জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১৪৯ নং কিস্তি
অনেকক্ষণ থেকে তোমরা ফুসুর ফুসুর গুজুর গুজুর করছো। ব্যাপারটা কি বলো?
যাও বড়দের কথায় ছোটদের থাকতে নেই। আমি চোখ পাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললাম।
দিলো আমার পেটে চিমটি। মাংস তুলে নেব—
আমার আউউ চিৎকারে অনিকারা এদিকে তাকালো। এগিয়ে আসছে।
মিত্রা তখনও আমার পেটে দুটো আঙুল গায়ের জোড়ে সিঁটিয়ে রেখেছে।
দেখ আমার গালটা কিন্তু এখনও….।
মিত্রা চিমটি ছেড়ে আমার মুখটা চেপে ধরলো।
প্লিজ প্লিজ আর কোনওদিন হবে না। মেয়ে আসছে এদিকে।
আমি ওঁ ওঁ করছি।
কি হয়েছেগো বাবা?
মিত্রা আমার পেট ছেড়ে দিয়ে জড়িয়ে ধরল। মুখটা লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠেছে।
শুর শুরি লাগছে। চেঁচিয়ে উঠলাম।
তুমি ভীষণ স্বার্থপর। মিত্রা বড়োমার দিকে তাকালো।
বড়োমা চোখ ছোটো ছোটো করে হাসছে। আমি কি করলাম—
তুমি সব সময় ওর দিকে ঝোলটেনে কথা বলো।
অনিকা আমার দিকে তাকিয়ে।
দেখ না তোর মা এমন চিমটি কাটলো। জ্বালা জ্বালা করছে।
সবাই হাসছে। কেউ গম্ভীর নেই।
বৌদি চা দাও।
আমি সোফার কাছে এলাম। কনিষ্কর কাঁধে হাত রেখে ঝাঁকুনি দিলাম।
কিরে শরীর ঠিক আছে—
আমার ঠিক আছে, নীরু গণ্ডগোল করেছে।
কেন, বয়েস তো হয়েছে। দিন দিন তো আর কমছে না—নীরু খ্যাঁক করে উঠলো।
কিরে নীরু, কাল আবার কি করলি! অমি বললাম।
অভ্যেস না থাকলে যা হয় আর কি—শ্রীপর্ণা বললো।
নীরু, শ্রীপর্ণার দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো, আর দাঁত কেলিও না।
যাআআ বাবা, বৌয়ের চাঁদবদন দেখে তোর গা জ্বলছে কেন। বটা বললো।
আমি নীরুর দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকালাম।
সকালে ওই তো প্রথম ক্যাচালটা পাকালো।
নীরুর কথায় আমি হাসছি।
দিদি—দিদি ও না….।
ও না…. মানে! আমি বললাম।
তোকে জানতে হবে না।
বাবা, নীরু মামা কালকে বাথরুম খুঁজে পায় নি। মামীর গায়ে….।
সারাটা ঘর হাসিতে ফেটে পরলো।
কিরে ব্যাটা!
নীরু হাসি মুখে গম্ভীর থাকার চেষ্টা করছে।
তবে তুই একা নয়, সবাই কাল রাতে বাথরুম খুঁজে পায়নি।
নীরু আমার দিকে বিষ্ময় চোখে তাকালো।
কনিষ্ক, বটা তোকে কিছু বলেছে?
ওরাই তো সব মাটি করে দিলো।
আমি কাল রাতে ভিডিও আর স্টিল তুলে রেখেছি। এক্সক্লুসিভ। তোকে দেব। পারলে স্ন্যাপ শট নিয়ে প্রিন্ট করে পকেটে রেখে দিবি। দেখবি বটা, কনিষ্ক তোকে সারাজীবনে কিছু বলবে না। বললেই শুধু পকেট থেকে তুলে একটুখানি দেখাবি, দেখবি চুপ।
আমি কথাটা ক্যারি কেচার করে বললাম।
কথা বলা শেষ হয়নি। মিলি আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পরে মুখ চেপে ধরলো।
অনিদা খুব খারাপ হয়ে যাবে। ইসিদি….।
দেখলাম মিত্রা, টিনা, নীপা, তনু তেরে এসেছে।
নীরুর চোখ চক চক করে উঠলো।
সত্যি! এই না হলে তুই আমার গুরু।
কনিষ্ক, বটা, বরুনদারা হাসছে।
নীরু আমার পায়ের কাছে বসে পড়েছে।
আমি তোকে একলাখ টাকা দেব। মালটা দে। সকাল থেকে আমাকে যেন বাটনা বেটে দিচ্ছে সবাই।
মাত্র একলাখ!
তোকে দু-লাখ দেব।
মিলির দিকে তাকালাম।
আমাকে শুধু প্রাণে মারতে বাকি রেখেছে।
দেখ ইজ্জত কা সওয়াল। নীরুর দিকে তাকিয়ে আছি।
আমি তোমাকে তিনলাখ দেব। তনু বললো।
কিরে নীরু, একলাখ বেরে গেল।
চার লাখ। টিনা বললো।
চার লাখ এক, চারলাখ দুই….। আমি চেঁচাচ্ছি।
দশলাখ।
পেছন দিকে তাকালাম। মিত্রা মিটি মিটি হাসছে।
নীরুকে এর ওপর উঠতে বল।
দম নেই অনি। ঘটিবাটি বেচে চার পর্যন্ত উঠতে পারি।
তাহলে পাবি না। দেখ সারাজীবন তোকে সেফটি দেব।
না হবে না।
নীরু শুকনো মুখে আবার সোফায় বসলো।
সকলে হেসে কুটি কুটি।
কি দেখতে লাগছিল জানিস নীরু, আমি যেন স্বর্গে পরীদের মাঝখানে….।
মিত্রা মুখ চেপে ধরেছে। কোথা থেকে সুরো এসে চিমটে ধরেছে, বনি আর একপাশে কাতাকুতু দিচ্ছে। নীপা, তনু, ইসি কেউ বাদ নেই।
আর বলবি।
মুখ দিয়ে গোঙানির শব্দ ছাড়া কিছু বেরচ্ছে না।
ওর মোবাইলটা নিয়ে আয় আগে ডিলিট করি।
এই তো পকেটে নীপা চেঁচিয়ে উঠলো।
বনি ছোঁ মেরে মোবাইলটা পকেট থেকে তুলে নিল।
ভাবু ছোড় দো ম্যায় সুরো সামহা লেঙ্গে।
মিত্রা মুখ ছাড়লো।
হাসতে হাসতে সকলের চোখে জল বেরিয়ে গেছে।
তাকিয়ে দেখলাম বড়োমারা সব পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে।
কিরে রোজগার হলো? বৌদি বললো।
মিত্রা তেড়ে এলো, আগে মোবাইলের পাসওয়ার্ড বল।
খোল না খোল।
আমরা এখন দলে ভাড়ি। তোর শরীরে একটুও মাংস থাকবে না। সব খুবলে নেব।
মরে যাব।
মরে দেখা।
আবার সকলে এঁটুলে পোকার মতো ঘিরে ধরলো।
চেঁচামিচি হই হই।
গেটের মুখে দাদা, অনিমেষদা, ডাক্তারদাদা।
অনেকক্ষণ থেকে হইচই করছে ব্যাপারটি কি? দাদা বললো।
তোমার দরকারটা কি শুনি—বড়োমা বললো।
দাদা ডাক্তারদাদার দিকে তাকাল।
অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
উঠেই শুরু করে দিয়েছিস।
আগে পাসওয়ার্ড দে নাহলে মোবাইল পাবি না। সাধু পুরুষ হয়েছো। মিত্রা তরপাচ্ছে।
ইসলামভাই, শুভ, সুন্দর, অনন্য বেশ কয়েকটা ব্যাগ নিয়ে ঢুকলো। পেছন পেছন নেপলা, রতন।
আমাকে সবাই ঘিরে রয়েছে দেখে নেপলা একবার উঁকি মারলো। মিত্রার দিকে তাকালো।
দাদা নিশ্চই বাজার গরম করে দিয়েছে।
দাদা না কচু। মিত্রা তরপালো।
নেপলা হাসতে হাসতে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
ঝামেলা করছে যখন মোবাইলটা অন করে দে-না। কনিষ্ক হাসতে হাসতে বললো।
দেখছিস নীরু, কিরকম ওষুধ দিয়েছি, সাং সাং কাজ শুরু হয়ে গেছে।
হাতে পাবো না, এই যা দুঃখ।
অনি কি এক জায়গায় মাল রাখে। ভাঙিয়ে খেতে হবে না। কনিষ্ক বললো।
সত্যি!
অনিসা। মিত্রা গম্ভীর গলায় বললো।
বলো।
নীরুমামার গলাটা টিপে ধর।
কেন অনিকে কিছু বলতে পারছো না। ও তো তোমার….।
মিত্রা হেসেফেললো।
বৌদি চা নিয়ে এলো।
ওরে ও ছবি তোলেনি। ওঘর থেকে ফিরে এসে বললো, ছোটোমা তুমি রাতে ও ঘরে শোও, আমি বড়োমার কাছে শোব। তারপর আমি দেখেছি আর ছোটো রাতে ছিল।
মিত্রা অবিশ্বাসী চোখে বৌদির দিকে তাকিয়ে।
তুই বিশ্বাস কর। তুই দিদিকে, দামিনীকে জিজ্ঞাসা করতে পারিস।
বৌদির হাত থেকে চায়ের কাপটা নিলাম।
কনিষ্ক, বৌদির দিকে তাকিয়েছে।
বৌদি ও একা?
এই তো খেলি!
এতক্ষণ যা হলো গলা শুকিয়ে গেছে।
দাঁড়া হাতের কাজ শেষ করি আগে।
বৌদি চলে গেল।
মিত্রারা আমার ঘারের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে।
চায়ে চুমুক দিয়ে বরুনদার দিকে তাকালাম। বরুনদা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
সুরো।
বলো।
পুঁচকে দুটোকে ডাক।
প্লিজ তুমি আর বিস্কুট চা খাইও না। সকাল থেকে দুধ খাওয়াতে গিয়ে হিমসিম খেয়ে যাই। বাধ্য হয়ে বর্ণভিটা কিনে এনেছি।
পিপটু কো ভি শিখা দিয়া। ম্যায় চকলেট ফ্লেভার কমপ্লান লে কে আয়া।
নীরু খিক করে উঠলো।
কিরে এই খিকটা কার উদ্দেশ্যে কনিষ্ক না মিলি। বটা বললো।
যা বুঝিস। প্লেটে ঢেলে একটু দে। সকালের বিজনেসটা মার খেয়ে গেল।
নীরু আমার দিকে তাকাল। আমি নীরুর দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছি।
কিসের বিজনেস?
চারলাখে মালটা এলে দশলাখে মালটা বেচতে পারতাম।
বটা উঠে নীরুর পাশে গেল।
কেন কেন আমার পাশে কেন, বসার মতো কাউকে পাচ্ছিস না।
বটা একবার শ্রীপর্ণার দিকে তাকাল।
তুমি যাও।
ছাড়, এখন ওর পেছনে আর কাঠি করিস না। আমি বললাম।
অনি বললো বলে ছেড়ে দিলাম। বটা বললো।
অনি না বললেও ছাড়তিস। তুই কি আমার পর।
অনিকা এসে আমার পাশে বসলো।
মামা।
নীরুর হাতে চায়ের কাপটা এগিয়ে দিলাম।
কিরে?
আমার মাথাটা ধরে কানটা মুখের কাছে রাখলো।
পক্কে, ঘণ্টা কাজে যাবে না?
এই কানে কানে না জোরে বল। মিত্রা বললো।
অনিকা, মিত্রার দিকে তাকিয়েছে।
না গেলে কিছু বলবে?
ম্যানেজারটা ভীষণ মুখ করে।
মিত্রা ধরে ফেলেছে। হেসে ফেললো।
অনিকার গালটা টিপে দিলাম। যা মামীকে বল ফোন করে দেবে।
ছাড় তো ফোন করতে হবে না। মিত্রা বললো।
আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম।
খাবে কি? তাহলে তুই একটা চাকরি দে।
চাকরি করতে হবে না। দু-দিন যাক তারপর দেখা যাবে।
অনিকার দিকে তাকালাম। ওই তো মামীমা সব বলে দিল। তুই?
আমি তোমার কাছে থাকবো।
পিএ।
মাথা দোলাচ্ছে।
কাজে ভুল হলে মারধোর খাবি।
অনেক খেয়েছি। আর একটু নয় খাবো।
দিদি সরতো, বাবার সঙ্গে একটু কথা সেরে নিই।
অনন্য, সুন্দর অনিকার ঘারের ওপরেই বসে পরলো।
কিরে লেগে টেগে যাবে।
লাগবে না। শোনো না। অনন্য বললো।
কান খোলা আছে বল?
মুরগি একটায় আট পিস করেছি। তুমি খুব ভালো বাটার ফ্রাই করতে পারো, আজকের দিনটা। প্লিজ।
মিত্রা আমার গালদুটো খামচালো। শুনতু মনা, শুনতু মনা। নে এবার ছেলেকে না বল।
অনিসা আমার থুতনি তুলে ধরেছে পেছনের দিকে, বাবা প্লিজ।
বুদ্ধিটা কে দিল? অনন্যর দিকে তাকালাম।
ভজুমামা বললো।
ভজুরাম। চেঁচালাম—
দাদার ঘরের সামনে থেকে ভজু সারা দিল।
নাগো, আমি বলিনি। বড়োমা, মা বলেছে।
হিসেব করে সব নিয়ে এসেছিস?
তুমি যদি করো, বড়োমার কাছ থেকে পয়সা নিয়ে নিয়ে আসি, মা অন্যরকম করে করে।
ভজু কাছে এসে দাঁড়ালো।
যা নিয়ে আয়। এইগুলোকে কাজে লাগাবি।
সুন্দর হাতটা ওপরের দিকে তুলে একবার কোমড় দোলালো। হাতটা বাড়িয়ে দিল।
কি হলো?
একবার সেক হ্যান্ড করি, এতো তারাতারি রাজি হয়ে গেলে। মা বলেছিল তুমি রাজি হবে না।
মার সঙ্গে করে নে। তবু হাতটা বাড়িয়ে দিলাম। একবার জোড়ে ঝঁকিয়ে দিয়ে চলে গেল।
অনি আমি যদি তোর সঙ্গে হাত লাগাই। নীরু বললো।
তাহলে একটাও পাবি না। নীরুর সুরে সুর মিলিয়ে কনিষ্ক বললো।
ছবিটা হাতে পেলাম না। তোর ভাগ্য ভালো। না হলে….।
নীরু আমার দিকে তাকাল, কিরকম দিলাম বল।
কিগো ভুলে গেছ? রতন গেটের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
না ভুলি নি। সবাই এসেগেছে?
আবিদ একটু পরে আসছে।
কাল রাতে কখন শেষ হলো?
দুটে নাগাদ।
চল ওঘরে গিয়ে বসি।
বাগানে বসলে অসুবিধে আছে?
একবারে না।
রান্না করবে কখন?
রেডি হতে হতে একঘণ্টা লেগে যাবে, ততক্ষণে তোদের সঙ্গে কথা বলে নিতে পারবো।
ভজু এসে কাছে দাঁড়ালো।
কিরে আবার কি হলো?
তুমি একবার চলো।
কেনো?
অনেক মাংস হিসেব পাচ্ছি না।
রতনের দিকে তাকালাম।
তোরা যা আমি যাচ্ছি।
আমি উঠে দাঁড়ালাম, নীরুও উঠে দাঁড়াল।
যতই অনির পেছন পেছন ঘুরিস, একটার বেশি পাবি না।
নীরু একবার বটার দিকে কট কট করে তাকালো।
আমি রান্নাঘরের কাছে আসতেই সুরো জড়িয়ে ধরলো।
কিরে এখনও ঘোর কাটেনি?
বাবা আছে।
বাবা কি বোকা তাই না। কিছুই জানে না।
দামিনীমাসি, বৌদি হাসছে।
ইসলামভাই দাঁড়িয়ে আছে।
ক কিলো নিয়ে এসেছো?
নয়।
পাগল নাকি। করতে রাত হয়ে যাবে।
তুই হাত লাগিয়েছিস দু-ঘণ্টায় রেডি।
মাংসর দিকে তাকালাম। আর একটু ছোটো করতে পারতে।
তোর ছেলেদের বল। আমি শুধু পয়সা দিয়েছি।
রান্নাঘরে গিয়ে সব দেখে ভজুকে বলে দিলাম এই জিনিসগুলো নিয়ে আয়।
এখন পুদিনা কোথায় পাবো?
চল আমি যাচ্ছি। ইসলামভাই বললো।
অনিকা, অনিসা দুজনেই চেঁচিয়ে উঠলো আমরা যাব।
ইসলামভাই হাসছে।
মিত্রাদের বললাম তোরা একটু হাত লাগা। সুরো লতানো গাছের মতো জড়িয়ে রয়েছে।
আর একটা রিকোয়েস্ট?
আবদার না? খেতে দিলে শুতে চাও।
আজকের দিনটা। তুমি তো আমার বিয়েতে ছিলে না। আর একটা মেনু।
সুরোর মুখের দিকে তাকালাম।
বুঝলাম আমার মুখটা সামান্য হলেও পরিবর্তন হয়ে গেল। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে।
তোর বিয়েতে সারাদিন ছিলাম, দুর্ভাগ্য আমাকে তুই চিনতে পারিস নি।
ফ্রায়েড রাইসটা একটু বানিয়ে দাও। সুরোর চোখে মুখে আর্তি।
প্লেন।
না, মিক্সড।
ঠিক আছে তোরা কেটে কুটে ধুয়ে রেডি কর। আমি বানিয়ে দেব।
সুরো আমার বুকে চুমু খেল।
দিদি ঘুরে এসে চা খাবো। ইসলামভাই বললো।
কতটুকু আর সময় লাগবে খেয়ে যাও। বৌদি বললো।
ইকবালভাইকে বলেছো? আমি বললাম।
বলতে হবে না চলে আসবে।
আমি ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলাম। বৌদি পেছন থেকে ডাকলো।
তুই কিছু খাবি না?
বাগানে রতনদের সঙ্গে একটু বসছি, পাঠিয়ে দাও।
গতকাল যেখানে বসেছিলাম দেখলাম সেখানেই সকলে গোল করে বসেছে। চাঁদ, চিনাদের সঙ্গে ওমরকে দেখলাম। কাছে আসতে হেসে জড়িয়ে ধরলো।
কালকে কোথায় ছিলি? অতক্ষণ থাকলাম, দেখতে পেলাম না।
যা রাগ হচ্ছে না আবিদটার ওপর।
কেন, ও আবার কি করলো!
আমাকে কিচেনে ঢুকিয়ে দিয়েছিল।
চল।
চাঁদ, চিনার দিকে তাকালাম।
কিরে ব্যাটা এখনও চোখ লাল?
ঘুম হয় নি।
আকণ্ঠ খেলে কি আর ঘুম হয়। মানুষ বেহুঁস হয়ে থাকে।
ওরা আমার কথায় হাসছে।
রতন।
বলো।
ভানু, মীরচাচাকে দেখতে পাচ্ছি না?
তোমাকে দেখে লুকিয়ে লুকিয়ে থাকছে।
চাঁদ।
চাঁদ আমার দিকে তাকালো।
তোদের কাগজপত্র নিয়ে এসেছিস?
রতনদাকে দিয়েছি।
রতনের দিকে তাকালাম।
বল রতন ওদের কি খবর?
খুব একটা ভালো নয়।
পকেট থেকে কত লাগাতে পারবে।
ম্যক্সিমাম এক কোটি।
ধ্যুস ওতে কি হবে। তার থেকে দালালি করলে বেশি কামাতে পারবে।
তুমি কি আফতাবভাইয়ের প্রজেক্টের ব্যাপারে কথা বলতে বসছো?
তাহলে কি!
না, মানে—
তোরা কি ভাবলি?
নেপলা, রতনের দিকে তাকাল।
রতনদা তুই দাদাকে কথা দে। চাঁদ বললো।
বেশি বকিস না। কাজের সময় দাদা চাঁদ, চিনা, রতন কাউকে চেনে না। টাইমে তুলতে না পারলে হাওলা খারাপ করে ছেড়ে দেবে মাথায় রাখিস।
নেপলারা ফাইনান্স করুক ইন্টারেস্ট দিয়ে দেব। চাঁদ বললো।
দাদা সে ব্যাপারে কোনও কথা বলছে, তাহলে প্রথমেই বলে দিতো।
চাঁদ, চিনা দুজনেই রতনের দিকে তাকিয়ে।
তাছাড়া মাথায় রাখবি প্রজেক্ট দাদা অপারেট করবে, জালি কিছু করতে পারবি না।
প্রশ্নই নেই।
তাহলে তুই, সাগির, নেপলা যে একটা ফার্ম করলি।
ওটা আলাদাভাবে কাজ করবো।
আমরা ওই ফার্মের আণ্ডারে কাজ করবো।
হবে না।
তোরা সবাই মিলে কতো ফেলতে পারবি। আমি বললাম।
ম্যাক্সিমাম দশ।
কতদিন ফেলে রাখতে পারবি।
খুব বেশি হলে, পঁয়তাল্লিশ দিন। রতন বললো।
ধর তোকে অর্ডার দেওয়া হলো হাজার লড়ি বালি ফেলতে। সময় দেওয়া হলো সাত দিন। কলজেতে দম আছে।
সব সময় দম থাকবে তার কি মানে আছে, দম করে নেব। তোমাকে যখন প্রথম দেখি ভয় পেতাম না। বরং তোমাকে মাঝে মধ্যে চমকেছি। রাজনাথ কেশে তোমাকে প্রথম ভয় পেলাম। সেই যে ভয় পেলাম এখনও পাই।
দাদা। চিনার দিকে তাকালাম। ইশারা করলো।
পেছন ফিরে তাকালাম। দেখলাম অনিকা ট্রে নিয়ে আসছে।
কিরে তোরা এখনও যাস নি?
বাবা খাচ্ছে। খাওয়া হলে বেরবে।
রতন একটা চেয়ার আন খাবারটা রাখুক। তোরা খেয়েছিস?
কখন খাওয়া হয়ে গেছে। নেপলা বললো।
অনিকা চেয়ারে খাবরটা রাখলো।
মনিমা বললো খাবার পর চা দেবে সকলকে।
ঠিক আছে।
তোমাকে জলের বোতল দিয়ে যাই।
নিয়ে আয়।
অনিকা চলে গেল।
ওমর তাকিয়ে আছে অনিকার দিকে।
কালকে আর একটু হলে কেশ জন্ডিস হয়ে যেত। ওমর হাসছে।
চিনাকে দানা করে দিতিস?
দূর জানতাম নাকি ওটা চিনার ঠেক। কতদিন যাইনি ওইপাশে।
তারপর।
একটা লুচি মুখে তুললাম।
তোমাকে শুনতে হবে না। তুমি সব জানো।
তোরা কি আমাকে ভগবান ভাবিস?
না। তোমার বুদ্ধি আমাদের থেকে বেশি।
সব একটা করে তুলে নে। নেপলার দিকে তাকালাম।
তুমি খাও। রতন বললো।
ওরে বৌদি তোদের হিসাব করেই দিয়েছে। অনি যে এতগুলো খাবে না। সেটা জানে।
রতনরা সবাই একটা করে নিল।
নেপলা।
বলো।
কাল একবার শ্যামের কাছে যেতে পারবি?
কেন!
ও কতোটা ম্যানপাওয়ার দিতে পারবে? আমি বাইরে থেকে লোক নিয়ে কাজ করতে চাইছি না।
বাইরের লোক তোমাকে নিতেই হবে।
তুই যেটা বলছিস সেটা ঠিক আছে। আমি স্টেটের বাইরের লোক নিতে চাইছি না।
সেটা আলাদা প্রশ্ন।
টেকনিক্যাল লোক আফতাবভাই ঠিক করবে। আমাকে যদি দায়িত্ব দেয় তখন ভেবে দেখব।
প্রজেক্ট কতো কটির? রতন বললো।
হাজার ছয়েক হবে।
ধ্যুস। তোমাকে দশকটির গল্প দিলাম। ও-তো দশটাকার সমান।
মিনিমাম একশোর ব্যবস্থা কর। মাস তিনেক সময় পাবি। না হলে টানতে পারবি না। আর একটা কাজ করতে পারিস—
বলো।
যেখানেই প্রজেক্ট করিনা কেন, মাঠভাটির ইঁট বানাবো। যতোটা তৈরি করা যায় আর কি।
ওমরের চাচার ইঁটভাঁটি আছে। রতন বললো।
কথা বলে নে। আমি কোনও জিনিষ ওয়েস্ট করতে চাই না।
নেপলা হাসছে। আমি খাচ্ছি।
একটা কথা বলবো। রতন বললো।
বল।
সবতো তোমার হাতে।
কে বললো?
জেনেছি।
ভুল। স্টেটের সঙ্গে কোলাবরেশন। আফতাবভাইয়ের শেয়ার বেশি থাকবে।
তুমি যদি পনেরো দিনে পেমেন্টের একটু ব্যবস্থা করো। বেশি না পার্ট। তাহলে একবার জানপ্রাণ দিয়ে লড়ে যাব। তোমার সঙ্গে এই কাজটায় থাকতে পারবো না, ভাবতেই খারাপ লাগছে।
আমি কি পাব?
তোমার কিসের অভাব বলো—
টাকার।
নিয়ে তো ইকবালভাইকে দেবে, নাহলে ফাদারকে দেবে। বাকিটা ভালোপাহাড়।
আমার হয়ে তোরা দিয়ে দিস।
কথা দিলাম।
তাহলে তোদের ব্যালেন্সসিট নিয়ে ব্যাঙ্কের সঙ্গে কথা বল। হিমাংশুকে বল প্রজেক্ট রিপোর্ট বানাতে। যখন প্রজেক্ট ওপেন হবে। আমি কোম্পানীর তরফ থেকে তোদের এতো টাকার কাজ দেব তার একটা সিকুরিটি চিঠি দেব।
রতন চেয়ার থেকে উঠে জড়িয়ে ধরলো।
হাতে যা সাদা টাকা আছে ব্যাঙ্কে ফিক্সড করতে আরম্ভ কর। যে ব্যাঙ্কে ফিক্সড করবি সেই ব্যাঙ্ক থেকে লোনের এ্যারেঞ্জমেন্ট করবি।
ধর ধর ধর ধর। রতন চেঁচিয়ে উঠলো।
চমকে ফিরে তাকালাম।
দেখি ওমর মাটিতে পড়ে আছে। চাঁদ, চিনা হেসে গড়িয়ে পরে।
কিরে কি করে পড়ে গেলি?
তখনও ওমর মাটিতে পড়ে আমি উঠে দাঁড়িয়ে ওর হাতটা ধরতে গেলাম।
দাঁড়াও দাঁড়াও ধরতে হবে না আমি উঠে পড়ছি।
এই তো বসেছিলি!
ওমর উঠে চেয়ারে বসলো।
কথাটা শুনে তোমাকে প্রণাম করতে যাচ্ছিলাম। পায়ে পা জড়িয়ে উল্টে গেলাম।
কেন, পরে প্রণাম করলে হতো না। নেপলা খ্যাঁকিয়ে উঠলো।
নেপলা দেখ ওর পায়ে কোথায় লাগলো। আমি বললাম।
লাগুক।
ওমর হাসছে।
প্রণামে বাধা পড়েছে, এখন ছুঁস না। নেপলা বলছে আর হাসছে।
দাদা।
ওমরের দিকে তাকালাম।
আমি যদি ছিটে ফোঁটা রতনদাকে দিই।
রতনদার সঙ্গে কথা বলে নে। আমি তো চাই তোরা কাজ কর। সব তো তোরা পারবি না। যতোটা সম্ভব কর।
রতনদা একটা কথা বলবো। চাঁদ বললো।
বল।
আমাদের সঙ্গে যারা আছে তাদের থেকে যদি টাকা তুলে ফিক্সড করি। তারাও লোন নেবে তাদের মাধ্যমেও কিছু কাজ তুলবো।
রতন হাসলো। ভালো বলেছিস।
একটা কাজ কর। নেপলা বললো।
কি বল। রতন বললো।
সুবীরকে ধর। এখন এখানে আছে। বসে একটু কথা বল। যদি সুবীর কোনও সাহায্য করতে পারে।
রতনের চোখ চক চক করে উঠলো।
সত্যিতো ঘরের লোক থাকতে বাইরের ব্যাঙ্ক নিয়ে চিন্তা করছি কেন?
অনিকা, অনিসা দুজনে চা নিয়ে এলো।
ওদের দিকে তাকালাম। বেশ লাগছে দুটোকে দেখতে। অনিসার হাত থেকে জলের বোতলটা নিয়ে ঢক ঢক করে কিছুটা জল খেলাম।
তুমি যাবে না? অনিসা বললো।
কোথায়!
আমাদের কাটা কাটি হয়ে গেছে।
যেগুলো আনতে বললাম।
ভাইদাদাই এবার বেরবে।
ওগুলো নিয়ে আয়, যাচ্ছি।
ওরা সকলকে চা দিয়ে চলে গেল।
চা খেতে খেতে ওদের সঙ্গে একটু কথা বললাম। তারপর নেপলাকে বললাম, এবার তোরা কেটে পর, আমি রতনের সঙ্গে একটু কথা বলি।
নেপলা হাসছে।
কেন আমরা থাকলে কথা বলা যাবে না।
বলা যাবে না বললে ভুল, তোদের এখন শুনতে হবে না।
ওরা তিনজনেই উঠে দাঁড়ালো।
একটা সিগারেট দিয়ে যা।
নেপলা পকেট থেকে প্যাকেট বার করে আমার হাতে দিল।
রাখো পড়ে নিচ্ছি।
ওরা চলে গেল।
রতনের দিকে তাকালাম। এবার বল খবর কি?
সবকটা গন্ডগোল হয়ে রয়েছে।
কিরকম?
তুমি কি কোনও খোঁজ খবর নাও নি?
ভাষা ভাষা। তাই তোকে দায়িত্ব দিলাম।
দু-টো জমি দাদাভাই গুবলেট করেছে। আর একটা চাঁদের লোক। আর একটা সুনীতদা।
ওটা এখনও বেঁচে আছে?
বহাল তবিয়েতে। ওইই তো অনাদিদার বেস্ট ইনফর্মার।
গুম হয়েগেলাম। চুপচাপ বসে থাকলাম।
চুপ করে গেলে কেন?
সুস্থ ভাবে নির্বিবাদে বাঁচতে চাই। ওরা সে অধিকারটুকু কেরে নিচ্ছে। তোর কথা শেষ কর।
চাঁদের লোক জাল দলিল বার করে জমিটা বেচেছে, ভদ্রলোক একজন ব্যবসায়ী। অনিমেষদাদের পার্টির সঙ্গে খুব ভাল রিলেশন।
কি সাম দাধিয়া?
হ্যাঁ। রতন হাসছে। তুমি জানলে কি করে?
ঠিকানাটা দেখার পর একদিন ওই পথে গাড়ি নিয়ে গেছিলাম। বাড়ির গায়ে লেখা আছে দাধিয়া।
তুমি আমার পেছনেও লোক লাগিয়েছ?
না-রে বিশ্বাস কর, চাঁদের লোককে বলেছিস?
চাঁদকে আওয়াজ দিয়েছি। জমির দলিলের জেরক্স কপি দিয়েছি। ও বলেছে একটা ব্যবস্থা করবে।
মিউটেশন হয়ে গেছে।
হ্যাঁ। ওর মেয়েটার সঙ্গে…..।
পিকু জড়িয়ে আছে।
না।
তাহলে?
পিকু ল্যাজে খেলছে। ও মনে হয় কোনওভাবে জমিটার ব্যাপারে জেনেছে।
বাড়িতে যাতায়াত আছে?
একদিন গেছিল।
আলাপ কোথায়?
ক্লাবে।
সুনীত।
জমিটা ডাক্তারের ছিল। জমিটা যে পরে ম্যাডামের নামে ট্রান্সফার হয়েছে, সেটা রেকর্ডে নেই। ব্যানার্জীর সম্পত্তি সুনীত পেয়েছে। সেটাও একটা জাল উইলের মারফৎ। তারপর বেচেছে।
ব্যানার্জীর সব সম্পত্তির মালিক মিত্রা!
জানি।
ওখানে কি হয়েছে?
ফ্ল্যাট বাড়ি হয়েছে।
বাঃ অতীব সুন্দর।
রতন হাসছে।
তুই হাসছিস, আমি ভাবছি।
ভেবে কি করবে।
ঠিক। আর দুটো?
শুনতে হবে না আমার ওপর ছেড়ে দাও।
ছেড়ে তো দিয়েছি, তবু একবার শুনি।
বারাসাতের টা যে নিয়েছিল সে এখনও কব্জা করতে পারে নি। কলনী তৈরি হয়ে আছে। নাম ভগত সিং কলনী।
এটা একটা হল, আর একটা?
সেটা এখনও খালি পরে আছে। পাঁচিল দেওয়া। তবে বেহাত হয়ে আছে। ইউপির একজন ব্যবসায়ী নিয়ে রেখেছে। ভেতরে দারোয়ান রয়েছে।
খোঁজ নিয়েছিস?
রতন চুপ করে রইলো।
কিরে চুপ করে রইলি?
রাজনাথের আত্মীয়।
নাম কি?
রঘুবীর প্রসাদ।
তারমানে রাজনাথ বকলমে যার নামে এ্যাকাউন্ট করেছিল!
তোমার মনে আছে!
মনে থাকবে না। তারমানে রাজনাথ কেশের আগেই মালটা ইসলামভাই ঘুরিয়ে দিয়েছে।
মনে হয়।
লোকটাকে যে কি করি। ছোটোমার ভাই না হলে মেরেই দিতাম।
রতন ফিক করে হেসে ফেললো।
তুই হাসছিস, আমার গা রি রি করছে।
কি করবে বলো, সব বুঝি।
এখন আমাকে কত খাটতে হবে বল। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে বাঁকা আঙুল করতে হবে। আবার একটা নোংরা খেলা খেলতে হবে।
তুমি তো বলো ক্ষমতাটা বাপের না দাঁপের। তুমি পার্মিশন দিলে একবার খেলে দেব।
তুই দাধিয়া আর ফ্ল্যাট কেশটা দেখ। বাকিদুটো আমি বুঝে নেব।
খোঁজ খবর নিয়ে হাল্কা করে কাজ শুরু করেছি।
হাল্কা নয় পুরোদমে। রেগুলার আপডেট দিবি। পারলে ফোন করে দিবি, না হলে দেখা করে দিবি। আমার অবস্থা বুঝেছিস। পাকে পাকে জড়িয়ে পড়ছি।
বুঝি তো, তাই তোমাকে বিরক্ত করতে ভালো লাগে না। তবু মাঝে মাঝে বুদ্ধিতে কুলয় না। তোমাকে বিরক্ত করতে বাধ্য হই।
কি মজা না, কার জিনিষ কার নামে রেকর্ড করে ভোগ দখল হচ্ছে। তুই সুনীতের ডিটেলসটা আমায় দে।
তোমায় একটা কথা বলি।
আবার কোনও গণ্ডগোল করেছিস নাকি?
অবতার সুনীতদাকে দুবার ধমকেছে।
ওকে খবর দিলি কেন! সুনীতের ওপর ওর এমনি রাগ আছে। কিছু একটা ঘটিয়ে বসলে আমাকে সামলাতে হিমসিম খেতে হবে।
অবতার কথা দিয়েছে। কিছু করবে না। অনাদিদা আমাকে তিনদিন ফোন করেছিল।
কেন?
একটা আণ্ডার স্ট্যান্ডিংয়ে আসতে চাইছে।
কিসের আণ্ডার স্ট্যান্ডিং?
রতন চুপ করে রইলো।
শুয়োরটাকে ভিক্ষারী না করা পর্যন্ত আমার শান্তি নেই। ওর জন্য আমার এই অবস্থা হয়েছে। দাদা অসুস্থ হয়েছে। অন্য কেউ হলে অর্জুনকে দিয়ে অনেক আগে ঠুকে দিতাম। নেহাত আমার বন্ধু, একসঙ্গে পড়াশুনা করেছি। ওর বাবা-মাকে ছোটো থেকে কাকা, কাকীমা বলে ডেকেছি, কতদিন ওর বাড়িতে পান্তা খেয়ে দুজনে এক সঙ্গে স্কুলে গেছি। তাই চুপ করে আছি এখনও।
কাঞ্চন বৌদিকে মুক্তি দিয়েছে। বাড়িতে ফিরে গেছে। নীপাকে গিয়ে সমস্ত বলেছে।
কবে!
এ সব কথা তোমাকে বলবো তার ফুরসত কই, একটা না একটা নিয়ে তুমি লেগে আছো।
চিকনা জানে?
চিকনাদাই এসে সব বললো।
কবে?
কাল রাতে কথা হচ্ছিল।
ঠিক আছে চিকনার কাছে জেনে নেব।
দেখলাম ভজু, অনন্য, সুন্দর, শুভ কথা বলতে বলতে এদিকে এগিয়ে আসছে।
আর কথা বলা যাবে না বুঝেছিস রতন।
রতন হাসছে।
আমি উঠে দাঁড়িয়েছি।
ওরা কাছে এলো।
আমরা আজ খাওয়া-দাওয়া করবো না? অনন্য বললো।
কেনো। তোরা স্নান করতে শুরু কর, দেখবি তোদের স্নান করতে করতে আমি সব রেডি করে দিয়েছি।
তুমি আচ্ছা মানুষ, এক ঘণ্টা বলে দু-ঘণ্টা পার করে দিলে। কটা বাজে জানো?
কটা?
সাড়ে বারোটা।
আমি দুটোর মধ্যে রেডি করে দেব। তোরা কাটা কাটি করে সব রেডি করেছিস?
আরও পাঁচ কিলো মাংস এনেছি।
এই তো গণ্ডগোল করলি।
ও ঠিক হয়ে যাবে।
কিরে ভজু পেঁয়াজ টেয়াজ সব ছেঁচা ছিঁচি করে রেডি করেছিস?
তুমি চলো না।
কেন করিস নি?
চলো আগে, বলছি।
আমি ভজুর দিকে তাকিয়ে হেসেফেললাম।
গণ্ডগোল পাকিয়ে রেখেছিস, আমাকে গিয়ে ম্যানেজ করতে হবে।
সুন্দর হাসছে।
ওদের সঙ্গে চলে এলাম, সামনের মাঠে অনিমেষদা দাদারা সব বসে আছে। বারান্দা দিয়ে ঘরে ঢুকতেই দেখলাম হুলুস্থূলুস কাণ্ড চলছে। অনিকা মিত্রাদের কাউকেই দেখতে পেলাম না।
তোর কি কাণ্ডজ্ঞান নেই। বড়োমা দেখা মাত্র বলে উঠলো।
কেন কি হয়েছে?
দুপুরের খাবার, লোকগুলো কি রাতে খাবে।
তোমার স্নান হয়ে গেছে?
কেন?
স্নান করে এসো, আমি রেডি করে দিচ্ছি।
এটা কি তোর হোটেল পেয়েছিস।
বড়োমার হোটেল।
বড়োমা হেসে ফেললো।
ওরা কোনও আন্দাজ পাচ্ছে না। এতোটা রান্না জীবনে করিনি। বৌদি বললো।
ঠিক আছে তোমরা কেটে পরো। মিত্রারা কোথায়? ওদের যে বলেগেলাম কাটা কাটি করতে।
এত পেঁয়াজ কাটতে বসে চোখ দিয়ে জল বেরিয়েছে, তাই দোকানে চলে গেছে। বড়োমা বললো।
সবাই?
হ্যাঁ।
ভজু ছগনদার কাছ থেকে ছুঁড়ি আর পিঁড়েটা নিয়ে আয়।
ওইভাবে কাটতে পারবে না। অনেকদিন অভ্যেস নেই। আমি মিক্সচারে পেস্ট করে দিচ্ছি।
তাই কর।
মাসি।
বল।
মাইক্রোওভেনটা পরিষ্কার করে দাও। গ্যাসে দু-হাঁড়ি প্লেন গরম জল বসিয়ে দাও।
গরম জল দিয়ে কি করবি। বড়োমা আমার দিকে তাকালো।
তোমরা চারজনে চুপ চাপ ওই সোফায় গিয়ে বসে পরো। শুধু দেখে যাবে, নো ডায়লগ। আমার সঙ্গে ঘণ্টা, পক্কে, ভজু, সুন্দর, অনন্য, শুভ থাকলেই চলবে। মাঝে মাঝে চা চাইলে দেবে।
তুই তো গ্যাস দখল করলি।
স্টোভ বার করো। দুধ-চিনি-চা সব রান্নাঘর থেকে বার করে নাও।
ছোটো, মিলিটারি মেজাজ, সব বার করে নে।
যখন ঢুকবে তখন বার করবো। ছোটোমা বললো।
আমি এখুনি ঢুকবো।
ছোটোমা হাসছে।
কাজে হাত দিলাম। ভজুকে একটা একটা বলি, না হ্যাঁ বলে যায়। তবু ওরা সবাই মিলে আমাকে সাহায্য করছে। কাজ সারতে সারতে ঘণ্টাখানেক লেগে গেল। বড়োমারা গেঁট হয়ে বসে সব দেখছে। মাঝে মাঝে আমার পেছনে লাগছে তিনজনেই।
একবার চা-ও করে দিয়েছে।
ভজুকে বললাম দেখ চালটা একফুট হলেই ঝুড়িতে ঢেলে দে। জল ঝড়ে যাক।
শক্ত শক্ত করবে?
কেন দাঁত নেই।
একটু নরম করো না। ভালো লাগবে।
ঘণ্টা পক্কে মাংস মাখতে গিয়ে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে। ওদের দেখিয়া দিলাম কি ভাবে তারাতারি করা যায়। গামলার দু-পাশ দিয়ে হাত ঢোকা আর একটু উঁচু করে ছাড়। ভেবে নে তোর হাতদুটো বড়ো বড়ো খুন্তি।
আমার কথা শুনে ওরা হাসে।
এখনও দোকান থেকে কারুর ফেরার পাত্তানেই।
ভজু যা ট্রে নিয়ে আয়।
ট্রে দিয়ে কি হবে।
যা না নিয়ে আয় না।
ভজু রান্নাঘর থেকে পাঁচটা ট্রে নিয়ে এলো।
আর নেই?
না।
বড়োমার দিকে তাকালাম।
কিগো ট্রে বার করো।
আর কটা লাগবে।
গোটা দশেক লাগবে।
অতো নেই।
তাহলে থালা নিয়ে আয়।
অনিদা।
ভজুর দিকে তাকালাম।
তুমি কি বেকড চিকেন বানাবে।
হ্যাঁ।
ভজু মুখ দিয়ে একটা মধুর শব্দ করলো। ওর দিকে তাকিয়ে হেসেফেললাম।
কিরে! আমি হাসছি।
তুমি যখন পুদিনা পাতা লেবু আনতে বললে তখনই বুঝেছিলাম তুমি ফ্রাই করবে না।
জিভে জল পড়ছে?
অনেকদিন খাই নি।
একটার বেশি পাবি না।
পনেরো কিলো আছে।
আমি হাসছি।
দেখলাম তিনটে গামলার দুটো মাখা হয়েছে এখনও একটা বাকি আছে।
ওটা ধুয়েছিস ভালো করে।
হ্যাঁ।
জল নেই।
একবারে শুকনো।
ওগুলো ছোট ছোট করে পিস কর।
টিকিয়া? আরি ব্যাস। কিছু ফ্রাই করো।
তাই হোক। ওদের নিয়ে ভাগাভাগি করে সেইভাবে মাখ।
তুমি একটু ভাগ করে দাও।
আমি সব ভাগাভাগি করে দিলাম।
সব গুছিয়ে নিলাম। পাঁচটার বেশি ট্রে ওভেনে ঢুকছে না। বাটি বুটি দিয়ে কোনওপ্রকারে ম্যানেজ করলাম। বড়োমারা রান্নাঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে।
ভজুকে বললাম ঘি-টি গুলো নিয়ে আয়। ভাতটাকে নেড়ে দিই।
বড়োমার দিকে তাকালাম।
আমি কিন্তু আর পনেরো মিনিট সময় নেব। তুমি দাদাদের বসিয়ে দিতে পারো।
তোর হয়ে গেল!
হ্যাঁ।
কড়াতে নারলি না।
ছোটোমা, বৌদি, জ্যেঠিমনি হাসছে।
অনি, নামিয়েই একটা করে দিবি। এতক্ষণ দেখলাম, কেমন টেস্ট হয় আগে চেঁখে দেখি, তারপর ওদের খেতে ডাকবো। ছোটোমা বললো।
আমি ছোটোমার দিকে তাকালাম। বৌদি ঠেলা মারছে।
কেমন গন্ধটা বেরিয়েছে বুঝতে পারছো।
তুই তো মিত্রা হয়ে গেলি।
এখন ভাবি কেন মিত্রা মাঝে মাঝে কাঁই কাঁই করে।
আমি হাসছি।
ভাতটার প্রিপারেশন শুরু করলাম। ঘরির দিকে তাকালাম।
কতো ডিগ্রীতে চাপিয়েছিস। বৌদি বললো।
আড়াইশো।
আ-ড়া-ই-শো!
কেনো?
আমি জন্মেও এতো ডিগ্রীতে চাপাই নি।
ভজু ঘড়িটা একবার দেখ। সময় হলে বলবি।
আচ্ছা।
ওগুলো রেডি করেছিস?
ব্যাসন একটু কম পরে যাবে।
শুভকে দে নিয়ে আসুক। কতটা লাগবে?
এক কিলো হলে হয়ে যাবে।
শুভ বড়োমার কাছ থেকে পয়সা নিয়ে, নিয়ে আয়।
শুভ উঠে দাঁড়ালো।
ভজু ছোট ছোট পিস করবি, না হলে কুলতে পারবি না।
ঠিক আছে।
কথা বলতে বলতে ভজু চেঁচিয়ে উঠলো, দাদা টাইম হয়ে গেছে।
আমি মাইক্রওভেনের স্যুইচ অফ করলাম। ওভেনের দরজা খুলতেই চমৎকার একটা সুগন্ধ বেরিয়ে এলো। ছোটোমা বুক ভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
অনিরে এ কি গন্ধ! বৌদি বলে উঠলো।
বড়োমা, জ্যেঠিমনি, দামিনীমাসি আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
তুই তো হোটেলের বাবুর্চিকে হার মানাবি।
ভজুরা গন্ধ পেয়ে চলে এসেছে।
অনিদা নামিয়েছ?
ওদের দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
দাও দাও একটা টেস্ট করি। একশো টাকা প্লেট।
বড়োমা একবার তাকালো ভজুর দিকে। একপ্লেট বানালে দাদার পঁচিশ আমার পাঁচটাকা। তখন লাইন দিয়ে লোক খেত। বসে থাকতো খাওয়ার জন্য। ধূপ করে দাদা ছেড়ে দিল। বেকার হয়ে গেলাম। তবু কৃষ্ণদা দাদাকে কতো সাধলো। অনিদা বললো, আর ভালো লাগছে না।
তোকে গল্প ঝাড়তে বলেছি। যা প্লেট নিয়ে আয়। আমি বললাম।
বড়োমা ছোটোমা আমার দিকে তাকিয়ে।
ভজু গিয়ে টেবিলের ওপর থেকে প্লেট নিয়ে এলো।
আমি ওভেন থেকে ট্রে বার করে ওদের প্লেটে করে দিলাম।
বাইরে প্রচন্ড একটা হইচইয়ের আওয়াজ পেলাম। মুহূর্তের মধ্যে সেটা ধুপ-ধাপে পরিণত হলো। রান্নাঘরের গেটের সামনে অবিরত চেনামুখ, ক্যাচর ম্যাচর। বদলে গেল ঘরের চেহারা।
তনু, মিত্রারা গোল গোল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে।
বড়োমা, ছোটোমা, বৌদি সবার মুখ চলছে।
মিত্রা, তনু হাঘরে তাই না? বড়োমারা কি? মিত্রা চোখ নাচাচ্ছে।
ছোটোমা, মিত্রাকে দেখিয়ে দেখিয়ে আঙুল চাটছে।
কেরে খেয়ে নেব কিন্তু।
ওকে চা, দেবে। ছোটোমা বললো।
দারুণ টেস্ট বুঝলি মিত্রা। বৌদি বললো।
বাবা এটা কি হলো। দাদারা আগে খাচ্ছে কেন। অনিসা গেটের মুখে।
অনিকাও বক বক করে চলেছে।
আমি হেসে চলেছি ওদের কীর্তি কলাপ দেখে।
সুরো, বনি লাফিয়ে পড়েছে। কে কাকে দেখে।
আমি ভজু বলে চেঁচিয়ে ডাকলাম।
বলো।
দুটো ট্রে টেবিলে রেখে আয়।
মিত্রার দিকে তাকালাম।
ওখানে যা ভজু দিয়ে আসছে।
তিনটে ট্রে, বার কর।
আমি হাসছি।
ভজু ওদের ঠেলে ঠুলে ভেতরে ঢুকলো।
ঘুরতে গেছলে কেন, ত্যাখন বারণ করছিলাম না।
তুমি কি বলেছিলে এতো তারাতারি হয়ে যাবে। অনিসা চেঁচিয়ে উঠলো।
সর দিকি বাইরে নিয়ে আসি।
ভজু অনিসাকে খেদালো।
ভেতরে ঢুকে এক একটা ট্রে নিয়ে বাইরে রেখে এলো। আবার হইহই শুরু হয়ে গেল।
বাকি ট্রেগুলো রেডি করেছিস?
বার করে ধুয়ে মুছে রেখেছি, তুমি সাজাবে চলো।
করতে করতে একের পর এক সবাই আসতে শুরু করেছে। ইয়ার্কি ফাজলামো চলছেই। নামাবার আগেই লাইন পড়ে যাচ্ছে। কামড়া কামড়ি মারা মারি শুরু হয়ে গেছে।
শেষের ট্রে গুলো ওভেনে ঢুকিয়ে, ভজুকে বললাম টাইম হয়ে গেলে ওভেনের স্যুইচটা অফ করে দিবি।
রান্নাঘরের বাইরে এলাম। সুরো এগিয়ে এসে প্রণাম করলো।
কিরে হঠাৎ পেন্নাম করছিস! আর কোনও জারি জুরি চলবে না বলে দিচ্ছি।
নতুন জামা-কাপর পরেছি।
সে তো দেখতেই পাচ্ছি।
একবারও তো টিপ্পনি কাটলে না। বেশ চামকি লাগছে।
অনিদার মুখ থেকে শুনতে খুব ভালো লাগে তাই না। ওর দু-কাঁধে হাত রেখে চোখে চোখ রাখলাম। বনি পাশে দাঁড়িয়ে চোখে হাসি।
তারপরই দেখলাম অংশু বেশ ধোপ-দুরস্ত পোষাক পড়ে এসে পেন্নাম ঠুকলো।
দাঁড়া দাঁড়া কোথাও যেন মনে হচ্ছে কেশ জন্ডিস হয়ে আছে। তুই সকালবেলা রাজি হওয়ার পর চুমা দিলি। এখন ঘটা করে পেন্নাম!
সুরো ডাগর চোখে আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
তুমি তো বিয়ের দিন কিছু খাও নি। তোমাকে নিজে হাতে যখন খাওয়াতে গেলাম তুমি নেই। আজ সপ্তম বার্ষিকী। তাই তোমাকে….।
আমি সুরোকে জড়িয়ে ধরলাম। আগে মনে করিয়ে দিবি তো। তাহলে আর একটা মেনু ফ্রি রেঁধে দিতাম।
তুমি এইটুকু করে দিয়েছো এটাই যথেষ্ট।
ভজু আমাদের পারিশ্রমিক।
পার প্লেট তোমার পঁচিশ আমার পাঁচ।
হিসাব করে অংশুদার পকেট থেকে মালটা নিয়ে নে। আমার পকেট এখন গড়ের মাঠ।
তুমি তো আমাকে কিছু দিতে, ধরো না ওটাই দিলে।
তাহলে একটু চা করে খাওয়া।
সুরো হেসে ফেললো।
কিরে বনি।
মেরে বারে মে ডিউ স্লিপ হ্যায়।
হেসে ফেললাম।
ঠিক আছে তোরটা তো তিনমাস পর। করে দেব।
নাগেশ পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো।
(আবার আগামীকাল)