| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কাজলদীঘি

Reporter Default
রিপোর্টার / ২৫৫৩ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ২৯ জুন, ২০২০

জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

১৩০ নং কিস্তি

দেখলাম এদিকেই আসছে তর তর করে। ভয়েজ অন করে ফোনটা মেঝেতে রাখা।

একবারে এদিকে নয়, কাগজ-পত্র ছড়ানো আছে। ঘুরে আয়।

এসে জড়িয়ে ধরলো।

খিদে পেয়েছে। পেছনে মিকি।

মনি যে বিস্কুট দিল।

মিকি সব খেয়ে নিয়েছে।

দু-প্যাকেট!

তুই খাস নি। মিকি বললো।

দুটো।

নাগো আঙ্কেল ও এক প্যাকেট আমি এক প্যাকেট।

মিত্রা জোড়ে হেসে উঠলো।

তুমি ফোনে কথা বলছো। মিলির মেয়ে বলে উঠলো।

হ্যাঁ।

কার সঙ্গে।

আন্টির সঙ্গে।

বড়ো আন্টি।

হ্যাঁ বড়ো আন্টি। মিত্রা বললো।

তোমার খিদে পেয়েছে সোনা।

দেখনা মিকি আমার বিস্কুট খেয়ে নিয়েছে। তুমি বকো।

কি করে বকবো, আমি এখন বাইরে।

আসবে না।

আসবো।

দেখলাম রবীন দুটো বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে ভেতরে এলো।

তুই এগুলো কোথা থেকে নিয়ে এলি! আমি বললাম।

আবার কে এলো রে? মিত্রা বললো।

রবীন।

কি নিয়ে এসেছে?

বিস্কুটের প্যাকেট।

আর বোলো না। কখন ব্যাগ থেকে বিস্কুট বার করে রাস্তার কুকুরগুলোকে খাইয়েছে। গেটের বাইরে যেতে পারে নি। ভেতর থেকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিয়েছে। রবীন বললো।

আমি ব্যাগ খুলে দেখি ভোঁ ভা। তারপর দেখলাম গেটের বাইরে খালি প্যাকেট পরে আছে।

তুই যা রেডি হ। আমি গুছিয়ে এখুনি বেরচ্ছি।

রবীন সব ঠিক আছে। মিত্রা বললো।

হ্যাঁ ম্যাডাম।

বাগান, ঘরদোর সব পরিষ্কার করছে।

আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে করাচ্ছি। আপনি দাদাকে জিজ্ঞাসা করুণ।

মিত্রা হাসছে।

রবীন দুটোকে নিয়ে চলে গেল। দু-জনে বিস্কুটের প্যাকেট খুলে ফেলেছে। আবার কিচির মিচির।

শুনছিস।

শুনছি।

আচ্ছা আমাদের ছেলে-মেয়ে দুটোও কি এরকম ছিল?

কাছাকাছি। তবে ছোটোমা, দামিনীমাসির দাপটে কিছু করতে পারত না। তবে রাত দিন খেয়োখেয়ি, মারামারি লেগেই থাকত। দুটোই ছোটোমাকে ভীষণ ভয় পায়। আবার কিছু হলে ছোটোমাকেই প্রথমে এসে বলে।

এগুলো গুছিয়ে নিয়ে এবার বেরোব।

কোথায় যাবি?

এগুলোকে আগে বাড়িতে ঢোকাই তারপর ভাববো।

মিত্রা হাসছে।

কাজ সার, ঠিক করে গুছিয়ে রাখবি, তুই আমি ছাড়া এর হদিস আর কেউ জানে না।

মনে আছে।

দেখি সময় পেলে রাতে ফোন করবো।

করিস।

তুই তো করতে পারিস।

চুপ করে থাকলাম।

মিত্রা ফোনটা কেটে দিল। একটা কঁ কঁ আওয়াজ ভেসে এলো।

সব কিছু গোছগাছ করে যথাস্থানে সমস্ত রেখে বেরিয়ে এলাম।

নিচে তখনও দাপাদাপি চলছে।

সত্যি এদের এনার্জি। মাথা খারাপ হয়ে যাবার জোগাড়।

রবিনকে নিয়ে যখন বেরলাম তখন সন্ধ্যে হয় হয়।

বেরবার সময় রবীনের বৌমার হাতে কিছু টাকা দিলাম, বললাম বাচ্চাটাকে কিছু কিনে দিও।

দাদা এবার কোথায় যাবে?

আগে চিত্তরঞ্জনে চল।

কেন!

ওখানে দেখবি কচুরির রোল পাওয়া যায়। বিস্কুটে এদের কিছু হবে না। একটু বেশি করে কেন। সবাই খাবে। তারপর অফিসে যাব। জল আছে?

হ্যাঁ, বোতলে ভরে নিয়েছি।

ঠিক আছে।

রবীন আমার কথা মতো কাজ করলো। নিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দু-জনে গাড়িতে বসে খেতে শুরু করে দিয়েছে।

দুটোর বেশি একটাও পাবি না।

মিলির মেয়েটা বেশি তরতরি। খালি কিচ কিচ করছে।

দু-টো করে দু-জনের হাতে দিয়ে রবীনকে বললাম সব ব্যাগে রাখ।

সুরোদি ফোন করেছিল।

কখন।

এই তো কিছুক্ষণ আগে। তোমার ফোন বন্ধ।

খোলাছিল। মিত্রার সঙ্গে কথা বললাম।

তাহলে দেখো ভুল করে স্যুইচ অফ করা হয়ে গেছে।

পকেট থেকে বার করে দেখলাম রবীন মিছে বলে নি। আবার অন করলাম।

সুরো কি বললো?

আসবে বলছিল, আমি বললাম, আমরা বেরিয়ে এসেছি।

বলেছিস, কোথায় যাচ্ছিস?

বলেছি।

অফিসের গেটে যখন এসে দাঁড়ালাম। তখন সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। শীতের বেলা, আলো তারাতারি মরে যায়। দু-টোকে দু-হাতে নিয়ে নামলাম। পুতুলদুটো নিতে দুজনের কেউ ভোলে নি।

রবীনকে বললাম ব্যাগগুলো নিয়ে আয়। ফাইলগুলো পেছনে থাক।

দু-জনে হাত ময় নোংরা করেছে। গায়ে হাত মুছছে।

যা পারে করুক। মিলি আছে, বলবো, বাবা তোমার মেয়েকে ধরো।

ভেতরে ঢুকতেই পিউ রিসেপশন থেকে উঠে এলো।

হাসতে হাসতে দু-জনের গাল টিপে দিল।

এরা কে স্যার?

আমার ছেলে আর মেয়ে।

পিউ খিল খিল করে হেসে উঠলো।

আঙ্কেল এটা তোমার অফিস। মিলির মেয়ে বলে উঠলো।

হ্যাঁ।

আমরা অফিসে এখন কাজ করবো।

চুপ করে রইলাম।

কতজন যে এসে এরই মধ্যে ওদের গাল টিপছে কে জানে।

দু-টোতেই ভীষণ বিরক্ত হচ্ছে।

চলো না এখান থেকে, সব বাজে।

যারা ঘিরে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল তারা হাসে।

লিফ্টে করে সোজা ওপরে উঠে নিউজরুমে এলাম।

অর্করা দেখতে পেয়েই সোজা উঠে এলো। সন্দীপ দেখলাম নিজের টেবিলে বসে হাসছে।

আঙ্কেল, অর্ক তোমার অফিসে কাজ করে।

মিলির মেয়ের দিকে তাকালাম।

ওরে তরতরি অর্ক তোর বাবার বন্ধু। একজন ওর গাল টিপে দিল।

হি হি করে হাসে। কতো কথা বলে যায়।

চুপ করে রইলাম।

উত্তর দিয়ে শেষ করতে পারবো না।

এদের কোথায় পেলে?

অর্ক এগিয়ে এসেছে। রাত্রি আর খুশী এগিয়ে এসে দুটোকে কোলে তুলে নিয়েছে।

আর বলিস না। সুরো গছিয়ে দিয়েছে। কয়েক ঘণ্টায় মাথার স্ক্রু পুরো ঢিলে করে দিল।

হাসছে।

ওরা চালান হয়ে গেছে। আমি গিয়ে নিজের চেয়ারে বসলাম।

দেখলাম ওদিকে তারস্বর চেঁচামিচি শুরু হয়ে গেছে।

দু-জনেই কোল থেকে নেমে পরে এদিকে ছুটে এসে আমার ঠ্যাঙের ফাঁকে ঢুকে পরেছে।

কি হলো অফিস করবি না—

কপট গাম্ভীর্যে মিলির মেয়ে বলে উঠলো, সব দুষ্টু।

আমি দুটোকে টেবিলের ওপর তুলে বসিয়ে দিলাম। পা থেকে জুতো খুলে দিলাম।

পকেট থেকে রুমালটা বার করে অর্ককে বললাম, যা এটা একটু ভিজিয়ে আন।

কেন?

আর বলিস না। হাতটা একবার ধরে দেখ।

অর্ক হাসছে। আমাকে ঘিরে ধরে জটলা।

অর্ক আবার কাকে দিল রুমালটা ভিঁজিয়ে আনার জন্য।

ভেঁজা রুমাল দিয়ে ওদের হাত মোছালাম। নো ঝামেলা বুঝেছো। আমি এখন কাজ করবো।

পুতুল কেউ ছাড়ে নি।

তুমি বারবিগুলো কোথা থেকে কিনলে? রাত্রি বললো।

ডলসহাউস থেকে।

কি মিষ্টি দেখতে। বলে কিনা আমার মেয়ে।

আমি হাসছি।

আঙ্কেল পেপার দাও। মিকি বললো।

অর্ককে বললাম দুটো নিউজ প্রিন্টের প্যাড আর পেন নিয়ে আয়।

মিলিদিকে ফোন করেছো?

না। এতক্ষণে হয়তো জেনে ফেলেছে।

অনেকদিন পর বেশ ঝামেলায় পরেছো মনে হচ্ছে।

কঠিন পরিস্থিতি।

দেখলাম দরজা ঠেলে মিলি, অদিতি, টিনা হাসতে হাসতে এদিকে আসছে।

আমি ওদের দিকে তাকিয়ে বললাম, দেখেছিস কে আসছে।

মিকি টেবিল থেকে সোজা আমার কোলে চলে এসেছে।

মাম্পি গলা জড়িয়ে ধরেছে।

মার সঙ্গে যাব না আঙ্কেল।

কেন। এটা তো মার অফিস।

যাব না।

ওরা কাছে এসে হেসে গড়িয়ে পরে। সন্দীপ উঠে এলো।

কিরে এবার শখ মিটেছে।

ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি।

কোথায় গেছিলে! মিলি বললো।

ও মা আবার পুতুল কিনেছিস। টিনা বললো।

দুটো।

আর একটা কোথায়?

গাড়িতে।

সত্যি অনিদা। টিনা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে সমানে হেসে চলেছে।

কি খেয়েছিস?

মিকি খেয়েছে।

মেয়ের কথায় মিলি হাসছে।

তুই খাস নি?

একটা।

মিলি মেয়েকে কোলে নিল। টিনা মিকিকে কোলে নিল।

জুতো কোথায় রে। অদিতি বললো।

নিচে খুলে রেখেছি। আমি বললাম।

তুমি জামাটা একটু ছাড়িয়ে দাও।

কেন।

অনেক কিছু মাখা মাখি করেছে। রবীন ব্যাগ দিয়ে গেছে?

হ্যাঁ। তুমি আমার ঘরে এসো।

যাচ্ছি যাও।

আমি সন্দীপদের সঙ্গে একটু বসলাম। কথা বললাম।

ওদের বললাম, দিন কয়েক আমাকে একটু সময় দে তারপর তোদের সঙ্গে বসবো।

সন্দীপ লেখার কথা বললো।

একবারে ভালো লাগছে না। কেমন যেন একটা ভ্যাকুমের মধ্যে আছি।

মিলি এর মধ্যে দু-বার ফোন করে ফেলেছে।

উঠে পরলাম।

নিচে এসে সব একসঙ্গে বাড়ি ফিরলাম।

ওরা ওদের মতো, আমি দুটোকে সঙ্গে নিয়ে রবীনের গাড়িতে এলাম।

বাড়িতে এসে দেখি বটা, কনিষ্ক, নির্মাল্য, নীরু, দেবাশিস বসে আছে।

আমাকে দেখে সবার হাসি আর বন্ধ হয় না।

সুরো, অংশু সমানে টিপ্পনি কেটে চলেছে।

মাসি এগুলো মাইক্রওভেনে ঢুকিয়ে দাও একটু গরম হয়ে যাক। মিলি বললো।

এগুলো কি? মাসি হাসতে হাসতে বললো।

অনিদা নিজের ছেলে-মেয়ের জন্য কিনেছে। মিলি বললো।

তাহলে, কিরে কনিষ্ক এবার বিশ্বাস হলো। নীরু চেঁচিয়ে উঠলো।

নিজের কানে শুনলি। বটা বললো।

ওমনি লেগে গেলো নীরুর সঙ্গে কনিষ্কর। বটা, দেবাশিস সঙ্গত করে।

আমি ভেতরে এসে বসলাম।

তোরা কোথা থেকে সবাই হাজির হলি! কাজ কর্ম কিছু নেই?

ম্যাডামকে ফোন করেছিলাম ওখানকার খবরা খবর নেওয়ার জন্য, ম্যাডাম তো হেসেই যায়, তারপর নতুন কথা শুনলাম।

কনিষ্ক হাসতে হাসতে বললো।

সখ মিটেছে? বটা বললো।

সবাই হাসছে।

মাসি।

বল।

একটু ভালো করে চা বানাও। শান্তিতে চা পর্যন্ত খেতে দেয় নি।

মাসি হেসেই চলেছে।

তোমরা এতো হাসছো কেন বলো? মিলি বললো।

মিলির মেয়েটা তোকে বেশি জালিয়েছে না। মাসি বললো।

নিশ্চই মিত্রা কুটুর কুটুর করে লাগিয়েছে। মাসির দিকে তাকালাম।

কিগো মাসি কি হয়েছে? মিলি চোখ পাকিয়ে তাকাল।

বলবোখোন, এতো তারাহুর করছিস কেন।

রাতে খাবার টেবিলে অনন্যর কথা উঠলো।

কনিষ্ক ভীষণ খুশী।

আমাদের আর চিন্তা নেই বুঝলি অনি, বছর ছয়েক পর একটা সলিড হ্যান্ডস পেয়ে যাব। আমাদের এখান থেকে ওখানের পড়াশুনর মান, ইকুইপমেন্টস অনেক বেটার।

আমি ওদের ওপিনিয়ন শুনছিলাম।

স্যার বললো কালকে সিপে কিছু নতুন ইকুপমেন্টস বুক করছে। দিন পঁচিশেক লাগবে আসতে।

আমিও সেরকম শুনলাম। তোদের মেশিনপত্র বোঝার ক্ষমতা আমার নেই।

নীরু দারুণ খুশি। অনেক দিন ধরে ঘ্যানর ঘ্যানর করছিল।

আবার কি নতুন ডিপার্টমেন্ট চালু করবি?

তিনটে ডিপার্টমেন্ট চালু করবো। একবারে মর্ডান টেকনলজি।

কনিষ্কর চোখে মুখে উত্তেজনা ফুটে উঠেছে।

ওরা নিজেদের মধ্যে অনেক কিছু আলোচনা করলো, আমি খুব ভালো শ্রোতা।

খাওয়া শেষ হতে বেসিনে মুখ ধুচ্ছিলাম। কনিষ্করা তখনও টেবিলে বসে।

কাল তোর কি কাজ আছে অনি। কনিষ্ক বললো।

দুপুরের দিকে ঘণ্টা তিনেকের জন্য একটু বেরোব, তারপর আবার ফিরে আসবো।

বিকেলের দিকে আমরা একটু আসবো। তোর সঙ্গে আলোচনা না করে একটা ব্যাপারে ডিসিসান নিতে পারছি না।

ফিরে তাকালাম।

কোনও গন্ডগোল?

না।

তাহলে।

একটা বড়ো প্রাইভেট হাসপাতাল বিক্রী আছে। কালকে তার কাগজপত্র আনতে বলেছি। যদি এসে যায় তোকে ফোন করবো, তাহলে বিকেলে সবাই এক সঙ্গে বসবো।

টাকা পাবি কোথায়?

দেবা দেবে বলেছে। তবে ইন্টারেস্ট নেবে।

আমি হাসছি।

আমি ঠিক কথা বলিনি বল অনি। দেবা হাসতে হাসতে বললো।

তুই ব্যাটা এতো টাকা পেলি কোথায়।

লাস্ট কয়েকটা মাসে অনেকটা কেপিট্যাল বাড়াতে পেরেছি। ব্যবসাটাও বাড়িয়ে ফেলেছি। অনাদিটা যা শুরু করেছিল, নাভিশ্বাস উঠেগেছিল।

প্রচুর টাকা খেয়েছে না।

তা আর বলতে। চালু ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হবে। কি করবো, দিতে হয়েছে।

আর কয়েকটা দিন অপেক্ষা কর ফেরত দিয়ে দেব।

তোকে আর ঝামেলা করতে হবে না। এই কটা দিন বেশ ভালো আছি।

তাহলে যেটা তুই দিয়েছিস সেটার কি হবে?

যেটা গেছে যাক।

টাকাটা খাটনির নয়। ফোঁকটে পেয়েছিস?

মুড ভালো আছে, তোর সঙ্গে এখন তর্ক করবো না।

চুপ করে গেলাম।

ওদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললাম, মাসি ওষুধ এনে দিল। খেলাম।

মাসি এখন তোমার দায়িত্ব? নীরু বললো।

আমি, সুরো কখনও কখনও মিলিও দেয়।

রাতটা বেশ ভালো কাটলো। দেবারা চলে গেলো। কনিষ্ক, অংশু থেকে গেল।

ওরা ওদের মতো শুতে গেল। আমি আমার মতো ঘরে এলাম।

ফাইলগুলো টেবিল থেকে নিয়ে সোফায় বসে একবার চোখ বোলালাম। ভীষণ ক্লান্তি লাগছে।

বিছানায় শুয়ে পরলাম। কখন ঘুমিয়ে পরেছি খেয়াল নেই।

হঠাৎ আমার নাম ধরে কে যেন ডাকছে। ঘুমটা ভেঙে গেল। একটু ভালো করে শুনলাম। হ্যাঁ কনিষ্ক ডাকছে। ঘড়ির দিকে তাকালাম। রাত তিনটে বাজে। এতো রাতে কনিষ্ক ডাকছে কেন!

বিছানায় উঠে বসলাম। তাহলে কি দাদার কিছু হয়েছে!

মনের ভেতর কু গেয়ে উঠলো।

কালকে দাদার সঙ্গে কথা বলেছি। বেশ তরতাজা মনে হলো। কতক্ষণ কথা বললো আমার সঙ্গে, তাহলে কি এমন ঘটলো?

নিজের বুকটা কেমন দুরু দুরু করছে।

দাদার কিছু হয়েগেলে বড়োমাকে সামলাবো কি করে?

বড়োমার সবচেয়ে দুর্বল জায়গা দাদা। আমি ছাড়া বড়োমাকে সামলাবার কেউ নেই।

বড়ো আলোটা জ্বেলে বিছানা থেকে নেমে এসে দরজা খুললাম। কনিষ্ক ছাড়াও আরও সবাই গেটের মুখে দাঁড়িয়ে।

সবারই মুখটা কেমন থমথমে, ফ্যাকাশে।

মাসির চোখটা কেমন ছল ছল করছে।

এতো রাতে তোরা সবাই উঠে পরেছিস! কার কি হয়েছে! কি সমস্যা বলবি তো, ওখান থেকে কোনও ফোন এসেছে।

না। ওখানকার সবাই ভালো আছে।

তাহলে কি হয়েছে!

তুই উতলা হোস না।

উতলা হচ্ছি না। কার কি হয়েছে, যার জন্য তোদের এতো রাতে উঠতে হলো।

চিকনা ফোন করেছিল।

কাকীমার কিছু…!

না। উনা মাস্টার।

মাথাটা কেমন বন বন করে ঘুরে গেল। নিজেকে খুব জোড়ে সামলে নিলাম। এখন একটুতেই কেমন যেন দুর্বল হয়ে যাচ্ছি। কেন?

অনি তুই তো কখনও এরকম ছিলি না। অনেক ঝড় তুই সামলেছিস।

সামলেছি ঠিক, কিন্তু আমার শৈশবের আকাশে দুটো তারা ছিল। এক মনাকাকা আর একজন উনা মাস্টার। একজন খসে গেছে। আর একজন খসে পরলো।

এরা দুজন না থাকলে অনি হয়তো আজকের অনি হতো না।

অনির জীবনে এদের অবদান অনেক। চেষ্টা করলেও অনি এদের ঋণ কোনওদিন শোধ করতে পারবে না।

আবঝা আবঝা মনে পরে যাচ্ছে বাবা-মার মৃত্যু দিনটার কথা। উনা মাস্টারের কোলে করে আমি শ্মশানে গেছিলাম। উনা মাস্টারের হাত ধরেই বাবার মুখে জ্বলন্ত পাটকাঠি ছুঁইয়ে ছিলাম।

কাকা মাঝে মাঝে রেগে গিয়ে বলেছে, আমার দ্বারা হবে না উনা, তুই দেখ যদি কিছু করতে পারিস। দুটো মানুষ কাঁচা লোহাকে পিটিয়ে পাটিয়ে তৈরি করেছিল আজকের অনিকে।

ভুলি কি করে সেই সব দিনগুলোর কথা।

চোখের সামনে ভেসে আসছে, কাকীমার মুখটা। লুকিয়ে লুকিয়ে রান্নাঘরে নিয়ে গিয়ে গরম দুধ দিতো। মাথায় হাত বুলিয়ে বলতো ঢক ঢক করে তারাতারি খেয়ে নে।

মা-বাপ মরা ছেলে বলে কথা।

কতো স্নেহের বন্ধনে দুজনে আষ্টে পৃষ্টে বেঁধে ফেলেছিল আমাকে।

আমার পড়াশুনার জীবনে এক একটা সাফল্য উনা মাস্টারের মনের খিদেটাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। এখানে আসা নিয়ে কাকার সঙ্গে তুমুল তর্কা তর্কি। তোমার বন্ধু যখন আছে তাকে চিঠি লিখতে তোমার অসুবিধে কি, যদি না হয় ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসবে। এই আজ পাড়াগাঁ ওর জন্য নয়। ওকে আরও অনেক বড়ো হতে হবে।

কাকা উনা মাস্টারের কাছে হার মেনেছিল। শুভঙ্করবাবুকে চিঠি লিখে দিয়েছিল।

কলকাতা আসার দিন স্যারকে যখন প্রণাম করতে গেছিলাম। একটা খাম হাতে দিয়ে বলেছিল এটা সঙ্গে রাখ, প্রয়োজনে কাজে লাগাবি। তোর বাবা বেঁচে থাকলে সেও তোকে দিতো।

চোখ ফেটে জল এসে যাচ্ছে। স্যারের কত স্মৃতি আমার চারপাশে ম ম করে ঘুরে বেরাচ্ছে।

আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে।

তুই কি করবি? কনিষ্কর কথায় মাথা তুললাম।

প্রথমে কোনও কথা বলতে পারলাম না। কথা বলতে গিয়ে গলাটা কেমন আটকে গেল।

ওদের মুখের দিকে কেমন বোবা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকলাম।

মাসি একবার আবিদকে ফোন করবে।

মাসি ভেঁজা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে মাথা দোলালো। ফোন করেছে।

কি বলেছে?

ও আসছে। রতনও আসছে।

আমরা তোর সঙ্গে যাবো। কনিষ্ক বললো।

সবাই গেলে এদিকটা সামলাবে কে।

তোকে ভাবতে হবে না।

চিকনা কখন ফোন করেছিল?

আধঘণ্টা আগে।

তোকে ফোন করেছিল না মাসিকে ফোন করেছিল?

মাসিকে।

মাসির দিকে তাকালাম।

ওখানে ফোন করো নি তো?

চুপ করে রইলো।

কাকে জানিয়েছো?

মামনিকে।

মামনিকে বারন করেছো যেন কাউকে না জানায়।

বলেছি।

তুমি যখন ফোন করেছিলে ওরা তখন শুয়ে পড়েছে।

না সবে শুতে গেছে।

যাও রেডি হও।

ঘরে এসে মুখ ধুলাম। কিছু ভালো লাগছে না। বার বার স্যারের কণ্ঠস্বর কানে ভেসে আসছে।

কয়েকটা পাজামা পাঞ্জাবী আর একটা জামা প্যান্ট বার করে বিছানায় রাখলাম। একটা চাদর।

সুরো ঘরে এলো।

তোরা গিয়ে কি করবি। তাছাড়া বাচ্চাদুটোকে নিয়ে এইরাতে গেলে ওদের শরীর খারাপ করবে। বরং একটু বেলার দিকে আয়।

সুরো জড়িয়ে ধরলো। কাঁদছে।

কেঁদে কি করবি। প্রত্যেককে একদিন চলে যেতে হবে।

সুরো চুপ করে রইলো।

জানিস সুরো, স্যার আমার জীবনের একটা মাইলস্টোন, কলকাতায় আসার পেছনে কাকার থেকেও স্যারের অবদান অনেক বেশি।

একটু থামলাম।

এই সব শিক্ষকদের হাত থেকে অনেক ভালো ভালো ছাত্র বেরিয়েছে। কিন্তু দেখ শিক্ষার জগত থেকে এরা কিছুই পান নি। কজনই বা মনে রেখেছে এদের মানুষ গড়ার ইতিকথা।

তোমাকে এই মুহূর্তে একা ছাড়তে ইচ্ছে করছে না।

এতদিন একা একাই সব করলাম।

মিলি ঘরে ঢুকলো।

কাছে এগিয়ে এসে সুরোর পিঠে হাত রাখলো।

বুঝলে মিলি, কনিষ্ক বরং আমার সঙ্গে যাক তোমরা যেও না। বাচ্চাটার কষ্ট হবে। তার ওপর তোমার ছেলেটা একা হয়ে যাবে।

মাসি যাবে বলছে।

তোমরা বরং সকাল হলে এসো। আজ না গিয়ে বরং তিন চারদিন পর এসো।

দেবাদা, নীরুদা, বটাদা আসছে। টিনা শুনে কেঁদে ফেললো। বার বার বলছে, স্যারের সঙ্গে শেষ দেখা অনিদা ফিরে আসার পর।

চুপ করে রইলাম।

মিলি পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে পিঠে মাথা রাখলো।

তুমি মন খারাপ করো না।

মন খারাপ করে কি করবো মিলি। বাবা-মাকে সেইভাবে মনে পড়ে না। মৃত্যু যন্ত্রনাটা কি অনুভব করিনি। কাকা উনামাস্টারের কাছে মানুষ। তাঁদের মৃত্যুটা আমাকে খুব….।

গলাটা বুঁজে এলো। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম।

ঠিক আছে ওরা যদি যায় চলুক। বিকেলের দিকে ফিরে আসবে। এদিকটা দেখতে হবে।

মিলি আমার কথাটা বুঝলো। সুরোকে বোঝাতে একটু সময় লাগলো।

আধা ঘণ্টার মধ্যেই সবাই এসে হাজির হলো।

আমি রেডি হয়ে নিলাম। ওরা আমার ব্যাগ গুছিয়ে দিল।

আবিদ, রতন এলো। দুজনের মুখটাই কেমন শুকনো শুকনো।

আমার দিকে কেমন ফ্যাকাশে চোখে তাকিয়ে।

চল বেরিয়ে পরি। অনেকটা পথ যেতে হবে।

আবিদ যাচ্ছে। আমি এদেরকে নিয়ে একটু বেলার দিকে যাব। রতন বললো।

কেন ঝামেলা বারাচ্ছিস।

তোমাকে এই সময় একা ছাড়া যাবে না।

মাথা খারপ করিস না।

মাথা খারাপের কিছু নেই, যা বলছি শোনো। রতন ধমক লাগালো।

চুপ করে গেলাম।

আমাকে কিছু টাকা দে।

রতন, আবিদ দুজনেই জড়িয়ে ধরলো।

তুমি এইভাবে বলবে না। ভীষণ কষ্ট লাগে।

সত্যি পকেটে বেশি পয়সা নেই। ভেবেছিলাম আজ তুলবো। এখন তো আমার সেরকম কোনও খরচ নেই, তাই পকেটে পয়সাও রাখি না।

তুমি নিজেকে এতো….। রতন আর বলতে পারলো না।

ইসলামভাইকে ফোন করেছিলি?

রতন মাথা দোলাল।

কেন করতে গেলি। ওরা আবার একটা টেনশনে পরে গেল।

তোমার ব্যাপার, তাই জানালাম।

দুদিন পরে জানাতে পারতিস, অসুবিধে হতো না।

বেরিয়ে এলাম। বারান্দায় নীরু, বটা, দেবা, কনিষ্ক দাঁড়িয়ে।

তুলনামূলক ভাবে ঠাণ্ডাটা আজ একটু কম।

মাসিকে একটু চা করতে বলেছিস। কনিষ্কর দিকে তাকালাম।

করছে।

চল এবার বেরিয়ে পরি। অনেকটা পথ যেতে হবে।

তুই কি এই পাজামা-পাঞ্জাবী পরে যাবি।

এই যথেষ্ট, কে দেখবে।

দেবা, অংশু থাকছে। ওরা বেলার দিকে যাবে।

রতন থাকবে বললো।

না ও সঙ্গে যাবে। দরকার আছে।

ঠিক আছে।

বড়োমার ঘরে ঢুকলাম, দেখলাম বাচ্চাদুটো পাশাপাশি শুয়ে ঘুমচ্ছে।

মাসির হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে চুমুক দিলাম।

ভজু কোথায় মাসি?

ওপরে ঘুমচ্ছে।

ওকে কিছু বলো নিতো?

না। সকাল হোক, উঠলে বলবো।

আমরা বেরিয়ে এলাম।

এরই মধ্যে কলকাতার রাস্তায় কর্পোরেসনের ঝাড়ুদাররা নেমে পরেছে রাস্তা ঝাঁট দেওয়ার জন্য। দু-একটা চায়ের দোকানও খুলে গেছে।

আবিদ ড্রাইভ করছে। আমি সামনের সিটে। রতন পেছনে। ওরা তিনজন মাঝের সিটে।

কনিষ্ক মনে হয় চিকনার সঙ্গে ফোনে কথা বললো।

আমার মাথাটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা মনে হচ্ছে।

রাস্তার দিকে তাকিয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছি। একরাশ চিন্তা মাথার মধ্যে। কিন্তু কিছু ভালো লাগছে না।

গাড়ির ভেতরটা নিস্তব্ধ। কেউ কথা বলছে না।

হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি চলেছে তীরের গতিতে।

মাঝে মাঝে রাস্তার ওপর মেঘের মতো কুয়শা লুটোপুটি খাচ্ছে। আবিদ ডিপার আর হর্ণের সাহায্যে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে।

মাঝে মাঝে ওর দিকে তাকাই। রাস্তার ওপর চোখ স্থির।

কনিষ্কদা। আবিদ বললো।

বল।

চা খাবে? ধাবাতে একটু দাঁড় করাই।

দাঁড় করা, বেশি দেরি করবো না। ওরা চকে থাকবে বলেছে।

আচ্ছা।

পৌঁছতে বেশি দেরি লাগলো না।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম পাঁচটা বাজে। এখনও ভোর হয়নি। এবার হবে। পূব আকাশটা সামান্য পরিষ্কার হয়েছে।

ধাবাতে আর নামতে ইচ্ছে করলো না।

আবিদ, রতনই চা নিয়ে এলো। সঙ্গে গরম সিঙ্গাড়া।

বেশিক্ষণ ওখানে দাঁড়ালাম না।

নার্সিংহোম যখন পেরচ্ছি তখন চারদিকে আলো ফুটে উঠেছে।

কনিষ্ক।

বল।

যাওয়ার পথে এখানকার অবস্থাটা একটু দেখে যাস।

কনিষ্ক চুপ করে রইলো।

চকে গাড়িটা এসে দাঁড়াতে দেখলাম ভানু, বাসু দাঁড়িয়ে আছে।

চারদিকে রোদ ঝলমলে সকাল।

অনেকদিন পর দু-জনকে দেখছি। রাত্রি জাগরনের ক্লান্তি সারা চোখে মুখে। ভানুর শরীরটা মন হচ্ছে আগের থেকে একটু ভালো হয়েছে।

গাড়ি থেকে নীচে নমতেই জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো।

জানিস অনি, স্যারকে একটু চিকিৎসা করালো না ঋজুটা। কতোবার সঞ্জু, চিকনা কলকাতায় নিয়ে যাবার কথা বললো।

বাসু টান মেরে আমার থেকে ভানুকে সরিয়ে দিল।

সঞ্জু তোকে কি বলেছিল।

কেন বলবো না। সঞ্জু তো বলেছিল সব খরচ আমি দেব। ও কেন ঝগড়া করলো।

কনিষ্ক, ভানুকে হাত ধরে একটু দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল।

নাগো কনিষ্কদা অনি অসুস্থ বলে সঞ্জু ফোন করে নি। বাসু বললো।

আমি সব জানতাম। তোমাকে বলছি চলো। বাসুও ওদের দুজনের পেছন পেছন গেল।

আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। নীরু, বটা আমার পাশে দাঁড়িয়ে।

চাদরটা মাথায় দিয়ে নে। নীরু বললো।

আমি চাদরটা মাথায় দিলাম। বাসু ফিরে এলো।

চল একটু চা খেয়ে বেরিয়ে পরবো, ওরা ওদিকটা গোছাচ্ছে।

বাসুর দিকে তকালাম। আমি যেন বোবা হয়েগেছি। পায়ে পায়ে পরিদার চায়ের দোকানে এলাম। এই সাত সকালে সেরকম কোনও ভিড়ভাট্টা নেই দু-একজন বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছে। তারাই হয়তো এক-দুকাপ চা খেয়েছে।

দেখলাম পরিদার দোকানের পরিবর্তন হয়েছে। এখন আর বেড়ার দেয়াল বাঁশের বেঞ্চি নেই। সেই জায়গায় ইঁটের গাঁথনি। টেবিল বেঞ্চ এসেছে। জায়গাটাও অনেকটা বড়ো করেছে। সেই ঘুপচি মতো আর নেই।

আমি তাকিয়ে তাকিয়ে চারদিকটা দেখছিলাম।

একটা বছর পনেরো বয়সের ছেলে চা তৈরি করছে।

টেরিয়ে টেরিয়ে আমাকে দেখছে।

একটু একটু ভিড় জমছে। এরইমধ্যে সকলে জেনে ফেলেছে উনামাস্টার মারা গেছেন।

আমি চুপচাপ। রতন, আবিদ ফোনে কথা বলছে।

ছেলেটি গ্লাসে করে চা এনে দিলো সবাইকে। আমি ওর দিকে তাকালাম।

পরিদার নাতি। কৃষ্ণ। বাসু বললো।

ছেলেটা হেসে বেঞ্চের তলা দিয়ে আমার পায়ে হাত ছোঁয়াল।

তোকে এরা চেনে। তুইও দেখেছিস খেয়াল করতে পারছিস না।

চায়ে চুমুক দিলাম।

রাস্তায় চোখ যেতেই দেখলাম এক দঙ্গল লোক সাইকেলে করে পাশের রাস্তা দিয়ে চলেছে। যেন মিছিলে অংশগ্রহণ করতে চলেছে।

বাসু হাসলো।

ওরা তোর ফার্মে কাজ করে। সাতটা থেকে সকলের ডিউটি।

চা খেয়ে উঠে এলাম।

বাইরে এসে দাঁড়াতেই পরিদার ছেলে ভোলা হন্তদন্ত হয়ে হাঁটতে হাঁটতে এলো।

তুমি এসেছো শুনে ছুটে এলাম।

প্রণাম করে উঠে দাঁড়াল।

আমি নিজে হাতে তোমাকে একটু চা করে দিই, খাও।

তোর ছেলে বানিয়ে দিয়েছে। খেয়েছি।

আর একটু খাও। বেশি সময় লাগবে না। একটা রসোগোল্লা খাও।

ভালো লাগছে না।

জোড় করবো না। তোমার মন ভালো নেই জানি।

একটু চা দে।

পরিদার ছেলে ভেতরে চলে গেলো।

যতো বেলা বাড়ছে ভিড়টাও বারছে।

আমাকে সকলেই দেখে। গ্রামের চরিত্রটা এই জায়গায় এখনও ঠিক আছে, একটুও বদলায় নি।

বাসু, ভানুকে দেখতে পাচ্ছি না—

স্যারের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। বাসু বললো।

চুপ করে গেলাম।

রতন, আবিদ গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। পরিদার ছেলে আবার সকলকে চা দিয়ে গেল।

খেলাম। আর দাঁড়ালাম না। বেরিয়ে এলাম। বাসু আমদের গাড়িতে উঠলো।

এই টুকু আসতে মিনিট পনেরো লাগলো। রাস্তায় নতুন মোরাম ফেলা হয়েছে। বেশ লাগছে। আমি যেন আমার পুরনো স্বর্গরাজ্যে এসেছি। নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে তার ঘ্রাণ অনুভব করতে পারছি।

মোড়াম রাস্তায় গাড়িটা এসে দাঁড়াতে দেখলাম চিকনা, সঞ্জু, সুবীর দাঁড়িয়ে।

গাড়ি থেকে নীচে নেমে এলাম।

চিকনা এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো।

তোর শরীর ঠিক আছে।

সঞ্জু, সুবীর আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে।

কালকে একবার ফোন করতে পারতিস। তাহলে শেষ দেখাটুকু দেখতে পেতাম।

বিশ্বাস কর। বুঝতে পারি নি। বিকেলের দিকে হঠাৎ সর্দিটা কেমন যেন বুকে চেপে বসলো। একটা ঘড় ঘড় শব্দ, এখানে একজন ভালো ডাক্তার এসেছেন। কনিষ্কদাদের পরিচিত। তাকে নিয়ে এলাম। তিনি দেখে বললেন কিছু করার নেই। শেষ স্টেজ। ওষুধ দিলেও কোনও কাজ করবে না। তবু আপনাদের মনের শান্তির জন্য ওষুধ দিচ্ছি। ইঞ্জেকসন দিলেন। কনিষ্কদার সঙ্গে ফোনে কথা বলিয়ে দিলম।

আমি কনিষ্কর দিকে তাকালাম।

আমাকে একবার বলতে পারতিস।

কনিষ্ক চুপ করে রইলো।

কটার সময় মারা গেছেন। চিকনাকে বললাম।

সাড়ে বারোটা।

ঋজু কোথায়?

চিকনা আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালো।

ভেতরে আছে। তুই চল।

দাহকরা কোথায় হবে?

যেখানে হয়।

সেটা আছে, না দখল হয়ে গেছে।

না আবার ঠিক ঠাক করেছি।

খেতের আইল পথ ধরে হেঁটে স্যারের বাড়ির খামারে এলাম। অনেক লোক এসেছে। মীরচাচাকেও দেখলাম একপাশে বসে আছে। হাত তুললাম।

এখানে খাটে করে শ্মশানে নিয়ে যাবার রেওয়াজ নেই দুটো বাঁশের ওপর কয়েকটা বাঁশের বাঁকারি বাঁধা। ওই রকম একটা দেখলাম খামারে পরে রয়েছে।

মিনতি আমার আসার খবর পেয়ে ভেতর থেকে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো।

নীপাকে দেখলাম পেছন পেছন বেরিয়ে এসেছে।

এখানে সান্তনা দেওয়ার কোনও ভাষা আমার নেই।

একে একে ঘর থেকে অনেকেই বাইরে বেরিয়ে এসে খামারে দাঁড়ালো।

কাউকেই তেমনভাবে চিনতে পারছি না।

আমি ভেতর বারান্দায় এলাম। এর আগের বারে এসে যে খাটে স্যারকে শোয়া অবস্থায় দেখেছিলাম, স্যার সেই খাটেই শুয়ে আছেন। পাশে কাকীমা বসে আছে।

কাছ যেতেই কাকীমা আমার হাতটা ধরে কেঁদে উঠলো।

কয়েকদিন ধরে শুধু তোর নাম ধরে খোঁজা খুঁজি করতো। সঞ্জুকে জিজ্ঞাসা করেছে তুই ভালো আছিস কিনা।

কাছে গিয়ে বসলাম। চোখে তুলসী পাতা দেওয়া। কপালে চন্দন পরানো হয়েছে। চারদিকে কান্নার রোল। শরীরটা হাড়ের ওপর চামড়া ঢাকার মতন।

শেষের কয়েকটা মাস ভীষণ কষ্ট পয়েছে। কাকীমা বললো।

দাড়িগুলো কাটা হয় নি। খোঁচা খোঁচা। আমি স্যারের মাথায় হাত রাখলাম। একেবারে বরফ ঠাণ্ডা।

কি জানি হঠাৎ যেন মনে হলো স্যার চোখ খুলে তাকালেন। তুলসী পাতা গুলো চোখের ওপর থেকে খেসে পরলো। আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। এসেছিস।

বুকের ওপর রাখা স্যারের শীর্ণ হাতটা শক্ত করে ধরলাম।

মনার সঙ্গে কাল দেখা হলো। অনেক দিন পর দুই বন্ধু জমিয়ে আড্ডা মারলাম বুঝেছিস।

একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।

চল বাইরে চল।

চোখ তুলে তাকালাম।

চিকনা পাশে দাঁড়িয়ে।

এবার নিয়ে যেতে হবে, অনেক বেলা হয়ে যাচ্ছে। তোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম।

উঠে দাঁড়ালাম।

সোজা বাইরে বেরিয়ে এলাম।

কনিষ্ক, নীরু, বটা দাঁড়িয়ে।

আমি খামার পার হয়ে সোজা মোরাম রাস্তায় চলে এলাম।

কেন জানিনা ঠিক সহ্য করতে পারছি না।

বার বার পেছন ফিরে তাকাতে ইচ্ছে করছে।

সুবীর আমার পেছন পেছন এসেছে।

সুবীরের দিকে তাকালাম।

চিকনাকে বলো, আমি এগিয়ে যাচ্ছি। তোমরা ধীরে সুস্থে এসো।

আমি কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছি।

গাড়িতে উঠে বসলাম।

তোরা যাবি, না স্যারের সঙ্গে আসবি।

কনিষ্ক আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।

তুই এগিয়ে যা আমরা স্যারের সঙ্গে আসি।

তাই আয়।

আবিদকে বললাম চল।

রতন মাঝের সিটে বসলো আমি সামনের সিটে।

আবিদ গাড়ি চালালো।

আগের থেকে রাস্তার কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

আবিদ।

বলো।

ওই ক্যালভার্টের কাছে গিয়ে দাঁড় করাস। ওরা ওই পথেই আসবে।

আচ্ছা।

স্কুলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একবার স্কুল বাড়িটার দিকে তাকালাম।

বেশ লাগছে। খুব সখ ছিল পাকাবাড়ির স্কুলে পড়বো। সে সখ আমার এই জীবনে আর মিটবে না। তবু গ্রামে পাকা স্কুল বাড়ি হয়েছে এটাই আনন্দ।

আবিদ গাড়ি থামাল।

আমি নেমে দাঁড়ালাম।

তোরা এখানে একটু দাঁড়া আমি আসছি।

কোথায় যাবে!

একটু আসছি দাঁড়া না।

রতনদা তুই থাক আমি অনিদার সঙ্গে যাচ্ছি।

কেন! এখানে আমাকে কেউ মারবে না।

আমি কি তোমার সঙ্গে সেই কারণে যাচ্ছি।

আবিদের দিকে তাকিয়ে হাসলাম।

আয়।

সোজা মাঠের আইল পথে নেমে এলাম।

আবিদ আমার পেছন পেছন।

চারিদিক তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি।

আমার জন্মভূমি। আমার নিঃশ্বাস প্রশ্বাস সব কিছু এখানে।

এর প্রত্যেকটা আঁকা বাঁকা পথ আমার চেনা। এই গাঁয়ের মাটি আমার সর্বাঙ্গে। তবু আজ কেন জানিনা আমার কাছে ভীষণ অচেনা অজানা ঠেকছে। মনে হচ্ছে আমি এই গাঁয়ের নতুন অতিথি। সবাই আমার দিকে সেই ভাবেই চোখ তুলে তাকাচ্ছে। প্রত্যেকটা গাছ-পালা, সবুজ ধানের খেত আমার দিকে বাঁকা চোখে তাকাচ্ছে। অচেনা অতিথিকে দেখলে যেমন হয় আর কি।

পীরসাহেবের থানে আসতে মিনিট পনেরো সময় লাগলো। পুকুর ধারে এসে দাঁড়ালাম।

চারদিকে বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। একটা গেট করা হয়েছে। গেটে পাতাবাহারী ফুলের গাছ লাগিয়েছে। লাল হলুদ ফুলগুলো আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

গেটটা একটু ফাঁক করে ভেতরে এলাম।

চারিদিকে সেই অগোছালো ভাবটা আর নেই। মানুষের হাতে জায়গাটার যেন এক নতুন রূপ পয়েছে। গোটা জায়গাটা জুড়ে ফুলের গাছ লাগানো। সব ধরণের গাছ আছে। দেখেই মনে হয় প্রত্যেকদিন কেউ না কেউ এর পরিচর্যা করে।

পায়ে পায়ে অশ্বত্থ গাছটার তলায় এলাম।

ওপরের দিকে তাকালাম।

আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে যেমন দেখেছিলাম ঠিক তেমনি আছে। শুধু শুকনোপাতা চারিদিকে পড়ে নেই। কেউ ঝাঁট দিয়ে সেগুলো হয়তো কোথাও ফেলে দিয়েছে। গাছের তলাটা ঝকঝকে তকতকে।

জুতো খুলে পুকুরে নেমে এলাম। জল টলটল করছে। গ্রীষ্মের দাবদাহে জল শুকনো হয়ে যায়। তবু মাঝখানটায় বেগদ খানেক থাকে। কিন্তু শীতকালটায় জল থাকে।

হাতে মুখে জল দিয়ে ওপরে উঠে এলাম।

আবিদ নিচে নেমে হাতে মুখে জল দিল।

আমি গাছের তলায় এসে প্রণাম করলাম। চুপচাপ গাছের তলায় বসলাম।

আবিদ নামাজ পড়তে শুরু করলো।

এই গাছকে ঘিরে আমার কতো স্মৃতি। ঝিরঝিরে হিমেল হাওয়া একটু একটু শীত-শীত করছে। মাঠের ধারে টালির চালের ঘরটা এখনও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে। আমার স্কুল। আমি মাধ্যমিক পরীক্ষা এই স্কুল থেকেই দিয়েছি। তারপর কলকাতা। এই রাস্তা দিয়ে স্যার কতোদিন হেঁটে বাড়ি ফিরেছেন। আজ তার নিথর দেহটা মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। আর কোনওদিন দেখা যাবে না। বাজখাঁই গলায় ডাকবে না অনি বলে।

তখন ক্লাস টেনে পড়ি। উনা মাস্টার সেদিন ভীষণ বকাবকি করেছিল ক্লাসে। যা অঙ্ক দেয় ভুল করি। যা প্রশ্ন করে তার কোনওটার সঠিক উত্তর দিতে পারি না। দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে ক্লাসের মধ্যেই যা নয় তাই বললো।

সৌমিরা সেদিন মুখ টিপে ভীষণ হেসেছিল।

কেন জানিনা সেদিন আমার পড়ায় মন ছিল না। বার বার যেন এই গাছটা আমাকে টানছিল। কেউ যেন বলছে আজ তোকে ক্লাস করতে হবে না। তুই এখানে চলে আয়। উনা মাস্টার ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতে। আমি বইখাতা সব ফেলে এই গাছের তলায় চলে এসেছিলাম। তখন জায়গাটা আরও নিঃঝুম ছিল। জংলা গাছে চারদিক ঢাকা ছিল। গাছের তলায় এসে বসলাম। কেন বসলাম, কি কারণে বসলাম, জানিনা।

একা একা বসে আছি। কত পাখি উড়ে এসে গাছের ডালে বসছে। তাদের কিচিরমিচিরে চারদিক ম ম করছে। অদ্ভূত একটা নীরবতা চারদিকে খেলা করে বেড়াচ্ছে। পাখির ডাক শুনতে শুনতে কখন যে সন্ধ্যে হয়ে গেল জানিনা। ঝিঁ ঝিঁ পোকা ডাকতে শুরু করেছে, জোনাকিরা ইতি উতি উড়ে বেরাচ্ছে, তার নরম আলো ছড়িয়ে পরছে চারদিকে।

এক মায়াবী পরিবেশ।

আমি গাছে হেলান দিয়ে বসে দেখছি। কেমন যেন একটা আবেশ আমার চারদিকে খেলা করে বেরাচ্ছে। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। ঘুমটা ভাঙতে দেখলাম চারদিকে মিশ কালো অন্ধকার। একটা ছায়া মূর্তি আমার সামনে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ কেমন যেন ভয় পেয়ে গেলাম। গা-টা কেমন ভারি ভারি ঠেকলো। গা-হাত-পা সব কেমন অবশ হয়ে গেলো।

কে ওখানে?

আমার কথা শুনে চারদিকে একটা অট্টহাসির রোল। আকাশের দিকে তাকালাম। লক্ষ তারার মেলা আমার দিকে তাকিয়ে ব্যাঙ্গের হাসি হাসছে। উঠে দাঁড়াতে গেলাম টলে পরে গেলাম। কোনওপ্রকারে গাছটা ধরে টাল সামলালাম। সামনের দিকে তাকালাম সেই ছায়া মূর্তিকে আর দেখতে পাচ্ছি না। শরীর তখনও অসম্ভব ভারী।

কাকা বলতো কোনও অশরীরী আত্মা আশে পাশে থাকলে এরকম হয় নাকি। বিশ্বাস করতাম না। আজ এই মুহূর্তে কাকার কথাটা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে। ভয়টা যেন মনের ভেতর আরও চেপে বসছে।

তবু বসে থাকলাম, কেন বসে থাকলাম, কি করণে বসে থাকলাম, নিজেকে এরপর বহুবার প্রশ্ন করেছি, তার কোনও উত্তর পাইনি। এরপর বহুবার এসেছি। কৃষ্ণপক্ষ, শুক্লপক্ষ সব পক্ষে কিন্তু সেই দিনের মতো ভয় পাইনি।

সেদিন শেষে টলতে টলতে বাড়ি ফিরেছি। মনে হয়েছে কেউ যেন আমার পেছন পেছন আমার বাড়ির খামার পর্যন্ত এসেছে। কিন্তু কাউকে দেখিনি। অনুভব করেছি মাত্র।

কাকা হারিকেন জ্বালিয়ে বাইরের বারান্দায় বসেছিল। আমার মুখ চোখ দেখে কাকা মনে হয় কিছু আঁচ করতে পেরেছিল। কিছু বলে নি। শুধু বলেছিল। এতো রাত পর্যন্ত একা একা কোথায় থাকিস বলতো। বাড়িতে যে কয়েকটা প্রাণী আছে, তোর কথা যে তারা ভাবে, সেটা একবারও মনে করিস না।

হাত মুখ ধুয়ে জামা কাপর ছেড়ে কাকার সঙ্গে খেতে বসেছি। অন্য অনেক কথা হয়েছে। কাকা একবারও জিজ্ঞাসা করে নি। তুই এত রাত পর্যন্ত কোথায় ছিলি।

পরে একদিন কথায় কথায় কাকাকে প্রশ্ন করেছিলাম, তুমি সেদিন রাতে আমায় বকলে না কেন? সেদিন তো আমি…

কাকা হাসতে হাসতে বলেছিল, সেদিন রাতে তোকে ওই অবস্থায় দেখে আমি নিজেই ভয় পেয়ে গেছিলাম।

আমাকে! ওই অবস্থায়? কেন?

তোর মুখ চোখটা কেমন বিশ্রী রকমের দেখাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল অশরীরী কোনও মানুষ এসে আমার সামনে দাঁড়িয়েছে।

হেসেছিলাম। মনকে বুঝিয়েছিলাম বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলে না।

(আবার আগামীকাল)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev