জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১২৮ নং কিস্তি
আজ প্রায় দেড়মাস হয়ে গেলো তুই নার্সিংহোমে। এখন তুই অনেকটা সুস্থ। একটু আধটু কথা বলছিস। ডাক্তারদাদার কঠোর অনুশাসন, বাইরের কোনও সংবাদ যেন ওর কানে না যায়।
আমরা তা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলছি।
অর্ক নিরুদ্দেশ, চিকনা নিরুদ্দেশ, ইসলামভাইরাও তথৈবচ। ফোনে একটু আধটু কথাবার্তা হয়। অনিমেষদারা নিয়ম করে একবার আসে, খোঁজ খবর নেয়, ফিরে যায়।
রুটিন মাফিক পুলিশের বড়বাবুরা আসে। তোর খোঁজ খবর নেয়। তুই সুস্থ কিনা জানে, ফিরে যায়। কনিষ্করা পরিষ্কার বলে দিয়েছে, আমাদের লিখিত পার্মিশন ছাড়া একটা কথাও ওর সঙ্গে বলতে পারবেন না।
চারদিকে টলমল অবস্থা।
সবকিছুর মধ্যে তুই অন্ততঃ ভালো হয়ে উঠছিস এটাই একমাত্র ভাল খবর।
ও বাড়িতে যাওয়ার পর এ বাড়ি মুখো হই নি।
ডাক্তারদাদা সব দেখাশুনো করছে। ছগনলাল আর জগনদের যা কিছু প্রয়োজন ডাক্তারদাদার কাছ থেকেই চেয়ে নেয়।
আজ অফিসে এসে বসতেই ফোনটা বেজে উঠলো। নম্বরটা অচেনা ঠেকলো।
ধরলাম।
হ্যালো।
মিত্রা ব্যানার্জী কথা বলছেন।
হ্যাঁ।
মন্ত্রী সাহেব আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চান।
কে মন্ত্রী?
মিঃ অনাদি চন্দ্র।
তারপরেই অনাদির গলা পেলাম।
মিলি বসেছিল। ইশারা করে বললো ভয়েজ অন করো আর রেকর্ডিং করো।
হ্যালো। মিত্রা বলছো।
প্রথম অনাদির মুখ থেকে এই সম্ভাষণ শুনলাম। একটু খটকা লাগলো।
মিলি দাঁত কিড়মিড় করছে।
বলছি।
আমি অনাদি।
বলো।
অনি কেমন আছে?
ভালো আছে।
সেন্স এসেছে?
কখনও আসছে, কখনও চলে যাচ্ছে।
ডাক্তারদাদা কি বলছেন?
কোনও এ্যাসুয়রেন্স দিতে পারছেন না।
আইন মাফিক কিছু কাজ কর্ম আছে, সেরে ফেলতে হবে।
চুপ করে রইলাম।
তুমি একটু কনিষ্কদের বোঝাও। ওরা যেন একটু পার্মিশন দেয়।
ওটা পারবো না।
তাহলে ব্যাপারটা আমার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। এরপর কিছু অঘটন ঘটে গেলে, আমি কোনও সাহায্য করতে পারবো না।
অঘটন ঘটার আর কি বাকি আছে?
দেখো ওর নামে অনেক এলিগেশন জমা পড়েছে। প্রমাণ হলে ফাঁসি পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে।
আইনে ফাঁসি হলে হবে। সেখানে তোমার কি করার আছে।
আমরা এক গ্রামের ছেলে, ছোটবেলাকার বন্ধু।
অন্য কিছু জানার থাকলে বলো।
তারমানে তুমি সাহায্য করতে পারবে না?
সম্ভব নয়।
অর্ককে একটু সামলাও, তোমার কাগজের স্টাফ, হয়তো তোমার কাগজের ওপর সাধারণ মানুষ তাদের ক্ষোভ দেখাতে পারে।
দেখাতে দাও। অইনত তা সামলাবার চেষ্টা করবো।
তুমি একটু কো-অপারেট করলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
তার আর দরকার পরবে না।
তোমার কাগজ আমার এগেনস্টে মিথ্যে লিখছে।
কেস করো। প্রমাণ করতে পারলে, তাকে জেলে ভরে দাও। তুমি তো মন্ত্রী।
এখন যা দেখছো, এর পরের স্টেপটা আরও কঠিন হবে।
বাকি কি আছে?
তোমার ছেলেমেয়েকে নিয়ে এবার টানা টানি শুরু হয়ে যাবে।
মনে হচ্ছে তুমি ভয় পেয়েছ, তাই এই নোংরা খেলায় মেতে উঠতে চাইছ।
অনাদি কোনও দিন ভয় পায় না। ভয় পেলে সে এই জায়গায় পৌঁছতে পারতো না।
সরি আমার কাজ আছে, রাখছি।
ফোনটা কেটে দিলাম।
মিলি উঠে এলো। আমার পাশে দাঁড়াল।
চুপ চাপ মাথাটা ধরে কিছুক্ষণ বসে রইলাম।
লোকটা কি শয়তান বলো। অনিদা আবার এর জন্য একসময় কতো করেছে।
একবার সেই দিনগুলোর কথা ভাব।
মিলির দিকে তাকালাম।
ক্ষমতা মানুষকে কতটা নোংরা করে দেয় তা আজ বুঝছি। একবার অনিদাকে সুস্থ হতে দাও।
সেই নিয়ে আমার আর এক টেনশন।
টেনশনের কিছু নেই, তুমি একবারে বাধা দেবে না।
কাকে বাধা দেব মিলি। ওকে যদি ধরে রাখতে চাই, অর্ক, অরিত্র ছেড়ে দেবে? ভেতরে ভেতরে খালি গুমড়ে যাচ্ছে। কেউ ধারে কাছে আসে? ভাবছিস কোনও খবর কানে আসে না?
তুমি সাপোর্ট না করলেও আমি করবো।
আমি চুপ চাপ বসে রইলাম।
একটু জল খাও। মিলি জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিল।
একদিকে দাদা আর একদিকে ও। বাড়ি শিল মেরে ফেলে রেখে দিয়েছে। সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে ভাবতে আর ভালো লাগে না।
ইসলামভাই কিছু করতে পারছে না?
শুনলাম সে শুধু দিল্লী, বম্বে করে বেরাচ্ছে। নিয়ম করে প্রতিদিন একবার ফোন করে, বুবুনের খবর নেয় ছোটোমার কাছে, রেখে দেয়।
অনিমেষদা।
ডাক্তারদাদাকে বলে তারাতারি সুস্থ করুণ ওকে কথা বলতে দিন। সময় চলে যাচ্ছে।
ডাক্তারদাদা হাসে।
মাঝে মাঝে ভাবি একটা মানুষ কত জনকে বেঁধে রেখেছে।
তুমি কয়েকদিন আগের একটা ঘটনা শুনেছো।
কি বলতো!
ও এসে বলছিলো।
কে, কনিষ্ক?
হ্যাঁ।
কি হয়েছে!
সকালের দিকে দু-জন স্যুইপার করিডরে কাজ করছিল। এসে দেখে একজন কাজ করছে আর একজন নেই।
ও ক্যাজুয়েলি অনিদার কেবিনে ঢুকে দেখে, আর একজন অনিদার মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে অনিদাকে চাপা স্বরে ডাকছে। অনিদা চোখ খোলো, দেখো আমি এসেছি। তুমি একবার শুধু বলো, আর কারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
ও তো ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়ে চেঁচাতে শুরু করে।
তখন সেই ছেলেটা কোমর থেকে রিভালবার বার করে ওর গলা টিপে ধরে।
একবারে চেঁচাবিনা। এখানেই মেরে দিয়ে চলে যাব। ওর মুখের মধ্যে রিভালবার গুঁজে দিয়েছে।
আমাকে বললো, কি বলবো মিলি, জীবনে ওর মুখ থেকে অনেক গল্প শুনেছি। এই রকম বাস্তব অভিজ্ঞতা যে আমার হবে তা ভাবি নি।
আমার হাত-পা তখন থর থর করে কাঁপছে। ছেলেটার চোখে মুখে কি জিঘাংসা।
তুই কে।
আমি ডাক্তার।
হারামী আগে বলবি তো। দাদাকে তারাতারি সুস্থ কর। আমাদের বিজনেসের অনেক হ্যাম্পার হয়ে যাচ্ছে।
চলে যাচ্ছিল।
ফিরে বললো।
তুই দাদার বন্ধু দেবাকে চিনিস।
না।
তারপর বিড় বিড় করতে করতে চলে গেলো।
আমার তো তখন হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।
বলে কিছুক্ষণ অনির মাথার শিওরে বসে রইলাম। ধাতস্থ হতে সময় নিলাম। নীরু এলো কিছু বলতে পারছি না। ওকে বললাম তুই বোস আমি একটু আসছি।
নিচে আসতে রিসেপসনিস্ট মেয়েটা আমার হাতে একটা খাম দিল।
তখনও আমি টলছি।
খাম খুললাম। ছোট্ট একলাইনের একটা চিঠি। ইংরাজীতে লেখা।
সরি, তুমি যে কনিষ্কদা বুঝতে পারিনি। দাদাকে কোনও দিন বলো না। আমাকে মেরে ফেলবে। ক্ষমা করবে। আলতাফ।
মিত্রাদি চিঠিটা আমি দেখেছি, কি সুন্দর হাতের লেখা। যেন মনে হচ্ছে ছাপানো।
আমি মিলির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। আলতাফ। নামটা নতুন শুনছি।
দেখো নার্সিংহোমে অতো লোক, গেটে ওইরকম সিক্যুরিটি কি করে ঢুকলো বলো।
আর ওদের ঢোকা মিলি। মনে মনে নীরুর কথাটা মনে পরে গেল।
আমার তো মনে হয় নার্সিংহোমের সব কটা লোক ওর নিজের। খুঁজে দেখ ঠিক সূত্র পেয়ে যাবি। ছেলেটা হয়তো নতুন, কনিষ্ককে চিন্তো না। কিন্তু অরিজিন্যাল লোক বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। সেইই সব অপারেট করছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ওকে নার্সিংহোমে কেউ কিছু করতে পারবে না।
সেটা ও নিজেও স্বীকার করেছে। আমরা কি অনিকে ভালোবাসি মিলি। ওকে ভালোবাসার লোক প্রচুর। কতো লোক নার্সিংহোমে প্রতিদিন আসে বলো। কাকে তুমি চিনবে। আর স্যুইপারকে আমি কোনও দিন চিনে রাখি নি। যারা ওদের কনট্যাক্ট নেয় তারাই সব অপারেট করে। আমরা মাসে মাসে বিল দিই।
ছিদামকে একটু চায়ের কথা বল।
মিলি ফোনটা টেনে নিল।
আমার ফোনটা বেজে উঠলো।
কে?
মেয়ে।
বুঁচকি এই সময়, ভয়েজ অন করো শুনি কি বলছে।
আমি হাসলাম।
বল।
মা।
বলছি।
ডাক্তারদাদাই বাবার মাথার ব্যান্ডেজ খুলে দিয়েছে। বাবার সঙ্গে কথা বললাম। কতোটা কেটেছে মা। কতো শেলাই।
মেয়ের গলার স্বর ভাড়ি হয়ে এলো।
আমার চোখটাও ভারি ভারি ঠেকলো। সামলে নিলাম।
তুমি আসবে মা। বাবা বলছিল।
একটু পরে যাচ্ছি।
দিদানরা এখনও আসে নি। আমি দাদা আছি। অনিমেষদাদাই এসেছিল চলে গেছে।
বাবার সঙ্গে দেখা করে নি?
না। নিচে ডাক্তারদাদাইয়ের সঙ্গে কথা বলে চেলে গেল।
ঠিক আছে আমি যাচ্ছি।
ফোনটা রাখতেই মিলি ছিদামকে ফোন করে তারাতারি চা নিয়ে আসার কথা বললো।
দাঁড়াও টিনা, অদিতিকে একবার ফোন করি। ওরা যদি যায়।
তনুকে আজ তোর সব শুভ সংবাদ জানালাম।
বেচারা কাঁদছে। সান্ত্বনা দেবার ভাষা আমার জানা নেই। সুন্দরের সঙ্গে বোচন, বুঁচকি দু-জনেই কথা বললো। আসতে চাইছে কি বলি বলতো।
সত্যি তুই আমাকে এমন গাড্ডায় ফেলে দিলি। আমি শিখতে না চাইলেও ঘার ধরে তুই শিক্ষা দিবি। ডাক্তারদাদা সেদিন বলেছে বোচন একবারে অনির মতো হার্ডি। দেখবি ও অনেক বড়ো ডাক্তার হবে।
আমি হেসেছি।
কাল রাতে নিজের ঘরে শুতে এসে হঠাৎ করে বিয়ের দিনটার কথা মনে পড়ে গেল।
হুড়মুড় করে তুই এসে স্ব-শরীরে হাজির হলি।
সোফাটার দিকে তাকালাম। দেখলাম তুই হেলান দিয়ে শুয়ে আমাকে ডাকছিস। কাছে গিয়ে সোফাটাতে বসলাম। তোর স্পর্শ পেলাম।
সোফার দিকে তাকিয়ে খাটটার দিকে তাকালাম। প্রথম যেদিন তুই এই বাড়িতে এসেছিলি, সেদিনটার কথা মনে পড়ে গেল। নিজের মনে নিজে হাসি।
তোর কথায়, পাগলের গোবরে আনন্দ।
জানিস বুবুন একা একা বসে এই কথাগুলো ভাবতে ভীষণ ভালো লাগছিল। আমার ঘরটার চারদিকে যেন তুই ঘোরাঘুরি করছিস। তোর ফিচলেমি খোঁচা খুঁচি।
মাঝে মাঝে কেঁদেও ফেলি।
তারপর আলমাড়িটা খুলে বসলাম। বিয়ের দিন সেই চোরা কুঠরিটা খুলেছিলাম। তারপর আর খোলা হয় নি। মাঝে মনে হয় একবার এসে খুলেছিলাম, অনিমেষদা কি সব কাগজ দেখতে চেয়েছিলো তার জন্য। সমস্ত টেনে নামালাম।
সেদিন তুই হেল্প করেছিলি। আজ নিজেই সব টেনে বার করলাম।
বাবার ডাইরীটা খুললাম, দেখলাম। আমার পুরনো সব দলিলগুলো দেখলাম। জানিনা এইগুলোর অবস্থা এখন কি অবস্থায় আছে। তখন তুই বলেছিলি, কাজগুলো শেষ হলে এইগুলো নিয়ে পরবি।
তোর কাজ এই জীবনে শেষ হবে না।
দামিনীমাসির কাছ থেকে তোর আমার চিঠিগুলো নিয়ে এসে এখানে রেখেছিলাম। সেগুলো বার করলাম। কেমন ফেটে ফেটে গেছে। বসে বসে অনেকক্ষণ পড়লাম।
যেনো বার বার তিরিশ বছর আগে ফিরে যাচ্ছি। তুই আমি হেঁদোতে বসে আছি। কলেজে এক সঙ্গে পাশা পাশি ক্লাসে বসে ডা. রায়ের ক্লাস করছি।
আমি তুই হাঁটতে হাঁটতে চুড়মুড় ভাজা খেতে খেতে শ্যামবাজারের দিকে হেঁটে যাচ্ছি। একটা নস্টালজিয়া আমাকে ঘিরে ধরলো।
কতোক্ষণ এইগুলো নিয়ে ঘাঁটা ঘাঁটি করেছিলাম জানি না।
হঠাৎ ধ্যান ভঙ্গ হলো ঘড়ির ঢং ঢং শব্দে। বাবার আমলের ঘরি। টাইম ঠিক দেয় না। তবে চলে। তাকিয়ে দেখলাম পাঁচটা বাজে। হাসলাম।
রবীন সপ্তাহে একদিন ওপরে উঠে এসে দম দেয়।
আবার সব গুছিয়ে তুলে রাখলাম।
কি কষ্ট তোকে কি বলবো। টেনে নামাবার সময় এতো কষ্ট হয় নি।
বিছানায় এসে শুলাম। আবার একরাশ চিন্তা মাথায় এসে হাজির হলো। চিন্তাগুলো কি বিটকেল দ্যাখ। এতোক্ষণ এর মধ্যে ডুবে ছিলাম কোনও চিন্তা মাথার মধ্যে আসেনি। যেই ফ্রেস মুডে শুতে এলাম। ওমনি বিশ্রী চিন্তাগুলো ভিড় করে এলো।
তোকে তো বলি নি। ডাক্তারদা বারণ করেছে। অনাদি নাকি এবার ছেলে-মেয়ের গায়ে হাত দেবে। তখন খুব খারাপ লাগছিল কথাটা শুনে। কিন্তু মন খারাপ করিনি। আমি এটুকু বিশ্বাস করি ও এই কাজ করলে, নিজের কবর নিজে খুঁড়বে, আমার কিছু করার নেই।
ইদানীং মেয়ে এসে প্রায়ই বলতো, মা জানো আমি যখন কলেজ থেকে ফিরি, তখন কারা যেন আমাকে ফলো করে।
বড়োমা একদিন শুনে ক্ষেপে গেল।
এখনই রবীনকে ফোন করে বলে দে, কালকে থেকে বুঁচকিকে কলেজে দিয়ে আসবে আর নিয়ে আসবে। সঙ্গে সঙ্গে মেয়ের সঙ্গে তার দিদান আর দিদাইয়ের ফাটাফাটি শুরু হয়ে গেল।
শেষ পর্যন্ত দাঁড়ালো, এ্যাঁ কততো খায়।
আমি হাসি।
একদিন ইসলামভাইকে ফোন করে ব্যাপারটা বললাম। কি করি বলো দাদাভাই।
দাঁড়া কালকেই খোঁজ নিচ্ছি।
আবার পরদিন ফোন করলাম। হতাশা ভরা গলায় বললো, আমার কিছু করার নেই মামনি। ওরা অনির স্পেশ্যাল ব্রাঞ্চের লোক কারুর কথা শুনবে না। অনি যতদিন না বাড়ি ফিরছে এটা চলবে। তোর পেছনে আমার পেছেনেও লোক লাগান আছে।
কেন!
ওরা ভেবে নিয়েছে অনির পরিচিত কোন কোন জনের ওরা ক্ষতি করতে পারে, তাদের পেছনে লোক আছে।
তোমাকে কে বললো?
আবার কে নেপলা। নেপলাকে ফোন করেছিলাম, সব বললো। এমনকি নার্সিংহোমের আশেপাশেও লোক আছে।
মিলির কথাটার যৌক্তিকতা খুঁজে পেলাম।
নাম জানতে পেরেছ।
নেপলা বললো এরা আলতাফের লোক।
কনিষ্ককে আলতাফই চিঠি দিয়েছিল।
সেটা আবার কে!
এরা সব বড় বড় মানুষ, বুঝলি মামনি। আমরা সব চুনোপুঁটি। ধোপে টিকবো না। আরও সব জেনেছি, তোর সঙ্গে দেখা হলে বলবো। ওর টিকি কোথায় কোথায় বাঁধা আছে একমাত্র নেপলা জানে।
তোমাকে কিছু বলে নি?
সব কি বলে। আভাসে ইঙ্গিতে এটুকু বুঝি ওর কিছু হলে নেপলা গেমটা হাতে নেবে। নাহলে যেমন চলছে তেমন চলবে।
তুমি নেপলার ফোন নম্বর দাও?
লেখ।
আমাকে নম্বরটা দিল। দেখলাম আগের নম্বরের সঙ্গে মিলছে না।
ঠিক আছে।
পরের দিন নেপলাকে ফোনে ধরলাম।
ফোনটা ধরেই বলে, বলো ম্যাডাম, নিশ্চই ভাইদা তোমাকে কুটুর কুটুর করে সব লাগিয়েছে?
না।
তাহলে আমার ফোন নম্বর পেলে কি করে? এই নম্বরটা ভাইদা ছাড়া কেউ জানে না—
কি সব শুরু করেছো?
আমি শুধু হুকুম তামিল করছি। না হলে আমাকে মরতে হবে।
আলতাফটা কে শুনি?
আফতাবভাইয়ের ইন্ডিয়ার এজেন্ট। নিজে চোখে সব দেখে এসেছে। এখন ওরা যা বলবে আমাকে শুনতে হবে। আমার ডিউটি ওদের চিনিয়ে দেওয়া। আমি চিনিয়ে দিয়েছি।
সেই তেল কোম্পানির মালিক?
হ্যাঁ।
সব্বনাশ!
আফতাবভাইকে দিনে তিনবার অনিদার সম্বন্ধে রিপোর্ট করতে হয়। এবার বলো কি করবো। এছাড়াও আরও দু-জন আছে। আমি তাদের চিনি না। তবে অনিদা চেনে।
নেপলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। থেমে থেমে বললো।
অনিদা কারুর কাছে কোনওদিন মুখ ফুটে কিছু চায় নি। ওদের কথা, এটা অনিদার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। আমিও এখানে এসে অনেক ঝাড় খেয়েছি।
কেন!
সেদিন অনিদাকে যেতে না দিয়ে যদি এখানে ফোন করতাম তাহলে এত কাণ্ড ঘটতো না। আমি এক্সপেক্ট করতে পারিনি, ঘটনাটা এদিকে টার্ন করে যাবে। তোমার সঙ্গে দেখা হলে মুখো মুখি সব বলবো।
ভাবছিলাম ওকে অনাদির ব্যাপারটা বলবো কিনা। কি মনে হলো ওকে বলেই দিলাম।
শুনে বললো। শুধু মাথায় রাখবে এখন যে অবস্থা আছে সেই অবস্থা যদি একটু বিগড়ে যায়, শুধু অনাদিদা নয় ওর টিমের মিনিমাম কুড়ি জন ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। যত বড়ো জেড ক্যাটাগড়ির ভিআইপি হোক না, ওর দেহরক্ষী ওকে মেরে দিয়ে নিজে মরে যাবে।
আমি এখন আফতাবভাইয়ের হাতের পুতুল।
ঠিক আছে। তোমরা সব ভালো আছো।
হ্যাঁ। দাদা আজ সকালে লিকুইড খেয়েছে। নাক মুখ থেকে নল খোলা হয়ে গেছে।
তুমি জানলে কি করে!
যখন খোলা হচ্ছে তখন জানতে পারলাম। ডাক্তারদাদা, কনিষ্কদা, নীরুদা ছিল। বুঁচকি কলেজ থেকে বেরিয়ে এসেছে।
আমি হাসছি।
ধন্য তোকে বুবুন। এ তো সিনেমায় হয়, বাস্তবে এরকম হয় আগে জানা ছিল না।
আজ অফিসে এসে দেখলাম গেটের ঠিক অপজিটে অনাদির পার্টির ব্যানার লাগিয়ে ছোটো একটা স্টেজ করা হয়েছে। আমি আর তাকায় নি। সোজা অফিসের ভেতরে চলে এলাম। নিজের ঘরে এসে বরুণদাকে ফোন করলাম।
বললো তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। আমি পুলিশকে জানিয়ে দিয়েছি।
তবু মনের মধ্যে একটা চাপা টেনশন।
বুঁচকিকে ফোন করলাম।
তুই কোথায়?
কলেজে। জানো মা আজকে বেশ একটা মজা হয়েছে।
বুকটা ধক করে উঠলো। তাহলে—
কি হয়েছে!
কবিতা মাসির ছেলে আজ গাড়িতে করে কলেজে পৌঁছে দিয়েছে। আমি প্রথমে চিনতে পারি নি। ও কি করে এতো ফর্সা হলো। তার ওপর গালের সেই কাটা দাগটাও নেই।
সেটা আবার কে?
ভিকি গো ভিকি। কবিতা মাসির ছেলে। এরই মধ্যে ভুলে গেলে।
মেয়ে তরতর করে চলেছে।
শ্যামবাজার বাটার কাছে এসেছি। দেখি একটা কালো গাড়ি সামনে এসে দাঁড়াল। গেটটা খুলে বললো, বোন গাড়িতে উঠে আয়, তোকে আজ বাসে যেতে হবে না।
প্রথমে একটু অবাক হয়েছিলাম, তারপর বললো তুই চিন্তে পারছিস না, আমি ভিকি। আমাকে কলেজের গেটে নামিয়ে দিল। আমাকে ক্যাটবেরি কিনে দিয়েছে। বলেছে কলেজ থেকে বেরবি না। আমি এসে তোকে নিয়ে যাব।
মন মানে না। কে ভিকি। আবার মাসিকে ফোন করে সব জানালাম।
মাসি বললো সব জানে। তোকে চিন্তা করতে হবে না। তুই তোর কাজ কর।
বোচনকে ফোন করলাম।
বললো অফ প্রিয়েড কলেজ ক্যান্টিনে বসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারছে।
কলেজে যেতে অসুবিধে হয় নি।
না। কেন মা, কিছু হয়েছে?
এমনি জিজ্ঞাসা করলাম।
তোমাকে ভাবতে হবে না। আমি ঠিক আছি। বলে আমাকে একরাশ জ্ঞান দিয়ে দিল।
কনিষ্ককে ফোন করে তোর খবর নিলাম।
বললো ঠিক আছে। সবে ড্রেস করিয়ে এলাম। বহুত ছটফট করতে শুরু করেছে। খালি বলে আমাকে রিলিজ দিয়ে দে বাড়ি যাব। কি বলি বলো।
আমি চুপ করে আছি।
হ্যাঁ শোনো, ওর ফোনটা কোথায়?
কেন!
আমাকে তেড়ে গালাগাল করেছে। ফোনটা একটু মনে করে আজ সঙ্গে নিয়ে এসো।
আচ্ছা। ওকে কি তোমরা ছেড়ে দেবে?
কমবেশি সবই তো বোঝো। ছাড়ি কি করে বলো তো।
তা ঠিক।
আইন কানুনের অনেক ঝামেলা আছে। এই মুহূর্তে ছাড়া যাবে না। বেরবার আগে ওর সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনের এক অংশের বসার কথা। তারা তো ওর সঙ্গে প্রেম করতে আসবে না। ও নিজেও তাদের সঙ্গে প্রেমের কথা বলবে না।
ওই খানেই আমার ভয় কনিষ্ক।
ভয় করে কি করবে। যা হবার তা হবে। এই কয় মাসে অনেক কিছু দেখলাম। অনেক অভিজ্ঞতা হলো ওর সম্বন্ধে। তোমাকে বলতে ভয় হয়। ওর কানে গেলে, সব আগুন লাগিয়ে দেবে। আমি ওকে চিনি।
দিনরাত টেনশনে ভুগছি। আজ দেখি অনাদির পার্টি আমার অফিসের সামনে মিটিং করার জন্য ডায়াস তৈরি করেছে।
ওটাকে আর বাঁচান যাবে না বুঝলে। একটু সুস্থ হলে শেষ করে দেবে।
সেও আর এক ঝড়।
সহ্য করতে হবে। অনুপ বললো, তোমার বয়ানে ওরা খুশি হয়নি। প্রয়োজন পড়লে আবার হয়তো তোমাকে বিরক্ত করবে।
চুপ করে রইলাম।
তুমি কাজ করো, রাউণ্ডে যেতে হবে, কয়েকটা সিরিয়াস পেসেন্ট ভর্তি হয়েছে আজকে।
ঠিক আছে।
কনিষ্ককে রেখে ছোটোমাকে ফোন করলাম।
ছোটোমা বললো, দামিনীমাসি তোর কাছে গেছে, জ্যেঠিমনি, মল্লিকদা বাড়িতে আছে।
দাদার খবর নিলাম। দাদা খেয়েদেয়ে বাগানে এসে বসেছে। কাগজ পড়ছে।
ফোনটা রেখে ছিদামকে বললাম এককাপ চা খাওয়াও।
এই একটা ছেলে তুই তৈরি করেছিস।
সাত চরে রা করে না।
কিছু জিজ্ঞাসা করো, ওমনি একগাল হেসে বলবে কই কিছু হয়নি। আপনি ভুল শুনেছেন। সেরকম হলে আপনাকে বলতাম।
জানি, চা দিতে এলে ওকে যদি এই ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞাসা করি ভাঙা রেকর্ডের মতো এই কথা বলে বিদায় নেবে।
ফাইলের পাহাড় জমে আছে। বরুণদাকে বলেছিলাম, আপনি ছেড়ে দিন না। এক কথা, ম্যাডাম তুমি আমার শালি, তুমি হয় তো ছেড়ে দেবে, অনি এসব শালি-ফালি বোঝে না। ওর শকুনের চোখ, পলক পরে না।
হেসেফেলেছিলাম।
বরুনদা নিজেই বললো, এতো হেসো না। যা সত্যি তাই তোমাকে বললাম।
সবাই তোকে কেন এতো ভয় পায় বলতো? তুই কি সবাইকে যাদু দণ্ডের ভয় দেখাস, এটা করবে না, করেছো, ঠিক আছে তোমাকে মাছি বানিয়ে দিলাম, এটা করবে না, করেছো, তোমাকে মশা বানিয়ে দিলাম।
ম্যাডাম আসবো।
দরজার দিকে তাকালাম। দেখলাম প্রেসের দুজন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।
কি যেন নাম? হ্যাঁ, উদয় আর শেখর।
এসো।
ভেতরে এলো।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো।
বললাম বসো।
চেয়ারে বসলো। চোখ দুটো খুব একটা ভালো দেখলাম না।
কি হয়েছে?
প্রেসে সামান্য গণ্ডগোল হচ্ছে। আমরা কিন্তু ছেড়ে দেব না।
থমকে গেলাম। তারমানে যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই।
কি হয়েছে খুলে বলো?
বাইরে যারা মিটিং করছে, তাদের কয়েকজন প্রেসের স্টাফ, ওরা প্রেস বন্ধ রাখতে বলছে।
বরুণদাকে বলেছো?
বরুণদা ভালো মানুষ। আমরা জানি কাকে কি ভাবে শায়েস্তা করতে হয়। শুধু আপনার কানে কথাটা তুলতে এলাম।
বুঝেগেলাম একটা গণ্ডগোল হতে চলেছে।
ঠিক আছে বসো, আমি বরুণদাকে ডাকি।
বরুণদাকে ফোন করলাম।
ওদের মুখ দেখি বেশ উত্তেজিত।
ছিদাম ভিঁজে বেড়ালের মতো চা দিয়ে চলে যাচ্ছিল।
ওদের দিকে তাকিয়ে বললাম তোমরা চা খাবে?
না ম্যাডাম।
বরুণদা এলো।
আবার কি হলো?
বসুন। আপনি চা খাবেন?
এই খেয়ে এলাম।
ওরা কি বলছে শুনুন।
তোরা আবার এখানে এলি কেন। যা করছে করতে দে-না। যারা কাজ করবে না তাদের জোড় করে করাতে পারবি?
ওরা সাবোতাচ করার চেষ্টা করছে।
ছিদাম কথাটা শুনে বেরিয়ে গেল। আমি শুধু ওর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম।
তোমাদের অনিদা অসুস্থ, এখন এসব ঝামেলায় জড়িয়ে পরো না।
অনিদা অসুস্থ বলে, অনিদার হ্যাণ্ডসগুলো কি অসুস্থ হয়ে নুলো হয়ে গেছে।
উদয় ঝাঁঝিয়ে উঠলো।
প্রথম থেকেই দেখেছি ছেলেটার বহুত টেঁটিয়া। তুই যে ওদের মগজে কি ঢুকিয়েছিস জানি না। একটাই কথা আমরা নুন খেয়েছি।
মনে মনে হাসলাম কাকে কি বলবো। তোর ছোঁয়া সকলের মধ্যে।
বুঝলাম একটা অন্য গন্ধ পাচ্ছি।
দুটোরই গলার স্বর সপ্তমে চড়ে আছে। ওদের কথাবার্তার টোনে এ টুকু বুঝছি, ওদের জিনিষ ওরা বুঝে নেবে। তুই থাকলে হয়তো এতক্ষণে কাজ শুরু করে দিত।
কি করতে চাও বলো?
শুধু আপনি একবার হ্যাঁ বলুন, আধাঘণ্টা সময় নেব, সব মাঠ করে দেব। বাকিটা আমরা বুঝে নেব, আপনাকে বুঝতে হবে না।
বরুণদা মাথায় হাত বোলাচ্ছে।
কাগজের ক্ষতি হবে।
একটুও হবে না। কাগজটা আমাদের পেট।
অন্যভাবে কিছু করা যায় না।
লাথির ঢেঁকি চড়ে ওঠে।
তোর ডায়লগ, এরা পেল কোথায়!
চায়ে চুমুক দিচ্ছি চুপ করে বসে আছি।
হঠাৎ দুজনেই উঠে দাঁড়িয়ে বলে, বুঝেছি আপনি পার্মিশন দেবেন না। আমাদের পথ আমরা বেছে নিচ্ছি।
বোস বোস, কোথায় উঠছো।
আপনি তাহলে হ্যাঁ বলে দিন।
আমি না বললে কি তোমরা কাজটা করবে না।
দেখলাম চুপ করে গেল।
দেখ ঝামেলা ঝঞ্ঝাট যতোটা এড়ান যায় এই সময়, তত ভাল। দেখছো তো চারদিকে কত সমস্যায় জড়িয়ে পরেছি।
সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে, দাদাকে একবার নার্সিংহোম থেকে বেরতে দিন।
এইবার নিশ্চিত হলাম তোর ছোঁয়া এদের লেগে গেছে। এতদিন হাবে ভাবে আঁচ করতাম, আজ নিশ্চিত হয়েগেলাম।
বরুণদার দিকে তাকালাম।
বরুণদা মাথা দোলাচ্ছে।
পুলিশ কি করছে?
ওরা পুতুল, মারপিট হলে মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছাড়া ছাড়ি করবে।
ওরা ওই পাশে মিটিং করছে করতে দাও না।
মিটিং করতে আমরা বাধা দেব না। কিন্তু প্রেসের কোনও ছেলে কাজ চলাকালীন মিটিংয়ে যেতে পারবে না, তাহলে খুব খারাপ হয়ে যাবে।
তখন আমাকে জানিও। ব্যবস্থা নেব।
দু-জনে দেখলাম চলে গেল। আমার এই মাঝা মাঝি কথায় ঠিক খুশী হতে পারল না।
কার কাছ থেকে সঠিক খবর পাবো। টিনা এতটা ভেতরে ঢুকবে না। দেখি পিকু কিংবা বিতানের কাছে কি খবর আছে। ছিদাম সব জানে, ওর পেট থেকে বের করার ক্ষমতা আমার নেই।
বরুণদাকে বললাম, আপনি একবার পিকুকে আর বিতানকে পাঠিয়ে দিন।
ওরাই এই দুটোকে তাতিয়েছে। তোমাকে আর কি বলবো। পিকু তার মশাইয়ের ছোঁয়া পেয়ে গেছে। নয় এসপার নয় ওসপার, মাঝা মাঝি কিছু নেই।
কই আমাকে কিছু বলেন নি!
তোমাকে আর কতো বলি বলো, তোমার মনের অবস্থা বুঝি। তার ওপর আবার এই ঝামেলা। আমাকে ইসিকে একবারে পাত্তা দেয় না। বেশি কিছু বললে বলে, মশাইয়ের কাছে তোমাদের জবাবদিহি করতে হবে না। আমাকে করতে হবে। কথায় কথায় অনির উদাহরণ দেবে, ক্ষমতা বাপের নয় দাঁপের। ভেরুয়ার মতো বাঁচতে পারবো না।
বরুণদা প্রায় কেঁদেই ফেলে। আমি হেসে ফেলি, কিছুতেই চাপতে পারছি না। সব শুনে আকাশ থেকে পড়ি।
এতই যখন বললাম তোমাকে আর একটা কথা বলি।
আবার কি হয়েছে!
মনে হয় একটা মেয়ের চক্করে পরেছে। কাঁচা বয়স, তারওপর সবাই জানে মালিক হয়েছে, বোঝই তো সব। অনির কাছে মুখ দেখাতে পারবো না।
ওটা নিয়ে আপনি ভাববেন না। যদি ভাল হয়, বুবুন আপত্তি করবে না। না হলে এক ধমকে প্যান্টে পেচ্ছাপ করিয়ে দেবে।
ভাল হলে বেঁচে যেতাম। ওর মা বললো অনেক রাত পর্যন্ত ফোনে তার সঙ্গে কথা বলে। ক্লাবে গিয়ে আলাপ।
বেচাল কিছু দেখছেন?
এখনও চোখে পরে নি।
আমি নিজেই ফোন করে বিতান আর পিকুকে ডেকে পাঠালাম। বরুণদাকে বললাম আপনি আসুন। আপনাকে দেখলে যদি কিছু না বলে।
বরুণদা চলে গেল।
কতো সমস্যা দেখেছিস। মিত্রাকে সব সমস্যার সমাধান করতে হবে, তুই মজা করে নার্সিংহোমে শুয়ে থাক। কি না মাথা ফাটিয়েছি।
তোর ওপর মাঝে মাঝে এতো রাগ হয় যে কি বলবো। দাদার সঙ্গে একটু আলোচনা করবো, তারও উপায় নেই। এই অবস্থায় দাদাকে কিছু বলতেও পারি না।
মল্লিকদাকে কিছু জিজ্ঞাসা করলেই বলবে তুই যেটা ভালোবুঝবি করবি। কারুর কথা শুনবি না। এ্যাডমিনিস্ট্রেসনের কি বুঝি বল। আমার কোন ইনটারেস্ট নেই।
ফাইলগুলো উল্টে পাল্টে দেখে সই করলাম কয়েকটায়।
বিতান, পিকু ঢুকলো। কোনও ভ্রুক্ষেপই নেই, চেয়ারে বসলো। মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম। একবারে নর্মাল।
পিকু নিজেই ফোনটা টেনে নিল।
ছিদামদা একটু চা খাওয়াবে।….খিদে পেয়েছে, ওই বিস্কুট নিয়ে আসবে। ….তিনটে। ….মনির ঘরে।
ফোনটা রেখে আমার দিকে তাকাল।
মশাইয়ের খবর কি?
তুই ফোন করিস নি!
করেছি, কনিষ্কমামার সেই এক ভাঙা রেকর্ড, প্রথম দিন থেকে যেটা বলে আসছে, ভালো আছে।
গিয়ে দেখা করিস।
যাই দেখা হয় না।
কেন!
ডাক্তারদাদাই বলেছে সবার ঘরে ঢোকার দরকার নেই।
আমার সঙ্গে যাস, দেখা করিয়ে দেব।
বোন ফোন করেছিল। বললো, অনেকটা সেলাই করেছে।
আমি পিকুর দিকে তাকিয়ে।
বলোনা, এখন ঠিক আগের মতো দেখতে লাগছে না বিচ্ছিরি দেখতে হয়ে গেছে।
আগের মতো লাগছে।
বাড়িতে ফিরুক তারপর দেখা করবো।
বিতান হাসছে।
হাসছিস কেন বিতান।
ঝাড় খাবে তার আগে তেল দিচ্ছে।
মনি ঝাড় দেবে না। দমই নেই। ঝাড় যে দেওয়ার সে এখন ঠিক সুস্থ নয়। তার আগে সব মেকআপ দিয়ে দেব। দেখে নেবে।
আমি মনে মনে হাসছি।
তুই নাকি আজকাল ঘন ঘন ক্লাবে যাচ্ছিস?
বিতান হেসেই চলেছে।
এই এক্সক্লুসিভ নিউজটা পেলে কোথায়! বাবা না মা?
আমি তাকিয়ে রইলাম ওর মুখের দিকে।
আমার জলের গ্লাসটা টেনে নিয়ে আলগোছে জল খেল।
এবার বলো, শুনলাম তুই জমিয়ে একটা ময়েকে পটিয়ে ফেলেছিস। পিকু হাসছে।
আমি কি তাই বলেছি?
বলোনি, বলবে। আমি এ্যাডভান্স বললাম।
দেখো মনি, তোমায় একটা কথা আজ বলে রাখি, মশাই যে ডিডটা করে দিয়েছে, তাতে পরিষ্কার করে বলে দেওয়া আছে, চারিত্রিক দৃঢ়তা না থাকলে এই কাগজের মালিকানা টিকিয়ে রাখা যাবে না।
তার মালিকানা অটোমেটিক কাগজের সম্পত্তি হয়ে যাবে। কাগজের অন্যান্য মালিক যাকে মনে করবে তার হাতে সেটা সমর্পণ করতে হবে। আমি জেনে বুঝে তাতে সাইন করছি। অতএব রাজা থেকে কে ফকির হতে চায়।
বিতান আমি দুজনেই ওর দিকে তাকিয়ে।
পিকু সরাসরি আমার চোখে চোখ রেখেছে। এতটুকু নামাচ্ছে না।
এটা লোভের বা আর্থিক নির্ভরতার দিকে তাকিয়ে তোমায় বলছি।
আমি পিকুর কথা শুনছি আর ভাবছি, এই পুঁচকে ছেলের কি ম্যাচুরিটি।
মনি, বিতানদা আমাদের আত্মীয়, তার সামনে বলতে আমার একটুও সঙ্কোচ নেই।
ভাবলাম আবার কি বলে বসে এখুনি।
দেখো যে শেয়ারটা আমার নামে, ভাইয়ের নামে, বোনের নামে ট্রান্সফার করা হয়েছে। সেটা মশাইয়ের নিজস্ব শেয়ার। তোমার শেয়ার মশাই এতটুকু স্পর্শ করে নি।
আমাদের পারিবারিক কি ব্যাপার ছিল সেটা আজ অতীত।
মশাই আমাকে শেয়ারটা ট্রান্সফার করবে কেন? এটা নিয়ে কখনও ভেবেছো।
আমি মন দিয়ে পিকুর কথা শুনছি, আর তোকে কতটা গিলে খেয়েছে, তা ভাববার চেষ্টা করছি।
যদি বলো ইমোশন্যাল, তাহলে বলবো ভুল। উইলটা আজ থেকে কুড়ি বছর আগের তৈরি। তোমরা কেউ জানতেও না। তাতে আমার নাম উল্লেখ আছে, বোচন বা বুঁচকির নাম উল্লেখ নেই। বলা আছে আমার উত্তরাধিকারীরা (সেখানে প্রাধন্য দেওয়া হয়েছে সন্তানকে, সন্তানের অবর্তমানে স্ত্রী) সমান ভাবে এর ভোগদখল করবে। না হলে সেই শেয়ারটাও কাদের মধ্যে ডিস্ট্রবিউট হবে তাও উল্লেখ করা আছে।
উইলটা আমি প্রায় একশোবার পড়েছি। হিমাংশুমামাকে পাঁচশো বার বিরক্ত করেছি, ল বাই-ল গুলো বোঝার জন্য। যত বুঝেছি, মশাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা তত বেড়ে গেছে।
একটা মানুষ কতটা নির্লোভ হতে পারে উইলটা তার প্রমাণ। আমি একটা শিক্ষা নিয়েছি ওই উইলটা পড়ে। কি ভাবে মানুষকে শ্রদ্ধা করতে হয়।
জিনিষটা আমার পাওয়ার কথা নয়, একচ্যুয়েলি পাওয়ার কথা মার। মা ওই বাড়ির সন্তান।
মাকে না দিয়ে কেন আমাকে দেওয়া হলো?
এখানে মশাইয়ের দূরদর্শিতা, একটা উঠন্ত গাছকে দেখেই বুঝতে পারে তাতে কতটা ফল হতে পারে। যদি সেটা ফলবতী না হয়, তাকে একটা সাইডে ফেলে রেখে দাও। অযত্ন করো না। মশাই খুব ভালো করে জানতো, মার সে এলেম নেই।
বাবা খুব ভাল সার্ভিস হোল্ডার। চাকরি করতে বাবা পছন্দ করে। এতো নরম সরম লোককে দিয়ে এ্যাডমিনিস্ট্রেসন চলে না। তবু তুমি বাবাকে এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার হিসাবে দায়িত্ব দিয়েছো। মশাই দেয়নি কিন্তু। আর বলবো না, বাকিটা তুমি বুঝে নাও।
অন্যদিক থেকে যদি আমার ব্যক্তিগত অভিমত জানতে চাও তাহলে বলছি, আমার জীবনে মশাই শেষ কথা। সেখানে তুমি, দিদা, মা, বাবা, কারুর স্থান নেই। মশাই আমাকে যে পথ দেখিয়ে দিয়েছে, আমি সেই পথে হাঁটবো। যদি আবার কখনও অন্য পথ দেখায় সেই পথে হাঁটবো, তোমাদের দেখান পথে আমি হাঁটবো না।
আমি পিকুর কথা শুনছি, আর তোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।
একবারে তুই যেন আমার সামনে বসে কথা বলছিস। ঠিক তোর মতো ধীর স্থির ভাবে কেটে কেটে বুঝিয়ে বুঝিয়ে কথা বলছে।
এতদিন তোমায় বলিনি, আজ তোমায় বলছি, মশাই যেদিন নার্সিংহোমে ভর্তি হয়েছিল, সেদিন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, যেদিন মশাই ভালো হয়ে বাড়ি ফিরে আসবে, সেদিন আমি মশাইয়ের মুখ দেখবো, না হলে এ জীবনে মশাইয়ের মুখ আর দেখবো না, যে দায়িত্ব আমাকে মসাই দিয়েছে, তা পালন করে যাব।
কেন যদি প্রশ্ন করো, তার সঠিক উত্তর দিতে পারবো না, আজ প্রায় দু-মাস হতে চললো আমি মসাইয়ের মুখ দেখিনি। তোমাদের কাছে খোঁজ খবর নিয়েছি। মশাই ভালো আছে।
কিছুক্ষণ চুপ করে মাথা নিচু করে বসে থাকলো।
হ্যাঁ আমি একটা মেয়ের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ ভাবে মিশি, তবে কেন মিশি কি কারণে মিশি তোমাদের বলবো না। আমি মশাইয়ের কাছে তার জবাবদিহি করবো। আমি জানি ওই একটা মানুষের কাছে ঠিক মতো কনফেস করতে না পারলে, আমার মাথাটা ঘাড়ে থাকবে না। মাটিতে লুটবে।
এবার বলো কেন ডেকেছিলে?
বিতানের দিকে তাকালো।
বিতানদা, ছিদামদাকে বলতো চায়ের কি হলো।
আমি পিকুর চোখে চোখ রেখেছি। এই ছেলেটা আমার বিয়ের দিন প্রথম আমাদের বাড়িতে এসেছিল, তোর কলে বসে খেয়েছিল। তোকে ছাড়া কাউকে সে সেদিন চেনে নি। আজ পিকু আমার সামনে বসে তার ওপিনিয়ন দিচ্ছে।
তাকিয়ে আছো কেন, বলো কেন ডেকেছিলে, অনেক কাজ।
কি কাজ আছে?
নিচে ঝামেলা হচ্ছে, সামাল দিতে হবে।
কিসের ঝামেলা!
প্রেসে একটা সমস্যা তৈরি হয়েছে। সমাধান করতে হবে।
ছিদাম চা নিয়ে এলো। দেখলাম তুই যে বিস্কুট খাস সেই বিস্কুট নিয়ে এসেছে।
এতো দেরি হলো? পিকু বললো।
তোমার বিস্কুট শেষ হয়ে গেছিল, নিয়ে এলাম।
তুই কবে থেকে এই বিস্কুট খাওয়া ধরলি! আমি পিকুর দিকে তাকালাম।
প্রথম থেকে। অনিদা খায় যে, সেই জন্য। ছিদাম বললো।
ছিদাম হেসে চলে গেল।
কিরে বিতান ঝামেলাটা এড়ানো যায় না?
যেত, যদি গোঁয়ার্তুমি না করতো।
দেখনা যদি ঝামেলা না করে ব্যাপারটা মিটিয়ে নেওয়া যায়।
মিটিয়ে দিয়েছি। তোমাকে চিন্তা করতে হবে না।
আমি বিতানের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
খবর নাও দেখবে স্টেজ-ফেজ গুটিয়ে সব চলে গেছে। প্রত্যেকের সংসার আছে বুঝলে। আজ কিছু হলে কাল খাবে কি?
পিকু চায়ে বিস্কুট ডোবাচ্ছে আর খাচ্ছে। মিটি মিটি হাসছে। আমার দিকে টেরিয়ে দেখছে।
কিরে আবার কি করলি!
বুঝলে মনি, মশাই বলেছে, প্রথম রাতেই বেড়াল মারবি, কাউকে বেশি সময় দিবিনা। লোহা গরম থাকতে থাকতে ঝেড়ে দিবি, দেখবি খুব তারাতারি সেপে এসে যাবে। আর বিষবৃক্ষ দেখলে প্রথমেই শেকড় সমেত উপরে ফেলে দিবি। গাছটা বড়ো হয়ে গেল বেজায় সমস্যা। বাকিটা আমি বুঝে নেব।
আমি মাথায় হাত দিয়ে বসলাম।
বুবুন আমি কাদের সঙ্গে কথা বলতে বসেছি!
তুমি আবার মাথায় হাত দিলে কেন! বিতান বললো।
দরজা খুলে টিনা, মিলি ঢুকলো।
বিতান প্লেটে ঢেলে আমায় দে। পিকু তোর থেকে টিনাকে দে। মিলি বললো।
সবে মাত্র ঝামেলা মিটিয়ে….। পিকুর কথা শেষ হলো না।
ছেলেটাকে কেন মারতে গেলি। টিনা, পিকুর মাথায় হাত রাখলো।
আমি মেরেছি? ওর বন্ধুরা মেরেছে। দাদা হওয়া অতো সহজ নয় বুঝলে টিনামনি।
সবাই অনিদা হতে চায়। গার্ডস আছে? বিতান বললো।
কাকে মেরেছিস! আমি বললাম।
তুমি টেনশন করো না, সব সামলে দিয়েছি। মিলি বললো।
আরে অনাদিদার পার্টি করে যে দুটো ছেলে তাদের। টিনা বললো।
কোনও ইনজুরি হয়েছে।
হয়েছে। ওরাই ধরা ধরি করে নিয়ে গেছে।
তারপর।
শুনলাম উদয় সবকটাকে শো-কজ করেছে অফিস আওয়ার্সে এইরকম ঘটনা ঘটে কেন, না হলে সব কটাকে সাসপেন করবে। এবার বুঝে নাও ব্যাপারটা।
মানে, ওই দুটোকে সাসপেন করবে আর সব কটাকে ছেড়ে দেবে!
তাহলে আর বলছি কি।
মর্কটটা চা ব্যাচে আর কুট বুদ্ধির আড়ত।
তোরা ছিলি কোথায়!
নিচে ছিলাম। অদিতি এখনও সামলাচ্ছে। আমরা চলে এলাম।
সুতনুবাবু?
নীচে আছে।
অদিতি ঢুকলো।
বাঃ অমনি চা খেতে শুরু করে দিয়েছিস।
মিত্রাদিরটা তোর জন্য রেখেছি। তুই আজকে লিড করলি কিনা। মিলি বললো।
অদিতি, পিকুর মাথায় একটা চাঁটি মারলো।
খুব পাকা হয়েছিস না।
মনি একেবারে এসব কথা বলবে না। আমি এর মধ্যে নেই। উদয়দা, শেখরদাকে বলবে।
উদয়, শেখর করে কি করে, তোর সাপোর্ট না থাকলে।
আমি অদিতিকে চায়ের কাপটা এগিয়ে দিলাম।
ওদের কীর্তি কলাপ দেখে আমিই কেমন জানি ঘাবড়ে যাচ্ছি।
অনিদা ঠিক না হওয়া পর্যন্ত তোমাকে কেউ ডিস্টার্ব করবে না। এটা তুমি নিশ্চিত থাকতে পার। অদিতি বলছে, আর হাসছে।
মিত্রাদি শেষ অস্ত্র, কি বল অদিতি? মিলি বললো।
উদয়, শেখর তো আমার কাছে এসেছিল!
ওই তো তোমার কাছে এসেছে। নিচে বেধে গেছে। সব চোরা গোপ্তা খেলা, বোঝ না। অরিত্রটা আর একটা বদ।
মনি উঠি, অনেক কাজ। বিতানদা তোমার কাগজের হিসাব দেওয়ার কথা ছিল আজ।
নিচে চল, দিয়ে দিচ্ছি।
দু-জনেই উঠে দাঁড়াল, এক মুহূর্ত দাঁড়াল না।
দেখিস আবার কোনও গণ্ডগোল করিস না। অদিতি বললো।
পিকু, বিতান বেরিয়ে গেল।
(আবর আগামীকাল)