নদীর দেশের ‘বিলেত ফেরতা’ এক মানুষ কর্মসূত্রে সমুদ্রের দেশে এসে সমুদ্রের মতই হয়ে উঠেছিলেন বিদ্রোহী। ব্রিটিশ প্রশাসনের আধিকারিক হয়েও স্বদেশের গরিব কৃষকদের স্বার্থে জমির খাজনা বৃদ্ধির প্রশাসনিক নির্দেশের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই শুধু নয়, কৃষক বিরোধী খাজনা বৃদ্ধির নির্দেশ বাতিল করতেও বাধ্য করিয়েছিলেন। সমুদ্রের মত বিদ্রোহী সেই মানুষের পিতৃদত্ত নাম দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের বদলে কাজলাগড়ের কৃষকরা কৃষক হিতৈষী হিসেবে তাঁর নতুন নামকরণ করেছিলেন ‘দয়াল রায়’।

অপরিচিত ‘দয়াল রায়’ বা চির পরিচিত ডি.এল.রায় বা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের স্মৃতি বিজড়িত বর্ধমান রাজ এস্টেটের কাজলাগড় রাজবাড়ি উপেক্ষা আর অবহেলায় খন্ডহরে পরিণত। কাজলাগড়ের রাজবাড়ির সঙ্গে বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যেতে বসেছে বর্ধমান এস্টেটের সেটেলমেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মরত অবস্থায় ‘দয়াল রায়’ হয়ে উঠার গৌরব গাঁথা। কাজলাগড় রাজবাড়ির ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ইতিহাসের চুপ কথা জানান দেয়, বর্ধমান রাজ এস্টেটের সুজামুঠা পরগনার (বর্তমানে পূর্ব মেদিনীপুর) ভগবানপুরের কাজলাগড়ের রাজবাড়িতে ১৮৯০ সালে সেটেলমেন্ট অফিসার হিসেবে দ্বিজেন্দ্রলাল আসেন। একাধারে কবি, গীতিকার, সুরকার ও নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জন্ম ১৮৬৩ সালের ১৯ জুলাই কৃষ্ণনগরের দেওয়ান পরিবারে। বাবা কার্তিকেয় চন্দ্র রায় ছিলেন নদিয়ার কৃষ্ণনগরের মহারাজের দেওয়ান। মা প্রসন্নময়ী দেবী। কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল থেকে এন্টান্স, কৃষ্ণনগর কলেজ থেকে এফএ, হুগলি কলেজ থেকে বি.এ পাস করার পর ১৮৮৪ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এম.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ছাত্র জীবন থেকেই একদিকে দেশপ্রেম, অন্যদিকে সাহিত্যপ্রেম এই দুই প্রেমে আসক্ত দ্বিজেন্দ্রলাল ১৮৮২ সালে কলেজে পড়ার সময়েই ইংরেজিতে লিখে ফেলেছিলেন তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আর্যগাথা’-র প্রথম ভাগ। এম.এ পড়াকালীন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল। বায়ু পরিবর্তনের জন্য ছাপড়া জেলায় যান। সেখানকার রেভেলগঞ্জ মুখার্জি সেমিনারিতে শিক্ষকতার কাজ নেন। দু’মাস পরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্র হিসেবে কৃষিবিদ্যা শিক্ষার জন্য সরকারি স্টেট স্কলারশিপ নিয়ে ১৮৮৪ সালে ইংল্যান্ড যান। ইংল্যান্ডের সিরেনসেস্টার কলেজ থেকে কৃষি বিদ্যায় এফ আরএএস ডিগ্রি পান। পাশাপাশি ‘এম আর এস এই’ ও ‘এম আর এসি’ খেতাব অর্জন করেন। দীর্ঘ তিনবছর ইংল্যান্ডে থাকার সময়েই পাশ্চাত্য সঙ্গীত শিক্ষায় মেতে থাকা ছাড়াও সেখানকার থিয়েটারে প্রায়ই অভিনয় করতেন। পরবর্তীকালে যা দ্বিজেন্দ্রলালকে নাট্যচর্চায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। ১৮৮৬ সালে স্যার এডুইন আর্নল্ডকে উৎসর্গ করে ‘লিরিকস অফ ইন্ড’ নামে ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন। যার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন স্বয়ং স্যার আর্নল্ড।

বিলেতে থাকার সময়েই পিতৃ ও মাতৃ বিয়োগ হয় দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের। তিন বছর পর ১৮৮৬ সালে দেশে ফিরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে মধ্যপ্রদেশের সার্ভে ও সেটলমেন্ট অফিসে সরকারি যোগ দেন। ১৮৮৭ সালে জমি জরিপ, জমাবন্দি-র কাজ শেখার জন্য মজঃফরপুরে বদলি হন। ১৮৯০ সালে সেটলমেন্ট অফিসার হিসেবে বর্ধমান রাজ এস্টেটের সেটেলমেন্ট অফিসার হিসেবে কাজলাগড়ে বদলি হন। কাজলাগড়ে আসার আগে ১৮৮৭সালে কলকাতার প্রখ্যাত চিকিৎসক প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের কন্যা সুরবালা দেবীর সঙ্গে বিয়ে হয় দ্বিজেন্দ্রলালের ।

কাজলাগড়। হিজলী নিমক মহালের সুজামুঠা পরগনার কাজলাগড়ের নাম নিয়ে এক কিংবদন্তী জড়িয়ে রয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে উপকূলবর্তী জঙ্গলময় এই অঞ্চলে শিকার করতে এসে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়া এক শিকারি ঘুমের মধ্যে মা কালীর স্বপ্ন দেখেন ও ঘুম ভাঙতেই পাশেই পাথরের কালীমূর্তি পড়ে থাকতে দেখতে পেয়ে ওখানেই কালীপুজো করেন। জঙ্গল কেটে কালীর গড় নাম দিয়ে বসতি স্থাপন করে দলবল নিয়ে বসবাস শুরু করেন। সেই ‘কালীর গড়’ পরবর্তীকালে লোক মুখে কাজলগড় ও তা থেকেই কাজলাগড় হিসেবে পরিচিত হয়। হিজলীর নিমক মহালের জায়গীরদার গোবর্ধন রণঝাঁপ কাজলাগড় রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা হলেও তার উত্তরসূরি মহেন্দ্র নারায়ণের সময়েই রাজবাড়ি, নবরত্ন মন্দির, উদ্যান তৈরি হয়ে কাজলাগড়ের রাজবাড়ির সমৃদ্ধি ঘটে। রাজ বংশের পরবর্তী রাজা গোপালেন্দ্র রণঝাঁপ ১৮০৭ সালে একটি বিশাল দিঘী খনন করেন। নামে কাজলাগড়ের রাজা হলেও গোপালেন্দ্রকে জায়গীরদার হিসেবেই সম্রাটকে খাজনা দিতে হত। সময়মত খাজনা দিতে না পারায় কাজলাগড়ের জমিদারি নিলামে উঠলে বর্ধমান রাজ এস্টেট সেই জমিদারি কিনে নেয়। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বর্ধমান রাজ এস্টেটের সেটেলমেন্ট অফিসার হিসেবে ১৮৯০ সালে সস্ত্রীক কাজলাগড়ে এসে বসবাস শুরু করেন। কাজলাগড়ের সুরম্য রাজবাড়ি, রাজবাড়ি সংলগ্ন বিশাল দিঘির পাড়ে বকুলবিথি, দিঘির স্বচ্ছ টলটলে জল, কাজলাগড়ের গ্রামীণ অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর স্ত্রী সুরবালার সান্নিধ্যে দ্বিজেন্দ্রলালের সুপ্ত কবিমনে সাহিত্য চর্চার অঙ্কুরিত বীজটি চারাগাছের রূপ নেয়। সেটলমেন্ট অফিসার হিসেবে প্রতিদিন মফস্বলে গিয়ে জমি জরিপ, জমাবন্দি-র হিসেব,খাজনা আদায়ের প্রশাসনিক কাজকর্মের ফাঁকে দিঘিরপাড়ে বকুল গাছের নীচে বসে অনেক কবিতা, গান ও নাটক লিখেছিলেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যা অমূল্য সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত। কাজলাগড়ে তিন বছর অবস্থান কালে দিঘির পাড়ে বসে লেখা কবিতাগুচ্ছ নিয়ে ১৮৯৪ সালে দ্বিজেন্দ্রলালের ‘আর্যগাথা’ কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় ভাগ প্রকাশিত হয়। পাশাপাশি চলতে থাকে জমিজমা জরিপের কাজ।

জরিপ কর্তা হিসেবে কাজলাগড়ে কাজ করার সময়ে দ্বিজেন্দ্রলাল লক্ষ্য করেন, জমি জরিপের আইনের সুযোগ নিয়ে ব্রিটিশ প্রশাসন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অরাজকতা ও খাজনা আদায়ের নামে গরিব কৃষকদের উপর কার্যত অত্যাচার চালাচ্ছে। ১৭৯৩ সালের জমি জরিপ আইনে খাজনা চিরস্থায়ী রূপে সুনির্দিষ্ট ঘোষিত হলেও বাস্তব কার্যক্ষেত্রে তার ভুল ব্যাখ্যার ফলে একদিকে ধনী ভূস্বামী জমিদাররা যেমন লাভবান হচ্ছেন পাশাপাশি গরিব কৃষকরা চরম ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। ব্রিটিশ প্রশাসনের খাজনা বৃদ্ধির এই অপ কৌশলের প্রয়োগ ও সাফল্য বাংলা সহ সারা দেশেই চালু ছিল। গরিব কৃষকদের পক্ষ নিয়ে জরিপ কর্তা দ্বিজেন্দ্রলাল খাজনা বৃদ্ধির এই অপকৌশলকে অন্যায় ও আইন বিরুদ্ধ বলে ঘোষণা করেন করে প্রশাসনের কাছে জমির কর বা খাজনা বৃদ্ধি বন্ধের সুপারিশ করেন। অন্য দিকে, ড্রেনেজ খাল বন্ধের ফলে সেচের জলের অভাবে কৃষি ফসলের বার্ষিক উৎপাদনের হার উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যাওয়ার জন্য কৃষক দরদী দ্বিজেন্দ্রলাল রায় গরিব কৃষকদের খাজনার পরিমাণ আনুপাতিক হারে কমিয়ে দেন। খাজনা বৃদ্ধি বাতিলের নির্দেশে ব্রিটিশ প্রশাসনের একাংশে যেন আগুনে ঘি পড়ল। সেই সঙ্গে যুক্ত হল বর্ধমান রাজ এস্টেটের স্বার্থান্বেষী কিছু রাজ কর্মচারীদের অভিসন্ধি। তারা বাংলার তৎকালীন ছোটলাট স্যার চার্লস ইলিয়টের কাছে দ্বিজেন্দ্রলালের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানান। দ্বিজেন্দ্রলালের সঙ্গে এনিয়ে ছোটলাটের জমি জরিপ আইন নিয়ে তুমুল উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। ইলিয়ট বাংলার জমি জরিপ আইনের আইনজ্ঞ নন বলেই তাঁর রায় বাতিল করতে চাইছেন বলে দ্বিজেন্দ্রলাল মুখের উপর বলে বলে দেন। এতে অপমানিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে ছোটলাট স্যার ইলিয়ট দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের চাকরিতে প্রমোশন বন্ধ করে দেন। অন্যদিকে, প্রজাদের খাজনা বৃদ্ধি আইনানুগ দাবি করে খাজনা বৃদ্ধির পক্ষেও দ্বিজেন্দ্রলালের বিরুদ্ধে জেলা জজকোর্টে ব্রিটিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়।

জেলা জজকোর্টে দ্বিজেন্দ্রলালের বিরুদ্ধে রায় হয়। এই অন্যায় রায়ের বিরুদ্ধে জমির অসহায় রায়তেরা হাইকোর্টের শরণাপন্ন হলে হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে খাজনা বৃদ্ধির বিপক্ষে ও দ্বিজেন্দ্রলালের পক্ষে রায় দেন। হাইকোর্টে জয়লাভ করে দ্বিজেন্দ্রলাল নিজেই লিখেছিলেন, ‘আমি এই ক্ষুদ্র ক্ষমতাতেই উক্ত কার্যে নিজের গায়ে কুঠারাঘাত করিলেও সমস্ত বঙ্গদেশ ব্যাপী এক বিরাট উপকার করিয়াছি। নিরীহ প্রজাদিগকে অন্যান্য কর বৃদ্ধি হতে বাঁচাইয়াছি’। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের কৃষক দরদী এই মনোভাবের জন্য কাজলাগড়ের মানুষ দ্বিজেন্দ্রলাল রায়কে ‘দয়াল রায়’ নতুন নামে অভিহিত করেন। কাজলাগড়ে মাত্র তিন বছর থাকার পর দ্বিজেন্দ্রলাল অন্যত্র বদলি হয়ে যান। কিন্তু কাজলাগড়ে থাকার সময়েই বাংলার অসহায় কৃষকদের জন্য অন্যায় ও আইন বিরুদ্ধ খাজনাবৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক আধিকারিক হয়েও অনন্য সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার জন্য বাংলার কৃষক সমাজে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ওরফে ‘দয়াল রায়’ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।