জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১৩২ নং কিস্তি
গ্রামের সবাই তোমার নামে মানত করে অষ্টমপ্রহর করলো। হিন্দু-মুসলমান সকলে। সে কি পরিস্থিতি তোমায় কি বলবো। এতো লোক যে কোথা থেকে এলো, আজও ভেবে পাই না। নিজেরাই রান্না করেছে পূজো দিয়েছে খেয়েছে। কাউকে দেখার আর তখন মন নেই। মানসিকতাও একেবারে তলানিতে ঠেকে গেছে।
মীরচাচারা পীরবাবার থানে গিয়ে সবাই মিলে পূজো দিল। গ্রাম শুদ্ধ ভেঙে পরলো। কতো যো ঘটনা তখন ঘটেছে তোমাকে কি বলি। কেউ এসে পায়ে ধরেছে, মীরচাচার হাত থেকে বাঁচাবার জন্য। কেউ এসে চাল চেয়ে নিয়ে যাচ্ছে দুটো ফুটিয়ে খাবে।
মীরচাচাকে তখন থামান যায় না। এর মধ্যে অনাদিদা একদিন এসে পুলিশ প্রহরায় বাজারে মিটিং করলো, হুমকি দিল।
যেই না চলে গেল, আবার লেগে গেল।
সুকান্ত নেই। ওকে তখন এ্যারেস্ট করেছে।
ও এর মধ্যে একদিন মনেহয় বাসুদার কাছে খবর এলো, অনাদিদা ইসলামভাই, ইকবালভাইকে এ্যারেস্ট করেছে। পুরো মুসলমানপাড়া খেপে গেল। বুঝলাম আজ চারদিকে রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে। সেদিন আমি মীরচাচার বাড়ি প্রথম গেলাম।
মীরচাচা ছিল না। কাকী, মীরচাচাকে ফোনে ডাকলো।
মীরচাচা ওদের পরিবারের আরও দু-একজন এলো। বাসুদা, সঞ্জুদা এলো।
মীরচাচা আমাকে দেখে অবাক।
তুই এখানে এসেছিস কেন? ডাকতে পারতিস।
সেদিন আমি মিথ্যে কথা বললাম।
তোমরা যা করতে চলেছো ঠিক করছো না।
আমি নীপার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে। সত্যি কতোদিনকার কষ্টের কথা আজ মন খুলে বলে অনেকটা হাল্কা হচ্ছে।
পরিষ্কার মীরচাচাকে ধমক দিয়েই বললাম, আমি মিত্রাদির সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি। মিত্রাদি এসব বন্ধ করতে বলেছে। বলেছে কেউ যদি ক্ষতি করার চেষ্টা করে তবে তার ক্ষতি করবে। না হলে সহ্য করে থাকতে হবে। মীরচাচা অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। বোঝার চেষ্টা করলো। আমি সত্যি না মিথ্যে। কি বুঝল জানি না। তারপর একটুক্ষণ চুপ থেকে বললো—
মামনি যখন তোকে বলেছে, তাহলে কিছু করবো না। কিন্তু তোকে বলে রাখলাম, কেউ ঝামেলা করলে কেটে কুঁচিয়ে দেব। মামনির বাধা তখন শুনবো না।
মীরচাচা বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেল।
তখন কিন্তু কাঞ্চনবৌদি কতো সাপোর্ট করেছে আমাদের। ছেলে, মেয়ে দুটোও। তারপর কি যে ভূত ঢুকলো ওদের মাথায় কে জানে।
এখান থেকে কবে গেল? আমি বললাম।
ওই তো তোমার সঙ্গে যেদিন নার্সিংহোমে ঝামেলা হলো, টিভিতে দেখাল। সেদিন সকালে অনাদিদার কাছ থেকে লোক এসেছিল ওদের বাড়ি। সবাইকে নিয়ে গেল।
তোমরা কিছু জানতে না?
শুনলাম চিকনাদা খবর পেয়ে রাত থেকে উঠে চলে গেছে। বাসুদাকে ফোনে বলেছে কলকাতা গিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করে খবর দেব।
তখন সব কেমন জট পাকিয়ে যাচ্ছে।
সকাল বেলা দঙ্গল দঙ্গল লোক বাড়ির খামারে। কাগজ পড়ছে। টিভিকে ঘর থেকে বার করে নিয়ে চলে গেছে। খবর দেখছে। অনাদিদাকে আছাড় মেরে মেরে একবারে ধুয়ে দিচ্ছে।
তারপর একটু বেলা হতেই আবার শুরু হয়ে গেল দু-দলে। বলতে পার সেইই শেষ যুদ্ধ। ওরাও বাইরে থেকে লোক নিয়ে এসেছিল। শ্যামদা লোক পাঠিয়েছিল। সব সাজো সাজো রব। তারপর দেখলাম সব কেমন চুপ হয়ে গেল। শুধু অমূল্যদার ঘরটা লুট করে সর্বশান্ত করে দিল। সেই যে অমূল্যদা পরিবার সমেত গ্রাম ছেড়ে চকে চলে গেছে আর ফিরে আসে নি।
তারপর কাঞ্চন বা ওর ছেলেমেয়ে আর যোগাযোগ করে নি?
কি বেইমান তোমায় কি বলবো অনিদা। ভালো মন্দর খবরটা পর্যন্ত জানায় নি।
নীপার মেয়ে তুয়া ঘরে ঢুকলো।
আমি ওর মায়ের কোলে শুয়ে আছি দেখে ফিক করে হেসে ফেললো।
আয়। নীপা বললো।
তুয়া শাড়ি পরেছে। বেশ লাগছে।
ও মা তুই তো একবারে লেডি হয়ে গেছিস—
যাঃ।
কোন ক্লাস হলো।
টেন।
নীপা হাসছে।
বনুমাসিকে গিয়ে বলবি, আমি আজ স্কুলে যাব না। মামা এসেছে তাই।
তুয়া আমাকে ঠেলা মারল।
তুমি ওঠো।
কেন তোর আদরে ভাগ বসাচ্ছি।
না। প্রণাম করবো।
আবার কিসের প্রণাম, এত ঘন ঘন প্রণাম করলে পা খয়ে যাবে।
তুয়া হি হি করে হাসে। আজ পরীক্ষা আছে।
এই বললি টেনে উঠেছি, তাহলে কিসের পরীক্ষা?
সামনে প্রি-টেস্ট, আজ ওড়াল।
উঠে বসলাম।
তুয়া প্রণাম করলো।
নীপার দিকে তাকালাম।
তোমাকে ও স্কুলে কি বলে ডাকে।
কেন? মা।
দিদিমনি বলে না।
সবাই জানে আমি তুয়ার মা।
আমাকে তোদের স্কুলে ভর্তি নেবে।
ধ্যাত, তুয়া হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল, যাওয়ার সময় বলে গেল, মা আসছি।
ও নীপা অনি উঠেছে।
নীচ থেকে চিকনার গলা পেলাম।
চলো, নীচে অনেক লোক তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।
আবার কিসের লোক?
তোমার মতো লোককে এতো সামনা সামনি দেখার সৌভাগ্যে কজনের ঘটে বলে।
আবার শুরু করে দিলে।
নাগো অনিদা। বিশ্বাস করো, একটুও বাড়িয়ে বলছি না। অন্ততঃ তোমার তৈরি ব্যাঙ্ক এই অঞ্চলের লোকেদের দুঃখ দুর্দশা কিছুটা হলেও ঘুঁচিয়েছে। আজ তাদের তৈরি জিনিষ দেবাদারা কিনে নিয়ে যাচ্ছে। এ্যাডভান্স টাকা দিচ্ছে। ঘরে ঘরে তোমার স্বপ্ন ছড়িয়ে পরেছে।
শিড়িতে ধুপ ধুপ করে পায়ের শব্দ পেলাম।
একদিন তুমি এই সব স্বপ্ন দেখতে। আজ ঘরে ঘরে মুড়ি, চিঁড়ে তৈরি হয়। কোনটা বাদ দেব। শাক তলা থেকে তোমার প্রিয় খাবার ছোলার পাটালি, বাদামের পাটালি। সব ওরা নিয়ে গিয়ে শহরে বিক্রী করে।
আগে এখানে মশলার আকাল ছিল, এখন ঘরে ঘরে মশলা তৈরি হচ্ছে। মাছ চাষ করতে লোকে ভয় পেতো পুকুরে বিষ মিশিয়ে দেবে বলে, এখন এখানকার প্রত্যেকটা পুকুরে মাছ চাষ হয়। সারারাত মাছ ধরা পুকুর পাহাড়া দেওয়া চলে। সেই মাছ চালান হয়ে যায় শহরে।
মীরচাচার উদ্যোগে গ্রামের লোকেরা নিজেদের পয়সায় নদী সংস্কার করে চাষের জল ধরে রাখে। যদিও ব্যাঙ্ক আর দেবাদা কিছু পয়সা দিয়েছে।
অন্ততঃ প্রত্যেকটা ঘরে একটা করে সৌরশক্তির হ্যারিকেন আছে। কম বেশি প্রত্যেকর ঘরে টিভি আছে। বাসন্তী পূজোর সময় সবাই নতুন জামাকাপর পরে। আগের থেকে বাসন্তী পূজো অনেক বেশি জমকালো।
সবচেয়ে বড়ো কথা কি জান, তুমি এই গ্রামের, এই বাড়ির ছেলে। সবাই আমাদের মাথায় করে রাখে। যখনই শোনে আমি অনিদার বোন। একমাসের কাজ এক ঘণ্টায় হয়ে যায়। একে ভগ্য ছাড়া কি বলবে বলো।
সুকান্তকে দেখো। সকালে যাওয়ার সময় বলে গেল, জানো নীপাদি আজ আমি যেখানে পৌঁছলাম স্রেফ দাদার জন্য। দাদার অনুপ্রেরণা আজ আমাকে আইপিএস বানিয়েছে।
সুকান্ত কে, তার সঙ্গে আমাদের কোনও রক্তের সম্পর্ক আছে। কেন সে বার বার ছুটে আসে এই ভিটেয়? তুমি এর কোনও সঠিক উত্তর দিতে পারবে?
কিরে আবার আমাশা রোগ হয়্যা মরছে।
নীপা একটুও রাগ করলো না। চিকনার কথার কোনও উত্তরও দিল না, শুধু হাসলো।
বয়স হয়েছে না হয় নি?
আর হবে না। মিউ মিউ সুরে বললো।
বেরো এখান থেকে, সক্কাল সক্কাল চলে এসেছে পেট খালি করতে।
তুই ওকে ধমকাচ্ছিস! ও চুপচাপ শুনে যাচ্ছে! ব্যাপারটা মাথায় ঠিক ঢুকছে না।
চিকনা হাসলো।
তুই বুঝবি না। ওটা ভাই, বোনের ব্যাপার। কখন উঠলি?
সে তো বুঝলাম। নীপা তোকে….।
ও কিছু নয়। চল দাঁত মেজে নে, চা খেয়ে দেয়ে একটু বসবো, তোকে নিয়ে কাজগুলো সারতে হবে। সঞ্জু এসে দু-বার ঘুরে গেছে।
ডাকতে পারতিস।
পারতাম। কিন্তু তোর মুখের দিকে তাকিয়ে আর ডাকতে ইচ্ছে করে নি।
নীপা উঠে দাঁড়িয়েছে।
একটু গরম জল করি।
কেন!
পুকুরের জলে স্নান কোরো না।
হাসলাম।
গুরুমা কাল রাতে ফোন করেছিল। তুই অনেক কথা চেপে গেছিস। চিকনা বললো।
বলার সময় পেলাম কোথায়।
কিগো চিকনাদা? নীপা বললো।
ভাই ইংলণ্ডে ডাক্তারি পড়ার চান্স পেয়েছে। দাদা অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছে।
তাই! যাই গিয়ে মনিমাকে, মাকে বলি।
আমি বলেছি। স্নান করে উঠে ঠাকুর ঘরে ঢুকেছে এখনও বেরোয় নি।
এখানে না বসে স্নানটান সেরে চল ব্যাঙ্কে গিয়ে বসি। সবার সঙ্গে দেখাও হবে।
তাই চল।
এ বাড়িতে এলাম।
দেখলাম মৌসুমিমাসি বারান্দার এক কোনে রোদে বসে আছে।
বুড়ী শীতে যেন আরও ছোটো হয়ে গেছে। আমি সামনে গিয়ে বসতে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। চোখগুলো এখন একেবারে ঘসা কাঁচের মতো। ফোকলা দাঁতে হাসে।
তুই হাসপাতালে থাকতে মোকে এন্যে লিয়ে যায় নি।
বেশ বুঝতে পারছি বুড়ী চোখে কিছু দেখতে পারছে না। অনুভবে বোঝার চেষ্টা করছে।
চিকনা চোখ কাটাইল, তবু দেখতে পাই নি। আবঝা দেখি।
চিকনার দিকে তাকালাম। হাসছে।
চশমা দিয়েছিল পরেছো।
আ সে চোখে ঠুলি পড়া যায়। নাক ব্যাত্থা করে।
চিকনা গাল দিল। দিবো আছাড়।
দেখছু চিকনা কেমন গাল দেয়।
চশমা পরো না কেন?
খুইল্যা পরি যায়। তুইল্যা রাখছি।
সত্যি কথাটা বলো। চিকনা বললো।
মাসি ফোকলা দাঁতে হে হে করে হাসে।
চিকনার দিকে তাকালাম।
বাচ্চাগুলো ফোক্কর, মাসিকে হেমামালিনি বলে ডাকে, তাই চশমা পরে না।
আমি হেসেফেললাম।
তারাতারি রেডি হয়ে নিলাম। নীপা পর পর সব রেডি করে রেখেছে, ওষুধ-দুধমুড়ি-চা খেয়ে বেরিয়ে এলাম। চিকনার বাইকে করেই বাজারে এলাম।
মাস ছয়েক আগে এসেছিলাম। না তেমন কিছু পরিবর্তন চোখে পরলো না। শুধু অনাদির পার্টির ফ্ল্যাগের জায়গায় অনিমেষদাদের পার্টির ফ্ল্যাগ পত পত করে উড়ছে।
ব্যাঙ্কের নীচে একটা ঘরে নতুন ডাকঘর তৈরি হয়েছে দেখছি। বেশ ভিড় নীচটায়। বাইক থেকে নেমে দাঁড়ালাম। পিঁপড়ের মতো চারদিকে ভিড় জমে গেল। চিকনা হেই হেই করছে।
এতো ভিড় কেনরে চিকনা?
লোন দেওয়া চলছে।
আমাদের গ্রামে এতো লোক আছে?
শুধু আমাদের গ্রামের নাকি, অনেক দূর দূর থেকেও লোক এসেছে।
তাই নাকি!
সুবীর একটা নতুন স্কিম চালু করেছে। বেশ ক্লিক করেছে স্কিমটা।
কি রকম?
প্রত্যেক গ্রামে একজন করে এজেন্ট ঠিক করেছে। সেই গ্রামের কাকে লোন দেওয়া হবে না হবে সেইই ঠিক করবে। টাকা রিকভারের দায়িত্বও তার।
বলতে পারিস ব্যাঙ্কের কমিশন এজেন্ট। আবার তার আন্ডারে পাঁচজন করে রয়েছে। বেশ ভালো চলছে স্কিমটা। গ্রামের ছেলেগুলো কাজও পাচ্ছে। এখন সকলের শুধু টাকার ধান্ধা। খাটো টাকা রোজগার করো।
ওপরে উঠে এলাম।
আমাকে দেখে সুবীর চেয়ার ছেড়ে উঠে এলো। পুরনো যে কজন ছিলো তাদের চিনতে পারলাম। এছাড়াও গোটা পাঁচেক নতুন ছলে ময়েকে দেখলাম। সকলে কেমন ভাবে যেন আমাকে দেখছে।
চিকনাদা তুমি দাদাকে নিয়ে ও ঘরে গিয়ে বসো আমি যাচ্ছি।
আমি এই ঘরে আসতে দেখলম বাসু, মীরচাচা, সঞ্জু বসে আছে।
কিরে তোরা কখন এলি?
কিছুক্ষণ আগে। সঞ্জু বললো।
মোবাইলটা হয়ে অনেক সুবিধে হয়েছে বল।
বাজারে একটা টাওয়ার বসাচ্ছি। মীরচাচা বললো।
নিশ্চই বাজার কমিটি সেখান থেকে পয়সা নেবে।
মীরচাচা হাসে।
মীরচাচা এখন বাজার কমিটির প্রেসিডেন্ট। বাসু বললো।
তাই নাকি?
দেখছিস না বাজারটা কিরকম ঝক ঝক করছে।
আমি সোফায় বসলাম।
তোরা বোস আমি একটু আসছি। চিকনা বললো।
তুই আবার কোথায় যাবি? আমি বললাম।
একটু লতার কাছে যাব, সেখান থেকে ঋজুর কাছ হয়ে আসবো।
লতাকে আমি বলে দিয়েছি। ছেলে ঠিক সময় এসে দিয়ে যাবে, তোকে ভাবতে হবে না। ঋজুকে খবর পাঠিয়েছি। একটু পরে আসছে। বাসু বললো।
কি বলতো? বাসুর দিকে তাকালাম।
তোর জেনে লাভ।
বাসুর কথায় হেসে ফেললাম।
একটু চায়ের কথা বল।
ঠিক সময় এসে যাবে।
আমি হেসে মীরচাচার দিকে তাকালাম। মীরচাচাও হাসছে।
কালকের সমস্যার সমাধান হলো।
গিয়েই পিটান দিলাম, সমাধান হয়ে গেল।
আচ্ছা তোমার কি পিটান ছাড়া কোনও কথা নেই?
ওই ওষুধটার অনেক গুণ বুঝছু অনি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বুইঝ্যা হয়নি। পিটান দিতে হয়। সব সমস্যার সমধান খুব তারাতারি হয়ে যায়।
কোনটা গো মীরচাচা সেই রহিম বলে ছেলেটা। চিকনা বললো।
হ্যাঁ।
ব্যাটা মহা নম্বরী।
নম্বরী গিরি ছুটি দিব একবারে। ফকিরকে বলে এসেছি আমি দ্বিতীয়বার আর আসবো নি। থানা থেকে যদি মোকে ডেকে পাঠায়, রহিমকে গাঁ ছাড়া করি দিব। ব্যাটা ওই মসজিদের ইমামটাও বদমাশ। ইকবালভাই না আসা পর্যন্ত কিছু করতি পারতিছি নি।
সঞ্জু, কাকীমা কেমন আছে? আমি বললাম।
একটু কান্নাকাটি করছে।
মীনু চারদিনে কাজ করবে?
হ্যাঁ।
ওখানে না তোর বাড়িতে?
আমার আর বাড়ি কথায়, আমি বাড়ি থেকে বিতাড়িত।
সঞ্জু এমনভাবে বললো, চুপ করে গেলাম।
দোকান কে সামলাচ্ছে?
বড়ো ছেলেটা আছে।
পরিবেশটা কেমন দমবন্ধ হয়ে যাবার মতো মনে হচ্ছে। কথা ঘোরাবার চেষ্টা করলাম।
শুনলাম তোর প্রচুর টিভি বিক্রি হচ্ছে। এখন নাকি ঘরে ঘরে টিভি, সোলার ল্যাম্প।
চিকনা জোড়ে হেসে উঠলো। সঞ্জু, বাসুও হাসছে।
চিকনা খবর দিল।
আমি না, সামনা সামনি বসে আছে জিজ্ঞাসা করতে পারিস। চিকনা চেঁচিয়ে উঠলো।
না না ও বলে নি।
ঋজু, সুবীর ঘরে ঢুকলো। সঙ্গে চায়ের ছেলেটা।
তোরা কথা বল, আমি একটা মিটিং সেরে আসি।
মীরচাচা উঠে দাঁড়াল।
চা খেয়ে যাও। সুবীর বললো।
তোমার আবার কিসের মিটিং? আমি বললাম।
সুবীর হাসছে।
পূর্বসাইতে ব্যাঙ্কের কিছু এজেন্ট নেওয়া হবে মীরচাচাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। চিকনা বললো।
কি ঝামেলা বলতো। মীরচাচা আবার সোফায় বসলো।
ভালোই তো।
আরও আছে।
কি রকম।
দুটো নতুন ব্রাঞ্চ খোলার জন্য ওই এলাকার লোক তাড়া লাগাচ্ছে।
কোথায়?
একটা মাড়োতলা আর একটা খড়াই মোড়।
সে তো অনেক দূর, সামলাতে পারবে?
সুবীর সামলে নেবে বলেছে। আমি বলেছি ইসলামভাই আসুক তারপর।
জায়গা দেখেছো।
দেখেছি। একবারে বাস রাস্তার ধারে। ওখানকার লোকেরা এখান থেকে লোন নিয়ে যায়। যেতে আসতে অসুবিধে হচ্ছে তাই প্রেসার করছে।
মীরচাচা চা খেয়ে চলে গেল।
ঋজুকে জিজ্ঞাসা করলাম, কাজের ব্যাপারে কি ঠিক করলি?
তুমি জামাইবাবু যা বলবে তাই হবে।
বাবা কার, তোর না জামাইবাবুর?
ঋজু চুপ করে গেল।
মার সঙ্গে কথা বলেছিস?
না।
কেন?
মা আমার কোনও কথা শুনতে চায় না।
কেনো শুনতে চায় না, নিজেকে কখনও প্রশ্ন করে দেখেছিস?
ঋজু চুপ।
বৌ যা বলবে তাতে এত নাচা নাচি করলে চলবে। বৌয়ের কথা নিশ্চই শুনতে হবে, কিন্তু বাবা-মা তোর। তুই তাদের একমাত্র সন্তান। তাহলে এরকমটা হবে কেন?
ঋজু মাথা নিচু করে বসে আছে।
আমি কমবেশি সব শুনেছি। তোর বৌয়ের সঙ্গে একটু কথা বলা যাবে?
সে ওবাড়িতে আছে।
কোন বাড়িতে? বাপের বাড়ি না শ্বশুর বাড়ি?
আমার বাড়িতে।
কাল দেখলাম না।
দেখেছো খেয়াল করো নি।
বিকেলে যাব। সবাইকে থাকতে বলিস। আমি ওখানে বসেই যা বলার বলবো। তোর শ্বশুর-শাশুড়ীকে থাকতে বলিস।
ওর জামাইবাবুটা যতো নষ্টের গোড়া। বাসু বললো।
ওনাকেও থাকতে বলিস।
সে থাকবে না বলেছে।
কেন?
মা তোমাকে সালিশি মেনেছে।
তাতে কি হয়েছে! আমি তোর বাড়িতে তোর জম্মের আগে থেকে যাই।
কে কাকে বোঝাবে। সে যে ছড়ি ঘোরাতে পারবে না।
বৌ কি বলে?
চুপ করে আছে, কি জানি মতিভ্রম হয়েছে।
জামাই থাকে কোথায়?
স্টেশন রোডে।
কি করে?
স্টেশন রোডে দোকান আছে। পার্টি করে।
নেতা নাকি?
হ্যাঁ।
আমার কথা বলিস। আমি থাকতে বলেছি। না হলে অন্য ব্যবস্থা হবে এটা তার কানে তুলে দিস।
আমি এখুনি ফোন করে দিচ্ছি।
এখন করতে হবে না। একটু পরে করিস।
ঋজু চুপ করে রইলো।
তুমি কখন যাবে?
পাঁচটা নাগাদ।
আমি এখন তাহলে যাই।
যা।
ঋজু বেরিয়ে গেল।
চিকনা আমার হাতটা চেপে ধরলো।
তুই কি যাদু জানিস?
কেন!
অনেকদিন বাদে ঋজুকে এইরকম নরম-সরম গলায় কথা বলতে শুনলাম।
তারমানে!
ওরে তোকে কি বলবো। বাজারের সবাই ওর বিপক্ষে। যে জামাইবাবুর কথা বললো, সে তো আর এক বেঁড়ে। অনাদির দলের লোক। তার গরম দেখলে, তোর মাথা খারাপ হয়ে যাবে।
এখানে এসে গরম দেখাল, আর তোরা চুপ করে রইলি?
সর্ষের মধ্যে ভূত, কি করি। হজম করলাম।
আচ্ছা করে দিতে পারিস নি।
একবার দিয়েছি। তার উল্টো তেজ স্যারের ওপর এসে পরলো।
বিকেলে চল, সব শুনি তারপর যা বলার বলবো। বাসু তুই থাকবি।
আমি থাকলে গণ্ডগোল।
কেন!
আমাকে সহ্য করতে পারে না ঋজু।
ঋজুর সহ্য করা না করার কোনও ব্যাপার নেই। সেরকম হলে ওর দোকানটা বন্ধ করে দিতে হবে। মীরচাচাকে দিয়ে তার ব্যবস্থা করতে হবে।
এই ডাস্ট্রিক ডিসিশনগুলো আমরা এতদিন নিতে পারিনি।
প্রয়োজনে নিতে হবে। পেটে টান পরলে সব ব্যাটা শিধে হয়ে যাবে।
চিকনাকে বললাম, একটা সিগারেট দে।
সঞ্জু পকেট থেকে প্যাকেট বার করলো।
হাসলাম।
ফিল্টার উইলস! চিকনা বললো।
সঞ্জু কিছু বললো না।
সবাই একটা করে নিলাম। চিকনাকে বললাম একটা কানে গুঁজলি না?
সঞ্জু, অনি কিন্তু সব কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
পুরো প্যাকেটটা রেখে দে।
আমি হাসছি।
সঞ্জু বেশ গম্ভীর হয়ে গেছে নারে চিকনা?
ছেলের ব্যা দিবে। দাদু হবে। নাতনের মুখ দেখবে।
বয়স কতো।
হারামী অনেকক্ষণ থেকে কচ কচ করছিস। সঞ্জু তেরে এলো।
আমি, বাসু জোড়ে হেসে উঠলাম।
তোমরা কি আগে সব এরকমই ছিলে। সুবীর বললো।
এর থেকে আরও উচ্চমার্গে। সঞ্জু বললো।
সবাই সিগারেট ধরালাম।
শেষ পর্যন্ত তোর নামে ধর্ষণ কেশ। তাও যদি শালার বউটাকে একটু চাখতিস।
ধ্যুস সব গন্ধ কথা বার্তা। সুবীর উঠে দাঁড়াল।
তোমরা কথা বলো, আমি আসছি।
সুবীর বেরিয়ে গেল।
তোর শালা মুখের কোনও জাত নেই। বাসু বললো।
না হলে সুবীর উঠতো না। কি বলি, গ্যাঁট হয়ে বসে শুনতো।
সঞ্জু নীচের চা দোকানির কাছে ফোন নেই?
আছে।
তাহলে একটু ফোনা ফুনি করে বলে দে।
দাঁড়া আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলে আসছি।
সঞ্জু উঠে গেলো।
চিকনা এবার ঝেড়ে কাশ অনেক কিছু চেপে আছিস। আমি কিছু জেনেছি বাকিটা তুই বলবি।
তোর হেঁপি মারা কথা ছাড়, আগে কি জানিস বল, তারপর বলছি।
সঞ্জু এসে সোফায় বসলো।
দাঁড়া আগে সঞ্জুর কেশটা শুনে নিই।
দরজাটা ভেজিয়ে দিই। চিকনা উঠে গিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে আবার এসে বসলো।
বলতো সঞ্জু ঘটনাটা কি?
কি বলবো সব সাজান।
ইনভেস্টিগেশন সুকান্ত করেছিল।
হ্যাঁ।
কেশ ডাইরী দেখেছিস?
দেখেছি, কিছু বুঝি নি।
আর কেউ ছিল না।
হারামী সত্যি কথাটা বলতে পারছিস না। চিকনা খ্যাঁক করে উঠলো।
বাড়িতে একদিন মিনতির সঙ্গে খুব ঝামেলা হলো। সম্পত্তির ব্যাপার নিয়ে। তখন বাবা দু-জনকেই বাড়ি থেকে বার করে দেন। কয়েকদিন বাপের বাড়িতে ছিল। একদিন দোকানে এসে খুব চোটপাট করলো আমার ওপর। সেই দিনটা বাজার বার ছিল। মাথা ঠিক রাখতে পারি নি। ঠেলে দোকান থেকে বার করে দিয়েছিলাম। এই আমার অপরাধ।
কে কে ছিল তখন?
বাসু ছিল, মীরচাচা ছিল বাজারের অন্যান্য লোকজনও ছিল। সেদিন ঋজুরও কি ঝাঁজ, আমি নাকি বাবাকে বলে কয়ে ওদের সম্পত্তি থেকে বঞ্ছিত করছি।
সুকান্ত স্যারের স্টেটমেন্ট নিয়েছিল?
সবার সঙ্গে আলাদা করে কথা বলেছে। আমাদেরও কিছু শত্রু আছে তারা সাক্ষী মেনেছে।
তারা কারা?
তুই সবাইকে চিনতে পারবি না। তার মধ্যে মণ্ডলের জামাই আছে। সেইই গোটা ব্যাপারটা নিয়ে জল ঘোলা করছে।
অনুপকে জানিয়েছিলি?
অনুপদার পরিচিত উকিলই লড়ছে।
তোকে এ্যারেস্ট করেছিল?
খাতায় কলমে। একদিন থানায় ছিলাম। তারপর দিন ছেড়ে দিয়েছিল।
তোকে যে রেপ কেশে ফাঁসাল। তার কোনও মেডিকেল এক্সামিন হয়েছিল।
আমি কিছুই জানি না।
সঞ্জুর চোখটা ছল ছল করে উঠলো।
তুই এখন ঋজুর বৌয়ের সঙ্গে কথা বলিস?
না।
মিনতি বলে?
না।
তোর ছেলে মেয়েরা?
মাঝে সাঝে বলে।
তোর কাছে তারপর আর ঋজু ঋজুর বৌ এসে ক্ষমা-টমা চায় নি?
ক্ষমা! তুই কি সব আজব কথা বলিস। চিকনা বলে উঠলো।
সঞ্জুর বাপ বাপান্তর করে ছেড়ে দিল। তারপর আমাদের নাম ধরে ধরে বললো, দেখবো কতো বড়ো দাদা আছে। সেই জামাই ভোঁ করে রাতে চলে এলো। তার কি তেজ। স্যারকে গিয়ে যা নয় তাই বললো। স্যারকে ভিটে মাটি থেকে উৎখাত করবে, এমনও হুমকি দিল।
তখন কাকে কি বলবো? তুই, দাদা নার্সিংহোমে। আমি গ্রাম ছাড়া। মাঝে মাঝে সুকান্তর দয়ায় গ্রামে ঢুকি। মীরচাচা সব দিক সামলে উঠতে পারছে না। তার ওপর অনাদির শাসানি। সে এক বিচ্ছিরি অবস্থা। প্রেসারের চোটে সুকান্ত রিজাইন দিতে বাধ্য হলো। যে নতুন অফিসারটা এলো, সে রাম হারামী। সঞ্জুকে নিত্য ডিস্টার্ব করতে লাগলো। আমি সব শুনি বোবা হয়ে বসে থাকি। ঘটনাটা একটা রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে গেল। তারপরই শুনলাম সুকান্ত এ্যারেস্ট।
সেই রাগে জামাইটাকে আর ওর পরিবারের দু-তিনজনকে এক রাতে তুলে নিয়ে গিয়ে রাম কেলান কেলালাম। তখন কিছুটা শান্ত হলো। কিন্তু স্যারের ওপর কোপ পরলো। অনাদিও তখন কম যায় নি। সাপের পাঁচ পা দেখে ফেলেছে।
চিকনার মোবাইলটা বেজে উঠলো। পকেট থেকে বার করেই জিভ কাটল।
গুরুমা। তুই মোবাইল নিয়ে আসিস নি।
আমি পকেটে হাত দিয়ে হাসেফেললাম।
নীপার কাছে আছে, নিতে ভুলে গেছি।
চিকনা ভয়েজ অন করে দিলো।
বলো গুরুমা।
ধরতে এতো দেরি হলো, কোথায় ছিলে?
এইতো ঘরে বসে আছি।
ব্যাঙ্কে?
হ্যাঁ।
গুরুটি কোথায়?
তোমার গলা শুনতে পাচ্ছে। চিকনা ফোনটা আমার হাতে দিল।
কিরে বিচারক কয়টা বিচার কমপ্লিট করলি?
সবাই হেসে উঠলো।
অনেকে আছে মনে হচ্ছে।
বাসু আর সঞ্জু আছে।
সঞ্জুর বিচার হয়েছে?
না, শুনছে। বিকেলে গিয়ে হবে।
কিরে আমার গলা কানে ঢুকছে?
ঢুকছে। আমি বললাম।
মেয়ে তোর অনেক গুণকীর্তন করছে।
শুনে যা এসে বলবি।
আজ ফেরার টিকিট কাটলাম।
তাই! কবে ফিরছিস?
পনেরোদিন পর টিকিট পেয়েছি। তাও দিল্লী হয়ে। ডাইরেক্ট ফ্লাইট এক মাসের আগে টিকিট পাওয়া যাবে না।
এখনও দু-সপ্তাহ!
কিছু করার নেই। তাছাড়া এখানেও কিছু কাজ আছে।
দাদা কেমন আছে?
এখন সুস্থ। নিজে নিজে খাচ্ছে। জামাকাপরও পরছে।
ভালো খবর দিলি।
কালরাতে ঘুমিয়ে পরলি। ফোন করেছিলাম।
চিকনা বললো।
সকালেও ফোন করেছিলাম।
নীপা বললো।
বেশি স্টেইন নিস না। আমাদের কথাটা একটু ভাব।
মিত্রার গলাটা হঠাৎ কেমন যেন বেসুরো শোনাল।
না না আমি ঠিক আছি।
ধর তোর সঙ্গে কথা বলার অনেক লাইন।
দে। আমি ভয়েজ অফ করলাম।
অনি।
ডাক্তারদাদার গলা পেলাম।
বলো।
কেমন আছিস?
ভালো আছি।
কাল মাথার যন্ত্রণা করছিল, নীপা বললো।
সেরকম কিছু না।
কোন দিকটা করছিল?
কাটা জায়গাটা টিপ টিপ করছিল।
কাল সকালের ওষুধটা খাওয়া হয় নি তাই না?
সময় পেলাম না।
ভুল করিস না। আর তিনটে মাস একটু কষ্ট কর।
আজ খেয়েছি।
নীপা বলেছে। এই কদিন নিয়ম টিয়ম একটু কম পালন কর। শরীর আগে। তোকে মনে রাখতে হবে, তুই এখনও সুস্থ নোস।
না না সাবধানে থাকছি।
ঠাণ্ডা লাগাস না।
সন্ধ্যের পর বাইরে থাকি না।
বেশ কয়েকটা মেশিন কিনলাম বুঝেছিস।
কনিষ্ক বললো।
তুই শুনেছিস?
হ্যাঁ।
তাহলে কিছু বলিস নি কেন?
তুমি নিশ্চই ভাল বুঝেছ তাই কিনেছ।
বুড়ো বয়সে অনেক নতুন জিনিস শিখলাম। দু-জন পুরনো সাহেব বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো। প্রায় চল্লিশ বছর পর।
দু-জনে দু-জনকে চিনতে পেরেছিলে?
চিনে নিতে হলো।
ওনারাও কি তোমার পেশায়?
অবশ্যই। দুজনে এখন ইংলণ্ডের রিনাউন্ড ডাক্তার।
তোমার স্ট্রিমে?
একজন। আর একজন কার্ডিয়াক।
কাজে লাগানো যাবে?
সব কথা বললাম। ভীষণ ইমপ্রেসড। তোর সঙ্গে আলাপ করতে চাইল।
আবার লেজুড় জুরলে কেন?
তোর ব্রেণ চাইল্ড, সেটা বলবো না।
ফিরে এসো ডিটেলসে সব শুনবো। দাদা ঠিক আছে?
আশিভাগ ঠিক হয়েছে। বাকিটা হবে না। এই সমস্যাগুলো থাকবে।
তোমার বন্ধুদের দিয়ে দেখালে না কেন?
সে কি আমি বাকি রেখেছি। ওরাই বললো।
বড়োমা, ছোটোমা?
ধর কথা বল।
কিরে শুনলাম জমিয়ে আড্ডা মারছিস?
বৌদির গলা পেলাম।
কেমন আছ?
চুটিয়ে ঘুরছি।
অনিমেষদা কোথায়?
দাদা, মল্লিকের সঙ্গে বসে শলা-পরামর্শ করছে।
কিসের?
কাল তোর আফতাব ভাই আসবে। স্টেটের জন্য যদি কিছু টাকা পয়সা হাতান যায়।
ওখানে গিয়েও ধান্দা। অনিমেষদাকে বলবে আমার কমিশনটা যেন থাকে।
সবই তোর জন্য। জীবনে চেষ্টা করলেও এখানে আসতে পারতাম না। যদি আসতাম লোকে দশ কথা শোনাতো। তবু তুই জেদ ধরলি। জায়গাটা ঘোরা হয়ে গেল। সঙ্গে ফাউটা যদি জুটে যায় সোনায় সোহাগা।
সুরোর সঙ্গে কথা বলেছো?
কাল বলেছি।
নাতির সঙ্গে?
সে তো ফোন ধরেই বলে আঙ্কেলকে পাঠিয়ে দাও। আমার কোনও কথা শুনলই না।
হাসলাম।
সাবধানে থাকিস।
আচ্ছা।
ধর দিদি কথা বলবে।
দাও।
ভয়েজ অফ করে রেখেছিস কেন, আমাদের শোনা। চিকনা বললো।
আমি ভয়েজ অন করলাম।
অনি।
বড়োমার গলা পেলাম।
বলো।
মনটা খুব খারাপ তাই না।
একটু লাগছে। কি করবো বলো। মানুষটাকে তো ধরে রাখতে পারবো না। স্মৃতি হাতড়াচ্ছি।
মিত্রার কাছে শুনে মনটা খারাপ হয়েগেল। বড্ড ভালোমানুষ ছিল।
শেষের কয়টা মাস খুব কষ্ট পেয়েছে।
নীপা সব বলেছে। যারা ভালো মানুষটাকে কষ্ট দিয়েছে তাদের একবারে ছাড়বি না।
কথাটা শোনা মাত্রই চিকনাদের মুখের চেহারায় পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট।
ছাড়ার কোনও প্রশ্নই নেই।
কেউ না করুক, আমি তোকে সাপোর্ট করবো।
তুমি আমাকে কিছুটা বুঝতে পার।
ছোটোকে বলেছি, ওকে একবারে বাধা দিবি না। শয়তানের গুষ্টি সব।
চুপ করে থাকলাম।
ইসলাম তোর কাছে রবিবার যাবে, ও শনিবার মাঝ রাতে কলকাতায় পৌঁছবে।
তোমরা কি দুবাই যাবে।
এবার আর যাব না। বাড়ির বাইরে থাকতে আর ভালো লাগছে না। তোর দাদা আগের থেকে অনেক ভালো হয়ে গেছে। এখন একা একা সব পারে।
আমার থেকে তুমি ভালো বুঝতে পারবে।
কালকে রাতে খাওয়ার সময় তোর কথা মনে পড়ছিল। খেতে পারলাম না।
কেন বৃথা কষ্ট পাও। তোমরা ঘুরতে যাও নি।
ও তোকে বলতে ভুলে গেছি।
কি।
তনু বাড়ি কিনেছে।
ছোটোমা বলছিল।
আমার পছন্দ হয়েছে। বেশ খোলামেলা। অনেকটা জায়গা নিয়ে। তোর দাদা আবার কয়েকটা গাছ পুঁতে দিল।
ভালো করেছে।
অনিয়ম করিস না।
না না আমি আগের থেকে অনেক ভালো আছি।
গিয়ে তোকে সব গল্প বলবো।
আচ্ছা।
আর কেউ কথা বললো না। কিছুক্ষণ কঁ কঁ করে ফোনটা কেটে গেল।
ফোনটা চিকনার হাতে দিলাম।
ঘরের সবাই চুপ। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
অনিমেষদা কবে গেছে? চিকনা বললো।
গত সপ্তাহে।
বোনের একা যাবার কথা ছিল না?
হ্যাঁ। আমিই জোড় করে পাঠালাম। ইসলামভাই, ইকবালভাই ফিরে আসছে। তাই।
সেইজন্য সুরো, মিলিদি ও বাড়িতে আছে?
হ্যাঁ।
সুবীর আমার মোবাইলটা নিয়ে ঘরে ঢুকলো।
মোবাইল ফেলে এসেছিলে। নীপা পাঠালো। বৌদি ফোন করেছিল।
আমার সঙ্গে কথা হয়েছে।
বাসুদা তোমাকে বৌদি একবার ফোন করতে বলেছে।
তোমায় কে বললো?
তুমি ফোনটা দোকানে ফেলে এসেছো।
বাসু হেসে ফেললো।
সঞ্জু ফোনটা বাসুর হাতে দিল। বাসু আমার দিকে তাকাল।
তুই এখন খাবি তো?
কি খাবো!
সকালে খেয়ে এসেছিস?
হ্যাঁ।
নীপা লতাকে বলে দিয়েছিল।
আমার পেট ভর্তি আছে।
তা হয় না, লতা কষ্টকরে তোর জন্য করেছে।
তাহলে একা খাবো না। বেশি করে পাঠাতে বল।
সেটা ও জানে।
এখন পাঠাতে বলে দিই। দুটো বেজে গেছে।
এতো বেলা হয়ে গেছে! সুবীর তোমার কাজ শেষ।
আর একটু বাকি আছে। ক্যাশটা মেলাচ্ছি।
মিলিয়ে এসো।
ওরা আপনার সঙ্গে একটু আলাপ করতে চায়।
কারা!
যারা নতুন জয়েন করেছে।
ঠিক আছে, কাজ শেষ হলে নিয়ে এসো। একটু চা দিয়ে যেতে বলবে।
পাঠিয়ে দিচ্ছি।
সুবীর বেরিয়ে গেল।
সঞ্জু।
বল।
স্যার কি কোনও উইল-টুইল করেছে।
না। মুখে মুখে বলে গেছে।
ঋজুকে কি দিয়েছে?
দোকান আর সাত বিঘে জমি।
সেগুলো ঋজু চাষবাস করছে?
ওই নিয়েই গণ্ডগোল।
কুঁতে হাগিস কেন?
চিকনা হেসে ফেললো।
গণ্ডগোলটা কি বল?
এখন অবস্থা ভালো নয়, ও সব ভাগে দিয়ে দিল। একবার দিলে আর ওঠানো খুব মুস্কিল। ভাগচাষীরা সব বর্গারেকর্ড করে নেবে। আমি বারণ করলাম। ওমনি আমি ওই জমিগুলোতেও নজর দিয়েছি কিছু ওকে নিতে দেব না।
তোরগুলো?
নিজে করছি লোক দিয়ে। পাঁচু, পচাকে সব দায়িত্ব দিয়েছি। ওকেও তাই বলেছিলাম। আমার কথা মানলো না। ওর সেই জামাইবাবুটা ঝামেলা করলো।
সম্পত্তির বাকি অংশ কার নামে?
সব দুই নাতির নামে থাকবে বলেছে।
নতুনভাবে যদি কিছু ভাবনা চিন্তা করতে হয় তাতে তোর কোনও আপত্তি আছে?
না। আমি একটা শুষ্ঠ সমাধান চাই।
চুপ করে রইলাম।
চায়ের ছেলেটা এলো। সবাইকে চা দিয়ে চলে গেল।
চিকনার দিকে তাকালাম।
কাঞ্চনের ব্যাপারটা একটু বল। আমি এই কয়মাস অনাদির সম্বন্ধে কোনও খবরা খবর রাখি নি।
কাঞ্চনকে এখান থেকে ভুল বুঝিয়ে নিয়ে গেছে। জোড় করে আটকে রেখেছে।
কোথায়?
ওটা রতন সব জানে। সময় হলে তোকে বলবে।
তুই কতটুকু জানিস?
আমি একবার গিয়ে দেখা করে এসেছি। কাকা-কাকী হাত ধরে খুব কাঁদল। ওর এখনকার বৌটা সুবিধার নয়।
বালিগঞ্জের ফ্ল্যাটে রয়েছে?
হ্যাঁ।
অনাদি কোথায়?
অসুস্থতার ভান করে হাসপাতালে রয়েছে।
কাঞ্চনকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়?
হ্যাঁ।
জামিন হয়েছে?
মনে হয় দেয় নি।
চার্জসিট দিয়েছে?
দিয়েছে।
এখানকার অবস্থা?
আগের থেকে অনেক ভালো।
কে কন্ট্রোল করছে?
আমি।
বাসু, সঞ্জু অবাক হয়ে চিকনার দিকে তাকাল।
তোকে কে গাইড করছে?
অনুপদা।
কবে থেকে দায়িত্ব দিয়েছে?
রাঘবন যেদিন তোর বাড়িতে এসেছিল সেদিন থেকে।
তারমানে খাতা কলমে দায়িত্ব পাস নি?
নিতে চাইনি। পরিষ্কার বলে দিয়েছি, অনি বললে দায়িত্ব নেব। অনিমেষদা রিকোয়েস্ট করলো। তাই না বলতে পারিনি।
সেদিন তুই বলেছিলি শবর পাড়ার একটা ছেলেকে ওরা গুলি করেছিল। মনে আছে?
ছেলেটা ভালো আছে। একটা পা একটু অকেজো হয়ে গেছে।
ছেলেটা এখন কি করে?
ব্যাঙ্কের টাকা তোলার দায়িত্ব দিয়েছি। একটা বাইক কিনে দিয়েছি।
ভালো করেছিস। কেমন কাজ করছে?
খুব ভালো।
অমূল্য?
বেঁচে থাকতে কোনওদিন এই তল্লাটে আর ঢুকতে পারবে না।
এখন থাকে কোথায়?
স্টেশনের কাছে বাড়ি করেছে।
জায়গা জমি?
গ্রামের ছেলেদের ভাগাভাগি করে চাষ করতে বলে দিয়েছি।
বাস্তু ভিটে?
কিছু নেই। মাঠ করে দিয়েছি।
অমূল্যর মতো আর কটা আছে?
এখন সব দু-মুখো সাপ। ঠিক বুঝতে পারছি না। কয়েকদিন সময় চেয়েছি অনুপদার কাছে।
সঞ্জু, বাসুকে দিয়ে কোনও কাজ হবে।
ওরা ভালো ছেলে। গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি পর্যন্ত ঠিক আছে।
দু-জনেই মুচকি মুচকি হাসছে।
বুঝেছি।
ঋজুর কেশটা তুই সাল্টালিনা কেন?
অন্য কেউ হলে চাকি ঘুরি দিতাম। স্যারের ব্যাপার, খুব সেন্সিটিভ, তাই দাঁতে দাঁত চেপে শুনে গেছি। কোনও উত্তর দিই নি। সঞ্জুও অনেক গাল দিয়েছে।
ভুল বোঝে নি?
বুঝলে ওর ক্ষতি, আমার নয়।
সঞ্জুর দিকে তাকালাম।
মাথাটা নিচু করে আছে।
কিরে সঞ্জু?
ও আমাদের আজ পর্যন্ত এসব কথা বলে নি। প্রথম শুনছি। বাসুকে জিজ্ঞাসা কর।
কতোবার বলেছি, সব কথা মুখে বলা যায় না। বুঝে নিতে হয়। আমি বললাম।
সামথিংস হ্যাপেন, সেটা আমি সঞ্জুকে বলেছি জিজ্ঞাসা কর। ইদানীং চিকনার চাল চলন বেশ সমীহ আদায় করে নিচ্ছিল। খুব ভেবেচিন্তে কথা বলছে। কাউকে আলটপকা কিছু বলছে না। সবচেয়ে বড়ো কথা মীরচাচা একবারে ওর নেওটা হয়ে গেছে। ও যা বলছে মীরচাচার কাছে সেটা বেদ বাক্য। বাসু বললো।
সেদিন লতার বাড়িতে একটা সমস্যা হয়েছিল। চিকনাকে ডেকে বলেছিল। আমি জানতাম না। তারপর লতাই বললো, চিকনাদা কাজটা করে দিয়েছে। ওই কাজটা তুইই একমাত্র করতে পারতিস। ও যখন করলো, তখনই বুঝতে পারলাম চিকনার হাতে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আমি চিকনাকে জাজ করে যাচ্ছিলাম। তারপর একদিন চেপে ধরতাম। কতদিন পালিয়ে পালিয়ে বেরাবে।
বাসুর ছেলে একটা ঢাউস টিফিন বাক্স নিয়ে ঘরে ঢুকলো।
বাসু কথা বলা থামালো।
চিকনা উঠে গেল।
কাউকে সঙ্গে নিয়ে আসতে পারলি না?
ছেলেটা আমাকে এসে প্রণাম করলো।
মা তোমাকে একবার যেতে বলেছে।
কেনোরে?
কি জানি।
মাকে বলিস আমি এখন থাকবো। হঠাৎ একদিন চলে যাব।
তোমার জন্য মা আলাদা করে দিয়েছে। আর সবার জন্য একজায়গায় দিয়েছে।
মা খুব অন্যায় করেছে। আমি কি গেস্ট?
বাসুর ছেলেটা দাঁত বার করে হেসে ফেললো।
আমি যাই।
যা।
ও বেরোবার সঙ্গে সঙ্গেই মীরচাচা, সুবীর ঢুকলো।
ভালো ছেলে পাওয়া খুব মুস্কিল বুঝলি অনি।
মীরচাচার কথায় আমি হাসছি।
হ্যাঁরে। পঞ্চাশটা এসেছিল। মাত্র তিনটে ভালো ছেলে পেলাম। অনেকে কাজটা পাওয়ার জন্য সুবীরকে টাকার অফার পর্যন্ত করে ফেললো।
নাও খেতে শুরু করে দাও।
তোর কাকী এবার বকবে।
কাকীকে বলবে অনি এসেছে, কয়েকদিন অনিয়ম হবে। কিছু করা যাবে না।
মীরচাচা জোড়ে হাসলো।
খেতে খেতেই সুবীরকে জিজ্ঞাসা করলাম।
এই মুহূর্তে কতোজন এজেন্ট নিয়োগ করেছো।
তিনশো এগারোজন।
মানে তিনশো এগারোটা গ্রাম।
হ্যাঁ।
লোন কতো ডিসবার্স করেছ।
একহাজার থেকে দশ হাজার পর্যন্ত প্রায় দুকোটি টাকা।
আমার চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল।
তোমাদের এতো টাকা আছে নাকি!
বাকিটা শুনলিই না। চিকনা বললো।
দশের ওপর পঁচিশের নিচে প্রায় তিন কোটি। আর লাখের ওপর দশ লাখের নিচে। গোটা পঞ্চাশেক। তারা সবাই আমাদের পকেটের লোক।
টাকা পয়সা ঠিক ঠাক শোধ হচ্ছে।
হবে না মানে। টাকা তোলার বাহিনী আছে। না দিলে জমির ধান কেটে ওর সামনে বিক্রী করে ওর পাওনা ওকে দিয়ে ব্যাঙ্ক তারটা নিয়ে চলে আসবে। চিকনা বললো।
এটা উচিত নয়। তোরা অত্যাচার করছিস।
টাকাটা কিসের জন্য দেওয়া হচ্ছে, চাষের জন্য। তুই চাষ না করে মাংস খাবি। হবে কি করে। একবার সবর পাড়ায় চলে যা। মেয়েছেলেগুলোর চেহরা দেখে আয়। চক চক করছে। লোন নিচ্ছে কাজ করছে। শোধ করছে, ডবল টাকা পাচ্ছে। কমবেশি সব ঘরে টিভি হয়েছে দু-একটা আসবাব পত্র কিনেছে। কোথা থেকে আসছে। আর ও শালারা টাকা নিয়ে ফুটানি মারবে। রোগ হলে ওষুধ দিতে হবে। দুঃখ করে লাভ নেই।
আমি হাসছি।
(আবার আগামীকাল)