জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১৬০ নং কিস্তি
দেখো তো ছোটোমা এবার ঠিক ঠিক লাগছে না? অনিসা বললো।
চুলটা একটু ঠিক করে দে।
চলো খাটে বসবে চলো। অনিকা বললো।
আমি এসে মিত্রার পাশে বসলাম। ওরা চুলটাও ঠিক করলো।
একসময় ঘর থেকে সবাই বেরিয়ে এলাম।
প্রথমেই ধাক্কা খেলাম অনিমেষদার কাছে এসে। আমাকে দেখে হেসে ফেললো।
তোকে চেনাই যাচ্ছে না।
কেন!
একবারে নায়ক নায়ক লাগছে।
আজ থেকে দুজন মেকাপম্যান এ্যাপয়েন্ট করলাম।
অনিমেষদা অনিকা, অনিসার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
দাদাই বাবাকে দেখতে বেশ ভালোলাগছে না?
দেখছিস তো এবার, সুরো পিসির কথায় আমি কেন আনচান করি।
অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে চোখ নাচাল। বিধানদা হাসাছে।
এবার একে একে সবার সঙ্গে পরিচয় পর্ব শুরু হলো।
দেখলাম আন্টির দুই ছেলে তাদের স্ত্রী ছেলেমেয়েও আছে। আমার ঋীতি অনুযায়ী সকল গুরুজনকে প্রণাম করলাম।
আজকে আপনাদের সঙ্গে ঠিক মতো কথা বলা যাবে না। একদিন সময় নিয়ে আসুন জমিয়ে গল্প করা যাবে।
আন্টির বড়ো ছেলে বললো। অবশ্যই, এতদিন আপনার নাম শুনেছি, পরিচিত হলাম।
আমি কথা না বলে হেসে তার উত্তর দিলাম।
শুনেছি কলকাতায় এদের বিরাট একটা নার্সিংহোম আছে। মিত্রা, তনুর সঙ্গে অনিমেষদা কারুর পরিচয় করিয়ে দিল না। বুঝলাম এদের সঙ্গে পরিচয় পর্ব সারা হয়ে গেছে।
আপনার নাম শুনেছি, দেখার সৌভাগ্য হয় নি। আন্টির ছোটো ছেলে এসে হাতটা চেপে ধরে প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনি দিল। বুঝলাম আমার সঙ্গে আলাপ করে ভীষণ উত্তেজিত।
কিছুক্ষণ ওদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বললাম।
কথা বলার ফাঁকেই চোখ চলে গেল মাঠের চারপাশে।
দেখলাম গেটের কাছে কনিষ্করা সবাই দাঁড়িয়ে। লক্ষ করলাম, আমার দিকে টেরিয়ে টেরিয়ে দেখছে আর হাসাহাসি করছে।
একপাশে দেখলাম বড়োমারা আন্টিকে নিয়ে জটলা করে দাঁড়িয়ে আছে। সেখানেও অনেক অপরিচিত মানুষকে দেখলাম। পায়ে পায়ে সেখানে গিয়ে ধাক্কা খেলাম। আবার কোমড় নোয়াতে হলো। বৌদি থুতনি ধরে চুমু খেল।
তোর মেয়ে দুটো তোকে বেশ চক চকে করে দিয়েছে।
অনিকা, অনিসার চোখে মুখে খুশির ছোঁয়া। এখানে দেখলাম তনু, মিত্রা, ইসির সঙ্গে কয়েকজনের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। ইসির নতুন পরিচয় হলো নম্রতার শ্বাশুড়ী হিসাবে।
বুঝলাম ব্যাপারটা অনেক দূর এগিয়েছে, পাকা-পোক্তর দিকে এগোচ্ছে। তনু, মিত্রা দু-জনেই আমার চোখে চোখ রেখেছে।
ছাড়া পেয়ে সোজা চলে এলাম কনিষ্কদের কাছে।
তোকে দুই মেয়ে একবারে খেঁড়ো কার্তিক সাজিয়ে দিয়েছে। নীরু চেঁচিয়ে উঠলো।
গম্ভীর হয়ে বললাম, শ্রীপর্ণা কোথায়?
সঙ্গে সঙ্গে সকলে হেসে উঠলো।
কেন শ্রীপর্নাকে কিসের দরকার? নীরু কাঁধ নাচাল।
মেয়েদের বলেছি আজ যদি তাদের জন্য দু-চারটে নতুন মা জোগাড় করে দিই আপত্তি আছে, ওরা বলেছে আপত্তি নেই।
কেন মিলি, টিনা, অদিতি নেই। নীরু চেঁচাল।
ওরা তো বনে গিয়ে দুধ দেয়।
আমারটাও দেয়।
হাসি থেমে নেই।
কাকে, সেটা জানতে চাইছি। বটার দিকে তাকালাম।
তোকে লেটেস্ট নিউজ দেব একটু অপেক্ষা কর। খুব জোড় পরকীয়া চলছে। বটা বললো।
মেয়ে হাত ধরে টানলো। চলো।
কি বলবি তো।
আগে আমার বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করবে চলো, তারপর এখানে এসে গল্প করবে।
ওরাও হাসছে।
ওই জন্য বাবা তোমাকে সন্ন্যাসী সেজে ঝাঁটা পেটা করেছিল। অনিসা, নীরুর দিকে তাকাল।
কেন তোর বাপকে কিছু বলতে পারছিস না।
বাবার কথায় তুমি উত্তর না দিলে পারতে।
তার পরের ঝারটা তুই খেতিস।
অনিকা, অনিসা দু-জনেই হাসছে।
নীরু চেঁচিয়ে উঠলো। আগের কাজ আগে কর।
আমি ওদের সঙ্গে মাঠের এই প্রান্তে চলে এলাম।
প্যাণ্ডেল বলতে একটা সামিয়ানা টাঙানো। তার তলায় একটা বড়ো টেবিল। বেশ সুন্দর করে সাজানো। মনে হচ্ছে বুফে সিস্টেমে খাওয়ার আয়োজন হয়েছে। রতনরা সব কাজ করছে, অনুপদা, রূপায়ণদাকে দেখলাম। আমাকে দেখে কাছে এগিয়ে এলো।
তোকে বেশ চক চকে লাগছে। অনুপদা বললো।
সৌজন্যে আমি, দিদিভাই। অনিসা বললো।
অনুপদা হাসছে।
আজ মনে হচ্ছে বেজায় ফেসাদে পড়ে গেছিস।
একটু।
মাঝে মাঝে এরকম ফেসাদে পড়া ভাল বুঝলি অনি। রূপায়ণদা বললো।
দেখলাম রতনরাও এগিয়ে এলো। সবারই এক কথা তোমায় আজ হিরো হিরো লাগছে।
চিকনা দুটো মুরগীর ঠ্যাঙ একটা প্লেটে করে নিয়ে এসে অনিসা, অনিকার হাতে দিল।
তোর বাপকে সাজিয়েছিস, তার জন্য দিলাম।
অনিকা, অনিসা আজ চোখ দিয়ে কথা বলছে।
এটা কি হলো চিকনাদা। আমরা অনেকক্ষণ থেকে লাইন দিয়ে আছি। অনন্য এগিয়ে এলো।
তুই তোর বাপকে সাজিয়েছিস।
অনন্য, সুন্দর আমার দিকে তাকিয়ে চোখ কপালে তুলেছে। পক্কে, ঘণ্টা আমার গা শুঁকতে শুরু করে দিয়েছে।
মামা, গায়ে মিষ্টি গন্ধ!
বাবা তোমাকে আজ হেবি লাগছে। সুন্দর আমাকে জড়িয়ে ধরেছে।
বোন, তুই না দিদিভাই? অনন্য বললো।
আমি, দিদভাই দুজনে। অনিসা বললো।
বাবা ঝামেলা করেনি?
একটুও না।
অনিকা চোখ নাচাচ্ছে।
ইসলামভাই এগিয়ে এসেছে।
মেয়ে দুটো তোকে পাগল বানিয়ে দেবে।
আমি হাসছি।
ইকবালভাইকে দেখছি না?
অনুপ বরফি আনতে পাঠিয়েছে।
কেন, মিষ্টি আনোনি? অনুপদার দিকে তাকালাম।
ডাক্তারদাদার রিকয়েস্ট।
এতো জোগাড় হবে।
যতটা হয় আনতে বলেছি। বাকিটা যদি বানিয়ে দিতে পারে বানাবে। নাহলে যেটুকু আনবে আমরা ঘরের লোকেরা খাব।
ওই মিষ্টি কাউকে বেঁটো না। সবাই কেটে পরলে আমরা পার্টি করবো।
রূপায়নদা জোড়ে হসে উঠলো।
এরমধ্যে তোর কি কোনও প্ল্যান আছে।
যাঃ তুমি সবেতেই….।
বাবা হাঁ করো।
মেয়ে একটুকরো মাংস মুখের সামনে ধরেছে। একটু খানি দাঁত দিয়ে কামড়ে নিলাম।
মেয়ে তার বন্ধুদের নিয়ে এসেছে। সবার সঙ্গে একে একে আলাপ করলাম।
সকাল থেকে এই প্রথম পিকু, নম্রতাকে দেখলাম। পিকু আমার দিকে ঠিক মতো তাকাতে পারছে না। তবু কাছে এসে প্রণাম করলো। ওর কাঁধটা ধরে একটু ঝাঁকিয়ে দিলাম।
সব ভুলে যাও এখন শুধু এনজয়।
নম্রতার গালটা ধরে একটু টিপে দিলাম।
বাবা-মাকে দেখতে পাচ্ছি না?
একটু বেরিয়েছে এখুনি চলে আসবে।
যাও সবাই।
ওরা চলে গেল। দুই মেয়ের হাত থেকে মুক্তি পেলাম।
অনুপদার দিকে তাকিয়ে বললাম, এবার শুরু করে দাও।
আর আধাঘণ্টা পর শুরু করে দেব। একটু গরম করে নিক।
অনেকদিন পর পার্টি অফিস ডকে তুলে দিলে?
যা বলেছিস। শ্রেফ ডাক্তারদাদা, আন্টির রিকোয়েস্ট ফেরাতে পারলাম না।
তোমরা কফি বানাচ্ছ না।
কেন সামনে দেখিসনি! তুই সেদিন যেমন টিকিয়া বানিয়েছিলি সেই রকম ছোটো ছোটো টিকিয়া আর কফি।
প্রবীরদা কখন আসবে?
পার্টির মিটিং আছে সেরে আসবে।
সপরিবারে আসতে বলেছো না একা চলে আসবে?
ডাক্তারদাদা নিজে বলেছে।
আমি আবার বাগানের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে গেলাম। কনিষ্কদের কাছে আসার পথে ডাক্তারদাদা ডাকলো। এগিয়ে গেলাম। দেখলাম রথীন ডাক্তার এসেছে।
আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরলো।
সত্যি তুই একটা মহৎ কাজ করলি। রতনলাল বেঁচে থাকলে আরও বেশি খুশি হতো।
ডাক্তারদাদার দিকে তাকাল, বুঝলে সামন্ত ও যখন খোঁচাচ্ছিল তখন এতটা বুঝি নি। ভাবলাম…
আবার বক বক শুরু করেছে।
অচ্ছা আচ্ছা।
আরও অনেক ডাক্তার এসেছে। সবাই নাকি আমাদের নার্সিংহোমের সঙ্গে এ্যাটাচ। দুর্ভাগ্য আমি কাউকেই চিনি না। তবু আলাপ করলাম সবার সঙ্গে। বয়স্কদের নিচু হয়ে প্রণাম করার রীতি টুকু ভুললাম না। সকলের চোখে মুখে বিষ্ময়, এমনভাবে তাকাচ্ছে আমি যেন মিরাকেল ম্যান।
ওদের সঙ্গে কথা বলার ফাঁকেই কনিষ্ক একজন ভদ্রমহিলা একজন ভদ্রলোককে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে এলো। ওরাও দেখলাম সবাই এই ডাক্তারকুলের সঙ্গে হাই হ্যালোতে মেতে উঠলো।
ডাক্তারদাদা আন্টির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চাইলে কি হবে, অনেকেই আন্টিকে চেনে।
অনি।
কনিষ্কর ডাকে ফিরে তাকালাম। দেখলাম সেই ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলা আমার ঠিক গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে।
দেখ চিনতে পারিস কিনা।
ডাক্তারদাদা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
চিনতে পারছিস না?
না ঠিক….।
আমি অবাক হয়ে ভদ্রমহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে। ভদ্রমহিলা মিটি মিটি হাসছেন।
বয়স প্রায় চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। চোখ মুখ বেশ সপ্রতিভ। চুলটা ছেলেদের মতো করে কাটা। দারুণ ঝক ঝকে। স্মার্ট।
এখন তুই চিনতে পারবি না। ডাক্তারদাদা বললো।
আমি তবু ভদ্রমহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। মুখের আদলের সঙ্গে কার যেন মিল খুঁজে পাচ্ছি। ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলা দুজনেই নিচু হয়ে আমাকে প্রণাম করলো।
দুজনেই মিটি মিটি হাসছে।
জানো ডাক্তারদাদা কুড়ি বছর আগের দেখা একটা মুখের সঙ্গে যেন মিল খুঁজে পাচ্ছি।
ডাক্তারদাদা হেসে ফেললো।
চিনতে পারছো না? ভদ্রমহিলা বললো।
ঝিমলি।
ভদ্রমহিলা এবার আমাকে জড়িয়ে ধরলেন।
তাই ভাবি অনিদা আমাকে চিনতে পারবে না তা হয় নাকি। যতই আমি বুড়ি হয়ে যাই।
সবাই হাসছে।
তোমার সেই লম্বা লম্বা চুল গেল কোথায়! বেশ ব্রাউনিস দেখতে। তোমার সেই পাকা গমের মতো গায়ের রং। এ কি চুলের অবস্থা করেছো! গালগুলো কেমন পাঁউরুটির মতো ফুলে ফুলে আছে।
তুমি আমাকে উনিশ বছর বয়সে দেখেছ এখন উনচ্চলিশ। বুড়ি হয়ে গেছি।
তোমার ছেলে মেয়েরা।
ছেলে, আবার মেয়ে?
কেন!
একটাই ছেলে, দার্জিলিং কনভেন্টে রেখেছি।
ইনি তোমার….
হাজবেন্ড। সঞ্জয় শ্রীনিবাসন।
এই দেখ তোমার বড়ের সামনে তোমাকে জড়িয়ে ধরলাম।
এঃ যেন লজ্জা পেয়ে গেলে। ওকে সব তোমার গুণের কথা বলেছি।
করেছো কি!
না হলে তোমাকে বুঝবে কি করে। একটা মানুষকে বোঝাতে গেলে এগুলোর দরকার আছে।
আমি সঞ্জয়ের হাতে হাত রাখলাম। কথা বলতে বলতে ভিড় থেকে এগিয়ে এলাম।
তোকে সঞ্জয় আগে দেখেছে। আমিও তোকে ওর কথা বলেছি। কনিষ্ক বললো।
কোথায় বলতো!
যখন নার্সিংহোমে ছিলি।
ও।
তোরা কথা বল। ওদিকটা দেখি, অনেকে আসছে। ম্যাডাম, তনু সামলাতে পারছে না।
আমার ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে তোমার আলাপ হয়েছে।
সবার সঙ্গে হয়েছে, একমাত্র তোমার সঙ্গে আলাপ হয়নি।
হাসলাম, মিত্রাদি?
মিত্রাদি, তনুদি দুজনের সঙ্গেই কথা বলেছি। এও বলেছি তোমাদের ভীষণ হিংসা করি।
সঞ্জয় তার বৌয়ের কথায় হাসছে।
রিমঝিম এখন কোথায়?
বম্বে।
মাঝে শুনলাম নায়িকা না কি হয়েছিল।
কার কাছে শুনেছ?
সুজিতদা বলেছিল।
তুমিই তো ওদের মাথাটা খারপ করলে।
এখন ভালো আছে না খারাপ আছে?
আগামী সপ্তাহে আসবে, নিজের চোখে দেখবে।
ল্যান্ডা-গ্যান্ডা?
একটা মাত্র মেয়ে।
তোমার মা?
বার বার তোমার কথা জিজ্ঞাসা করে, কি বলবো।
তোমরা এখনও ওই ফ্ল্যাটে আছো?
তাহলে কোথায় যাবো!
দেখবে একদিন হঠাৎ চলে গেছি।
তা তুমি যেতে পার। এটা বিশ্বাস করি।
দেখলাম ভজু গেটের কাছ থেকে ছুটতে ছুটতে আমার কাছে এলো। হাঁপাতে হাঁপাতে বললো।
অনিদা—অনিদা ভেঁদোদা এসেছে।
তাই, তুই চিনিস।
এখানে দু-বার এসেছে না।
যা সঙ্গে করে নিয়ে আয়।
সঞ্জয়, ঝিমলি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
কি ভাবছো?
ভাবছি তোমার কোনও পরিবর্তন হয়নি।
হয়েছে। তুমি সাদা চোখে দেখতে পাচ্ছ না।
আচ্ছা তুমি কি আমাকে কুড়ি বছর আগের ঝিমলি পেয়েছো। যা বোঝাবে বুঝে যাব।
সে ভাববো কেন, তুমি এখন রিনাউন্ড চাইল্ড স্পেশালিস্ট, এই দেখ সঞ্জয় আমার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছে, ভাবছে হয়তো আমার বউটা সত্যি আমার তো?
সঞ্জয় হাসলো।
নাগো অনিদা তোমার অনেক গল্প ওকে বলেছি, কিছুতেই বিশ্বাস করে না। যেদিন তোমাকে প্রথম দেখল সেদিন তুমি অপারেশন টেবিলে শুয়ে আছ।
সে কথা কনিষ্ক বলেছে। তোমাদের সঙ্গে দেখা করতাম, নানা ঝামেলায় এতো জড়িয়ে পড়েছি….।
ঝিমলি হাসছে।
সত্যি বলছি ঝিমলি।
অনেকদিন পর আমার পুরনো নামটা তোমার মুখে শুনছি।
হাসলাম। কেন তোমায় বুঝি এখন এই নামে কেউ ডাকে না।
তুমি জানো না বুঝি।
সত্যি ভাবলে অবাক লাগে ঝিমলি, গত কুড়ি বছর তুমি আমাকে দেখনি, আমি তোমাকে দেখিনি। কিন্তু কাজগুলো সব ঠিক ঠাক হয়ে গেছে। তোমার কাছে আমি ভীষণভাবে কৃতজ্ঞ।
এটা বলছো না কেন, তোমার জন্যই আমি ডাক্তরী পড়ার সুযোগটা পেয়েছি।
অসম্ভব রকমের বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।
অনিদা।
দখলাম ভজু, ভেঁদোদাকে হাত ধরে নিয়ে আসছে। সঙ্গে পদু, পদুর বউ-মেয়ে, ঝুনে, সর্বেশ্বরজ্যেঠু, সর্বেশ্বরজ্যেঠুর ছেলে-বউ।
আমি সর্বেশ্বরজ্যেঠুকে প্রণাম করলাম।
থাক থাক এখানে তোকে আর এসব করতে হবে না।
এটা অভ্যেসে পরিণত হয়েগেছে জ্যেঠু।
তোমরা ভালো আছো। জ্যেঠুর ছেলে বৌয়ের দিকে তাকালাম।
ওরা হাসছে।
বৌদির সঙ্গে পরিচয় হলো।
ওরা মাথা দোলালো।
ভেঁদোদার দুই কাঁধে হাত রাখলাম। আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
কেমন আছো?
ভেঁদোদার মুখে চোখে একটা যন্ত্রণার ছাপ। চোখটা কেমন ছল ছল করছে।
আমি এখন ভালো আছি।
ভেঁদোদা পকেট থেকে একটা কাগজের মোড়ক বার করে আমার হাতে দিল।
হাসলাম।
এটা আমার একার না সকলের জন্য?
তোর।
সকলে হাসছে।
আমার ছেলেমেয়ের জন্য নিয়ে আসো নি?
ওরা খায় না।
আমি ভেঁদোদার সামনেই কাগজের মোড়ক থেকে চিনি বার করে মুখে দিলাম।
ভেঁদোদা হেসে ফেললো।
ভজু একটু জল নিয়ে আয় আর বল এখানে সবাইকে কফি দিতে।
পদু, ঝুনে হাসছে। ঝিমলি, সঞ্জয় আমার দিকে তাকিয়ে।
ঝিমলি এদের সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দিই এসো।
তোকে আর পরিচয় করাতে হবে না। ভেঁদোদা, ম্যাডাম আর ডাক্তারবাবুর পেসেন্ট। পদু বললো।
তাই নাকি?
আমি পদুর দিকে তাকালাম। পদু হাসছে।
কই আমাকে বলিস নি!
শোনার মতো তোর সময় আছে।
জ্যেঠুর ছেলে, বউ হেসেই চলেছে।
এতদিন যাচ্ছে ওর কাছে, ভেঁদোদাকে আজ প্রথম হাসতে দেখলাম। ঝিমলি বললো।
তুই তখন থেকে ম্যাডামকে ঝিমলি, ঝিমলি করছিস ম্যাডামের নাম তো জয়ন্তী। পদু বললো।
এটার একটা গল্প আছে দাদা, আপনাকে পরে বলবো। ঝিমলি, পদুর দিকে তাকালো।
ভেঁদোদাকে কেমন দেখছো। সঞ্জয়ের দিকে তাকালাম।
আগের থেকে অনেক ভালো।
কিগো ভেঁদোদা ডাক্তারবাবুর কথা শুনছো।
তেঁতো ওষুধ, চিনি দিয়ে খাই।
ওমা দেখছো কেমন টুক টুক করে কথা বলছে। ঝিমলি বললো।
তবু অনিদার সঙ্গে কথা বলছে, আমাদের সঙ্গে কথাই বলে না। সর্বেশ্বরজ্যেঠুর ছেলে বললো।
ভজু কফির ছেলেটাকে ধরে এনেছে, আমার জন্য জলের গ্লাস এনেছে। আমি জল খেলাম।
ভেঁদোদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, আমি ভজুর সঙ্গে যাই।
যাও। গেটের বাইরে যাবে না।
ভজুর দিকে তাকালাম।
ভেঁদোদাকে খাইয়ে দে।
ভজু ভেঁদোদাকে নিয়ে চলে গেল।
ঝিমলি বললো, তুমি কথা বলো, আমরা একটু আমাদের কলিগদের সঙ্গে আড্ডা মারি।
যাও।
পদুর মেয়েটার দিকে তাকালাম। বেশ মিষ্টি করে সেজেছে।
আন্টির সঙ্গে দেখা করেছিস?
মাথা দোলালো। করেছি।
কি বললো?
ওখানে গেলে, খবর দেবে।
তোর চাকরিটা মনে হয় গেল।
তুমি একটা চাকরি দেবে।
আমি নিজেই এখন চাকরি খুজছি।
পদুর মেয়ে হাসছে।
পদুর বৌয়ের মুখের দিকে তাকালাম।
কিগো তোমার বড়কে আর কেউ মারধোর করছে না।
পদু হাসছে। এই প্রথম তোর বাড়িতে এসেছে, বিশ্বাসই করছিল না।
তুই ব্যাটা মাঝে মাঝে গণ্ডগোল করছিস খবর পাচ্ছি।
কেন করবো না। আমি বলেছি ভিক্ষে কর, তোলা তুলবি না। যারা ভিক্ষে করে তাদের কিছু বলি না। তোলা তুললেই মাথা গরম হয়ে যায়।
জ্যেঠু খুব জোড়ে হেসে উঠলো।
পদুর নীতিটা খুব ভালো তাই না অনি?
আমি হাসছি।
তোর ব্যবসা কেমন চলছে?
দারুণ। সকালে মাল নিয়ে আসি, বেচে বিকেলে পয়সা দিয়ে দিই। বিকেলে নিয়ে আসি, সকালে পয়সা দিয়ে দিই। যা পাই কিছুটা হাত খরচ রেখে বউকে দিয়ে দিই। বেশ আছি। চিটিংবাজ কেউ বলছে না।
ধার—
অনেকটা শোধ করে দিয়েছি। জ্যেঠুর বেশ কিছুটা বাকি আছে।
এনজিওতে এ্যাপ্লাই করেছিস?
আমি করিনি। মেয়ে করেছে।
ডাক্তারদাকে আগে থেকে বলে রাখ।
দু-জনকেই বলেছি। একটা সুখবর আছে।
কি!
আমার বউটাকে কনিষ্কদা নার্সিংহোমে একটা কাজ দিয়েছে।
ভাল খবর দিলি। পদুর বউয়ের দিকে তাকালাম। মাথা নিচু করে মুচকি মুচকি হাসছে।
তোর চাকরি?
আমাকে অনিমেষদা বলেছে যেমন কাজ করছো তেমন করো। বাকিটা আমরা বুঝবো।
তাহলে তো হয়েই গেল। জ্যেঠু, ওই পাড়ার অবস্থা কেমন?
আগের থেকে অনেক ভাল। তুই তো আর গেলি না।
যাব। একটু সময় করে নিই।
আর তোর সময়, আগে তবু পদুর মুখে মাঝে মাঝে তোর খবর পেতাম, এখন রেগুলার তোর কথা শুনি।
আমি হাসছি।
তবে হ্যাঁ এখন অনেক শান্তিতে পাড়ায় বাস করি। আমি দোকানে বসলে আগে আমার বন্ধু-বান্ধবরা অনেকে আসতো, তারা আসা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল। এখন তারা আবার আসা শুরু করেছে।
দুলুর দিকে তাকালাম। দুলুবাবু তোমার খবর?
যাঃ তুমি দুলুবাবু বলে লজ্জা দিও না।
আরে ওই হলো।
বাবা বললো তো আগের থেকে অনেক ভালো আছি। একটাই পজিটিভ রেজাল্ট, আগে দোকানটা ঠিক মতো চালাতে পারতাম না, উটকো ঝামেলা প্রচুর ছিল। ধার দেনাও হয়ে গেছিল। এখন অনেকটা সামলে নিয়েছি।
অনেকটা ছন্দে এসেছে। এই তো?
হ্যাঁ।
কথা বলতে বলতে ওদের সঙ্গে বাগানের এই প্রান্তে এলাম। জ্যেঠুর দিকে তাকিয়ে বললাম, আর দেরি করবেন না। এবার খেয়ে নিন।
সকলেই দেখলাম এক একটা গ্রুপে ভাগ হয়ে আড্ডা মারছে।
কনিষ্কদের ধারে কাছে দেখছি না। মনে হচ্ছে ওরা পেছন পাশে অতিথিদের সামলাতে ব্যস্ত।
অনিমেষদাদের দেখলাম বেশ খোশ মেজাজ আড্ডা মারছে। বড়োমা, ছোটোমারাও ওখানে আছে। ডাক্তারদাদা, আন্টিকে দেখতে পেলাম না। হয়তো পেছন পাশে অতিথি সামলাচ্ছে।
আমি পায়ে পায়ে গেটের বাইরে এসে ফুটপাথটায় দাঁড়ালাম। পকেট থেকে ফোনটা বার করে গোটা কয়েক ফোন করলাম। মোটামুটি সব ঠিক আছে।
ফিরে আসার সময় গেট দিয়ে ঢুকতেই নেপলার সঙ্গে ধাক্কা খেলাম।
কোথায় যাচ্ছিস?
তোমার খোঁজে।
কেন! হেসে ফেললাম।
শুনলাম চুপি চুপি বেরিয়ে এসে ফোন করছো।
আমার পেছনে লোক লাগিয়েছিস নাকি!
আমি লাগাই নি। বসরা সব সময় এখন তোমাকে চোখে চোখে রাখছে।
নেপলার কথায় আমি হাসছি।
একটা সিগারেট দে। দুটো টান মেরে যাই।
ওদিকে তো গেলে না। সবার পেট ফুলে যাচ্ছে তোমাকে দেখতে না পেয়ে। তাড়াতাড়ি করো।
আবার গেটের বাইরে এলাম। নেপলা একটা সিগারেট দিল ধরালাম।
আবহাওয়া কেমন বুঝছিস।
দারুণ। অনেকদিন পর ডাক্তারদাকে ভীষণ খোশ মেজাজে দেখছি। আন্টিও বেশ খোশ মেজাজে।
বড়োমা, ছোটোমা?
মাঝে গিয়ে চূড়ান্ত ভাবে ডাক্তারদার পেছনে লেগে এসেছে। এখন অনিমেষদার কাছে। আমাকে তিনবার রিমাইন্ডার দিয়েছে। অনি কোথায়?
আমারে ছেলে মেয়েগুলো।
ফুল মস্তি।
পিকুকে কেমন দেখছিস?
এখন অনেকটা স্বাভাবিক। সকাল থেকে তো ভয়ে তোমার ধারে কাছে আসেনি। বার বার দাদাভাইকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে, তুমি মশাইয়ের হাত থেকে আমাকে বাঁচাও। মশাই আমাকে ছট্টুর মতো মেরে দেবে।
আমি নেপলার দিকে তাকালাম।
হ্যাঁগো বিশ্বাস করো, তোমার এই একটা ব্যাপারে সবাই চমকায়। জানে অনিদার বিশ্বাস অর্জন করতে পারলে অনিদা মাথায় রাখবে, তার কোনওদিন খাওয়া পরার অভাব হবে না। আর বিশ্বাস ভঙ্গ করলেই তার পরিণতি মৃত্যু। এখন সবাই আমার, সাগির আর অবতারের উদাহরণ দেয়। আজ থেকে নতুন সংযোজন অর্জুন।
হাসলাম।
কেন, অর্জুন অনেক গল্প বলে গছে।
হ্যাঁ, ওর জীবনটাও অনেকটা আমাদের মতো। আগে জানতাম না, আজ জানলাম।
নেপলা আমার মুখের দিকে তাকাল।
তোমাকে একটা কথা বলবো।
বল।
দিল্লীতে তুমি খুব একটা থাকনি। তাছাড়া ওই সময় আমরা তোমার পাশে আছি সব সময়। ওকে পেলে কি করে?
একচ্যুয়েলি ও দিল্লীর নয় কানপুরের ছেলে। তারপর আগ্রাতে চলে আসে। সেখান থেকে মুম্বাই।
আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে?
ওর কাছ থেকে জেনে নিস।
নেপলা হাসলো।
নম্রতা কোথায়?
অনিকাদের সঙ্গে আড্ডা মারছে, বেশ মানিয়ে নিয়েছে।
সাগর ওর বউকে দেখতে পাচ্ছি না?
কেশ জন্ডিস।
আবার কি হলো?
তুমি ফোন করলে কিছু জানতে পারো নি?
আমি ওদের ফোন করিনি।
তাহলে কাকে করলে!
অন্য খোঁজ খবর নিলাম।
বুঝেছি।
সাগরের কি হলো বল।
প্রথমে অনিমেষদার কাছে আমরা চলে যাবার পর বেশ ভালোরকম ঝাড় খেয়েছে। একবারে আন্টিকে সামনে বসিয়ে অনিমেষদা ঝেড়ে কাপর পরিয়ে দিয়েছে। সরকারেরও কিছু কাজকর্ম নিয়ে গণ্ডগোল করেছে।
আন্টি কোনও কথা বলেনি?
শুধু বলেছে অনিমেষ তুমি যা ভাল বুঝবে করবে। আমি এতে কোনও বাধা দেব না। আজ থেকে নাতনি আমার কাছে থাকবে। ওর কাছে আর থাকবে না। আমি নিজে অনিকে বলবো।
সাগর মনে হয় প্রবীরদাকে ফোন করেছিল। প্রবীরদা বলেছে অনিমেষদার ওপর আমি কোনও কথা বলতে পারবো না। অনিমেষদা যা বলবেন তা মেনে নিন।
তারপর খাবার দিতে গিয়ে শুনলাম, আলতাফভাই ফোন করেছিল। পরিষ্কার বলে দিয়েছে। রতন যা বলছে শুনে যান। বেশি বারা বারি করবেন না। আখেরে আপনার লাভ, নাহলে ক্ষতি হবে।
ব্যাশ সেই যা গেছে এখনও আসেনি। আন্টি মনে হয় ফোন করেছিল, বলেছে ঘণ্টা খানেক বাদে আসবে।
আন্টির মেয়ে?
সকলের সঙ্গে বেশ মজা করছে। সাগরের সঙ্গে ওর শালাদেরও খুব একটা ভাল সম্পর্ক নেই।
চল ভেতরে যাই।
বাগানের ভেতরে পা রাখতেই দেখলাম বড়োমারা সব গুটি গুটি পায়ে ওই পাশের দিকে এগিয়ে চলেছে। আমাকে দেখে দাঁড়াল।
আমি কাছে যেতেই বললো, বাইরে দাঁড়িয়ে কি করছিলি?
এমনি দাঁড়িয়ে ছিলাম।
তুই এমনি বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলি? ছোটোমা বললো।
অনিমেষদা, বিধানদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
এদিকে এসে দেখলাম সার্ভিসের কোনও লোক নেই সব ঘরের লোক।
কনিষ্করা দেখলাম একপাশে গোল হয়ে হাসাহাসি করছে। জ্যেঠিমনি, ডাক্তারদাদা, আন্টি একটা সোফায় বসে। দামিনীমাসি সব গুছিয়ে গুছিয়ে দিচ্ছে। অনেকটাই ফাঁকা হয়ে এসেছে।
ছোটোমাকে কানে কানে বললাম এবার তোমরা সব ঘরে চলে যাও। আমি একটু পড়ে যাচ্ছি। জ্যোঠিমনি, আন্টি, দামিনীমাসিকে নিয়ে যাও।
সুরোর শ্বাশুরী!
ছোটমার মুখের দিকে তাকালাম।
দিদি বলেছিল, খাবে বেলেছে।
হাসলাম।
ছোটো অনি কি ফিস ফিস করে রে। বড়োমা চেঁচিয়ে উঠলো।
ছোটোমা হেসে ফেললো।
দেখলাম তনু, মিত্রা এদিকে আসছে। কাছে এসেই বললো।
ছেলে এতক্ষণ কোথায় ছিল জিজ্ঞাসা করেছো?
আমি দাঁত বার করে আছি।
খিদে পেয়েছে, কিছু খাওয়া না। মিত্রার দিকে তাকালাম।
বাবাঃ তোর খিদে পেয়েছে! মেয়েকে ডাকি।
তোকে আর উপকার করতে হবে না।
তনু হেসে ফেললো।
ছোটোমার চোখে চোখ রেখে ইশারা করলাম, যাও এবার কেটে পরো।
আমি নিজেই ইসলামভাইয়ের কাছে এগিয়ে গেলাম।
একটু কিছু দাও তো খাই, খিদে লেগেছে।
কি খাবি বল?
একটু রাইস আর মাংস দাও।
মেয়ে অনিকা এগিয়ে এলো, বাবা পার্টি কখন হবে।
কিছু খেয়েছিস?
টুক টাক চলছে।
নেপলা আঙ্কেলকে ডাক। মেয়ে দৌড় লাগাল।
মামা। অনিকা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
কি হয়েছে?
নাচবো না।
হ্যাঁ।
কিছু নেই।
ভাইকে ডাক।
অনিকা ওখান থেকেই চেঁচিয়ে উঠলো। বোচন বলে।
বোচন এদিকে তাকিয়ে আমাকে দেখেই কাছে এগিয়ে এলো। পেছন পেছন সব।
বাবা আর কখন হবে?
তোরা নাচার কিছু রাখিস নি হবে কি করে?
ভাইদাদাই বলেছে ওসব লাগাতে হবে না।
যা তোর ঘর থেকে সব খুলে নিয়ে আয়। আসতে চালাবি।
নিমেষের মধ্যে সব হাওয়া হয়ে গেল।
দেখলাম অনিসা, নেপলার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে আসছে।
আমাকে দেখে নেপলা হেসে গড়িয়ে পরে।
সবাই খালি উসখুস করছে, তুমি শুধু ফিতেটা কেটে দাও।
এই টেবিলে হবে না। তুই দুটো বড়ো টেবিল জোগাড় কর। আর গ্লাস সাজা আমি সব বেটে দেব।
একসঙ্গে।
হ্যাঁ। তারপর যার যার ইচ্ছে মতো নিয়ে খাবে।
জলের গ্লাসের মতো।
হ্যাঁ।
বুঝেছি তুমি নির্ঘাৎ একটা গণ্ডগোল পাকাবে।
কাউকে গাড়ি করে তুলে আনতে হবে না। ঝামেলাও হবে না।
ইসলামভাই প্লেটে করে একটু রাইস আর মাংস নিয়ে এসেছে।
দেখলাম মিত্রা, তনুর হাতেও প্লেট।
ইসলামভাই প্লেটটা আমার হাতে দিতেই অনিকা, অনিসা হাঁ করলো। আমি ওদের মুখে একটু দিলাম। নিজে খেলাম।
পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলাম ছোটোমারা ভেতর দিকে হাঁটা আরম্ভ করেছে।
আবিদকে ইশারায় কাছে ডেকে বললাম, ঘরের টেবিলদুটো বাইরে নিয়ে আয়।
আবিদ মুচকি হাসলো।
রতনকে বল সব বাইরে বার করে আনতে।
দাঁড়াও কয়েকজন বাইরের লোক আছে ওরা চলে যাক।
ওরা সব ডাক্তার কেউ এত তাড়াতাড়ি যাবে না।
আবিদ হাসতে হাসতে চলে গেল।
মেয়ের দিকে তকিয়ে বললাম চিকনাদাকে ডাক আর আবিদ আঙ্কেলকে একটু সাহায্য কর।
মেয়েরা আবিদের পেছন পেছন চলে গেল।
মিত্রা কানের কাছে এসে বললো, আজ যদি একটু বেশি খেয়ে ফেলি কিছু মনে করিস না। বাড়িতেই তো আছি।
তেঁতুল দিয়ে বমি করাবো।
ঠিক আছে, ঠিক আছে আর বলবো না।
তনু হাসছে।
ঘণ্টারা দেখলাম এরই মধ্যে সব ওপর থেকে নামিয়ে নিয়ে চলে এসেছে।
কনিষ্করা এতক্ষণ এদিকে তাকায়নি। গল্পে মশগুল ছিল। সব দেখে শুনে কাছে এগিয়ে এলো।
কিরে আলাদা টেবিল পাতা হচ্ছে! ওপর থেকে বক্স এলো! কনিষ্ক বললো।
শ্রীপর্ণাকে বিয়ে করবো।
তনু, মিত্রা হাসছে।
কনিষ্ক চেঁচিয়ে ডাকলো, নীরু এদিকে আয়।
কনিষ্কর ডাকে সবাই এগিয়ে এলো। কম বেশি সবাই হাসছে।
কি হয়েছে? নীরু গম্ভীর গলায় বললো।
অনি কি বলছে শুনছিস?
কি।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আলাদা টেবিল পাতা হচ্ছে, বক্স লাগান হচ্ছে ব্যাপারটা কি?
বললো, নীরুর শ্রাদ্ধ করবো এই তো। নীরু বললো।
সে বললে বরং ভাল হতো।
তাহলে কি বললো?
বললো শ্রীপর্ণাকে বিয়ে করবো।
তোর তো ছটা আছে, আমার সবে ধন নীলমনিকে নিয়ে টানা টানি করছিস কেন। নীরু চেঁচাল।
শ্রীপর্ণা হেসে গড়িয়ে পরে। হাসতে হাসতেই বললো, তুমিও পার অনিদা।
আমি নীরুর দিকে তাকালাম। গম্ভীর হয়ে বললাম, পার্টি স্টার্ট করছি। বাথরুমটা আগে থেকে মার্কিং করে আয়।
নীরু হেসে ফেললো, আজ খাবই না।
মনে থাকে যেন। বটা কট কট করে উঠলো।
তোর সঙ্গে কথা বলছি।
বটা তেরে যেতেই নীরু আমার পেছনে। আমাকে জাপ্টে ধরেছে।
অনিরে গোদা পায়ের হাত থেকে রক্ষা কর। উঃ পা তো নয় যেন ল্যাম্পপোস্ট।
রতন কাছে এগিয়ে এলো। একবার দেখে নাও সব ঠিক আছে কিনা।
গ্লাস সাজিয়েছিস।
না।
সাজিয়ে দে।
দুটো টেবিল জোড়া লাগিয়েছি।
যথেষ্ট। আমরা সব ঘরের লোক, অর্কদের একবার ফোন করে দে।
করে দিয়েছি। অফিস থেকে বেরিয়েছে। রতন চলে গেল।
কনিষ্ক তোরা একটু দাঁড়া আমি একটু মাইনাস করে আসি।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
আসতে আসতেই পকেট থেকে ফোনটা বার করে চিকনাকে ফোন লাগালাম।
বল।
বড়ো প্লেটের একপ্লেট একটু বড়ো বড়ো টুকরো দেখে মাংস নিয়ে আয়। আর টিকিয়া। বাকিটা বলে দিতে হবে।
একবারে না।
পকেটে ফোনটা রাখলাম, বারান্দায় উঠতেই ছোটোমা এগিয়ে এলো।
তুই কি রে সবাইকে পাঠিয়ে দিয়ে….।
কেন, দামিনীমাসি ঢালতে পারে নি?
পারবে না বলেছে।
গ্লাস বার করেছো?
করেছি।
সব বড়োমার ঘরে সাজাও।
পুঁচকে দুটো আছে।
ওদের খাওয়া হয়ে গেছে?
সুরো পাঠিয়ে দিল, বললো ঘুম পারিয়ে দাও, ঘুমোয় নাকি।
ওদেরও খাইয়ে দেব।
ঘরে ঢুকতেই বৌদি আমাকে দেখে হেসে ফেললো।
নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি আকর্ষণ দেখছিস।
ছোটোমাকে বললাম, কোথায় রেখেছো তাড়াতাড়ি বার করো।
জ্যেঠিমনি, আন্টি সোফায় বসে হাসছে।
আমি বড়োমার ঘরে ঢুকলাম। দেখলাম টেবিলে গ্লাস সাজান আছে। ছোটোমা ব্যাগটা আলমাড়ি থেকে বার করে দিল।
ফ্রিজ থেকে বরফ নিয়ে এসো।
তোর ফিরিস্তি দেখলে খাওয়া মাথায় উঠে যাবে।
ছোটোমা বলতে বলতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
মাম্পি, মিকি খাটে ছিল উঠে এলো।
আঙ্কেল এটা কি গো।
সরবত। খাবি?
দাও।
খেয়েই ঘুমিয়ে পরতে হবে।
দুজনেই মাথা দোলাচ্ছে। খেয়েই ঘুমিয়ে পরবে।
দুজনে আমার দুপাশে দাঁড়িয়ে।
ছোটোমা, দামিনীমাসি এসে ঘরে ঢুকলো। হাতে বরফের ট্রে। মাম্পি, মিকির দিকে তাকাল।
উঠে চলে এসেছিস। ছোটোমা চোখ পাকাল।
আঙ্কেল সরবত দেবে বলেছে। মাম্পি বললো।
ছোটোমা, দামিনীমাসি দুজনেই হেসে উঠলো।
আমি ছোটোমার দিকে তাকালাম।
চিকনা মাংস আর টিকিয়া নিয়ে আসছে। একটু ওভেনে গরম করে নাও।
ওখানে খাবো না?
এটার সঙ্গে খাবে, তারপর ওখানে গিয়ে খাবে।
ঠিক আছে।
দামিনীমাসি, শুধু হেসে যায়।
তুমি হাসছো কেন?
দাদারা জানতে পারলে খেয়ে ফেলবে।
সবাইকে খাইয়ে দেব।
আমি গ্লাসে গ্লাসে ঢেলে সব রেডি করে দিলাম। আইস কিউব দিলাম।
মাম্পি মিকিকে এক ছিপি করে খাইয়ে দিলাম। চোখ নাচিয়ে মাম্পি বললো কি মিষ্টি।
আন্টি, বৌদি, জ্যেঠিমনি ঘরে ঢুকলো। সবাই হাসছে।
দেরি করো না, আমি সব গুছিয়ে দিলাম। তাড়াতাড়ি চলে আসবে, আমি ওদিকটা সামলে দিচ্ছি।
কেউ যদি এসে পরে। বৌদি বললো।
আসবে না। পাহাড়াদার ঠিক করে দিয়েছি।
ছোটোমা প্লেটে করে মাংস টিকিয়া নিয়ে এলো। আমি একটা টিকিয়া তুলে মুখে দিলাম।
বড়োমা আমার দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে।
কিরে কতটা খাব?
দু-গ্লাসের বেশি খাবে না। যেটুকু পরে থাকলো ভাগ করে নেবে।
দামিনী মাসিকে বললাম, শেষ হয়ে গেলে নিজেরা ঢেলে নেবে।
ছোটোমার দিকে তাকিয়ে বললাম সেরকম বুঝলে আমাকে একটা ফোন করবে।
আচ্ছা।
কিরে খেয়ে ওখানে যেতে পারবো তো? ছোটোমা বললো।
বেশ পারবে এতে নেশা হবে না। তাছাড়া এটা ঠিক মদ নয় ফলের রস। একটু দেরি করে নেশা লাগবে।
কি নিয়ে এসেছিস।
স্যাম্পেন।
ওই যে খেলোয়াড়রা গায়ে মাখা মাখি করে।
হ্যাঁ।
মাম্পি মিকিকে বললাম, এবার খাটে উঠে চোখ বন্ধ করে শুয়ে পর।
ওরা খাটে উঠে গেল।
বারন্দায় এসে বাইরের দরজাটা ভেজিয়ে দিলাম।
সোজা বাগানের এপাশে চলে এলাম। দেখলাম প্রবীরদা এসেছে। সঙ্গে স্ত্রী-পুত্র।
আমাকে দেখেই এগিয়ে এলো।
কোথায় ছিলি?
একটু বাথরুমে গেছিলাম।
হেসে ফেললো।
হাসছো কেন?
তুই সত্যি কথা বলিস না তাই।
তোমার সঙ্গে এখন কথা বলবো না। আগে নাচন-কোদনের ব্যবস্থা করি।
আমাদেরও নাচাবি নাকি!
হাসলাম।
আমি ওদিকে চলে গেলাম। রতন, আবিদ টেবিলে গ্লাস সাজাচ্ছে। আমি কাছে এসে দাঁড়ালাম। সবাই ঘিরে ধরেছে। চিকনা পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বললাম, আগে ওখানে গিয়ে পাহাড়া দে। কেউ যেন না যায়।
চিকনা মুচকি হেসে চলে গেল।
আমি একটা একটা গ্লাসে পেগ মেপে ঢালতে শুরু করলাম। রতন, আবিদ, নেপলাকে বললাম সব গ্লাসে আইস দিয়ে যা।
ওরা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
তনু মিত্রাকে দেখতে পেলাম না। ইসি, সাগরের বউয়ের সঙ্গে কথা বলছে।
অনিকা, অনিসা আমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে।
রতন একটা ট্রের ব্যবস্থা কর।
কেন?
দাদাদের দিয়ে আসি।
রতন হেসে ফেললো।
তুমি কি সবাইকে খাওয়াবে নাকি?
এক প্যাগ, বেশি না। সন্টার টেবিলে একটু গরম মাংস আর টিকিয়া দিয়ে আয়।
আমি এদিককার কাজ শেষ করে নিজে ট্রে নিয়ে অনিমেষদাদের সামনে এসে হাজির হলাম। অনুপদা, রূপায়ণদা হেসে উঠলো।
তোর মস্তিষ্কটা বহুত উর্বর।
ধরো ধরো কথা বলো না। সবাই একটু একটু করে।
চাইলে দিবি না? প্রবীরদা বললো।
একবারে না।
এগুলো এখন খেলে খাবো কখন। দাদা বললো।
খেতে খেতেই খাবে।
তোর বড়োমাকে ডাক।
অনিমেষদা, বিধানদা জোড়ে হেসে উঠলো।
না। কোনওপ্রকারে বুজুং বাজুং দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে এসেছি। বলে এসেছি এক ঘণ্টা পর আসবে।
তারপর রাতে আমাকে ঝাড় দিক।
অনিমেষদা, বিধানদা হেসে গড়িয়ে পরে।
তোর বৌদি যদি কিছু বলে আমি তোকে দেখিয়ে দেব। অনিমেষদা বললো।
বক্স বেজে উঠলো। নাচন কোদন শুরু হয়ে গেল।
আমি সবার হাতে একটা করে গ্লাস ধরালাম। ইকবালভাই বললো, তুই খাবি না।
খাচ্ছি।
আবার টেবিলে ফিরে এলাম। দেখলাম চাঁদ, চিনা, ওমর একপাশে গ্লাস নিয়ে চুক চুক করে খাচ্ছে। মীরচাচাও আছে।
আমার দিকে চোখ পড়তে হেসে ফেললো।
খাওয়ার যেন নষ্ট না হয়।
তুমি নিশ্চিন্তে থাকতে পার। চাঁদ বললো।
সুরো কাছে এসে বললো, অনিদা তনুদি-বৌদিকে দেখতে পাচ্ছি না।
আছে কোথাও দেখ।
ফ্যানটাস্টিক বানিয়েছো। সেদিনের থেকেও দারুণ। বুঝতেই পারছি না মদ খাচ্ছি।
তোর বাবাও খাচ্ছে।
বাবাদের ঘরে ঢুকিয়ে দাও।
তোর অসুবিধে আছে।
নাচতে পারছি না।
ভিড়ের মধ্যে নাচ কেউ দেখতে পাবে না।
অনিকা ছুটতে ছুটতে কাছে এলো। হাঁপাচ্ছে।
কি হলো?
মামা রসগোল্লার কমপিটিশন হবে না।
আগে এই পর্বটা শেষ হোক তারপর।
বোন, মামা বলেছে হবে। এখান থেকেই চেঁচিয়ে উঠলো।
ওখান থেকে সবাই হই হই করে উঠলো।
(আবার আগামীকাল)