বিষধর কালাচ সাপের আতংক এখন আরামবাগ ও খানাকুল জুড়ে। গত ছ-মাসে কয়েক জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া দু-টি ব্লকের বিভিন্ন জায়গায় এই প্রজাতির সাপের দেখা মেলায় সন্ত্রস্ত মানুষ। খানাকুলের নন্দনপুর, বন্দীপুর, রামচন্দ্রপুর এবং আরামবাগের পীরিজপুর, হরিণখোলা ইত্যাদি এলাকায় এই সাপের কামড়ে কয়েকজন মারা গেছেন। এছাড়া হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন অনেকে। এখন রাত হলে একটাই আতংক কালাচ সাপকে নিয়ে।
আরামবাগ স্নেক অ্যান্ড অ্যানিমাল রিলিফ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মঙ্গল সাউ বলেন, গত পাঁচ বছর আগেও খানাকুল ও আরামবাগে কালাচ প্রজাতি সাপের উপদ্রব ছিল না। নদীবাহিত এলাকার জন্য দক্ষিণ ২৪ পরগণার সুন্দরবন এলাকা থেকে এখানেও চলে আসছে। সাধারণত এই দুটি ব্লকে বিষধর সাপ বলতে চন্দ্রবোড়া ও গোখরো সাপের দেখা মিলত। কিন্তু ইদানীং লক্ষ্য করা যাচ্ছে এতদ অঞ্চলে কালাচ সাপের উপদ্রব। রহস্যময় সাপ। পিঁপড়ার মতো কামড়ায়। জায়গা অসাড় হয়ে যায়। কামড়ানোর দাগ থাকে না। ফুলেও যায় না। জ্বালা-যন্ত্রণা হয় না। পেট ও গলায় ব্যথা করে। শরীর জুড়ে অস্বস্তি। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে রোগি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। কামড়ালে যদি বুঝতে না পারা যায় তাহলেই তো বিপদ। এই নিয়েই চিন্তিত অভিভাবকেরা। বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে ভাবনা বাবা-মায়ের। আর এই শিশুদেরই কামড়ানোর সংখ্যা বাড়ছে।
সর্প বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এই প্রজাতি সাপের বিচরণক্ষেত্র হল শ্রীলঙ্কা, ভারত, বালাদেশ, মায়ানমার, মালয়েশিয়া, চিন, নেপাল ইত্যাদি জায়গা। আমাদের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগণাতেই বেশি দেখা মিলত। বিশেষ করে সুন্দরবন এলাকায়। এরা নদীবাহিত স্যাঁতস্যাাঁতে এলাকায় থাকতে ভালোবাসে। সাধারণত খাবারের সন্ধানে রাতে বের হয়। সুন্দরবন এলাকা থেকে নদীবেয়ে হুগলির আরামবাগ ও খানাকুলেও হানা দিয়েছে। ছিপছিপে কালো রঙের উপর সাদা সাদা ডোরাকাটা দাগ থাকে। ফণাহীন এই সাপের বিষ অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞরা আরও জানাচ্ছেন , অনেক জায়গায় এই কালাচ সাপের আলাদা আলাদা নাম। যেমন ডোমনাচিতি, শাঁখাচিতি, শিরচাঁদা ও নিয়রচাঁদা বলেও উল্লেখ করা হয়। কেউ কেউ আবার ঘামচাটা সাপও বলে থাকেন। বাড়ির আনাচকানাচে, ঝোপঝাড়ে এদের দেখা মেলে। এমনকী এই প্রজাতির সাপ বিছানা ও বালিশের নিচে থাকতে ভালোবাসে। মানুষের ঘামের গন্ধে এরা বিছানায় ওঠে আসে। মানুষের সাহচর্য এদের পছন্দ। তবে এরা নিশাচর।
উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে এই কালাচ সাপের কামড়ে গড়ে প্রায় এক হাজার মানুষ মারা যান। যার প্রায় অর্ধেক স্বল্প বয়সী। বিশেষজ্ঞদের মতে সাপে কামড়ালে গ্রামের মানুষ এখনো প্রথমেই ওঝা ও গুনিনের কাছে ছুটে যান। বিপদটা এখানেই। চিকিৎসা শুরু করতে অনেক সময় দেরি হয়ে যায়। ফলে মৃতু হয় অনেকের। কালাচ সাপে কামড়ালে মুশকিল হল অনেক মানুষ বুঝতে পারেন না। যেহেতু জ্বালা – যন্ত্রণা নেই। একটু সজাগ বা সচেতন থাকা জরুরি।কখনোই ওঝা বা গুনিনের কাছে যাবেন না।
নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষ পীতবরণ চক্রবর্তী জানান, কালাচ সাপে কামড়ালে প্রধানত তিন ধরনের লক্ষণ ধরা পড়ে। প্রথমত, হেমোটক্সিন বা রক্ত দূষণ। দ্বিতীয়ত, মায়োটক্সিন বা মাংসপেশি অকার্যকর। তৃতীয়ত, নিউরোটক্সিন বা মস্তিষ্কের অসাড়তা। কালাচ সাপে কামড়ালে সঙ্গে সঙ্গে কাছাকাছি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। যাতে দ্রুত চিকিৎসা শুরু হয়। তাহলেই রোগি সুস্থ হয়ে উঠবে।
মানষের অভিযোগ, সুন্দরবনের ত্রাস এখন হুগলিতে। খানাকুল ,আরামবাগ, পুরশুড়া ও পোলবা ব্লকে এই প্রজাতির সাপের দেখা মিলছে।এতেই মানুষের মনে দেখা দিয়েছে আতংক। বিশেষ করে চাষিমহলে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, অযথা ভয় পাবেন না। বিষধর সাপ কামড়ালেই মৃত্যু হয় না। সঠিক সময়ে চিকিৎসা হলে সবাই সুস্থ হন। কালাচ বা বিষধর সাপের হাত থেকে রক্ষা পেতে বাড়ির আশপাশ অবশ্যই পরিষ্কার রাখুন। প্রয়োজনে কার্বলিক অ্যাসিড ব্যবহার করুন বাড়ির আশপাশে। কালাচ সাপ যেহেতু বিছানা ভালোবাসে, তাই শুতে যাবার আগে ভালো করে বিছানা ঝেড়ে নেন। সেইসঙ্গে অবশ্যই মশারি খাটিয়ে চারপাশ ভালো করে গুঁজে নেন। মনে রাখতে হবে সাপ নিরীহ ও শান্ত প্রাণী। ওকে আঘাত করলে কিংবা বিরক্ত করলে বাঁচার জন্য ছোবল মারে। এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এক ছোবলেই ছবি — এটা ভেবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।