জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
৬৬ নং কিস্তি
ওটা পকেটে রাখ। অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে।
আমি অর্ক, অরিত্রকে আর ওই মেয়েদুটোর কি যেন নাম….।
রাত্রি আর খুশী। মিত্রা ফুট কাটল।
হ্যাঁ।
ছোটো আমাকে আরও দুটো মিষ্টি দাও।
ছোটোমা উঠে দাঁড়ালো।
সেকিগো! এ মাসের সুগারটা একটু নর্মাল আছে তাই বলে….। বৌদি বললো।
অনি আমার সুগার নর্মাল রাখতে দেবে না। বরং মিষ্টি খেয়ে নর্মাল রাখি।
ছোটো আমাকেও দিও। বিধানদা বললো।
ছোটোবান্ধবী আমিই বা বাদ যাই কেন। ডাক্তারদাদা বললো।
ছোটোমা সবাইকে দিতে দিতে আমার সামনে এসে দাঁড়াল।
লাগবে না।
কেন, পেট ভড়ে গেছে। ছোটোমা বাঁকা চোখে তির্যক দৃষ্টি হানল।
ছোটোমার দিকে তাকালাম। সবাই মুচকি মুচকি হাসছে।
অনিদার ভাগটা আমাকে দাও। সুরো বললো।
সুরোর দিকে তাকালাম।
অনেক খেয়েছো। হজম হতে সময় লাগবে।
হাসলাম। খুব মজা না।
এমনি এমনি বললাম। বাবা তোমাকে বেশি ভালোবাসে কিনা।
মাথায় রাখিস।
ফুটো হয়ে গেছে।
ঠিক সময়ে ঝালাই করে দেব।
সে দিও এখন তোমার ভাগেরটা খাই।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
কিরে উঠছিস কেন। শেষটুকু শুনে যা। অনিমেষদা হাসতে হাসতে বললো।
বড়োমাকে শোনাও। চোখ দুটো দেখেছো।
তুইও শুনে যা।
না।
গিয়ে আবার ফোন করিস না যেন। সব দায় আমার আর বিধানবাবুর ঘারে নিয়ে নিয়েছি।
পেছন ফিরে একবার হাসলাম। বাইরের বারান্দার বেসিনে মুখ ধুয়ে ওপরে চলে এলাম।
ঠিক পনেরো দিন পরে অফিসের গলির মুখে এসে দাঁড়ালাম। এই কটা দিন খুব চাপ গেল শরীররে ওপর দিয়ে। কলকাতায় সাকুল্যে ছিলাম মাত্র দু-দিন, বাকি কটা দিন বাইরে বাইরেই কেটেছে। যে দুদিন কলকাতায় ছিলাম মিত্রা আমার সঙ্গে ঠিক ভাবে কথা বলেনি। ওর একটাই কথা, আমারও কিছু কথা থাকতে পারে তোর সঙ্গে।
ওকে বলে বোঝাতে পারি না, আমি নিজের জন্য সময় নষ্ট করছি না। তুই আমাকে পাকে পাকে জড়িয়ে ফেলছিস। এই গেড়ো থেকে বেড়িয়ে আসা সত্যি খুব মুস্কিল। এই কদিন অফিসের যে টুকু খোঁজ খবর রেখেছি তা নিজস্ব প্রয়োজনে। আর কোনও খোঁজ খবর রাখি নি। সব ওদের ঘাড়ে ছেড়ে দিয়েছিলাম। জানিনা কি অবস্থা, কেউ আমাকে ফোনও করেনি।
তুমি এখন আসছো?
একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। দেখলাম তাপস। আমাদের অফিসে ওর গাড়ি ভাড়ায় খাটে।
হ্যাঁ।
তোমার সঙ্গে একটু কথা আছে।
বল।
এখানে বলা যাবে না।
তাহলে!
একটু মোড়ের মাথায় চলো।
চল।
আমি ওর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেলাম।
বল।
ঠাকুর আমার গাড়িটা বসিয়ে দিয়েছে।
কেন!
ও সন্দেহ করেছে আমি সব খবর তোমায় দিয়েছি।
কতদিন বসিয়ে দিয়েছে?
পনেরো দিন।
তোকে দায়িত্ব দিলে তুই চালাতে পারবি।
পারবো। তুমি একটা মাস দিয়ে দেখ।
ঠিক আছে আমাকে একবার ফোন করে কাল আসিস।
আমায় কিছু টাকা দাও। পকেট একদম খালি।
মানি পার্টস থেকে ওকে একটা পাঁচশো টাকার নোট বার করে দিলাম।
কবে ফেরত দিবি?
বিলটা পাই পেলে দিয়ে দেব।
বিল দিস নি?
আটকে রেখেছে, কি গণ্ডগোল আছে।
কে?
তোমার ওই ম্যানেজার।
ম্যাডামকে বলেছিস?
ঢুকতেই দেয় না।
কে?
কে আবার কিংশুকবাবু।
তাপস মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।
পনেরো দিন ধরে এখানে এসে বসে থাকি তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য।
আমি ছিলাম না।
ছিদাম বললো।
কে ছিদাম?
সিকুরিটির ছেলেটা ওই যে তোমাকে একদিন রাতে আটকেছিল।
মনে পড়েছে।
তাপসের দিকে তাকালাম। ছিদামের সম্বন্ধে ও আর কিছু জানে কিনা। না ওর চোখ সেই কথা বলছে না। ওর সঙ্গে দাঁড়িয়ে আরও কিছুক্ষণ কথা বললাম।
ঠিক আছে তুই যা। কাল একবার দেখা করিস।
আচ্ছা।
পায়ে পায়ে অফিসের গেটের সামনে এলাম। দেখলাম আজ অন্য একটা ছেলে গেটের মুখে দাঁড়িয়ে। রবীন, ইসমাইল আমাকে দেখতে পেয়ে কাছে এগিয়ে এলো।
দাদা কেমন আছো?
ভালো আছি। তোরা কেমন আছিস?
ভালো।
ইসমাইল, ছেলে কেমন আছে?
আগের থেকে একটু ভালো।
ওষুধগুলো ঠিক ঠিক খাওয়াচ্ছিস?
হ্যাঁ। নীরুদা কিছু দিয়েছে। বাকিটা কিনে নিয়েছি।
অফিস থেকে বিল করে নিয়ে নিয়েছিস?
হ্যাঁ।
রবীন দাদারা এসেছে?
রবীন মাথা দোলাল।
গেট পেরিয়ে ভেতরে এলাম। রনিতা ম্যাডাম দেখেই উঠে দাঁড়াল, মর্নিং।
মর্নিং।
পায়ে পায়ে লিফ্ট বক্সের কাছে এলাম। সোজা ওপরে উঠে এলাম। মিত্রার ঘরের দিকে একবার তাকালাম। দেখলাম হরিদার ছেলে সোজা হয়ে বসে কাগজ পড়ছে। নিউজরুমে এলাম। আজ ঘর ভর্তি। সায়ন্তন কাছে এগিয়ে এলো।
কোথায় ছিলে এতদিন! পুরো বেপাত্তা।
হাসলাম।
আমাকে দেখা মাত্র মল্লিকদা ফোনটা কানে তুলছে। বুঝে গেলাম।
নিজের টেবিলে এসে বসলাম। অগোছাল টেবিল, চিঠির পাহাড় জমেছে। নতুন ঘরে কাঁচের রং বদলেছে। কাঁচের ওপর ফিল্ম লাগানো হয়েছে। ভেতর থেকে দেখা যাবে বাইরে থেকে কেউ ভেতরটা দেখতে পাবে না। এটা নিশ্চই দেবার আর্জি মতো মিত্রা করে দিয়েছে।
অর্ক, অরিত্র হাসতে হাসতে কাছে এলো।
তুমি বহুত দুগ্গি আছো। ফাঁসিয়ে দিয়ে কেটে পরলে।
মুচকি মুচকি হাসলাম। মল্লিকদা চেয়ার ছেড়ে উঠে এলো। অর্ক একটা চেয়ার এগিয়ে দিল।
পাঁচদিন ট্রেস নেই তোর ব্যাপারটা কি?
কেন! প্রত্যেক দিন তিনবার করে ফোনে কথা বলেছি। তোমার কাছে খবর না পৌঁছলে আলাদা।
পকেটে ফোনটা নাড়া চাড়া করে উঠলো। বার করলাম। নম্বরটা দেখে বুঝলাম ঠিক জায়গা থেকে খবর এসেছে।
বল।….কনফার্ম….কাজে লেগে যা।….মাথায় রাখিস মিস যেন না হয়।
ফোনটা পকেটে রাখলাম।
তোমার ফোন স্যুইচ অফ না। অরিত্র বড়ো বড়ো চোখ করে আমার দিকে তাকাল।
হ্যাঁ।
তাহলে কার সঙ্গে তুমি কথা বললে!
একটা ছেলের সঙ্গে।
সে তো বুঝলাম! দাঁড়াও দাঁড়াও মাথায় ঢুকছে না। এটা কি আবার তোমার নতুন স্কিম।
বাজে বকিস না। চা খাওয়াবি? অনেক কাজ।
মল্লিকদা মুচকি মুচকি হাসছে আর আমাকে মেপে যাচ্ছে। দেখলাম নিউজরুমের গেটটা ঠেলে হরিদা আমার দিকে এগিয়ে আসছে। বুঝে গেলাম।
চা আনব, না বড়ো সাহেবের ঘরে গিয়ে খাবে। অরিত্র ফুট কাটলো।
আমি হাসতে হাসতে মল্লিকদার দিকে তাকালাম।
আর কাকে কাকে ফোন করে জানানো হয়েছে।
যারা এটলিস্ট তোর খবরটা পেতে চায় তাদের জানিয়েছি।
হরিদা কাছে এসে দাঁড়ালো।
বড়সাহেব ডেকে পাঠিয়েছে। অর্ক ফুট কাটলো।
শুধু বড়ো সাহেব না। দিদমনিও আছে। হরিদা, অর্কর দিকে তাকিয়ে খেঁকিয়ে উঠলো।
কার কাছে গেলে চা পাবো। আমি হাসলাম।
হরিদা হেসে ফেললো। চলোতো মেলা বকিও না।
সন্দীপ আসেনি। মল্লিকদার দিকে তাকালাম।
দেরি হবে আসতে।
দেবাশিস, নির্মাল্য?
সকালে বেরিয়েছে। তুই এখন কোথা থেকে আসছিস?
দিল্লি থেকে।
মল্লিকদা হেসে ফেললো।
হাসলে যে।
হাসির কথা বললি তাই।
ঠিক আছে বড়সাহেবের ঘরে এসো।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
আমাদের সঙ্গে একটা ছোট্ট মিটিং করতে হবে। অরিত্র বললো।
আজ সারাদিন অফিসে আছি।
বিশ্বাস করতে পারি?
হ্যাঁ।
পায়ে পায়ে নিউজরুমের বাইরে চলে এলাম। আমার সামনে হরিদা। আমি মিত্রার ঘরের দিকে যাচ্ছিলাম।
ওদিকে কোথায় যাচ্ছ? হরিদা ধমকে উঠলো।
দিদিমনির সঙ্গে দেখা করে আসি।
সবাই এই ঘরে।
হাসলাম।
দাদার ঘরের দরজা খুলতেই চোখে পরলো মিত্রা দাদার পাশের চেয়ারে বসে আছে। চোখ চলে গেলো ওর শরীররে দিকে। পনেরোদিন ঠিক মতো ওকে দেখিনি। পেটটা সামান্য উঁচু হয়েছে। এই সময় আমার একটা দায়িত্ব আছে। প্রবল চাপে আমি সেই দায়িত্ব পালন করতে পারিনি। এবার যে কেউ একটু ভালো করে তাকালে বুঝতে পারবে মিত্রা মা হতে চলেছে। ও আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে। চোখে মুখে তীব্র উত্তেজনা। অপরজিটের চেয়ারে মিলি, টিনা, অদিতি। আমি মুখটা বাড়িয়ে ফিক করে হেসে ফেললাম।
আয়।
দাদার কন্ঠস্বর ভীষণভাবে স্বাভাবিক। মিত্রা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল। বুঝতে পারছি ভেতর ভেতর ভীষণভাবে গরম খেয়ে রয়েছে। আমাকে মনের সুখে তুলধুনো না করতে পারলে শান্তি নেই।
চেয়ার টেনে নিয়ে বসলাম। এমনভাবে বসলাম যাতে সবার মুখ নজরে আসে।
কিছু খাওয়াবে?
তুই মালিক বলে কথা। খাওয়াব আমি!
উঠে দাঁড়ালাম।
উঠলি কেনো?
মালিক যখন তখন এডিটরকে আমার কাছে ডেকে পাঠাব।
তোর আলাদা কোনও ঘড় আছে? দাদা হেসে ফেললো।
নিউজরুমের চেয়ারটা এখনও আছে।
ওখানে বসে একটা কাগজের এডিটর, মালিকের সঙ্গে কথা বলবে?
মালিক যদি বলতে চায় এডিটর পারবে না কেন। তাছাড়া এই অফিসে কথা বলার মতো অনেক জায়গা আছে, তোমার আপত্তি থাকতে পারে, আমার নেই।
বোস, বেশি বক বক করিস না।
টিনারা মাথা নীচু করে মুচকি মুচকি হাসছে।
ছিলি কোথায়?
দেখলাম দরজা ঠেলে মল্লিকদা ঘরে ঢুকলো।
প্রথম থেকে বলবো না আজ সকালে যেখান থেকে এলাম সেটা বলবো।
এখন কোথা থেকে এলি?
এয়ারপোর্ট থেকে। ব্যাগটা নেপলাকে দিয়ে বাড়িতে পাঠালাম। নেপলা এয়ারলাইন্সের সামনে নামিয়ে দিল হাঁটতে হাঁটতে অফিস।
দু-ঘণ্টা আগে পাঠিয়েছিস। এয়ারলাইন্স থেকে এখানে আসতে নিশ্চই দু-ঘণ্টা সময় লাগে না।
ফোনটা পকেটে আবার নাড়া চাড়া করে উঠলো পকেটে হাত ঢুকিয়ে বার করলাম।
বল।…. দে….হ্যাঁ ম্যাডাম প্যাকেটটা দাদার ঘরে পাঠিয়ে দিন।
সবাই কট কট করে আমার দিকে তাকিয়ে।
ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখলাম।
আর কি জানতে চাও বলো।
এটা কি তোর নতুন নম্বর?
হ্যাঁ।
কবে নিলি?
দিন পাঁচেক হয়েছে।
নম্বরটা দে।
দেওয়া যাবে না। তোমাদের জন্য একটা নম্বর আছে। ওটাই থাকবে।
দরজা ঠেলে হরিদা ঢুকলো। হাতে প্যাকেট।
নিচ থেকে পাঠাল।
ডিমটোস্ট খাওয়াবে?
ওপরে বলে পাঠিয়েছি। আসছে।
একটা না সবার জন্য?
দেখি কটা দিয়ে যায়।
প্যাকেট থেকে ফোনটা বারকরলাম, মানি পার্টস থেকে সিমটা ঢুকিয়ে দিয়ে সেটটা চালু করলাম। সবাই আমার দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছে।
কিরে একটায় হচ্ছে না। দাদা হাসতে হাসতে বললো।
প্রয়োজন পরলো। তাই কিনে নিলাম।
টিনার দিকে তাকিয়ে, ফোনটা আর চার্জারটা দিয়ে বললাম, যাওতো একটু চার্জে বসিয়ে দাও।
টিনা উঠে দাঁড়ালো।
তোর ওই ফোনটা দেখি।
এতক্ষণ পর মিত্রা নিস্তব্ধতা ভাঙলো।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে ফোনটা ওর হাতে দিলাম। আমার মুখে হাসি।
মিত্রা ফোনটা নিয়েই টেপা টিপি করতে শুরু করলো।
বুঝলাম নিজের মোবাইলে ডায়াল করার চেষ্টা করছে। আমার দিকে কট কট করে তাকাল।
দাদার দিকে তাকিয়ে বললো। দেখো দেখো একবার, ওর কাণ্ডটা।
কেন কি হয়েছে!
পাসওয়ার্ড দিয়ে রেখেছে। ও ছাড়া এই ফোনটা অচল।
ওই জন্য তুই চাইতেই তোকে সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দিল। মল্লিকদা বললো।
মিলি, অদিতি আওয়াজ করে হাসলো।
মিত্রাদি তুমি কি অনিদাকে এতো কাঁচা ভেবেছ। মিলি বললো।
এইবার তুমি অনিদাকে আর হাতের নাগালের মধ্যে পাবে না। অদিতি বললো।
ওই ফোনটা বেজে উঠলো।
টিনাকে বললাম, দেখো কে ফোন করলো।
টিনা উঠে গেলো। আমার দিকে তাকালো।
বড়োমা।
কথা বলো।
আমাকে দে। মিত্রা বললো।
টিনা ফোনটা নিয়ে এসে মিত্রার হাতে দিল।
বুঝলাম মিত্রা ভয়েজ অন করে দিলো রিংয়ের আওয়াজ পেলাম।
হ্যালো।
বলো।
তুই! অনি কোথায়?
আমাদের সামনে ছত্রিশপাটি দাঁত বার করে বসে আছে।
ওর দাঁত ভেঙে দিতে পারছিস না।
তুমি আবার কষ্ট পাবে।
আমি একটুও কষ্ট পাব না, তুই ভাঙ। আমি বলছি।
শোনো তিনি আর একটা ফোন কিনেছেন তার নম্বরটা আমরা কেউ চেষ্টা করলেও পাব না।
তার মানে!
পাসওয়ার্ড দিয়ে রেখেছেন।
ওকে দে।
তোমার কথা শুনতে পাচ্ছে।
কিরে আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস?
সকাল থেকে খাওয়া জোটেনি। দাদাকে বললাম কিছু খাওয়াবে, বললো তুই তো মালিক।
সকাল থেকে কিছু খাস নি! সেকিরে! আয় আয় চলে আয়। দুজনে একসঙ্গে খাব।
দেখলি দেখলি টিনা, ছেলের গলা শুনে একেবারে গলে জল।
দেখ ছেলেটা সকাল থেকে কিছু খায়নি। ও তো বড়ো একটা খেতে চায় না।
তাহলে দাঁত ভাঙবো কি করে।
থাক এখন ভাঙতে হবে না। পরে ভাঙিস।
টিনারা সবাই হাসছে।
তোরা হাসছিস কেন।
তোমার কথা শুনে। মিত্রা বললো।
দেখ ও নিশ্চই বাজে কাজে সময় নষ্ট করেনি।
বুঝেছি।
রাতে যাব। আর শোনো ব্যাগের নিচের দিকে একটা প্যাকেট আছে। বার করে নিও।
তুই কি দিল্লী গেছিলি?
কি করে বুঝলে—
আমি আর ছোটো একটা করে লাড্ডু খেয়েছি।
হ্যাঁরে বদমাস, তুই তো দিল্লীকা লাড্ডু, খেলেও পস্তাব না খেলেও পস্তাব। তার থেকে খেয়েই পস্তাই। ছোটোমা চেঁচিয়ে উঠলো।
মল্লিকদা, দাদা হাসছে।
একটু বেশি করে আনতে পারিসনি। ছোটোমা বললো।
ঠিক আছে আগামী সপ্তাহে এনে দেব।
বড়োমা ফোনটা কেটে দিল। টিনা, মিত্রার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে আবার চার্জে বসিয়ে দিল।
ছোটোমা ঠিক কথা বলেছে। তাই না দাদা?
টিনা দাদার মুখের দিকে তাকাল।
আমাদের সবারই অবস্থা ছোটোর মতো। বুঝলে টিনা। দাদা বললো।
হরিদা ঘরের দরজা খুললো। পেছনে ক্যান্টিনের বাচ্চা ছেলেটা। আমাকে দেখেই একগাল হেসে ফেললো।
তুমি এসে গেছ!
কেন রে?
বটাদা তোমায় খুঁজছে।
কি হলো আবার?
সে অনেক ব্যাপার।
বক বক করিস না। এখন যা। হরিদা খেঁকিয়ে উঠলো।
তুমি তরতর করছো কেন। এবার ওপরে যেও, চায়ে নুন মিশিয়ে দেব।
হরিদা আর বাচ্চাটার মধ্যে লেগে গেল।
আমি ওদের কথা শুনে হাসছি।
ঠিক আছে তুই ওপরে যা আমি পরে যাচ্ছি।
মিত্রাদি পুঁচকেটার কাণ্ড দেখলে। মিলি বললো।
তুই দেখ।
ওকে খুব ভালোবাসে। মল্লিকদা বললো।
আমি মুচকি মুচকি হাসছি।
পাঁউরুটি খাওয়া শুরু করলাম। মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে, আমি টপাটপ খাচ্ছি।
কিরে খাচ্ছিস না গিলছিস। দাদা বললো।
যা মনে করতে পার।
আবার সেদিনকার মতো কিছু আছে নাকি।
সবাই দাদার মুখের দিকে তাকাল। মল্লিকদা হাসছে।
মানে! মিত্রা দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে।
তুই খা। দাদা আমার দিকে তাকিয়ে বললো।
মিত্রার দিকে তাকিয়ে।
ওর কথা বার্তা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে।
সেতো দেখতে পাচ্ছি।
খেয়ে নে।
আমার খাওয়া শেষ। প্যান্টে হাতটা মুছে নিলাম।
তোমার পকেটে রুমাল নেই। মিলি বললো।
হাসলাম।
ঘরের আলনায় শোভা পায়। পকেটে থাকে না। রুমাল রাখলে কাগজপত্র রাখার জায়গা থাকে না। মিত্রা টিপ্পুনি কাটল।
মল্লিকদা হাসছে।
আমরা সব কর্পোরেট জগতের মানুষ ও কর্পোরেট জগতের বাইরে।
চম্পকদা, সনাতনবাবু দরজা ঠেলে ভেতরে এলো। আমার দিকে তাকাল।
তুই! কখন এলি? চম্পকদা ভেতরে এলো।
অনেক দিন পর ছোটোবাবুর দেখা পেলাম, কি বলুন ম্যাডাম।
আমি দুজনের দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
বোস চম্পক, সেদিনের মতো বাবু খেলেন না, গিললেন।
কেন আবার কোনও গণ্ডগোল?
কি করে বুঝি বল।
চম্পকদা, টিনার পাশের চেয়ারে বসলো।
টিনা এবার তোর চাকরি নট।
চম্পকদা, টিনার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বললো।
বেঁচে যাই।
তুইও এ কথা বলছিস!
যা শুরু করেছে সব।
তুই কিছু বলেছিস? চম্পকদা টিনার দিকে তাকাল।
আমার কি আর বলতে লাগে? যে ভাবে গিললো। বুঝলাম এবার আমাদের গিলবে।
মিত্রা ফিক করে হেসে ফেললো।
কিগো চায়ের কথা বলো।
দাদার দিকে তাকালাম।
সবার খাওয়া শেষ হোক তারপর।
চম্পকদা ফাইল থেকে একটা চিঠি বার করে টিনার হাতে দিল।
দেখ ইয়োলা কালার দিয়ে মার্ক করে দিয়েছি। ওই জায়গাগুলো পড়বি।
টিনা খেতে খেতেই চোখ বোলাতে শুরু করলো। মিলি, টিনার দিকে ঝুঁকে পরলো। টিনা চিঠিটা পড়তে পড়তে মুচকি মুচকি হাসছে। মিলি জোড়ে হেসে উঠলো।
এইবার মিত্রাদি তুমি অনিদার ওপর রাগ করতে পারবে না। টিনা মুখ তুললো।
কেন! মিত্রা কি অনির ওপর রাগ করে বসে আছে। চম্পকদা মিত্রার দিকে তাকাল।
বাবু পনেরদিন বেপাত্তা। দিনে তিনবার করে সবাইকে ম্যাসেজ। তারপর ফোনের স্যুইচ অফ। দাদা বললো।
আমাকে একদিন ফোন করলো। দেখলাম পাবলিক বুথ থেকে ফোন করছে। জিজ্ঞাসা করলাম বললো পয়সা ভরতে ভুলে গেছি।
আপনি ওর কথা বিশ্বাস করলেন? মিত্রা চম্পকদার দিকে তাকাল।
বিশ্বাস করিনি। তবু মনকে বোঝালাম ওর পক্ষেই এটা সম্ভব।
তারপর—
কয়েকটা কথা জিজ্ঞাসা করলো। ফোনটা কেটে দিল।
নম্বরটা আছে।
তোকে হলফ করে বলতে পারি ওটা মোবাইল নম্বর নয়।
দরজাটা সামান্য খুললো। কানে ভেসে এলো।
তুই এলি কি করতে—
বেশ করেছি এসেছি, তোর কি।
এখুনি বলতে হবে।
ওর কি হকের জিনিস। যার জিনিস সে কোনওদিন না করে না।
সবাই হরিদা আর বটাদার দিকে তাকিয়ে।
আবার কি হলো! আমি পেছন ফিরে তাকালাম।
দরজাটা ধর। বটাদা হরিদার দিকে তাকিয়ে গজ গজ করলো। তবু দরজাটা ধরে থাকলো। দুজনে ঘরের মধ্যে এলো।
বটাদা, হরিদা এই দুজন এই হাউসের সবচেয়ে পুরনো মানুষ। সেই মিত্রার মামাদাদুর আমলের। শুনেছি বছর ষোল বয়সে এরা এই হাউসে এসেছিল। সেই থেকে এই হাউসটা এদের ঘর বাড়ি। দুজনেই উড়িষ্যার বাসিন্দা। কিন্তু কেউ দেখলে বিশ্বাস করবে না। দাদা, বটাদা, হরিদা সবাই প্রায় এক বয়সী। ষাটের কাছা কাছি।
তোমাকে আজকেই এর মীমাংসা করতে হবে।
চায়ের কাপটা আমার সামনে রাখতে রাখতে বটাদা গজ গজ করে উঠলো।
তোর আবার কি হলো? দাদা বললো।
ও কম্ম তোমার নয়।
সে তো বুঝলুম।
মিত্রারা, বটাদার দিকে তাকিয়ে মাথা নীচু করে হাসছে।
বটাদা সকলকে চায়ের কাপ দেওয়ার পর আমার সামনে এসে দাঁড়াল একটা ঠোঙা থেকে এক বোঝা কাগজ বার করে আমার সামনে রাখলো।
তুমি যতদূর পর্যন্ত হিসাব করেছিলে ততদূর পর্যন্ত ঠিক ছিল। তারপর বলে কিনা আমি জল মিশিয়েছি। আমিও বলে এসেছি চোরের দল সব, অনি আসুক আমি দেখাচ্ছি মজা।
চম্পকদা, সনাতনবাবু ম্যায় দাদা পর্যন্ত বটাদার কথায় হেসে যাচ্ছে।
সুদে টাকা নিলে কি হতো বলো। ভাগ্যিস তুমি দিয়েছিলে। তাই চালাতে পারলুম। তোমার টাকা পর্যন্ত শোধ করতে পারলুম না। দু-মাস হয়ে গেল।
ঠিক আছে তুমি যাও, আমি হিসেব করে দিচ্ছি।
আজই একটা হেস্তনেস্ত করে দিয়ে যেতে হবে।
দাঁড়া দাঁড়া বটাদা ঠিক বুঝতে পারলাম না। চম্পকদা বললেন।
তোমার বুঝে কাজ নেই।
তুই ব্যবসা করিস অনি টাকা দেয়!
কেন দেবে না। আমি কি অসৎ।
না মানে….।
টকা ছিল না, চাইলাম তাই দিয়েছে। কেন, ও তো প্রথম থেকেই দেয়।
বটাদা আমার দিকে তাকাল।
সব স্লিপ এই ঠোঙার মধ্যে আছে।
আজকে পারবো না। কালকে করে দেব।
যখন হোক তুমি করে দিলেই হবে।
তাহলে আর একটু চা খাওয়াও।
দাঁড়াও বানিয়ে আনি।
কিরে বটাদা অনির জন্য স্পেশাল। চম্পকদা বললো।
তোমরা ওর মতো কাজ করো।
চম্পকদা হেসে উঠলো।
বটাদা গজ গজ করতে করতে বেরিয়ে গেল।
এ নিশ্চই বটাদার চায়ের হিসাব। তাই না অনি?
চম্পকদার কথায় আমি মাথা দোলালাম।
তুই পারিসও বটে।
চম্পকদা এবার চিঠিটা টিনার কাছ থেকে দাদার দিকে এগিয়ে দিল।
কি লেখা আছে বল না।
স্যার দিল্লী গেছিলেন ডিএভিপির সঙ্গে কনট্রাক্ট করতে।
আমাদের ডিএভিপির এ্যাড আসতো না? দাদা বললো।
আসতো। নামমাত্র। বলার মতো নয়। এবার বলার মতো আসবে।
কতো।
ইয়ারলি পঞ্চাশ থেকে পঁচাত্তর কোটি।
দাদা মিত্রার দিকে তাকাল।
মিত্রা মুচকি হেসে মাথা নীচু করে নিল।
সনাতনবাবু আমাদের গাড়ির ব্যাপারটা এখন কে দেখছেন? আমি বললাম।
সনাতনবাবু আমার মুখের দিকে তাকালেন।
কেন? আবার কি হলো!
এমনি।
তুমি প্রশ্ন করলেই ভয় লাগে, আবার হয়তো গণ্ডগোল করছে।
হাসলাম।
কিংশুকবাবু দেখেন। তার ওপরে মিলি ম্যাডাম।
এর মধ্যে কিছু গণ্ডগোল হয়েছে। দাদা, সনাতনবাবুকে জিজ্ঞাসা করলো।
কই সেরকম কিছু শুনিনি।
মিলি তোর কাছে এরকম কোনও খবর আছে?
দাদার কথা শুনে মিলি আমার দিকে অবাক হয়ে তাকাল।
বটাদার ব্যাপারটা কে দেখে? আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
ওটাও কিংশুক দেখছে। সনাতনবাবু বললেন।
কিংশুকবাবু টাকা ফেরত দিয়েছেন।
পঁচাত্তর ভাগ দিয়েছেন। পঁচিশভাগ বাকি আছে।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
কোথায় যাচ্ছিস? দাদা বললো।
মিত্রার ঘরে আছি। ওখান থেকে এই মুহূর্তে নড়ছি না। চিন্তা নেই।
বটা চা আনতে গেল।
এলে ও ঘরে পাঠিয়ে দাও।
আমার শারীরিক ভাব-ভঙ্গিতে সকলে বুঝল আমার নাকে কোনও গন্ধ এসেছে। কারুর দিকে আর তাকালাম না। বটাদার কাগজগুলো নিয়ে সোজা উঠে দাঁড়ালাম।
টিনা ফোনটা দাও।
টিনা উঠে গিয়ে ফোন আর চার্জারটা এনে দিল।
পায়ে পায়ে মিত্রার ঘরে এলাম। দরজার সামনে হরিদার ছেলে বসে আছে। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়াল। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। দেখলাম মিত্রার টেবিলে সব ফাইল ডাঁই করা রয়েছে। তারমানে বুঝলাম এরা কোনও ডিসিসন নিতে পারেনি। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলাম।
ফোনটা বেজে উঠলো। নাম ভেসে উঠলো দাদু। বুঝলাম কোথা থেকে ফোন এসেছে।
বলো।
কিরে তুই এলি না। দিদার গলা ভেসে এলো।
আমি একটু বাইরে গেছিলাম। আজ ফিরেছি।
কখন ফিরলি?
সকালে।
তোর ফোন বন্ধ ছিল?
হ্যাঁ।
তোর বড়োমা কেমন আছে?
ভালো আছে।
অমিতাভ?
ভালো আছে। আমি এখনও কাউকে বলিনি। তোমরা ফোনটোন করোনি তো?
না। তুই বারন করেছিস।
কাল কিংবা পর্শুদিন যাব।
আসার আগে একবার ফোন করিস।
কোরবো। কি খাওয়াবে?
তুই যা বলেছিলি তাই খাওয়াব।
গিয়ে মাছ ধরবো?
ধরিস।
দাদুকে দাও?
ধর দিচ্ছি।
কাঁপা কাঁপা গলায় দাদু কথা বললো।
কিরে কবে মিনুকে নিয়ে আসবি?
দিদাকে বললাম, কাল কিংবা পর্শুদিন।
এখানে এসে খাবি।
তাই হবে।
মিত্রাকে নিয়ে আসবি?
নিয়ে যাব। আমি যা বলে এসেছি মাথায় আছে।
আছে।
এতদিন শুধু শুধু কষ্ট পেলে।
তোর মতো কেউ এসে বোঝায়নি। ঈশ্বর তোকে পাঠিয়েছে এইসব করার জন্য।
আবার মন খারাপ করে। তাহলে যাব না।
ঠিক আছে। আসিস।
প্রণাম নিও।
নিলাম।
ফোনটা কেটে দিলাম।
পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলাম মিত্রা পাশে দাঁড়িয়ে।
চোখ চকচক করছে। দরজার দিকে একবার তাকালাম। দেখলাম লক করা হয়ে গেছে।
কাছে টেনে নিলাম। কাপরটা সরিয়ে ওর পেটে একটা চুমু খেলাম।
দাদু! দিদা! কোথায় খুঁজে পেলি? আবার কাল কিংবা পর্শুদিন যাবি!
আমি ওর দিকে তাকিয়ে হাসছি।
তোর ব্যাপারটা কি বলতো!
সব বলবো, তুই মাঝে মাঝে এমন গরম খেয়ে যাস।
এমনি এমনি গরম খাই। নিজের দোষটা কোনওদিন দেখলি না।
ধরিয়ে দে।
এই যে না বলে পনেরো দিনের জন্য হাওয়া হয়ে গেলি।
প্রত্যেকদিন তোকে ম্যাসেজ করেছি।
কথা বলিস নি।
মাঝে দু-দিন কলকাতায় ছিলাম। তোকে ডেকেছি। তুই আসিসনি।
তোর জন্য আমাকে জ্যেঠিমনির কাছে কথা শুনতে হচ্ছে। বড়োমা, ছোটোমা সবাই বলছে। আমি তো আমার ভেতরটা কাউকে দেখাতে পারি না।
ছাড় ওসব কথা। তুই, আমি ঠিক থাকলে সব ঠিক।
এখন অনিমেষদা, বিধানদা নিয়ম করে আমায় ফোন করে। তোর কথা জিজ্ঞাসা করে। কি বলি?
যা সত্যি তাই বলবি।
কি বলবো, ও আমাকে কিছু বলে যায়নি। এটা কাউকে বললে বিশ্বাস করবে।
তোকে বলতে ভয় লাগে, তুই বড়ো পেট পাতলা।
সবাই যদি চেপে ধরে তখন মিথ্যে কথা বলতে পারি?
অশ্বথমা হতো ইতি গজো।
আমি এইভাবে বলতে পারি না।
আমি মিত্রাকে আরও কাছে টেনে নিলাম।
দাদু, দিদাকে কোথায় পেলি বল।
এখুনি জানতে হবে।
আবার দেখবো একটু পরে বেরিয়ে গেলি, একটা ম্যাসেজ করে জানালি কয়েকদিনের জন্য বাইরে যাচ্ছি মনে কিছু করিস না।
তুই বিশ্বাস কর।
আমি জানি। তোকে ধরে রাখার ক্ষমতা আমার নেই। এটা আমার কপালেই লেখা আছে। কে খণ্ডাবে। তবু যেটা পেটে আছে তাকে নিয়েই কোনও প্রকারে জীবনটা কাটিয়ে দেব।
মিত্রার গলাটা ভারি হয়ে এলো।
আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলাম। চোখদুটো ছল ছল করছে।
আমি মিত্রার ঠোঁটে ঠোঁট রাখলাম। মিত্রা চোখ বন্ধ করলো। গাল বেয়ে দুফোঁটা মুক্তদানা গড়িয়ে পরলো। আমি ওর কপালে হাত রাখলাম।
কেন তুই আমাকে কষ্ট দিস।
কোথায় কষ্ট দিলাম। কাজগুলো সারতে হবে। জানিসনা চারদিকটা ক্যানসার হয়ে আছে। যেখানে হাত দিচ্ছি। সেখানেই দগদগে ঘা।
অনেক হয়েছে এবার ছেড়ে দে।
তুই বললে ছেড়ে দিতে পারি। কিন্তু আমার অসমাপ্ত কাজ যে আসছে তার ওপর বর্তাবে, তুই সেটা চাস।
কি করে বুঝলি?
আজ তোর বাবা যদি সব পরিষ্কার রাখতো তাহলে কি এই ঘটনাগুলো তোর সঙ্গে ঘটতো।
মিত্রা চোখ খুলে আমার দিকে তাকাল।
বড়ো জটিল অঙ্ক। তোকে বোঝাতে চাইলেও তোর মাথায় ঢুকবে না।
মিত্রা আমার বুকে মাথা রাখলো।
শুধু তোকে একটা কথা এ্যাডভান্স বলেরাখি। বেশ কিছুদিন তোকে একলা একলা চলতে হবে। আমি বাইরে থেকে ইনভিজিবিল হয়ে সব অপারেট করবো।
সে কি করে হবে! তোকে ছাড়া আমি বাঁচবো না।
কেন পারবি না। এতদিন পারলি কি করে।
যা হয়ে গেছে গেছে। আর পারব না।
পারবি, সময়ে সব পারবি। না হলে আমি হেরে যাব। ভাববো মিত্রাকে আমি আমার মতো তৈরি করতে পারিনি।
কেন তুই এ কথা বলছিস।
এই কদিনে সেরকমই আভাস পেলাম। তোকে আর একটু গুছিয়ে দিই।
মিত্রা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো।
নে এবার কাজগুলো সারি, অনেক কাজ জমে আছে।
তোকে ছাড়তে ভালো লাগছে না।
এই ভাবে পাগলামো করলে বিজনেস চালাবি কি করে।
ঠিক চলে যাবে।
যা বাথরুমে গিয়ে মুখটা ধুয়ে আয়। দেখ চোখ মুখের চেহারা কি করেছিস।
তোর ঠোঁটটা বাথরুমের আয়নায় দেখবি চল।
কেন!
মিত্রা হাসছে।
আমার হাতটা ধরে হিড় হিড় করে বাথরুমে টেনে নিয়ে গেল। বাথরুমের আয়নায় দেখলাম ওর ঠোঁটের রং আমার ঠোঁটে। ভালো করে সাবান দিয়ে মুখ ধুলাম। মিত্রা আবার নতুন করে ঠোঁটে রং লাগাল। মুখটা ঠিক করে নিল।
যা দরজার লকটা খুলে দিয়ে আয়।
খোলা আছে।
তারমানে!
হরিদার ছেলেকে বলে এসেছিলাম, কেউ যেন ডিস্টার্ব না করে।
আমি মিত্রার দিকে তাকিয়ে।
মিত্রা আমার হাতটা চেপে ধরলো। তুই আমার চেয়ারটায় বোস।
না। তোর পাশে বসতে পারি। তোর চেয়ারে নয়।
কেন!
তোকে বোঝাতে পারবো না।
কেন বোঝাতে পারবি না বল।
রানীর চেয়ারে রাজা বসে না। রানীর সন্তান যখন রাজা কিংবা রানী হয় তারা বসে।
তুই এতোটা ভাবিস!
আবার মুখটা নষ্ট হয়ে যাবে।
মিত্রা হাসছে।
তুই একবার বরুণদাকে ফোন কর।
ফোন করতে হবে না। বরুণদা ওপরে আছে।
তারমানে!
তুই তো বরুণদাকে রিজাইন দিতে বলেছিলি।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।
মিলিদের মতো বরুণদাকে মাথায় বসিয়ে দিয়েছি।
আমি হাসতে হাসতে মিত্রার কাছে এগিয়ে গেলাম।
একেবারে না, মুখ নষ্ট হয়ে যাবে।
মিত্রা ফোনটা তুলে নিয়ে কথা বললো। বরুণদাকে আসতে বললো। নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলো। আমি টেবিলের অপরজিট চেয়ারে বসলাম।
বেলটা বাজাল। হরিদার ছেলে মুখটা ভেতরে ঢোকাল।
কেউ আসতে চাইলে পাঠাবে।
আচ্ছা ম্যাডাম।
গেটটা বন্ধ হয়ে গেল।
বল অফিসের হাল কি।
মিলির একটু অসুবিধে হচ্ছে। কিংশুকবাবু একটু গণ্ডগোল করছে।
বুঝতে পারছিস তাহলে।
দূর করে দে।
আর একটু কাজ বাকি আছে। চম্পকদার কি অবস্থা?
খুব শ্রুট। পলিটিক্সটা ভালো বোঝে। যা কিছু সব টিনার ঘাড়ে। টিনাও সবাইকে টাইট দিয়ে দিচ্ছে। এমন সব টার্গেট দিচ্ছে। সবকটার নাভিশ্বাস উঠছে।
অদিতি?
সনাতনবাবুকে হ্যান্ডিক্রাফ্ট করে দিয়েছে।
আসতে পারি।
আমি মাথা ঘুরিয়ে পেছন ফিরে তাকালাম। হাসলাম।
কাকে বলছো?
দুজনকেই।
বরুণদা ভেতরে ঢুকে চেয়ারে বসলো।
জানো বরুণদা, এ সম্মান পাওয়ার যোগ্যতা আমার নেই।
তুমি সব সময় নিজেকে এতো ছোটো ছোটো ভাবো কেন।
নিজে ছোটো বলে।
কি মিত্রা অনি কি কথা বলছে।
ওর কথা ছাড়ুন। পাত্তা দেবেন না।
সেকিগো! একটু আগে আমি খবর পেলাম ও অফিসে এসেছে। তারপরেই আবহাওয়া সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে গেল। সবাই তো ওর ভয়ে তটস্থ।
কেন!
সে কি করে বলবো। তুমি থাকলেও যা না থাকলেও সেই একই অবস্থা।
আমি হাসলাম। পিকুবাবু কেমন আছে?
তার নেমন্তন্ন খাওয়া হচ্ছে না, মন খারাপ।
জ্যেঠিমনি।
খ্যাতির বিড়ম্বনা।
কেন!
এতদিন বেশ চলছিল আমাদের জীবনটা। হঠাৎ তোমার আগমনে পাড়ায় যেন একটা বিরাট পজিসন পেয়ে গেছি। প্রত্যেকদিন কেউ না কেউ এসে তোমাদের খোঁজ খবর নেবে। সেলিব্রিটি বলে কথা।
খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না।
একটুও না, বরং বেশ মজা পাচ্ছি। ইসি আবার সেই পুরনো জায়গায় ফিরে গেছে। এখন বরং ভিড় বেশি। সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে।
রেট বাড়িয়ে দিতে বলো।
সে আর বলতে। তাতেও ভিড় আটকে রাখতে পাড়ছে না। তারপর দাদা, দিদিরা আছে।
ইসিকে বলো আমার খাওয়া পাওনা রয়েছে।
কথা বলে নাও।
এখন না। পরে। অফিসের হালচাল কি বুঝছো?
কেউ কি আর কাজ করতে দেয়। কাজ করে নিতে হয়। তা সত্ত্বেও যদি না হয় বাঘের ভয় দেখাতে হয়। কখনও ডাইরেক্ট কখনও ইনডাইরেক্ট।
তুমি আমার একটা উপকার করতে পারবে।
বলো।
আমাকে আমাদের গাড়ির লাস্ট তিনমাসের ডেটা বার করে দাও।
ডিটেলস।
হলে ভালো হয়। নিজের হাতে অপারেট করবে।
জানি।
বরুণদা হাসছে।
আবার কাকে বধ করবে।
বধ করবো না। প্যারালালি ওয়াল তুলব।
লড়ে জায়গা করে নাও।
এই তো তুমি বুঝতে পেরেছো।
তোমার এই নীতিটা আমার ভীষণ ভালো লাগে। তবে সবাই ইমপ্লিমেন্ট করতে পারে না।
তুমি তাহলে বার করে নিয়ে এসো। আমি আর কয়েকটা কাজ সারি। চা খাবে নাকি?
প্রিন্টআউটটা নিয়ে আসি।
এসো।
বরুণদা বেরিয়ে গেল।
তুই কি সুন্দর বরুণদাকে বললি!
শিখলি। আমার অবর্তমানে এইভাবে চলবি। তুই অফিসে থাকবি না। তবু সবাই মনে করবে তুই আছিস। মিউ মিউ করবি না। মিলি, টিনা, অদিতিকে ডাক। বল প্রবলেম ফাইলগুলো সঙ্গে নিয়ে আসতে।
সব এখানে জড়ো হয়ে আছে।
ডাক তাহলে।
মিত্রা টকাটক ফোন ঘুরিয়ে ওদের ডাকল।
তুই পাশে থাকলে কাজে একটা এনথু পাই।
আর এনথু পেতে হবে না। নিজে নিজে এনথু জোগাড় করো।
তুই ব্যবস্থা করে দে।
চল বাথরুমে চল।
তুই সেই কলেজ লাইফের মতো কথা বলছিস।
কেন!
সুমিতা একবার সবার সামনে তোকে বলেছিল তুই ছেলে কিনা আমার সন্দেহ আছে। তুই তখন বলেছিলি বাথরুমে চল প্রমাণ করে দেব।
তাই বুঝি।
নেকু। কিছু জানে না যেন।
কিগো দুজনে আবার শুরু করে দিয়েছ।
হুড়মুড় করে তিনজনে ঘরে ঢুকলো।
নারে সুমিতার কথাটা বলছিলাম। বলে কিনা তাই নাকি।
সত্যি তুমি বলার আর জায়গা খুঁজে পেলে না।
বসো।
বলুন বস।
মিলির দিকে তাকালাম। মুচকি হাসলাম।
কিগো অনিদা হাসছো কেন। তোমার হাসিতে একটা গন্ধ গন্ধ ভাব। টিনা বললো।
শুঁকে দেখ। মিলি বললো।
শুঁকতে হবে না, খবর পেয়ে যাব। অদিতি বললো।
মিত্রা হো হো করে হাসছে।
টিনা ম্যাডাম তোমার মেমোর উত্তর পেলে?
তুমি শোনোনি!
না।
কেঁদে কেটে একসা। মিত্রাদি দাদা বললো ছেড়েদে। এবার থেকে তুই দ্যাখ, ওকে দেখতে হবে না।
তাহলে ওর কাজ কি।
ওকে প্রসে পাঠিয়ে দিয়েছি। ডে টু ডে হিসাব আমার টেবিলে রাখতে বলে দিয়েছি। ওদিকে সুতনুবাবুকে একটা আলাদা হিসাব দিতে বলেছি।
তাহলে তোমার কোনও সমস্যা নেই।
নেই মানে। এ্যাড ডিপার্টমেন্টের দু-একটা ফোড়ে গণ্ডগোল করছে।
গাড়ি নিয়ে—
তুমি জানলে কি করে! আমি কাউকে বলিনি।
আরি ব্যাস, আমি ফুলের বাগানে ঢুকে পড়েছি।
বরুণদা ঘরে ঢুকলো।
মধু খেতে যেয়ো না ইসি ডিভোর্স করে দেবে। অমি বললাম।
সত্যি তোমার মুখে কিছু আটকায় না।
দাও।
আমি মোবাইলটা হাতে নিয়ে বোতাম টিপলাম। ভয়েজ অন।
বসো। বরুণদার দিকে তাকালাম।
রিং বাজছে।
বটাদা।
বলো।
তখন চা খাওয়ালে না।
গেছিলাম হরির ছেলেটা ঢুকতে দিল না।
এখন খাওয়াবে?
কটা।
গোটা ছয়েক নিয়ে এসো।
ছটা না সাতটা।
তোমার ম্যাডামের ঘরে ছটা, দাদার ঘরে একটা।
দাদাকে এখুনি দিয়ে এসেছি। দাদার ঘরে একজন বুড়ো-বুড়ি এসেছে তোমায় খুঁজছে।
তুমি কি জোয়ান।
বটাদা হেসে ফেললো।
আর শোনো।
বলো।
সেই বিস্কুট।
কুত্তা বিস্কুট।
হ্যাঁ।
মিলিরা হাসছে। বরুণদাও হাসছে।
ফোনটা পকেটে রাখলাম।
কুত্তা বিস্কুটটা কিরে। মিত্রা বললো।
এলে দেখতে পাবি।
কথা বলতে বলতে আমি আমার কাজ করে চলেছি।
মিত্রাদি আজ একটা নতুন জিনিস আবিষ্কার করলাম। মিলি বললো।
আবার কি আবিষ্কার করলি!
অনিদা বটাদার কাছে উড়িয়া ভাষা শিখেছে।
ধ্যাৎ।
জিজ্ঞাসা করো।
কিরে, মিলি কি বলছে? মিত্রা বললো।
বরুণদা আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। আমি মিত্রার কথার কোনও উত্তর দিলাম না।
মিলি গাড়ির বিলগুলো এখন তুমি দেখছো।
দুটো বিল আটকে রেখেছি।
কেন?
মনে হলো ম্যানিপুলেট।
বার করো। ফাইলটা বন্ধ করলাম।
এরই মধ্যে তোমার দেখা হয়ে গেলো। বরুণদা আমার দিকে তাকাল।
হ্যাঁ।
তোমার কি সব মুখস্থ?
না।
তাহলে!
তুমিও কয়েকদিন প্র্যাকটিস করো দেখবে দুয়ে দুয়ে চার হচ্ছে। পাঁচ হবে না। যে পাঁচ করতে যাবে ধরা পড়ে যাবে। তোমার কাজ হচ্ছে খবরদারি করা। আর কাজটা করিয়ে নেওয়া।
সে তো বুঝলাম, আমাকে একটু বোঝাও, শিখি।
দেখো কি করি, তাহলে বুঝতে পেরে যাবে।
মিলি তুমি মিত্রার কমপিউটারে বসো তো। একটা চিঠি লেখো। তিনটে পয়েন্ট থাকবে। এক গতমাসে কেনো পনেরোটা গাড়ি এক্সট্রা নেওয়া হয়েছে। সেই গাড়িগুলো কি কি পারপাসে ব্যবহার হয়েছে। কারা কারা ব্যবহার করেছে। দুই এ্যাডের জন্য মান্থলি কটা গাড়ি ব্যবহার করা হয় টোটাল কস্টিং কতো লাস্ট থ্রি মান্থসের। তিন নিজেদের গাড়ি প্রতিমাসে কতো কিলোমিটার চলে তার কস্টিং এটাও লাস্ট থ্রি মান্থসের।
বাবাঃ তুমি তো বড়ো খেলোয়াড়। মিলি বললো।
ছোট খেলোয়াড়, তুই ভাবলি কি করে। কিছু শিখলি। মিত্রা মিলিকে ধমক দিল।
শিখলাম মানে এইরকম ছোট ছোট টিপস পেলে, নড়িয়ে দেব একবারে।
চিঠিটা কার নামে লিখবে।
আমার নামে। তুমি আমাকে দিচ্ছ। আমি কিংশুকবাবুকে ফরোয়ার্ড করছি।
হরিদা, বটাদা দুজনে একসঙ্গে ঘরে ঢুকলো।
মিত্রারা হো হো করে হেসে উঠলো।
কিগো আবার দুজনে একসঙ্গে।
আমার কথা বলার ভঙ্গিতে, ওরা আরও জোড়ে হেসে উঠলো।
তোমায় দাদা ডাকছে।
কেন!
কি করে জানব।
চা খেয়ে নিই।
বটা আমাকে একটু দে।
ভাগ এখান থেকে। বেশি আনি নি।
হরিদা তবু দাঁড়িয়ে রইলো।
এইনাও তোমার বিস্কুট।
এই বিস্কুট আনলি?
তোকে কথা বলতে বলেছি।
হরিদা, বটাদার কথায় হেসে ফেললো।
হরিদা প্যাকেট থেকে একটা নিয়ে খেতে শুরু করলো।
বুঝলি বটা অনেকদিন পর এই বিস্কুট খাচ্ছি।
বাবামনিরা এই বিস্কুট আর চা খেতো। তোর মনে আছে। বটাদা বললো।
খুব মনে আছে। এখন সব বাবু বুঝলি।
অনি বাবু নয়। ও যখনই ওপরে যায় এই বিস্কুট দিয়ে চা খায়। ওর জন্য শুধু নিয়ে আসি।
এবার আমার জন্যও নিয়ে আসিস।
পয়সা দিস।
হরিদা আবার হেসে ফেললো।
মিত্রা দাঁতে কামর দিয়েই বলে উঠলো, এটা তোমার কুত্তা বিস্কুট।
তুমি খেতে গেলে কেন, তোমার জন্য ক্রিমকেকার নিয়ে এসেছি।
এটা শুধু অনির জন্য! বরুণদা বললো।
অনির দাঁত শক্ত। তাই।
সবাই হাসছে।
বটাদা সকলকে চা দিয়ে বেরিয়ে গেল।
আমি চা খেতে খেতেই অদিতিকে বললাম, তোমার অবস্থা কি?
সামলে নিয়েছি। প্রথমে একটু ঝামেলা হচ্ছিল।
আমার তাহলে কোনও প্রয়োজন নেই।
প্রয়োজন নেই মানে! আমার ফাইলগুলো একটু দেখে দাও, ঠিকঠাক স্টেপ নিয়েছি কিনা।
অদিতি নিজের ফাইলগুলো বার করে আনলো।
আমি একটার পর একটা চেক করে ওকে বুঝিয়ে দিলাম। ও নোট করে নিল। মিলির চিঠি লেখা হয়ে গেছে আমাকে দিল। আমি কয়েকটা জায়গায় কারেকসন করে দিলাম।
মিলি আমার দিকে তাকাল।
তোমার কাছ থেকে ইংরাজীটা শিখতে হবে।
কেন!
একটা শব্দের মধ্যে দিয়ে সব কথা বলে দিলে।
এটা আইনের মারপ্যাঁচ সাপও মরবে লাঠি ভাঙবে না।
দারুণ দিলে।
তোকে কখন থেকে ডাকছি বলতো।
কথা বলতে বলতে দাদা ঘরে ঢুকলো।
আসুন। ভেতরে আসুন। দাদা ইশারায় ডাকলো।
দুজন বয়স্ক ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলা দাদার পেছন পেছন ভেতরে ঢুকলেন।
আপনারা!
আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে ওনাদের প্রণাম করলাম।
কেমন আছেন?
ভালো।
সেই যে ফিরে এলে, আর গেলে না।
সময় পাইনি। সুমন্ত কেমন আছে?
ভালো।
ওকে নিয়ে এলেন না কেন?
তুমি ওর সঙ্গে চুক্তি করেছ গ্র্যাজুয়েট না হয়ে দেখা করবি না।
ব্যাটা মনে রেখেছে।
ভদ্রমহিলা মাথা নীচু করলেন।
এবার কোন ক্লাস হলো।
তোমার মতো বাংলা অনার্স নিয়ে পরীক্ষা দিয়েছিল। দু-নম্বরের জন্য ফার্স্টক্লাস পায়নি।
পার্ট ওয়ানে কম থাকলে কিছু হবে না। পার্টটুতে মেক আপ হয়ে যাবে।
তুমি ওকে একটু ফোন করে বলো। খুব মন খারাপ।
ওর ফোন নম্বর আমার কাছে নেই।
দাও অনিকে কাগজটা।
ভদ্রলোক পকেট থেকে একটা খাম বার করে আমার হাতে দিলেন।
আমি মোবাইলটা বার করে পটাপট ফোন করলাম। ভয়েজ অন করলাম। সবার চোখে উৎকন্ঠা। এরা আবার কারা। কোথা থেকে এলো।
হ্যালো।
কে বলছি বলতো?
অনিদা।
কি করে বুঝলি?
তোমরা নম্বরটা সেভ করে রেখেছি।
কে দিল তোকে?
কনিষ্কদা।
কেমন আছিস?
তোমার জন্য বেঁচে আছি।
পুরনো কথা মনে রাখিস না।
তুমি তো বলেছ অতীত থেকে শিক্ষা নিতে।
বলেছিলাম বোধ হয়—
তোমার মনে নেই, আমার মনে আছে। তোমার কথা রাখতে পারলাম না অনিদা।
কে বললো রাখতে পারিসনি। সেকেন্ড হাফটা একটু তেড়ে পর, দেখবি হয়ে যাবে।
আপ্রাণ চেষ্টা করছি।
তারপর বল।
কনিষ্কদা বললো তুমি বিয়ে করেছো। বৌদিকে ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে।
মা-বাবার সঙ্গে চলে আসতে পারতিস।
যেতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু তোমার কথা রাখতে পারিনি।
দূর পাগল, সব ঠিক হয়ে যাবে।
তোমার জন্য আমি একটা পাঞ্জাবী বানিয়েছি, নিজের হাতে কাজ করেছি।
বেশ করেছিস।
বাবা, বৌদির জন্য নিজের হাতে একটা কাপড় বুনেছে। তুমি ফিরিয়ে দিও না। তোমাকে আমাদের দেওয়ার মতো কিছু নেই।
তাহলে ফিরিয়ে দিচ্ছি।
প্লীজ অনিদা।
তাহলে বললি কেন।
আর বলবো না।
একদিন ফোন করে অফিসে চলে আয়।
পরীক্ষাটা হয়ে যাক। যাব। একটা কথা বলবো।
বল।
একটা লেখা লিখেছি। তাঁতীদের ওপর। একটু পড়ে দেখবে।
কোথায়?
বাবার হাতে পাঠিয়েছি।
ঠিক আছে। এখন রাখি।
ভালো থেকো।
থাকব। শরীরটার দিকে একটু নজর দিস। ওষুধগুলো ঠিক ঠাক খাস।
খাচ্ছি। তুমি এ মাসে এতো বেশি টাকা পাঠিয়েছ কেন?
মাইনে বেরে গেছে বুঝলি, তাই। তাছাড়া এখন তুই সাবালোক হয়ে গেছিস। তোর হাত খরচা আছে।
আমি এখানে একটা ছোটোদের স্কুল করেছি।
মাস্টার কে তুই?
হ্যাঁ।
দেশোদ্ধার করেছিস।
তুমিও তো করছো।
হো হো করে হেসে ফেললাম।
বৌদিকে নিয়ে একদিন আসবে?
দেখি যদি সময় করতে পারি।
এসোনা একদিন, ভালো লাগবে। আমার পক্ষে এতদূর জার্নি করা সম্ভব নয়।
খুব সম্ভব, দু-বছর হয়ে গেছে। এখন তুই দৌড়দৌড়ি করতে পারিস।
কনিষ্কদা সামনের মাসে একটা এক্সামিন করবে বলেছে।
আসার আগে আমাকে একবার ফোন করিস। আমি তোর নম্বরটা সেভ করে রাখলাম।
তোমার মতো মানুষের মোবাইলে আমার নম্বর থাকবে এটা আমার সৌভাগ্য।
দাঁড়া তোর সঙ্গে দেখা হোক, তারপর পিট্টি দেব।
তোমার সঙ্গে কথা বলে খুব ভালো লাগল। তুমি হচ্ছ আমার অক্সিজেন। একদিন এখানে এসো না। দেখবে তোমার কতো ফ্যান।
আমার ফ্যানের দরকার নেই। দুটো পান্তা জুটলেই হবে।
সুমন্ত হেসে ফেললো।
রাখি রে।
আচ্ছা।
(আবার আগামীকাল)
প্রথম খন্ড তো খুব বেশি বাকি নেই।এটা শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় খন্ড পেতে খুব বেশি দেরি হবে না তো?