জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১৭৬ নং কিস্তি
অনুপদা, রূপায়ণদা আশারাখি অঙ্কটা এবার মেলাতে পারবে।
দাঁড়া পরে বলছি। মিত্রা তুই নীপাকে একবার ফোন কর চা পাঠাবার জন্য। কিছু খাবার আনতে বল। টেনসনে সব হজম হয়ে গেছে।
ইসলামভাই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো।
বাবাঃ তোমরা যা হাসলে নীচ থেকে না লোক উঠে আসে।
মিত্রা হাসতে হাসতে এসে আমার পাশে বসে পড়লো।
কি বিউটিফুল আন্ডার স্ট্যানডিং বল। রূপায়ণদা তনুর দিকে তাকাল।
বলে কি গিভ এন্ড টেক পলিসি। তনু হাসছে আর বলছে।
সকালে কি বললো বল রূপায়ণ। সব কি বলা যায়, মন্ত্রগুপ্তির শপথ নিয়েছি। অনুপদা বললো।
ইসলামভাই আমার দিকে তাকাল।
সুকান্ত নিচে দাঁড়িয়ে আছে।
ওকে ডাকো। অনিমেষদা বললো।
নম্রতা ফোন করেছিল। মামনির ফোনের স্যুইচ অফ।
অনুপদা আমার সিমটা আগে চেঞ্জ করে দাও এখুনি বড়োমা জানতে পাড়লে পুরো উদ্ধার করে ছেড়ে দেবে। মিত্রা বললো।
আমাকে দু-বার করা হয়ে গেছে। ইসলামভাই বললো।
নম্রতাকে কিছু জিজ্ঞাসা করলে? আমি ইসলামভাই-এর দিকে তাকালাম।
কাঁদছিল।
কেন।
বললো আঙ্কেলকে কোন মুখ বলবো বাবাকে ক্ষমা করতে।
অনুপদা ফোনটা নিয়ে সিমটা চেঞ্জ করে দিল।
মিত্রা ফোনটা হাতে নিয়ে প্রথমে নীপাকে ফোনে বললো, একটু চা আর খাবার নিয়ে আয়।
গরম গরম লুচি ভাজছি, আলু ভেজে নিয়ে যাব।
দাঁড়া অনুপদাকে জিজ্ঞাসা করি।
মিত্রা অনুপদার দিকে তাকাল।
অনুপদা, নীপা বলছে লুচি, আলুভাজা খাবে?
আবার জিজ্ঞাসা করতে হয়।
আবার মোবাইলে ঠোঁট ছোঁয়াল, নিয়ে আয়।
লাইনটা কেটে দিয়ে নম্রতাকে ফোনে ধরলো।
তোরা আর শুনিস না। আমি মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম।
তা হয় নাকি! মিত্রা বলে উঠলো।
সুকান্তরা ঘরে ঢুকলো। হাত দেখিয়ে বললাম বসো। ওরা বসলো না দাঁড়িয়ে রইলো।
হ্যালো।
নম্রতা।
হ্যাঁ মনি।
মশাই কথা বলবে।
দাও।
মিত্রা আমার হাতে ফোনটা দিল। আমি ফোনটা হাতে নিয়ে হ্যালো বললাম।
কোনও কথা নেই।
নম্রতা।
কোনও সাড়া-শব্দ পেলাম না। সামান্য ফোঁপানির শব্দ।
তুমি এখন কোথায়, অফিসে না বাড়িতে?
অরিত্র মামার কাছে।
কোথায় আছো, নিউজ রুমে?
না। মনির ঘরে।
দেখেছো?
হুঁ।
কেঁদে কিছু করতে পারবে?
আমি কিছু ভবতে পারছি না মশাই।
তোমায় ভাবতে হবে না। মাকে বলেছো নাকি?
মা শুনে কাঁদছে।
এবার বুঝতে পারছো তোমার মাকে দিয়ে বাবার ব্ল্যাঙ্ক স্টাম্প পেপারে সই করাবার রহস্য।
নম্রতা চুপ করে রইল।
তোমার ওপিনিয়ান বলো?
তুমি শুধু বাবাকে বাঁচিয়ে রেখে যা খুশি শাস্তি দাও। আমি কিছু বলবো না।
দিদানকে, মাকে বলেছো?
কিছুটা বলেছি।
কালকে যেটা কাগজে বেরবে সেই লেখাটা দেখলে?
দেখেছি।
তুমি বললে আমি আরিত্রকে বলে লেখাটা উইথড্র করে নেব।
তোমাকে বলার মতো মুখ আমার নেই।
এখন তোমাদের বাড়িতে যাবে না। নিউজের লোকেরা হয়তো তোমাদের দু-জনকে হ্যারাস করতে পারে। তোমরা এখন এই বাড়িতে থাকবে। প্রয়োজন পড়লে, মনির বাড়িতে গিয়ে থাকবে। অনিমেষদাদাই কলকাতায় ফিরে যাক, সব ব্যবস্থা করে দেবে।
আচ্ছা।
মন খারাপ করবে না। মাকে এগুলো দেখাবার দরকার আছে?
কয়েকটা জেরক্স করে নিয়ে যাচ্ছি।
যাও।
অনিমেষদার কানটা আমার দিকে ছিল। কিন্তু চোখ সুকান্তদের দিকে।
আমি ফোনটা মিত্রার হাতে দিলাম। ওদের দিকে তাকালাম।
দাদা আজ অন ডিউটিতে নেই তাই সকলকে প্রণাম করছি। সুকান্ত বললো।
অনিমেষদা হাসছে। আমার দিকে তাকাল।
এই তিনজনকে সকালে তোর সঙ্গে পাঠিয়েছিলাম?
হ্যাঁ।
তুই এদের আগে থেকে খুব ভাল করে চিনতিস।
মাথা দোলালাম।
এরা কবে এসেছে?
গতকাল মাঝ রাতের ফ্লাইটে কলকাতায় এসেছে। একটু রেস্ট নিয়ে আমার বাড়ি।
প্রবীরও মিছে কথা বললো।
মাঝে মাঝে বললে অপরাধ নেই।
দাদা আমাদের কাজ শেষ।
সুকান্ত প্রণাম করে উঠে দাঁড়াল।
চিঠি পেয়েছো?
স্যারের সঙ্গে কথা হয়েছে।
কি বললো?
ফ্যাক্স করে দিয়েছেন। সরকারি ভাবে কাগজপত্র কালকে আসবে।
আর কিছু বলেছে?
সুকান্ত হাসছে।
এর রিওয়ার্ড তুমি সাতদিনের মধ্যে পাবে।
আপনার আর্শীবাদ।
প্রশাসন তোমায় এই পদটা পাকা পাকি দিতে বাধ্য হবে।
সুকান্ত মাথা নিচু করে হাসছে।
তোমার বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দাও সকলকে।
অনুপদারা আমার মুখের দিকে তাকাল।
সুকান্ত সকলের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল। ওরা পা জড়ো করে শরিরী ভাষায় প্রণাম করলো।
ওদের খাইয়েছো?
হ্যাঁ।
কোনও অসুবিধে হয় নি?
একবারে না।
সব ঘুরিয়ে দেখিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছো?
হ্যাঁ।
তুমি কি এখন হেডকোয়ার্টারে ফিরে যাবে?
হ্যাঁ। গাড়ি বলে দিয়েছি।
ভাল করেছো। কাল সকালে চার্জ নেবে?
দেখি। পরিবেশ পরিস্থিতি সেরকম হলে আজই নিতে পারি।
ওদের এখন ছেড়ো না। আমি রাঘবনকে ফোন করে দেব। টোটাল রিপোর্টটা আমাকে দাও।
কাল বিকেলে দেব।
আমি কাল একটু সকাল সকাল ভালোপাহাড় যাব।
কটার সময়!
ভোর চারটে নাগাদ বেরবো। ইচ্ছে আছে আটটা সাড়ে আটটার মধ্যে পৌছবো।
দাদা একবার একটু নিচে চলুন।
যাও যাচ্ছি।
ওরা চারজনে নিচে চলে গেল।
নীপা নিজে চা-জলখাবার নিয়ে এসেছে। সঙ্গে তুয়া, বাসুর বউ লতা। তিনজনেই বেশ সাজুগুজু করেছে। মিত্রা তনু উঠে গেল।
আমি-বৌদি বাসুদার দোকানে যাচ্ছি, তোমায়, তনুদিকে আর এত রাতে যেতে হবে না।
নীপা মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললো।
মিত্রা গাল ফুলিয়ে হাসছে।
সুকান্তদের চা দিয়েছো? আমি নীপার দিকে তাকালাম।
এসে ও বাড়িতে এক কিলো ময়দার লুচি গিললো চারজনে।
কথাটা শুনে নীপার দিকে তাকিয়ে হেসে বেড়িয়ে এলাম।
চা নিয়ে গেলে না?
রাখো আসছি।
নিচে এলাম, দেখলাম খামারে ওরা চারজন দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গে রতন, আবিদ।
কাছে গেলাম। রতন, আবিদ হাসতে হাসতে বললো।
তোমরা কথা বলো আমরা এগোই।
তোদের কাজ হয়েছে?
যে টুকু বাকি আছে কাল সকালে ব্যাঙ্ক খুললে হবে।
ভালো। চাঁদ, চিনা কোথায়?
বাজারে ঘুরতে গেছে।
ওরা নতুন বাড়ির দিকে চলে গেল।
মেয়েটার হদিস পেয়েছো। সুকান্ত বললো।
পাইনি গেইজ করছি।
কাকে?
মনে হচ্ছে যেটাকে অনাদি দাঁড় করাবে বলে ঠিক করেছে সেটার সঙ্গে এই ছেলেটার কোনও লটঘট আছে।
একবারে ঠিক ধরেছো।
তুই জানলি কি করে?
সুকান্ত ছাড়া বাকি তিনজন আমার দিকে অবাক হয়ে তাকাল।
সুকান্ত হেসে ফেললো।
হাসলি যে?
ওরা ভাবছে তুমি এতক্ষণ আমাকে সম্মান করছিলে এখানে একবারে তুমি থেকে তুইতে নেমে এলে, দেখছো না ওদের চোখ-মুখ।
আমি হাসছি।
বুঝলে সেন ওখানে আমি এই ডিস্ট্রিক্টের এসপি এখানে আমি দাদার ভাই। এইটা দাদা ভীষণভাবে মেইনটেন করে। তুমি বুঝতেই পারবে না।
ওরা আমাদের দিকে তখনও তাকিয়ে।
যাক, লোকাল থানায় খোঁজ নিলাম, আমার পুরনো লোকজন এখনও কিছু আছে।
চন্দ্রশেখর মরেছে না বেঁচে আছে?
মরেছে। আরও দুটো এলাকাতেই ছিল, অবস্থা বেগতিক দেখে গা ঢাকা দিয়ে পালিয়ে গেছে।
ভীমপুরের নার্সিংহোমে যে কটা আছে?
একটাও পুলিশের লোক নয়।
এসপি যে বললো!
নুন খেয়েছে, বেইমানি করবে কি করে।
তোলতাই করে নে?
ব্যবস্থা করেছি। দায়িত্ব নিই আগে, তারপর।
কালকে অফিসে জয়েন করে হাওয়াটা বোঝ আগে।
হাওয়া ঠিক করে নিয়েছি।
আমি সুকান্তর মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছি।
সেন, শ্রীবাস্তব, মহান্তি এখানে কাজ করতে চাইছে, তুমি একটু প্রবীরদাকে বলে ব্যবস্থা করো।
কেনো দিল্লী ভালো লাগছে না! ওদের দিকে তাকালাম।
সেন ওয়েস্টবেঙ্গল ক্যাডার, শ্রীবাস্তব বিহার, মহান্তি ওড়িষ্যার সবাই কাছা কাছি।
রাঘবন খেপে যাবে।
আপনি বললে স্যার ছেড়ে দেবে। সেন বললো।
তোমরা এখানে টোটালটা এনকোয়ারি করেছো তো, আগামী সপ্তাহে ওরা এখানে আসবে।
আপনি একবারে ভাববেন না। আপনাকেও একটা কপি দেব। শ্রীবাস্তব বললো।
যাও অনেক রাত হলো, আবার ফিরতে ফিরতে দেরি হয়ে যাবে।
কাল সকালে তোমার সঙ্গে দেখা হবে।
ঠিক আছে।
ওদেরকে বল পিচরাস্তায় পৌঁছে দেবে।
লোক আছে বাঁশ ঝাড়ে। সুকান্ত বললো।
হাসলাম।
ওরা বাড়ির পেছন পাশ দিয়ে বাঁশ বাগানে ঢুকে গেল।
চারিদিকে লাইট জ্বলছে। এদিক ওদিক প্রচুর লোকজন। পরিচিত মুখের দেখাই পাচ্ছি না।
একটু দূরের দিকে তাকিয়ে দেখি সামনের খেতেও একদঙ্গল বসে আছে। বাঁধের ওপরও একটা দঙ্গলকে দেখতে পাচ্ছি।
মনে মনে হাসলাম।
ওপরে উঠে এলাম। লুচি-আলুভাজা দিয়ে চা পর্ব চলছে। নীপারা মনে হয়ে চলে গেছে।
আমি নিজের জায়গায় গিয়ে বসলাম।
মিত্রা আমার চা নিয়ে এলো।
লুচি খাবি?
না।
সেই জন্য আমি, তনু ভাগাভাগি করে খেয়ে নিয়েছি।
অনিমেষদা হাসতে হাসতে বললো, মেয়েটার খবর পেলি?
আমি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে হেসে ফেললাম।
এই তিনটেকে কোথায় পোস্টিং করাবি। বিধানদা বললো।
তোমরা কি শুরু করেছো বলো তো।
বিধানদা হাসছে। এই মাত্র আর একটা নতুন খবর পেলাম।
বিধানদার মুখের দিকে তাকালাম।
কি খবর?
অপেক্ষা করি, ঘটুক আগে তারপর বলবো।
সাগরের ব্যাপারটা এখনও ধোঁয়াশায় আছি। অনিমেষদা বললো।
খুব চালাক লোক। সিঁধ কেটে বেরিয়ে গেছে।
ময়েটা ওইভাবে তোকে বললো।
শিক্ষিতা বুদ্ধিমান মেয়ে, নিজের আত্মসম্মান বোধ আছে তাই বললো।
সেইটাই জানতে চাইছি।
সাগরের নিজের কিছু নেই ও নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করেছে।
অনিমেষদা, বিধানদা আমার দিকে তাকাল। অনুপদা, রূপায়ণদার চা খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে।
ভাবছো আমি গল্প লিখছি।
তা ভাবছি না, হঠাৎ এই ডিসিসানটায় সাগর এলো কেন?
ওর তিনটে ফ্যাক্টারি সিক। আমার থেকে তোমরা ভালো জানো। লেবার প্রবলেমও চূড়ান্ত। তা কেষ্টবাবুকে মাসোহারা দিয়ে ওই দিকটা কোনও প্রকার সামলে দিয়েছে।
এর পর টোটাল সম্পত্তিটা নিজের বউকে লিখে দিয়েছে। তা রেজিস্ট্রিও করে নিয়েছে। তারমানে যাবতীয় দায়ভার ওর বউয়ের ওর আর কিছু নেই। এরপর ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভালপমেন্ট বোর্ডের কাছ থেকে অনুজবাবুর সাহায্যে ভালো টাকা লোন নিয়েছে। ফ্যাক্টারিগুলো রিমডেলিং করবে বলে। লোনটা কে নিল? এবার বোঝো। ও না, খাতা কলমে ওর স্ত্রী। সেইই যেহেতু মালিক। এরপর বউকে মিউচ্যুয়াল ডিভোর্স দিল। বিয়ে করলো বান্ধবী ন্যান্সিকে। টাকাটা অনুজ আর অনাদির পাল্লায় পরে জমি কেনার পেছনে ঢুকিয়ে দিল।
কেউ কিন্তু কিছু জানে না। সব কাগজে কলমে। এরপর ন্যান্সির নামে দুটো প্রফিটেবল কোম্পানী ট্রান্সফার করিয়ে নিয়ে তার পাওয়ার অফ এ্যাটর্নি লিখিয়ে নিল। তাহলে খাতায় কলমে ও নিঃস্ব ওর আর কিছুই নেই। আর লোন নেওয়ার কারণে সব জমি জমা ব্যাঙ্কে বন্ধক।
অনিমেষদা মাথা দোলাচ্ছে।
তোমরা রাজনীতি করো, বৈষয়িক দিকটা এতোটা ধরতে পারবে না। সাগর কিন্তু খুব সূক্ষ্মভাবে খেলে বেরিয়ে গেছে। বউ ব্ল্যাঙ্ক স্ট্যাম্প পেপারে সাইন না করলে শারীরিক-মানসিক নির্যাতন করেছে। যেটা নম্রতা অস্বীকার করেছে, পিকু স্বীকার করেছে।
অনুজবাবু বেনামে জমি কিনেছে। সাগর, অনাদি নিজের নামে। এবার আমার ওপর বকলমায় প্রেসার, ফ্যাক্টারি ওখানে করতে হবে। না হলে ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ। সঙ্গে দু-চারটে লেজুড় আছে। তাছাড়া তোমাদের হাইকমান্ডে তোমার বিধানদার শত্রু খুব একটা কম নেই। ঘি তোমরা দুজনে একা খেলে চলে?
রূপায়ণদা, অনুপদা মাথা দোলাচ্ছে।
তাছাড়া অনুজের এলাকা। আমাকে কিছু করতে হলে অনুজকে তেল দিতে হবে। সেটা না করে আমি তোমাদের সঙ্গে আলোচনা করছি, এটা মনে নেওয়া যায় না। অতএব একটু খোঁচা খুঁচি করলে যদি মালটা হয়ে যায় তাহলে ওরা মজমা নেবে।
ওরা ওদের জমিতে বিন্দাস টাউনসিপ বানাবে। জলা জমি চরিত্র বদলে বাস্তু জমি হয়ে যাবে। এরজন্য আলি সাহেবকে হাতে রাখলেই হবে। তারপর শুধু টাকায় টাকা লাভ।
অনাদি সব জানলেও ফোঁকটসে যদি কিছু মাল পাওয়া যায় ক্ষতি কি। অনেকদিন শুকনো হাতে বসে আছে। দল চালাতে টাকা লাগে। এটা আমার থেকে তোমরা ভালো জানো। নিজেও কিছু টাকা ভিড়িয়ে দিল। দিবাকরের কাছ থেকেও টাকা টানলো।
সেদিন আমার ছক জানার পর, ওদের মাথা খারাপ।
আমি জানতাম আজ নয় কাল ওরা একটা প্রত্যাঘাত করবে। অনুজ সেদিনের হাওয়া দেখে বুঝে গেছিল আমি এতো সহজে ছেড়ে দেব না।
এখান থেকে বেরিয়ে যাবার পর ওরা অনাদির বাড়িতে অনেক রাত পর্যন্ত মিটিং করে। রাতেই আমার কাছে খবর পৌঁছে যায়।
কে দিল, খনা ? বিধানদা বললো।
হ্যাঁ।
পরদিন নেপলার মুখ থেকে একই সম্ভাবনা ঘটতে পারে শুনলাম।
খনা রাত্রি বেলা জানাল চিকনাদা কুথা যাবে অনাদিদা মারি দিবে কইছে।
তখনই ভাবলাম চিকনা কোথায় যাবে অনাদি জানল কি করে?
তারপর ওদের এয়ারপোর্টে তোলার সময় অর্জুন সিগন্যাল দিল।
তার আগে নেপলার মুখে শুনলাম আলতাফ, ইকবাল-হাফিজকে পাঠিয়েছে। সুকান্তকে বললাম দেখতো ঘোটালা কোথায়। সেরকম বুঝলে তুই ছুটি নিয়ে নে।
ও এসপির ছক খোলসা করলো।
হানিফকে ফোন করে দিবাকরকে ধরলাম। টোপ দিলাম অনেকদিন অভুক্ত আছিস প্রিয়দর্শিনীকে তোর হাতে তুলে দেব, প্রিয়দর্শিনী আবার তোর হবে। আগে বল তুই লোক পাঠিয়েছিস কিনা।
মিত্রা, তনু মাথা নিচু করে হেসেফেললো।
স্বীকার করে নিল, প্রিয়দর্শিনী যে টিমটা কন্ট্রোল করে তার থেকে তিনজন কলকাতায় এসেছে। নতুন ছেলে ও চেনে না।
চিকনাকে ঝাড়ার ধান্দা করেছে?
বললো হ্যাঁ।
কেন?
তোকে একটা ধাক্কা দিতে চায়।
তুই কিছু বলিসনি?
বলেছি। অনাদি এখন দাদা হতে চায়।
সাগরের টিপটাও ওর কাছ থেকে ঘুরিয়ে জেনে নিলাম।
ও তোকে সব বলে। অনিমেষদা বললো।
না বলে উপায় নেই। দেখছো না ওর বিয় করা বউ অনাদি ভোগ করছে।
আচ্ছা ও যে এতো জানছে মোবাইল কোথায়? মিত্রা বললো।
কেন হানিফের মোবাইল থেকে কথা বলে। ভয়েজ অন করে কথা বলতে হয়। হানিফ শোনে। রেকর্ডিং করে।
হানিফ তোকে কিছু বলে নি?
হানিফ না বললে নেপলা জানলো কোথা থেকে। হাওয়ায়? ঘটে একটুও বুদ্ধি নেই।
অনিমেষদা, বিধানদা হাসছে।
দিলি তাল কেটে। আর শুনতে হবে না, যা।
ঠিক আছে, ঠিক আছে আর কথা বলবো না শুধু শুনে যাব।
এদিকে সাগরেরও আমার ওপর একটা চাপা আক্রোশ আছে। সেদিন ও যে টাকাটা দিয়েছিল সেটা খড়গপুরে রেলের স্ক্র্যাপ বেচা টাকা। অতগুলো টাকা আমারও দিতে হলে গায়ে লাগতো।
ওদিকে চন্দ্রশেখর এসপিকে নিজের বউকে দিয়ে কাজ হাসিল করাতো। সেখানে ঘুঁটি বসালো সুকান্ত। সে খবর আমার কাছে ছিল। আমি শুধু ওকে বলেছিলাম, কাগজপত্র সরাতে শুরু কর, তারপর আমি দেখছি। সুকান্ত এই কাজ মন দিয়ে করে গেছে।
এদিকে চন্দ্রশেখরের সুন্দরী বউকে পেয়ে এসপি প্রেমে হাবুডুবু। চন্দ্রশেখর প্রায় জুলুম শুরু করে দিল এসপির ওপর। এসপি বিরক্ত হয়ে ঝাড়ার ধান্দা করছিল। মওকা পেয়ে গেল। চন্দ্রশেখর রেলের ছাঁট, লোহা কন্ট্রোল করতো। বেনিয়া সাগরের সঙ্গে সেই সূত্রে আলাপ।
রেলের ছাঁট, লোহার টাকা অনুজবাবু, কেষ্টবাবুর কাছে কম বেশি আসতো। সেই রাতে তোমরা যারা মিটিংয়ে বসেছিলে তাদের মধ্যে তিনজন লোক ওদের লবির ছিল। ওরা সিওর জানতো এই কথা ওরা আদায় করে নেবে।
সেটা হয়নি। উল্টে অনিকা-অনিসা পুরো ব্যাপারটা বুমেরাং করে দিল। আমিন সাহেব সব জানেন, বুদ্ধিমান। আমার কথাবার্তার ভাঁজে উনি বুঝে গেছিলেন জল অনেক দূর গড়ালেও গড়াতে পারে। উনি কেষ্টবাবুকে বোঝান সরে আসুন। না হলে ফেঁসে যাবেন।
কেষ্টবাবু মুখ মুছে নেন। খবরটা প্রবীরদার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
সেদিন সারারাত ধরে ঘুঁটি সাজালাম। হেল্পার সুকান্ত, বাসন্তী, অরিত্র, অর্ক। কাজ বুঝিয়ে দিলাম। সবার প্রথমে চিকনার সাথে ফোনে খেজুরে আলাপ করে বোঝার চেষ্টা করলাম ও কিছু জানে নাকি। বুঝলাম কিছু জানে না। শুধু বললাম সময়টা ভাল যাচ্ছে না, সাবধানে চলাফেরা করিস।
তারপরই দারু, ছুড়কিকে ফোন করে সব বললাম।
আলতাফকে পরিকল্পনা জানিয়ে বললাম শুভকে ঘুঁটি কর।
আলতাফ আপত্তি করলো, আমি বললাম কর না কিছু হবে না।
অনাদির সামনে শুভকে ঠিক সময় হাজির করবি, তাহলে বুঝবে বিনিময়ে কিছু পেলাম। তার আগে বাসন্তীকে দিয়ে খেলাটা করবি, কাজ সারবি।
খনা তোদের টিপ দিয়ে দেবে। খনার ফোন নম্বর দিয়ে দিলাম।
বাসন্তী যদি ফেল করে তাই কবিতাকে সেকেন্ড লাইনে রেখে ওর পেছনে গুঁজে দিলাম। শুনেছিলাম ভিকি টিমটা ভাল বানিয়েছে। মওকা পেলাম একবার পরীক্ষা করে নিই, কেমন দম। দেখলাম কাজটা ভালই করলো। বাকিটা আলতাফ গুছিয়ে করলো।
এদিকে চিকনাকে সকালে ফোন করলাম, দেখলাম বেরিয়েছে। কথাবার্তায় সেরকম কিছু বুঝলাম না যে গন্ধ পেয়েছে।
আমি যেমন কনফার্মাসেন নিলাম ওদেরও কেউ কনফার্মেসন নেবে, চিকনারা আদৌ বেরিয়েছে কিনা। এটা আমি জানতম।
চিকনারা বেরতে সেই কনফার্মেসন ওদের কাছে পৌঁছেছিল। নেক্সট কনফার্মেসন নেয় ঋজুর ভায়েরা। সে ব্যাটা স্টেশন রোডে থাকে। ইদানীং অনাদির কাছ থেকে ফুটে দলে ভেড়ার জন্য চিকনাকে জ্বালাচ্ছিল। সে দেখা করবে বলে চিকনাকে বলে। চিকনা বলে আমি ওই পথে যাচ্ছি তোমার সঙ্গে রাস্তায় দেখা করে নেব।
এটা জানলাম কি করে?
চায়ের দোকানে বসে ভোলার পেটে কিল মারলাম। বলে ফেললো তুমি ফোন করার পর আর একটা ফোন এসেছিল চিকনাদার মোবাইলে। চিকনাদা কার সঙ্গে দেখা করবে বলেছিল।
কিন্তু সব হলো আমার অঙ্ক কিছুতেই মিলছিল না। খনা আমাকে যা বলেছে এটা অনাদি জানছে কি করে? তারমানে চিকনাদের খুব ক্লোজ একজন আছে যে অনাদিকে জানায়। নিশ্চই সেটা মীরচাচা, বাসু, সুবীর হবে না। কাঞ্চন অনাদির ছেলে-মেয়ে এতোটা পাকা নয়।
কথায় কথায় ছুড়কি বাসুর দোকানের ছেলেটার কথা বললো। বুঝলাম ও যখন আমাকে বলেছে, তখন নিশ্চই চিকনাকে বলেছে, কিন্তু চিকনা, বাসু দু-জনেই হেঁপি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে। ওরা ভেতরের ব্যাপারটা জানতো না।
তুমি বলবে ছুড়কি বুঝলো কি করে?
এই দেখো ছুড়কির ম্যাসেজ। নিজের মোবাইলটা অন করলাম। পাসওয়ার্ড দিয়ে খুলতেই মিত্রা ফোনটা হাত থেকে ছিনিয়ে নিল।
খুঁজে পাবি না।
সবকটা পড়ি।
না।
মিত্রা হাসছে। দেখা দেখি সবাই হাসছে।
বাসন্তীর ম্যাসেজটা পড়া।
পড়াব। আগে যেটা দেখার সেটা দেখ।
মিত্রা ফোনটা আমার হাতে দিল।
আমি ম্যাসেজটা বার করে ওর হাতে দিলাম।
মিত্রা পোড়ে হেসেফেললো।
বাসু, মিত্রার দিকে বিষ্ময় দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে।
কে ম্যাডাম!
নীপার বিপক্ষে অনাদি যাকে দাঁড় করাতে চাইছে, সেই মেয়েটার সঙ্গে বিজনের রিলেসন আছে।
এ্যাঁ।
অনিমেষদা, বিধানদা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।
সুকান্ত কনফার্ম করলো? অনিমেষদা বললো।
আমি হাসছি।
তুই প্রিয়দর্শিনী, ন্যান্সি দুজনকে তুলে নিয়ে গেলি কেন?
সাতদিন পরে জানবে।
ওইটা বলুন। অনুপদা বিধানদার দিকে তাকাল।
ভালো কথা মনে করিয়ে দিয়েছো।
বিধানদা আমার দিকে তাকাল।
তোর এতো টাকা কিসের দরকার?
আমি বিধানদার দিকে তাকালাম।
তোমার জানার কথা নয়।
জানার কথা নয়, জেনেছি।
কে বলেছে?
তুই সব বলিস।
দাঁড়াও ফিরে যাই কলকাতায়, তারপর সুজিতদার কট কটানি বন্ধ করবো।
এই তোর মথা খারাপ হলো।
ও এখন বাড়িতে আছে?
আছে।
তোমাকে বড়োমা ফোন করেছিল?
না।
এছাড়া কে তোমায় ফোন করবে বলো?
ঠিক আছে বল না।
আমি রেসের ঘোঁড়া, টাকা লাগবে না?
হেঁয়ালি ছাড়।
মা-মেয়েকে বাঁচাতে হবে তো।
বিধানদা হাসছে।
ঠিক আছে। আমরা যদি হেল্প করি। অনিমেষদা বললো।
তোমার স্টেটেরটা সাহায্য করবে। সেন্ট্রালেরটা কি হবে?
স্টেট যদি দায়িত্ব নেয়।
তোমাদের বিরোধী পক্ষ চেপে ধরবে। বলবে তোমার নিশ্চই কোনও স্বার্থ আছে। তাছাড়া তোমাদের পার্টির অন্যান্যরা মনে নেবে কেন।
ওই টুকু টাকাতে হয়ে যাবে।
প্রাথমিক ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠতে পারবো।
ও কি একবারে শেষ।
না হলে প্রবীরদা বাঁচবে না। কাকে চাও সাগর না প্রবীরদা।
এমন কি করেছে প্রবীর!
সময় হোক প্রবীরদা নিজে বলবে। তোমরা প্রবীরদাকে বলে লজ্জা দেবে না।
তুই এতো খোঁজ রাখিস কি করে!
দেখছো তো তোমাদের সঙ্গে যে ভাবে বসে কথা বলি আবার ভিকুর সঙ্গে ভিকির সঙ্গে হাফিজের সঙ্গেও সেইভাবে বসে কথা বলতে হয়। তোমরা পারবে না। তোমরা একটা ক্লাস মেনটেন করো। এটা তোমরা অস্বীকার করতে পারবে না। ছুড়কি আমাকে যে কথাটা সহজ সরল ভাবে বলবে, তোমাকে বলবে না। কেন? আমি ওদের সঙ্গে সেইভাবে মিশি।
একটা কিছু খটকা লাগলেই আমার কানে তুলে দেয়। সে তুমি ভিকি বলো ছুড়কি বলো কিংবা… না থাক সব বলে দিলে আবার গণ্ডগোল।
ইসলামভাই হেসে ফেললো।
ইসলামের সঙ্গে যখন চলাফেরা করতিস তখন কি এইভাবে চলতিস। বিধানদা বললো।
ঠিক এইভাবে বললে ভুল। তবে প্রথম থেকেই পুলিশদের এই স্পাইগিরির ওপর আমার একটা টান ছিল। ওরা ব্যাটা টকাটক ধরে ফেলে কি করে? মাসির ওখানে থাকার দৌলতে বটতলা আর শ্যামপুকুর থানায় প্রায় যেতে হতো। পুলিশগুলো প্রথমে ভাবতো আমি দালাল-টালাল হবো।
যাওয়া আসা করতে করতে বন্ধুত্ব। বলতে পারো, একটু একটু করে আমার উত্তরণ শুরু। তোমাদের প্রশাসন এক থানায় বেশিদিন কোনও অফিসারকে রাখে না। বদলি করে। বদলি মানেই আমার নতুন বন্ধুত্ব। আবার যে নতুন থানায় গেল সেখানেও বন্ধুত্ব হলো। ইসলামভাই এটা জানতো ও সাহায্য চাইতো আমি সাহায্য করতাম। তার ওপর আমি সাংবাদিক। ধীরে ধীরে দেখলাম কলকাতায় প্রায় সব থানায় আমার বন্ধু-বান্ধব নেহাত খারপ হলো না। একটা নিউজ সোর্সও তৈরি হলো।
এর মধ্যেই খোঁচর গুলোকে চিনলাম। তাদের যারা খবর দেয় তাদের দেখলাম। ওরে সর্বনাশ ফুচকা ওয়ালা থেকে রাস্তার ভিখারী সব ব্যাটা ওই দলে।
আমার কথা শুনে অনিমেষদারা হাসছে।
নতুন নতুন বুদ্ধি মাথায় অসতে শুরু করলো।
আমিও নিজের কাজে ওদের লাগাতে শুরু করলাম। দেখলাম আমি যখন ওদের কাছ থেকে নিউজ পাচ্ছি তার দু-তিনদিন পর অন্য সাংবাদিকরা পাচ্ছে। দাদাকে প্রথম প্রথম বলতাম, দাদা পাত্তা দিত না। ধমক দিত। পাকা ছেলে। তারপর যখন সত্যি সত্যি কেউ নিউজটা করে দিত, তখন ঘরে ডেকে আবার ধমকানি, কেন তুই জোর করে নিউজটা করলি না।
এরপর থেকে দাদা দশটা বললে চারটে করতো। আমার স্কুপ নিউজ। অফিসের যারা সিনিয়ার তারাও একটু ভড়কে যেত। আমি পাই কোথা থেকে। আমি নির্বিকার থাকতাম। তারপর আমি যা আনতাম দাদা চোখ-কান বুঁজে ছেড়ে দিত। শুধু বলতো কিরে অনি, ফেঁসে যাব না তো?
আমি হাসতাম।
পিছুটান হীন বহেমিয়ান মানুষ ওদের সঙ্গে মিশে যেতে বেশিক্ষণ সময় লাগলো না। রাস্তা-ঘাটে ফুটপাথে বসে ওদের সঙ্গে খাওয়া দাওয়া গল্প গুজব। প্রথম প্রথম একটু সংকোচ লাগতো, তারপর মানিয়ে নিলাম। নিজের মনকে বোঝালাম ভেক না ধরলে ভিক্ষা পাওয়া যাবে না।
বলতে পারো রপ্ত করে ফেললাম। ওরাও আমাকে নিজেদের একজন বড়ো বন্ধু মনে করলো। আমিও ওদের দায়ে অদায়ে থাকতাম। তখন কতো লোককে যে মেডিকেলে ভর্তি করেছি, তাদের ট্রিটমেন্ট করেছি বলতে পারবো না। আর গাদাগাদা ছেলে মেয়েকে ফাদারের কাছে আস্তানা জোগাড় করে দিয়েছি। জানো আমি যদি লাইন করে দাঁড় করিয়ে দিই তাহলে আমার শ-খানেক ছেল মেয়ে হবে। তোমরা তো কয়েকজনকে মাত্র চোখের সামনে দেখছো।
মিত্রা-তনু মুচকি মুচকি হাসছে।
তারা কোথায়? অনিমেষদা বললো।
তারা সকলেই দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। কম বেশি সকলেই এস্টাব্লিশড। প্রত্যেকেই ফাদারের কাছে নিয়ম করে টাকা পাঠায়। আমার এ্যাকাউন্টেও পাঠায়, যখন প্রয়োজন পরে, একটু বেশি চাই।
তোর সঙ্গে যোগাযোগ? বিধানদা বললো।
না থাকলে আঠারোটা বছর কাটালাম কি করে?
বিধানদা মুচকি মুচকি হাসছে।
আমার সমস্ত কর্মক্ষেত্র জুড়ে আমার আসল নকল ছেলেমেয়েরা আছে। ওরাই আমার বল ভরসা। আমি যে নিজে হাতে ওদের মানুষ করেছি। মিত্রা আমার কাছে থেকে সরে যাবার পর সাত বছর ধরে এদের নিয়ে কাটিয়েছি। মিত্রা ফিরে আসতে একটু হচপচ হয়েছিল ঠিক, তারপর আবার সব মানিয়ে নিলাম মেনে নিলাম।
এক নিঃশ্বাসে অনেক কথা বলে ফেলেলাম একটু থামলাম। মিত্রা-তনু মাথা নিচু করে বসে আছে। বুঝতে পারলাম, ওদের মন খারাপ লাগছে। আবার শুরু করলাম।
সেই সময় কনিষ্করাও আমাকে ভীষণভাবে হেল্প করেছে। বলতে পারো অনির সম্পূর্ণ হয়ে ওঠার পেছনে ওদেরও অনেক অবদান। আমার এই সব পাগলামো দেখে ওরাও পরবর্তীতে আমার মতো হয়ে গেল। আমার ফ্লেভার ওরাও উপভোগ করতে লাগলো।
ও একটা গল্প মনে পড়ে গেল তোমাদের বলি। বেশ মজার জানো।
সকলে আমার কথা শুনে হাসছে।
ডাক্তারী পড়ার সময় কনিষ্ক মাসে একবার ওর দেশের বাড়িতে যেত। আমতায় ওদের দেশের বাড়ি। তখন ওর বাবা-মা ওখানেই থাকতেন। একান্নবর্তী পরিবার।
আমি সেইদিন ওদের হোস্টেলে বসে আড্ডা মারছি।
নীরু, অনিকেত, বটা আমাদের বন্ধুদের দঙ্গলের সবাই আছে।
কনিষ্ক মুখ চুন করে ঘরে ঢুকলো।
ভাবলাম বাড়িতে কিছু অঘটন ঘটেছে।
ঘরে ঢুকতেই জিজ্ঞাসা করলাম কিরে মুখটা ওরকম ভেটকে আছিস।
প্রথমে কিছু বলেনি। কেমন গুমরে আছে। তারপর জেদাজেদি করতে বললো। এ মাসটা না খেয়ে মরতে হবে।
একটু অবাক চোখে তাকালাম।
বললো, পকেট মার হয়ে গেছে। মাসের খরচ যা বাড়ি থেকে এনেছিল। সব গেছে।
বললাম কোথায় ঘটনাটা ঘটেছে বল?
আমার ওপর রেগে গেল।
ওই সময় আমি যদি ওর জায়গায় থাকতাম তাহলে আমিও রেগে যেতাম।
জানলে তো আমি ধরেই ফেলতাম।
তুই কোথা থেকে বাসে উঠেছিস?
বাড়ি থেকে হাওড়ায় এসে ট্রেন থেকে নামলে কোথা থেকে মানুষ বাসে ওঠে।
নেমেছিস কোথায়?
গ্রেস সিনেমাহলের সামনে।
তোকে কোথায় সবচেয়ে বেশি ঠেলা ঠেলি করেছিল?
দিলো আমাকে কাঁচা কাঁচা গালাগাল।
হাসলাম। বলনা একবার, তাহলে চেষ্টা করবো উদ্ধার করার।
তুই কি পকেট মারের লিডার?
কি বলি ওকে, হাসলাম।
ঠিক আছে আমার সঙ্গে চল যদি কিছুটা উদ্ধার করতে পারি।
ওদের সে কি হাসি।
তখন ওরা সবাই মিলে আমাকে মুরগি করতে শুরু করেছে।
আমি বললাম দেরি করলে হবে না। ভাগাভাগি হয়ে গেলে এক পয়সাও পাবি না।
তখন ওরা কেন জানি আমার কথা বিশ্বাস করলো।
বললো ঠিক আছে চল অনিবাবার খেলটা আজকে দেখি।
আমি, নীরু, কনিষ্ক বেরলাম।
প্রথমে এলাম কলাবাগান। গলি তস্য গলি। তেমনি দুর্গন্ধ। কনিষ্ক, নীরু নাকে রুমাল চাপা দিয়েছে। মনে মনে আমকে গালাগাল দিচ্ছে।
বাড়িটার কাছে আস্তে দু-একজন পরিচিত মুখের দেখা পেলাম।
কয়েকজন আমাকে দেখে বললো, অনিদা নমস্তে।
কনিষ্ক, নীরু টেরিয় টেরিয়ে দেখে। স্বাভাবিক। কারুর গালে খুরের দাগ কারুর চোখ নেই। তারা আমাকে নমস্তে বলছে।
নীরুর চোখ নাচানাচি শুরু হয়ে গেছে।
একটা চারতলা বাড়ির সামনে এসে ওদের নিচে দাঁড় করিয়ে আমি বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম।
দেখো কলেজস্ট্রীটের এতো কাছে জায়গাটা ওরা কোনওদিন ওখানে আসেনি। ভালোছেলে। প্রমিসিং ডাক্তার।
প্রথমে নুরুদ্দিনের কারখানায় গেলাম।
নুরুদ্দিনের কারখানা! অনুপদা বললো।
ও হচ্ছে পেকেটমারদের ট্রেনার।
তারমানে!
কি ভাবে পকেট মারতে হয় তার ট্রেণিং দেয়। তিন মাসের ট্রেণিং তারপর রাস্তায় বার করে। তারপরেও তিনমাস ইন্টারনসিপ তারপর লাইসেন্স পায়।
মিত্রা, তনু, বাসু আমার কথা শুনে হেসে মরে।
হ্যাঁরে, তোরা হাসছিস আমি নিজের চোখে দেখেছি।
তারপর বল। অনিমেষদা বললো।
বিধানদা, অনিমষদা দুজনেই বেশ কেঁচকি মেরে পায়ের ওপর পা তুলে বেশ মৌজ করে সিগারেট ধরিয়ে আমার গল্প শুনছে।
নুরুদ্দিনকে সমস্ত ব্যাপারটা বললাম। বললো আজ আমার লোক এই রুটে ছিল না। তুই রাজাবাজারে জাকিরভাই-এর কাছে যা।
বললাম যেতে যেতে যদি বখরা হয়ে যায়।
দাঁড়া বলে ফোন করে দিল। তখন মোবাইল নেই। ল্যান্ড ফোন।
নিচে নমে এলাম।
আমাকে দেখে কনিষ্ক, নীরু পরি কি মরি করে কাছে এগিয়ে এলো।
চোখ বড়ো বড়ো।
আমার টাকার দরকার নেই। তুই আগে এই গলি থেকে বার করে নিয়ে চল। যা সব খোমা দেখছি। জামা-প্যান্ট খুলে নেবে।
কেন, কেউ কিছু বলেছে!
না-আ যে ভাবে তাকাচ্ছিল। কনিষ্ক বললো।
একজন এসে জিজ্ঞাসা করলো এখানে কি চাই, তখন ওই চপের দোকানর লোকটা বললো অনির সঙ্গে এসেছে। চলে গেল। নীরু বললো।
তোকে সবাই চেনে!
কনিষ্কর কথার কোনও উত্তর দিলাম না।
এখন একবার রাজাবাজারে যেতে হবে তোর টাকা ওখানে আছে।
রাজাবাজার! সেও কি এরকম জায়গা! নীরু বললো।
কেন তোর হাসপাতালের হোস্টেল হবে।
দুজনে চুপ করে গেল।
এবার হনটনবাবুর গাড়ি। কলেজস্ট্রীট বাটার সামনে দিয়ে সোজা রাজাবাজার। খালের ধার দিয়ে ছগলপট্টিতে ঢুকলাম।
ছাগলপট্টি! তনু বলে উঠলো।
হ্যাঁ। ওটা ছাগলের হাট। সারারাত ছাগল বিক্রী হয়। অনুপদা বললো।
তনু মিত্রা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
জাকিরভাই-এর গদিতে এলাম।
গদি সেটা আবার কি রে? মিত্রা বললো।
জাকিরভাই-এর ছাগলের ব্যবসা। যেখান বসে বিক্রি-বাট্টা করে সেটাকে গদি বলে।
গিয়ে দেখি জাকিরভাই নেই। লড়ি ঢুকেছে। ছাগল বাছতে গেছে। বেশ কিছুক্ষণ পর এলো। জাকিরভাই দেখেই বললো, ব্যাটা খালি খবর নেবার জন্য আসবি, আর নিজের প্রয়োজনে আসবি, নাহলে তোর দেখা পাওয়া যায় না।
কেনো, গত সপ্তাহেই তোমার পরিচিতকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি।
জাকিরভাই হাসছে, খবর পেয়েছি।
কনিষ্ক-নীরুর সঙ্গে জাকিরভাই-এর পরিচয় করালাম।
ডাক্তারদের সঙ্গে করে এখানে এসেছিস।
তোমাকে নুরুভাই কিছু বলেছে।
বলেছে। ওরা এখনও এসে পৌঁছয়নি। তোকে ঘণ্টা খানেক অপেক্ষা করতে হবে।
তাহলে একটু ঘুরে আসি।
না কোথাও যাবি না। ভেতরে গিয়ে বস।
কনিষ্করা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে।
জাকিরভাই আর একজনকে ডাকলো।
সে ব্যাটা আমাকে চেনে।
জাকিরভাই বললো, অনিদাকে নিয়ে গিয়ে আমার ঘরে বসা। খানা-পিনারা ব্যবস্থা কর।
নীরু হেসে ফেললো।
কি ডাক্তার তুমি হাসছো কেন?
নীরু কোনও কথা বলতে পারে না।
অনি আমাদের অনেক ভালোবাসে আমরাও অনিকে ভালোবাসি।
বাংলা বলছে বটে তবে হিন্দী, উর্দু মিশে যাচ্ছে।
এদের সঙ্গে ইসলামের আলাপ ছিল না? অনিমেষদা বললো।
তুমি কথার মাঝখানে বড়ো ইন্টারাপ্ট করো অনিমেষ। বিধানদা বিরক্ত হয়ে বললো।
অনিমেষদা, আমি হেসে ফেললাম।
ইসলামভাই আপার লেবেলের লোক। ওরা লোয়ার লেবেল।
তবে সেকেন্ড হুগলী ব্রীজ দিয়ে ওদের ছাগলের গাড়ি এলে ইসলামভাই-এর লোকজন তোলা তুলতো। আমি ওটা ইসলামভাইকে বলে মাসোহারার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। ওরা শুধু গাড়ির হিসাব রাখতো।
ইসলামভাই, ইকবালভাই দু-জনেই হাসছে।
অনুপ শুধু ওর অভিজ্ঞতাগুলো শেয়ার করো তাহলেই দেখবে তোমরা সব জেনে ফেলছো। তোমরাও জীবনে এতো ঘোরোনি। কিন্তু পার্টির কাজে ওই অঞ্চলে বহুবার ঘুরেছ। বিধানদা বলে উঠলো।
অনিমেষদা আবার হাসছে।
তারপর কি হলো? বিধানদা আমার দিক তাকাল।
জাকিরভাই-এর ওই বস্তিঘরে এসিরুম মাটিতে কাশ্মীরি গালিচা দেখে কনিষ্কর চোখ চড়কগাছ।
নীরু বললো, কিরে অনি এতো নরক থেকে একবারে স্বর্গ।
তারপর সরবৎ মিষ্টি এলো।
নীরুর প্লেট নিমেষে শেষ, আমার প্লেট টেনে নিল। ওর যা স্বভাব। তিনজনে গল্প করছি।
প্রায় আধঘণ্টা পরে জাকিরভাই এলো।
জমিয়ে গল্প। নীরু কল কল করে জাকিরভাইকে প্রশ্ন করে। জাকিরভাই উত্তর দেয়।
এমনকি সেদিন ছাগলের হিসাবও নিয়েছিল।
সাড়ে পাঁচটা নাগাদ সকলে আস্তে শুরু করলো।
যারা মার্কেটে ছিল। বিধানদা বললো।
অনিমেষদা একবার বিধানদার দিকে তাকাল। মুচকি মুচকি হাসছে।
হ্যাঁ।
সবাইকার সারাদিনের ইনকাম জমা দিচ্ছে। সেভেন্টি ফাইভ পার্সেন্ট জমা পড়ছে বাকি টোয়েন্টি ফাইভ পার্সেন্ট কমিশন যে যার নিয়ে চলে যাচ্ছে।
সোনাদানা হলে জমা থাকছে। যাচাই করে জাকিরভাই যা দাম হয় তার টোয়েন্টি ফাইভ পার্সেন্ট ক্যাশ দিয়ে দিচ্ছে।
এলাকা ভাগ করা আছে। এলাকার বাইরে কেউ যাবে না।
শেষে একটা ছেলে ঘরে ঢুকেই আবার দৌড়ে বাইরে চলেগেল।
জাকিরভাই চেঁচিয়ে উঠলো এই ক্যারামত এদিকে আয় কিছু হবে না।
ছেলেটি কাঁচুমাচু হয়ে ঘরে ঢুকলো।
আমার অপরাধ হয়ে গেছে বস।
কেন?
আমি আজ ওই দাদার পকেট সাফ করে দিয়েছি।
কনিষ্কর দিকে আঙুল দেখাল।
কনিষ্ক অবাক হয়ে ক্যারামতের মুখের দিকে তাকিয়ে। ঠিক মনে করতে পারছে না।
তুই তো অনিকে দেখেছিস আগে।
ক্যারামত মাথা দোলায়। হ্যাঁ।
ওরা অনির বন্ধু মেডিক্যালের ডাক্তার।
পকেট থেকে কনিষ্কর মানিপার্টসটা বার করে জাকিরভাই-এর হাতে দিল।
জাকিরভাই কনিষ্কর হাতে মানিপার্সটা দিয়ে বললো, দেখ সব ঠিক আছে কিনা।
কনিষ্ক তখন কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না। সত্যি এরকম কিছু ঘটতে পারে নাকি!
মানিপার্সটা খুলে সব দেখে নিয়ে, কনিষ্ক মাথা দোলাল সব ঠিক আছে।
এবার তোর মনে যা চায়, খুশী মতো ক্যারামতকে বক্সিস দিয়ে দে। আমাকে কিছু দিতে হবে না।
কনিষ্ক তিনটে একশো টাকার নোট ক্যারামতের হাতে তুলে দিল।
ক্যারামত আবার একশো টাকা নিয়ে দুশো টাকা কনিষ্ককে ফেরত দিল।
এই নিয়ে দুজনের মধ্যে কিছুক্ষণ টানাপোরেন চললো।
তারপর ক্যারামত বললো, তোমরা ডাক্তার মানুষ। সরকারী হাসপাতালে আমাদের চিকিৎসা হয় না। তোমরা আমাদের একটু ভালকরে চিকিৎসা করো।
ওরা ওদের নাম-ধাম হোস্টেলের রুম নং সব দিয়ে এলো।
জাকিরভাই এরপর থেকে ডাইরেক্ট ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করে লোকজন পাঠাত।
এরপর বটার একবার পকেট মার হয়েছিল। কনিষ্ক নিজে বটাকে নিয়ে চলে গেছিল জাকিরভাই-এর কাছে। তবে সেটা জাকিরভাই-এর এলাকা ছিল না। ওটা মল্লিকবাজার এলাকার কারুর ছিল। টাকা ফেরত পেয়েছিল। হাফ।
সেদিন ওদের কাছে আমি বীরের সম্মান পেয়েছিলাম।
খাওয়া দাওয়া হলো।
কতটাকা পকেটমার হয়েছিল। মিত্রা বললো।
পাঁচহাজার।
পাঁচহাজার!
বিধানদরা হাসছে।
তারপর যখন শেয়ালদায় এলাম। তখন জগৎ-সংসারটা একবারে খুলে গেল।
(আবার আগামীকাল)
tomorrow independence day. request to post 2 part as a celebration.