দুর্গাপুজোয় সপ্তমীর দিন সকালে তিথি নক্ষত্র মেনে কলাবউ স্নান করানো এক আবশ্যিক কর্ম৷ অনেকে বিশ্বাস করেন, কলাবউ হল গণেশের স্ত্রী৷ যেহেতু দুজনের অবস্থান পাশাপাশি৷ আসল ঘটনা হচ্ছে ‘কলাবউ’ ব্রহ্মার স্ত্রী৷ তাই তার আর এক নাম ব্রহ্মাণী৷ শাস্ত্রমতে নবপত্রিকার প্রধান উপকরণ এই নয়টি পাতাযুক্ত কদলীবৃক্ষ৷ অন্যান্য উদ্ভিদ হল কচু, হরিদ্রা, অশোক, দাড়িম্ব, বিল্ব, জয়ন্তী, মানকচু ও ধান্য৷ কলাবউ স্নানের পর কদলীবৃক্ষটিকে লালপাড়বিশিষ্ট কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়৷ অন্যান্য উদ্ভিদগুলি সুতোয় বা অপরাজিতা লতায় একত্রে বেঁধে কলাবউয়ের পাশে স্থাপন করা হয়৷ প্রত্যেক উদ্ভিজ্জের জন্য একজন অধিষ্ঠাত্রী দেবদেবী থাকেন৷ কদলীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন ব্রহ্মাণী৷ যেমন ধান্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষ্মী, বিল্বের দেবতা শিবা৷ এছাড়া রক্তদন্তিকা, শোকরহিতা, কালীও আছেন৷ কিন্তু কলাবউ গণেশের স্ত্রী নয়। অভিধান জানাচ্ছে ‘ক’-এর একটি প্রধান অর্থ ‘ব্রহ্মা’৷ ‘লাব’ মানে ছিন্ন বা ছেদিত অংশ৷ ‘কলাব’ শব্দটির অর্থ ব্রহ্মার শরীর থেকে ছিন্ন হয়ে যার উৎপত্তি, অর্থাৎ ‘ব্রহ্মাণী’৷ বস্তুত ‘কলাব-বধূ’ অপভ্রংশের ফলে কলাবধূ তথা কলাবউ হয়ে গেছে৷ হিন্দুদের প্রধান শস্যদেবী হল ব্রহ্মাণী৷ কলাবউ-এর অবগুণ্ঠনময়ী রূপের আড়ালে হিন্দুদের নবশস্যের সৃষ্টির সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে৷
নবপত্রিকার ৯টি উদ্ভিদ আসলে দুর্গার ৯টি বিশেষ রূপের প্রতীক। এই ৯ দেবী হলেন রম্ভাধিষ্ঠাত্রী ব্রহ্মাণী, কচ্বাধিষ্ঠাত্রী কালিকা, হরিদ্রাধিষ্ঠাত্রী উমা, জয়ন্ত্যাধিষ্ঠাত্রী কার্তিকী, বিল্বাধিষ্ঠাত্রী শিবা, দাড়িম্বাধিষ্ঠাত্রী রক্তদন্তিকা, অশোকাধিষ্ঠাত্রী শোকরহিতা, মানাধিষ্ঠাত্রী চামুণ্ডা ও ধান্যাধিষ্ঠাত্রী লক্ষ্মী। এই নয় দেবীকে একত্রে “নবপত্রিকাবাসিনী নবদুর্গা” নামে ‘নবপত্রিকাবাসিন্যৈ নবদুর্গায়ৈ নমঃ মন্ত্রে পূজা করা হয়।
মহাসপ্তমীর দিন প্রত্যূষে কাছের কোনও নদী বা কোনও জলাশয়ে নবপত্রিকা নিয়ে যাওয়া হয়। গৃহকর্তা বা পুরোহিত নিজেই কাঁধে করে নবপত্রিকা নিয়ে যান। তাঁর পিছন পিছন ঢাকীরা ঢাক বাজাতে বাজাতে এবং মহিলারা শঙ্খ ও উলুধ্বনি করতে করতে যান। পাঁচ বা সাতজন এয়োস্ত্রী মাস্ট। শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী স্নান করানোর পর নবপত্রিকাকে নতুন শাড়ি পরানো হয়। দেবীর ডান দিকে একটি কাষ্ঠসিংহাসনে স্থাপন করা হয়। পুজোমণ্ডপে নবপত্রিকা প্রবেশের মাধ্যমে দুর্গাপুজোর মূল অনুষ্ঠানটির শুরুয়াৎ।
এরপর বাকি দিনগুলিতে নবপত্রিকা অন্যান্য দেবদেবীদের সঙ্গেই পূজিত হতে থাকে। লক্ষণীয় হল, নবপত্রিকা প্রবেশের আগে পত্রিকার সামনে দেবী চামুণ্ডার আবাহন ও পুজো করা হয়। নবপত্রিকাস্থ অপর কোনও দেবীকে পৃথক ভাবে পুজো করা হয় না। কলাবউ যদি ব্রহ্মাণী হয়, তাহলে অন্য কথা।
ডঃ শশিভূষণ দাশগুপ্ত লিখেছেন, ‘এই শস্যবধূকেই দেবীর প্রতীক রূপে গ্রহণ করিয়া প্রথমে পূজা করিতে হয়, তাহার কারণ শারদীয়া পূজার মূলে বোধহয় এই শস্য-দেবীরই পূজা।’ পরবর্তীকালের বিভিন্ন দুর্গাপুজোর নিয়মে এই নবপত্রিকার বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। পৌরাণিক দুর্গার সঙ্গে এই শস্যদেবীকে মিলিয়ে দেওয়ার একটা সচেতন প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নবপত্রিকা যেন শস্যনির্ভর জনগোষ্ঠীর একটি টোটেম। কলাবউও টোটেম হয়ে দেবী দুর্গার ডানদিকে বিরাজ করে।