জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
৭৮ নং কিস্তি
টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াল। ঘুম হবে না। ব্রাসে মাজনটা লাগিয়ে সোজা বাথরুমে চলে গেল। ফ্রেস হয়ে জামাকাপরটা বদলে নিচে চলে এলো।
কেউ এখনও ওঠে নি।
বাগানের শেষপ্রান্তে চলে এলো। দুদুন একটা গাছের গোড়ার মাটি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নরম করছে। পরে ভজুমামা জল ঢালবে।
অনিসা পেছনে এসে দাঁড়াল।
কি করছো—
বাবাঃ তুই এত সকালে, সূর্য আজ কোন দিকে উঠেছে?
সূর্য ঠিক দিকেই উঠেছে। ঘুম ভেঙে গেল, ভাবলাম তোমার সঙ্গে বাগানে একটু হাঁটি।
তা বেশ।
দুদুন উঠে দাঁড়াল অনিসা দুদুনের পাশে হাঁটতে শুরু করলো।
কোনও কথা নেই। অনিসা প্রথম কথা বললো।
দুদুন।
বল।
তুমি কোন কলেজ থেকে পড়েছো।
বিদ্যাসাগর।
দিদান।
একই কলেজে।
তার মানে তোমরা দুজনেই দুজনকে চিনতে।
অমিতাভ থমকে দাঁড়াল। নাতনির মুখের দিকে একবার তাকাল।
বলো না?
চিন্তাম।
অমিতাভ হাসলো।
তুই হঠাৎ এই প্রশ্ন করছিস?
আমি তোমার কলেজে পড়বো।
কেন? তোর বাবার কলেজে ভর্তি হবি।
বাবা কোন কলেজে পড়তো?
স্কটিশচার্চ।
বাবা-মা এক কলেজে পড়তো?
হ্যাঁ। এক ক্লাশে।
তোমাদের মতো।
না তোর দিদান আমার থেকে জুনিয়ার।
আচ্ছা বাবার সঙ্গে তোমার আলাপ কি ভাবে হলো?
সে অনেক কথা।
অনিসা বলতে যাচ্ছিল আমি জানি। চুপ করে গেলো।
আবার নিস্তব্ধে হাঁটা।
কালকে বাবার লেখাগুলো পড়লি?
পড়লাম। তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো।
বল।
ডা. ব্যানার্জী, রাজনাথ কে?
ওরা এক একটা বর্ন ক্রিমিন্যাল। তোর বাবা ওদের কঠোর হাতে শাস্তি দিয়েছে।
কেন? ওরা কি বাবার কোনও ক্ষতি করেছিল?
অমিতাভদা আবার দাঁড়াল, বোঝার চেষ্টা করলো। নাতনির প্রশ্নটা খুব ভালো ঠেকছে না। মনে হচ্ছে ও ওর বাবার মতো শম্বুক গতিতে এগোচ্ছে। চুপচাপ আবার হাঁটতে আরম্ভ করলো। অনিসা পাশে পাশে হাঁটছে।
কিগো বললে না—
কি বলতো—
ওরা কি বাবার কোনও ক্ষতি করেছে?
তা একটু করেছে।
তোমার সঙ্গে বাবার কথা হয়?
একদম না।
এই কয় বছরে বাবাকে তুমি চোখের দেখাও দেখনি!
না।
বাবা কি সত্যি বেঁচে আছে?
এই তো তুই বেঢপ প্রশ্ন করছিস। চল একটু চা বানা, দুজনে একটু চা খাই।
খাওয়াব, আগে বলো।
আমি তোর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবো না।
তাহলে বাবা মরে গেছে, এটাই সত্যি।
একবারে বাজে কথা বলবি না।
তাহলে তুমি সত্যিটা বলো।
তোর ডাক্তারদাদাই জানে।
ডাক্তারদাদাই জানে, তুমি জান না, সেটা কি করে হয়?
তোর ডাক্তারদাদাই আমার থেকে বেশি খোঁজ খবর রাখে।
বাবা তোমার কাছে থাকতো।
তাতে কি হয়েছে।
বারে, তোমার কাছে থাকবে, আর ডাক্তারদাদাই সব জানবে, কেমন করে হয়।
বললাম তো আমি কিছু জানি না।
বুঝেছি তুমি বলবে না। এই তো। যাও তোমাকে বলতে হবে না।
অনিসা হন হন করে সামনের দিকে এগিয়ে গেল।
এই দেখো মেয়ের রাগ হয়ে গেলো।
অনিসা হেঁটে গেটের কাছে এগিয়ে এলো।
গেটের তালা খোলাই ছিল। অনিসা আস্তে করে গেটটা একটু ফাঁক করে বাইরে বেরিয়ে এলো। শুনশান রাস্তা। দু-একটা কুকুর গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে।
একবার ডান দিকটায় তাকাল।
ঠিক ওই জায়গায় বাবা বসেছিল।
অনিসা ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো।
একবার চোখ বন্ধ করে ভাববার চেষ্টা করলো।
হ্যাঁ একটু একটু মনে পড়ছে।
সুরো পিসির বিয়ে। বাড়িতে প্রচুর লোকজন। ওরা সবাই এক সঙ্গে বাগানের এই প্রান্তে চোর পুলিশ খেলছিল। তখন গুবলুদা পুলিশ হয়েছিল।
গুবলুদা পুলিশ হলেই ওকে চোর সাজাতো।
অনিসা খেলতে খেলতে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। গেটের বাইরে এসে লুকিয়েছিল।
তখন পাগলটা ঠিক এই জায়গাতে বসে।
ও পাগলটাকে মুখে আঙুল দেখিয়ে চুপ করতে বলেছিল।
পাগলটা হাসলো, অনিসাও হাসলো।
পাগলটা পাঁচিলে ঠেসান দিয়ে চুপ করে বসেছিল।
অনিসা তাকাল।
পাগালটা ওকে ইসারায় বললো, একটু জল খাওয়াবে।
অনিসা এক ছুটে ছগন দাদুর ঘর থেকে জলের ঘটিটা নিয়ে এসেছিল।
পাগলটা দু-হাত জড়ো করে আঁচলা মতো করলো।
অনিসা জল ঢাললো। প্রথমটায় হাতটা একটু কেঁপে বেশি জল পরে পাগলটার চোখে মুখে জল ছিটকে গেলো। পাগলটা একটু হাসলো।
ঘামে ভেঁজা চট চটে মুখটায় কে যেন একগাদা কালি লেপে দিয়েছে। চুলগুলোয় জট পরে গেছে, ধুলো ভর্তি। গা দিয়ে কেমন যেন একটা বোঁটকা গন্ধ বেরচ্ছিল।
অনিসার দেখে কেমন যেন একটা লেগেছিল।
পাগলটা ইসারায় ওকে বললো, খিদে পেয়েছে একটু খাবার দেবে।
অনিসা একছুটে ভেতরে চলে এসেছিল। মাকে বলেছিল লুচি দেবার কথা।
এই তো, বেশ পরিষ্কার মনে পড়ে যাচ্ছে।
মা লুচি দিয়েছিল।
অনিসা ছুটে এসে সেই লুচির প্লেটটা ওই পাগলটার হাতে দিয়েছিল। তারপর ওই ফুটপাথ থেক আরও দু-জন এদিকে এসেছিল। মুখটা ঠিক মনে পড়ছে না।
আবার ও ছুটে মার কাছে এসেছিল।
এইবার মা ওর সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল।
অনিসা পাগলটার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, আমার মা।
বেশ মনে পড়ে মা ওর কথায় হেসেছিল।
তারপর অনিসার হাত দিয়ে খাবার প্লেটটা দিয়ে ভেতরে চলে গেছিল। তখন জটাজুটো ধারি পাগলটা মাথা নীচু করে বসেছিল।
অনিসা বেশ কিছুক্ষণ পাগলটার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারপর পাগলটা খেতে খেতে ইশারায় ওকে ডেকেছিল।
তোমার মা?
হ্যাঁ।
অনিসা পাগলটার সামনে বসে পড়েছিল।
তোমার বাবাকে আমি চিনি—
তুমি চেনো!
পাগলটা মাথা দুলিয়ে ছিল।
জানো আমার বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে—
তোমার বাবা আমাদের কাছে আছে—
আমাকে নিয়ে যাবে—
নিয়ে যাব। একটা জিনিষ দেব আগে নেবে বলো?
তাহলে নিয়ে যাবে?
যাব।
অনিসার পর পর ছবিগুলো চোখের সামনে ভেস উঠছে।
বুকের ভেতরটা কেমন যেন দলা পাকাতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে চোখ দুটো ছলছল করে উঠছে। অনিসা নিজেকে সামলে নিল।
কেন বাবা তুমি আমার সঙ্গে এরকম করলে। আমি তোমার সঙ্গে কোনও অন্যায় করিনি।
এখনও যেন অনিসার মনে হচ্ছে পাগলের রূপ ধরে ওর বাবা ওখানে বসে আছে।
বেশ মনে পড়ে।
পাগলটা ঝোলার ভেতর থেকে একটা ক্যান্ডি বার করে ওর হাতে দিয়েছিল।
ক্যান্ডিটা নিয়েই ছুটে ভেতরে চলে এসে পিকুদাদের সঙ্গে অনেকক্ষণ খেলা করেছিল। বেশ মনে আছে এরপর একবারও ও হারেনি।
দুপুর বেলা দিদানের সঙ্গে আবার খেতে দিতে এসেছিল।
দিদান বলেছিল, মরণ তোমাদের কি আর যাওয়ার জায়গা নেই। অনুষ্ঠান বাড়ির সামনে ঘর আলো করে বসে আছ। আরও কয়েকটা কথা দিদান বলেছিল। ঠিক মনে পড়ছে না।
তবে পাগলটা থালা টানতে গিয়ে দিদানের পা ছুঁয়েছিল।
দিদান খ্যাঁক খ্যাঁক করে উঠেছিল।
দিলে তো ছুঁয়ে। তোমরা কি একটু চানটান করতে পার না। কি দুগ্গন্ধ ছাড়ছে।
তারপর গেট দিয়ে ঢোকার সময় ছগনদাদুকে বলেছিল। দেখো বাবা কিছু যেন চুরি টুরি করে নিয়ে না পালায়।
পাগলটা হেসেছিল।
তারপর ও নিজেই বিকেলে জেদ ধরেছিল। পাগলটাকে নেমন্তন্ন খাওয়াবে বলে।
সুরোপিসি তখন ওকে সঙ্গে করে নিয়ে ইসলামদাদাই-এর কাছে থেকে খাবার এনে তিনজনকে দিয়ে গেছিল।
তারপর বিয়ে বাড়ি। হ্যাঁ ভারি মজায় কেটেছিল সেই রাতটা।
তারমানে মা যে ঘটনা লিখেছে ঠিক। ওই ঘটনা ওরা শুতে যাবার পরই ঘটেছে।
বাবা সিগারেটের প্যাকেটটা কখন দিয়েছিল? ঠিক মনে করতে পারছে না।
অনিসা কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।
পরের অংশটুকু পড়া হয়নি।
কিরে ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি করছিস?
অনিসা পেছন ফিরে তাকাল—
দিদান।
আয়, সক্কাল সক্কাল উঠে দুদুনের সঙ্গে ঝগড়া করেছিস?
অনিসা কাছে এগিয়ে এলো।
কিরে চোখ দুটো কেমন ছলছল করছে!
অনিসা চুপ করে রইলো।
দুদুনের সঙ্গে ঝগড়া করবি, আবার কাঁদবি—
অনিসা দিদানের পাশে বাগানের পথে হাঁটতে আরম্ভ করলো।
বলবি তো কি হয়েছে?
অনিসা চুপ করে থাকল।
চল দুদুনকে দেখাচ্ছি। সক্কাল সক্কাল মেয়েটাকে….বুড়ো বয়সে ভীমরতি।
না কিছু হয় নি।
তাহলে তোর চোখটা ছলছল করছে কেন।
এমনি। তুমি দুদুনকে কিছু বলবে না।
দিদান চলতে চলতে থমকে দাঁড়াল।
অনিসা বুঝতে পারলো দিদান ওর দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে।
বল আমাকে কি হয়েছে?
বলছি তো কিছু হয়নি।
হাঁটতে হাঁটতে বারান্দা পেরিয়ে বসার ঘরে এলো।
দুদুন ওর দিকে তাকাল।
দেখলি তোর জন্য তোর দিদান সক্কাল সক্কাল আমাকে মুখ করলো।
আর করবে না, আমি বলে দিয়েছি। অনিসার গলাটা বেশ ভাড়ি।
দুদুনের পাশে এসে বসলো।
মা রান্না ঘরে, দিদাইও উঠে পরেছে। দাদাকে দেখতে পেল না।
দিদাই, দাদা কোথায়?
বাবু উঠেছেন। আসছে, তুই বোস।
মা রান্নাঘর থেকেই ওর দিকে একবার তাকাল।
ডাক্তারদাদাই আসবে না?
এসে পরলো বলে।
দিদান রান্নাঘরে গেল।
মা চায়ের ট্রে নিয়ে এসে সামনের সোফায় বসলো।
কাল রাতে ঘুমোসনি।
হ্যাঁ।
তোর ঘরে অনেক রাত পর্যন্ত টেবিল ল্যাম্প জ্বলছিল।
একটু পড়াশোনা করছিলাম।
মিত্রা মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো।
আচ্ছা মা তোমাকে কয়েকটা প্রশ্ন করলে ঠিক ঠিক উত্তর দিতে পারবে?
জানলে বলবো।
সকাল বেলা এই নিয়ে তোর সঙ্গে গণ্ডগোল হয়েছে—
অনিসা, দুদুনের দিকে তাকাল।
ঠিক আছে, ঠিক আছে, আর বলবো না।
সকাল বেলায় দুদুনের সঙ্গে ঝগড়া করেছিস! মা বললো।
ঝগড়া করিনি, দুদুনকে কয়েকটা প্রশ্ন করেছিলাম। বললো কিছু জানে না। সব ডাক্তারদাদাই জানে। কেন?
দুদুন সব নাও জানতে পারে।
বারে, বাবা দুদুনের কাছে থাকতো, নিশ্চই ডাক্তারদাদাই-এর কাছে থাকতো না।
কি জানতে চাস বল?
দিদান আমার চা। অনিসা বলে উঠলো।
অনন্য ঘরে এসে ঢুকলো।
পেছন পেছন ডাক্তারদাদাই।
ছোটোগিন্নী এতো সকাল সকাল!
এখন সিরিয়াস প্রশ্ন-উত্তর পর্ব চলছে। চুপ চাপ শুনে যাবে। যদি কিছু জেনে থাক তাহলে উত্তর দেবে।
দুদুনের কথায় ডাক্তারদাদাই চুপ করে গেল।
আচ্ছা মা মনিদাদাই কবে মারা গেছে?
তোর বাবা চলে যাবার বছর চারেক পর।
তুমি সেই সময় ওখানে গেছিলে?
গেছিলাম।
ওটা কি ফার্মটা উদ্বোধন হওয়ার আগে না পরে?
দেড় বছর পর।
নীপা পিসির বিয়ে কবে হয়েছে?
তারও বছর দুয়েক পর।
তখন তুমি গেছিলে?
গেছিলাম।
একা, না আমরা সঙ্গে ছিলাম?
তোর মনে নেই, আমরাও গেছিলাম। অনন্য বললো।
অনিসা দাদার দিকে একবার তাকাল।
সকাল থেকে তুই খুব গরম খেয়ে আছিস মনে হচ্ছে। দিদান ব্যাপারটা কি? অনন্য চেঁচিয়ে উঠলো।
তুই জিজ্ঞাসা কর।
আচ্ছা ডাক্তারদাদাই তুমি নাকি বাবার সম্বন্ধে সব জান। দুদুন বললো।
সব জানি না। কিছু কিছু জানি।
বাবা চলে যাবার পর তোমার সঙ্গে বাবার কোনওদিন কথা হয়েছে।
না। তবে কখনোসখনো তোর বাবার গলা শুনেছি। সেখান থেকে গেইজ করেছি সে জীবিত আছে।
আর কিছু।
না।
অনিসা একবার ডাক্তারদাদই-এর দিকে স্থির চোখে তাকাল। ডাক্তারদাদাই মুচকি হাসল।
তোর চোখ বলছে তুই কথাটা বিশ্বাস করতে পারছিস না।
ঠিক তাই।
এর বেশি বলতে পারবো না। বাকিটা সব গল্প, তার কোনও ভিত্তি নেই আমার কাছে।
শুভদীপ এসে দরজার সামনে দাঁড়াল।
কিরে তুই এতো সকালে!
অনিসা সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
দাদু এসেছে।
কোথায়!
গেটের বাইরে, গাড়িতে বসে আছে।
মিত্রা উঠে দাঁড়াল।
গাড়ল দাদুকে বাইরে রেখে তুই কি করতে ভেতরে এলি। অনিসা চেঁচিয়ে উঠলো।
তুই উঠেছিস কিনা দেখতে।
না উঠলে কি করতিস?
ফিরে যেতাম।
তাহলে এলি কেন?
তোর সঙ্গে কথা বলতে।
অনন্য উঠে এলো।
ছগনদাদু গেট খোলেনি?
খোলা আছে।
চল দাদুকে ভেতরে নিয়ে আয়।
তিনজনে বেরিয়ে গেল।
ব্যাপরটা কি বলতো মিত্রা। শুভ এই সাত সকালে দাদুকে নিয়ে। উনি তো বড়ো একটা এই বাড়িতে আসেন না।
ডাক্তারদাদার কথায় মিত্রা একবার তাকাল।
বলতে পারবো না। কাল শুভ লাইব্রেরী থেকে কাউকে না বলেই চলে এসেছে।
কোথায় যেন একটা গণ্ডগোল ঠেকছে।
ওরা চারজন ঘরে এসে ঢুকলো। শুভর দাদু হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকলো। ভদ্রলোক বেশ লম্বা চওড়া। এখনও শরীরটাকে বেশ মজবুত রেখেছেন।
মিত্রা উঠে দাঁড়িয়েছে।
জানো মা, শুভ কাল দাদুর সঙ্গে ঝগড়া করেছে। অনিসা বললো।
তুইও আমার সঙ্গে সকালে ঝগড়া করলি। দাদা বললো।
মোটেও না।
আপনাদের বাড়িতে এই নিয়ে তৃতীয়বার এলাম। অবশ্য ওর ঠাম্মা অনেকবার এসেছে।
ওনাকে আনলেন না কেন? দাদা বললো।
কাল রাতে শুভর পিসী এসেছে দিল্লী থেকে নাতি, নাতনি-সহ।
আপনি হঠাৎ এই সাত সকালে। ডাক্তারদাদা বললো।
আর বলবেন না। শুভ এখন এ্যাডাল্ট তার কথার সঠিক জবাব দিতে না পরলে সে বলেছে আমার এগেনস্টে আইনত ব্যবস্থা নেবে।
সবাই হেসে উঠলো।
শুভরদাদু একটা সোফায় এসে বসলেন।
কিরে শুভ দাদু কি বলছে? ডাক্তারদাদার কথায় শুভ মাথা নীচু করলো।
আমার কিছু প্রশ্ন আছে, দাদু তার কোনও সঠিক উত্তর দিতে পারছে না। দাদু বলেছে আন্টি জানে। তাই দাদুকে ধরে এনেছি। আমাকে প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে হবে।
আরি বাবা, তোর প্রশ্ন, অনিসার প্রশ্ন তোরা করছিসটা কি বলতো!
দাদা এমন ভাবে বললো, আবার সবাই হাসলো।
বুঝলে এডিটর ব্যাপারটা বেশ জটিল বলে মনে হচ্ছে।
আর কি বলেছিস বল। শুভরদাদু বললো।
শুভ, দাদুর দিকে তাকাল।
ওটা না বললে তুমি আসতে না।
ঢেঁড়স তোর ঘটে একটুও বুদ্ধি নেই। অনিসা বলে উঠলো।
শুভ একবার অনিসার দিকে কটকট করে তাকালো।
তাকাস না চোখে ছানি পরে যাবে।
মিত্রা মেয়ের কীর্তিকলাপ দেখে মাথা নীচু করে মুচকি মুচকি হাসছে।
বড়োমা চা নিয়ে এলো।
দাদা লুচি ভাজছি কয়েকটা দিই।
এটা কি আবার জিজ্ঞাসা করতে হয় নাকি। ডাক্তারদাদা বললো।
তোমার মতো নাকি, যা দেখো তাই খেতে চাও। উনি হিসেব করে খান।
না না দিদি এ অপবাদ দেবেন না। একটা সময় মেইনটেন করেছি এখন আর পারি না।
দেখো, দেখে শেখো।
বুড়ো বয়সে সবারই একটু আধটু ওরকম হয়। কি বলো ডাক্তার। দাদা টিপ্পনি কাটল।
তুমি আবার আমাকে দলে টানছ কেন?
হাসা হাসি চলছে। কথা বলা চলছে।
মিত্রা তোমার সঙ্গে আমি একটু একা কথা বলতে চাই। শুভরদাদদু বললেন।
একা হবে না। আমি সঙ্গে থাকব।
শুভর কথায় সবাই ওর দিকে তাকাল।
আমি তো কথা দিয়ছি।
যা হবে আমার সামনে, আমার জানার দরকার আছে।
কি হয়েছে কি বলুন—ডাক্তারদাদা বললো।
আর কি বলবো দাদা, আমার হয়েছে যতো জ্বালা।
পৈতে থেকে লকারের চাবিটা খুলে দাও তোমাকে আর কোনও প্রশ্ন করবো না। আমার প্রশ্নের উত্তর আমি পেয়ে যাব। শুভ বলে উঠলো।
তোকে দেবো বলেছি—
একথা তুমি বহুবার বলেছো—
ঠিক আছে লুচি কয়টা খেয়ে নিই।
তুই ওরকম করছিস কেন? অনিসা শুভর দিক তাকাল।
বেশি ভ্যাড় ভ্যাড় করবি না। ব্যাপারটা আমার আর দাদুর, তুই এর মধ্যে মাথা গলাচ্ছিস কেন।
তুই আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে আছিস।
দাদু আন্টির নাম করেছে তাই এই বাড়িতে এসেছি
আমি তোর থেকে অনেক বেশি জানি।
অনিসা গট গট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
শুভ কিছুক্ষণ দাঁড়াল তারপর কি ভেবে অনিসার পেছন পেছন ঘরের বাইরে চলে গেলো। অনন্যও ওদের পেছন পেছন বেরিয়ে গেল।
ছেলেটার সত্যি কাল থেক মাথা খারাপ হয়ে গেছে। শুভরদাদু স্বগতোক্তির সুরে বললো।
মিত্রা মন মনে হাসছে। কি বলবে। এখনকার ছেলেমেয়ে, এদের কাছে কিছু লুকিয়ে রাখা যাবে না। নিষিদ্ধ জিনিষের প্রতি এদের আকর্ষণ বেশি।
কি হয়েছে বলুন? দাদা বললো।
ডাক্তারদাদা, শুভরদাদুর দিকে তাকাল।
সে অনেক কথা দাদা, এতদিন তবু ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিলাম। কাল বাস্ট আউট।
ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
কাল সকালের দিকে কোথায় বেরিয়েছিল। একটু বেলার দিকে ওর ঠাকুমাকে ফোন করে বললো, আপনাদের অফিসে যাবে। ফিরতে দেরি হবে। সাতটা নাগাদ ফিরে এলো। বাড়িতে ঢোকার পর থেকেই দেখি গুম হয়ে আছে। কারুর সঙ্গে কথা বলেনি। ওর ঠাকুমা জিজ্ঞাসা করলো, খাওয়াদাওয়া করেছে কিনা। কোনও উত্তর দিল না। তারপর ওর পিসি এলো। ভাই বোনের সঙ্গে কয়েকটা কথা বললো, না বলারই মতো। তারপর খেতে বসে আমার সঙ্গে তুমুল হলো। না খেয়ে উঠে চলে গেল।
ব্যাশ ওর ঠাকুমা আমার জ্যান্ত শ্রাদ্ধ করে ছেড়ে দিল। বাধ্য হয়ে বললাম, অনিসার মা সব জানে। তবে ছেলে দুটো খেলো। তারপর সকাল হতে না হতেই আমাকে ধরে নিয়ে এসেছে।
দেখোনা মা, ছেলেটা গেল কোথায়?
শুভর দাদু মিত্রার দিকে তাকাল।
এখানেই আছে, কোথাও যাবে না।
মিত্রা মাথা নীচু করলো।
বুড়োটাকে একটু বাঁচাও মা। তোমাকে ও ভীষণ শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে।
শুভর দাদু ভেঙ্গে পরলেন।
আমার একমাত্র বংশধর। ও এখনকার ছেলে, কিছু ঘটিয়ে ফেললে….।
একথা বলছেন কেন! শুভ খারাপ ছেলে নয়—
সব বুঝি মা, মন মানে না। তোমাকে তো নতুন করে কিছু বলার নেই, কয়েকদিন ধরে দেখতে পাচ্ছি ওর চাল চলন আগের মতো নেই।
বড়োমা লুচির প্লেট নিয়ে এলো।
ঠিক আছে আপনি খান, আমি ওদের সঙ্গে কথা বলে নিচ্ছি। মিত্রা বললো।
ওরা তিনটে গেল কোথায়? বড়োমা বললো।
বারান্দায়।
মিত্রা উঠে দাঁড়ালো।
তোমরা বরং বসো, আমি ওদের নিয়ে আমার ঘরে যাই।
আগে খেয়ে নে—বড়োমা বললো।
ভজু প্লেটগুলো নিয়ে ওই ঘরে আয় তো।
ভজু মাটিতে বসেছিল, উঠে এলো।
আমরা যাবো না—
মিত্রা, ডাক্তারদাদার দিকে তাকাল।
এখন না একটু পরে—
মিত্রা বেরিয়ে এলো।
কিরে তোরা ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি করছিস? আয় আমার ঘরে আয়।
মিত্রা বারান্দা দিয়ে হেঁটে সোজা নিজের ঘর চলে এলো। ঘরের দরজা খুলে ভেতরে এলো। নিজে খাটে বসলো ওদের সোফায় বসতে বললো।
ভজুরাম খাবার প্লেটগুলো নিয়ে এলো। সেন্টার টেবিলে রাখলো।
আমরা খেতে খেতে কথা বলি কি বলো শুভ—মিত্রা বললো।
আমার কোনও অসুবিধে নেই আন্টি।
কিরে অনন্য তুই বসবি—
তোমরা কথা বলো আমি বরং দুদুনের সঙ্গে একটু আড্ডামারি।
তাহলে যা।
অনন্য নিজের প্লেটটা নিয়ে বেরিয়ে গেল।
শুভ মাথা নীচু করে বসে আছে। অনিসা খেতে শুরু করলো।
নাও, খেতে খেতে বলো কেন তুমি দাদুর সঙ্গে কাল রাতে অমন ব্যবহার করেছো?
শুভ চুপ করে থাকল।
বলো। তুমি চুপ করে থাকলে আমি তোমাকে হেল্প করবো কি করে?
শুভ প্লেটটা সেন্টার টেবিলে রেখে উঠে এলো।
মিত্রা নিজের খাবার প্লেটটা টেবিলের ওপর রাখলো। বুঝলো একটা কিছু ঘটবে।
শুভ সোজা চলে এসে, মিত্রার কোলে মুখ গুঁজে কেঁদে ফললো।
প্রথমটায় একটু অস্বস্তি হয়েছিল মিত্রার, তারপর নিজেকে সামলে নিল। অনিসার দিকে তাকাল মুখটা কেমন পাংশু।
এই দেখো বোকার মতো কাঁদলে যে কাজ করতে নেমেছো শেষ করবে কি করে। দাদু তোমাকে কিছু বলেনি। তুমি আমার কাছে জানতে এসেছো। কেনো? আমি জানি বলে।
আন্টি তুমি আমাকে ক্ষমা করো। আমি দাদুকে কয়েকটা নোংরা কথা বলে ফেলেছি।
কেন বলেছো বলো?
দাদুকে যতোবার বাবা-মার কথা জিজ্ঞাসা করেছি দাদু তার কোনও সঠিক উত্তর দেয়নি। তোমার আর আঙ্কেলের সঙ্গে বাবার একটা ছবি পেয়েছিলাম বেশ কিছুদিন আগে। তারপর থেকে অনিসাকে আমি সব বলেছি। তবু দাদু কিছুতেই স্বীকার করতে চায়নি।
কি বলেছে বলো?
বাবা দুবাইতে খুন হয়েছেন এমনকি মাকেও খুন করা হয়েছে। আমাকে তখন কেউ নিয়ে বাজারে বেরিয়েছিল। তাই আমি বেঁচে গেছি। কিন্তু কেন বাবা খুন হয়েছেন, কারা খুন করেছে আমি জানি না। দাদুর কাছে জানতে চেয়েছি। দাদু সব সময় আমার প্রশ্নটা এড়িয়ে গেছে।
কাল অনিসার সঙ্গে লাইব্রেরীতে গিয়ে পুরনো কাগজ ঘাঁটতে ঘাঁটতে বাবার একটা ইন্টারভিউ দেখতে পাই। তখন আমি সিওর হই তোমাদের সঙ্গে বাবার খুব ভালো রিলেশন ছিল। দাদু কিছুতেই এসব স্বীকার করছে না। শেষে কাগজের কথা যখন বলেছি। বলেছে তুমি সব জানো।
মিত্রা কোনও কথা বলতে পারলো না। মেয়ের মুখের দিকে তাকাল। মেয়ে স্থির চোখে ওর দিকে তাকিয়ে। নিজেকে মনে মনে তৈরি করে নিল। এভাবে এদের আটকান যাবে না।
কি করবে ও? ও কি সব জানে? জানলে আজ ও নিজে মনে মনে এতো কষ্ট পেত। বুবুনকে ও দোষ দিতে পারে না। তবু মিত্রা গেইজ করছে মি. মুখার্জীর সম্বন্ধেই শুভ কথা বলছে।
ঠিক আছে তুমি ওঠো।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস আঙ্কেলের সঙ্গে দাদুর যোগাযোগ আছে। আমি লুকিয়ে আঙ্কেলের সঙ্গে দাদুকে কথা বলতে শুনেছি। দাদু আঙ্কেলকে হেল্প করে।
মিত্রার পিঠে কে যেন সজোরে চাবুকের বারি মারলো। শিরদাঁড়া দিয়ে কেমন যেন একটা গরম স্রোত বয়ে যাচ্ছে। দাঁতে দাঁত চিপে মিত্রা সহ্য করছে।
তোমার দাদুর সঙ্গে আঙ্কেলের কিভাবে পরিচয় হলো!
দাদু এক্স সার্ভিসম্যান, ডিফেন্স ইনটেলিজেন্স এজেন্সিতে কাজ করতো। বাবাও প্রথমে চান্স পেয়েছিল দাদু যেতে দেয়নি। তাই বাবা র’তে জয়েন করে।
তুমি আমাকে ফটোটা দেখাতে পারবে?
পারবো। গাড়িতে আছে।
ঠিক আছে খেয়ে নাও, তারপর গাড়ি থেকে নিয়ে এসো।
শুভর যেন তর সয় না।
আমি ফটোটা নিয়ে আসি?
ঠিক আছে যাও, নিয়ে এসো।
শুভ ছুটে বেরিয়ে গেল।
মিত্রা মেয়ের দিকে তাকাল।
থমে থমে মুখ। মিত্রা মুখটা পড়ার চেষ্টা করলো। বুঝতে পারলো এরা দুজন অনেক কিছু জেনে ফেলেছে। অনেক ভেতরে ঢুকে পরেছে।
তুই আজ সকালে দুদুনের সঙ্গে ঝগড়া করেছিস কেন?
ঠিক ঝগড়া নয়। দুদুনকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞাসা করলাম।
মিত্রা মেয়ের দিকে তাকিয়ে।
দুদুন কেমন ইরিটেট ফিল করলো। তারপর আর কথা বলিনি।
বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখ মুছছিলি কেন?
কান্নাপেল তাই।
এমনি এমনি।
অনিসা চুপ করে রইলো।
তোরা কাঁদলেই তোর বাবা চলে আসবে?
না।
তাহলে?
তোমার কষ্টটা আজ সকালে প্রথম অনুভব করতে পারলাম, তাই।
মিত্রা চুপ করে গেলো। বুঝলো ছেলের থেকে মেয়ে অনেক বেশি ম্যাচিওর।
শুভ ঘরে ঢুকলো।
খামটা মিত্রার হাতে দিলো।
মিত্রা খামটা খুলে ছবিটা একবার দেখে ভেতরে ঢুকিয়ে রাখল। বৌভাতের দিন রাতে তোলা। মি. মুখার্জী যখন তার দলবল নিয়ে এসেছিলেন সেই সময় মি. মুখার্জী নিজের মোবাইলে ছবিটা তুলেছিলেন।
অর্ক ছবিটা তুলে দিয়েছিল।
এ ছবি তুমি কোথায় পেলে।
বাবা, মার একটা এ্যালবাম ছিল, দাদু সেটা কোনওদিন আমাকে দেখতে দেয়নি। কয়েকদিন আগে দাদুর আলমাড়ি থেকে আমি এ্যালবামটা সরিয়ে দিই। তারপর থেকে দাদুর সঙ্গে আমার কথা বন্ধ।
অনিসা ছবিটা দেখেছে?
দেখেছে।
তোমার আঙ্কেলের সঙ্গে তোমার বাবার খুব ভালো রিলেশন ছিল।
তাহলে বাবা খুন হলেন কেন?
সেটা আমি বলতে পারব না। তোমার আঙ্কেল ফিরে এলে জানতে পারবে।
আঙ্কেল ফিরে আসবে?
অবশ্যই।
কবে আসবে?
তার কাজ শেষ হলেই ফিরে আসবে।
কি এমন কাজ!
অপেক্ষা করো জানতে পারবে। নাও খাও।
শুভ মাথা নীচু করে রইলো।
খাওয়া শুরু করো। খেতে খেতে তোমার যদি আর কিছু জানার থাকে বলো, আমি চেষ্টা করবো উত্তর দিতে।
আচ্ছা মা। তুমি তো বাবার সম্বন্ধে কোনও কিছু আমাদের বলোনি। বাবার সম্বন্ধে একটু বলবে।
কি জানতে চাস বল—
বাবা হঠাৎ কেন উধাও হয়ে গেল?
মিত্রা মেয়ের দিকে একবার তাকাল। কি বলতে চায় ও। বাবার সম্বন্ধে ওর কোনও সন্দেহ।
বলো না। বাবাকে এতো লোকে শ্রদ্ধা করে ভালোবাসে। তবু কেন বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেল। বাবার কি একবারও ইচ্ছে করে না আমাদের দেখতে।
ইচ্ছে অবশ্যই করে। তাই তোমাদের আগলে রাখে।
তুমি কি করে বোঝ?
এখান থেকে সেখান থেকে খবর পাই।
সেই জায়গাগুলো একটু বলো না। তোমাকে আর বিরক্ত করবো না।
আমিও সঠিক জানি না।
মিত্রার গলাটা ভাড়ি হয়ে এলো।
অনিসা সোফা থেকে উঠে এসে মায়ের পাশে বসলো।
মার গলা জড়িয়ে ধরলো। গালে গাল ঘোষলো।
মিত্রা মেয়ের দিকে তাকাল। চোখটা সামান্য ছল ছল করছে।
তোমার অনেক কষ্ট। আমি জানি।
কি করে জানলি? মিত্রা মাথা নীচু করে নিল।
জেনেছি।
একবার ভাবলো ওদের সব বলে দেবে তারপর ভাবলো না।
ওরা নিজের থেকে জানুক। ওর মা কোথা থেকে কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে। ওদের মার জন্য ওদের বাবা কতটা সেক্রিফাইস করেছে জীবনে।
শুভর দাদু এবং ডাক্তারদাদা ঘরে এসে ঢুকলো।
কি ছোটো ম্যাডাম সব জানা হয়ে গেছে?
তোমাকে বলেছি না। আমাকে ম্যাডাম বলবে না।
ঠিক আছে বুঁচকি। তাহলে হবে?
তাই বলবে।
অনিসা কট কট করে উঠলো।
মিত্রা মেয়ের কথায় হাসলো।
ডাক্তারদাদাই?
বল।
দুজনেই সোফাতে এসে বসলো।
দুদুন বলে তুমি নাকি বাবাকে খুব ভালো ইন্ট্রোগেট করতে পারতে।
পুরোটা না একটু একটু।
আচ্ছা বাবা কি ডন।
একেবারেই না।
তাহলে মস্তান?
না।
তাহলে!
তোর আমার মতো সাধারণ মানুষ।
তাহলে বাবার সবকিছু পর্দার আড়ালে কেন।
তোকে তাহলে প্রথম থেকে জানতে হবে। তুই তো জানার চেষ্টা করছিস।
করছি, পারছি কই?
চেষ্টা কর পারবি। তোর বাবাকে কেউ কোনওদিন হাতে ধরে শেখায়নি।
একটা কথা বলবো কিছু মনে করবে না?
বল।
বাবার সঙ্গে অন্য কারুর রিলেশন আছে।
মিত্রা মেয়ের মুখের দিকে একবার তাকাল। এই কথাটা যে ওর সন্তানের মুখে একদিন নয় একদিন আসবে সেটা ও জানতো।
যদি এ কথাটা ভেবে থাকিস তাহলে ভুল।
দামিনীদিদার সঙ্গে বাবার রিলেশন কি করে তৈরি হল?
তোর বাবা যখন হস্টেল থেকে বিতারিত হলো। তখন দামিনীদিদার আশ্রয়ে আঠারো মাস ছিল।
হোস্টেল থেকে বাতাড়িত হলো কেনো?
কলেজে যে কদিন ছিল হস্টেলে ছিলো, কলেজ ছাড়ার পর হোস্টেল ছেড়ে দিতে হলো। শুনেছি ফুটপাথে মাস খানেক ছিল। তারপর দামিনীদিদার আশ্রয়ে।
ফুটপাথে!
হ্যাঁ।
তারপর।
ইউনিভার্সিটি, টিউসিনি, পরোপকার, রাস্তার কলের জল, হোটেলের রাঁধুনী, কাগজের স্বাধীন সাংবাদিকতা।
তুমি বাজে কথা বলছো।
একটুও না। বিশ্বাস না করলে বাজিয়ে দেখতে পারিস। তোর বাবাকে নিয়ে লিখতে বসলে একটা গোটা উপন্যাস লেখা হয়ে যাবে।
রাস্তার কলের জল মানে, ঠিক বুঝলাম না।
বহুদিন পয়সার অভাবে খাওয়া জুটতো না। তাই কলের জল খেয়ে কাটিয়ে দিত।
মিত্রা ডাক্তারদাদার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে।
ওদের জানতে দে মা। এভাবে ওদের তুই দমিয়ে রাখতে পারবি না। আজ না হয় কাল ওরা জানবে। বাবার প্রতি সন্তানের ইন্টারেস্ট থাকবে না এ কখনও হয়। অনির রক্তটা ওদের শরীরে বইছে। এটা তুই অস্বীকার করবি কি করে।
বাবা এখনও অফিসের সমস্ত খোঁজ খবর রাখে। এমনকি নার্সিংহোম, ফার্ম সব কিছুর।
কার কাছ থেকে কিভাবে খোঁজ খবর নেয়, বলতে পারব না। তবে তোর কথাটা ঠিক।
অনিমেষদাদু এতো পাওয়ার ফুল লোক কিছু করতে পারছে না!
তোর বাবা ক্রিমিন্যাল নয় যে পুলিশের খাতায় নাম থাকবে। পুলিশের খাতায় নাম থাকলে তোর অনিমেষদাদু কিছু করতে পারতো।
ইকবালদাদাই-এর সঙ্গে তোমার পরিচয় আছে?
আছে।
এবাড়িতে ইকবালদাদাইকে কোনওদিন আমি দেখিনি।
তোদের জন্মের সময় এসেছিল। তাছাড়া তোদের শরীর খারাপ হলে দেখতে এসেছে। তাও কচিৎ কদাচিৎ। কেন তুই গেছিলি?
গেছিলাম।
কি বললো?
বললো কেউ যদি জানতে পারে তুই অনির মেয়ে তোকে ভিড় করে সবাই দেখতে আসবে।
কেন?
তার কোনও উত্তর পাইনি। বলেছে জানার চেষ্টা কর, পেয়ে যাবি।
চেষ্টা কর।
করছি তো। পারছি কোথায়।
কি হলো সব জানা হয়ে গেছে। পুঁচকে ছোঁড়ার দল, তেজ দেখেছো।
ছোটোমা চায়ের ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকলো।
কিরে তুই খেয়ে বেরবি, না দাদার হাত দিয়ে পাঠিয়ে দেব।
ছোটোমা মিত্রার দিকে তাকাল।
পাঠিয়ে দিও।
দাদা আপনার।
ছোটোমা, ডাক্তারদাদার দিকে তাকাল।
আজ বাড়িতে থাকব বলে এসেছি। সব দায়িত্ব ওদের ঘারে চাপিয়ে দিয়ে এসেছি। বলেছি প্রয়োজন পরলে ফোন করিস।
আজ কোথাও যাবেন না!
না ছোটো। আজ শুয়ে বসে গল্প করে কাটিয়ে দেব।
ছোটোমা বেরিয়ে গেল।
মিত্রা উঠে দাঁড়ালো।
আমি এবার যাই।
ওর সব প্রশ্ন করা হয়েগেছে? শুভর দাদু মিত্রার দিকে তাকাল।
একদিনে সব হয়। যেটা ওর কাছে এসেন্সিয়াল ছিল সেটা জানতে পেরেছে।
চা খেতে খেতে শুভর দাদুর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললো।
মিত্রা বেরিয়ে গেল।
কিরে আমি এবার যাই। তুই থাকবি না যাবি?
শুভর দাদু শুভর দিকে তাকাল।
তুমি যাও, আমি পরে যাচ্ছি।
ডাক্তারদাদা হাসল।
শুভরদাদু উঠে দাঁড়াল। ডাক্তারদাদাও উঠে দাঁড়াল।
তুমি কোথায় যাচ্ছ? অনিসা কট কট করে উঠলো।
একটু বাড়িতে যাই।
এই যে বললে সারাটাদিন শুয়ে বসে গল্প করে কাটাবে। বসো এখানে। তোমার যাওয়া হবে না। শুভ দাদুকে তুলে দিয়ে আয়। অনিসার কণ্ঠে হুকুমের সুর।
আমি ফিরে এলে শুরু করবি।
ঠিক আছে।
শুভ দাদুকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। শুভর দাদু ডাক্তারদাদার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।
তারমানে!
তুমি বসো আগে তারপর বলছি।
অনিসা ডাক্তারদাদাই-এর হাত ধরে সোফায় বসিয়ে দিল।
তুই ঝামেলা করিস না অনেক কাজ।
এই যে বললে শুয়ে বসে কাটাবে।
তারমানে, বাড়িতে যে ফাইলগুলো নিয়ে এসেছি তার কাজগুলো কে করবে।
ওই তো তোমার নার্সিংহোম আর এনজিওর ফাইল ও তোমার এক ঘণ্টার কাজ।
তা হোক আমার কাজ তুই করে দিবি না।
শিখিয়ে দাও, করে দেব।
পড়াশুনো শেষ কর সব শিখিয়ে দেব। বয়স হচ্ছে আর কতদিন।
একেবারে বয়স হচ্ছে বয়স হচ্ছে করবে না। তুমি এখনো ইয়ং।
ডাক্তারদাদাই হাসছে।
তোর মনের কথাটা বল শুনি।
অনেক কথা, তোমকে যে কি করে বলি।
অনিসা খানিকক্ষণ চুপ করে রইলো।
বলোনা শুভর বাবা মি. মুখার্জীর সঙ্গে বাবার রিলেশনটা কি।
আমার সঙ্গে ভদ্রলোকের তিনবার দেখা হয়েছে।
শুভ এসে ঘরে ঢুকলো।
বোস। কোনও কথা বলবি না। শুধু শুনে যাবি।
প্রথম কবে তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছে।
সেদিন সকালে উঠে দেখলাম তোদের বাড়ির সামনে অনেকগুলো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। অনি বেশ উত্তেজিত। ওর গলার স্বর শুনতে পেলাম। আমি ওকে যতটুকু জানতাম ও কোনওদিন উঁচুস্বরে কথা বলতো না। সেদিনটা কেমন যেন খটকা লাগলো। ভাবলাম মামনির আবার শরীর খারাপ করলো নাকি। অনির একটা স্বভাব ছিল ও সচরআচর কাউকে বিরক্ত করতো না। এমনও অনেক দিন গেছে তোর মায়ের প্রচণ্ড শরীর খারাপ হয়েছে। ও নিজের বুদ্ধিতে লড়ে গেছে। সকাল বেলা এসে আমি দেখেছি। পাশেই থাকি কিন্তু আমাকে ডাকেনি। এমনকি তোর দিদান, দাদু বারান্দার ওই কোনে থাকতো তারাও জানতে পারতো না।
সেদিন সকালে পায়ে পায়ে এসে দেখলাম। তোর মা ঠিক আছে। কিন্তু গণ্ডগোল একটা হয়েছে। প্রথমে বুঝতে পারিনি। তারপর অনেক পরে বুঝলাম।
সেদিন মি. মুখার্জীকে ও ফোন করে ডেকে এনেছিল। পরে জেনেছিলাম মি. মুখার্জী ওর কাছে কোনও একটা ব্যাপারে ভীষণ ঋণী। কেন ঋণী, কিসের জন্য ঋণী তা জানতাম না। তারপরও মি. মুখার্জীর সঙ্গে ও অনেকগুলো কাজ করেছে। বলতে পারিস একে অপরের পরিপূরক।
অনিমেষদাদু জানতো?
সব জানতো। তোর বাবাকে মনে মনে সাপোর্ট করতো। এখনও করে। নিজে যেটা করতে পারে না। অনি সেটা করলে মুখ বুঁজে সহ্য করে। চোখ বন্ধ করে থাকে।
এখনও করে মানে! অনিমেষদাদুর সঙ্গে বাবার যোগাযোগ আছে!
না না তোর বাবার সঙ্গে অনিমেষের কোনও যোগা যোগ নেই।
এখন উঠি বুঝলি।
উঠি উঠি করবে না। বোসো চুপ করে। অনিসা ডাক্তারদাদাই-এর হাতটা শক্ত করে ধরেছে।
ডা. ব্যানার্জী কে?
খুব সেন্সেটিভ জায়গা। তোকে বলতে পারব না। তুই জানলি কি করে?
কাল পুরনো কাগজে পড়ে জেনেছি।
যা পড়লাম তাতে উনি আমাদের কাগজের একসময় মালিক ছিলেন। উনি কি খারাপ কাজ করেছিলেন? বাবা কেন শাস্তি দিয়েছিল?
তোকে অপেক্ষা করতে হবে। এই কোশ্চেনটা পাশ দিলাম।
ঠিক আছে, রাজনাথ কে?
এটাও পাশ দিলাম।
টোডি কে?
তুই এতো নাম জানলি কি করে বল!
তোমাকে জানতে হবে না। যা বলছি তার উত্তর দাও।
বাবাঃ তুই অমন করে ধমকাচ্ছিস কেন?
ঠিক আছে তোমাকে বলতে হবে না যাও, আমি জেনে নেব।
সেই ভালো। তাহলে আমি উঠি।
আবার উঠি উঠি করে।
এই তো, সব প্রশ্ন শেষ হয়ে গেল।
কিচ্ছু শেষ হয়নি। সবে শুরু।
ডাক্তার অনিসার মুখের দিকে তাকাল।
আচ্ছা বাবা এখান থেকে চলে যাবার পর কখনও এই বাড়িতে এসেছে।
হ্যাঁ। না কখনও আসেনি।
ধরা পরে গেছ।
কি বলতো।
বাবা এসেছিল।
বলছি আসে নি, তুই জোর করে বলাবি এসেছিল।
আচ্ছা সুরো পিসির বিয়ের সময় কোনও ঘটনা ঘটেছিল।
কার বিয়ে?
সুরো পিসির বিয়ে।
সেতো এখান থেকে হয়নি!
কোথা থেকে হয়েছিল?
তোর মায়ের বাড়ি থেকে।
এখান থেকে হয়েছিল। বাবা সেদিন এই বাড়িতে এসেছিল। তোমরা অনেক পরে ঘটনাটা জানতে পেরেছিলে। বলতে পারো চিকনাদার কাছ থেকে।
নির্ঘাৎ তোর মাথাটা খারাপ হয়েছে।
তুমি তো ডাক্তার, ওষুধ দাও।
দেখছিস শুভ বুড়টাকে একা পেয়ে কিরকম নাকানি চোবানি খাওয়াচ্ছে।
তুমি আমার কথার একটারও সঠিক জবাব দাওনি।
বেঠিকটা কি দিয়েছি।
সব পাশ কাটিয়ে গেছ। আমার মন বলছে একটা জট পেকে আছে কোথাও, বাবা সেই জটটা খুলতে গেছে। এসপার না হয় ওসপার।
তুই সার কথাটা বুঝেছিস। এবার উঠি।
আজ ছেরে দিলাম। আবার বিরক্ত করতে পারি।
ডাক্তারদাদা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।
অনিসা কিছুক্ষণ একা একা বসে থাকল। শুভ ওর দিকে তাকিয়ে।
তুই এতো সব জানলি কোথা থেকে!
তোর কবে বুদ্ধি হবে বলতো। এই জন্য তোকে বলি লেডিস ফিঙ্গার। আমার বাবাকে দেখেছিস?
অনিসা আঙুল তুলে টেবিলের ওপর রাখা ছবিটার দিকে দেখাল।
দেখে শেখ। তোর বাবার মতো লোক তার কথায় উঠতো বসতো।
আর তুই কিনা দাদুর সঙ্গে ঝগড়া করে বসলি। আর কয়েকটাদিন অপেক্ষা করলে মহাভারত অসুদ্ধ হয়ে যেত।
তুই বিশ্বাস কর।
কি বিশ্বাস করবো। তোকে বারবার বলেছিলাম বাবার সঙ্গে মুখার্জীকাকুর রিলেশন ছিল। লাইব্রেরীতে গিয়ে কাগজ পড়তে পড়তে গুম হয়ে চলে এলি। একবার বলে আসার প্রয়োজন বোধ করলি না।
তখন নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনি।
গঙ্গায় গিয়ে ডুবে মর। না পারলে সেকেন্ড হুগলীব্রিজ থেকে ঝাঁপ মার। ডিসগাস্টিং।
শুভ চুপ করে থাকলো।
ছবিটার দিক তাকা। চোখদুটো দেখ। এখনও যেন কথা বলছে।
সামনে গিয়ে দাঁড়া দেখবি তোর সঙ্গেও কথা বলবে।
আমি ফিল করি। ভেবেছিলাম তুই আমার মতো। এখন দেখছি….। না থাক।
শুভ মাথা নীচু করে চুপ করে বসে রইলো।
দাদুর সঙ্গে ঝগড়া করেছিস কেন?
শুভ চুপ।
ঝগড়া করে কিছু জানতে পেরেছিস?
বাবার সঙ্গে আঙ্কেলের ভালো রিলেশন ছিল। আন্টি বাবাকে চিনতো।
তাতে তুই কি করতে পারলি?
বাবাকে যারা মেরেছে হাতের কাছে পেলে প্রতিশোধ নিতাম।
তোর কাছে এসে নাচতে নাচতে বলবে, শুভ আমরা তোমার বাবাকে মেরেছি। আর তুই পটাপট তাদের মেরে দিতিস।
শুভ চুপ করে গেল।
মারতে গেলেও বুকের পাটা থাকা দরকার। তোর আছে?
শুভ মাথা নীচু করে আছে।
তোর বাবা কবে মরেছে জানিস?
শুনেছি আমার তখন চোদ্দমাস বয়স।
তারমানে আজ আঠার বছর হতে চলেছে। ভাবলি কি করে যারা তোর বাবাকে মেরেছিল তারা এখনও বহাল তবিয়াতে জীবিত আছে।
তাহলে!
পড়াশুনোয় ফার্স্ট হলেই হয় না। মাথাটাকে একটু খাটাতে হয়। আমার বাবা যেটা করেছে। কালকে তো কাগজগুলো গিললি। কিছু ঘটে ঢুকেছে।
কিছুটা।
কি ঢুকেছে শুনি।
তোর বাবা, আমার বাবা দুজনেই খুব ডেঞ্জার লোক ছিল।
ছাগল।
ফালতু কথা বলবি না। শুভ রেগে উঠলো।
ফালতু কথা মানে। বুঝেছি তুই লেডিস ফিংগার। যা ভাগ। আমি একাই বার করে নেব।
প্লিজ তুই এরকম করিস না। তুই যা যা বলেছিস আমি তাই তাই করেছি। একটা ভুল করেছি।
ওই একটা ভুলের জন্যই আবার নতুন করে শুরু করতে হবে।
কেন!
সে বুদ্ধি তোর থাকলে জিজ্ঞাসা করতিস না। চিকনাদাকে দেখেছিস।
দেখেছি।
একমাত্র লোক যে বাবার সম্বন্ধে সব জানে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ শত চেষ্টা করেও চিকনাদার পেট থেকে একটা কথা বার করতে পারেনি, পারবেও না। মাকে গুরুমা বলে। মনে রাখবি বন্ধুর বৌকে গুরুমা বলে। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে। কতটা ডেডিকেশন থাকলে এই ব্যাপরটা ঘটতে পারে একবার ভেবে দেখেছিস। আমরা দুজন চিকনাদার ভাইপো, ভাইঝি না, ভাই-বোন। মা যেহেতু গুরুমা, তাই।
অনিমেষদাদাই পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়েছে। যেদিন বাবার মৃতদেহটা নিয়ে সবাই কান্না কাটি করেছে একমাত্র চিকনাদা কাঁদেনি। কান্নার অভিনয় করেছিল। ও রকম হতে পারবি।
অনিসা চুপ করে গেল।
কিছুক্ষণ চলন্ত পাখার দিকে তাকিয়ে থাকল।
একমাত্র মায়ের কাছে চিকনাদা সব স্বীকার করেছে ও সব জানে। কিন্তু মায়ের পায়ে হাত দিয়ে প্রতিজ্ঞা করেছে, তুমি আমাকে কোনওদিন কিছু জিজ্ঞাসা করবে না। তাহলে বন্ধুর অকল্যান হবে। কতটা বিশ্বাস থাকলে এই ব্যাপরটা আসতে পারে একবার ভেবে দেখেছিস? শুধু বন্ধু হলে এই ব্যাপারটা কোনও দিন ঘটতো না।
তোকে দেখিয়ে দেবো।
আজ থেকে তুই ছাড়া আমার পেট থেকে কেউ কথা বার করতে পারবে না।
কে রে বীর পুত্তুর।
দেখ ওই ভাবে বলবি না। কাল সারারাত ঘুমইনি।
আমিও সারারাত জেগে আছি। তোর মতো জাহির করতে যাই না।
তোর সব পড়া হয়ে গেছে!
এখনও বাকি আছে।
একটু বল। প্লিজ।
মেয়েদের মতো করছিস কেন?
তুই ছেলে বলে।
এক থাপ্পর।
অনিসা হেসে ফেললো।
ব্যাশ ঠিক আছে, এবার বল।
চল আমার ঘরে চল।
দুজনে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলো।
বারান্দায় আসতেই দেখল মা সিঁড়ি দিয়ে নামছে।
তুমি রেডি।
হ্যাঁ।
দাদা?
আমার সঙ্গে বেরচ্ছে।
অনিসা মাথা নীচু করে হাসলো।
হাসছিস যে?
এমনি।
সবাই তোর মতো হবে ভাবলি কি করে?
না আমি সেই জন্য হাসিনি।
মিত্রা বাইরের ঘরে ঢুকলো। অনিসা শুভ পেছন পেছন ঢুকলো।
দুদুন তোমার সঙ্গে যাবে?
দুদুনের গাড়ি আসবে।
তোমার গাড়িটা আজ একটু দেবে।
কেন?
আমি আর শুভ একটু বেরবো।
রবীনকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
শুভ ড্রাইভ করবে।
মিত্রা মেয়ের মুখের দিকে তাকাল।
ঠিক আছে। আমি দুদুনের গাড়ি করে চলে যাচ্ছি।
একিরে ও বললো তুই ওমনি হ্যাঁ করে দিলি!
মিত্রা ছোটোমার দিকে তাকাল।
যাক।
তারমানে?
কি হলোরে ছোটো—
বড়োমা রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে উঠলো।
বুঁচকি গাড়ি চাইলো অমনি মিত্রা দিয়ে দিল।
কোথায় যাবি রে?
বড়োমা রান্নাঘরের গেটে।
কথা দিচ্ছি বেইরে কোথাও যাবো না।
না হবে না।
কেন। আমি কি ছোটো আছি।
না তুমি তালগাছের মতো ঢ্যাঙা হয়ে গেছ।
অনিসা ছুটে গিয়ে দিদুনকে জড়িয়ে ধরলো।
যতই জড়িয়ে ধরো, গাড়ি পাবে না। কোথায় কি ঘটাবে।
তুমি বিশ্বাস করো। অনেকগুলো জায়গায় যাব।
হবে না।
তাহলে বাবার মতো বাসে অটোতে করে ঘুরবো।
তাও হবে না।
তাহলে কি হবে?
বাড়ির বাইরে যাওয়া হবে না।
কেন বলবে তো!
কেনর কোনও উত্তর নেই।
তাহলে না বলে চলে যাব।
একবার বেড়িয়ে দেখ না ঠ্যাঙ ভেঙে দেব।
পারবে?
ছাড় আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
আগে বলো। তারপর।
দুদুনকে জিজ্ঞাসা কর, যদি হ্যাঁ বলে তারপর।
দুদুন হ্যাঁ বলে দিয়েছে।
কোথায় যাবি?
মিত্রা মেয়ের দিকে তাকালো।
দেখি।
আজকে না বেরিয়ে যদি কাল বেরোস।
ঠিক আছে। কাল কিন্তু সক্কাল সক্কাল বেরোব।
আচ্ছা।
শুভ তুমি তাহলে এখানে খেয়ে নিও।
শুভ মাথা নীচু করে রইলো।
বাড়ি যাবে?
হ্যাঁ।
তাহলে এখুনি বেরিয়ে যাও। আর কোথাও যাবে না।
আচ্ছা। শুভ একবার অনিসার মুখের দিকে তাকিয়ে সোজা গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করলো।
(আবার আগামীকাল)
Excellent . want to read balance part.