| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কাজলদীঘি

Reporter Default
রিপোর্টার / ২০০৫ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ১০ মে, ২০২০

জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

৮০ নং কিস্তি

অনিসা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না, ছুটে এসে রতনকে জড়িয়ে ধরলো। রতনের বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে ডুকরে কেঁদে উঠলো।

রতন অনিসার পিঠে হাত রেখেছে।

এইটুকুতেই যদি কেঁদে ফেলিস তাহলে লক্ষ্য পূরণ হবে কি করে। তোকে আরও অনেক হার্ডেল পেরতে হবে।

অনিসার কিছুতেই কান্না থামছে না।

ভিকি ওর জন্য কিছু খাবার নিয়ে আয়।

দাঁড়াও আগে মাথায় ডেটল দিই।

কেন?

যা জোরে ব্যাগটা দিয়ে মারলো। মাথাটা ফেটেছে মনে হয়।

অনিসা রতনের বুক থেকে মুখ তুললো।

হাসতে গিয়েও হাসতে পারলো না।

কি আছে তোর ব্যাগে ওর মাথা ফাটালি।

মোবাইল আর ছাতা আছে। বাজে কথা বললো কেন?

আমি বলতে বলেছি। না হলে তোর মোন বুঝবো কি করে?

অনিসা রতনের বুকে মাথা রাখল।

মোবাইলটা ঠিক আছে? না দু-টুকরো করেছিস—

জানিনা।

যা বাথরুমে গিয়ে মুখটা ধুয়ে নে। ভিকি।

বলো।

ওর ব্যাগটা খুলে মোবাইলটা একবার দেখিস ঠিক আছে কিনা।

বাবা কোথায় বলো?

বাবা বাবার জায়গায় আছে।

তুমি সব সময় বলে এসেছো বাবার সঙ্গে তোমার কোনও যোগাযোগ নেই।

এখনও তোকে সেই কথা বলবো।

তাহলে আমাকে যে আসতে বলেছে।

তোকে প্রেমানন্দ আসতে বলেছে। ও তোর বাবার খাস লোক। আমরাও তার কথা শুনি, তিনি যা বলেন সেই মতো চলি।

তাকে তুমি দেখনি।

না। তোর বাবা ম্যাসেজ করে জানিয়েছিল।

বাবার ফোন নম্বরটা দাও।

আমার কাছে নেই।

তাহলে তোমাকে যে ম্যাসেজ করেছে বললে।

সেটা অন্য কারুর মোবাইল থেকে করেছে।

অনিসা, রতনকে ছেড়ে দিল।

ভেতরে আয়।

অনিসা, রতনের সঙ্গে ভেতরের ঘরে এলো। একটা ছোটখাটো অফিস। ভীষণ সুন্দর সাজান গোছান। এটা মনে হয় রতন আঙ্কেলের প্রাইভেট চেম্বার।

ভিকি।

বলো।

একবার ফাদারকে বলে আসিস পরে যাব।

আচ্ছা।

ফাদার!

অনিসা মনে মনে একবার চিন্তা করলো এখানে ফাদার আবার এলো কোথা থেকে? অপেক্ষা করতে হবে তাড়াহুড়ো করলে চলবে না।

দেয়ালে বাবার একটা বড়ো ফটো। ও একটু অবাক হয়ে গেল।

বাবার ফটো এখানে কেন?

তোর বাবা আমার কাছে গড তাই।

মালা পরাও নি কেন?

অনিদা কারুর কাছে কোনওদিন মালা পরে না।

ইসলামদাদাই এখানে কখনও এসেছে?

একবার। যেদিন এটা ওপেন হয়।

এটা কিসের অফিস?

তোর বাবা যে কাজ করতে দিয়েছে তার অফিস।

এক্সপোর্ট ইমপোর্ট।

হ্যাঁ।

আবিদ আঙ্কেল এখানে আসে?

না।

আবিদ আঙ্কেলও তোমার মতো কাজ করে?

হ্যাঁ।

আবিদ আঙ্কেলের কোনও অফিস নেই?

আছে।

কোথায়?

পার্ক সার্কাস।

তুমি ওই অফিসে যাও না?

মাঝে মাঝে যাই।

তোমাদের দুজনের বিজনেস আলাদা?

হ্যাঁ।

অনিসা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল রতনের দিকে।

মাথায় ঢুকছে না?

না।

মুখ চোখটা কেমন যেন লাগছে বাথরুমে গিয়ে জল দিয়ে আয়।

অনিসা উঠে গেল।

রতন মোবাইলটা বার করে রিং করলো। আবার কেটে দিল।

ভিকি ঘরে ঢুকলো।

নিয়ে এসেছিস?

হ্যাঁ।

যা প্লেটে করে নিয়ে আয়। সবার জন্য নিয়ে এসেছিস?

না।

তাহলে ও খাবে না।

কেন!

ও ঠিক অনিদার মতো।

মনগড়া কথা বলছো।

অপেক্ষা কর প্রমান পেয়ে যাবি।

ভিকি হাসলো।

অনিসা বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো।

ভিকি ওর দিকে তাকিয়ে মাথা নীচু করে নিল।

রতন আঙ্কেল আমাকে যে স্টেশন থেকে নিয়ে এলেন তিনি কোথায়?

একটা কাজে পাঠিয়েছি।

উনি আমার সঙ্গে কথাই বললেন না।

উনি কম কথা বলেন।

উনি কি সন্ন্যাসী।

না।

তুমি সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছ। আবার কোথায় যেন কিছু লুকচ্ছ।

তুই বুঝতে পারছিস?

একটু একটু।

ভিকি তোর জন্য খাবার এনেছে খেয়ে নে।

তোমাদের জন্য আনে নি?

আমরা তোর আসার আগে খেলাম।

তুমি জানতে না আমি আসবো?

জানতাম।

তাহলে খেলে কেন?

ভেবেছিলাম তুই এতদূর পর্যন্ত আসবি না।

সবার জন্য আনতে পাঠাও।

ভিকি একবার রতনের দিকে তাকিয়ে হাসলো। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

তুই খেতে শুরু কর ও আনছে।

আগে আনুক তারপর।

রতনের মোবাইলটা বেজে উঠলো।

হ্যাঁ বলো।….আমার সামনে বসে আছে….ঠিক আছে।

প্রেমানন্দ এখন ব্যস্ত আছে তোর সঙ্গে কথা বলতে পারবে না। রাতে তোর সঙ্গে চ্যাটে কথা বলবে।

বাবা কোথায়?

জানিনা।

আমি বিশ্বাস করি না।

আমার কিছু করার নেই। এর বেশি তোকে বলতে পারবো না।

কেন!

সে অধিকার আমার নেই। আমার গণ্ডী সীমাবদ্ধ, তার বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।

আবিদ আঙ্কেল?

ওরও একই অবস্থা। আমি কি কাজ করি ও জানে না। ও কি কাজ করে আমি জানি না।

জানা জানি হলে।

হয়তো এই পৃথিবীতে নাও থাকতে পারি।

কেন!

এটাই অনিদার শাস্তি।

বাবা কখনও এরকম করতেই পারে না।

চোখে দেখেছি তাই বলছি।

ভিকি ঘরে ঢুকলো।

ওদের দিয়েছিস?

হ্যাঁ।

যা তোরটা আমারটা প্লেটে করে নিয়ে আয়।

ভিকি বেরিয়ে গেল। আবার ফিরে এলো।

বোস।

অনিসার দিকে তকিয়ে।

নে খা।

আচ্ছা রতন আঙ্কেল—

বল।

বাবা কি মস্তান?

একেবারেই না।

তুমি যেভাবে বলছো তাতে বাবাকে মাস্তান বলে মনে হয়।

তোর বাবা বিশ্বাসঘাতককে শাস্তি দেয়। আর যারা বিশ্বাসের মর্যাদা দেয় তাদের  নিজের শরীরের রক্ত দিয়ে বাঁচায়। ভিকি তার প্রমাণ।

অনিসা ভিকির দিকে তাকাল।

ভিকিদার গালটা ওরকম ভাবে কাটা কেন?

ও অনিদার কথা শোনেনি। নিজে বেশি বুঝেছিল। তাই গালটা গেছে।

ভিকি মাথা নীচু করে নিল।

কবে হয়েছিল?

কয়েক বছর আগে।

বাবাতো এখানে ছিল না, বাঁচালো কি করে।

এখানে এসেছিল দিন পাঁচেকের জন্য। কয়েকদিন নার্সিংহোমে ভর্তি ছিল।

সুরো পিসির ছেলে হওয়ার সময়।

হ্যাঁ। তুই জানলি কি করে!

প্রেমানন্দ বলেছে।

মিথ্যে কথা বললি।

তুমি ও ভাবে তাকাবে না।

সত্যি কথা বল।

তুমি সত্যি কথা বলছো যে আমি বলবো।

রতন হাসলো।

চুপ চাপ।

রতন আঙ্কেল?

রতন আনিসার দিকে তাকাল।

তুমি এই জগতে এলে কি করে?

সে অনেক কথা।

একটু বলো। ছোটো করে।

শুনবি।

অনিসা মাথা দোলাল।

তুই চা খাবি না ঠাণ্ডা খাবি।

চা খাব। খুব খিদে লেগেছিল বুঝেছো।

আর একটা নিয়ে আসুক।

না পেট ভরে গেছে।

ভিকি উঠে গেল।

বলো।

কি বলতো।

তুমি এই জগতে এলে কেন?

কেউ ইচ্ছে করে আসে। পেটের তাগিদে চলে এলাম। তারপর তোর বাবার পাল্লায় পরে নিজেকে আস্তে আস্তে ওই জগত থেকে সরিয়ে নিলাম।

তোমার চায়ের দোকানটায় সেদিন গেছিলাম।

আমার চায়ের দোকান!

অবাক হচ্ছো—

তা একটু হচ্ছি—

মির্জা গালিব স্ট্রীটে—

রতন একবার ভাইঝির দিকে তাকাল। মেয়েটা মনে হচ্ছে এই কয়মাসে অনেক কিছু জেনে ফেলেছে। ওর পেছনে এবারে লোক লাগাতে হবে। এতদিন ভাবছিলাম ওর সখ হয়েছে। এখন দেখছি এটা সখ নয়। অনিদার মতো ওরও একটা নিজস্ব ক্ষমতা আছে।

ধরা পরেগেছ—

কি বলতো—

মিথ্যে কথা বললে আমাকে।

ঠিক তা নয় আগে দোকানটা আমার ছিল। এখন আর নেই।

এখনও দোকানটা তোমার।

কে বললো তোকে?

খোঁজ নিয়েছি।

কি পেলি?

বলবো কেন তোমাকে।

রতন তাকিয়ে থাকলো অনিসার দিকে। হাসলো।

একেবারে অনিদার মতো চোখে ওর দিকে তাকাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন একেবারে ভেতর পর্যন্ত দেখে নিচ্ছে। প্রেমানন্দর সঙ্গে ওর আলাপ হলো কি করে? এই ব্যাপারটা ও জানতো না। ওকে জানতে হবে। কয়েকদিন আগে ওর কাছে ইনফর্মেশন আসে। সেই মতো ও কাজ করেছে। এমনও ইনস্ট্রাকশন দেওয়া আছে ও যদি কিছু জানতে চায় ওকে যেন বলা হয়। কিন্তু বুঝে শুনে।

বলো।

কি বলতো?

বাবার কাছে বিশ্বাস ঘতকদের একটাই শাস্তি মৃত্যু।

রতন হাসলো।

হাসলে কেন?

তুই খুব মনে রাখতে পারিস।

মনে রাখবো না—

ভিকি ঘরে ঢুকে চায়ের কাপটা টেবিলে রাখলো।

নে, চা খা।

বুঝেছি তুমি এটাও বলবে না।

বলছি। কটা বাজে বলতো?

ছটা দশ।

বাড়ি যাবি না। মা চিন্তা করবে।

করুক।

ওরা কেউ জানে না তুই এখানে।

সব জানাতে হয় নাকি।

মাথায় রাখবি তুই একটা মেয়ে।

তাতে কি হয়েছে।

কিছু একটা অঘটন ঘটলে।

তোমরা আছ শাস্তি দেবে।

শাস্তি দিলেই কি সব শেষ হয়ে যায়।

বলো না। তোমাকে এতোবার বলতে হয় কেনো বলোতো?

তুই চাইলি আর তোকে দিয়ে দিলাম, তাহলে তোর ইন্টারেস্ট থাকবে না।

ঠিক আছে যাও, তোমাকে বলতে হবে না।

জানিস অনিসা সেদিনের কথাটা মনে পরলে আজও শরীরটা কেমন শিউরে ওঠে। সেদিন অনিদা সবে দেশের বাড়ি থেকে ফিরেছে। সেই প্রথম ইসলামভাই অনিদার বাড়িতে গেছে। কলকাতায় ঢুকেই আমাকে ফোন করলো।

রতন।

হ্যাঁ।

একবার তুই ওমকে খুঁজে বার কর।

ওম কে!

পরে বলছি।

ঠিক আছে।

আমি বললাম, কেন আবার কি হলো?

যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব খুঁজে বার কর, না হলে একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাবে।

আবার কি হলো!

পরে বলছি।

তখন অনিদার একটা টাফ ফেজ চলছে। ঘরে বাইরে সব জায়গায়। আমরা বুঝতাম কিন্তু খোলসা করে কিছু জানতাম না। ইসলামভাই ভাসা ভাসা জানতো, আবার জানতো না গোছের। সঙ্গে সঙ্গে ওমকে ফোন করলাম। বললো, তুমি পিলখানায় চলে এসো রতনদা। ইসলামভাই আমাকে ফোন করেছিল।

আমরা তখন কেউ ভালো লোক ছিলাম না। এখনও নই। তবে অনেক বুঝে শুনে কাজ করি। তোর বাবার কাছ থেকে এটুকু শিখেছি। বলতে পারিস বুদ্ধি দিয়ে কাজ করি।

ওখানে এসে দেখি ওম একটা ছেলেকে নিয়ে বসে আছে। আগে আমাদের সঙ্গে ছিল তারপর আমাদের এ্যান্টি হয়ে যায়, নতুন দল গড়ে।

নাম কি?

ছট্টু।

তারপর আবার ইসলামভাইয়ের ফোন এলো। বললো, তুই ছট্টুকে নিয়ে থাক। আমি নেপলাকে পাঠালাম। অনি যাচ্ছে। অনিকে নেপলা পিকআপ করবে। অনি না খেয়ে বেরিয়ে গেছে। আর শোন, কখনও অনিকে বলবি না আমি তোদের পাঠিয়েছি।

আচ্ছা।

হিসাব বুঝে গেলাম আবার একটা গণ্ডগোল।

কেন তার আগেও গণ্ডগোল হয়েছে?

তোকে বললাম না ওই ফেজটাই গণ্ডগোলের ফেজ চলছে। সব টালমাটাল অবস্থা।

অনিদা এলো। নেপলা নিয়ে এলো।

কিছুই জানি না। দাদা যা বলেছে অন্ধের মতো কাজ করছি।

অনিদা যে ছট্টুকে চেনে, অনিদা আসার আগে পর্যন্ত আমরা কেউ জানতাম না। কথা প্রসঙ্গে জানলাম অনিদার কাছে ছট্টু পড়তো শেয়ালদার পথ শিশুদের স্কুলে। অনিদা ওকে বহুবার পুলিশের হাত থেক বাঁচিয়েছে। ছট্টু কথা প্রসঙ্গে সব স্বীকার করলো। অনিদা ওর সঙ্গে ইয়ার্কি ফাজলামো মারলো। আমরা সবাই হাসাহাসি করলাম। তোর মার সঙ্গে অনিদার তখন দিন পাঁচেক হলো বিয়ে হয়েছে। সেই নিয়েও হাসা হাসি হলো।

একথা সেকথা বলতে বলতে অনিদা আসল কথাটা মনে হয় জেনে ফেলল। তারপর অনিদা কি কথা জিজ্ঞাসা করতে ছট্টু মনে হয় মিথ্যে কথা বললো (সেটা পরে বুঝতে পারলাম) দাম করে ছট্টুর বুকে একটা লাথি। মুখে একটা সজোরে ঘুসি আছড়ে পরলো।

অনিদাকে কোনওদিন রাগতে দেখিনি। সেই অনিদা রেগে টং। নেপলাকে চেঁচিয়ে বললো যা দড়ি আর লিউকো প্লাস নিয়ে আয়। নেপলা পরি কি মরি করে জোগাড় করে নিয়ে এলো। ওকে বাঁধা হলো। মুখে লিউকোপ্লাস আটকে দিলো নিজে হাতে।

তার আগে ছট্টু অনিদার পা জড়িয়ে ধরেছে। আমাকে বাঁচাও। আমি আর করবো না। আমি জানি তুমি আমাকে মেরে দেবে। আমি তোমাকে চিনি।

কে কার কথা শোনে।

অনিদার চোখ মুখ দেখে আমাদের বুক হিম হয়ে গেছে।

নেপলাকে বললো আমাকে রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে আসবি চল।

আমার আর আবিদের দিকে তাকিয়ে বললো যতক্ষণ না আমি ফিরবো এখানে বসে থাকবি। না হলে আজই হজম করে দেব দুটোকে।

তখন আমাদের হাত পা কাঁপছে।

অনিদা চলে যেতে ইসলামভাইকে ফোন করে সব বললাম।

ইসলামভাই ছুটে এলো।

ছট্টুর পেট থেকে সব কথা টেনে বার করলো।

কি কথা!

তোকে জানতে হবে না।

বলো না।

তোর বাবাকে আর ইসলামভাইকে।….বলতে পারিস তোদের পুরো পরিবারকে মারার ছক কষেছিল।

আঁ।

হ্যাঁ।

ওর মুখ থেকে এও জানলাম ছট্টু একবার গুলি খেয়ে রাস্তায় পরেছিল। তোর বাবা পুলিশের হাত থেকে ওকে বাঁচিয়ে মেডিকেলে ভর্তি করিয়েছিল। কিন্তু খাতা কলমে ছট্টু হাসপাতালে ভর্তি হয়নি।  কনিষ্কদারা রাতে অপারেশন করে সেই গুলি বার করে। যে কিনা এতো করেছে তাকে মারার ছক কষেছে ছট্টু।

কেন!

সে অনেক কথা।

তারপর বলো।

ঠিক এক ঘণ্টার মাথায় নেপলা এসে খবর দিল তোমরা ফেটে যাও অনিদা ঢুকছে।

দূর থেকে দেখলাম প্রায় দশখানা গাড়ি ভর্তি স্পেশাল ব্রাঞ্চের লোক। হাতে সব এসএলআর।

ছট্টুকে তুলে নিয়ে গেল। কোথায় নিয়ে গেল কি করবে কিছু বুঝলাম না। ছট্টুর মুখ থেকে যেটুকু শুনেছিলাম ঘুটিয়ারি শরিফে কারা আছে। তারা অনিদাকে মারার ছক কষেছে।

রাত দেড়টার সময় তোর বাবার একটা ম্যাসেজ পেলাম, আমি মরি নি।

পরে অর্কদার মুখে শুনেছিলাম ওখানে অনিদাকে মারার জন্য তৎকালীন একজন সাংসদ ইউপি থেকে সাত জনকে ভাড়া করে এনেছিল। এমনকি অনিমেষদাকে পর্যন্ত মারার ছক কষেছিল।

ওই রাতে অনিদা তাদের এনকাউন্টার করাল। আমরা সবাই ভয়ে মরি। ছট্টুর মুখ থেকে ওইটুকু সময়ে যা শুনেছি। তাতে আমাদের হাত পা সব ঠান্ডা হয়ে গেছে।

মি. মুখার্জী এই অপারেশনটা করেছিল। ছট্টুকেও অনিদা কুত্তার মতো মেরে দিয়েছিল। সেই থেকে অনিদার কথার কোনওদিন অবাধ্য হইনি। আজও যা বলছে যেমন ভাবে চলতে বলছে। চলছি।  খাওয়া পরার কোনদিন অভাব হয়নি। সমাজে এখন আমি প্রতিষ্ঠিত বিজনেস ম্যান। আর ব্যবসা করতে গেলে তোকে আন্ডার ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে একটু আধটু ভাব রাখতে হবে। না হলে টিঁকতে পারবি না।

বাবা ঠিক কাজ করেছে—

তুই বলছিস—

হ্যাঁ। আমি হলেও তাই করতাম।

কেন!

দুধ দিয়ে কাল সাপ পোষার থেকে না পোষা ভালো।

রতন হাসলো।

তুমি জানো মি. মুখার্জী কে?

জানি, শুভর বাবা।

উনি মারা গেছেন।

মি. মুখার্জীকে যারা মেরেছে তারা আজ আর কেউ বেঁচে নেই।

এটাও বাবা করিয়েছে?

আর কে করাবে, কে জানবে মি. মুখার্জীকে কারা মারলো। পরে শুনেছি সেদিনও অনিদা মি. মুখার্জীকে বারন করেছিল। আজ আপনি ওই জায়গায় যাবেন না। ভদ্রলোকের অত্যাধিক সাহস। একলা বেরিয়ে পরলেন। ভাগ্যিস বাচ্চাটাকে অনিদা তুলে নিয়ে এসেছিল।

বাবা শুভকে তুলে নিয়ে এসেছিল!

হ্যাঁ।

রতন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো।

তারপর ওর দাদু গিয়ে বাচ্চাটাকে নিয়ে আসলো।

ইসলামদাদাই এসব জানে?

না।

আমাকে বললে?

তোর হজম শক্তি বেশি, তাই।

অনিসা হাসলো।

তারমানে আমি যদি বিট্রে করি, বাবা আমাকেও ঘ্যাঁচ….।

রতন হো হো করে হেসে উঠলো।

তুমি আমাকে ট্রাস্ট করতে পার রতন আঙ্কেল।

এবার বাড়ি চল।

দাঁড়াও আরও কিছু জানার আছে। তোমাকে যখন পেয়ে গেছি।

আজ আর নয়।

রাজনাথ কে?

সেই সাংসদ।

ডা. ব্যানার্জী?

এটা তোকে বলতে পারবো না।

কেন!

এটা অনিদা ফিরে এলে জিজ্ঞাসা করবি।

তুমি পাক্কা বাবা ফিরে আসছে?

অবশ্যই।

ফোনটা বেজে উঠলো।

রতন ফোনটা পকেট থেকে বার করেই জিভ বার করলো।

ইসলামভাই। তুই ওঠ আগে।

হ্যাঁ দাদাভাই….অনিসা….তাই….ঠিক আছে….তুমি ভেব না। ওর পেছনে আমার লোক লাগান আছে।

ফোনটা পকেটে রাখলো।

তুই ওঠ আগে। বাড়িতে কান্নাকাটি পড়ে গেছে।

রাখো তো। কান্না ছাড়া ওরা আর কিছু জানে।

তুইও তো কাঁদছিলি তখন।

ওটা রাগে।

চল চল। তোর ফোন কোথায়?

ব্যাগে।

নিশ্চই স্যুইচ অফ।

হ্যাঁ।

এখন খুলিস না।

অনিসা হাসলো।

রাস্তায় বেরিয়ে আসার সময় সবাই রতন আঙ্কেলকে সেলাম জানাচ্ছে।

গড়িয়াতে এসে রতন আঙ্কেল ইসলামদাদাইকে ফোন করলো।

কি হলো বল।

ও এখন গড়িয়াহাট দিয়ে একা একা হাঁটছে। মনে হচ্ছে বাড়ির দিকে যাচ্ছে।

অনিসা মুখে হাত চাপা দিয়ে হাঁসছে।

কে আছে ওর পেছনে।

তোমাকে জানতে হবে না।

মহা মুস্কিল।

মুস্কিল কিসের।

বাড়ি ঢোকা পর্যন্ত যেন লোক থাকে।

আচ্ছা।

বাড়ির কাছাকাছি এসে রতন আঙ্কেল একটা রিক্সা ডেকে ওকে তুলে দিল।

গেটের মুখে রিক্সা থেকে নামতেই দেখল বাগানে ইসলামদাদাই কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। শেষটুকু কানে এলো। হ্যাঁ এসেছে। তোর সঙ্গে পরে কথা বলছি।

ইসলামদাদাই এগিয়ে এলো।

বারান্দায় চোখ পড়তে দেখল দিদাই, দাদা, শুভ দাঁড়িয়ে। দিদান, মাকে দেখতে পেল না।

কিরে এতক্ষণ কোথায় ছিলি? ইসলামভাই বললো।

কাজ ছিল।

কলেজ থেকে অনেকক্ষণ বেরিয়েছিস।

শুভ বলেছে বুঝি?

একবার ফোন করবি তো।

ফোন বন্ধ করে রেখেছি।

কেন!

ভালো লাগছিল না।

বাড়িতে সবাই তোর জন্য ভাবছে।

ভাবুক। আমি কি ছোটো আছি।

না তুই বড়ো হয়ে গেছিস।

আর কাকে কাকে জানিয়েছ।

কাউকে জানাই নি।

অনিসা বারান্দায় উঠে এলো।

দিদাই-এর দিকে একবার তাকিয়ে হেসে ফেললো। তারপর জড়িয়ে ধরলো।

আমি হারাবো না।

আর আদর দেখাতে হবে না। ভাগ এখান থেকে। বাপ যেরকম করেছে, মেয়েও সেরকম শুরু করেছে।

দিদাইকে জড়িয়ে ধরেই বসার ঘরে এলো।

মা, দিদান সোফায় গম্ভীর হয়ে বসে।

ও একবার মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসলো। মা হাসলো না গম্ভীর।

দিদান মুখটা কেমন যেন করলো।

দিদাইকে ছেড়ে দিয়ে ও দুজনের মাঝখানে গিয়ে বসলো।

বাবাঃ তোমার মুখটা ঠানদিদির মতো লাগছে।

দিদানের গলা জড়িয়ে ধরলো।

কোথায় যাওয়া হয়েছিলো শুনি?

একটা লোকের সঙ্গে আলাপ হলো বুঝলে, তার সঙ্গে একটু ঘুরতে গেছিলাম।

বাড়িতে লোকজন আছে সে খেয়াল আছে।

আমি না বলেছি।

ফোনটা বন্ধ কেন?

কথাবলার সময় ডিস্টার্ব হবে তাই।

কাল থেকে কলেজ যাওয়া বন্ধ।

যাব না।

তোর বাপ আসুক সব তোলা রইলো।

অনিসা খিল খিল করে হেসে উঠলো। মাকে জড়িয়ে ধরলো। গালে চকাত করে একটা চুমু খেয়ে বললো, আজ একটা নতুন জগত দেখলাম বুঝলে। দারুণ ইন্টারেস্টিং।

মিত্রা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে।

তোমরা এতক্ষণ সব হম্বিতম্বি করছিলে, বাড়ি মাথায় তুলে রেখেছিলে, ফিরে আসার পর ওকে কিছু বললে না? অনন্য বলে উঠলো।

কেন তোর খুব সুবিধে হয় তাই না। বড়োমা ঝাঁঝিয়ে উঠলো।

বুঝেছি আমি করলেই দোষ, ও করলে সাতখুন মাপ।

ছোটো দে তো ওর কানটা মুলে।

কান মুললেই হলো। কাল থেকে আমিও দেরি করে বাড়ি ঢুকবো।

মিত্রা মাথা নীচু করলো। হাসবে না কাঁদবে। দুজনে প্রায়ই এরকম ঝগড়া করে। তবে অনিসা চুপচাপ থাকে, কোনও কথা বলে না। অনন্য কিছুক্ষণ তরপাবার পর যখন দেখে কোনও রেসপন্স আসছে না তখন চুপ করে যায়।

অনন্য গট গট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

মিত্রা একবার তাকিয়ে দেখল।

শুভ দাঁড়িয়ে রইলো।

ঘটের মতো দাঁড়িয়ে রইলি কেন। বোস।

শুভ একবার অনিসার দিকে কুত কুত করে তাকাল।

নালিশ করে কটা বালিশ পেলি।

আমি নালিশ করিনি—

তাহলে কি করেছিস—

তুই ফিরেছিস কিনা জানতে এসেছিলাম।

তারপর পেট উজার করে সব বমি করে দিলি।

শুভ চুপ করে রইলো।

ইসলামভাই হাসছে। ছোটোমা অনিসার জন্য জল নিয়ে এলো।

খাওয়া দাওয়া কিছু হয়েছে।

তোমার জন্য সাবাই না খেয়ে বসে আছে।

কি রকম ভিআইপি হয়েগেছি বলো। দাও দাও নিয়ে এসো।

শুভর দিকে তাকাল।

যা দাদাকে ডেকে নিয়ে আয়।

শুভ উঠে চলে গেল।

আজ আরএসের ক্লাসটা করে কলেজ থেকে কাট মারতে হবে। কলেজে অনিসার এখন বেশ নাম ডাক হয়েছে। ও নাকি খুব ভালো ইংরেজী লিখতে পারে।

মা বার বার বলেছিল দাদা জয়েন্ট দিচ্ছে তুই জয়েন্টে বোস। ও কিছুতেই বসেনি। বার বার মাকে বুঝিয়েছে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার সবাই হলে লিটেরেচার নিয়ে কারা পড়বে।

বাবা বাংলা নিয়ে পড়েছে তুমি বাংলা নিয়ে পড়েছ, আমি ইংরাজী অনার্স নিয়ে জার্নালিজম করবো।

মেয়ের যুক্তি শুনে মা মেনে না নিলেও দুদুন মেনে নিয়েছে। বলতে পারা যায় দুদুনের জন্যই ও ইংরাজী অনার্স নিতে পেরেছে।

মাত্র তিন নম্বরের জন্য ও শুভকে বিট করতে পারেনি। শুভ ফার্স্ট হয়েছে ও সেকেন্ড।

দাদা যদিও ওর অনেক পরে।

দাদা ডাক্তারিতে চান্স পেয়েছে।

মেডিক্যেলে আছে। হোস্টেলে থাকে না।

শুভ মাইক্রো-বায়লোজি নিয়ে ওর সঙ্গে একই কলেজে ভর্তি হয়েছে।

সেদিন ওদের কলেজের জিএস এসে ওর সঙ্গে যেচে আলাপ করেছিল।

তোমার নাম অনিসা।

হ্যাঁ। কেন বলুন তো?

আমি কুন্তল এই কলেজের জিএস।

তাতে আমি কি করবো।

ছেলেটা একটু অবাক হয়ে তাকিয়েছিল ওর দিকে।

একটু যদি আসতে আমাদের ইউনিয়নরুমে।

সময় নেই। কি দরকার বলুন।

এখানে বলা যাবে না।

সরি। অনিসা গট গট করে ক্লাসে চলে গেছিল।

পেছন থেকে দু-একজন স্টুডেন্ট জিএসকে বেশ ভালোরকম আওয়াজ দিয়েছিল। ওর কানে এসেছিল।

ওর বায়োডাটা জানা সত্ত্বেও তুই ইঁট পাততে গেলি। দিলো তো।

অনিসা মনে মনে হাসলো।

ওর একটা বড়ো প্লাস পয়েন্ট আছে। ও কাগজের মালিকের মেয়ে। তাছাড়া ওর বাবা-মাও এই কলেজে পড়াশুন করেছে। ওই সময়কার বেশ কয়েকজন প্রফেসর বাবাকে শুধু নামে চেনে না বাবার সম্বন্ধে ডিটেলসে জানে।

বোন তোর কি সময় হবে।

চিন্তার সূত্রটা ধাক্কা খেল।

ফিরে তাকাল।

দাদা।

কিরে!

তোকে কয়েকটা কথা বলতাম—

বল—

তুই তো ববার সম্বন্ধে অনেক কিছু জেনেছিস—

অনিসা একবার দাদার দিকে তাকাল—কি বলতে চায় ও?

বাবা কি আমার একার, তোর নয়।

আমি তোর মতো ভাবতে পারি না। কোথায় যেন খেই হারিয়ে ফেলি।

চেষ্টা কর পারবি।

করেছি বুঝলি, পারি নি।

কি বলছিস বল?

আমি কতকগুলো জিনিস জানতে পারলাম। তুই যদি একবার যেতিস।

কোথায়?

আমাদের হাসপাতাল মর্গে যে ডামটা আছে তার কাছে।

মর্গে!

হ্যাঁ।

কি জানলি?

সেদিন আমাদের ডেড বডি নিয়ে একটা ক্লাস ছিল। স্যার বললো ওকে চেনো কেষ্ট।

ভদ্রলোক বললেন, না স্যার।

ও অনির ছেলে।

তুই বিশ্বাস করবি না বাবার নমটা শোনার পর ভদ্রলোকের চোখমুখ চকচক করে উঠলো। হাসি যেন আর ধরে না। ছুটে এসে ভদ্রলোক আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমার কেমন যেন একটা করছিল। তারপর বললো তুমি অনিদার ছেলে!

বেশ কিছুক্ষণ আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলো, যেন আমার মুখের মধ্যে কিছু খোঁজার চেষ্টা, তারপর আপনমনে বিড় বিড় করতে করতে চলে গেল। লোকটার এক চোখ কানা সারাদিন মরা ঘাঁটে। কেমন যেন দেখতে। ডোম বলে কথা। আমার বন্ধুরা বললো—

তোর বাবা কি ডাক্তার ছিল?

আমি কি উত্তর দেব বল।

যা সত্যি তাই বলবি—

বলেছি—

ওরা কেমন সন্দেহের চোখে আমার দিকে তাকাল।

পরে নীরুমামা ক্লাস করাতে এসে একটা গল্প বললো। গল্পের মধ্যে দিয়েই ডাক্তারের বিহেভিয়ার কেমন হওয়া উচিত তা বোঝাল। কিন্তু গল্পটায় বাবার জীবনের বেশ কিছুটা ছোঁয়া পেলাম।

ইন্টারেস্টিং। কি বললো?

মার মুখ থেক শোনা বাবার সেই মর্গের ডোমদের সঙ্গে বাবার ভাব। তাতে নীরু মামাদের কি উপকার হয়েছিল? তারপর শিয়ালদার ফ্রি স্কুলে রাতে পড়াতে যাওয়া। বিনে পয়সায় রোগীর চিকিৎসা, এই সব। কিন্তু কোথাও বাবার নামটা উচ্চারণ করলো না।

বললো, ডাক্তাররা শুধু মানুষের রোগের ট্রিটমেন্ট করে না। রুগীর মনটাকেও সতেজ করে তোলে। ডাক্তার সমাজের উপকারী বন্ধু। টাকা রোজগার করার যন্ত্র নয়। যে এই গুণটা বেশি রপ্ত করতে পারবে সেই-ই বড়ো ডাক্তার হবে।

পরে আমি কেষ্টদার কাছে গেছিলাম।

কথাবার্তা শুনে বুঝলাম বাবা যে নেই সেটা ও জানে। তাছাড়া ও অনেক কথা গোপন করলো মনে হয়।

তুই আমাকে নিয়ে যাবি—

সেই জন্য তোকে বলতে এসেছি, তোর আজ সময় হবে?

একটার পর। বল কোথায় যেতে হবে?

তুই আমাকে একটা ফোন করিস।

আচ্ছা।

অনন্য দাঁড়িয়ে থাকল।

কিছু বলবি।

তুই বাবার সঙ্গে আমার একটু কথা বলিয়ে দিবি?

আমি!

কেন, সবাই যে বলে তোর সঙ্গে বাবা কথা বলে।

কে বলে বল—

ভজুমামা পর্যন্ত বাবার সঙ্গে কথা বলেছে—

তাই বল। ঠিক আছে তোকে গল্পটা রাতে ফিরে বলবো।

সত্যি তুই বাবার সঙ্গে কথা বলিসনি?

একটা সূত্র পেয়েছি কিন্তু কথা বলতে পারিনি।

তোকে আর একটা ক্লু দেবো।

অনিসা দাদার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে আছে। ওর থেকে মাত্র তিরিশ সেকেন্ডের বড়ো। দাদার মনের মধ্যে একটা সঙ্কোচ কাজ করছে। ও ঠিক ফ্রি-ভাবে ওর সঙ্গে কথা বলতে পারছে না। তাহলে কি বাড়ির কেউ ওকে কিছু বলেছে?

বল।

আজ থাক। আর একটু ভালো করে জেনে নিই।

তুই এইভাবে আমার সঙ্গে কথা বলছিস কেন?

তুই বাবার মেয়ে হয়ে যা করেছিস আমি বাবার ছেলে হয়ে কিছু করতে পারলাম না। মাঝে মাঝে নিজের প্রতি নিজের ঘেন্না হয়। যে কাজটা আমার করার কথা ছিল সেই কাজটা তুই করছিস।

আমি তুই আলাদা নই—

অনন্য মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে।

বাবা আমার বয়সে জীবনে কি না করেছে। সে তুলনায় আমি নস্যি। তবু তুই কিছুটা এগিয়েছিস। অনন্যর গলাটা ভাড়ি হয়ে এলো। চুপ করে থাকলো।

কাল রাতে মা বাগানে দাঁড়িয়ে অঝোড়ে কাঁদছিল। কার সঙ্গে যেন কথা বলছিল। বার বার তোর নাম করছিল। শেষে বললো বুবুনের জেদের কাছে আমি পারলাম না, মেয়ে যদি পারে।

অনন্য, অনিসার দিকে তাকাল।

মা আমার থেকেও তোকে ভীষণ ট্রাষ্ট করে। তুই মাকে কষ্ট দিস না।

তুই এ কি বলছিস!

সেদিন তোর ফিরতে দেরি হতে দিদান মাকে ফোন করলো। মা আধঘণ্টার মধ্যে অফিস থেকে চলে এলো। তারপর সেই যে চুপ করে গেলো কোনও কথা বললো না। মায়ের মুখটা দেখে বুঝতে পারছিলাম মায়ের ভেতরটা ভীষণ কাঁদছিল।

তুই বিশ্বাস কর, সেদিন আমি আর একটা সূত্র খুঁজে পেয়েছি।

শুভ বললো, তুই ওকে ফোন করেছিলি। তারপর ফোনটা স্যুইচ অফ করে রেখেছিলি।

অনিসা দাদার দিকে তাকিয়ে আছে।

শুভ অনেক কিছু জানে। আমাকে বলেছে।

রাখ ও একটা ছাগল।

সব সময় ওকে ওইরকম করিস কেন। ও তোকে ভীষণভাবে হেল্প করতে চায়। দেখনা ও কি বলতে চায়। হয়তো তোর কাজেও লাগতে পারে।

অনন্য আবার চুপ করে থাকল।

মায়ের ডাইরীগুলো পরেছিস?

তুই জানলি কি করে!

আমি কয়েকদিন আগে একবার মায়ের ঘরে ঢুকেছিলাম। বাবাকে প্রণাম করতে। মা তখন অফিসে। দেখলাম বিছানায় একটা ডাইরী পরে। কি খেয়াল হতে দু-এক লাইন পড়ে মাথা খারাপ হয়ে গেল। সেদিন আর বেরলাম না। লুকিয়ে সারা দুপুর ডাইরীটা পড়ে ফেললাম।

ডেট টাইম দেখেছিস।

মাস চারেক আগেকার।

কি লিখেছে।

মা লিখেছে তুই মার ডাইরীর সন্ধান কি ভাবে পেয়ে গেছিস। মা এখন তাই ডাইরীতে আর লিখছে না ল্যাপটপে লিখছে।

আর কি লিখেছে?

তুই ডা. ব্যানার্জীকে চিনিস?

অনিসার চোখগুলো বড়ো বড়ো হয়ে গেলো।

না।

আমাদের নার্সিংহোম গুলোর আগে মালিক ছিল, এমনকি কাগজেরও।

তোকে কে বললো!

ওই হারামীর বাচ্চা মায়ের জীবনটাকে নষ্ট করে দিয়েছে। শুয়োরটাকে পেলে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেললতাম।

অনন্য দপ করে জ্বলে উঠলো। চোখ দুটো যেনো গনগনে আগুনের কয়লার টুকরো।

অনিসার চোখ গোল গোল হয়ে গেল। দাদার মুখে আগে কোনওদিন গালাগাল শোনেনি।

তুই কি বলছিস!

গত সপ্তাহে আমি গোপাললাল ঠাকুর রোডে গেছিলাম। বাড়িটা পোড়ো বাড়িতে পরিণত হয়েছে। গেটে একটা দারোয়ান বসে রয়েছে।

জিজ্ঞাসা করলাম। বললো, সে তো বহুদিন আগে স্যুসাইড করেছে।

অফিসে গিয়ে ওই প্রিয়েডের কাগজ পড়লাম লাইব্রেরী থেকে। নিউজ হয়েছে, ঘটনাটা সত্যি।

কে মারল কারা মারল কিছু ট্রেস করতে পেরেছিস?

কে মারবে, বাবা করিয়েছে কাজটা।

তুই জানলি কি করে?

অংশু পিসেমশাইয়ের কাছে জেনেছি।

অংশু পিসেমশাই জানে?

সবাই সব কিছু জানে, কেউ মুখ খুলতে চায় না।

কেন বলতো!

এমন কিছু একটা ঘোঁট পেকে আছে বাবা সারাজীবন ধরে তার সমাধান করে যাচ্ছে।

স্ট্রেঞ্জ।

দেখনা দিদান, দিদাই, দাদাই, দুদুন কারুর সঙ্গে আমাদের রক্তের সম্পর্ক আছে। বাবার সঙ্গে ওখানকার দাদামনি, দিদান, নীপাপিসি কারুর। যে কেউ আমাদের এই পরিবারটাকে দেখলে বাইরে থেকে কিছু বুঝতে পারবে। পারবে না। বাবা যেন সত্যি কারের দিদানের ছেলে।

মাকে দেখ। অতো বড়ো বাড়ি খালি পড়ে আছে। শুধু মেনটেনান্স করে যাচ্ছে। তোকে আমাকে নিয়ে একবারও ওই বাড়িতে গিয়ে রাত কাটিয়েছে। কোনও একটা প্রয়োজন হয়েছে, চলো সবাই মিলে ওই বাড়িতে গিয়ে থাকি। এটাই যেন আমাদের বাড়ি ঘর। আমি অনেক ভাবি বুঝতে পারলি, তল খুঁজে পাই না। এতো বড়ো হলি, তুই একদিনও মাকে এই ব্যাপারে প্রশ্ন করতে পেরেছিস। পারবি না।

অনিসা হাঁ করে দাদার মুকের দিকে তাকিয়ে।

আচ্ছা তুই দিদাই আর ইসলামদাদাই-এর কথা ভাব। কেউ কখনও এই সিচুয়েশন চিন্তা করতে পারবে?

ভেবেছি।

বসিরহাটের কথা ভাব। বিতান আঙ্কেল কে? শুনেছি দিদানের সঙ্গে উনত্রিশ বছর ওই বাড়ির কোনও রিলেশন ছিল না। হলো কি করে—সেখানেও বাবা। একবার কোনও প্রকারে হাতের নাগালে পাই—

অনিসা মাথা নীচু করে মুখ টিপে হাসলো।

বাবার তাহলে কতো বড়ো ক্ষমতা, সবাইকে এক কাট্টা করেছে। কেউ টেঁ-ফুঁ করতে পারে না। অনিসা বললো।

আমি ভাবি। মাথাটা কেমন শূন্য শূন্য লাগে।

তুই ডাক্তারদাদাই-এর কথা ভাব। পাশের বাড়ির লোক। আজ আমাদের ফ্যামিলি মেম্বার। যে কোনও ডিসিশনে ডাক্তারদাদাই-এর গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।

বাবা কোথাও নেই কিন্তু সব জায়গায় আছে। অনন্য বললো।

তুই দামিনীদিদাই-এর কথা একবার ভাব। অনিসা বললো।

এইটা আরও বেশি স্ট্রেঞ্জ লাগে আমার কাছে।

দামিনীদিদাইকে দেখে বাইরে থেকে কারুর বোঝার ক্ষমতা নেই যে দিদাই ওই পাড়ার বাসিন্দা। যে কেউ শুনলে নাক সিঁটকাবে। বাবা কি সুন্দর সবাইকে এক সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। কি ক্ষমতা আছে বলতো লোকটার।

আমার সব কিছু কেমন যেন রবিনহুড মার্কা মনে হয়। অনিসা বললো।

রবিনহুড তুই গল্পে পড়েছিস। গল্পটা আকাশ থেকে উড়ে আসেনি। কেউ তো একজন ছিল। তাই গল্পটা লেখা হয়েছিল। অনন্য বললো।

সব সময় বাবা একটা অদৃশ্য শক্তির মতো কাজ করে চলেছে। মাঝে মাঝে ভাবি বাবা এতো স্ট্রং নেটওয়ার্ক করলো কি করে!

কার কথা ছেড়ে কার কথা বলবি। অনন্য বললো।

মিলিমনি, টিনামনি, অদিতিমনি, দেবাশিস মামা, কনিষ্কমামা, নীরুমামা….।

তুই কার কথা বাদ দিবি।

সুরোপিসি তো বাবা বলতে অজ্ঞান।

কিন্তু আঠারো বছর হতে চললো তার দেখা নেই।

তুই একবার অনিমেষদাদাই-এর কথা ভেবেছিস। অনিসা বললো।

ঠিক ওই ভাবে ভাবিনি।

ওই রকম একটা লোক বাবাকে কব্জা করতে পারছে না। বিধানদাদাই, প্রবীর আঙ্কেল।

প্রবীর আঙ্কেল তবু মার কাছে সপ্তাহে একদিন আসে ফোন করে। মার সমস্ত সমস্যা প্রবীর আঙ্কেল সামলায়। কেন জানিস? অনন্য বললো।

কেন!

বাবা একবার প্রবীর আঙ্কেলকে বাঁচিয়েছিল।

অনিসা দাদার দিকে অবাক হয়ে দেখছে। ওর থেকে তো দাদা বেশি খবর রাখে।

ভালোবাসা বুঝলি ভালোবাসা।

একটু থেমে।

শাসন করা তারই সাজে সোহাগ করে যে। বাবা এই পথটা খুব ভালো ভাবে রপ্ত করেছে।

অনিসা একবার দাদার দিকে তাকাল।

আমার খুদ্র বুদ্ধিতে যে টুকু বুঝেছি, বাবা ভালোবাসার বন্ধনে সবাইকে বেঁধে রেখেছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার নিজের কোনও চাহিদা নেই। এতো টাকার সম্পত্তি পেয়েও মাথা ঘুরে যায়নি। শুনেছি বাবা নাকি তার জুনিয়র ছেলেদেরও ভীষণ শ্রদ্ধা করতো।

অর্ক আঙ্কেল, অরিত্র আঙ্কেল, রাত্রিমনি….। অনিসা বললো।

সন্দীপমামার কথা বললি না। অফিসে বাবার একমাত্র বুজুম ফ্রেন্ড, মা সন্দীপমামার বন্ধুর স্ত্রী তবু এখনও সন্দীপমামা মাকে ম্যাডাম বলে। আপনি বলে।

আমি একদিন জিজ্ঞাসা করেছিলাম সন্দীপমামাকে, শুধু বললো তোর বাবার কাছ থেকে শিখেছি। যে মানুষের স্থান যেখানে, তাকে সেখানে রেখে তার সম্মান দাও। তুমিও ফেরত পাবে। তুমি যদি ঠিক মতো সম্মান দিতে না পারো, তার কাছ থেকে তুমি সম্মান আদায় করবে কি করে—

তুই ব্যাপারটা ঠিক বলেছিস, তবে এর বাইরেও কিছু ব্যাপার আছে। অনিসা বললো।

সেই কিছুটা কি—

সেটাই তো খুঁজছি। একটু থেমে।

ডা. ব্যানার্জীর ব্যাপারে তুই কি জেনেছিস—

প্রশ্নটা করেই অনিসা দাদার দিকে তাকিয়ে রইলো।

তোকে বলতে পারি কিন্তু শপথ করতে হবে কাউকে বলবি না। ব্যাপারটা খুব সেন্সেটিভ।

আমি তোকে কথা দিলাম।

ভজু মামার কাছে সামান্য হিন্টস পেয়েছিলাম। তুই বুড়ী মাসিকে চিনিস?

অনিসা দাদার মুখের দিকে তাকাল। বিষ্ময়ে চোখ দুটো বিহ্বল। তারমানে দাদা ওর আগে থেকে এসব নিয়ে ঘাঁটছে। কিন্তু ও ঘুনাক্ষরেও টের পায়নি। দাদা তো বহুত ডেঞ্জার!

তুই বাবার ফ্ল্যাটে কোনওদিন গেছিস।

না।

আমি ভজু মামার সঙ্গে একবার গেছিলাম। ভজু মামা ঘর গোছাল। সবকিছু নেড়েচেড়ে পরিষ্কার করলো। আমি বসে বসে বাবার লেখা পড়লাম।

তাতে বাবা সবাইকে জ্ঞান দিয়েছে। বলতে পারিস বুঝিয়েছে। তুমি যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে সাধনা করবে, সেই মাটি পর্যন্ত জানতে পারবে না তোমার মনের কথা। তখন লেখা গুলো ছাগলের মতো মুখস্থ করেছিলাম। এখন সেগুলো রিয়েলাইজ করছি। কি গভীর তাৎপর্য। তুই বাবার লেখা পড়েছিস?

না।

তোকে পড়াব।

বুড়ী মাসির কথা বল। অনিসা বললো।

মায়ের বাড়িতে মা যখন একা থাকত মার দেখা শোনা করতো। শুনেছি বুড়ীমাসি নাকি মায়ের জন্ম দেখেছে। এখন প্রায় কাছাকাছি আশি বছর বয়স হবে।

মা একা থাকতো!

একটা ফেজ মায়ের এরকম কেটেছে।

তুই কোথা থেকে জানলি?

বুড়ীমাসির কাছ থেকে।

বুড়ীমাসিকে তুই কোথায় পেলি?

মা একবার রবীন মামার সঙ্গে আমাকে পাঠিয়েছিল। বুড়ীমাসির তখন অবস্থা ভালো নয়। টাকা দিতে আর জামাকাপর দিতে। জায়গাটা চিনে এসেছিলাম।

তারপর একদিন একা একা গেছিলাম।

বুড়ীমাসি আমাকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদলো।

বার বার বাবার নাম উচ্চারণ করে আর ডা. ব্যানার্জীর গুষ্টির ষষ্ঠীপূজো করে।

বললো, তোর বাবা দেবতারে দেবতা। আর ডাক্তারটা রাক্ষস। তোর মায়ের রক্ত শুষছিল।

তারপর সুযোগ বুঝে প্রায়ই যেতাম। বলতাম মা টাকা পাঠিয়েছে। টাকা দিতাম, আর বুড়ীমাসির সঙ্গে গল্প করতাম।

টাকা কোথায় পেতিস? অনিসা বললো।

ডাক্তারদাদাই-এর কাছ থেকে নিতাম, মিথ্যে কথা বলে।

কেউ জানত না?

পরে দুদুন জানতে পেরেছিল।

তুই কি বললি?

বন্ধুদের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে খাবো বলে নিয়েছি।

তারপর।

বুড়ীমাসির কাছ থেকেই বাবার সম্বন্ধে ডিটেলস পেলাম।

কি পেলি!

তখন মা নাকি ভীষণ ড্রিঙ্ক করতো।

মা ড্রিঙ্ক করতো, কি বলছিস!

আমি বলিনি, বুড়ী মাসি বলেছে।

একদিন মা বেহেড মাতাল হয়ে ক্লাব থেকে ফিরলো। বাবা খবর পেয়ে ওই রাতে ওখানে যায়। মাকে রাতে তেঁতুল জল খাইয়ে বমি করিয়েছে। তারপর বুড়ী মাসির হেপাজতে মাকে রেখে চলে এসেছে। সকালে নাকি বুড়ীমাসির সঙ্গে মা ভীষণ ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। এখানে এসে মায়ের শরীর খারাপ হয়। ডাক্তারদাদাই দেখে। বলতে পারিস সেই থেকে মা এখানে রয়েগেল। আর ও বাড়িতে ফিরে যায়নি। বুড়ীমাসি ওই বাড়ি দেখাশুনো করতো। মাঝে মাঝে এই বাড়িতে আসতো। বুড়ীমাসি তোকে খুব ছোটো সময় দেখেছে। আমাকে প্রায়ই বলে ওকে একবার নিয়ে আয় না। কতদিন দেখিনি। আমি বিছানা নিয়েছি। আর যেতে পারি না।

চল যাবো।

ঠিক মতো কথা বলতে পারে না। বিছানার সঙ্গে শরীরটা মিশে গেছে।

কিছু করা যায় না।

বয়স হয়েছে।

তারপর।

ডা. ব্যানার্জী নাকি জোর করে মাকে বিয়ে করেছিল পয়সার লোভে। তখন আমার দাদু অসুস্থ। ডাক্তার সৎ চরিত্রের লোক ছিল না। উল্টো-পাল্টা ব্যাবসা তো ছিলই এমনকি মায়ের শরীরটা নিয়েও সে ব্যবসা শুরু করেছিল।

তুই কি বলছিস! অনিসার চোয়ালদুটো শক্ত হয়ে গেল।

উত্তেজিত হোস না।

তোর মতো আমিও উত্তেজনায় দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়েছিলাম। বুড়ীমাসির বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা চলে গেছিলাম গোপাললাল ঠাকুর রোডে। যাওয়ার পথে একটা কাটারি কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম। এসপার নয় ওসপার। ব্যার্থ হয়ে ফিরে এসেছি। দু-দিন ঘুমতে পারিনি।

আমাকে বলিস নি কেন?

তোকে তখন বিশ্বাস করতে পারি নি।

তুই একা না আর কেউ ছিল।

আমি একা। কাউকে সঙ্গে নিতে আমার ভালো লাগে না। নিজের সমস্যা নিজে মেটাব। দাদুর ফটো জ্যেঠিদিদার ঘরে দেখেছিস, কিন্তু দিদানের কোনও ফটো দেখতে পেয়েছিস?

গুড পয়েন্ট। অনিসা বললো।

কাকে জিজ্ঞাসা করবি? এতদিনেও কাউকে ট্রাস্ট করতে পারিনি। জানি এই জায়গাটা খুব সেন্সেটিভ। সবাই যে ব্যাপারটা জানবে তাও নয়। বুড়ীমাসি আঁচ করেছে। যেহেতু সর্বক্ষণ সে মার কাছে থাকতো। দিদানরা হয়তো কিছুই জানে না। দামিনীদিদা জানলেও জানতে পারে।

রতন আঙ্কেল? অনিসা বললো।

এই বুদ্ধি নিয়ে তুই বাবাকে ধরবি।

আমার কেমন যেন লাগছে। আমি প্রতিদিন চ্যাটে একজনের সঙ্গে কথা বলি।

কে? প্রেমানন্দ?

হ্যাঁ। তুই কি করে জানলি!

শুভর সঙ্গে একদিন কথা বলছিল দেখেছিলাম।

কখন!

এই তো কয়েকদিন আগে দুপুরে।

কোথায়?

ওর বাড়িতে।

কি বলেছে?

শুধু মাথা থেকে বদ বুদ্ধিগুলো সরিয়ে দিয়ে ভালো করে পড়াশুনো করতে বলছে। ওইটা ঠিক মতো করতে পারলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

ভদ্রলোক বাবার সম্বন্ধে অনেক কিছু জানেন।

শুভর মুখ থেকে শুনলাম।

ওর বাবার ব্যাপারটাও উনি বলেছেন।

তোদের সঙ্গে আলাপ হলো কি করে।

চ্যাটে।

সবার সঙ্গে এইসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করিস না।

ভদ্রলোক যে বাবাকে চেনেন তার প্রমান সেদিন পেলাম রতন আঙ্কেলের কাছ থেকে।

সত্যি!

হ্যাঁ। উনি এখন বাবার মিডিয়েটর।

সরি। আমি যে টুকু বুঝেছি, বাবা কখনও মাঝখানে কাউকে দাঁড় করিয়ে কাজ করতে ভালোবাসে না। তুই এতদিনে এই বুঝলি?

অনিসা হ্যাঁ করে দাদার দিকে তাকিয়ে থাকলো।

(আবার আগামীকাল)

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “কাজলদীঘি”

  1. ahsan badal says:

    Waiting for the next part. real good story.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev