| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কাজলদীঘি

Reporter Default
রিপোর্টার / ২৬৪৬ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২০

জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

১৭৪ নং কিস্তি

একে একে সবকটা ট্রলিই এসে খামারে দাঁড়ালো। মুহূর্তের মধ্যে চেঁচামিচি ভিড় জড়িয়ে গেল। ভর ভর করে গোটা দশেক বাইক এসে জড়ো হয়ে গেল। ভেবেছিলাম চিকনারা শুয়ে শুয়ে আসবে। দেখলাম বসে বসে এসেছে। বিজয়কেও দেখতে পাচ্ছি। ব্যাটার আর বয়স হবে না।

অনিমেষদারা, মিত্রা, তনু, নীপা সবাই হেঁটে হেঁটে এই পাশেই আসছে।

আমি বারান্দায় বসেই চেঁচালাম।

বাসু, চিকনাকে এখন ও বাড়িতে নিয়ে যাস না। এই বাড়িতে নিয়ে আয়।

আমার গলা পেয়ে চিকনাও মনেহয় কিছু বলছে বাসুকে। বাসু হাসছে।

মিত্রা বারান্দায় পা রেখেই চোখ বড়ো বড়ো করলো। চেঁচিয়ে উঠলো।

সুরোমাসি, আসার সঙ্গে সঙ্গে আদর শুরু।

নারে বাপু বিশ্বাস কর সে গাছ থেকে পেরে নিয়ে এসেছে। তাই….।

সুরো মাসির কথা শেষ হল না। মিত্রা প্লেট থেকে একটুকরো নিয়ে মুখে দিয়েই টকাস করে আওয়াজ করে উঠলো।

তনু, এক টুকরো মুখে দে, অমৃতের স্বাদ কাকে বলে বুঝবি।

মিত্রা অনিমেষদার দিকে তাকাল।

বুঝলেন দাদা আগে আসার জন্য কেন এতো হম্বি-তম্বি এবার দেখছেন।

অনুপদা, রূপায়ণদা প্লেটে হাত দিয়েছে ইসলামভাইও বাদ গেল না।

আমি অনিমেষদার দিকে তাকালাম।

গরমকাল একটুকরো মুখে দাও দেখবে শরীর ঠান্ডা হয়ে যাবে।

কঁয়েতবেলের প্লেট মিত্রার হাতে চলে গেছে। ভাগা ভাগি শুরু হয়ে গেছে।

অনিমেষদা, বিধানদা হাসছে। বারান্দায় চেয়ার পাতাই ছিল সব বসে গেছে। অনুপদা গিয়ে দোলনায় ঝুলে পরেছে। আমি বেঞ্চের এক কোনে বসে আছি।

চিকনাদের বাসু, সঞ্জু ধরে ধরে এনে বেঞ্চে বসাল।

ভানু, পচা, পাঁচু ওবাড়িতে ছুটলো। রতনরা সব খামারেই দাঁড়িয়ে।

মিত্রা একটুকরো করে আম চিকনা আর মীরচাচার হাতে দিল।

চিকনা আমার দিকে তাকিয়ে ফিক ফিক করে হাসছে।

আমিও ওর দিকে তাকালাম।

বেরা ঘরের গাছ নু চুরি করছু?

চিকনার কথা শুনেই মিত্রা আমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকাল।

তুই একটা চোর, তাই সবাইকে সেরকম ভাবিস। ঝাঁজিয়ে উঠলাম।

আমার কথা শুনে অনিমেষদারা সবাই হেসে গড়িয়ে পরে।

অনুপদা দেখলাম দোলনা থেকে উঠে এলো।

এই ভর দুপুরে তোকে কে আম পেরে দেবে। কালই আমি ওই পথে এসেছি। নিচের দিকে সব আম বাচ্চাগুলো পেরে খেয়ে নিয়েছে। গাছে না উঠলে আম পারা যাবে না।

এতো বুঝিস বলে গুলি খেয়েছিস।

সবাই আমার চিকনার কথা শুনে হেসে খান খান।

নীপা ভেতর থেকে সরবতের গ্লাসের ট্রে নিয়ে এসেছে।

মিত্রাদি একটা দুটো আম নয়গো প্রায় বারো চোদ্দটা আম। ডাল ছিঁড়ে নিয়ে এসেছে। পাঁচটা কঁয়েতবেল।

আবার একটা হাসির ঢেউ উঠলো।

নীপা সবার হাতে গ্লাস দিচ্ছে।

কঁয়েতবেল গাছে না উঠলে পাওয়া যাবে না। চিকনা বলে উঠলো।

আমি চিকনার দিকে কট কট করে তাকালাম।

তুই নির্ঘাৎ গাছে উঠেছিলি। মিত্রা বলে উঠলো।

গিলছিস তো, গেল না, চিকনার কথা শুনে বক বক করছিস কেন।

এই বুড়ো বয়সে এখনও গাছে ওঠার সখ! মিত্রা বড়ো বড়ো চোখ করলো।

তনু হাসছে।

দাঁড়া, এখুনি বড়োমাকে ফোন করে তোর গুণের কথা বলছি।

আমি গম্ভীর হয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

দেখছো, কেমন গম্ভীর হয়ে গেল।

কথা বলতে বলতে মিত্রা তেড়ে এলো।

ভেবেছিস কি, গাছ থেকে পড়ে যদি হাত-পা ভাঙতো।

আমি ওর ঘুঁসি পাকানো হাতটা ধরে ফেললাম।

একবারে ঝামেলা করবি না। বেশ তো টকাস টকাস আওয়াজ করে দুটো প্লেট শেষ করে দিলি। আমি কয়েকটা মাত্র মুখে তুলেছি।

ওরে মিত্রা তুই থাম, আর পাগল পনা করিস না। নিরঞ্জনদা চেঁচিয়ে উঠলো।

তুমি দেখো, এই বুড়ো বয়সে গাছে উঠে আম পারা। চিকনা না বললে আমাদের হেঁপি মেরে উড়িয়ে দিত, অমনি একটা গল্প ঝেড়ে দিত।

দেরি করিস না। বেলা হয়ে গেছে। সবাই না খেয়ে বসে আছে। আমি গম্ভীরভাবে বললাম।

তুই খেয়ে নিসনি কেন?

আমি এ বাড়িতে তোরা ও বাড়িতে।

পান্তা গিলবি?

হ্যাঁ।

আবার একচোট হাসি।

সুরোমাসি এবার বেশি করে আম আর কঁয়েতবেল মেখে দুটো বড়ো বাটিতে করে নিয়ে এসেছে।

অনিমেষদা দেখে হাসলো।

তুমিও আছো দিদি।

কলকাতায় তো এসব পাওয়া যায় না।

নাগো দিদি তুমি ঠিক করেছো।

রূপায়ণদা এগিয়ে এসে বাটি থেকে তুলে নিয়ে একটুকরো মুখে দিল। কেউ আর হাত লাগাতে বাকি রইলো না।

এরই মধ্যে কে এসে কার পা ছুঁয়ে চলে যাচ্ছে বোঝা মুস্কিল।

হাসাহাসি কথা-বার্তা চলছে।

মিত্রা-তনু আমার পাশে বসে টকাস টকাস শব্দে আম খাচ্ছে। কল কল করে যাচ্ছে।

আমি বাসুকে কাছে ডেকে বললাম একটা কাজ করবি।

বল।

তোর দোকান খোলা আছে?

হাফ বন্ধ আছে।

তোর দোকানের ছেলেটা আছে?

আছে।

ওকে একটু বল না তোর দোকানের সবচেয়ে যে দামী শাড়ি আছে তার থেকে চারটে বেছে নিয়ে আসতে, আর চারটে ভালো লুঙ্গি, আর চারটে পাজামা পাঞ্জাবী।

এখুনি!

হ্যাঁ।

খেয়েদেয়ে বরং চল নিজে বেছে নিবি।

তাহলে তোকে বলতে যাব কেন। আমার গলাটা পরিবেশ অনুযায়ী বেমানান শোনাল।

অনিমেষদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।

কাকীমা চা নিয়ে এলো।

হঠাৎ পরিবেশটা কেমন থম থমে হয়ে গেল। বাসুও একটু থতমতো খেয়ে গেছে। মুখটা সামান্য হলেও ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বাসু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে, কি ভাবলো কে জানে।

ঠিক আছে আমি ফোন করে বলে দিচ্ছি।

বাসু গম্ভীরভাবে কথাটা বলে, খামারের দিকে চলে গেল।

অনিমেষদার দিকে তাকালাম। মুচকি মুচকি হাসছি।

মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম যা স্নান সেরে নে। তোদের তো আবার সময় লাগবে।

সকালে করে এসেছি। না করলেও চলবে।

যে রিদিমে কথাবার্তা চলছিল সেই রিদিমটা হঠাৎ কেমন তাল কেটে গেছে। নীপা চা নিয়ে এলো। চা খাওয়া হচ্ছে। কথা চালাচালি চলছে। কিন্তু কেমন যেন ছেঁড়া ছেঁড়া।

এগুলো কি এই মুহূর্তে খুব জরুরি ছিল। অনিমেষদা বললো।

আমি অনিমেষদার দিকে তাকালাম।

হ্যাঁ।

ব্যাপারটা কেমন অপ্রাসঙ্গিক ঠেকছে না।

চুপ করে রইলাম কথার কোনও উত্তর দিলাম না।

চিকনা-মীরচাচা অনিমেষদার দিকে তাকাল। ব্যাপরটা এরকম, আপনি ঠিক বলেছেন।

অনিমেষদা আর কথা বারাল না।

বিধানদা চায়ের কাপে ঘন ঘন চুমুক দিয়ে যাচ্ছে।

বাসুকে দেখলাম খামার থেকেই ওই বাড়ির দিকে চলে গেল।

অনুপদা যথারীতি আবার দোলনায় দুলছে। সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বারান্দাতেই বসে আছে। নিজেদের মধ্যে কথা বলছে।

মিত্রার দিকে তাকালাম।

পান্তা খাবি না মাংস-ভাত খাবি?

দুটোই খাব।

ইসলামভাই খিক খিক করে উঠলো।

শরীরটা ঠিক রাখিস, কাল ভোর ভোর বেরবো। ভালোপাহাড় যাব।

তুই একলা যাস, আমরা যাব না।

সে তোদের ইচ্ছে। আমি যখন কথা দিয়েছি যাব, তখন যাব।

কখন যাবি?

চারটে সারে-চারটেয় বেরবো।

রতনরা খামারে দাঁড়িয়ে কথা বলছে।

বুঝলি চিকনা বেরা ঘরের আঁখ বাড়িতে বেশ মোটা মোটা আঁখ হয়েছে।

তুলে আনতে পারতিস।

অনেক বাঁধা বাঁধি করে রেখেছে।

মিত্রা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে উঠলো।

তুই এরকম ঠ্যাংয়ের ওপর ঠ্যাং তুলে বসে আছিস কেনরে। গুরুজনেরা সামনে বসে আছে দেখতে পাচ্ছিস না।

তোকে জ্ঞান দিতে হবে না।

পা নামা।

অসুবিধে আছে।

কিসের অসুবিধে।

আবার দেখলাম সকলে মুচকি মুচকি হাসছে।

লুঙ্গিটা আসুক বুঝতে পারবি।

অনিমেষদা হাসতে হাসতে কাপটা টেবিলে রাখলো।

মীরচাচা চারটে লুঙ্গি আনতে দিয়েছি। তুমি একটা আমি একটা চিকনা একটা….।

তুই তো লুঙ্গি পরিস না। মিত্রা বলে উঠলো।

আজ পড়তে ইচ্ছে করছে।

আর একটা লুঙ্গি কাকে পরাবি? ইসলামভাই বললো।

মীরচাচা এবার জোরে হেসে উঠলো।

ইকবালভাইকে দেব। যদি চিকনার মতো গুলি লাগে তাহলে পরবে।

দেখলাম একটা বাইক এসে খামারে দাঁড়াল। ছেলেটার হাতে একটা ব্যাগ।

বাইক থেকে নেমে ছেলেটা এদিকে হেঁটে আসছে। বাসুকে দেখলাম ও বাড়ি থেকে এ বাড়িতে এলো। বুঝলাম ছেলেটাকে দেখে বাসু এই বাড়িতে এলো।

এটাই বাসুর দোকানে কাজ করে!

ছেলেটি বারান্দায় জুতো খুলে উঠেই চিকনার দিকে তাকিয়ে হাসলো।

কেমন আছো চিকনাদা?

ভালো।

সকালে তোমার, মীরচাচার কথা শুনে মনটা এতো খারাপ হয়ে গেল।

কি করবি বল, সব কপাল।

বাসু বেশ গম্ভীর হয়েই ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বললো। ঠিক ঠিক নিয়ে এসেছো।

হ্যাঁ বাসুদা।

বাসু ছেলেটির হাত থেকে প্যাকেটটা নিয়ে আমার হাতে প্রায় ছুঁড়েই দিল।

দেখে নে, পছন্দ কিনা।

আমি কাপরগুলো বার করে দেখলাম, বেশ দামী শাড়ি। সব শাড়িই ভায়োলেট কালার ঘেঁষা।

মিত্রা আমার হাত থেকে শাড়িগুলো নিয়ে নিল।

আমি এবার যাই বাসুদা। ছেলেটি বাসুর দিকে তাকাল।

যাও। দোকান বন্ধ করে এখন চলে যাও। সাড়ে পাঁচটার সময় আবার খুলবে।

একটু দাঁড়াও।

আমি ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে।

ছেলেটিও আমার মুখের দিকে তাকাল।

বাসু একটু অবাক চোখে আমার দিকে তাকাল।

কাপরের রং গুলো তুমি পছন্দ করেছো?

হ্যাঁ।

তোমাকে বাসু কিছু বলে দিয়েছিল?

বললো বৌদিরা পড়বে এমন ধরনের কালার চয়েস করে আনবে।

বয়েস বলে দিয়েছিল?

না।

এই ভায়োলেট ঘেঁষা ছাড়া আর কোনও কালার ছিল না?

চারটেই তো আলাদা কালার।

প্রত্যেকটার মধ্যেই ভায়োলেট কালারটা আছে।

অন্য শাড়ি ছিল। কোয়ালিটি এতো ভালো ছিল না।

পাঞ্জাবী গুলো বার করলাম।

এই দেখ ভাই তুমি পাঞ্জাবীর কালারগুলোও ভায়োলেট ঘেঁষা নিয়ে এসেছো।

ছেলেটি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে!

লুঙ্গি গুলোর কালার দেখ সব এক।

বদলে আনবো।    

থাক আমি নিজে গিয়ে পছন্দ করে আনবো। তুমি থাকো কোথায়?

নাচিন্দা।

নাচিন্দায় কাদের ঘর?

আরে আমাদের পোষ্ট অফিসের রানার বেচা মহান্তি আছে না। তুই চিনতে পারবি না। তার শালির ছেলে। চিকনা বললো।

তার মানে তুমি এই গ্রামের নয়?

ছেলেটি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে।

আমাকে আগে দেখেছো?

না। নাম শুনেছি।

এখানে যাদের দেখছো তাদের কাউকে চেনো?

ইসলামভাই ছাড়া কাউকে চিনি না। আজ গাড়ি এসে বাজারে থামতে সকলকে দেখলাম।

নাম শুনেছো এঁদের?

হ্যাঁ।

আমার এরকম পরের পর প্রশ্ন করা দেখে সকলের চোখের রং ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করলো। প্রত্যেকেরই চোখে মুখে ফুটে উঠেছে, অনি যে ছেলেটাকে চেনে না জানে না তাকে এত প্রশ্নবানে জর্জরিত করে তুলছে কেন?

তুমি তো বাসুদাকে বলতে পারতে এই অপরিচিত মানুষগুলোর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতে। নিশ্চই বাসুদাকে বললে বাসুদা না বলতো না।

ছেলেটি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল।

সকলে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।

বাসুর চোখ দুটোও কেমন ছোটো ছোটো হয়ে গেছে।

খনা কোথায় রে? বাসুর দিকে তাকালাম।

ও বাড়ির বারান্দা শুয়ে আছে।

একটু ডাক।

বাসু একবার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে, বিরক্ত হয়ে চলে গেল।

তুমি বাসুর দোকানে কতদিন কাজ করছো?

দু-মাস পূর্ণ হয়ে দশদিন চলছে।

মনে মনে বললাম ছুড়কি তাহলে ওকে সপ্তাহ দুয়েক ফলো করছে।

এই গ্রামে কতদিন এসেছো?

আরে ও ব্যাঙ্কে ইন্টারভিউ দিতে এসেছিল। খুব কোয়ালিফায়েড ছেলে। কিন্তু ওর থেকে ভালো ছেলে পেলাম বলে আমরা ওকে নিতে পারলাম না। বেচাদা বললো, আমার শালাটার জন্য তোমরা একটা কিছু ব্যবস্থা করে দাও। তাই টেম্পোরারি বাসুর দোকানে রয়েছে। তারপর সমবায়ে একটা কথা চলছে দেখি ওখানে যদি একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারি।

চিকনা থামলো। আমি চিকনার মুখের দিকে তাকিয়ে।

আমার চাহুনিটা মনে হয় চিকনার ঠিক ভাল লাগলো না। চোখ নামিয়ে নিল।

তারমানে তুমি বাসুদার দোকানে যে দিন থেকে কাজে লেগেছো সেদিন থেকে আছো?

ছেলেটির মুখের দিকে তাকালাম।

বেশ ভাল করে লক্ষ্য করলাম ছেলেটার হাত দুটো সামান্য কাঁপছে।

তোমার নাম কি?

বিজন শতপথী।

বাড়ি?

দীঘা।

এপার না ওপার?

এ্যাঁ।

দীঘা না বালেশ্বর?

বালেশ্বর।

চন্দনেশ্বর মন্দিরের সামনা সামনি?

একটু আগে।

খনা এসেই আমার সামনে দাঁড়িয়ে পরলো।

কি বলো।

ফোন নম্বরটা দে?

পকেট থেকে একটা ছেঁড়া কাগজ বার করে আমার হাতে দিল।

বাবার সঙ্গে দেখা করেছিস?

খনা মাথা দোলাল।

বাবার হাতে টাকা দিয়েছিস?

দিয়েছি।

কি বলেছে?

সুবীরদার সঙ্গে কথা বলে ব্যাঙ্কে রাখতে।

বাবা আর কিছু বলেনি?

তুমার কথা কইলো, কইলো যা বলবে শুনবি।

খামারে যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারা সবাই পায়ে পায়ে বারান্দায় চলে এসেছে। নিস্তব্ধ বারান্দা।

আমি পকেট থেকে মোবাইল বার করে অন করে পাসওয়ার্ড দিলাম।

মিত্রা আমার আঙুলের দিকে বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে। কোনও কথা বললো না।

ফোন নম্বরটা টিপে কানে ধরলাম। বিজনের পকেটের ফোনটা বেজে উঠেছে।

এক মিনিট, ফোনটা রিসিভ করবো?

আমি ইসারায় ঘার নারলাম। ওর দিকে তাকিয়ে আছি।

আমি কানেই ধরে আছি।

বিজন পকেট থেকে ফোনটা বার করে দেখলো মিস কল হয়ে গেছে।

আমি কান থেকে ফোনটা সরালাম না।

মিস কল হয়েছে? বিজনের দিকে তাকালাম।

বিজন চুপ করে থাকলো।

আমারটা এখনও রিং বেজে যাচ্ছে। ব্যাটারা এতো ব্যস্ত তুলতেই ভুলে গেছে।

বিজন আমার চোখে চোখ রেখেছে। আমি কান থেকে ফোনটা নামিয়ে নিলাম।

কথা বলে এসো তোমার কোনও জরুরি ফোন এসেছে হয়তো।

না থাক পরে কথা বলবো। মুখ নিচু করে নিল।

করো না। কোনও অসুবিধে নেই। যাও খামারে গিয়ে কথা বলে এসো।

বিজন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে।

তোমার মোবাইলটা দেখি।

বিজন আমার মুখের দিকে তাকাল।

দাও না দেখি একবার কোথা থেকে ফোন এলো।

এবার বিজন হতভম্ব হয়ে গেছে।

ঠিক আছে থাক। তুমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছ। বাসু একটা টুল এনে দে ওকে একটু বসুক। বাসু নিজের জায়গা থেকে একটুও নড়লো না। ছেলেটিও দাঁড়িয়ে।

অনিমেষদার দিকে তাকালাম। চোখে হাজার পাওয়ারের বাল্ব লাগিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বিধানদার অবস্থাও তাই।

আমি ফোনটা তুলে আবার ডায়াল করলাম। এবার ইচ্ছে করেই ভয়েজ অন করে দিলাম।

অনিআকা।

হ্যাঁ।

চিকনা আকারা সেঠিনু চলিইছে।                

আমার সঙ্গে এসেছে।

দারু আকা কইল মামনি ফইন করবেক, করে লাই।

দারুর সঙ্গে তোর মামনির কখন দেখা হলো!

আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।

হইছে, তুমি ত্যাখন গাড়িয়ে ঘুমাইছিলে।

ও। সব কাজ শেষ করে ফেলেছিস।

হ।

এটাকে মেরে দে। এ-তো বহুত সরেস মালরে।

মুহূর্তের মধ্যে ছেলেটি আমার পায় হুমড়ি খেয়ে পরলো। পা জড়িয়ে ধরে কাটা ছাগলের মতো ছটফট করতে করতে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো।

আমাকে মারবেন না, আমি আর কোনওদিন করবো না। আমার ভুল হয়ে গেছে।

বাসু কেমন থতমতো খেয়ে গেছে। মিত্রা, তনু বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ছিটকে দূরে সরে গেল। অনুপদা দোলা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছে।

সবাই হই হই করে উঠলো।

অনিমেষদা ইজি চেয়ার থেকে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে।

ছুড়কি তার স্বর চেঁচাচ্ছে, কি হইছেগো অনিআকা উখানে হল্লা কিসে।

আমি বাড়িতে আছি, তোকে চিন্তা করতে হবে না।

আইচ্ছা।

ফোনটা হাতেই রাখলাম।

মিত্রা আবার আমার পাশে বসে হাতটা চেপে ধরেছে।

বিজন তখনো আমার পায়ে মাথা দিয়ে হাপুস নয়নে কেঁদে চলেছে।

বাসু শক্ত কাঠের মতো দাঁড়িয়ে।

বিজন কেঁদে কিছু হবে না। আমার সম্বন্ধে তুমি অনেক কথা জানো। শেষ কথাটা আমি বলে দিয়েছি। তোমার আয়ু আর বেশিক্ষণ নেই।

আমি কথা দিচ্ছি আর কোনওদিন করবো না। আমাকে একটা শেষ সুযোগ দিন।

চিকনার দিকে তাকালাম।

এই গ্রামে আর একটা দিবাকরের জন্ম দিয়েছিস তোরা।

চিকনা, মীরচাচা আমার কথা শুনে মাথা নিচু করে নিল।

অ্যাতো টাফ প্রিয়েড যাচ্ছে, বার বার বলেছি সাবধানে পা ফেল। আমার কথাটা কেউ গা করলি না।

রতনদের দিকে তাকালাম, সবার চোখ মুখের চেহারা বদলে গেছে।

অনিমেষদার দিকে তাকালাম।

বুঝলে দাদা, আমার এই অঙ্কটা মেলাতে চব্বিশ ঘণ্টা সময় লাগল। তাও শেষ মুহূর্তে এক্স ধরলাম। ছুরকি। একটা আদিবাসী ছেলে। এদের থেকে অনেক বেশি বুদ্ধি ধরে।

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। চোখ দুটো আবার জ্বালা করতে শুরু করেছে।

তিল তিল করে একটা বনিয়াদ গড়ে তুলছি, এরা ভুলের পাহাড় তৈরি করে চলেছে।

সারা বারান্দায় এতগুলো লোক কারুর মুখে কোনও কথা নেই।

বিজন তখনও আমার পা ধরে বসে আছে।

সকাল বেলা ছুড়কিকে দ্বিতীয়বার ফোন করতে খানিকটা কেঁদে নিয়ে বললো, ওর একটা ভুলের জন্য চিকনারা গুলি খেয়েছে। কথায় কথায় শুধু বললো অনিআকা মোর একজনকে সন্দেহ হয়। বুঝতে পারি লাই এউটা অনাদি আকার ঘুঁটি কিনা।

প্রথমে নিজেরই কেমন কেমন যেন লেগেছিল, ব্যাটা বলে কি?

আমাকে নামটা বল।

বিজনের কথা বললো, বাসু আকার দুকানে ছেইলেটা কাজ করে। লতুন আসছে।

আর এরা প্রায় আড়াইমাস দিন-রাত চোখের সামনে দেখলো বুঝতেই পারলো না।

খনা আমাকে মাঝে মাঝে বলতো আজ এই আলোচনা হলো সেই আলোচনা হলো। কিছুতেই ধরতে পারতাম না। আমার সর্ষের মধ্যে কোথায় ভূত আছে।

বললাম ব্যাটা ফোন নম্বরটা টুকে রাখ।

দেখো ওর ফোন নম্বরে যে মিস কলটা এখুনি গেল সেটা আমার ফোন নম্বর।

জাস্ট খনার দেওয়া নম্বরের সঙ্গে মিলিয়ে নিলাম।  

অনিমেষদা মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে হাসছে।

চিকনাকে আলাদা করে বলেছি। হেঁপি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে।

বাসুকে বলেছি। বলেছে তোর কোথাও ভুল হচ্ছে। তবে তুই যখন বলছিস দেখছি।

দেখো আমি কিন্তু ছুড়কির কথাটা হেসে উড়িয়ে দিতে পারতাম। দিইনি। জাজ করেছি।

চিকনার মুখের দিকে তাকালাম।

সকালে আমি ফোন করার পর তোকে কে ফোন করেছিল?

চিকনা মাথা নিচু করে রইল।

সে আর বেঁচে নেই তুই বলতে পারিস।

চিকনা আমার দিকে চমকে তাকাল।

এ্যাডমিনিস্ট্রেসনে দয়া-দাক্ষিন্য বলে কিছু নেই। তাহলে অন্ততঃপক্ষে কৃষ্ণ মহাভারতে ভীষ্মকে সুস্থ অবস্থায় বহাল তবিয়েতে বাঁচিয়ে রাখতো। যুদ্ধ করতে দিত। সরসজ্জা বানিয়ে আঠারো দিন শুইয়ে রাখতো না। আমার শিক্ষাটা সেখান থেকে নেওয়া।

হঠাৎ বাসু বিজনের মুখে সজোরে একটা লাথি মেরে দিল। বিজন আমার পা থেকে ছিটকে পড়ে গেল।

বিজনের ঠোঁট ফেটে গল গল করে রক্ত বেরতে লাগলো।

ভানুরা ছুটে এসে কোনওপ্রকারে টেনে হিঁচড়ে বিজনকে সরিয়ে নিয়ে গেল।

রতনরা বাসুকে ধরে ফেললো।

বাসুর মুখ থেকে দেশীয় ভাষায় ফুল ঝুরির মতো গালাগাল বেরচ্ছে।

দুধ দিয়ে কাল সাপ পুষেছি। আবার বলে কিনা বিকেলে নিয়ে গেলে হতো না। সকাল থেকে এতো খাটা খাটনি গেল।

বাসু আমার দিকে তাকাল।

শালা তখনি আমার কেমন যেন একটা খটকা লাগলো। বিশ্বাস কর সেই মুহূর্তে তোর ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছিল। এখন বুঝছি কতো বরো ভুল করেছি।

মিত্রা উঠে গিয়ে বাসুকে ধরেছে। তনু আমার একটা হাত চেপে ধরেছে।

ঠাণ্ডা হও। দেখো বুবুন ভেতরে ভেতরে রাগ করেছে তার বর্হিপ্রকাশ দেখতে পাচ্ছ।

বাসু এমনিতে খুব একটা রাগে না। খুব ঠাণ্ডা ছেলে। সাত চরেও রা করে না। রেগে গেলে দিক বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে ভুল বকতে শুরু করে। সেই মুহূর্তে গুছিয়ে কথাও বলতে পারে না। কথা বলতে গেলেও কেমন আটকে যায়।

জানো ম্যাডাম এখন বুঝতে পারছি আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে।

বাসু কেঁদে ফেললো।

অনির কতো পরিশ্রম করে গড়ে তোলা সব কিছু।

কিচ্ছু সর্বনাশ হয়নি। যে বনিয়াদ তৈরি করেছে তার রক্ষণা-বেক্ষণের ব্যবস্থা সেইই করবে। তোমরা ওর পাশে থেকে সাহায্য করলেই হবে।

মিত্রা ওকে ভেতরে নিয়ে যা। বিধানদা ভারি গলায় বললো।

অনিমেষদার দিকে তাকালাম।

তোমরা একে জেরা করলে সব কিছু উদ্ধার করতে পারবে।

বিজনের দিকে তাকালাম। মুখে রুমাল চাপা দিয়েছে। মনেহয় ঠোঁটটা ফুলে গেছে।

তুমি সকাল থেকে দুবার চেষ্টা করেছিলে পালিয়ে যাওয়ার জন্য।

বিজন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে নিল।

তুমি বাজারের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করো না। তাহলে তোমায় কুকুরের মতো গুলি করে মেরে দেবে।

ভানুর দিকে তাকালাম।

ওকে নিয়ে ওই বাড়িতে চলে যা। এখন ছাড়বি না।

মীরচাচা চেঁচিয়ে উঠলো, রহমতুল্লা।

গম গম করে উঠলো সারাটা জায়গা।

একটা সন্ডামার্কা ছেলে ভিড় ঠেলে সামনে এসে দাঁড়াল।

বিজনকে ওই বাড়িতে নিয়ে যা।

মীরচাচা আমার দিকে তাকাল।

বিশ্বাস কর অনি সকাল থেকে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। গ্রামের মানুষ। সারাজীবনে শরীরে সেই ভাবে সুঁই ফোড়াইনি। আজ গুলি খেলাম। এখন যেন মনে হচ্ছে কষ্টটা অনেকটা কমে গেছে।

মীরচাচার গলাটা ভারি ভারি ঠেকলো।

ইকবালভাই নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে এলো।

না ইমামসাহেব সত্যি বলছি। ভুলটা ভুল। তাকে শোধরান যাবে না। আবার লতুন করে সব কিছু শুরু করতি হবে। অযথা সময় লষ্ট।

মীরচাচা কাঁধের গামছা দিয়ে চোখ মুছছে।

মীর এটা ঠিক নয়। বিধানদা বললো।

না দাদা, আজ তো মরে যেতে পারতাম। মরিনি শুধু ওই বাচ্চা ছেলেটার জন্য। শুধু অনিকে নয়, আমাদেরও কতোটা ভালোবাসে বলুন। মামনির কাছ থেকে তখন ওর কথা শুনে নিজেরই চোখ ফেটে জল আসছিল।

মীরচাচা থামলো।

কি দরদ বলুন। অকপটে স্বীকার করছে, আর একটু শতর্ক হলি একটা গুলিও মোদের লাগতনি। আর বিজনকে দেখুন, এখনও মুখ ফুটে স্বীকার করলোনি, খবর পাচার করছে।

যাও ও বাড়িতে গিয়ে রেস্ট নাও। অনেক বেলা হয়েছে। সুরোমাসি একটু চা খাওয়াও। তারপর স্নান করে ভাত খাব। বিধানদা বললো।

তুমি এখন চা খাবে! নীপা বিধানদার দিকে তাকাল।

শুনলি তো সব। মাথাটা ধরে গেছে। চা খেয়ে মাথাটা একটু ছাড়াই আগে।

কঁয়েতবেল খাও টকের চোটে মাথা ছেড়ে যাবে।

এইরকম একটা গুরুগম্ভীর পরিবেশেও বিধানদা হাসছে। আমিও হেসেফেললাম।

মিত্রা আমার দিকে তাকাল।

ভিড়টা সামান্য ফাঁকা হয়ে এসেছে। মিত্রা সামনে এসে দাঁড়াল।

লুঙ্গি পরবি বললি। এখনও কেঁচকি মেরে বসে আছিস। তাও অনিমেষদার দিকে ঠ্যাং তুলে।

তোর কি? নীপা একটা গামছা আনো।

গামছা দিয়ে কি হবে। মিত্রা খোঁচা মারলো।

স্নান করতে যাব।

ভেতরে চলে যা।

তোকে বক বক করতে বলেছি।

তুই তো বক বক করাচ্ছিস।

উঃ মিত্রাদি। ঠিক আছে দাঁড়াও আমি এনে দিচ্ছি।

নীপা ভেতরে চলে গেল।

ভিড়টা পাতলা হয়ে গেল। বিজনকে ও বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ভানু বলে গেল নিচের বিছানাটা রেডি করে মীরচাচা, চিকনাকে নিয়ে যাচ্ছি। ওরা ততক্ষণ একটু বসুক।

ইসলামভাই আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।

এখনও দুটো বাকি আছে কি বল।

কেনো তুমি ফুট কাটছো বলো তো। বিধানদা, ইসলামভাই-এর দিকে তাকাল।

সে কি আর বাকি রেখেছে। অনিমেষদা বললো।

আমি অনিমেষদার দিকে তাকালাম।

ও দুটো বলে ফেল, তাহলে আর একটু বুঝতে সুবিধে হবে। অনিমেষদা হাসছে।

বিজনকে জেরা করো, দেখবে সব জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে। তুমি বিধানদা যা এদের বলেছো যা এরা পরিকল্পনা করে এগিয়েছে সব পৌঁছে গেছে অনাদির কাছে।

অনাদিটা বেঁচে আছে না মরে গেছে?

ফোন করো।

অনিমেষদা হাসছে।

ঘণ্টা চারেক হলো স্যুইচ অফ।

মুখ্যমন্ত্রীকে বলো খুঁজে দেবে।                   

ওর সঙ্গে তুই একটা ভালো সাঁটগাঁট বেঁধে রেখেছিস।

বিধানদা মুচকি মুচকি হাসছে।

কেন?

সে তো বললো খবর পাঠিয়েছি। অনুপ ফোন করলে বলে, দাঁড়া না তাড়াহুড়ো করছিস কেন।

ও।

কাজ তো থেমে নেই?

তা থামবে কেন।

অনিমেষদা, বিধানদা দু-জনেই জোড়ে হেসে উঠলো।

তোমার জানা হয়ে গেছে? বিধানদা হাসত হাসতে অনিমেষদার দিকে তাকাল।

অনিমেষদা হাসতে হাসতেই মাথা দোলাচ্ছে।

নীপা গামছা নিয়ে এলো। আমার কোলের ওপর গামছাটা ছুঁড়ে দিল।

এই নাও।

আমি নীপার দিকে তাকালাম।

অনুপদা এবার ঝটপট করতে হবে অনেক বেলা হয়েছে। পৌনে চারটে। নীপা বললো।

চা আসুক মেরেই স্নান করতে ছুটবো।

আমি বেঞ্চে বসেই কোনওপ্রকারে গামছাটা কোমরে জরালাম।

কিরে! তুই এইভাবে হামাগুড়ি দিয়ে গামছা পরছিস?

মিত্রা আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাল।

অনেকক্ষণ একভাবে বসে আছি। পা ধরে গেছে।

চিকনা-মীরচাচা আমার দিকে তকিয়ে।

আমি গামছাটা জড়িয়ে ধীরে ধীরে প্যান্টটা খুললাম। ভাঁজ করতে যেতেই মিত্রা বললো।

তোকে আর কষ্ট করতে হবে না, সকাল থেকে অনেক কষ্ট করেছিস।

মিত্রা আমার হাত থেকে প্যান্টটা একপ্রকার ছিনিয়েই নিল। হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে পেছনটা দেখতেই চিকনা, মীরচাচা, নীপা, তনু জোড়ে হেসে উঠলো।

ইসলামভাইরা প্রথমটায় একটু অবাক হয়ে গেছে, হঠাৎ এরকম হাসির কারন কি?

মিত্রা ক্রূড় দৃষ্টি হেনে আমার দিকে তাকিয়ে। মিটি মিটি হাসছে।

ওরা তখনও হেসে গড়া গড়ি খায়।

চোরের মার বড়ো গলা। তাই না? মিত্রা ধমকালো।

আমি গম্ভীর হয়ে থাকার যথেষ্ট চেষ্টা করছি। পারছি না।

রতনরা সবাই হেসে নিজেদের জড়িয়ে ধরছে।

অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে। মুচকি মুচকি হাসছে।

কিরে মামনি? ইসলামভাই বললো।

না-গো, তখন নদীর বুকে নামতে গিয়ে পা-টা হরকে গেল। আমি বললাম।

গ্রামের ছেলে নদীর বুকে নামতে গিয়ে পা হরকে গেল। তনু ফুট কাটলো।

কেন হরকাতে পারে না। তুমি কি তোমার মিত্রাদির স্যাঙাত হয়েছো।

একটা সত্যিকে ঢাকতে গিয়ে কতগুলো মিথ্যে কথা বলবি।

মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে। আমি মুখ ঘুরিয়ে নিলাম।

এখানে আসার পর থেকে সারাক্ষণ অনিমেষদার দিকে ঠ্যাং তুলে রইলি। বহুবার বলেছি, পাত্তা দিলি না। জীবনে কখনও এরকম করেছিস?

তারমানে ও গাছে উঠেছিল! বিধানদা বললো।

এই দ্যাখো, পেছনটা পুরো জানলা। কেঁচকি মেরে বসে থাকবে না তো কি করবে?

মিত্রার কথায় হাসির ঢেউটা সমুদ্রের ঢেউ-এর মতো আছাড় খেয়ে পড়ছে।

ভেতর থেকে সুরোমাসি কাকীমারা বেরিয়ে এলো, বাসুও চোখ-মুখ ফোলা অবস্থায় ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে।

বাবাঃ তোমাদের তো বোঝা মুস্কিল, এক্ষুণি মেঘ এক্ষুনি ঝকঝকে আকাশ। কাকীমা অনিমেষদাদের দিকে তাকিয়ে বললো। ওরা তখনও সকলে হাসছে।

তোমার ছেলের কীর্তি দেখছো? মিত্রা কাকীমার দিকে প্যান্ট ঘোরালো।

কি!

বুঝতে পারছো না।

কাকীমার চোখ বরো বরো।

অনিদা তখন গাছে উঠে আম চুরি করেছে। প্যান্টের পেছন ফাটিয়েছে। নীপা বললো।

হাসি থেমে নেই। সুরোমাসি সেই হাসিতে যোগ দিল।

এই প্যান্টটা ঠিক এই ভাবে রেখে দেব। তোর দুই মেয়ে ফিরুক। তাদের দেখাব তোর কীর্তি। তারা তো বাবা আর মামা অন্তঃপ্রাণ। আমার কথা তনুর কথা তাদের বিশ্বাস হয় না। ভাবে খালি গল্প বলছি।

কাকীমা মিত্রাকে জড়িয়ে হাসছে। তুই আর এরকম করিস না বাপু।

তোমরা একবার ভাব। ওর বয়সটা এখন যেন বাসুর ছেলের মতো।

মিত্রা অনিমেষদার দিকে তাকাল।

যদি বেটক্কর পড়ে গিয়ে কোথাও লাগতো কি হতো বলো।

মিত্রা একবার করে বলে আর হাসির রোল ওঠে।

গাছে চড়ার নেশাটা মদ খাওয়ার মতো। চিকনা বলে উঠলো।

দেখছো, শুঁড়ির সাক্ষী কেমন মাতাল জুটেছে।

তনু ব্যাগ কোথায়? মিত্রা তনুর দিকে তাকাল।

নীপা। তনু নীপার দিকে তাকাল।

ওই বাড়িতে আছে। নীপা বললো।

প্যান্ট আর নিয়ে এসেছিস?

আরও দুটো আছে। গত সপ্তাহে যে দুটো কিনলে সেই দুটো।

এটা?

এটাও তো একসঙ্গে কিনলাম।

আজ প্রথম পড়েছিল?

হ্যাঁ।

তনু বেশ তৃপ্তি করে কথা বলছে।

বাসুর বৌ চায়ের ট্রে নিয়ে এলো।

নীপা সবার জন্য নিয়ে আসি? লতা তাকাল নীপার দিকে।

থার্মোকলের গ্লাস আছে না?

হ্যাঁ।

পটে করে নিয়ে চলে এসো ঢেলে দিচ্ছি।

ভানু, সঞ্জু ও বাড়ি থেকে এলো। চিকনা, মীরচাচার দিকে তাকাল।

চল।

একটু চা খেয়ে নিই।

তন্যে তখন হাসছিলু কেন? ভানু বললো।

গুরুমাকে জিজ্ঞাসা কর।

কি হয়েছে গো ম্যাডাম? সঞ্জু বললো।

অনিদা গাছে উঠে প্যান্টের পেছন ফাটিয়েছে। নীপা বললো।

প্যান্ট খুলে উঠিস নি! সঞ্জু আমার দিকে তাকাল।

আবার হাসা-হাসি শুরু হয়েগেল।

তোমরা ওইরকম করো নাকি? মিত্রা সঞ্জুর দিকে তাকাল।

না হলে ভীষণ অসুবিধে হয়। রিক্স হয়ে যায়।

অনিমেষদা, বিধানদা হেসেই চলেছে।

সব এক গোয়ালের গরু।

সঞ্জু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।

কনিষ্কদা দুফুরে দুটি ভাত খায়ে ওষুধ খাইতে কইছে। রাতে কানাই কম্পাউন্ডার আইসবে ইনজেকসন দিবে। ভানু বললো।

কইলো যে ইনজেকসন দিবে নি। ট্যাবলেট দিবে। মীরচাচা বললো।

দু-টাই দিছে। দিনে দু-টা পাঁচ দিন লিতে হবে সকাল বিকেল।

দেখলাম গাঙ্গুলী ঘরের পুকুর ধার থেকে বেরিয়ে একটা বছর চোদ্দর ছেলে খামার দিয়ে এদিকে এগিয়ে আসছে। মাথায় একটা ছোট্ট বস্তা।

হ্যাঁগো মীরচাচা, বিনদদার ছেলে কোথা থেকে এলো। বাসু বললো।

বাচ্চাটা এগিয়ে এসে বেঞ্চিতে চিকনাকে দেখে হেসে ফেললো।

তুই কাইনু আইসুঠুরে কইচা। চিকনা বললো।

ধরো দিনি আইগে, বেজায় ভার।

বাসু উঠে যাওয়ার আগেই চাঁদ ওর মাথা থেকে বস্তা নামিয়ে দিয়েছে।

এতে কি আছে রে কইচা। বাসু বললো।

আম, কঁতবেল (কঁয়েতবেল)।

মিত্রা ফিক করে হেসে ফেললো।

হাসির রোগ। আবার সকলে হাসছে।

কি হবে?

ত্যাখন কে মোদের গাছে ন্যাংটো হয়ে উইঠ্যা আম পারতিছিল। বাবা দেখছে। সে নাকি মস্ত লোক।

চিকনা আর থাকতে পারলো না শরীর কাঁপিয়ে হাসতে গিয়ে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠলো।

সবাই হাসছে।

তুই আর হাসিস না। বাসু চিকনাকে ধমকালো।

তোর বাপ আম আর কঁতবেল পেরে পাঠি দিল। বাসু বাচ্চাটার দিকে তাকাল।

হ। কইলো মনা মাস্টারের বাড়ি লেই যা। দিদিমনির হাতে দিতে কইছে।

নীপা ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে। হেসেই চলেছে।

হাসিস না, তোর অনিদার কীর্তি দেখ। সারা গ্রাম রাষ্ট্র হয়ে গেছে।

মিত্রা বলছে আর আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।

তুই তাকে দেখছু? বাসু বললো।

না, আমি ত্যাখন জাম গাছে উঠছিলি।

খালের ধারে?

হ।

যা কইচা তুই এবার যা। বাপকে গিয়ে কইবি দিদিমনির কাছকে পৌঁছে দিছু।

বাচ্চাটা চলে গেল।

বাসুর কথা শুনে রতনরা হেসেই চলেছে।

আমি চা খাচ্ছি মুচকি মুচকি হাসছি। সঞ্জু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে।

আধদামড়া ছেলে ন্যাংটো হয়ে গাছে ওঠা। মিত্রা তেরে এলো।

একবারে ঝামেলা করবি না।

ঝামেলা করবি না মানে।

জাঙ্গিয়া পরা ছিল।

আমার কথায় সকলে হাসছে। মিত্রাও হসে ফেললো।

শয়তান।

আমি হাসছি।

আর হাসিস না, আম নিয়ে পুরো আম ষষ্ঠী বানিয়ে দিলি। মিত্রা বললো।

(আবার আগামীকাল)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev