জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১৭০ নং কিস্তি
একদিন কি কথা বলছি, হঠাৎ আমাকে বললো মিত্রা তুই কখনো সিমপ্লিফাই-এ পুরো নম্বর পেয়েছিস? ঠিক ওই মুহূর্তে ওই কথাটার সঙ্গে সিমপ্লিফাই-এর কোন লিঙ্ক নেই।
ভাবলাম ও হয়তো আমাকে টিজ করছে। মনটা খারাপ হয়েগেল। মুখে কিছু বললাম না।
বললাম কিরকম?
সিমপ্লিফাই করতে গেলে তোকে বদমাস শব্দটা মাথায় রাখতে হবে।
বদমাস!
হ্যাঁ। বি ও ডি এম এ এস। এই ছটা বর্ণের মধ্যে অনেক রস বুঝলি।
বি মানে হচ্ছে ব্র্যাকেট, ধর এই ফার্স্ট ব্র্যাকেট সেকেন্ড ব্র্যাকেট থার্ড ব্র্যাকেট। ও মানে হচ্ছে অফ দুটো ভ্যালুর মধ্যে ইন্টু চিহ্ন। একে আমরা গুনিতক হিসাবে ব্যবহার করি। ডি মানে হচ্ছে ডিভাইড। ভাগ করো। এম মানে হচ্ছে মাল্টিপ্লাই। গুণিতক। তুই বলতে পারিস একটু আগে তুই যে বললি, অফ মানে হচ্ছে গুনিতক। হ্যাঁ অঙ্কের ভাষায় কি আছে জানি না। তবে সাহিত্যে বর্ণমালায় দুটো ব আছে। আমি আমার জীবনে এই অফ আর মাল্টিপ্লাইকে সেই ভাবে ভাবি। এ মানে হচ্ছে এ্যাড যোগ করো। একের সঙ্গে অপরের। এস মানে হচ্ছে সাবট্র্যাক্ট। বিয়োগ। তারমানে প্রথমে ব্র্যাকেট দিয়ে শুরু শেষে বিয়োগ অঙ্ক মিলতে বাধ্য।
তুই এই শব্দটাকে যদি মাথায় রাখিস আর নিজের জীবনের ক্ষেত্রে ঠিকভাবে ইমপ্লিমেন্ট করতে পারিস, দেখবি অনেক ক্ষমতাবান লোক তোকে খুব সমঝে চলছে। ফর্মুলাটা যিনি বার করেছিলেন তাকে সত্যি মাথায় করে রাখতে হয়। আমার জীবনে তিনি একজন সার্চলাইট।
ও পাগলের মতো বলে গেল। আমি শুনে গেলাম। মাথায় এক ফোঁটাও ঢুকলো না। মনে মনে বললাম, আমি কাকে ভালোবেসেছি।
বেরবার সময় বললাম কখন আফিসে আসছিস?
তুই যা, গিয়ে বলবি আমি দুটো থেকে মিটিং-এ বসবো।
সেদিন অফিসে ঢুকলো দেড়টা নাগাদ। খবর পেলাম।
অফিসে গিয়ে প্রথম নিজের চেয়ারে গিয়ে বসতো।
সেই নিউজরুমের চেয়ার।
হ্যাঁ।
তারপর একে একে সব কটাকে তুলো ধুনো করলো আমার ঘরে বসে। তখন আমার সকালের কথাটা মন পড়ে গেল। আরে ও তো সকালে কি কথায় কথায় বললো তুই সিমপ্লিফাই করতে জানিস। তারমানে কি এটা ওর সিমপ্লিফাই?
রাতে শুয়ে চেপে ধরতে বললো হবে হয়তো। তুই এ সব নিয়ে ভাবিস না।
আজ আমি গেইজ করছি। জানিনা এর মধ্যে কতটা সত্যি মিথ্যে আছে। আচ্ছা তনু?
তনু মিত্রার মুখের দিকে তাকিয়ে।
রামকৃষ্ণাণের সঙ্গে আমাদের পরিচয় পর্বের কথাগুলো তুই ফলো করেছিস।
সত্যি মিত্রাদি আমি অবাক হয়ে গেছি। বলতে পারো স্তম্ভিত।
ওরা দু-জনে কথা বলে যাচ্ছে আমি নির্বাক শ্রোতা। মাঝে মাঝে নিজের মনে হাসছি। মিত্রার তাহলে সত্যি সত্যি ম্যচুরিটি এসেছে। মাঝে একবার শুধু অকারনে ফিক করে হেসে ফেলেছিল।
কথা বলতে বলতে অনিমেষদা, বিধানদা, অনুপদা, এসপি, ডিএসপি দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলেন।
অনিমেষদা আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে। চোখ হাসছে, মুখ গম্ভীর।
বিধানদাও হাসছে।
অনিমেষদা, বিধানদার দিকে তাকিয়ে ইসারা করলো।
ব্যাপারটা এরকম, ওর মুখ দেখে কিছু বুঝছেন।
বাইরে এতো ঝড় বইছে, তুই ঠান্ডা ঘরে বসে জমিয়ে গল্প করছিস? অনিমেষদা বললো।
মিত্রা হাসলো।
তোমাদের প্রশাসন আমাকে এ্যারেস্ট করতে পারে। সেই ভয়ে বসে আছি।
তাহলে তুই ভয় পাস বল।
যতই হোক একটু-আধটু মান-সম্মান আছে।
এসপির দিকে তাকালাম।
আপনার আর কিছু জানার বাকি আছে।
ভদ্রলোক কেমনভাবে যেন আমার দিকে তাকিয়ে।
আমি এখন ভালোপাহাড় রওনা হবো।
দু-জনেই মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে।
বাসু ঘরে ঢুকলো।
অনি, কেউ রিসিভ করলো না।
চিঠিটা ডেসপ্যাচ করেছিস?
করেছি।
পোস্ট অফিসের স্লিপগুলো প্রত্যেকটা চিঠির ওপর সাঁটিয়ে পাঁচটা করে জেরক্স করে নে। দুটো করে জেরক্স আমাকে দে। বাকি অরিজিন্যাল সমেত তোর কাছে রেখে দে। আর একটা কথা শোন…
বল।
তোর মোবাইল থেকে রেকর্ডিংটা আমাকে পাঠিয়ে দে।
আচ্ছা
কিসের চিঠি! অনিমেষদা বললো।
আনুমেষদা বাসুর দিকে তাকাল। বাসু আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
এক কপি করে জেরক্স বেশি কর, অনিমেষদাকে জেরক্স দিয়ে দে, পড়ে নেবে।
বাসু বেইরে চলে গেল।
কিসের চিঠি অনুপ!
অনাদি বাসুক ধমকাচ্ছে খুন করে দেবে। তাই….।
কাকে কাকে লিখেছে?
এসপি, ডিএসপি, লোকাল থানার ওসি।
কে লিখলো চিঠিটা?
অনি নিজে লিখলো।
অনিমেষদা রামকৃষ্ণাণের দিকে তাকাল।
আপনারা রিসিভ করলেন না কেন?
রামকৃষ্ণাণ মাথা নিচু করলো।
কোনও অসুবিধে ছিল?
দু-জনেই চুপ।
সব তো মোটামুটি ধরতে পারছেন, নিজের বাঁচার রাস্তাটা অন্ততঃ পক্ষে তৈরি করুণ। সেটার পথও রাখছেন না দেখছি। কতো ধামাচাপা দিই বলতে পারেন। এখন যান, যখন ডাকবো আসবেন।
অনিমেষদার ধমক খেয়ে দু-জনেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
অনিমেষদা চেয়ারে বসতে বসতে বললো, মা-রে ভীষণ খিদে পেয়েছে। কিছু খাওয়া না।
তোমরা খেয়ে বেরও নি! মিত্রা বলে উঠলো।
সময় পেলাম কোথায়? পুত্র সন্তান নেই, তবু পুত্র সন্তানের যন্ত্রণায় ভুগছি।
দাঁড়াও বলেই মিত্রা মোবাইল বার করে ডায়াল করলো।
রতন….তুমি যে প্যাকট….কনিষ্করা খেয়েছে….ওরা কখন এলো!…. (অনিমেষদা ইশারা করলো আমাদের সঙ্গে এসেছে) আর নেই?….দুটো আছে, তুমি এক কাজ করো একটা কোল্ডড্রিঙ্কসের বড়ো বোতল আর ওই দুটো প্যাকেট একটু নিয়ে এসো, অনিমেষদা, বিধানদা সকাল থেকে কিছু খায় নি।….আচ্ছা।
অনুপ তুমি বাইরেটা সামলাও। আমরা ওর সঙ্গে কথা বলি। রূপায়ণ, প্রবীরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে লাস্ট আপডেট নাও। আমাদের নেতৃত্ব স্থানীয় যারা আসছেন, তাদের চুপ থাকতে বলো। প্রেসের কাছে যেন মুখ না খোলে।
অনুপদা বেরিয়ে গেল। বিধানদা আমার বাঁ-পাশে বসেছে অনিমেষদা, বিধানদার পাশে।
অনিমেষদা মিত্রার মুখের দিকে তাকাল।
কিছু বার করতে পারলি?
একফোঁটাও না। আমার সব কথা তোমাকে শুনিয়েছি।
শুনেছি। তোর কথার কোনও প্রতি উত্তর করেনি?
স্পিকটি নট। শুধু হেসেছে।
ভাগ্যিস রাতে তুই শুনেছিলি, না হলে এই জল কতদূর গড়াত কে জানে। আবার হয়তো একটা রাজনাথ কেস ঘটে যেত।
আমি মিত্রার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি।
তাকাসনি। সংসার তো করলি না, খালি বিয়ে বিয়ে খেলা করলি। অনিমেষদা আমার দিকে তাকাল।
রতন ঘরে ঢুকলো। পেছনে আর একজন নার্সিংহোমর কর্মচারী, হাতে একটা ঢাউস ট্রে। তাতে প্লেট গ্লাস রয়েছে।
মিত্রা, তনু দুজনেই নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে এলো।
রতন আর কিছু খবর পেলে। অনিমেষদা তাকাল।
বেঙ্গল বর্ডার পেরিয়ে চলে গেছে।
যাক ল্যাটা চুকে গেছে। ইসলাম কিছু খবর দিতে পারলো?
শেষ পর্যন্ত যা খবর পেয়েছি আপনাকে জানিয়েছি।
তোমাদের সঙ্গে যে তিনজন এলো তাদের হদিস পেয়েছো।
না। সেই যে গাড়ি থেকে নেমে চলে গেল, এখনও কোনও খবর পাইনি।
প্রবীর কিছু বলতে পারলো?
বললো এখন মিটিং করবে আধঘণ্টা পর আপনাকে ফোনে জানাবে।
কথা বলার ফাঁকেই মিত্রারা বিধানদা-অনিমেষদার খাবার গুছিয়ে দিল।
ঠিক আছে তুমি যাও। নতুন কিছু পেলে আমাকে জানাও।
স্যার কফি নিয়ে আসবো না চা? রতনের সঙ্গে আসা ছেলেটি বললো।
মিনিট পনেরো পর কফি নিয়ে এসো।
দু-জনেই বেরিয়ে গেল।
বিধানবাবু আগে খেয়ে গায়ে জোর করুন তারপর পিটতে পারবেন।
অনিমেষদার কথায় বিধানদা হাসছে।
দু-জনেই খেতে শুরু করলো।
হাসবেন না বিধানবাবু, আড়ালে আবডালে নয়, আপনার চোখের সামনে সব সময় ছিল। এখন শুধু দেখে যান কোথাকার জল কোথায় গিয়ে গড়ায়।
মিত্রার দিকে তাকাল।
জানিস মিত্রা অর্ক-অরিত্রর ফোনের স্যুইচ অফ। সকাল থেকে বার পঁচিশেক ফোন করলাম।
বুবুনের ফোনে একটাও ফোন আসেনি। কিন্তু ওর ফোন খোলা আছে।
বাসন্তী মেয়েটা কেমন রে?
লক্ষ্মীর থেকেও শ্রুট, দেখতে লক্ষ্মীর থেকেও সুন্দর।
দামিনী বললো কাল মাঝরাতে একজন খরিদ্দারের সঙ্গে মোটা টাকার বিনিময়ে বেড়িয়েছে, এখনও ফেরেনি। তার ফোনেরও স্যুইচ অফ।
বাসু ঘরে ঢুকলো।
অনি ময়না পালের ব্যাটা এসেছে। তোর সঙ্গে দেখা করবে বলছে।
সেটা কে বাসু? অনিমেষদা বললো।
খনা। আমাদের গ্রামের ছেলে।
তার আবার ওকে কিসের দরকার! আর ও যে এখানে এই সময়ে আছে, সে জানলো কি করে ?
বুঝতে পারছি না। মাস দশেক আগে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেছিল। আজ হঠাৎ দেখছি।
অনিমেষদা আমার মুখের দিকে তাকাল। মুচকি মুচকি হাসছে।
ওকে নিয়ে এসো বাসু।
আমি যাচ্ছি, চল। আমি উঠে দাঁড়ালাম।
তুই একবারে এই ঘর থেকে নরবি না। সব গুবলেট করে দিবি। অনিমেষদা ধমকে উঠলো।
তুমি খাচ্ছ খাও না। ঝাঁজিয়ে উঠলাম।
অনিমেষদা হাসলো, বাসুকে ইশারা করলো।
বাসু বেরিয়ে গেল।
তোমরা কিন্তু গণ্ডগোল শুরু করে দিয়েছো।
কে শুরু করেছে তুই না আমরা।
আমি কিছু শুরু করিনি।
তুই থাবারি দিয়েছিস। তাতেই সকলে ত্রাহি ত্রাহি মধুসূদন বলে ডাকতে শুরু করেছে।
অনিমেষদা মিত্রার দিকে তাকাল।
ওকে একটু ঠান্ডা জল দে।
না আমার দরকার নেই।
বিধানদা হাসছে।
খনা ঘরে ঢুকলো। আমার দিকে তাকিয়ে ফরফর করে অনেক কথা বলে গেল। অনিমেষদা বিধানদা ওর মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে।
খনার ঠোঁটটা একবারে নাক পর্যন্ত কাটা সব কথাই ফ ফ করে বেরিয়ে যায়। কোনও কথাই সম্পূর্ণ নয়। ওর কথা আগে যে না শুনেছে বুঝতে পারবে না।
অনিমেষদা বাসুর দিকে তাকাল।
অনির একটা দরকারি কিছু ও রাস্তার ধারে ঝোপের মধ্যে ফেলে এসেছে। নিয়ে আসতে হবে।
সেই রকমই একটা বুঝেছিলাম।
অনিমেষদা মাথা দোলাচ্ছে। আমাকে দেখছে।
চাঁদ আর চিনাকে ডাক। বাসুর দিকে তাকালাম।
বাসু দরজা খুলতেই দুজনে উঁকি মারলো। চোখের ইশারায় ভেতরে ডাকলাম।
খনার সঙ্গে একবার যা ও যেটা দেবে আমাকে এনে দে।
খনার দিকে তাকালাম, ওদের সঙ্গে যা কোনও ভয় নেই। তারপর এখানে চলে আসবি।
আচ্ছা।
কিছু খেয়েছিস?
ঘার দোলালো। হ্যাঁ।
তিনজনেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
বাসু একে অনি পেল কোথায়? আর আজই বা মাটি ফুঁড়ে বরলো কোথা থেকে।
গ্রামে সকলে অনিকে চেনে।
সে চিনুক, অনি যে এখানে আছে খনা ব্যাটা জানল কি করে?
দাঁড়ান খোঁজ নিয়ে দেখি। বাসু বেরিয়ে গেল।
দেখো দেখো। মনেহচ্ছে কিছু উদ্ধার করলেও করতে পারো। মিত্রা।
অনিমেষদা মত্রার দিকে তাকাল।
মনে হচ্ছে এ বুবুনের বটাদা নয় ছিদাম। মিত্রা বললো।
অনিমেষদা মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে হাসছে। খাওয়া শেষ হয়ে গেছে প্লেটেই হাতটা ধুয়ে মুখে বুলিয়ে নিল। বিধানদার দিকে তাকাল।
বিধানবাবু।
আজ আমি খুব প্রয়োজন না হলে কোনও কথা বলবো না অনিমেষ, শুধু শুনে যাব।
মিত্রা কথাটা খুব একটা খারাপ বলেনি।
তা বলেনি। কিন্তু গাছের কোন ডালটা ধরে ঝুলছে সেটা দেখো।
মিত্রা কফি আনতে বল। কাজগুলো সারতে হবে।
কথাটা বলেই অনিমেষদা আমার মুখের দিকে তাকাল।
চিকনাদের কারা গুলি করলো।
জানিনা, খোঁজ খবর নিইনি।
চিকনা তোর বন্ধু নয়, তাকে তুই সন্তান স্নেহ করিস। এখনও তুই হাত-পা গুটিয়ে বসে আছিস।
কি করবো মাঝে মাঝে আমার ক্ষমতা কোনও কাজ করে না। তাই হজম করতে হয়।
চিকনা মরে নি। ইনজিওর্ড হয়েছে। তাও খুব সামান্য। আমি নিজে চোখে দেখে এলাম।
আমি এখনও দেখিনি।
তোর কাছে আগাম খবর ছিল।
আমি অনিমেষদার দিকে তাকালাম।
মিত্রা তোর সঙ্গে যা কথা হয়েছে আমাকে শুনিয়েছে। তুই ওর একটা কথারও প্রতিবাদ করিসনি। চুপ চাপ শুনে গেছিস।
ও কিছু জানে না। তাই ফর ফর করেছে।
প্রিয়দর্শিনীকে কিডন্যাপ করলো কারা? তাও চিকনা গুলি খাওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে।
জানি না।
ওরা এখন বেঙ্গল বর্ডার পেরিয়ে চলে গেছে।
আমি এ ব্যাপারে কিছু জানি না।
সাগরের বান্ধবীকে কারা বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেছে।
মহা মুস্কিল, কোথা থেকে সব গল্প শুনে এসে তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করে চলেছো।
এগুলো গল্প হলেও সত্যি। তোকে একটা সত্যি কথা বলি।
আমি অনিমেষদার দিকে তাকালাম।
রামকৃষ্ণণ তোকে প্রথম দেখছে, ঠিক গেজ করতে পারেনি। একটু দুর্ব্যবাহার করে ফেলেছে। তাই বলে এতবড়ো শাস্তি তুই ওকে দিতে পারলি?
আমি কাউকে কোন শাস্তি দিইনি।
ও ভীষণ ভয় পেয়েছে। তুই শুধু ওর বান্ধীকে তুলিসনি। ওর পরিবারকে কিডন্যাপ করিয়েছিস। একটু আগে ম্যাড্রাস থেকে ওর কাছে খবর এসেছে। ওর কোনও আত্মীয় খবরটা পাঠিয়েছে। সাসপেক্ট করছে মারান ঘটনাটা ঘটিয়েছে।
আমি এর বিন্দু বিসর্গ কিছু জানি না।
সুকান্ত এই ডিস্ট্রিক্টের এডিসন্যাল এসপি। তিনদিন ও ছুটিতে গেছে। ওকে ফোন করলে একটা শব্দই ভেসে আসছে, আউট অফ রিচ।
আমি অনিমেষদার দিকে বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি।
তুই কোনওদিন আমাকে বাবা বলে ডাকিসনি। দাদা বলেই চিরটাকাল ডেকে এসেছিস। সম্মান করেছিস বাবার মতো। অনেক কষ্টে একটা ডুবে যাওয়া জাহাজকে টেনে তুলছি। অনুজ ভুল করে ফেলেছে, ওকে তুই এর মধ্যে জড়াস না। বিরোধীদের হাতে এটা ট্রাম্প কার্ড।
চাঁদ, চিনা, বাসু ঘরে ঢুকলো। হাতে একটা এ্যাটাচি।
আমার সামনে টেবিলের ওপর এ্যাটাচিটা রাখলো।
চাঁদের দিকে তাকালাম। খুলেছিস?
না। লক করা আছে।
খনা কোথায়? অনিমেষদা বাসুর দিকে তাকাল।
বাসু মুখ টিপে হাসছে।
হাসছিস কেন। ওকে আমার কাছে নিয়ে আয়। আমি বললাম।
তোকে চিন্তা করতে হবে না, যাদের হাতে তুলে দিয়েছি ও এখন সেফ, পুলিশ ছাড়া ওকে কেউ ছুঁতে পারবে না।
কোনও খবর পেলে? অনিমেষদা বললো।
ও অনাদির বাড়িতে কাজ করতো। অনি ওকে মাসে মাসে দশহজার টাকা মাইনে দিত।
বিধানদা শরীর কাঁপিয়ে হেসে উঠলো।
অনিমেষদা আমার দিকে এমনভাবে তাকাল, মিত্রা-তনু পর্যন্ত হেসে ফেললো।
জানিস মিত্রা তুই খেতে বসে মাঝে মাঝে অনেক কথা বলতিস। ভাবতাম সব গল্প। এখন ওগুলোকে মাঝে মাঝে এ্যাপ্লাই করি, দেখি মিলে যাচ্ছে।
মিত্রা-তনুর গালে রং লেগেছে।
তোমরা কেউ জানতে। অনিমেষদা, বাসুর দিকে তাকাল।
না। সেই সময় ওর বাড়ির লোকজন ধরা-ধরি করতে আমরা থানায় একটা মিসিং ডাইরী করেছিলাম। সেই সময় সুকান্ত ওর এক বন্ধুর সাহায্যে ওই থানার ওসিকে বলে ব্যবস্থা করে দিয়েছিল।
অনাদির বউ ছেলে মেয়ে মাঝে গিয়ে ওর কাছে উঠেছিল না?
বাসু মাথা দোলাল।
ওরা এসে কিছু বলেনি?
যে ফ্ল্যাটে প্রিয়দর্শিনী থাকতো সেই ফ্ল্যাটে ও থাকতো।
ঠিক আছে তোমরা যাও পরে কথা বলছি।
ওরা বেরতে যেতেই অনুপদা ঘরে ঢুকলো। প্রায় ধাক্কা লেগে যাওয়ার অবস্থা।
অনুপদার মুখের দিকে তাকালাম। কেমন যেন শুকনো শুকনো।
ওরা বেরিয়ে গেল। অনুপদা ভেতরে এলো। অনিমেষদার মুখের দিকে তাকাল। চোখে চোখে কথা হলো। অনিমেষদা উঠে বাইরে গেল।
কফি এলো। আমি কফির কাপে চুমুক দিলাম।
তনু, মিত্রা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। কখনও হাসছে, কখনও গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে। কখনও বিষ্ময়ে চোখ বিষ্ফরিত।
প্রায় তিন ঘণ্টা হয়ে গেল কারুর সাথে কোনও কথা বলা হয়নি। ঠিকমতো কাজ আদৌ এগোল কিনা সন্দেহ থেকে যাচ্ছে। খনা এখানে পৌঁছেছে তারমানে এই পার্টের কাজটা হয়েছে।
দরজা ঠেলে অনিমেষদা ঘরে ঢুকলো।
চোখ-মুখ দেখে খুব সুবিধার বলে মনে হলো না। ঘটনা একটা ঘটেছে। সেটা জটিলও হতে পারে। সামান্যক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে পাশে এসে বসলো।
অনিমেষদার কফির কাপটা প্লেট দিয়ে ঢাকা দেওয়া ছিল। প্লেটটা তুলে কফির কাপে চুমুক দিল।
অনুজবাবু, প্রবীরদার কথা মানছে না। একটা সেপারেট লবি তৈরি করে ফেলেছে।
আমি খুব ধীর স্থির ভাবে বললাম। অনিমেষদা আমার মুখের দিকে তাকাল!
তনু, মিত্রা, বিধানদা নড়ে চড়ে বসলো।
বলো না, যা বলছি ঠিক কিনা।
শুনে তোর কি লাভ, তুই কি আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ে যাবি।
আজব ব্যাপার। পয়সা ইনভেস্ট করবো আমি, কোথায় ইনভেস্ট করলে সেটা রিটার্ণ আসবে আমি দেখবো না। উনি বলবেন ওনার বাড়ির পাশে করতে, আমি করে ফেলবো।
অনাদি, শুভকে কিডন্যাপ করেছে।
এ্যাঁ। মিত্রা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
এই খবরটা তোমায় কে দিল? বড়োমা না প্রবীরদা? আমি বললাম।
ঘটনাটা ঘণ্টা দুয়েক আগে ঘটেছে। অনাদিই ফোন করেছিল প্রবীরকে।
শুভ কোথায় ছিল?
শুভ মনে হয় নিজের বাড়ি থেকে এ বাড়িতে আসছিল।
বাড়িতে কেউ জানে?
ইসলাম জানতে পেরেছে, অনাদি তোর ছেলে-মেয়েদের ম্যাসেজ করেছিল।
তুমি কি শুভর ফোনে ফোন করেছিলে?
আউট অফ রিচ।
অনন্যর সঙ্গে কথা বলেছিলে?
বললো এইরকম একটা ম্যাসেজ ও পেয়েছে। তবে সকালে শুভর সঙ্গে ওর কথা হয়েছিল, তখন শুভ বলেছিল ওর ফোন আজ সারাদিন বন্ধ থাকবে। ও একটা জায়গায় যাবে।
ঘণ্টা, পক্কে, সুন্দরের সঙ্গে কথা হয়েছিল?
ঘণ্টা ফোন করে জিজ্ঞাসা করেছিল, ঘটনার সত্যতা কতটা। মামা জানে কিনা।
তুমি কি বললে?
পরে জানাব বলেছি।
বড়োমার সঙ্গে তোমার কথা হয়েছে?
অনুপ ফোন করার আগে অনাদি দিদিকে ফোন করেছিল, ছোটো-বড়ো কথা বলেছে। আমি তখন অনাদির সঙ্গে কথা বলি। জানতে পারি এতো সব ঘটেছে।
অনাদি তোমাকে কোনও ছোটো-বড়ো কথা বলেছে।
অনিমেষদা চুপ করে রইলো।
তুমি যে বললে তোমার কাছে খবর ছিল আমাকে মারবে। তাই সকালে তিনজনকে আমার পেছনে গুঁজে দিলে।
খবরটা আমি পাব কোথা থেকে প্রবীর সার্ভ করেছিল তাই পেয়েছি।
তোমাদের নিজেদের ভেতর দলাদলি আছে। সবাই শের সোয়া শের।
অনুপদার দিকে তাকালাম।
একবার এসপি আর ডিএসপিকে ডাকো। আমার গলার স্বরে সামান্য পরিবর্তন হলো।
অনুপদা আমার মুখের দিকে একবার তাকাল।
চাঁদ ঘরে বসেই চেঁচালাম।
চাঁদ দরজা ঠেলে মুখ ঢোকালো।
ভেতরে আয়।
চাঁদ ভেতরে এলো।
চিনা কোথায়?
একটা ফোন এসেছিল। বাইরে গেছে কথা বলতে।
বাক্সটা লাথি মেরে ভেঙে যা কাগজপত্র আছে বার করে দে।
চাঁদ নিমেষের মধ্যে বাক্সটা ভেঙে দিল। তিনটে ফাইল, কয়েকটা ব্যাঙ্কের চেক বই। তিনটে এগ্রিমেন্ট পেপার দেখতে পেলাম।
চাঁদ কাগজগুলো গুছিয়ে আমার হাতে দিল।
লাস্ট খবর কি আছে?
সব কাজ সাক্সেসফুল।
কেউ ফেল করেনি?
না।
চিকনার সাথে দেখা করেছিস?
করেছি।
যা জানাতে বলেছিলাম জানিয়েছিস?
হ্যাঁ।
কিছু বলছিল?
মন খারাপ করছিল, তোমার কথা শোনেনি বলে।
মোবাইলটা দে?
চাঁদ পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে অন করে দিল।
অনুপদা, এসপি, ডিএসপি ঘরে ঢুকলো। আমি বসার জন্য হাত দেখালাম।
দু-জনেরি মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে।
আমি ফাইলগুলো একবার দেখে নিলাম। বিধানদা ঝুঁকে পরে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। আমি একবার বিধানদার দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
কিছু বুঝছো?
বুঝছি।
আগামী মাসে কেসটা হাইকোর্টে উঠছে। ফার্স্ট হেয়ারিং। আমি নিজে প্লিড করবো।
বিধানদা হাসছে।
আটমাসের ফসল।
মিঃ রামকৃষ্ণাণ আপনকে অনুজ কিসের দায়িত্ব দিয়েছিল?
বিধানদা তাকাল এসপির দিকে।
এসপি চুপ করে থাকল।
চুপ করে থাকবেন না বলুন।
উনি মৌখিক ভাবে বলেছিলেন।
কি বলেছিলেন?
এই রকম একটা ঘটনা ঘটতে পারে। আমাকে সেল্টার দিতে হবে।
দিয়েছিলেন?
তার আগেই সব গণ্ডগোল হয়ে গেছে।
কারা করলো?
ছুড়কি আর দারু।
আপনি ছুড়কিকে এ্যারেস্ট করেছেন?
না।
কেন?
যাওয়ার আগেই তারা চলে গেছে।
আমি অবাক হয়ে রামকৃষ্ণাণের দিকে তাকিয়ে। একটু আগে ব্যাটা বলেছিল ছুড়কিকে এ্যারেস্ট করেছে। এখন পুরো পাল্টি।
যে তিনজনের বডি পোস্ট মর্টেমে পাঠিয়েছেন তারা কারা।
একজন খড়গপুরের চন্দ্রশেখর আর দুজন বম্বে থেকে এসেছিল।
চন্দ্রশেখর! যে রেলের স্ক্র্যাপ কেনাবেচার কালোবাজারির সঙ্গে যুক্ত?
এসপি চুপ।
সাগরের সঙ্গে আপনার পরিচয় কি ভাবে?
অনাদিবাবু করিয়ে দিয়েছিলেন।
চন্দ্রশেখরের স্ত্রী আপনার বান্ধবী?
এসপি চুপ।
অনুজ আপনাকে কখন ফোন করেছিল?
কাল রাতে।
কি বলেছিল?
চন্দ্রশেখর যে ভাবে বলবে সেই ভাবে হেল্প করতে।
চন্দ্রশেখর কি বলেছিল আপনাকে?
একটা কাজ করবে। ঘটনা ঘটার এক ঘণ্টা পর যেতে।
অনিমেষ কাল রাতে আপনাক ফোন করে বলেছিল, অনুপ আজ এখানে আসবে?
হ্যাঁ।
আজ সকালেও আপনাকে ফোন করেছিল। ওরা রওনা হয়েছে বলে?
হ্যাঁ।
তখন কি ঘটনাটা ঘটেছিল?
তার আধঘণ্টা পর হয়।
আপনি স্পটে গেছিলেন?
গেছিলাম।
গিয়ে কি দেখলেন?
পুলিশের জিপটা জ্বলছে। একটা বডিও চেনা যাচ্ছে না।
এলাকার লোকের সঙ্গে কথা বলেছিলেন?
হ্যাঁ।
যারা ব্যাপারটা দেখেছে এমন কাউকে পেয়েছিলেন?
পেয়েছি।
কি বলেছে?
ওরা ওদের মতো আসছিল। দারু, ছুড়কি স্পটেই গা ঢাকা দিয়েছিল। এরা গুলি চালাতেই ওরা স্পট করে দেয়। তারপর গাড়িতে ঢুকিয়ে আগুন দেয়।
আর কাউকে মেরেছে?
না।
গিয়ে ওদের কাউকে পেয়েছিলেন?
পাবলিক আমাদের এ্যাটাক করেছিল।
কেন!
চিকনাবাবু, মীরবাবু ওখানকার খুব জনপ্রিয় নেতা।
ওরা আমাদের সংগঠনের লোক এটা জানতেন?
পরে জানতে পেরেছি।
আগে জানতে পারেননি কেন?
এসপি চুপ।
চন্দ্রশেখরকে আপনি কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলতে চেয়েছিলেন, গত মাস তিনেক ধরে ও আপনার ওপর খুব প্রেসার করছিল। অনুজ ওকে সেল্টার দিয়েছিল।
এসপি চুপ।
আপনারা এখন যান, প্রয়োজন পরলে ডাকবো। দু-জনেই শুর শুর করে উঠে চলেগেল।
অনিমেষ প্রবীরকে বলেদাও এদের দু-জনকেই শো-কজ করতে।
আমি তাই বলেছিলাম বলেই অনুজ এই কথা এসে প্রবীরকে বলেছে।
বিধানদা হাসলো। অনিমেষ তুমি এতো বোঝো আর এটা বুঝতে পারলে না।
মাথাটা ঠিক কাজ করছে না। মনটা কেন যেন কু গাইছে।
ঘটনা পরম্পরা যা বলছে শুভকে অনি নিজে পাঠিয়েছে।
এ্যাঁ! অনিমেষদা বললো।
অনাদি তুলে নিয়ে যায়নি। অনাদির এতটা ক্ষমতাও হয়নি। তুমি প্রবীরকে নির্দিধায় বলো এদের শো-কজ করতে, দেখি এরা কি উত্তর দেয়।
আমি বিধানদার দিকে তাকালাম।
বিধানদা আমার পিঠে হাত রাখলো। হাসছে।
বল না ধরতে পেরেছি কিনা।
কি করে ধরলে? আস্তে করে বললাম।
অমিতাভবাবুর মুখ থেকে তোর মিঃ ব্যানার্জীকে ধরার গল্পটা একদিন খুব ধৈর্য ধরে শুনেছিলাম। জিজ্ঞাসা করিস, ওই বয়সে তোর বুদ্ধিরও তারিফ করেছিলাম।
তনুকে তখন তুই ফিট করেছিলি। এখানে খনা। ব্যানার্জীর সামনে সেবার ছিল আবিদ। অনাদির সামনে এবার শুভ। অবিশ্বাস করার কোনও জায়গা তুই রাখিসনি।
রাজনাথের সময় অরিত্র, অর্ক, লক্ষ্মী মেন রোল প্লে করেছিল। এখানেও মনেহয় ওরা আছে লক্ষ্মীর জায়গায় হয়তো অন্য কেউ।
বাসন্তী বলে মেয়াটা মিসিং। অনিমেষদা বললো।
আমি অনিমেষদার দিকে একবার তাকিয়েই সবার মুখটা লক্ষ্য করে আবার বিধানদার মুখের দিকে তাকালাম। ঘরের সবার মুখের পরিবর্তন হয়েছে।
জানিষ অনি হঠাৎ করে যেন মনে হলো, সেই ঘটনার ছায়া আমি এই কেশটাতে দেখতে পাচ্ছি।
আমি হাসছি।
একুশ বছর পর একই ছককে তুই আবার ইমপ্লিমেন্ট করলি।
আমি মাথা নিচু করলাম।
তুই অনাদিকে কিছুতেই বাগে পাচ্ছিলি না। এবার পেয়ে গেছিস।
মাথা দোলালাম।
হ্যাঁ বলো।
মিত্রার গলা পেয়ে তাকালাম।
ফোনটা টেবিলের ওপর। তারমানে রিং টোন অফ করা আছে।
ভয়েজ অন করে রেখেছে, বড়োমার গলা পাচ্ছি।
সকাল থেকে ফোন করলি না।
তোমাকে ফোন করবো তার ফুরসৎ কোথায়?
এখানে কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করলে সকলে থাবারি দেয়। চিকনা, মীর কেমন আছে?
সত্যি কথা বলবো।
বল। বড়োমার গলাটা কাঁপা কাঁপা শোনাল।
ওরা ভালো আছে। আমি এখনও দেখিনি। বলতে পারো দেখার ফুরসত মেলেনি। তোমর ছেলেকে এক চুল কাছ ছাড়া করিনি। দু-জনে মিলে ওর সঙ্গে সেঁটে আছি।
সকালে অনাদি খুব নোংরা নোংরা কথা বললো।
তোমার কথা ছেলে শুনছে।
বড়োমার গলাটা ভাড়ি ভাড়ি ঠেকছে।
শুনলাম শুভকে নাকি ওরা ধরে নিয়ে গেছে।
মিত্রা চুপ করে রইলো।
চুপ করে রইলি কেন, বোচনকে জিজ্ঞাসা করলাম, ধমক দিলো, বললো থামো তো।
ইসলামভাই কোথায়?
সকাল থেকে বাড়িতে বসে আছে। কাকে কাকে যেন ফোন করছে। সে আর কি করবে।
ছোটোমা কোথায়?
তোর কথা শুনছে। তারও বয়স হচ্ছে। দিন দিন কমছে না।
দাদা, মল্লিকদা, ডাক্তারদাদা?
ওরা সবাই বাগানে বসে গল্প করছে।
তুমি কিছু জিজ্ঞাসা করো নি?
বললো যার কাজ তাকে করতে দাও। তুমি আমি ভেবে কিছু করতে পারবো।
শুভর দাদু এসেছিল?
এসেছিল, ইসলামের মুখ থেকে সব শুনে হাসলো। বললো অনেক বড়ো গেম খেলেছে অনি। কতো রাঘব-বোয়াল এবার জালে পরবে দেখো। তারপর চলেগেল। ছেলেটাকে কিছু করবে না?
আমি ফোনটা ডায়াল করলাম।
তোমার সঙ্গে পরে কথা বলছি। তোমার ছেলে কাকে ফোন করছে। শুনতে হবে।
আমাকে শোনা।
কথা বলবে না।
এই ভয়েজ অন কর। মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে ধমকের শুরে বললো।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।
একবারে ঠাণ্ডা চোখে তাকাবি না।
রিং বাজছে।
হ্যালো। অনাদির গলাটা বেশ ভাড়ি ভাড়ি।
আমি অনি বলছি।
অনি না অনিন্দ ব্যানার্জী, লোকের কাছে অনি নামে পরিচিতি লাভ করেছি।
হাসলাম। কেমন আছিস?
ভালো।
কি রকম ভালো?
যেমন রেখেছিস।
আমি আর কিরকম রাখবো। তুই এখন কিংপিন। অঢেল ক্ষমতা তোর।
তুইও বা কমতি কিসে।
সাগর তোর কাছে?
জেনে তোর লাভ।
কাল একশো পঁচিশ টানলাম।
হজম করতে পারবি না।
ভাবছি পুরোটাই তোর পেছনে ইনভেস্ট করবো।
কাজের কথা বল।
বাসুকে হুমকি দিয়ে বার বার ফোন করছিস কেন?
হুমকি দিচ্ছি না আজই মেরে দেব।
কথা বেশি না বলে কাজে করে দেখা।
দেখলি তো কাজ করতে পারি কিনা।
সকাল থেকে এতো ঘটনা ঘটালি, একবার ফোন করতে পারতিস।
আমি কেন করবো, প্রয়োজন তোর।
তোর লোক গুলো কাজের নয়। সব ধসকা মাল।
বুঝেছি এখনও তোর কাছে খবর পৌঁছয়নি।
তুই শুভকে তুলে নিয়ে গেছিস এই তো?
এখনও বাঁচিয়ে রেখেছি এই তোর ভাগ্য ভালো। অনাদি ঝাঁজিয়ে উঠলো।
আমি জানি তোর অনেক ক্ষমতা। সকালে চিকনাকে, মীরচাচাকে মারলি। বরাত ভালো বেঁচে গেছে। গ্রামের ছেলেগুলো কি তোর পাকা ধানে মই দিয়েছে?
তার কৈফিয়ত তোকে দিতে হবে নাকি।
ভাটপাড়ার ছেলেটা আর হাঁড়িপাড়ার ছেলে দুটো বেশি ইনজিওর্ড হয়েছে। ফকিরের….।
চিকনা বহুত বাড়াবাড়ি করছে, বারন করে দিস। এবারের মতো ছেড়ে দিলাম।
ওরা গ্রামের মানুষ দিন আনে দিন খায়, তোর সঙ্গে কি বারাবারি করলো।
ন্যাকা, খোঁজ খবর নে, বুঝতে পারবি।
ব্যাপারটা তুই ঠিক করলি না।
তুই কি আমাকে ধমকাচ্ছিস নাকি।
না তোকে বোঝাবার চেষ্টা করছি।
অনাদি কাঁচা কাঁচা খিস্তি দিয়ে উঠলো। নিজের অজান্তেই জিভটা বেরিয়ে এলো।
মোবাইলের ভয়েজ অফ করতে গেলাম। বিধানদা হাতটা চেপে ধরলো। ইসারা করলো, থাক।
প্রিয়দর্শিনীকে কখন ছাড়ছিস?
প্রিয়র্শিনী!
অনাদি আবার খিস্তি করলো, আর দু-ঘণ্টা সময় দেব, ওগুলোকে যেমন মেরেছি, শুভকেও কুত্তার মতো মেরে দেব।
প্লিজ তুই এটা করিস না। বাপ-মা হারা ছেলে, তুই তো ওর ব্যাপারটা সব জানিস।
প্রিয়দর্শিনীকে কোথায় রেখেছিস?
আমি কেন রাখতে যাব, প্রিয়দর্শিনী যার বিবাহিত স্ত্রী সে নিয়ে গেছে।
দিবাকরকেও ছারবো না, অনাদি আবার খিস্তী করে উঠলো।
সবার চোখ বড়ো বড়ো। এ কি শুনছে সবাই।
কোন ফাঁকে যে এসপি, ডিএসপি ঢুকেছে খেয়াল করিনি। ওরা যেন নতুন কিছুর গন্ধ পেল।
কৌন ফোন কিয়া। একটা ভাড়ি গলার আওয়াজ ভেসে এলো।
অনাদি খিস্তী দিয়ে আমার নামটা বললো।
রেনডি কা আওলাদ, একটা বিভৎস আওয়াজ হলো। মনে হলো ঝনঝন করে কিছু ভেঙে পরলো।
আমি সবার দিকে অপরাধীর মতো তাকালাম। যেন ভুল করে ফেলেছি।
হাপিজ। আবার সেই বাজখাঁই গলা।
তু উস্কো বানা, ম্যায় ইস্কো দেখতা হুঁ। সুবে সে বহুত ফর ফর কিয়া।
গলার স্বরে ফোনের স্পিকারটা যেন ফেটে যায় যায়।
এই শুভ। আবার হুঙ্কার।
হ্যাঁ আঙ্কেল। শুভর গলা বেশ সপ্রতিভ।
তু বাহার যা কে খাঁড়া হো যা।
খিস্তির বহর, তার সঙ্গে প্রচণ্ড আওয়াজ।
সারাটা ঘর নিস্তব্ধ। সবার চোখে মুখে বিষ্ময়।
চাঁদের দিকে তাকালাম।
দু-জনের চোখ লাল ডগডগে। পেছনে দেখলাম রতন, আবিদ থম মেরে দাঁড়িয়ে। কখন এসেছে খেয়ালই করিনি। বুঝতে পারছি চারজনেরই অবস্থা খুব একটা ভাল নয়।
তুমি আমাকে কাজটা দিলে না। চিনা বলে উঠলো। চিনার এ স্বর সকলের অপরিচিত।
অনিমেষদা, বিধানদা একবার চিনার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো। মাথা দোলাচ্ছে।
টেবিলের ওপর ফোনটা পড়ে আছে, যেন ফেটে যাচ্ছে।
রতনকে বললাম ভিকিকে ফোন করে আমাকে দে।
স্যুইচ অফ।
আমি আমার আর একটা মোবাইল থেকে নম্বরটা ডায়াল করে ওর হাতে দিলাম।
তনু মিত্রার চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। উত্তেজনায় যেন ফেটে যাবে এখুনি।
আমার ফোনটা টেবিলে কিছুক্ষণ চেঁচামিচি করে আপসেই থেমে গেল।
এসপি, ডিএসপির মুখ শুকনো খট খটে।
অনিমেষদা মাথায় হাত দিয়ে বসে।
হ্যালো।
বুঝলাম রতন ফোনটা ভয়েজ অন করে দিয়েছে।
আমি রতনদা বলছি।
বুঝতে পারছি।
তুই এখন শোয়াসের হয়ে গেছিস।
তোমার সঙ্গে এখন কথা বলার সময় নেই।
ধর অনিদা কথা বলবে।
রতন ফোনটা আমার হাতে দিল।
ভিকি।
বলো আঙ্কেল।
তুই সিগগির ওপরে যা।
শুভ ফোন করেছিল।
হাফিজ, ইকবাল মনে হয় দু-টোকে মেরে দেবে। পারলে বাঁচা। বল আমি বলেছি। ইকবালকে বল আমাকে ফোন করতে। মা কোথায়?
বাগানে আছে।
বাগানে! ওখানে বাগান পেলি কোথায়?
তোমাকে পরে সব বলছি।
ঠিক আছে। শুভকে বাড়ি পৌঁছে দে। বলবি আন্টিকে একবার ফোন করতে।
আচ্ছা।
ফোনটা কেটে গেল।
বড়োমা সব শুনলে। মিত্রার দিকে তাকালাম। উত্তজনায় চোখের মনি কাঁপছে।
শুনলাম।
তোমাকে পড়ে ফোন করছি। শুভ এখুনি ফোন করতে পারে।
আমাকে একটু জানাস।
পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে।
অনিমেষ, বিধানবাবু কোথায়?
সবাই নাটক শুনছে।
ছেলেটার জন্য ওদের কি জ্বালা বল।
সরাটা জীবন তো ভোগ করলে। আর একটু করো।
বিধানদা জোরে হেসে উঠলো, অনিমেষদা মুচকি মুচকি হাসছে।
ঠিক আছে রাখছি।
মিত্রা ফোনটা কেটে দিয়ে টেপাটেপি শুরু করে দিল।
পেছন দিকে তাকিয়ে দেখলাম বাসু ঘরে এসেছে। রতন, আবিদ ফোনে নিচু স্বরে কথা বলছে। হাত চারেক মাত্র দুরত্ব তবু কিছু শোনা যায় না।
বাসুর দিকে তাকিয়ে বললাম, একটু চায়ের ব্যবস্থা কর। মাথাটা ধরে গেছে।
কিছু খা। সেই সকালে মাত্র একটা পরোটা খেয়েছিস। মিত্রা বললো।
ভালো লাগছে না।
অনিমেষদা আমার দিকে তাকাল।
বাসু ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
দাদাভাই তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে। রতন বললো।
একটু অপেক্ষা করতে বল, পরে বলছি।
আমাকে দাও আমি কথা বলছি। অনিমেষদা রতনের কাছে থেকে ফোনটা নিল।
উঠে বাইরে চলে গেল। অনুপদাও পেছন পেছন বেরিয়ে গেল।
বিধানদা নিরুত্তাপ মুখে এসপি, ডিএসপির মুখের দিকে তাকাল।
মিঃ রামকৃষ্ণাণ এই ড্রিলটায় আপনি কত পেয়েছেন?
রামকৃষ্ণাণ একবার বিধানদার মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে নিল।
লজ্জার কিছু নেই। সব তো নিজের কানে শুনছেন। লুকিয়ে চুরিয়ে কিছু হচ্ছে না। আপনি হয়তো অনিকে আজ দেখছেন। বিগতো কুড়ি বছর আমরা ওকে দেখে আসছি। বুঝতে পারছেন না এইরকম একটা ছোট্ট ঘটনায় আমরা দুজনে ছুটে এসেছি।
রামকৃষ্ণাণ কোনও কথা বলছে না।
আপনাকে সৎ অফিসার মনে করে এখানে পোস্টিং দেওয়া হয়েছিল।
বিশ্বাস করুণ স্যার আমার কোনও অপরাধ নেই।
আপনি নিজের কানে সব শুনতে পাচ্ছেন। অপরাধ গোপন করার জায়গা আছে?
মিত্রার ফোনটা বেজে উঠলো।
বিধানদা, শুভ। মিত্রা বলে উঠলো।
শোনা, কি বলে শুনি।
হ্যালো।
আন্টি, আমি শুভ।
তুমি কোথায়? মিত্রার গলায় উৎকন্ঠার সুর।
বারুইপুরে একটা বাগান বাড়িতে।
ওখানে কি করতে গেছ! সবাই তোমাকে খোঁজা খুঁজি করছে।
তুমি কিছু জানো না!
না।
আঙ্কেল কোথায়?
নার্সিংহোমে, তোমার চিকনাদার এ্যাকসিডেন্ট হয়েছে।
চিকনাদার এ্যাকসিডেন্ট হয়েছে!
হ্যাঁ। তুমি কোনও খবর পাও নি!
না! তুমি কোথায়?
তোমার আঙ্কেলের দেশের বাড়িতে।
চিকনাদাকে তুমি দেখনি?
সকালে দেখেছি। খবর নিয়েছি, এখন ভালো আছে।
কি হয়েছে চিকনাদার?
শুনলাম কারা যেন গুলি করেছে।
তোমরা ভালোপাহাড় যাও নি?
এই অবস্থায় আর যাওয়া যায়।
সেই জন্য অনাদি আঙ্কেল, সাগর আঙ্কেলকে বেদম পেটাচ্ছে। আমি কিছুটা ভিডিও করেছি।
কারা পেটাচ্ছে? কেন!
(আবার আগামীকাল)