জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১৭৩ নং কিস্তি
চারিদিকে একবার চোখ মেলে তাকালাম। রতনরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। ইসারায় কাছে আসতে বললাম।
দোকানের ভেতরে এসে বেঞ্চে বসলাম।
ভোলা মিষ্টির প্লেট নিয়ে এসে তনু, মিত্রা, নীপার হাতে দিল।
আমি ওর মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে।
আমার মিষ্টির প্লেটটা নিয়ে এসে সামনে দাঁড়ালো। ওর হাত থেকে প্লেটটা নিলাম। ভোলা আমার চোখে চোখ রাখতে পারলো না। আমার পায়ের কাছে বসে কোলে মাথা রেখে ঝড় ঝড় করে কেঁদে উঠলো।
স্বাভাবিক ভাবেই তনু, মিত্রা, নীপা অবাক হয়েগেছে।
রতনরা দোকানের বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল ভতরে এলো।
আমিও প্রথমটায় একটু অপ্রস্তুত হয়ে পরেছিলাম।
এক হাতে মিষ্টির প্লেটটা ধরে আর একটা হাত ভোলার মাথায় রাখলাম।
কাঁদছিস কেন বল?
তোমার জন্য বোকনার আত্মাটা আজ শান্তি পেল।
মিত্রারা সকলে অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। রতনরাও এই রকম অবস্থায় ভোলাকে দেখে খানিকটা অবাক হয়ে গেছে।
তোকে কে খবর দিল?
ছুড়কি ফোন করেছিল।
কাঁদিস না। অন্যায় করেছিল শাস্তি পেয়েছে। আরও অনেক আগে পাওয়া উচিত ছিল। পরিদা দেখে যেতে পারলে ভালো লাগতো।
মা তাই বলছিল।
পরিবেশটা হঠাৎ মূহূর্তের মধ্যে কেমন থম থমে হয়ে গেল। বাইরের চেঁচামিচি ছাড়া এখন আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না।
এবার ওঠ। ল্যাটা চুকে গেছে।
ভোলা আমার কোল থেকে মাথা তুলে কাঁধের গামছা দিয়ে চোখ মুছছে।
তোদের কাছে বোকনার কোনও ছবি আছে।
আমাদের কাছে নেই। দেবাদার কাছে আছে।
ঠিক আছে আমি চেয়ে নেব।
নীপা মনেহয় তনু মিত্রাকে ফিস ফিস করে কি বলছে।
আমি চামচ দিয়ে একটু একটু করে ভেঙে ছানার জিলিপি খেলাম।
একগ্লাস জল খেলাম।
ভোলা চা নিয়ে এসে সকলকে দিল। আমাকেও দিল।
তুমি বাড়িতে যাবে?
আজ যাব না। আমি হয়তো কাল সকালে চলে যাব। আগামী সপ্তাহে আসবো। আমার সঙ্গে অনেকে আসবে। একটু বেশি করে ছানার জিলিপি বানিয়ে রাখবি। তোকে আগে থেকে ফোন করে দেব।
ভোলা মাথা দোলাল।
মন খারাপ করিস না। যা নিজের কাজ কর।
আমি বসে বসে চা খাচ্ছিলাম। মিত্রারা সকলে চায়ের গ্লাস নিয়ে উঠে চলে গেল। রতনরাও দেখলাম পেছন পেছন উঠে গেল। মনে মনে হাসলাম।
ওরা উঠে যেতে বেশ কয়েকটা কম বয়সী ছেলে দোকানের ভেতরে এসে বসলো।
আমি পকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে ধরালাম।
আর একটু চা দেব। ভোলা বললো।
দে।
আমি আপন মনে সিগারেটে টান দিচ্ছি। ভোলা চা দিল, খেলাম।
এখানে বসে বসেই মিত্রাদের দিকে নজর রাখছি। নিশ্চই অনিমেষদাকে ফোন করেছে। তারপর দারুকে ফোন করেছে। ওদের হাব ভাব দেখে বুঝতে পারছি ওরা ঘটনাটা ঠিক মিলিয়ে উঠতে পারছে না।
তন্যে এঠি এসে বুইসলি কেন, ভাগ এঠিনু। ভোলা ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে ধমকে উঠলো।
সঞ্জুদা কইছে।
অনিদাকে এঠি কেউ কিছু করতে পারবেনি। যা এঠি নু। লোকটা টুকু শান্তিতে বুইসছে। তর সয়ঠেনি, না।
ছেলেগুলো শুর শুর করে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল।
ভোলা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
সকাল থেকে এখানে খুব টেনসন।
তা একটু আধটু হবে।
ওদের দলের লোক জন ঘর বাড়ি ছেড়ে সব চলেগেছে।
কেন!
ভয়ে।
এটা ঠিক নয়। ওরা তো কোনও দোষ করেনি।
সব কটা নম্বরি তুমি জানো না। যখন ঘরকে ঘর লুঠ করেছিল তখন মনে ছিল না।
সে তো অনেকদিন আগের ঘটনা, এখন তো আর করছে না।
যাদের ঘর লুঠ করেছিল তাদের রাগ তুমি থামাতে পারবে। মীরচাচা কি দোষ করেছে বলো। মুসলমান পাড়া খেপে লাল।
সব সময় খেপে গেলে চলে। ঠান্ডা মাথায় কাজ করতে হয়। খেপেগেলে কাজে ভুল হবে।
তুমি গিয়ে বোঝাবে। সব সেখানে রয়েছে। তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।
তোর এখান থেকে চিকনা কখন বেরিয়েছিল?
সাতটা নাগাদ।
তুই জানিস তার আগে ও কারুর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিল কিনা?
তোমার সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর, একজনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিল। কে ফোন করেছিল বুঝি নি। তবে বলেছিল, দাঁড়ান আমি ওই পথেই যাচ্ছি কথা বলে নেব।
ওদের সঙ্গে এমন কোনও ছেলেকে দেখেছিলি, যাদের তুই চিনিস না।
না। সেরকম কাউকে দেখিনি। আমি সবকটাকে চিনি।
আজ থেকে কয়েকদিন কান দিয়ে দেখবি। চোখ দিয়ে শুনবি। কি বললাম বুঝেছিস।
বুঝেছি।
সেরকম কিছু বুঝলে আমাকে একবার মিস কল মারবি।
আচ্ছা।
ছুড়কি আর কিছু বলেছে।
না।
সকালে যা ঘটেছে, আর ছুড়কি যা বলেছে, তাছাড়া কোনও নতুন খবর পেয়েছিস।
স্টেশন রোড থেকে কাকে তুলে নিয়ে গেছে। শুনলাম সকালের ঘটনায় সঙ্গে সে জড়িয়ে ছিল।
মণ্ডলের জামাই?
নির্বংশ করে দিয়েছে।
ঠিক আছে। উঠে দাঁড়ালাম।
তুমি এখন সোজা বাড়িতে যাবে?
হ্যাঁ।
চিকনাদাকে দেখেছো?
না।
মাথা নিচু করে ভোলার দোকান থেকে বেরিয়ে এলাম।
রতনরা তখনও গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে।
দেখলাম ডানপাশ থেকে বড়ো বড়ো দুটো কাঁচা শাক-সব্জিতে বোঝাই লড়ি ভেতরের রাস্তা থেকে ধুলো উড়িয়ে ফার্মের দিকে চলে গেল।
আমি ধীর পায়ে গাড়ির কাছে এলাম।
কটা বাজেরে?
দেড়টা। চাঁদ বললো।
মিত্রা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
চল এবার যাব।
চিকনাদের নিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিয়েছে। একটু অপেক্ষা করি। একসঙ্গে যাব। মিত্রা বললো।
ওরা ওদের মতো আসুক না।
আমি যে বললাম, অপেক্ষা করছি।
তাহলে তোরা আয়, আমি বরং এগিয়ে যাই।
তুই কার সঙ্গে যাবি!
এখানে অনেক ছেলে আছে। বললে পৌঁছে দেবে।
মিত্রা আমার মুখের দিকে তাকাল।
সত্যি তুই যাবি! একটু অপেক্ষা কর না।
সঞ্জু আমাদের গ্রামের কোন ছেলে থাকলে ডাকতো, একটু পৌঁছে দেবে।
ম্যাডাম এরকম ভাবে বলছে, একসঙ্গে গেলে ভালো হতো না?
সঞ্জুর কথায় হাসলাম।
ঠিক আছে তুই যা। আমরা পড়ে যাচ্ছি।
মিত্রা আমার মোবাইলটা দে।
মিত্রা আমার দিকে হতাশ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তনুও কেমন ভাবে যেন তাকিয়ে।
একটু থেকে গেলে কি অসুবিধে আছে। তনু বললো।
মিত্রার দিকে তাকালাম।
ঠিক আছে মোবাইলটা দে। আমি পরিদার দোকানে বসছি।
তুই তো সব কাজ শেষ করে দিয়েছিস। মোবাইল নিয়ে কি করবি?
চুপ করে থাকলাম।
মিত্রা নীপার কাঁধ থেকে ব্যাগটা নিয়ে মোবাইলটা বার করে আমার হাতে দিল।
ওরা সবাই আমার মুখের দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে।
আমি মোবাইলটা হাতে নিয়ে এক মুহূর্ত আর অপেক্ষা করলাম না। সোজা পরিদার দোকানে এসে বসলাম।
অনেকেই আছে। আমি আমার মতো দোকানের একটা কোনায় বসলাম।
মোবাইলটা অন করে পটাপট পাসওয়ার্ড দিয়ে চালু করলাম।
অনেকগুলো ম্যাসেজ এলো পর পর। প্রত্যেকটা পড়ে পড়ে দেখলাম। ঠিক ঠাক কাজ হয়েছে। প্রবীরদার একটা মিস কল দেখলাম। সুকান্ত দুটো ম্যাসেজ করেছে। যে কাজের দায়িত্ব দিয়েছি সেই কাজ করে দিয়েছে। অনিমেষদার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে।
দ্বিতীয় ম্যাসেজটায় সুকান্ত লিখেছে। তোমার কথা ঠিক। আমাকে প্রবীরদা এখন এসপির কাজ চালাতে বলেছে। এসপিকে ছুটিতে যেতে বলা হয়েছে। আমি রাতে তোমার সঙ্গে দেখা করবো।
আলতাফকে একটা ম্যাসেজ করলাম। এখন তোর সঙ্গে ফোনে কথা বলতে পারবো না। কোনও খবর থাকলে ম্যাসেজ করে পাঠা। মোবাইল অন করেছি।
ভোলার দিকে তাকিয়ে বললাম আমাকে একটু চা খাওয়া।
ভোলা মুচকি মুচকি হাসছে।
আমার কথা শুনে চায়ের জল বসালো।
মোবাইলটা কুঁ কুঁ করছে। বুঝলাম ম্যাসেজ ঢুকছে।
হ্যাঁ আলতাফ ম্যাসেজ করেছে। পর পর ম্যাসেজগুলো পড়লাম। এই পর্যন্ত সব ঠিক ঠাক আছে।
হাফিজ, ইকবালকে ও ফোন করেছিল। যা বলার বলে দিয়েছে।
ভোলা চা নিয়ে এলো। চায়ের গ্লাসটা ওর হাত থেকে নিয়ে ওর মুখের দিকে তাকলাম।
কিরে তখন হাসছিলি যে।
ম্যাডাম তোমাকে যেতে দিল না।
এক যাত্রায় পৃথক ফল ভালো হয় না।
ভোলা হেসে চলে গেল।
বাইরে একটা চাপা হই চই শুনে তাকালাম।
দেখলাম দূর থেকে একটা পুলিসের গাড়ি ছুটে আসছে। তার পেছনে তিনটে গাড়ি। একটায় অনিমেষদারা আছে। আর একটায় চিকনারা, তিন নম্বরটায় কারা আছে!
কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনটে গাড়ি এসে পড়লো। পুলিশের গাড়িতে দেখলাম অন্য লোক। দুটো গাড়ির লোকজন কারা থাকতে পারে জানতাম। তিননম্বর গাড়ি থেকে দেখলাম ইসলামভাই, ইকবালভাই, রূপায়ণদা নামলো। ওদের গাড়িগুলোকে ওখানে যারা রয়েছে তারা ঘিরে ধরেছে।
অনিমেষদা নিশ্চই মিত্রাকে আমার কথা জিজ্ঞাসা করছে। মিত্রা পরিদার দোকানের দিকে হাত দেখাচ্ছে। হাসাহাসি করছে।
আনিদা দুধ চা করবো না, র চা করবো।
আমি ভোলার দিকে তাকালাম।
যেমন অর্ডার হবে করবি। মিষ্টি আছে?
সে আর বলতে, এক হাঁড়ি সরিয়ে রেখেছি।
দেখলাম সকলেই এদিকে এগিয়ে আসছে। নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করছে।
চিকনাদের গাড়ির সামনে সঞ্জু, সুবীর দাঁড়িয়ে আছে।
ভোলা।
ভোলা আমার দিকে তাকাল।
চিকনাদের গাড়ির সামনে তোর ছেলেটাকে পাঠা। দেখ ওরা মিষ্টি খাবে নাকি। নামতে পারবে না মনে হয়।
সুবীরদা নিশ্চই আসবে।
দেখলাম যারা এতক্ষণ বসেছিল তারা সব আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে জায়গা খালি করে দিল। আরও তিনটে গাড়ি পর পর এলো। এতো ভিড় হলো এখান থেকে আর দেখা যাচ্ছে না।
মিত্রা তনু প্রথমে হাসতে হাসতে ঢুকলো। আমাকে একবার দেখে নিয়ে অনিমেষদাদের দিকে তাকালো।
দেখো কিরকম মটকা মেরে বসে আছে।
অনিমেষদারা সকলে একে একে মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকলো।
আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
দেখলাম বেশ কয়েকটা প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে এসে হাজির হয়েছে কয়েকজন।
ইসলাম আমরা বরং বাইরেটায় বসি। এখানে ভিড় করলে ওর কাজ করতে অসুবিধে হবে। অনিমেষদা বললো।
না না স্যার আপনারা বসুন না আমার কোনও অসুবিধে হবে না। ভোলা বললো।
আমি মুখ ঘুরিয়ে মুচকি মুচকি হাসছি।
তনু চোখ টিপে হাসছে।
ব্যাপারটা এরকম তোমার এবার হবে। শুধু আগে আগে পালিয়ে যাওয়া।
দাদা আপনি বিধানদা বরং বাইরে বসুন। আমরা বরং একটু অনির সাথে কথা বলি।
অনুপদা কথাটা বলে মুচকি হাসলো।
সকাল থেকে অনেক টেনসন নিল। রূপায়ণদা খ্যার খ্যার করে উঠলো।
ভোলা জিজ্ঞাসা করেছিস র-চা না দুধ-চা। আমি বললাম।
ইসলামভাই হাসছে। ভোলা জানে তোকে আর মনে করিয়ে দিতে হবে না।
ইসলামভাই হেসো না। দেখো আবার র আর দুধের কোনও ইনারমিনিং আছে কিনা। যেটা তুমি আমি জানি না। একমাত্র ভোলাই জানে। অনুপদা বললো।
ঠিক কথা, এটা তো ভেবে দেখিনি?
ইসলামভাই ভোলার দিকে তাকাল। কিরে ভোলা অনিদা কিসের হিন্টস দিল।
কিছু না। সব কথায় গেরো দিলে চলে।
অনুপ তোমরা বসো এখানে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করা যাবে না। অনিমেষদা বেরিয়ে গেল।
ইসলামভাই, ইকবালভাই দু-জনেই বেরিয়ে গেল।
অনুপদা, রূপায়ণদা আমার পাশে এসে বসলো।
আমার একটা বিশাল হাই উঠলো।
ওমনি আমাদের দেখে ঘুম পেয়ে গেল। অনুপদা বললো।
অনেকক্ষণ থেকে পাচ্ছে। মিত্রাকে বললাম, আমি চলে যাই তোরা পরে আয়, শুনলো না।
তাতে তোর কাজ বন্ধ নেই।
সে তো তার মতো হয়েই চলেছে।
অনুপদা, রূপায়ণদা মুচকি হাসলো।
ভোলা চায়ের গ্লাস নিয়ে এসে সামনে দাঁড়াল।
নাও চা খাও। এখান থেকেই কেটে পরবে না ভেতর পর্যন্ত যাবে?
আজ রাতটা থাকবো।
কি করবে থেকে?
কাজ আছে।
হ্যাজাতে পারবে না।
ও বাবা তুই তো দেখছি প্রথমেই ইঁট চাপা দিচ্ছিস।
সাহেবরা থাকবে, না চলে যাবে?
পরিবেশ পরিস্থিতির ওপর সেটা নির্ভর করবে।
পরিবেশ সব ঠিক আছে, তোমরাও চলে যাও। কষ্ট করে এতোটা এলে কেন?
গিয়ে বলতে পারছিস না।
সময় হোক বলে দেব।
ভোলা বাইরে চা দিয়ে এলো।
মিষ্টি দিলি না?
ম্যাডাম বললো হাঁড়িতে প্যাক করে দাও বাড়িতে গিয়ে সবাই খাবে।
পেছনের তিনটে এ্যাম্বাসাডারে কারা এলো অনুপদা।
এলাকার লোকজন আছে, নিরঞ্জনদা আছে।
এতো লোকের রান্না করবে কে?
তুই তো করবি না?
তা ঠিক।
তাহলে আর চিন্তা করে লাভ কি, তুই যে কাজটা করছিস সেটা মন দিয়ে কর।
প্রবীরদার একটা মিস কল দেখলাম একবার তোমার মোবাইল থেকে লাইনটা করে দাও তো।
তোর মোবাইলে মিস কল তুই তোর মোবাইল থেকে কর। আমার থেকে কেন?
বাবা, বেশ ট্যারা ট্যারা কথা বলছো দেখছি। মেঘ মনে হয় কেটে গেছে।
রূপায়ণদা, আমার অনুপদার কথায় মুচকি মুচকি হাসছে।
অনুপ তোমাদের চা খাওয়া হলো। অনিমেষদা বললো।
হ্যাঁ দাদা আর এক চুমুক।
বেলা গড়িয়ে গেছে, চলো। দিদিরা আবার অপেক্ষা করে বসে থাকবে।
আপনি উঠে পরলেই আমরা উঠে পরবো।
নিরঞ্জনবাবু বাদে ওদেরকে তাহলে চলে যেতে বলি।
বললে কি যাবে। সঙ্গে যেতে দিন। তারপর না হয় বলা যাবে।
তাই হোক।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
কিরে উঠে দাঁড়ালি। অনুপদা আমার মুখের দিকে তাকাল।
গাড়িতে গিয়ে বসি। তোমরা এসো।
অনুপদা হাসছে।
আমি পরিদার দোকান থেকে বেরিয়ে এলাম। ভানুর গাড়িটা দেখলাম।
আমাকে দেখতে পেয়ে ভিড়ের মধ্যে থেকে বাসু এগিয়ে এলো।
কিরে সব ঠিক আছে?
হ্যাঁ।
চিকনা বসে আছে না শুয়ে আছে?
বসে আছে।
আমি পায়ে পায়ে চিকনাদের গাড়ির দিকে এগিয়ে এলাম।
দূর থেকে দেখলাম দরজাটা খোলা রয়েছে। সামনে বেশ ভিড়।
কাছে যেতেই সকলে সরে দাঁড়াল। চিকনা হেলান দিয়ে বসে আছে। কাঁধ থেকে একটা ব্যাগের মধ্যে হাতটা ঝোলান। সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই চিকনা হেসে ফেললো।
খিস্তি দিস না। বাড়িতে গিয়ে যা বলার বলিস।
মীরচাচার দিকে তাকালাম।
কি করবো বল। কপালের গেড়ো। শালা যে মনকাকে মারবে বুঝতে পারিনি।
কোথায় লেগেছে?
বাঁ পায়ে আর বাঁ হাতে।
তার মানে বাঁদিক থেকে গুলি চালিয়েছিল?
চিকনা হাসছে।
কথা দিচ্ছি বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে দাঁড়িয়ে পরবো।
দাঁড়িয়ে পরেই ওদের সবকটাকে গুলি করে দিবি।
সে-তো কিছু বাকি রাখিসনি, গাঁ সমেত উজার করে দিয়েছিস।
বাবাঃ বেশ খবর টবর রেখেছিস দেখছি।
যা তুই গাড়িতে গিয়ে বোস। বাড়িতে গিয়ে কথা হবে।
হাঁটতে পারছিস?
লেংচে লেংচে।
মীরচাচা।
দু-জনেরি একই অবস্থা।
আজ থেকে সাতদিন দু-জনে আমার বাড়িতে থাকবি।
মীরচাচা হাসছে।
চাচী কোথায়?
বাড়িতে আছে তার সঙ্গে কথা কইছি।
ফকিররা কেমন আছে বাসু? বাসুর দিকে তাকালাম।
চার পাঁচদিন থাকবে। তারপর ছেড়ে দেবে।
এমনি ঠিক আছে?
হ্যাঁ।
কাকে রেখে এসেছিস?
চাচার আর এক জামাই আছে, গ্রামের চারজন আছে।
ওরা ফিরে আসবে না থাকবে?
আজকের দিনটা থাকবে।
ব্যবস্থা করে এসেছিস?
তিনজনের ঘরে একজন একজন করে থাকবে। বাকি দুজন রিসেপসনে শোবে।
ভয়ের কিছু নেই তো?
না।
আমি আমাদের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম। চাঁদ দাঁড়িয়ে ছিল।
আমাকে দেখে মুচকি মুচকি হাসছে।
হাসছিস কেন?
হাসি পাচ্ছে তাই।
নে গাড়ি স্টার্ট দে।
আমি ভেতরে উঠে বসলাম।
সবাই আসুক।
তুই স্টার্ট দিয়ে এগিয়ে চল দেখবি সকলে উঠে পরবে।
দাদাভাই এই গাড়িটা চালাবে বলেছে।
আমি গাড়ির দরজা বন্ধ করলাম। চাঁদ গাড়ি স্টার্ট দিল। গড়িয়ে গড়িয়ে পরিদার দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালো। তখনও অনিমেষদারা চেয়ারে বসে আছে। আমি জানলা দিয়ে মুখ বারিয়ে বললাম, তোমরা এসো তাহলে, আমি এগোচ্ছি।
অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে নির্মল হাসি হাসলো।
উঠে দাঁড়ালো। মিত্রারা দাঁড়িয়ে কথা বলছিল কাছে এলো।
বাবাঃ তোর যে খুব তাড়া দেখছি। মিত্রা বললো।
ওরা গেটের দরজা খুলতেই আমি মাঝের দিকে সরে এসে বসলাম।
তুই ওই সাইডে বোস। আমি তনু এদিকে বসবো।
দু-জনে দু-পাশে বসবি না।
না। কাজ হয়ে-গেছে।
তোরা তো সবাই ইনটেলেকচ্যুয়াল হয়ে গেছিস।
মিত্রা হাসছে।
সকাল থেকে মিত্রার এরকম হাসি দেখিনি।
গম্ভীর মুখের ছবি। মান অভিমানের কথাই বেশি শুনে এসেছি। এখন সকলকেই কম বেশি বেশ খুশী খুশী দেখাচ্ছে।
নিরঞ্জনদা আমার সঙ্গে একটিবারও কথা বলেনি। শুধু আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হেসেছে। ইকবালভাইও তথৈবচ।
সব গাড়িতে যে যার মতো উঠে বসলো। আমাদের গাড়ির ড্রাইভিংসিটে আবিদ বসলো। রতনকে এই গাড়িতে দেখলাম না। তার জায়গায় সামনের সিটে নীপার পাশে ইসলামভাইকে দেখলাম।
গাড়িতে ওঠার সময়েই ইসলামভাই একটা বিটকেল হাসি হসলো। আমি দেখেও না দেখার ভান করলাম। চাঁদ-চিনা দুজনেই যথারীতি পেছনে বসেছে।
গাড়ি চলতে শুরু করেছে। আঁকা বাঁকা পথে লাইন দিয়ে গাড়ি চলছে। আমি কথাই বলছি না। সবার প্রথমে ভানুর গাড়ি। ওটা মনে হয় পাঁচু চালাচ্ছে। গ্রামের ছেলেরাই ওতে বেশি রয়েছে। তারপর চিকনাদের গাড়ি। যেটা ভানু চালাচ্ছে। এই ভাবে শেষে আমাদের গাড়ি।
আমাদের গাড়ির ঠিক পিছনেই অনিমেষদাদের গাড়ি।
এখন মাঠ পুরো খাঁ খাঁ। কোথাও এতটুকু নীলের স্পর্শ নেই। ঝাঁ ঝাঁ রদ্দুর। এসি চলছে বলে বাইরের রোদের তাপ কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কোনও কোনও জমিতে ট্রাক্টর চলছে।
মামনি তোরা কখন জানতে পারলি। ইসলামভাই বললো।
ধাবাতে খাচ্ছিলাম। অনুপদা প্রথম জানতে পারে। অনিমেষদা ফোন করেছিল।
আমরা জানার পর জেনেছিস।
হ্যাঁ।
তখন তোর কিছু মনে হয়নি।
কালরাতে ও যখন ফোন করে সবার সঙ্গে কথা বলছিলো, এ রকম একটা আভাস পাচ্ছিলাম। কিন্তু কখন কোথায় ঘটনা ঘটবে কাকে মারবে ঠিক বুঝতে পারিনি। চিকনাকে গুলি করেছে শোনার পর প্রথমে খুব আপসেট হয়ে পরেছিলাম। তারপর ভাবলাম আগে ব্যাপারটা ভালোকরে জানি। তারপর ওকে ধরবো, কি বলে শুনবো। কিন্তু সে ঘটনা এখনও শোনা হয়নি।
বড়দি শুনেই কেঁদে ফেললো। তারপরই অনিমেষদাকে বললো, তুমি আগে তোমার লোককে পাঠাও অনিকে আটকাবার জন্য। ও জানলে একটা অনর্থ করে দেবে।
মিত্রা মুচকি হাসলো।
তুই বিশ্বাস কর মামনি, ব্যাপারটা শুনে আমরাও প্রথমে ঘাবড়ে গেছিলাম। বিশ্বাসই হচ্ছিল না। কি থেকে কি ঘটে গেল। কেনই বা চিকনাকে মারতে যাবে।
বিধানদা মাথায় হাত দিয়ে বসে, ডাক্তারবাবু কেমন থম মেরে গেছে। দাদা, মল্লিকদা চুপ।
ছোটদি চা নিয়ে এলো। অনিমেষদার দিকে তাকিয়ে বললো, দাদা আপনি এতো ভেবে কি করবেন। আপনি কি ভাবেন অনি এসব জানে না। সব জানে। চুপ চাপ আছে। বেঁচে যখন আছে তখন ভাববেন ওর প্রোটেকসন দেওয়া ছিল। না হলে মরে যেত।
দেখলাম বৌদি ছোটদির কথাটা সাপোর্ট করলো। এরপর অনিমেষদা খোঁজ খবর নিতেই আস্তে আস্তে পরিষ্কার হতে শুরু করলো। তখন তো এতো ডিটেলসে জানিনি। অনিমেষদা বললো, তুমি ইকবাল এখানে থাকো। আমি বিধানাবু যাই, দেখি কি হলো আবার।
প্রবীরদাকে ফোন করে অনিমেষদা সব বলতে, বললো, খবর পেয়ছি। এসপি, ডিএসপি ওখনে আছে। প্রোটেকসন দিতে বলেছি। অনুপের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে।
জানিস মামনি নিজেকে সেই সময় খুব হোপলেস মনে হচ্ছিল। যে দু-চারজনকে ফোন করলাম তারা শুধু বললো, আমাদের কাছে সব ব্ল্যাক আউট, কিচ্ছু জানি না।
তারপর নিজের মনকে বোঝালাম, আমি কি আমার টপ ফর্মে, এতো বুঝে-শুনে এতো গুছিয়ে কখনও কাজ করেছি। কাজ পেয়েছি, কাজ করেছি, টাকা পেয়েছি। তার অতীত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান চিন্তা ভাবনা করিনি। তার জন্য নিজেকে অনেক গুনাগার দিতে হয়েছে।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনির কাঁধে চেপে রক্ষা পেয়ে গেছি।
রতনদের ফোন করলাম এক কথা। উল্টে আমাকে ধমক দিয়ে বললো, জানলে কি হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকি। কখন খেলা শেষ করে দিতাম।
সাহসও পাচ্ছি না অনির ব্যাপারটা জানতে যদি খ্যাঁক করে ওঠে।
দেখলাম আবিদ কথাটা শুনে মুচকি হাসলো। ভিউং গ্লাস বলছে চাঁদ-চিনাও হাসছে।
অনিমেষদাকে ফোন করি, বিজি। বিধানদার স্যুইচ অফ।
উল্টে রতন আমাকে বললো, খোঁজ নিয়ে আমাদের জানান।
ওদের কি জানাবো! ইকবাল এলো ওকে সব বললাম। শুনে ও থ। বলো কি?
যেন অন্ধকারে হাতড়াচ্ছি।
তারপরেই অনাদির ফোন বড়দিকে, যা নয় তাই বললো। ভাবলাম শেষ করে দিই। খবর নিয়ে জানলাম, ওই বাড়িতে অনাদি নেই। তখনও বুঝিনি সাগর এর মধ্যে ইনভলভ।
অনিমেষদা তোর কথা শোনার পর। সোনাদিকে ফোনে সব কথা বললো।
সোনাদি শুনে বললো, তোমরা প্রশাসনিক ভাবে যা করার করো। তোমাদের কাজে আমি কোনও বাধা দেব না। শুধু আমার মেয়ে আর নাতনিকে তোমরা দেখো।
অনিমেষদা বললো, আমি ভাববার আগে অনি সব ভেবে রেখে দিয়েছে।
তারপরেই সোনাদি নম্রতাকে ফোন করে বললো এখুনি মাকে নিয়ে এই বাড়িতে চলে আয়। ইসিদের তখনও জানাইনি। নম্রতা মনেহয় ফোন করে জানাতেই সব হাজির।
সামন্তদা কি বকাটাই না বকলো সোনাদিকে। সেই নিয়ে আবার একটা ঝামেলা হলো। বড়দিদি সামলালো। এদিকে বুঁচকি মেয়ে ঘন ঘন ফোন করছে। বাবার ফোন অফ কেন, মামার ফোন অফ কেন। কি জবাব দেব।
তোমাকে ফোন করার পর আমাকে ফোন করেছিল। বলে দিয়েছি। মিত্রা বললো।
শেষে নেপলাকে ফোন করে সব জানালাম। শুধু বললো, এরকম একটা ঘটনা ঘটতে পারে ও সেটা আঁচ করে অনিকে বলেছে।
আমাদের বললো, তোমরা আমাকে আধঘণ্টা সময় দাও খবর নিয়ে সব জানাচ্ছি।
কিছুক্ষণ পর মাসি এসে হাজির চোখ ছল ছল। জিজ্ঞাসা করতে জানলাম। কাল তিনটে মেয়েকে কারা কিডন্যাপ করে নিয়ে গেছে। তার মধ্যে বাসন্তী আছে।
বাসন্তীর কথা তুই কাল রাতে খেতে বসে বললি। অতো প্রশংসা করলি।
তখন মাথাটা আর কাজ করছে না। অনিমেষদাকে ফোন করে সব বললাম।
বললো, মনে হচ্ছে অনির কাজ করছে ওরা। তোমরা চিন্তা করো না। আমি সবেমাত্র পৌঁছলাম, ওদের সঙ্গে দেখা করে অনির সঙ্গে বসবো। তবে যা বুঝছি সব জট পেকে আছে।
বড়ো বিল ছাড়িয়ে চলে এসেছি। ক্যালভার্ট পেরিয়ে লাড়োর বিলে ঢুকতেই আবিদকে বললাম, সামনে হারুজানার কালা, গাড়িটা ওখানে একটু দাঁড় করাবি আমি নেমে ভেতর দিয়ে যাব। তোরা বাজারে গাড়ি রেখে আয়।
কেনো, আমাদের সঙ্গে যাবি। মিত্রা বললো।
আমি এমনভাবে তাকালাম, মিত্রা দ্বিতীয় কথা বলার আর সাহস পেল না।
ঠিক আছে তুই নেমে যা।
আবিদ গাড়ি দাঁড় করাতেই আমি নেমে পরলাম। অনিমেষদাদের গাড়ি ঠিক পেছনেই ছিল, ওদের গাড়িও দাঁড়িয়ে পরলো। পেছনের গাড়ি গুলোও দাঁড়িয়ে পরেছে।
আমি নামতেই অনিমেষদা গাড়ির কাঁচ খুলে বললো, তুই এখানে নামলি?
তোমরা ঘুরে এসো। আমি এই পাশ দিয়ে যাচ্ছি।
একসঙ্গে গেলে হতো না।
মিনিট দশেকের তো ব্যাপার।
দশ মিনিটকেই তুই দশঘণ্টা বানিয়ে দিবি।
এসে দেখবে আমি দালানের বেঞ্চে বসে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছি।
ঠিক আছে যা।
আমি বাঁশবাগানের ভেতরে ঢুকে পরলাম।
একটু গেলেই বেরা ঘরের আঁখের খেত, শাক তলা।
নিঃঝুম দুপুর, মাথার ওপর ঝাঁ ঝাঁ রোদ। গায়ে যেন হুল ফোটাচ্ছে। চারদিক শুনশান। মাঝে মাঝে কুবুপাখী কুব কুব করে ডেকে উঠছে। কাঠ বেড়ালির খঞ্জনির মতো কণ্ঠস্বর চারদিকে ম ম করছে। দূরে কোথাও একটা দাঁড় কাক কাবা কাবা বলে চেঁচিয়ে উঠলো। ঝিরঝিরে বাতাসের স্পর্শে গাছের পাতায় কাঁপন ধরছে। নিস্তব্ধ দুপুরের একটা অদ্ভূত মদিরতা চারপাশে মিহি সুরে খেলা করে চলেছে।
বাঁশ বাগানের ভেতর দিয়ে বেরা ঘরের গা ঘেঁষে শরু পথটা সোজা চলেগেছে খালের দিকে। যেখানে বাঁশের সাঁকোটা আছে।
বেরা ঘরের কাছে আসতেই দেখলাম সামনের জায়গাটায় গরুগুলো দুপুর রোদে ঝিমচ্ছে। কেউ বসে, কেউ শুয়ে, কেউ দাঁড়িয়ে। একটা ছোট্ট বোকনা বাছুর মাথা দুলিয়ে আপন মনে এদিকে সেদিক দৌড়ে বেরাচ্ছে। দেখে মনে হয় দিন সাতেক বয়েস। নাভিটা এখনও খসে পরেনি। মাঝে মাঝে মায়ের পেটের তলায় দুধের বাঁটে মুখ দিয়ে মাথাটা গোঁতাচ্ছে। মা গরুটা হাম্বা হাম্বা বলে চেঁচিয়ে উঠছে।
নদীর ধারের দিকে একটু এগিয়ে আসতেই সেই আমগাছটার দিকে চোখ চলে গেল। থমকে দাঁড়ালাম। ওপরের দিকে চোখ মেলে তাকালাম। বেশ ডাঁসা ডাঁসা আম হয়েছে। থোকা থোকা আমগুলো কেমন ভাবে যেন ঝুলে আছে। নিজের রূপের অহঙ্কারে গর্বে বুক ফুলে উঠেছে। মাটিতে যেন পা পরতে চায় না। জুল জুল করে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এক একটা থোকায় তিনটে চারটে করে ঝুলছে।
নিচের ডালগুলো একবারে শুনশান। চোখ সরাতে পারছি না। লোভে পরে গেলাম। ছোটোবেলায় আমি চিকনা এই ঠাটা পোরা দুপুরে কতো আম চুরি করেছি। পকেটে বাঁশের তৈরি পাতলা কঞ্চি আর নুনের পুরিয়া। তখন তর তর করে গাছে উঠে যেতে পারতাম। এখন আর পারবো না। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলাম, না হাতের কাছে কোন মাটির ঢেলা দেখতে পাচ্ছি না।
সামনের খেতটায় সবে মাত্র মাটি কোপান হয়েছে। হয়তো খাঁচি বাড়ি (মাদুর কাঠির চাষ) তৈরি করবে। কালবৈশাখীর সময়। বর্ষা এলেই এই মাটি গলে ক্ষীর হয়ে যাবে। তখন গাছ পুঁততে অসুবিধে নেই।
এদিক ওদিক তাকিয়ে আমি একটা আধমনি মাটির ঢেলা তুলে আছাড় মারলাম। অনেকগুলো মাটির ঢেলা তৈরি হয়ে গেল। তিন-চারটে ছোঁড়ার পর দেখলাম একটাও লাগলো না। নিজের মনে নিজে হাসলাম। অনভ্যাসের ফল। একসময় এক ঢেলায় গোটা পাঁচেক আম মাটিতে লুটোপুটি খেত।
নাঃ গাছেই উঠতে হবে। এই নিঃঝুম দুপুরে ধারে কাছে কাউকে দেখতে পালাম না। পরনে জিনসের প্যান্ট, তাও বেশ টাইট। গাছে উঠতে গেলে পেছন ফেটে যেতে পারে। তাতে আর এক বিপত্তি জবাবদিহি করতে করতে প্রাণ যাবে। পায়ে পায়ে গাছের তলায় এলাম। এখানটায় একটু ছায়া ছায়া। দোনোমনো করে গাছের আড়ালে গিয়ে প্যান্ট খুলে গাছের তলায় রেখে জাঙ্গিয়া পরে গাছে উঠে পরলাম।
প্রথমে একটু অসুবিধে হলো বটে। তারপর ঠিক ডাল ধরে ঝুলে তর তর করে উঠে পরলাম। ডাল সমেত বেশ কয়েকটা থোকা ছিঁড়ে নিচে নেমে এলাম।
গোটা বারো আম হবে।
প্যান্টটা পরে একবার চারদিক দেখে নিলাম কেউ দেখলো কিনা।
আবার হাঁটতে শুরু করলাম।
একটু আসতেই দেখলাম কঁয়েতবেল গাছটা আমার দিকে কেমন ভাবে যেন তাকিয়ে আছে। নিজের মনে নিজে হাসলাম। এদিক ওদিক তাকালাম। গাছের নিচে একটাও পরে নেই। একটা দীর্ঘশ্বাস বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। হয়তো পড়ে ছিল। আমার চিকনার মতো ভালো ছেলে এই গ্রামে এখনও রয়েছে। ছোটোবেলার সেই রোগ কোনও ওষুধে সারানো যাবে না।
দোনোমনো করে ভাবলাম আবার প্যান্ট খুলবো, না সোজা উঠে পরবো। একটু কষ্ট করে উঠে পা দিয়ে ডালাটা নাড়ালেই গোটা দুয়েক পরে যেতে পারে।
গাছটার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম।
সত্যি লোভ সামলানো বড়ো দায়।
আমের বোঝা হাত থেক গাছের তলায় নামিয়ে রেখে তরতর করে উঠে পরলাম। এবার খুব একটা অসুবিধে হলো না। ডালটা নাড়াতেই গোটা পাঁচেক কঁয়েতবেল ঝুপ ঝুপ করে নিচে পরে গেল।
কিন্তু নামতে গিয়ে বিপত্তি হলো। বাঁ-পাটা ঝুলিয়ে নামতে গিয়ে চিড়িক করে আওয়াজ হলো। নেমে এসে পেছনে হাত দিয়ে দেখলাম যে ভয় করছিলাম তাই হয়েছে। একবারে নিচুর দিকে হাঁ হয়ে গেছে। নিজের মনে নিজে হাসলাম।
লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। কি আর করা যাবে।
কঁয়েতবেল কুড়িয়ে সোজা হাঁটা আরম্ভ করলাম।
হাঁটতে হাঁটতেই ফোনটা পকেট থেকে বার করে সবার সঙ্গে একবার কথা বলে নিলাম।
আলতাফকে ফোন করে জেনে নিলাম, বাসন্তী কাজ শুরু করে দিয়েছে। তবে বারুইপুর থেকে ওদের তুলে নিয়ে এসে আলতাফের নিজের ডেরায় কাজ করবে। অর্ককে ব্যাপারটা জানিয়ে দিয়েছে আলতাফ।
খালের ধারে এসে দেখলাম খাল একবারে শুকনো খট খটে। ধীরে ধীরে খালের গর্ভে নেমে এলাম। একটা সিগারেট ধরালাম। সরু শুতোর মতো নদীর জল একলাফেই পেরিয়ে যাওয়া যায়।
এতটা পথ এলাম একটা শেয়াল চোখে পরলো না। শেয়ালগুলো কি সব মরে গেছে?
হুনুমান গুলোর দেখা নেই। এর আগের বার তবু দু-একটা দেখেছিলাম।
খালের গর্ভ থেকে ওপরে উঠে আসতে গিয়ে হাত থেকে দুটো কঁয়েতবেল পরে গিয়ে গড়িয়ে গেল শুকনো খালের গর্ভে। আবার সব হাত থেকে নামিয়ে রেখে, খালে নামলাম। কষ্টের জিনিষ কুড়িয়ে নিয়ে এলাম। অর্ককে ফোনে ধরলাম।
হ্যালো।
কিগো খবর শুনে ঘুম ভেঙে গেছে?
কি খবর বলতো!
ওমনি নাটক শুরু করে দিলে।
বিশ্বাস কর। গাড়িতে ঘুমিয়ে পরেছিলাম। তারপর থেকে তোদের সঙ্গে একটু কথা বলবো সে সুযোগই পাই না। তোদের ম্যাডাম আর তনুদি একবারে এঁটুলে পোকার মতো সেঁটে আছে। নড়তেই চায় না।
এখন কোথায়?
খালের গর্ভ ছেড়ে ওপরে উঠছি। বাড়িতে ঢোকার মুখে সেই হারুজানার কালায় নেমে পড়েছি। ওরা বাজার ঘুরে আসছে।
সেই খাল পেরনো!
হ্যাঁ।
এখন কি জল আছে?
না একবারে শুকনো খটখটে।
অনুজ পুরো ফিউজ। ব্যাপারটা এই পর্যায়ে যেতে পারে ভাবতেই পারেনি। প্রবীরদা নিজের কাঁধ থেকে পুরোটা ঝেড়ে ফেলেছে। পরিষ্কার বলে দিয়েছে। ব্যাপারটা আপনি নিজে সামলান।
সেই জন্য অনিমেষদা বিধানদাকে খুব খুশ খুশ দেখলাম। তারপর।
অনিমেষদাও মনে হয় ভালোরকম বিট দিয়েছে।
আল্টিমেট কি হলো?
ব্যাটা নিজের ঘরে বসে আছে।
সাংবাদিক কুল?
সাংবাদিকরা প্রবীরদাকে চেপে ধরেছিল। বলেছে খোঁজ খবর নিয়ে বিকেলে আপনাদের জানাব।
তারমানে টাইম কিল করলো। ধীরে চলো নীতি।
তবে আর কি।
তুই কোথায়?
একটু আগে অফিসে এসেছি। ছিদামদার কাছে ডিম-পাঁউরুটি, ঘুগনি আর চা মারছি।
ব্যাটা কাছাকাছি আছে?
না, নিচে গেল।
আলতাফ ফোন করেছিল?
বললো খবর তৈরি হচ্ছে।
বাসন্তীকে ফোন করেছিলি?
বললো কাজ হলে স্পট বলে দেবে আমাকে যেতে হবে। সব শুনেছি ওর মুখ থেকে।
বেশ রসিয়ে লিখবি। যাতে কামিং সিক্স মান্থ ব্যাটা মুখ দেখাতে না পারে। ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার পকেটের ছেলে গুলোকে জানিয়ে রাখ।
সে আর বলতে, বহুত জ্বালাচ্ছে।
শোন আমি পুকুর পারে চলে এসেছি। এবার ঢুকবো। পরে কথা বলছি।
আচ্ছা।
আমি পেয়ারা গাছের তলা দিয়ে বাঁশ বাগানে ঢুকে পরলাম।
খিড়কি দরজা দিয়ে ভেতরে এলাম। কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। এদিকটা পুরো ফাঁকা। ঠাকুর ঘরের দরজা খুলে ঠাকুরকে প্রণাম করলাম। আবার দরজা বন্ধ করে বাইরের বারান্দায় এলাম।
দেখলাম কাকীমা, সুরোমাসি সামনের ঢিপিতে বসে আছে।
আমি চেঁচিয়ে ডাকতে দুজনে তাড়াতাড়ি চলে এলো।
কাছে আসতেই বুঝলাম চোখে মুখে সামান্য উৎকন্ঠা।
তারা কোথায়?
এখনও আসেনি!
না। নীপা ফোন করেছিল। সুরোমাসি বললো।
আমি দু-জনকে প্রণাম করলাম।
ওরা হয়তো গাড়ি রেখে আসছে।
তুই আম পেলি কোথায়? কাকীমা বললো।
ওই দেখ দিদি কঁয়েতবেল। সুরোমাসি বললো।
কাকীমা হাসছে।
আসার সময় বেরা ঘরের খেতের ধারে যে গাছটা আছে, দেখলাম ঝুলে আছে, ছিঁড়ে নিলাম।
সুরোমাসি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।
হ্যাঁগো, সত্যি বলছি। তুমি একটা আম চার-টুকরো করে কেটে একটু নুন দিয়ে আনো তো। অনেকদিন খাইনি।
এখন খেতে হবে না। স্নান করে ভাত খা। কাকীমা বললো।
ওরা আসুক, অনেকে আছে।
কঁয়েতবেল মাখবো? সুরোমাসি বললো।
মাখো।
সুরো মাসি চলে গেল। বারান্দার ঘড়ির দিকে তাকালাম আড়াইটে বাজে।
মনে মনে ভাবলাম বাবাঃ কি করছে ওরা।
কাকী এপাশ ফাঁকা দেখলাম, রান্নাবান্না কোথায় হচ্ছে?
বাসুর বৌ আর কাঞ্চন ও বাড়িতে করছে।
তারমানে খাওয়া দাওয়া সব ও বাড়িতে।
হ্যাঁ।
আমি পান্তা খাব।
কাকী হাসছে। চিকনা, মীর আসছে?
হ্যাঁ। বললাম, কয়েকদিন এখানে থাকো।
সকাল থেকে এখানে কি গণ্ডগোল।
এখন থেমেছে?
তক্ষুনি সঞ্জু গিয়ে দুই ঝাঁকার (বকুনি) দিতে সব থামা থামি হয়ে গেছে।
তোমাদের কোন অসুবিধে হয়নি তো?
সকালে জানাজানি হতে। সব এই বাড়িতে এসে হাজির। সব খামারে বসেছিল।
সুরোমাসি আম আর কঁয়েতবেল মেখে নিয়ে এলো। আমগুলো কুচি কুচি করে কেটে নুন কাঁচা লঙ্কা দিয়ে বেশ ভালো মেখেছে। একটুকরো মুখে দিয়ে বুঝলাম সেই স্বাদ এখনও অমলিন।
কাকী সুরোমাসিদের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই মিত্রাদের ট্রলি খামারে এসে দাঁড়ালো। ওখান থেকেই আমাকে দেখতে পেয়েছে। কিছু একটা বললো তনুকে।
তনু হাসছে। নীপাও হাসছে।
(আবার আগামীকাল)