জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
৬৫ নং কিস্তি
সবাই আমার দিকে তাকিয়ে। এমনকি রথীন ডাক্তার পর্যন্ত অবাক হয়ে গেছে। চোখে মুখে তা ফুটে উঠছে। আমি অনিমেষদার পেছন পেছন জ্যেঠিমনির ঘরে এলাম। আমাদের দেখেই ভজুরাম হেসে ফেললো।
আমরা ওপরেরে ঘরে গিয়ে খেলা করি।
তাই কর।
অনিমেষদা পিকুর গালটা ধরে একটু টিপে দিল।
ভেতরে এলাম। অনিমেষদা জ্যেঠিমনির ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসলো। আমি খাটে বসলাম।
প্রবীরের কাছে সব শুনলাম। আবার কি হলো?
কি শুনেছো বলো। তারপর বলছি।
তুই তো সব জানিস।
জানি তবে প্রবীরদা কি বলেছে একটু শোনার দরকার আছে।
কেন প্রবীর কি আবার গণ্ডগোল করছে?
মনে হচ্ছে প্রবীরদা নয় অন্য কেউ।
তুই কি করে বুঝলি?
আমাকে আজ রাত টুকু সময় দাও।
ওরা বলছে তুই করাচ্ছিস।
তুমি বিশ্বাস করো?
করছি না বলেই তোকে জিজ্ঞাসা করছি।
আবীর মুখার্জী কে?
অনিমেষদা ইজি চেয়ারে এতক্ষণ হেলান দিয়ে বসেছিল। এবার সোজা হয়ে বসলো।
কেন!
যা জিজ্ঞাসা করছি বলো।
এখানকার জোনাল কমিটির সেক্রেটারি।
তার সঙ্গে প্রবীরদার সম্পর্ক কি রকম?
সঠিক বলতে পারব না। ওইতো ও ঘরে বসে আছে?
তাই!
তোর সঙ্গে প্রবীর আলাপ করায় নি?
না।
স্ট্রেঞ্জ!
এদের মধ্যে কেউ কি ইসির ব্যাপারে বিরোধিতা করেছিল।
এরা কেউ করেনি। তবে এখানকার ব্রাঞ্চ করেছিল।
এই ব্রাঞ্চ কার হাতে।
মনে হয় আবীর বাবুর দিকে আছে।
তোমায় গল্প বলছি তুমি শুধু ফলো আপ করে আমাকে জানাবে। পারলে প্রবীরদা, অনুপদার সঙ্গে কনসাল্ট করবে।
বল।
অবতারকে আমার বিয়ের দিনে দেখেছিলে।
হ্যাঁ।
ওর ভাই চিনা এখন জেলে। রাজনাথ যেদিন থেকে জেলে গেছে সেদিন থেকে আমি অবতারের মাধ্যমে চিনাকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম রাজনাথ আর ডাক্তারকে ওয়াচ করার জন্য।
অনিমেষদা আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে। চোখের পলক পড়ছে না।
রাজনাথকে ছাড়াবার জন্য দিল্লী থেকে তোমাদের একটা লবি তদবির করছে। মুখার্জীর ওপরও কম বেশি প্রেসার আসছে।
রাজনাথের পকেটের চারজন এখন জেলে আছে। তারা যে কোন ভাবে হোক কয়েকদিন আগে পাল্টি খেয়ে গেছে। তোমাদের সঙ্গে সেই রাতে কথা বলার পর অবতার আমাকে রাতে ফোন করে জানায়। ওই চারজন রাজনাথকে কাস্টডির ভেতর মারার প্ল্যান করেছে। দোষটা চাপান হবে প্রবীরদার ওপর।
আমি পর্শুদিন রাতেই অবতার, সাগিরকে মুখার্জীর কাছে পাঠাই ওদের একটা ফলস কেসে এ্যারেস্ট করাই। গতকাল বেল করাইনি। এখন আলিপুর জেলে রেখেছি। বলতে পার গটআপ গেম খেলছি। অবতার, সাগিরকে সব বুঝিয়ে দিয়েছি।
আজ সকাল থেকে তিনবার রাজনাথের ওপর এ্যাটেম্পট হয়েছে। আবীর মুখার্জীর সঙ্গে তোমাদের অপোনেন্ট পার্টি বেহালার একজন পার্টি নেতার খুব দহরম মহরম আছে। তার লোক নাচি। সেও এখন জেলে। সে এই চারজনকে নিয়ে কাজটা হাসিল করতে চাইছে।
সকাল থেকে অবতার, সাগিরের সঙ্গে ওদের প্রচুর মারপিট হয়েছে। ওদের তিন-চারজন উনডেড হয়েছে। তোমাদের দিল্লী লবির সঙ্গে হাত মিলিয়ে আবীরবাবু এই কাজটা করছে। ও এক সময় রাজনাথের খুব ক্লোজ ছিল।
রাজনাথের ভাইপো প্রথমে ওর আশ্রয়ে এসে উঠেছিল, তারপর প্রবীরদার কাছে পাঠায় ওই ভদ্রলোক। কেশ খায় প্রবীরদা। সিং সাহেবের রিপোর্টে আবীরবাবুর নাম পাই। ওয়েপনসের ব্যবসা রাজনাথ করতো। ঘার ভাঙতো প্রবীরদার। প্রবীরদা ভাগ পেতো। এখন সেই ব্যাপারটা বকলমে আবীরবাবু করতে চাইছে। প্রবীরদা মনে হয় বাধা দিয়েছে। তাই এই পথ বেছে নিয়েছে।
ছোটোমা চা নিয়ে ঘরে ঢুকলো।
বাবা কি ফিস ফিস করছিস গেট থেকে শোনা যাচ্ছে না।
অনিমেষদা ট্রে থেকে একটা চায়ের কাপ তুলে নিল।
দাদা কিছু নোনতা মুখে দেবেন।
না। দেখো তো ও ঘরে মনে হয় আমার সিগারেটের প্যাকেটটা ফেলে এসেছি।
ছোটোমা বেরিয়ে গেল।
কটা বাজে বলো।
সাতটা।
চলো ছাদে যাই। তোমাকে একটা জিনিস শোনাই।
এখানে শোনা।
না।
চা খেয়ে নিই।
প্লেটে ঢেলে খেয়ে নাও।
ছোটোমা ও ঘর থেকে অনিমেষদার সিগারেট প্যাকেট আনার আগেই আমাদের চা খাওয়া শেষ।
দাদা চা কি ঠান্ডা ছিল?
না বেশ গরম ছিল।
ছোটোমা একবার দুজনের দিকে তাকাল। কিছু বোঝার চেষ্টা করলো, তারপর বেরিয়ে গেল।
চল ওপরে যাই।
আমরা দুজনে শিঁড়ি ভেঙে ছাদে চলে এলাম। একবারে ছাদের এক সাইডে এসে দাঁড়ালাম। অবতারের সঙ্গে আমার কথার রেকর্ডিং অনিমেষদাকে শোনালাম। অনিমেষদা মন দিয়ে সব শুনে আমার দিকে তাকাল।
আমাকে জানাস নি কেন?
জানালে তুমি বিশ্বাস করতে?
অনিমেষদা আমার চোখে চোখ রাখলো।
কিছু অঘটন ঘটলে?
ঘটবে না।
দেখছিস তো বিরোধীরা ল্যাজে গোবরে করে দিচ্ছে।
তাতে খতিটা কি হচ্ছে। যে লেখাটা শুরু করেছিল সে তো আর কিছু লিখছে না। তাহলে তোমার চিন্তা কিসের।
দাঁড়াও লাস্ট আপডেটটা নিই।
আমি অবতারের মোবাইলে মিস কল করলাম। অনিমেষদার দিকে তাকালাম।
হয়তো গালা গালি করতে পারে, মনে কিছু কোরো না। ওরা জানে না তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছো।
অনিমেষদা মুচকি হাসলো।
তুই তো ঝানু গোয়েন্দা হয়েগেছিস।
নিজে বাঁচার তাগিদে। মিত্রার জায়গায় অন্য কেউ হলে এতোটা ঝুঁকি নিতাম না।
মেয়েটা মানুষ চেনে বুঝলি। নাহলে এতো ছেলে থাকতে তোকেই বা ভালোবাসতে যাবে কেন।
তোমাদের আশীর্বাদ।
অবতার রিং ব্যাক করলো।
কি খবর বল।
তুমি পার্মিশন দাও ওই চারটেকে আজ রাতেই উড়িয়ে দিই।
কেন?
ওরা আজ রাতেই কাজ হাসিল করবে ঠিক করেছে। প্রচুর টাকা ছড়িয়েছে।
তুই কিছু লুটে নে।
তুমি না থাকলে লুটে নিতাম। সারাজীবন তো ভেতরে থাকবো না। বাইরে বেরলে তোমার হাত থেকে বাঁচবো না।
কি হয়েছে বল?
ওরা চারজন আজ রাজনাথের আশে পাশের সেলে থাকবে। শুনলাম ওয়েপনস নিয়ে এসেছে।
তুই কি করতে চাস।
আর কিছুক্ষণ পর খাওয়ার ঘণ্টা বাজবে। খাওয়ার পর কাজ শেষ করে দেব।
জানা জানি হলে।
আমার জিভের তলায় ব্লেড আছে। শিরা কেটে দেব।
আবীরবাবুর কি খবর?
চিনাটা একেবারে ঢ্যামনা। আগে বল। তাহলে আমি ভেতরে আসতাম না। বাইরেই সাঁটিয়ে দিতাম। আমার ছেলেগুলো ঠিক ঠাক কাজ করছে?
হ্যাঁ।
তুমি মিথ্যে কথা বলছো।
কেন?
একটা ডাক্তারদাদার কাছে ধরা খেয়ে গেছে।
তোকে কে বললো?
চার নম্বরের মামনি।
ঠিক আছে তোকে এসব নিয়ে ভাবতে হবে না। আমি ঘুঁটিগুলো একটু সাজিয়ে নিই, পাঁচ মিনিট পর ফোন কর।
আচ্ছা।
আমি অনিমেষদার মুখের দিকে তাকালাম। অনিমেষদা মুচকি হাসলো।
আমি মাথা নীচু করে নিলাম।
আমার সরকারি ক্ষমতা নেই। প্রয়োজন পরলে চারটেকে সরিয়ে দেব। এটুকু ক্ষমতা আমার আছে।
আমি না আসলে তুই কি এই পথ বেছে নিতিস।
প্রবীরদাকে বাঁচাতে, বাধ্য হয়ে বেছে নিতাম।
ব্যাপরটা কেউ জানতেও পারত না বল।
তোমাদের আবীরবাবু বুঝতে পারত, তারপর অবতাররা বেরিয়ে এলে ও হাফিস হয়ে যেত। ওদের কথা কিছু কিছু আমাকে শুনতে হয়।
তুই তো এরকম ছিলি না!
আমি কোথায় অন্যায় করছি বলো। সময় হয়ে যাচ্ছে। একটা ডিসিশন নাও।
অনিমেষদা পকেট থেকে ফোনটা বার করে অন করলো।
তুমিও ফোন বন্ধ করে রেখেছিলে!
তোর সঙ্গে কথা বলবো বলে।
আমি হাসলাম।
অনিমেষদা ডায়াল করে কানে ধরলো।
অনুপ।….হ্যাঁ ফোনের সুইচ অফ ছিলো….তুমি এক কাজ করো বিশ্বজিতবাবুকে একটা ফোন করো বলো আলিপুর জেলের জেলারকে যেন এখুনি একবার ওখানে যেতে বলেন। তুমিও যাও আমিও যাচ্ছি।…. তোমার কাছে খবর চলে এসেছে?….আমি অনির সামনেই দাঁড়িয়ে আছি….কি করবে বলো….ঠিক আছে তুমি যাও, আমি যাচ্ছি। আর শোনো রাজনাথের সেলের সামনে যেন আর্মড ফোর্স থাকে, তারপর তোমায় গিয়ে সব বলছি।
অনিমেষদা আমার দিকে তাকাচ্ছে। মুচকি মুচকি হাসছে। ফোনটা বন্ধ করে পকেটে রাখলো।
চল নিচে যাই।
অবতার, সাগির কিন্তু নিজের নামে ঢোকে নি।
তাহলে!
একজন জাকির নামে ঢুকেছে আর একজন মহিন নামে ঢুকেছে।
তুই তো মাথা খারাপ করে দিবি!
আমি মুচকি হাসলাম।
তুই কোথাও বেরবি না তো?
না।
আমি অনিমেষদার মুখের দিকে তাকালাম।
কিছু বলবি?
আমি তাহলে অবতারকে জানিয়ে দিই।
তাই দে।
তুমি নিচে যাও, আমি ফোন করে যাচ্ছি।
ফোন করে নে একসঙ্গে যাই।
অনিমেষদার সামনেই আমি অবতারের সঙ্গে ফোনে কথা বলে নিলাম। ওকে সব জানালাম।
অনিমেষদা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব শুনলো। মুচকি মুচকি হাসছে।
আমি অনিমেষদা নিচে নেমে এলাম। সবাই গল্প করছে।
অনিমেষদা ঘরে ঢুকতেই বড়োমা চেঁচিয়ে উঠলো।
কি গো অনিমেষ, তোমরা যে ম্যারাথন মিটিং করলে।
মিটিং না, ওর সঙ্গে একটু গল্প করছিলাম। ছাদে বেশ ফুর ফুরে হাওয়া দিচ্ছিল।
তুমিও আজকাল হাওয়া খাও নাকি? ডাক্তারদা হাসতে হাসতে বললো।
কি করবো দাদা অনির পাল্লায় পরে সেটাও অভ্যাস করতে হচ্ছে।
দাদা চা খাবেন। ছোটোমা বললো।
ভাবছিলাম চা না খেয়েই চলে যাব। একটা জরুরি মিটিং আছে।
আপনি একটু বসুন, ঠিক এক মিনিট।
অনিমেষদা চেয়ারে বসলো। রথীন ডাক্তার এখনও আছে। সেই কখন এসেছে।
অনিমেষদা মিত্রার দিকে তাকাল।
কিরে মামনি, বাংলার পাঁচের মতো মুখ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
মিত্রা হাসলো।
কি করবি বল। পাগলটাকে যখন ভালোবেসেছিস কি আর করবি। ওর সঙ্গে ঘর করতে হলে তোকে একটু আধটু টেনসন ভোগ করতে হবে।
মিত্রা মাথা নীচু করে নিল।
অনিমেষদা, জ্যেঠিমনির দিকে তাকাল।
কি দিদি অন্যায় বললাম।
জ্যেঠিমনি হাসছে।
বড়দি, ছোটো অনেকটা প্রুফ হয়ে গেছে।
অনিমেষদা আবার মিত্রার দিকে তাকাল।
এখন মাঝে মাঝে মনে হয় কি জানিস ওর মগজাস্ত্রটা যদি আর কয়েকদিন আগে কাজে লাগাতে পারতাম, বড়ো উপকার হতো। অনেক দেরি করে ফেলেছি।
ঘরের সবাই চুপচাপ। অনিমেষদার মুখের দিকে সবাই তাকিয়ে।
অনিমেষদার ফোনটা বেজে উঠলো।
হ্যাঁ বলো।…. পেয়ে গেছো…. বেশ ভালো….হ্যাঁ আমি এখান থেকে সোজা ওখানে যাচ্ছি ….প্রবীরকে সঙ্গে নেব….ঠিক আছে….কি বললে প্রবীরের ফোন বন্ধ….হবে হয়তো….আমরা সব মিত্রার আদি বাড়িতে….হ্যাঁ বাগবাজারের বাড়িতে….হ্যাঁ দিদিদের সঙ্গে একটু আড্ডা মারছি। অনিমেষদা হেসে ফেললো।
ফোনটা বন্ধ করে পকেটে রাখতে রাখতে বললো।
কি গো প্রবীর?
খেয়াল নেই দাদা।
খোলো খোলো।
ছোটোমা চা নিয়ে এলো।
অনিমেষদা, ছোটোমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
তখন তুমি নোনতার কথা বললে না।
খাবেন?
একটু দাও। এখন মিষ্টি খাওয়া যাবে না। নুন খেয়ে গুণ গাইতে হবে।
বড়োমা হাসছে।
মাসি তুমি বড্ডো চুপচাপ বসে আছো।
দামিনীমাসি একবার অনিমেষদার দিকে তাকাল।
নিজের ছেলেকে তোমরা যদি এখনও ঠিকমতো চিনতে না পার, আর কবে চিনবে?
মাসি মাথা নীচু করে মুচকি মুচকি হাসছে।
হাসলে হবে না মাসি।
অনিমেষদা চায়ে চুমুক দিয়ে জ্যেঠিমনির মুখের দিকে তাকাল।
বড়ো জামাইটা বড্ড সাদাসিধে। ছোটোটা ততটাই অসুবিধাজনক।
নীরু, বরুণদা মুচকি মুচকি হাসছে।
ও ঠিক কাজ করছে। কোনও অন্যায় কাজ করে নি। জ্যেঠিমনি বললো।
ওরে বাবা! অনির সাপোর্টার আর একটা বেড়ে গেল। অনিমেষদা বললো।
সবাই হাসছে।
শুনলেন ডাক্তারবাবু নতুনদিদির কথা শুনলেন।
জ্যেঠিমনি মুচকি মুচকি হাসছে।
আরও কিছুক্ষণ অনিমেষদা হাসি ঠাট্টা করলো।
এবারও প্রবীরদা আমার সঙ্গে নবাগত দুজনের আলাপ করিয়ে দিল না। এমনকি অনিমেষদাও খুব একটা পাত্তা দিল না। চোখা চুখি হলো। চা খাওয়া শেষ অনিমেষদা উঠে দাঁড়াল, রথীন ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করলো।
ডাক্তারবাবু এখন আসি। যাক অনির শ্বশুর বাড়ির দৌলতে আপনাদের পাড়ায় কিছুক্ষণ আড্ডা মারা হলো। আপনার মতো মানুষের সান্নিধ্যে আসতে পারলাম।
মাঝে মাঝে এরকম হলে খুব ভালো লাগে। রথীন ডাক্তার বললো।
সবই তো বোঝেন ডাক্তারবাবু, নতুন করে আর আপনাকে কি বলি বলুন।
অনিমেষদা উঠে দাঁড়াল আর সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে।
সামন্তদা রাতে ওই বাড়িতে থাকছেন তো?
কেন গো অনিমেষ?
একটু বোসবো।
ছেলেটা মনেহচ্ছে তোমাদের সুস্থ ভাবে বাঁচতে দেবে না।
অনিমেষদা হাসলো।
আমি অনিমেষদার সঙ্গে নিচে নেমে এলাম। নিচে বেশ ভিড় দেখলাম। বুঝলাম উৎসাহী মানুষের অভাব এখনও কমে নি। আবীরবাবু অনেকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন।
পার্টিগতো ডেকরাম। অনিমেষদা গাড়িতে উঠে বসলো। প্রবীরদা আর একটা গাড়িতে।
গাড়িতে ওঠার আগে অনিমেষদা ইশারায় বললো, ফোনটা খোলা রাখিস যদি কিছু দরকার পরে।
আমি মাথা দোলালাম।
আমি অনিমেষদাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে ওপরে উঠে এলাম।
এতক্ষণ এই ঘরটা জমজমাট ছিল এখন ফাঁকা। ইসির খাটে টান টান হয়ে শুলাম।
বড়োমা, জ্যেঠিমনি, দামিনীমাসি ঘরে ঢুকে আমাকে দেখে মুচকি মুচকি হাসছে।
কাজ শেষ হলো? বড়োমা বললো।
কিছুটা।
আবার কি ঘোঁট পাকিয়েছিস?
কিছু না।
কিছুনা মানে!
তুমি বিশ্বাস করতে পারো।
দামিনীমাসি হাসছে।
ডাক্তারদাদা কোথায়? জ্যেঠিমনির দিকে তাকালাম।
রথীন ডাক্তারকে নিয়ে ছাদে গেছে।
এবার যেতে হবে। কাল সকাল থেকে অনিকে আটকাবার চেষ্টা করবে না। বড়োমার দিকে তাকালাম।
ঠ্যাংদুটো বাড়িতে রেখে যাবি।
তোর সঙ্গে আমার কথা বলা হলো না। দামিনীমাসি বললো।
একে একে সবাই ঘরে ঢুকলো।
আমি উঠে বসলাম।
বান্ধবী অনিবাবু খট্টাঙ্গে চিৎপটাং? ডাক্তারদাদা বললো।
যতোসব বদ বুদ্ধি। বড়োমা আমার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চিপলো।
জ্যেঠিমনি, দামিনীমাসি হাসছে।
রথীন তাকিয়ে লাভ নেই। মা, ব্যাটার ব্যাপার।
ওর চোখ মুখটা দেখেছো।
তুমি আজ দেখছো, আমার দেখে দেখে ছানি পরেছে।
হাসলাম।
ইসি মা একটু চা খাওয়া।
ডাক্তারদাদা আমার মুখের দিকে তাকাল।
বেরবি তো? অনিমেষ আসবে বোললো।
আমি রেডি। দামিনীমাসির কথা শেষ হয়নি।
অসুবিধা না থাকলে সঙ্গে চলো, ও বাড়িতে সারারাত কথা বলবে।
দামিনীমাসি, বড়োমার দিকে তাকাল।
যাবে?
দামিনীমাসি মাথা নীচু করলো।
আমি তাহলে বাদ যাই কেনো। ইসলামভাই চেঁচিয়ে উঠলো।
আমি হাসলাম।
বাড়ির গেটে গাড়ি এসে দাঁড়াতেই দেখলাম ভেতরে সব লাইট জ্বলছে। তারমানে বাড়িতে কেউ আছে। বড়োমার দিকে তাকালাম। বড়োমা হাসলো। বুঝলাম বড়োমা ব্যাপারটা জানে। ছগনলাল গেট খুলে দিল। গাড়ি ভেতরে এসে বাগানের রাস্তায় দাঁড়াল আমি গাড়ি থেকে নামলাম। ওরাও সবাই নেমে এলো।
মিত্রার ফোনটা বেজে উঠলো।
হ্যালো….হ্যাঁ সবে মাত্র বাড়িতে ঢুকলাম। এখনও ঘরে যাই নি।….হয়তো বন্ধ….হো হো হো….
দেখলাম ভেতর থেকে টিনা, মিলি বেরিয়ে এলো। বুঝলাম এরা অফিস থেকে সোজা এখানে চলে এসেছে। তারমানে এরাও কিছুটা আঁচ করেছে আজকের ঘটনার সম্বন্ধে।
তোমরা কখন আসবে….রান্না টিনা, মিলি করছে….ঠিক আছে তোমরা নিয়ে এসো…. বৌদি সুরো আসবে! কি মজা হবে…. শোনো না একটু কষা কষা নিয়ে আসবে….আচ্ছা।
মিত্রা এতক্ষণ কথা বলেছে, দামিনীমাসি, ইসলামভাই, ছোটোমা, বড়োমা ওর মুখের দিকে সমানে চেয়ে আছে, বোঝার চেষ্টা করেছে মিত্রা কার সঙ্গে কথা বলছে। কথা শেষ করেই মিত্রা আমার সামনে এগিয়ে এলো। পেছন পেছন ওরা। চোখে মুখে বিস্ময়ের হাঁসি।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম ফোনটা কার হতে পারে। কথা শুনে বুঝলাম, খাওয়ার একটা আয়োজন হতে পারে। ডাক্তারদাদা গাড়ি থেকে নেমে এলো।
আবার কি হলো, তোমরা সব ওকে ঘিরে ধরে দাঁড়িয়ে আছ কেন?
একটু পরে বুঝতে পারবে। মিত্রা বললো।
তোরা শুধু শুধু ছেলেটাকে সন্দেহ করিস।
ওর সব কীর্তি এবার থেকে দেয়ালে খোদাই করে রাখতে হবে।
মিত্রা হাসিহাসি মুখ করে ডাক্তারদাকে বললো।
নীরু মিত্রার কথায় হাসছে।
আমি আর দাঁড়ালাম না। প্রচন্ড জোরে বাথরুম পেয়েছে। সোজা হাঁটা লাগালাম।
কিরে হন হন করে কোথায় যাচ্ছিস! তোর হবে দাঁড়া।
সিঁরি বেয়ে ওপরে তরতর করে উঠে এলাম। জামা প্যান্টটা কোনও প্রকারে ছেড়ে বাথরুমে দৌড়লাম। সব কাজ সেরে ভালো করে স্নান করলাম। শরীরটা এখন বেশ হাল্কাহাল্কা লাগছে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখলাম সুরো আমার খাটে চিত্তাল হয়ে শুয়ে আছে। বেশ সুন্দর একটা শালোয়াড়, কামিজ পরেছে। মাথার ওপর পাখাটা বন বন করে ঘুরছে।
কিরে তুই, এই অসময়ে!
তরাক করে বিছানায় উঠে বসলো।
ঢং, কিছু জানেনা যেন।
তারমানে!
এখানে জোর খাওয়া দাওয়া আছে।
স্পন্সর কে?
বাবা।
তোর বিয়ে?
ছুটে এসে দিলো আমার পেটে গোঁতা মারলো।
আমার বিয়ে খাওয়ার সখ হয়েছে।
আমি হেসে উঠলাম।
কেন তুই তো ইন্টুমিন্টু করছিস আমার কাছে সেরকমই খবর আছে।
আবার তেড়ে এলো। আমি ওর হাতটা চেপে ধরলাম। ধস্তা ধস্তি শুরু হয়ে গেলো। সুরো চেঁচিয়ে উঠলো।
কে বলেছে আগে শুনি।
কে আবার বলবে, আমি জানলাম।
কোথা থেকে জানলে বলো।
তাহলে আমার কাছে খবরটা ঠিক এসেছে বল।
ফালতু খবর। সুরো কোনওদিন এলি তেলি ছেলের সঙ্গে প্রেম করবে না।
তা ঠিক। তোর তো আবার….
খুব খারাপ হয়ে যাবে বলে দিচ্ছি অনিদা।
আমি ওর হাতটা ছেরে দিলাম।
আমাকে যে ফোন করে বললো তুই সেন্ট্রাল পার্কে হাতে হাত ধরে বসে আছিস।
সুরো গঁ গঁ করতে করতে আবার তেরে এলো।
তবেরে। আমি….
আবার ওর হাত দুটো চেপে ধরলাম।
টাওয়েল খুলে গেলে কিন্তু হুলুস্থূলুস কাণ্ড বেঁধে যাবে।
খুলুক।
সে কিরে! তোর বৌদি একেবারে কালিঠাকুর হয়ে যাবে।
ও কিরে দুজনে মারপিট করছিস কেন! গেটের সামনে ছোটোমা।
দেখো না অনিদা বাথরুম থেকে বেরিয়ে কিসব বলছে।
যা সত্যি তাই বলছি।
ছোটোমার পেছনে এসে বৌদি, মিত্রা দাঁড়াল
ওরা আমাদের এই অবস্থায় দেখে হাসছে।
ওরা মারপিট করুক। চল আমরা নিচে যাই। বৌদি বললো।
দেখো না মা অনিদা কি সব বলছে।
ও তোর অনিদা আর তোর ব্যাপার।
তাহলে সকলকে বলি।
আমি সুরোর দিকে ভ্রু নাচিয়ে বললাম।
সুরো দাঁত মুখ খিঁচিয়ে আমার পেট চিমটে ধরলো।
আর হবে বলো।
আমি উ উ করে উঠলাম।
আগে বলো আর বলবে।
না আর বলবো না। ছাড়।
বলো, যা বলিলাম মিথ্যে বলিলাম।
যা বলিলাম মিথ্যে বলিলাম।
আমার অপরাধ হইয়া গেছে সুরো।
এতো সাধু ভাষা বলতে পারবো না।
চলিত ভাষায় বলো।
তুই আগে ছার তারপর বলবো।
আগে বলো তারপর ছারবো।
বললাম।
মুখে উচ্চারণ করে বলো।
নোট পাবি না। ফার্স্ট ক্লাস হবে না।
না হোক তবু মুখে বলো।
ওরা তিনজনে গেটের সামনে সুরোর কীর্তি দেখে হেসে গড়িয়ে পরে।
আচ্ছা পরে বলছি। এবার কিন্তু আমার টাওয়েল খুলে পরে যাবে।
খুলুক।
সেকিরে! বৌদি গেটের মুখ থেকে চেঁচিয়ে উঠলো।
সুরো পেট থেকে হাত সরাল আমি একটু হাত বুলিয়ে নিলাম। জায়গাটা সামান্য লাল হয়ে গেছে। বহুত জোড়ে চিমটে ধরেছিল।
মনে রাখিস কষা মাংসের এক টুকরোও পাবি না। চেটে চেটে সব পাতে সাজিয়ে রেখে দেব।
আমি তাই খাবো।
ছোটোমারা আমাদের রকম সকম দেখে হেসে গড়িয়ে পরে যায়।
আমি একটা সাবেক পাজামা-পাঞ্জাবী আলনা থেকে টেনে বার করলাম।
সুরো ছুটে এলো।
এটা পরা হবে না।
সেকিরে তুইও আমার ওপর খবরদারি করবি নাকি!
বেশ করবো।
খেয়েছে।
খেয়েছে না খাইসে।
ওই হলো আর কি।
মিত্রা পায়ে পায়ে ভেতরে এলো।
কোনটা পরবে বল।
বিয়ের দিন সকালে যে গেড়ুয়া রংয়েরটা পরেছিল সেইটা।
তোর কি আজ বিয়ে।
আবার….।
সুরো তেরে এলো।
ঠিক আছে ঠিক আছে মিত্রা তাই দে ডাকিনী, যোগিনীর হাত থেকে অন্ততঃ বাঁচি।
সুরো আবার তেরে এলো, আমি মিত্রার পেছনে আশ্রয় নিলাম। ঢাল বানালাম মিত্রাকে।
কি ভেবেছ কি বৌদি তোমাকে বাঁচাবে।
না। তুই হাফ মার্ডার করবি আর তোর বৌদি হাফ। তাহলেই ষোলকলা পূর্ণ।
কিগো তোমার জামা কাপর পড়তে এতো দেরি।
হাসতে হাসতে টিনা ওখানেই বসে পরলো।
তোমরা তিনজনে কি করছো?
ঘুসো-ঘুসি। সুরো মারছে আমি মিত্রাকে দিয়ে আটকাচ্ছি।
এই মিলি দেখবি আয় অনিদার অবস্থা।
টিনা তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো।
দেখলি, দেখলি একেবারে কেল করে দিলি।
বেশ করেছি।
এবার সারা পাড়া রাষ্ট্র হয়ে যাবে।
হোক।
ঠিক আছে ঠিক আছে। উইথড্র।
ঠিক।
ঠিক। যা বলেছি সব।
সুরো ঘুরে দাঁড়াল
মাথায় রাখিস, এবারের মতো ছেরে দিলাম পরের বার হলে….
সুরো দাঁত মুখ খিঁচিয়ে আবার তেরে এলো। আমি জড়িয়ে ধরলাম।
তুমি কিছু করতে পারো না। মিত্রার দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠলো।
মিত্রা খিল খিল করে হাসছে।
আমি কি করবো বল।
চিমটি কেটে পেটের মাংস তুলে নেবে।
মিলি, বড়োমা এসে হাঁসির আসরে যোগ দিয়েছে।
ওরা কি করছে রে ছোটো।
কথা বোলো না, বৌদি বলেছে শুধু দেখে যেতে। টিনা বললো।
ও সুতপা।
থামো তো তুমি। খালি সুতপা আর সুতপা।
তা বলে ধিংগিগুলো মারপিট করবে।
আজ দেখছো তাই বলছো, আমার দেখে দেখে চোখে ছানি পরে গেছে।
ও সুরো ছার ছার রোগা প্যাটকা ছেলে….
রোগা প্যাটকা। সুরো ভেংচি কাটল।
জানো গায়ে অসুরের মতো শক্তি।
মিত্রা হাসতে হাসতে খাটে গিয়ে বসে পরলো। আমি সুরো কে জড়িয়ে ধরলাম।
দেখ ঘেমে গেছি। অনেকক্ষণ ধস্তা ধস্তি হয়েছে। বহুত খিদে লেগেছে।
মাংস আমার।
সবাই এবার জোড়ে হেসে উঠলো।
শুধু মাংসো নয় আমার পাতে যা পরবে সব তোর।
সুরো আমার কি থাকবে। মিত্রা চেঁচিয়ে উঠলো।
তোমাকেও ভাগ দেব।
ওরা সবাই হাসতে হাসতে বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছে।
ধস্তা ধস্তির পরিসমাপ্তি হলো। হাসতে হাসতে যে যার ক্লান্ত।
ওরে বাবারে সত্যি তোরা পারিসও বটে। ছোটোমা বলে উঠলো।
আমি মিত্রার বার করা পাজামা-পাঞ্জাবী নিয়ে ছোটোমার ঘরে চলে গেলাম। বাথরুমে গিয়ে আবার গায়ে একটু জল ঢাললাম। তারপর পাজামা পাঞ্জাবী পরলাম।
এ ঘরে এসে দেখি সব নিচে চলে গেছে। বারান্দা দিয়ে লক্ষ্য করলাম পাঁচ খানা গাড়ি লম্বা করে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লালবাতির গাড়িও আছে। বুঝলাম নিচে অনেক ভিড়ভাট্টা। আমি মোবাইলটা পকেটে নিয়ে নীচে নেমে এলাম।
আয় আয় বিধানদা আমাকে দেখেই বলে উঠলো। আমি মুচকি হাসলাম।
ঘরে পা রেখেই চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম।
সোফায় পাঁচ মাথা, চেয়ারে দামিনীমাসি, ইসলামভাই। রতন, আবিদ, অবতার, সাগির এক কোনে বসে আছে। বুঝে গেলাম কেশটা কি হয়েছে। এরাও সব জেনে গেছে। রান্নাঘরের সামনে নীরু, সুরো খেয়োখেয়ি করছে সঙ্গে মিত্রা। তালে তাল দিচ্ছে মিলি, টিনা। বড়োমার ঘরে উঁকি মেরে দেখলাম ডাক্তারদাদা, দাদা, মল্লিকদা। তারমানে দাদা, মল্লিকদাও চলে এসেছে!
প্রবীরদা আমাকে দেখেই উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে আসতে গিয়ে বাধা পেল।
বিধানদা চেঁচিয়ে উঠলো।
না প্রবীর আমাদের আইডিয়োলজিতে ইমোশনের কোনও দাম নেই, বি-প্র্যাকটিক্যাল। বাস্তব যেটা সেটা মেনে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলি।
অনুপদা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
ইসলামভাই, দামিনীমাসিও হাসছে।
অবতার, সাগির দুজনেই আমার কাছে এগিয়ে এলো।
এই তোরা কি ফুসফুস করতে যাচ্ছিসরে। এতক্ষণ বোবা হয়েছিলি, অনিকে দেখামাত্রই মুখে বোল ফুটে গেল। রূপায়ণদা চেঁচিয়ে উঠলো।
ওরা মাথা নীচু করে এসে আমার সামনে দাঁড়াল। সবাই তাকিয়ে দেখছে।
বাবুর সময় হলো নিচে নামার—
ঘর থেকে বেরতে বেরতে দাদা আমার দিকে তাকিয়ে বললো।
মল্লিকদা আমাকে দেখে হাসতে হাসতে বললো। তুই পারিসও বটে।
তোমার কাজটা এবারও পুরো করতে পারলাম না। অবতার মাথা নীচু করে বললো।
অনিমেষদা, বিধানদা আমার দিকে তাকিয়ে। মিটিমিটি হাসছে।
ওদের মতো এরকম বিশ্বস্ত সৈনিক পেলে আমরা অনেক দূর এগোব বুঝলি অনি।
রূপায়ণদা ফুট কাটলো।
দাদাদের সব বলেছিস?
সাগির মাথা দোলাল, বলেনি।
মাসি কিছু বলেছে?
না।
ইসলামভাই?
না।
রতন আমার হাতে একটা খাম দিল।
গেছিলি?
রতন মাথা দোলাল।
করে দিয়েছে?
হ্যাঁ।
কোনও ঝামেলা করে নি?
বললো তুই আবার কবে থেকে একে চিনলি।
একটু ছুঁয়ে দিলি?
রতন হাসতে হাসতে মাথা দোলাচ্ছে।
সাগির ওদিককার খবর?
ঠিক আছে। একটু ঝামেলা করেছিল। আমি লোক লাগিয়ে দিয়েছি।
ফোন-টোন কিছু করেছিল?
না।
খবরা-খবর চালু রাখবি।
দাদা দেখছেন ওর কারবারটা। ইসলামভাই বললো।
দেখছি, দাঁড়াও বোঝার চেষ্টা করছি। বিধানদা বললো।
দাদাদের এবার সব বলে দে। যা যা প্রশ্ন করবে সব।
অবতার, সাগির আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
আবিদ তুই বাইরে আয়।
কেন ও বাইরে যাবে? এতক্ষণ বেশ হচ্ছিল হোক না। অনিমেষদা বললো।
না এটা একেবারে অন্য, তোমাদের এখন জানান যাবে না।
সুতপা—
আবার কি হলো—
তোমার পুত্রবতের অবস্থা দেখেছ। আমরা এখানে বসে আছি, পাত্তাই দিচ্ছে না।
তোমাদের কোনও ক্ষতি করেছে?
বিধানবাবু উত্তর শুনলেন।
শুনলাম। সুতপা একটু চা দাও তারপর খাব।
দাদা কটা বাজে খেয়াল আছে?
আছে আছে। এতবড়ো একটা অসম্মানের হাত থেকে অনি সকলকে বাঁচাল, সেই উপলক্ষে একটু চা চাইছি।
বাবাঃ ছেলের কীর্তিটা তাহলে স্বীকার করছেন। আপনারা সহজে কিছু স্বীকার করেন না।
বিধানদা হেসে উঠলো।
আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম। আবিদের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথা বললাম। তারপর ভেতরে এলাম। দেখলাম তখনও চা খেতে খেতে অনিমেষদা, বিধানদা, সাগির, অবতারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে চলেছে। ওরা কখনও চুপ করে আছে, কখনও উত্তর দিচ্ছে। আমি ভেতরে এসে একটা চেয়ার নিয়ে বসলাম।
এবার ওদের ছেড়ে দাও। খেয়ে দেয়ে চলে যাক, অনেক কাজ আছে।
আবার কিসের কাজ!
আছে। কিছু ছোটছোট কাজ আছে।
সাগির, অবতারের দিকে তাকিয়ে বললাম।
যা বাথরুমে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নে।
আমি বলার সঙ্গে সঙ্গে ওরা উঠে দাঁড়াল। ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। অনিমেষদার দিকে তাকালাম।
খোঁজ খবর নিলে। আমি যা বলেছিলাম মিললো কিছু।
অনিমেষদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
প্রবীরদা আর কাউকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করো না।
তুই বিশ্বাস কর অনি।
আমার গায়ে জননেতার গন্ধ নেই তোমার আছে। চোখের সামনে প্রমাণ করে দিলাম।
আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না।
বিশ্বাস করা না করা তোমার ব্যাপার।
একটু থেমে।
ডাক্তারদাদা ধরতে না পারলে তোমরা কিছুই জানতে পারতে না।
সে তো বুঝলাম। বিধানদা বললেন।
ওই ভদ্রলোকের সম্বন্ধে কি ডিসিসান নিলে।
এখনও কিছু নিইনি। কালকে একবার সকলে বসবো। মিটিং-এ ডেকে পাঠাই তারপর।
দেরি কোরো না।
কেন!
যে টুকু ক্ষতি করার করে দিয়েছে। বাকিটা সুযোগ দিও না। আর একটা কথা।
বল।
মাসিকে এখন কোনও দায়িত্ব দিও না। কিছুদিন যাক তারপর দিও।
কেন বলছিস!
পরিবেশটা অনুকূল নয়।
তুই অরিত্র আর অর্ককে কোথাও পাঠিয়েছিস। দাদা বললো।
আমি! কোথাও পাঠাই নি।
ওরা বেশ কয়েকদিন অফিসে আসছে না।
ফোন করে দেখ।
সন্দীপ বহুবার ফোন করেছে, স্যুইচ অফ।
তোমার কি দরকার অফিসের হাজিরা খাতায় নাম লেখান, না সংবাদ।
অনিমেষদা, বিধানদা হেসে উঠলো।
দুটোই।
সম্ভব নয়।
তারমানে!
কোনও মানে নেই।
অনি, কি বলছেরে তোর দাদা। বড়োমা রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে উঠলো।
এবার অনুপদা, রূপায়ণদা, প্রবীরদা তিনজনে একসঙ্গে হেসে উঠলো।
দেখলে, দেখলে ডাক্তার অবস্থাটা দেখলে। দাদা, ডাক্তারদাদার দিকে তাকাল।
দেখে কি করবো। তোমার লেখা পাওয়া নিয়ে দরকার, পেয়ে যাবে।
অনেক হয়েছে এবার ওঠো। বিধানদা চটপট করে রেডি হতে হবে। রাত হয়ে গেছে। বৌদি এসে তাড়া লাগাল।
সবাই উঠে দাঁড়াল ইসলামভাই গিয়ে রতনদের ডেকে নিয়ে এলো। ওরা ধরাধরি করে সব টেবিল চেয়ার একপাশ সরিয়ে দিলো। নিচে আসন পাতা হল।
বড়োমা আজ আমি অনিদার পাশে।
বড়োমা সুরোর দিকে তাকিয়ে হাসল।
আবার শুরু করবি?
না।
মনে থাকে যেন।
হ্যাঁ।
তোর বৌদি কোথায় বসবে?
আর এক পাশে বসবে।
এটা কি হলো সুতপা। অনিমেষদা, বৌদিকে বললো।
আর বলো না। এসে একচোট অনির সঙ্গে হয়ে গেছে।
কেন!
জিজ্ঞাসা করো তোমার মেয়েকে।
নাগো বাবা আনিদা বাজে কথা বললো তাই।
তাই বলে তুই….।
একটু, বেশি না।
ঠিক করেছিস, আমি বলছি তোকে, পারলে বেশি করে করবি। তোকে এবার থেকে ওর নজরদারি করার দায়িত্ব দেব। বিধানদা বললো।
দেবে?
পারবি।
তুমি বলোনা এক চিমটিতে পেট থেকে সব কথা বার করে নেব।
সুরোর কথায় সবাই হাসে।
মাথায় রাখিস আমার পাশে বসা হবে না।
বড়োমা বলেছে।
বড়োমার পাশে বসবি।
মাংসগুলো দিয়ে দেবে।
সবাই হাসছে।
খেতে বসা হলো।
খেতে খেতে অনিমেষদা বললো।
জানিষ অনি তোর সব কথা ঠিক ঠিক লেগে গেছে, একটা কথা লাগেনি।
কোনটা বলো।
ওরা প্রবীরকে ফাঁসাতে চেয়েছিল ঠিক, তবে তার আগে তোর নামটা ছিল।
তুমি আমার কাছ থেকে যেটা জানতে চইছো, সেটা এত সহজে জানতে পারবে না। তবে একটা কথা বলে রাখি, আমি যদি টার্গেট হতাম। কাজটা অবতাররা ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে খতম হয়ে যেত। সময় দিত না। এবার তুমি যা বোঝার বুঝে নাও।
সবাই খাওয়া থামিয়ে আমার মুখের দিকে তাকাল।
যা বলছি ঠিক বলছি। তুমি অবতার আর সাগিরকে ছাড়িয়ে এনেছ। ওদের চারজনকে ছাড়িয়ে আনতে পারনি। ওদের কাল পরশু ছাড়িয়ে আনব। একচ্যুয়েলি অবতার, সাগির ফিডব্যাক দিত, কাজটা করতো ওরা। অবতার, সাগিরও ওদের চেনে না।
তাই কি আবিদের সঙ্গে বাইরে দাঁড়িয়ে সেই কথাই আলোচনা করলি।
চুপ করে থাকলাম, কোনও কথা বললাম না।
আন্ডারওয়ার্ল্ডের ব্যাপারটা তুই বেশ ভাল রপ্ত করে ফেলেছিস।
বাঁচার তাগিদে, না হলে কুকুর বেড়ালের মতো সকলে ছিঁড়ে খেয়ে ফলতো। আশা রাখি তার প্রমাণ তোমাদের এই কয়মাসে বহুবার দিয়েছি।
আস্বীকার করছি না।
তোমরা পলিটিক্যালি ব্যাপারটা জানতে পেরেছিলে। কবে জানতে পেরেছিলে?
আজ সকালে জেনেছিলাম। অনুপদা বললো।
আমি যদি টার্গেট হতাম কাল রাতেই কাজ হাসিল হয়ে যেত। তোমরা বড়োজোড় একটা তদন্ত কমিশন বসাতে। তার রিপোর্ট জমা পরতো তিন বছর পর। কি হতো?
সবাই চুপ করে গেল। সুরো আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। আমি ওর পাতে আমার পাত থেকে দুটো মাংসের টুকরো তুলে দিলাম। সুরো হাসলো। দুটো তুলে দিলাম মিত্রার পাতে।
তুই খাবি না। মিত্রা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
আমার দুটে আছে। বড়োমা তোদেরটাও আমার পাতে দিয়ে দিয়েছে। না হলে কম পরে যাবে।
তাহলে আর একটা দাও।
চেটে নিই তারপর দিচ্ছি।
উঁ কতো খায়।
দেখেছিস তোর বাবা খাওয়ার সময় ইনটরোগেসন শুরু করে দিয়েছে।
ওই জন্য তোমায় বললাম আমাকে একটু শিখিয়ে দাও। বাবাকে নিয়েই প্রথম লিখব।
কি লিখবি বাবা খারাপ কজ করছে।
তা না।
তাহলে।
তুমি বলে দেবে।
সুরো মাংসের হাড়টা ভালো করে চুষলো।
এটা খাবে?
দে।
এ্যাঁ কত খায়।
হাসলাম।
প্রবীরদা।
বল।
তোমার এখনও দুটো ফাঁড়া আছে। তুমি একটু চোখ-কান খোলা রেখে চলো, বুঝতে পারবে।
অনিমেষদা আমার দিকে তাকাল। মুচকি মুচকি হাসল।
কিগো ইসলাম তোমার কাছে এরকম কোনও খবর আছে।
সত্যি বলছি দাদা, গত দেড়মাস আমি রতন, আবিদকে সব ছেড়ে দিয়েছি। আমি শুধু আপনার কাজটায় মন দিয়েছি। এদিকটা ওরাই দেখে।
হ্যাঁরে রতন।
রতন মুখ তুললো।
তোদের নামে পুলিশের খাতায় কোনও খারাপ রিপোর্ট দেখিনা। এতো সব কাজ করিস কি করে।
দাদা খারপ কাজ করতে বারণ করে দিয়েছে।
তাহলে খারাপ কাজগুলো করে কারা।
রতন চুপ করে রইলো।
বলবি না, এই তো।
অমিতাভদা আপনি কিছু ধরতে পারছেন।
সত্যি কথা বলবো অনিমেষ।
বলুন।
তোমার সঙ্গে বিধানবাবুর সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। সেই সময়ের কথা বাদ দিলে, বর্তমানে একজন কাগজের সম্পাদক হিসাবে যতটা পরিচয় থাকা দরকার ততটা। এককথায় মুখ চেনা। এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু গত দেড়মাসে তোমাদের সঙ্গে যতটা ঘনিষ্ঠতা হলো সেটা ছিল না।
তোমার সঙ্গে যে ওর এতটা ঘনিষ্ঠতা আছে সেটাও ঘুণাক্ষরে জানতাম না। তুমি ওর বড়োমাকে জিজ্ঞাসা করতে পার। অফিসে গণ্ডগোল হলো। একদিন ওকে ডেকে মিত্রার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম। সেদিন প্রথম ওর চোখমুখের চেহারার পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম।
এরপর মিত্রা যখন আমাদের সঙ্গে জড়িয়ে পরলো। তারপর থেকে একের পর এক এই ঘটনাগুলো একটু একটু জানতে পারলাম। তার আগে অনি এ বাড়িতে থেকেছে খেয়েছে শুয়েছে, ঘুণাক্ষরেও কিছু জানতে পারিনি। তবে ওর আর্টিক্যালগুলো দেখে মাঝে মাঝে সন্দেহ হতো। এ ধরণের আর্টিক্যাল সেই-ই লিখতে পারে, যে ওই ক্লাসের সঙ্গে গভীরভাবে মেশে। বিশেষ করে যে লেখাটা লিখে ও নাম করলো।
মাসিদের নিয়ে লেখাটা বলছেন তো?
হ্যাঁ।
প্রত্যেকটা ইনস্টলমেন্ট আপনার কাগজে দেওয়ার আগে ও সুতপাকে পড়িয়ে নিত। আমি সুতপার কাছ থেকেই জেনেছি। আমার সঙ্গে প্রয়োজন ছাড়া ও বিশেষ কথা বলতো না। যতো জাড়িজুড়ি সুতপার কাছে। সুতপাকে ও মন খুলে অনেক কথাই বলতো, মিত্রার কথাও একবার নয় বহুবার বলেছে, সুতপার মুখ থেকে ওর কথা শুনে শুনে ওর প্রতি একটা দুর্বলতা এলো, বলতে পারেন ইনটারেস্ট, তখন ওর সম্বন্ধে একটু আধটু খবর নেওয়া শুরু করলাম। কিন্তু চেষ্টা করেও ওর স্থায়ী ঠিকানা জোগাড় করতে পারি নি। কারন জানেন?
না।
ও তখন ওই জায়গায় অনি নামে বিখ্যাত ছিল না। সকলে মাস্টার বলে জানত। তাছাড়া দামিনী, ইসলাম ছাড়া ও যে সাংবাদিকতা করে এটাও কেউ জানত না। কি দামিনী আমি ঠিক কথা বলছি?
দামিনীমাসি মাথা দোলালো। আমি এই আলোচনায় কোনও ইনটারফেয়ার করলাম না। বুঝলাম অনিমেষদা একটা জাল বিস্তার করছে, কিছু জানার তাগিদে।
আপনাক সংক্ষেপে বললাম। আরও অনেক কিছু ওর সম্বন্ধে এই কদিনে উদ্ধার করেছি।
খারাপ না ভালো। দাদা বললো।
সময় বলবে।
বলা যাবে না।
না।
ছোটো দুটো ভাত দাও। বিধানদা বললো।
হ্যাঁ দাদা দিই।
ছোটোমা উঠে গেল।
হ্যাঁরে অনি জিজ্ঞাসা করলি না আজকের খাওয়াটা কি উপলক্ষে।
আমি বিধানদার দিকে তাকালাম। তারপর সুরোর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলাম।
চিমটি কেটে পেটের মাংসো তুলে নেব। সুরো খিঁচিয়ে উঠলো।
কে কি বুঝলো জানি না, আমি হেসে ফেললাম।
কিরে তোর আবার কি হলো? অনিমেষদা বললো।
তোমাকে জানতে হবে না।
ওরকম করে উঠলি কেন?
আসার পর থেকে এরকম চলছে। বৌদি বললো।
টিন হাসছে।
টিনাদি খুব খারাপ হয়ে যাবে। সুরো আবার চেঁচাল।
না না আমি বলবো না। মিত্রাদি যদি বলে দেয়।
তুমি বৌদিকে বলেছো!
একটু।
সুরো ঘ্যান ঘ্যান করে উঠলো।
সবাই হাসছে।
কি হয়েছেরে অনি। বিধানদা বললো।
বলে দিই। সাসপেন্সে রেখে লাভ কি। আমি বললাম।
খুব খারাপ হয়ে যাবে।
আচ্ছা বলবো না। তোর ভাগের মিষ্টিগুলো আমার।
ঠিক আছে।
অনিমেষদা হেসে উঠলো।
বিধানবাবু।
বুঝলাম। তারমানে এখানেও একটা গণ্ডগোল আছে।
কোনও গণ্ডগোল নেই। সুরো চেঁচিয়ে উঠলো।
তাহলে।
তাহলে আবার কি।
তোকে নজরদারির চাকরিটা দেওয়া যাবে না।
দিও না। বয়েই গেছে।
তাহলে খাওয়া দাওয়াটা কিসের জন্য তুই বল। বিধানদা বললো।
আমি সুরোর দিকে তাকালাম।
বাবা বললো অনি একটা ভালো কাজ করেছে।
সুরো আমার দিকে তাকিয়ে।
তাই প্রবীর বলেছে অনির বাড়িতে আজ রাতে খাওয়া দাওয়া। চলে আয়। তাই চলে এলাম।
তোর বিশ্বাস হয় অনি ভালো কাজ করেছে? বিধানদা বললো।
অনিদা খারাপ কাজ করে না। প্রবীরকাকু তো বললো অনিদা বয়সে বড়ো হলে অনিদাকে প্রণাম করতো। খারাপ কাজ করলে প্রবীরকাকু এই কথা বলতো।
বিধানদা হাসছে।
জব্বর কথা বলেছে সুরো। কি বিধানবাবু এর পর আর কোনও প্রশ্ন করবেন। ডাক্তারদাদা বললো।
বিধানদা হাসছে।
ইসলাম। ডাক্তারদা, ইসলামভাই-এর দিকে তাকালো।
বলুন দাদা।
তুমি তো পর্শু চলে যাবে। এদিককার কাজের কি ব্যবস্থা করেছো?
আমি কালকে সব বুঝিয়ে দিয়ে যাব।
অনি।
বলো।
আমার টাকার কি হলো?
পেয়ে যাবে।
কিসের টাকা! অনিমেষদা বললো।
বাড়িটা সারাতে হবে না।
অনুপ ব্যবস্থা করবে।
না। আমি বললাম।
কেন!
তোমরা অনেক সাহায্য করছো এটাই যথেষ্ট। বাকিটা আমি ঠিক জোগাড় করে নেব।
আমরা যদি কিছু সাহায্য করি।
ব্যাঙ্ক এ্যাকাউন্টটা করতে দিয়েছি। হয়ে যাক, তোমরা সাহায্য পাঠিয়ে দেবে। তখন কোনও বাধা দেব না।
অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
তোকে সবাই কান ধরে, এবার আমি কান ধরবো।
তা ধরতে পারো। কিন্তু ওটা আমার খুব সফ্ট কর্নার। বরং সুরোর কাছ থেকে আমি সাহায্য নেব।
ও তোকে সাহায্য করবে বলেছে।
হ্যাঁ। ডোনেসনের বিল ছাপতে দিয়েছি। ওকে একটা দেব ও ডোনেসন তুলে নিয়ে আসবে। ও তো এই ফাউন্ডেসনের একজন মেম্বার।
সুরো মিটি মিটি হাসছে।
আর কাকে কাকে মেম্বার করলি?
তোমাদের সকলের নাম প্রস্তাব করে চিঠি পাঠান হয়েছে। যারা যারা সম্মতি দেবে তাদের আমরা মেম্বার করবো।
কি করতে হবে?
ওখানে ডিটেলসে লেখা আছে।
দাদা, পাকা পোক্ত কাজ। অনুপদা ফুট কাটল।
সে আর বলতে।
তোমরা সকলে মিলে ওকে চেপে ধরেছো কেন বলো। বড়োমা বললো।
ওকে সেই ভাবে পাই কোথায় বলুন দিদি।
অনিমেষদা এমনভাবে কথাটা বলে থামলো, সারাটা ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আমরা চেষ্টা করলে ওর মতো কাজ করতে পারি। কিন্তু আমাদের অনেক অবলিগেশন। ও যেটা একলা তাৎক্ষণিক ভাবে ডিসিশন নিতে পারে, আমাদের সেটা একটু বেশি সময় লাগে। তাতে সব সময় যে ক্ষতি হয় তা নয়, তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের ক্ষতি হয়ে যায়। পলিটিক্যালি তাকে ধামা চাপা দেবার ব্যবস্থা করি। সব সময় হয়ে ওঠে না। এ সব কথা যদিও বলা ঠিক নয়, তবু আপনারা সবাই ঘরের লোক বলে মনে করছি। তাই বলছি।
ওর কাছ থেকে আমাদেরও কিছু শেখার আছে। প্রবীরকে আমি ব্যক্তিগতভাবে বলেছি। তুমি অন্যায় করেছ এটা স্বীকার করো। ও মেনে নিয়েছে। এও বলেছি সেদিন রাতে তেমার সঙ্গে অনি যে ব্যবহার করেছে তাতে তেমার মনে কোনও দাগ কেটেছে। ও স্বীকার করে নিয়েছে। অনির জায়গায় অন্য কেউ হলে ও ভেবে দেখতো। অনি মন থেকে এটা করতে চায়নি। তবে অনি আমাকে শিক্ষা দিয়েছে।
জিজ্ঞাসা করুণ আমি কিন্তু প্রবীরের সামনে এই কথা বলছি। আজও প্রবীর যখন আমাকে বললো, দাদা আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে। তখনই মনে একটা কু গেয়েছে। আসতে আসতে অনুপকে ফোন করলাম। দেখো তো কোনও খবর আছে কিনা অনিকে নিয়ে। তারপরে প্রবীর গাড়িতে আসতে আসতে সব বললো। বুঝলাম আবার কোথাও একটা গণ্ডগোল পেকেছে। অনির কাছে সব শোনার পর অনুপকে ফোন করতেই বললো ও সব খবর জোগাড় করেছে। বুঝে গেলাম।
ওখানে আমি পৌঁছবার আগে বিধানবাবু পৌঁছে গেছিলেন। আবহাওয়া খুব একটা যে ভালো ছিলো তা বলবো না। তবে ওর সৈনিকগুলো ওকে খুব ভালোবাসে। ও যদি মন থেকে ওদের কাছে কিছু চায় সেই কাজটার জন্য ওরা জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিয়ে দেবে।
আমি মাথা তুলে ঘরের পরিবেশটা একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিলাম। সবাই অনিমেষদার কথা মন দিয়ে শুনছে। বলতে পারা যায় গিলছে। ইসলামভাই, রতন, আবিদরা এই প্রথম অনিমেষদাকে এতো কাছ থেকে আলাপচারিতায় দেখছে। অবতার, সাগিরের চোখে কেউ যেন হাজার পাওয়ারের বাল্ব জেলে দিয়েছে।
আচ্ছা মিত্রা তোকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো?
বলুন।
কিছু মনে করবি না?
না।
অনিকে তুই কতো মাইনে দিস?
ও মালিক হওয়ার আগে পঞ্চাশ হাজার টাকা।
এখন?
এখনও ও সেই টাকা নেয়। ওর ডিরেকটরশিপ রেমুনারেশন নেয় না। রিফিউজ করেছে।
তোর সঙ্গে যখন ওর আবার দেখা হলো তারপর এই সব ঘটনা ঘটলো। তুই ওর আরও কাছে এলি। কখনও ওকে জিজ্ঞাসা করেছিস ও একা মানুষ এতো টাকা ও খরচ করে কোথায়?
একবার করেছিলাম। উল্টে বলেছিল ওই টাকায় ওর কুলোয় না।
অনিমেষদা মিত্রার দিকে মুখ তুলে তাকাল, বিধানদার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। ব্যাপারটা এরকম আমি যে অনুসন্ধিৎসু নিয়ে এই কথা বলছি তা মিলছে। বিধানদা চোখে চোখে হাসল।
ওর খাওয়া দাওয়ার পয়সা লাগে না। বেশিরভাগ সময় ওর যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিষ তুই কিংবা দিদি বা ছোটো কিনে দিস। তারপর ওর বৌদি আছে মাসি আছে, ইসলাম আছে। ওর খাওয়া খরচ লাগে না, থাকার খরচ লাগে না। বাজে খরচ ও করে না। একটা মানুষ শুধু অটো, বাস, ট্যাক্সি চড়ে এত টাকা খরচ করতে পারে। তাও….।
মিত্রা চুপ করে রইলো।
অনিমেষদা বড়োমার দিকে তাকাল। দিদি আপনি কখনও জিজ্ঞাসা করেছেন?
আমি যতোটুকু জানি ওর দাদা ওর মাইনের কিছু টাকা কেটে ওর বাড়িতে প্রতিমাসে মানি অর্ডার করে পাঠায়। আগে কম পাঠাতো এখন বেশি পাঠায়। ওর টাকা ও খরচ করে।
অমিতাভদা আপনি কিছু জানেন?
না।
অনিমেষদা এবার আমার দিকে তাকাল।
কিরে আমাকে দাদা বলে ডাকিস, সম্মান করিস, এবার সবার সামনে আমার প্রশ্নের উত্তর দে।
আমি অনিমেষদার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম মুচকি হেসে মাথা নীচু করলাম। মনে মনে বললাম তুমি অনেক ঘোরেল মাল। ঠিক খবর তুমি জোগাড় করে ফেলেছ।
অফিসের টাকা ছাড়াও তুই আরও রোজগার করিস। সব তোর কঠোর পরিশ্রমের টাকা। সেগুলো কি করিস?
অনুপদা জানে অনুপদাকে জিজ্ঞাসা করো।
সবাই আমার দিকে তাকাল।
অনুপদা জোড়ে হেসে উঠলো।
অনিমেষদা মুচকি হাসল।
হাসছো কেন?
তোর মেধাকে কুর্নিশ করছি।
কেন?
অনুপ জানবে কি করে? অনিমেষদা বললো।
অনুপদা লোক পাঠিয়েছিল। নিজে সেই সব জায়গায় ভিজিট করে এসেছে। নীরু।
গলার স্বরটা একটু বদলে গেল।
তুই বিশ্বাস কর, বটার কোনও দোষ নেই।
আমি নীরুর দিকে কটকট করে তাকিয়ে।
অনুপদা ডাক্তারকে টোপ দিয়েছে এক মাসের মধ্যে প্রমোশন করিয়ে দেবে। বটা বলে এসেছে অনুপদা একমাত্র আপনাকে অনির হাত থেকে বাঁচাতে পারে। ডাক্তার রাজি হয়েছে, অনুপদা কথা দিয়ে এসেছে।
নীরু এক নিঃশ্বাসে কথা বলে থামলো।
বিধানদা অট্টহাসির মতো হাসতে শুরু করলো। বৌদি, ছোটোমা, বড়োমা, দামিনীমাসি খাওয়া থামিয়ে আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। ডাক্তারদাদা স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে। আমি পকেট থেকে ফোনটা বার করলাম।
(আবার আগামীকাল)