জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১২৯ নং কিস্তি
মিত্রাদি অনিদা ছাড়া পিকুকে আমরা কেউ সামলাতে পারবো না। মিলি বললো।
মিলির দিকে তাকালাম। আমার তাকানোর মধ্যেই হয়তো কোনও প্রশ্ন ছিল।
সত্যি বলছি।
আবার কি করলো?
তুমি কি শুনেছো।
এই তো তোরা শোনালি। আবার নতুন করে কি শুনবো?
দাঁড়াও কয়েকদিন দেখে নিই তারপর বলবো।
মেয়ে ঘটিত কিছু।
তুমি কি করে জানলে!
বরুণদা এসে মন খারাপ করলো। ওকে ধরলাম। স্বীকার করেছে।
কি বললো!
হ্যাঁ আমি একটা মেয়ের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ ভাবে মিশি, তবে কেন মিশি কি কারণে মিশি তোমাদের বলবো না। আমি মশাইয়ের কাছে তার জবাবদিহি করবো। আমি জানি ওই একটা মানুষের কাছে ঠিক মতো কনফেস করতে না পারলে, আমার মাথাটা ঘাড়ে থাকবে না। মাটিতে লুটবে।
তাহলে ঠিক আছে, ব্যাপারটা ওইরকম নাও হতে পারে।
ও যখন এতো বড়ো কথা বলেছে, তাহলে খুব সাবধানেই পা ফেলছে। টিনা বললো।
মেয়েটা কোথায় থাকে বলতো?
শুনেছি আলিপুরের দিকে। বিশাল ব্যবসায়ীর একমাত্র মেয়ে।
চেপে যা। ওকে সুস্থ হতে দে। ঠিক খবর বের করে নেবে। আমাদের ঢের সময় লাগবে।
তুমি অনিদার কাছে যাবে?
এবার উঠবো।
তুমি যাও আমরা ঘণ্টা খানেক পর যাচ্ছি।
আজ সকাল থেকে বহু ঝড় সামলালাম বুঝলি বুবুন।
ক্ষণে ক্ষণে অনাদির ধমক, সিআইডির কয়েকজন অফিসারের নরম গরম কথা। শেষে সহ্য করতে না পেরে অর্ককে ফোন করলাম। অর্ক যেন এখন অনাদির মহৌষধি। তারপর ফোন একেবারে বন্ধ হয়ে গেল।
অর্কর সঙ্গে দেখা নেই, ফোনে যা কথা হয়।
প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পর আমাকে ফোন করে বললো, আর ফোন করেছে কিনা।
বললাম, না।
আর কোনও দিন করবে না। হাই ডোজের ওষুধ দিয়ে দিয়েছি।
জিজ্ঞাসা করতে হাসছে। বলবে না।
একে একে সন্দীপ, দ্বীপায়ণ, সুমন্ত এলো।
কাগজের সমস্যা। ওদের নিউজ রুমে গণ্ডগোল। যা হয় আর কি ইগোর লড়াই। সিনিয়ার ভার্সেস জুনিয়র। আবার তাদের সঙ্গে বসলাম। সমাধান আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
সময় চাইলাম, ফোন করে চম্পকদা, সনাতন বাবুকে ডেকে নিলাম।
চম্পকদা এসে সুতনুবাবুকে ডাকলো। মিটিংয়ে চম্পকদা এক হাত নিল সবকটাকে। দেখলাম খুব তারাতারি ব্যাপারটা মিট মাট হয়ে গেল।
তিন জনে বসে একটা গাইড লাইন তৈরি করে দিল, যতদিন না তুই সুস্থ হচ্ছিস ততদিন এই গাইডলাইন ফলো করে সবাই চলবে।
মিলি, টিনা, অদিতির সঙ্গে বসে বাজেট তৈরি করলো।
মিলির কাছে খোঁজ খবর নিলো, এ্যাডের ছেলেগুলো আর সমস্যা তৈরি করেছে কিনা।
প্রত্যেককে আলাদা আলাদা করে ডেকে কাজ বুঝিয়ে দিল।
সুতনুবাবু ফোনে কথা বলে প্রেসের খোঁজ খবর নিল। ছেলেগুলোকে ডেকে ধমক দিল।
যেই ছেলেদুটোকে সাসপেন করা হয়েছিল। সুতনুবাবুর মধ্যস্থতায় মুচলেকা দিয়ে তাদের আবার নিজের জায়গায় বহাল রাখা হলো।
তবে উদয় আর শেখর বলে ছেলেদুটো যে প্রেসে এখন রাজ করছে, সুতনুবাবুর কথায় ধরতে পারলাম। দুঃখ করে বললো, ম্যাডাম আমি এই সমস্যার কিছুই সমাধান করতে পারবো না। ছোটোবাবুকে সুস্থ হতে দিন। আমি খোঁজ খবর নিয়ে জেনেছি, উদয় শেখরের ওপর ছোটোবাবু কিছু দায়িত্ব দিয়েছে, তাকে আবার ফিডব্যাক দেওয়ার জন্য ছোটোবাবুর কিছু খাস লোক রয়েছে। আমার পক্ষে ওই জায়গায় পৌঁছনো সম্ভব নয়।
যতটুকু ধমকে ধামকে দেওয়া যায় তাই করছি।
এটুকু আমি কনফিডেন্ট প্রেসে কোনও সমস্যা হলে ওরা দুজনে বুঝে নেব। কারুর তোয়াক্কা ওরা করবে না। এর আগের দিন আমাকে ঠারে ঠোরে সেটা বুঝিয়ে দিয়েছে। আপনাকে হয়তো মৌখিক ভাবে এসে জানাবে, তবে সেটা একেবারেই গৌণ। বলতে পারেন আই ওয়াশ।
বলিস কি সুতনু! চম্পকদা বললো।
সত্যি বলছি চম্পকদা, সেই মিটিংয়ের পর থেকে দু-জনে যেন ধরাকে সড়াজ্ঞান করেছে। প্রেসের প্রত্যেকটা স্টাফ দুজনকে যথেষ্ট ভয় পায়। কেন পায় তুমি বোঝ না। আর তোমাকে কি বলবো বলো। ছোটোবাবুর প্রচ্ছন্ন সম্মতি না থাকলে ওরা এ সব কাজ করতে কখনই সাহস পেত না।
পিকু, বিতান। আমি বললাম।
ওরা দুজনে উদয়, শেখরের কাছে শিশু। কাগজের সমস্যার সমাধান ছোটোবাবু করেছে। বিতান, পিকু শিখণ্ডি, সামনে খাঁড়া হয়ে আছে, উদয়, শেখর।
তাহলে তোমাকে একটা গল্প বলি। সেদিন কাগজের ব্যাপরটা নিয়ে সত্যি আমি খুব উত্তেজিত হয়ে ওদের দুটো কটু কথা বলে ফেলেছিলাম। তবে আমি কিন্তু হাল ছাড়ি নি। প্রায়ই খোঁজ খবর নিতাম। একবার শুনলাম আমাদের রেক কোনও কাগজের সঙ্গে বদলা বদলি হয়েছে। খবরটা বিতান, পিকু জানার আগেই ওদের দুজনের কাছে খবর আসে। শুনলাম ট্রেডিং কোম্পানীর ডাইরেক্টরকে বাড়ি ফেরার পথে কারা যেন তুলে নিয়ে গেছে। এখন তো শুনি আমাদের হাউস থেকে কেউ না গেলেও বিল সমেত সঠিক কাগজ আমাদের হাউসে পৌঁছে যায়। ওখানকার সকলে উদয়-শেখরকে নামে চেনে। যথেষ্ট সমীহ করে। কি করে এটা হয় তুমি বলো?
আমি মনে মনে হাসি। কি খুড়োর কল তুই করেছিস।
পিকু নিজে থেকে এসে তার সমস্ত হিসাব পত্র চম্পকদাদের দেখিয়ে দিয়ে গেল।
বরুণদার সামনেই চম্পকদা, সনাতনবাবু ক্রশ করতে খুব আস্তে আস্তে কামিং প্ল্যানটা কি হবে তা বুঝিয়ে দিল।
চম্পকদা কি বলেছিল, তর্ক জুড়ে দিল, মেনে নেবে না। মশাই আসুক যা বলবে তাই হবে।
তারপর নিজের কাজে বেরিয়ে গেল।
চম্পকদা হাসতে হাসতে বললো, বুঝলি মিত্রা, পিকুর মধ্যে কিছুটা অনির ছায়া দেখতে পাচ্ছি। তবে ওই বয়সে অনির যা ম্যাচুরিটি ছিল ততটা নয়, তবে কাজ চলে যাবে।
বরুণদাকে জিজ্ঞাসা করলো তুমি কি ওকে সামলাতে পারছো, বরুণদা স্বীকার করে নিল, পারছে না। ভবিষ্যত কি হবে তাও জানে না।
সনাতনবাবু, সুতনুবাবু, চম্পকদা এখান থেকে ওই বাড়িতে গেল, দাদার সঙ্গে দেখা করার জন্য। তিনজনের কেউই তোকে দেখতে যায় নি। এক কথা, ‘ওর এই ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছি না’।
সব কিছুর মধ্যে একটা আনন্দের ব্যাপার তুই ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠেছিস।
সকালে ঘুম ভাঙতে দেখলাম, দামিনীমাসি আমার মাথার চুল সরিয়ে কাটা জায়গাটায় আঙুল বোলাচ্ছে। ফিরে তাকালাম।
মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে কাপর দিয়ে চোখ মুছছে।
মহা মুস্কিল। আবার কি হলো?
না, কিছু হয় নি। গলাটা ভার।
তাহলে কান্না কিসের?
দামিনীমাসি চুপ করে রয়েছে, চোখে জল টলটল করছে।
আমি দামিনীমাসির কোলে মাথাটা রাখলাম। মাসি মাথায় হাত বোলাচ্ছে।
ভজু কোথায়?
বাগানে গাছ পুঁতছে।
এখন আবার কিসের গাছ পোঁতা?
দাদা যে দোকান থেকে গাছের চাড়া কিনে আনে, সুরোর কাছে পয়সা নিয়ে সেই দোকান থেকে ফুলের চাড়া কিনে এনেছে।
সুরো কোথায়?
রবীনকে সঙ্গে নিয়ে ছেলে-মেয়ে দুটোকে আনতে গেল।
তারমানে! অনেক বেলা হয়ে গেছে বলো। ডাকো নি কেন?
কাল অতো রাতে শুলি।
কি করে জানলে?
আমি দু-বার এসে ঘুরে গেছি।
চুপ করে থাকলাম।
মিলি অফিসে গেছে?
মাথা দোলাল।
সকাল থেকে মামনি, বুঁচকি অনেকবার ফোন করেছে।
নিশ্চই বমি করেছো?
মাসি হেসে ফেললো।
রবিনকে দশটার সময় আসতে বলেছিস, ও বাড়িতে যাবি শুনলাম।
একটু কাজ আছে।
খেয়ে বেরবি?
হ্যাঁ। ফিরতে রাত হবে।
আর কোথাও যাবি?
ইচ্ছে করছে না।
আজ মঙ্গলবার, ঠনঠনেতে একটু পূজো দিয়ে আসিস।
ঠিক আছে।
বিছানা ছেড়ে উঠে বাথরুমে গেলাম, একবারে সব সেরে বেরলাম। দামিনীমাসির বিছানা গোছান হয়ে গেছে। বিছানার একপাশে আমার প্যান্ট-জামা বার করা। পরে ফেললাম।
এখন সকালের ওষুধটা বন্ধ হয়ে গেছে। দুপুরে খাওয়ার আগে, আর রাতে খাওয়ার আগে পরে ওষুধ খেতে হয়। মাসি রান্নাঘরে।
সোফায় এসে বসে মাসিকে চায়ের কথা বললাম।
কাগজটা দেখলাম।
মাসি ইসলামভাই ফোন করেছিল?
সকালে করেছিল, ওরা এখন নেপলাদের ওখানে আছে। আগামী শনিবারের ফ্লাইটে ইন্ডিয়াতে আসবে।
আজ মঙ্গলবার, মানে এখনও চারদিন।
হ্যাঁ।
অনিমেষদাদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল?
হ্যাঁ ওদের ফ্লাইট ক্যানসল হয়েছিল, তাই দুদিন থেকে যেতে হয়েছিল ওখানে। তারপর ওরা বেরিয়ে এসেছে।
দাদা ঠিক আছে?
হ্যাঁ, আমার সঙ্গে কথা বললো। তোর কথা জিজ্ঞাসা করলো।
কিরকম বুঝলে?
কথা বলার সময় জড়ান ভাবটা আর নেই।
তাহলে ওখানে পাঠানোটা ঠিক হয়েছে বলো?
অনেক ভালো হয়েছে। ডাক্তারবাবুও তাই বললো।
আমি কাগজটা উল্টেপাল্টে দেখছি।
বোচন মনে হয় ওখানকার কলেজে চান্স পেয়েছে।
তাই নাকি! কাগজ থেকে মুখ তুলে মাসির দিকে তাকালাম।
ছোটো বললো।
ভাল খবর দিলে। তাহলে এখানকার একটা ইয়ার নষ্ট হবে।
ও ওখানেই পড়বে জেদ ধরেছে।
ডাক্তারদাদা কি বলে?
ডাক্তারবাবুই সব ব্যবস্থা করেছে।
তাহলে সব ঠিকই আছে।
ভজু আমার ফোনটা কানে দিয়ে ঢুকলো।
জানো দাদা গাছ পুঁতছি, তুমি যখন আসবে দেখবে কততো ফুল হবে। …. কেন সুরোদির কাছ থেকে ধার করেছি, তুমি এলে তোমার কাছ থেকে নিয়ে শোধ দিয়ে দেব ….বড়োমাকে একটু দাও …. তোমার হাঁটু ব্যাথা করছে না-তো ….এখানে শীত নেই, গরম …. ধরো ধরো।
ফোনটা আমার হাতে দিল।
বড়োমা, ধরো ধরো।
হ্যালো।
ভজু আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
কি করছিস? বড়োমার গলা।
এই ঘুম থেকে উঠলাম। চা খাচ্ছি। তোমরা কেমন আছো?
ভালো আছি। নে ওর সঙ্গে কথা বল, তারপর বলছি।
কিরে অনি, তুই নাকি মন খারাপ করছিস?
এখান থেকে যাওয়ার পর দাদার গলাটা এই প্রথম শুনলাম। যাওয়ার সময় দাদা যেভাবে কথা বলেছিল, সেই শব্দটাই কানে লেগে ছিল, এখন কেমন অন্য রকম শোনাল। অনেকটা স্বাভাবিক।
মন খারাপ করবো কেন।
আমি ঠিক হয়েগেছি বুঝলি। সকালবেলা আমি ডাক্তার দুজনে অনেকটা পথ হাঁটি। একা একা। এখন আর কাউকে ধরতে হয় না।
এখানে এসে তোমাকে স্বাভাবিক দেখতে চাই।
সবটা হবে না। বাঁ হাতের জোরটা এখনও ঠিক মতো আসেনি। তবে পা ঠিক হয়েছে।
ডাক্তার কি বলছে?
সেভেন্টি পার্সেন্ট পর্যন্ত স্বাভাবিক হবে। তবে বাঁ চোখটা এখন পুরো খুলতে বন্ধ করতে পারি। জল পড়াটা বন্ধ হয়েছে।
সব চলে গেছে?
না কিছুটা আছে। ওটাও ওষুধ দিতে দিতে কমে যাবে। পাওয়ারটা একটু বেড়েছে বুঝলি। তনু একটা নতুন চশমা বানিয়ে দিয়েছে।
লেখা লিখি করছো।
দাদা জোড়ে হেসে উঠলো।
তুই তো এখন এডিটর, গেলেই লেখার তাড়া লাগাবি। ধর ছোটো, মল্লিক সব লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে।
হ্যালো।
ছোটোমার গলা।
বলো।
বুঁচকি বললো, সেদিন ওদের তুলে দিয়ে ফেরার সময় কাঁদছিলি।
সব বাজে কথা, কে বলে এসব—
কাজের কথা কি শুনি—
বেশ আছি, খাচ্ছি দাচ্ছি ঘুমচ্ছি। আগের থেকে একটু মুটিয়েছি।
মাসি আমার কথা শুনে হাসলো।
তুই কি ভাবিস যা বলবি সব বিশ্বাস করে নিতে হবে।
এসে ফিতে দিয়ে মাপবে।
শোন না।
বলো।
বোচন এখানে ডাক্তারির এন্ট্রান্স পরীক্ষা দিয়েছিল, চান্স পেয়েছে।
মাসির মুখ থেকে শুনলাম।
এখানেই ভর্তি হয়ে যাক কি বল।
আমার কোনও আপত্তি নেই। ডাক্তারদাদা, অনিমেষদার সঙ্গে একবার কথা বলে নাও। তাছাড়া ওরও একটা নিজস্ব মতামত আছে, সেটা ওকে জিজ্ঞাসা করো। জোড় করে কিছু চাপিয়ে দিও না।
এদের সেসন আরম্ভ আরও তিন মাস পর।
তাহলে এখানে এসে আবার যাবে?
হ্যাঁ।
থাকবে কোথায়?
তনু ঠিক কথা বলেছে।
কি?
দেখবে শেষমেষ বলবে, থাকবে কোথায়?
সত্যি তো, তনুর দু-কামড়ার ফ্ল্যাট দুজনের জন্য ঠিক আছে।
তুই এসে থাকতিস কোথায়?
ওরা মা এক ঘরে, ব্যাটা এক ঘরে আমি মাঝে ড্রইংরুমের সোফায় শুয়ে পরতাম।
তনু একটা বাড়ি কিনেছে। আগেই দেখে রেখেছিল। তুই অসুস্থ হয়ে পড়ার জন্য তোর সঙ্গে আর কথা বলা হয়নি। আমরা আসার কয়েকদিন আগে কিনেছে। আমরা সবাই উদ্বোধন করলাম।
আজ সকালটা খুব ভাল শুরু হলো বুঝলে ছোটোমা, অনন্যর খবর, তনুর খবর, দাদার খবর।
অফিসটাও সিফ্ট করা হয়েছে।
তনু এতো পয়সা পাচ্ছে কোথায়?
জেনে তোর লাভ।
ঠিক, পরিণত বয়স্কা রোজগেরে গিন্নী বলে কথা।
খুব জোড় হাসির শব্দ হলো।
কিগো ভয়েজ অন করা আছে মনে হচ্ছে?
ছোটোমা হাসছে।
হ্যাঁরে চোরের মন বোঁচকার দিকে। মিত্রার গলা পেলাম।
বাবা। মেয়ে ডেকে উঠলো।
বল।
দারুণ এনজয় করছি বুঝলে।
খুব ভালো।
কাল তুমি ফোনটা স্যুইচ অফ করে রেখেছিলে কেন?
ব্যাটারি শেষ হয়ে গেল।
তুমি সন্দীপমামা কাল ওখানে গেছিলে?
কোথায় বলতো!
গঙ্গার ধারে।
হ্যাঁ। অনেকদিন পর গেলাম।
তোমার সঙ্গে পরে কথা বলবো।
আচ্ছা।
সাবধানে থাকিস। এখন রাখছি।
ছোটোমা ফোনটা রেখে দিল।
দামিনীমাসি আমার দিকে তাকিয়ে।
দিদি ওখানে তনুর জন্য একটা ঠাকুর ঘর বানিয়েছে।
কে পূজো করবে?
তনু।
ওর অতো সময় কোথায়?
ওই-ই তো দিদিকে বলে বানিয়েছে।
সখ আছে ষোলো আনা।
বাইরের গেটে তারস্বর চিৎকার শুরু হয়েছে। সুরো চেঁচাচ্ছে।
নামবি না, দৌড়বি না।
কে কার কথা শোনে।
দামিনীমাসি এগিয়ে গেল।
মাম্পি, মিকি দৌড়তে দৌড়তে ঘরে এসে ঢুকলো। ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
আমি ওদের জড়িয়ে ধরে বুকে কান পেতেছি। ধক ধক করছে ছোট্ট বুক দুটো। ছুটে এসেছে।
মাসি একটা লাঠি বার করো। খালি জ্বালানো, না। দুটোকে এমন দেব না।
মা ক্যাটবেরি কিনে দেয় নি। মিকি বললো।
নাগো, মনি বলেছে বাড়িতে আছে। এসে দেবে। ও রাস্তায় শুয়ে পরলো। মাম্পি নালিশ করলো।
দু-জনেই টরটরি।
ঠিক আছে জামা কাপর ছেড়ে নে। আমার কাছে আছে, দেব।
দু-জনেই হাততালি দেয় নাচে।
সুরোর মুখটা রাগে লাল, তবু হেসেফেললো।
মনে থাকে যেন কোনও দুষ্টুমি নয়, তাহলে দেব না।
দুজনেই আমার কাছ থেকে বড়োমার ঘরের দিকে ছুট লাগাল।
তুমি কখন উঠলে? সুরো আমার দিকে তাকাল।
আধঘণ্টা হবে।
বেরোবে?
হ্যাঁ।
এই দুটোকে স্নানটান করে খাইয়ে দিচ্ছি, সঙ্গে নিয়ে যাও।
কোথায় নিয়ে যাব!
যেখানে যেখানে যাবে।
ঘুমবে না?
কোন দিন ঘুমোয় শুনি। সারাটা দুপুর জ্বালিয়ে মারে।
তুই কোথায় যাবি?
আমি একটু বেরবো।
একা একা!
হ্যাঁ। অংশু বলেছে গড়িয়াহাটে দাঁড়াবে।
গাড়ির কথা বলেছিস?
আবিদদা পাঠিয়ে দেবে।
আমি প্রথমে ও বাড়িতে যাবো। কাজ শেষ হলে তাহলে ও বাড়ি থেকে নিয়ে আসিস।
ঠিক আছে।
মাসি রান্নাঘরে, সুরো বড়োমার ঘরে চলে গেল। আমি বাগানে এলাম। ভজু তার মনের মতো করে অনেকটা জায়গা জুড়ে বাগান করে চলেছে।
কিরে গাছ পোঁতা শেষ হলো?
আর কয়েকটা বাকি আছে।
কি কি নিয়ে এসেছিস?
পাঁচরকমের গোলাপ, গাঁদা, ডালিয়া।
ব্যাশ।
না সুরোদি আর কি কি লিখে দিয়েছিল সেগুলো নিয়ে এসেছি। নাম জানি না।
কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। মনে হচ্ছে আমি যেন বিশ্ব বেকার। কোনও কাজ করতে ভালো লাগছে না। ঘুরতে ঘুরতে আমগাছের তলায় এলাম। ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম বিশাল একটা মৌচাক হয়েছে।
ও ভজু।
কি।
দেখেছিস।
ভজু কাছে এসে ওপরের দিকে তাকাল।
মা বলেছে বড়োমা এলে লোক দিয়ে চাক ভাঙবে। অনেক মধু হবে জানো অনিদা।
সাবধানে কাজ করিস।
কিছু হবে না, ওরা আমার বন্ধু।
ভজুটা এখনও ঠিক হলো না। তবে আগের থেকে অনেক সুস্থ। একটা পরিবেশের মধ্যে আছে। নিজের মতো করে কাজকর্ম চলা ফেরা। ওরাও একটা মানুষ।
সকালের ওষুধ খেয়েছিস?
হ্যাঁ। আমি এখন নিজে নিজে ওষুধ খাই।
চিনতে পারিস?
সুরোদি খামের গায়ে লিখে দিয়েছে। সকাল, বিকেল, দুপুর।
আমি ভজুর দিকে তাকিয়ে।
আমি অঙ্ক করতে পারি, সহজপাঠ পড়তে পারি।
আমি হাসছি।
নে তারাতারি কাজ সেরে নে। একসঙ্গে খাবো।
তুমি যাও আমার এক্ষুনি হয়ে যাবে।
খেয়ে দেয়ে যখন বেরোলাম তখন প্রায় একটা বাজে।
সুরো জলের বোতল, বিস্কুটের প্যাকেট, চিপসের প্যাকেট সব একটা ব্যাগে ভরে দিল। একসেট করে জামাকাপরও দিয়ে দিল। সঙ্গে গরম জামা কাপর। একটু বিকেল হলেই ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা হাওয়া বয়।
এগুলো কি?
যদি অসুবিধে হয় ছাড়িয়ে পরাতে পারবে?
হাসলাম।
ঠিক পারবে একটু চেষ্টা করো।
দামিনীমাসি হাসছে। ও পারবে না।
ছাড়ো তো মাসি এতো কিছু করতে পারছে ওইটা পারবে না।
এই তোরা দুষ্টুমি করবি না আঙ্কেল যা বলে শুনবি।
তখনও দুজনের মধ্যে ঠাণ্ডা যুদ্ধ চলছে কে জানলার ধারে বসবে। সুরোর কথা কে শোনে।
দুজনেই জানলার ধারে বসবে, ফলে আমি মাঝখানে। দু-জনে দু-পাশে।
চারিদিকের জানলা তুলে দিলাম। রবীন গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে এল।
সুরো খুব হাসছে।
ব্যাপারটা এরকম কেমন মজা এবার টের পাবে।
গেটের বাইরে গাড়ি না বেড়নো পর্যন্ত দামিনীমাসি, সুরো বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকলো। দু-জনেই মুচকি মুচকি হাসছে। ট্র্যাংগুলার পার্ক পার হতে রবীনকে বললাম, যাওয়ার পথে একবার শ্যামবাজারের ডলসহাউসে দাঁড়াস।
দু-জনে দু-পাশে বসে জানলার দিকে মুখ ফিরিয়ে আছে। নিজের মনেই চড়ুই পাখির মতো কিচির-মিচির করে চলেছে। কি কথা বলে বুঝি না। কখনও কখনও তারস্বরে গান ধরে।
আমি মাঝে মাঝে কানে আঙুল দিই। ওরা খিল খিল করে হাসে।
কখনও কখনও দাঁড়িয়ে পরে সিটের ওপর।
জানলা খোলার জন্য বায়না ধরে।
আবার চেপে চুপে বসাই।
দামিনীমাসির কথাটা ভুলেই গেছিলাম। বলেছিল একবার ঠনঠনেতে পূজো দিস। কলেজস্ট্রীট পেরতেই রবীনকে বললাম, বললো ঠিক আছে। মন্দিরের সামনে এসে গাড়িটা সাইড করে দাঁড় করাতেই দুটোর হাত শক্ত করে ধরে বাইরে বেরিয়ে এলাম।
আঙ্কেল, ঠাকুর। মাম্পি চেঁচিয়ে উঠলো।
আমি ওর মুখের দিক তাকিয়ে হাসি।
এ্যাল। জিভ বার করলো।
পাশেই মিষ্টির দোকান থেকে পাঁচটা প্যাকেট নিলাম। পয়সা দেওয়ার সময় হাতটা একটু ছাড়তেই দুজনে ছুটে মন্দিরের মধ্যে ঢুকে গেল। ভাগ্যিস এই দুপুরে বিশেষ একটা ভিড় ছিল না।
দুটো কি যমজ।
দোকানদার ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম।
না।
ভীষণ ছটফটে।
হ্যাঁ।
পাশেই ফুলের দোকান। ফুল কিনলাম।
মন্দিরে যখন ঢুকলাম। দু-জনেই তখন মাতৃমন্দিরের একবারে দোরগোড়ায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে। পায়ে জুতো নেই, তারমানে জুতো খুলেই উঠেছে। কিন্তু আশেপাশে ওদের ওইরকম ছোটো ছোটো জুতো দেখতে পেলাম না।
আমি মন্দিরের চাতালে উঠতেই মাম্পি চেঁচিয়ে উঠলো, আঙ্কেল ঠাকুর টিপ দেয় নি।
আমি মুচকি হাসলাম।
এগিয়ে গিয়ে মন্দিরের পুরোহিতের হাতে ফুল এবং পূজোর প্রসাদ দিলাম।
আপনার বাচ্চা।
না, আমার বোনের।
ভীষন চঞ্চল।
হ্যাঁ।
দু-জনে আমার পাশে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে প্রণাম করে চলেছে।
নাম বলুন।
কি ব্যাপারে বলুন তো?
কার কার নামে পূজো দেব।
ও। একধারসে সকলের নাম বলে গেলাম।
ভদ্রলোক হেসে ফেললেন।
গোত্র।
জানি না।
উনি হাসছেন।
পূজোর পর প্রসাদের প্যাকেট ফেরত দিলেন। আমি ওনার হাতে একশোটাকা দিলাম।
টিপ দাও।
মাম্পির কথা শুনে সত্যি এবার উনি জোড়ে হেসে ফেললেন।
দু-জনের কপালেই সিঁদুরের টিপ লাগিয়ে দিলেন। হাতে একটা করে প্রসাদের পেঁড়া দিলেন।
দু-টোকে একহাতে ধরলাম আর একহাতে প্রসাদের প্যাকেট।
জুতো কোথায় রেখেছিস?
ওই দিকে।
মাম্পি যে দিকে আঙুল তুললো সেটা মন্দিরের বাইরে ফুটপাথের দিকে।
দু-টোর হাত ধরে সেখানে গেলেম। দুদিকে দুটো জুতো ছিটকে পরে রয়েছে।
এই বেল্টবাঁধা জুতো আমার পক্ষে পরান সম্ভব নয়। কোনও প্রকারে একহাতে প্রসাদের প্যাকেট আর ওদের দুটোকে নিয়ে, আরএক হাতে জুতো নিলাম।
আমার অবস্থা দেখে রবিন এগিয়ে এসে ওদের কোলে নিল।
জুতো দুটো পরিয়ে দে।
গাড়িতে চলুক পরিয়ে দিচ্ছি।
সেই বরং ভাল।
গাড়িতে উঠেই মিকি বলে উঠলো। প্রসাদ।
এই তো খেলি, ঠাকুরমশাই দিল না—
শেষ।
মা জলের বোতল দিয়েছে, আগে একটু জল খা, তারপর দেব।
রবিন জুতো পড়িয়ে দিয়ে সামনের সিটে গিয়ে বসলো।
এবার কি শ্যামবাজার ডলসহাউস?
হ্যাঁ।
ডলসহাউসে ঢুকে মহা বিপদে পড়লাম। পুরোদোকনটাই কিনে দিলে ভালো হয়। তবু অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে দুজনে দুটো দুটো করে পুতুল কিনলো।
ওখান থেকে যখন মিত্রার বাড়িতে পৌঁছলাম তখন বেলা প্রায় তিনটে বেজে গেছে।
ভেবেছিলাম এক, হলো আর এক।
সারাটা দুপুর এ বাড়িতে বসে কাজ করবো ভেবেছিলাম। বেকার, কিছু কাজ জোগাড় করতে হবে। কিন্তু সুরো বদমাইশি করে এদের গছিয়ে দিল।
গাড়িতে উঠেই রবীনকে বললাম তুই এদের একটু সামলাবি, আমি কাজ সেরে নেব।
গাড়ি ভেতরের পর্টিকোতে দাঁড়াতেই দুজনে ফটাফট দরজা খুলে নেমে দৌড় লাগাল বাগানের দিকে।
রবীন ধর ধর। চেঁচিয়ে উঠলাম।
তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। তুমি তোমার কাজ করো।
আরে পরে-টরে গেলে ব্যাথা পাবে, কেটে-কুটে যাবে, সে এক বিপত্তি।
কিচ্ছু হবে না। এ বাড়িতে কয়েকদিন ওরা কাটিয়ে গেছে। সব চেনে।
তাকিয়ে দেখলাম একটা বছর তেইশের বিবাহিত মেয়ে একটা বছর দেড়েকের বাচ্চাকে কোলে নিয়ে এগিয়ে এসেছে।
রবীনের দিকে তাকালাম।
আমার বৌমা। তোমার গ্রামের মেয়ে।
তাই নাকি! তোর ছেলে এতো বড়ো হয়ে গেছে। তুই তো দাদু হয়েগেছিস দেখছি।
মেয়েটি এসে আমার পায়ে হাত ঠেকালো।
তুমি কার ঘরের।
বিষই ঘরের।
ওদের অনেক বড়ো ফ্যামিলি।
আমার বাবার নাম ভানু বিষই।
তুমি ভানু খুড়োর মেয়ে! খুড়ো কেমন আছে।
পক্ষাঘাত হয়েছে।
বাচ্চাটা আমার দিকে জুল জুল করে তাকিয়ে আছে।
কেন, কি হয়েছিল?
গাছের ডাল কাটতি উঠছিল, পরিইছে। কোমরটায় লাগছিল, কত ঝাড় ফুঁক কইরলো গুনিন জ্যাঠা, ঠিক হছে নি।
মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলাম।
ডাক্তার দেখিয়েছিলে?
অপরেসন করতে কইছিল। পয়সা কাই।
বাচ্চাটার গালটা একটু টিপে দিলাম। ফোকলা দাঁতে হাসছে। মাথায় সামান্য চুল, বেশ গোলগাল।
তুই দিদিমনির ঘরটা একটু খুলে দে। রবীনের দিকে তাকালাম।
মিকি, মাম্পি মাঠ দাপিয়ে বেরাচ্ছে।
আমি একবার ওদের কাছে গেলাম, দেখলাম চারদিকটা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। মালিদের ঘরটা রবীনের ঘরের পাশেই।
আমাকে দেখা মাত্রই দুজনে ছুটে এলো।
আঙ্কেল, কানামাছি খেলবে।
আমি একটু কাজ করি, তোরা খেল।
তুমি খেল, একটু।
অনেক কাজ।
দু-জনে হাত ধরে টানাটানি শুরু করে দিল।
মহা মুস্কিল। দু-জনকে দু-হাতে ধরে একটু বাগানের এদিক ওদিক ঘুরলাম।
রবীন নিচে এসে বললো, দাদা ঘর খুলে দিয়েছি। তুমি যাও। আমি ওদের দেখছি।
আমি ওপরে গেলাম।
আজ প্রায় বিশ বছর পর এই বাড়িতে এসেছি। কতো স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে এই বাড়ির আনাচে কানাচে। এই বাড়িতেই আমার সঙ্গে মিত্রার বিয়ে, তারও আগে আমাকে ও কাগজের অংশীদার করেছে। ও যদি অনির প্রতি এই মহানুভবতা না দেখাত, অনি আজ কোথায় হারিয়ে যেত।
লোকে বলবে মিত্রা তার নিজের স্বার্থের জন্য এই পথ বেছে নিয়েছে।
শুধু কি তাই?
নস্টালজিয়ার মধ্যে জড়িয়ে পড়ছি। পাস্ট ইজ পাস্ট।
দোতলার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে মাথা তুলতেই প্রথম দিনের ছবিটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। মিত্রা যেন সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে, আয়। তোর জন্য অপেক্ষা করছি।
চারি দিক চেয়ে চেয়ে দেখছি। শেষবার যেমন দেখে গেছিলাম ঠিক তেমন ভাবেই সব কিছু সাজানো গোছান আছে। লম্বা বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাগানের দিকে তাকালাম। মিকি, মাম্পি দৌড়োদৌড়ি করছে।
একদিন হয়তো অনিসা অনন্যও এই বাড়ির বাগানে দৌড়োদৌড়ি করেছে। আমার পোড়া কপাল দু-চোখ ভড়ে দেখা হয়নি। জুঁই ফুলের গাছটা যেখানে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। কোনও ক্লান্তি নেই।
পায়ে পায়ে ঘরে এলাম। ঘরের রংয়ের পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু জিনিষপত্রের পরিবর্তন হয় নি।
পুরনো ফার্নিচারগুলো একটু আধটু পালিশ করেছে। ঝক ঝকে ঘর।
নাঃ অস্বীকার করে কোনও লাভ নেই, রবীন নিজের বাড়ির মতো করেই মেইনটেন করে।
ড্রেসিন টেবিলে দেখলাম আমার আর মিত্রার ছবি একই ফ্রেমে রাখা। সেই কুড়ি বছর আগেকার ছবি। তখন সবে বিয়ে হয়েছে। মিত্রার মুখটা এখন অনেক পরিবর্তন হয়েছে।
স্মৃতি গুলো হুমড়ি খেয়ে লুটিয়ে পড়ছে আমার সামনে।
এখানে বসে আর কাজ করা যাবে না। বরং ফাইল পত্র দলিলগুলো সব বার করে নিই।
আমি জানি মিটসেফের কোথায় চাবি রয়েছে।
নিচের ড্রয়ারটা খুলে সেখানে হাত ঢোকালাম। চাবিটা পেলাম। টেনে বার করলাম। মরচে ধরে গেছে।
আলমাড়িটা খুলতে বেশ বেগ পেতে হলো।
ওপরের তাকে দুটো মদের বোতল। চমকে উঠলাম।
ভয়ে ভয়ে বার করে দেখলাম কুড়ি বছর আগের ডেট লেখা। নিজের মনে নিজে হাসলাম। শেষ স্মৃতি মিত্রা সযত্নে রেখে দিয়েছে। আবার ঠিক সেই জায়গায় রাখলাম।
একে একে সব নামিয়ে নিচে রাখলাম।
রবীনের বৌমা ঘরে ঢুকলো।
দাদা চা এনেছি।
দেখলাম এরই মধ্যে কাপর-চোপর ছেড়ে বেশ পরিষ্কার হয়ে গেছে। বাচ্চাটা কোলে নেই।
চা রেখে চলে যাচ্ছিল।
ওরা নিচে ঠিক আছে?
খেলছে।
কোথায়?
আমার ঘরে।
দেখো তোমার বাচ্চাকে যেন মেরে টেরে না দেয়।
বাবা আছেন।
মেয়েটি চলে গেল। বেশ দেখতে মেয়েটাকে, আমি যখন গ্রাম ছাড়া হয়েছিলাম তখন হয়তো ও সবে জন্মেছে। যদিও ওই পাড়ায় আমার বিশেষ যাতায়াত ছিল না।
ভানুখুড়ো খুব ভালো যাত্রা করতো। কাকাদের যাত্রা দলে নায়কের অভিনয় করতো।
কতবার ভানুখুড়োকে তরোয়াল দিয়ে মারপিট করতে করতে হাত থেকে তরোয়াল ভেঙে যেতে দেখেছি। যুদ্ধ থামিয়ে ছুটে গিয়ে আবার গ্রিণরুম থেকে আর একটা তরোয়াল নিয়ে এসে শেষ যুদ্ধটুকু করতো।
এই গ্যাপটুকুতে ডায়লগ থেমে থাকতো না। ইচ্ছে মতো যে যার ডায়লগ আওড়ে যেত, প্রম্পটার রাগের চোটে উঠে চলে যেত। মাঝে মাঝে যাত্রার মাঝখানে ঝগড়া বেধে যেত। আমরা হেঁসে গড়িয়ে পড়তাম। বাঁশের বাঁখারির তরোয়াল তাকে রাঙতা দিয়ে মোড়া।
কিন্তু সেই যাত্রার মধ্যেও এক অকৃত্তিম আনন্দ থাকত। এক মাতাল করা ভালোলাগা, আবেশের মতো ছড়িয়ে পড়তো সারাটা মন জুড়ে। যাত্রা শেষ আমরা সেই তরোয়াল নেওয়ার জন্য কাড়া কাড়ি শুরু করে দিতাম।
আবার নিজের মনকে বোঝালাম, নো নস্টালজিয়া, কাজ করতে এসেছ কাজ করো।
কুড়ি বছর আগে মিত্রা এসব দেখিয়েছিল। সেগুলো সব আস্তে আস্তে বার করলাম।
গোটা দশেক ফাইল।
সব একে একে দেখলাম। মিত্রার বাবার ডাইরীটাও পেলাম। পাতা উল্টে সেই খামটা পেলাম, যেখানে মিত্রার বাবা বড়োমা বিয়ের সাজে বসে আছে।
যেগুলো এই মুহূর্তে আমার কাজে লাগবে সেগুলো আলাদা করে রাখলাম। সঙ্গে নিতে হবে।
ফোনটা বেজে উঠলো দেখলাম মিত্রার নম্বর ব্লিঙ্ক করছে।
হ্যালো।
খিল খিল করে হেসে উঠলো। কিরে, কেমন মজা?
কিসের বলতো!
তোর তিনটেতে পোষাছে না? আরো দুটো চাই!
বুঝলাম না।
মিকি, মাম্পি কোথায়?
ও তাই বল। নীচে, বাগানে খেলছে।
তুই নিশ্চই আমার ঘরে ঘাঁটতে বসে গেছিস।
হ্যাঁ।
এবার এগুলোকে নিয়ে পরবি।
দেখি।
নীচে কে আছে।
রবীন আর ওর ছেলের বউ।
যাক রক্ষে। এবার বুঝছিস তো কেমন কষ্ট করে ছেলে-মেয়ে মানুষ করতে হয়।
একটু একটু বুঝছি।
এবার বল, সেদিন ফেরার পথে কাঁদছিলি কেন?
চুপ করে রইলাম।
মেয়েকে অনেক গল্প করেছিস শুনলাম?
তা একটু করেছি।
এখানে এসে তনুকে চেপে ধরেছে।
কেন?
বারে, মার গল্প শোনা হয়ে গেছে, এবার তনুমনির গল্পটা শুনতে হবে।
তনু কোথায়?
সবাই বেরিয়েছে, বাড়িতে আমি ডাক্তারদাদা।
কোথায় গেছে?
বললো ঘুরতে যাচ্ছি।
তুই যাস নি কেন?
দূর তুই না থেকলে ঘোরাটা ঠিক জমে না।
কাজ হয়ে গেলে, তারাতারি চলে আয়। ভালোলাগছে না।
মনে হচ্ছে স্নেহের রোগে আক্রান্ত হয়েছিস?
ঠিক বলতে পারবো না। কেমন যেন চারিদিকটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।
হুঁম বুঝেছি।
কি বুঝেছিস?
শুনলাম তুই নাকি ইদানিং বুঁচকি, মিকি, মাম্পি ছাড়া ঠিক থাকতে পারছিস না?
ঠিক তা নয়, ওটা গল্প কথা।
গল্প কথা তো গুমড়ে আছিস কেন?
ছাড়। তুই খুব ভাল সময় ফোন করেছিস।
কোনও কাজের কথা হবে না।
শোন না।
বলতে পারিস, উত্তর পাবি না।
তুই যে দলিলগুলো দেখিয়েছিলি এখানে যা আছে সেইগুলোই তো, না আরও কিছু আছে।
ওখানে যা আছে আছে, বাকি ব্যাঙ্কের লকারে।
তাহলে তুই না এলে হবে না।
চাবি পেলি কোথায়?
কেন তোর সেই চারা কুঠরিতে।
তোর মনে আছে!
একটু সময় নিলাম। সেদিন রাতের ঘটনাটা মনে করলাম, তুই কোথায় কোথায় হাত ঢুকিয়ছিলি মনে পড়ে গেল।
সত্যি তোর মাথা।
যাক তুই তো স্বীকার করিস না, আজ স্বীকার করলি।
গাঁট্টা বুঝিস, মাথা ফুলিয়ে দেব।
সিঁড়িতে তারস্বর চিৎকার আঙ্কেল, আঙ্কেল।
ধর, দাঁড়া মিলির মেয়ে কেন চেঁচাচ্ছে দেখি।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
ঘরে ঢুকতে ঢুকতে মিলির মেয়ে চেঁচালো আঙ্কেল হিস হিস।
কোথায় রে?
প্যান্টুটা খুলে দাও। জামা তুলে দাঁড়ালো।
আমি ফোনটা পাশে রেখে ওর প্যান্ট খুললাম। হাত ধরে বাথরুমে নিয়ে গেলাম।
আবার ফোনটা কানে তুললাম।
মিত্রা হেসেই চলেছে।
হাসছিস কেন?
জীবনে প্রথম।
হ্যাঁ।
মেয়ের প্যান্ট খুললি না। মিলির মেয়ের খোল।
আঙ্কেল। বাথরুম থেকে আবার চিৎকার করে উঠলো।
উঃ বড়ো জ্বালায় তো মেয়েটা।
কি হলো? ওখান থেকেই চেঁচালাম।
জল পড়ছে না।
দাঁড়া টেনে আনি।
আবার কানে ফোন দিয়েই ওকে হিড় হিড় করে টেনে আনলাম।
জল দেবে না।
তুই থাম, পড়ে দিচ্ছি।
জামা তুলে দাঁড়িয়েছে, প্যান্ট পড়িয়ে দিতে হবে। মাথায় হাত দিয়ে ঠ্যাঙ তুললো।
মিকি কোথায়?
ভায়ের সঙ্গে খেলছে।
ওর হিসি পায় নি?
ও মাঠে দাঁড়িয়ে ঘুরে ঘুরে হিসি করেছে।
তুই দেখলি?
মাথা দোলাচ্ছে।
আমি প্যান্টটা পড়িয়ে বললাম যা আমি এখুনি যাচ্ছি। কোনও দুষ্টুমি করবি না।
দৌড় লাগালো।
বল।
যাক তাহলে অনিবাবা বাবার রোল প্লে করছে।
তোর খুব মজা তাই না।
বাঃ মজা হবে না। সারাটা জীবন শুধু ফাঁকি মেরে ফাঁকে ফাঁকে কাটিয়ে দিলি।
বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
শোন অনন্য এখানে ডাক্তারিতে ভর্তি হবে।
সকালে ছোটোমা বললো।
ছেলে তোর সঙ্গে কথা বলতে ভয় পাচ্ছে।
কেন!
তোকে না জানিয়ে পরীক্ষা দিয়েছে।
তাতে কি হয়েছে। অন্যায় তো করে নি। ভালোই করেছে।
ডাক্তারদাদা অনেক মেটিরিয়াল কিনেছে। আগামী সপ্তাহে জাহাজে বুকিং করবে। কাল কিংবা পর্শুদিন আফতাবভাই আসবে।
কেন!
বলেছে ফেরার পথে দুবাই হয়ে যেতে হবে।
তোরা কি ডিসিসন নিয়েছিস?
বড়োমার ব্যাপার জানিস। নেপলা বলেছে চিন্তা নেই তোমরা এসো আমি সব ব্যবস্থা করে রাখবো। আফতাবভাই তনুকে এই বাড়িটা প্রেজেন্ট করেছে।
বুঝলাম না।
তনুর কাছে টাকা ছিল না। আমি দিতে চাইলাম, বললো—না মিত্রাদি, ইন্ডিয়া থেকে এই টাকাটা নিয়ে আসা অসুবিধে আছে। তার থেকে আফতাবভাইকে বললে সমস্যা মিটে যাবে।
আফতাবভাইকে টাকা চেয়েছিল। সে তো আর এক কাঁটা ওপরে। বললো, কি কারণে বল।
ও তো কিছুতেই বলবে না। তারপর ওর একজন এজেন্ট আছে এখানে তাকে পাঠিয়েছিল। সে সব শুনে ব্যবস্থা করে দিল। আফতাবভাই এসে দাদাকে দেখে গেছে। এখানকার নার্সিংহোমের একটা খরচও দিতে দেয় নি।
দাদার হাতে ধরে বলেছে, এর জন্য আমি দায়ী। আমাকে তার ভার বহন করতে দিন।
ইসলামভাই, ইকবালভাইকে বলেছে আপনারা ভাল কাজ করুণ আফতাবকে পাশে পাবেন।
তারপর বলে কি জানিষ—
কি—
আনি আমার বিবির ভাই। ও আমার বিবিকে মরার হাত থেকে বাঁচিয়েছে। আমার বিবি বলেছে একবার ওর পীরসাহেবের কাছে যাবে। আমিও ইন্ডিয়া গেলে ওনার কাছে যাব।
দাদা শুনে বললো, ওটা একটা গাছ।
তা হোক, আমি মাটি নিয়ে আসবো।
ছোটোমা ইসলামভাইয়ের দিদি শুনে প্রথমে অবাক হয়েগেছিল। তুই বলিস নি?
না।
তারপর থেকে ছোটোমার খুব ভক্ত হয়ে গেছে। প্রায় ফোন করে দাদার খবর নেয়।
অনেকক্ষণ হয়ে গেল। আজ রাখ। এসে গল্প বলবি, শুনবো।
দূর একটু কথা বলছি তাতেও তোর সহ্য হচ্ছে না।
তুই তো আমার পাশে বসে গল্প করছিস।
করছি তো। তোর এতো জ্বালা ধরছে কেন। তোর ফোনের বিল উঠছে।
ঠিক, ঠিক বলেছেন ছুটকি ম্যাডাম, অপরাধ নেবেন না।
মিত্রা খিল খিল করে হেসে উঠলো।
ফোনটাকে ভয়েজ অন করে কান থেকে মাটিতে নামিয়ে রাখলাম। ফাইলগুলো দেখে দেখে গোছাতে আরম্ভ করলাম।
বৌদি বলছিল, যাক অনির জন্য বিদেশ ঘোরা হলো।
ঘোরা আর হলো কোথায়, পাহাড়া দিতে গেছে।
আমরা কেউ পাহাড়া দিচ্ছি না। প্রথম পনেরো দিন দাদা নার্সিংহোমে ভর্তি ছিল, ওই টুকু যা, তারপর থেকে বাড়িতেই আছে। সপ্তাহে চার দিন গিয়ে থেরাপি আর চেকআপ করিয়ে আসতে হয়। পাক্কা ছ-ঘণ্টা। এখানকার ডাক্তারদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে বুঝলি।
অবশ্যই।
এখানকার ডাক্তারদের প্রফেশন হচ্ছে রুগীর পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সুস্থ করা। আর ওখানকার ডাক্তারদের প্রফেশন হচ্ছে, রুগীর বাড়ির লোকেদের কাছ থেকে যতটা পারো দুইয়ে নিয়ে তাকে ফকির করা। জানিস দাদা এখন আগের মতো হাঁটা চলা করতে পারে।
সত্যি!
বার বার বলছে, বুঝলে বড়ো, নিজের পেটের ছেলে-বউ, নাতি-নাতনি পর্যন্ত এরকম করবে না।
চুপ করে রইলাম।
জানিষ যখনই নিজেরা কথা বলে তখন শুধু তোর আলোচনা। মনটা খারাপ হয়ে যায়।
আর তো কটা দিন।
অনিমেষদা যেই শুনেছে আফতাবভাই আসবে বিধানদা, প্রবীরদাকে ফোন করেছে। স্ক্যান করে সমস্ত মেটিরিয়ালস ইমিডিয়েট পাঠাও। আমি একজনের সঙ্গে বসবো।
কি করে পাঠাবে?
কেন, তনুর মেল আইডি আমার মেল আইডি। তাছাড়া কাগজের অফিসে গিয়ে ফ্যাক্স করবে।
ভালোই আছে।
বিন্দাস। খাওয়া-দাওয়া গল্প।
ওই দেখ সিঁড়িতে আবার ধুপ-ধাপ আওয়াজ হচ্ছে। মন হয় দুটোতেই আসছে। কাজ করবো ভাবলাম আর করা হবে না।
বাড়ি নিয়ে চলে যা। রাত জেগে করবি।
ঠুকছিস।
ঠুকবো কেন। তুই অনিন্দ ব্যানার্জী এ্যালাইস অনি ব্যানার্জী হাজবেণ্ড অফ তনুশ্রী….।
বুঝেছি।
আঙ্কেল। মিলির মেয়ে চেঁচিয়ে উঠলো।
আবার কি হলো।
(আবার আগামীকাল)