জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
৭৩ নং কিস্তি
গাড়িতে উঠেই অনিসা বললো, আবিদ আঙ্কেল আমরা প্রথমে যাব প্রিন্সেপ ঘাট।
ওখানে কি করতে যাবি!
গঙ্গার হাওয়া খেতে।
আবিদ একবার অনিসার দিকে তাকাল। ভাইঝির মতিগতি ঠিক ভালো ঠেকছে না। মনে হচ্ছে ও নিশ্চই একটা কিছুর গন্ধ পেয়েছে।
আবিদ বুঝতে পারলো, এবার অনিসা ওকে ছাড়বে না।
আবিদও মনে মনে ঠিক করলো সরাসরি ওকে ধরা দেবে না।
আবিদ নিজে গাড়ি ড্রাইভ করছে। রাস্তা দিয়ে আসার সময় অনিসা একটা কথাও আবিদের সঙ্গে বললো না। শুধু ভিউংগ্লাস দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থেকেছে।
প্রিন্সেপঘাটে গাড়িটা দাঁড় করাতেই পরিচিত সব মুখগুলো দূর থেকে আবিদের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। সবাই অবাক হয়ে দেখছে। অনেকে আবিদকে দেখে কাছে আসতে চাইল আবিদ ইশারায় সকলকে না বলে দিল।
অনিসা গাড়ি থেকে নেমে এলো।
আবিদ ভাইঝির দিকে তাকাল আজ অনিদার পাঞ্জাবী আর জিনসের প্যান্টটা পরে ওকে দারুণ লাগছে। চোখে একটা সানগ্লাস লেগিয়েছে। হাইট অনেকটা অনিদার মতো। অতোটা না হলেও মেয়েদের জেনারেল হাইটের থেকে ও একটু লম্বা। ওর মাথার লম্বাচুল পিঠময় ছড়িয়ে পড়েছে। হেয়ার ব্যান্ড দিয়ে চুলটা আটকান। ঠিক কালো নয়। একটু ব্রাউনিস।
কোথায় যাবি?
অনিসা আবিদের সামনে এসে দাঁড়াল। চশমাটা চোখের থেকে মাথায় তুললো।
তুমি বলো তো আবিদ আঙ্কেল আমি হঠাৎ এখানে এলাম কেন?
কি করে জানবো, তুই বললি একটু ঘুরতে যাব গঙ্গার ধারে, তাই এলাম।
তার জন্য তোমাকে সঙ্গে নেব কেন? ভজুমামাকে নিয়ে চলে আসতে পারতাম।
আবিদ ভাইঝির মনের কথাটা বোঝার চেষ্টা করলো। পোড় খাওয়া আবিদ অনিসার চোখের ভাষা ঠিক ঠাহর করতে পারছে না।
তাকিয়ে আছো কেন, আমার কথার উত্তর দিলে না।
আমার মাথাটা তোর মতো পরিষ্কার নয়। আমি তোর মতো লেখাপড়া শিখিনি।
ওটা তুমি নিজেকে আড়াল করার জন্য বলছো।
আবিদ ভাইঝির চোখে চোখ রাখলো।
বাবা এখানে এসে কোথায় বসতো। তোমার সঙ্গে কোথায় বসে কথা বলতো?
আবিদ চমকে তাকাল ভাইঝির দিকে।
আমাকে সেই জায়গাটায় নিয়ে চলো।
আবিদ এবার মাথা নীচু করলো।
নিয়ে যাবে না?
কি করবি ওখানে গিয়ে।
তোমার সঙ্গে বসে দু-ঘণ্টা গল্প করবো।
এখানে না বসে অন্য কোথাও যাই চল।
কেন!
জায়গাটা ভালো নয়।
বাবা কেন এই খারাপ জায়গায় তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসতো?
তোর বাবা সাংবাদিক। সংবাদ সংগ্রহ করতে আসতো।
আমিও নিউজ কালেক্ট করতে এসেছি।
আবিদ চমকে উঠলো।
চলো।
এবার আবিদ আর না করলো না। পায়ে পায়ে গঙ্গার ঘাটের দিকে এগিয়ে এলো। পাঁচিলের ধারে সেই বেঞ্চটায় গিয়ে বসলো।
অনিসা বসলো না। চারদিকটা একবার ঘুরে ঘুরে দেখলো। নিজের মোবাইলে ছবি তুলে নিল। স্টিল ভিডিও।
বুঝলে আবিদ আঙ্কেল বাবার টেস্ট ছিল।
আবিদ চেয়ে চেয়ে ভাইঝির রকম সকম দেখছে। একেবারে ডিটো অনিদার চোখ। সব সময় যেন কিছু খোঁজার চেষ্টা করছে।
আবিদ আঙ্কেল বাবা এখানে এসে বসলে তুমি বাবাকে বাদাম দিতে আসতে। তোমাকে দেখে কেউ বাদাম দিতে আসছে না কেন।
আমাকে কেউ চেনে না। তাই।
ইকবালদাদাই-এর নৌকো কোনটা?
আমি চিনি না।
ভাইদাদাই-এর বুজুম ফ্রেন্ড। ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আর তুমি চেন না। তা হয়? আমাকে লুকিয়ো না আমি সব জানি। বলতে পার জেনে ফেলেছি।
আবিদ চুপ করে থাকলো।
আমাকে একটু বাদাম খাওয়াও?
অনেক বাদাম ওয়ালা আছে ডেকে নে।
আমি ডাকবো না তুমি ডাকো?
আমি ডাকলে আসবে না।
কেন আসবে না। তোমাকে সবাই চেনে বলে।
তুই কি করে জানলি?
আমি জেনেছি। কি করে জেনেছি তোমাকে বলবো না।
তাহলে আমিও বলবো না।
অনিসা আবিদের কোল ঘেঁসে বসলো। আবিদের মুখের দিকে তাকাল।
তুমি ধরা পড়ে গেছো। তোমার মুখ বলছে। আমার দিকে তাকাও।
আবিদ ভাইঝির মুখের দিকে তাকাল।
আমি বাবাকে ছবিতে দেখেছি। তোমরা বাবার কাছে থেকেছো। বাবার সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করেছো। বলোনা বাবা কোথায় আছে?
আবিদের চোখটা হয়তো ছল ছল করে উঠেছিল। নিজেকে সামলে নিল।
তুমিই তো কনিষ্ক মামাকে প্রথমে বলেছিলে, বাবা মরেনি বাবা বেঁচে আছে। বাবাকে সহজে কেউ মারতে পারবে না।
আবিদ এবার নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না।
ধমকে উঠলো, তুই চুপ করবি। কথটা জোড়ে বলতে গিয়ে আবিদের গলা ধড়ে এলো।
আমি চুপ করার জন্য আসিনি। আমার প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর তোমাকে দিতে হবে।
আমি জানি না, যা—
তুমি চলে যাও, আমি একা এখানে থাকবো।
না তোর এখানে একা থাকা হবে না।
তাহলে ইকবালদাদাই-এর কাছে নিয়ে চলো।
ইকবালভাই এখানে নেই।
আছে। বাবা ইকবালদাদাই-এর আত্মীয়ের কাছে আছে।
তুই ভুল জানিস—
ঠিকটা তাহলে কি বলো—
আবিদ চুপ করে রইলো।
অনিসা লক্ষ্য করেছে এরই মধ্যে দু-চারজন সাদা ধুতি-পাঞ্জাবী পরা বাদাম ওয়ালা ওদের দিকে তাকাতে তাকাতে এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে চলে গেছে। সকলের চোখে একটা সন্দেহ।
এক কাজ করো।
বল।
তুমি আমাকে ইকবালদাদাই-এর কাছে নিয়ে চলো। তারপর তোমার ছুটি।
তুই অফিসে চল।
আমি একা চলে যেতে পারবো। তুমি চলে যাও।
আবিদ কিছুক্ষণ অনিসার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইলো।
অনিসা মুচকি মুচকি হাসছে।
তুমি হেল্প না করলে আমি ঠিক খুঁজে নেবো। তখন তুমি কিন্তু কিছু বলতে পারবে না।
আচ্ছাই তো পাগলকে নিয়ে পরলাম।
অনিসা হাসছে।
ঠিক আছে চল কিন্তু কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারবি না।
ওটা নিয়ে তোমাকে ভাবেতে হবে না। ওটা আমি বুঝে নেব।
ইসলামদাদাইকে একটা ফোন কর।
ফোন করতে হবে না। আমি তোমাকে নিয়ে কোথায় এসেছি খবর চলে গেছে?
খুব পাকা পাকা কথা শিখেছিস।
খুউউউববব।
কি করে বুঝলি?
আমি অনি ব্যানার্জীর মেয়ে, তাই।
আবিদ হেসে ফেললো।
দেবো একটা ঝাঁপ্পড়।
তুমি মারতেই পারবে না।
তুই ইকবালভাইয়ের কথা জানলি কি করে?
তোমাকে সব বলবো, আগে একটু গুছিয়ে নিই।
আবিদ উঠে দাঁড়াল। ঠিক আছে চল।
অনিসা, আবিদকে জড়িয়ে ধরলো।
এই তো গুড বয়। আর একটা কথা আছে আঙ্কেল—
বল—
তুমি কাউকে বলতে পারবে না—
কি—
আমি কোথায় যাচ্ছি কি করছি—
এই তো বললি ভাইদাদাই সব জানতে পারছে।
পারবে না।
কেন!
সে তোমাকে পরে বলবো।
সব পরে বললে, আমি কি উত্তর দেবো।
তোমাকে কেউ জিজ্ঞাসা করবে না।
অনিসা আবিদের হাত ধরে গঙ্গার ধার দিয়ে হাঁটতে শুরু করলো।
গাড়িটা ওখানে থাকবে?
ও কিছু হবে না।
তারমানে!
আমি তো বললাম, কিছু হবে না।
তোমার দেখার লোক আছে?
আবিদ হেসে ফেললো।
তুই তো বহুত জ্বালাস। আছে। হয়েছে এবার।
অনিসা হাসছে।
এবার বাদাম খাওয়াও।
যেখানে যাচ্ছিস সেখানে খাওয়াবে।
তোমাকে এখানে কারা কারা চেনে, একটু দেখাবে না।
একটু অপেক্ষা কর জানতে পারবি।
হাঁটতে হাঁটতে ওরা একটা মসজিদের সামনে এসে দাঁড়াল। আবিদকে দেখে অনেকেই আসলাম আলেকম সালাম বলছে। আবিদও আলেকম সালাম বলছে।
অনিসা চেয়ে চেয়ে দেখছে।
ও শুনেছে বাবা ধর্ম বলে কিছু মানতো না। বাবার কাছে সব ধর্ম সমান। অনিসা শুনেছে বাবা নাকি একসময় ইসলামদাদাইকে কি একটা জটিল ব্যাপার থেকে বাঁচিয়েছে। কেউ ওকে এখনও পর্যন্ত ভেঙে বলেনি সব কেমন ভাসা ভাসা। এর কাছে একটুখনি তার কাছে একটুখানি। সেই থেকে নাকি ইসলামদাদাই বাবাকে খুব ভালোবাসে। আবিদ আঙ্কেল, রতন আঙ্কেলও বাবার খুব নেওটা। রতন আঙ্কেল তো প্রায়ই বলে আমার যা কিছু তোর বাবার জন্য।
তুই এখানে একটু দাঁড়া, আমি ভেতর থেকে আসছি।
অনিসা মাথা ঝাঁকালো। ঠিক আছে যাও।
আবিদ ভেতরে চলেগেল।
অনিসা চারদিক চেয়ে চেয়ে দেখছে। কতো লোক নমাজ পড়ে বেরচ্ছে, আবার কতো লোক নমাজ পড়তে যাচ্ছে। সবই কি রকম এক ছন্দে বাঁধা। কেউ কেউ ওকে যে দেখছে না তা নয়। অনিসা গা করলো না।
হঠাৎ পেছন ফিরে তাকাতেই ও দেখলো একটা সাদা ধুতি-পাঞ্জাবী পড়া বাদামওয়ালা আস্তে করে নিজেকে আড়াল করে নিলো। অনিসা বুঝলো এ আবিদ আঙ্কেলের লোক।
অনিসা চারদিক ভালো করে দেখছে। কেউ কিন্তু ওকে কোনও প্রশ্ন করছে না। কিছুক্ষণ পর একজন সাদা ধবধবে কুর্তা-পাঞ্জাবী, মুখ ময় সাদা দাড়ি, গায়ের রং টকটকে ফর্সা একজন সৌম্য শান্ত ভদ্রলোক আবিদ আঙ্কেলের সঙ্গে মসজিদের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। সোজা এসে ওর সামনে দাঁড়াল।
দ্যাখো চিনতে পারো কিনা?
অনিসা মনে মনে ভেবে নিলো এ নিশ্চই ইকবালদাদাই। নীচু হয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো।
থাক থাক মা।
অনিসা সোজাসুজি ইকবালদাদাই-এর চোখে চোখ রাখলো। চেখদুটো কি অস্বাভাবিক জ্বলজ্বলে। মুখটা কি শান্ত।
বড়ো চেনা চেনা লাগছে। কিন্তু চিনতে পারছি না।
অনিসা হাসছে।
ভালো করে মুখটা দেখো চিনতে পারবে। আবিদ বললো।
কে বলতো, অনির কেউ?
অনিদার মেয়ে।
এবার বুড়ো আবেগে অনিসাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো।
তুই এতোবড়ো হয়েগেছিস!
অনিসার কপালে চুমু খেলো।
কতোদিন পর তোকে দেখছি। তুই যখন ছোটো ছিলি তখন ইসলাম তোকে একবার নিয়ে এসেছিল। আর তুই যেদিন জন্মেছিলি সেদিন দেখতে গেছিলাম। আয় আয় ভেতরে আয়।
অনিসা ইকবালদাদাই-এর বুক থেকে উন্মুক্ত হলো।
ওর অনেক প্রশ্ন, আমি তার একটারও উত্তর দিতে পারবো না। তুমি পারলে দাও।
ইকবালভাই হাসছে।
আবিদ, অনিসার দিকে তাকাল।
এবার আমি যাই।
যাও।
আবিদ হাসছে।
কাজ হয়ে গেছে তাই না।
অনিসা মাথা দোলাচ্ছে।
অনিসা ইকবালদাদাইয়ের হাত ধরে, মসজিদের পেছনে একটা ছোট্ট ঘরে তিনজনে এলো। সাধারণ একটা ঘর। কয়েকজন ঘরে বসে আছে। ইকবালভাই নিজের আসনে গিয়ে বসলো।
আয় মা আয় এখানে এসে বোস।
ইকবালভাই নিজের পাশে জায়গা দেখাল।
অনিসা গিয়ে ইকবালভাই-এর পাশে গিয়ে বসলো।
আবিদ একবার সেলিমকে ডাক।
আবিদ বেরিয়ে গেল।
ইকবালদাদাই যারা বসেছিলেন তাদের সঙ্গে কথা বলছেন।
অনিসা বুঝতে পারলো, এখানে যারা এসেছে তারা তাদের নানা সমস্যা নিয়ে এসেছে ইকবালদাদাই-এর কাছে। বেশ মজা লাগছিল অনিসার।
কারুর মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না। কোন বাচ্চাটা রাতে ভয় পায়। আরও কতো সমস্যা।
ইকবালদাদাই কাউকে মাদুলি দিচ্ছে, কাউকে জলের বোতলে মন্ত্র পড়ে দিচ্ছে। কাউকে বলছে একটা ধুপের প্যাকেট কিনে নিয়ে আয়। আমি ফুঁ দিয়ে দিই। সবাই সরল বিশ্বাসে সেইগুলো নিয়ে আসছে। ইকবালদাদাই তা মন্ত্রপূতঃ করে দিচ্ছে, ওরা সেইগুলো নিয়ে চলে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর আবিদ একজনকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে ঢুকলো। তাকেও দেখতে বেশ সুন্দর।
ইকবালভাই-এর মতো পোশাক পরা। কিন্তু বয়সটা আবিদের মতো।
আয় সেলিম। দেখ একে চিনতে পারিস কিনা।
ইকবালভাই অনিসাকে দেখাল।
সেলিম অনিসার দিকে কিছুক্ষণ তাকাল। কিছুটা সন্দেহের চোখে।
মুখের আদলটা অনেকটা অনিদার মতো লাগছে। অনিদার কেউ?
অনির মেয়ে।
অনিসা উঠে দাঁড়াল। প্রণাম করার জন্য নীচু হলো। সেলিম ওর হাতটা চেপে ধরলো।
একবারে বাপের মতো। গুরুজন দেখলেই কোমড় নীচু করে ফেলবে।
ওরে সেলিম রক্তের দোষটা যাবে কোথায় বল?
সবাই ইকবালভাই-এর কথায় হাসছে।
সেলিম ওকে নিয়ে গিয়ে কিছু খেতে দে। তারপর আমি যাচ্ছি।
চল।
ইকবালভাই এবার আমি যাই। অবিদ বললো।
দাঁড়া, যাসনি। কিছু কথা আছে।
তাড়াতাড়ি এসো।
যা যাচ্ছি।
অনিসারা ওই ঘর থেকে চলে এলো।
তিনজনে গিয়ে সেলিম আঙ্কেলের ঘরে গিয়ে বসলো। সেলিম আঙ্কেল ঘড়ে ঢোকার সময় একজনকে ডেকে কিছু বললো। তারপর ভেতরে এলো।
হ্যাঁরে তোর নাম কি?
অনিসা।
বাবাঃ তুই একবারে তোর বাবার নামে নাম রেখেছিস।
আমার বাবা তো নেই।
কে বললো তোর বাবা নেই।
আমি জম্মের পর থেকে বাবাকে দেখলামই না।
তোর বাবা তোকে দেখে।
ওপর থেকে।
সেলিম আঙ্কেল জিভ বার করলো।
ও কথা বলতে নেই।
তুমি আমার বাবাকে একটু দেখাবে।
সেলিম আঙ্কেল হাসছে।
তুই ভীষণ চালাক।
কেন!
এরই মধ্যে খুব সুন্দর কথার মার প্যাঁচ শিখে গেছিস।
অনিসা মাথা নীচু করলো।
তুই মন থেকে তোর বাবাকে চাইছিস। একটু অপেক্ষা কর সময় হলেই তোর বাবাকে দেখতে পাবি।
অনিসা বুঝতে পারলো সেলিম আঙ্কেল কথাটা ঘোরাবার চেষ্টা করলো।
তুমি কি করে জানলে?
জানি বলেই বলছি।
আমার সঙ্গে বাবার একবার কথা বলিয়ে দেবে।
তোর বাবা বলবে না।
কেন!
তোর বাবা এখন সাধনা করছে। একটু ধৈর্য ধর, চলে আসবে।
তোমরা সবাই বলো বাবা আছে। কোথায় আছে আমাকে একটু বলো না। আমি ঠিক চলে যাব। মাঝে মাঝে বাবার জন্য খুব মন খারাপ হয়।
অনিসার গলাটা ধরে এলো।
সেলিম কাছে এগিয়ে এলো। অনিসার দুই কাঁধে হাত রাখলো।
তোর মন খারাপ হয়, তোর বাবার হয় না?
অনিসা সেলিমের চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে মাথা নীচু করলো।
তুই তো খোঁজার চেষ্টা করছিস।
অনিসা ডাগর চোখে সেলিমের দিকে তাকাল।
আস্তে করে মাথা দোলাল। করছে।
তোর বাবা তোকে কিছুদিনের মধ্যে নিজে থেকে রেসপন্স করবে।
আমি বিশ্বাস করি না।
রেসপন্স করলে বিশ্বাস করবি?
হ্যাঁ।
ইকবালভাই ঘরে ঢুকলো।
কিরে মা চোখ ছলছল করছে কেন?
ওর বাবাকে খুঁজতে বেরিয়েছে।
শক্ত কাজ।
কেন ও কথা বলছো!
মনে এলো তাই।
জানো দাদাই মা কাল রাতে বাগানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খুব কাঁদছিল। মায়ের জন্য ভীষণ কষ্ট হয়।
তোর বাবা তোর মায়ের কাজ করতে গেছে।
এমন কি কাজ বাবার সতেরো বছর সময় লাগছে।
হয়ে এসেছে। আর মাস তিনেক সময় লাগবে হয়তো। কেন তোর মা তো সব জানে।
মা যে বলে, এখন আমার আর বিশ্বাস হয় না।
সেটাও মিছে কথা বলে না।
তাহলে সত্যিটা বলো।
তুই আমাকে চিনলি কি করে?
তুমি আমাকে বাবার কথা না বললে, আমি তোমাকে বলবো কেন।
ওরে দুষ্টু মেয়ে। বাবার মতো প্ল্যান করেছ।
সবাই তোমরা আমাকে বাবার মতো বলো কেন, আমি আমার মতো হতে পারি না।
তুই তোর মতো।
ইকবালভাই এর হাসি হাসি মুখ।
কেন তুই বাবার মতো হতে যাবি। তুই তোর বাবার থেকেও আরও বড়ো হবি। আমি বলছি। আমি সব শুনেছি।
আমার সঙ্গে বাবার একটু কথা বলিয়ে দাও না।
সেটা পারবো না।
কেন! বাবাকে তোমরা ভয় পাও?
ইকবালভাই হেসে ফেললো।
তা বলতে পারিস। ভয়ও পাই আবার ভালোবাসি।
সবার এক কথা।
অনিসা মাথা নীচু করে থাকলো।
যাও তোমাদের কিছু বলতে হবে না। আমার বাবাকে আমিই খুঁজে বার করবো।
এই তো তুই তোর বাবার মতো কথা বলছিস।
অনিসা একবার ইকবালদাদাই-এর দিকে তাকাল।
চোখ দুটো চক চক করছে। মুখে পরিতৃপ্তির হাসি। সৌম্য মুখটায় কোনও উত্তজনা নেই।
ধর তোর বাবা যদি এক্ষুনি তোর সামনে এসে দাঁড়ায় তুই চিনতে পারবি?
অনিসা, ইকবালদাদাই-এর চোখে চোখ রাখলো।
তোর চোখ বলছে তুই পারবি না। তাই তো?
হ্যাঁ।
আগে তুই এইটুকু চিনতে শেখ, দেখবি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
অনিসা ইকবালদাদাই-এর চোখ থেকে চোখ সরাল না। মনে মনে ভাবল, বুড়ো তুমি বহুত গভীর জলের মাছ, আমি তোমাকে জালে ধরতে না পারি ডুব সাঁতারে ধরবার চেষ্টা করবো। তবে তোমায় কথা দিচ্ছি তোমরা সাহায্য করো আর না করো, আমি আমার বাবাকে খুঁজে বার করবো।
কিরে তুই ওরকম ঠাণ্ডা হয়ে গেলি।
না মানে।….
একজন একটা ট্রেতে করে সরবতের গ্লাস নিয়ে এলো। প্রথমে অনিসাকে দিল। অনিসা হাত বাড়িয়ে গ্লাসটা তুলে নিল। তারপর সবাই নিল।
এই সরবৎটা এরকম দেখতে কেন।
তোর বাবা খেতে খুব ভালোবাসতো। পেস্তা আর বাদাম দিয়ে তৈরি।
বাবা খেতে ভালোবাসতো বাবাকে দেবে, আমাকে দিচ্ছো কেন।
তুই বাবার রিপ্রেজেন্টেটিভ। তাই।
ইকবালদাদাই-এর কথায় অনিসা চুপ করে গেল।
জানিস নিসা।
অনিসা ইকবালদাদাই-এর দিকে তাকালো।
তোকে এই নামে আজ থেকে ডাকবো।
অনিসা হাসলো।
তুই যে মসজিদে বসে আছিস। এটা তোর বাবার পয়সায় তৈরি। বিশ্বাস করবি?
অনিসা অবাক হয়া গেল।
আজ এখানকার কেউ জানে না তুই অনির মেয়ে। যদি জানতে পারে এখুনি তোকে দেখার জন্য ভিড় হয়ে যাবে। ভাবছিস ইকবালদাদাই কি সব আজেবাজে কথা বলছে।
হ্যাঁ, ঠিকই তো।
তোর বাবা এখানে শারীরিক ভাবে উপস্থিত নেই তবে সবার মনের মধ্যে আছে।
অনিসার চোখে মুখে বিষ্ময়।
তার কাজ সবার মন চুরি করে নিয়েছে। শেষের কথাটা অনিসার কানে ঢুকলো না।
দেখে তো মনে হচ্ছে এই মসজিদটার বয়স আট দশ বছর। তাই না?
ইকবালভাই মাথা দোলালো।
তোর কথা ঠিক। তুই খোঁজ কর জানতে পারবি। তোর বাবা সব সময় চাইতো কারুর ওপর নির্ভরশীল হবে না। নিজে থেকে জানার চেষ্টা করো, জানতে পারবে। পারলে সাহায্য নাও। আমি একসময় গঙ্গায় নৌক চালাতাম। আজ আমি এই মসজিদের ইমাম। তোদের ধর্মমতে এই মন্দিরের পুরোহিত। এটাও তোর বাবার অনুপ্রেরণায়। আজ ইসলাম, রতন, আবিদকে যে অবস্থায় তুই দেখছিস, ওরা এরকম ছিল না। ওরা খুব খারাপ লোক। তোর বাবা ওদের ভালো করে দিয়েছে। কিন্তু দেখ তোর বাবা এখানে নেই। ওরা এখন কেউ আর খারাপ কাজ করে না। তুই যখন আমার কাছে পৌঁছে যেতে পেরেছিস, তুই পারবি। চেষ্টা কর।
অনিসা মাথা নীচু করে চুপ করে বসে রইলো।
অনেক কথা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু বলতে পারছে না। বাবার প্রসঙ্গ এলেই সবাই কেমন সুন্দর ভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে। অনেকক্ষণ ও ইকবালদাদাই, সেলিম আঙ্কেলের সঙ্গে গল্প করলো। বাবার অনেক অজানা কথা ওদের কাছ থেকে জানলো। ওর মনে হচ্ছে ওর বাবা একটা ইনভিজিবিল ম্যান।
ঘণ্টা খানেক ওদের সঙ্গে কাটিয়ে অনিসা বেরিয়ে এলো। ওরাও এলো।
দেখলো আবিদ আঙ্কেল মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
কিগো আঙ্কেল তুমি যাও নি?
ছারলি কোথায়—
কেন তোমাকে আমি চলে যেতে বলেছিলাম।
তুই বললেই যাওয়া যায় না। ম্যাডামকে কি উত্তর দেব। এখন কোথায় যাবি?
মাকে বলে দাও আমি অফিসে যাচ্ছি।
আবিদ, মিত্রাকে একটা ফোন করে বলে দিল। ওকে অফিসের সামনে নামিয়ে দিচ্ছে।
অনিসা, আবিদ আঙ্কেলের মুখের দিকে তাকিয়ে।
মা নিশ্চই আবিদ আঙ্কেলকে জিজ্ঞাসা করলো কোথায় গেছিলে।
আবিদ আঙ্কেল হাসতে হাসতে ইকবালদাদাই-এর প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেল।
অনিসা সব বুঝতে পারলো। আবিদ আঙ্কেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। তারপর দুজনে একসঙ্গে গাড়িতে বসলো। কিছুটা আসতেই অনিসা বললো—
আবিদ আঙ্কেল।
বল।
তুমি কামিং সানডে আমার জন্য একটু সময় রেখো।
কেন!
তোমাকে নিয়ে বেরবো।
হবে না।
কেন?
আমি অনিদার দেশে যাব, কাজ আছে।
ওআও।
আবিদ ভাইঝির দিকে তাকালো। চোখে মুখে খুশি গলে গলে পড়ছে।
কবে ফিরবে?
তিন চারদিন লাগবে।
দারুণ।
কি দারুণ!
আমি তোমার সঙ্গে যাব।
না।
কেন!
সে তোকে জানতে হবে না।
ও সব শুনছি না। আমি যাব।
তুই তো ভারি বজ্জাত। আমি আর আসবই না।
পারবে—
আবিদ ভাইঝির কথায় হাসছে।
নিজের বাড়িতে যাব, তাতে তোমার আপত্তি কোথায়?
আমি তোর পেছন পেছন ঘুরতে পারবো না।
তোমায় ঘুরতে হবে না। আমি নিজে নিজে ঘুরবো। তুমি তোমার কাজ করবে, আমি আমার কাজ করবো।
মা পার্মিশন দিলে তবে যেতে পারবি, তা না হলে হবে না।
ঠিক আছে আমি মার পার্মিশন নিয়ে নেব।
অফিসের গেটের সামনে গাড়ি এসে দাঁড়াল। অনিসা নেমে গেল।
গেট দিয়ে রিসেপসনিস্ট কাউন্টারে আসার সময় দু-একজনের কথা কানে ভেসে এলো।
একেবারে অনিদার হাইট, অনিদার মুখটা যেন বসানো।
অনিসার একবার ইচ্ছে হচ্ছিল পেছন ফিরে দেখে। এদের বয়স কতো।
তারপর নিজেকে সামলে নিলো। সোজা গট গট করে ভেতরে ঢুকে এলো।
ম্যাডাম।
রিসেপসনিস্ট মেয়েটার মিহি ডাকে ফিরে তাকাল।
আপনার জন্য একজন কনফারেন্স রুমে অপেক্ষা করছে।
আমার জন্য!
হ্যাঁ ম্যাডাম।
কই ডাকুন।
মেয়েটি চলে গেল। কিছুক্ষণ পর মেয়েটির পেছন পেছন শুভদীপ এসে ওর সামনে দাঁড়াল।
তুই এখানে! জানলি কি করে আমি এখানে আসব!
তোর মোবাইল অফ।
সরি।
আন্টিকে ফোন করেছিলাম। বললো তুই দুটোর পর অফিসে আসবি।
তাই নাচতে নাচতে চলে এলি।
তাহলে চলে যাই।
এলি যখন যাবি কেন। মার সঙ্গে কথা বলেছিস?
ফোনে কথা বলেছি। এখানে এসে আর জানাইনি।
কেন!
শুভদীপ চুপ করে থাকলো।
চল ওপরে চল।
দুজনে লিফ্ট বক্সের সামনে এসে দাঁড়াল। লিফ্ট নামতে দুজনে ওপরে উঠে এলো।
তোর মতো গাঢ়ল দুনিয়ায় দুটো নেই।
ফালতু কথা একবারে বলবি না।
ফালতু কথা কেন, তুই এটলিস্ট মাকে একটা ফোন করতে পারতিস।
আন্টির কাজ আছে।
তাই বলে কি মা বলেছে তোর সঙ্গে কথা বলবে না।
লিফ্ট থামতে দুজনে নেমে এলো। করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনিসা তাকাল শুভদীপের দিকে।
তুই এরকম একটা আলখোল্লা পরেছিস কেন?
তোর অসুবিধে আছে—
অবশ্যই।
তাকাবি না।
অনিসা চুপ করে গেল।
মায়ের ঘরের সামনে এসে দেখলো কেউ নেই। লকে হাত দিয়ে দরজাটা ফাঁক করতেই দেখলো বেশ কয়েকজন বসে আছে। একমাত্র মিলিমনি আর টিনামনিকে চিনতে পারলো। আর কাউকে চিনতে পারলো না।
মিত্রা একবার অনিসার দিকে তাকাল।
তুমি ব্যস্ত—
ভেতরে আয়—
শুভ আছে—
ওকে নিয়ে আয়—
তোমাদের অসুবিধা হবে না?
দেখেছিস টিনা কেমন পাকা পাকা কথা বলতে শিখেছে।
মিত্রাদি ও এখন এ্যাডাল্ট।
অনিসারা ভেতরে এলো।
মিত্রা একবার মেয়ের দিকে একবার শুভদীপের দিকে তাকাল।
শুভকে পেলি কোথায়?
উনি নাকি তোমাকে ফোন করে জেনেছেন আমি দুটোর পর আসবো, নীচে গেস্ট রুমে বসে অপেক্ষা করছিলেন।
কতক্ষণ!
তোমায় যখন ফোন করেছেলি তার মিনিট পনেরো পর থেকে কাউন্ট করো।
প্রায় ঘণ্টা দুয়েক আগে শুভ ফোন করেছিলি।
তবে বোঝ—
তুই যদি না আসতিস—
ওকে জিজ্ঞাসা করো। গবেট গোবিন্দ, গাঢ়ল। বলেছি বলে, তেজ দেখাচ্ছে।
মিত্রা মাথা নীচু করে মুচকি হাসলো।
শুভদীপ একবার অনিসার দিকে ঠাণ্ডা চোখে তাকাল।
তোর ফোন অন করা আছে। মিত্রা অনিসার দিকে তাকাল।
সরি মা। এখুনি অন করে দিচ্ছি।
বন্ধ কেন?
অনিসা হাসলো।
মিত্রা, ঘরে যারা উপস্থিত আছেন তাদের দিকে তাকিয়ে বললো, আপনারা এখন যান। আমি ডিসিসান নিয়ে আপনাদের জানাব। ফাইলগুলো রেখে যান।
সবাই আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেল। একমাত্র টিনা, মিলি বসে থাকলো।
শুভদীপ চুপ চাপ বসে আছে।
শুভকে আজ খুব গম্ভীর গম্ভীর লাগছে। মিলি হাসতে হাসতে বললো।
দিয়েছি ঝাড়। অনিসা বললো।
মিত্রা আবার হাসলো।
কেন রে! টিনা বললো।
ওর বাড়িতে আর কোনও প্যাণ্ট জামা নেই। কি একটা পরেছে দেখ। কোনও টেস্ট আছে?
মিত্রা হাসছে।
বললাম, এরকম একটা আলখাল্লা পরেছিস কেন। বললো, তাকাবি না।
এবার টিনা, মিলি দুজনেই জোড়ে হেসে উঠলো।
সেই জন্য শুভ গম্ভীর।
ওর যে কখন কি হয় বোঝা মুস্কিল। দাদুকে বলে এসেছিস?
না।
ঠাম্মাকে?
বলেছি।
এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসবি এই তো।
শুভ চুপ করে রইলো।
মিত্রা মেয়ের শাসন দেখছে। মনে মনে হাসছে। কি জোড় ছেলেটার ওপর। ও চুপচাপ মেয়ের ধমক খেয়ে যাচ্ছে। ওর যতো হম্বিতম্বি শুভর ওপর।
আবার শুভ যখন গুম হয়ে যায় তখন অনিসা কি তেল মারে।
বেশ মজা লাগে মিত্রার।
শেষের আট দশ দিন মিত্রা লক্ষ্য করেছে শুভ খুব ঘনঘন ওদের বাড়িতে আসছে। কমপিউটার নিয়ে দুজনে বসে কি সব যেন করে। তারপর চলে যায়।
ছোটোমাকে ও ব্যাপারটা বলেছিল।
ছোটোমা বললো। থাক, মাঠে ঘাটে তো যাচ্ছে না। বাড়িতেই থাকে। তুই বুঁচকিকে কিছু বলিস না।
মিত্রা চুপ করে গেছে।
কি খাবি? মিত্রা মেয়ের দিকে তাকাল।
আমার পেট ভড়া। তুই খেয়ে বেরিয়েছিস? অনিসা শুভর দিকে তাকাল।
শুভ মাথা দোলাল।
কিভাবে মাথা দোলাল দেখলে—অনিসা মার দিকে তাকাল।
ও নির্ঘাৎ খেয়ে আসেনি।
কি করে বুঝলি।
মথাটা কেমন দ-র মতো দোলাল দেখলে না। হ্যাঁ নার ঠিক মাঝা মাঝি।
মিত্রা হাসছে।
দাদাই-এর ঘরে কে আছে?
অনিসা মার দিকে তাকাল।
দাদাই আছে।
দাদাই এসেছে?
হ্যাঁ।
আমাকে একটা বসার জায়গা দাও।
এতো জায়গা আছে তোর বসার জায়গা নেই।
দূর।
মিলির ঘরে চলে যা।
মিলি মনি এখুনি আবার যাবে।
মিলির যেতে দেরি আছে।
তাহলে তুমি দুটো চিকেন প্যাটিস আর কোল্ড ড্রিংকস পাঠিয়ে দাও।
এই যে বললি পেট ভড়া আছে।
ও খাবে আমি চেয়ে চেয়ে দেখব নাকি।
মিত্রা হাসছে।
অনিসা উঠে দাঁড়াল।
চল।
শুভদীপ উঠে দাঁড়াল। দুজনের হাইটই সমান। উনিশ-বিশ। মিত্রার বুকটা হঠাৎ যন্ত্রণায় মোচর দিয়ে উঠলো। ইস যদি বুবুন থাকতো।
অনিসা মার ঘর থকে বেরিয়ে শুভর দিকে তাকাল।
দাদুকে একটা ফোন কর।
ফোন করে বলে দিয়েছি।
এখানে এসেছিস বলেছিস।
না।
কেন।
সবাইকে সব কিছু জানাতে নেই।
পেকো রাম। লিফ্টে যাবি, না হেঁটে উঠবি—
হেঁটে—
দুজনে সিঁড়ি ভাঙা শুরু করে দিল।
কখন বেরিয়েছিস—
সাড়ে দশটা—
কোথায় ছিলি এতক্ষণ—
তুই যে কাজগুলো দিয়েছিলি সেগুলো করছিলাম—
নেগেটিভ না পসিটিভ—
কয়েকটা নেগেটিভ আছে—
আমিও আজ গেছিলাম—
কি পেলি—
যা বুঝলাম সবাই বাবাকে কম বেশি ধ্বসে। কেউ মুখ খুললো না।
একটা কেলো হয়েছে—
কি!
কয়েকদিন ধরে আমার পার্সোনাল ই-মেল আইডিটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিল কেউ যেন হ্যাক করেছে। আজ দেখি আবার আছে। ভাবলাম কেউ হয়তো ঘাঁটা ঘাঁটি করেছে। দেখলাম, না সব ঠিক আছে।
ওই আইডিটা আর ইউজ করিস না। একটা নতুন বানিয়ে নে।
বানিয়েছি। আবার সকলকে মেল করে জানাতে হবে।
শিঁড়ি দিয়ে ওঠার মুখে কেউ চোখাচুখি হলে অনিসার দিকে তাকিয়ে হাসছে। কেউ আবার বলছে গুড আফটারনুন ম্যাডাম।
অনিসাও মাথা দুলিয়ে সম্বোধনের প্রত্যুত্তর দিচ্ছে।
অনিসারা ওপরে চলে এলো। মিলি মনির ঘরে ঢুকে কাঁধ থেকে ল্যাপটপটা নামিয়ে রাখলো। মিলি মনির ঘরটা একেবারে নিউজ রুমের গায়ে। এখান থেকে নিউজরুমের সমস্ত অংশই দেখা যায়। নিউজরুমটা এখন বেশ ফাঁকা ফাঁকা। দাদাইকে টেবিলে দেখতে পেল না। হয়তো দুদুনের ঘরে গেছে।
মিলি মনির টেবিলে রাখা ইনটারকম ফোনটা তুলে নিয়ে দুদুনকে বলে দিল আমি মিলি মনির ঘরে আছি। তোমার কাছে পরে যাচ্ছি। দুদুন বললো, তোর মা জানিয়েছে।
অনিসা ফোনটা রেখে দিল।
দুজনে চেয়ারে বসলো।
বল তোর আপডেট।
শিয়ালদহ, পিলখানা, ভাসিলাভেড়ি তিন জায়গাতেই গেলাম। নাম শুনে সবাই কেমন সন্দেহের চোখে দ্যাখে। একজন তো আমাকে এমন এক জায়গায় টেনে নিয়ে গেল, কলকাতায় যে ওই রকম একটা জায়গা থাকতে পারে তা কল্পনাই করতে পারি না।
কোথায়?
পিলখানায়।
অনিসা শুভর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে।
সে কি জেরা রে। প্যান্ট প্রায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল।
অনিসা ঠোঁট টিপে হাসলো।
এক একটার খোমা দেখলে তোর দিমাক খারাপ হয়ে যাবে।
সঙ্গে সঙ্গে নিজের পরিচয় দিলি।
পরিচয় দিইনি। বললাম উনি আমার আঙ্কেল। জন্ম থেকে আঙ্কেলকে দেখিনি। তাই দেখার খুব ইচ্ছে।
কি বললো?
আমার নাম বাড়ির ঠিকানা চাইলো, বললাম। কিছুতেই বিশ্বাস করে না।
তারপর?
আন্টির নাম বলতে ছারলো।
শুভ চুপ করে গেল। অনিসা শুভর মুখের দিকে তাকিয়ে।
আর কিছু বলেনি?
বুঝলি অনিসা আঙ্কেলের দম আছে। আজ সতেরো বছর কলকাতায় নেই। সেরকম মনেই হচ্ছে না। আমার মন বলছে আঙ্কেল মাঝে মাঝে কলকাতায় আসে।
কি করে বুঝলি!
ওদের কথা-বার্তায়।
আমারও কেমন যেন মনে হচ্ছে। শেষ যে দিন প্রিন্সিপ্যাল আন্টির কাছে গেছিলাম। আন্টি বললো, মন খারাপ কোরো না। তোমার বাবা কোনওদিন খারাপ কাজ করেনি। ঈশ্বর তার কোনওদিন ক্ষতি করবেন না।
কথাটা শোনার পর বার বার ভেবেছি। প্রিন্সিপ্যাল আন্টি হঠাৎ কেন ওই কথা বললেন।
কোনও উত্তর পাইনি।
একটু ভাব উত্তর পেয়ে যাবি।
আজ ইকবালদাদাই হঠাৎ একটা কথা বললো, তুই তোর বাবাকে কোনও দিন দেখিসনি। আজ যদি তোর বাবা তোর সামনে এসে দাঁড়ায়, চিনতে পারবি।
একবারে ঠিক কথা।
তখন থেকে আমি এই কথাটা ভেবে যাচ্ছি। ইকবালদাদাই কেন এই কথা বললো।
একটা কাজ করলে হয় না—
বল।
আঙ্কেলের ওই সময়কার কোনও ছবি তোর কাছে আছে?
আছে।
চল একজন আর্টিস্ট খুঁজে বার করি।
আবার আঁতলামো শুরু করে দিলি।
কথাটা শোন না—
বল।
তাকে একটা প্রপোজাল দিই—
কি!
এই ছবিটা দেখে এই মানুষটা আঠারো বছর পর কেমন দেখতে হবে ড্র করে দিন।
ছাগল।
কেন ও কথা বললি।
ভেবে দেখ। পাগলাম করার আর জায়গা পেলি না। আঁতেল কোথাকার।
ডায়নোসারের জীবাশ্ম আবিষ্কার হওয়ার পর যদি ডাইনোসার দেখতে কেমন ছিল তা জানতে পারি, এটা হবে না কেন।
অনিসা একবার শুভর দিকে তাকাল। শুভর চোখ দুটো চক চক করছে।
এই তো তোর মাথার গোবরগুলো আস্তে আস্তে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।
মাঝে মাঝে আমার কথা শুনবি উপকার পাবি, নিজেক সবজানতা হরিদাস পাল ভাববি না।
দেব পিঠে একটা গুম করে, বুঝবি।
আমার কথা পছন্দ না হলে তুই এই ব্যাপারটা করেই থাকিস। একচুয়েলি আমার আবার তোর মতো এতোটা ইনটেলেক্ট নেই।
এই তো, সেন্টু ঝাড়তে শুরু করলি।
অনন্য কোথায়?
ও এখন পুরোপুরি মার সঙ্গে কাজকর্মে মনোযোগ দিয়েছে। ব্যবসায়ী হওয়ার চেষ্টা করছে। মা আস্তে আস্তে ওকে সব বোঝাচ্ছে।
তুই?
বাবাকে খুঁজে বার করার চেষ্টা করছি।
স্ক্যানগুলো সব পড়া হয়ে গেছে?
না। আজ আবার রাতে শুরু করবো।
আমাকে পেন ড্রাইভে কপি করে দে।
আজ না পর্শুদিন দেব।
একজন বেয়ারা খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকলো। অনিসা যা বলেছিল মা ঠিক তাই পাঠিয়েছে। খাবারের প্লেটটা টেবিলের ওপর রেখে ভদ্রলোক বেরিয়ে গেল।
নে খেয়ে নে। একবার লাইব্রেরী যাব।
কেন!
বাবার পুরনো লেখাগুলো একবার দেখব। যদি কিছু মেটেরিয়াল পাওয়া যায়।
এটা একটা ভালো সাজেসন।
আর একটা নাম পেলাম মায়ের ডাইরী পড়তে পড়তে।
কি?
মিঃ টোডি।
নমটা খুব শোনা শোনা মনে হচ্ছে—
কি করে!
দাঁড়া একটু মনে করতে দে।
বাবা যে এ্যাকসিডেন্টে মারা যায়নি, এটা আমি কাল মার ডাইরী পড়ে বুঝতে পেরেছি।
এই ব্যাপারটা তোকে ঢের আগে বলেছিলাম।
তুই কিসের ওপর ভিত্তি করে বলেছিলি?
পারিপার্শিক আবহাওয়া।
কিরকম!
প্রথমতঃ আঙ্কেলের কোনও পারলৌকিক কাজ হয়নি।
হ্যাঁ। সেটা ডাক্তারদাদাই আমাকে ব্যাখ্যা করেছে, কেন।
শোন ব্যাখ্যাটা যার যার ব্যক্তিগত। আমরা সমাজবদ্ধ জীব সমাজের কিছু আইন কানুন আমাদের মেনে চলতে হয়।
বাবাঃ তুই তো আজ হেবি পড়াশুন করেছিস মনে হচ্ছে—
যা তোকে বাকিটা শুনতে হবে না।
ওমনি তোর রাগ হয়ে গেল।
ইনটারাপ করছিস কেন।
ঠিক আছে আর করবো না। এবার বল।
দ্বিতীয়তঃ…. একটু থেমে, মনে কিছু করবি না।
কি এমন বলবি যে মনে করতে হবে।
যেটা বলবো সেটা বাঙালী মেয়েদের কাছে খুব সেন্সেটিভ।
বল শুনি।
আন্টি এখনও সিঁথিতে সিঁদুর দেয়। বাঙালী বিধবারা এটা করে না। সাতবছর পর্যন্ত স্বামী ফিরে না এলে তাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। আঙ্কেল সেভেন্টিন ইয়ার্স রানিং।
মাকে তো কিছু বলতে পারি না, একদিন এই ব্যাপারটা নিয়ে দিদানকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তা দিদান বললো তোমাকে এই বিষয় নিয়ে পাকামো করতে হবে না।
তারপর থেকে তুই একবারে চেপে গেলি।
হ্যাঁ।
এবার বুঝলি।
টোডির নামটা তোকে বললাম।
হ্যাঁ।
বাবা তার পেছনে ধাওয়া করে মিডিলইস্টে গেছে। তারপর আর ফিরে আসেনি।
তোকে তো বললাম নামটা আমার কাছে পরিচিত। দাদুর মুখে নামটা শুনেছি।
দাদুর কাছ থেকে!
হ্যাঁ।
কি বললো দাদু?
দাদুর কাছে কয়েকদিন আগে বাবা-মার মৃত্যুর কারণ জানতে চেয়েছিলাম। তখন আমার বছর খানেক বয়স। আমারও খুব ইন্টারেস্টিং লাগে পার্টটা। দাদু কথা প্রসঙ্গে টোডির নাম করলো। বললাম ভদ্রলোক কোথায় আছেন এখন। দাদু বললেন মিডিলইস্টে। তারপর দাদু প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেল। জানিস আমার জন্ম দুবাইতে।
ভারি ইন্টারেস্টিং।
দাদুর কাছে অনেক মাল আছে বুঝলি।
কি করে বুঝছিস?
দাদু এক্স আর্মির লোক। তাছাড়া ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্সিতে খুব বড়ো পোস্টে ছিলেন।
তাহলে তো থাকবেই। বার করার চেষ্টা কর।
কিছুতেই বার করতে পারছি না। বহু চেষ্টা করেছি। মাল সব সিন্দুকে। সিন্দুকটা এমনভাবে আগলে রাখে…।
এখন চেপে যা। আগে এদিকটা একটু গোছাই। তারপর দেখছি।
আবিদ আঙ্কেল কি বললো?
পিছলে পিছলে বেরিয়ে যাচ্ছে।
কিরে এখনও খাওয়া হয়নি, কি গুজুর গুজুর ফুসুর ফুসুর করছিস দুজনে।
মিলি ঘরে ঢুকলো।
তুমি এখন কাজ করবে তো?
হ্যাঁ।
ভালো, আমরা একটু লাইব্রেরীতে যাব। তোমার এখানে আমার ল্যাপটপটা থাকলো।
রেখে যা।
কথা বলতে বলতে মিলি গিয়ে নিজের চেয়ারে বসলো।
আচ্ছা মনি, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো।
বল।
বাবার সঙ্গে তোমার পরিচয় কবে হয়।
কেন, আবার বাবাকে নিয়ে পরেছিস নাকি?
বড়ো হয়েছি, বড্ড জানতে ইচ্ছে করছে।
তাহলে তুই বড়ো হয়েছিস বলছিস।
কেন তোমার কি মনে হয় আমি ছোটো আছি?
এই তো সেদিন জন্মালি।
কামিং মান্থ এইট্টিন কমপ্লিট করবো।
ওরে বাবা তাহলে তুই এ্যাডাল্ট।
বলো না?
কি বলবো।
তোমার সঙ্গে বাবার কবে পরিচয় হয়?
কলেজে।
তারপর তোমাদের সঙ্গে বাবার যোগাযোগ ছিল না।
হুঁ।
তারপর কিভাবে তোমাদের সঙ্গে বাবার রিলেসনটা এতটা ডিপ হলো?
মিলি একবার অনিসার দিকে তাকাল। কি বলতে চায় মেয়েটা। ও খুব সহজ সরল ভাবে মিলিকে প্রশ্ন করছে। কিন্তু এর মধ্যেও কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করছে।
পরে বলবো। এখন মেলা বকাস না, অনেক কাজ।
এই তুমি ঘুঁটি বসিয়ে দিলে, আর বলবে না বুঝেছি।
তুই জেনে কি করবি?
তুমি যদি আমার জায়গায় থাকতে, আমি যদি তোমাকে প্রশ্ন করতাম কি উত্তর দিতে।
দাঁড়া মিত্রাদিকে ফোন করছি। তুই বড্ড পাকা পাকা কথা বলতে শিখেছিস।
বলোনা, মাকে আমি সব বলেছি।
মিলি চুপ করে গেল।
জানো মনি কাল রাতে মা কাঁদছিল।
কে বললো তোকে?
আমি মায়ের কান্নার আওয়াজ পেয়েছি।
মিলি গম্ভীর হয়ে গেল।
কোথায় যাবি বলছিলি।
তারমানে তুমি বলবে না।
একটু অপেক্ষা কর সব জানতে পারবি।
বুঝেছি যাও, তোমাকে বলতে হবে না। নিজের কাজ নিজে করে নেব।
(আবার আগামীকাল)