জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
৭৫ নং কিস্তি
আজ তোর ছেলে মেয়ে ক্লাস থ্রিতে উঠলো।
জীবনে প্রথম ছেলে-মেয়ের স্কুলে গার্জেন কল মিটিংয়ে এলাম।
বড়োমা, ছোটোমা, দাদা, মল্লিকদা এতোদিন যেত। আমি এই প্রথম গেলাম।
আসতাম না। বলতে পারিস ডাক্তারদাদা আজ আমাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে পাঠাল।
সত্যি কথা বলতে কি, স্কুলটা আমার প্রথম থেকেই ভালো লাগেনি। কনিষ্ক শুধু জোড় করে বলেছিল, তুমি আমার এই রিকোয়েস্ট টুকু রাখো। কয়েক বছর পড়াও, যদি ভালো না লাগে তাহলে তোমার পছন্দের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিও।
সত্যি স্কুলটা দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম।
প্রথম যেদিন ভর্তি করাতে এসেছিলাম সেদিন স্কুলটা সবে তৈরি হচ্ছিল। সাকুল্যে দুশো বাচ্চা। বিশাল জায়গা নিয়ে স্কুল। এখন প্রায় হাজার খানেক, কি নেই। বাচ্চাদের সমস্ত উপকরণ স্কুলটায় আছে। একবারে আদর্শ স্কুল বলতে যা বোঝায় তাই।
স্কুলটা পরিচালনা করছেন ফাদার হ্যারিস।
উনি একজন মিশনারি। কিন্তু স্কুলের সমস্ত শিক্ষিকা এবং শিক্ষক এখানকার।
ফাদার মাঝে মাঝে এখানে আসেন। বেশির ভাগ সময় গোয়াতে থাকেন।
প্রিন্সিপ্যাল আন্টি আমাকে দেখে নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে গেলেন। তারপর শুধু তুই।
আমি মুখ বন্ধ করে শুনে গেলাম।
ফাদারের সঙ্গে তোর নাকি ভীষণ ভালো রিলেসন। সেই সূত্রে প্রিন্সিপ্যাল আন্টির সঙ্গে তোর পরিচয়। তুই নাকি এই স্কুলটার জন্য অনেক টাকা ডোনেসন তুলে দিয়েছিস।
ফাদার প্রিন্সিপ্যাল আন্টিকে বলেছেন তোর ছেলে মেয়েদের যেন টেক কেয়ার করা হয়।
যতো তোর কথা শুনি ততো মনটা ভাড়ি হয়ে যায়।
বুকের ভেতর একটা যন্ত্রণা অনুভব করি।
তোর মেয়ে একটা ছেলেকে হিড় হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে এলো।
জানো মা এটা শুভদীপ আমার বয়ফ্রেন্ড আমি ওকে লাভ করি।
মেয়ের কথা শুনে আমি হাসবো না কাঁদবো।
কি পাকা পাকা কথারে বাবা।
প্রন্সিপ্যাল আন্টি দুজনকে কাছে ডেকে নিয়ে দুটো টফি দিল, ওরা নাচতে নাচতে বেরিয়ে গেল।
জানেন ম্যাডাম শুভদীপের ব্যাকগ্রউন্ডটা ভীষণ স্যাড।
প্রিন্সিপ্যাল আন্টির কথায় ওনার মুখের দিকে তাকালাম।
কি রকম?
ওর বাবা-মা নেই। দুজনেই মারা গেছেন। ও দাদু-ঠাকুমার কাছে থাকে।
কি করে মারা গেলেন।
বলতে পারবো না। শুভদীপ ফাদারের রেকমেন্ডেশন।
কেন জানিনা ছেলেটার প্রতি মায়া পড়ে গেল।
প্রন্সিপ্যাল আন্টির সঙ্গে বেরিয়ে এলাম, দেখলাম শুভদীপ ওর দাদুর হাত ধরে দাঁড়িয়ে।
কাছে গেলাম। ভদ্রলোক দাদার থেকে কয়েকবছরের ছোটোই হবেন। কাঁচা পাকা চুল। বেশ স্টাউট ফিগার। প্রণাম করলাম।
আপনার জন্য দাঁড়িয়ে আছি।
কেন!
শুভ বললো আন্টির সঙ্গে আলাপ করবে না।
ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে, বেশিক্ষণ কথা বলতে পারলাম না।
দু-একটা সৌজন্য সূচক কথা বলে চলে এলাম।
সুমন্ত আজ পাকাপাকি ভাবে কলকাতায় চলে এলো।
ও এখন পুরোপুরি সুস্থ। ডাক্তারদাদা ওর জন্য লড়েছে। তবে ছেলেটাও ঋণ স্বীকার করলো। ওকে আমাদের অফিসে চাকরি দিয়েছি।
এখন ও কলকাতায় থাকবে। বসতবাড়িটুকু রেখে দেশের সব জমিজমা আমাদের ট্রাস্টিকে দান করেছে। ডাক্তারদাদা ওখানে একটা স্কুল করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছে।
আচ্ছা আমাকে একটা কথা বলতে পারিস?
তোর সঙ্গে যারা মেশে তারা সবাই কি তোর মতো গোঁয়াড় গোবিন্দ?
আজ বিতানকে আমাদের অফিসে কিংশুকবাবুর পোস্টে জয়েন করালাম। কিংশুকটাকে আর সহ্য করতে পারলাম না, দূর করলাম।….
অনিসা আবার বোতলটা হাতে নিয়ে ঢক ঢক করে জল খেল। কিছুতেই মনিটর থেকে চোখ সরাতে পারছে না। যতো পড়ছে তত যেন নেশা ধরে যাচ্ছে। কিছুতেই চোখে ঘুম আসছে না।
পাতার পর পাতা উল্টে চলেছে। আর নোট ডাউন করে চলেছে।
ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত তিনটে।
আজ এই মাত্র বাড়ি ফিরে তোকে লিখতে বসলাম।
বসিরহাট গেছিলাম। শ্মশান থেকে ফিরলাম।
কাল থেকে দাদুর শরীরটা খারাপ ছিল। খবর পেয়ে বাড়িশুদ্ধু সবাই গেছিলাম। সারাটা রাস্তা বড়োমা কাঁদতে কাঁদতে গেল। তোর ছেলেমেয়ে একবার করে বড়োমার মুখের দিকে তাকায় আর তার ছোটো দিদাইকে জিজ্ঞাসা করে তুমি বকেছো। শেষ মেষ ভীষণ জ্বালাচ্ছিল বলে মল্লিকদা নিজর কোলে নিয়ে বসলো।
ওখানে গিয়েও প্রথমে একচোট কান্নাকাটি হলো। ডাক্তারদা সঙ্গে গেছিল।
দেখলো। ডাক্তারদার মুখ দেখে বুঝলাম হাতের বাইরে। তবু ওষুধ দেওয়া হলো।
দাদু তোর ছেলেমেয়েকে কাছে নিয়ে যেতে বললো। ওরা গেল। তোর ছেলে মেয়ের মাথায় দাদুর শীর্ণহাতটা ঘোরা ফেরা করছে। চোখের কোল বেয়ে জল পড়ছে। মুখ দিয়ে কোনও কথা বলতে পারছে না। ফ্যাল ফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। ঘর থেকে বাইরের বারান্দায় চলে এলাম।
হাপুস নয়নে কিছুক্ষণ কাঁদলাম। তোর মেয়ে এসে একবার কাপরের আঁচল টেনে ধরে বলেছিলো, কাঁদছো কেন মা? দাদাই তোমায় বকেছে।
কি বলবো তোর মেয়েকে।
বড়ো হোক সব জানতে পারবে।
দুপুরের দিকে দাদু দেহ রাখলেন।
বড়োমা খুব কাঁদলো।
কেঁদে কি করবে।
ডাক্তারদা শেষ চেষ্টা করেছিল।
দাদু ইঞ্জেকসনটা নিতে পারলো না।
শেষ সময়টুকু খুব কষ্ট পেল।
তোর ছেলে মেয়ে পাশেই ছিল।
কি বুঝলো, কতটুকু বুঝলো জানি না।
মামীমা বললো। শেষ কটা দিন শুধু তোর নাম করেছে। জড়িয়ে জড়িয়ে বলেছে অনিটা এলো না। ওর সঙ্গে আর শেষ দাখা টুকু হলো না। ভাবলাম একবার রেকর্ড করা তোর গলাটুকু শোনাই। তারপর ভাবলাম না থাক। তোর আবার সাধনায় ব্যাঘাত ঘটবে।
আমি শ্মশানে গেছিলাম। ওখান থেকেই বাড়িতে এলাম। দাদা, মল্লিকদা আমার সঙ্গে ফিরলো। তোর ছেলে মেয়েকে বড়োমা, ছোটোমা কিছুতেই আসতে দিল না। ওরা ওখানে রয়ে গেল।
আসার সময় সারা রাস্তা তোর কথা ভাবতে ভাবতে এলাম। একদিন বসিরহাট থেকে ফেরার পথেই তুই হারিয়ে গেলি। খুব কষ্ট পেলাম আজ। বাবার মৃত্যুটা তবু মেনে নিতে পেরেছিলাম। দাদুর মৃত্যুটা ঠিক মেনে নিতে পারলাম না।
মনকে বোঝালাম দাদুর বয়স হয়েছিল।
দাদুর খুব ইচ্ছে ছিল, তোকে একবার চোখের দেখা দেখবে। দেখতে পেল না।
ঠাকুর আজকে বড়ো বিপদের হাত থেকে আমাকে রক্ষা করলো।
মনটা খুশিতে ভড়ে উঠলো। আজ আমার ভীষণ ভীষণ আনন্দ লাগছে। আজ থেকে আবার নতুন করে বিশ্বাস করতে শুরু করলাম তুই আছিস। তুই আমার পাশে আছিস। তুই আমার শরীরের সঙ্গে মিশে আছিস। তুই আমার নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে মিশে আছিস। তুই আমার। তুই একান্ত ভাবে আমার। আমার কাছ থেকে তোকে কেউ কোনওদিন ছিনিয়ে নিতে পারবে না। সাময়িক দূরে সরিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু সেটাও ক্ষণিকের।
বুবুন, বুবুন, বুবুন। আমার বুবুন।
আমার সুখ দুঃখের কথা কার সঙ্গে শেয়ার করি বল। তুই ছাড়া আমার কে আছে। তুই আমাকে সব কিছু দিয়েছিস, আর আমি যখন তোকে দিতে চাইলাম, দেখলাম তুই আমার পাশে নেই। তোর ছায়াটা আমাকে সর্বোক্ষণ আগলে রেখেছে।
বছর খানেক আগে সুনীতদা অফিসে এসেছিল ল-ইয়ার নিয়ে। তার নাকি অনেক টাকা কড়ি পাওনা আছে অফিসের কাছে। সেই সব ঘটনার পর আমি কিছুই জানতাম না। কি কাগজপত্র তুই তৈরি করেছিলি। কি করেছিস না করেছিস তা কিছুই জানতাম না।
আমাকে আলাদা করে সেই ভাবে বলিসও নি। দেখাসও নি।
ইসলামভাই, দাদা, হিমাংশুর সঙ্গে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করলাম। ওরাও ঠিক হদিস দিতে পারলো না। বললো, এটা অনি হ্যান্ডেল করেছিল, অনিই সব বলতে পারবে।
বিশেষ করে মির্জা গালিব স্ট্রীটের জায়গাটা। এখন সেখানে অফিস তৈরি করে সব একাকার করে ফেলেছি। মনে হয় সুনীতদা সব নতুন করে তৈরি করে ডিমাণ্ড করছে। বেশ আট ঘাট বেঁধেই নেমেছে। অলরেডি কেশও করেছে। তারপর চলেও গেল। চোখ ফেটে জল আসছে।
তোর এতো কষ্টের জিনিস হারাতে হবে। প্রায় দেড় বছর ধরে কেশ চললো। আমরা প্রায় হারতে বসেছি। শুনানির লাস্ট ডেট আগামী সপ্তাহে। কয়েকদিন আগে একটা ডেট গেল। সেখানেও আমরা কিছু করে উঠতে পারিনি। এরপর আর একটা শুনানির পর রায় বেরবে। নির্ঘাৎ আমরা হারছি এটা ধরে নিয়েছি। ইসলামভাই বললো ওকে সরিয়ে দেবে। রতন, আবিদেরও এক কথা। আমি বাধা দিলাম।
বললাম যার জিনিষ সে যখন নেই তার সম্পত্তি আমরা রক্ষা করতে যাব কেন।
এটা তোর অভিমানের কথা। আমি আনিকে সব অরিজিন্যাল দলিল হাতে তুলে দিয়েছিলাম। ইসলামভাই বললো।
তাহলে অনিকে ধরে আনো।
ইসলামভাই আমার কথায় চুপ করে গেল।
ওই একটা দুর্বলতার জায়গা সবার।
আজ অফিসে দাদা মিটিং কল করেছিল। আমরা সবাই বসে মিটিং করছি। কি করলে কি হয়। অন্তত পক্ষে জায়গাটা যদি রক্ষে করা যায়। সুনীতদাকেও আসতে বলা হয়েছে। সেরকম বুঝলে একটা নিগোসিয়েসনে যাওয়া হবে। সুনীতদা প্রথমত রাজি হয়নি। তারপর কি মনে করে সকালে দাদাকে ফোন করে আসবে বলেছে।
যথা সময়ে সুনীতদা এসে হাজির। সঙ্গে সুনীতদার ল-ইয়ার।
ভরা অফিস। সবাই জানে কিছু একটা আজ হবে। সুনীতদা হয়তো আগে ভাগে ডিক্রী ফিক্রী কিছু বার করে নিয়েছে কিনা কে জানে। হিমাংশুও এই কদিনে প্রায় বেশামাল হয়ে পড়েছে। এককথায় আমরা সকলেই চরম হতাশ। মনের দিক থেকেও আমরা সকলেই প্রায় ভেঙে পড়েছি। এ সম্পত্তি আর রক্ষা করা গেল না।
হিমাংশু বার বার আমাকে বলেছে। ওই দিনে অনি সুনীতদাকে দিয়ে সব কিছু লিখিয়ে নিয়েছিল। আমি নিজে হাতে ড্রাফ্ট করেছি। রেজিস্টার ম্যাডামকে দিয়ে সব রেজিস্ট্রি করাও হয়েছিল সেটা আপনি কোথায় আছে খুঁজে দেখুন। সেই দলিল কাগজপত্র আমি তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। কোথাও পাইনি। সেই ডেট ধরে দলিলের কপি বার করার চেষ্টা হয়েছিল। সেখানেও ব্যার্থ হয়েছি। বলতে পারিস সব দিক থেকে আমরা হতাশ।
অগত্যা প্রমাণ না করার দায়ে সব হারাতে বসেছি।
সুনীতদা এসে সোজা দাদার ঘরে ঢুকলো। উইথ ল-ইয়ার।
আমরা তখন দাদার ঘরে বসে আছি। চম্পকদা, সনাতানবাবু, ইসলামভাই, ডাক্তারদাদা আছে। আরও অনেকে। কার নাম বাদ দিয়ে কার নাম করবো। তোর কোর কমিটি। মিটিং চলছে। অন্ততঃ পক্ষে জায়গাটা যাতে রক্ষে করা যায়। তার স্ট্র্যাটিজি তৈরি করছি।
সুনীতদা ঘরে ঢুকে সটাং দাদার পা ধরে হাপুস নয়নে কেঁদে ফেললো।
দাদা প্রথমে অবাক! বেশ বিরক্ত—
তোর এটা আবার কি রকম নাটক সুনীত—
আপনি আমাকে বাঁচান দাদা।
আমি আবার তোকে কি করে বাঁচাব। দু-বছর ধরে কেশ করে তোর সম্পত্তি উদ্ধার করছিস। ছেলেটা বেঁচে থাকলে তোর কেশের জবাব দিতে পারতাম।
অনি বেঁচে আছে দাদা, আমি কোনওদিন আর এ ভুল করবো না।
সারা ঘর নিমেষে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। পিন পড়লে শব্দ হবে।
সকলে সুনীতদার কথায় বাকরহিত। একমাত্র সুনীতদার কান্নার আওয়াজ ছাড়া কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। দাদাও প্রথমে ব্যাপারটা ধরতে পারেনি। আমি কোন ছাড়।
বেশ কিছুক্ষণ পর সবার সম্বিত ফিরে এলো।
কি করে বুঝলি, অনি বেঁচে আছে? চম্পকদা বললো।
আজ সকালে আমাকে ফোন করেছিল। চব্বিশ ঘণ্টা সময় দিয়েছে। যদি কেশটা উইথড্র না করি, আজই আমার বংশ লোপাট করে দেবে।
পুলিশের কাছে যা। ডাইরী কর। তোকে ভয় দেখাচ্ছে বলে।
বিশ্বাস কর চম্পক, আমি মিথ্যে বলছি না। সে কি ঢেউ তুলে কান্না।
তুই সত্যি বলছিস প্রমাণ কোথায়?
আমাকে হুইপ করল সব কথাবার্তা রেকর্ড করতে এবং অফিস খোলার আধঘণ্টার মধ্যে তোদের কাছে এসে ক্ষমা চাইতে। তারপর এখান থেকে কোর্টে গিয়ে কেশটা উইথড্র করতে।
তুই বাধ্য ছেলের মতো সব কথা শুনে ফললি!
উপায় নেই। আমি ওকে চিনি। ও মুখে যা বলে তাই করে।
দেশের কিছু আইন কানুন আছে।
ও আইন কানুনের ঊর্ধে।
ইসলামভাই এই গুরুগম্ভীর পরিবেশের মধ্যেও হেসে ফেললো।
তুই রেকর্ড করেছিস? চম্পকদা বললো।
করেছি।
শোনা।
সুনীতদা দাদার পায়ের কাছ থেকে কিছুতেই ওঠে না।
তারপর অনেক কষ্টে চম্পকদা, সুনীতদাকে গিয়ে টেনে তুললো।
তুই জানিস না চম্পক একমাত্র দাদা ছাড়া এই ভূ-ভারতে ও কাউকে পাত্তা দেয় না।
ন্যাকামো করিস না, ওঠ। এতই যদি ভয়, কেশ করতে গেলি কেন—
আমি ভেবেছিলাম ও মরে গেছে।
চম্পকদা হাসবে না কাঁদবে বুঝে উঠতে পারছে না।
সুনীতদা ফোনটা চম্পকদার হাতে দিল। স্পষ্ট বুঝতে পারলাম হাত-পা কাঁপছে।
তুই রেকর্ডিংটা চালা। সুনীতদা বললো।
দেখে শুনে চম্পকদা রেকর্ডিংটা চালালো।
নিস্তব্ধ ঘরে পিন পরলে শব্দ হবে।
হ্যালো।
কে রে সুনীত?
আপনি কে বলছেন—
তোর বাবারে, বাবা। এরই মধ্যে অবতারকে ভুলে গেলি। কলকাতায় নেই বলে সাপের পাঁচ পা দেখেছিস। অনেকের সঙ্গে কাওতালি করেছিস। সব খবর আছে।
কি বাজে বকছেন!
ধর অনিদার সঙ্গে কথা বল।
অনি মরে গেছে।
তোর বাবা মরেছে। অনিদা সামনে আছে বলে তোকে ধুতে পারলাম না। না হলে ধুয়ে পরিষ্কার করে দিতাম।
দেতো ফোনটা আমাকে, ওর কপচান বার করছি। সাগিরের গলা পেলাম।
শোন অনিদাকে মারার মতো লোক এখনও পৃথিবীতে জন্মায়নি। নে কথা বল।
আমি কথা বলবো না।
তাহলে আজ রাতের মধ্যে তুই সমেত তোর বংশ লোপাট হয়ে যাবে। আর একটা কথা শোন। যা কথা হবে সব রেকর্ডিং করবি। সকালে অফিস খুললে আধা ঘণ্টার মধ্যে কেশটা উইথড্র করবি। কাগজপত্র সব পৌঁছে যাবে। ভালো করে দেখে নিবি। অরিজিন্যাল না ডুপ্লিকেট। তোর ওই উকিলটাকে দেখিয়ে নিবি। তারপর ওর হাইকোর্টে প্র্যাক্টিশ করা জন্মের মতো বার করে দেবো। যদি কানে এসেছে, ব্যাপারটা নিয়ে জলঘোলা করেছিস। চোখ বন্ধ করার সময় দেব না।
তুই এতো কথা বলছিস কেনরে অবতারদা। শালা বেশি তরপালে, ভ্যানতারা মেরে সময় নষ্ট করতে চাইলে, এখুনি করকে দেব। আর কাগজের অফিসে নিগোসিয়েশন করার জন্য যেতে হবে না। নেপলার গলা পেলাম।
রেকর্ডিং করছিস। অবতারের গলা।
করছি।
প্রথম থেকে করছিস না এখন থেকে করছিস।
তোর বলার আগে থেকে করছি।
এই তো ভালো ছেলে। নে ধর অনিদার সঙ্গে কথা বল।
তুই বিশ্বাস করবি না বুবুন, সারাঘর নিস্তব্ধ।
কারুর মুখে কোনও কথা নেই।
একবার সবার মুখের দিকে তাকালাম। সবার চোখে-মুখে বিষ্ময়। সবাই যেন স্বপ্ন দেখছে। এ হয় নাকি কখনও। কিন্তু সাগির, নেপলা, অবতারের গলা যখন শুনলাম তোর গলাও শুনতে পাব। মিলি, টিনা, অদিতির মুখ লাল।
আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। তাকিয়ে দেখলাম শুধু আমি নয়। সবার মুখ কেমন থম থমে।
সবাই রুদ্ধশ্বাসে মোবাইলটার দিকে তাকিয়ে আছে। কারুর চোখে পলক পরে না। ইসলামভাই-এর চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসবে। আমার শিরদাঁড়া দিয়ে গরম শ্রোত বইছে। এগারো বছর পর তোর গলা শুনবো। এক যুগ। মিলি, টিনা, অদিতি, নির্মাল্য, বিতান, দেবার চোখ মুখ কেমন যেন হয়ে গেছে।
হ্যালো।
তোর গলা শোনা মাত্র সকলের চোখের রং বদলে গেল।
হ্যালো।
সুনীতদা আমি অনি। গলাটা চিন্তে পারছো?
পারছি।
এবার বুঝতে পারছো। আমি সেদিন এ্যাক্সিডেন্টে মরিনি। ওটা একটা সাজান ঘটনা।
বুঝতে পারছি।
চম্পকদা মুখে হাত দিয়ে হেসে ফেললো।
এটা তুমি কি করলে। এতোবার বলা সত্ত্বেও, তুমি এটা কি ভালো কাজ করলে।
তুই এতো ঠাণ্ডা এতো নরম গলায় কথা বলছিস ভাবতেই পারছি না। সেই গলা সেই থ্রোইং। কেটে কেটে ধীর স্থির ভাবে বলছিস।
আমার হকের জিনিষ, কেন ছাড়বো। প্রমাণ করুক মিত্রা ওটা ওর।
ওই সম্পত্তিটা মিত্রার নয়, আমার নামে লিখে দিয়েছিলে, এটা ভুলে গেলে কি করে?
তোর কাগজপত্র মিত্রা দেখাতে পারেনি।
কোনওদিন দেখাতে পারবে না। থাকলে তো দেখাবে। তাই তুমি সেই সুযোগটা নিলে।
বেশ করেছি, তোর ক্ষমতা থাকলে দেখা।
আমি এখানে বসে বসে এতদিন তোমার রগড় দেখছিলাম। তুমি কতোটা উড়তে পার। যদি মনে করতাম, শেষ যেদিন আমি কোর্টে হাজির ছিলাম, সেদিনই তোমার ভবলীলা সাঙ্গ করে দিয়ে চলে আসতাম।
তুই কোর্টে হাজির ছিলি!
তাহলে কি ম্যানা বোতল মুখে নিয়ে এখানে বসে বসে দুদু খাচ্ছিলাম।
ঘর ভর্তি সবাই মুখে হাত চাপা দিয়েছে।
যাক যেটা বলছি মন দিয়ে শুনে নাও।
তুই আমাকে ওটা ফিরিয়ে দে।
তোমার দিবাকরকে আমি তুলে নিয়ে চলে এসেছি। তোমার শেষ অস্ত্র এখন আমার কাছে জমা হয়ে গেছে।
কথাটা শোনা মাত্র আমি থ হয়ে গেলাম। সত্যি কয়েকদিন ধরে দিবাকরের খোঁজ খবর পাচ্ছিলাম না। চিকনাও দিতে পারেনি। চিকনাই আমাকে ফোন করেছিল।
রাজনাথ, ডা. ব্যানার্জীর যা হাল করেছি তোমরও তাই হাল করে ছেড়ে দেব। কোনওদিন কোর্টে কেশ উঠবে না। ওদের দুজনের বডি পাওয়া গেছিল, তোমারটা পাওয়া যাবে না।
এটা তুই কি বলছিস!
যা বলছি তোমার ভালোর জন্য বলছি।
তুই আমাকে….।
আমার অনেক কাজ। বেশি কথা বলার সময় নেই।
বল কি করতে চাস?
তোমার এ্যাকাউন্টে কিছু টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছি। কাল পেয়ে যাবে। সেটা নাড়াচাড়া করে কিছু করে-কম্মে খাবে।
আর শোনো, অনুপ বলে একটি ছেলে অফিসে যাবে।
আমার বিশেষ বন্ধু। তার কাছে সমস্ত ইনফর্মেশন থাকবে। আমি সমস্ত ব্যাপারটা ফলো আপ করছি। কথা না শুনলে, অবতার যা বললো, সেটা ঘটবে। তখন আমার হাতের বাইরে চলে যাবে সব কিছু।
ফোনটা কেটে গেলে।
সারাঘর নিস্তব্ধ, আমার হাত-পা ঠক ঠক করে কাঁপছে।
দাদা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে।
ইসলামভাই-এর মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে।
চম্পকদা বুঝতে পেরেছে দাদা ভীষণ আপসেট হয়ে পড়েছে।
চেয়ার থেকে উঠে দাদার কাছে এলো।
দাদা, হরিদাকে একটু চা আনতে বলি।
দাদা মুখ তুললো।
দাদার চোখে জীবনে প্রথম জল দেখলাম।
ডাক্তারদাদার মুখটাও কেমন থম থমে।
জানিনা আবিদ, রতন এখানে উপস্থিত থাকলে কি করতো।
মল্লিকদা উঠে দাদার কাছে এলো। আমি দাদার পাশেই বসে আছি।
তুই বল চম্পক….।
দাদা আর কথা বলতে পারলো না। গলাটা ধরে এলো।
কথা বন্ধ হয়ে গেল। চোখের কোল বেয়ে জল গড়িয়ে পরছে।
মুখে চোখে কী ভীষণ যন্ত্রণার ছাপ তা তোকে বলে বোঝাতে পারবো না।
আপনি এরকম করলে কি করে হবে।
দাদা ধরা গলায় বললো, কি রাজকার্য করতে গেছে শুনি।
আপনি আমার থেকে ওকে ভালো করে চেনেন।
বাচ্চা দুটোর মুখের দিকে ভালো করে তাকাতে পারি না। ওদের দেখলেই ওর কথা মনে পড়ে যায়। মনে হয় এই যেন ও এসে পড়েছে।
ঠিক আছে ঠিক আছে। আপনি শুনলেন সব কথা।
দাদা পকেট থেকে রুমাল বার করে চোখ মুছলো।
আমাদের অফিসের অবস্থাও আপনি দেখছেন। অনেক ডিসিসান কে নিচ্ছে, আপনি নিশ্চই বুঝতে পারছেন, আমরাও বুঝতে পারছি। আমরা একসঙ্গে ওই ডিসিসনগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি, সহমত হয়েছি।
এখান থেকে এইটুকু, একবার দাদা বলে এসে মুখটা দেখিয়ে যেত পারতো না।
হয় তো ওর কোনও অসুবিধে আছে।
হরিদা দরজা খুলে উঁকি মারলো।
দাদার ওরকম অবস্থা দেখে ভেতরে এসে সুনীতদার ওপর সে কি তেন্ডাই মেন্ডাই।
এই বুঝি সুনীতদার গালে থাপ্পর কষায় আর কি। ঘরে তখন এক হুলুস্থূলুস কাণ্ড।
সনাতনবাবু গিয়ে হরিদাকে আটকায়। যে ল-ইয়ার এসেছিল তার মুখ শুকিয়ে গেছে।
বরুণদা এতো ঠাণ্ডা মাথার ছেলে চেয়ার ছেড়ে উঠে ঘরের বাইরে চলে গেল।
এরকম একটা ঘটনা ঘটতে পারে, বুঝে উঠতে পারেনি।
বুড়োকে ধরে রাখা দায়, হরিদা হাঁপিয়ে গেল।
তারপর একটু থিতু হতে বললো, নীচে অনুপ বলে একজন ভদ্রলোক বসে আছেন, দিদিমনির সঙ্গে দেখা করতে চান।
তুই ডেকে নিয়ে আয়, এ ঘরেই আসুক, কি বলিস মিত্রা? চম্পকদা বললো।
আমি মাথা দোলালাম।
হরিদা বেরিয়ে যেতে চাইছিল।
চম্পকদা চায়ের কথা বললো।
দাদা কাঁদছে কেন আগে বলো।
হরিদাও কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে।
বলছি বলছি তুই আগে সবার জন্য চা বল বটাদাকে।
হরিদা চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল।
ওরে তোকে কি বলবো। অনুপ সবে মাত্র ঘরে ঢুকেছে। পেছন পেছন বটাদা হাজির।
হরিদাকে তো আটকান গেছিল।
বটাদাকে ধরে রাখা যায় না। দেবাশিস, বিতান, নির্মাল্য হাঁপিয়ে গেল। দুই উড়ে তখন রাজ করছে ঘরের মধ্যে। দুই বুড়োর সে কি তেজ। বলে কিনা, একটাকে খেয়েছিস আর দুটোকে খেতে এসেছিস। তোর রক্ত টাটকা খেয়ে নেব। ভগবানের বাবাও তোকে বাঁচাতে পারবে না।
বাধ্য হয়ে আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলাম।
কোনও প্রকারে বুঝিয়ে শুনিয়ে বললাম, তোমাদের ছোটোবাবু বেঁচে আছে।
কথাটা শোনা মাত্রই দুজনে কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
তার কথা আমরা এতক্ষণ শুনছিলাম।
তোকে কি বলবো বুবুন, নিমেষে মুখের ভঙ্গিটা কেমন চেঞ্জ হয়ে গেল।
বটাদা কেমন কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়লো।
আমি তো ভাবলাম এইরে স্ট্রোক হয়ে গেল!
চোখে মুখে জলের ছিটে দিলাম, দেখলাম বটাদা নরেচরে উঠলো।
আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে বললো, কালই আমি কালীঘাটে মায়ের কাছে গিয়ে জোড়া পাঁঠা বলি দেব।
তোর অনুপ এসব দেখে পুরো ফিউজ।
তাকে কি দেখভাল করবো। ঘর সামলাতেই আমরা সবাই হিমশিম খেয়ে গেলাম।
প্রায় আধঘণ্টা পর স্বাভাবিক হতে পারলাম।
অনুপ তার নিজের পরিচয় দিল। সে নাকি সুপ্রীমকোর্টে প্র্যাক্টিশ করে। কলকাতায় বাড়ি। তুই নাকি ওকে সুপ্রীমকোর্টে প্র্যাক্টিশের ব্যবস্থা করে দিয়েছিস।
মিত্রাদেবী কে?
আমি।
তাকালাম।
আপনার সঙ্গে কিছু ব্যক্তিগত কথা আছে।
আপনি এখানে বলতে পারেন। কোনও অসুবিধে নেই। আমি সবার সঙ্গে ওনার পরিচয় করাই আর উনি বলতে থাকেন, আমি সবার নাম শুনেছি। কারুর সঙ্গে পরিচয় হয়নি। সবাইকে আমি আজ প্রথম দেখছি।
বটাদা চা নিয়ে ঢুকলো।
চা খেতে খেতে দাদা একটু স্বাভাবিক হলো।
তুই বিশ্বাস কর বটাদা সেই উকিল আর সুনীতদাকে চা দিল না।
শেষে চম্পকদা নিজেহেতে বটাদার কাছ থেকে চা নিয়ে সুনীতদাকে আর সেই উকিলবাবুকে দিল। কি লজ্জা করছিল আমার।
হ্যাঁ গো অনুপ তোমার সঙ্গে অনির পরিচয় কি করে? দাদা বললো।
আমি ও একসঙ্গে ইউনিভার্সিটিতে পড়তাম।
তুমিও কি জার্নালিজম নিয়ে পড়েছো?
হ্যাঁ। তারপর ওর বুদ্ধিতে ওকালতি পড়ি।
তারপর।
এখানে ব্যাঙ্কশাল কোর্টে প্র্যাক্টিশ করতাম। তারপর আমাকে ধরে নিয়ে গেল দিল্লিতে।
তোমার সঙ্গে ওর শেষ দেখা কবে হয়েছিলো?
যেদিন আপনাদের লাস্ট কেশের ডেট ছিল।
তুমি সেদিন কোর্টে ছিলে!
আমি ছিলাম না। আমার জুনিয়াররা ভেতরে ছিল, অনি নিজে উপস্থিত ছিল। আমি ও দুজনেই কোর্টের বাইরে ছিলাম।
চম্পক তুই সনাতনবাবু সেদিন গেছিলি না?
গেছিলাম।
অনিকে দেখেছিলি?
দেখলে কি খালি হাতে ফিরতাম।
তোর অনুপ হাসছে।
হাসছো কেন অনুপ?
ও চেনার মতো পোশাক পরিচ্ছদ পরে এখানে আসেনি। সুনীতবাবু কে?
সুনীতদা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
উঠতে হবে না বসুন।
দাদার দিকে তাকিয়ে।
দাদা নিচে আমার একটা বড়ো ভিআইপি স্যুটকেস আছে। বেশ ভাড়ি। নিয়ে আসতে হবে। কাউকে যদি আমার সঙ্গে একটু পাঠাতে পারেন খুব ভালো হয়।
তোমায় যেতে হবে না। বোসো। আমি বলে দিচ্ছি।
দাদা ফোনে নিচে বলে দিল।
হায়, দেখি নিউজরুম থেকে সন্দীপ, অর্ক, অরিত্র, দ্বীপায়ণ তোর রাত্রি, খুশী সব এসে হাজির। সারা অফিস রাষ্ট্র হয়ে গেছে। দাদা সবাইকে ধমকে ঘর থেকে বার করে দিল।
আর বার করা। একদল যায় তো একদল আসে। তারা সবাই সুনীতদাকে দেখে নেবে।
আমি হাসবো না কাঁদবো। বোবার মতো বসে আছি।
এরই মধ্যে দেবাশিসরা সুনীতদার মোবাইল থেকে তোর রেকর্ড করা গলা ব্লুটুথে ট্রন্সফার করে নিল।
নিচের দুজন সিকুরিটি গার্ড সেই ভিআইপি স্যুটকেশ নিয়ে এলো।
এখানে সবাই অনির খুব ক্লোজ। আমি নির্ভয়ে খুলতে পারি। অনুপ বললো।
হ্যাঁ হ্যাঁ তুমি খোলো। দাদা বললো।
স্যুটকেশটা খুলতেই আমি উঁকি মারলাম। ঠাসা মালপত্র, মিষ্টির বাক্স, অনুপ একটা ফাইল বার করলো।
দাদা যে কেশটা চলছে তার কাগজ-পত্র এর মধ্যে সব আছে। আপনি দেখে নিন।
আমি কি বুঝবো বলো। তুমি উকিল, তুমি এদের বুঝিয়ে দাও। হিমাংশু তুমিও সব কিছু এবার ভালো করে বুঝে নাও। আর যেন ভুল না হয়।
এরপরও আর ভুল হবার আশা আছে? সনাতানবাবু টিপ্পনি কাটলো।
মল্লিকদা দেখলাম ঘরের এককোনে ফিস ফিস করে কথা বলছে। বুঝলাম কার সঙ্গে কথা বলছে।
দাদা পরিচয় করিয়ে দেবার পর অনুপ, সুনীতদার ল-ইয়ারের হাতে দলিলগুলো দিল। উনি দেখে চোখ কপালে তুললেন।
সুনীতদার দিকে তাকালেন।
আপনি এই অরিজিন্যল কাগজের এগেনস্টে লড়ছিলেন!
সুনীতদা চুপ।
আপনি হাইকোর্টে জিততেন। তারপর কেশটা সুপ্রীম কোর্টে গেলে কি হতো বুঝতে পারছেন। আপনি সব জেনেও একটা সাজান কেশ করতে গেলেন।
সুনীতদা মাথা আর তোলে না।
ভদ্রলোক রেগে উঠলেন এখানে আর বসে থেকে লাভ নেই। কোর্টে গিয়ে কাজ সারি।
এই নিন, আপনারা যে কেশটা উইথড্র করবেন তার ফাইল। এখানে সবকিছু বলা আছে। অনুপ আর একটা ফাইল দিল।
ফাইল ঘুরছে সবার হাতে, ডাক্তারদাদা ডুব দিল কাগজপত্রের মধ্যে।
সেই ল-ইয়ার ভদ্রলোক এবার দাদাকে বললেন—
দাদা আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো?
বলুন।
বছর দশেক আগে আপনাদের কাগজে অনি ব্যানার্জী বলে একজন কাজ করতো। রাজনাথ বাবুর সম্বন্ধে ডা. ব্যানার্জীর সম্বন্ধে তখন বহু লেখালেখি হয়েছিল। উনি লিখেছিলেন। তখন একটা ঝড় বইছিল কলকাতা শহরে।
হ্যাঁ ওই অনি ব্যানার্জীই এই অনি ব্যানার্জী।
বাবাঃ গলা শুনে তো মনে হচ্ছিল উনি ডন!
এই শয়তানরা ওকে ডন বানিয়েছে। আজ ও দেশ ছাড়া। কেন আপনার গুণমন্ত্র মক্কেল সব খোলসা করে বলে নি?
বললে কি কেশটা হাতে নিতাম দাদা। কাগজের এগেনস্টে কেশ, জিতলে একটু নাম ডাক হবে। মক্কেল বেশি পাব। এই ভেবে কেশটা হাতে নিয়েছিলাম।
এরই মামা ডা. ব্যানার্জী। আর কিছু বললাম না। ওর মুখ থেকে সব শুনে নেবেন।
মিত্রাদেবী?
অনির স্ত্রী।
বোঝা হয়ে গেছে।
আপনি শুধু সুনীতবাবুকে বাঁচালেন না। আমাকেও একটা অতি ঘৃন্য কাজের হাত থেকে বাঁচালেন।
উঠি দাদা। ভদ্রলোক হাতজোড় করলেন।
হিমাংশু কোর্টে গেল, সনাতনবাবু, চম্পকদা সঙ্গে গেল।
এবার তোর অনুপ ঝোলা থেকে সব বার করতে আরম্ভ করলো।
প্রথমে দাদার হাতে একটা খাম দিল।
এটা আপনার জন্য।
কি এটা?
প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে পারবো না দাদা।
এই দেখুন এই কাগজে সিরিয়ালি লেখা আছে। আমি ধরে ধরে দিয়ে যাচ্ছি।
ইসলামভাই।
আমি।
এই খামটা আপনার।
একে একে নাম ধরে ধরে ডাকে আর একটা করে খাম হাতে দেয়।
মিলি, টিনা, দেবা, সনাতনবাবু, চম্পকদা, নির্মাল্য, বরুণদা, জ্যেঠিমনি, মল্লিকদা সবার খাম।
দুটো প্যাকেট বার করলো একটা বড়োমার একটা ছোটোমার।
এগুলো দিল্লির লাড্ডু। হুকুম ছিল, কিনে পাঠান হয়েছে।
ম্যাডাম আপনি এগুলো সবার মধ্যে ভাগ করে দিন।
আমার দিক থেকে চোখ না ফিরিয়েই বললো, এর ভেতরে দুটো প্যাকেট আছে। ওটা বার করলাম না। বাড়িতে গিয়ে আপনি দেখবেন।
আর বড়োমা ছোটোমার প্যাকেটটা ওনারা খুলবেন আর কেউ খুলবে না।
দাদা দেখি আপন মনে হো হো করে হেসে উঠলো।
সবাই প্রথমে একটু অবাক হয়ে গেছে।
ওরে আগে কম্পোজে পাঠা মল্লিক, বলে কিনা নিজস্ব সংবাদদাতা। আমি ওর নাম ছেপে দেব। দেখি তুই কতোবরো দাদা হয়েছিস।
ডাক্তারদাদা, দাদার দিকে ফ্যাকাশে চোখে তাকাল।
তুমি কি পাগল হয়ে গেলে এডিটর!
হ্যাঁ ডাক্তার, আমি পাগল হয়ে গেছি। দেখো দেখো আমি যে জিনিসটা চাই সেটাই পাঠিয়েছে। উইথ ফটোগ্রাফ।
বিতান, হরিকে ডাক, চা আনতে বল।
না—যাই করুক লেখাটা ভোলে নি, বুঝলি মা। কি কনস্ট্রাকসন, শব্দগুলোর কি তেজ?
দাদা আমার দিকে শিশু সুলভ দৃষ্টিতে তাকাল।
একেবারে তোর ছেলেমেয়ের মতো আচরণ করছে।
হরিদা, বটাদা চা নিয়ে ঢুকলো। পেছন পেছন অর্ক, অরিত্র, সায়ন্তন, সন্দীপ, দ্বীপায়ন।
দেখ সন্দীপ দেখ, অনি লেখা পাঠিয়েছে।
দাদার কথা শুনে ওরা প্রথমে ভড়কে গেল। একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে।
একচ্যুয়েলি তিনটে ইনস্টলমেন্টে পুরোটা বেরিয়ে যায়। একসপ্তাহ ধরে কনটিনিউ করবি। দ্বীপায়ন ছবিগুলো ভালো করে দেখে নিবি, ঠিক ঠিক জায়গায় প্লেস কর। ভুল যেন না হয়।
ঘরের মধ্যে যেন হরির লুট চলছে।
দাদা বড়োমাকে ফোন করলো—ইসলামভাই ওর্ণাদিয়ে চোখ মুছছে—
তোমার আবার কি হলো ইসলাম! ডাক্তারদাদা বললো।
গতো সপ্তাহ পর্যন্ত যা ভুল কাজ করেছি, তার একটা লিস্ট পাঠিয়েছে। কি করতে হবে তাও বলে দিয়েছে।
তার মানে গত সপ্তাহ পর্যন্ত ও কলকাতায় ছিল?
ডাক্তারদাদা অনুপের দিকে তাকাল।
কি অনুপ তুমি মিছে কথা বলছো কেন?
বিশ্বাস করুণ স্যার। আজ সকালে এই স্যুটকেশ আর এই চিঠিটা আমার বাড়িতে আসে। গাড়ির কাঁচে লেখা ছিল প্রেস বিবিসি।
আমাকে বাক্সটা হ্যান্ড ওভার করে গাড়িটা ভোঁ করে চলে গেল।
তারপর আমার মোবাইলে একটা ম্যাসেজ এলো আধঘণ্টা পর। পড়লাম। সব জানতে পারলাম। আপনি যদি ম্যাসেজটা দেখতে চান এখুনি দেখাতে পারি।
দেখাও। ডাক্তারদাদা বললো।
ডাক্তারদাদা মুখের কথা আর কিছুতেই বিশ্বাস করতে চায় না।
অনুপ মোবাইল থেকে ম্যাসেজটা বার করে ডাক্তারদাদার হাতে দিল।
অনুপ ম্যাসেজটা ফরোয়ার্ড করে দাও না।
দেবাশিস বললো।
অনুপ হাসছে।
নিয়ে নিন।
ঘরে তখন হই হই রই রই।
আচ্ছা মামনি—
আমি ইসলামভাইয়ের দিকে তাকালাম।
এখানে কেউ আবার অনির ইনফর্মার নেই তো?
সবাই উচ্চশ্বরে হেসে উঠলো।
জব্বর কথা বলেছো ইসলাম। দাদা বললো।
কাকে বিশ্বাস করি বলুন দাদা। সব কেমন যেন স্বপ্ন দেখছি মনে হচ্ছে।
তুমি স্বপ্ন দেখ আমি আর দেখতে রাজি নই। ছেলেটা এলো, তোমরা খপ করে ধরতে পারলে না। কি তোমরা ক্ষমতা দেখাও কে জানে।
কি করে বুঝবো। যে কটাকে আমি ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিলাম, তাদের গলা শুনলেন।
তুমি খোঁজ লাগাও, দেখ ওদের চ্যালা-চামুণ্ডা কে আছে।
আমি কি বসে আছি দাদা। নো ট্রেস।
একবার ভালোকরে খুঁজে দেখো ঠিক পেয়ে যাবে।
দেখি।
অনুপ তার কার্ডটা আমাকে দিল।
আমি আমার কার্ড দিতে গেলাম।
আপনাদের সবার নম্বর আমার কাছে আছে।
তারপর দাদার কাছে গিয়ে বললো, দাদা একটা অপরাধ হয়ে গেছে।
আবার কি হলো?
আপনাদের কাউকে প্রণাম করা হয়নি।
কেন খবরটা চলে গেছে বুঝি?
সবাই আবার হেসে উঠলো।
অনুপ সবাইকে প্রণাম করে চলে গেল।
যাওয়ার আগে বললো, আমাকে প্রয়োজন হলে ফোন করবেন।
ফোন করবো কি হে তুমিই তো এখন শিখন্ডি।
আবার সবাই হাসে।
অনুপ আমাকে ইশারা করলো, আমি অনুপের পেছন পেছন বাইরে এলাম।
গেটের মুখে দাঁড়ালাম।
এটা আমার তরফ থেকে আপনাকে দিলাম। কেউ যেন জানতে না পারে। এমন কি অনি পর্যন্ত। তাহলে ওর হাতেই আমার মৃত্যু লেখা থাকবে। আপনাকে নিশ্চই এই ব্যাপারে বিশ্বাস করতে পারি।
আমি ছোট্ট খামটা ওর হাত থেকে নিলাম। হাসলাম।
আসি ম্যাডাম।
অনুপ চলেগেল। ওকে লিফ্ট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এলাম।
নিজের ঘরে গেলাম। ব্যাগটা গুছিয়ে নিলাম। আবার দাদার ঘরে এলাম।
দাদা আজ আর ভালো লাগছে না। আমি বাড়ি যাই।
ডাক্তারদাদা হঁ হঁ করে উঠলো। তুই একা কেন। আমিও যাব।
ইসলামভাই উঠে দাঁড়াল। আমিও যাব।
আমার গাড়িতেই সকলে এক সঙ্গে উঠলাম।
গাড়ি এসে গেটের কাছে দাঁড়াতেই বারান্দা দিয়ে দেখলাম দামিনীমাসি নেমে বাগানে চলে এল। পেছন পেছন বড়োমা, ছোটোমা, জ্যেঠিমনি।
মনে মনে ভাবলাম এরই মধ্যে দামিনীমাসি, জ্যেঠিমনি এলো কোথা থেকে!
আমাদের কি নামতে দেয়।
আমি নামতেই দামিনীমাসি আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মুখ গুঁজলো।
ছোটোমা, বড়োমা, জ্যেঠিমনির মুখ কাঁদো কাঁদো। দিদিভাই বারান্দায় দাঁড়িয়ে। তোর ছেলে-মেয়ে, পিকু তারস্বরে চেঁচামিচি করছে।
অনি কোথায় আছে বল?
আচ্ছাই শুরু করলে তোমরা, ভেতরে চলো, সব বলছি।
কে কার কথা শোনে।
ততক্ষণে রবীন গাড়ির পেছন থেকে সেই বড়ো বাক্সটা নামিয়ে নিয়েছে।
দিদিভাই এইবার বারান্দা থেকে বাগানে নেমে এলো।
তোর ছেলেমেয়েদের কোনও হুঁস নেই। পিকুদাকে পেয়ে তারা স্বর্গরাজ্য পেয়েছে।
দিদিভাই ইসারা করে বললো, বল না একটু।
আমি মনে মনে হাসি। আসল লোকটার দেখা নেই। তার গলা নিয়ে কি কাণ্ডটাই না ঘটে যাচ্ছে। আচ্ছা তোর কি একটুও ইচ্ছে করে না। এদের এই করুণ মুখ গুলো দেখতে।
আমরা তিনজনে এসে ভেতরের ঘরে বসলাম।
তোর মেয়ে ইসলামভাই-এর গলা জড়িয়ে ধরে বললো, ভাইদাদাই আমরা চোর পুলিশ খেলছি।
তোরা ওই ঘরে গিয়ে খেল, আমরা একটু কথা বলি।
ওরা চলে গেল।
ডাক্তারদাদা ইসির দিকে তাকিয়ে বললো, একটু চা কর না।
কিছু খেয়েছো। বড়োমা বললো।
না সকাল থেকে যা চললো জুটবে কোথা থেকে।
ভাত খাও।
আগে একটু চা দাও।
দিদিভাই রান্নাঘরের দিকে গেল। বুঝলাম কানটা এদিকে রেখে গেল।
কি রে বল। ছোটোমা বললো।
কি বলবো। শুধু ওর গলা শুনলাম।
মল্লিক যে বললো ও কলকাতায় এসেছিল। বড়োমা বললো।
ইসলাম বললো, সাতদিন আগে পর্যন্ত ছিল। দামিনীমাসি বললো।
ইসলামভাইকে জিজ্ঞাসা করো।
এসেছিল, আমরা কেউ দেখতে পাইনি। অনুপ বলে ছেলেটি ওর সঙ্গে ছিল। ডাক্তারদাদা বললো।
হ্যাঁগো ইসলাম তুমি কি করছিলে। জ্যেঠিমনি বললো।
কি করবো তুমি আমাকে বলো দিদি।
রতন, আবিদ কি করছে।
ওরা হয়তো আমার থেকে বেশি জানে।
আসুক আজকে ঝ্যাঁটা মেরে বিদায় করবো। বড়োমা খ্যার খ্যার করে উঠলো।
এই মুহূর্তে আমার হাসি পেল না। কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছি।
দিদিভাই চা নিয়ে এলো।
চা খেতে খেতে আমি ওদের রেকর্ডিংটা শোনালাম। জ্যেঠিমনি, বড়োমা ডুকরে কেঁদে উঠলো।
এই দেখো তোমরা এরকম করলে আমি উঠে চলে যাব।
বড়োমা আমার পাশে এসে বসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
কান্না থামাও আর একটা জিনিষ শোনাব।
বড়োমা চোখ মুছছে।
শোনার পর কাঁদতে পারবে না। প্রমিস—
বড়োমা মাথা দোলাচ্ছে।
আবার কি শোনাবি! ইসলামভাই-এর চোখ বড়ো বড়ো।
শোন না আগে তারপর বলছি।
সবাই হুমড়ি খেয়ে পরেছে মোবাইলটার ওপর। আবার সকলের চোখে মুখে উত্তেজনা।
আমি দশ বছর আগে তোর গলার রেকর্ডিংটা অন করলাম।
কিরে আজ আবার পা পিছলে ছিলি?
কই।
তাহলে মিত্রাকে খবর পাঠালি কেন?
এ খবরটাও তোর কাছে চলে গেছে!
তোকে বলেছি না চিকনা আমি সাধনা করছি। আমার সাধনায় ব্যাঘাত ঘটাবার চেষ্টা করবি না।
ক্ষমা কর—
আমার কাছে ভুলের কোনও ক্ষমা নেই। এটা তুই ভালো করে জানিস।
কি করবো, গুরুমার মুখের দিকে তাকাতে পারছি না।
ওটা তোর আর তোর গুরুমার ব্যাপার।
একটুক্ষণ চুপ।
চুপ করে রইলি কেন?
কি করবো বক বক করবো, তুই আমাকে আর ফোন করে জানতে চাইবি না।
তাহলে সরে যেতে হবে।
কবে সরাবি বল, আমি প্রস্তুত। আমার আর ভালো লাগছে না।
চিকনার কান্না।
বাচ্চা দু-টোকে কোলে নিয়েছিলাম বললো, বাবার কাছে যাবে। কি উত্তর দেব—
মেয়ের দিব্যি খেয়ে বলছি চিকনা টোডিকে এমন মার মারবো, ওর বডির একটা টুকরো তোরা কেউ খুঁজে পাবি না। শুধু কয়েক টুকরো পোড়া মাংসো পাবি।
একটু থেমে।
শালা জীবনটাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিল। গলাটা ধরে গেল।
চুপ চাপ।
কথা বলছিস না কেন, আমার প্রশ্নের উত্তর দে। পৃথিবীতে তুই ঠিক আর সবাই ভুল।
চুপ চাপ।
বোবার শত্রু নেই তাই না। তুই কি হনু হয়েগেছিস। আমি আর কতো জবাব দিহি করবো সবার কাছে। কতো মিথ্যে কথা বলবো। বড়োমা, ছোটোমা, জ্যেঠিমনি, সুরো কতো নাম বলবো।
সুরো এসেছে!
হ্যাঁ।
কাঁদছিস?
না।
বৌদি?
এসেছে।
হ্যাঁরে বাচ্চাদুটো তোকে কি বললো?
দেখলাম বড়োমা মুখে কাপর চাপা দিয়েছে। কাঁদতে পারছে না। ছোটোমা, জ্যেঠিমনি, দামিনীমাসির একই অবস্থা।
ডাক্তারদাদার চোখ মুখ স্থির, যাকে বলে একবারে কুল।
ইসলামভাই-এর গাল বেয়ে জল গড়াচ্ছে।
কি বলবে, পাটালি খাওয়ালাম। নিজে হাতে বানিয়ে ছিলাম।
খাইয়েছিস! কি বললো খেয়ে?
কি বলবে, কিছুটা খেয়ে আমার মুখে ঢুকিয়ে দিল।
কেমন দেখতে হয়েছেরে, মিত্রার মতো?
কাল তোকে ছবি পাঠাবো।
পাঠা।
বুঝলি এবার কলকাতা গিয়ে তিনবার চান্স নিলাম দেখার জন্য, দেখতে পেলাম না। কেউ নিয়ে বাগানে বেরলই না।
তুই এখন কোথায়—দুবাই না লণ্ডন?
লণ্ডন।
মিথ্যে কথা বলছিস?
বিশ্বাস কর। কাগজের অফিসটা বানাব তার তোর জোর করছি।
চুপচাপ।
হ্যাঁরে, বড়োমার চুলগুলো একেবারে সাদা হয়ে গেছ তাই না?
চিকনার উত্তরের অপেক্ষা না করেই…।
আচ্ছা তার আগে বল কারা কারা এসেছে।
সবাই। দামিনীমাসি পর্যন্ত।
দামিনীমাসি এসেছে!
হ্যাঁ।
শোবার জায়গা কোথায়?
রাজপ্রাসাদ বানিয়েছি।
আবার ঝামেলা শুরু করে দিলি।
ছাড়, কথা বলতে ভালো লাগছে না।
তুই এখন কোথায়?
পীরসাহেবের থানে বসে আছি।
কটা বাজে বলতো।
দুটো ফুটো হবে।
আমাদের এখানে সবে মাত্র বিকেল হলো।
হ্যাঁরে ছোটোমাকে দেখতে কেমন হয়েছে?
ছবি তুলে পাঠাব, দেখে নিবি।
তুই গরম খেয়ে যাচ্ছিস কেন?
বেশ করছি, কবে মারবি বল।
তোকে মারলে আমিই মরে যাব।
মেয়েটা তোর মতো দেখতে হয়েছে।
ধ্যাত।
দেখে নিবি।
কোনটা বেশি দুষ্টু।
মেয়েটা। ছলেটা ভিঁজে বেড়াল।
কি রকম করে কথা বলছে?
রেকর্ড করে পাঠাবো।
পাঠা। প্রজেক্টের খবর বল।
ঠিক ঠাক চলছে। একটু ঝামেলা হচ্ছিল পার্টিগত ভাবে।
অনিমেষদাকে জানিয়েছিস?
না। সামলে নিয়েছি।
রসদ আছে?
আছে।
কাকা কেমন আছে?
ভালো। তোর ওদিকের কাজের খবর কি?
মি. মুখার্জীকে যে মালগুলো সাল্টে ছিল। তার তিনটেকে হজম করেছি। আর দুটো বাকি আছে। আশা রাখছি আগামী কয়েক মাসের মধ্যে হজম করে নেব।
অবতার, সাগির কোথায়?
দুবাইতে।
টোডি।
লণ্ডনে।
তাই তুই লণ্ডনে।
হ্যাঁ। ওকে চেইন করে বেঙ্গলে নিয়ে যাব। শালা নাম ভাঁড়িয়ে বড়ো ব্যবসায়ী হয়েছে।
কতোদিন সময় নিবি।
বলতে পারছি না। তবে ওই কাজটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারুর সঙ্গে কথা বলবো না।
নেক্সট ডেট বল।
ম্যাসেজ করবো।
তোর নম্বরটা গুরুমাকে দেব।
না। কাজের জায়গায় দুর্বলতার কোনও স্থান নেই। একথা তোকে আগেও বলেছি।
আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না।
সম্ভব না হলে অনাদি, বাসুকে দায়িত্ব দিতাম, তোকে দিতাম না।
অনাদি এখানে স্কুল করতে চাইছে।
কোথায়?
মোরাম রাস্তার ধারে।
জমি যেটা নেওয়া হবে সবাই যেন পয়সা পায়। ফোঁকটসে নয় মাথায় রাখবি।
ও হাফদাম দেবে বলেছে।
পয়সা কি ওর বাবার ঘর থেকে দেবে।
আমিও সেই কথা বলেছি।
চেপে যা দেখনা কি করে। তারপর আমি লোক পাঠাব। হিমাংশুর কাছে গেছিলি?
হ্যাঁ।
ডিডটা তৈরি করে দিয়েছে?
দিয়েছে।
কিছু বুঝতে পেরেছে?
না।
আগামী সপ্তাহে পরিদার দোকানে লোক যাবে দিয়ে দিবি। সাইন করে পাঠিয়ে দেব।
তুই কি সত্যি সব উইল করে দিবি?
আমার নিজের বলে কি আছে বল তো চিকনা—বাবার কয়েক বিঘে জমি।
ওটাও তো বাসন্তী মাকে দিয়ে দিলি।
যদি না ফিরি। যাদের জিনিষ তাদের দিয়ে দেওয়া ভালো।
আর কয়েকদিন পর করলে হতো না।
হতো। তবে ডিসিসন নিলাম যখন করেই ফেলি।
তনুদি কবে আসবে?
লণ্ডনের অফিসটা বানিয়ে নিই, তারপর।
তুই এতো টাকা পাচ্ছিস কোথায়?
মস্তানি করে।
খিস্তি দেব।
দে। অনেকদিন তোর মুখের গালাগাল শুনিনি।
তুই কবে আসবি?
কেন, কথা বলছি, তাতে আশ মিটছে না।
গুরুমার সঙ্গে একটু কথা বল না। মনটা শান্তি পেত।
আমাকে দুর্বল করে দিসনা চিকনা। তুই পাশে আছিস এটাই যথেষ্ট।
বাচ্চাদুটোর সঙ্গে কথা বল।
ওরা বড়ো হলে নিজের তাগিদে তাদের বাবাকে খুঁজে নেবে। শোন আমি একটু বেরোব। একটা মিটিং আছে। পারলে কালকের আপডেটটা দিস, ঠিক এই সময়ে।
কে ফোন করবে তুই না আমি?
আমিই করবো।
আচ্ছা।
রাখছি।
ফটোগুলো পাঠাতে ভুলিস না যেন।
ফোনটা কেটে গেলো।
আমি ফোনটা হাতে তুলে নিলাম।
বড়োমা চোখ মুছতে মুছতে বললো। তোকে কবে ফোন করেছিল!
আমাকে করেনি। চিকনাকে করেছিল। চিকনা কনফারেন্সে আমাকে শুনিয়েছে।
কবে করেছিল—এতদিন বলিস নি!
দশ বছর আগে। যেদিন কৃষি ফার্মটার উদ্বোধন হয় তার আগের দিন।
আমাকে এতদিন জানাস নি কেন!
শুনলে তোমার ছেলের কথা, কি বললো।
বড়োমা ডুকরে কেঁদে উঠলো। আমাকে আষ্টে পৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো।
তুমি এরকম করলে আমি কি নিয়ে থাকবো।
কিছুতেই কান্না থামে না।
ডাক্তারদাদা উঠে এলো। কোনওপ্রকারে সামলে নিলাম নিজেকে।
তারপর সারাটা দিন ধরে হাজার প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম। বিশেষ করে ইসলামভাই, ডাক্তারদাদার। উত্তর দিতে দিতে আমি হাঁপিয়ে উঠলাম।
(আবার আগামীকাল)