জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১৫৯ নং কিস্তি
হিসাবটা তোর সঙ্গে রাতে করবো।
সে তুই যা পারিস করবি। রাখে হরি, মারে কে।
হরি আমি, মারবও আমি।
আমি বেরিয়ে এলাম।
দেখলাম গাড়ির কাছে নেপলা আর চিকনা দাঁড়িয়ে। রতনদের দেখতে পেলাম না।
তাহলে বেরচ্ছিস? রূপায়ণদা চেঁচাল।
ঘুরে আসি।
আয়।
অনিমেষদা, বিধানদা, অনুপদা হাসছে।
রূপায়ণ, বাবু আজও ধার কর্য করলেন। বৌদি বললো।
পেছন ফিরে তাকালাম, বৌদি, ছোটোমা বারান্দায় দাঁড়িয়ে।
সবাই হাসছে, কনিষ্ক, নীরু প্যাঁক দিল।
আমি গাড়িতে উঠে বসলাম, আমার দুই পাশে অনিকা, অনিসা। সামনে চিকনা ইসলামভাই। নেপলা ড্রাইভিং সিটে। আমি একবারও জিজ্ঞাসা করলাম না কোথায় যাবি কি বৃতান্ত।
গেটের বাইরে আসতে নেপলা বললো, অনিকা কোথায় যাবি?
একটা ফুলের দোকানে আগে দাঁড় করাও। অনিসা বললো।
আমি দু-জনের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছি। খুব ইচ্ছে করছে জিজ্ঞাসা করি কোথায় যাবি। উৎসাহ দেখালাম না।
নেপলা গড়িয়াহাটের মুখে এসে একটা ফুলের দোকানে দাঁড়াল। অনিকা, অনিসা নেমে গেল।
অনিদা চা খাবে? নেপলা বললো।
নিয়ে আয়।
ইসলামভাই তুমি মেয়ের সঙ্গে গেলে না?
গাড়িতে ওঠার আগে চুক্তি করে নিয়েছে। কোনও কথা বলবে না।
চিকনা হাসছে।
তোকেও কি তাই বলেছে?
আমাকে সেরকম কিছু বলেনি। বুঁচকি গম্ভীর হয়ে বললো, কাজ না থাকলে আমাদের সঙ্গে যেতে পারো। তোকে কি বলেছে?
আমাকে সকালে বলে রেখেছিল চারটেতে বেরবো দু-ঘণ্টার জন্য কোনও কাজ রাখবে না।
নেপলা একটা ছেলেকে ধরে আনলো। ছেলেটা ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লেবু চা বানিয়ে দিল।
আমাদের চা খাওয়ার মাঝেই ওরা ফিরে এলো। অনেক ফুল কিনেছে। সঙ্গে ধূপ মোমবাতি।
অনিকার দিকে তাকালাম। মন্দিরে যাবি?
না। মার কাছে যাব।
কথাটা শোনা মাত্রই সকলের চোখের চাহুনি একটু বদলে গেল।
আমি ইসলামভাইয়ের দিকে তাকালাম। মুখটা কেমন থমে থমে হয়ে গেছে।
যাও একটা মিষ্টিপান কিনে নিয়ে এসো।
আমি কিনবো না, মেয়ে কিনে নিয়ে আসুক।
আমি অনিকার দিকে তাকালাম। একটা মিষ্টিপান কিনে নিয়ে আয়।
দু-জনেই আমার দিকে একবার তাকাল। হঠাৎ কেন আমি মিষ্টিপানের কথা বললাম।
নেপলা ওদের সঙ্গে একটু যা।
ওরা ফুলের প্যাকেটটা সিটের ওপর রেখে নেপলার সঙ্গে গেল। মুহূর্তের মধ্যে পরিবেশটা কেমন বদলে গেল। চিকনা সামনের সিটে উঠে বসলো।
ওরা ফিরে এলো। কলাপাতায় মোড়া মিষ্টি পান আমার হাতে দিতে গেল।
ওটা ফুলের প্যাকেটে রাখ। তোর মা মিষ্টিপান খেতে ভালোবাসতো।
অনিকা আমার দিকে তাকাল। চোখের ভাষায় জিজ্ঞাসা, কই আগে বলোনি!
তাকাস না, সব কি আর মনে থাকে। তা হঠাৎ মায়ের কাছে যেতে মন চাইল। আজ সেরকম কোনও দিনক্ষণ নয়।
অনিকা আমার দিকে টেরিয়ে তাকাল।
মনে হচ্ছে দু-বোনে যুক্তি করে কোথায় একটা প্যাঁচ মেরে রেখেছিস।
তোমার সবেতেই সন্দেহ।
অনিকা আমার দিকে তাকাল। অনিসা মুচকি মুচকি হাসছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারবো আমি ঠিক না বেঠিক।
বুঝে কি করবে?
পিটবো।
অনিসা হেসে উঠলো।
দেখি তোর মোবাইলটা। অনিকার মোবাইলের দিকে হাত বারালাম।
কেন দেবো, তোমরটায় হাত দিতে দাও।
অনিসার দিকে ফিরে তাকালাম।
আমি না, দিদিভাই প্রোগ্রাম করেছে।
ক্যান্ডি দে।
দিদিভাইয়ের ব্যাগে।
অনিকার দিকে তাকালাম।
ওখানে চলো তারপর দেব।
কাছাকাছি আসতেই দেখলাম দু-তিনটে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। একটা গাড়ির নম্বর দেখে আমার কেমন সন্দেহ হলো। অনিকার দিকে তাকালাম। মিটি মিটি হাসছে।
কান টেনে ছিঁড়ে দেব।
একবারে হাত দেবে না। ছোটোবেলায় মেরে কানের পর্দা ফাটিয়ে দিয়েছিলে মনে আছে।
দেখলাম ইসলামভাই, চিকনা পেছন ফিরে তাকাল।
ওরা ঠিক বুঝতে পারেনি। নেপলা গাড়ির আয়না দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
দেখলি বোন তোকে বলেছিলাম, মামা ঠিক বুঝতে পেরে যাবে।
অনিসার দিকে তাকালাম মুখ নিচু করে হাসছে।
বড্ড বেশি পাকা হয়েগেছিস। দাঁড়া দুটোরই এবার বিয়ে দিয়ে দেব।
ইসলামভাই চিকনা জোড়ে হেসে উঠলো।
তুমি বললেই বিয়ে করবো নাকি।
নেপলা গাড়িটা গেটের সামনে দাঁড় করাল।
একে একে সবাই নামলো। ওরা ফুলের ব্যাগ নিল।
এর আগে এখানে একবার মাত্র এসেছিলাম, যেদিন লেখাটা দাদার হাতে দিয়েছিলাম। মনে মনে বলেছিলাম, দিদি আমি শেষ রক্ষা করতে পারলাম না। তবে তোমার ভালোবাসার জনকে যতদিন বাঁচব আগলে রাখবো, তোমায় কথা দিলাম। তাকে কেউ ছুঁতে পারবে না।
চারিদিক চেয়ে চেয়ে দেখছি। এখন দেখলাম অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। কোথা দিয়ে যে এতগুলো বছর কেটে গেছে তার হিসেব রাখি নি।
তখন এই পাশে অনেকটা ফাঁকা জমি ছিল। এখন পুরো ভড়ে গেছে। এই কবরখানার পাশ দিয়ে বহুবার গেছি। কিন্তু ভতরে ঢোকার তাগিদ কোনওদিন অনুভব করিনি।
ওরা ডানদিকের কলে হাতে মুখ ধুয়ে নিল। আমিও মুখে হাতে জল দিলাম। বাঁদিকের রাস্তাদিয়ে রতন, চিনা, চাঁদ, ওমরকে আসতে দেখলাম। ওদের দেখে একটু অবাক হলাম। কাছে এসে চারজনেই দাঁত বার করে দিল।
তোরা এখানে কি করতে!
প্রয়োজন পরলো তাই এসেছি।
বিদেশীরা কি ভেতরে আছে।
নেপলা হাসতে হাসতে জড়িয়ে ধরলো। অনিকার দিকে তাকাল।
তুই কি মামাকে বোকা ভেবেছিস?
গাড়িটা দেখে সন্দেহ করেছে।
অন্য কেউ হলে করতো?
কখনই না।
রতনের দিকে তাকালাম।
চারদিকটা ভাল করে বেঁধে দিয়েছিস?
নিজেদেরটা নিজেরা বেঁধে নিয়েছে।
ফুল টিম না একজন।
ফুল টিম।
তাহলে তো তোরা করিতকর্মা হয়ে উঠেছিস। চিনা, চাঁদ, ওমর মুখ ঘুরিয়ে হাসছে।
চাঁদ আমার কাজ হয়েছে।
হাফ দিতে চেয়েছিল। বলে এসেছি পর্শুদিন আসবো ফুল দিতে।
চিনা, ওমর নিশ্চই ইঁট পেতেছে।
তুমি না….।
অনিসার দিকে তাকালাম, তুইও অনেক পাকা হয়েছিস।
এতদিন তোমার ডাইরীতে পড়েছি এবার চাক্ষুষ দেখবো।
পায়ে পায়ে ভেতরে এলাম। দেখলাম মেরিনাদিকে যেখানে মাটি দেওয়া হয়েছে সেখানটা বেশ পরিষ্কার। অর্জুন, অভিমন্যু, ঝিনুক, আলতাফ, ভিকু, আপ্পে দাঁড়িয়ে।
আমাকে দেখে অর্জুন ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো। অভিমন্যু, ঝিনুক, আলতাফ, ভিকু, আপ্পে সবাই ঘিরে ধরেছে।
বেশি চাপাচাপি করলে কিন্তু অজ্ঞান হয়ে যাব অর্জুন।
কেন তোমার শরীর এখনও ঠিক হয় নি? ভিকু বললো।
অভিমন্যুরা হাসছে।
ভাইপো, ভাইঝিদের তৈরি করা রান্না খেয়েছিস। আলতাফের দিকে তাকালাম।
আমরা সবাই খেয়েছি।
অর্জুন, ভাইঝি তোর দিকে কিরকম ভাবে তিকিয়ে আছে দেখেছিস। ঝিনুক বললো।
আমি অনিসার দিকে তাকালাম।
তুই তো দেখতে চেয়েছিলি কাউকে চিনিস?
দিদিভাই ছবি দেখিয়েছে।
তোমাকে কতদিন পর দেখছি অনিদা।
অর্জুন ছাড়তে ভিকুরা সবাই একবার করে জড়িয়ে ধরলো।
কেন দেখে যাসনি।
তখন তুমি সেনস্লেস অবস্থায় পড়ে আছ।
ভিকু আমার দিকে কেমন অবাক হয়ে তাকিয়ে। কাছে এগিয়ে এসে বললো।
তোমার মাথাটা নিচু করো।
কেন?
দেখি কতটা কেটেছে।
আবার পাগলামো করে।
তবু ওরা জোড় করে আমার মাথার কাটা অংশটা দেখল।
ভিকু, আপ্পের চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো।
অর্জুনরা তোমায় তখন দেখে গেছিল, আমি আপ্পে দেখিনি।
দেখলে কি করতিস আর দুটোকে মেরে দিতিস এই তো।
ওরা মাথা নিচু করে ওর্নায় চোখ মুছছে।
তোরা ইসলামভাইকে আগে দেখেছিস?
ইসলামভাই, চিকনা একটু দূরে দাঁড়িয়ে।
দাদাভাইকে দূর থেকে দেখেছি। এত কাছ থেকে দেখিনি। অলতাফ বললো।
আমি ইসলামভাইয়ের সঙ্গে সকলের আলাপ করিয়ে দিলাম।
ইসলামভাইকে সকলে নিচু হয়ে পা ছুঁল।
আলতাফ, চিকনার সঙ্গে সকলের আলাপ করিয়ে দিল।
অর্জুন, চিকনাদা অনিদার কার্বন কপি। সেই ক্লাস ওয়ান থেকে এক সঙ্গে পড়েছে। অনিদা, চিকনাদেক বেদম মারতো।
অনিদা মারতো! অর্জুন বললো।
চিকনাদা গল্প করেছে তোদের বলবো।
অনিসা অবাক বিষ্ময়ে সকলকে দেখছে।
এখানে আসার প্রোগ্রামটা কখন করলি। আমি অর্জুনের দিকে তাকালাম।
বোনকে এয়াপোর্টে পৌঁছেই ফোন করলাম। বললাম, দেখ আমার মা নেই। আমার মায়ের মৃত্যুও তোর মায়ের মতো। তোর মতো অনিদাও আমাকে বড়ো করেছে। তোকে যখন বোন বলে ডেকেছি তখন তোর মাও আমার মা। আজ বিকেল বেলা একবার আয়। মার জন্য দুই ভাইবোনে একটু নামাজ পড়ি।
যা আগের কাজ আগে করে ফেল।
সূর্য অনেকটা পশ্চিমদিকে হেলে পড়েছে। ওরা মেরিনাদির সানবাঁধানো দেহের ওপর ফুল দিয়ে সাজালো তারপর ধূপ মোমবাতি জ্বালালো।
অনিসা আমার কাছে এগিয়ে এলো।
বাবা আমি কি করে প্রার্থনা করবো?
হাসলাম। তুমি তোমার মতো করে প্রার্থনা করো।
পাপ হবে না।
প্রার্থনা করার সব পথ এক। পদ্ধতি আলাদা।
মেয়ে আমার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকলো।
কোনও অসুবিধে নেই। তোমার মনের আর্তি যদি ঠিক থাকে, তোমার প্রার্থনা তাঁর কাছে পৌঁছে যাবে। সেখানে স্থান-কাল-পাত্র বলে কিছু নেই।
অনিসা ওর মতো করে সেই সিমেন্টের বেদিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটু মুড়ে চোখ বন্ধ করে বসে থাকলো। আপ্পে দক্ষিণ ভারতের ঋীতি অনুযায়ী তার প্রার্থনা জানাল।
তারপর একে একে সবাই উঠে এলো।
আমি যেমন যে জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলাম তেমনি দাঁড়িয়ে রইলাম। বুকের ভেতরটা কেমন ভাড়ি ভাড়ি লাগছে।
অনিকা এগিয়ে এসে ফুলের ব্যাগ থেক পানটা বার করে আমার হাতে দিল।
যা মায়ের মাথার শিয়রে পানটা রেখে আয়।
তুমি যাও।
আমি তোর মায়ের পাতান ভাই, তুই তার শরীরে আশ্রয় নিয়ে পৃথিবীর আলো দেখেছিস, আমার থেকে তুই দিলে সে বেশি শান্তি পাবে।
অনিকা কোনও কথা বললো না। মাথা নিচু করে চলে গেল।
পানটা রেখে এসে আমার সামনে ছল ছল চোখে দাঁড়াল। আমি ওর দুই কাঁধে হাত রাখলাম।
জানিস তোর বাবা তখন তোর মায়ের ওপর কম বেশি অত্যাচার করতো। তোর বাবাকেও দোষ দিই না। সে জানত না, তখন তুই তোর মায়ের শরীরে বাসা বেঁধেছিস। তোর মা প্রায়ই ফাঁক পেলে আমার কাছে চলে আসতো। তোর বাবা জানতে পারলে ধমক দিত। তখন তোর বাবা কলকাতা শহরের ডন। আমি চুনপুঁটি। আমার এম.এ পরীক্ষার শেষ পেপারটার আগের দিন তোর মা এলো আমার ঘরে। তখন রাত দেড়টা-পৌনে দুটো। আমি পড়ছি। তোর ভজুমামা আমার পাশে শুয়ে আছে।
আমি দিদিকে দেখে একটু অবাক হলাম। চোখ মুখটা কেমন কেমন যেন লাগছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললাম, কি হয়েছে! তোমার চোখ মুখটা কেমন যেন লাগছে! বললো—
তোর ইসলামভাইটা বহুত ঢ্যামনা।
আবার কি করলো!
বললাম মাল খাব না। জোড় করে গেলাল।
তুমি গিললে কেন? প্রেম উথলে উঠেছিল?
ফিক করে হাসলো, ওর কতো টেনশন বল। আমার কাছে আসে একটু শান্তির জন্য।
হুঁ, শরীর খারাপ লাগছে?
ভীষণ বমি পাচ্ছে, গা গোলাচ্ছে। পেটটা কেমন মোচড়াচ্ছে।
ভজুকে ঠেলে তুললাম। ওতো মেরিনাদিকে দেখেই চমকে উঠলো।
কি হয়েছে মেরিনাদি, তোমাকে ইসলামদা মেরেছে, শালাকে আজ কেটেই ফেলবো।
এমনিতে ভজু খুব শাদা-শিধে রেগে গেলে মারাত্মক। ওকে বোঝালাম না কিছু হয়নি। দিদির শরীরটা একটু খারাপ লাগছে। তুই এক কাজ কর, একটা পান কিনে নিয়ে আয়।
ভজু দৌড় দিল। কিছুক্ষণ পর একটা জর্দাপান কিনে হাজির।
দিলাম গালাগাল। তোকে জর্দা পান আনতে বলেছি।
তুমি তো বললে পান আনতে, সবাই যা পান খায় তাই আনলাম।
তারপর নিজে গেলাম। একটা মিষ্টিপান বেশ গুছিয়ে বানিয়ে নিয়ে এলাম।
ওপরে এসে শুনলাম দিদি দু-বার বমি করেছে। ভজু জল এনে দিয়েছে, মুখ ধুয়েছে। তখন এতো সব জানতাম না। দিদি তোকে শরীরে ধারণ করেছে বলে তার এই সব হবে। বললাম পানটা মুখে দাও দেখবে বমি ভাবটা কেটে যাবে।
দিদি পানটা মুখে দিয়ে আমার বিছানায় শুয়ে পরলো। ভজু পাশে। আমি কোনওপ্রকারে বসে সারারাত পরীক্ষার প্রিপারেশন নিলাম। সকালে দামিনীমাসি কিছুটা গালাগাল দিলো। হজম করলাম। পরীক্ষা দিতে চলে গেলাম।
তারপর থেকে দিদিকে দেখতাম পুচুর পুচুর পান চিবচ্ছে। একদিন বললাম।
তুমি কবে থেকে পানের নেশা ধরলে?
হাসতে হাসতে বললো, বুঝলি অনি তোর টোটকাটা বেশ কাজে দিয়েছে। এখন ঘরে পান নিয়ে এসে রাখি। যখনই গা গোলায় পানটা মুখে দিই, দেখি বমি বমি ভাবটা কেটে গেছে।
পারিশ্রমিক চাইলাম। পঞ্চাশ টাকা দিল। অনেকদিন টাকাটা গুছিয়ে রেখেছিলাম। খরচ করিনি। দিদি মারা যাবার পর। তোকে যেদিন প্রথম দেখতে গেলাম। সেদিন ওই টাকা দিয়ে একটা পুতুল কিনে নিয়ে গেছিলাম। ওই পুতুল নিয়ে তোর সঙ্গে আমার একটা ছবি আছে।
মরার আগে পর্যন্ত তোর মা পানের নেশাটা আর ছারতে পারেনি।
অনিকা আমাকে জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ লোকাল। আমিও অনিকাকে জড়িয়ে ধরলাম।
জানিস প্রত্যেকটা সন্তান তার বাবা-মার ভালবাসার ফল। তুইও তার ব্যতিক্রম নোস। আমি আমার দিদির রেখে যাওয়া সম্পত্তি এখনও আগলে বেরাচ্ছি।
তাই তুই হারিয়ে যেতে আমি পাগলের মতো হয়ে গেছিলাম। বাধ্য হয়ে অর্জুনকে বলে দিলাম জাফরকে মেরে দে। ওকে না পাই ওর মাকে যে মেরেছে তাকে অন্ততঃ শেষ করি।
অনেকক্ষণ দু-জনে দু-জনকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম, ময়ে আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরেছে। বুকের ভেতরটা খুব মৃদু চিন চিন করছে।
মুখ তোল ওই বেদিটার দিকে তাকা। একটু ভাল করে লক্ষ্য কর। দেখ তোর মা ওই বেদিটার ওপর বসে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।
দূর পাগলী আমি কি তোকে ছেড়ে যেতে বলেছি।
ওর মুখটা তুলে ধরলাম।
এই দেখো কাঁদে। তোর মা বেঁচে থাকলে তুই এই কথা বলতে পারতিস। মেয়ে হয়ে জন্মেছিস। আজ নয় কাল তোকে সংসার করতে হবে। তখন দেখবি মামার কথা ভুলে যাবি।
অনিসা চোখ বন্ধ করলো। গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।
তোকে এতোবড়ো করলাম কি করে?
তোর মায়ের এইসব ছোটো ছোটো স্মৃতি আমাকে লড়াই করার অনুপ্রেরণা দিয়েছে।
কৃষ্ণদার হোটেলে কাজ করতাম। সপ্তাহান্তে টাকা পেলেই দুধের কৌটো কিনে ছুটে যেতাম তোর কাছে। তোকে দেখার পর শান্তি। তারপর আরও দুটো আপদ জুটলো, ঘণ্টা আর পক্কে।
তখন আমার ভরা সংসার।
তবে কৃষ্ণদা পয়সাটা ঠিক ঠাক দিত। না হলে তোদের বাঁচাতে পারতাম না। ভজুর পয়সায় পেট চালাতাম, আমার পয়সা তোদের। মাঝে মাঝে মাসির ফাই ফর্মাস খেটে যা ইনকাম হতো আমার ভজুর দু-জনের সংসার দিব্যি চলে যেত।
তাই তোর দুই মামী, দিদান, পিসীরা হাত ভরে দিলেও খরচ করতে পারি না। খরচ করার জায়গা খুঁজে পাই না। তাদের জিনিষ আবার তাদের ফেরত দিয়ে দিই।
অনিকা আষ্টেপৃষ্ঠে আমাকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
এবার মুখ তোল।
অনিকা আমার দিকে জলেভেঁজা চোখে তাকাল।
এবার একটা ক্যান্ডি দে, অনেকক্ষণ বক বক করলাম।
অনিসার হাত ধরে পেছন থকে সামনে নিয়ে এলাম। দুই বোন এখন আমার দুই পাশে।
এতক্ষণ আপন মনে বকে যাচ্ছিলাম কারুর দিকে খেয়াল ছিল না। ধারে কাছে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। গোধূলি পেরিয়ে সন্ধ্যে নেমে এসেছে।
তোর দাদাই কোথায় গেল মা?
ওরা সবাই ওখানে বসে কাঁদছে। তুমি ওই ভাবে বললে কেন?
মেয়ের চোখের দিকে তাকালাম। চোখ দুটো ছল ছল করছে।
জানিস মা, মিথ্যে কখনও কাউকে কাঁদায় না। সত্যি জিনিষটা এতো কঠিন ভাবে মানুষের বুকে আঘাত করে তাই মানুষ কাঁদে।
দু-জনকে দু-হাতে ধরে আস্তে আস্তে সামনের দিকে এগিয়ে এলাম। পেছন ফিরে একবার দেখলাম মোমবাতির আলোগুলো ধিকি ধিকি করে জ্বলেছে।
ওই ধিকি ধিকি আলোর মধ্যেও যেন মেরিনাদিকে স্পষ্ট দেখতে পালাম, বেদীমূলের ওপর বসে হাসছে। চোখে মুখে প্রশান্তির ছাপ।
বাড়িতে যখন পৌঁছলাম তখন ছটা বেজে গেছে। সামনের বাগানে লাইট জ্বলে উঠেছে। মনে হয় খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা পেছনের পাশে হয়েছে। সামনের দিকে অনেকগুলো ছাতার মতো। তার তলায় চেয়ার পাতা।
অনিমেষদা, বিধানদা, দাদা, ডাক্তারদাদা, মল্লিকদা বসে আছে। সঙ্গে আরও তিন-চারজনকে দেখতে পাচ্ছি। চেনা চেনা ঠেকছে না। মনে হচ্ছে আন্টির আত্মীয়-স্বজন হবে।
ওরা আমাদের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করছে।
গাড়িতে আসার সময় কেউ আমার সঙ্গে একটা কথাও বলেনি। অনিকা নিস্তব্ধে ব্যাগ থেকে একটা ক্যান্ডি বার করে আমার হাতে দিয়েছে।
গাড়ি থেকে নেমে অনিকার দিকে তাকিয়ে বললাম, তোদের আর কোনওদিন কিছু বলবো না।
কেন?
তোরা এতো কান্নাকাটি করিস।
তোমার অভিজ্ঞতাগুলো এতো কঠিন মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়।
চুপ করে থাকলাম।
এতক্ষণ বসে বসে শুধু একটা কথা ভাবলাম, তুমি জীবনে এতো কষ্ট পেয়েছো কখনও আমাকে বলো নি। বরং সমস্ত কষ্ট বুকে চেপে রেখে আমাদের মুখে হাসি ফুটিয়েছ। মাঝে মাঝে ভাবি তুমি মানুষ না অন্য কিছু।
দিদিভাই আমরা কি একা কেঁদেছি। আর কেউ কাঁদে নি। বাবাকে বলো।
তুমি রাগ করোনা মামা। বিশ্বাস করো, বাবার ওপর আমি একটুও অভিমান করিনি। আমি জানি তুমি ভাবছো আমি, বোন দুজনে বাবার ওপর রাগ করেছি। সত্যি বলছি, বাবার ওপর একটুও রাগ বা অভিমান করিনি। তুমি মাকে যেমন ভালোবাসতে। বাবাকেও ভীষণ ভালোবাস।
চলো জামা-কাপরটা ছেড়ে নেবে। মেয়ে হাত ধরে টানল।
তোরা যা পরে যাচ্ছি।
ওরা এগিয়ে গেল। মেয়ে, অনিকা বারান্দা দিয়ে সোজা আমার ঘরে গিয়ে ঢুকলো।
অনেককেই ধারে কাছে দেখতে পাচ্ছি না, কনিষ্করা গেল কোথায়?
চিকনা কাছে এগিয়ে এলো, ব্যাগটা তাহলে ছোটোমাকে দিয়ে আসি।
ওর দিকে তাকালাম। তোরও কি মন মেজাজা বিগড়ে গেছে।
সেই সময় খুব খারাপ লাগছিল। এখন ঠিক আছে।
সাবধান কারুর যেন চোখে না পড়ে।
চিকনা মাথা দুলিয়ে ভেতরে চলেগেল।
রতন কাছে এগিয়ে এসে বললো। ওগুলো সব পেছনে রেখেছি।
সব সাজিয় গুছিয়ে নিয়ে এসেছিস?
হ্যাঁ।
তোরা গেলি আবিদ কোথায়?
অনুপদা কাজে লাগিয়েছে।
যা তোরাও লেগে পর। সময় হলে বলবো।
আমি ইসলামভাইয়ের মুখের দিকে তাকালাম।
এখনও মুখটা ভেটকে থাকতে হবে। ছোটোমা দেখলে আমাকে গালাগাল দেবে।
তখন যদি একটু বুঝতে পারতাম।
বুঝতে পারনি বলে আজকে এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছো। বুঝতে পারলে জীবন কাহিনীটা হয়তো অন্যভাবে লেখা হতো।
তুই ভীষণ কড়া কড়া কথা বলিস।
আমি কিন্তু একটুও মিথ্যের আশ্রয় নিইনি।
ইসলামভাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। অনেক না বলা কথা চোখে মুখে ফুটে উঠেছে। কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলো না।
নেপলা এগিয়ে এসে বললো, ওদের তাহলে দিয়ে আসি।
যা। সাবধান। শত্রুর অভাব নেই।
নেপলা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলো।
আমি ধীর পায়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে এলাম।
তুই কি চেঞ্জ করে আসবি।
পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলাম অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে।
একটু বসো, আসছি।
ওনারা তোর সঙ্গে আলাপ করতে চান।
এখুনি চলে যাবেন?
না না।
আমি আসছি।
বারান্দায় উঠে এলাম। বাইরের ঘরে এসে দেখলাম লোকে লোকারণ্য।
অংশু, সুবীর, বরুণদা তিনজনে সোফায় বসে গল্প করছে। একপাশে আন্টি আর একপাশে আন্টির মেয়ে বসে। সাগরকে দেখতে পেলাম না।
আন্টি আমাকে দখে হেসে ফেললো।
দিদি অনি এসেছে। আন্টি রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে বললো।
বড়োমা একবার রান্নাঘর থেক উঁকি মেরে আমাকে দেখল।
কোথায় গেছিলি? আন্টি বললো।
অনিকার মার কাছে।
আমাকে নিয়ে গেলিনা কেন। আন্টির গলায় অভিমানের সুর।
জানতামই না ওরা যাবে। রাস্তায় বেরিয়ে জানলাম ওরা ওখানে যাচ্ছে।
বরুণদার দিকে তাকালাম।
সকাল থেকে বৌয়ের দেখা পেলাম, তুমি ছিলে কোথায়?
তোমার অফিসে, কিছু কাজ সেরে এলাম।
হাসলাম।
অংশুবাবু স্যার বৌ কোথায়?
বৌ তোমায় খোঁজে, তুমি বৌকে খোঁজ।
আমি বড়োমার ঘরে এলাম। দেখলাম ছোটোমা, বৌদি ঘর থেকে বেরচ্ছে। আমাকে দেখে ছোটোমা জড়িয়ে ধরলো।
দু-জনেই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। আমি মুচকি মুচকি হাসছি।
তুই কি ভালো রে আমাদের কথা মনে রেখেছিস।
সাতকান করো না। জানাজানি হলে গণ্ডগোল।
বৌদি হাসছে।
কখন খাওয়াবি?
ঠিক সময় খবর পাঠিয়ে দেব। একটু চা খাওয়াও।
দুটো মিষ্টি দিই।
দাও।
দু-জনেই বেরিয়ে গেল।
ঘরে আমি একা। সোফায় শরীরটা হেলিয়ে দিলাম।
নানা চিন্তা মাথার মধ্যে কিলবিল করছে। অর্জুন বললো, রাতের ফ্লাইটে চলে যাবে।
ওকে নিয়ে মাঝে মাঝে এতো টেনশন হয়, নিজেরই শরীর খারপ লাগে।
ভিকু, আপ্পের চোখ-মুখ ভাল ঠেকল না। আবার কি অঘটন ঘটিয়ে বসে।
বার বার না বলেছি। কে কার কথা শোনে। ওদের ইতিহাস ওরা নিজের মতো করে লেখে।
পিকুকে আর বিশ্বাস করা যাবে না, হয়তো একটু স্নেহ করতে গিয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করে ফেলতে পারি।
হিমাংশুকে বলে দিতে হবে, উইলের বয়ান অনুযায়ী যা করার তা করে দিতে।
সাগর এতো সহজে আমাকে ছেড়ে দেবে এটা বিশ্বাস হয় না। ও পিকুকে দিয়ে অপারেট করাতে চাইবে। নম্রতার প্রতি পিকুর যথেষ্ট দুর্বলতা তৈরি হয়েছে।
ফিরে আসার পর দুজনের কাউকে দেখিনি।
মিত্রা হয়তো পিকুকে সাপোর্ট করতে চাইবে। নিজের বোনপোর প্রতি দুর্বলতা থাকতেই পারে।
কিরে একা একা ঘরে বসে কি করছিস!
গলার শব্দ শুনে চমকে দরজার দিকে তাকালাম। বড়োমা, দামিনীমাসি।
দু-জনেই ঘরে এসে খাটে বসলো। মিটি মিটি হাসছে।
হাসছো কেন?
ছোটো বলেছে।
যখন বলবো তখন এই ঘরে এসে সবাই মিলে খেয়ে নেবে।
কে দেবে? বড়োমা বললো।
দামনীমাসি ভাগ করে দেবে।
তুই আয়।
আমি সটকে আসতে পারলে আসবো।
ছোটোমা, বৌদি একটা ট্রেতে করে চারটে প্লেট নিয়ে ঢুকলো। চার রকমের মিষ্টি।
এতো কে খাবে!
তুই খাবি, কাল থেকে একটাও মিষ্টি মুখে তুলিসনি। ছোটোমা বললো।
দু-জনেই খাটে বসলো।
জ্যেঠিমনি কোথায়?
ওপরে পিকুর সঙ্গে কথা বলছে।
আবার কিছু হয়েছে নাকি?
না। নম্রতা, নম্রতার বাবার সঙ্গে কথা বলছে।
সোস্যাল ম্যারেজ করাতে চাইছে?
বড়োমা আমার মুখের দিকে তাকাল।
তোর আপত্তি আছে?
আমার আপত্তি থাকবে কেন। একটা বিয়ে যেন প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি না করে, আমি সেদিকটা লক্ষ্য রাখবো। এই কথাটা তোমাকে তখনও বোঝাবার চেষ্টা করেছি।
বৌদি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
ভাবছো অনি কি কথা বললো।
স্বাভাবিক।
ওদের মধ্যে ভালোবাসার থেকে শারীরিক এবং স্বার্থের সম্পর্ক বেশি ছিল। এখনও সেটা নেই, জোড় গলায় বলতে পারবো না। তুমি চাইলেও, সাগর তার মেয়ের সঙ্গে পিকুর মিউচ্যুয়াল ডিভোর্সে রাজি হবে না।
তাছাড়া সাগর কি জানতো না, তার মেয়ে পিকুর সঙ্গে মেশে। অবশ্যই জানতো, এও জানতো পিকুর নামে ওই কাগজের শেয়ার আছে, কিন্তু ভতরের ব্যাপারটা জানতো না। হয়তো এখন সেটাই জানার চেষ্টা করছে।
যতই হোক নম্রতা দিদির নাতনি, সাগর দিদির জামাই। বৌদি বললো।
সেই জন্য দু-জনে এখনও জীবিত আছে।
অনি!
আমি একটুও অন্যায় কথা বলিনি বৌদি। একটু ভাবো, তাহলে সহজ সরল সত্যটা বুঝতে পারবে। তাছাড়া সাগরের সঙ্গে আন্টির সম্পর্ক যথেষ্ট তিক্ত।
মিত্রা, তনু এসে দরজার সামন দাঁড়াল। ওদের দিকে তাকালাম, দু-জনের চোখ হাসছে।
আয় প্লেটে সাজানো আছে আমাকে একটু সাহায্য কর।
দু-জনে এসে আমার পাশে সোফায় বসলো। বেশ সুন্দর সাজু গুজু করেছে। কোথাও কোনও উগ্রতা নেই সারাটা শরীরে পরিশীলতার ছাপ স্পষ্ট।
একটা রসগোল্লা চামচে করে নিজের মুখে তুললো, আর একটা তনুকে খাইয়ে দিল।
বড়োমার দিকে তাকাল।
ছেলেকে জিজ্ঞাসা করেছো কোথায় গেছিল?
বড়োমা মিত্রার দিকে তাকিয়ে।
আজ শুধু দুই ময়ে কাঁদেনি, আরও অনেকে কান্নাকাটি করেছে। নাতনির কাছে জেনে নেবে।
তুই কি করে জানলি?
ফিরে এসে ওই ঘরে এতক্ষণ গল্প করছিল।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।
আমরা তোর বউ, আমাদেরও কিছু অধিকার আছে।
কোগজ পত্র দেখাতে পারবি?
তনু দেখাতে পারে আমি পারবো না।
তনুকে দেখাতে বল।
কিরে!
সব ওর কাছে, আমার কাছে কিছুই নেই।
বৌদি হেসে ফেললো।
মিষ্টি গুলো দুজনে খেয়ে নে।
তুই খা তোকে আদর করে দিয়েছে।
একিরে! বেড়াল বলে মাছ খাব না ভাত খাব না কাশী যাব। ঠিক আছে কথাটা মনে রাখবো।
না না খাচ্ছি তুইও খা।
দামিনীমাসি হেসে উঠলো।
তনু হাত লাগাও।
তুই ওকে ভয় পাস। বড়োমা, মিত্রার দিকে তাকাল।
তুমি পাও না?
ঠিক ভয় না তবে….।
তুমি যেটা পাও, আমি তনুও সেটা পাই।
বড়োমা ঠোঁট ফুলিয়ে হেসে উঠলো।
ছোটোমা চা এলো না।
আনছি বোস। দামিনীমাসি উঠে গেল।
আজ রাতে নাচন-কোদন করবি তো? মিত্রার দিকে তাকালাম।
পাগল তারপর সেই রাতের মতো হবে, কেশ খাই আর কি।
তনু তুমি?
দেখি, পরিবেশ পরিস্থিতি কি বলে।
বাবাঃ বেশ গুরুগম্ভীর ডায়লগ।
না বাবা তারপর ছবি-টবি তুলে বলবে তিন লাখ, দশলাখ….।
ছোটোমা জোড়ে হসে উঠলো।
ওই ঘরে সব জড়ো করেছে। ছেলেরা বলেছে আজ বাড়িতে পার্টি কোনও চিন্তাই নেই, বেশি কিছু হলে রাতে ঘরে যাব না, বাগানে শুয়ে রাতটা কাটিয়ে দেব, নতুন অভিজ্ঞতা। মিত্রা বললো।
মাথায় রাখিস আজকে আমি সার্ভ করবো। আমি বললাম।
সে তুই করগে যা। বেড়াল রান্নাঘরে ঢুকবে মনের মতো করে মাছ খাবে না তা হয়।
কিগো তুমি এখনও বসে! সত্যি তোমাকে নিয়ে আর পারা যাবে না। এখন বুঝতে পারছি মা-ছোটোমা কেন তোমাকে নিয়ে ফেডআপ। চলো চলো সবাই এসে পড়েছে।
অনিকা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। মেয়ে এসে হাত টেনে ধরলো। মিত্রা, তনু মুচকি মুচকি হাসছে।
আয় ভেতরে আয়। আমি বললাম।
না আসবে না। অনিসার মুখে কপট রাগ।
অনিকা ভেতরে এলো।
আমি ওদের দিকে তাকিয়ে আছি। বেশ লাগছে দেখতে দুই বোনকে। বেনারসী পরেছে। খুব চেনা চেনা ঠেকছে। বনেদী ঘরাণার একটা ছাপ দুজনের মধ্যে।
কে সাজিয়ে দিল?
নিজেরা সেজেছি।
কাপর দুটো কার?
দিদিরটা ছোটোমা, আমারটা মার।
হুঁ।
হুঁ করলি কেন? মিত্রা আমার দিকে তাকাল।
এই কাপরের অনেক ইতিহাস কিনা তাই হুঁ করলাম।
তনু খিক খিক করছে।
উঠে দাঁড়ালাম।
যাই মেয়ারা যখন বলছে একটু ড্রেস-ট্রেস করি একটু ফুস-ফাস গায়ে দিই।
ভাল কথা বলতে পারিস না। বড়োমা খিঁচিয়ে উঠলো।
মেয়ের দিকে তাকালাম।
মাকে বমি করেছিস?
বমি করিনি, যা সত্যি তাই বলেছি।
মা বলে নি, আমাদের একটু বলতে পারতিস, একটু চোখের দেখা দেখতাম।
তাও দেখিয়েছি।
অর্জুন নিজের সম্বন্ধে বাড়িয়ে বাড়িয়ে যে গল্প বলেছে, সেটা বলেছিস?
দিদি বলেছে।
এই তো দু-জনেই বেশ ভালো আমাশা রোগে আক্রান্ত হয়েছিস দেখছি।
ঘুসি মেরে তোমার পেট ফাটিয়ে দেব। অনিকা ঘুসি বাগিয়ে এগিয়ে এলো। জড়িয়ে ধরলাম।
আমার দিক তাকিয়ে চোখে মুখে হাসছে।
তোর মা মেরে ফাটিয়েছে, তোর বাপ ফাটিয়েছে, এবার তুই ফাটাবি নতুনত্ব আর কি আছে।
দু-জনে আমাকে হাত ধরে হিড় হিড় করে টানতে টানতে ঘরের বাইরে নিয়ে চললো।
ঘর থেকে বেরবার সময় ধাক্কা খেলাম সুরো, নীপার সঙ্গে। দু-জনেই বেশ চক চক করছে।
আমাকে দেখেই নিচু হয়ে প্রণাম করলো।
আমি ওদের দিকে তাকিয়ে একটা বিটকেল হাসি হাসলাম।
হাসছো কেন?
একবার পেছন ফিরে ছোটোমাদের দিকে তাকালাম। যেই সুরোর দিকে তাকিয়েছি সুরো জোড় করে আমার মুখ টিপে ধরলো। সকলে হাসছে।
প্লিজ আজ না কাল বোলো।
ঘরের সবাই তখনও হেসে চলেছে।
দেখলে দিদি সুরো কিরকম বুঝে গেলো ও নিশ্চই বাজে কথা বলতো। তনু বলে উঠলো।
তুমি জানো না তনুদিদি মুখ তো নয় একদম নর্দমা। সুরো বলে উঠলো।
সুরো আমার দিকে তাকাল।
মেয়ে বড়ো হয়ে গেছে এখনও অসভ্যতামি গেল না। সুরো কপট চোখে তাকাল।
তোলা থাকল। রাতে সুদে আসলে তুলবো।
সে তুমি তোলো আপত্তি নেই।
নীপা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।
তোমার বড় দেখেছে?
এবার দেখবে। আগে তোমাকে দেখিয়ে রেকমেণ্ড করিয়ে নিলাম।
দুই মেয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। মেয়ে, অনিকা আমার দুই হাত ধরে রয়েছে।
সোফা দেখলাম ফাঁকা। তারমানে সবাই বাইরের বাগানে চলে গেছে। আমি বারান্দা দিয়ে যখন এ ঘরে এলাম তখন দেখলাম বাগানে বেশ ভিড়। চেনা অচেনা অনেক লোক এসেছে। সুরোর শ্বশুরমশাই, শ্বাশুড়ীকেও দেখলাম। হাত তুলে বললাম আসছি।
এ ঘরে এসে ঢুকলাম। মিত্রা বেশ সুন্দর একটা চাদর পেতেছে। আমার একটা নতুন পাজামা পাঞ্জাবী বিছানার ওপর পড়ে আছে দেখলাম।
এটা আবার কোথা থেকে এলো?
আমি দিদিভাই কয়েকদিন আগে পছন্দ করে কিনে এনেছি। অনিসা বললো।
এতগুলো আছে আবার কিনতে গেলি কেন?
তোমার কোনও অসুবিধে আছে? অনিকা গম্ভীর হয়ে তাকাল।
মাথায় রাখিস কেউ যদি চোখ মারে, আর আমাকে এসে যদি বলেছিস….।
যে চোখ মারবে তার চোখ গেলে দেব।
উঃ বাবা তুমি তাড়াতাড়ি করবে। অনিসা বিরক্ত হয়ে উঠলো।
দাঁড়া না একটু বাথরুম থেকে ঘুরে আসি।
আমি ঘড়ি দেখছি। পাঁচ মিনিট হলেই দরজা ধাক্কা দেব মনে থাকে যেন।
বাবাঃ তুই তো মিলিটারি মেজাজে কথা বলছিস।
আমার কথা বলার ধরণে অনিসা হেসে ফেললো।
সত্যি তুমি বহুত ঢিলা। কি করে যে লোকে তোমাকে এতো ভয় পায় বুঝি না।
অনিকা ঠেলা দিল তুমি আগে বাথরুমে যাও।
আমি টাওয়েলটা কাঁধে নিয়ে বাথরুমে এলাম।
কাজ সারতে না সারতেই মেয়ে দুবার দরজা ধাক্কা দিল। কোনও আওয়াজ দিলাম না। নিজের কাজ যতটা সম্ভব ধীরে সুস্থে সারলাম।
বাথরুম থেকে বেরতে দেখলাম তনু, মিত্রা, ইসি খাটে বসে। মেয়ে অনিকার হাসি হাসি মুখ কিন্তু কপট গাম্ভীর্য সারাটা মুখ মণ্ডলে।
আমি ওদের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললাম।
অনিকা আমার দিকে তাকিয়ে বললো। ঘরিটার দিকে একবার তাকাও।
পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সেরে ফেলেছি।
পাক্কা বাইশ মিনিট বাথরুমে ছিলে।
তাহলে কমই লেগেছে।
মিত্রারা মুচকি মুচকি হাসছে।
দে পাজামা-পাঞ্জাবীটা গলিয়ে নিই।
অনিসা একটা ড্রয়ার, গেঞ্জী আমার হাতে এনে দিল।
এটা পড়তে হবে নাকি!
তাহলে কি খালি….।
মিত্রারা হেসে গড়িয়ে পরে।
এবার এটা নিয়ে পাঁচ মিনিট যাবে। তনু বললো।
ওই জন্য মৈনাক আঙ্কেলের ওই অবস্থা হয়েছিল। অনিসা কট কট করে উঠলো।
অনিকা হাসলো। আমিও হেসে ফেললাম। মিত্রার দিকে তাকালাম।
বিশ্বাস কর আমি বলিনি। দিদিভাই বলেছে।
আমি আবার বাথরুমে এলাম। ড্রয়ার গেঞ্জি লাগিয়ে বেরিয়ে এলাম। তখনও ওরা হেসে চলেছে।
আমি ওদের পছন্দ মতোই সাজু-গুজু করলাম।
দেখ কেউ যদি পছন্দ করে বসে তাহলে তোরা আর একটা মা এক্সট্রা পেয়ে যাবি।
একটা কেন তুমি দশটা আনতে পারো আপত্তি নেই। অনিকা বললো।
মিত্রার দিকে তাকালাম। চর তুলেছে। তনু আমার ঘাড় মটকাচ্ছে।
কে কে আসছে বলতো? অনিসার দিকে তাকালাম।
ওরা তখন আমাকে সেন্ট লাগাতে ব্যস্ত।
ডাক্তারদাদাই সব ডাক্তারকে ইনভাইট করেছে। অনিসা বললো।
তাহলে দাদাইয়ের বিয়েতে জোড় খাওয়াদাওয়া হবে বল।
তোমার জন্য তো বিয়ে দিতে পারলাম না।
বিয়ে কের নি!
কোথায় করলো, বললো এই বুড়ো বয়সে এসব করে লাভ নেই, এই বেশ ভালো আছি।
মাথাটা একটু নামাও। অনিকা বললো।
কেন?
মুখে একটু ক্রিম লাগিয়ে দিই।
ধ্যুস ওসব কেউ লাগায় নাকি।
সবাই লাগায় শুধু তুমি লাগাও না।
এটা লাগালে কি হবে।
মুখটা কচি কচি লাগবে।
অনিকার দিকে তাকিয়ে হাসছি। ওর হাত ততক্ষণে আমার মুখে কাজ করতে শুরু করেছে।
আর না এবার অনেক হয়েছে।
অনিকা মামার পকেটে রুমাল দিয়েছিস। না হলে পাঞ্জাবী তুলে পেছনে হাত মুছে দেবে। মিত্রা বললো।
বোন, সত্যিতো! অনিকা চোখ বড়ো বড়ো করে অনিসার দিকে তাকাল।
আমি মিত্রার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছি। আমার এই অবস্থা দেখে বেশ মজা পাচ্ছে।
মা রুমাল কোথায় রেখেছো? অনিসা মার দিকে তাকাল।
আলমাড়িটা খোল। দেখ ডানদিকে আছে।
অনিসা মায়ের কথা মতো কাজ করলো। পকেটে রুমাল গুঁজে দিল। অনিকা আমার হাত ধরে আলমাড়ির আয়নাটার সামনে এসে দাঁড় করাল।
এবার দেখো নিজেকে কেমন দেখতে লাগছে। অনিকা বললো।
সিনেমা আর্টিস্টের মতো লাগছে।
এটাই অনি ব্যানার্জীর আসল লুক বুঝলে, চর্চার অভাবে মর্চে পড়ে গেছিল। এবার মা, ছোটোমার পাশে তোমাকে ঠিক ঠাক মানাবে। অনিসা বললো।
ঠোঁটে লিপস্টিক লাগাবি না।
তোমার ঠোঁটটা এতো লাল, লিপস্টিক লাগবে না। অনিকা বললো।
মিত্রা খিক খিক করে উঠলো।
(আবার আগামীকাল)