জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১৭১ নং কিস্তি
তোমায় পরে সব জানাচ্ছি। দারুণ এক্সপিরিয়েন্স বুঝলে আন্টি। আঙ্কেল ফোন করলে বলবে, আঙ্কেল যেমন যেমন বলেছে, আমি ঠিক তেমন তেমন ভাবে কাজ করেছি।
আচ্ছা। তুমি এখন কোথায় যাচ্ছ?
আমি বাড়ি যাচ্ছি।
কার সঙ্গে যাচ্ছ।
ভিকিদা একজনকে ঠিক করে দিল, সে গাড়ি করে পৌঁছে দেবে।
আমার কেমন ভয় করছে।
একবারে ভয় করো না। এরা সবাই আঙ্কেলের লোক। তোমায় পরে সব বলছি।
আমি তোমাকে ফোন করবো।
আচ্ছা।
ফোনটা কেটেই মিত্রা আমার দিকে তাকাল।
ওরা বারুইপুরে কি করতে গেছে!
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম। কোনও কথা বলতে পারছি না। সত্যিতো বারুইপুরে গেল কি করে!
অনিমেষদা, অনুপদা ঘরে ঢুকলো। মুখটা সামান্য থম থমে। বিধানদা তাকাল।
কি হলো অনিমেষ?
অনুজ একটু জলঘোলা করতে চাইছে।
আমি অনিমেষদার মুখের দিকে তাকিয়ে।
ওকে বলেছো, ওর সঙ্গে সাগর, অনাদির বহু কাগজ অনির হাতে পৌঁছে গেছে। বিধানদা বললো।
না। অনি নিশ্চই ওর সঙ্গে কথা বলবে। কি বলে আগে শুনি, তারপর।
প্রবীর কি বললো?
খবর অনুজের কাছে পৌঁছে গেছে। ও ওর দপ্তর থেকে বেরিয়ে গেছে।
রূপায়ণের সঙ্গে কথা বলেছো।
বলেছি।
বাসু একটা ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। ট্রেতে চায়ের পট। কাপ ডিস। দেখলাম নীপাও পেছন পেছন ঢুকলো। চোখটা ছল ছলে। আমার পাশে এসে দাঁড়ালো।
আমি ওর কোমরটা পেঁচিয়ে ধরে মুখের দিকে তাকালাম।
চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরছে।
কেমন আছে চিকনা?
মাথা দোলাল, ভাল আছে।
কথা বলেছো?
মাথা দোলালো।
মীরচাচা?
নীপা কোনও কথা বলছে না। মাথা দুলিয়ে আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চলেছে।
কাকী, সুরোমাসি জেনেছে?
জেনেছে।
তুমি কিছু খেয়েছো?
কনিষ্কদাদের সঙ্গে খেয়েছি। নীপা কথা বললো।
ওরা কোথায়?
চিকনাদার কেবিনে।
আমার ফোনটা বেজে উঠলো।
দেখলাম ইকবালের নম্বর ব্লিঙ্ক করছে।
নীপাকে ছেড়ে ফোনটা ধরতে গেলাম।
একবারে একা শুনবি না আমরা শুনবো। মিত্রা চেঁচিয়ে উঠলো।
ওরা খারাপ খারাপ কথা বলবে কেন শুনতে চাইছিস।
তোর জন্য কানে সব সেট হয়ে গেছে।
আমি একবার চারদিকটা তাকিয়ে নিলাম।
ছেলেটি চা দিয়ে বেরিয়ে গেছে। তনু পট থেকে চা ঢেলে সকলের দিকে এগিয়ে দিচ্ছে।
হ্যালো।
অনিদা। ইকবালের বাজখাঁই গলা।
হ্যাঁ।
তুম কাঁহা।
নার্সিংহোম।
চিকনাদা, মীরচাচা ঠিক হ্যায় না।
হ্যাঁ।
বোলো, দোনোকা খুপরি মে ডাল দুঁ।
নেহি। মারা কিঁউ?
রেনডি কা আওলাদ সুবে দাদি কো ভি গালি দিয়া। হাফিজ বোলা ডাল দে শালে কো।
হাফিজ কো বুলা।
এ হাফিজ, দাদা কো সাথ বাত কর।
একটুক্ষণ পর হাফিজের গলা পেলাম।
হ্যালো।
কি খবর হাফিজ।
কবিতাদি ভিকি ট্রিটমেন্ট করছে।
ইকবাল খুব মেরেছে?
মিত্রা মুখে চাপা দিয়ে হাসলো।
সকাল থেকে বহুত দাদা গিরি করছিল। বলে কি শুভকে মেরে দে।
ধরতে পারে নি?
শালা এখন রাম কেলানি খাওয়ার পর ধরতে পেরেছে আমরা কে।
তোরা বারুইপুর গেলি কি করে?
ভিকু ভাই-এর ছক। সকালে ওর এজেন্ট ফোন করেছিল বম্বে থেকে। ব্যাটা আমাকে ফোনটা দিল কথা বলতে। হাঁ হু করে ফোনটা কোনও প্রকারে কেটে দিয়ে রিসিভ কল থেকে নম্বরটা ভিকু ভাই-এর মোবাইলে ম্যাসেজ করে দিই।
ভিকু ভাই পানবেল থেকে ওর এজেন্টকে তুলে নেয় তারপর থেকে ভিকু ভাই ওর এজেন্ট হয়ে গেছে। কি বুজুং বাজুং দিলো তারপর সাগরের বাগান বাড়িতে এসেছি।
অনাদি কার কার সঙ্গে কথা বলেছে।
অতো চিনি নাকি। তবে মন্ত্রীটা ঘন ঘন ফোন করছিল। একটু আগেও শালা ফোন করেছিল, বলে দিয়েছি খবর ফাঁস হলে আজ রাতেই গিরিয়ে দেব। তোর পোঁদেও লোক লেগে আছে। দেখবো তোর কতো বড়ো বাপ আছে।
ভিকু কোথায়?
ভালোপাহাড়।
পৌঁছে গেছে।
দাঁড়াও শালাকে একটা থাপকি মেরে আসি, টেঁটিয়া গিড়ি করছে।
আরে থাম থাম।
কে থামে, খিস্তির বহর আবার ধুপ ধাপ আওয়াজ।
কবিতার গলা পেলাম। ঝড়ঝড়ে বেশ্যা পট্টির খিস্তী, মুখ দিয়ে যেন খই ফুটছে। আমার চোখ মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে। ফোন বন্ধ করার উপায় নেই। মাথা নিচু করে বসে আছি।
কবিতার গলা না!
মিত্রা বললো।
আমি ঠোঁটের ওপর আঙুল তুলে বললাম চুপ।
সত্যি মাইরি অনিদাটা না গান্ধী আছ। এই জন্য অর্জুনভাই বলে সব সময় দাদার কথা শুনবি না। মাঝে মাঝে তোদের মতো কাজ করে দাদাকে বলবি ভুল হয়ে গেছে। সাত খুন মাপ।
হ্যালো।
হাফিজ।
হ্যাঁ বলো।
অনুজের পেছেনে কাকে লাগিয়েছে?
অভিমন্যু, ঝিনুক।
অনিমেষদা, বিধানদা চমকে আমার দিকে তাকাল।
আলতাফ কোথায়?
কলকাতায় বসে আছে।
অনাদিকে ফোনটা দে।
আমরা শুনবো।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। ব্যাপারটা এরকম আমরা শুধু একলা নয়।
শোন।
কে ফোন করেছে রে হাফিজ? কবিতার খ্যারখেরে গলা ভেসে এলো।
দাদা।
অনিদা!
হ্যাঁ।
আমাকে দে।
অনিদা। কবিতার গলা ভেসে এলো।
বল।
এ দুটোকে আর বাঁচিয়ে রেখ না। এরা তোমার সাগির, অবতার হবে না। ওই টুকু বাচ্চা ছেলের মা-মাসি রাখলে না। বেচারা চুপ করে দাঁড়িয়ে সব শুনে গেল। বড়োমাকে ফোন করে কি গালটাই না দিল সকালে।
তুই কখন গেছিস।
তুমি ফোন করতেই রাত থেকে উঠে চলে এসেছি। শোনো না।
বল।
ইকবাল দিয়েছে দুটোর দাঁত ভেঙে। কাঁচা দাঁত, রক্তে ভেসে যায়। মুখ ফুলে টোবলা। বরফ লাগাতে গেলাম, আন্টির জামাইটার কি চোপা গো। বলে কি আমাকে দেখে নেবে। দিয়েছি তলপেটে কোষে একটা লাথি। দ হয়ে পড়েছিল কিছুক্ষণ।
খানকির ছেলে…।
আঃ মুখ খারাপ করিস না।
কেনগো কাউকে শোনাচ্ছ নাকি!
মিত্রা-তনু নিঃশব্দে মুচকি হেসে উঠলো।
না। অনাদিকে দে।
অনিমেষদা ফোন করেছিল ধরিনি। পরে রূপায়ণদা, মাসি ফোন করেছিল, ধরিনি। ফোন বন্ধ করে রেখেছি। তুমি একটু বাঁচিও।
ঠিক আছে।
ধর রে খানকির ছেলে।
মাথাটা একবার ঝাঁকিয়ে নিলাম।
বিধানদা আমার মাথায় হাত দিল।
হ্যালো।
বল। অনাদির গলাটা ধরা ধরা।
গলার স্বর বেরচ্ছে না মনে হচ্ছে, এরি মধ্যে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছিস।
যা বলার বল।
এই খানকির ছেলে। অনিদা যা বলছে তার ঠিক ঠিক জবাব দিবি। তোর থেকেও বড়ো বাবা রাজনাথকে গিড়িয়ে দিয়েছি মনে রাখবি। অনিমেষদার পেছনে ছুড়ি। হিম্মত থাকে দাদার মতো সামনে থেকে দিবি। নিতে সুবিধে হবে। আজ তোদের মাগীর নেশা একবারে ছুটিয়ে দেব। কবিতা ফর ফর করে যাচ্ছে।
উঃ মা থামবে। ভিকির গলা পেলাম। আঙ্কেলের সঙ্গে কথা বলতে দাও।
থাম। কতটুকু জানিস অনিমেষদাকে। লোক দুটো পার্টির জন্য জান দিয়ে দিল, এরা মাগি নিয়ে ফুর্তি করে গেল। নোট কামানো। মুখে নুরো জেলে দেব। দাদা মেয়ে দু-টোকে পর্যন্ত বিদেশে পাঠিয়ে দিল যাতে কাজটা হয়। আর এরা ওই ঢ্যামনা মন্ত্রীটাকে ধরে হিস্সা খাওয়ার কল করেছে। সকালে ওই রকম ভালো মানুষ চিকনাদা, মীরচাচাকে পর্যন্ত গুলি খাইয়েছে এই ঢ্যামনা দু-টো। ভাগ্যিস নেপলা টিপটা পেয়েছিল। না হলে মরেই যেত।
চিকনাদাকে গুলি করেছে! ভিকির গলা।
তারপরেই বিকট আওয়াজ বাবাগো মাগো। বুঝলাম ভিকি শুরু করে দিয়েছে।
অনিদা। কবিতার গলা পেলাম।
বল।
তুমি এখন কথা বলতে পারবে না। আবার রক্তা রক্তি। একটু পরিষ্কার করি।
তিনজনে মিলে পিটছে না ভিকি একা।
ইকবাল, ভিকি।
ঘরের জানলা দরজা সব বন্ধ আছে।
ও সব নিয়ে তুমি ভেবো না। এলাকাটা আমার। পুলিশ ত্রিসিমানায় আসবে না।
ঠিক আছে থামা থামি হলে ফোন করিস।
মাসিকে একবার ফোন করবো।
কর।
লাইনটা কেটে গেল।
নিস্তব্ধ ঘরে শুধু নিঃশ্বাসের আওয়াজ।
অনিমেষদা, বিধানদা, অনুপদার চোখ আমার ওপর। অনুপদা আমার ঠিক অপজিটে তনুর পাশে গিয়ে বসেছে। রতনরা আমার পেছনে দাঁড়িয়ে।
কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রইলাম। মনে হচ্ছে গেমটা আমার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।
আমি ছুরকিকে ডায়াল করলাম। কিছুক্ষণ ফোনটা বাজার পর ধরলো।
অনিআকা আমি তুমার কথা রাখতি পারি লাই।
ছুড়কির গলাটা ভাড়ি ভাড়ি। কাঁদছে।
কাঁদছিস কেন?
চিকনা আকা, মিরদাদাইকে ওন্যে গুলি করছে।
ওরা বেঁচে আছে।
এবার ছুড়কির কান্নার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। ফোঁপাচ্ছে।
অনিমেষদাদাই মোর হাত থেকে ওই এসপিকে বাঁচাইতে পারবেনি। আমি সব রেডি করচি আজই মারি দিব।
কি পাগলামো করছিস। ধমকে উঠলাম।
ওর লোক গুলি চালাইছে। সব সাদা পোষাক পরছিল।
চমকে তাকালাম এসপির দিকে। দু-জনের মুখ থম থমে।
তুই কোথাও ভুল করছিস।
না মুই ভুল করতিছিনি, আমি নিজে চা দোকানে মেসিন লিয়ে বুইসে ছিলি। আমি নিজে ওনকার দু-জনকে জখম করছি। ওন্যে গাড়ি লিয়ে ভাগিছে। সাদা টাটাসুমো ছিল।
গাড়ির নম্বর কতো।
ছুড়কি বললো।
একবার এসপির মুখের দিকে তাকালাম। অনিমেষদাও তাকিয়ে আছে।
তুমি মোকে যখন ম্যাসেজ করছিলো ত্যাখন ভোর রাত। মোরগ ডাকতিছিল। দারু আকাকে বললি তুমি পশ্চিম পাশের রাস্তায় লজর দাও মুই চক দেখিঠি। সাদা গাড়িটা ওই রাস্তানু মেন রোডে এসে দাঁড়াইল। পুলিশের গাড়িটা খড়গপুর রাস্তায় ছ্যালো। পূব দিকে মুখ করে। সেউটাতে তিনজন ছ্যালো। সুমোতে পাঁচজন ছ্যালো। পুলিসের গাড়িটা মেন রোডনু আইসা খড়গপুর রাস্তায় দাঁইড়েছ্যাল। সুমোটা খড়গপুর রাস্তা নু আইসা মেনরোডে দাঁইড়েছ্যাল।
চিকনা আকারা গিধনী পাইরতেই এন্যে সিগন্যাল দিল। পুলিশের গাড়িনু অন্যে মেসিন লিয়ে লামতেই দারু আকা পজিসন লেয়, অন্যে ধরি ফ্যালে মোন্যে ঘেরি লিছি। ত্যাখন চিকনা আকারা চক ছাড়ি যায়ঠে।
মুই তখন চায়ের দোকান নু বারাইছি। সুমো নু দু-জন প্রথম গুলি চালাইতেই আমি ঝাড়ি দিই। মোকে দেইখ্যা লইখ্যা, ভলি চালাইতে শুরু করি দেয়। বেগতিক দেইখ্যা অন্যে পলায়ে যায়। গাড়ির পিছনের কাঁচ বডিতে কিছু লাই। একটার পা একটার হাত বাদ দিতি হবে। আমি ঝাঁঝি দিছি।
ছুড়কি হাঁপাচ্ছে।
শালা এসপি ত্যাখন আসছিল রোয়াবি মারছিল, ত্যাখনি মারি দিতি দারুআকা কইলো অনিদা না কইলে কিছু কইরতে যাসনি।
গাড়িটার খোঁজ নিয়েছিলি।
সেঠিনু সইটকে আসছি। খোঁজ লিতে পারি লাই।
চিকনাদের কে নিয়ে এল।
ত্যাখন দেখিলাই। তানকাকে মারি দিয়ে গাড়ি সমেত জালি দিছি।
দারু কোথায়?
চকের পাশে রইছে।
ছুড়কি চুপ, কান্নার আওয়াজ।
চিকনা আকা কথা কইতিছে?
হ্যাঁ, তোর বাসু আকার সঙ্গে কথা বলেছে।
তুই এক কাজ কর।
বইলো
এলাকার প্রত্যেকটা নার্সিংহোমে ঢুঁ মার। যেখানে ওই দু-টোকে দেখবি ঝেড়ে দিবি।
একটা খপর পাইছি।
কি?
ভীমপুর নার্সিংহোমে পুলিশ পাহাড়া দিছে।
খোঁজ নে। পেলে আমাকে জানা।
আইচ্ছা।
বাবা কিছু জেনেছে?
তুমার ওপর রাগ কইরেছে। ওখানে ভিকুআকা কাদের লিয়ে গেইছে। ত্যাখন সব জানিছে।
ঠিক আছে খবর নিয়ে আমাকে জানা।
অনিআকা আমার একটুস ভুলের জন্য চিকনা আকার গুলি লাইগলো।
ঠিক আছে, কাঁদবি না।
ফোনটা কেটে দিলাম।
অনিমেষদার মুখের দিকে তাকালাম।
কিছু বুঝলে। এদের ধরে আনতে বলেছে। এরা অতি উৎসাহে বেঁধে আনতে গেছে।
এসপির দিকে তাকালাম।
সকালে আপনি আমাকে জিজ্ঞাসা করতে এসেছিলেন। বলেছিলেন ছুড়কিকে এ্যারেস্ট করেছেন। কোথায় রেখেছেন একটু বলতে পারেন?
এসপি মাথা নিচু করে বসে আছে।
বেঙ্গলে আপনি প্রটেকসন পাবেন, আপনার নিজের স্টেটে কি হবে?
এসপি একটি কথাও বলছে না।
অনুজবাবু আপনাকে বাঁচাবেন। এখন আপনি অনুজবাবুকে ফোন করুন দেখবেন বলবে আপনাকে ঠিক চিনতে পারছি না। নিজের পিঠ বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। যে দুটো উনডেড হয়েছে ওরা কি পুলিসের লোক না চন্দ্রশেখরের?
এসপি চুপ।
টোটাল কজন ছিল?
সাতজন।
কটা বেঁচে আছে কটা মরে গেছে?
সবাই উনডেড দু-জনের অবস্থা সিরিয়াস।
সবাই কি ভীমপুর নার্সিংহোমে আছে?
হ্যাঁ।
খাতায় কলমে কি দেখাতেন এনকাউন্টারে ইনজিওর্ড?
এসপি চুপ।
ভীমপুর নার্সিংহোম কেন! অনাদি বলেছে?
দু-জনের কারুর মুখে কোনও কথা নেই।
চন্দ্রশেখর মরে গেছে না বেঁচে আছে।
মারা গেছে।
সঙ্গে যে দু-জন ছিল তারা কারা?
এসপি মাথা নিচু করে বসে আছে।
ওরা বম্বে থেকে এসেছিল।
এসপি আমার মুখের দিকে তাকাল।
সুকান্তকে শো-কজের চিঠি ধরিয়েছেন কেন? আপনার কাজে বাধা দিয়েছে বলে।
এসপি চুপ আমার ফোনটা বেজে উঠলো। দেখলাম কবিতার নম্বর।
আপনারা বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করুণ। ডাকলে আবার আসবেন। এসপির দিকে তাকালাম।
দু-জনে একবারে সময় নষ্ট করলেন না। বেরিয়ে গেলেন।
হ্যাঁ বল।
নাও খাইয়ে দাইয়ে একটু চাঙ্গা করেছি।
কি করছে?
তোমার সঙ্গে কথা বলার জন্য ছোঁক ছোঁক করছে।
কেন?
মন্ত্রী ফোন করেছিল, হাত তুলে নিয়েছে। চাচা আপন প্রাণ বাঁচা।
পরে কথা বলছি। বাসন্তী ফিরে গেছে?
না। নিচে আছে।
মাসির সঙ্গে কথা বলেছিস?
বলেছি।
কিছু বলেছে?
না। সাবধানে কাজ করতে বলেছে।
বাসন্তীকে বল এই নম্বরে ফোন করতে। আমি না ফোন করা পর্যন্ত ওখানে রেখে দে।
আচ্ছা।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। আমি একটু আসছি।
না তোর কোথাও যাওয়া হবে না। মিত্রা চেঁচিয়ে উঠলো।
এই সব ছ্যাঁচরা লোকগুলোর সঙ্গে লড়তে পারবি? পারবি না। পারতে হলে তোকে অনেক নিচে নামতে হবে। দেখছিস তো কতদূর নামতে হয়েছে। আর একটু নেমে আসি।
যা করার তুই এ ঘরে বসে করবি। বাইরে যাবি না।
বাথরুমে যাব।
মিত্রা হেসে ফেললো।
ওই তো আছে চলে যা।
হবে না।
তোর জন্য এই বিল্ডিং-এ কোনও স্পেস্যাল বাথরুম নেই।
বলছে যখন বোস না। অনিমেষদা আমার হাতটা ধরলো।
তুই একা টেনসন নিচ্ছিস না। আমরা সকলে নিচ্ছি।
আমি চেয়ারে বসলাম।
তুই এখনও কনক্লুসনে আসিসনি। এখনও অনেক ফোন বাকি আছে।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম। চক চক করছে চোখটা।
খিদে পায়নি?
এই তো খাচ্ছি। দেখতে পাচ্ছিস না।
হাসলাম।
চিকনার সঙ্গে একটু দেখা করে আসি।
আমি, তনু সঙ্গে যাব।
কেন। হেসে ফেললাম।
বাসন্তী এখুনি ফোন করবে তোকে, কি বলিস শোনার ইচ্ছে আছে।
আমি ওই চেয়রটায় গিয়ে বসছি।
বসতে পারিস ম্যাসেজ করতে পারবি না।
ঘরের সকলে হেসে ফেললো।
বিধানদা হাসতে হাসতে বললো, তোকে ও খুব চিনে ফেলেছে।
আমার ফোনটা বেজে উঠলো। দেখলাম অর্ক।
কে ফোন করছে রতন।
বুঝতে পারছি না।
এই শোনাবি। না হলে ফোনটা এখুনি হাত থেকে নিয়ে নেব।
বল অর্ক।
খেল জমিয়ে দিয়েছি।
ফাইল পৌঁছে দিয়েছিস?
হ্যাঁ। প্রবীরদা কি খুশি গো। বললো প্লিজ অর্ক এখন নিউজ করিস না। পার্টির একদম বদনাম হয়ে যাবে। অনিমেষদা, বিধানদার সব পরিশ্রম বৃথা হয়ে যাবে।
আমাদের যা খরচ হয়েছে সেই নোটটা চেয়েছিস?
ধ্যুস ভাইঝি ফিরে আসুক ভাইঝিকে দিয়ে চাওয়াব।
অনিমেষদা সকাল থেকে তোকে অনেকবার ফোন করেছিল।
আমি এখন চিফ মিনিস্টার।
অরিত্র কোথায়?
কাজ শেষ করতে পারেনি।
আমি আধা ঘণ্টা পর ফোন করছি।
চিকনাদা কেমন আছে?
এখনও দেখিনি।
ছুড়কিকে ফোন করেছিলে?
হ্যাঁ।
ওখান থেকেই খবর পেলাম লাইন ওপেন হয়েছে।
পরে কথা বলছি।
আচ্ছা।
অনুপ আমার ফোন থেকে প্রবীরকে লাইনটা ধরে আমাকে দাও। বিধানদা বললো।
অনিমেষদা হাসছে।
তুমি বড়ো দুর্বল হয়ে পড়ছো, এখন দুর্বলতা দেখালে চলবে না।
আমরা শুনবো না। মিত্রা বিধানদার দিকে তাকাল।
সবটা শুনিস না। এখানে বসেই কথা বলবো শুনে নে।
অনুপদা প্রবীরদার সঙ্গে কথা বললো।
আর বল….না তোকে আর বলতে হবে না। তুই বিধানদার সঙ্গে কথা বল।
অনুপদা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
তোকে আর শুনতে হবে না। তুই তো সব জানিষ। কি অর্ডার হয় শোন।
আমার মোবাইলটা ঢং ঢং করে উঠলো।
যাঃ। মিত্রা বলে উঠলো।
কিরে! কি হলো! বিধানদা বললো।
তুমি কথা বলে নাও পরে বলছি।
মিত্রা আমার দিকে কট কট করে তাকিয়ে আছে।
আমি হাসলাম।
হ্যাঁ প্রবীর বলো….না আর দেরি কোরো না, ওকে আটকানর জন্য তোমার এগুলো প্রয়োজন ছিল….তাই….তাহলে সুকান্তকে এখন দায়িত্ব দাও….না প্রশাসনিক ভাবে আমি অনুজের সঙ্গে কথা বলবো না। ওটা তোমার দায়িত্ব। আমি রাতে ফিরে যাব কাল ওকে পার্টি অফিসে ডেকে পাঠাব।….তুমি বললে এদেরও ডাকতে পারি। এখানে যা সব শুনলাম…. দেরি কোরো না।….আচ্ছা।….কাকে কি বলবো বলো ওপরের দিকে থুতু ফেললে নিজের গায়ে পড়বে….ওই হলো আর কি, তুমি চেষ্টা করো আমরাও করি….হ্যাঁ এবারেও ইজ্জতটা বাঁচবে।
বিধানদা ফোনটা বন্ধ করে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।
মিত্রা নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে এসেছে।
তোর ফোনটা দেখি।
কেন।
কি ম্যাসেজ এলো দেখবো।
ডিলিট করে দিয়েছি।
তুই এখনো পরিসনি।
অনিমেষদা আমাদের দু-জনের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
তুমি জান না। আমাদের কথা বলার ফাঁকেই ও ম্যাসেজ করেছে। তার রিপ্লাই এলো। আমি ওর মোবাইলের প্রতিটা শব্দ মুখস্থ করে রেখেছি।
মিত্রা জোড় করে আমার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে নিল। টিপে দেখার পর আমার দিকে তাকাল।
কোন সিম থেকে করেছিস।
ম্যাসেজ করিনি, বিশ্বাস কর।
এতো ঘটনার পরও তোকে বিশ্বাস করি কি করে।
আমি মিত্রার দিকে তাকিয়ে আছি।
প্লিজ তুই আর কোনও ঘটনা ঘটাস না। আর পারছি না।
মিত্রার গলাটা ধরে এলো। চোখ চিক চিক করছে।
আমি রাগের চোটে ওকে ম্যাসেজটা ওপেন করে ওর হাতে দিলাম।
মোবাইলটা নিয়ে ও একবার দেখে অনিমেষদার মুখের সামনে তুলে ধরলো।
দেখতে পাচ্ছ সিমটা কোথাকার। কাকে করেছে।
সব কল ডাইভার্ট হয়ে আসছে। তোমরা ধরবে কি করে ওকে। সেই জন্য সকাল থেকে ওর ফোন খোলা আছে একটাও ফোন আসেনি। আমি তিনবার ওর নম্বরে ফোন করেছি, তনু দু-বার। স্যুইচ অফ। ও কিন্তু দিব্যি ফোন করে যাচ্ছে।
দেখো বাসন্তীকে ও ম্যাসেজ করেছে বাসন্তী উত্তর দিয়েছে, কাজ শুরু করে দিচ্ছে। তুমি বাসন্তীকে ফোন করো, দেখবে স্যুইচ অফ।
মিত্রা আমার হাতে ফোনটা দিয়ে নিজের জায়গায় গিয়ে বসলো।
প্রবীরদার সঙ্গে ওর যে রাতে কথা হয়েছ তোমায় কিছু বললো। মিত্রা বিধানদার দিকে তাকাল।
না তো!
তোমরা কি প্রবীরদাকে বাঁচাবে, তার আগে ও সব বেঁধে রেখেছে।
এখনও অরিত্রের সঙ্গে কথা হয়নি। মারাত্মক ফাইলটা সে নিয়ে ঘুরছে।
অর্কর ফাইলে যদি কাজ না হয়। অরিত্রর ফাইলটা প্রবীরদার হাতে পৌঁছবে। তাতে যদি কাজ না হয় আজ রাতেই অনুজ মরে যাবে। এবার তোমরা যা হয় করো।
আর এও বলে রাখছি, মৃত্যুটা খুন জখম নয় ব্যানার্জীর মতো মৃত্যু হবে। প্রমাণ লোপাট।
ওই জন্য বাসন্তী কাজে লেগে গেছে!
শুনলে তো ছুড়কির কথা। চিকনার গায়ে একটা গুলিও লাগতো না। স্রেফ ছুড়কির মুহূর্তের ভুল। তার মধ্যেই সবকটা জখম হয়েছে। দু-টো মারাত্মক। রেকর্ড বলছে শুধুমাত্র তিনজন মারা গেছে।
আর চিকনার গায়ে গুলি না লাগলে এতো ঘটনা ঘটতো না। স্মুথলি ও কাজটা করে বেরিয়ে যেত, তোমরা কেউ ধরতেই পারতে না কি ঘটনা পেছন থেকে ঘটে গেল। আমরাও ড্যাঙ ড্যাঙ করে ভালোপাহাড় থেকে ঘুরে ওর দেশের বাড়ি হয়ে কলকাতা চলে যেতাম।
সুকান্তকে খুঁজে পাচ্ছ না। ও জানলো কি করে সুকান্তকে শো কজ করা হয়েছে।
তারমানে সুকান্ত ওকে বলেছে। ও বলেছে তুই ছুটিতে যা তার মধ্যে আমি সব বেঁধে ফেলছি।
ওকে একটা কাজের দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছে। সুকান্ত গোটা ঘটনাটা জানে। এই এসপির সমস্ত খুঁটি নাটি সেই-ই সাপ্লাই করেছে ওকে।
তুমি যে তিনজনকে সকালে ওর পেছনে গুঁজে দিলে তুমি খোঁজ নিয়ে দেখেছো তারা কোথাকার লোক। মিত্রা অনিমেষদার দিকে তাকাল।
প্রবীরকে বলেছিলাম প্রবীর পাঠিয়েছে।
ওরা তিনজন ওর পরিচিত। এখানে আসার পর তাদের পাত্তা পেয়েছো।
না! অনুপদা বললো।
চাঁদ, চিনাকে জিজ্ঞাসা করো। এতটা পথ এসেছে কি কথা হয়েছে।
চুপ করে বসেছিল। বহুবার ম্যাসেজে কথা বলেছে। চাঁদ বললো।
ধাবাতে তিনজনে শুধু কাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছে তাই তো।
হ্যাঁ।
তোমরা যেমন খবর পেলে বাসুর কাছ থেকে, ওরাও খবর পেল কারুর কাছ থেকে। কে দিল?
সারাটা রাস্তা ঘুমবি বলে জালাচ্ছিল তাই না। মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে উঠলো।
অনুপদা হেসে ফেললো।
হেসো না অনুপদা নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলেছি। ও ঘুমতো না।
স্রেফ ঘুমোবার ভান করে পরে থাকতো। তোমরা ভাবতে ও ঘুমিয়ে পরেছে এই ব্যাপারটা নিয়ে তোমরা আলোচনা করতে। ও সব শুনতো। এখন ওর তাস রতন, আবিদ নয় ভিকি, খনা।
আচ্ছা তোমরা কখনও চিন্তা করেছো যে মেয়ে দু-টোর প্রতি ও সবচেয়ে বেশি দুর্বল একজন মামা, একজন বাবা বলতে অজ্ঞান তারা কেউ সারাদিনে একটাও ফোন করেছে!
অনাদি নাকি ছেলেমেয়েদের ম্যাসেজ করেছে, শুভকে তুলে নিয়ে এসেছি দেখ কেমন মজা।
তাই তো বললো বড়োমা?
ঘণ্টা, পক্কের উত্তর মামা জানে তো? বোচনের উত্তর থামো তো?
সুন্দর। পিকচারেই নেই। হিডিন ফাইল। কোড নম্বর দিয়ে তোমাকে খুলতে হবে।
অনিমেষদা হেসে ফেললো।
তোমরা হাসছো, আমার গা রি রি করছে।
তুমি শুধু ওদের মনের জোরটা লক্ষ্য করো। নো রেসপন্স। আমাকে পর্যন্ত একটা ফোন করে বলেনি, মা তুমি প্লিজ বাবাকে একটু বলো এই ঘটনা ঘটেছে।
শ্যামকে ফোন করো শ্যাম কিছু জানে না। ছেলেকে কাজের দায়িত্ব দিয়েছে বাপ জানবে কেন?
সবাইকে মন্ত্র দিয়েছে, যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করবি সেই মাটি পর্যন্ত যেন জানতে না পারে তুই কি করছিস। অনিবাবার মন্ত্র।
আমি হেসে ফেললাম।
হাসিস না। গা জলে যায়। মিত্রা অনিমেষদার দিকে তাকাল।
প্রবীরদাকে চেপে ধরো বলবে কিছু জানি না। আপনি যখন বলছেন খোঁজ খবর নিচ্ছি। অফ দ্যা ট্র্যাক বলবে মন্ত্রগুপ্তির শপথ নিয়েছি সব বলা যায় নাকি।
মিত্রা বিধানদার দিকে তাকাল। অনিমেষদা, অনুপদা মিত্রার মুখের দিকে তাকিয়ে।
আন্টি যেদিন এলো তারপর দিন রাতে যে প্রোগ্রাম হলো, সেদিন ও একা একা ছিল। তোমরা বলবে ও তোমাদের চোখের সামনে সব সময় ছিল। অবশ্যই ছিল। নিজের কাজ করেছে। সাগর সেদিন আমাদের বাড়ি থেকে অনাদির ওখানে গেছিল। তোমরা জানতে?
আমি মাথা নিচু করে ছিলাম।
আমার ওপর যতো রাগ অভিমান সব এই মুহূর্তে ও উগরে দিচ্ছে।
কোনও কিছুর বাঁধ মানছে না।
রতনরা কখনও মিত্রার মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ কুঁচকেছে। কখনও হাসতে গিয়ে মাথা নিচু করে নিয়েছে। নীপা প্রথমে আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর ধীরে ধীরে মিত্রাদির পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
কখনও কখনও কেউ ওর কথায় মুচকি হেসেছে। কখনও ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করেছে ও কতটা ঠিক কথা বলছে। এর মধ্যে বাস্তব কতটা।
ভাবছো মিত্রা পাগলির মতো কি সব বকে যাচ্ছে?
একটাও মিথ্যে কথা বলছি না।
কলেজ লাইফ থেকে ওকে দেখছি। ওর সঙ্গে মিশছি।
কলেজে কোনওদিন পার্টি করেনি। ক্লাস ক্যাম্পেনিং করেনি। এমনকি স্টুডেন্টস ইউনিয়নে পর্যন্ত কোনওদিন আড্ডা মারতে যেতে দেখিনি। তবু কলেজের জিএস ওর পেছন পেছন ঘুরতো। বিরোধী ইউনিয়নের ছেলেগুলো ওর সঙ্গে ফুস ফুস গুজ গুজ করতো। প্রথমে ভাবতাম ও আমার থেকে দু-বছর আগে কলেজে ভর্তি হয়েছে। তাই সকলের সঙ্গে ওর একটা ভালো সম্পর্ক আছে। তাছাড়া ভালো ছেলে বলে কথা। টুয়েলভে আমদের কলেজে ও ফার্স্ট হয়েছে। আর্টস গ্রুপে বোর্ডে সেকেন্ড পজিসন করেছে।
পরে খোঁজ খবর নিয়ে জানলাম বিরোধী ছেলেরা যে ফ্রি-স্টুডেন্টসিপের ফর্ম জমা দিত তা এরা করতো না। ও সেগুলো জিএসকে বলে করিয়ে দিতো। বিনিময়ে এরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে এদের কাজের কোনও বিরোধিতা করতো না। কিছু সমস্যা হলে ড. রায়কে ধরে প্রিন্সিপ্যালের সঙ্গে বসে সেটা মেটাতো। আমরা যে কয় বছর কলেজে ছিলাম, বিশ্বাস করবে না সেই ভাবে কোনও ঝামেলা হয়নি। কখনও কখনও যদি হতো, সেটা বেশি দূর পর্যন্ত গড়াত না মিট মাট হয়ে যেত। ওকে বলতাম কিরে তুই যে বললি আর হবে না। তখন আমাকে বলতো, ওটা কোলেটরেল ড্যামেজ। ওয়েস্টেজ সম্পত্তি নিয়ে মারামারি।
পার্টিতে আবার মিট মাট হয় নাকি। মারামারি রক্তা রক্তি না হলে পার্টি কিসের। কোন যাদু মন্ত্র বলে ও ওই কয়েকটা বছর তা বন্ধ রেখেছিল? আমি যদি একরোখা হয়ে জিজ্ঞাসা করতাম ব্যাপারটা কিরে।
বলতো তুই কি ক্লাস রিপ্রেজেন্টিটিভ হবি। তাহলে জেনে লাভ। ও হ্যাঁ তখন কিন্তু ও মেডিকেলে যাতায়াত করে। কারুর অসুবিধে হলে কনিষ্কদের দিয়ে ভর্তি করাতো। ফ্রি ট্রিটমেন্ট। এই কারণে কলেজ ক্যান্টিনের ছেলেগুলো পর্যন্ত ওর নেওটা ছিল।
পরে বুঝলাম খবর সাপ্লাই হয় ওইখান থেকে।
তোকে কোনওদিন নিয়ে যায়নি? বিধানদা বললো।
জানালে তো। আমি তো এর তার মুখ থেকে শুনতাম।
আজ প্রবীরদা ওর কথা শুনছে। অনুজবাবুও শুনতে বাধ্য না হলে ও বাধ্য করাবে। সেদিন ইসিকে বলেছে। যে মৃত্যুভয় করে বুঝবি তার কোথাও না কোথাও দুর্বলতা আছে।
অনেক বক বক করলি খিদে পাচ্ছে না? আমি বললাম।
কেন গোপন কথা ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। মিত্রা ঝগরুটে মেয়ের মতো বলে উঠলো।
কনিষ্ক, বটা দরজা ঠেলে ভেতরে এলো।
এই আর একজন শিখণ্ডি। মিত্রা কনিষ্ককে দেখে চেঁচিয়ে উঠলো।
জিজ্ঞাসা করো, বলবে কিচ্ছু জানি না। আরে বাবা অনি কতটুকু পাত্তা দেয় আমাদের। তোমাকে যতটা দেয় আমাদের ততটাও দেয় না। কানাঘুষ যতটুকু জানতে পারি সেটুকু।
কনিষ্ক আমার মুখের দিকে তাকিয়ে একবার হাসলো। অনিমেষদার মুখের দিকে তাকাল। মিত্রা যে ওকে কেন্দ্র করে কিছু বললো সেটা বুঝতেই দিল না।
এদিকে সব ঠিক আছে। আমরা এবার রওনা হতে পারি। কনিষ্ক অনিমেষদার মুখের দিকে তাকাল।
কি বুঝলে? অনিমেষদা বললো।
চিকনা, মীরচাচা বাড়ি চলে যাক। দিন সাতেকের ধাক্কা। তারপর স্বাভাবিক হয়ে যাবে। ওষুধ দিয়ে দিয়েছি। বাসুকে বলেছি পারলে তোদের ওখানে যে ডাক্তার আছে প্রত্যেকদিন একবার তাকে দিয়ে ড্রেসিংটা করিয়ে নিতে। না হলে এটলিস্ট একদিন অন্তর একদিন যেন ড্রেসিংটা হয়।
গুলি কি ভেতরে ছিল।
না। মাংস খুবলে গেছিল, শেলাই হয়েছে।
তোমরা কথা বলো, আমি একটু অপরজিটের কেবিনে আছি।
মিত্রা আমার মুখের দিকে তাকাল।
তুই যেতে পারিস, অসুবিধে নেই। অনিমেষদা বললো।
তবু মিত্রা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
হেসে ঘর থেক বেরিয়ে এলাম।
কনিষ্ক, বটা, রতনরাও আমার পেছন পেছন বেরিয়ে এলো।
নার্সিংহোমের গেটের কাছে আসতেই দেখলাম বেশ বেলা হয়েছে। অপরজিটের ফুটপাথে বাসু, পাঁচু, পচা, ভানু দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখে এগিয়ে আসতে চাইল। আমি হাত দেখিয়ে থামতে বললাম। এসপি কাছেই দাঁড়িয়েছিল। এগিয়ে এলো।
আপনি কি কোথাও যাবেন?
না। ওই কেবিনে গিয়ে একটু বসবো।
ওই দিকে একটা নতুন রেস্টুরেন্ট তৈরি হয়েছে। এ.সি, বেশ ভালো।
না থাক। আপনি ওখানে অপেক্ষা করুণ, অনিমেষদা হয়তো আপনাকে ডাকতে পারে।
ভদ্রলোক আমার পাশে পাশে রাস্তার এপার পর্যন্ত এলো। থমকে দাঁড়িয়ে পরলো।
ভানু এগিয়ে এসেছে। সামনে এসে দাঁড়াল। চোখ ছল ছল করছে।
চিকনার সঙ্গে দেখা করেছিস?
করছি।
কথা বলছে?
হ।
আজ ছেড়ে দেবে। তোর গাড়ি নিয়ে এসেছিস?
হ।
রতন একটা কর্নারের টেবিল ফাঁকা আছে কিনা দেখ। না হলে একটু পরে ভেতরে যাব।
কনিষ্ককে বললাম, একটা সিগারেট দে।
পাঁচু, পচার মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম মন খারাপ করিস না। এর থেকেও খারপ সময় তোদের গেছে।
রতন ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো।
ভেতরে এসো, খালি আছে।
আমি বাসুর দিকে তাকিয়ে বললাম আয়।
কনিষ্কর দেওয়া সিগারেটটা ধরিয়েছি। দেখলাম ভেতরে খুব একটা ভিড় নেই বেশ ফাঁকা ফাঁকা। যারা বসে আছে সকলে কেমনভাবে যেন তাকিয়ে রয়েছে আমাদের দিকে।
কনিষ্ক তোরা এই পাশে বোস আমি একটু ওই কর্নারের টেবিলে একলা বসবো।
কনিষ্ক হাসলো। আর কি বাকি রেখেছিস?
গেমটা আজই শেষ করতে হবে। ঝুলিয়ে রাখা চলবে না।
এখনও বাকি আছে!
একটু।
কনিষ্করা একটা টেবিল ছেড়ে সকলে বসলো। চোখ আমার দিকে।
আমরা তোমার পাশে বসি। চিনা বললো।
পরে। দেখলাম ঠিক আগের টেবিলটাতেই ওরা বসলো।
চেয়ারে বসেই মোবাইলটা হাতে নিলাম। সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
ডায়াল করেই কানে দিলাম। আস্তে করে বললাম।
বল অরিত্র খবর কি?
অরিত্র হো হো করে হেসে উঠলো।
হাসছিস কেন?
প্রথম ফাইলেই পুরো প্যান্ট হলুদ। একবারে অনুগতো সৈনিক। ফোন করতেই বাবু অফিসে চলে এসেছে। প্রবীরদাকে বলেছি প্রয়োজনে ফোন করো নেক্সট ফাইল পাঠাব।
ভাল করেছিস।
নিউজটা কি করবো?
ছবি কে তুলেছে?
সায়ন্তন।
স্টিল না মুভি?
দুটোই।
মুভিটা গুছিয়ে কাছে রাখ। থোবরগুলো দেখতে হবে, চিনি কিনা। স্টিল ছবি বাসুর নামে ছাপবি।
কেনো গো। কোনও নতুন ছক!
আছে, পরে বলবো।
অর্কর সঙ্গে কথা বলেছিস?
হ্যাঁ।
কি বলছে?
ওর পার্টের কাজ স্মুথলি চলছে।
বউকে কিছু বলিসনি?
এতো কাঁচা এখন আর নেই বুঝলে, কাল রাতে ফোনের আওয়াজ শুনে উঠে বসলো। তোমার সাথে কথা বলার পর বললো, অনিদা ফোন করেছিল, এখন বেরবে, এই তো?
আমার জন্য তোদেরও অনেক হেপা পোয়াতে হচ্ছে।
এই শুরু করে দিলে।
থাক, পরে কথা বলবো। কাজগুলো সারি।
আলতাফ ভাই ফোন করেছিল।
কেন!
তুমি কোন ইনফর্মেসন পাঠিয়েছ কিনা।
আবার ফোন করলে বলবি আমি পরে ফোন করছি।
আচ্ছা।
লাইনটা কেটে দিয়ে একবার ওদের দিকে তাকালাম। এখান থেকে কিছু শুনতে পাচ্ছে না ঠিক। তবে কানটা খাঁড়া করে রেখেছে। যদি শোনা যায়। আবার ডায়াল করে কানে দিলাম।
অর্ক।
বলো।
কাজ হয়েছে?
হ্যাঁ। বাবু এখন প্রবীরদার ঘরে ঢুকেছেন।
সাঙ্গ-পাঙ্গ।
দু-টোকে দেখলাম। এসপির চমচেটা রয়েছে।
কি নামরে।
মনীশকুমার।
ওই হারামীটা সকালে নেতৃত্ব দিয়েছিল?
হ্যাঁ।
তুই কোথায়?
প্রেস লবিতে বসে আছি।
খবরটা জানাজানি হয়েছে নাকি?
না হওয়ার কি আছে।
অরিত্র কোথায়?
অফিসে।
কনিষ্ক আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে।
এতো চেঁচামিচি কিসের গো?
আমি নার্সিংহোমের সামনের কেবিনে বসে আছি।
কেউ নেই তমার সঙ্গে!
সবাইকে সামনের টেবিলে বসিয়েছি।
কাছাকাছি?
না একটা টেবিল ছেড়ে বসিয়েছি।
তাই বলো।
তুই একবার বাসন্তীকে ফোন কর। ওকে একটা কাজের দায়িত্ব দিয়েছি। ফলো আপ কর। রাতে একটু দেরি করে কাগজ বার করতে বলবি সন্দীপকে।
নতুন নিউজ।
হ্যাঁ।
ঠিক আছে। পায়ের কাঁটাটা এবার উপরে ফেলো।
তাইই ভেবেছি। খুব জরুরি না হলে ফোন করবি না। আমি করবো।
আচ্ছা।
একটা ছেলে এসে মিষ্টির প্লেট রেখে গেল। আমাকে একবার ড্যাব ড্যাব করে দেখল।
ঢক ঢক করে আগে জলের গ্লাসটা শেষ করলাম। তারপর ঝট পট মিষ্টিগুলো খেয়ে নিলাম। রতনকে বললাম চা-টা একটু তাড়াতাড়ি দিতে বল।
রতন আমার মুখের দিকে একবার তাকাল।
বসে বসে কয়েকটা ম্যাসেজ করলাম। উত্তরও পেলাম। পরে বুঝলাম কাজ এগোচ্ছে।
চা এলো, খেতে খেতে ম্যাসেজ পর্ব শেষ করলাম।
কিরে এবার যাওয়া যাবে না গন্ডী টেনে রাখবি? বটা চেঁচিয়ে উঠলো।
কোনও কথার উত্তর দিলাম না। উঠে দাঁড়ালাম। হন হন করে বাইরে বেরিয়ে এলাম।
আমার এরকম অবস্থা দেখে ওরা প্রথমে হকচকিয়ে গেল। তারপর রতন দৌড়তে দৌড়তে পেছন পেছন বেরিয়ে এলো।
কোথায় যাবে!
গাড়িটা কোথায় রেখেছিস?
ওই তো।
দেখলাম নার্সিংহোমের গেট থেকে একটু দূরে গাড়িটা দাঁড় করিয়ে রেখেছে। পেছন ফিরে তাকালাম দেখলাম আবিদ, চাঁদ, চিনা দাঁড়িয়ে। কনিষ্ক, বটারাও উঠে এসেছে।
আমি সিগারেটের দোকান থেকে এক প্যাকেট সিগারেট কিনলাম। একটা দেশলাই।
ওরা আমাকে দেখছে। চিনার দিকে তাকালাম। গাড়ির দরজা খোলা আছে?
না। লক করা।
খুলে দে। তোরা নার্সিংহোমের ভেতরে চলে যা।
ওরা আমার মুখের দিকে তাকাল, কথা বলার সাহস পেল না। আমি ধীর পায়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম। চিনা আমার পেছন পেছন এলো।
(আবার আগামীকাল)