জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১৭৫ নং কিস্তি
খাওয়া দাওয়া শেষ হতে বিকেল গড়িয়ে গেল।
নতুন বাড়িতে অনিমেষদারা বাসু, চিকনা, মীরচাচা আর বিজনকে নিয়ে বসেছে।
ইকবালভাই, ইসলামভাইরা রতনদের নিয়ে সুবীরের সঙ্গে বসেছে।
আমি এসে খট্টাঙ্গে টান টান হয়ে শুলাম।
মিত্রা, তনু এখনও ওই বাড়িতে।
সারাটা শরীরে একটা আলিস্যি জড়িয়ে আছে। কিন্তু ঘুম আসছে না।
নিচে অনেক লোক। ক্যাচরম্যাচর করেই চলেছে।
জানলার দিকে পাশ ফিরে শুলাম। বিকেলটা এখানে বেশ হাওয়া দেয়। শরীর জুড়িয়ে যায়।
এখন ঠিক গোধূলি নয় গোধূলির ঠিক আগের মুহূর্ত।
পঞ্জাবীটা শরীর থেকে খুলে সোফার ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিলাম।
জানলা দিয়ে বাইরে চোখ পড়তেই হেসে ফেললাম। ঝির ঝিরে বাতাস, বাঁশবাগানের ভেতর দিয়ে অর্জুন গাছটার গা ঘেঁষে, ঘরে এসে লুটোপুটি খাচ্ছে। একটা হনুমান অর্জুন গাছটার মগডালে তার লম্বা লেজ ঝুলিয়ে পাকা পেঁপে খাচ্ছে। আমাদেরই পেছনে যে পেঁপে গাছ আছে সেখান থেকে তুলে এনেছে হয়তো। আমি তাকাতেই দাঁত মুখ খিঁচিয়ে কিচ কিচ করে উঠলো। আমি ইসারায় ডাকতেই আবার মুখ ঘুরিয়ে পেঁপে খেতে শুরু করলো। এদের কোনও ভয়ডর নেই।
অনেকক্ষণ তাকিয়ে তাকিয়ে হনুমানটার খাওয়া দেখছিলাম। রাতের ডিনার এখন সেরে নিল। আর আমি দুপুরের খাবার খেয়ে সবে বিছনা নিয়েছি। হঠাৎ দেখলাম লেজটা তুলে একলাফে সপেদা গাছের মাথায় দুবার দোল খেয়েই সামনের মাঠের দিকে ছুটলো। একটা হই হই শব্দ। বুঝলাম নিচের বাচ্চাগুলো হনুমানটার পেছনে দৌড়চ্ছে। সব ভেস্তে গেল।
বিজন কতটা কি বলেছে জানি না। আবার নতুন করে চলা শুরু করতে হবে। মীরচাচা ঠিক বলেছে। সময়ের কিছুটা অপচয় হলো। তা হোক। তিনটে পয়েন্ট একবারে জন্মের শত অফ করে দিয়েছি। আর সারাজীবন কোনও কাজ তারা করতে পারবে না।
মাঝে মাঝে অপারগ হয়ে কিছু নোংরা ডিসিসন নিতে হয়। এটা ছাড়া কোনও পথ খোলা থাকে না। আজকে আমাকে সেরকম কয়েকটা ডিসিসন নিতে হয়েছে। খারাপ লাগলেও কিছু করার নেই। টিউমারটা শরীর থেকে কেটে বাদ না দিলে সেটা ক্যানসারে পরিণত হতে পারে।
কাল সংক্রান্তি ছুড়কিদের ওখানে বড়ো উৎসব। সারাজীবনে দু-বার মাত্র এই উৎসবে আমি উপস্থিত থাকতে পেরেছিলাম। কাল যাব। ভীষণ ভালোলাগছে।
অনিকা অনিসার সঙ্গে কাল রাতে যা কথা বলেছি। তারপর থেকে আর কথা বলা হয়নি।
আফতাবভাই-এর সঙ্গেও কাল রাতে কথা বলেছি। একটা হিন্টস দিয়েছিলাম।
আফতাবভাই নিজের কথা বলতেই ব্যস্ত।
অনিকাকে আমাকে দিয়ে দে। এবার আর ও কোনও কথা শুনবে না। ওর সঙ্গে তালে তাল মিলিয়েছে দিদি। তোর দুটো মেয়ে একটা দিতে তোর আপত্তি কোথায়।
এয়ারপোর্টে তিনজনেই নিতে এসেছিল। আফতাবভাই নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে নিয়ে গেছে।
অনিকা বললো, ও আর অনিসা দু-জনে মিলে একটা নতুন মেনু রান্না করে খাইয়েছে সকলকে।
পাঁচজনে মিলে একসঙ্গে খেতে বসেছে। খুব মজা করে খেয়েছে।
আজকে ওদেরকে নিয়ে আফতাবভাই অফিসে যাবে। মিটিং করবে। বসিরকে সঙ্গে নিয়ে যাবে বলেছে। কি হলো কে জানে। রাতে একবার ফোন করে খবর নিতে হবে।
আর বোলো না….সত্যি ছোটোমা কি প্রেসটিজের ব্যাপার বলো….
মিত্রার গলা পেলাম। ছোটোমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে ওপরে উঠে আসছে। তারমানে পাই টু পাই ছোটোমাকে ডিটেলসে রিপোর্ট দাখিল করা চলছে। সকাল থেকে ঠিক ঠিক কথা বলতে পারেনি। এখন অনেকটা রিলিফ।
বড়োমাকে বলেছো….কি বলছে গুণমন্ত্র ছেলের কথা শুনে….
আমি পাশ ফিরলাম মিত্রা ঘরে ঢুকেই কান থেকে ফোনটা সরিয়ে নিয়ে বললো।
দাঁড়াও দাঁড়াও….
কিরে ভূতের মতো অন্ধকারে শুয়ে আছিস!
আবার ফোনটা কানে দিল।
বাবু অন্ধকার ঘরে চিত্তাল হয়ে শুয়ে আছেন। দাঁড়াও লাইটটা জ্বালি।
তনু পেছন পেছন ঘরে ঢুকলো। সোজা খাটে এসে বসে আমার গায়ে হেলান দিয়ে বসলো।
মিত্রা লাইট জ্বাললো। দরজাটা ভেজিয়ে ছিটকিনি দিল।
তারপর শোনো না….বাচ্চাটা বলে কি, যে গাছে উঠছিল, উঃ আমি তোমাকে ঠিক বলতে পারছি না, ওরা কিরকম ভষায় কথা বলে না, সেই রকম ভাষায় বলছিল, চোখ মুখ পাকিয়ে বলে কি, সে মস্ত লোক….
মিত্রা কথা বলছে হাসছে।
প্রায় কিলো দশেক আম, গোটা কুড়ি কঁয়েতবেল দিয়ে গেছে।….
দু-জনেই হাসছে। মনে হচ্ছে ও পাশ থেকে ছোটোমাও কিছু বলছে।
কালকে আমরা ভোর ভোর ভালোপাহাড় যাব….ইসলামভাই-এর হাতে পাঠাব….দেখি বাবু কবে ফেরেন….মর্জি, হয়তো কালই ফিরবেন…. মেয়ের সঙ্গে কথা হলো….ওরা জানে নাকি….সব এক গোত্রের বুঝলে….শুভ কখন এসেছিল!….তাই?….সব তৈরি হয়েগেছে বুঝলে….একসঙ্গে বেরিয়েছে!….ধরো।
মিত্রা আমার দিকে ফোনটা এগিয়ে দিল।
কেন তোর সঙ্গে কথা বলে শান্তি হচ্ছে না?
তুই আয় তোর হবে। সবাই সানিয়ে রাখছি। ছোটোমা বললো।
মিত্রা ভয়েজ অন করে দিয়েছে।
বলো।
এখনও গাছে ওঠার সখ আছে।
আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে, আমি সেই ষড়যন্ত্রের স্বীকার।
মিত্রা চিমটি কাটলো।
আবার চিমটি কাটে।
আমি মিথ্যে বলেছি নাকি।
তনু আমার শরীরে ওপর শুয়ে শরীর কাঁপিয়ে হাসছে।
মিত্রা।
বলো।
সুরোদিকে বলিস একটু আমাদের জন্য মেখে পাঠাতে।
ঠিক আছে। শোনো।
বল।
বাবু বিরাট বিরাট হাই তুলছেন।
ওকে একটু ঘুমতে দে।
ওমনি গলে জল হয়ে গেলে।
কি করবো বল, ও ছাড়া আমাদের কে আছে। এতবড়ো একটা সাম্রাজ্য ঠিক মতো গুছিয়ে রেখেছে তো। কারুর শরীরে এতটুকু আঁচড় পরতে দিচ্ছে না, কার মান সম্মান যাচ্ছে সেদিকেও ওর শ্যেনদৃষ্টি, ওর যন্ত্রণা আমরা অতটা বুঝি না। তাই যতটা চোখের দেখা দেখতে পাই উপসম করার চেষ্টা করি।
আমি তাই বললাম বুঝি?
দূর মুখপুরী।
মিত্রা খিল খিল করে হেসে উঠলো।
বুঝেছি। রাতে ফোন করবো।
আচ্ছা।
মিত্রা ফোনটা মাথার শিয়রে ছুঁড়ে ফেলেদিয়ে আমার বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পরলো।
ঝামেলা করিস না।
দিদি তুমি ধারে শোও আমি ভতরে ঢুকে পরছি।
মিত্রা আমার মুখের দিকে হাসি হাসি চোখে তাকিয়ে।
তনু ইঁদুরের মতো আমার বাঁদিকের গর্তে ঢুকে পরলো।
জামা খুলেছিস কেন?
গরম লাগছে।
আমরা কাপর খুলি।
নেংটো হ না কে দেখতে যাচ্ছে।
সুন্তু মনা সুন্তু মনা বলে তনু আমাকে জাপ্টে ধরে একটা ঠ্যাং আমার শরীরের ওপর তুলে দিল।
তনু এমন জোড়ে খামচে ধরবো গন্ডগোল হয়ে যাবে।
তোমার গায়ে জোড় আছে আমাদের নেই।
তবে রে। মিত্রা আমার হাতদুটো শক্ত করে ধরে ঝাঁপিয়ে পরলো।
বুড়ো বয়সে খুব রস দেখছি দু-জনের।
কচি বয়সে তো ঝড়াসনি। তাই স্টক করে রেখেছি, এখন ঝড়াব।
কিছুটা কোস্তা-কুস্তি ধস্তা-ধস্তি করলাম তিনজনে।
তরপর দু-জনেই আমার বুকে মাথা রাখলো।
এলোমেলো হয়ে গেছে সারাটা শরীর। ওদের নরম উষ্ণ নিঃশ্বাস তখনও আমার ঘারের কাছে সমান ভাবে বিঁধছে। সন্ধ্যে হয়ে গেছে। ও বাড়িতে ঠাকুর ঘর থেকে শঙ্খের আওয়াজ পেলাম। কাঁসর-ঘণ্টা বাজছে। নীপা হয়তো সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালছে।
দু-জনেই আমার বুকে কান পেতেছে।
বুবুন।
উঁ।
তুই কখনও ভেবেছিলি আমি, তনু দু-জনে এইভাবে তোর বুকে শুয়ে থাকবো।
ভাবিনি, তবে স্বপ্ন দেখতাম। আর ভাবতাম এ জন্মে তোর সঙ্গে থাকলাম আগামী জন্মে যেন তনুর সঙ্গে থাকতে পারি, না হলে তনুকে ঠকানো হবে।
তুই তনুকেও ঠকাসনি, আমাকেও ঠকাসনি।
কেন একথা বলছিস?
দু-জনেই বুক থেকে মাথা তুলেছে।
যখনই সময় পাই আমি তনু দু-জনেই তোকে নিয়ে আলোচনা করি।
আমি তাকিয়ে আছি ওদের মুখের দিকে।
তুই ভীষণ সুন্দর কমপ্রমাইজ করতে পারিস।
তোদের সঙ্গে তাই করি বুঝি।
করিস কিনা বলতে পারবো না। তবে দু-জনেই অনুভব করি, আমরা যেন তোকে নিয়ে ভাগাভাগি না করি। তুই আমাদের দু-জনের। একটু কম বেশি হলে দু-জনে যেন মানিয়ে নিই।
দু-জনকে আরও কাছে টেনে নিলাম।
সেদিন আন্টির সঙ্গে কথা বলছিলাম। আন্টিও দু-জনকে একই প্রশ্ন করেছিল।
আমি তাকিয়ে আছি।
তোরা দু-জনে একই পুরুষকে এত সুন্দর মানিয়ে নিয়েছিস কি করে?
তনু তার উত্তর দিয়েছিল।
ও আমাদের দু-জনকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করে। এই শ্রদ্ধাটা তুমি স্বামী-স্ত্রী হিসাবে দেখতে পারো আবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসাবেও দেখতে পারো। আমরাও ওকে ঠিক তেমন শ্রদ্ধা করি। তাই আমাদের অসুবিধে হয় না।
জানিস বুবুন তনুর উত্তরটা শুনে আন্টি কিছুক্ষণ তনুর মুখের দিকে তাকিয়েছিল।
তারপর হাসতে হাসতে বললো, অনি বসীকরণ মন্ত্র জানে জানিস।
আমাদের দু-জনের সে কি হাসি।
আন্টি বললো, তোরা হাসছিস। আমিও তোদের মতো অনুভব করেছি। না হলে পেসেন্ট দেখাতে এসে কতো লোকের সঙ্গেই তো আলাপ হয়। ওর মতো আত্মীয় ক-জন হয়েছে বল। আমাকে নতুন ভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখাল। কখনও কি ভেবেছিলাম?
ওইটা বলো দিদি। তনু বললো।
কোনটা বলতো!
বারে বুঁচকিকে আন্টি কি বলেছিল ?
ওইটা আরও মজার জানিষ বুবুন।
আমি দু-জনের কথা বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনছি।
ওরা ভাইবোনেরা মনে হয় সেদিন বসে আড্ডা মারছিল। আন্টিও গিয়ে ওদের সঙ্গে একটু হই হুল্লোড় করেছে। তারপর কি কথা প্রসঙ্গে বলেছে, দেখ আমরা এই বাড়ির সঙ্গে কেউ রিলেটেড নয় তবু একছাদের তলায় কেউ দিদা কেউ ছোটোমা কেউ বড়োমা হিসাবে দিব্যি রয়েছি।
তখন ঘণ্টা বলেছে, আন্টিদিদা তুমি এর রাসায়নটা ঠিক ধরতে পারবে না। তোমার আরও কিছুদিন সময় লাগবে। মামা কিন্তু আমাদের জ্ঞান হওয়া থেকে একটা কথা বুঝিয়েছে। তোদের বাবা-মা নেই সেই অর্থে তোরা অরফ্যান। কিন্তু ব্যাপক অর্থে যদি ধরিস, তাহলে দেখবি এই পৃথিবীতে তোদের এতো আত্মীয়-স্বজন আছে গুনে শেষ করতে পারবি না।
তবে এখন জানতে চাইবি না আমার কাছে। ধৈর্য ধরতে হবে। দেখবি ঠিক সময়ে তোদের কাছে তারা এসে হাজির হয়েছে। এতদিন অপেক্ষা করেছি। মামার কথাটা যে কতটা সত্যি এখন অনুভব করি।
মামার সঙ্গে আমাদের রক্তের সম্পর্ক নেই ঠিক, কিন্তু মামা সেই সম্পর্কের ঊর্দ্ধে বিচরণ করছে। তাই না পাওয়া জিনিষ যখন পেলাম দেরেমুশে উপভোগ করছি।
যেমন দিদিকে বার বার বলেছে। তোর মা নেই তোর মা মরে গেছে। তোর বাপ বেঁচে আছে। আগে বদ লোক ছিল, এখন ভালোমানুষ। আঙ্কেলকে দেখে তোমার কি তাই মনে হয়।
দেখো মামা আমাদের কোনও অভাব রাখেনি। জামা-কাপর থেকে খাওয়া-দাওয়া শেষে পড়াশুন। তুমি আমাকে পক্কেকে দিদিকে অশিক্ষিত বলতে পারবে না। এই পৃথিবীতে লড়ে খাওয়ার মতো জমি মামা আমাদের তৈরি করে দিয়েছে।
হ্যাঁ, মামার ওপর বহু অভিমান আমরা তিন ভাই-বোন করেছি। কিন্তু সেটা সাময়িক। মামা এসে সেই অভিমান ভেঙে দিয়েছে। মাটিতে টানা বিছানা করে চারজনে শুয়েছি। কতো গল্প করেছি। এখনও সেই দিনগুলো মিশ করি। বার বার মনে হয় সেইদিনগুলো যদি ফিরে পাই বেশ হয়।
তিন ভাই-বোনে মামার পাশে শোবার জন্য কতো মারপিট করেছি।
তারপর মামা ঠিক করে দিয়েছিল দিদি মামার ওপরে শোবে আমরা দু-জনে দু-পাশে। একটু বড়ো হতে সেই নেশাটা কেটে গেল। এখনও আমরা সেই দিনকার কথা মনে করে হাসাহাসি করি।
তোমাকে কতো বলবো। শেষ হবে না।
কেনো আমি। সুন্দর বললো।
আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত জানতাম ড্যাড আমার অরিজিন্যাল ফাদার মম আমার মাদার। এইট্টিন ইয়ার্স বার্থ ডেতে ড্যাড ওখানে প্রেজেন্ট ছিল। সারাটা দিন আমার সঙ্গে ছিল।
তবে মনে মনে আমার একটা খটকা লাগতো ড্যাড কখনও বেশিদিন ওখানে থাকত না। তবে আমার সঙ্গে কমবেশি ফোনে কথা বলতো। আর যখন যেত মম-ড্যাড এক ঘরে শুলেও ড্যাড নিচে বিছানা করে শুতো।
মমকে একবার প্রশ্ন করতে বলেছিল তোমার ড্যাড এখন সন্ন্যাস জীবন পালন করছে, ঠিক সময়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে।
ড্যাডকে প্রশ্ন করার মতো সাহস তখনও অর্জন করিনি। এখনও নেই। তবে ড্যাডের সাধারণ জীবন যাপন আমার কাছে খুব আকর্ষণীয় ছিল।
সেদিন সারাটা দিন ড্যাডের সঙ্গে ছিলাম। দপুরে খেতে বসে ড্যাড বলেছিল সুন্দর তুমি সারাজীবন মিথ্যের দাসত্ব করবে না সত্যের। সাধারণ ভাবে সবাই যা বলে আমিও তাই বলেছিলাম। সত্যের।
সত্যের দাসত্ব করা খুব কঠিন, সহ্য করতে পারবে।
তুমি যখন পারছো, চেষ্টা করলে, নিশ্চই আমি পারবো।
তারপরেই বিনা মেঘে বজ্রপাত। আমি নিজের সম্বন্ধে সব জানতে পারলাম। ড্যাড ধীরে ধীরে সব জানালো। শেষে খুব স্বাভাবিক ভাবে বললো, তুমি কি আপসেট?
ড্যাডের মুখের দিকে সেদিন বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। কোনও কথা বলতে পারিনি।
রাতে তোমার সঙ্গে আবার খেতে বসবো। তুমি যা যা প্রশ্ন করবে তার প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি প্রস্তুত। ড্যাড খাওয়ার টেবিল থেকে উঠে চলে গেল।
সারা দিন ঘর থেকে বেরোইনি। খালি ভেবেছি। সেদিন সারারাত আমি ড্যাড মম কথা বলেছি। আমার প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর ড্যাড দিয়েছিল।
সেদিন আমার ভাই-বোনের কথা জেনেছিলাম। আমার বড়োমার কথা জেনেছিলাম। বাবা-মার রিলেসনের কথা জেনেছিলাম। ড্যাড এতটুকু গোপন করেনি।
কথাগুলো এতো সংবেদনশীল ছিল, কেঁদেও ফেলেছিলাম। আর ভাবছিলাম ড্যাড তার সারা জীবনে কতটা সেক্রিফাইস করেছে। কিন্তু ইচ্ছে করলে ড্যাড বিন্দাস জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারতো, কোনও অসুবিধে হতো না।
সেদিন ড্যাডকে কিছু বলিনি, কিন্তু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। আমি ড্যাডের পাশে সারা জীবন থাকবো। আমিও আমার লাইফটা ড্যাডের মতো সেক্রিফাইস করবো।
এখানে প্রথম দিন এলাম। সব যেন স্বপ্ন। ড্যাডের জন্মভূমিতে গেলাম। আমার কাছে যেন মনে হলো হেভেন। ড্যাডকে এতো মানুষ ভালোবাসতে পারে কল্পনা করতে পারিনি।
দু-চোখ ভরে দেখেও যেন আশ মিটছিল না। আমরা ড্যাডের হারিয়ে যাওয়া ছোটোবেলাটা দেখলাম নিজের চোখে, সে এক অদ্ভূত অনুভূতি।
জানো আন্টিদিদা আমার কোনও বেস্ট ফ্রেন্ড নেই। ড্যাড আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।
তাই বলে আমার অরিজিনকে আমি কিন্তু অস্বীকার করি না। তাদের প্রতিও আমার দায়িত্ব আছে।
আজ ড্যাড সেই দায়িত্ব পালন করছে, একদিন আমি করবো। প্রমিস।
আমি দু-জনের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে।
সকলে তো সকলের কথা বলেছে। তোর মেয়ে শেষে কি বলেছে জানিষ?
আমি চোখের ইসারায় জিজ্ঞাসা করলাম কি।
আন্টিদিদা আমরা হচ্ছি ওয়েস্টইন্ডিজ। তত্ত্বটা তোমার লাভারের কাছ থেকে জেনে নেবে। তোমাকে ভালো বুঝিয়ে দিতে পারবে।
আমি হাসছি।
কি শয়তান বল।
নিপাট সহজ-সরল উত্তর। আমি বললাম।
এবার ঠোঁটটা দাও দুজনে একটু ভাগাভাগি করে চুষে নিই।
দিলাম তনুর কোমরে একটা রাম চিমটি।
উ, দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা।
তনু সোজা উঠে বসলো আমার কোমরের উপর।
মিত্রা হাসছে।
মিত্রার ফোনটা বাজলো। আমার মাথার শিয়র থেকে ফোনটা হাতে নিতে গিয়ে ওর ভারি বুকের তলায় আমার মুখ চাপা পরলো। মিত্রা বললো, অনিমেষদা।
দিলি মুখে ডলে।
দাঁড়া কথা বলে নিই তারপর দেখাচ্ছি।
হ্যাঁ দাদা বলুন।
ঘুম হলো।
ঘুমই নি দাদা, কথা বলছি।
এবার আমাদের একটু সময় দে। সব তো গোলমাল হয়ে গেছে। টিভিতে যা দেখছি মাথা খারপ হয়ে যাবে।
আবার কি হলো!
তাহলে এতক্ষণ কি কথা বললি?
নিজেদের কথা।
আমরা যাচ্ছি রেডি হ।
আসুন।
মিত্রা ফোনটা বন্ধ করলো।
শয়তান আমি ডলে দিলাম না। দাঁত মুখ খিঁচিয়ে তেরে এলো।
মিত্রা আমার হাতদুটো চেপে ধরেছে।
ডলে দিলি তো। এখুনি দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল।
তনু একটা বিদঘুটে মুখ করে বললো, সব মাটি।
সারারাত পরে আছে। অতো ভাবছিস কেন।
দূর যখন কার কাজ তখন না করলে ভালো লাগে।
আমি হাসছি।
তবু নিস্তার পেলাম না ওদের হাত থেকে।
তারপর দু-জনেই উঠে দাঁড়িয়ে নিজেদের কাপরটা ঠিক করে নিল। তনু সোফা থেকে আমার পাঞ্জাবীটা দিল। পড়ে নিলাম।
মিত্রার দিকে তাকালাম।
একটা কাজ করবি।
চা?
না।
তাহলে?
তুই আর তনু একটু বাসুর দোকানে যাবি।
কেন!
তখন যে কাপরগুলো এনেছে। সেগুলো চেঞ্জ করে কয়েকটা ভালো শারি নিয়ে আয়।
কেন শারিগুলো তো বেশ ভালো ছিল।
সব কালো কালো মানুষ পড়বে, এমনভাবে বেছে নিয়ে আয়। লুঙ্গি গুলোও পাল্টে নিয়ে আয়। সব একডজন করে নিবি।
অতো যদি না পাই।
যতটা পারবি নিয়ে আয়।
কাল নিয়ে যাবি।
হ্যাঁ।
তোরা কি আলোচনা করবি শুনবো না।
এই ঝামেলাটা মিটিয়ে চলে আয়।
ওখানে গিয়ে শালোয়াড় পড়া যাবে।
পড়া যাবেনা বললে ভুল। তবে না পড়াই ভাল। তোরা দু-জনে ওদের চোখে মায়ের মতো। ওরা তো কখনও দেখেনি মায়েরা সালোয়ার পড়ে বসে আছে। তাই বারন করছি।
তনু আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে।
আমি একবিন্দু মিথ্যে বলছি না। গেলেই দেখতে পাবে।
দু-জনে আলমাড়ির আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলটা আঁচড়ে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
আমি উঠে মিটসেফের কাছে গেলাম। ফোনটা দেখতে পেলাম। সিগারেটের প্যাকেটটা দেখতে পেলাম না। ভীষণ ইচ্ছে করছিল একটা সিগারেট খেতে।
জলের মগটা নিয়ে বারান্দায় এলাম। ভালো করে চোখে মুখে জল দিলাম। ঘরে গিয়ে টাওয়েল দিয়ে মুখটা মুছলাম।
নিচে অনিমেষদাদের গলার আওয়াজ পেলাম।
বুঝলাম ফুল ব্যাটেলিয়ান ওপরে উঠে আসছে।
ঘরে প্রথমে বাসু ঢুকলো।
কিরে ম্যাডামদের বাজারে পাঠাচ্ছিস?
কয়েকটা কাপর-জামা কিনতে পাঠালাম, দরকার আছে।
কাল নিলে হতো না।
অনিমেষদারা একে একে ঘরে ঢুকলো। সোফায় বসলো। ওরা চারজন, ইসলামভাই, ইকবালভাই।
কাল সকাল সকাল বেরবো।
ভালোপাহাড় যাবি?
অনিমেষদার মুখের দিকে তাকালাম।
হ্যাঁ।
এদিকে তো সব গণ্ডগোল করে দিয়েছিস। সামলাতে হিমসিম খাচ্ছি।
বাহাত্তর ঘণ্টা, তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে।
অনিমেষদা আমার দিকে তাকাল।
কালকে নিউজটা বেরতে দাও।
অনাদি উল্টো-পাল্টা বকছে।
সুস্থ অবস্থায় না অসুস্থ অবস্থায়?
দেখে কিছু বুঝছি না।
কাল সকাল থেকে দেখবে আবার অন্য কথা বলছে।
তোর ফোন অফ। নম্রতা বার বার ইসলামকে ফোন করছে।
কেন?
তোর সঙ্গে একটু কথা বলতে চায়।
কি জন্য?
তা কি করে জানবো!
ইসলামভাই-এর দিকে তাকালাম।
তোমায় কি বলেছে?
আমায় কিছু বলেনি। ছোটদির মুখ থেকে শুনলাম। টিভিতে দেখছি।
কি দেখছো?
অনুপদা মুচকি হাসলো।
তুমি হাসছো কেন?
তুই এমনভাবে বলছিস যেন কিছুই জানিস না।
আমি যখন সব জানি, তাহলে এই ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করাই উচিত নয়। আমার জন্য তোমাদের কোনও সমস্যা হলে বলো, সমাধানের চেষ্টা করছি।
এই তুই উল্টোচাপ দিতে শুরু করলি।
ধরো ধরো দিচ্ছি।….না না ঠিক আছে….
মিত্রা ফোনটা কানে দিয়ে ঘরে ঢুকলো, সোজা আমার সামনে এসে বললো, নম্রতা।
মিত্রার হাত থেকে ফোনটা নিলাম। সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। তনু দেখলাম গেটের কাছে দাঁড়িয়ে। বাজারে যাওয়ার জন্য দু-জনে একটু-আধটু সাজুগুজু করেছে।
হ্যালো।
মশাই আমি নম্রতা।
বলো। শুনলাম তুমি ফোন করেছিলে?
হ্যাঁ।
তোমার গলাটা ভার ভার ঠেকছে কেন?
কিছু না। এমনি।
তুমি কোথায়?
দিদার কাছে।
মা।
মাও দিদার কাছে।
তোমরা কি এখন আমাদের বাড়িতে?
হ্যাঁ।
বলো তুমি কি বলছো?
বাবাকে টিভিতে দেখাচ্ছে। মা কাঁদছে। দিদার মনটা ভালো নয়।
তুমি কি জানতে চাইছো বলো?
বাবাকে ক্ষমা করে দাও।
নম্রতা। গলাটা সামান্য কঠিন হলো।
তুমি আমাকে শাস্তি দাও?
পরের কাজের কর্মফল তুমি ভোগ করবে কেন?
যতই হোক আমার বাবা।
বাবা যদি তোমার মাকে খুন করতে চায় পারবে তাকে ক্ষমা করতে।
নম্রতা চুপ।
এখুনি তুমি পিকুকে নিয়ে অফিসে চলে যাও। অরিত্র মামার কাছে তোমার বাবার একটা ফাইল আছে। ভাল করে সেটা দেখো। পারলে তোমার চোখে যেগুলো ইমপর্টেন্ট মনে হবে সেগুলো জেরক্স করে নিয়ে এসো। তোমার মা, দিদাকে দেখাও। যদি তাঁরা তোমার বাবাকে ক্ষমা করেন, তাহলে আমি ক্ষমা করে দেব।
ঠিক আছে।
তবে একটা কথা।
বলো।
সব সত্যি জানার পর তুমি তোমার বাবাকে খুন করার প্ল্যান করতে পারবে না।
মশাই!
যা সত্যি তাই বললাম। যাও একঘণ্টা পর আমাকে ফোন করবে।
লাইনটা কেটে দিয়ে মিত্রার হাতে ফোনট দিলাম। ওরা সবাই কেমনভাবে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
অনিমেষদা বিধানদার মুখের দিকে তাকালাম।
সবচেয়ে অবাক করার বিষয় কি জান, লোকটা প্রবীরদাকে পর্যন্ত একটা জায়গায় ফাঁসিয়ে রেখেছে। সেই পথে অনুজ সমেত আরও দু-জন ঢুকে পড়েছে। তাই প্রবীরদা সাগরকে না পারছে ওগরাতে না পারছে গিলতে।
অনিমেষদা হাসছে।
তুমি হেসো না। থুতু দিয়ে একসময় ছাতু গুলেছিলে। সেই স্বভাবটা এখনও ছাড়তে পারলে না। এটাকে রাজনীতি বলে না।
রূপায়ণদা জোড়ে হেসে উঠলো। বিধানদা মুচকি মুচকি হাসছে।
বাসুর দিকে তাকালাম।
কাউকে বল না একটু চা আনতে।
আমরা যদি একটু পড়ে যাই অসুবিধে আছে। মিত্রা আমার দিকে তাকাল।
বোস।
আমার কথা বলতে দেরি দু-জনে দু-পাশে বসে পরলো।
চিকনা কোথায়? বাসুর দিকে তাকালাম।
ও বাড়িতে।
এখন কেমন আছে?
খুব একটা অসুবিধে হচ্ছে না। গা-টা একটু গস গস করছে।
জ্বর এসেছে নাকি?
এতোবড়ো একটা ধকল গেল। কনিষ্কদা বলেছে, এলেও আসতে পারে, ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
কানাই কম্পাউন্ডার এসেছে?
না। বাজারে যে ডাক্তার আসে তাকে আজ রাতটা থাকতে রিকয়েস্ট করেছি।
কি বললো?
থাকবে।
নীপা কয়েক কাপ চা দিয়ে যাবি।
কথাটা শুনে মিত্রার দিকে তাকালাম।
হ্যাঁ এই ঘরে সবাই আছে….তুই রেডি হ একটু পরে বেরবো।
মিত্রা ফোনটা বন্ধ করে আমার মুখের দিকে তাকাল।
এখন কারুর যাওয়ার সময় নেই তাই ফোনে বলে দিলাম।
চিকনাকে ফোন করে আমাকে দে।
ওকে ধরে ধরে নিয়ে আসবো। বাসু বললো।
না।
আমরা একটু শুনবো। মিত্রা নিজের ফোন থেকে ডায়াল করতে করতে বললো।
রিং বাজার পর চিকনার গলা ভেসে এলো।
বলো গুরুমা।
তোমার গুরু একটু কথা বলবে।
আবার কপালে ঝাড় নাচছে।
মিত্রা হাসলো।
মিত্রা ফোনটা আমার হাতে দিল।
হ্যালো।
বল।
তখন তোকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করেছিলাম মনে আছে।
হ্যাঁ।
কি কথা বলতো।
তুই সকালে ফোন করার পর আমাকে কে ফোন করেছিল?
তার উত্তর দিয়েছিলি?
তুই তো জানিষ।
আমার জানার সঙ্গে তোর সম্পর্ক কি?
তাকে তো তুই আমার জন্য রাখলি না।
আরও কয়েকটা গুলি খাওয়ার জন্য।
ভুল হয়ে গেলে কি করবো।
সাবধান করি নি।
চিকনা চুপ করে রইলো।
এবার থেকে ছোটোরা যদি কোনও কথা বলে হেঁপি মেরে উড়িয়ে দিবি না। অন্ততঃ পক্ষে মন দিয়ে শুনবি। গ্রহণ করা না করা তোর ব্যাপর।
আমি অনিমেষদাকে কথা দিয়েছি।
এরকম কথা আগেও তুই বহুবার দিয়েছিস।
এবার হলে তুই মেরে দিস।
তাহলে আর কোনও প্রশ্নের উত্তর রইলো না।
চিকনা হাসছে।
ঋজু কিছু বলেছিল?
তোর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল।
কেন!
ওদের পরিবারকে পুলিশ খুব হ্যারাস করছে।
কাদের পরিবারকে?
না না এখানকার নয় ভীমপুরের।
তাই বল। ঋজুকে বলে দে ওদিকে যেন পা না মাড়ায়। ওর বউ যেন এখন ফোনা-ফুনি না করে। তাহলে ওদের দু-জনকে নিয়েও টানাটানি শুরু হয়ে যাবে।
আচ্ছা।
খনা কোথায়?
নিচে।
ওটাকে চোখে চোখে রাখ। তোর প্রাণের বন্ধুকে টিভিতে দেখাচ্ছে। ভালকরে দেখ কি ডায়লগ দিচ্ছে।
চিকনা হাসছে।
ফোনটা কেটে মিত্রার হাতে দিলাম।
নীপার মেয়ে তুয়া এসে গেটের কাছে দাঁড়িয়েছে। তনু উঠে গেটের কাছে গেল। ওর হাত থেকে চায়ের ট্রে-টা নিয়ে মিটসেফের ওপর রাখলো।
ইসলামভাই-এর দিকে তাকালাম।
সুবীরের সঙ্গে তোমার কাজ সেরেছো।
হাফ হয়েছে হাফ কাল সেরে নেব।
এই, তুয়া তোমায় কি বলবে। তনু আমার দিকে তাকাল।
কিরে!
তুয়া আমার কাছে এগিয়ে এসে গালটা ধরে কানের কাছে ফিস ফিস করে বললো, সুকান্ত আঙ্কেল এসেছে।
এমনই আস্তে বললো তুয়া, অনিমেষদা মিত্রা পর্যন্ত শুনতে পেয়ে গেল।
দু-জনেই জোড়ে হেসে উঠলো।
যা ডেকে নিয়ে আয়। আমি বললাম।
কি হলো দাদা এতো হাসি কিসের? অনুপদা বললো।
অনিমেষদা তখনও হাসছে।
তুয়া ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
একবারে হাসবে না। একবার প্রবীরদাকে তোমার ফোন থেকে ধরে দাও।
অনুপদা মিত্রাকে ইসারা করছে ব্যাপারটা কিরে?
মিত্রা বললো, সুকান্ত এসেছে।
অনিমেষদা হাসতে হাসতে কেশে ফেললো।
তনু জলের জাগ থেকে একগ্লাস জল অনিমেষদার হাতে দিল।
জলটা খেয়ে অনিমেষদা বললো, আমার ফোনে শোনা যাবে না। তোর ফোন থেকে কর।
অসুবিধে আছে।
আমার ফোনে তোমার সিমটা লাগিয়ে নাও।
মিত্রা উঠে গিয়ে অনিমেষদার ফোন আর নিজের ফোনটা অনুপদার হাতে দিল।
তুই লাগা না।
তুমি লাগাও।
ইসলামভাই অনুপদার কছ থেকে ফোন দুটো নিজের হাতে নিয়ে ঠিক করে দিল।
বিজনের কাছ থেকে কিছু বার করতে পারলে। অনিমেষদার দিকে তাকালাম।
ও যতটুকু অনাদিকে জানিয়েছে সব বলেছে।
কি শয়তান ছেলে বলো। মিত্রা বললো।
অভাবী ছেলে টাকা পেয়েছে।
এর মধ্যে আর একটা ঘোটালা আছে। আমি বললাম।
অনিমেষদা আমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে।
বলবো। আর একটু দেখে নেই। সব লতায় পাতায় জড়িয়ে রয়েছে।
হ্যাঁ দাদা বলুন। প্রবীরদার গলা পেলাম।
ইসলামভাই ফোনটা অনিমেষদার হাতে দিল।
প্রবীর।
হ্যাঁ।
খবর কি?
এখন পরিবেশ অনেকটা অনুকূল।
টিভি দেখছো?
সব ভুল-ভাল আপনি এই বিষয় নিয়ে একবারে ভাববেন না।
তুমি যা বলো অনিও তাই বলে।
অনি কি বলছে জানি না। তবে প্রশাসনিক দিক থেকে আমি আপানাকে সঠিক খবর দিচ্ছি।
ওরা দুজনেই কি সরকারি হাসপাতালে রয়েছে।
হ্যাঁ। এখনও পর্যন্ত আমি যা খবর পেয়েছি, রাস্তায় নেসার ঘোরে নোংরা মেয়েদের সঙ্গে গণ্ডগোল করছিল, কোনও এক সাংবাদিকের ফোন পেয়ে পুলিশ রেসকিউ করে হাসপাতালে এ্যাডমিট করে।
বাঃ বেশ গুছিয়ে গল্পটা লিখেছো।
মিত্রারা ঠোঁট টিপে হাসছে।
এই আপনি আবার শুরু করে দিলেন। অনি আছে?
ওই-ই তো তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইলো।
দিন।
ধরো।
আমি অনিমেষদার হাত থেকে ফোনটা নিলাম।
হ্যালো।
বলো।
আমার গলা কেউ শুনছে না-তো?
না।
আড্ডার থেকে উঠে একটু বাইরে আয়।
মিত্রা আমার হাত চেপে ধরেছে। ইসলামভাই ইসারা করছে আরে থাম থাম।
দাঁড়াও।
মিত্রারা মুখ টিপে হাসছে। ইসলামভাই ইশারা করে বলছে কাপর চাপা দে মুখে।
কিছুক্ষণ পর।
বলো।
অঙ্ক সব মিলেছে?
এখনও মেয়েটাকে খুঁজে পাচ্ছি না।
পেয়ে যাবি, খোঁজ, কাছাকাছি আছে। সুকান্ত গেছে?
খবর পেলাম এসেছে। এখনও আমার কাছে আসেনি।
তুই সাগরের মেটেরিয়ালটা দে এই মওকায় ঝেড়ে দিই। যা ফাঁসান ফাঁসিয়েছে।
বারো নম্বর কোর্টের ফাইলটা সাইন করে দাও।
সচিবকে বলেছি কালই সাইন করবো। এবার ওকে ছেরে দিলে আমার সব্বনাশ করে দেবে।
নিরঞ্জনদার বোনের কেশটা।
ওটাকে যা দিয়েছি। সরকারি সব সুবিধা বন্ধ। এখন দশবছর ধরে কোর্টে কেশ চলুক।
ভাল করে ক্লজগুলো মেরেছো তো।
হ্যাঁরে হ্যাঁ, তোর কাছ থেকে সেখা বিদ্যে। টিও টু আর টি ডবলও টু।
যাক তুমি তাহলে গানটা গাইতে পেরেছ।
তুই তবলার ঠেকাটা একটু ভালকরে দিস তাহলেই হবে।
সে তো দিচ্ছি, এই কাজটা হলে নিরঞ্জনদার বোনটা একটু শান্তি পাবে।
বড়দি সেদিন বলতে বলতে কেঁদে ফেলেছিল। নিজেরেই খুব খারাপ লাগছিল। তোকে কথা দিলাম এক সপ্তাহের মধ্যে নিরঞ্জনদার বনের কাছে টাকা পৌঁছে যাবে।
আমিন সাহেবের সঙ্গে কথা বলেছো।
আমিনদার পার্মিসন পেয়েছি। এই সচিবটাকেও হাটাব। বহুত দু-নম্বরী মাল। তারপরেই ওর পেছনে ফেউ লাগিয়ে দেব।
দেখো কেষ্টবাবু যেন আবার খেপে না যায়।
তোর দেওয়া কাগজটা দেখিয়ে দেব।
এই তো তোমার মাথা খুলে গেছে। খুব সাবধান, পা যেন পিছলে না যায়।
সে আর বলতে। কমপ্রমাইজ করতে করতে লাইফ শেষ। কাজ করবো কখন।
আলি সাহেবকে বলেছো।
আমার কাছে সাতদিন সময় চেয়েছে। তোকে একটা রিকোয়েস্ট করবো।
বলো।
ওকে ওই প্রজেক্টের সঙ্গে ইনভলভ কর না।
গণ্ডগোল করলে তুমি দায়িত্ব নেবে।
আমি সেইভাবে কথা বলে নিচ্ছি।
মাথায় রাখবে কথাটা যেন পাঁচকান না হয়।
তোকে কথা দিচ্ছি। এখনও কোনও কথা পাঁচকান হয়েছে।
পার্টির ভেতরে কোনও গণ্ডগোল।
একটু হবে, মানিয়ে নিতে হবে। তোর মতো প্রেসার গেম খেলব।
এবার কেষ্ট আর বিনোদবাবুকে সাইজ করতে শুরু করে দাও।
দেখলাম, ইসলামভাই উঠে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বুঝলাম, এই সময় কেউ যেন ভেতরে না আসে তার ব্যবস্থা করলো।
এখুনি পারব না। তবে তোকে কথা দিলাম ধীরে ধীরে ডানা ছাঁটবো।
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শুরু করে দাও। দুটোই কিন্তু বিষ। পেছন থেকে ছুঁড়ি চালায়।
দেখছি। ছোটোভাই হিসাবে তোকে আর একটা রিকোয়েস্ট করবো।
তোমার রিকোয়েস্টের আর শেষ নেই দেখছি।
লাস্ট।
আজকের দিনের মতো।
হ্যাঁ।
বলো।
সুকান্তকে তোকে দিলাম।
আমাকে দিলে মানে! আমি কি চিফ মিনিস্টার?
ওই হলো, আমাকে ওই তিনটের মধ্যে দুটোকে দে। দুটো ডিস্ট্রিক্টে দিই।
রাঘবন ছাড়বে না।
উনি আসবেন, আমি রিকয়েস্ট করবো। তুই একটু আগে থেকে কানে তুলে রাখ।
সে হয় নাকি।
তুই বললে রাঘবন না করবেন না।
মামার বাড়ি আর কি।
এরকম করিস কেন।
অনিমেষদা, বিধানদার চোখ ঠেলে বেড়িয়ে আসার জোগাড়।
ঠিক আছে। ওটা কিন্তু আমি সামলাব না। তুমি সামলাবে।
তোকে কথা দিলাম। এসপিকে সাসপেণ্ড করেছি।
এটা তোমার সিদ্ধান্ত না পার্টির মাথাদের সিদ্ধান্ত।
বিধানদা বলেছে, তবে তার আগেই আমি চিঠিতে সাইন করে ফ্যাক্স করে দিয়েছিলাম।
অনিমেষদা?
অনিমেষদা বলেছে, এই ব্যাপারে বিধানদার সঙ্গে কথা বলে ডিসিসন নিতে। ম্যাক্সিমাম রূপায়ণ আর অনুপের সঙ্গে কথা বলতে পারি।
ডিএমটার কি হাওলা করলে?
তুই ফাইলটা দে।
কেন অরিত্র তোমাকে দেয় নি?
একটা ফাইল দিয়ে গেছে।
ওর মধ্যেই সব আছে।
রাতে বাড়িত গিয়ে খুলে দেখবো।
তুমি কি এখনও অফিসে?
না পার্টি অফিসে বসে।
অনুজ কি বলছে?
বহুত তরপাচ্ছিল। সকাল থেকে কি টেনসনটাই না খেলাম। তোকে কথা দিয়েছি। তবু এসপিটা কাজ করলো না। টাকার ড্রলিং শুনে আমার মাথা খারাপ। অনিমেষদাকে বলেছি, আপনি, বিধানদা যদি ব্যবস্থা না নেন, আমাকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
কি বলছে দু-জনে?
চুপ করেছিল।
অনুজ ফাইল দেখে কি বলে?
প্রথমে একটু অবাক হয়েছিল। তারপর গুম হয়ে গেল।
তোমার ঘরের সব মালপত্র চেঞ্জ করো।
তিনটেকে আজই সরিয়ে দিয়েছি।
অনুজকে জরাবে কিনা সেটা অরিত্রকে বলে দিয়েছ?
আমি কিছু বলিনি। জরালে জরাক। পর্টি মিটিং-এ চেপে ধরতে সুবিধা হবে।
তোমার কিন্তু অনেক শত্রু।
তুই যে ভাবে হেল্প করছিস, সবকটাকে ঠিক পটকে দেব। আর কমপ্রোমাইজ করবো না। তারপর যদি প্রজেক্টটা ফাইন্যাল হয়ে যায়, মার দিয়া কেল্লা।
আমার কমিসন?
সবাই মুখে হাত চাপা দিয়ে হাসে যেন টুঁ শব্দটি না বেরয়।
হবে হবে তোকে কথা দিয়েছি যখন করবই করবো।
তারপর দেখা গেল তুমি ঘুঁটি হয়ে গেলে, অনুপদা মুখ্যমন্ত্রী বনে গেল।
তুই এতদিন অনুপের সঙ্গে মিশে এই বুঝলি।
তোমাদের পার্টিকে বিশ্বাস নেই। খেয়েদেয়ে কেটে পড়লে, প্রজেন্টেসন যে একটা দিতে হয় সেটা ডিউ স্লিপ মেরে চলেগেলে। নেক্সট টার্ম।
মিত্রা আমার পাস থেকে উঠে চলে গেল।
কেন সাগর, অনাদি দুটোকে বাঁধিয়ে দিচ্ছি যে।
ওটা তোমার নিজের স্বার্থে। বিনিময়ে একশো এগারোটা যে গিলবে। শ্যামের সঙ্গে আণ্ডার স্ট্যান্ডিং করবে। আরও বলবো….।
ঠিক আছে, ঠিক আছে, সাতদিনের মধ্যে ব্যবস্থা করে দেব।
মনে থাকে যেন গিভ এন্ড টেক পলিসি।
পাক্কা।
আর একটা কথা।
বল।
ওই দুটোকে কোথায় পোস্টিং দেবে ঠিক করেছো।
তোকে খুলে বলতে হবে।
ঠিক আছে, রাতে কথা হবে এখন রাখি। ওরা সব ভেতরে আছে।
যা।
ফোনটা কাটার সঙ্গে সঙ্গে দমফাটা হাসি হেসে উঠলো সকলে।
আমি অনিমেষদা, বিধানদার দিকে তাকিয়ে আছি। দুজনেরই চোখ চক চক করছে।
প্রমিস তোমরা কিন্তু কেউ শোনোনি। আমি মুচকি মুচকি হাসছি।
(আবার আগামীকাল)