জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১১৯ নং কিস্তি
হবু সিএমের সঙ্গে কথা বললে?
আলাপ হলো।
কি সব ফাইল পত্র নিয়ে এলো ছোটাছুটি করে তোমাকে দেখাবে বলে।
সব এক কপি করে জেরক্স দিতে বলেছি।
কাল কখন ফিরছো?
যা কাজ আছে বিকেলের আগে শেষ হবে না।
ঠিক আছে।
তোর এখানে কাল সকালে দুটো মিটিং করা যাবে?
তোমার প্রটোকলে অসুবিধে না থাকলে করা যাবে।
তাহলে তোর এখান থেকে কাল দশটায় বেরবো। তার আগে একটা সাড়ে সাতটা থেকে সাড়ে আটটা আর একটা পৌনে নটা থেকে পৌনে দশটা। এগারটায় রাজভবন যাব।
তাই হবে।
ফোনটা বার করে পিএকে ফোন করে সব বলে দিল।
তোমরা পিএটি কোথায়?
হোটেলে পাঠিয়ে দিয়েছি। যারা এমনি ডিউটিতে থাকবে তারা থাকবে।
ওদের খাওয়া হয়ে গেছে। এবার খেতে বসি চলো।
বাড়িটা ভালো করে দেখা হলো না।
কাল দিনের বেলা দেখবে।
তোর বৌদির সঙ্গে একটু কথা বল। তখন ফোন করেছিল। বললাম তোর বাড়িতে নাইট স্টে করছি। আমার ওপর খেপে গেল। কেন একা একা এসেছি।
সব বউগুলো সমান বুঝলে।
রাঘবন হাসছে।
লাইনটা ধরে আমার হাতে ফোনটা দিল।
কানে দিলাম। ওপাশ থেকে ভেসে এলো। হ্যালো।
আমি বললাম হ্যালো, কেমন আছো।
তুই! কোথায় ছিলি এতক্ষণ?
গেস্ট এসেছে। তার দেখভাল করছিলাম।
আগে বল শরীর কেমন আছে।
আগের থেকে একটু সুস্থ। মাঝে মাঝে মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করে।
বাড়ির সকলে।
ভালো আছে।
সবার সঙ্গে আলাপ করালি আমার সঙ্গে করালি না।
তোমাকে আর বনিকে আমি নিজে গিয়ে নিয়ে আসবো। একটু সুস্থ হতে দাও।
তোর সঙ্গে কথা বলবো না তোর বৌকে দে।
দাঁড়াও। রাঘবনকে ইশারায় বলে, এ ঘরে এলাম।
মিত্রা তখন দেখি জায়গা করছে। ইশারায় ওকে ডাকলাম।
বিষ্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে।
কি হলো?
আয় তাড়িতাড়ি।
কিরে তোর বৌ আসছে না।
খাওয়ার জায়গা হচ্ছে। সবাই এক সঙ্গে খেতে বসবো। তোমর বড়ের আর্জি।
বৌদি হেসে উঠলো।
মিত্রা কাছে এলো।
বৌদি তোর সঙ্গে কথা বলবে।
ইসারায় ওকে কে এই বৌদি বললাম।
ও ইসারায় জবাব দিলো কি বলবো!
ওর হাতে মোবাইলটা গুঁজে দিলাম।
আমি ভেতরে এলাম দেখলাম দাদার খাওয়া হয়ে গেছে। টেবিলটা একপাশে সরিয়ে রাখা হয়েছে। অনিসা, অনন্য ছোটোমার পেছন পেছন ঘুর ঘুর করছে। ইসারায় ডাকলাম।
কাছে এলো।
মার কাছে যা। রাঘবন আন্টি কথা বলবে তোদের দু-জনের সঙ্গে।
বলার সঙ্গে সঙ্গে ওরা ঘরের বাইরে চলে গেল।
আমি পেছন পেছন এলাম। একে একে সবাই কথা বললো। শেষে আমি বললাম। তারপর ফোনটা রাঘবনের হাতে ফেরত দিলাম।
আমাকে আধ ঘণ্টা সময় দে।
হেসে ফেললাম। কি বলতে চায় বুঝে গেলাম।
ঠাকুর ঘর ওপরে।
সবাই আমার দিকে অবাক হয়ে তাকাচ্ছে।
তুই চল।
আমি কোনওদিন ঢুকিনি।
রাঘবন হাসছে।
দাঁড়াও মেয়েকে ডাকি। কাপর-চোপর নিয়ে এসেছো। না দাদার ধুতি দেব।
নিয়ে এসেছি। যাঃ ভুলে গেছি।
আবার কি হলো।
দাঁড়া।
নিজেই বেরিয়ে এলো। একটা সেন্ট্রিকে ডাকলো।
সে তো পরি কি মরি করে ছুটে এলো। তাকে বললো, আমার গাড়ির পেছনে একটা পেটি আছে নিয়ে এসো।
সে দৌড়লো।
কি আছে ওতে।
গিফ্ট আছে। ভুলে গেছি দিতে।
অনিমেষদা হাসছে।
নিজের এ্যাটাচি থেকে একটা ধুতি আর ফতুয়া বার করলো।
সেন্ট্রি একটা পেটি নিয়ে এলো।
ইসারায় তাকে বললো, ও ঘরে রাখো।
বেরিয়ে গেলো।
তুই চল।
তোমার এ কাপরে হবে না। ঠাকুর ঘরের কাপর আলাদা। ওটা ঠাকুর ঘরেই আছে। ওটা পরে ঠাকুরকে ছুঁতে হবে।
রাঘবন হাসছে।
দাঁড়াও ছোটোমাকে ডেকে আনি।
আবার এ ঘরে এলাম। ছোটোমাকে সমস্ত ব্যাপারটা বললাম। শুনে বলে কিছু হবে না তুই যা।
অগত্যা ওকে নিয়ে ওপরে এলাম।
রাঘবন ছোটোমার বাথরুমে ঢুকলো। তারপর টাওয়েল পরে বেরিয়ে এলো। ছোটোমার পাশের ঘরটাই ঠাকুর ঘর। দরজা খুলে ওকে ভেতরে যেতে বললাম।
কোনওদিন ঢুকিনি। আজ প্রথম ঢুকলাম। আমার ঘরের থেকেও সুন্দর গোছান। সিংহাসনে তারামার ফটো। নিচে শিব, নারায়ণ, গোপালঠাকুর সব আছে। কিছু বাদ নেই। আলনায় রাখা কাপর দেখালাম।
রাঘবন সেই পট্টবস্ত্র পরে আসনে বসে পরলো। নিজে থেকেই ধুপ প্রদীপ জ্বালালো। কি সব বিড় বিড় করলো বেশ কিছুক্ষণ ধরে। তারপর আসন ছেড়ে উঠে কান ধরে তিন-চারবার ওঠবস করলো।
হাসি পাচ্ছে কিন্তু হাসতে পারছি না। যার যার ধর্মীয় ভাবাবেগ। নিজে নিজেই কাপর ছেড়ে গুছিয়ে রাখলো। ঠাকুর ঘরের দরজা বন্ধ করলো।
মনটা ভরে গেল বুঝলি অনি।
কেন?
আমার ঠাকুরঘরের থেকেও সুন্দর।
সব বড়োমার হাতে গোছানো। বড়োমার এ্যাবসেন্সে ছোটোমা, মিত্রা।
আর কেউ আসে না?
মেয়ে আর ছেলে আসে।
ছেলের পৈতে হয়েছে?
দাদা দিয়েছে।
ছোটোমার ঘরে এলাম।
নিচে যে বেশ হই হুল্লোড় চলছে। ওপর থেকে তা টের পেলাম।
এটা কার ঘর?
ছোটোমার, তবে ছোটোমা এখন নিচে থাকে। ছেলে এই ঘরটা দখল করেছে।
ঠাকুরের আসনে বড়ো ছবিটা কার বলতো।
তারাপীঠের তারামা।
মূর্তিটা ভয়ঙ্কর।
তুমি আসল মূর্তি দেখছো না। ওটা নকল।
তার মানে!
সে অনেক গল্প, পরে বলবো।
শুনেছি ওটা শাক্তপীঠ। তান্ত্রিকদের সিদ্ধপীঠও বলে।
ঠিক শুনেছো। তবে শাক্তপীঠ নয় সিদ্ধপীঠ।
তাহলে তুই যে বললি ওটা মায়ের আসল মূর্তি না।
আমি নিজের চোখে যা দেখেছি। সেটা বললাম।
রাঘবন আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে।
ওটা একটা কলসীর মতো, আসল মূর্তিকে ঢাকা দেওয়া রয়েছে।
তুই কি দেখেছিস?
একটা কালো রং-এর শিলা। তার ওপর একটি পূর্ণবয়স্ক নারী মূর্তি একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষকে স্তন দান করছেন। তাও তুমি এটা স্পষ্ট দেখতে পাবে না। অনেকক্ষণ এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকলে এই অবয়বটা তোমার চোখের সামনে ভেসে উঠবে। ওটাই মায়ের আসল শিলা। বলতে পারো মূর্তি।
আমি এটা পরি নি। ইংরাজীতে এর কোনও বই আছে।
বলতে পারবো না।
গল্পটা একটু বল।
অসুরের সঙ্গে দেবতাদের প্রবল যুদ্ধের পর সমুদ্র মন্থন করে দুটো জিনিষ উঠে এসেছিল। একটা গরলের কলসী। একটা অমৃতের কলসী। এটা জানো।
হ্যাঁ।
অমৃতের কলসী নিয়ে দেবতাদের সঙ্গে আবার অসুরদের প্রবল যুদ্ধ বাধলো। দেবতারা অমৃতের কলসী নিয়ে স্বর্গের উদ্দেশ্যে পালাতে শুরু করলো। বিভিন্ন জায়গায় অমৃতের কলসী রাখে আর অসুরদের সঙ্গে যুদ্ধ করে।
এরমধ্যে দুটো জায়গার নাম বলছি একটা ইলাহাবাদ আর একটা হরিদ্বার। সে অন্য গল্প। পরে বলবো। এই কারণে কুম্ভমেলা আর বারো বছর অন্তর অন্তর পূর্ণকমুম্ভ মেলা হয়।
এই যে দেবতারা অমৃত নিয়ে পালালো। তাহলে গরলটা খাবে কে। অসুররা নিশ্চই খাবে না। শেষমেষ ব্রহ্মার কাছে আসা হলো। তাঁর বিধানই শেষ কথা।
অসুররা তা মনে নিলো।
অমৃতের ভাণ্ড দেবতারাই পেল। তাহলে গরলটা কাকে খাওয়ানো যাবে।
দেবতাদের মধ্যে একজনই পাওয়ার ফুল আপনভোলা মানুষ আছেন তিনি হচ্ছেন শিব। দে ব্যাটা ওকে গরল খাইয়ে।
শিবও অমৃত মনে করে গরল খেয়ে ফেললো।
ব্যাশ সারাটা শরীর জ্বলছে। ছটফট করতে শুরু করলেন শিব। ব্রহ্মা, বিষ্ণু দুজনেই একটু ভড়কে গেলেন। তারপর ব্রহ্মাই মাথা থেকে বার করলেন, এ যাত্রা থেকে একমাত্র শিবের স্ত্রী পার্বতী তাঁকে রক্ষা করতে পারে। আর কেউ নয়।
সবাই ছুটলো কৈলাশে। পার্বতীকে সব জানানো হল। পার্বতী স্বামীর এই অবস্থা শুনে বিহ্বল দশা। ছুটতে ছুটতে এলেন ব্রহ্মার কাছে। তিনি বললেন তোমার স্বামীকে তুমিই একমাত্র এই অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারো।
কি করে।
তুমি ওকে স্তন দান করো।
পার্বতী তাই করলেন। স্বামীকে স্তন দান করলেন। সমস্ত গরল এসে জড়ো হলো শিবের কন্ঠে। শিবের কন্ঠটা নীল রংয়ের আকার ধারণ করলো। তাই শিবের আর এক নাম নীলকণ্ঠ। আর এই প্রতীকী ছবিটাই ওই শিলাতে রয়েছে।
রাঘবন আমার দিকে বিষ্ময়ে তাকিয়ে আছে।
এর একটা নিগূঢ় অর্থ আছে সেটা ধরতে পারছো কি?
কি বলতো।
স্তন কাকে দান করা হয়?
শিশুকে।
শিশুর কাছে মাতৃদুগ্ধ অমৃতের সমান। এটা মান?
অবশ্যই।
আবার আর এক দিক থেকে একটু ভাবো, এই মাতৃদুগ্ধের পাওয়ার বা শক্তির কথা।
রাঘবন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
নারী শক্তি-স্থিতি-সৃষ্টির অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তাঁর শরীর নিঃসৃত করে পুরুষ এই পৃথিবীর আলো, বাতাস, শব্দ, স্পর্শ, গন্ধের আস্বাদন পেয়েছে। এই নারী শক্তিকে মহামায়া বলে। তারাপীঠের তারামা মহামায়ার আর এক রূপ।ত্রেতা যুগে মুনিবশিষ্ঠ এই দেবীর সাধনা করে সিদ্ধি লাভ করেন।
পুরানে দ্বারকা নদীর কথা শুনেছো?
রাঘবন মাথা দোলাল।
এই পীঠস্থান দ্বারকার তীরে অবস্থিত।
মুনি বশিষ্ঠ কোজাগরী পীর্ণিমার ঠিক আগের দিন চতুর্দশীতে মায়ের দেখা পয়েছিলেন। বলতে পারো সিদ্ধি লাভ করেছিলেন।
ওই দিনটাকে তারাপীঠের ভক্তরা এখনও মায়ের আবির্ভাব দিবস হিসাবে পালন করেন।
ওই শিলা মূর্তি মুনি বশিষ্ঠ দ্বারকা নদী থেকে পেয়েছিলেন।
কি অদ্ভূত দেখো তারাপীঠ প্রসিদ্ধ লাভ করলো ব্যামাক্ষেপার জন্য।
সাধক ব্যামাক্ষেপার সঙ্গে মা তারার সম্পর্ক মাতা-পুত্রের। মা যেন তারাপীঠের সিদ্ধ পীঠে কোলেপিঠে করে তাঁর সন্তানকে মানুষ করছেন।
তখন নাটোরের রাজা এই অঞ্চলটা দেখাশুনা করতেন। রাজমাতা একদিন স্বপ্নে মায়ের দেখা পেলেন, মা বললেন তুই এবং তোর লোকজন আমাকে আমার সন্তানকে মন্দির থেকে তাড়িয়ে দিলি আমি চললাম।
রাণীমা স্বপ্ন দেখে উঠে পরলেন। পরের দিন লোক পাঠিয়ে খোঁজ নিলেন, দেখলেন ব্যামাক্ষেপাকে মন্দির থেকে নির্বাসন দেওয়া হয়েছে তার পাগলামোর জন্য। তাঁর আদেশেই সেদিন থেকে প্রথমে মায়ের সন্তানের জন্য খাওয়ার তৈরি হতো, বামাক্ষেপা খেলে তবে মায়ের ভোগ নিবেদন হতো। এখনও কিন্তু এই নিয়ম চলে আসছে। এর কোনও সঠিক ব্যাখ্যা তোমায় দিতে পারবো না। আবার আর একটা মতও আছে এই বিগ্রহকে ঘিরে।
সেটা কি রকম।
বিপরীত মুখী রতি ক্রিয়ায় মত্ত দুই নারী-পুরুষ। তন্ত্রে এরও ব্যাখ্যা আছে।
একটু বল।
সব বলে দিলে তুমি আর পড়াশুনো করবে না।
বলনা। তোর এই একটা গণ্ডগোল। উসকে দিয়ে থেমে যাস।
নিচে সবাই বসে আছে।
রাঘবনের চোখ চলে গেলো ছোটোমার ড্রেসিনটেবিলটার দিকে। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলো। ছবিটার দিকে একবার তাকায় আর একবার আমার মুখের দিকে তাকায়। ছবিটা হাতে তুলে ভালোকরে দেখে নিয়ে আবার যথাস্থানে রাখলো।
তোর মা?
হ্যাঁ। কি করে বুঝলে।
মুখের আদলের সঙ্গে অনেক মিল আছে।
হাসলাম।
চলো নিচে চলো।
দুজনে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।
রাঘবন চুপ, কোনও কথা বললো না।
দুজনে শিঁড়িতে পা রাখলাম।
কি চিন্তা করছো?
পুরান, বেদ, উপনিষদ তিনটেই একেবারে আলাদা সাবজেক্ট তাই না?
পুরাণটা গল্পের ছলে তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার বর্ণনা করা হয়েছে। বেদ মন্ত্র। মনকে সেই মন্ত্রের দ্বারা শুদ্ধ করো। উপনিষদ পথ। এককথায় তত্ত্ব।
খুব সুন্দর বললি।
আমার মতো করে বললাম। আমি পড়াশুনো করে যেটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছি।
সারাটা জীবন এ্যাডমিনিস্ট্রেসনের পেছনে দিলাম। রিটায়ারের পর চুটিয়ে পড়াশুনো করবো।
বারান্দায় পা রাখলাম। বাগানের চেয়ারে বসে থাকা রাঘবনের লোকজন উঠে দাঁড়ালো।
একটু এগিয়ে গেলো।
তোমরা রেস্ট নাও। লোকাল থানাকে বলো বাইরেটা দেখতে।
হ্যাঁ স্যার।
পিল্লাই চলে গেছে?
হ্যাঁ স্যার।
ওই পেটিটা কোথায়?
ওই ঘরে স্যার।
আচ্ছা।
দুজনে এই ঘরের সামনে এলাম।
দেখলাম নিচে বেশ লম্বা করে চারপাশে আসন পাতা হয়েছে।
রাঘবন আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
অসুবিধে নেই তো?
মাথা দোলাচ্ছে। না।
পেটিটা একটু বার করতে বল।
কেন।
গিফ্ট আছে। সবাইকে দিতে হবে।
থাকনা এখন।
রাঘবন নিয়ে আসতে বললো।
ইসলামভাই এগিয়ে এসেছে।
কি হয়েছে বল না।
ওরা কোনও পেটি দিয়ে গেছে।
হ্যাঁ।
ওটা একটু নিয়ে এসো।
ইসলামভাই, বড়োমার ঘরের দিকে গেলো।
আস্তে করে বললাম ও নিয়ে এলে তোমার কোনও অসুবিধে নেই?
রাঘবন হাসলো।
বাক্সটা মনে হয়ে বেশ ভারি। ইসলামভাই যে ভাবে নিয়ে এলো।
কোথায় রাখবো?
টেবিলে রাখো।
রাঘবন এগিয়ে গেলো।
অননিসা।
অননিসা না অনিসা।
রাঘবন নিজে নিজে উচ্চারণ ঠিক করলো।
মেয়ে হাসতে হাসতে এগিয়ে এলো।
তুই খোল।
কেন!
খোল না।
অনিসা পিচবোর্ডের পেটিটা খুললো।
ভেতরে দেখলাম অনেক ছোট বড়ো বাক্স।
অনিসা হাসছে।
কি আছে?
তুই একটা ছোট বাক্স তুলে নে।
অনিসা একটা নিয়ে খুললো।
দেখলাম স্ফটিকের গণেশ।
ও মা কি সুন্দর।
অনিসার চোখ মুখ খুশিতে ভরে উঠলো।
তোর পছন্দ?
অনিসা হাসছে।
বড়ো বাক্সগুলো বড়োমাদের জন্য, ছোটোগুলো সব তোদের। সবাইকে দিয়ে দে।
তুমি দাও।
তুই দিলেই আমার দেওয়া হয়ে যাবে।
সুরো পিসী। অনিসা চেঁচিয়ে উঠলো।
সুরো এগিয়ে এলো।
দুজনে মিলে সবাইকে একটা করে বাক্স হাতে হাতে দিল।
সবার জন্য এক জিনিষ।
গণেশ নিয়ে ওদের সবার হই হুল্লোড় রাঘবন বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছে।
আসন পাতার অবস্থা দেখে বেশ বুঝলাম আমাদের জায়গাটা ঠিক কোথায় হয়েছে। রাঘবনকে নিয়ে এগিয়ে গেলাম।
বড়োমাকে বললাম, দিয়ে দাও আর দেরি কোরো না।
বড়োমা গণেশ হাতে এগিয়ে এলো।
রাঘবন বললো আপনার ঠাকুর ঘরটা বেশ সুন্দর।
তোমার দেওয়া গনেশ কালকে সিংহাসনে তুলবো।
রাঘবন হাসলো। পূজো করবে তো?
করবো।
আমি রাঘবন পাশা পাশি বসলাম।
রাঘবনের পাশে অনিসা, অনন্য আমারে পাশে মিত্রা, ছোটোমা, বড়োমা। রাঘবন সবার সঙ্গে গল্প করতে করতে খেলো। খাওয়ার নিয়ে হই হুল্লোড় হলো। অনুপদারা যে ফ্রায়েড রাইস নিয়ে এসেছিল, কিংবা ইসলামভাইরা যে বিরিয়ানী নিয়ে এসেছিল তার লেশমাত্র আমাদের খাওয়ার সময় পরিবেশন করা হলো না। সব নিরামিষ।
পরিবেশন করলো মিলি, সুরো, টিনা, অদিতি। চারজনে বেশ গুছিয়ে সবাইকে দিল।
শেষে মিষ্টি নিয়ে আসা হলো। রাঘবন দেখলাম মিলির কাছে চেয়ে চেয়ে মিষ্টি খেলো। সবচেয়ে পছন্দ হয়েছে ওর রাবড়ী।
আমি কাল যাওয়ার সময় নিয়ে যাব অনি।
প্রবীরদার দিকে তাকালম।
প্রবীরদা হাসছে।
আমি দিলে তুই আবার লিখে দিবি ঘুস দিলাম।
সবাই হেসে উঠলো।
অনিমেষদা তার আবার ইংরেজী তর্জমা করে দিল।
এবার রাঘবনও হাসছে।
আমি টাকা দেব।
আবার হাসির রোল উঠলো।
খাওয়ার শেষের দিকে সন্দীপ, দ্বীপায়ণ, সায়ন্তন, অরিত্র এলো।
রাঘবন ওদের দিকে তাকাল।
তোমরা খাবে তো সন্দীপদা। মিলি বলে উঠলো।
খাব মানে! সেই জন্য ছুটতে ছুটতে এলাম।
টিনা জায়গা করে দে বসে পরুক। বড়োমা বললো।
কাগজ নিয়ে এসেছিস? আমি বললাম।
তাহলে এলাম কেন—
খবর কি—
তুই যেটা জানতে চাইছিস সেটা এই শেষ বেলা হলো।
প্রবীরদা আমার দিকে তাকাল।
রাঘবনও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বাংলায় কথা বলছি। একবর্ণও বুঝছে না।
প্রথমে ওদের সঙ্গে রাঘবনের পরিচয় করিয়ে দিলাম। তারপর এতক্ষণ কি কথা হলো বললাম।
ওরা লেট করলো, আরও আগে করা উচিত ছিল। ওরা খেতে বসবে।
হ্যাঁ।
তাহলে ওঠা যাবে না। আরও দুটো মিষ্টি খাই।
হাসলাম। ভাবিকে ফোন করবো।
সুগার ইজ কোয়াইট ওকে।
কনিষ্ক অপরপ্রান্ত থেকে জোড়ে হেসে উঠলো।
আমাকে ইসারায় বললো, ওই নরম নরম মিষ্টি।
মিলার দিকে তাকিয়ে বললাম, কাঁচা গোল্লা দাও।
কাছাগললা।
না, কানচা গোল্লা।
আমার কথা শুনে মিলিরা হাসছে।
রাঘবন অনিসার দিকে তাকাল।
তুই আমাকে বাংলাটা শেখাবি?
তোমার সময় কোথায়!
দু-বছর পর রিটায়ার করবো তখন শিখবো।
আমার দিকে তাকিয়ে আলুর দমের বাটিটা দেখাল। এটা কি পটেটো কারি।
না, আলুর দম।
রাঘবন হাসছে।
বড়োমারা সবাই হাসছে।
বৌদি করেছে।
বৌদির দিকে তাকাল।
নিয়ে যাবে?
তোর বৌদিকে খাওয়াব।
প্লেনে ধরবে।
হাসাহাসি চলছে।
খাওয়া শেষ হলো। আমরা সবাই উঠলাম।
দেবাশিস, নির্মাল্য এগিয়ে এলো। যাচ্ছি, কাল সকালে আসবো।
তোদের সঙ্গে কথাই বলা হলো না।
সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে।
অদিতি থাকবে?
হ্যাঁ।
রাঘবনের দায়িত্ব নিয়েছে অনিসা। দুজনে বেশ হাসাহাসি করছে। নির্মাল্যকে ইসারায় বললাম কনিষ্কদের নিয়ে একবার বাগানে আয়। আমি এগিয়ে গেলাম।
নেপলারা সব বাগানের কলে গিয়ে ভিড় করেছে।
আমি চাদরটা মাথায় মুড়ি দিয়ে বাগনে এসে নামলাম। নীরু ছুটে এলো কোথায় যাচ্ছিস?
একটা সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছে।
আগে ট্যাবলেটগুলো গেল তারপর খাবি।
আমি দাঁড়িয়ে পরলাম, নীরু বড়োমার ঘরের দিকে দৌড় দিল।
কনিষ্ক, বটারা এলো।
তোর রাঘবন বেশ জম্পেশ জিনিষ।
ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিব।
দেখে মনেই হচ্ছে না।
ওদের লাইফটাও তো প্রটোকল মেনে তৈরি। অনন্দ বলতে কি জিনিষ জানে না। সুযোগ পেলেই তাই যথেচ্ছ ফুর্তি করে নেয়।
চল। বটা বললো।
দাঁড়া নীরু কি ওষুধ গেলাবে বললো।
বটা একটা বিটকেল হাসি দিল।
হারামী।
কনিষ্কর দিকে তাকালাম।
রাঘবনকে সঙ্গ দিতে গিয়ে তোদের সঙ্গে কথাই বলা হচ্ছে না।
আগে গেস্ট তারপর আমরা।
নীরু জলের বোতল ওষুধ নিয়ে হাজির।
কোনওপ্রকারে গলধকরণ করে বাগানে নেমে এলাম সবাই।
নির্মাল্য ভেতরে গেল বোতল রাখতে।
সবাই আমগাছটার তলায় এসে দাঁড়ালাম।
কোথা থেকে চিকনা এসে পায়ে পরে গেল।
তুই এতক্ষণ কোথায় ছিলি! মাঝে মাঝে দেখি তারপর ফুরুত করে উড়ে যাস।
সিগারেটের প্যাকেট বার করলো।
এখানে না এলে জীবন বৃথা হয়ে যেত।
তোর সঙ্গে তো রাঘবনের আলাপ করানই হলো না।
গুরুমা আলাপ করিয়েছে। তেরে ইংরাজী বলে আমি অতো ভালো বলতে পারি নাকি। খালি দাঁত কেলালাম।
তখন যে তোকে দায়িত্ব দিলাম।
হয় নি। অনিমেষদা সব গুবলেট করে দিয়েছে। পরে সব বলবো।
সিগারেট ধরালাম।
হ্যাঁরে চিকনা এদের শোবার ব্যবস্থা কোথায় হলো।
সব ডাক্তারদার বাড়িতে।
যেগুলো ঘোরা ঘুরি করছে।
এরা নাইট ডিউটি দিচ্ছে। বাগানের পেছনও আছে গোটা ছয়েক।
ভেতরে বেশ হই চই হচ্ছে। বুঝলাম রাঘবন বেশ এনজয় করছে।
কনিষ্ক।
বল।
আমি আর ফিরে যাব না। আমাকে রিলিজ দে।
ওটা নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না।
রাঘবন চলে গেলে, বিকেলের দিকে তোদের নিয়ে একটু বসবো।
কেন?
নার্সিংহোমগুলোর ব্যাপার নিয়ে একটু আলোচনা করবো। ডাক্তারদাদাকে রিলিফ দেব।
ওটা আমিও ভেবে রেখেছি। স্যার আর পারছে না।
আমাদের ওখানকার নার্সিংহোমটার কি হাল?
সব কটা এখন একটা পথে চলে এসেছে।
ওই মর্কটটাকে রেখেছিস না দূর করেছিস?
অনুপ হাইকোর্টে কেশ করেছে। মনে হয় একটা নিগোসিয়েশন আসতে চায়।
অনুপ আজ এলোনা কেন বলতো। ওর তো আসার কথা ছিলো। নেপলা তাই বললো।
এসেছে। রাঘবনের কি কাজে ফেঁসে আছে। কাল সকালে আসবে। ম্যাডামকে ফোন করেছিল।
অরিত্র, অর্ক, সুমন্ত, দ্বীপায়ণ, সন্দীপ, সায়ন্তন এসে যোগ দিল।
অরিত্র আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
তুমি খুব সর্টিয়ালি করলে আজকে আমার সঙ্গে।
কেন বলতো!
অর্ক, সুমন্ত থেকে গেলো আমাকে ফুটিয়ে দিলে।
কোথায়, তুই তো আসিস নি।
অর্ক ছিল, সুমন্ত বললো সন্দীপ ওকে এখানে আসার এ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছে। ওরা লেখাটা ঝেড়ে দিল।
অর্ক জোড়ে হাসলো।
কোন লেখাটা বলতো।
তুমি গল্প দিলে ওরা দুজনে লিখে দ্বীপায়ণদাকে দিল।
আমি বুঝতে পারছি না!
শ্যামদাদের ইতিহাস।
সব্বনাশ। অর্ক ঝেড়ে দিয়েছে!
এই সব মাল রেখে দেওয়ার লোভ কেউ সামলাতে পারে। দ্বীপায়ণদা আবার তোমার মাল থেকে ঠিক ঠিক ডকুমেন্টস বার করে প্রিন্ট করে দিল।
তাহলে আজ সন্দীপের বুক ফুলে চওড়া হয়ে গেছে।
চওড়া মানে, কাল আবার কন্টিনিউ করেছে।
অর্ক হাসছে।
তোকে এর থেকে একটা ভালো মাল দেব। দেখবি একটা মারও তোর শরীরে বাইরে পরবে না।
সায়ন্তন প্যাঁক দিয়ে উঠলো।
শুভ কেশটা ওপেন করি।
বেশ তো চলছে, মুডটা খারাপ করে খিস্তি খাওয়াবার কল করছিস কেন। সায়ন্তন বললো।
চল অনেক রাত হলো। আমি বললাম।
তোর শরীর ঠিক আছে। নীরু তাকাল আমার দিকে।
মাঝে মাঝে মাথাটা ঝিম ঝিম করছে।
আরও কয়েকদিন সময় লাগবে। রাঘবন কাল কখন যাবে?
বললো তো কাল সকালে এখানে দুটো মিটিং সেরে বেরবে।
কটায় বলেছে?
একটা সাড়ে সাতটায় বলেছে। আর একটা তারপর হবে। এগারটার সময় রাজভবনে যাওয়ার কথা।
আমি শ্রীপর্ণা কাটছি। কাল সকালে আসা যাবে।
যা।
বাগানে থেকে বারান্দায় উঠে এলাম। একে একে সবাই চলে গেল। ডাক্তারদাদার বাড়িতে অনিমেষদারা শুতে গেল। আমি, রাঘবন আমার ঘরে। আমার ঘর পরিপাটি করে সাজান। দুজনে কিছুক্ষণ গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পরলাম।
সকালে রাঘবনের ঠেলায় ঘুম ভাঙলো।
কিরে উঠবি না।
জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালাম। তখনও একটু একটু অন্ধকার আছে। সবে আলো ফুটছে।
কটা বাজে?
পৌনে পাঁচটা।
হাঁটবে?
এটা এখনও রেগুলার মেইনটেন করি। তোর বৌদিকে নিয়ে প্রত্যেক দিন ইণ্ডিয়া গেটে চলে যাই। ঘণ্টা দুয়েক দুজনে এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত চক্কর দিই। তারপর বাড়ি। নিজের বাড়িতে থাকলে মেরিনা সী বীচে চলে যাই। বুড়ো-বুড়ীর সংসার বেশ কেটে যায়।
দুজনে চোখে মুখে একটু জল দিয়ে বেরিয়ে এলাম। আলো ফুটে উঠেছে। পুলিশগুলো যে যার ঘুমে ঢলে পরেছে। বাড়ির বাইরে গাড়ি, লনে চারটে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। হাঁটতে হাঁটতে বাগানের শেষ প্রান্তে চলে এলাম।
বোঝাই যাচ্ছে না কলকাতায় আছি।
কেন?
বাগানটা এতো সুন্দর, এতো গাছ, মনে হচ্ছে শহর থেকে দূরে কোথাও আছি।
দাদার সখের বাড়ি।
আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে কিনেছিলেন। তখন যেমন ছিল এখনও তেমন আছে।
দাদার কথা কিছু ভাবলি।
ভেবেছি। তনুর সঙ্গে একবার কথা বলি। ওখানে পাঠাবার ইচ্ছে আছে।
গুড আইডিয়া। আমার মনে হচ্ছে ওখানে গেলে কিছুটা ইমপ্রুভ হবে। ওদের অনেক অপশন।
আমার জন্য দাদা অনেক করেছেন। আর দাদার ওই সময় আমি পাশে থাকতে পারলাম না। শুনলাম আমি নাকি তখন জ্ঞান হারিয়ে পরেছিলাম।
তখন তোর বৌদি বার বার আমাকে আসতে বলেছিল আসি নি। প্রটোকলে অনেক বাধা। তবে আমার লোক রেগুলার আপডেট দিত।
মাধবনের খবর কিছু রেখেছো।
ভিকু তোর বলার পর কাজ সেরে দিয়েছে। একটা ফালতু লোক।
ভিকু এখানে না চলে গেছে।
চলেগেছে। থাকে কখনও।
আফতাবের সঙ্গে তোমার কথা হয়েছে।
হয়েছে। এই প্রিয়েডটা খুব টাফ গেল।
কেন?
তোর এই অবস্থা। সেন্ট্রালে একটা চাপা উত্তেজনা। তোর খবর পেয়ে আফতাব তেল পাঠানো বন্ধ করে দিল। মিনিস্টার আবার আমাকে ডেকে পাঠাল।
ভেতরের ব্যাপার কিছু বলেছো নাকি?
এগুলো বলতে হয়। খবর পৌঁছে যায়। আমাকে বললো তুমি ব্যবস্থা করো। আমি দায়িত্ব নিচ্ছি। তখনই তো মাধবন ঘুটিটা খেললো।
আফতাব ভাইয়ের সঙ্গে তিনমাস কথা বলিনি।
এরা তনুদের আটকে দিয়েছিল। কিছুতেই যেতে দেবে না। তারপর মন্ত্রী নিজে ইনিসিয়েটিভ নিয়ে ব্যবস্থা করলো।
অনিমেষদা কি বললো?
কয়েকজন আইপিএস অফিসারকে ছেড়ে দেবে। রাখতে চাইছে না। রাখলেও খোঁয়াড়ে পাঠাবে।
আচ্ছা এরা তো কম টাকা পায় না?
সবাই কি সমান। ক-জন রাঘবনকে তুই পাবি।
প্রবীরদাকে সিএম বানাবে।
ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলে খুব একটা খারাপ মনে হলো না।
একসময় অনেক নোংরামি করেছে। এখন যথেষ্ট সভ্য হয়ে গেছে।
তোকে খুব ভালোবাসে। কাল বলছিল, অনি আমার চোখ ফুটিয়ে দিয়েছে। ওর মতো নির্লোভ ছেলে দ্বিতীয় দেখি নি।
আফতাবভাই এখানে বকলমে রিফাইনারি করতে চাইছে।
আমাকে বলেছে। কাগজপত্র তোর কাছে।
হ্যাঁ।
এরা গভর্ণমেন্ট ফর্ম করলে ফাইলটা পাঠা আমি মিনিস্টারের সঙ্গে কথা বলবো।
কথা বলতে বলতে পেয়ারা গাছটার তলায় এসে দাঁড়ালাম।
দাঁতন করার অভ্যাস আছে।
ছাত্রাবস্থায় করতাম। নিমডাল পাবি কোথায়?
নিমডাল কেন পেয়ারার কচি ডালে করো দেখবে আলাদা টেস্ট।
দে দেখি টেস্ট করি।
আমি পেয়ারা গাছের একটা সরু ডাল ভাঙলাম। দুটুকরো করে ওকে একটা দিলাম, নিজে একটা নিলাম। এপাশে আস্তে দেখলাম সবাই উঠে পরেছে। দাদাকে ধরে ধরে অনন্য হাঁটাচ্ছে। মাঝে মাঝে একটু একটু ছেড়ে দিচ্ছে।
আমাদের দুজনকে দেখে হাসলো।
কখন উঠেছিস? কথাটা জড়িয়ে যাচ্ছে।
পাঁচটা।
রাঘবনের দিকে তাকাল।
বাড়িটা দেখেছো?
দেখেছি।
সব গাছ আমি লাগিয়েছি। এখন আর পারি না।
রাঘবন মাথা নীচু করে নিল।
আপনি অনন্যর হাত ছেড়ে দিন। একা একা হাঁটুন।
পারি না, ভয় লাগে, যদি পরে যাই। আবার এদের কষ্ট।
পারবেন। একটু চেষ্টা করুণ।
রাঘবন এগিয়ে গেল।
অনন্য হাতটা ছেড়ে দিল। দাদা কিছুটা হেঁটে দাঁড়িয়ে পরলো।
দাদাকে দেখে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল।
অনন্য এবার দুদুনকে ছেড়ে দে।
আর পাঁচ মিনিট। তারপর ব্যায়াম আছে।
আমি দাঁড়ালাম না। বাগান থেকে উঠে চলে এলাম।
রাঘবন আমার দিকে একবার তাকাল। তারপর নিজেও ধীর পায়ে চলে এলো।
ঘরে এসে মুখ ধুলাম। এরই মধ্যে দেখলাম ঘরটা ঝকঝকে হয়ে গেছে।
রাঘবন বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে বললো, স্নান সেরে একটু ঠাকুর ঘরে যাব।
দাঁড়াও বড়োমাকে ডাকি।
বেরিয়ে এসে দেখলাম বড়োমা নেই। ছোটোমা রান্নাঘরে।
ছোটোমা, বড়োমা কোথায়?
ওপরে ঠাকুর ঘরে।
অনিসাকে বলো, একবার খবর দিতে, এখন যেন না বেরোয়। রাঘবন একবার যাবে।
পূজো করবে?
প্রণাম-টোনাম করবে হয়তো।
ছোটোমা হাসলো।
এসে দেখি রাঘবন নেই, বুঝলাম বাথরুমে চলে গেছে। ঘড়ির দিকে চোখ গেল। দেখলাম পৌনে সাতটা।
আবার এই ঘরে এলাম।
জ্যেঠিমনি, দামিনীমাসি চলে এসেছে।
একটু চা খাওয়াবে।
নীরু বলেগেছে খালি পেটে কয়েকটা ওষুধ খেতে হবে। মিত্রার কাছে আছে। ছোটোমা চেঁচাল।
ওকে দেখতে পাচ্ছি না।
ওপরের ঘরে আছে। দেখ দিদির সঙ্গে লেগে পরেছে কিনা।
দূর আমি এখানে বসলাম।
রাঘবন কোথায়?
বাথরুমে ঢুকেছে। ওতো আবার ও ঘরে মিটিং করবে।
কারা আসবে?
বলতে পারবো না। তবে ওর পিএ এলে জানতে পারবো।
অনিসা ঘরে ঢুকলো।
তুমি ডেকেছো।
রাঘবন আঙ্কেলকে একবার ঠাকুরঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে আয়।
কোথায়?
দেখ বাথরুম থেকে বেরিয়েছে কিনা।
অনিসা বেরিয়ে গেলো।
ডাক্তারদাদার সঙ্গে অনিমেষদা, বিধানদা ঢুকলো।
বৌদি কোথায়? অনিমেষদার দিকে তাকালাম।
কি করে জানবো। এখানেই কোথাও আছে। তুই কখন উঠেছিস?
পাঁচটা।
ছোটো চা করেছো?
করেছি দাদা। বসুন, দিচ্ছি।
তোর রাঘবন কোথায়? অনিমেষদা আমার দিকে তাকালো।
স্নান করছে, ঠাকুরঘরে ঢুকবে।
ভদ্রলোকের প্রচণ্ড নিষ্ঠা।
এখানে তবু ঠিক আছে ওর দেশের বাড়িতে ব্রাহ্মণ ছাড়া ঘরের চৌকাঠে উঠতে পারে না কেউ।
অনিসা ঘরে ঢুকলো।
কিরে।
আঙ্কেলকে পৌঁছে দিয়ে এলাম। মা বললো তোমায় ওষুধ দিতে।
কোথায় দিয়ে এলি! অনিমেষদা বললো।
ঠাকুর ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে এলো।
অনিসা বড়োমার ঘরে ঢুকলো।
ছোটোমা।
ষাঁড়ের মতো চেঁচাস না।
পুঁচকে দুটো এখনও ঘুমচ্ছে?
ওপরের ঘরে আছে। তুই ঘুমোসনি বলে কি কেউ ঘুমোবে না।
তোমাদের সঙ্গে রাঘবনের মিটিং কখন? অনিমেষদার দিকে তাকালাম।
সাড়ে তিনটে।
কাগজপত্র রেডি করেছো?
ওমনি টোকা মেরে নিয়েছিস।
আমি মারতে যাব কেন। নিজেই বললো।
ডাক্তারদাদা হাসছে।
একটা ভালো অফার দিতে পারি। দেড়শো কটি টাকা কাটমানি দিতে হবে, পারবে।
অনিমেষদা, বিধানদা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।
অনিসা আমার হাতে জলের গ্লাস ওষুধ ধরিয়ে দিল। গেট দিয়ে দেখলাম নেপলা, ইসলামভাই ঢুকলো। হাতে দুটো বড়ো বড়ো ঝুড়ি। তার পেছনে রতন, আবিদ, চিকনা। বুঝলাম কচুরী, জিলিপি, মিষ্টি এলো।
ওষুধ খেতে খেতেই ওদের দিকে তাকিয়ে একবার হাসলাম।
দিদি কোথায় রাখবো?
টেবিলে রাখ। ছোটোমা রান্নাঘর থেকে মুখ বাড়িয়ে ইসলামভাইকে বললো।
অনন্য দাদাকে নিয়ে ঘরে ঢুকলো। দাদা একেবারে এই হিমপড়া সকালেও ঘেমে নেয়ে গেছে। অনন্য আস্তে আস্তে ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে দাদার ঘরে ঢুকলো। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম। মনটা মাঝে মাঝেই খচ খচ করে উঠছে।
কখন উঠলি? ইসলামভাই এসে বসলো।
পাঁচটা।
ঘুমোসনি!
হ্যাঁ। রাঘবন মর্নিংওয়াক করে, তাই ঠেলে তুলে দিল।
সাহেব কোথায়?
ঠাকুর ঘরে।
কিরে ঢিলটা ছুঁড়ে দিয়ে চুপ করে গেলি?
ইসলামভাই তাকাল, অনিমেষদার দিকে।
আবার সাত সকালে কি হলো!
দেড়শো কোটির কাটমানি চাইছে।
কিরে শরীর ঠিক আছে তো?
ইসলামভাই আমার দিকে তাকাল।
বেশি কথা বললে ওটা কিন্তু পঁচিশ বেরে যাবে।
ওরে বাবা।
অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে। বিধানদা, ডাক্তারদাদা সমানে হেসে চলেছে।
ইসলাম তুমি এদিকে এসো, আমি ওর পাশে গিয়ে বসি।
ইসলামভাই উঠে দাঁড়াল। অনিসা হাসছে।
উঃ দাদাই তুমিও পারো।
তোর বাবা সক্কাল সক্কাল গাঁজা খেয়েছে কিনা একটু ভেরিফাই করি।
ছোটোমা অনেকক্ষণ ওষুধ খাওয়া হয়ে গেছে। আমি চেঁচালাম।
দাদা ঘর থেকে আসবেন তারপর পাবি।
সেটা বললেই হয়ে যেতো।
অনিমেষদা আমার দিকে ঝুঁকে পরে বললো, বল না। তোর কি প্রজেক্ট।
আগে টাকার হিসাবটা করো, ফোঁকটসে অনেক করেছি, আর নয়।
ওমা, তুমি আবার ওর পেছনে লেগে পরেছো কেন! বৌদি বলতে বলতে ঘরে ঢুকলো। এরই মধ্যে স্নানসারা হয়ে গেছে। কাপরটাও বেশ সুন্দর পরেছে।
বৌদি—
বৌদি আমার দিকে তাকালো।
সুরোর ছেলেটা ওঠে নি?
সব ঠাকুর ঘরে ঢুকে পরেছে।
ঠাকুর আছে না ওরা সিংহাসনে উঠে পরেছে।
আর বলিস না। রাঘবন কান ধরে ওঠ বস করে, ওরাও করে। ওদের সাউথ ইণ্ডিয়ান প্রণাম শেখাচ্ছে। আবার মন্ত্র উচ্চারণ করাচ্ছে। ভালো সংস্কৃত জানে।
ওরও ওইরকম একটা নাতি আছে। ওটা ওদের ঘরাণা।
খুব নিষ্ঠা। দিদি কি খুশী। আবার ঘণ্টা বাজিয়ে আরতি করলো।
তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলে?
সুযোগ পেলেই খোঁচা মারবি, তাই না—
ঝুড়ির কচুরী গুলো ঠাণ্ডা হয়ে যাবে বাঁটার ব্যবস্থা করো।
তুই কিন্তু ব্যাপারটা ঝুলিয়ে রাখছিস—
অনিমেষদার দিকে তাকালাম।
একে একে সব নিচের ঘরে জড়ো হচ্ছে।
অনন্য দাদাকে নিয়ে ঘরের বাইরে এলো। দাদাকে এখন বেশ চকচকে লাগছে। মুখের যে ক্লান্তির ভাবটা ছিল অনেকটা কেটে গেছে। অনন্য, দাদাকে ধরে নিয়ে এসে ডাক্তারদাদার পাশে বসিয়ে দিল।
রাঘবনরা সব এক সঙ্গে ঘরে ঢুকলো। ওর দুই হাতে সুরোর ছেলে আর মিলির মেয়ে।
রাঘবন আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
ওদের একটা কথাও বুঝতে পারছি না অনি।
মেয়ের কাছে বাংলা শিখে নাও।
শিখতেই হবে।
সকলের কপালেই তো দেখছি দাগ মেরে দিয়েছো।
ধুনির। তুই তো নাস্তিক।
দুজনে মহা খুশি। হি হি করে হাসছে।
তোমার মিটিং কটায়?
পিল্লাই এসেছে। ও ঘরে অপেক্ষা করতে বলেছি সকলকে।
কটায় বেরবে?
দশটা পঁয়তাল্লিশ। এগারোটায় মিটিং।
বিকেলে ফ্লাইট কটায়?
বিকেলে যাব না। রাতে যাব।
কেন?
বড়োমা বললো দক্ষিণেশ্বর নিয়ে যাবে।
হেসে ফেললাম।
বড়োমাও আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
ওখান থেকে এয়ারপোর্ট চলে যাব।
এই মিটিংটা কখন সেটেল করলে?
এবার ঘর শুদ্ধ সবাই হেসে ফেলল।
তোমরা দুজন না আর কেউ আছে?
ওটা আমার ব্যাপার তোকে ভাবতে হবে না। তুই তো যাবি না।
রাঘবন চেয়ারে বসলো। ওর দুই পায়ের ফাঁকে মাম্পি, মিকি দুজনে ঢুকে পরেছে।
কচুরী খাবে?
রাঘবন আমার দিকে তাকাল।
পুরী।
মাথা দোলাচ্ছে। খাবে।
পিল্লাই এসে ঘরের সামনে দাঁড়াল।
স্যার।
এসেছেন?
হ্যাঁ স্যার।
আপনি কাগজপত্র দেখুন আমি যাচ্ছি।
আচ্ছা স্যার।
কারা এসেছে?
স্টেটের মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব আর সব কে কে আছেন।
ছোটোমা ও ঘরের জন্য দু-জনকে এ্যাপয়েন্টমেন্ট দাও।
তোকে বক বক করতে বলেছি।
রাঘবন হাসছে।
(আবার আগামীকাল)