জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১৫৮ নং কিস্তি
সবাই এ ঘরে এসে ঢুকলাম। দারুণ গন্ধ ছেড়েছে। হই হই শুরু হয়ে গেছে। থমকে যাওয়া প্রাণের পরশ আবার ধীরে ধীরে ফিরে আসছে।
অনিসারা মিষ্টির ট্রে নিয়ে এসে টেবিলের ওপর রাখলো।
বোন। অনন্য রান্নাঘরের থেকে চেঁচিয়ে উঠলো।
অনিসা কাছে এগিয়ে গেল। অনন্য ওকে কি যেন বললো।
অনিমেষদারা সব সোফায় বসে গেছে।
অনিসা একটা প্লেটে করে একটা মাংসের টুকরো এনে আমার সামনে দাঁড়াল। চিকনা পাশে দাঁড়িয়ে মিটি মিটি হাসছে।
তুমি একবারে তাকাবে না। আমি, দিদি লাইনে আছি। অনিসা চেঁচিয়ে উঠলো।
চিকনা হেসে উঠলো।
আমি মাংসের টুকরো মুখে দিয়েই চেঁচিয়ে উঠলাম পক্কে।
পক্কে হাসতে হাসতে সামনে এসে দাঁড়াল।
ব্যাটা ফাঁকি মেরেছিস।
হাত ব্যাথা হয়ে গেছিল। শেষ পর্যন্ত সুন্দর হাত লাগাল।
আমি অনিসার দিকে প্লেটটা এগিয়ে দিলাম। ওরা সবাই বেশ মজা করে খাচ্ছে।
ছোটোমা, বৌদি, দামিনীমাসি এসেই লেগে পরেছে।
নীরু, বটা, কনিষ্ক ঘরে ঢুকলো।
আমি গম্ভীর হয়ে নীরুর দিকে তাকালাম। নীরু এগিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
বিশ্বাস কর, সকালে কালবৈশাখীর পূর্বাভাস দেখলাম। কনিষ্ককে বললাম আগে কেটে পরি চল, কত গাছ ভেঙে পড়বে তার কোনও ইয়ত্তা নেই। মাঝে মাঝে ম্যাডাম, তনু, ইসিকে ফোন করেছি। আপডেট নিয়েছি। গ্রীণ সিগন্যাল পেলাম, চলে এলাম।
আমি নীরুর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি।
তুই রাগ করলে পুরো দেবদাস।
অনিসার দিকে তাকাল।
কই-রে বুঁচকি, আমাদের দিকে একটু ছোড়া-ছুড়ি কর।
পাঁচু দেখলাম বড়োমার পেছন পেছন ঘুর ঘুর করছে।
মাঝে মাঝে চোখ পড়ে যাচ্ছে আন্টির দিকে। অবাক হয়ে চেয়ে চেয়ে দেখছে চারদিক। হাতে প্লেট ধরা আছে। জ্যেঠিমনি মনে হয় বড়োমার ঘরে। সবাই কম বেশি ব্যস্ত।
আমি ঘরের বাইরে এলাম। নেপলা, রতন, চাঁদ বসে আছে। আমাকে দেখে তিনজনে উঠে এলো।
আয়।
আমি আমার ঘরে এলাম।
খাটে টান টান হয়ে একটু শুয়ে পড়লাম।
তিনজনেই হাসছে।
হাসছিস কেন?
হাসির কাজ করবে, হাসলেই দোষ। চাঁদ বললো।
নেপলা।
বলো।
খবরটা যখন কষ্ট করে দিয়েছিস, একটু মাংস পৌঁছে দিয়ে আয়।
আমি দিই নি। চাঁদ দিয়েছে।
ও তো এখন বড়ো দাদা।
এই তুমি শুরু করে দিলে। চাঁদ বলে উঠলো।
তোর হিসেবটা পরে করবো।
সে তুমি করো, আমার আপত্তি নেই।
লাস্ট আপডেট কি রতন?
চাঁদকে ডেকে ক্যাশ টাকা দেবে বলেছে।
কতো।
এখন বাজার দর যা আছে তাই।
কত রেট চলছে।
কম বেশি একশো দশ পনেরো হবে।
কতো কাঠারে?
পঁচিশ মতো।
নিয়ে নে। হিমাংশুকে বলে একটা ব্যবস্থা করে দে। বৌদিকে দিয়ে সই করিয়ে নিবি। তোদের টাকার দরকার কাজে লাগিয়ে দে। বাকিটা দেখছি।
নেপলা জোড়ে হেসে উঠলো। চাঁদ সোফা থেক উঠে এসে পা জড়িয়ে ধরেছে।
তুমি মাইরি মাঝে মাঝে এমন করো না, পেটের নাড়ি ভুঁড়ি পর্যন্ত শুকিয়ে যায়।
চাঁদের দিকে তাকালাম।
পায়ে যখন হাত দিলি একটু টিপে দে।
সে তুমি বললে কাঁধে রেখে দেব।
অতো উপকার করতে হবে না।
রতনের দিকে তাকালাম।
একটা উপকার করবি।
বলো।
গোটা পনেরো/কুড়ি সবচেয়ে দামী মদের বোতল নিয়ে আসবি।
আবার আজকে!
নেপলা হেসে সোফায় গড়াগড়ি খায়।
তুই শরীর নাচিয়ে দাঁত কেলাচ্ছিস কেন। নেপলার দিকে তাকালাম।
তোমার মুড ঠিক হয়ে গেছে।
হেসেফেললাম।
রতনদা দাধিয়াকে একটা ফোন মেরে দে। আজকেই কাজটা সাল্টে দেব। চাঁদ বললো।
সুবীর এসে গেছে। তাই না? রতন, চাঁদের দিকে তাকাল।
চাঁদ হাসছে।
এই টাকাটা সুবীরকে দিবি না। আমি বললাম।
তাহলে! চাঁদ বড়ো বড়ো চোখ করলো।
তোকে বলে লাভ আছে। তুই তো আবার সকলকে বলে বেরাবি।
সেদিন থেকে কাউকে কোনও কথা বলি না।
মাংসের ব্যাপার জানল কি করে।
একটা আনন্দের দিন একটু শেয়ার করবো না। সব কথার মাঝখানে যদি বলে অনিদার পার্মিশন নিয়েছিস, কি বলবো।
তাই বললাম, অনিদা এখন ছেলেমেয়েদের নিয়ে মাংস রান্নায় ব্যস্ত আছে। কি কারনে মাংস রান্নায় ব্যস্ত আছে তাও বললাম। কথাটা বলে আমি চাঁদের দিকে তাকিয়ে হাসছি।
দূর তোমার সঙ্গে কথা বলা যাবে না। চাঁদ হাসতে হাসতে বললো।
রতন।
বলো।
টাকাটা আলতাফের হাতে পৌঁছে দিবি। যদি না নেয় তাহলে ব্যাঙ্কে ঢোকাবি।
রতন হাসছে।
আমাদের পকেটের দশজনের নাম এ্যাড্রেস আলতাফকে দিবি।
আমাকে বলেছিল।
তুই কি বললি?
দাদার সঙ্গে কথা বলে তোমায় দেব।
চাঁদ, চিনা, তোর, আবিদের নাম যেন না থাকে সেই লিস্টে। কি কারনে নাম চাইছে নিশ্চই বুঝতে পেরেছিস। এলাকার হলে ভালো। কাজ করতে সুবিধে। এখন থেকে কাজ চালু করে দে। হিসাব করে নাম দিবি, যার তার নাম দিয়ে বসিসনা যেন।
আমি একটু একটু কাজ শুরু করে দিয়েছি।
তুই, নেপলা, সাগির যে ফার্মটা বানিয়েছিলি তার কাগজ পত্র তৈরি করে ফেলেছিস।
করেছি।
একটা অফিস কর।
ম্যাডাম এখন মির্জাগালিব স্ট্রীটের অফিসের একটা পার্ট ব্যবহার করতে দিয়েছে।
ওই টুকুতে কাজ হয়ে যাবে?
খুঁজে নেব।
নেপলা।
বলো।
একটা সিগারেট দে। কালকে তুই একবার ফাদারের কাছে যেতে পারবি।
কখন বলো?
সকালের দিকে।
যাব।
তোর সঙ্গে রতন যাবে, ঘণ্টা, পক্কে যাবে।
নেপলা আমার দিকে তাকাল।
ফাদারের কাছে দশটা ছেলে মেয়ে চাইবি। পক্কে, ঘণ্টা ওদের নিশ্চই চিনবে। ওদের এখন থেকে তৈরি করতে শুরু করে দে। পক্কে, ঘণ্টাকে তোদের দিলাম। তৈরি করে নে। পক্কে, ঘণ্টার ব্যাঙ্কের কাজ কর্ম সেরে আসবি।
আফতাবভাই কবে আসবে?
আগামী সপ্তাহের শেষের দিকে।
সাগির, অবতার আসতে চাইছে।
আসতে বল। তিনজনে একসঙ্গে ওখানে থাকবি না। সমস্যা হবে না।
না। অনেকটা গুছিয়ে নিয়েছি।
কনিষ্ক, নীরু, বটা ঘরে ঢুকলো।
সত্যি নেপলা, তুই রতন ছেলেটাকে একবারে মেরে দিবি।
আমি না। রতনদা, চাঁদ। যা বলার ওদের বলো, আমাকে কিছু বলবে না।
নীরু পাশে এসে বসলো।
কিরে শরীর খারপ লাগছে!
না।
শরীরে আর দোষ কি। নিজের অজান্তেই সংসার বাড়িয়ে চলেছিস। সকলের দেখভাল করতে করতে তোর সময় শেষ।
নীরুর দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
আমার কথা নয়। শ্রীপর্ণার কথা।
নীরু হাসছে।
কাল রাতে হাসতে হাসতে কথাটা বলে ফেললো। তারপর ভেবে দেখলাম বেশ দামী কথা বলেছে। আমরা তোর পাশে থেকেও এতদিন ব্যাপরটা গুরুত্ব দিয়ে ভাবিনি।
বড়োমা, ছোটোমা, পিকু জ্যেঠিমনি ঘরে ঢুকলো।
পিকুর মুখের দিকে তাকালাম। একদিনেই চোখের কোলে কেউ যেন কালি লেপে দিয়েছে।
কিরে শুয়ে আছিস! ছোটোমা বললো।
এমনি। উঠে বসলাম।
রতন, চাঁদ, নেপলা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
কনিষ্করা সোফায় গিয়ে বসলো।
পিকু মাথা নিচু করে আছে। আমার পায়ের দিকে বসলো।
বড়োমা আমার কাছে এসে বসলো। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
কিছু বলবে?
পিকু একটা ভুল করে ফেলেছে। ক্ষমা করে দে।
কিসের ক্ষমা? তুমি আমাকে বলো।
তুই তো সব জানিস ন্যাকামো করিস না।
দেখো সেই ভুলের ক্ষমা হয়, তুমি না জেনে যদি করো। আর তুমি জেনেশুনে জ্ঞানতঃ ভুল করছো। ক্ষমতা দেখাতে চাইছো। তার কখনও ক্ষমা হয়।
এই বারটা মাফ করে দে। আর কোনওদিন করবে না।
এখানে মাফের কিছু নই। এ্যাডাল্ট হয়ে গেছে। নিজের বুদ্ধি বিবেচনা সহকারে কাজ করেছে। তার থেকে কিভাবে বেরিয়ে আসবে তাকে বুঝতে দাও। তোমরা এর মধ্যে মাথা গলাচ্ছ কেন। ও কি তোমাদের পার্মিশন নিয়ে এই ভুলটা করেছে।
কনিষ্ক হাসছে।
বড়োমা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে।
তুই ওরকম করিস না।
আমি কি করলাম বলো। ছেলে বড়ো হয়েছে, বিয়ে করেছে। তার বাপ-মা মেয়ে রেখে চলে গেছে। বাবা তোদের বাড়ির বৌ তোরা সামলা। এবার তোমরা সামলাও। আমি কি করবো। আমি বিয়ে করলে আমি বুঝতাম। যে বিয়ে করেছে তাকে বুঝতে দাও। সে খাওয়াতে পড়াতে পারবে বলেই না বিয়ে করেছে।
নীরু, বটা খিক খিক করছে।
দেখো আমার দুটো বউ। চেষ্টা করলে আরও দু-চারটে পেয় যাব। ছ-টা ছেলেমেয়ে। দুটো নতুন সংযোজন, যদি ধরি তাহলে আটটা ছেলেমেয়ে।
নীরু খুব জোড়ে হেসে উঠলো।
গোটা দশেক মা, গোটা ছয়েক বাবা। আমি কারুর কাছে সাহায্য চাইতে গেছি?
বড়োমা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
আমাকে ক্ষমা করো।
জ্যেঠিমনি হাসতে গিয়েও হাসতে পারছে না।
অনিকাকে দেখছো। পিকুর থেকে পাক্কা দেড় বছরের বড়ো। ওরা কিন্তু ভুল করেছে। আমি ক্ষমা করে দিয়েছি। কেন? এক বুক অভিমান নিয়ে ওরা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছে, একবার অনিমামার মুখটা দেখবে।
তখন আমারও এমন অবস্থা ওদের নতুন ফোন নম্বরটা জোগাড় করতে পারিনি। আজও সকালে এসে মেয়ে, অনিকা বলে গেছে চারটের সময় বেরবে আমি যেন কোনও কাজ না রাখি। কোথায় নিয়ে যাবে গেলে জানতে পারবো। এরা কোনওদিন তার প্রয়োজনটুকু বোধ করেছে।
আরও অনেক কথা আছে তোমায় বলছি না। জ্যেঠিমনির কাছ থেকে জেনে নাও। জ্যেঠিমনি তোমাকে সম্পূর্ণ বলেনি।
বড়োমা, জ্যেঠিমনির মুখের দিকে তাকাল।
তোমাদের একটা অনুরোধ করবো।
বল। বড়োমা আমার মুখের দিকে তাকাল।
যার জিনিষ তাকে বুঝে নিতে দাও। তোমরা এর মধ্যে মাথা গলাবে না। তোমাদের সকলের খাওয়া পড়ার দায়িত্ব আমার। আমি, মিত্রা, তনু যতদিন বাঁচব তোমাদের কাউকে কারুর কাছে কোনওদিন হাত পাততে হবে না। ক্ষমা চাইতে হবে না।
বড়োমা আমার মুখের দিকে তখনও চেয়ে রয়েছে।
এখন যাও। আজ সবাই মিলে একটু আনন্দ করবো, তোমরা মন খারাপ করবে না।
বড়োমা কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে উঠে দাঁড়ালো। সবাই বেরিয়ে গেল।
কনিষ্ক আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
একটা সিগারেট দে খাই।
আমার প্যাকেটটা শেষ হয়েগেছে। বটা দে।
বটা একটা সিগারেট আমার হাতে দিল।
বুঝলি কনিষ্ক ভাবছি কয়েকদিনের জন্য কোথাও পালিয়ে যাব।
তাই বরং যা। আগে তবু সপ্তেহে একদিন কিংবা পনেরো দিনে একদিন ভালোপাহাড়ে যেতিস। এখন সেখানে যাওয়াও বন্ধ করে দিয়ছিস।
নীরু, শ্রীপর্ণা রাতে আসবে?
আসবে।
বাচ্চাটা এখানে না হস্টেলে।
হস্টেলে।
তোরটা আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো।
না বুঁচকি বোচনের থেকে দেড় বছরের ছোটো।
তারমানে!
এবার উচ্চমাধ্যমিক দেবে।
বটার দিকে তাকালাম।
টিনারা এলো না?
অফিসে কিসের মিটিং চলছে। আমরা যখন বেরলাম তখন শেষ হলো।
এই দেখ ভুলে গেছি।
কি? কনিষ্ক বললো।
টিয়া কেমন আছে?
কাল না হলে পর্শু ছেড়ে দেব।
কি হয়েছিল কি?
বেটক্কর লেগে গেছে। চোখের কোলে রক্ত জমে গেছে।
আর কিছু হয়নি তো?
মুখটা বেঢপ দেখতে হয়ে গেছে। দিন কুড়ির ধাক্কা।
বিতান কোথায়?
কাল থেকে নার্সিংহোমে গ্যারেজ। মামা-মামী, টিয়ার মা-বাবাকে বলে দিয়েছি আপনারা কেউ এই মুখো হবেন না। ভিজিটিং আওয়ারে যেমন দেখতে আসেন তেমন দেখতে আসবেন।
কি বদমাস ছেলে ভাব।
সামান্য একটা ব্যাপার নিয়ে গণ্ডগোল। মালের জিগাড়ে ছিল হাত চালিয়ে দিয়েছে।
তা না। ওদের দু-জনের মধ্যে একটা ইগোর লড়াই চলছে। টিয়াটা অনেক বেশি প্রমিসিং। সবাই পছন্দ করে। এটা বিতান কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না।
তা বলে হাত তুলবে! নীরু বললো।
কি বলবি। বেশি বললে বলবে ক্ষমা করে দাও, আর করবো না। পিকুকে দেখ কতোবড়ো সাহস।
পোঁদ পেকে লাল হয়ে গেছে। বটা বললো।
যা শুনলাম অনি না থাকলে ওকে হয়তো ঘুড়িয়ে দিত। নীরু বললো।
পিকুর জন্য চাঁদকে ফিট করেছিল। আমি বললাম।
এ্যাঁ। বলিস কি! কনিষ্ক বললো।
চাঁদকে জিজ্ঞাসা করবি বুঝতে পারবি। চাঁদকে আবার ওমর বলেছে শালা মরে যাবি ওখানে যাস না। ওটা ম্যাডামের বোনের ছেলে। ততদিনে চাঁদ পাঁচ লাখটাকা খেয়ে নিয়েছে।
কনিষ্ক হাসতে হাসতে কেশে ফেললো।
তবে চাঁদ, ইসির কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে।
ওরে অনি তুই এসব কি শোনাচ্ছিস! নীরু বললো।
ইসিকে জিজ্ঞাসা করিস। বেচারা ভয়ে প্রেসার ধরিয়ে ফেললো। বরুণদা শুধু ফোনে খবর নিচ্ছে শালির কাছে, সকাল থেকে এই পথ এখনও মাড়ায়নি।
আজকে চাঁদ তোর পা টিপছিল কেন?
আমি দেড়শো চেয়েছিলাম। দাধিয়া একশো বিশ পঁচিশে রফা করতে চাইছে।
নীরু কনিষ্ক হেসে এ ওর ঘাড়ে গড়াগড়ি খায়।
বটা হাসতে হাসতে বললো, তুই শালা বহুত হারামী।
ওটা কি চাঁদ হ্যান্ডেল করবে। কনিষ্ক বললো।
রতনকে দায়িত্ব দিয়েছি। এবার চিনা, ওমরও পেছনে লেগে যাবে।
টাকাটা কি করবি।
রতনরা একটা ফার্ম করেছে। আফতাবভাইয়ের প্রজেক্টে কাজ করতে গেলে টাকার দরকার। পাবো কোথায়? প্রথমে ভেবেছিলাম আলতাফকে টাকাটা দেব, আলতাফ মাটি কিনবে। পরে আলতাফ নিজেই বললো, আমার লাগবে না, তখন ওদের বললাম ওখান থেকে নিয়ে সুবীরের ব্যাঙ্কে ঢুকিয়ে দে। ওর এগেনস্টে লোন নে। আমি কাজের অফার লেটার দেব। তাহলে সুবীরের লোন দিতে অসুবিধে নেই।
তখন ইসলামভাই ব্যাপারটা বুঝে নেবে। কনিষ্ক বললো।
আমি হাসতে হাসতে মাথা দোলালাম।
তিনজনেই হেসে চলেছে। আমিও হাসছি।
তুই শালা বহুত ঘোরেল মাল।
বুঝছিস না, এই ভাবে না বাটলে দু-দিনে ফুটিয়ে দেবে।
মিত্রা, ইসি, তনু এসে ঘরের দরজার সামনে দাঁড়াল।
আমরা এতো হাসাহাসি করছি দেখে তিনজনেই একটু চমকে গেছে। মিত্রা হেসেও হাসতে পারছে না। তনু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। ইসিও অবাক।
ম্যাডাম ভেতরে এসো, দাঁড়িয়ে কোনও লাভ নেই। কনিষ্ক হাসতে হাসতেই বললো।
তিনজনেই ভেতরে এসে আমার পাশে খাটে বসলো।
দেখছিস নীরু, তোর ম্যাডামের চোখমুখ দেখছিস আমাকে পুরো গিলে খেয়ে নিচ্ছে।
নীরুদের হাসি তখনও থামেনি।
নীরু ইসির দিকে তাকাল।
হাই না লো।
মিত্রা আমার পেট খামচে ধরলো।
শয়তান সকলে টেনশনে মরছে, তুমি এখানে ফুর্তি করছো।
কনিষ্করা আরও জোড়ে হেসে উঠলো। আমি উঃ উঃ করছি।
সত্যি অনি তোর শরীরে এক ফোঁটা শক্তি নেই দিমাকের শক্তি অফুরন্ত। কনিষ্ক বললো।
মিত্রা ছেড়ে দিয়েছে। আমি ওর হাতটা চেপে ধরলাম।
হাসতে হাসতেই কনিষ্কর দিকে তাকিয়ে বললাম।
সকালে ঘুম থেকে উঠতেই মিত্রা দিমাকটা চেটে দিল। তখনই শালা ঠিক করলাম আজই তোকে বধ করবো। এই সুযোগ ছারলে তুই ব্যাটা পিছলে যাবি।
আন্টি? নীরু বললো।
রাখ তোর আন্টি, আজ বাদে কাল টেঁসে যাবে। আমার সব পরিকল্পনা গিও।
ম্যাডাম তাহলে সক্কাল সক্কাল দিমাগটা চেটে উপকার করেছে বল। বটা বললো।
এইজন্য ওকে ডিভোর্স করে তনুকে বিয়ে করেছি।
মিত্রা আবার খামচাতে আসছিল ওকে জাপ্টে ধরলাম।
সবার সামনে ঠোঁটে কামর দেব।
নীরু তরাক করে লাফিয়ে উঠলো।
মিত্রা চোখ দিয়ে হাসছে। তনু, ইসি এখনও ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি। তবে ওদের চোখ মুখ বলছে যাক বাবা তোমাকে এতোটা ভাল দেখছি যখন তাহলে সব কিছু ঠিক আছে।
আমাদের এতো হাসির কারণ এখনও ঠিক মতো বুঝে উঠতে পারছো না, তাই না ? কনিষ্ক তনুর দিকে তাকিয়ে বললো।
কি করে বুঝবো। কখনও মেঘ দেখছি কখনও চরচরে রোদ্দুর। তনু বললো।
সকাল থেকে একশো পঁচিশ কোটি কামাই হয়েছে।
যাঃ। মিত্রা কনিষ্কর দিকে তাকাল।
হ্যাঁগো ম্যাডাম। ওর কাছে সেই স্কিমটা শুনেই এতো হাসাহাসি করছি। নীরু বললো।
কে দিল?
দাধিয়া।
মিত্রা হাসি হাসি মুখে আমার দিকে তাকাল।
সত্যি!
ব্যাটা চাঁদকে দিয়ে ইসিকে চমকাতে পাঠিয়েছিল, জ্যেঠিমনিকে ছোটো বড়ো কথা শুনিয়েছে। ওকে ছেড়ে দেব ভেবেছিস।
সেই জন্য চাঁদ, রতন বেরিয়ে গেল।
বেরিয়ে গেছে!
ওরা বেরতেই অনিমেষদা পাঠাল তোরা একটু ওই ঘরের হাওয়া বুঝে আয়। আবার ও কোনও গণ্ডগোল পাকাল কিনা।
তনু শিগগির গিয়ে অনিমেষদাকে বলে আয়। সে আবার এর মধ্যে কটা ফোন করল কে জানে।
তনু বেরিয়ে গেল।
তবে তোর স্কিমটা সুপার। কনিষ্ক বললো।
মিত্রার আরও দুটো জমি আছে। রতনকে বলেছি উদ্ধার কর। যা পাবি এখানে লাগাবি তারপর আমাকে ফেরত দিবি।
সে দুটোও কি এরকম? বটা বললো।
হ্যাঁ। ফিরে পাব কখনও আশা করিনি। বলতে পারিস পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা।
তাহলে ওরা তোর পা টিপবে না তো কি আমার পা টিপবে। নীরু বললো।
আমিও পরের ধনে পোদ্দারি করে চলেছি। মিত্রার দিকে তাকালাম।
মিত্রা মিষ্টি করে হাসছে।
ইসি, বরুণদা এসেছে?
বিকেলের দিকে আসবে বললো।
ছেলের বিয়ে দিলি, খাওয়াবি কবে?
আমি কিছু ভাবতে পারছি না।
ছেলের বৌকে তোর স্কুলের হেডমিস্ট্রেস করে দে। ছেলে প্রিন্সিপ্যাল। তুই ছুটি নিয়ে নে।
তাহলেই হয়েছে দু-দিনে ডকে তুলে দেবে।
পেটকা জ্বালা বড়ো চিজ বুঝেছিস ইসি। পেটে টান পরলে সবাই সিধে হয়ে যাবে।
কিচ্ছু হবে না।
মাঝের কুড়িটা বছর আমি ছিলাম না। জানিনা তোরা কিভাব ওকে হ্যান্ডেল করেছিস।
তুই শেয়ারটা ট্রান্সফার করার পর ও ধরাকে সড়াজ্ঞান করতে শিখেছে।
ওটা তোদের পরিবারের জিনিষ। আমার কাছে গচ্ছিত ছিল, ফেরত দিলাম। আমার অন্যায়টা কোথায় বল।
আমি তা বলিনি।
তোর বোন আমাকে দু-হাত ভরে দিয়েছে। এখনও দিয়ে চলেছে। তবু মিত্রা, তনু, অনিকা, অনিসা আমাকে দিনরাত গালাগাল করে। কারন, আমার চালচলনটা ঠিক ওই মাপের মানুষের মতো নয়।
আচ্ছা আমি কি ইচ্ছে করলে পারি না?
পারি। কিন্তু কোথায় যেন বাধ বাধ ঠেকে। ভাবি আমি একা কেন খাব। আমার চারপাশে যারা আছে, তাদের সঙ্গে যদি এইটুকু জিনিষ শেয়ার করতে পারি, ভাল লাগবে।
সবাই তোর মতো নয়।
তবু পিকুর মা-বাবা আছে। আমার কে ছিল?
ইসি আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকাল।
ইয়েস, মনাকাকা। কাকা কিন্তু মা-বাবার শূন্যস্থান পূরণ করতে পারেনি। তবে সাধ্য মতো তার দায়িত্ব পালন করেছে। দেখবি মনাকাকার এই গুণটা আমার মধ্যেও পাবি। বড়োমা, ছোটোমা, দাদা, মল্লিকদার কাছে আমি অনেক কিছু পেয়েছি। বৌদি, অনিমেষদা, জ্যেঠিমনি কত নাম করি বলতো, এরা সকলে আমাকে স্নেহের আশ্রয় দিয়েছে। মা-বাবার শূন্যস্থান এরা আমার অনেকটা পুষিয়ে দিয়েছে। তবু কোথায় যেন আমি তাদের মিশ কিরি। সেই শূন্যস্থান আমি এখনও খুঁজে চলেছি ইসি।
অনিকার মধ্যে অনিসার মধ্যে মাঝে মাঝে আমি তার ঝলক দেখতে পাই। আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করি, ভয় পাই। অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি, ফস্কে যায়। এবার যা, অনেক বাজে কথা বলে ফেললাম। মনে কিছু করিস না।
ইসি উঠে এসে আমার পায়ের কাছে হাঁটু ভাঁজ করে বসে হাত দুটো ধরে মুখ ঢাকলো। ঝড় ঝড় করে কেঁদে ফেললো। ও যে এরকম একটা ব্যাপার ঘটাতে পারে কেউ বিশ্বাস করতে পারেনি। সবার চোখে মুখেই তার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে।
সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। হঠাৎ পরিবেশটা এত গুরুগম্ভীর হয়ে যাবে কেউ ধারণাও করতে পারেনি। চমকে দরজার দিকে তাকাতে দেখলাম তনু, বড়োমা, ছোটোমা, বৌদি গেটের মুখে দাঁড়িয়ে। ওরাও কেমন অবাক।
একটু আগে তনু গিয়ে যে সংবাদ দিয়েছে তার সঙ্গে একবারেই মিলছে না।
আমি ইসির দিকে তাকালাম।
তুই কাঁদছিস, আমার একটুও কষ্ট হচ্ছে না ইসি। বরং ভীষণ আনন্দ হচ্ছে। অন্ততঃ তোর মনের বন্ধ দুয়ারে আমি আঘাত করতে পেরেছি।
তুই আগে কেন এভাবে বলিসনি।
ইসি আমার হাতের থেকে মুখ তোলেনি। কেঁদে চলেছে। ঘরের সবার চোখেমুখে বিষ্ময়।
বলেছি, একবার নয় বহুবার, তুই বুঝিস নি। আমি ধারণা করেছিলাম তুই মিত্রার থেকে অনেক বেশি বুদ্ধিমতী। এখন দেখছি ঠিক তার উল্টো।
তুই আমাকে তোর পাশে থাকতে দে।
আমি তোকে দূরে সরিয়ে দিইনি। তোর ওপর রাগ হয়। জ্যেঠিমনির ওপর বেজায় অভিমান হয়। তোরা দু-টো তো জ্যেঠিমনির কাছে মানুষ হয়েছিস। কই বকে যাসনি। তাহলে? খারাপ লাগে এইটা দেখে একটা ছেলের লাইফ শেষ হয়ে গেল তোদের দু-জনের টানা পোড়েনের জন্য। আর সেই মানুষটার কথা ভাব। কোনওদিন তোর কাজে বাধা দেয়নি, বুঝতে দেয়নি তার ভেতরের কষ্টটা।
আমাকে তুই আর একটা সুযোগ দে।
এক তরকারি ভাত, সেটাও তুই নুনে পুরিয়ে দিলি। শ্রেফ নিজের গোঁয়ার্তুমিতে।
আমি তোকে কথা দিচ্ছি।
চেষ্টা কর। আমার সাহায্য তুই পাবি।
তুই আমার একটা অনুরোধ রাখ।
ইসি আমার হাত থেকে মুখ তুললো। জ্যেঠিমনি পায়ে পায়ে ভেতরে এসেছে।
ইসির চোখ দুটো অসম্ভব লাল। চোখের পাতা জলে ভিজে কাদা।
তুই তোর উইলের শর্ত অনুযায়ী শেয়ারটা ফিরিয়ে নে।
তোর কথা মতো ফিরিয়ে নিলাম। তারপর।
ও চাকরি করে খাবে।
তাতে রেক্টিফাই হবে।
যে মৃত্যুকে ভয় পায় না, তাকে রেক্টিফাই করা যায় না। আমার বিশ্বাস যে মৃত্যুকে ভয় পায় তাকে রেক্টিফাই করা যায়।
চাবুকের আঘাতের মতো কথাটা সবার কানে গিয়ে বিঁধলো। অবাক চোখে সকলে ইসির দিকে তাকিয়ে। এ কি কথা বলছে ইসি!
আমি মুচকি হেসে ইসির গালদুটো টেনে ধরলাম। তারপর ওর মুখটা পদ্মফুলের মতো আমার দুই হাতের তালুতে তুলে নিলাম। চোখে জল টল টল করছে। আমি দুই হাতের বুড়ো আঙুলের সাহায্যে তা মুছে দিলাম।
এই তো তুই আসল সত্যটা বুঝে ফেলেছিস।
আমি পারবো অনি তুই একটু সাহায্য কর।
আমি তোকে কথা দিয়েছি। তুই যখন যে ভাবে চাইবি, সাহায্য করবো। এবার একটু হাস। সবাই আমার দিকে কেমন ভাবে তাকিয়ে আছে। ভাবছে আমি হয়তো মেন কালপ্রিট।
কে কি ভাবলো, কে কি ভাবছে আমার জানার দরকার নেই, আমি অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করি, তুই কোনওদিন আমাদের ক্ষতি চাসনি।
যা বাথরুমে গিয়ে মুখে চোখে জল দিয়ে নে, অনিমেষদা, বিধানদা দেখলে ভাববে ছেলেটা কি সব পাগলাম শুরু করে দিয়েছে। আবার টেনশনে পড়ে যাবে।
তুই যতটা জেনেছিস কেউ এখনও অতটা জানে না।
এখন থাক। এগুলো নিয়ে আলোচনা করার অনেক সময় আছে। চল একসঙ্গে খেতে বসি। মেয়ে, অনিকা হুকুম করে রেখেছে আমাকে নিয়ে কোথায় বড়বে।
ইসির ঠোঁটদুটো ফুলে ফুলে উঠলো, আমি ওর ঠোঁটে আঙুল রাখলাম।
আর একবারে নয়। আমি কথা দিয়েছি।
ইসি আমার হাতের তালুতে মুখ ঢাকলো। মিত্রা আমার কাঁধে মাথা রেখেছে।
তনু এগিয়ে এসে ইসির পিঠে হাত রাখলো। ক্ষীণ কণ্ঠে ডাকলো, ইসিদি।
কনিষ্ক, নীরু, বটা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ভাবছে হঠাৎ করে কি ঘটে গেল।
ছোটোমা, বড়োমা, বৌদি, জ্যেঠিমনি স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে।
তনু, ইসিকে নিয়ে বাথরুমে গেল। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এলাম।
হই হই করে খাওয়া-দাওয়া হলো। পিকু-নম্রতা ছিল। বরুণদাও খুব মজা করলো। বুঝলাম ইসি সব বলেছে। মুখটা এখন অনেক পরিষ্কার।
বুঁচকি, বোচনরা বেশ ভাল রান্না করেছে। পক্কে, ঘণ্টাও দেখছি পেছনে লাগতে শুরু করেছে। মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো এমন ঠেকা দিচ্ছে হাসির ফোয়ারা ছুটছে।
অনিসা খুব জোড় তার ডাক্তারদাদাইয়ের পেছনে লেগে পরেছে। আন্টি বেশ মজা পাচ্ছে। খাওয়ার শেষে ছোটোমা আমাকে হাত ধরে বড়োমার ঘরে নিয়ে এল।
মাম্পি, মিকি দু-জনেই অঘোরে ঘুমচ্ছে। একে একে দেখলাম বৌদি, জ্যেঠিমনি, বড়োমা এলো।
সকলে আমাকে চেপে ধরলো কি হয়েছে বল। কেন ইসি কাঁদছিল।
আমি কি বলবো, শুধু বললাম সমস্যাটা ওদের, ওদের বুঝে নিতে দাও। জ্যেঠিমনির দিকে তাকিয়ে বললাম, তুমি যদি কিছু জেনেও থাকো না জানার ভান করবে। তুমি চিরদিন থাকবে না। ওদের জিনিষটা ওদের বুঝে নিতে দাও।
আমি তোকে বলবো ভেবেছিলাম। বড়োকে, ছোটোকে আর কত বলি বল। আমারও বয়স হয়েছে।
দেখো জ্যেঠিমনি, আমার মিত্রার মধ্যে কোনও সমস্যা নেই? অবশ্যই আছে। তার ওপর তনু। কই তোমরা কিছু বুঝতে পার। বড়োমা, ছোটোমাকে মিত্রা নালিশ করে আমার বিরুদ্ধে। কই সেখানে কোনও সমস্যার সৃষ্টি হয় না। যুক্তি দিয়ে তোমাকে বোঝাতে হবে। বুঝতে হবে।
কেউ যদি অবুঝ হয় তাহলে কি করবি। বড়োমা বললো।
তার ফল তাকে ভোগ করতে হবে। এর অনেক উদাহরণ তোমাদের দিয়েছি।
অনিমেষদা গেটের সামনে এসে দাঁড়াল। মিটি মিটি হেসে বললো।
বাবা, ভাবলাম খেয়েদেয়ে ওকে নিয়ে একটু বসবো। দেখছি তোমরা খপ করে ধরে ফেলেছ।
কেন চিকনা সব বললো তো, তাতে আশ মেটেনি। বৌদি কট কট করে উঠলো।
চিকনার মুখে শোনা, আর ওর মুখে শোনার মধ্যে পার্থক্য আছে।
কোনও পার্থক্য নেই চিকনাকে ও তৈরি করে দিয়েছে। চিকনা ওর পার্মিশন ছাড়া একটা কাজও করবে না। বৌদি কট কট করে চলেছে।
ঠিক আছে ঠিক আছে, তোমাদের বিরক্ত করবো না।
অনিমেষদা গেটটা ভেজিয়ে চলে গেল।
বৌদি আমার মুখের দিকে তাকাল। সত্যি সকলকে তুই এমনভাবে বেঁধে রেখেছিস।
আমি বৌদির মুখের দিকে তাকালাম।
কাউকে বেঁধে রাখিনি। আমি আমার দায়িত্বগুলো সম্পূর্ণ করছি। কোনও একটা দিন তুমি, আমি, সুরো, অনিমেষদা এক সঙ্গে খেতে বসে এই ধরণের অনেক কথা আলোচনা করেছি। আজ সময় সুযোগ এসেছে। বাস্তবায়িত হবে। এর জন্য টেনশন করার কোনও কারণ নেই। তোমার জিনিষ তুমি সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করবে না?
আমি বড়দিকে, ছোটোকে বলেছি।
বড়োমা, ছোটোমার থেকে তুমি আমায় আগে দেখেছ। বেশি জানবেই।
সোনাদির ব্যাপারে কি ভাবলি?
কেন মিত্রা তোমাদের কিছু বলেনি!
বলেছে।
তাহলে?
তোর মুখ থেকে শুনতে চাই।
একটু আগে দাদাকে তুমি কি বললে?
এভাবে হবে না দিদি আমি ওর পাশে গিয়ে বসি।
ছোটোমা খাট থেকে উঠে এলো। আমি ছোটোমার গলা জড়িয়ে ধরলাম।
বড়োমার মুখটা দেখেছ। গাল ফুলিয়ে দেখালাম।
কিছু বলে না যে, সেই জন্য মাথায় চড়ে বসেছিস। ছোটোমা বললো।
সকালবেলা পদু, অজন্তা এসেছিল। বৌদি বললো।
কই আমার সঙ্গে দেখা করলো না—
তখন তুই ঘুমচ্ছিলি। দিদির কয়েকটা জিনিষ ফ্ল্যাট থেকে দিয়ে গেল। পদুকে গাড়ির চাবি দিল। ড্রাইভারকে নিয়ে বিকেলে গাড়িটা এখানে রেখে যাবে।
আন্টিক দেখে তোমাদের কি মনে হচ্ছে?
অতীতটা ভুলে থাকতে চায়।
সত্যি কথা কি জানো, এই সময়টা একটা মানুষ যেটা আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায় আন্টির সেটার বড়ো অভাব। আমার থেকে তুমি, বড়োমা, ছোটোমা, জ্যেঠিমনি সবচেয়ে বেশি অনুভব করবে।
সোনা যদি যেতে না চায় থাক না—বড়োমা বললো।
দেখো বড়োমা আন্টিকে নিয়ে সমস্যা নেই। সমস্যা তার সম্পত্তি নিয়ে। আন্টির যদি কোনও সম্পত্তি না থাকতো কোনও ছেলে-বৌ, মেয়ে-জামাই, নাতি-নাতনি তার ধারে কাছেও ঘেঁসতো না।
সোনা, পিকু-নম্রতার বিয়ে দিতে চাইছে।
বিয়েতো হয়ে গেছে। দেবে কি? বলো অনুষ্ঠান করতে চাইছে।
তুই পরিষ্কার করে কখনও কিছু বলিস না। ছোটোমা বললো।
অপরিষ্কার কোথায় বললাম। দুজনেই প্রাপ্ত বয়স্ক। ম্যারেজ রেজিষ্ট্রি করেছে। এখন দু-জনেই আইনের চোখে স্বামী-স্ত্রী। তুমি আমি কি করবো?
কেন তুই কিছু করতে পারবি না।
যতটুকু আমার করার ছিল করেছি। তাই আজকে এই ঘটনা ঘটলো। হয়তো কিছু অঘটন ঘটতে পারতো। আমার জন্য হয়নি। আমি সেটা রুখেছি। তাই এই অবস্থা।
বাবা চারটে বাজতে পাঁচ।
তাকিয়ে দেখলাম অনিকা, অনিসা গেটের মুখে দাঁড়িয়ে। মেয়ে আজ শাড়ি পরেছে। এই প্রথম ওকে শাড়ি পরা অবস্থায় দেখছি। ভীষণ মিষ্টি লাগছে।
ঢঙি। বাবাকে নিয়ে কোথায় বেরবি রে? ছোটোমা বললো।
মেয়ে, অনিকা দুজনেই হাসছে।
চলো। ওঠো।
শাড়ি কে পরাল। বৌদি বললো।
দিদি।
এবার থেকে আর ওই প্যান্টজামা পরবি না। শাড়ি পরবি।
দিদাই আজ রাতে আবার নাচ হবে। অনিসা চোখ নাচালো।
কে বললো?
বাবা সব ঠিক করে রেখেছে। সময় হলেই দেখতে পাবে।
ছোটোমা আমার মুখের দিকে তাকাল।
কিরে মেয়ে কি বলে!
ওরা একটু আনন্দ করবে।
উঠে দাঁড়ালাম।
কোথয় যাবি? ছোটোমা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
জানিনা। কোথায় ধরে নিয়ে যায় দেখি।
কথা শেষ হলো না। মেয়ে এসে হাত ধরে হিড় হিড় করে টানতে শুরু করলো।
ঘরের বাইরে আসতেই ডাক্তারদাদা সোফা থেকে চেঁচিয়ে উঠলো।
অনি।
আমি তাকালাম।
আজ ছোটোগিন্নীর সঙ্গে রেস্ট্রি করছি। হিমাংশুক আসতে বলেছি। তুই আমার কাগজটাতে সই করিস।
হ্যাঁ বুড়ো, আমার সঙ্গে কেন, তোমার তো আছে। আন্টি দিদাইয়ের সঙ্গে রেস্ট্রি করতে পারছো না। অনিসা তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো।
সারাটা ঘরে হাসির শব্দে রিনিঝিনি করে ছড়িয়ে পরলো।
ফিরে আসি তোমার হচ্ছে দাঁড়াও। অনিকা কট কট করছে।
আমাকে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
বাগানে কনিষ্করা চেয়ার পেতে সব গোল হয়ে বসে আছে। নির্মাল্য, দেবাশিস, টিনা, অদিতি, মিলি, সুরো সবাই আছে। মাম্পি, মিকিকে দেখলাম আরও কয়েকটা বাচ্চার সঙ্গে খেলছে। একপাশে ঘণ্টা, পক্কে, শুভ, সুন্দর, অনন্য বসে গল্প করছে। ইসলামভাই, চিকনা গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। একবারে গেটের কাছে বাসুরা বসে আছে। নীপাকে দেখতে পেলাম না।
তুমি চেঞ্জ করবে চলো। অনিসা বললো।
কেন এটা পরে যাওয়া যাবে না।
তুমি না সত্যি। তুমি কিন্তু মা, ছোটোমার সঙ্গে বেরচ্ছ না। আমাদের সঙ্গে বেরচ্ছ।
দুজনে হাত ধেরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে এ ঘরে নিয়ে এসে ঢোকাল।
পেছন থেকে কনিষ্কর গলার আওয়াজ পেলাম, অনিরে তুই আজ ফেঁসেছিস।
খাটে তনু, ইসি, নীপা বসে। মিত্রা আলমাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে।
বার করেছো। অনিসা বললো।
দেখ কোনটা তোর বাবাকে পরাবি।
উঃ মা সত্যি তুমি একটা ঢ্যাপস।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেললো।
তুমি একটুও মনে রাখতে পারো না।
মেয়ে আলমাড়ির সামনে এগিয়ে গেল। তোমার রিসেপসনের পাঞ্জাবীটা কোথায়?
কোনটা বল?
এই বাড়িতে যেটা পড়েছিল।
ওটা তোর বাবার লক এণ্ড কি-তে আছে।
মেয়ে আমার দিকে তাকাল। চাবি দাও।
আজ অন্যটা পরি।
না ওটা পড়বে।
ঠিক আছে ফিরে এসে পড়বো আমি তোর মাকে বলে যাব বার করে রাখতে।
ছোটোমা, তুমি বাবার জন্য যে পাঞ্জাবীটা কিনে আনেলে সেটা কোথায়?
মিত্রা খাটে গিয়ে বসলো।
আলমাড়ি খোলা আছে, তোদের পছন্দ মতো বার করে নে। তনু বললো।
আমি বাথরুমে ঢুকলাম হাত-মুখ ধুয়ে বেরিয়ে দেখলাম খুঁজে খুঁজে একটা গেড়ুয়া কালারের পাঞ্জাবী বার করেছে। বিয়ের দিন এখান থেকে ওটা পরে মিত্রার বাড়িতে গেছিলাম। বৌদিরা যখন গায়ে হলুদ মাখাল তখন খুলে রেখেছিলাম।
আমাকে দেখে মিত্রারা হাসাহাসি করছে।
আমি পাজামা পাঞ্জাবী পড়লাম। তনু হাসতে হাসতে বললো।
দিদি অনি ব্যানর্জীকে শাসন করার মতো তাহলে একটা গার্জেন পাওয়া গেল।
তোমরাও হেতে পারতে। অনিসা বললো।
মিত্রা, তনুর দিকে টেরিয়ে দেখলাম।
বাবার গায়ে সেন্ট দিবি না?
এখন না রাতে।
মিত্রাকে বললাম, কিছু টাকা দে।
ভাগ এখান থেকে, সকালে একশো পঁচিশ ইনকাম করেছিস, এখন ধার চাইতে লজ্জা করছে না।
তনু দাও।
কতো।
বেশি না পঞ্চাশ টাকা।
মেয়ের কাছ থেকে নাও।
অনিকা, অনিসা দুজনে হাসছে।
সত্যি তোমার কাছে পয়সা নেই!
ঠিক আছে থাক আমি বড়োমার কাছ থেকে নিয়ে নিচ্ছি।
যা বড়ামার কাছ থেকে নিয়ে নে। মিত্রা বললো।
আমার কাছে আছে। অনিকা বললো।
খরচা তোরা করবি। পকেটে রাখতে হয় তাই রাখবো।
ইসি, নীপা হেসে গড়িয়ে পরে।
টেবিলের ওপর থেকে মোবাইলটা নিয়ে আমি বেরিয়ে এলাম। মেয়েদের দিকে তাকিয়ে বললাম, তোরা যা আমি যাচ্ছি।
মানিপার্সটা নিয়েছিস? মিত্রা পেছন থেকে চেঁচাল।
পয়সা নেই নিয়ে কি করবো।
আমি এই ঘরে এলাম। ডাক্তারদাদা, দাদা, আন্টি, মল্লিকদা সোফায় বসে। চা খাচ্ছে। দামিনীমাসিকে দেখলাম রান্নাঘরে কি করছে।
আমি বড়ামার ঘরে ঢুকলাম। চারজনে বসে কথা বলছে। বড়োমা আমার মুখের দিকে তাকাল।
বেরচ্ছিস?
হ্যাঁ।
এটা বুঝি মেয়ে পরাল?
কি আর করা যাবে।
মেয়ের সঙ্গে ঝগড়া করিসনি?
না। তুমি আমাকে পঞ্চাশটা টাকা দাও।
পেছন দিকে হাসির আওয়াজ হলো। তাকিয়ে দেখলাম মিত্রা, তনু, ইসি দাঁড়িয়ে।
ছেলেকে পঞ্চাশ টাকা ধার দাও। মিত্রা বড়োমাকে চোখ পাকিয়ে বললো।
বৌদিরা হাসছে।
সত্যি তোর টাকা নেই? ছোটোমা বললো।
ছিলো কালকে একজনকে দিলাম। ভেবেছিলাম সকালে এক ফাঁকে বেরিয়ে তুলে আনবো। বেড়তে পারলাম না। তোলাও হলো না। খালি পকেটে বরবো, তাই।
পঞ্চাশ টাকা হলে হয়ে যাবে।
হয়ে বেশি হয়ে যাবে। খরচ ওরা করবে।
তুই যখন খরচ করবি না। তাহলে নিয়ে দরকার নেই। খালি পকেটে যা। বাসে ট্রামে ওঠার ঝামেলা নেই।
দাও না। দেরি হয়ে যাচ্ছে।
পঞ্চাশ নেই, পাঁচশো আছে নিয়ে যা।
তাই দাও।
বড়োমা, জ্যেঠিমনি, বৌদি আমার কথা শুনে হেসে গড়িয়ে পরে।
ছোটোমা উঠে গিয়ে বড়োমার আলমাড়ি থেকে বার করে দিল।
আমি নিয়ে পকেটে রাখলাম। মিত্রার দিকে তাকালাম।
(আবার আগামীকাল)