জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
৮২ নং কিস্তি
সকলে চিকনার কথায় হাসছে।
বড়ো জব্বর ছেলে। ডাক্তারদাদা বললো।
একমাত্র ওই-ই বুক চিতিয়ে লড়ে যাচ্ছে ওখানে। অনিমেষদা বললো।
অনিকে ও গড বলে মনে করে। ইসলামভাই বললো।
তাই এই আঠারো বছর একমাত্র ওইই ওর হদিস দিতে পেরেছে।
ইসলামভাই, অনিমেষদা, ডাক্তারদাদা থামলো।
বড়োমা একটু চা দেবে। আমি বললাম।
তুই আসার পর থেকে কি শুরু করেছিস দেখতে পাচ্ছিস। বৌদি বললো।
কি করবো বলো।
তুই সব সাজিয়ে গুছিয়ে এসেছিস। ইসলামভাই বললো।
আমি হাসলাম।
একটা ছোট্ট ভুল করে ফেলেছি, তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।
তুই তো কিছুই খেলি না। ছোটোমা সামনে এসে দাঁড়ালো।
দাও আর দুটো কচুরি খাই।
ছোটোমা রান্নাঘরের দিকে চলেগেল। শুভর দাদুর কাছে এগিয়ে গেলাম।
আপনার সঙ্গে কথাই বলা হচ্ছে না।
না না ঠিক আছে, তুমি আগে কাজ শেষ করো। ওটা জরুরী। এরা তো কিছুই জানে না।
আমার অন্যায়।
তোমার অন্যায় হবে কেন। তুমি যে ভাবে লড়তে পারো, সবার সে ক্ষমতা থাকে না।
আপনাদের অসীম আর্শীবাদ।
আমৃত্যু আমি তোমাকে আর্শীবাদ করবো।
আমার ফোনটা বেজে উঠলো।
মিত্রা ছুটে এসে আমার হাতটা চেপে ধরলো।
আগে ভয়েজ অন কর।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
আমি তোকে রিসিভ করতে দেব না।
মা কি করছো তুমি! অনিসা বলে উঠলো।
দেখ মেয়ে কি বলছে।
বলুক। তোর কীর্তি কলাপ ওরা দেখেনি। আমরা দেখেছি। আজ থেকে ওরা দেখবে। এতদিন এর-তার কাছ থেকে গল্প শুনেছে। তাতে ওদের মন ভরেনি। তাই ওরা ওদের মতো করে তোকে খুঁজেছে। আমি বাধা দিইনি।
ঠিক আছে হাতটা ছাড়, অন করছি। লাইনটা কেটে যাবে।
ফোনটা ঝোলা থেক বার করে অন করলাম।
দেখছিস কার ছবি ভেসে উঠেছে।
মিত্রা হেসে ফেললো।
বল।
কাজ শেষ করলাম। সব চিঠি সার্ভ করে দিয়েছি। অনুপের গলা ভেসে এলো।
কটার সময় করেছিস?
দশটা দশ/পনের নাগাদ। কেন?
সিপি, এসপি দেখা করতে চাইছে।
কলকাতায় গিয়ে ওর জামাপ্যান্ট খুলবো।
আমি কি করবো?
তুই তোর মতো খেলবি। আমি আমার মতো। শোন—
বল—
হিমাংশুকে কালকে একবার আসতে বলতে পারবি?
আমি কাল দেশের বাড়িতে যাব। কাকার কাজটা সারতে।
ঠিক আছে, আমি কথা বলে নিচ্ছি। তনু ফোন করেছিল—
কি বললো—
এগারোটার ফ্লাইটে নামবে। আমরা সবাই একটার ফ্লাইট ধরবো।
আচ্ছা। আমাকে একটা কপি পাঠা।
তোর মেল বক্স দেখ। পেয়ে যাবি। পারলে একটা প্রিন্ট আউট বার করে নে।
আচ্ছা।
ফোনটা ঝোলায় রাখলাম।
মিত্রা হাসছে।
হ্যাঁরে এটা কিসের অর্ডার! অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে।
কার সঙ্গে কথা বললো বলোতো। মিত্রা বললো।
ডাক্তারদাদা, অনিমেষদা মিত্রার দিকে তাকাল।
ওর সেই বন্ধুর সঙ্গে? অনিমেষদা বললো।
হ্যাঁ। সুপ্রীমকোর্টে প্র্যাক্টিশ করে। ডাক্তারদাদা বললো।
কি অর্ডার বার করে সার্ভ করেছে?
অনিমেষদা তাকিয়ে রইলো ডাক্তারাদাদার মুখের দিকে।
বুঝলে না—
না—
কাল পর্যন্ত যে এসপি, সিপি, ওসি এতো তরপাচ্ছিল আজ তাদের রূপ দেখেছ।
অনিমেষদা হাসলো।
কাল পর্যন্ত তোমাকে পাত্তা দেয়নি। আজ এসে স্যালুট করে গেল।
তুই কাগজপত্র পেলি কোথায়! এরইমধ্যে সুপ্রীমকোর্ট থেকে বার করে নিয়ে চলে এলি!
অনিমেষদা আমার দিকে তাকাল।
ওর কথা বলার থ্রোয়িং দেখলে না। মেয়েকে পর্যন্ত বলে দিল কি ভাবে কথা বলবি।
অনিমেষদা ডাক্তারদার মুখের দিকে তাকিয়ে।
পরের টুকু বলতে পারবো না। ওই যে তখন তোমায় বললো, সময় হোক জানতে পারবে।
অনিমেষদা হাসছে।
বাইরে প্রচণ্ড হইচই শুরু হয়ে গেছে।
বড়োমা, সব এসে গেছে। এবার তুমি সামলাও।
মিত্রা বড়োমার কাছ ঘেঁসে দাঁড়াল। চোখে মুখে খুশীর ছোঁয়া।
কিরে রতন কচুরী আর আছে? আমি রতনের দিকে তাকালাম।
আছে মানে—তুমি কি বলতে চাও—চারশো পিস নিয়ে এসেছি। দাঁড়িয়ে থেকে ভাজিয়ে এনেছি। প্রয়োজন পরলে আরও এক ঝুড়ি ভাজিয়ে নিয়ে চলে আসবো।
বড়োমা হাসছে।
মেয়েকে ইশারায় কাছে ডাকলাম।
তোর ল্যাপটপটা নিয়ে আয় না।
দাদার ঘরে প্রিন্টার আছে।
তাহলে দাদারটা নিয়ে আয় আমি পিডিএফ করে দিচ্ছি একটু প্রিন্ট বার করে দিবি।
মেয়ে চলে গেল। সঙ্গে ছেলে, শুভ।
বুঁচকি তোর বাপ কই। নীরুর গলা পেলাম।
ভেতরে আছে যাও।
আমি দরজার দিকে তাকিয়ে।
দরজার গোড়ায় নীরুর মুখটা ভেসে উঠলো। খুশিতে চোখমুখ চক চক করছে।
হায় রাম। কনিরে দেখবি আয়, অনি সত্যিকারের সাধু সেজেছে।
গেটের মুখে নীরু দাঁড়িয়ে, আমি হাসছি।
দাঁড়া ওকে সাধু সাজাচ্ছি। মিলি তুমি ওকে কোলে নিয়ে এসো।
কনিষ্কর গলা পেলাম।
সবাই একে একে ঘরে ঢুকলো।
ওদের জাপটা জাপটিতে আমার প্রাণ ওষ্ঠাগতো।
নীরু দম বন্ধ হয়ে আসছে—
অক্সিজেন দেব—
দেখলাম গেটের কাছে মেয়ে, ছেলে, শুভ দাঁড়িয়ে হাসছে।
আমার পরাণটা ফেটে যাবে—
ফাটুক, সেলাই করে দেব—
আমার হাত দুটো কিন্তু ফ্রি আছে নীরু—
একবারে অসভ্যতামি করবি না। ছেলেমেয়ে এখন যথেষ্ট বড়ো হয়েছে।
নীরু তরবর করে উঠলো।
ঘরের সবাই হাসছে।
কনিষ্কর দিকে তাকালাম, মিলির দিকে তাকালাম, বাচ্চাটার দিকে তাকালম। বছর চারেক বয়স হবে। হাসলাম।
মিলি মাথা নীচু করে নিল।
ফলস ফায়ার হয়ে গেছে। কনিষ্ক বললো।
তারমানে!
তোর দুই, আমার দুই।
কনিষ্কর কথা বলার ভঙ্গিতে ইসি খুব জোড়ে হেসে উঠলো।
নীরু এমন ভাবে তাকাল, ইসি আরও জোড়ে হেসে উঠলো।
ব্যাপারটা এরকম হোলসেল আমার হাতে।
নীরু, সবার হাতে এতো বড়ে বড়ো প্যাকেট, ব্যাপারটা কি বলতো।
সাধুবাবার জন্য নিয়ে এসেছে।
জীবনে এই প্রথম।
হাআআআরারারমমমমম হ্যাঁচো।
হ্যাঁচো করেই নীরু খুব জোড়ে হেসে উঠলো।
খুব জোর সামলে নিয়েছিস, কি বল—আমি হাসতে হাসতে বললাম।
হ্যাঁ।
নীরু হেসে চলেছে।
বটা চুপচাপ কেন—
টিনার ঝাড়—
কেন—
স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার—
ব্যাক্তিগত—
টিনা আমার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করছে।
তোরটা—
গ্যারেজ থেকে সবে গাড়ি বেরিয়েছে—
বটার ব্যাপারটা তাহলে অন্যায় হচ্ছে—
অন্যায় কিসের। সকালে বেলা বুঁচকি ম্যাসেজ করেছে। ও বলে ফল্স, তারপর আমি ম্যাডামের সঙ্গে কথা বলে যখন ফোন করলাম, তখন উনি উঠেছেন। বটা আজকাল বড্ড কুঁড়ে হয়েগেছে বুঝেছিস।
বটা কট কট করে নীরুর দিকে তাকিয়ে।
তাকাস না, চোখ গেলে দেব।
টিনা হাসছে।
আবিদ কাছে এসে আস্তে করে বললো, আমি এবার যাই।
এয়ারপোর্ট?
হ্যাঁ।
ফোন করেছিল?
সবাই।
এখানে চলে আসবি।
আর কোথায় যাব?
এদিকে সব গুছিয়ে দিয়েছিস।
রান্না বন্ধ, অর্ডার দিয়ে দিয়েছি, বড়োমা বললেই রতনদা নিয়ে আসবে।
কি ফুস ফুস করছিসরে আবিদ। বড়োমা চেঁচিয়ে উঠলো।
একটু বেরচ্ছি। ফিরে আসছি ঘণ্টা দুয়েক পর।
আবার কি ঘোঁট পাকাচ্ছিস।
একটুও না।
আবিদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে বারান্দায় এলাম।
সাবধানে।
ও নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। সব গোছান আছে।
ইসলামভাইকে বলেছিস?
কাল আমি রতনদা সব বলেছি।
কি বললো শুনে?
কাঁদছিল। এবার তুমি দাদাভাইকে কিছু কাজ করতে দাও।
কেন কাজ করছে না?
আবিদ মাথা নীচু করে রইলো।
যা গাড়ি ছাড়ার সময় একবার ফোন করবি?
নতুন নম্বর, না পুরনো নম্বর।
পুরনোটাতে করিস।
আবিদ বেরিয়ে গেল। ঘরের দিকে ফিরতে গিয়ে দেখলাম গেটের কাছে এসে প্রেস লেখা একটা গাড়ি দাঁড়াল।
দাঁড়িয়ে পরলাম।
পিকু গেট ঠেলে ছুটতে ছুটতে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
পেছনে বরুণদা, সন্দীপ, অর্ক, অরিত্র, দ্বীপায়ণ।
তুমি একেবারে বুড়ো হয়ে গেছো। পিকু জড়িয়ে ধরে বললো।
হাসলাম।
বাবাকে দেখেছো—
তোর বাবা শরীর চর্চা করে।
পিকুর চেঁচামিচিতে সব বেরিয়ে এসেছে।
সবাই এসে জড়িয়ে ধরলো।
কি দ্বীপায়ণ বাবু স্যার, মুখটা ভার ভার?
তোমাকে দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল।
কেন?
এইভাবে দেখবো ভাবিনি।
কি ভাবে দেখবে ভেবেছিলে?
ঠিক আগের মতো।
তুমি কি আগের মতো আছো?
দ্বীপায়ণ হাসলো। এই হাসির মধ্যে কান্না লুকিয়ে আছে।
কি অর্কবাবু, সন্দীপবাবু স্যার এখন এডিটর।
এডিটর মানে, তুমি কি বলতে চাও।
তারপর আমার দাড়িতে হাত দিল।
যাই বলো গুরু, মালটা ফ্যান্টাসটিক নামিয়েছ। পুরো রবিদা।
অনিসারা সবাই হেসে চলেছে।
তোরা হাসছিস কেন রে? অর্ক ধমকালো।
তুমি এইভাবে কথা বলতে পার?
তোরা বুঝবি না। গুরুদেব এসে গেছে। এখন ডোন্ট কেয়ার।
মিত্রার দিকে তাকিয়ে।
ম্যাডাম প্লিজ ওই ভাবে তাকাবেন না। শুধু আজকের দিনটা।
মিত্রা মুখ টিপে হাসছে।
আমার মালপত্র। আমি বললাম।
অরিত্র সব হ্যান্ড ওভার কর।
ওর মাল পত্র মানে? সন্দীপ তাকাল অর্কর দিকে।
সব তোমাকে বলতে হবে নাকি। তুমি কে হে—
কিরে দ্বীপায়ন, কাবাব মে হাড্ডি!
দ্বীপায়ন হাসছে।
সরি, বোন লেস চিকেন। অরিত্র বললো।
দেখছিস দ্বীপায়ণ! মুখে খই ফুটছে। সন্দীপ বললো।
এখনও কিছু দেখো নি। আর ঘণ্টা খানেক সময় দাও। কালকের থেকে কাগজ বারুদ।
মানে!
ছাপার পর দেখবে বুম করে একটা আওয়াজ। সামলাতে পারবে। অর্ক বললো।
সেই জন্য সাতদিন ধরে তোর আর অরিত্রর পাত্তা নেই।
আমি হাসছি।
সায়ন্তন কই?
একঘণ্টা সময় দাও চলে আসবে।
যাই দাদাকে খবরটা দিই।
কেস তুমি খাবে, আমি না। আমাকে জিজ্ঞাসা করলে পরিষ্কার বলে দেব কিছুই জানি না।
সকলে হাসা হাসি করছে।
মা-গো, সকাল থেকে হাসতে হাসতে পেট ব্যাথা হয়ে গেল।
অনিসা, মিত্রাকে জড়িয়ে ধরলো।
মেয়ের কথায় বরুণদা নাকটা টিপে দিল।
বাবা কিরকম যন্ত্র এবার বুঝতে পারছিস?
বুঝতে পারব না মানে।
বুঁচকি কোন ঘরটা ফাঁকা আছে রে?
নীরু এগিয়ে এলো।
মার ঘর, আমার ঘর, দাদার ঘর…. কোন ঘরটা তোমার চাই বলো না।
তোর মার ঘরেই যাই।
আমরা কি যেতে পারবো।
বরুণদা, নীরুর দিকে তাকিয়ে হাসলো।
অবশ্যই।
বুঁচকি।
বলো।
কনিষ্ক, বটাকে এ ঘরে পাঠিয়ে দে।
নীরু আমার হাতটা চেপে ধরে টানতে শুরু করলো।
আবার কি হলো—
চল না। অনেকক্ষণ সিগারেট ফুঁকি নি।
আমার হাত ধরে হিড় হিড় করে টানতে টানতে নীরু নিয়ে এলো। পেছন পেছন ওরা সবাই। বরুণদা হাসছে।
আমরা সবাই এসে ঘরে বসলাম।
অরিত্র নিজের ব্যাগ থেকে ফাইল বার করলো।
এখন এসব রাখ, সবে এসেছে, ওমনি কাজের ফিরিস্তি। নীরু বললো।
আমি ফাইলটা হাতে নিলাম।
সব গুছিয়ে নিয়েছিস।
একেবারে। তবে সব জেরক্স। এক কপি অর্ক এক কপি আমার আর এক কপি তোমার।
যাক মাথাটা তাহলে ঝামা হয়ে যায়নি কি বল অর্ক?
সত্যি অনিদা মাথাটা ঝামা হয়েগেছিল। আবার এন্থু পাচ্ছি। গত সাতদিনে বুঝলাম রিপোর্টিং-এর আনন্দটা কোথায়।
ব্যাপারটা কি বলতো!
সন্দীপ তাকাল।
বলেছিনা এটা তোমার জানার বিষয় নয়।
আমার দিকে তাকিয়ে।
তবে অনিদা একটা কথা মানতেই হবে। তোমার লোকগুলো বহুত চাঙ্গা।
চাঙ্গা তো আছেই। তার সঙ্গে নোট কথা বলে বুঝেছিস।
এটা মানি। তবে তোমাকে এখনও যে ভালোবাসে সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম।
বরুণদা চা হলে ভালো হতো না। নীরু বলে উঠলো।
খুব ভালো হয়।
দ্বীপায়ন যাবে নাকি?
আমি যাচ্ছি। অরিত্র বললো।
হ্যাঁরে সন্দীপ সব চলে এলি, কাগজের হাল। আমি বললাম।
এখন যদি আমরা দশদিন নাও যাই কাগজ স্মুথলি বেরবে।
তাই নাকি?
নেকু জানে না যেন কিছু।
অরিত্র ঘুরে এলো।
অর্ক, হারামীগুলো চলে এসেছে।
বলেই জিভ বার করলো।
সরি অনিদা, স্লিপ অফ টাং।
হাসলাম। কারা এসেছে।
এসপি, সিপি, সচিব।
দুর শালা, মৌজ করে সিগারেট খাব মনে করলাম। শালারা এসে হাজির। ঘর ফাঁকা কর, বাবু মিটিং-এ বসবেন।
বোস না রগরটা দেখ না। আমি বললাম।
কি রগর দেখবো। কাল পর্যন্ত এক অবস্থা ছিল, আর আজকে থেকে সিচুয়েসন চেঞ্জ। আমার খবর নেওয়া হয়ে গেছে। নীরু বললো।
মেয়ে ওদের সঙ্গে নিয়ে ঘরে ঢুকলো।
বাবা।
দেখলাম গেটের সামনে তিনজন দাঁড়িয়ে।
উঠে গেলাম।
বুকের ওপর হাত তুলে দাঁড়ালাম।
আসুন।
তিনজনেই আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে।
আপনার সঙ্গে একটু পার্সোনালি কথা বলতাম।
কি ব্যাপারে বলুন?
এবার তিনজনেই হেসে ফেললেন।
আপনি সব জেনে শুনে এরকম কথা বলছেন কেন স্যার।
সরি। আপনারা ফিরে যান।
না স্যার আপনার সঙ্গে কথা বলেই যাব।
তখন থেকে স্যার স্যার করছেন কেন বলুন? আমি আপনাদের বস নই—সাধারণ একজন মানুষ।
আমরা জানি স্যার। আপনি যদি একবার ওনার সঙ্গে কথা বলে নেন।
কার সঙ্গে?
মিনিস্টারের সঙ্গে।
প্রয়োজন কার? আমার না ওনার—আপনারা কার রিপ্রেজেন্টেটিভ হয়ে এসেছেন?
এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিস কেন, ভেতরে যা না।
অনিমেষদা এগিয়ে এলো।
আসুন।
ওই ঘরের বারান্দার সামনের ভিড়টা একবার দেখে নিলাম।
পায়ে পায়ে ঘরের ভেতর এলাম।
অনিমেষদারাও সবাই এলো।
নীরু মুখটা প্যাঁচার মতো করে চলে গেল।
তোরা একটু ওঘরে যাতো বাবা। অনিমেষদা বললো।
ঘরে যারা ছিল সবাই বেরিয়ে গেল।
আমি খাটে বসলাম। ওরা সবাই সোফাতে।
দেখে বুঝতে অসুবিধে হলো না। কে সিপি, কে এসপি।
তবে সচিব ভদ্রলোককে খুব চেনা চেনা লাগছে। ওদের সঙ্গে কথা বলছি ঠিক কিন্তু মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই চিন্তা, লোকটা কে? কোথায় যেন দেখেছি?
মনে পড়ে গেল, মনে মনে হাসলাম।
বলুন। সিপির দিকে তাকালাম।
একটু কথা বলতাম।
এনারা থাকলে অসুবিধে আছে?
হ্যাঁ স্যার, প্রশাসনিক কথাবার্তা।
আপনারা চেনেন এনাদের?
বিলক্ষণ স্যার।
আপনি আমার সঙ্গে কি বিষয়ে কথা বলতে এসেছেন?
স্যার!
তিনজনের চোখেই চোখ ঘষে নিলাম।
এনাদের সামনেই বলুন, কোনও অসুবিধে নেই।
আছে স্যার।
তুই কথা বল, আমরা বেরিয়ে যাই। অনিমেষদারা চলে গেল।
বৌদি চায়ের ট্রে নিয়ে এসে ঢুকলো। সেন্টার টেবিলে রেখে চলে গেল।
যাওয়ার আগে তিনজনকে ভালো করে দেখে নিল।
ইসারায় হাততুলে ওনাদের চা নিতে বললাম।
চায়ের কাপে চুমুক দিলাম।
এসপি ভদ্রলোক খুব ব্রাইট। ভনিতা না করেই শুরু করলেন।
আপনি অনি ব্যানার্জী।
সরি। অনিন্দ ব্যানার্জী। লোকে অনি ব্যানার্জী বলে ডাকে।
গত সপ্তাহে ঝাড়গ্রামে একটা এক্সপ্লোসন হয়। তাতে একজন ব্যবসায়ী মারা যান।
তাই! তারপর?
আপনার নামটা আমরা সেখানে পেয়েছি।
এ্যারেস্ট করুণ।
এসপি ভদ্রলোক হেসে ফেললেন।
আপনি কিছুই জানেন না স্যার?
না।
তাহলে সুপ্রিম কোর্ট থেকে আগাম জামিন নিলেন?
কেন নিলাম, তার কাগজ তো আপনাদের কাছে এসে গেছে।
দেখেছি স্যার।
তাহলে?
আরও কিছু কথা আছে স্যার।
বলুন।
আমরা কেসটা নিয়ে আর মুভ করতে চাই না।
কেন?
আমরা খবর পেয়েছি উনি একজন আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন। নাম ভাঁড়িয়ে এখানে এসেছিলেন।
তাহলে ল্যাটা চুকে গেল।
আপনি স্যার আর কোনও মুভ করবেন না।
কিসের মুভ!
আমি কি বলতে চাইছি সেটা বুঝতে পারছেন।
আজ সকালে কলকাতায় এসেছি। আমি শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ। বিদেশে থাকি। নামের ভুলে কেউ যাতে বিরক্ত না করতে পারে তার জন্য আমার ল-ইয়ার এই প্রিকোয়েশনটা নিয়েছে।
ওরা সকলেই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
উনি আর কিছুক্ষণের মধ্যে কলকাতায় চলে আসবেন। আমি ওনার গাইডেন্স অনুসারে চলবো।
প্লিজ স্যার একটা রিকোয়েস্ট রাখুন।
সিপি ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকালাম। একেবারে বিগলিত সুর।
বলুন।
কাগজে কোনও লেখা লিখি করবেন না—
ওটা কাগজের ব্যাপার, আপনি এডিটরের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। ওনাকে ডেকে দেব?
আপনি কাগজের ওয়ান অফ দেম পার্টনার—
আবার কোথাও ভুল হচ্ছে মনে হচ্ছে।
কেন স্যার অনিন্দ ব্যানার্জী আর অনি ব্যানার্জী তো একই ব্যক্তি।
সেটা আপনারা বলছেন, আমি বলছি না, কিংবা আইন বলছে না।
আপনি কাল দেশের বাড়ি যাবেন—
যাব।
ওটা তো অনি ব্যানার্জীর বাড়ি।
আমি কখনও বলিনি আমি অনি ব্যানার্জী নই। আমার নাম অনিন্দ ব্যানার্জী। লোকে আমাকে অনি ব্যানার্জী বলে ডাকে।
আপনার প্রপার্টি কি অনি ব্যানার্জীর নামে না অনিন্দ ব্যানার্জীর নামে।
আমার মনে হয় আপনারা এক্তিয়ার বভির্ভূত প্রশ্ন করছেন। আপনারা কেন আমাকে বিরক্ত করছেন তা জানতে পারি?
সরি স্যার আপনাকে হার্ট করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। সেন্ট্রালের একটা প্রেসার আছে।
সেটা আপনাদের প্রশাসনিক ব্যাপার।
একচুয়েলি নামটা এক হয়ে যাওয়াতে….।
তিনজনের দিকেই ভালো করে দেখলাম।
এই যে আপনারা আমার কাছে এসেছেন, এইরকম একটা কনফিডেন্সিয়াল ব্যাপার নিয়ে কথা বলছেন, আমাকে ইন্টরোগেশন করছেন, আমি যদি সাংবাদিকদের ডেকে একটা প্রেস কনফারেন্স করে ব্যাপারটা জানাই, আমি আজ সকালে বিদেশ থেকে এখানে এসেছি এবং আরও পরিষ্কার করে বলি, আপনারা আমাকে ইচ্ছে করে হ্যারাস করছেন কাজটা ঠিক হবে কি?
না না স্যার আপনাকে আমরা হ্যারাস করতে আসিনি। আপনি ভুল বুঝবেন না।
আপনারা যে আমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছেন তার কোনও সঠিক কাগজপত্র আপনাদের কাছে আছে? সঙ্গে এনেছেন কি?
তিনজনেই চুপ করে গেল।
চাইলে দেখাতে পারবেন?
আমার প্রশ্নের কোনও উত্তর পেলাম না।
আমি কি আপনাদের এখন বিদায় জানাতে পারি?
সরি স্যার ভুল হয়ে গেছে।
একচুয়েলি ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। আমরা তিনজনে কেশটা ট্যাকেল করছি।
সচিব ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম।
আমি আপনাদের কি ভাবে সাহায্য করতে পারি?
যদি অনি ব্যানার্জীর সঠিক পরিচয়টা পেতাম খুব উপকার হতো।
আমাকে জিজ্ঞাসা করার অধিকার কি আপনাদের আছে?
আইনত নেই তবে সন্দেহ হলে আমরা যে কোনও ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারি।
সচিবের দিকে তাকালাম।
তারও একটা প্রসেস আছে, সেটা মেইনটেন করছেন কি?
ভদ্রলোক চুপ করে গেলেন।
আপনাদের যাদের ওপর সন্দেহ হবে প্রথমে একটা এফআইআর করে তাকে এ্যারেস্ট করুণ, তারপর তাকে থানায় তুলে নিয়ে গিয়ে বেধড়ক পেটান, দেখবেন গল গল করে সব সত্যি কথা বলে দেবে। তাও যদি না হয় পরদিন কোর্টে তুলে পিসি চান। এই সব কেশে বিচারক চোখ বন্ধ করে গোটা বারো দিনের পিসি দিয়ে দেন। তারপর আপনাদের সদর দপ্তরে তুলে নিয়ে যান, ফার্স্ট, সেকেন্ড, থার্ড ডিগ্রী চার্জ করুন দেখবেন কাজ হবে।
সিপি ভদ্রলোক মৃদু হাসলেন।
কি স্যার, আমি অন্যায় কথা বললাম। সচিবের মুখের দিকে তাকালাম।
আপনার মুখ থেকে এটা আশা করিনি।
কেন?
ওটা ক্রিমিন্যালদের জন্য।
আপনারা আমাকে নিশ্চই ওইরকম কিছু একটা ভেবেছেন, তা না হলে আমার কাছে আসবেন কেন?
না স্যার তা নয়। এসপি বললেন।
তাহলে কি?
আমাদের কাছে একটা খবর ছিল সেদিন এরকম একটা কিছু ঘটতে পারে। যিনি এটা ঘটাবেন তিনি দুবাইতে থাকেন।
যদি আগাম খবর পেয়েই থাকেন, ঘটনাটা ঘটতে দিলেন কেন। আটকাতে পারলেন না কেন?
আমাদের হাতে সেই ফোর্স নেই।
সেটা সরকারের ব্যাপার।
আপনি স্যার দুবাইতে থাকতেন? সিপি বললেন।
কোনওদিনই থাকতাম না।
তাহলে?
এই দেখুন আপনারা আবার এক্তিয়ার বহির্ভূত জায়গায় ঢুকে পড়ছেন। সংবিধান অনুয়ায়ী আমার ব্যাক্তিগত মৌলিক অধিকার আপনারা হরণ করতে চাইছেন।
স্যার আপনি দিবাকর বলে কাউকে চেনেন? এসপি বললেন।
কে দিবাকর!
একসময় আপনার সঙ্গে একই স্কুলে পড়তো।
কত বছর আগে স্কুল ছেড়েছি, তরপর দিবাকর নামে কতো হাজার লোকের সঙ্গে মিশেছি তার কোনও ইয়ত্তা আছে। ওইরকম স্পেসিফিক নামে কাউকে মনে পড়ছে না।
আমাদের স্বরাষ্ট্রদপ্তরের মন্ত্রী আপনার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
কি নাম বলুন!
অনাদি চন্দ্র।
একটু একটু মনে পড়ছে। তাই নাকি ও এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছে? তা বেশ। ও আমাকে চেনে?
আপনাকে অনি নামে চেনে।
ওই নামেই আমাকে সকলে ডাকতো। তাই অনিন্দ নামটা ঢাকা পড়ে গেছে।
ঠিক আছে স্যার, আমরা এখন আসি।
বুকে হাত দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম।
চারজনে একসঙ্গে বেরলাম। ওই ঘরের গেটের সামনে সবাই দাঁড়িয়ে।
অর্করা মাঠে সকলে দাঁড়িয়ে কথা বলছে।
অর্ককে ইশারায় ডাকলাম। কাছে এগিয়ে এলো।
একটা উপকার করতে পারবি?
বলো।
আমি একটা প্রেস কনফারেন্স করবো একটু মিডিয়ার সকলকে ডাকতে পারবি, শুধু প্রিন্ট মিডিয়া নয়, ইলেকট্রনিক্স মিডিয়াকেও ডাকিস।
এই কাজ, আধঘণ্টা সময় দাও। অর্ক পকেট থেকে ফোন বার করে ফেলেছে।
তিনজনে একটু এগিয়ে গেছিল। থমকে দাঁড়াল। আবার ফিরে এলো।
এ কি করছেন স্যার! সিপি বললো।
দাঁড়া অর্ক এখন ফোন করিস না। ওনারা কি বলেন একটু শুনে নিই।
বলুন।
তিনজনেই হাতজোড় করলেন।
প্লিজ স্যার, এটা আপনি করবেন না।
চারিদিকে একটু একটু করে ভিড় জমছে।
কোনও ডকুমেন্টস ছাড়া আপনারা আমাকে এতক্ষণ ধরে ইন্টরোগেসন করলেন, সংবিধান অনুযায়ী আমার শুষ্ঠ ভাবে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারে হাত দিলেন। এটা জনসাধারণকে জানান দরকার। আজ আমি হ্যারাস হলাম, কাল আমার মতো আরও কেউ হ্যারাস হতে পারে।
কথা দিচ্ছি স্যার, এই ব্যাপার নিয়ে আর কেউ আপনাকে বিরক্ত করবে না।
মুখের কথায় অনিন্দ ব্যানার্জী বিশ্বাস করে না।
সকলে নামটা শুনে একটু অবাক হয়ে তাকাল।
আমরা কথা দিচ্ছি।
এক কাজ করুণ।
বলুন।
আপনার মন্ত্রীকে গিয়ে বলুন এই কথাগুলো গোদা বাংলায় সহজ সরল ভাষায় দু-কথা লিখে দিতে।
এটা হয়না স্যার।
তাহলে আমাকে আর বিরক্ত করবেন না, দেশের আইন কানুন আছে, শুষ্ঠভাবে বেঁচে থাকার তাগিদে আমি তার আশ্রয় নেব।
সচিব ভদ্রলোক এবার আমার দিকে তাকাল।
বলুন কি লিখে দিতে হবে, আমি লিখে দিচ্ছি।
আপনি সচিব আপনার লেখাটা আমার পছন্দ হবে না। আপনি গিয়ে বরং এখুনি মন্ত্রী মহাশয়কে বলুন শুদ্ধ বাংলায় আমাকে একটা চিঠি দিতে। তাতে আমার এই বাড়ির ঠিকানা থাকবে দেশের বাড়ির ঠিকানা থাকবে। লেখা থাকবে আমরা এই ব্যাপারে, এক দুই করে ভালো করে বিষয়গুলো উল্লেখ করে দেবেন। শেষে শ্রীযুক্ত অনিন্দ ব্যানার্জীকে আর বিরক্ত করবো না।
সেটা হয় না।
আমি একঘণ্টা অপেক্ষা করবো। তারপর আপনাদের কোনও রেসপন্স না পেলে প্রেস কনফারেন্স করবো। প্রয়োজনে লাইভ। এই বাড়ি থেকে। নমস্কার।
তিনজনে মিনিট খানেক দাঁড়াল।
এটাই আপনার শেষ কথা। সচিব আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
হাসিমুখে বুকের ওপর হাতটা জড়ো করে নমস্কারের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলাম।।
ঠিক আছে স্যার। সিপি বললেন।
ভদ্রলোকের বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
মাথাটা সামান্য হেলিয়ে বললো, আসি স্যার।
ওদের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
গাড়ি গেটের মুখ থেকে অদৃশ্য হলো।
অনিমেষদা কিছু বলার আগেই মিত্রা আমার ঝোলার মধ্যে হাত পুরলো।
কি করছিস কি!
আগে তোর মোবাইলটা দে।
কেন বলবি তো!
জানিসনা কেন চাইছি।
হেসে ফেললাম।
তোকে সত্যি ওই-ই একমাত্র চিনেছে। আমাদের চিনতে এখনও ঢের দেরি।
অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
দে না। ওরকম করছিস কেন।
খুলতে পারবি না।
তোর ছেলে এরই মধ্যে নেট ঘেঁটে এর আদ্যপ্রান্ত সব জেনে নিয়েছে।
আমি অনন্যর মুখের দিকে তাকালাম।
মিটি মিটি হাসছে।
ঠিক আছে চল, আমি ওপেন করে দিচ্ছি।
তোর ফোন বিজি ছিল। আবিদ ফোন করেছিল। তনুর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে।
বড়োমা এগিয়ে এলো। তোর মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে। একটু ফল কেটে দিই।
তোমরা খাওয়া দাওয়া করবে না?
ওরা আসুক, একসঙ্গে খাব।
ঘরে গেলাম।
পামটপটা ব্যাগ থেকে বার করে রেকর্ডিংটা সার্চ করলাম।
কি প্রবীরদা কি বলেছিলাম। মিত্রা ভ্রু নাচাচ্ছে।
প্রবীরদা মিত্রার দিকে তাকাল। হাসছে।
তুই ওর বউ তোর কথার ওপর আর কি বলতে পারি।
ডাক্তারদাদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
রেকর্ডিংটা অন করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।
খাবি না।
বড়োমার দিকে তাকালাম।
শুনে নাও।
নীরু, কনিষ্ক, বটা আমার পেছন পেছন বেরিয়ে এলো।
তোরা কিছু খেয়েছিস।
আবিদ এতো কচুরী এনেছে শেষই হচ্ছে না।
পায়ে পায়ে এ ঘরে এলাম।
এবার একটা সিগারেট খেতে খুব ইচ্ছে করছে।
পুরো প্যাকেটটা নে।
কনিষ্কর পেটে একটা গুঁতো মারলাম।
হ্যাঁ, সত্যি বলছি। না হলে তো বলবি, বুঝলি সুরো, কনিষ্কটা একটা গাড়ল, সিগারেটটা খেয়ে শেষটুকু পর্যন্ত পা দিয়ে ডলে চলে গেল।
কনিষ্ককে জড়িয়ে ধরলাম।
ছাড়।
তবু ওকে ছাড়লাম না।
আজ এই মুহূর্তে তোর যেমন ফিলিংস হচ্ছে, সেদিন এর থেকে অনেক বেশি আমি কষ্ট পেয়েছিলাম। নিজের বিবেক ছাড়া কাউকে সেই কথার উত্তর দিতে পারিনি।
একটা ইমোসনে লিখে ফেলেছিলাম।
সেটা আমি জানি। মিলি বহুবার এই প্রশ্নের উত্তর চেয়েছে। দিতে পারিনি।
ঠিক আছে আমি উত্তর দেব।
একটা সিগারেট ধরালাম।
তুই সত্যি এই পনেরো বছর ফল খেয়ে আছিস।
ঠিক তা নয়। যখন নিজে ভাত ফোটাতে পেরেছি খেয়েছি।
রান্না করতিস!
না পারলে ড্রই ফুড। মাছ, মাংসো কখনও ছুঁই নি।
কি বলছিস! বটা বললো।
প্রথম প্রথম খুব কষ্টে হয়েছে, তারপর অভ্যাস হয়ে গেছে।
সুরোর বিয়েতে এসেছিলি যে।
টনা, মনা খেয়েছে। আমি শুধু মেয়ের হাতের কয়েকটা লুচি খেয়েছিলাম।
রাতে সুরো যে খাবার দিল।
রাধা বল্লভী ডালটা খেয়েছিলাম বাকিটা টনা, মানা খেয়েছে।
নীরু আমার দিকে তাকিয়ে ঘন ঘন সিগারেটে টান দিচ্ছে।
সারাদিন ওই খেয়ে চালিয়ে দিলি।
না। ফিরে গিয়ে মালতী ফল কেটে রেখেছিল খেলাম।
কি মেয়ে দেখেছিস! একবারও বলেনি তুই এসেছিস।
আমি কলকাতা এলে ওখানে থাকতাম। থাকার আরও নানা জায়গা ছিল।
কোথায় থাকতিস?
ওদের ঘরে।
নীরু আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে।
কনিষ্ক হাসছে। একটা স্যাড নিউজ আছে।
গম্ভীর হয়ে গেলাম।
কি বল!
মালতীর বড়ো ছেলেটা হারিয়ে গেছে।
তাই! কবে?
বছর খানেক যখন বয়স তখন, তারপর আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
মনে মনে হাসলাম, মুখে কিছু বললাম না। এমনকী এমন ভাবে মুখটা করলাম সত্যি আমি খুব কষ্ট পেয়েছি।
মেয়ে ও ঘর থেকে ছুটতে ছুটতে এসে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। পিঠে একটা চুমু খেয়ে মুখ ঘোষতে লাগলো।
তোর আবার কি হলো! নীরু বললো।
অনিমেষদাদাই বললো, ইউ আর গ্রেট।
মেয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো।
তোমার নাম অনি ব্যানার্জী, অনিন্দ ব্যানার্জী কবে থেকে হলে?
কনিষ্ক হাসছে।
তুই এতো তাড়াতাড়ি সব বুঝে গেলে হবে কি করে?
ও পোড়ার মুখো আঁটকুড়ের ব্যাটা মোকে একটু ধর না।
দিবো না এক আছাড় তখন দেখতে পাবে। চিকনার গলা পেলাম।
ও মা দেখছু, ওলাউঠা গাল দিয়া মরেঠে। ছেলেটাকে টুকু দেখতি চাইছি।
চমকে উঠলাম, কার গলা। চেনা চেনা মনে হচ্ছে।
অনিসাকে ছেড়ে দিয়ে ঘরের বাইরে এলাম।
বারান্দায় দাঁড়িয়েই সে দৃশ্য দেখে নিজে হেসে ফেললাম।
শালা বুড়ি পথও হাগবে চোখও রাঙাবে। অনি কি তোর বাপ। চিকনা তরপে চলেছে।
হঁ মোর বাপ।
মিনমিনে গলা তার তেজ কতো।
চিকনা কোলে করে বুড়িকে গাড়ি থেকে নামিয়ে মাটিতে বসিয়ে দিল।
ও মিনসের পো মোকে লাঠিটা এগি দে।
কোমড় আছে, যে হেঁটে যাবে।
মুই হাটি যাব। তুই মোকে লাঠি দে।
ততক্ষণে সবাই বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে।
আমি বারান্দা থেকে বাগানে নেমে এগিয়ে গেলাম।
চিকনা মৌসুমী মাসির হাতে লাঠি গুঁজে দিচ্ছে। নীপা গাড়ি থেকে নেমে এসেছে।
বাসু জিনিষপত্র নামাচ্ছে। নিপার পাশে বছর চোদ্দর একটা মেয়ে। বেশ মিষ্টি দেখতে।
আমি যাওয়ার আগেই মেয়ে একছুটে আমার পাশ দিয়ে চলে গেল।
কে যায়ঠেরে চিকনা। মৌসুমী মাসি চেঁচিয়ে উঠলো।
চোখ আছে যে দেখবে।
ওলাউঠো বইলা মর না।
কাছে গেলাম।
অনির মেয়ে।
মৌসুমি মাসি তখনও লাঠিতে ভড় দিয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে।
চিকনা আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
আগের থেকে চেহারাটা খারপ হয়েগেছে।
বাসু ব্যাগ ফেলে এগিয়ে এলো। নীপা এলো।
চোখ ছল ছল।
গ্রাম শুদ্ধ উজার করে সবাই আসতে চায়। বল, সম্ভব। সারাটা রাস্তা জ্বালিয়ে মারলো।
ও ওলাউঠোর পো এন্যে কারা কইতে পারছুনি।
দিবো এক আছাড়। চিকনা চেঁচিয়ে উঠলো।
আমি ওদের ছেড়ে মৌসুমী মাসির কাছে গিয়ে বসলাম।
তখনো চেঁচিয়ে চলেছে।
এন্যে কারা ক না। এততো লোক কুথা থেকে আইলো।
চোখের মনিদুটো ঘোলাটে হয়ে গেছে। শরীরের চামড়া গ্রীষ্মের ধান খেতের মতো ফুটি ফাটা। তবু এখনো জ্বলজ্বলে। চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। আমি কাছে গিয়ে বসতেই কাঁপা কাঁপা হাতে মুখে চোখে হাত বোলাল। তারপর হাতটা আস্তে আস্তে আমার শরীরে নেমে এলো। ঠাওর করার চেষ্টা করলো লোকটা কে। সবাই চুপ। কেউ কোনও কথা বলছে না।
তুই কে রে, অনি। কাঁপা কাঁপা গলায় অস্ফুট শব্দ। একটা দাঁতও নেই।
হ্যাঁ মাসি, আমি অনি। গলাটা ধরে এলো।
আমাকে কাছে টেনে নেবার আপ্রাণ চেষ্টা করলো। গালদুটো ফুলে ফুলে উঠলো। ক্ষমতায় কুললো না। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরলো।
বড়ো কত্তা মরিইছে।
ঠোঁট দুটো থিরি থিরি কাঁপছে। আশক্ত হাতে আমার হাত দুটো শক্ত করে ধরে আছে।
চোখ গেছে, কিছু দেখতি পাইনি। কানটা আছে, মাঝে মাঝে ভঁ ভঁ করে।
গোল করে ঘিরে সবাই আমাকে আর মাসিকে দেখছে। আমার দুই পাশে ছেলেমেয়ে।
মাসির চোখটা আমার কাপর দিয়ে মুছিয়ে দিলাম।
আমি ডাইন হয়ে ভিটে পাহাড়া দিতিছি।
তুমি কেন ডাইন হতে যাবে।
তুই আইসা পরছু এবার মুই শান্তিতে মরতি পারবো।
তুমি মরবে কেন। আমি ধরি তুমি ওঠো। পারবে?
তুই ধরলি পারব। চিকনা মোকে আছাড় মারবে কইছে।
চিকনা হেসে ফেলল।
ঠিক আছে তুমি লাঠি ধরো, আমি তোমাকে ধরছি।
ধরি দে।
আমি লঠিটা হাতে ধরিয়ে দিলাম। একটা হাত ধরতেই বুড়ী উঠে দাঁড়ালো। সত্যি সত্যি একেবারে বেঁকে গেছে।
এবার ছেড়েদে অনি, গাড়ি স্টার্ট হয়ে গেছে। যেখানে থামতে বলবি সেখানে থামবে।
চিকনার কথায় হেসে ফেললাম।
দিনরাত আমার গুষ্টির ষষ্ঠী পূজো করছে। একবার শ্মশানে নিয়ে যায়। আবার শ্মশান থেকে জ্যান্ত তুলে নিয়ে আসে।
বুড়ী বেশ টুক টুক করে হেঁটে চলে এলো। আমি পাশে পাশে হাঁটছি। একটা হাত ধরেছি।
কোমড় একবারও সিধে করলো না। বারান্দায় এসে বসলো।
বুঝছু অনি।
বলো।
অনাদি মুখপোড়াটা অন্য দলে ভিড়া মরছে।
অনিমেষদা পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল, হেসেফেললো।
পুন্যা চন্দকে সেউদিন দু-মুড়ো গাল দিছি।
কেন দিলে—
মুখপোড়া যেউ পাতে খাবে সেউ পাতে হাগবে।
মাসি এখানে অনেকে আছে—
সবাই মুখ টিপে হাসছে।
বাবুরা এয়েছে—
হ্যাঁ।
আচ্ছা আর কইবনি।
কিছুক্ষণ থেমে।
শ্যাম এয়েছিল। কইলো তুই এউবার চইলে আসবি।
বুড়ী কিন্তু এখনও বেশ স্ট্রং তাই না বিধানবাবু। অনিমেষদা, বিধানদার দিকে তাকাল।
টর টর করে অনিকে কিরকম লাগাচ্ছে বলুন।
শ্যাম কইবার পর অশ্বিনীগুণীনের কাছে গেছলি। কইলো শ্যাম ঠিক কথা কইছে।
অশ্বিনী খুড়ো কেমন আছে?
এখন টুকু ভালো, মাঝু হাঁফ ধইড়া মরছিল।
চিকনা জানতো তো—
মিয়াপুরু, আধাভুইদ্রা মোকে কিছু কয় নাকি। শ্যামকে দিব্যি কাটতে সে কইছিল, তুই বাঁইচা আছু। কাউকে কই নি, শুধু বড়কত্তাকে কইছিলি।
প্রবীরদা হাসছে।
গেটে তিনটে গাড়ি এসে দাঁড়ালো। পেঁ পেঁ করে হর্ন বাজলো।
দেখছু আবার মোটোর আইসছে। মৌসুমি মাসি বলে উঠলো।
বড়োমা কাই আছে ডাক।
বড়োমা পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল।
বলো কি হয়েছে।
কাঁপা কাঁপা হাতে ট্যাঁক থেকে একটা কাগজের পুরিয়া মতো বার করলো।
নাতনদের মাথায় ছুঁ কইরে দাও। তারপর ঠাকুরের আসনে রেইখে দিব।
ততক্ষণে সবাই গেটের কাছে চলে গেছে।
হই হই শুরু হয়ে গেছে গেটের কাছে। কে কাকে দেখে। ইসলামভাই সবচেয়ে বেশি চেঁচামিচি করছে।
বুঝতেই পারছি আলাপ পর্ব সব ওখানেই সারা হয়ে যাচ্ছে।
অনিমেষদা, বিধানদা বারান্দায় দাঁড়িয়ে। ডাক্তারদাদা, দাদা, মল্লিকদা সবাই ঘরের বাইরে বেড়িয়ে এসেছে।
একে একে সবাই ভেতরের দিকে এগিয়ে আসছে।
অবতার, সাগির, নেপলা সবার আগে।
এসেই আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
তোমার সঙ্গে কতোদিন পর দেখা হলো।
কোথায় কতোদিন। এই তো দিন পনেরো আগে রাত কাটালাম।
পনেরো দিন মানে আমাদের কাছে পনেরো বছর।
তারপরেই অনিমেষদা, বিধানদা, ডাক্তারদাদা, দাদা, মল্লিকদার পায়ে গিয়ে পড়ে গেল।
কিরে অনি এদের তো চেনাই যাচ্ছে না—অনিমেষদা বললো।
না দাদা এভাবে বলবেন না। নেপলা বললো।
সুন্দর ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো।
ড্যাড দিদান, দিদাইকে চিনিয়ে দাও।
কথাটা শোনা মাত্রই সবাই আমার দিকে তাকাল। মিত্রার চোখ বড়ে বড়ো। তনু, মিত্রার পাশে দাঁড়িয়ে হাসছে। এই ব্যাপারটা তনু মনেহয় উহ্য রেখেছে।
মমকে বল, বলে দেবে।
নো নো তুমি বলো। মম বলেছে চেনে না।
আমি তো বলছি মমকে বল।
মিত্রার চোখ গোল গোল। একরাশ বিস্ময়। অনিসা, অনন্যর মুখটা মুহূর্তের মধ্যে কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
বড়োমা আমাদের দিকে কেমন ভাবে যেন তাকিয়ে আছে।
বিদেশে বড়ো হয়ে ওঠা সুন্দরের কোনও জড়তা নেই। ব্রিটিশ ইংরাজীতে ফ্লুয়েন্ট কথা বলে চলেছে।
বলো না প্লিজ। আচ্ছা আমার ভাই, বোন কোনটা বলো।
তোর মা তোর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয়নি?
মা শুধু আন্টির সঙ্গেই কথা বলে গেলো।
তুই সব একবারে জানতে চাইলে হবে কি করে?
নেপলা চেঁচিয়ে উঠলো। কি অনিদা, এবার ফেঁসে গেছ—
নেপলা আঙ্কেল তুমি বলো—
সুন্দর ঠাট ব্রিটিশ ইংলিশে বলছে।
নেপলা তার প্রতি উত্তর দিচ্ছে।
ওটা তোর ড্যাডের চ্যাপ্টার আমি বলতে পারবো না।
এরা কারা বলো।
সুন্দর আমার দিকে তাকিয়ে অনিমেষদাদের দিকে হাত দেখাল।
তোকে বাংলায় বলতে হবে। তবে বলবো।
তুমি তো পুরো শেখাও নি।
মম তো শিখিয়েছে।
বড়োমাকে ইসারায় কাছে ডাকলাম।
আড় চোখে দেখলাম মালতী দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কখন এসেছে খেয়াল করি নি।
বড়োমা কাছে এলো।
এটা তোর দিদান।
সুন্দর আমাকে ছেড় বড়োমাকে জড়িয়ে ধরলো। গালে কপালে হুঁম হুঁম করে চুমু খেলো।
পরিষ্কার বুঝতে পারছি বড়োমার চোখে মুখে অশ্বস্তি।
সবাই বেশ গম্ভীরভাবে আমাকে দেখে চলেছে।
ভাবছে অনির আঠারো বছর সবাইকে এখানে ফেলেরেখে বাইরে কাটাবার চাবিকাঠি কি তাহলে সুন্দর, তনু?
ছেলে-মেয়ের দিকে ঠারে ঠোরে চোখ বুলিয়ে চলেছি। গম্ভীর মুখ। এতক্ষণ হই হুল্লোড় করা মুখগুলো কেমন ফ্যাকাশে ফ্যাকাশে।
আমার মা।
মিত্রার দিকে আঙুল তুললাম।
ওই আন্টি আমার মা, সুন্দর ছুটে গেল।
মিত্রাকে জড়িয়ে ধরেছে।
বড়োমার গলাটা জড়িয়ে ধরে ফিস ফিস করে বললাম।
ছেলেটাকে চিনতে পার—
তুই তনুকে বিয়ে করেছিস?
আমার দিকে সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল।
তোমার কি মনে হয়—
তাই তো মনে হচ্ছে—
তোমার বিশ্বাস হয় অনি এই কাজ করতে পারে?
বিশ্বাস হয় না, তবু কি জানি মন মানে না।
সুন্দর, মিত্রাকে ছেড়ে দিয়ে আবার আমার কাছে ছুটে এলো।
সামনে এসে দাঁড়ালো।
পরিষ্কার ইংরাজীতে বললো।
এবার তুমি বলো দিদাই, না তার আগে বলো আমার অরিজিন?
সবাই এবার আমার আর সুন্দরের দিকে বিষ্ময়ে তাকিয়ে আছে।
তোমার কি খুব জানার ইচ্ছে?
আমি সব মেনে নেব ড্যাড। সুন্দরের গলায় আর্তি।
আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে।
তোমার কাছ থেকে আমি শিখেছি। কিভাবে মেনে নিতে হয়, মানিয়ে নিতে হয়।।
কেন তোর মমকে পছন্দ নয়?
মম আমার সব। তবু আমার অরিজিনকে জানা দরকার। তুমি কথা দিয়েছো।
সবার চোখের মনি স্থির।
কিছু যেন একটা ঘটতে চলেছে।
বড়োমা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। ছেলেটা বলে কি!
অনন্য, অনিসা মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে।
হয়তো ভাবছে তাহলে কি সুন্দর বাবার কেউ নয়! যদি তাই হয় বার বার বাবাকে ড্যাড বলে সম্বোধন করবে কেন?
শুভ মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে।
তুমুল কনভার্সেশন চলছে সুন্দর আর আমার মধ্যে।
তুমি তো আমাকে বলেছো যা সত্যি তা সবাইকে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে জানাতে।
সুন্দর মাথা নীচু করে কেঁদে ফেললো।
গোটা ঘটনায় সবাই স্তব্ধ।
তনু, আমি নির্বিকার ভাবে দাঁড়িয়ে।
বলো না ড্যাড প্লিজ।
তুই তো দুটো মা পেলি, তাতেও হচ্ছে না। আমারও তোর মতো দুটো মা।
তোমার অরিজিনাল মা বেঁচে থাকলে, তোমার দেখতে ইচ্ছে করতো না।
তনু, মিত্রা দুজনে এগিয়ে এলো।
তুমি বিশ্বাস করো ড্যাড তিনি যেরকমই হোন আমি তাকে মেনে নেব।
ছোটোমা, বৌদি, জ্যেঠিমনি সবাই আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে।
তোর মা কিন্তু তোর একটা কথাও বুঝবে না—
তুমি মিডিয়েটর হবে—
বড়োমা আমার মুখের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে, চোখের পাতা পরছে না।
আমার মাকে দেখার দায়িত্ব কি আমার নয়। তুমি এতদিন আমাকে যা বলেছো সব মিথ্যে।
কান্না থামাও।
সুন্দর হাতদিয়ে চোখ মুছলো।
সবাই কেমন যেন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে।
তনু মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে।
আশে পাশে কারুর মুখে কোনও কথা নেই।
এসো আমার সঙ্গে।
(আবার আগামীকাল)