জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১১৮ নং কিস্তি
চিঠির সঙ্গে আলুর দমের সম্পর্ক কি? বৌদি হাসছে।
আছে, বুঝবে না।
আমার সামান্য অসতর্ক মুহূর্ত মিত্রা আমার হাত থেকে চিঠিটা ছিনিয়ে নিল।
নিজে দেখে বৌদির হাতে দিল। আমার দিকে ফিরে তাকাল। হাসলো।
তুই এত সাসপেন্সে রাখিস না। এখুনি বুকটা ধক করে উঠেছিল। মিত্রা বললো।
বৌদির চিঠিতে চোখ বোলান হয়ে গেছে, দাঁতমুখ খিঁচিয়ে আমাকে তেড়ে এলো।
আরে করো কি? অনিমেষদা চেঁচিয়ে উঠলো।
বৌদি চিবিয়ে চিবিয়ে বললো, তোর কাছে সুরোই ঠিক।
মেয়ে জোড়ে হেসে উঠলো।
আলুরদম দিয়ে কি হবে রে, আলুরদম খাওয়াবি। বৌদির গলায় স্নেহের ঝাঁজ।
সকালবেলা তোমরা যে যরকম মেনু করেছিলে অবিকৃত রাখ। ব্যাটা কিন্তু পঁটা বামুন, মাছ খায় না। তবে তরকারিতে পিঁয়াজটা নিরামিষ হিসাবে ট্রিট করে।
কে আসবে গো সুতপা! অনিমেষদার চোখে বিষ্ময়।
বৌদি চিঠিটা এগিয়ে দিল অনিমেষদার হাতে। মুখে দুষ্টুমির হাসি।
অনিমেষদা কি লেখা আছে সেটা দেখলো না। শুধু প্যাডের ওপরে নামটা কি লেখা আছে সেটা দেখল, আর নিচের সইটা দেখল। পাশ থেকে বিধানদা উঁকি মেরে জোড়ে হেসে উঠলো।
দুজনেই আমার দিকে তাকাল। চোখে মুখে বিষ্ময়ের হাসি।
তুই বড়ো তেঁয়েটে মার্কা ছেলে। অনিমেষদা চিবিয়ে চিবিয়ে বললো।
প্রবীরদাদের দিকে তাকাল।
রাঘবন আসছেন—
এ্যাঁ—
এ্যাঁ না হ্যাঁ—
বিধানদা, অনিমেষদার মুখের দিকে তাকাল।
একবার ভাবুন ব্যাপারটা—
তুমি ভাব, আমার ভাবা হয়ে গেছে।
কি বড়দি, আপনার ছেলের কীর্তিকলাপ কিছু বুঝছেন।
রাঘবনটা আবার কে গো অনিমেষ? নতুন শুনছি।
মাথায় গোবড় পোরা, নাম শোন নি? উনি ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিব। ডাক্তারদাদা বলে উঠলো।
থামো ডাক্তার সব জানতে হবে তার কি কথা আছে।
দাদা হাসছে। সহজ সরল হাসি।
অনি যে সুতপাকে আলুরদমের কথা বললো!
উনি এখানে এসে সকলের সঙ্গে রাতের খাবার খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। অনিমেষদা বললো।
এই কথা ওর চিঠিতে লেখা আছে?
বড়োমা, ছোটোমাকে ঠেলা মারল।
ছোটো ওর কানটা মুলে দে, এ্যাক্টো করছে আমাদের সঙ্গে।
যাও না যাও তোমার আদরের সুপুত্তুর।
ছোটোমা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
অনি ওকে আলুরদম খাওয়াবে—
কেন তুমি ইডলি ধোসা তৈরি করবে। আমি বললাম।
তুই কি সকলকে তোর মতো মনে করিস।
আমি ওকে ওর বাড়িতেই পান্তা তৈরি করে খাইয়েছি।
এবার সকলে জোরে হেসে উঠলো।
তোর সঙ্গে শ্যামেদের কোনও পার্থক্য নেই, কথাবার্তা শুনে মনেহচ্ছে ইঁদুর-টিদুঁরও খেয়েছিস। বৌদি হাসতে হাসতে বললো।
ইসি হাসতে হাসতেই ওয়াক করে উঠলো।
আ মোলো, তুই আবার ওয়াক তুলিস কেন। বড়োমা বললো।
বৌদি বললো কেন।
তুই দেখতে গেছিস।
ছোটোরে, মান্যিগন্যি মানুষ বলে কথা। এই রাতে কি করি বল।
ওকে জিজ্ঞাসা করো।
ও তো সুতপাকে আলুরদমের কথা বললো, এরপর বলবে গরমভাতে জল ঢেলে দাও।
এবার ডাক্তারদাদা, দাদা দুজনেই হাসলো।
জলঢালা ভাত গরম সিঙ্গারা দিয়ে কখনও খেয়েছো, আমার কথাটা মনে করে একবার খেয়ে দেখো। দিল খুশ হয়ে যাবে।
মেয়ে হাসতে হাসতে মায়ের কোলে ঢলে পরছে। অনন্যও হাসি চেপে রাখতে পারছে না।
শুনলি ওর কথা। বড়োমা, ছোটোমা বৌদির দিকে তাকাল।
আমি দাদার দিকে তাকিয়ে, দাদার এই অমলিন হাসিটা বহুদিন পরে দেখলাম।
সকাল থেকে বুকের ভেতর যে যন্ত্রণা করছিল, কিছুটা উপশম হলো। ভীষণ ভালো লাগলো।
ও অনি বল না, তুই লোকটাকে দেখেছিস। বড়োমা আমার দিকে তাকিয়ে।
পঁটা বামুন বললাম না। নিরামিষ ছাড়া কিছু খায় না। অফিসে বাড়ির তৈরি খাবর ছাড়া কিছুই নিয়ে আসে না। এবার তোমরা যা ভালো বোঝ করো।
ও ছোট চল, সুতপা চলো। দামিনী কোথায় গেল বলোতো?
মাসি রান্নাঘরে। ইসি বললো।
বড়োমা আমার দিকে তাকাল। পরিতৃপ্ত মুখ।
চা খাবি?
একটু কফি খাওয়াবে।
বড়োমা হেসে ফেললো।
তোর মুখে নতুন কথা শুনলাম।
আরও শুনবে দিদি। অনুপদা চেঁচিয়ে উঠলো।
তুমি কজনের খাবার এনেছো? অনুপদার দিকে তাকালাম।
আমাদের ঘরের যে কজন আছে।
তোকে ভবতে হবে না। আমি রতনকে পাঠিয়ে দিয়েছি। ইসলামভাই বললো।
আমি ইসলামভাইয়ের দিকে তাকালাম।
এই ভদ্রলোক তোর দুপুরের গেস্ট?
হাসলাম।
তুমি জানতে! অনিমেষদা বললো।
দুপুরে খাওয়ার আগে ও বললো, আজ বিশেষ কাজ রেখ না, আমার একজন গেস্ট আসবে, তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব।
তুমি একবারও বলো নি!
কি করে জানবো, এই গেস্ট যে সেই গেস্ট। তাছাড়া আমার থেকে আপনারা খবরটা ভালো জানবেন, সকাল থেকে ওই চত্বরে আছেন।
আমরা জানি উনি কাল দুপুরের দিকে আসছেন, আমরা সেই ভাবেই ওনার পিএ-র কাছ থেকে বিকেলে এ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছি।
অনিমেষদা, প্রবীরদার দিকে তাকাল।
প্রবীর, তুমি অনুপ অফিসে গিয়ে ফাইলগুলো ঝপ করে নিয়ে এসো। আমার মন বলছে আজ রাতটা এখানেই কাটাবেন ভদ্রলোক।
অনিমেষদা আমার দিকে তাকাল।
কিরে ঠিক বলছি না ভুল বলছি।
যা বাবা, আমি কি ওনার সিডুল দেখেছি।
তোকে যে ভদ্রলোক চিঠি দিয়ে রাতে সবার সঙ্গে খাবার কথা বলে, তার সিডুল তুই জানবি না, এটা কেমন কথা?
সব কিছু এরকম ধরা-ধরি করে নাও কেন বলো তো?
অনিমেষদা হাসছে।
কনিষ্ক, নীরুর চোখে মুখে একরাশ বিষ্ময়ের ছোঁয়া।
মিলি আছে?
কনিষ্কর ঘোর কাটল। মনেহয় ও ঘরে আছে।
একবার ডাক না।
তুমি বসো কনিষ্কদা আমি মিলিদিকে ডেকে আনছি।
অর্ক কথাটা বলেই তীরবেগে বেরিয়ে গেল।
প্রবীরদা, অনুপদা উঠে দাঁড়াল। অনিমেষদার দিকে তাকাল।
আমরা চট করে ঘুরে আসি।
সব গুছিয়ে নিয়ে আসবে, সুযোগ পেলে এখানেই আলোচনা সেরে নেব।
এবার বুঝছো কারা সুবিধাবাদী। তুমি না আমি?
অনিমেষদা আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
ডাক্তারদাদা হাসছে।
ইকবালভাই।
বল।
তোমার ওখানের বরফি গোটা কয়েক আনতে দাও না।
তুই ও সব নিয়ে ভাবিস না। অতিথিকে আমরা আপ্যায়ণ করতে জানি।
মিলি হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢুকলো।
কি বলছো বলো।
ওরকম হাঁপাচ্ছ কেন! কনিষ্ক এখানে বসে—
এইজন্য ডেকেছো—হাসছে।
মেয়ে কোথায়?
তুমি আর জালিও না। সবে খাইয়ে দাইয়ে ঘুম পারিয়েছি।
কটা বাজে এর মধ্যে ঘুম পারিয়ে দিলে।
তোমার ঘরিতে পাঁচটা বাজে। আমাদের ঘরিতে সাড়েনটা বেজে গেছে।
এতো রাত হয়ে গেছে!
বলো কি বলছো, অনেক কাজ।
একবার টিনা, দেবাশিসদের আসতে বলে দাও।
বলা হয়ে গেছে। বরুণদা ফোন করেছিল, ইসিদি বলে দিয়েছে পিকুকে সঙ্গে নিয়ে চলে আসতে। বিতান বসিরহাট গেছে। আসতে পারেব না। কাল এসে তোমার মাথা ভাঙবে বলেছে। আর—
অনিমেষদা, বিধানদা হাসছে।
তুমি সব ভাঙা রেকর্ডের মতো বাজালে।
ও হ্যাঁ। সুরো, অংশুকে বলেছে চলে আসতে। বিশিষ্ট ব্যক্তি আসছেন শুনে অনিমেষদার বেয়ান মশাই বায়না ধরেছেন আসবেন বলে। উনিও আসছেন।
অচিন্তবাবু আসছেন? অনিমেষদা বললো।
মিলি হাসছে।
থাক না অনিমেষ, আসতে দাও। দাদা বললো।
ডাক্তারবাবু মনে হয় চেয়ারে সট পরবে।
আমার বাড়ি থেকে আনতে বলছো।
অনিমেষদা হাসছে।
ইসলামভাই আর একটা কাজ করবে। আমি বললাম।
বল।
আমাদের খাবার টেবিলে ছ-জন বসে ডাক্তারদাদার টেবিলটা তুলে নিয়ে এসো।
তা নিয়ে আসা যেতে পারে।
তবে ওনার নিচে বসে খাবার অভ্যাস আছে। তোমাদের যদি কোনও আপত্তি না থাকে।
তুই কি গল্প শোনাচ্ছিস।
গল্প নয় যা বললাম তাই। খুব ধর্মভীরু মানুষ। বাড়িতে কাঠের তৈরি পিঁড়ে আছে। তাতে বসেই খান। বাড়িতে বেশির ভাগ সময় খরম পরেন। তাতে নাকি ব্লাডপ্রেসার ঠিক থাকে। তামিল ব্রাহ্মণ, জানই তো একটু গোঁড়া প্রকৃতির।
তাহলে একসঙ্গে খাবে কি করে।
একসঙ্গে খেতে আপত্তি নেই। ধারে কাছে আমার ব্লাড রিলেটেড লোক থাকলেই হলো। তারা সবাই ব্রাহ্মণ।
অনিমেষদা হাসছে, এত সব!
বিদেশে গেলে কি করেন? ডাক্তারদাদা বললো।
সে এক হাস্যকর ব্যাপার। ড্রাইফুড সঙ্গে থাকে।
তারমানে চিঁড়ে-গুড় বেঁধে নিয়ে যান।
তাইই বলতে পারো। ভীষণ ফল খেতে ভালোবাসেন। তারপর সাউথ ইণ্ডিয়ান খাবার বিশ্বের সর্বত্র পাওয়া যায়।
টিনা, অদিতি ঘরে ঢুকলো, হাতে ট্রে। মিত্রা, অনিসা উঠে এগিয়ে গেল।
দু-জনেই আমাকে দেখে হাসলো। কেমন আছো।
ভালো আছি। তারপর ডাক্তারবাবুরা যা বলেন। টিনার দিকে তাকালাম।
টিনা, অদিতি মুখ টিপে হাসছে।
অনিমেষদা, অনিদা আগের থেকে একটু রোগা হয়ে গেছে, তাই না। অদিতি বললো।
কবে মোটা ছিল বল। সারাটা জীবন ওকে পাটকাঠির মতো প্যাকাটি দেখলাম।
একবারে ও কথা বলবে না। মিত্রা গড়গড়িয়ে উঠলো।
পাটকাঠিকে প্যাকাটি বলবো না!
না এখন তবু আগের থেকে একটু মোটা হয়েছে।
তোর চোখে, আমাদের চোখে নয়। বিধানদা বললো।
মিত্রা হাসছে।
দাদা, অদিতির দিকে তাকিয়ে।
বড়োমা বললো হাফ কাপ খেতে। একটু পরে খেতে দেবে।
দাদা হাসছে।
তিনজনে কফি তৈরি করছে অনিসা এগিয়ে এগিয়ে সকলকে দিচ্ছে।
দেবা আর বটা আসে নি? আমি বললাম।
মল্লিকদা কোথায় পাঠাল। টিনা বললো।
বাচ্চাগুলোকে নিয়ে আসোনি?
সব ওপরে, অনিসার ঘরে চলে গেছে।
পুঁচকে দুটো কোথায় শুয়েছে?
বড়োমার খাটে।
নীরু একটু শ্রীপর্ণাকে ফোন করে দে।
করেছিলাম। বললো রাতের আরএমও চলে এলেই ও অনিকেত আসবে।
একজন ভদ্রলোক হাতজোড় করে ঘরে ঢুকলেন। ঠিক চিনতে পারলাম না।
অনিমেষদা উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেলেন। উনি এসে ডাক্তারদাদা, দাদাকে প্রণাম করলেন। বিধানদা, রূপায়ণদার দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে নমস্কার করলেন।
দিদি ভালো আছেন? বড়োমার দিকে তাকাল।
অনি না এলে তোমার এ বাড়িতে পা পরে না।
এই দেখুন। ঠিক আছে পরে আপনার কথার জবাব দিচ্ছি। সাহেবকে একটু চোখের দেখা দেখি।
ভদ্রলোক আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। চিন্তে পারছি না।
এবার ধরতে পারলাম এ নিশ্চই সুরোর শ্বশুরমশাই অচিন্তবাবু হবেন। আমি উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করলাম। একজন গুরুজনকে প্রণাম করলে সবাইকে প্রণাম করতে হবে। তাই করলাম। আমার দেখাদেখি অনিসা, অনন্য, মিত্রাও করলো।
ইনিই হচ্ছেন শ্রীমান অনি। অনিমেষদা বললেন।
উনি আমার গালে হাত দিলেন। তোমার অনেক গল্প শুনেছি বাবা, দেখার সৌভাগ্য হয় নি।
কেন আজ টিভিতে দেখেন নি? রূপায়ণদা বললো।
সবে বাড়িতে ঢুকেছি। অংশু দেখি জামাকাপড় পড়ে রেডি হচ্ছে। বললাম এত রাতে কোথায় যাবি? সংক্ষেপে বললো, কোনওপ্রকারে জামাকাপড়টা বদল করে চলে এসেছি।
অনিসা মা। অনিমেষদা ডাকলো।
বলো।
যা তো মা সুরোপিসীকে একটু মিষ্টি দিতে বল দাদাইকে।
ব্যস্ত হবেন না। এই তো কফির গন্ধ পাচ্ছি। অচিন্তবাবু বললেন।
এখানে নিয়ে আসবো?
নিয়ে আয়।
অনিসা বেরিয়ে গেল।
বাইরে হুটারের আওয়াজ পেলাম। সবাই কেমন যেন একটু নড়ে চড়ে উঠলো।
অনিমেষদা আমার দিকে তাকাল।
হাসলাম।
তুমি, ডাক্তারদাদা, বিধানদা, অনিসা, মিত্রা, অনন্য রিসেপসন করো।
গেস্ট কার তোর না আমাদের?
রিপ্রেজেন্টেটিভ যাচ্ছে।
তুই গিয়ে নিয়ে আয়। বৌদি তাড়ালাগাল।
বড়োমা, ছোটোমা হাসছে।
কফিটা সবে মাত্র হাফ খাওয়া হয়েছে। কাপটা টেবিলে নামিয়ে রাখলাম। উঠে দাঁড়ালাম।
এই ঘরে বসাবে না ওই ঘরে।
বড়োমার দিকে তাকালাম।
এই ঘরে। ও ঘরে বসালে কাজ কর্ম শিকেয় উঠবে।
বাইরে বেরিয়ে এলাম। বারান্দায় বেরতেই দেখলাম গেটের মুখে ভিড়। জগাই বাইরের গেট হাট করে খুলে দিয়েছে। একটা গাড়িই ভেতরে আসছে। অন্যান্য গাড়ি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে পরেছে। সাদা বড়োগাড়ি। আমি বাগানে নেমে এলাম। ওরা আমার পেছন পেছন এলো। তিন চারজন কালো কোর্ট পরা অফিসার গেট পেরিয়ে গাড়ির কাছে ছুটত ছুটতে এগিয়ে গেল। গাড়ি দাঁড়াতেই একজন গেটটা খুলে দিল।
রাঘবন গাড়ি থেকে নেমে এলো। পরনে সাদাধুতি লুঙ্গির মতো করে পরা। একটা সাদা সার্ট। ওদের জাতীয় পোষাক।
অনেকদিন পর দেখছি। আগে বেশ গোল গাল ছিল। এখনও সেরকম আছে। থলথলে চেহারা।
নেমেই আমাকে কাছে দেখে জড়িয়ে ধরলো।
আমি ওর বুকের সঙ্গে মিশে গেছি।
তোকে কতদিন পর দেখলাম।
এখানটা একটু অন্ধকার অন্ধকার। বারান্দার আলো যতটা এসে পরেছে। বাগানের লাইটটা ততটা জোড় নয়।
রাঘবনের মুখের দিকে তাকালাম।
কাল তোর শরীর খারাপ হয়েছিল শুনলাম। কেমন আছিস?
তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
মিত্রাকে দেখা।
অন্ধকারে দেখবে না আলোতে।
রাঘবন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলো।
আমার হাত ধরে বাগানের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দুজনে বারান্দায় উঠলাম। সামনে পেছনে কালোকোর্টের সেই সব ভদ্রলোক।
রাঘবন একজনকে ডেকে নীচুস্বরে কি সব বললো। আমরা বারান্দায় ওঠার পর ওরা চলে গেল।
সবাই আমাদের পেছন পেছন আসছে।
তোকে দেখে খুব ভালো লাগছে।
আমি ভাবলাম তুমি আসবে না।
তুই তো কাজ বাড়িয়ে দিলি। যার জন্য আজই আসতে বাধ্য হলাম। আমার জন্য ফ্লাইটটা দেরি করলো। তারপর রাজভবনে থাকার এ্যারেঞ্জমেন্ট ছিল। ভাবলাম একা থেকে কি করবো। সুযোগ যখন পাওয়া গেছে। রাতটা তোর কাছেই থাকবো।
আমার এখানে শোবার জায়গা কোথায়?
তোর বৌকে অন্য ঘরে পাঠিয়ে দেব। তুই আমি শোব।
ওরা সবাই আমাদের কথা শুনে হাসছে।
দেখো তোমার কথা শুনে সবাই হাসছে। ভাবতেই পারছে না তুমি এইরকম একটা পোস্ট হোল্ড করে রয়েছো।
ওটা অফিসে, বাড়িতে না। আমিও একজন ভালো বন্ধু, ভালো স্বামী, ভালো বাবা হওয়ার যোগ্য ব্যক্তি। তুই তো বলেছিস।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে। সকলে আমাদের দেখছে।
প্রথমে আমি দাদা, বড়োমা, ছোটোমার সঙ্গে আলাপ করবো, তারপর তোর মেয়ে, বৌ, ছেলে। তারপর সবার সঙ্গে।
কেন?
তোর মুখ থেকে ওঁদের গল্প শুনেছি। একটা ছবি মনে মনে এঁকেছি। দেখি মেলে কিনা।
মিলবে না।
কেন?
স্বপ্ন আর বাস্তব এক নয়। তোমায় যখন ওদের গল্প বলেছিলাম, তখন সব স্বপ্নছিল। এখন বাস্তব।
আমি রাঘবনকে আমার ঘরে নিয়ে এলাম।
দেখলাম এরই মধ্যে ঘরের চেহারা বদলে গেছে।
দাদা একা ঘরে একটা সোফায় বসে আছে। আমাকে দেখে উঠতে গেল। একটু টাল খেয়েছে। আমি ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম।
কেন একা উঠতে যাচ্ছিলে?
পারবো।
আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। শিশু সুলভ হাসি সারা মুখটাতে মাখা মাখি।
মিঃ রাঘবন এসেছেন। তোমার সঙ্গে আলাপ করবেন।
দাদা, আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে। দাদার মুখ দেখে বুঝতে পারছি। বুকের ভেতরটা ভীষণ যন্ত্রণা করছে।
আমি বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে দাদাকে উঠিয়ে দাঁড় করালম। হাতে লাঠিটা দিলাম। অনন্য এগিয়ে এসেছে। দাদুকে ধরলো।
রাঘবন এসেছেন।
ভিড়ের মধ্যে চোখ চলে গেল।
রাঘবন এগিয়ে এসেছে।
নাও দাদাকে দেখ। স্ট্রোকে পঙ্গু। সাহায্য ছাড়া একপাও নরতে চরতে পারে না।
রাঘবন সাষ্টাঙ্গে দাদাকে প্রণাম করলো। তারপর জড়িয়ে ধরলো। কথা বলতে গিয়ে আটকে যাচ্ছে। রাঘবনের মুখের চেহারার যে বদল হয়েছে সকলে তা লক্ষ্য করলো।
একে একে বড়োমা, ছোটোমা, মল্লিকদা, মিত্রা, অনন্য, অনিসার সঙ্গে আলাপ করালাম। রাঘবন বড়োমা, ছোটোমাকে প্রণাম করলো। মল্লিকদাকে হাত জোড় করে নমস্কার করলো। মিত্রার কাঁধে হাত রেখে মুচকি হেসে বললো, আগামী জন্মে তোর মতো একটা যেন বান্ধবী পাই। অনিসা, অনন্যকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। নানা বিশেষণে ওদের দুজনকে অভিভূত করলো।
এবার ডাক্তারদাদাকে কাছে ডাকলাম।
পরিচয় করাতেই রাঘবন ডাক্তারদাদার দিকে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো। তারপর স্যার বলে মাটিতে শুয়ে পরলো।
সবাই একটু অবাক, ব্যাপারটা কি হলো!
উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নীচু করে ডাক্তারদাদার কাছে দাঁড়াল।
স্যার আপনি আমাকে চিন্তে পারছেন না?
সত্যি চিন্তে পারছি না আপনাকে!
আপনি না স্যার তুই, আমি আপনার ছাত্র।
আমার ছাত্র!
ঘরের সবাই অবাক।
হ্যাঁ স্যার।
কোন ইয়ারের।
সিক্সটি ওয়ান।
তখন আমি ম্যাড্রাস মেডিক্যাল কলেজে কাজ করছি।
হ্যাঁ স্যার।
দাদাকে অনন্য সোফায় বসিয়ে দিয়েছে।
তুমি বসো।
আপনি আগে বসুন। আমি নিচে বসবো।
সে কি করে হয়।
আপনি আমার শিক্ষাগুরু। আপনার সামনে চেয়ারে বসতে পারবো না।
বসো কিছু হবে না।
আমি ওই খাটে বসছি স্যার। তাহলে আপনাদের সকলের মুখ দেখতে পাব।
সবাই যে যার মতো বসেছে। আমি রাঘবনের পাশে বসলাম।
অঙ্কটা ঠিক মিলছে না।
আমি একবছর পড়েছিলাম স্যার।
তারপর কনটিনিউ করলে না কেন?
তখন আপনার বন্ধু ছিলেন ডা. আর.এল দাস। সার্জারী।
হ্যাঁ হ্যাঁ। ও কিছুদিন হলো মারা গেছে।
স্যার মারা গেছেন!
হ্যাঁ। স্ট্রোক হলো, ম্যাসিভ, সার্ভাইভ করতে পারলো না।
ও গড।
তারপর কি হলো—
উনি একদিন আমাদের অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেলেন। অপারেশন দেখাবার জন্য। অপারেশন থিয়েটারেই রক্ত দেখে মাথা ঘুরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম। বাবা সব জানার পর আর কলেজে পাঠালেন না। ম্যাথমেটিক্স অনার্স নিয়ে পড়লাম। তারপর এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ পরীক্ষা দিয়ে এই চাকরি।
চারজন কালো কোর্ট পরা অফিসার ঢুকলো। এক একজনের হাতে এক একরকম বস্তু। কারুর হাতে বিশাল একটা লালগোলাপের বুকে। কারুর হাতে মিষ্টির বিরাট প্যাকেট আর একজনের হাতে এ্যাটাচি। আর একজন একটা বাক্স নিয়ে ঢুকলো।
রাঘবন উঠে গিয়ে মিষ্টির প্যাকেটটা ওদের হাত থেকে নিয়ে বড়োমার হাতে দিল। ফুলের বুকেটা মিত্রার হাতে দিল। বাক্স আর এ্যাটাচিটা ওখানে রেখে ওদের চলে যেতে বললো। শুধু বললো, পিএকে একবার ডেকে দাও।
তোর সুতপা বৌদি আর বোন সুরোকে দেখালি না।
হাসলাম।
পর পর নাম মনে করো।
সব নাম মনে আছে। বৌদিকে দেখা।
তার বড়কে দেখবে না।
আগে বৌদি আর বোন।
বৌদি হাসছে। এগিয়ে এলো।
রাঘবন হাত জোড় করলো।
আপনার কথা ওর মুখ থেকে অনেক শুনেছি। আপনি ওর জীবনের একটা পার্ট।
সুরো কোথায় বৌদি। আমি বললাম।
পিসি ও ঘরে, আসছে। অনিসা বললো।
তোর দামিনীমাসিকে ডাক।
হাসলাম। কেন?
তোর মুখে গল্প শুনেছি। একটু চোখের দেখা দেখি।
মাসি, সুরো, অদিতি, মিলি, টিনা সরবতের ট্রে নিয়ে একে একে ঘরে ঢুকলো।
অনিসা, মিত্রা, ছোটোমা, বড়োমা এগিয়ে গেল।
সকলে ধরা ধরি করে সেন্টার টেবিলে রাখলো।
দামিনীমাসিকে কাছে ডাকলাম।
মাসি তোমার কথা বুঝবে না।
আমি ভালো বাংলা বলতে পারে।
কচু। ওইটুকু ছাড়া কিছুই বলতে পারে না।
বড়োমা হেসে উঠলো।
দামিনামাসি হাত জোড় করেছে।
রাঘবন দামিনীমাসির হাতদুটো ধরে কপালে ঠেকাল।
ইউ আর আ গ্রেট লেডি।
মাসি হাসছে।
আমার আর দু-বছর চাকরি আছে। তারপর তোমাদের সঙ্গে আমি কাজ করবো।
মাসি আমার দিকে তাকাল।
বাংলা তর্জমা করে দিলাম।
সুরোকে ডাক।
সুরো কাছে এগিয়ে এলো।
রাঘবন ওর দুই কাঁধে হাত রাখলো। চোখে চোখ রাখলো।
তুই ওকে খুব ভালোবাসিস।
সুরো মাথা দোলাল।
তোর বিয়ের দিন ওকে খেতে দিস নি কেন?
সুরো চোখ নামিয়ে নিলো। ছল ছল করে উঠলো ওর চোখ।
ঘরের পরিবেশটা কেমন হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলো। কারুর মুখে কোনও শব্দ নেই।
অনিমেষদা, বৌদি মাথা নীচু করে আছে।
টেক ইজি। সুরোর কাঁধ ধরে রাঘবন ঝাঁকুনি দিল।
ওই ঘটনা না ঘটলে তোর কথা জানতেই পারতাম না।
সুরো চোখ তুলে তাকাল। চোখের পাতা ভিঁজে গেছে।
জানিস সেদিন দিল্লীতে গিয়ে রাতে আমার মেয়ের হাতে খেল। আমার ওয়াইফ দিতে চেয়েছিল। খায় নি। বললো বনির হাতে খাব। তুমি ওকে দিতে বল। প্রথমে বুঝিনি। আমার মেয়ে তোর বয়সী। তারপর তোর কথা জানলাম।
তুই ওকে যতদিন ফোঁটা দিস নি। বনি দিয়েছে।
রাঘবন সুরোর কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল।
দে তোর হাতে আমি জল খাব।
সুরো টেবিলের ওপর রাখা একটা সরবতের গ্লাস এনে রাঘবেনের হাতে দিল।
গ্লাসটা হাতে নিয়ে সুরোর গালটা ধরে একটু নাড়িয়ে দিল। মাথায় রাখবি আমি কিন্তু এ বাড়ির গেস্ট নয়। তুই তোর বাবাকে যে ভাবে ট্রিট করিস সেই ভাবে আমাকে করবি।
সুরো মাথা নীচু করলো।
রাঘবন ঠোঁটে গ্লাস ছোঁয়াল।
এবার একটু হাস।
সুরো নীচু হয়ে রাঘবনকে প্রণাম করলো।
রাঘবন আমার দিকে তাকাল।
মিলি, অদিতি, টিনাকে কাছে ডাকলাম।
মিলি, টিনার সঙ্গে আলাপ করাবার সময় রাঘবন আস্তে করে বলে উঠলো, কিস এন্ড লাভ।
সুরো ব্যাপারটা প্রথমে ধরে ফেলেছে। ফিক করে হেসে উঠলো।
আমি জোরে হেসে উঠলাম।
ঘরের সবাই নিস্তব্ধ, আমি অতো জোরে হেসে উঠতে সবাই একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে। মিলি প্রথমে ফ্যাল ফ্যাল করে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। তারপর সুরোর দিকে তাকাল। সুরো ইশারা করতেই আমার দিকে তেরে এলো। পেট চিমটে ধরলো।
তবেরে শয়তান। ওখানেও গল্প।
এবার রাঘবন জোড়ে হেসে উঠলো।
মুহূর্তের মধ্যে ঘরের চেহারাটা বদলে গেল। ছোটোমা প্রথমে বুঝতে পেরে হেসে উঠেছে।
আমি যন্ত্রনায় ছটফট করছি।
মিত্রা, অনিসা এগিয়ে এলো এবারের মতো ছেড়ে দে মিলি।
মনি ছাড়ো না বাবাকে।
ছার, মানুষ চেনাবার ভাষা দেখছিস তোর বাবার।
রাঘবন তখনও সারাটা শরীর দুলিয়ে হেসে চলেছে।
ঘরের কেউ তখন গম্ভীর নেই।
হাসতে হাসতে আমার চোখে জল বেরিয়ে এসেছে।
মিলি আমাকে রেহাই দিয়েছে।
বাঁকা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে।
বুড়ো হয়েছো এখন রস যায় নি।
রাঘবন আমার দিকে তাকিয়ে। তাকে ইংরাজীতে তর্জমা করে দিলাম। আবার হাসি।
টিনা তখনও মাথা নীচু করে রয়েছে। হাসছে।
রাঘবন টিনার কাঁধে হাত দিয়ে ঝাঁকিয়ে দিল।
জানো ম্যাডাম অল আর ফানি স্টরি। মাঝে মাঝে তুমি কাজের ফাঁকে এগুলো নিয়ে একটু ভাববে। দেখবে এনার্জী পাবে। আমারও জীবনে এরকম অনেক ফানি স্টোরি আছে। শুধু আমার বললে ভুল হবে, তুমি যদি একটু ভালো করে দেখ, দেখবে সবার জীবনে এরকম অসংখ্য ফানি স্টোরি আছে।
টিনা মুচকি মুচকি হাসছে।
দরজার দিকে তাকালাম। অনুপদা, প্রবীরদা, শ্রীপর্ণা, অনিকেত কখন ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারি নি। একে একে সবার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলাম।
কনিষ্কর হাতে হাত রেখে বললো। তুমি এবং তোমার বন্ধুরা অনির জন্য অনেক করেছো। আমার কাছে সমস্ত খবর আছে। আশা রাখবো তোমাদের বন্ধুত্ব সারাটা জীবন অক্ষুণ্ণ থাকবে।
কনিষ্ক, নীরু, বটা, অনিকেত অনেকক্ষণ কথা বললো।
তোর সেই দুটো নতুন বন্ধু মাম্পি এণ্ড মিকি।
আবার সবার অবাক হওয়ার পালা।
এ ওর মুখের দিকে তাকায়।
ঘুমিয়ে পরেছে। কাল সকালে আলাপ করিয়ে দেব।
এবার সবাই বুঝতে পারলো রাঘবন কাদের কথা বলছে।
অনিমেষদা এগিয়ে এসেছে।
সুরোর ছেলে হওয়ার দিন ও অবশ্য কাছেই ছিল।
সেইদিন আমার বাড়িতে গিয়ে সারাটা দিন কারুর সঙ্গে কথা বলে নি। শুধু আমার নাতির সঙ্গে খেলেছে। আমার নাতিও ওর বেস্ট ফ্রেন্ড। এই কয়েকমাস দেখতে পায় নি বলে সে একবারে পাগল করে দিচ্ছে। তুমি যেখান থেকে পার আঙ্কেলকে ধরে এনে দাও।
শিশু মন বোঝাই কি করে। এখন একটু শান্ত।
ঘরের পরিবেশ এখন একটু হাল্কা। মেয়েরা সবাই বেরিয়ে গেছে।
অনিমেষদাকে বললাম, তোমরা সবাই কথা বলো। আমি একটু ওঘর থেকে আসছি।
রাঘবনের দিকে তাকালাম।
এখন খেতে বসবে?
আর একটু পর।
কফি খাবে?
রাঘবন হাসলো।
পাঠাচ্ছি।
ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।
বাগানটায় মনে হয় একটা লাইটের ব্যবস্থা হয়েছে। আগের থেকে অনেক বেশি উজ্জ্বল লাগছে।
গোটা পাঁচেক বড়ো বড়ো ছাতাও পোঁতা হয়ে গেছে। তার তলায় চেয়ার পাতা।
কেউ কেউ বসে আছে। কেউ কেউ বাগানের এপাশে ওপাশে ঘোরা-ঘুরি করছে। নেপলা, আবিদ, রতন আরও দু-তিনটে নতুন মুখ দেখতে পাচ্ছি। ওদের দেখা শোনা করছে।
বারান্দা পেরিয়ে এ ঘরে এলাম।
মিলিরা আমাকে দেখে হই হই করে এগিয়ে এলো।
সুরো-মিলি দুজনেই দুপাশ থেকে জড়িয়ে ধরেছে।
আমাদের ওপর রাগ করো নি?
একটু করেছি।
মিলি লাজুক চোখে তাকাল।
এখনও জ্বালা জ্বালা করছে।
শ্রীপর্ণা আবার হেসে উঠলো।
মিলি তাকাল।
ইসিরা টেবিলে খাবার গোছাচ্ছে। ডাক্তারদাদার ঘর থেকে মনে হয় আর একটা টেবিল নিয়ে আসা হয়েছে। টেবিলটা চেহারা চরিত্রে বেশ বড়ো বড়ো লাগছে।
মিলি।
বলো।
তুমি আর সুরো ওদের জন্য একটু কফি করে নিয়ে যাও। রাঘবন চাইছে।
এতো রাতে!
বললো আরও কিছুক্ষণ পর খেতে বসবে।
আমাদের কিন্তু সব রেডি।
টেবিলে কাদের ব্যবস্থা করছিস। ইসির দিকে তাকালাম।
যারা বাইরে আছে।
ওদের এখানে বসে খাইয়ে দে?
কেউ ভেতরে আসতে চাইছে না। প্লেটে করে রেডি করে দিচ্ছি। রতনরা দিয়ে আসবে।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।
রান্নাঘরের সামনে দেখলাম বড়োমারা চারজনে গোঁতাগুঁতি করছে।
মিলিরা মুক্তি দিয়েছে।
রান্নাঘরের কাছে গেলাম। বড়োমারা দেখলাম নারকেলের বড়া বানাচ্ছে। একটা চাইলাম।
বৌদি তেরে এলো। একবারে না, আগে নীরুকে জিজ্ঞাসা কর। পার্মিশন দিলে, তবে।
তুমি দাও না। কিছু হবে না।
সুতপা চাইছে যখন একটা দাও। বড়োমা বললো।
বৌদি হাসছে।
বড়োমা ও ঘরে কফি পাঠাতে হবে। মিলি পেছন থেকে বললো।
এতো রাতে কার কফির নেশা উঠলো।
অনিদার গেস্টের।
বড়োমা হেসে ফেললো।
এবার কিছু বলো।
বাইরের গ্যাসস্টোভে বানিয়ে নে।
দুধ ফ্রিজ থেকে বার করি।
বাইরের ফ্রিজে নেই, আমার ঘরের ফ্রিজে আছে। ওখানে না থকলে ছোটোর ঘরের ফ্রিজ থেকে বার করে নে।
ছোটোমা একটা নারকলের বড়া আমার হাতে দিল।
আজ কি সাউথ ইণ্ডিয়ান খানা—না এ দেশের?
মিক্সড।
বৌদি বললো।
আলুর দম, আর ডালটা বানিয়ো সকালে বেশ ভালো খেয়েছিলাম।
খেলি কোথায়? অতো কষ্ট করে রান্না করলাম শুধু নারাচারা করলি।
কনিষ্করা এ ঘের এসে ঢুকলো। সোজা আমার কাছে এগিয়ে এলো।
কিরে চলে এলি।
যা আলোচনা শুরু হয়েছে। মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে যাবে। তুই কি খাচ্ছিস?
নারকেলের বড়া।
শরীরটা একটু সুস্থ আছে….।
খাক, কিছু হবে না। নীরু কথাটা বলেই রান্নাঘরে উঁকি মারল।
ছোটোমা, বেশি না আমরা চারজন আছি।
কনিষ্ক হাসছে।
মিলি।
বলো।
অনিমেষদারা কফি চাইছে।
বানাচ্ছি। তোমরা খাবে?
হাফ কাপ।
নীরু, কনিষ্কর দিকে তাকিয়ে হাসছে।
তুই হাসছিস কেন।
ইসি, মিত্রা আমাদের দিকে তাকিয়ে।
সকালে কি কথাটা বলেছিলাম মনে আছে।
কি বলতো!
ওই ঘরে বসে।
ইসি হেসে উঠলো।
ছুটকি, নীরু কি বিঁচকে দেখেছিস।
তুই দেখ, পরিবেশের দোষ।
নীরু মনে করিয়ে দাও। ইসি বললো।
কি বলেছে গো নীরুদা। মিলি চেঁচিয়ে উঠলো।
তুই এদিকে কান দিচ্ছিস কেন। মিত্রা বললো।
নিশ্চই আমাকে নিয়ে নীরুদা কিছু বলেছে।
বটা এগিয়ে এলো। অনেকদিন পর পাওয়া গেছে। বলতো নীরু কি বলেছিলি তখন কনিষ্ককে।
তোর বড়া থেকে হাফ দে।
এই নে।
বটা এগিয়ে দিল।
কনিষ্ক, মিত্রা, ইসি হেসেই চলেছে।
বল এবার।
আগে কনিষ্কর পার্মিশন নে। ক্যালানি তুই খাবি, আমি খাব না।
বড়াটা ফেরত দে।
এঃ কতো খায়।
তাহলে বল।
তুই আমার সামনে এসে দাঁড়া।
নীরু, কনিষ্কর দিকে তাকায় একটু করে বড়া খায়।
দেখ ঝাড় খেলে দুজনে ভাগ করে নেব।
হ্যাজানো বন্ধ কর। না হলে….। বটা চেঁচিয়ে উঠলো।
তখন অনি কনিষ্ককে বললো, মেয়েটাকে আমায় দিয়ে দে।
কনিষ্ক পা তোলার আগেই নীরু বাবাগো বলে বটাকে জড়িয়ে ধরলো।
রান্নাঘর থেকে ছোটোমা মুখ বার করলো।
কি হলো রে… তোদের কি এখনও বয়স হয় নি?
শিব ঠাকুর যদি দুধ চায় গরু বনে গিয়ে দিয়ে আসে।
গায়ে গরম জল ঢেলে দেব। মিলি, নীরুর দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে উঠলো।
তোমরা দু-জন হলে কি হবে আমরাও দু-জন আছি। প্লাস অনি আমার দলে।
সবাই হাসছে।
তুমি অনিদাকে কালকেই রেস্ট্রি করে দিয়ে দাও। মিলি তরপে উঠলো।
তোরা দাঁড়া, আমি আসছি।
কোথায় যাবি?
একটু দাঁড়া এখুনি চলে আসছি।
আমি সোজা বড়োমার ঘরে ঢুকে বাথরুমে ঢুকলাম।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখলাম বাচ্চাদুটো অঘোরে ঘুমচ্ছে। দুজনের গায়ে দুটো ছোট ছোট শাল চাপা দেওয়া। মাঝখানে একটা বড়ো পাশ বালিশ দিয়ে ব্যারিকেড করা। কেউ যেন কারুর কাছে না আসতে পারে।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ওদের ঘুমনো দেখলাম। মাঝে মাঝে দুজনেই ঘুমের মধ্যে হাসে। কথা বলে। বেশ লাগছিল।
শিশুরা যে সত্যি ফুলের মতো এখন এই অবস্থায় দেখলে তা বোঝা যায়।
দু-জনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। একটু নড়েচড়ে উঠলো তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার পাশ ফিরে শুলো।
ঘরের বাইরে এলাম। দেখলাম জ্যেঠিমনি, বরুণদা দাঁড়িয়ে।
আমাকে দেখেই বরুণদা হেসে উঠলো।
কখন এলে?
এই জাস্ট ঢুকলাম। বাবাঃ নিজের বাড়িতে আসবো, তার জন্য যে এ্যাতো হেপা সইতে হবে, কি করে বুঝবো।
কেনো?
বাইরেই আধঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছি। তোমাদের সকলের ফোন বন্ধ। একমাত্র ইসলামভাইয়ের ফোনটা দেখলাম চালু আছে। ফোন করলাম, তারপর আমাকে ভেতরে নিয়ে এলো।
জ্যাঠিমনি হাসছে।
পিকু কোথায়?
কাজে লাগিয়ে দিয়েছে তার মা।
তোমার সঙ্গে রাঘবনের আলাপ হয়েছে।
মিত্রা আলাপ করিয়ে দিল।
কেমন দেখলে ভদ্রলোককে।
তোমাকে যে এতটা ভালোবাসে তাকে খারপ বলি কি করে।
আমি হাসছি।
জেনুইন পার্সেন। এইরকম পজিশনে থেকে এইরকম অমায়িক ব্যবহার ভাবতেই পারছি না।
আমার দিকে তাকাল।
মার কাছ থেকে ওনার গল্প শুনছিলাম। জিনিয়াসরা এরকমই হয় জান।
অনন্য, দাদাকে ধরে ধরে ঘরে নিয়ে এলো।
আমি কিছুক্ষণ ওদের দুজনের দিকে তাকালাম। কতো যত্ন করে দুদুনকে ধরে ধরে টেবিলের কাছে নিয়ে চলেছে। দাদাও যেন অনন্যর ওপর নিজেকে সঁপে দিয়েছে।
বরুণদা মনে হয় আমার মুখ দেখে বুঝতে পেরেছে।
তোমার ছেলেও একেবারে তোমার মতো। যে দায়িত্ব কাঁধে নেবে। একেবারে নিখুঁত ভাবে করবে।
রাতে ফিরে যাবে?
হ্যাঁ। কাল সকালে না হয় চলে আসবো।
জ্যেঠিমনি, দাদার সঙ্গে তুমিও খেতে বসে যাও।
পরে বসছি।
ইসলামভাই গেটের মুখে এসে দাঁড়াল। মনে হয় কাউকে খুঁজছে। তারপর আমার দিকে চোখ পরতেই কাছে এগিয়ে এলো।
দেখছেন দিদি, আপনাদের ছেলের কীর্তি।
জ্যেঠিমনি হাসছে।
ঈশ্বর ওকে অনেক কিছুই দিয়েছেন ইসলাম। আমরা ওর সঙ্গে আছি এটাই গর্ব করে লোককে বলার মতো।
যে জিনিষ মাথা খুড়লে পাওয়া যায় না সেটা কতো সহজে পেয়ে যাচ্ছি বলুন।
তুমি কাকে খুঁজছিলে? আমি বললাম।
কেন নিজের গুণের কথা বলছি শুনতে ইচ্ছে করছে না।
ইসলামভাই হাসছে।
তোকে ডাকতে এসেছি।
কেন?
তোর গেস্ট তোকে খুঁজছে।
অনিমেষদাদের কথা বলা হয়ে গেছে।
এক জায়গায় এসে আটকে গেছে। উনি বলছেন এটা আমার হাতের বাইরে, তবে অনি যদি করাতে পারে, আমি পাস করিয়ে দিতে পারি।
আবার কি হলো?
চল নিজের কানে শুনবি।
কফি খাওয়া হয়ে গেছে?
হ্যাঁ।
ইকবালভাই কোথায়?
মাঠের লোকজনকে সামলানোর দায়িত্ব দিয়েছি।
চিকনাকে অনেকক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না।
বাগানে আছে।
অর্করা।
সবাই আছে।
মনু।
ছোটোমার ডাকে ইসলামভাই রান্নাঘরের দিকে তাকাল।
ছোটোমা ইসারায় কাছে যেতে বললো। ইসলামভাই হাঁটা লাগালো।
আমি বরুণদার দিকে তাকালাম।
দাঁড়াও একটু ঘুরে আসি।
যাও, আবার দেখো অনিমেষদা কি ঘোটালা পাকালো। মাঝে মাঝে মাথাটা একটু ধার দিও।
হাসলাম। আমি বেরিয়ে এলাম।
বাগানে সত্যি সত্যি সবাই বেশ মজা করে খাচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে না এরা সব হাই অফিসিয়াল। হই হুল্লোড় করছে নিজেদের মধ্যে। পিকুকে দেখলাম একজনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। এইবার চিকনাকে চোখে পরলো। গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ব্ল্যাক ক্যাটগুলোর সঙ্গে কথা বলছে।
এই ঘরে ঢুকলাম। দেখলাম টেবিলে একটা প্লেটে গোটাকয়েক নারকেলের বড়া পরে রয়েছে। অনিমেষদারা পাঁচজন ছাড়া একমাত্র ডাক্তারদাদা রয়েছে।
প্রবীরদা আমাকে দেখে হেসেফেললো।
তুই কোথায় গেছিলি? রাঘবন বললো।
ও ঘরে ছিলাম। খাওয়ার বন্দবস্ত করতে বলি।
মিত্রা তাই বলেগেলো।
কাজ হয়েছে?
সামান্য। আগে সরকার তৈরি হোক। তারপর ওনারা চিঠি পাঠালে ব্যবস্থা করবো।
কি সমস্যা হয়েছে বললো?
ওটা সমস্যা নয়। তুই অনিমেষবাবুর সঙ্গে পরে কথা বলে নিস।
অনাদিকে এ্যারেস্ট করেছো?
তুই তাড়াহুড়ো করলে হবে। একটা গ্রাউণ্ডস তৈরি হোক আগে।
এরা করবে না।
ভুল করছিস। শেষ বয়সে কেউ চায় না চাকরি নিয়ে টানাটানি হোক। বাকিটা নতুন সরকার ফর্ম হলে তারা যেরকম স্টেপ নেবেন তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।
তার মানে একমাসের ধাক্কা।
রাঘবন হাসছে।
(আবার আগামীকাল)