জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
৭৭ নং কিস্তি
অনিসা হাঁপিয়ে উঠলো। এক নিঃশ্বাসে যেন গোগ্রাসে পাতার পর পাতা গিলে চলেছে। একবার চেয়ার ছেড়ে উঠে আড়মোড়া ভাঙলো। একবার জানলার কাছে গেলো। নিচের দিকে তাকালো। না চারদিক নিঃস্তব্ধ। রাস্তার কর্পোরেশনের ল্যাম্পপোস্টের আলোটা আমগাছের ফাঁক দিয়ে জানলার গায়ে এসে পড়েছে। ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শুনতে পাচ্ছে। একটানা শব্দটা রাতের গভীরতাকে আরও যেন নিঃঝুম করে তুলেছে।
এখন কটা হবে? অনিসা দেয়াল ঘড়িটার দিকে একবার তাকাল।
আড়াইটে!
তারমানে মধ্যরাত।
পায়ে পায়ে টেবিলটার কাছে এলো। জলের বোতলটা হাতে নিয়ে ঢক ঢক করে বেশ কিছুটা জল খেল। তারপর বাথরুমে গেল। চোখে মুখে বেশ কিছুটা জলের ঝাপ্টা দিয়ে এসে আবার চেয়ারে বসলো। নিজের ভেতরে কেমন যেন একটা উত্তেজনা অনুভব করছে।
বাবা-মায়ের ভালোবাসার কেমেস্ট্রিটা কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না। আবার তনুর নাম পাচ্ছে। কে এই তনু? মা তনুকে নিশ্চই চেনে। তাহলে কি বাবা….?
অনিসা আবার ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রাখলো।
আজ সুরোর বিয়ে হলো।
শেষটা এমন হলো, সারাদিনের আনন্দ মাটি। মনটা ভারি হয়ে গেলো। কান্না ছাড়া আমার জীবনে কিছু নেই বুঝলি। লোকে এরপর থেকে আমাকে কাঁদুনেমাসি বলবে। আর তুই ছত্রিশ পাটি দাঁত বার করে হাসবি।
দেব না এক থাপ্পর, বুঝবি তখন।
তোর সঙ্গে ওর চুক্তি হয়েছিল—এক, তুই যেখানেই থাকিস ওর বিয়েতে আসবি। দুই, তোর বিয়ে যেখান থেকে হবে ওর বিয়েও সেখান থেকে হবে। মানে সেই বাড়ি থেকে।
তাই দাদার বাড়িকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
ছেলের নাম অংশুমান। তুই চিনিস, সুরো বললো। একবার নাকি তোর সঙ্গে আলাপও করিয়ে দিয়েছিল। ওর থেকে তিন বছরের সিনিয়ার। আমাদের কলেজেই পড়তো। এখন আমাদের কলেজেই প্রফেসারি করছে। দেখতে বেশ ভালো ছেলেটাকে।
অনিমেষদা, বৌদি দুজনে দায়িত্ব দিয়েছে আমাকে বিয়ের সব কেনাকাটির জন্য। ইসলামভাই বিয়ের সব অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়েছে। এলাহি ব্যবস্থা।
তোর ছেলে মেয়ের কি আনন্দ। সুরো পিসির বিয়ে। পাত পেরে খাবে। পিকু একটু বড়ো, সে তো আর এক কাঁটা ওপরে।
এখানেও তুই নেই।
সবার সেই এক কথা।
সবাই আগের রাত থেকে আমাদের বাড়িতে হাজির। সুরো গত সাতদিন ধরে রয়েছে। শয়নে স্বপনে অনিদা। কতবার যে চিকনাকে ফোন করে বলেছে, তুমি অনিদার সঙ্গে আমাকে একবার কথা বলিয়ে দাও না। কে কার কথা শোনে। অনিমেষদাকে পর্যন্ত চিকনা ফিরিয়ে দিয়েছে। বলেছে অনি নম্বর চেঞ্জ করেছে। সে নম্বর আমার কাছে নেই।
সকাল বেলা দধি-মঙ্গল অনুষ্ঠান শুরু হতেই সুরো একটু কান্নাকাটি করছিলো। তারপর আবার ঠিক হয়ে গেছে। মিলি তার ছেলেকে নিয়ে এসেছে। টিনা তার মেয়েকে নিয়ে এসেছে। সব গ্যাঁড়া গ্যাঁড়া। অদিতির ছেলেটা একটু বড়ো। প্রথমটা নষ্ট হয়েগেছিল। দ্বিতীয়টাকে যাই হোক নীরু জানপ্রাণ দিয়ে বাঁচিয়ে দিয়েছে। সেটারই এখন বয়স দশ।
সবাই এসেছে। আড্ডা খাওয়া দাওয়া। হই হুল্লোড়।
একটু বেলার দিকে ছেলের বাড়ি থেকে গায়ে হলুদ এলো। সুরোর এক দূর সম্পর্কের ননদ এবং কয়েকজন আত্মীয় এবং সুরোর শ্বশুর নিজে এসেছেন। সব কাজ মিটে যাবার পর আমাকে এসে বললেন, মা আমাকে একটা জিনিস দেখাবে।
প্রথমে আমি একটু অবাক হয়েছিলাম।
বলুন।
অনির একটা ছবি তোমার ঘরে আছে আমাকে একটু দেখাবে।
হাসলাম।
আমার বৌমা অনেকবার আমাকে তার দাদার গল্প বলেছে। লোকের মুখে খোঁজ খবর নিয়েছি। অনিমেষবাবুর কাছ থেকেও সব শুনেছি। ও তো একটা মিথে পরিণত হয়েছে।
নিজের ঘরে নিয়ে গেলাম।
অবাক হয়ে চারিদিক কিছুক্ষণ চেয়ে চেয়ে দেখলেন। ওনার চোখ মুখ দেখে বুঝতে পারলাম এই বাড়ির মধ্যে এই ঘরটা দেখে সত্যি উনি বিষ্মিত। তোর ছবিটার সামনে ভদ্রলোক অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন। কি বিড় বিড় করলেন কি জানি।
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন।
চোখ দুটো যেন কথা বলছে মা।
তারপর আনমনে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
এখন আর সেই ভাবে মন খারাপ হয় না। এটুকু মনে মনে জানি তুই আছিস।
আবার কাজের মধ্যে জড়িয়ে পরলাম। তখন মনে হয় আমি রান্নাঘরে, কি একটা গরম করছিলাম। ও হ্যাঁ মনে পড়েছে, আটার লেই তৈরি করছিলাম। ছাদনা তলায় সাজাবার জন্য কি সব লাগাবে তাই।
হঠাৎ তোর মেয়ে ছুটতে ছুটতে এলো, মা আমাকে দুটো লুচি দেবে—
কেনরে, এই তো খেলি!
আমি খাবো না। বাইরে একটা পাগল বসে আছে খেতে চাইছে।
তোকে বুঝি খেতে চাইলো—
মাথা দোলাল।
হাসলাম।
একা একা যেও না। কাউকে সঙ্গে নিয়ে যাও। না হলে পাগলটা আবার ধরে নিয়ে যাবে।
রান্নাঘর থেকে চারটে লুচি তরকারি একটা প্লেটে করে মেয়ের হাতে দিলাম।
ছোটোমা দেখতে পেয়ে বললো, ওটা আবার কি করছিস!
বাইরে কে পাগল বসে আছে মেয়ে বায়না করলো তাই দিলাম।
মেয়ে নাচতে নাচতে বেরিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে ছোটোমাকে বললো, দিদাই জল দাও।
ভাগ এখান থেকে খেতে পেলে শুতে চায়। ছগনদাদাকে বল তারিয়ে দিতে। কাজের বাড়িতে এরকম অনেক পাগল ভিক্ষিরি আসে।
দাও না।
আবার জল দিলাম।
মেয়ে দিয়ে এলো।
একবার আমি নিজে গিয়েও বাইরে বেরিয়ে দেখে এলাম। একটা নয় তিনটে পাগল।
আবার তোর মেয়েকে ডেকে একটু বেশি করে লুচি তরকারি দিলাম।
অনিমেষদা হাসতে হাসতে বললো। মিত্রা তোর মেয়ে দরিদ্র নারায়ণ সেবা করছে।
ছগনলাল একবার তারিয়ে দিল। দেখলাম এই ফুটপাথ থেকে গড়াতে গড়াতে ওই ফুটপাথে গিয়ে বসলো।
দুপুরে সকলে এক সঙ্গে খেতে বসলাম। আমরা সকলেই কথা বলছি হাসাহাসি করছি হঠাৎ দেখলাম তোর মেয়ে নিজে হাফ খেয়ে থালা নিয়ে উঠে যাচ্ছে।
ধর ধর বলে চেঁচিয়ে উঠলো সকলে।
বলে কি, বাইরে পাগলটা বসে আছে খায়নি। ওদের দিয়ে আসি।
বড়োমা খেতে খেতে উঠে গেল। বুঝিস তো বড়োমার গজগজানি।
আচ্ছা পাগলের পাল্লায় পরেছি সারাটা দিন। সকাল থেকে বড্ড জ্বালাচ্ছে। চল তোর পাগলদের খেতে দিয়ে আসি।
রান্নাঘর থেকে খাবার নিয়ে, নিজে মেয়ের সঙ্গে গিয়ে খাবার দিয়ে আসলো। মনে হয় দুটো মুখও করে আসলো। বারান্দা থেকে গলা পাচ্ছিলাম।
আমাকে এসে বললো কোথায় তুই অনেকগুলো বললি। দেখলাম তো একটা। কি দুগ্গন্ধ বেরচ্ছে গা থেকে। ছগনলালকে বলে এসেছি দূর করো। কাজের বাড়ি বলে কথা।
বিকেল বেলা সুরো সাজতে গেল।
সেজে গুজে সুরো ফিরে এলো সাড়ে পাঁচটা নাগাদ। তখনও ঠিক সন্ধ্যে হয়নি।
চারিদিকে লাইট জ্বলছে।
বাড়ি ভর্তি লোকজন। তোর মেয়ে আবার জ্বালাতন শুরু করলো। খালি ঘ্যানর ঘ্যানর।
আজ ওকে পাগলে পেয়েছে।
শেষ মেষ সুরোকে ধরলো।
সুরো কনের সাজে নিজে গিয়ে তোর মেয়ের সঙ্গে পাগলকে খাইয়ে এলো।
সবাই সুরোর পেছনে কি লাগাটাই না লাগলো। সুরো পুণ্যি করলি।
জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।
তখন কটা হবে ছ-টা।
এরপর বড় এলো।
আমরা সবাই বিয়েতে মেতে গেলাম। ছেলের বাড়ি থেকে বড়যাত্রী এসেছে। তাদের দেখভালো করছে সবাই। আমি ঘর সামলাচ্ছি।
প্রথমে রেস্ট্রি হলো, তারপর বিয়ের আসর বসলো।
নীপা খুব সুন্দর করে সেজেছিল। ভীষণ মিষ্টি লাগছিল।
ওর পেছনে কনিষ্ক, বটা, নীরু আটার মতো পরে রয়েছে।
এবার তোর পালা নীপা, তৈরি হয়ে যা।
বরুণদা হেভি সার্ভিস দিয়েছে।
মাঝে একবার অনিমেষদা নীপাকে বলেছিল।
হ্যাঁরে নীপা সবাই এলো চিকনা এলো না কেন?
সে এখন নেতা হয়েছে। সময় নেই।
সবাই নীপার কথায় হাসে।
রাতে নাচ গান হলো। তারপর খেতে বসা হলো।
আমার বিয়ের মতো সবাই এক সঙ্গে বুফে সিস্টেমে। সুরোর ইচ্ছে।
হঠাৎ দেখি সুরোর চোখ ছলছল। বৌদি আমাকে ইশারা করলো, কাছে গেলাম।
বুঝলাম মনে পড়ে গেছে।
বেশ তো ছিলি সারাদিন, আবার কি হলো?
অনিদাটা থাকলো না। বলেছিল তোর বিয়েতে খুব আনন্দ করবো।
বিধানদা বোঝাল। প্রবীরদা বোঝাল। অনুপদা, রূপায়ণদা কেউ বাকি নেই।
কে কাকে বোঝায়, তার ফোঁপানি বন্ধ হলো না। তারপর যা হোক তার কান্না থামলো।
খাওয়া তখন বলতে পারিস শেষ।
তোর ছেলেমেয়ে তাছাড়া যতগুলো ল্যান্ডাগ্যান্ডা ছিল ডাক্তারদাদার বাড়িতে ঘুমতে গেছে। কবিতা পাহাড়াদার। আমরা বেশ হই চই করছি।
আমাদের বিয়ের টুকরো টুকরো গল্প হচ্ছে।
অনুপদা বললো, মনে আছে সুরো অনির বিয়েতে সেই নাচ, চল চল আজ আর একবার নেচে নিই। পাবলিকের সামনে নাচলে পেঁদাবে। বেশ আনন্দ হচ্ছিল।
হঠাৎ সুরোর ফোনটা বেজে উঠলো।
সুরো আমার দিকে তাকিয়ে বললো, শিষ্য ফোন করেছে।
কথা বল।
আমি পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।
কে রে? বৌদি বললো।
চিকনা।
বৌদি মুখ টিপে হাসলো। সুরো কথা বলিস না ওর সঙ্গে।
হ্যালো।
খাওয়া দাওয়া হয়ে গেছে? চিকনার গলা।
হ্যাঁ আঙুল চাটছি। তুমি কোথায়?
পীরসাহেবের থানে বসে আছি।
তোমার সঙ্গে কথা বলবো না—
কেন—
তুমি এলে না—
তারপর ফিস ফিস করে কি কথা হলো চিকনার সঙ্গে বুঝলাম না। কথা বলতে বলতেই সুরোর চোখমুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল, এঁটো হাতে ফোনটা নিয়ে পরি কি মরি করে গেটের দিকে রুদ্ধশ্বাসে দৌড়লো।
আমি ধরতে পেরেছিলাম কিছু একটা হয়েছে। অংশু ওর পেছন পেছন দৌড়চ্ছে।
আমি কি ওর সঙ্গে পারি।
আবিদ, রতন সবাই দৌড়ে গেল।
একটা হতভম্ব করা পরিবেশ। হুট করে কি যে হোল।
সুরো সটাং গেটের বাইরে এসে কাকে যেন খুঁজছে।
আমি ছুটতে ছুটতে কাছে গেলাম।
সুরো আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পরে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো।
অনিদাকে তোমরা কেউ চিনতে পারলে না—
আমি তখনও হাঁপাচ্ছি। কথা বলতে পারছি না। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলাম না।
হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম, কি পাগলের মতো বলছিস!
হ্যাঁগো বৌদি, চিকনাদা এখুনি বললো। অনিদা এসেছিল।
ততক্ষণে সবাই গেটের কাছে চলে এসেছে। সুরো অঝোড়ে কাঁদছে।
রতন, আবিদ গেট থেকে বেরিয়ে দু-জন দু-দিকে ছিটকে গেল।
ইসলামভাই কাকে যেন বললো, গাড়িটা ওপাশ থেকে নিয়ে আয়।
মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু লণ্ড-ভণ্ড, ওলট-পালট হয়ে গেল।
ছগনলাল গেটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে।
কি হয়েছে বল। আমি সুরোকে জড়িয়ে ধরে আছি।
সুরো বললো।
চিকনাদা বললো, মনটা ভালো নয় সুরো—
কেন—
সে তোকে বলা যাবে না—
আমারও মনটা ভালো নয়—
কেন—
আমি বললাম, আমার দাদা নেই—
চিকনাদা বললো, কেন, দাদাকে অতো পরিপাটি করে খাইয়ে দিয়ে এলি।
কি বাজে বকছো!
কনে সেজে তুই অনিসা খেতে দিস নি কাউকে?
সে তো বাইরে একটা পাগল বসেছিল। সকাল থেকে বহু জ্বালাচ্ছিল।
ওটাই তোর অনিদা।
তুমি বলো বৌদি, সকাল থেকে আমার দাদা গেটের বাইরে বসে রইলো। তোমরা কেউ চিনতে পারলে না।
ইসলামভাই, রতন, আবিদ তখন রাস্তায় বেরিয়ে গেছে।
ছগনলাল চেঁচিয়ে উঠলো।
কুথা যাবেন বাবু, তাকে পুলিশে উঠায়ে লিয়ে গেছে।
অনিমেষদা, প্রবীরদা, বিধানদা থম মেরে একজায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। রূপায়ণদা, অনুপদা কাকে ফোন করছে।
দাদা, মল্লিকদা, ডাক্তারদাদা কেমন যেন বোবা হয়ে গেছে।
সবাই কেমন হতভম্ব হয়ে গেছে কথাটা শোনার পর।
ইসলামভাই তখন ফোনটা বার করেছে পকেট থেকে। আমি ইশারায় না করলাম। আমার ফোনটা এগিয়ে দিলাম।
চিকনাকে রিং করে আমাকে দাও।
সুরো আমার বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে।
কার চোখে জল নেই। বড়োমা, ছোটোমা, জ্যেঠিমনি, দামিনীমাসি মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে পরেছে। সবার এঁটো মুখ, কারুর হাত ধোয়া পর্যন্ত হয়নি।
টিনা, মিলি, অদিতি, নীপা ভেতর থেকে জলের বোতল আনতে ছুটলো।
ইসলামভাই ফোনটা ধরে আমাকে দিল।
ভয়েজ অন করা আছে, সবাই শুনবে, নাহলে আমার ষষ্ঠী পূজো হবে।
বলো গুরুমা।
গলাটা ভাড়ি ভাড়ি লাগছে—
পীরসাহেবের থানে বসে আছি, একটু ঠাণ্ডা লেগেছে—
কাঁদছো কেন?
তোমরা আমার গুরুকে দুটো খেতে দিতে পারলে না। তোমাদের বাড়িতে খাওয়ার এতই অভাব। চিকনা ঝাঁজিয়ে উঠলো।
চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসছে, তবু কাঁদতে পারছি না।
অনিমেষদাকে দেখলাম চোখ থেকে চশমাটা খুলে রুমাল দিয়ে মুখ মুছছে। এই প্রথম একটা দোর্দন্ড প্রতাপ মানুষকে এতোটা ভেঙে পড়তে দেখলাম।
আমার কথাটা শোনো।
শুনবো না, তুমি আমাকে একা থাকতে দাও।
বুঝলাম চিকনা অঝোড়ে কেঁদে চলেছে। সবাই নিস্তব্ধ।
কান্না কি আমারও পাচ্ছে না, কি করবো। দিনে দিনে কেমন যেন হয়ে যাচ্ছি। জীবনের সব তাপ উত্তাপ হারিয়ে ফেলেছি।
তবু নিজের মেয়ের হাতে দুটো লুচি এঁটো ভাত খেয়েছে।
বুকের ভেতরটা ভীষণ যন্ত্রণা করছে বুঝলি বুবুন।
যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে।
একদিকে সুরো আর একদিকে চিকনা।
যার দিকে তাকাই সেদিকে ছলছলে চোখ ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না। আমি নিজে শুধু কাঁদতে ভুলে গেছি।
ফোনে তখনও চিকনার ডুকরে ডুকরে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে।
তুমি এতদিন কি করে ঘর করলে ওর সঙ্গে।
তুমি আমার কথাটা একটু ভাবো।
ঠিক আছে ওকে চিনতে পারনি, টনা-মনাকে চিনতে পারেল না কেন।
প্রবীরদা কাছে এগিয়ে এলো। ফোনটা বার করতে গেল পকেটে থেকে।
অনুপদা হাতটা চেপে ধরলো।
টনা, মনাও ছিল!
ছিল তো।
কি করে বুঝবো বলো।
সবাই আমাকে ঘিরে ধরে আছে।
পাঁচিলের পাশে একটা পোঁটলা পড়ে আছে। ওটা নিয়ে এসো।
চিকনা ফোঁপাচ্ছে।
আর কি বললো?
বম্বে এয়ারপোর্টে নেমে আমাকে ফোন করলো।
কি বললো?
রাত দেড়টার ফ্লাইটে লন্ডন যাবে। বললো, চিকনা আজ আর কাউকে কিছু বলিস না। কাল সকালে বলিস।
চিকনা ফোঁপাচ্ছে।
মেয়ের হাতের লুচিগুলো ভীষণ ভালো খেলাম বুঝলি।
চিকনা কেঁদে ফেললো।
সারাদিন না খেলেও চলতো। শেষ বেলায় সুরোর হাতে খেলাম।
চিকনা ঢেউ তুলে তুলে কাঁদছে আর বলে যাচ্ছে।
ইসলামভাই মেনুগুলো বেশ ভালো বানিয়েছে। মাংসটা আর একটু সেদ্ধ হতো, তবে রাতের দিকে ঠিক হয়ে যাবে।
দেখলাম ইসলামভাই ওর্ণা দিয়ে চোখ মুছছে।
আর কি বললো?
জানিনা, বলতে ভালো লাগছে না। তোমার সঙ্গে পরে কথা বলবো।
সুরো আমার বুক থেকে মুখ তুললো।
সুরো কথা বলবে বলেছে।
পরে বলবো। কারও সঙ্গে আমার কথা বলতে ভালো লাগছে না।
আচ্ছা। তুমি বাড়ি যাও।
পড়ে যাব।
গুরুমার কথা রাখবে না।
ঠিক আছে আর একটুক্ষণ বসি।
আচ্ছা।
ফোনটা ইসলামভাই আমার হাত থেকে নিল।
বড়োমা কাঁদছে।
কাছে গেলাম।
আমার কেন মরণ হয় না মিত্রা—কেন আমাকে ঈশ্বর নেয় না—আমি কি জমের অরুচি—
এ সব কি কথা বলছো তুমি!
ছেলেটাকে তখন আমি কতো গাল দিলাম। অনিকে আমি কোনওদিন গাল দিইনি।
বড়োমার চোখ-মুখটা কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগছে।
তুমি না জেনে দিয়েছো!
ঠাকুর আমার চোখটা অন্ধ করে দেয়না কেন।
বুঝলাম বড়োমা ভুল বকতে শুরু করেছে।
কাকে বলবো নিয়ে যাবার জন্য। কনিষ্কর দিকে তাকালাম।
জ্যেঠিমনি আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে। তারও চোখে অনেক প্রশ্ন।
কনিষ্ক এগিয়ে এলো।
আস্তে করে বললাম, পারলে প্যথিডিন দিয়ে দাও দুজনকে।
আবিদ পাঁচিলের গা থেকে পোঁটলাটা তুলে নিয়ে এসেছে।
চ্যাটচেটে কালো নেগড়ায় মোড়া।
কারুর কোনও মুভমেন্ট নেই।
আমার দিকে তাকাল।
খুলবো।
খোলো।
নেগড়ার গিটটা খুলতেই একটা লাল পরিষ্কার কাপর বেরিয়ে এল। মনে হলো একটা বাক্স আছে। ঠিক তাই একটা বড়ো বাক্স তার ভেতর আর একটা বাক্স। তার ভেতর একটা গয়নার বাক্স আর একটা কাপড়।
বড়োমাকে কনিষ্ক-নীরু ধরে ভেতরে নিয়ে গেল।
সুরোর ফোনটা আবার বেজে উঠলো।
সুরো আমার দিকে তাকাল।
চিকনাদা।
কথা বল।
বলো।
তোদের ভিডিও তুলেছে কে রে।
কেন।
তুই যখন তোর অনিদাকে খাওয়াচ্ছিলি ওই ছেলেটা তখন ভিডিও তুলেছে। ছবিটা যদি ঠিক মতো আসে, আমাকে একটা স্টিল বানিয়ে দিবি।
ফোনটা কেটে গেল।
কিরে কি বললো?
বললো আমি যখন অনিদাকে খাওয়াচ্ছিলাম সেই সময় ভিডিওর ছেলেটা ছবি তুলেছে।
সুরোর কথা শেষ হলো না। রতন ভেতরের দিকে দৌড় দিল।
অনিমেষদার চোখ দুটো লাল, থম থমে মুখ। বিধানদা গুম মেরে দাঁড়িয়ে। ক্যাটারিংয়ের ছেলেগুলো চেয়ার এনে দিয়েছে বসার জন্য।
অংশুর বাবা এইরকম পরিস্থিথিতে জীবনে কোনওদিন পরেনি। কেমন যেন মুখ করে দাঁড়িয়ে। ভদ্রলোক সবে মাত্র বাড়ি ফিরে যাবার জন্য তোরজোড় করছিলেন।
সবাই চেয়ারে বসলো।
অনিমেষদা ছগনলালকে ডাকলো।
ছগনলাল কাছে এলো।
তুমি ঠিক দেখেছ পুলিশের গাড়িতে তুলে নিয়ে গেছে?
হ্যাঁ বাবু, বড়া গাড়ি থা, আন্দার মে দো গো পুলিশ ভি থা।
উস সময় কিতনা টাইম থা?
ও ছোটা দিদিমনি যব খানা দে কে গায়া উস টাইম।
প্রবীর থানার বড়বাবুকে একবার ডেকে পাঠাও।
প্রবীরদা ফোনটা বার করলো।
আর শোনো। না থাক—
বলুন না।
টনা-মনাকে এখন পাবে?
রতনকে পাঠিয়ে দিই। একবার ট্রাই করুক।
হ্যাঁরে রতন তোরা কেউ কিছুই জানতিস না! এই সময় অন্তত সত্যি কথা বল।
বিশ্বাস করুণ দাদা।
তোদের কথা আর বিশ্বাস করতে পারি না।
রতন মাথা নীচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো।
অনুপ তুমি ছেলেটাকে দেখেছ?
বহুবার দেখেছি। মাথায় এই সিকোয়েন্সটা আসেনি। আর যেই ভাবে বসেছিল….।
ব্যাটা সকলকে ঘোল খাইয়ে দিল।
বিধানদা মুচকি মুচকি হাসছে।
বিধানবাবু আপনি একবার ভাবুন। আমিও যে গেটের বাইরে দু-চারবার যাইনি তা নয়। সেইভাবে…।
আমার মাথাটা কোনও কাজ করছে না অনিমেষ।
না করারই কথা। আমার কি আর করছে, করাবার চেষ্টা করছি।
সুরোর দিকে তাকাল।
দেখ তো মা তোর এই প্যাকেটে কিছু লিখেছে-টিখেছে কিনা।
বৌদির মুখটা গম্ভীর। কাপরের খুঁট দিয়ে চোখ মুছছে।
সুতপা কেঁদে কিছু হবে না।
অনিমেষদার গলাটা কেমন ভার ভার।
বোকাদের মধ্যে তুমিও একজন। আমার থেকে তুমি ওকে বেশি চিনতে।
দামিনীমাসি তখনও মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে থেবড়ে বসে আছে। চোখমুখটা কেমন যেন।
কিগো দামিনী, তুমিও চিনতে পারেল না। তোমার কাছে অনি আঠারো মাস ছিল।
দামিনীমাসি মাথা নীচু করে রইলো।
সুরো প্যাকেট থেকে একটা খাম বার করে আমার হাতে দিল।
দেখ না মা কি লিখেছে গুণধর।
অনিমেষদা আমার দিকে করুণভাবে তাকাল।
একটু জোড়ে পড়। সবাই শুনুক।
কিরকম রাম ঠকান ঠকালুম বল তো। তোর কথা রেখেছি। অনিদা কোনওদিন তোকে ফিরিয়ে দেবে না। আকাশের চাঁদ চাইলেও তোকে এনে দেবে। যদি তার সামর্থে থাকে। তোকে যে কয়টা কথা দিয়েছি সব কটা রাখবো। হারটা নিজের হাতে কিনেছি। জীবনে প্রথম। জানিনা তোর পছন্দ হবে কিনা। ক্যাশমেমো আছে, পছন্দ না হলে চেঞ্জ করে নিয়ে আসিস। খুব ভালো খেলাম বুঝলি। আমার মেয়েটাকে একেবারে আমার মতো দেখতে হয়েছে। ছেলেটা গাড়ল। একবারও কাছে এলো না। মেয়েকে একটা ক্যান্ডি দিয়েছি। পাগলের হাত থেকে ক্যান্ডিটা প্রথমে নিতে চায়নি বুঝলি, তারপর নিলো। সবাইকে চোখের আশ মিটিয়ে দেখলাম। কতদিন পর দেখলাম। কনিষ্কটার চোখে নেবা হয়েছে বুঝলি। কতবার বাইরে এলো, সিগারেট খেলো। পোড়া সিগারেটটা একবার ভুল করে ফেলে যাবি তো। তা না, পা দিয়ে ডলে ভেতরে চলে গেল।
অনিদা।
তোর এ সব লেখা পড়লে কার মন ভালো থাকে বল।
কনিষ্কর পর্যন্ত চোখ ছল ছল করে উঠলো। বটা, নীরুর চোখ লাল।
কি কনিষ্কবাবু চোখ মুছলে হবে, পাখি উড়ে গেছে। চিঠিটা কেন পড়তে বললাম বলো।
কনিষ্ক মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।
এইখানেই তোমাদের সঙ্গে অনির তফাৎ। ও খুব সন্তর্পণে ইচ্ছে করে একটা ভুল করেগেছে। বলতে পারো ওকে খোঁজার জন্য একটা অস্ত্র ও তুলে দিয়ে গেছে।
অনুপ তুমি বলতে পারবে?
ক্যাশ মেমোটা।
ঠিক ধরেছো।
দেখ ওটা কোনও বড়ো দোকান থেকে কেনা।
হ্যাঁ সেরকমই দেখছি।
ও যেটা কিনে দিয়েছে সুরোর অপছন্দ হওয়ার কথা নয়। তবু তোমরা যদি ওর ট্রেস পেতে চাও খুঁজে নাও। প্রমাণ দিয়ে গেলাম। কালকে তোমার একটা কাজ আছে অনুপ।
ওই দোকানের সিসি টিভিতে ওর কোনও ছবি ধরা পড়েছে কিনা রেকর্ড করে আনবো।
ইয়েস।
আচ্ছা।
আমার দরকার। শেষ চেষ্টা একটা কোরবো।
অনিমেষদা ইসলামভাই-এর দিকে তাকাল।
ইসলাম তোমার ছেলেটাকে বলো না যদি একটু চা খাওয়াতে পারে।
একটু থামলো।
ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিল ছেলেটা।
অংশুর বাবা মন দিয়ে সব শুনছে।
বুঝলেন বিধানবাবু আমার সবচেয়ে বড়ো কষ্ট, ছেলেটাকে কাজে লাগাতে পারলাম না। হাজার চোখকে ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে গেল। চাড্ডিখানি ব্যাপার।
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে, বুক ফেটে যাচ্ছে মুখে কিছু বলতে পারছি না।
দেখলাম বড়োমাকে ধরে ধরে দিদিভাই, ছোটোমা নিয়ে আসছে।
তাড়াতাড়ি কাছে গেলাম।
তুমি একটু শোও না। কেন অমন করছো—
তুই আমাকে থাপ্পর মার—বড়োমা আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
কেন এরকম করছো!
আমি কোনওদিন ওকে বাজে কথা বলিনি—
আচ্ছা ঠিক আছে, ও কি তোমায় কিছু বলেছে!
তখন ও বোবার মতো বসে আছে, ঘামে ভিঁজে গেছে, মুখটাও ভালো করে দেখতে পেলাম না। কেমন কালিঝুলি মাখা।
ঠিক আছে, ঠিক আছে তুমি একটু শান্ত হও।
ছেলেটা আমাকে পর্যন্ত একবার বললো না।
এই আবার শুরু করলে।
চিকনাকে আমাকে একটু ধরিয়ে দে, আমি কথা বলবো।
ওর কি মন ভালো আছে—
আমি কথা বলবো। বড়োমা তোর মেয়ের মতো কথা বলতে শুরু করলো।
তখন আমার মাথা খারাপ হয়ে যাবার জোগাড়, বুঝলি। তুই তখন মহা আনন্দে বোনের বিয়ের নেমন্তন্ন খেয়ে লণ্ডনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিস। মেয়ের হাতে লুচি খেয়েছিস। সুরোর হাতে নেমন্তন্ন খেয়েছিস।
বাধ্য হয়ে চিকনাকে ফোন করলাম।
বলো—
বাড়ি যাও নি—
এইবার যাব—
বড়োমা কাঁদছে, তোমার সঙ্গে কথা বলবে—
দাও—
চিকনা বাবা—
কথা আর হলো না।
তুমি বলো বড়োমা।
দু-জনে খানিকক্ষণ কেঁদে নিল।
তুমি তবু দেখলে, আমি ওকে এখনও চোখের দেখা দেখিনি। তুমিও চিনতে পারলে না?
আমি যে ওকে পেটে ধরিনি বাবা।
তোমায় ও পায়ে হাত দিল। তুমি গালাগাল করছিলে ও তখন মুখ নীচু করে হাসছিল, তুমি খেয়াল করনি।
বিশ্বাস কর বাবা, খেয়াল করলে কি ওকে ছাড়ি।
অনিসা তখন যে জামাটা পরেছিল ওটা কি কেচে দিয়েছ?
জানি না।
ওর জামার পকেটে একটা কাগজের টুকরো আছে, দেখো কি আছে।
ও মিত্রা, চিকনা কি বলে।
বলো চিকনা।
দেখলাম দিদিভাই ভেতরে দৌড় দিল। অনিমেষদা প্রবীরদা দেখি গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে। অংশু এক কোনে চুপচাপ স্থবিরের মতো দাঁড়িয়ে।
অনিসার সঙ্গে ওর অনেক কথা হয়েছে। কি কথা হয়েছে ওকে জিজ্ঞাসা করো।
ও তো ঘুমচ্ছে।
কাল উঠলে জিজ্ঞাসা করবে।
অনিমেষদা ইশারা করলো কথা বলবে।
আমি বড়োমার হাত থেকে ফোনটা নিলাম। চিকনার গলাটা তখনও ভাড়ি ভাড়ি।
চিকনা।
বলো।
অনিমেষদা তোমার সঙ্গে কথা বলবে।
দাও।
আমি অনিমেষদাকে ফোনটা দিলাম।
হ্যালো।
বলুন।
তুমি কোথায়?
অনি যেখানে এসে বসে থাকত, আমি সেখানে বসে আছি।
কি করছো?
কি আবার কোরবো। আমার কি কোথাও যাওয়ার জো আছে। পাহাড়া দিচ্ছি। যক্ষের ধন।
ও কবে এসেছিল?
জানিনা। আটটা নাগাদ ফোন করে বললো। চিকনা কলকাতা এসেছিলাম, কতকগুলো কাজ সারলাম। বম্বে যাচ্ছি। ওখান থেকে লণ্ডনের ফ্লাইট ধরবো।
আমি বললাম আজ সুরোর বিয়ে তুই জানিস।
বললো সকাল থেকে ওখানেই ছিলাম। আমার সঙ্গে টনা, মনা ছিল। তুই এলিনা কেন। তাহলে দেখা হতো।
আপনি বলুন দাদা ও আসবে জানলে, আমি কি না গিয়ে থাকতাম।
চিকনা আবার কাঁদতে শুরু করলো।
কাঁদছো কেন, কাঁদলে কি অনিকে পাবে।
ও ফিরে আসুক তারপর দেখাচ্ছি, ওর একদিন কি আমার একদিন।
শুধু ফোঁপানর শব্দ।
রাখছি দাদা, কথা বলতে ভালো লাগছে না।
চিকনা ফোনটা কেটে দিল।
অনিমেষদা ভাবলেশহীন মুখে ফোনটা আমার হাতে দিল।
একটা পুলিশের গাড়ি এসে গেটের সামনে দাঁড়াল।
অনিমেষদা ধীর পায়ে এগিয়ে গেল।
পুলিশ কেন?
বড়োমা আমার হাতটা চেপে ধরলো।
অনিমেষদা ডেকে পাঠিয়েছে।
আমাকে নিয়ে চল, আমি শুনবো।
কাঁদতে পারবে না।
দিদিভাই ছুটতে ছুটতে এলো।
কাগজ তো পেলাম না এই সিগারেটের প্যাকেটটা পেলাম। আমার হাতে দিল।
অনিমেষদা দেখি আবার ফিরে এলো।
কি আছে রে এতে!
চিকনা বললো। মেয়ের সঙ্গে বুবুন অনেক কথা বলেছে। মেয়েকে প্যাকেটটা দিয়ে গেছে।
তোরাও আর অনিসাকে ফলোআপ করিসনি।
কি করে বুঝবো বলুন দাদা।
তাও ঠিক। কি কথা বলে ফেললাম।
কি সুন্দর সুযোগটা নিয়েছে। দেখ তো ওর মধ্যে কিছু আছে নাকি?
আমি প্যাকেটটা খুললাম। একটা ছবি। তোর আর আমার। কয়েকটা ক্যান্ডি লজেন। একটুকরো কাগজ।
ছবিটার পেছনে লেখা আছে, এই পাগলটা তোমার বাবা, তোমার মার সঙ্গে তোমার পাগল বাবার ছবি।
ছেঁড়া টুকরো কাগজটায় লেখা আছে।
বড়োমা তোমার হাতে অনেকদিন পর খেলাম। এর স্বাদই আলাদা। আজ মিত্রাকে কোনও ভাগই দিলাম না। তুমি সম্পূর্ণ আমার। আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত নাতি-নাতনিকে গুছিয়ে রাখবে। অনি।
বুঝলি বুবুন বুকের ভেতরটা এতো প্রচণ্ড যন্ত্রণা করছে। কথা বলতে পারলাম না। শুধু কাগজের টুকরটা অনিমেষদার হাতে এগিয়ে দিলাম।
বলনা ও কি লিখেছে—
বড়োমার মুখের দিকে তাকালাম কোনও কথা বলতে পারলাম না।
অনিমেষদা একবার দেখে নিয়ে দিদিভাই-এর হাতে কাগজের টুকরোটা দিয়ে ফিরে গেল।
জানিস এতো ঘটনা ঘটলো ছোটোমা একবারে পাথর। সেই যে মাঠে থেবড়ে বসে পরেছিল আর ওঠে নি। কেমন যেন বোবা চোখে সকলকে দেখছে।
শেষে আমি গিয়ে ছোটোমাকে জড়িয়ে ধরলাম। সেই যে কান্না শুরু হলো থামান যায় না। ফুলে ফুলে শুধু কেঁদে উঠছে। নীরুর চোখ, কি বুঝলো কে জানে প্রেসার মাপলো। হাই প্রেসার। প্যিথিডিন দিল। জ্যেঠিমনি, বড়োমাকেও ওষুধ দিয়ে ঘুম পারাতে হলো।
তোর পাগল সাজার চলমান ছবি দেখলাম। একঝলক দেখলে কিছুতেই বোঝা যাবে না তুই। অনেকক্ষণ ভালো করে দেখলে বোঝা যাবে তুই। তোকে যে কোনওদিন দেখেনি, তারপক্ষে ধরা অসম্ভব।
আবার একবার কান্নাকাটি হলো।
সারারাত আমার আর ঘুম হলো না। ডাক্তারদাদা, অনিমেষদারা গোল হয়ে বসে অনেকক্ষণ কি সব শলাপরামর্শ করলো।
সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে এসেই তোর মেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। কাঁদো কাঁদো মুখে বললো জানো মা, পাগলটা চলে গেছে।
আমি মেয়ের মুখের দিকে তাকালাম। হায়রে ও যদি জানত ওই পাগলটা ওর বাবা।
তারপর ঘরের মধ্যে ঢুকে জামার পকেটে হাত দিল। কিছু না পেয়ে মুখটা কেমন শুকিয়ে গেল। আমি কাছে গেলাম।
কি খুঁজছিস?
আমার তাস।
কোথায় ছিল?
আমার পকেটে ছিল।
তাস কোথায় পেলি?
মেয়ে চুপ করে গেল। কিছুতেই বলে না।
আমাকে সত্যি কথা বললে দিতে পারি।
পাগলটা দিয়েছে।
মেয়েকে নিয়ে ওপরে চলে এলাম।
সুরো তখন যাওয়ার তোরজোড় করছে। কার আর মন ভালো থাকে। অনিমেষদা আমাকে দেখলো, ইসারায় বললো দেখ কিছু পাস কিনা।
আলমাড়ি থেকে প্যাকেটটা বার করলাম।
পাগলটা তোকে কালকে কয়েকটা ক্যান্ডি দিয়েছিল।
তুমি জানো—
মাথা দোলালাম।
পাগলটা কি বললো জানো—
কি বললো—
পাগলটা তোমাকে চেনে। বললো ওটা তোমার মা?
আমি বললাম হ্যাঁ।
পাগলটা দিদান, দাদাই সবাইকে চেনে।
তোকে আর কি বললো—
বললো আমার বাবাকে চেনে আমার বাবা পাগলটার সঙ্গে থাকে।
তুই কি বললি—
আমাকে নিয়ে যাবে—
বললো হ্যাঁ—
গেলিনা কেন—
তুমি যে বললে ওরা ছেলেধরা, ধরে নিয়ে যাবে, তাই গেলাম না।
মেয়ের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললাম। কাজের কাজ কিছুই হলো না।
সুরো চলে গেল, যাওয়ার সময় তোর মেয়েকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদল।
পড়তে পড়তে অনিসার চোখদুটো কেমন ঝাপসা হয়ে গেছে। বুকের ভেতরটা কেমন দম বন্ধ হয়ে যাবার মতো অবস্থা। ঠিক যন্ত্রণা হচ্ছে না। কেমন যেন কিনকিন করছে।
ডান হাতের তালু দিয়ে চোখটা মুছলো। আবার ঝাপসা হয়ে গেল।
মায়ের কতো কষ্ট। তবু মা কিরকম মুখবুঁজে সব সহ্য করে আছে। কাউকে মুখ ফুটে এতটুকু কিছুই বলে না। সব জানে অথচো কিছুই জানে না।
সত্যি এতদিন ও কিছুই জানতো না। বাবার সম্বন্ধে যা শুনেছে সব ভাষা ভাষা।
কেন বাবা আজ আঠারো বছর বাড়ির বাইরে। লেখাগুলো পড়ে মনে হচ্ছে বাবার সঙ্গে একমাত্র চিকনাদার ডাইরেক্ট যোগাযোগ আছে। আর সবাই ভাসা ভাসা সব জানে। পরিষ্কার করে কিছুই জানে না।
তাহলে মা কার সঙ্গে রাতে কথা বলে বাবার সঙ্গে?
এতক্ষণ যেটুকু পড়েছে তার থেকে এইটুকু পরিষ্কার বাবা কিছুতেই মার সঙ্গে কথা বলবে না। যতক্ষন না বাবা তার লক্ষ্যে পৌঁচচ্ছে।
অনিসা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না, বাবা সত্যি সত্যি কেন বাইরে পরে রয়েছে?
চিকনাদাকে বাবা আমার দিব্যি খেয়ে বলেছে কিছুতেই টডিকে ছাড়বে না।
কে এই টডি?
এই মুখার্জী কি শুভর বাবা!
সিকোয়েন্স যা বলছে, শুভর বাবাই হবে। তারমানে শুভর বাবাকে যারা মেরেছে, তারা কেউ বেঁচে নেই? শুভর দাদু জানে? জানা উচিত।
তনু কে? তনু ম্যাডামের সঙ্গে চিকনাদা যোগাযোগ রাখে, আর এক জায়গাতেও মা তনুর কথা লিখেছে।
মা নিজেই ফোন করেছিল, তারমানে মার সঙ্গে তনু ম্যাডামের পরিচয় আছে। তাহলে কি মা সপ্তাহে একদিন তনু ম্যাডামের সঙ্গেই কথা বলে? বাবার সঙ্গে তনু ম্যাডামের কি সম্পর্ক? অনিসার মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছে।
সুরো পিসির বিয়ের দিনটা ও ভালো করে ভাববার চেষ্টা করলো।
একটু একটু আবঝা আবঝা মনে পড়ছে। একটা পাগলের সঙ্গে ও অনেকক্ষণ কথা বলেছে। কিন্তু কি কথা বলেছে। আজ ঠিক পরিষ্কার মনে নেই। মা লিখে রেখেছে বলে ও মনে করতে পারছে। না হলে ও ভুলেই গেছিল।
বাবা ওকে দেখেছে। ও নিজে বাবাকে দেখেছে। কথা বলেছে।
তারমানে বাবা যে মারা যায়নি, এটা ও আগেই প্রমাণ পেয়েছে। বাবাকে ও দেখেছে, বাবার সঙ্গে কথা বলেছে, দাদার সঙ্গেও কথা বলেছে বাবা। ভাবলেই ওর মনের ভেতর কেমন শিহরণ জাগছে।
অনিসা কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে ভাববার চেষ্টা করলো। সব কেমন যেন আবঝা আবঝা চোখের সামনে ভেসে আসছে।
হঠাৎ বাগানের আমগাছটা থেকে দু-একটা কাক কা কা করে ডেকে উঠলো। অনিসা চোখ খুলে জানলার দিকে তাকাল। পূব আকাশটা ফর্সা হয়ে এসেছে।
নিশ্চই দুদুন বাগানে ঘুরতে বেরিয়ে পরেছে।
অনিসা ল্যাপটপটা বন্ধ করলো।
সারাটা রাত ও জেগে আছে। চোখে এক ফোঁটা ঘুম নেই। এক নিঃশ্বাসে পড়ে গেছে।
সত্যি ওর বাবার সম্বন্ধে ভীষণ জানতে ইচ্ছে করছে। কেন বাবা এরকম কাণ্ড করলো? মি. মুখার্জীর ব্যাপারটা ও মোটামুটি ধরে ফেলেছে শুভর বাবা। কিন্তু ডা. ব্যানার্জী, রাজনাথ এরা কারা? দুদুনের মুখ থেকে এদের নাম কোনওদিন শোনেনি। মনে হচ্ছে ইতিহাসের মধ্যে ইতাহাস লুকিয়ে আছে।
বিতান আঙ্কেলকে জিজ্ঞাসা করলে যে জানতে পারবে তাও নয়—মায়ের খাতা পড়ে যেটুকু ও বুঝলো বাবাকে বিতান আঙ্কেল যথেষ্ট ভয় পায়। মিলিমনি, টিনামনি কিছুই বলবে না। কালকে ইচ্ছে করে ভিডিও ক্লিপিংসগুলো পেনড্রাইভে ভরে দেয়নি। কনিষ্কমামা, নীরুমামা? ধ্যুস ফুঁ মেরে উড়িয়ে দেবে।
আজ সুরো পিসির কাছ থেকে বিয়ের সিডিটা নিয়ে ল্যাপটপে কপি করে নিতে হবে। কিন্তু কি বলে চাইবো? হাজার প্রশ্ন, দেবে কিনা সন্দেহ।
শুভ কালকে পুরনো কাগজগুলো দেখতে দেখতে গম্ভীর হয়ে চলে এলো। বাবা দুবাইতে আছে। ওর বাবাও দুবাইতে ছিল। শুভ বলেছে ওর জন্ম দুবাইতে। ওর দাদুর মুখ থেকে টোডির নামটা শুনেছে। তাহলে কি মি. মুখার্জী শুভদীপের বাবা?
বারবার একই কথা অনিসার মনে ঘুরে ফিরে আসছে।
মার লেখাগুলো পরে মনে হচ্ছে বাবার সঙ্গে মি. মুখার্জীর খুব ভালো রিলেসন ছিল।
মি. মুখার্জী খুন হয়েছিলেন। বাবা তার প্রতিশোধ নিয়েছে।
মা তাই লিখেছে। চিকনাদার কথোপকথন থেকে তাই বোঝা যাচ্ছে।
শুভ বলছিল ওর দাদু কিছুতেই ওর বাবা-মার সম্বন্ধে বলতে চায় না। বড়ো হলে জানতে পারবি। এই বলে এড়িয়ে গেছে। আচ্ছা আমরা কি এখনো ছোটো আছি?
দাদা কি এই ব্যাপারগুলো কিছু জানে?
যদি জেনে থাকে ওকে কোনওদিন কিছু বলে নি।
টোডি কে? কেন বাবা টোডির পেছনে দৌড়চ্ছে।
ইসলামদাদাই কেন কিছু করতে পারবে না।
ইকবালদাদাই বললো, তুই খোঁজ, ঠিক তোর বাবার দেখা পেয়ে যাবি। অনিসার মাথাটা আবার ঝিমঝিম করতে শুরু করেছে।
(আবার আগামীকাল)