জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১৬২ নং কিস্তি
আজ থেকে বছর খানেক আগের কথা আপনার মনে আছে? সেই দিন, সবে মাত্র অনি কলকাতায় ফিরেছে।
পরিষ্কার মনে আছে।
সেদিন ওর একটা কথা শুনে আমরা খুব উৎসাহিত হয়েছিলাম।
হ্যাঁ কথায় কথায় ও বলেছিল, এখুনি যদি সরকার পড়ে যায় তোমরা সরকার গড়তে পারবে।
এই তো আপনার পরিষ্কার মনে আছে।
এরপর সব কেমন হচপচ হয়ে গেল। ও নার্সিংহোমে ভর্তি হলো। একটা বিভৎস গণ্ডগোল, তারপর ওর একটা আর্টিকেলে সরকার পরলো, আমরা সেই রাতে ওই ঘরে এসে বসেছিলাম।
হ্যাঁ। তুমি বললে প্রবীরকে সিএম বানাচ্ছি।
ঠিক।
তারপর প্রবীর বললো অনি আমি তোর হেল্প চাই।
একবারে ঠিক এগোচ্ছেন। তখন অনি কি বললো?
আমি তোমাকে হেল্প করতে পারি একটা শর্তে। প্রবীর বললো, বল।
একবারে ঠিক ঠিক এগোচ্ছেন, সত্যি আপনার স্মৃতি শক্তি প্রখর।
তখন অনি বললো, তোমাদের একজন ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী আছে। বারো নম্বর কোর্টে তার নামে আটান্নটা ওয়ারেন্ট আছে। পুলিশের সঙ্গে তিনি মিটিং করেন। কিন্তু পুলিশ তাকে ধরতে পারে না, প্রথমে সেই ফাইলটায় সই করতে হবে।
অনিমেষদা, বিধানদার সে কি হাসি। হাসির চোটে ছোটোমা, বড়োমা, জ্যেঠিমনি, বৌদি সব ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
সামন্তদা, সাগর হচ্ছে সেই ব্যবসায়ী।
এ্যাঁ, বলো কি অনিমেষ! ডাক্তারদাদা সোফাতে হেলে বসেছিল। তরাক করে সোজা হয়ে বসলো।
সাগরের মুখ তখন শুকিয়ে গেছে।
এবার বুঝতে পারছেন কেন সাগর এত মরিয়া। ওর বাঁচার কোনও পথ নেই। আমি ওকে কি সাহায্য করবো। আমি অনিকে বুঝিয়ে-শুঝিয়ে এই কেশটা মিটমাট করলাম। ওইগুলো কি হবে। আজ নয় কাল ও ওপেন করবে।
ওর ছেলাগুলো দেখেছেন। ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না। কিছু বলবেন একগাল হেসে আস্তে করে সটকে পড়বে। আমাদের পর্যন্ত ঘোল খাইয়ে ছেড়ে দিচ্ছে।
কতদিন হোম ওয়ার্ক করে ওরা এই সব কালেকশন করেছে। অনি ছেড়ে দিলে ওরা ছেড়ে দেবে। সব চুপচাপ বসে আছে। অনি গ্রীণ সিগন্যাল দিলেই খেলা শুরু করে দেবে।
অনিমেষদা এবার আন্টির দিকে তাকিয়ে বললেন, দিদি আপনি সব শুনলেন, এবার বলুন আপনি যদি আমার জায়গায় থাকতেন সাগরকে কি ডিসিশন দিতেন।
আমি এ্যালুপ থাকতাম। তোমার ব্যাপার তুমি বুঝে নাও। আন্টি বললো।
সাগর শুনলে তোমার শ্বাশুড়ী মায়ের কথা।
সাগর তখন মাথা নিচু করে বসে আছে। চোখ মুখ লাল।
দেখো সাগর সত্যি মিথ্যে এখনও যাচাই করিনি। আমার কাছে একটা খবর আছে।
সাগর মুখ তুলে তাকাল।
তুমি যদি দিদির জামাই না হতে, কিংবা সামন্তদার শরীর গতকাল খারাপ না হয়ে সাতদিন পর খারপ হতো, আর দিদি যদি সাতদিন পর এই বাড়িতে আসতো। তুমি আমাদের সামনে এইভাবে বসে কথা বলতে পারতে না। আমার মনে হয় অনির অনুমতি ছাড়াই, এই খবর তোমার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
ঘরের সবাই চুপ। কারুর মুখ দিয়ে কোনও কথা বেরচ্ছে না।
সেই খবরটা কতটা ভয়াঙ্কর তুমি সেটা নিশ্চই বুঝতে পারছো।
সেই জন্য আপনার সাহায্য চাইছি।
আমার থেকেও তোমার অনেক ক্ষমতা। তুমি অনিকে তোমার কতটা ক্ষমতা আছে দেখাতে গেছ। তোমার ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করো, দেখো তারা তোমায় কোনও সাহায্য করতে পারে কিনা। তুমি তো অনেক বড়ো বড়ো ব্যবসায়ী সংগঠনের মাথায় বসে আছো।
সাগর কোনও কথা বলে না। কেঁদে ফেলার মতো অবস্থা।
আমি হলপ করে বলতে পারি, তোমাকে কেউ সাহায্য করবে না। তারাও ব্যবসা করে। অনির সঙ্গে তোমার বেশ কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু নিত্য যোগাযোগ রেখে চলেছে। কামিং প্রজেক্টে কাজ পাওয়ার জন্য, তুমি তাদের সঙ্গেও মিস বিহেভ করেছো।
আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারিনি।
তাহলে অনির সঙ্গে টক্কর নিতে গেছ কেন। ইসলামকে দেখেছো, একসময় কলকাতায় ও ছাড়া কেউ ছিল না। আজ তাকে অনি তিনশো ষাট ডিগ্রী ঘুরিয়ে দিয়েছে। ওই যে নেপলাটা ওর পেছন পেছন ঘুরছে। তোমার মতো দুটো ব্যবসায়ীকে ও কিনে নেবে। আরও দুটোর খবর তুমি নিশ্চই রেখেছো। এতো সব জানা সত্ত্বেও তুমি ক্ষমতা দেখাতে গেছো, কেন?
আমি কি আপনাদের জন্য কিছু করিনি?
করেছো বলে তুমি এই বাড়িতে প্রবেশ করার অনুমতি পেয়েছ। এই মুহূর্তে বসে কথা বলতে পারছো। না হলে সেটুকুও পেতে না। এত সহজে তুমি অনির দেখা পেয়ে গেলে কথা বলতে পারলে। সেটা কি এমনি এমনি।
সবাই চুপচাপ শুনছে।
দেশের স্বরাষ্ট্রসচিব এ বাড়িতে এসে এক রাত কাটিয়ে যায়। তার ছেলে-মেয়ে এখানে এসে বাহাত্তর ঘণ্টা কাটিয়ে যায়। আমরা দিনরাত এখানে পড়ে আছি। এমনি এমনি।
আমাদেরও স্বার্থ আছে। তোমার থেকে বেশি। তোমাকে সাহায্য করতে গেলে সেটা আমাদের হাতছাড়া হবে। তুমিও গন্ধে গন্ধে সেই সব জায়গায় ইনভেস্ট করে বসে আছো। করোনি?
সাগর আর মাথা তোলে না। মুখ গুঁজে বসে আছে।
অনি যা বলে অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলো, না হলে আখেরে তোমার ক্ষতি। আমি বিধানবাবু কোনও সাহায্য তোমাকে করতে পারবো না। প্রবীরকে বলো, ও যদি কিছু করতে পারে।
প্রবীরদা হাত গুটিয়ে নিয়েছে।
অনিমেষদা হেসে ফেললো।
তুমি গতো কুড়ি বছরে পার্টিকে যা দিয়েছো, তার হাজার গুণ বেশি ব্যাবসা করে নিয়েছো। তুমি কি ভাব আমরা কোনও খবর রাখি না?
আমি সে কথা বলছি না। সাগর বললো।
আর কেউ পারে কিনা দেখ। আমার দ্বারা হবে না।
প্লিজ অনিমেষবাবু।
এটুকু তোমাকে এ্যাসুয়রেন্স দিতে পারি, তুমি যেহেতু দিদির জামাই তোমাকে ও মারবে না। তবে সর্বশান্ত করে দিতে পারে। যা অনি ওর বাল্য বন্ধু অনাদিকে করতে চলেছে।
আমি ওখানে ফেঁসে গেছি।
আন্টি তখন কি জোরে হেসে ফেলেছে। সবাই কেমন অস্বস্তিতে পড়ে গেছে।
আমি জানি। কিন্তু আমার হাত পা বাঁধা। তুমি বলছো যখন, আমি অনির মন বুঝে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করবো। তবে কতদূর কি করতে পারবো জানি না।
আমাকেই কথায় কথায় ওর দেশের বাড়িতে খেতে বসে সবার সামনে বলে দিয়েছিল, তোমার ভুল দেখলে তোমাকে রাজনীতি থেকে সন্ন্যাস নিতে বাধ্য করাবো। ওর গার্ডস আছে, করে দেখাতে পারে।
জানো সাগর আমি যখন ওকে প্রথম দেখি তখন ওর গোঁফ-দাড়ি বেরয়নি। ওর প্রতিটা চাল চলন আমার নখো দর্পনে। তবু ওকে মাঝে মাঝে বুঝতে পারি না। আর তুমি হুমকি-টুমকি কত কিছু দিয়ে ফেলেছো। তখন কি একবার আমার সঙ্গে এসে আলোচনা করেছিলে। করোনি।
যাও মেলা বকিও না। তুমি বুদ্ধিমান ব্যবসায়ী, তোমার অনেক রকম ব্যবসা। আমি কি বলতে চাইছি নিশ্চই বুঝতে পেরেছো। ওর যে রিপ্রেজেন্টেটিভ তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করছে তার সঙ্গে বসে একটা সেটেলমেন্ট করে নাও। এর বেশি আমি কিছু বলতে পারবো না।
অনাদি বাবুর ব্যাপারটা আপনি একটু সামলিয়ে দিন।
কথা দিতে পারবো না। ওকে এখন ছয়মাস ঠিক ভাবে পাব কিনা সন্দেহ। যেটুকু পাচ্ছি তাতে মন খুলে কথা বলতে পারছি না। নিজেদের কথা বলতেই সময় চলে যায়।
সাগর দেখি গট গট করে সোফা থেকে উঠে বাইরে চলে গেল।
বেরিয়ে যেতেই আন্টি বললো, তুমি ঠিক করেছো অনিমেষ, মহা তেঁদড়, আমার মেয়েটা ওর জন্য দুবার স্যুইসাইড করতে গেছিল। বিয়ে দিয়েছি কিছু করতে পারি না। অনেক অবলিগেশন। মেয়েটা আমার কাছে আসতো, থাকতো, তাকে পর্যন্ত আসতে দেয় না। কষ্টের কথা কি বলবো।
সব এই অজুটার জন্য। শয়তানটা চল্লিশ বছর পরও আবার জ্বালাতে শুরু করেছে।
ওই রকম গুরুগম্ভীর পরিবেশেও ঘরের সকলের সে কি হাসি।
বড়োমার ফর্মা তখন যদি একবার দেখতে। ডাক্তারদাদা খালি মুচকি মুচকি হাসে।
তুমি খুশবু নিচ্ছিলে। তনুর দিকে তাকালাম।
হাতটা কোথায় আছে বুঝতে পারছো।
পারছি।
খুশবু একবারে বার করে দেব।
মিত্রা আমার গালটা ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ধরলো।
বড়োমাকে বোতল কে এনে দিয়েছে?
ধমকাচ্ছিস কেন।
ভালোকথা মনে করিয়ে দিয়েছো।
তনু সটাং উঠে বসলো।
তনুর দিকে তাকালাম।
যুদ্ধ করবে নাকি?
সেরকম ইচ্ছে আছে।
লেগে পরো আমি প্রস্তুত।
মিত্রা ঘুসি তুলেছে, মুখ ফাটিয়ে দেব।
সত্যি আজ এতো ভাললাগছিল বড়োমাকে আর ছোটোমাকে দেখে কি বলবো। তনু বললো।
তোমরা জানলে কি করে?
মিত্রাদি বলবে।
মিত্রার দিকে তাকালাম।
আগে বল অর্জুন কেশটা কি?
বিশ্বাস কর আমি বিন্দু বিসর্গ কিছু জানতাম না। বিউরিয়াল গার্ডেনে গিয়ে জানতে পারলাম।
ন্যাকামো করবি না।
তাহলে আর কিছু বলার নেই। মেয়ে আর অনিকা প্ল্যান করেছিল। তবে নেপলা মনে হয় একটা আঁচ করেছিল, ঠিক বুঝতে পারেনি।
নেপলাদের মতো অর্জুনকেও তুই মানুষ করেছিস?
হ্যাঁ।
এরকম হয়ে গেল কেন!
সে অনেক কথা। বলতে পারিস আমিও কিছুটা দায়ী।
কিরকম।
তখন আমার কোনও গতি ছিল না। একটা মরচে পরা লোহা কুড়িয়ে পেয়েছিলাম। তারপর তাকে সান দিলাম। দেখলাম খাঁটি ইস্পাত বনে গেল।
জানিস আমি অপারগ হয়ে একরাতে ওর হাতে প্রথম রিভালবার তুলে দিয়েছিলাম। সেদিন শুভর মাথায় হাত রেখে ওকে শপথ করিয়েছিলাম এই বাচ্চাটার জন্য তুই এই কাজটা করে দে।
কি বলছিস তুই!
আমি একটুও ভুল বলছি না।
তখন আমরা সকলে দুবাইতে। মিঃ মুখার্জী পোস্টিং নিয়ে গেছে।
সেদিন রাতে বাড়ি ফেরার পর, মুখার্জী আমাকে ফোন করলো। অনিবাবু আমি বেরচ্ছি, সলিড টিপ আছে। আমি বার বার বললাম যাবেন না। আমি খবর নিয়েছি, আমার মনে হচ্ছে ওটা টোপ, আমার কথা শুনলো না। আমি সঙ্গে সঙ্গে স্পটে গেলাম আমার যাওয়ার আগেই কাজ গুছিয়ে চলে গেছে।
আফতবভাইকে ফোনে খবরটা দিয়ে মুখার্জীর ফ্ল্যাটে এলাম। দেখলাম মুখার্জীর স্ত্রীর বডিটা বিছানায় পড়ে আছে। শুভ ভেতরের ঘরে ঘুমচ্ছে। তখন ও এগারো মাসের শিশু। বুকে করে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে এলাম। কিছুক্ষণ পর আফতাবভাই এলো। দিদি এলো।
দিদিকে বললাম যেমন করেই হোক বাচ্চাটাকে তুমি কয়েকদিনের জন্য সামলাও।
আমি তখন পাগল কুত্তা। চারদিকে জাল ফেলতে শুরু করে দিলাম। খবর নিয়ে জানলাম ওর নিজেরই অফিসারগুলো বিট্রে করেছিল। চুপ চাপ থাকলাম কয়েকদিন।
তখন নেপলা, সাগির, অবতার ছিল না?
ছিল। ওদের কাছে ওরা শিশু।
অর্জুন তখন বম্বেতে, বললাম, তুই ইমিডিয়েট আয়। আর একজন ছিল। দুবাইয়ের কাজটা একজন করলো, বম্বের কাজটা অর্জুন করলো।
ও চলে এলো।
তখনও ও কোনওদিন মার্ডার করেনি। ভয় দেখিয়েছে। ওকে সব বললাম শুভর মাথায় হাত দিয়ে শপথ করালাম। ও কথা দিয়েছিল। কথা রেখেছিল। তার মধ্যে আমাদের এখানকার দুজন টপ অফিসার ছিল। আর তিনজন ছিল টডির লোক।
সেই যে ওর যাত্রা শুরু এখনও চলছে।
আফতাবভাই সেই সময় দারুন হেল্প করেছিল। এখান থেকে শুভর দাদু-ঠাকুমা ওর পিসী গেল। সব বললাম। শুভর দাদুর হাতে শুভকে তুলে দিলাম।
ওর বয়স কতো।
নেপলাদের বয়সী।
দেখলে তো মনে হয় বছর চব্বিশ বয়স।
ও আমার তোলা কাপর, কখনও আটপৌরে করে ব্যবহার করি না। সেদিক থেকে ঝিনুক, অভিমন্যু ঠিক আছে।
আজ ও মেরিনাদির কথা শুনে খুব কেঁদেছে।
কাঁদলে কি করবো বল। যা সত্যি তাই বলেছি।
অর্জুনের লুকটা দারুণ সুন্দর।
তুই কথা বললে বুঝতেই পারবি না।
দেখছো মিত্রাদি তুমি তখন শুধু শুধু আমাকে ধমকাতে, আমি কিছুই জানতাম না।
এখন বুঝতে পারছি তনু। সেই সময় তোকে মাঝে মাঝে ভুলও বুঝেছি।
মিত্রা আমার দিকে তাকাল।
মেয়ে মোবাইলে ছবি তুলে এনেছিল, দুজনে দেখলাম। আবার বলেছে, তুই অনিদার মেয়ে আমার ভাইঝি, তোর অনিকার গায়ে কেউ যদি একটু ফুঁ দিয়েছে, তার গলাটা ধর থেকে আলাদা করে দেব।
হাসলাম।
মাঝে মাঝে তোকে নিয়ে খুব ধন্ধেতে পরে যাই।
কেন?
তোর মতো ছেলে, তুই এই জায়গায় কি করে পৌঁছলি!
হাতিবাগান থেকে চূড়মূড়ভাজা খেতে খেতে যখন তোকে নিয়ে শ্যামবাজারে পৌঁছতাম তখন মনে মনে ঠিক করেছিলাম মিত্রাকে বিয়ে করবো, আর এই সব করবো, তাই পৌঁছে গেলাম।
দেখলি তুই কেমন। কথা বলার রিদিমটা কেমন নষ্ট করে দিস।
তনু হাসছে।
ঘুমিয়ে পর, অনেক রাত হলো।
বড়োমার বোতলটা এতো দামী আমাদেরটা কম দামী কেন?
চিকনা কিনেছে।
তুই জ্যেঠিমনিকে পর্যন্ত খাইয়ে দিলি!
খেতে চাইলে কি করবো।
তার মানে!
আবিদের রিসেপসনের পরের দিন সকালে চা খাওয়ার জন্য ও ঘরে গেলাম। দেখলাম ছোটোমা মাছের বড়া ভাজছে, রান্নাঘরে ঢুকে পরলাম। বড়োমা, জ্যেঠিমনি, ছোটোমা, বৌদি ধরলো কালকে ওদের দেখে কি ভালো লাগছিল, আমাদের একদিন খাওয়া। কোনওদিন খাইনি।
যাঃ।
সত্যি বলছি। একটুও মিথ্যে কথা বলছি না।
তারপর ডাক্তারদাদার নাম করে দেড়েমুসে গালাগাল দিল, ওখানে গিয়ে ওই কন কনে ঠাণ্ডায় কি সব ভুসি মাল খাইয়েছে, গা গরম পর্যন্ত হয়নি। কথা দিয়েছিলাম সুযোগ এলে অবশ্যই খাওয়াব। আজ সুযোগ পেলাম খাইয়ে দিলাম।
তুই যখন কনিষ্ককে বললি মাইনাস করতে যাব। তখনই বুঝেছিলাম কিছু একটা করবি। তোর মাইনাস মানে কখনও এক ঘণ্টা কখনো দু-ঘণ্টা।
আমি হাসলাম।
মনটা খচ খচ করে উঠলো। তক্কে তক্কে ছিলাম। দেখলাম তুই ফিরে এলি, পার্টির আয়োজন করতে ব্যস্ত হয়ে পরলি। তোর পাশে চিকনা ছিল হঠাৎ দেখলাম হাওয়া।
তনুকে বললাম, দেখতো চিকনা গেল কোথায়।
ও কিছুক্ষণ পর ঘুরে এসে বললো, চিকনা বাগানের ও প্রান্তে বড়োমার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কার সঙ্গে ফোনে কথা বলছে।
বুঝে গেলাম একটা গণ্ডগোল হলেও হতে পারে। এই বাড়িতে আগে যে কটা প্রোগ্রাম হয়েছে একটাও গণ্ডগোল ছাড়া সম্পূর্ণ হয়নি। আজও সকাল থেকে ছিটে ফোঁটা চলছে।
তখন সবে মাত্র আমি আর তনু একটা শেষ করেছি। ভেবেছিলাম রয়ে সয়ে খাব।
দেখলাম তুই তোর মতো কাজ করে চলেছিস।
তনুকে বললাম তুই এক কাজ কর পেছন দিয়ে গিয়ে বড়োমার ঘরে একবার উঁকি মেরে আয়।
তনু গিয়ে ম্যাসেজ করলো, সিগ্গির এসো, এখানে দারুন একটা মজার ঘটনা হচ্ছে।
আমি হাসছি।
তারপর সবার চোখের আড়ালে সটকে গেলাম। এতদিন এই বাড়িতে আছি। ওই ঘুপচি গলিতে আগে কোনওদিন ঢুকিনি। ছোট্ট প্যাসেজ কোনও প্রকারে ঢুকে পরলাম। দেখলাম তনু জানলা দিয়ে উঁকি মারছে।
আমাকে দেখে মুখে আঙুল তুললো। পা টিপে টিপে ওর কাছে গেলাম।
জানলা দিয়ে উঁকি মেরে আমি অবাক। মাম্পি-মিকি বিছানায় অঘোরে ঘুমচ্ছে।
মাঠ থেকে মিউজিকের যে সামান্য আওয়াজটুকু ভেসে আসছে তাতে বৌদি, ছোটোমা কোমড়ে কাপর পেঁচিয়ে নাচছে। সবার হাতে রঙীন জলের গ্লাস। মাঝে মাঝে বড়োমা, জ্যেঠিমনি আর আন্টিকে বলে, উঠে একটু নেচে নাও এখানে দেখার কেউ নেই। ওখানে তো নাচতে পারবে না। সেই শুনে সুরোর শ্বাশুরির কি হাসি।
দামিনীমাসিকে হাত ধরে টেনে তুলে বলে নাচো।
তারপর বলে আমি সোনা একটু তোমাদের সঙ্গে নেচে নিই।
তখন দামিনীমাসি বলে দিদি হাঁটু ব্যাথা করবে।
করুক, ভজু টিপে দেবে।
বুঝতে আর কিছু বাকি রইলো না।
তারপরেই বড়োমা বলে, কি এনেছে কে জানে, চিনি গোলা সরবৎ। দামিনী সব শেষ হয়ে গেল, তুমি ঢালো।
দামিনীমাসি হেসে গড়িয়ে পরে।
ওরে আমি কি খাই বড়োমা, জ্যেঠিমনি, আন্টি দেখি ঢক ঢক করে খেয়ে নিচ্ছে।
ছোটোমা বললো দিদি তোমার তিন গ্লাস হয়ে গেছে আর খেয়ো না। অনি বলেছে এটা কিন্তু অনেক দেরি করে নেশা হয় সামলাতে পারবে না।
রাখ তুই। সব মিছে কথা। ও আজকাল ওর দাদা আর ডাক্তারের মতো হেঁপি মারতে শিখেছে।
আন্টির সে কি ফুলে ফুলে হাসি।
তুমি বাড়িতে খাও না। বড়োমা বললো।
কনফারেন্সে গেলে একটু আধটু মুখে দিতাম। এখন সে সব পাঠ চুকে গেছে।
দিদি আস্তে। বাচ্চাদুটো উঠে পড়বে। দামিনীমাসি বললো।
অনি ওদের দুই ছিপি খাইয়ে দিয়েছে। ওদেরও নেশা হয়েছে, উঠবে না। বৌদি বললো।
আমি তনু না পারছি হাসতে না পারছি কথা বলতে। মুখের মধ্যে আঁচল ঢুকিয়ে নিলাম। যদি শব্দ বেরিয়ে আসে।
সে কি ইয়ার্কি ফাজলামো নিজেদের মধ্যে। কান গরম হয়ে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর বড়োমা বললো, চল বোতল শেষ। ছোটো লুকিয়ে-টুকিয়ে রাখ, কেউ দেখে ফেললে বিপত্তি। ও দুটোর চোখ ভালো নয়।
কাদের! ছোটোমা বললো।
কাদের আবার, তনু আর মিত্রা। ওই দুটো তো হার বজ্জাত।
তারপর দেখি সবাই সবার মুখ শোঁকে গন্ধ বেরচ্ছে কিনা। কেউ মুখে গন্ধ পায় না।
বড়োমা বললো, বাচ্চাদুটো আছে সবাই গেলে হয় কি করে।
ওরা এখন উঠবে না। বৌদি বললো।
উঠবে না বলে ঘর খালি রেখে যাওয়া যায়। বড়োমা বললো।
এক কাজ করো ছগনকে বলো এসে পাহাড়া দিক। ছোটোমা বললো।
তারপর ছগনভাইকে রেখে সবাই বেরিয়ে এলো।
আমরা দুজনে তার আগে পৌঁছে গেছি। একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে। তখনই তনুকে বলেছি, তনু আজ নির্ঘাৎ একটা গণ্ডগোল বাধবে আমরা দু-জনে কেউ খাব না।
তনু বললো, কি শয়তান ছেলে বলো, একটু আনন্দ করবো তারও উপায় নেই, এদের পর্যন্ত খাইয়ে দিল।
আমি তনুর গোপন অঙ্গে হাত ছোঁয়াতেই তনু তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো।
কি হলো! মিত্রা বললো।
তনু দাঁত মুখ খিঁচিয়ে আমার নাক মুখ টিপে ধরেছে।
মিত্রা বুঝতে পেরেছে, সারাটা শরীর কাঁপিয়ে হেসে উঠলো।
তোরটায়….।
কিছুক্ষণ তিনজনে মিলে ধস্তা ধস্তি করলাম।
হাসি থামিয়ে মিত্রা আবার শুরু করলো।
জানিস বুবুন, আসা মাত্রই বড়োমা শুরু করে দিল। তারপর নিজে নিজেই বললো, সবাই গিলছে আমরাই বা বাকি থাকি কেন। ওমা দেখি যারা সার্ভিস করছিল তাদের ডেকে পটা পট একটা করে গ্লাস নিয়ে খেতে শুরু করলো।
অনিমেষদা ব্যাপারটা মনে হয় প্রথমে ধরতে পেরেছিল, কিন্তু কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। তারপর বৌদিকে মাঝে মাঝে মিউজিকের তালে কোমড় দোলাতে দেখে অবাক।
সবার চোখ বড়োমাদের দিকে। ওরা কিন্তু নিজেদের মতো করে এনজয় করছে।
মাঝে মাঝে আন্টির হয়ে ডাক্তারদাদার ষষ্ঠী পূজো করে ছেড়ে দিচ্ছে।
প্রথমে সুরো এসে বললো, বৌদি ব্যাপারটা কি, মাকে কেমন কেমন যেন দেখছি!
সুরোকে ধমকালাম, তোর কি নেশা হয়েছে।
বলে বাবা আছে বলে এখনও সেই ভাবে শুরুই করিনি। সবে একটা খেয়ে দুটো চলছে।
শুরু করে দে, কেউ কিছু বলবে না।
মিলি, অদিতি, টিনা এসে দাঁড়াল। আমি ওদের দিকে তাকাই, গম্ভীর হয়ে থাকার চেষ্টা করি। পারি নাকি।
মিলি বললো মিত্রাদি বড়োমা, ছোটোমা, জ্যেঠিমনিকে কেমন কেমন যেন লাগছে।
কটা খেয়েছিস।
দুটো করে খেয়েছি, কিন্তু তুমি যা ভাবছ তা একটুও হয়নি।
তারপরেই দেখি কনিষ্ক, নীরু এসে হাজির।
ম্যাডাম, বড়োমা-ছোটোমা-বৌদি, অনিকা-অনিসার সঙ্গে নাচছে, জ্যেঠিমনির কোমর দুলছে, দামিনীমাসিকে এতদিন দেখছি, কোমড়ে কোনওদিন কাপর জড়াতে দেখিনি। ব্যাপারটা ঠিক ভালো ঠেকছে না।
তোমার বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করো।
নীরু চেঁচিয়ে উঠলো, খাইয়ে দিয়েছে?
গাঢ়ল, চেঁচাচ্ছিস কেন। কনিষ্ক দাঁত মুখ খিঁচিয়ে উঠলো।
আমি কনিষ্ককে ডিটেলস দিলাম।
কনিষ্ক শুনে অবাক। বলো কি ম্যাডাম!
শুধু রগড়টা দেখে যাও। আর গুণমন্ত্র ছেলেকে দেখো, গ্লাস বানিয়ে সকলকে সার্ভিস দিয়ে চলেছে। গিয়ে জিজ্ঞাসা করো, বলবে কিছু জানি না।
চিকনা কোথায়?
দেখো আশেপাশে কোথাও আছে। বড়োমাদের চোখে চোখে রেখেছে। বিপদের গন্ধ বুঝলে গুরুকে খবর দেবে।
মিলি, টিনা, অদিতি লাফিয়ে চলে গেলে।
মিত্রাদি এই সুযোগ আর জীবনে পাব না, একটু কোমড় দুলিয়ে আসি।
তিনজনে দে ছুট।
পরপরই দিদিভাই এলো, ছুটকি ভালো বুঝছি না।
ওকে আবার বললাম, সব শুনে ওর চোখ বড়ো বড়ো।
অনি! মাকে….!
যা তুই একটু নেচে আয়।
মা লজ্জা পেয়ে যাবে। বরং ওকে গিয়ে বলি।
আমি হাসলাম।
এবার ঘুমই। অনেক রাত হয়েছে।
আমাদের পাওন গণ্ডা। তনু বললো।
নীপা কেশটা এখনও জানা হয় নি। মিত্রা বললো।
কাল মিটিং করি তারপর জানতে পারবি।
দুজনেই আমার ঘারের কাছে মুখ গুঁজে দিলো। একটু দুষ্টুমি করলাম।
ঘুম ভাঙতে দেখলাম আমার ঘরে জোড় আড্ডা বসেছে।
লম্বা সোফায় তনু, মিত্রা, সুরো, নীপা। ছোটো দুটোর একটায় বৌদি আর একটায় আন্টি। বড়োমা আমার মাথার শিয়রে জ্যেঠিমনি আমার পায়ের কাছে, ছোটোমা মাঝখানে।
আমি উপুর হয়ে শুয়ে ছিলাম। বড়োমার হাত আমার মাথায় মোলায়েম ভাবে খেলা করে চলেছে।
আলোচনার বিষয়বস্তু কালকের খাওয়া দাওয়া।
নিজেরা নিজেরা বলে আর হেসে গড়া গড়ি যায়।
আমি কিছুক্ষণ শুয়ে শুয়ে ওদের কথা শুনলাম। বেশ মজা লাগছে।
দামিনীমাসি মেনেহয় গেটের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। মাসির গলা পেলাম। খাবার দাবার নিয়ে এসেছে। ভাগ করতে হবে।
মিত্রা চেঁচিয়ে উঠলো এবার ছেলেকে তোলো, অনেক ঘুমিয়েছে, আমাদের সেই সাত সকালে গুঁতিয়ে তুলে দিয়েছো।
উঠলেই তো মিটিং-এ বসবে। দেখছিস না সব কেমন ওঁত পেতে বসে আছে। একটাই রক্ষে রান্না করতে হবে না। বেঁচে গেছি।
তারপরই বড়োমার স্নেহের হাত আমার মাথায়।
ও অনি ওঠ বাবা অনেক বেলা হলো।
আমি সামান্য নড়ে চড়ে উঠলাম। আড়মোড়া ভাঙলাম। বড়োমার দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমির হাসি হাসলাম। তারপর ছোটোমার দিকে আর বৌদির দিকে তাকালাম।
আমার মুখের দিকে তাকিয়ে সকলে হো হো করে হেসে উঠলো।
বুঝতে পারলাম না। কেন হাসছে।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, একবার উঠে আয়নায় মুখটা দেখ।
ভাবলাম হয়তো ওদের মাথার সিঁদুর টিঁদুর লেগে আছে।
নীপা-সুরো তখনও হেসে চলেছে।
বুঝলাম নির্ঘাৎ কিছু হয়েছে। উঠে এসে আলমাড়ির সামনে দাঁড়ালাম।
সারা মুখে কালি ঝুলি মাখানো। গোঁফ দাড়ি তৈরি করেছে, কপালে টিপ লাগিয়েছে, চোখে কালি ঝুলি লাগিয়েছে, এক কিম্ভূত কিমাকার অবস্থা।
মিত্রা, তনুর দিকে তাকালাম।
আমরা না, তোমার মেয়েরা। তনু চেঁচিয়ে উঠলো।
তুই সকলকে কালকে সাজিয়ে-গুজিয়ে দেখছিলি কাকে কেমন লাগছে, তাই তোর দুই মেয়ে সকাল থেকে তোর পেছনে ধৈর্যধরে অনেক পরিশ্রম করেছে। মিত্রা বললো।
আমি আলনা থেকে টাওয়েলটা নিয়ে বাথরুমের দিকে চলে গেলাম।
মেয়ে করেছে তাই সাতখুন মাপ তাই না। মিত্রা চেঁচাল।
আমি বাথরুমে ঢোকার আগে একবার মুখটা বার করলাম। অট্টহাসিতে ঘরটা ফেটে পরলো।
কালি ঝুলি তুলতে বেশ সময় লাগল।
মনে মনে আজকের প্রোগ্রাম সাজালাম। সুবীর, চিকনার সঙ্গে একবার বসতে হবে। জানিনা চিকনা বাসু, মীরচাচাকে বাড়িতে পাঠিয়েদিল কিনা। অনাদির ব্যাপরটা এবার মিটিয়ে ফেলতে হবে। দিবাকরকে সামনে আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।
কাজ সেরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলাম।
তনু আলমাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কি করছিল। আমাকে দেখে মুচকি হাসলো।
পাজামা, পাঞ্জাবী পরবে না প্যান্ট, গেঞ্জি।
আজ তোমার দায়িত্ব?
না, কারা এসেছে দিদিকে ডেকে পাঠাল তাই গেল।
আবার কারা এলো!
মনেহয় বরুণদাদের কোনও আত্মীয়।
তোমার সঙ্গে আলাপ হয়নি।
এখনো যাইনি। দিদি বললো তুই বুবুনকে সঙ্গে নিয়ে আয়। বলো কি পরবে?
পাজামা পাঞ্জাবী দাও।
অনেকগুলো নতুন পড়ে আছে একটা বার করে দিই।
দাও।
তনু বার করে দিল, আমি দরজাটা ভেজিয়ে দিলাম।
অনিমেষদারা আছে?
সকালে চা খেয়ে বেরিয়েছিল, ফিরে এলো, তুমি ঘুমচ্ছ দেখে আবার কোথায় বেরল।
অনিকা, অনিসা কোথায়?
ওপরে ব্যাগ গোছাচ্ছে। আফতাবভাই সকাল থেকে বার পাঁচেক ফোন করেছে।
কথা বলেছো?
সবাই কথা বলেছি।
অনুপ ফোন করেছিল?
হ্যাঁ। মিউটেসন হয়ে গেছে।
তাহলে তুমি এখন বড়োলোক। লণ্ডনে তোমার বাড়ি আছে দিল্লীতে তোমার বাড়ি আছে।
তনু আমার দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।
হাসছো যে!
এই যে বড়োলোক বললে, তাই।
বড়োলোক মানুষকে বড়োলোক বলবো না তো কি গরীব লোক বলবো।
তনু একবার দরজার দিকে তাকাল, আমি ভেজিয়ে রেখেছি না ছিটকিনি দিয়েছি।
তনু কাছে এগিয়ে এলো। জড়িয়ে ধরে মুখের কাছে মুখটা তুলে ধরলো।
আমার ম্যারেজ সার্টিফিকেটে লেখা রয়েছে আমার হ্যাজবেন্ডের নাম অনিন্দ ব্যানার্জী। তনু ব্যানার্জী বড়োলোক, অনিন্দ ব্যানার্জী গরীব, তাই না। তনু ব্যানার্জী বড়োলোক হলো কি করে?
তনুর নাকে আমার নাকটা ঘসে দিলাম। তনু ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ালো।
এটা মিত্রা ব্যানার্জী বলতে পারে।
তাহলে দিদিকে ডাকি।
ডাকো, সক্কাল সক্কাল তিনজনে একটু লেগে পরি।
এতদিন পর কাল দাদা নিজে থেকে ফোন করেছিল।
তাই!
বার বার তোমার কথা জিজ্ঞাসা করছে, বলছে একটু আলাপ করিয়ে দিবি।
কেন!
হয়তো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। খুড়তুতো ভাইরাও ফোন করেছিল।
তনু আমার পাঞ্জাবীর বোতাম লাগাতে শুরু করলো।
হঠাৎ দেখবে এই মুহূর্তে তোমার আত্মীয়-স্বজনের সংখ্যা বেড়ে যাবে। তার জন্য ঘাবড়ে যেও না।
এ কথা বলছো কেনো?
কেউ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে আসবে না। তুমি এখন বড়োলোক হয়ে গেছো, যতটা পারবে দুয়ে নিতে আসবে। একা বাড়িটা কিনে ফেললে, কারুর সাহায্য নিলে না। তার ওপর বাড়িটা যেমন ছিল ঠিক তেমন রেখে রি-মডেলিং হচ্ছে, চোখ টাটাচ্ছে।
তনু হাসলো, ধরলে কি করে?
এগুলো ধরার জন্য বুদ্ধি লাগে নাকি, সাগরকে দখে বুঝতে পারছো না। ব্যাটা কি রকম শ্বাশুড়ীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। একটু তলিয়ে দেখো, তোমার দাদার তোমাকে দিয়ে নিশ্চই কোনও স্বার্থসিদ্ধি আছে। তাই যেচে ফোন করেছে। বলতে পারো পিতলা পীরিত।
তনু আবার আমার বুকে মাথা রেখে হাসলো।
তুমি এতো সব বোঝ কি করে?
জলের মতো তরল। এতদিন বোনের প্রতি পীড়িত জাগলো না। নিজের সম্পত্তির ভাগটা কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নিল, হঠাৎ এমন কি ঘটলো বনের প্রেমে হাবুডুবু।
তুমি এরকম ভাবছো কেনো?
দেখো তনু, তুমি বহুদিন তোমার দাদা-বৌদি, ভাইপো-ভাইঝির জন্য মন খারাপ করেছো। ভাই ফোঁটার দিন দাদার নাম করে দেয়ালে ফোঁটা দিয়েছ। আমি তার কয়েক বছরের সাক্ষী।
এতদিন কেউ মুখ ঘুরিয়েও তোমার খোঁজ খবর নেয়নি। আজ হঠাৎ কেন?
দাঁতে দাঁত চিপে লাড়ই করার সেই দিনগুলো ভুলে যাও কি করে? তখন তোমার কটা আত্মীয় তোমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। সবাই মজা দেখেছে।
দিল্লীতে এসে নিজের বাড়িতে থাকতে পারোনি। কি না, অতো বড়ো বাড়িতে তোমার থাকার জায়গা নেই। তোমার মায়ের চিকিৎসাটা পর্যন্ত তোমার বৌদি ঠিক মতো করতে দেয়নি। তোমার দাদাকে টাকা দিতে হতো না, তুমি দিতে চেয়েছিলে। তাহলে চিকিৎসাটা হলো না কেন?
দিল্লীতে এসে অনুপের বাড়িতে থেকেছো, না হলে রাঘবনের বাড়ি। কেন?
আজ সবার প্রেম উথলে উঠেছে।
তনু মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে। আমি ওর মুখটা তুলে ধরলাম, চোখটা ছল ছল করছে। বুকর মধ্যে টেনে নিলাম।
আমি তোমাকে আঘাত দিতে চাইনি। একবার আমাকে বোঝার চেষ্টা করো।
আমি তোমার কথা শুনে মনখারপ করিনি। মায়ের কথাটা হঠাৎ মনে পড়ে গেল।
তনুর গলাটা ভাড়ি ভাড়ি।
তোমরা খুব তাড়াতাড়ি ভুলে যাও, আমি ভুলতে পারি না। তাই আমার এতো জ্বালা।
একটু থামলাম।
আমি তোমার মাকে জীবনে চোখে দেখিনি। দু-একবার তুমি তাঁর ছবি আমাকে দেখিয়েছ। ছবি দেখে কেন জানিনা আমার মনে হয়েছে তিনি খুব স্বস্তিতে জীবনটা কাটিয়েছেন এমন নয়।
আমার সেই দিনটার কথা খুব মনে পড়ে।
ঘটনাটা ঘটার তিন চারদিন আগে আমি লণ্ডন গেছি। সুন্দরের তখন বছর সাতেক বয়স।
তুমি যেতেই বললে, মার শরীর খারপ। আমি বললাম তুমি শেষ কখন ফোন করেছিলে, বললে এক ঘণ্টা আগে। এও বললে, মা আগের থেকে ভালো আছেন। আমি তোমাকে প্রভোক করলাম, তুমি ইমিডিয়েট চলে যাও, আমি সুন্দরকে সামলে নিচ্ছি কয়েকদিনের জন্য। তুমি আমার কথা শুনে চলে এলে। দিল্লী এসে ফোন করে জানালে মা কয়েকদিন আগে মারা গেছেন। সেদিন নিজেকে আমি সবচেয়ে অসহায় বোধ করেছিলাম। কোথায় যেন একটা সূক্ষ্ম মিল খুঁজে পেয়েছিলাম তোমার সঙ্গে মিত্রার। সেদিন আমি অনুভব করেছিলাম, মিত্রার মতো তুমিও পৃথিবীতে একা।
আমার একটা কথা সেদিন কিছুতেই মাথায় ঢোকেনি। তোমার দাদা কি মায়ের মৃত্যু সংবাদটাও ঠিক সময়ে জানাতে পারতেন না। সেখানেও কি সম্পত্তি? মা তাঁর একার। তোমার নয়!
তনু আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।
দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ পেলাম। তনুর হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে, নিজে গিয়ে দরজা খুললাম। দেখলাম মিত্রা-ছোটোমা দাঁড়িয়ে। সরে দাঁড়ালাম। ওরা ভেতরে এলো।
আমি বারান্দায় বেরিয়ে এলাম। দেখলাম বাগানে চেয়ার নিয়ে চিকনারা সবাই বসে আছে।
ওখান থেকেই চেঁচিয়ে বললাম, চা খেয়ে তোদের সঙ্গে বসবো।
চিকনা মাথা দোলালো।
আমি এ ঘের এসে ঢুকলাম। সোফা ফাঁকা। কেউ নেই। বড়োমা, দামিনীমাসি, বৌদি রান্নাঘরে গোঁতা গুঁতি করছে।
সব গেল কোথায়?
বড়োমা। চেঁচালাম।
নিজেই এসে সোফায় বসে পড়লাম।
এসেছিস। চা খাবি?
হ্যাঁ। কাউকে দেখছি না।
সব ডাক্তারের বাড়িতে আছে। এবার এসে পরবে।
মিটিং মিছিল চলছে নাকি?
হবে হয়তো।
তোমাদের শরীর ঠিক আছে।
বৌদি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
শক্তি বেড়ে গেছে।
তাহলে রেগুলার একটু একটু খাও। বৌদির দিকে তাকালাম।
দামিনী গ্যাস নিভিয়ে দিয়ে চলে এসো, আগে চা খাই তারপর ওরা এলে কচুরী খাব।
বড়োমা চায়ের ট্রে হাতে চলে এলো।
আমায় একা দেখে বললো। তোর ছোটোমা, মিত্রা, তনু কোথায় গেলো?
আসছে।
দামিনী ওদের ডাকো। এলে একসঙ্গে চা ঢালবো।
দামিনীমাসি বেরিয়ে গেল।
বড়োমা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ফিক ফিক করে হাসছে।
দাদা কি বললো?
কিছু বলেনি।
আমি ভাবলাম রাতে হয়তো তোমাকে ধরে ঠ্যাঙাবে।
বললেই হলো, নিজে গেলেনি। আমি গিললেই দোষ।
আস্তে আস্তে কেউ শুনে ফেললে গণ্ডগোল।
সবাই জানে।
তুমি জানিয়েছো।
আমি জানাবো কেন, ওই যে একটু নাচলাম সব জেনে গেল।
নাচলে কেন?
খুব ইচ্ছে করছিল।
বৌদি হাসতে হাসতে আমার পাশে বসে গলা জড়িয়ে ধরেছে।
জানিস সবচেয়ে ইউনিক বলেছে মাম্পি-মিকি। বৌদি বললো।
কি?
তোর দাদার গলা জড়িয়ে ধরে গালে হামি-টামি খেয়ে বলেছে, দাদাই জানো, আঙ্কেল কাল রাতে সরবৎ খাইয়েছে। তোমাদের দেয় নি, কি মজা।
আমি হাসছি। অনিমেষদা কি বললো।
মাথা দোলায়, বলে অনিটা আর কিছু বাকি রাখলো না।
কাল ভজু পর্যন্ত খেয়েছে জানিস। বড়োমা বললো।
কখন!
কোন ফাঁকে খেয়ে দেয়ে পেছনের ঘরে গিয়ে ঘুমিয় পড়েছে।
এখন ঠিক আছে।
ইসলামের সঙ্গে বেরিয়েছে।
দেখলাম ছোটোমারা সব ঘরে ঢুকলো। আমি তনুর দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
কি ম্যাডাম আমার নামে রিপোর্ট দস্তখত করেছেন।
তনু মাথা নিচু করে এসে চেয়ারে বসলো।
ফাঁক পেয়েছিস ওমনি শুরশুরি দিয়ে দিয়েছিস। ছোটোমা বললো।
কোথায় দিলাম।
একটু মন খুলে তোর সঙ্গে কথাও বলা যাবে না।
মিত্রা রবীনকে আসতে বল, আজ আমি তুই তনু। চল সারাদিনের জন্য বেরবো, দুজনে মন খুলে কথা বলে যাবি, আমি বোবার মতো শুনে যাব। আশা রাখি আজই সব কথা শেষ হয়ে যাবে।
মিত্রা-তনু দুজনেই হেসে উঠলো।
তোর দাদা, বিধানদা, অনুপ, রূপায়ণ সব সকাল থেকে ছুটে বেরাচ্ছে। কাল রাতে কি বলেছিস, তার জন্য সকাল থেকে কতো যে ফোন হয়ে গেল তার ইয়ত্তা নেই। তুই যেতে পারবি?
বৌদির দিকে তাকালাম। তুমিও সত্যি একটা ঢেঁড়স। আমি বললেই ওরা যাবে নাকি। আজ কচুরী দিয়ে দিনটা শুরু, তারপর কতো ভালো মন্দ খাওয়া আছে।….
সবাই জোড়ে হেসে উঠলো।
আমরা যাব। মিত্রা বলে উঠলো।
কাল মেয়ে যাচ্ছে। পর্শু সকালে আমি, তুই, তনু বেরবো। কোনও ড্রাইভার নেব না। তুই আর তনু ড্রাইভ করবি। মিনিমাম তিনশো কিলোমিটার। প্রিপারেসন নে।
আমরা যাব না? ছোটোমা বললো।
না। আমার কাজ আছে, আর ওরা ঘুরতে চেয়েছে, দুটোই এক সঙ্গে হবে।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে চোখে চোখে হাসছে। তনু অনেকটা পরিষ্কার হয়েছে।
বড়োমা চা ঢেলে সবাইকে দিল।
বুঝলে ছোটোমা এখনও আমার সখী দুটোকে পাখি পড়ার মতো বোঝাতে হবে কে তোমাদের সঙ্গে ধান্দাবাজি করতে আসছে, কে আসছে না। এদের কবে বুদ্ধি হবে বলো।
আমি প্রতিবাদের সুরটা একটু চড়া করলেই চোখ দিয়ে জল গড়াবে। দোষ আমার। জীবনের সঙ্গে যখন জুড়ে নিয়েছিস ওদেরও কিছু কথা থাকতে পারে শুনবিনা কেন। আমার একটাই প্রশ্ন, এই কথাগুলো কতটা রিজিওনেবেল।
আবার পরিবেশটা সামান্য গম্ভীর হয়ে গেল।
ছোটোমার দিকে তাকালাম।
(আবার আগামীকাল)