পুঁচকে ছেলে অনি ব্যানার্জী। তুমি কি আমার সঙ্গে ফাজলাম করছো।
সবাই রথীন ডাক্তারের কথায় হেসে ফেললো।
কেন ডাক্তার আমার ছেলের কথা শুনে কি তোমার বৃদ্ধ মানুষ বলে মনে হচ্ছিল। বড়োমা এমনভাবে বলে উঠলো হাসি আর থামে না।
তা না অন্ততঃ পক্ষে ওর মতো হবে ভেবেছিলাম। বরুণদার দিকে ইশারা করলো।
আমি সকলকে একে একে প্রণাম করলাম।
কিরে তোকে যে কেউ অনি বলে পাত্তাই দিচ্ছে না। ডাক্তারদাদা বললো।
ওদের জিজ্ঞাসা করো, ওকে যারা চেনে না, যারা শুধু নামে জানে তারা কেউ মানবে কিনা।
কথাটা তুমি খাঁটি বলেছ। প্রথম দিন আমারও ওরকম ভ্রম হয়েছিল।
তা বাবা তুমি এ বঙ্গের না ও বঙ্গের?
ও শেকড়হীন বঙ্গের মানুষ।
সেটা কি রকম!
আমি ওকে পাঁচ মাস দেখছি। ম্যায় ওর দেশের বাড়িতেও একবার গেছিলাম। আমিই ওকে ঠিক মতো বুঝতে পারলাম না ও কোন বঙ্গের, আর তুমি কয়েক মিনিটের দেখায় বুঝে যাবে।
ওকে তুমি দেখেছো?
ডাক্তারদাদা মিত্রার দিকে হাত তুললো।
জম্মাতে দেখেছি। আর কিছু জানতে চাও।
না।
তুমিও এই বাড়িতে এসেছো দু-বার।
আমি!
হ্যাঁ। আমি তোমাকে নিয়ে এসেছি।
ডাক্তারদাদা রথীন ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে আছে!
ছুটকির দাদু একবার পরে গিয়ে কোমড়ে লেগেছিল। তা ধরো বছর তিরিশ আগে।
আসাতক গুল মেরে চলেছো।
আমরা তখন মেডিক্যালে চাকরি করি।
ধ্যুস তুমি সেই ত্রেতা যুগের কথা বলছো।
তা বাবা তুই নিজে এ সব লিখিস! রথীন ডাক্তার আমার মুখের দিকে তাকাল।
আমি মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছি।
তোমাকে একদিন ওর গল্প বলবো। অবশ্য যতটুকু জানি।
যাই বলো সামন্ত ওর চোখ দুটো কিন্তু বেশ সার্প সব সময় কথা বলে।
ধরে ফেলেছো?
হৃদয়ের অনেক কথা যে চোখ বলে দেয়।
তুমি হার্টের ডাক্তার বলে।
তা নয় হঠাৎ মনে হলো তাই বললাম।
ইসি মিষ্টির ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকলো।
নাও মিষ্টি মুখ করো। আমি চিত্তরঞ্জন থেকে নিয়ে এসেছি।
চিত্তরঞ্জন কোয়ালিটি খারাপ করে ফেলেছে, নকু এখনও ধরে রেখেছে।
মিত্রা খিল খিল করে হেসে উঠলো।
ও হাসলো কেন? রথীন ডাক্তার বললো।
অনি নকুর দোকান থেকে নিয়ে এসেছে। আমি চিত্তরঞ্জন, তাই হাসি।
কোনটা নকুর রে ইসিতা। রথীন ডাক্তার বললো।
সব কটা।
খেয়ে দেখি আগে। তুমি খাবে না?
ভাতের পাতে খেয়েছি।
ও ইসি ওকে এনে দে, না হলে আর এক ডাক্তারের ব্যামো হবে।
বড়োমার কথায় ডাক্তারদাদা হাসছে।
আমি ভ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এদের রকমসকম দেখছি।
রথীনডাক্তার আমার দিকে তাকাল।
তুই বোস, দাঁড়িয়ে রইলি কেন।
আমি মাথা দলালাম। বসছি।
যাই বলো সামন্ত তোমার সঙ্গে অনেক দিন পর দেখা হলো।
বছর দশেক হবে। ডাক্তারদাদা বললো।
তা হবে। রিলেশন বলতে আমার প্রেসকিপসন নিয়ে তোমার কাছে পেসেন্ট যায়, তোমার প্রেসকিপসন নিয়ে আমার কাছে পেসেন্ট আসে।
আমি গিয়ে বড়োমা, দামিনীমাসির মাঝখানে খাটে বসলাম।
কিরে চা খাবি?
ইসির দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
প্রবীরদার ফোনটা বেজে উঠলো। নম্বরটা দেখে সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা কানে তুলে নিল। বুঝলাম অনিমেষদা এসে গেছে।
হ্যাঁ দাদা….চলে এসেছেন?….যাচ্ছি।
প্রবীরদা উঠে দাঁড়াল।
ডাক্তারদাদা আমি একটু ঘুরে আসি।
অনিমেষ চলে এসেছে?
হ্যাঁ।
যাও।
প্রবীরদা বেরিয়ে গেল সঙ্গে সেই দুই ভদ্রলোক।
অনিমেষবাবু এখানে আসবে মানে! রথীন ডাক্তার মিষ্টি খেতে খেতে বললো।
তোমায় বলছি না। একদিনে সব জানতে পারবে না। অনিমেষের মেয়ে আর অনি দুই ভাইবোন।
রথীন ডাক্তারের মিষ্টি খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে।
মিষ্টিটা গিলে নাও, না হলে বিষম খাবে।
তুমি আজ খালি মেঘে মেঘে কথা বলছো।
লেখা লিখি করো নাকি?
কেন?
সাহিত্য ঘেঁষা কথা বলছো।
একটু আধটু করি।
ঠিক আছে আমি অমিতাভকে বলে দেব। তোমার লেখা ছেপে দেবে।
অনি তোদের কাগজে স্বাস্থ্যের ওপর কোনও পাতা নেই।
আছে।
কবে বেরোয় বল?
মনে হয় বুধবার।
দাঁড়া আমি হার্টের ওপর একটা জব্বর লেখা দেব।
আমি চুপ করে থাকলাম।
সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। বুঝলাম ওখানে আর যাওয়া হবে না। আজ কপালে আমার দুঃখ আছে। ডাক্তারদাদা কথাটা না বললে কিছুই হতো না। ভালোয় ভালোয় সব মিটে যেত। কেন যে ডাক্তারদাদা বলতে গেল।
কিরে খুব বোড় লাগছে না।
আমি ডাক্তারদাদার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
ইসি চা নিয়ে এলো। মিত্রা সকলকে হাতে হাতে এগিয়ে দিল। বুঝতে পারছি আজ এ বাড়ির মানুষগুলোর ওপর খুব চাপ সৃষ্টি করা হয়ে যাচ্ছে। কি করা যাবে। বরুণদাকে দেখতে পেলাম না। বুঝলাম বরুণদা, নীরু দুজনে কোথাও বেরিয়েছে। ছোটোমাও ঘরে নেই।
চা খেয়ে ইসলামভাইকে বললাম, চলো একটু ছাদ থেকে ঘুরে আসি।
ইসলামভাই উঠে দাঁড়াল বড়োমা, দামিনীমাসি আমার দিকে তাকিয়ে একবার মুচকি হাসল।
দুজনে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। ওপরে চলে এলাম। দেখলাম খোলা আকাশের তলায় পিকু ব্যাট করছে, আর ভজুরাম গড়িয়ে গড়িয়ে বল করছে। সন্ধ্যে হতে আর মিনিট পনেরো বাকি।
ভজু পিকুকে নিয়ে নীচে চলে যা, সন্ধ্যে হয়ে যাচ্ছে।
আর একটু। পিকু আঙুল তুলে বললো।
না বাবা আবার পরে।
ভজু পিকুকে কোলে তুলে নীচে চলে গেল।
সিগারেট আছে।
এখন খাবি?
কেন!
অনিমেষদা এখুনি চলে আসবে।
আসুক।
ইসলামভাই পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বার করে নিজে একটা নিল, আমাকে একটা দিল। বুঝতে পারছি ইসলামভাই আমার চোখে চোখ রেখে বোঝার চেষ্টা করছে, কেন আমি এখানে ডেকে নিয়ে এলাম।
সত্যি তুই রাজনাথকে টার্গেট করেছিলি?
না।
তাহলে প্রবীরদা বললো!
সঠিক খবর পায়নি। প্রবীরদার খুব কাছের লোক এটা করেছে।
তুই বুঝলি কি করে?
পর্শুদিন বুঝতে পেরেছি।
যেদিন অনিমেষদার সঙ্গে মিটিং করছিলি!
হ্যাঁ।
ইসলামভাই আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে ঘন ঘন সিগারেটে টান দিল।
আমার সিগারেটটা খেতে ভালো লাগলো না। ছুঁড়ে ফেল দিলাম।
তোমার চোখে আজকাল ছানি পড়ে যাচ্ছে। পরিষ্কার করো।
একথা বলছিস কেন?
বুঝতে পারছি তাই। তুমি এরকম ছিলে না।
আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
বোঝার চেষ্টা করো। তোমার পুরনো শত্রুরা হাত মিলিয়েছে। যদিও কিছু করতে পারবে না।
কি করে বুঝলি?
খোঁজ খবর নাও।
রতন, আবিদ আমাকে কিছু বলেনি।
বলতে চেয়েছে, তুমি বোঝো নি। আমি বুঝলাম কি করে?
খোঁজ নিতে হবে।
তোমাকে আর খোঁজ নিতে হবে না। তুমি তোমার কাজ করো। অনিমেষদার কাজ কি করলে?
অনাদি সব দেখে এসেছে। আমি এই সপ্তাহে যাব।
কবে যাবে?
তোর এই কাজটা বুঝিয়ে দিয়ে চলে যাব।
তুমি যাও, পরে আমি যাচ্ছি। ওখানে কাকে নিয়ে যাবে?
রতনকে বলেছি।
কি বললো রতন?
জায়গাটা দেখতে চাইল।
নিয়ে যাবে ওকে?
হ্যাঁ।
বেশিদিন আটকে রাখবে না। ছেড়ে দেবে। একবারে নতুন ছেলেদের নিয়ে কাজটা করো। যাদের গায়ে এখনো দাগ পরেনি।
এ কথা বলছিস কেন!
তুমি ভাবছো কি করে, অপনেন্ট ঘুঁটি সাজাচ্ছে না।
তুই ঠিক কি বলতে চাইছিস খোলসা করে বল।
যা বলার তা তো বললাম। তাছাড়া অনাদিকে আমি কিছু দায়িত্ব দিয়েছি। গেলে জানতে পারবে। পারলে চিকনাকে বেশি করে কাজে লাগাবে। গ্রামের ব্যাপারটা চিকনা ভালো বোঝে।
আমি ওকে মাইনাস করে রেখেছিলাম।
মনে রাখবে ওইই হবে তোমার ট্রাম্প কার্ড।
কি বলছিস!
ঠিক বলছি। মিলিয়ে নেবে।
কিরে নীচে চল দাদা ডাকছে। মিত্রা পেছনে এসে দাঁড়াল।
এসে গেছে?
অনেকক্ষণ। নতুন ডাক্তারের সঙ্গে বেশ জমপেশ করে গল্প করছে।
তুই এলি কি করতে?
খাওয়া দাওয়া হলো, বললো মিত্রা যা এবার অনিকে ডেকে আন।
কিছু বিশেষণ প্রয়োগ করে নি?
তোকে বলা যাবে না।
ইসলামভাই হাসছে।
আমি ইসলামভাই মিত্রার পেছন পেছন নিচে নেমে এলাম।
ইসির ঘরে তখন জোড় আড্ডা চলছে। সবাই আড্ডার অংশীদার, এমনকি জ্যেঠিমনি পর্যন্ত বেশ টকাটক কথা বলছে অনিমেষদার সঙ্গে। সবার হাতেই চায়ের কাপ। বুঝলাম আতিথেয়তার কোনও ত্রুটি রাখে নি ইসি, ছোটোমা। আমি ঘরে ঢুকতেই অনিমেষদা হেসে উঠলো।
আয় তোর কথাই হচ্ছিল।
আমি তাকালাম।
দিদিকে বলছিলাম, তোর বিয়ে করে কোনও উপকার হয়নি।
আমি অনিমেষদার মুখের দিকে তাকালাম।।
তুই যে তিমিরে থাকার সেই তিমিরেই আছিস।
আমি মুখ টিপে হাসলাম।
বোনের সঙ্গে কথা বলেছিস?
তিনদিন কথা বলিনি।
সেইজন্য ওর মেজাজ সপ্তমে।
কেন!
ফোন করে জান।
ওতো একবার ফোন করতে পারতো।
তোর ফোন খোলা থাকে?
চুপ করে গেলাম।
তুই নিজের প্রয়োজন ছাড়া ফোনটা ব্যবহার করিস না।
ঘরের সবাই হাসছে।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই তোমাদের এখানে নিয়ে চলে এলো। অনিমেষদা, বড়োমার দিকে তাকিয়ে বললো।
ঘুম থেকে ওঠার পর দেখলাম মুখটা ভার ভার। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছে রে। কিছু বললো না। ভাবলাম রাতে হয়তো মিত্রার সঙ্গে ঝগড়া করেছে। তারপর কচুরি খেয়ে ওপরে চলে গেল। বেশ কিছুক্ষণ পর নিচে নেমে এসে বললো রেডি হও ওবাড়ি যাব।
আমি বড়োমার দিকে তাকিয়ে একবার হাসলাম।
মিত্রাকে ফোন করে বললো, তুই অফিস থেকে চলে আয়। অনিমেষদা বললো।
মিত্রাকে ছোটো ফোন করেছিল। বড়োমা বললো।
অনিমেষদা হাসছে।
তোর জন্য সুরোই ঠিক। ও-ই তোকে শাসন করতে পারবে। মিত্রার দ্বারা কিছু হবে না।
মিত্রা হাসছে।
তোর এদিককার কাজ শেষ?
এদিকে কোনও কাজ ছিল না।
তুই কি আজকাল এমনি এমনি যাওয়া আসা করছিস নাকি? সেটা জানতাম না!
সবাই অনিমেষদার দিকে তাকিয়ে। বুঝতে পারছে কি ভাবে অনিমেষদা অনিকে বাঁধছে।
আমি চুপ করে আছি।
একটু সময় হবে। দুটো কথা বলতাম।
এবার সবাই জোরে হেসে উঠলো।
ডাক্তারবাবু আপনি একবারে হাসবেন না। অনিবাবু এখন ভিভিআইপি। দেখলেন না প্রবীরের এক ফোনে আমি এসে হাজির হয়ে গেলাম। কত কাজ নষ্ট হলো।
এবার সবাই আরও জোরে হেসে উঠলো।
ওরে থাম থাম পাশের বাড়ি থেকে সব লোক জন চলে আসবে। অনিমেষদা বললো।
তুমিও শেষ পর্যন্ত ভিআইপি বললে। মিত্রা হাসতে হাসতে অনিমেষদার দিকে তাকালো।
কেন বলতো, অন্যায় করে ফেললাম নাকি?
সকাল থেকে বড়োমার সঙ্গে এই নিয়ে ঘুসো ঘুসি চলছে। কি তেজ।
তাই! তাহলে উইথড্র। কিন্তু সুরো, সুতপা বলে যে।
উঁ সেদিন বৌদি বলেছিল, বলে কিনা এখনও ভেতরে ঢুকি নি, জুতোও খুলিনি, সোজা নিচে নেমে যাব। তারপর বৌদি ঘাড় ধরে ভেতরে ঢোকাল।
আমি যে ওরকম করতে পারলাম না। তাই ওর পেছন পেছন ছুটি। ওকে স্নেহ করে বড়ো অপরাধ করে ফেলেছি।
ঘরটা মুহূর্তের মধ্যে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কারুর মুখে কোনও কথা নেই। অনিমেষদা একবার চারদিক ভালো করে লক্ষ্য করে নিল।
ইসি।
ইসি অনিমেষদার দিকে তাকাল।
ও ঘরে কেউ আছে।
পিকু আর ভজু খেলা করছে।
চল, তুই আমি গিয়ে একটু বসি।
ইসির দিকে তাকিয়ে, চা খেলাম বুঝলি ঠিক মজাটা পেলাম না। আর একবার দিবি।
ইসি হেসে ফেললো।
প্রবীরদার দিকে তাকিয়ে।
তোমরা বসো, প্রয়োজনে ডাকবো।
(আবার আগামীকাল)