জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১৩৪ নং কিস্তি
তোনকার হতিছে দাঁড়া। বড্ড বাড় বারছু, আগে অনিআকার সঙ্গে কথা সাড়ি লেই।
ভেতর বারান্দাটা লোকে ভরে গেল। কেউ পরিচিত নয়। চিকনারা এগিয়ে এলো।
চিকনাআকা তুই কোনও কথা কইবি নি। তোর কথা আমান্যে মানবি নি।
চিকনার মুখে একরাশ বিরক্তি ফুটে উঠেছে।
আমার দিকে তাকিয়ে ছেলেটা হেসে ফেললো।
চিনতে পারো লাই?
তখনও ওর মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে।
খাইট থেকে একটুক লিচে লামো একটা গড় করি।
চিকনার দিকে তাকালাম।
শ্যামের ছেলে, ছুড়কি।
আমার শরীরে কেমন যেন একটা বিদ্যুতের শিহরণ খেলে গেল।
শ্যামের ছেলে!
তারাহুরা কের খাট থেকে নেমে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম।
তুই ব্যাটা এতো বড়ো হয়েগছিস!
ছেলেটা নিচু হয়ে আমার পায়ে মাথা ঠেকাল। উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে সামনে দাঁড়াল।
আমি ওর দুই কাঁধে হাত রেখেছি।
মেদ হীন সুঠাম চেহারা। ওর মতো বয়সে শ্যামের চেহারাটাও এরকম ছিল।
তুমি মোকে ওই নামে ডাকবো নি।
তাহলে কি বলে ডাকবো।
তুমি মোকে যে নাম দিছিলে।
সে কি আর মনে আছে।
মনে করো, মা মোকে কইছে।
ভাবতেই অবাক লাগছে, তুই চূড়ার ছেলে, হঠাৎ এতো বড়ো হয়ে গেলি কি করে!
ছুড়কি লজ্জা পেয়েগেছে।
আর কে এসেছে?
দলের লোক আসছে। তুমাকে গড় করবে সক্কলে।
আমার হাতটা চেপে ধরলো।
তুই জানলি কি করে আমি এখানে এসেছি।
বাবা কাল দুফুরে মোকে পঠাইছে। আবিদআকা ফোন করছিল।
তোরা যে এখানে এসেছিস চিকনা জানে?
চিকনাআকা, বাসুআকা, সঞ্জুআকা সব জানে।
দেখ আমাকে কেউ কিছু বলে নি।
তুমি যে কাউখে কিছু কও না।
হাসলাম। বেশ টক টক করে কথা বলছে ছুড়কি।
নীপা তোকে চেনে?
মাথা দোলালো। আমি পিসীকে ঘরনু লেইসলি।
নীপার দিকে তাকালাম। মুখ নিচু করে হাসছে।
চল তোর দলের লোকগুলোকে একটু দেখি।
আমি ছুড়কির কাঁধে হাত দিয়ে বাইরের বারান্দায় বেরিয়ে এলাম।
বুঝলাম কোমরে রিভালবার গোঁজা।
এই ছেলেটার জন্মানর দিন আমি ভালোপাহাড়ে ছিলাম। শ্যাম ফোন করেছিল, তুই একবার আয় অনিদা। চূড়া তোকে আসতে বলেছে। তখন আমার উত্তাল অবস্থা। পনেরো দিনের জন্য হঠাৎ নিখোঁজ হয় গেছি।
গ্রামের দাইরাই ওর জন্ম দিয়েছিল। জন্মাবার পর সাঁওতালী প্রথায় ওকে বরণ করা হয়েছিল। সেই রাতে খুব আনন্দ উৎসব হয়েছিল। জোর খাওয়া দাওয়া হয়েছিল।
গ্রামের মুখিয়া বলেছিল অনি তুই ওর একটা নাম দে। হাসতে হাসতে বলেছিলাম, আমি সব বাঙালি নাম জানি তাই রাখবো।
মুখিয়া হাসতে হাসতে বলেছিলো, তাই দে।
তখন কি মনে হয়েছিল জানি না। বলেছিলাম ওর নাম দাও কৃষ্ণ, আমাদের কেষ্ট ঠাকুর তোমাদের কৃষ্ণ ঠাকুর।
ওরা সবাই মেনে নিয়েছিল। তারপর কোথা থেকে যে এতটা সময় কেটে গেল কে জানে।
বাইরে এসে দেখলাম খামারে গ্রামের অনেক লোক ভিড় করেছে।
সবাই পলির জামাইবাবুর গুষ্টি উদ্ধার করে ছেড়ে দিচ্ছে। পেলে যেন এখুনি ছিঁড়ে খায়।
দেখলাম আরও গোটা দশেক ওর বয়সী ছেলে বাইরে দাঁড়িয়ে। কেউ খালি হাতে নেই। আমাকে দেখতে পেয়ে সবকটা হুড়মুড় করে ছুটে এসে পায়ে পরে গেল।
চিকনাআকা জামাইটারে ধরি লিয়ায়, আমান্যে ঘরে কিছু করবনি। এউ ঘর অনিআকার দেবতার ঘর। দেবতার অপমান করছে ওন্যে।
ওদের মধ্যেই একজন খ্যাড় খ্যাড় করে উঠলো।
তোরা যা আমি কথা দিচ্ছি সামলে নেব।
তুই আগে ওনকাকে ডাক। নাইলে আইজ রাতেই মারিদিব।
তোর অনিকাকার মাথায় হিম পরছে। শরীর খারাপ হলে আবার গণ্ডগোল।
চিকনা কাঁচুমাচু হয়ে বললো।
আমান্যে বারান্দায় বইসিঠি। আকা মনকার সঙ্গে আছে, তুই আইগে ডাক।
চিকনা অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভেতরে চলেগেল।
বারান্দার বেঞ্চে এসে সবে বসেছি। দেখি গোটা পাঁচেক বাইক এসে খামারে থামল।
মীরচাচা গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এলো।
আমাকে দেখে হেসে ফেললো।
তোকে দেখতিছি একলা আর কোথাও ছাড়া যাবে নি।
আমি হাসলাম।
তোন্যে কি করছিলু?
ছুড়কির দিকে তাকাল।
তোন্যে থাকতি এতো ঝামিলি হয় কি করে?
আমান্যে বাঁশ ঝাড়ে বুইশেছিলি তান্যে চেঁচাইতে এঠি আসলি।
নীপা।
মীরচাচা বাজখাঁই গলায় চেঁচিয়ে উঠলো।
আবার নীপাকে ডাকছো কেন। আমি বললাম।
দরকার আছে।
ভেতর থেকে নীপা বাইরে বেরিয়ে এলো।
আমার দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে টিপে হাসছে।
খইরুল।
আইজ্ঞ্যা।
একটা ছেলে এগিয়ে এলো। ছুড়কির মতোই বয়স।
পিসীর হাতে প্লাসটিকের কাপগুলান দে।
চাচা নীপার দিকে তাকাল।
একটুক চা বনা। কাকীকে একবারটি ধরি ধরি বাইরে লিয়ে আয়। মোন্যে ভিতর যাইতি পারবোনি।
চিকনা, বাসু, সুবীর ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো।
মীরচাচা হেসে ফেললো।
অনি বাড়ি চলি যাক, মোদের গ্রামের সমস্যা এউবার মিটি লিব।
তোমায় কে খবর দিল? চিকনা বললো।
বাসু ফোন করছিল।
চিকনা বাসুর দিকে কট কট করে তাকাল।
তারপর খইরুলকে পাঠাইলি। মন মানে লাকি। আমি এউগাকে চিনি। এন্যে এক একটা ঢ্যামনা সাপ।
নীপা, মিনু দুজনে কাকীমাকে ধরে ধরে এনে বাইরের বেঞ্চিতে নিয়ে এসে বসাল।
তুমি কাঁদতিছো কেন। কাঁইদো না। স্যার কষ্ট পাবে।
মীরচাচা কাকীমার মুখের দিকে তাকাল।
নীপা সেই জামাই-টামাইরা কুথা আছে ডাইক।
বাইরের বারান্দা ভড়ে গেছে।
ঋজু সবার আগে বেরিয়ে এলো।
ওন্যে গেল কাই। মীরচাচা ঋজুর দিকে তাকাল।
আমার আর ভালো লাগছে না চাচা।
কি করবি বাবা। বিয়ে যখন করছিস ফেলে দেওয়া যাবেনি।
দেখলাম পেছন পেছন সবাই বেরিয়ে এলো।
আইসো হে জামায়ের পো আইসো। মোরা ছোটো জাত। ম্লেচ্ছ। মনটা তুমাদের মতো নোংরা না। ভাবছিলাম তুমাদের ব্যাপারে থাকবোনি। স্যারের সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র অনি এয়েছে। মোরাও অনির কথা মাইনে চলি। অখনও পর্যন্ত কোনও অসুবিধে হয়নি। এখন দেখতিছি না থেকে উপায় লেই। তুমান্যে সব শিক্ষিত মানুষ, অনির সম্মানটুকু রাখতি শিখলেনি। জানো জামাই এর ফল ভালো হবেনি। এর আগে তুমি তা দেখছ। মোন্যে সবাই মুখ বুঁজে রয়েছি স্যারের সম্মান যাতি লষ্ট না হয়। তা যদি হয় তুমান্যে বাঁইচে কেউ ফিরবেনি।
মীরচাচা নরম গলায় সব বলে যাচ্ছে।
এউখানে যারা এয়েছে দেখতিছো সবাই স্যারের ছাত্র। আমিও। তবে বহুযুগ আগের। ত্যাখন কাকীমার বিয়ে হয়নি। মোদের এউ তল্লাটের তিন মাস্টার উনা মাস্টার, মনা মাস্টার আর অনির বাবা অভী মাস্টার।
এউ মাস্টাররা মোদের কাছে আল্লাহর মতো। এউ গ্রামের জন্য এউ মাস্টাররা অনেক কিছু করছেন। এঁদের পরিবারের সম্মানহানি হলি মোরা কেউ সহ্য করবোনি। এউবার তুমানকার কথা বলো।
সবাই চুপ করে রইলো।
চুপ করে থাকলি হবে নি।
অনিবাবু যা বলেছেন আমরা মেনে নেব। জামাই বললো।
তাইলে নিজেদের মধ্যে এতো ঝগড়া-ঝাঁটি করার কি দরকার ছিল।
নীপা, মিনু চা নিয়ে এলো।
মীরাচাচা নীপার দিকে তাকাল।
বারান্দায় রাখি দে। খইরুল বেটে দিচ্ছে। ওদের জন্য আলাদা লিয়ে আয়।
তুমি ওরকম করছো কেন।
তা হয় না নীপা।
নীপা কেমন থমকে গেল।
বারান্দায় প্লাস্টিকের গ্লাস চায়ের পট রেখে দিল। খইরুল তুলে নিয়ে খামারে চলে গেল।
যা ওদের জন্য আলাদা করে লিয়ে আয়।
তোমার।
আমি ওদের থেকে নিয়ে নিতিছি।
নীপা ভেতরে চলেগেল।
পলি।
পলি মীরচাচার দিকে তাকালো।
তুই ইদিকে আয়।
পলি পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলো।
তুই জানিস ঋজুর বাজারে কতটাকা ধার আছে।
পলি চুপ করে রইলো।
হ্যাঁ না কিছু একটা বল।
পলি তবু মুখ থেকে একটা কথাও বার করলো না।
আজ ঋজুর কিছু হলে, তোর ওই জামাইবাবু তোকে দেখবে?
জামাইবাবু কিছু বলতে যাচ্ছিল। মীরচাচা দুই ধমক মারলো।
মোর সব জানা আছে জামাই। বয়সটা মোর নেহাত কম লয়। তুমরা অনির সামনে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করে এখনও বাঁইচা আছো। তুমাদের ভাগ্য যথেষ্ট ভালো।
কার একটা ফোন বেজে উঠলো। দেখলাম ছুড়কি প্যান্টের পকেট থেকে ফোনটা বার করেই মীরচাচার দিকে তাকালো।
দাদাই বাবা ফোন করছে।
ধর।
মোকে ঝাড় দিবে কথা শুনি লাই।
ও এখন মোকেও মানবে নি। তোর অনিআকাকে দে।
ছুড়কির কাছ থেকে ফোনটা নিলাম।
বটম টিপতেই অলচিকি ভাষায় কাঁচা কাঁচা খিস্তি ভেসে এলো।
ফোন থেকে যেটুকু শব্দ বাইরে ভেসে আসছে তাতেই ছুড়কির মুখ শুকিয়ে গেছে।
আমি অনিদা বলছি।
ছুড়কি কাই। ঝাঁঝিয়ে উঠলো।
এখানেই আছে। অতো রাগ করলে চলে।
ওনকার সব ফোন বন্ধ কেন।
বন্ধ না, খোলাই আছে। হয়তো পাচ্ছিসনা।
জামাইটা তুর গায়ে হাত তুলছিল।
না না ঝগড়া ঝাঁটি করছিল নিজেদের মধ্যে।
ওটাকে আর বাঁচাইবো নি। মারি দিব।
পাগলামো করিস না।
তুই ওকে মোর হাত থেকে বাঁচাইতে পারবি লাই।
তাহলে তোর সঙ্গে সম্পর্ক রাখবো না।
শ্যাম চুপ করে থাকলো।
চুপ করে রইলি কেন?
শোর গুলোকে অউঠি মুখ দেইখতে পঠাইছি।
শোন না, আমি ঠিক আছি। তোর ছেলেকে আমি প্রথমে চিনতেই পারি নি। কতো বড়ো হয়ে গেছে। সেই কবে ছোটটা দেখেছি।
তুই আমার মন ভুলাইতে চাইছু।
নারে সত্যি বলছি। এখানকার অবস্থা ঠিক আছে। আমি ঠিক আছি। চিনতা করিস না।
তুই যখন শেষবার ভালোপাহাড়ে আসছিলু তখন ও দাহিজুড়ির স্কুল বোর্ডিংয়ে ছিল।
চূড়া কই।
তুর কথা শোনে।
কিরে চূড়া, আমার কথা শুনতে পাস।
শুনি তো।
তোর ছেলে একবারে শ্যামের মতো দেখতে হয়েছে। তোর মতো হয় নি।
চূড়া হি হি করে হাসে।
ওরা নাকি তুর গায়ে হাত দিছে।
না না নিজেদের মধ্যে বিবাদ করছিল। তোর ব্যাটা এলো, সব থেমে গেল।
অনিদা। শ্যামের গলা পেলাম।
বল।
মীরচাচা সেউঠি গেছে?
হ্যাঁ আমার সামনে বসে আছে।
তুর সঙ্গে রাতে কথা বলবো। ছুড়কিকে দে।
ধর।
ছুড়কির মুখটা শুকিয়ে গেছিল। এখন হাসছে।
ফোনটা ছুড়কির হাতে দিলাম। ছুড়কি খামারে চলেগেল।
শরীরটা ঠিক ভালো লাগছে না। মীরচাচার দিকে তাকালাম।
আমি বাড়ি যাই চাচা।
মীরচাচা আমার দিকে কেমনভাবে যেন তাকাল!
কেন! শরীর খারাপ লাগছে?
এখানে থাকতে ভালো লাগছে না।
নীপা এগিয়ে এসে গায়ে হাত দিল। চিকনা উঠে দাঁড়িয়েছে।
নারে বাবা, আমার কিছু হয় নি। আমি ঠিক আছি।
সবার দৃষ্টি এবার আমার দিকে।
মীরচাচা তোমরা সমাধান করো, আমি অনিকে নিয়ে বাড়ি যাই। চিকনা শুকনো মুখে বললো।
তাই যা, আমি ফেরার পথে যাব।
কাকীমা আমার হাতটা চেপে ধরলো।
শরীর খারাপ লাগছে?
কেমন যেন লাগছে। ভীষণ ঘুম ঘুম পাচ্ছে।
চিকনা যা বাবা ওকে বাড়ি নিয়ে যা।
কেন জানি না, আর এক মুহূর্তও আমার ওখানে থাকতে ভালো লাগছে না।
আমি খামারে নেমে এলাম।
সবাই আমার মুখের দিকে কেমন ভাবে যেন তাকিয়ে।
খইরুল।
আইজ্ঞ্যা।
ওদের এগিয়ে দিয়ে আয়।
নীপা, সুবীর আমার পেছন পেছন বেরিয়ে এসেছে।
চাদরটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে চিকনার পেছনে বসলাম।
মিনিট দশেকের মধ্যে বাড়িতে পৌঁছে গেলাম। হারুজানার কালার কাছ দিয়ে নদীর ওপর একটা কাঠপুল তৈরি হয়েছে। আগে এই নদী পথে হেঁটে খাল পার হতে হতো। খালে বেশি জল থাকলে এই পথে আর যাওয়া যেত না। তার ওপর দিয়েই চিকনা মটোর বাইক ছুটিয়ে চলে এলো। পেছন পেছন সুবীর।
হঠাৎ শরীরটা এমন আনচান করে উঠলো কেন? কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না। চিকনার মটর বাইক থেকে খামারে নেমে সোজা নিজের ঘরে চলে এলাম। নীপা আমার পেছন পেছন এলো। সারা শরীরে একটা অস্বস্তি। চাদরটা কোনও প্রকারে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পরলাম। নীপা আমার মাথার শিয়রে এসে বসলো।
চিকনার মুখ শুকিয়ে গেছে।
তোমার কি হয়েছে অনিদা? নীপার মুখটা শুকনো শুকনো।
কিছু না। তুমি বরং আমাকে একটু দুধ মুড়ি এনে দাও। ওষুধটা দাও খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। ভীষণ ক্লান্তি লাগছে। মাথাটা টিপ টিপ করছে।
নীপা বিন্দু মাত্র অপেক্ষা না করে বেরিয়ে গেল। ভানু, পচা, পাঁচু পেছন পেছন এসেছে। ওদের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলাম। একবারে কথা বলতে ইচ্ছে করলো না।
চিকনাকে বললাম সোফায় বোস। ঘাবড়াস না, আমার কিছু হয় নি।
কিছু অন্ততঃ বল। তুই কিছুই বলছিস না!
অপারেশনের পর থেকে মাঝে মাঝেই এরকম হয়। বুঝি না কেন। তখন কারুর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় শুধু ঘুমোই।
কনিষ্কদাদের বলিস নি?
বললে শুধু বলে রেস্ট নে।
আর কথা বলিস না।
চুপচাপ চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলাম। মাথাটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা মনে হচ্ছে। কোনও কিছু মাথাতে আসছে না। কেমন যেন ভোঁ ভোঁ করছে।
নীপা হন্তদন্ত হয়ে দুধ মুড়ির বাটি হাতে ঘরে ঢুকলো। পেছনে সুবীর। চোখ মুখ দেখে মনে হচ্ছে বেশ টেনশনে পড়ে গেছে।
দু-জনেরি মুখ শুকনো শুকনো।
ওর হাতটা ধরলাম।
অনিদার কিছু হয় নি। একটু ঘুমলেই দেখবে ঠিক হয়ে যাবে।
নীপা মুখ নিচু করে রইলো। কোনও কথা বললো না।
কোনও প্রকারে নীপার আনা একটু দুধ-মুড়ি খেয়ে ওষুধগুলো খেলাম।
নীপা সারাক্ষণ বসে বসে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। থম থমে মুখ।
চিকনাকে বললাম মাথাটা একটু টিপে দে। লেপ মুড়িদিয়ে শুয়ে পড়লাম।
বেশ শীত শীত করছে। শরীরটা তখনও আনচান করছে।
কখন ঘুমিয়ে পরেছি জানি না।
সকালে যখন ঘুম ভাঙলো, দেখলাম মাম্পি, মিকি আমার পিঠে বসে গাড়ি চালাচ্ছে।
মুখে বুরুরুরুরু বুরুরুরু আওয়াজ।
একটু অবাক হয়ে গেলাম।
মুখ ফিরিয়ে দেখলাম সোফায় কনিষ্ক, নীরু, চিকনা, বাসু বসে। আমার পায়ের কাছে সুরো, মাথার শিয়রে মিলি।
ওদের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললাম।
নে এবার আঙ্কেল চোখ খুলেছে। মিলি বললো।
কনিষ্ক, নীরু হাসছে।
মাম্পি, মিকি দুজনেই ঝুঁকে পরে আমার মুখের কাছে মুখ নিয়ে এলো।
আঙ্কেল।
উঁ।
তোমার শরীর খারাপ।
ওদের দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
মাম্পি গালে ঠোঁট ছোঁয়াল।
চকাত করে একটা আওয়াজ হলো।
ইস মুখে গন্ধ, যাও ব্রাশ উইথ টিথ।
আমি উপুর হয়ে শুয়ে ছিলাম।
তোরা নাম নাহলে আমি ব্রাশ উইথ টিথ করবো কেমন করে।
ওরা নামলো। সোজা হলাম।
ওরা আমার একজন পেটে একজন বুকে বসে পড়লো।
আঙ্কেলের লাগবে। তোরা এবার নাম। সুরো বললো।
তোরা কখন এলি?
কনিষ্ক তখনও হাসছে। সিগারেটের ধোঁয়ায় রিং ছাড়ছে।
হারামী তোকে না ঝেঁটিয়ে বিষ ঝেড়ে দিতে হয়। নীরু খ্যাক খ্যাক করে উঠলো।
কেন, আমি আবার কি দোষ করলাম?
কতোবার বলেছি এই তিনটে মাস একটু ধৈর্য ধরে থাক। ওষুধগুলো টাইমলি খা।
খাচ্ছি তো।
খাওয়া দাওয়াটা রেস্ট্রিকসনে আছে সেটা মেইনটেন কর।
আমি অনিয়ম করি নি।
তাহলে কি সাত সকালে মরতে এখানে মুখ দেখাতে এসেছি।
তুমি বলে কিছু করতে পারবে নীরুদা? সুরো বললো।
গম্ভীর মুখ।
ঠান দিদি। সুরোর দিকে তাকিয়ে বললাম।
মুখ ঘুরিয়ে নিল।
ইচ্ছে করছে তোকে এখুনি চাবগে ঠিক করে দিই।
ঘুম থেকে সবেমাত্র উঠেছি তার মানে এখন সত্যযুগ। কলিযুগের মতো কথা বলিস না। ওটা রাতে বলতে হয়।
মাম্পির কথা শোনা হচ্ছে না। অনেকক্ষণ থেকে কচকচ করছে। আমার গালটা ধরে ওর দিকে ঘোরাল।
আঙ্কেল আঙ্কেল নারোল তোমাকে বকছে?
হেসে ফেললাম।
ওটা আবার কে-রে?
মাম্পি, নীরুর দিকে হাত তুললো।
ও যে নারদ মুনি।
মিলি হাসছে। নীরুও হেসে ফেললো।
উঃ মিলিদি তোমার মেয়ে যা তৈরি হচ্ছে না। সুরো বললো।
নীপা ঘরে ঢুকলো।
আমার দিকে তাকিয়ে মুখটা নিচু করে নিল।
সত্যি নীপা তুমি ভীষণ করিতকর্মা মেয়ে। খবরটা কতদূর পর্যন্ত পৌঁচেছে।
কেন অন্যায় করেছে। এবার সুরো দাঁতমুখ খিঁচিয়ে উঠলো।
বেশ গম্ভীর হয়েছিলি, আবার খেঁচাচ্ছিস কেন।
কনিষ্কর মোবাইল বাজলো। একবার দেখে কানে তুললো।
বলো।….না এখন ঠিক আছে।….মিনিট দশেক হলো উনি উঠেছেন।….যা হয় আর কি। বলেছি বেশি স্টেইন নিস না। বাবু নিজেকে ফিট মনে করেছেন। নীপা তোমাকে সব ডিটেলস দিয়েছে।….হ্যাঁ বিপিটা হাই হয়ে গেছিল। ধরো কথা বলো।
কনিষ্ক হাত বাড়িয়ে আমার দিকে মোবাইলটা এগিয়ে দিল।
বুঝলাম কার সঙ্গে কথা বললো।
আমি নীপার দিকে তাকালাম।
নীপা চোখ নামিয়ে নিল। চিকনা, বাসু মুচকি মুচকি হাসছে।
ফোনটা কানে দিয়ে হ্যালো বলার আগেই কানে ভেসে এলো।
তুই আজই ওখান থেকে চলে আসবি।
যাক সকালে ঘুম থেকে উঠে বাসি মুখে নীরুর নাম সংকীর্তন শুনলাম। এবার তোর কড়া হুকুম। বুঝেছি আজ আমার দিনটা বেশ ভালো যাবে।
তুই আসবি কিনা বল। মিত্রা নাছোড় বান্দা।
ওরকম ধমকাচ্ছিস কেন?
একবার যেতে দে তারপর তোর সালিশি গিরি বার করছি।
সক্কাল সক্কাল একটু ভালো কথা বল না।
বড়োমা।
মিত্রা চেঁচিয়ে উঠলো। আমি শুনছি।
তোমার গুণমন্ত্র ছেলের কথা শুনে যাও।
মিলি ভয়েজটা অন করো একটু শুনি। কনিষ্ক বললো।
আমি মাথাটা সরিয়ে নিলাম।
মিলি জোর জবরদস্তি মোবাইলটা কেরে নিয়ে ভয়েজ অন করলো।
তখনও মিত্রার গলা ভেসে আসছে।
শয়তানটা বিয়ের দিন থেকে জ্বালিয়ে পুরিয়ে মারছে।
তুমি বলে যাও মিত্রাদি আমরা সবাই শুনি। মিলি বললো।
ও কোথায়?
সামনে বসে ভ্যাবলার মতো হাসছে। যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না।
ও কি ফোন ধরে আছে না তোর গলা শুনে ফোনটা কাউকে দিয়ে দিয়েছে।
বড়োমার গলা ভেসে এলো।
তোমার গলা ওর কানে ঢুকছে। মিত্রার গলায় ঝাঁঝ।
অনি।
চুপ করে রইলাম।
কিরে আমার গলা শুনতে পাচ্ছিস?
বলো কি বলছো।
তুই আজকেই ওদের সঙ্গে চলে আসবি।
কেন বিরক্ত করো বলো তো।
আমি কোনও কথা শুনতে চাই না। আমি ফিরে গেলে তুই আবার আসবি।
ঠিক আছে তাই হবে।
তুই তাহলে ওদের সঙ্গে চলে আসবি।
দেখছি।
তারমানে তুই আসবি না।
আমার কিছু হবে না।
তোকে কে বিচার করতে ডেকে নিয়ে গেছিল।
পরে কথা বলবো। এখনও দাঁত মাজা হয় নি। বাসি মুখে এসব কথা বলতে নেই।
সোজা খাট থেকে নেমে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলাম। তখনও বড়োমা চেঁচিয়ে চলেছে।
মাম্পি, মিকি দুজনেই আমার পেছন পেছন বেরিয়ে এলো।
ওদের দুজনকে সঙ্গে নিয়ে শিঁড়ি দিয়ে নেমে পেছনের দরজা দিয়ে পুকুর পাড়ে এলাম।
মিকি একটা মাটির ঢেলা তুলে নিয়ে পুকুরে ছুঁড়ে মারলো।
ডুব করে আওয়াজ হলো।
মিকি হাততালি দিয়ে উঠলো। চোখে মুখে আনন্দ ছরিয়ে পড়েছে।
আমি ওর দিকে তাকালাম।
আঙ্কেল পুকুরে মাছ আছে—
হুঁ।
এততো বড়ো—মিকি দু-হাত দু-দিকে ছড়িয়ে দিল।
হাসলাম।
ওর থেকেও বড়ো। তোকে হাঁ করে গিলে খেয়ে নেবে।
মিকি আর ঢিল ছুঁড়িস না। মাছরা রেগে যাবে। মাম্পি বললো।
ধ্যাত মাছরা কথা বলতে পারে নাকি।
দু-জনের মধ্যে কিচির মিচির শুরু হয়ে গেল।
বেশ মজা লাগছে। হয়তো আমিও একসময় এইভাবেই কথা বলতাম।
নীপার শাকতলার কাছে এসে ওরা থমকে দাঁড়ালো।
অনেকগুলো রং-বেরংয়ের প্রজাপতি উড়ছে কচি পালংশাকের ডগার ওপর।
দুজনে দেখতে পেয়ে বসে পরলো। বুঝলাম এই মুহূর্তে ওঠান দায়।
আঙ্কেল বাটার ফ্লাই।
এইখানে বসে থাকবি। কোথাও যাবি না। আমি এখুনি আসছি।
বাথরুমে ঢুকলাম। কান খাড়া করে ওদের গলার আওয়াজ শোনার চেষ্টা করলাম। বুঝলাম প্রজাপতি দেখে দুজনে লাফা লাফি শুরু করে দিয়েছে। তার ওপর আমি কাছে নেই তার মানে আরও বেশি নাচা নাচি শুরু করে দিয়েছে।
শাকতলায় উঠে যদি দাপাদাপি করে নীপা আমার ষষ্ঠী পূজো করে ছেড়ে দেবে।
তারাহুরা করে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলাম।
যা ভেবেছি ঠিক তাই। দুজনে শাকতলার ভেতরে চলে গেছে প্রজাপতি ধরার জন্য। পায়ের নীচে কচি পালং-এর ডগা লুটো পুটি খাচ্ছে। পরিষ্কার জুতোয় নরম মাটির পলেস্তরা লেগেছে।
দিলি তো সব শেষ করে, নীপাপিসী আমার পিঠের একটা হাড়ও আস্ত রাখবে না।
ছুটে গিয়ে দুটোকে টেনে বার করে নিয়ে এলাম।
উউউউউউউউঃ। মাম্পি বিরক্ত হলো।
ওই পিসিটাকে দেখেছিস, ভীষণ রাগী। এমন দেবে না।
প্রজাপতি ধরে দাও।
না ওরা কষ্ট পাবে। তার থেকে বরং চল আর একটা জিনিষ দেখাচ্ছি।
কি বলো।
চল না। দেখবি।
ঘাসে পা ঘসে ঘসে দুজনের পায়ের তলা থেকে কাদা মাটি তুললাম।
আঙ্কেল।
বল।
এগুলো পটি।
হাঁ তোর।
মিকি শরীর ভাঁজ করে হাসছে।
ওকে বকো।
কেন।
ওর পায়েও পটি আছে।
ঠিক আছে মুছে দিচ্ছি।
প্রজাপতিটা দাও না।
বললাম না ওরা কষ্ট পাবে।
দুজনকে দুহাতে ধরে বাঁশবাগানের ভেতর দিয়ে খালের ধারে এলাম। পেয়ারা গাছটা বেশ পুরুষ্টু হয়ে বেড়ে উঠেছে। একটা ডাল ভাঙলাম। ছোট ছোট কয়েকটা পেয়ারা হয়ে রয়েছে।
গুয়াভা দাও।
শক্ত খেতে পারবি না।
দাও না।
বাধ্যে হয়ে হাত বাড়ালাম, নাগাল পেলাম না।
মাম্পি তুই এদিকে আয়।
মাম্পি এগিয়ে এলো।
তোকে কাঁধে তুলছি পেয়ারা ছিঁড়তে পারবি।
মাম্পি মাথা দোলায়, মাহাখুশী।
আঙ্কেল আমাকে তোলো।
মিকি পাজামা প্রায় টেনে খুলে ফেলে।
দাঁড়া আগে ও পাড়ুক তারপর তুই।
আমি আগে।
তাহলে কাউকে দেব না।
মিকি চুপ করে গেল।
সব সময় মাম্পি আগে।
মিকি গজ গজ করছে।
তুই ছেলে না, সব সময় লেডিজ ফাস্ট।
মিকির মুখ দেখে মনে হলো কথাটা মনে ধরেছে।
মাম্পিকে তুলে ধরেছি।
পেয়ারা পারা হলে দাঁড়াবি মুখে দিবি না। ধুয়ে দেবো, তারপর খাবি।
একে একে দুজনকে কাঁধে চরালাম।
পেয়ারা পারা হলো।
কে কার কথা শোনে মিকিকে নীচে নামাতে যতটুক সময় লগেছে তার মধ্যেই দেখি মাম্পি পেয়ারায় দাঁত বসিয়ে দিয়েছে।
তোকে যে বললাম দাঁড়া আগে ধুয়ে দিই তারপর খাবি।
ওকে বকো।
মিকি কট কটিয়ে উঠলো।
দুজনের হাত থেকে দুটো পেয়ারা নিয়ে খালের জলে ধুয়ে আনলাম, আমি পেয়ারার ডাল চিবোই ওরা পেয়ারা খায়। দু-জনে আমার দু-পাশে বসেছে।
তুমি ব্রাশ উইথ টিথ করবে না।
এই তো করছি।
তুমি তো ট্রি খাচ্ছ।
এটাই ব্রাশ উইথ টিথ।
দু-জনেই মন দিয়ে পেয়ারা চিবোচ্ছে।
কি মিষ্টি। মাম্পি বললো।
আমারটাও।
তোর থেকে আমরাটা বেশি মিষ্টি।
আবার কিছুটা কিচির মিচির।
আমি পেয়ারার ডাল চিবিয়ে চলেছি।
চেয়ে চেয়ে ওদের দেখি, কেউ কম যায় না। কতো যে কথা বলে তাল খুঁজে পাই না।
নদীর জলে বাঁশ গাছের ছায়া পরেছে। ঝির ঝিরে হাওয়ায় নদীর বুকে গিলে করা পাঞ্জাবির হাতার মতো পাতলা কাঁপন। দুটো হাঁস প্যাঁক প্যাঁক করে ভেসে যাওয়া হ্রদের বুকে মুখ গুঁজে দিচ্ছে খাদ্যের সন্ধানে। চারিদিক নিস্তব্ধ আশেপাশে কেউ কোথাও নেই। মাঝে মাঝে হাওয়ার দোলায় বাঁশে বাঁশে ঘসা ঘসি, ক্যাঁচর ক্যাঁচর আওয়াজ।
আমি যেন ধীরে ধীরে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছি।
ভোরের আলো ফুটতে ফুটতেই কাকা ঠেলে তুলে দিত।
ওঠ উনার কাছে যেতে হবে।
কাঁচা ঘুম ভেঙে যেত। রাগ হতো। কাকার মুখের ওপর কোনও কথা বলতে পারতাম না।
শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা একই নিয়ম। ঘুম থেকে উঠে ঘুঁটের ছাই কিংবা পেয়ারার ডাল বা নিমডাল ভেঙে এখানে এসে বসতাম।
বর্ষাকালে ভরা নদীর জল ছলাৎ ছলাৎ করে আমার পায়ের পাতা ছুঁয়ে যেত। ঝির ঝিরে বৃষ্টি, মাথায় তালপাতার সেউনি। বেশ লাগতো।
বর্ষা ছাড়া আর সব ঋতুই বড়ো মনোরম ছিল। তখন বাথরুম ছিল না। সকালের প্রাতঃকালীন কাজকর্ম সারতে বসে বনচাঁড়ালের সঙ্গে সক্ষ্যতা হলো। বেশ ভালো লাগতো। যেই হাততালি দিতাম অমনি গাছগুলো কেমন নাড়াচড়া শুরু করে দিত। প্রাতঃকালীন সারতে সারতে সে এক মজার খেলা। সময় পেরিয়ে যায়, আমার ওঠার নাম নেই। কাকীমা এসে গজ গজ করতে করতে ফিরে যেত।
আর পারিনা বাবা ছেলেটাকে নিয়ে কোন গ্রহ থেকে এসেছে কে জানে।
দাঁত মেজে ঘরে যেতাম। কাকার রক্তচক্ষুর হাত থেকে কাকীমা বাঁচাত। আদর করে মুড়ি কিংবা পান্তা দিত কোনওপ্রকারে খেয়ে দে ছুট উনামাস্টারের ডেরায়।
আঙ্কেল এই পুকুরটা তোমার।
মাম্পির দিকে তাকালাম।
মাম্পি খালের দিকে আঙুল দেখাল।
এটা পুকুর না, নদী।
মাম্পি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। বুঝলাম বুঝতে পারেনি।
এটা হচ্ছে রিভার।
বোট নেই।
আছে, এখন দেখা যাচ্ছে না।
বোটে চড়বো।
মা পিঠে গুম গুম।
হি হি হি হি।
দুটো বক কোথা থেকে উড়ে এসে নদীর বুক ছুঁয়ে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে উড়ে গেল। ঠোঁটে ধরা আছে একটা মৃগেল মাছ।
মিকি দেখলি ক্রেণ ফিস ধরলো।
আমি মাম্পির দিকে তাকালাম। একটা জিনিষ দেখবি।
হুঁ।
ওদের দুটোকে ধরে বনের মধ্যে নিয়ে গেলাম।
আগে এই জায়গাটায় কতো বনচাঁড়ালের গাছ ছিল। এখন সবাই ভদ্র হয়ে যাওয়ায় ওরাও আর জম্মায় না। খুঁজে খুঁজে বেশ কয়েকটা পেলাম। খুব একটা বড়ো নয়।
চারদিক বেশ পরিষ্কার নোংরা নেই।
এদিকে আয়।
দুজনে কাছে এলো।
আমি উবু হয়ে বসলাম।
গাছ ডান্স করবে, দেখবি?
ড্যন্সিং ট্রি।
আমি হাসছি।
মিথ্যে কথা।
হ্যাঁরে।
দেখাও।
হাততালি দে।
মাম্পি হাত তালি দিতেই, বনচাঁড়াল নড়ে চড়ে উঠলো।
দু-জনের সে কি খিল খিল করে হাসি। সমান তালে ঘন ঘন হাততালি দিয়ে চলেছে।
বেশ মজা লাগছিল।
চল আর একটা জিনিষ দেখাব।
দু-জনকে ট্যাঁকে করে লজ্জাবতী গাছের কাছে নিয়ে এলাম। একটু ছুঁতেই পাতাগুলো কেমন ঝিমিয়ে পরছে। তাতেও ওদের ভারি মজা। আধ খাওয়া পেয়ারা হাতের মুঠোয়। পেয়ারা খাওয়া ভুলে গেছে।
চল আর নয়।
দুজনে কিছুতেই আসতে চায় না। জোর করে নিয়ে এলাম। দু’জনকে দুটো লজ্জাবতী গাছ তুলে দিলাম। দুটোকে বসিয়ে আমি ধীর পায়ে নদীর ঘাটে নেমে এলাম মুখ ধোয়ার জন্য। মুখ ধোয়া সবে শেষ করেছি।
আঙঙঙঙঙকেকেকেকেকলললললল।
মাম্পির তারস্বর চিৎকারে পেছনে তাকালাম।
বুকটা ধক করে উঠলো।
একটা মুখ পোড়া হনুমান ওদের সামনে বসে। তার বিশাল লেজ মাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছে। মাম্পির হাত থেকে পেয়ারা নিয়ে সে আপন মনে খাচ্ছে। আর এদিক ওদিক দেখছে।
দুজনেই হতবাক, ভয়ে সিঁটিয়ে গেছে।
আমি পরি কি মরি করে ছুটতে ছুটতে ওপরে উঠে এলাম। আমায় দেখে হনুমান লেজ তুলে দৌড়। মাম্পি, মিকি ছুটে এসে ভয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে।
দু-জনেই চিল চিৎকার জুড়ে দিয়েছে।
ওদের চিৎকার শুনে পুকুরের ওপার থেকে সবাই ছুটতে ছুটতে এদিকে এলো।
দু-জনেই খুব জোড় ভয় পেয়ে গেছে।
কোলে তুলে নিলাম।
দূর বোকা ওটা মাঙ্কি।
সবাই কাছে চলে এসেছে।
মাম্পি তখনও ফুঁপিয়ে চলেছে।
মিকির হাতের পেয়ারাটা তখনও রয়েছে। মাম্পির হাতে নেই।
চিকনা এদিক ওদিক তাকিয়ে প্রথমে ব্যাপারটা বুঝতে পারে নি। আমার দিকে তাকাল।
নিশ্চই হনুমান এসেছিল।
মাম্পি কাঁদতে কাঁদতেই বললো।
মাঙঙঙঙঙকি।
কনিষ্ক হেসে ফেলেছে।
মেয়েকে কোলে নিতে চাইলো, মাম্পি গেল না।
মিলি বুকে হাত দিয়েছে।
তোমার আবার কি হলো? কনিষ্ক বললো।
নীরু কট কট করে আমার দিকে তাকিয়ে।
তুই কোথায় ছিলি? চিকনা বললো।
মুখ ধুতে নদীর ঘাটে নেমেছিলাম।
দুটোকে সঙ্গে নিয়ে নামতে পারিস নি।
বুঝবো কি করে।
তোকে ওদের কে আনতে বলেছিল। নীরু রাগে গড়গড় করছে।
সুরো মূর্চ্ছা যাওয়ার অবস্থা। নীপার বুক তখনও ওঠানামা করছে।
আমি ওদের এই অবস্থা দেখে হাসবো না কাঁদবো।
চুপ করে গেলাম।
কাঁদবিনা চল তোকে আর একটা পেয়ারা দিচ্ছি।
আর তোকে আদিখ্যাতা করতে হবে না, এবার চল। নীরু চেঁচালো।
সকাল থেকে তুই বহুত বক বক করছিস। কিচ্ছু বলিনি। মাথায় রাখবি, সব তোলা থাকছে।
নীপা হেসে ফেললো।
আমি মম্পিকে কাঁধে নিলাম।
ও একটা পেয়ারা ছিড়লো।
আমাকে দে। মিকি বললো।
মাম্পি মুখ ঘুরিয়ে নিল।
ও-কি-রে, ওকে একটা দে—দাদা না। মিলি বললো।
ওরটা নেয় নি।
মিলি হেসে ফেললো।
দাঁড়া আমি তোকে দিচ্ছি।
চিকনা তর তর করে গাছে উঠে পরলো। একটার জায়গায় অনেকগুলো পারলো।
এই সময় কেউ আর চিকনাকে বাধা দিল না। সবার হাতেই পেয়ারা।
দুজনে আমার দুই কাঁধে। বাঁশবাগানের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফিরে এলাম।
কান্না থেমে গেছে।
আঙ্কেল বোট। মাম্পি বললো।
এবার কাঁধ থেকে নামিয়ে দেব।
মিলি ফিক করে হেসে ফেললো।
তুই আবার নৌক কোথায় পেলি? চিকনা বললো।
দূর নদী দেখে নৌকর কথা মনে পড়েছে। মনে পরা মানেই চড়াতে হবে।
ঘরে ঢোকার মুখে ওদের কাঁধ থেকে নামালাম।
নীপা একটু চা নিয়ে এসো।
নীপা আমার মুখের দিকে তাকাল।
অন্য কিছু খাও।
কেনো হরলিকস খাওয়াবে।
নীপা হসে ফেললো।
ঠিক আছে তুমি যাও, আমি নিয়ে যাচ্ছি।
নীপার পেছন পেছন মিলি, সুরো গেলো। এরা আমার পেছন ছাড়লো না।
মিলি ডাকলো মাম্পিকে, মুখের ওপর না বলে দিল।
ওপরে উঠে এলাম।
দেখলাম বিছানা পরিপাটি করে গোছান হয়ে গেছে। খাটে বসলাম। নীরুরা সোফায়।
তোরা কখন বেরিয়েছিস? কনিষ্কর দিকে তাকালাম।
চারটে নাগাদ। কনিষ্ক বললো।
আসার কি জরুরী দরকার ছিল?
হয়তো ছিল, না এলেও হতো।
আলমাড়ি খুলে ফাইলগুলো বার করে টেবিলের ওপর রাখলাম।
কখন বেরোবি?
কেন তুই যাবি!
হুকুম যখন হয়েছে, ফিরে যাই। আমার জন্য সকলে টেনসনে ভুগবে তা হয় না। স্যারের কাজের দিন নয় আবার আসবো।
সেই ভালো। নীরু হাসছে।
তুই তখন বললি বিপি বেড়ে গেছিল।
কনিষ্ক আমার মুখের দিকে তাকাল।
কাল সারাটা দিন বেশ ছিলাম। হঠাৎ ওই সময় শরীরটা কেমন আনচান করে উঠলো। বেশ গরম লাগছিল। এই ব্যাপারটা আমার এখন প্রায়ই হচ্ছে। কেন বলতে পারিস?
এটা এই সময় হয়। তুই এখনও আন্ডার ট্রিটমেন্ট। যা করছিস জোড় করে করার চেষ্টা করছিস। শরীর সেটা পারমিট করছে না।
ঠিক আছে, তিনটে নাগাদ বেরবো।
তুই একটু কেয়ারে থাকলে এখানে থেকে যেতে পারিস।
না, থাক। চিকনা।
চিকনার দিকে তাকালাম।
একবার সুবীরকে ফোন করে আমাকে দে।
চিকনা ফোনটা পকেট থেকে বার করলো।
আমি খাটে বসলাম। মাম্পিরা টেবিলের জিনিষ নিয়ে ঘাঁটা ঘাঁটি শুরু করে দিয়েছে।
বাসু কাল রাতে শেষ পর্যন্ত কি হলো।
সব মিটে গেছে।
ব্যাপারটা সহজে মেটার ছিল না। মিটল কি করে সেটাই জানতে চাইছি।
ওরা মেনে নিয়েছে।
মেনে নিল, না জোর করে মানালি।
চিকনা হাসছে।
হ্যালো, ধরো অনি তোমার সঙ্গে কথা বলবে।
চিকনা ফোনটা আমার দিকে এগিয়ে দিল।
সুবীর।
হ্যাঁ দাদা।
একটা কাজ করতে পারবে।
বলুন।
আজকের দিন পর্যন্ত একটা ব্যালেন্স সিট টেনে রাখতে পারবে। আমি তিনটে নাগাদ কলকাতা ফিরে যাব।
আজই ফিরবেন!
স্যারের শ্রাদ্ধের দিন আবার আসবো।
আপনি এই পথেই যাবেন।
হ্যাঁ। তুমি প্রিন্ট করে রেখো, যাওয়ার পথে পিক আপ করে নেব।
ঠিক আছে।
রাখছি।
চিকনার হাতে ফোনটা দিলাম।
বাসুর দিকে তাকালাম।
কাল রাতে এখানে ছিলি না বাড়ি ফিরেছিলি।
বাসু হাসলো।
হাসলি যে।
এরপর বলবি রাতে কোন ডাক্তারকে ধরে এনেছিলাম।
সেরকম বুঝলে স্যারের বাড়ি থেকে তোদের বলতাম নার্সিংহোমে নিয়ে যেতে। সেটা যখন বলিনি তখন আমি বুঝেছিলাম ঠিক আছি।
তোকে আমরা সেই অবস্থায় চোখে দেখিনি। স্বাভাবিক একটু ভয় পেয়েছিলাম। হিতে বিপরীত যাতে না হয় তাই জন্য খবর পাঠিয়েছিলাম।
মীরচাচারা নিশ্চই অনেক রাত পর্যন্ত ছিল?
তুই কি সব গেইজ করছিস?
না তোদের চোখমুখ বলছে।
নীরু মুখ ঘুরিয়ে হাসছে।
হারামী হাসি পাচ্ছে। কলকাতা চল সরু মুলিবাঁশ রেডি করে রেখেছি।
কেন তোকে বলি নি, নিয়ম করে ওষুধটা অন্ততঃ খাবি। চেঁচিয়ে উঠলো।
আমি খাই নি?
টাইমে খাস নি।
ওরা সবাই সুস্থ আছে। আবার বাসুর দিকে তাকালাম।
বাসু হেসেই চলেছে।
চিকনা মুখ ঘুরিয়ে নিল।
আমি এখানে অসুস্থ হয়ে পরেছি। খবরটা নিশ্চই চেপে যাস নি। শ্যাম পর্যন্ত অবশ্যই খবর গেছে। ছুড়কি ওখানে এই খবরটা পেয়ে আনন্দে হাঁড়িয়া খেয়ে নেচেছে, তা নিশ্চই হয় নি।
তোর ওসব জেনে লাভ নেই। ব্যাপারটা গ্রামের, তুই যতদূর করেছিস ঠিক আছে। বাকিটা আমরা মিটিয়ে নিচ্ছি।
সে তো কাল রাতেই মিটিয়ে নিয়েছিস। নিশ্চই আমার জন্য ফেলে রাখিস নি।
নীপারা সবাই ঘরে ঢুকলো।
শুরু করে দিয়েছে। মিলি বললো।
তারাতারি চা দিয়ে মাথা ঠাণ্ডা করো। নীরু বলে উঠলো।
ও বাবা, তুমি হঠাৎ পাল্টি। সুরো বলে উঠলো।
কনিষ্ক হাসছে।
মিলি তাকাল কনিষ্কর দিকে, ইশারায় বললো, আবার কি হলো।
অনি নীরুর জন্য মুলিবাঁশ রেডি করেছে। কলকাতায় গিয়ে উপহার দেবে।
মাম্পি, মিকি ওদের ঢুকতে দেখে আমার কাছে এগিয়ে এলো।
এই তোরা ওখানে গেলি কেন। সুরো বলে উঠলো।
দু-জনে সোজা খাটে উঠে আমার পেছনে গিয়ে গলা জড়িয়ে ধরেছে।
কি তেঁয়েটে দেখ নীপা। মিলিদিরটা সবচেয়ে বেশি। সুরো বললো।
নীপা হাসছে।
চায়ের কাপ নিয়ে এগিয়ে এলো।
তোমার বর ফোন করেছিল? আমি নীপার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছি।
সব জেনে বসে আছো না?
আমার কথার উত্তর দিলে না।
করেছিল, হয়েছে। নীপা হে হে করে উঠলো।
তারাতারি সব রেডি করো, আমি চিকনাকে নিয়ে একটু আধঘণ্টার জন্য বেরবো। তারপর এসে খেয়ে বেরিয়ে পরবো।
চায়ের কাপটা নীপার হাত থেকে খাটের ওপর রাখতে মাম্পি, মিকি বিস্কুটগুলো ভাগা ভাগি করে তুলে নিলো।
নীপা দেতো দুটোর মাথা ঠুকে। সুরো বললো।
তোর গা জ্বালা ধরছে কেন। তোরটা নিয়েছে।
ওই জন্য উচ্ছন্নে যাচ্ছে।
যেতে দে সময় হলে আবার রি-ব্যাক করবে।
সুরো চুপ করে গেল।
দু-জনেই কাপে বিস্কুট ভিজিয়ে আমাকে একবার যাচলো না বলতে নিজেরা খেতে শুরু করে দিল।
ভালই তৈরি করেছিস। কনিষ্ক চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললো।
এই জন্য তো বলি….। নীরুর কথা শেষ হলো না।
কনিষ্ক চেঁচিয়ে উঠলো, গরম চা গায়ে ঢেলে দেব।
আমি মিলির দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
ওরাও হাসছে।
মাম্পি হনুমানটা তখন কি বললো রে? আমি চায়ে চুমুক দিলাম।
মিকি চেঁচিয়ে উঠলো।
ওকে চুপ করতে বললো, ও কেঁদে ফেললো।
তুই তো ছেলে, হনুমানটার সঙ্গে মারপিট করতে পারলি না।
ইয়া বড়ো।
আমাকে পাপ্পি দিয়েছে তোকে দিয়েছে। মাম্পি বললো।
মিকি একবার মাম্পির দিকে তাকালো। কি উত্তর দেবে ঠিক ভেবে উঠতে পারছে না।
আমি হাসছি।
কালকে মনিমা পিঠে করেছিল তোমার জন্য।
নীপার দিকে তাকালাম।
এখন একটা নিয়ে আসতে পারো। বাকিটা টিফিন কৌটে ভরে দাও, নিয়ে যাব।
নীপা, নীরুর দিকে তাকাল।
এখন যা খুশি দিতে পার। হাতের বাইরে যেতে দেব না। আমরা কাছে থাকলে কোনও অসুবিধে নেই।
নীপা হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল।
(আবার আগামীকাল)