উদ্বোধন পত্রিকায় প্রকাশিত বর্তমান ভারত রচনাটির সমাপ্তি মুহূর্তে স্বামী বিবেকানন্দ জানিয়েছেন যে, ব্যক্তি, সমাজ, দেশ, সমগ্র বিশ্ব তথা সব কিছুই‘বিরাট মহামায়া’-র ছায়ামাত্র। তাঁকে ঘিরেই ভূমি থেকে ভূমায় উত্তরণ। এই মহামায়াই হলেন বিবেকানন্দের কাছে কালী। কালী অন্ধকার থেকে আলোর পথে, আসুরিকভাব থেকে সুরলোকভাবে, আসক্তি থেকে নিরাসক্তিতে, কাপুরুষতা থেকে দুর্বলতা থেকে মহাসংগ্রামে পৌঁছে দেন। তিনি সমন্বয়কারিণীও বটে। শাক্ত কবিরা তা জানাতে ভোলেন না— ‘ও রে শত শত সত্য বেদ, তারা আমার নিরাকারা’।
বিবেকানন্দের কালী এই ভাবনারই দ্যোতক। দ্বৈত থেকে অদ্বৈতে পৌঁছোবার এই সাধনা শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনে পূর্ণতা পেয়েছে। রামকৃষ্ণ পরমহংসের প্রেরণাই বিবেকানন্দের হৃদয়ে জাগিয়ে তুলেছিল কালী মহাকালীর অনুধ্যান। যদিও তাঁর কাছে ভবতারিণীর অভয়া বরদা মূর্তির চেয়েও বড়ো হয়ে উঠেছে সৃষ্টিস্থিতি বিনাশিনী প্রলয়ঙ্করী মূর্তি! এই প্রলয়ের মধ্যেই আছে নূতন সম্ভাবনা— আদিভূতা, সনাতনীর এই লীলা মানবজগতের জীবনের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। শ্রীরামকৃষ্ণের চরম উপলব্ধিতে ব্রহ্ম এবং শক্তি বা কালী এক। এঁদের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। বিবেকানন্দ প্রথম জীবনে ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে যুক্ত থাকায় একেশ্বরবাদ ও নিরাকারে বিশ্বাসী ছিলেন। যুক্তি-মনন-প্রজ্ঞা ছিল তাঁর জীবনের অলংকার। রামকৃষ্ণ পরমহংসের সান্নিধ্যে আসার পরেও তার সঙ্গে নানা বিষয়ে যুক্তিতর্কে অবতীর্ণ হয়েছেন। কালীসাধনা ছিল তারই অন্যতম। নরেন্দ্রনাথ তার স্বভাবসুলভ মানসিকতায় ভবতারিণী কালীকে মানতে পারেননি, মানতে চানওনি। ব্রাহ্ম মতাদর্শে কালীমূর্তি তাঁর কাছে পুতুল ছাড়া দ্বিতীয় কিছু নয়। শেষ পর্যন্ত শ্রীরামকৃষ্ণের কৃপায় তিনি মা কালীর স্বরূপ সাক্ষাৎ উপলব্ধিতে কালীরূপী রামকৃষ্ণ ও রামকৃষ্ণরূপে কালীকে প্রত্যক্ষ করেন। বিবেকানন্দের কাছে এই উপলব্ধি ছিল সত্য থেকে শাশ্বত সত্যে, আনন্দ থেকে পরমানন্দে, স্বরাট থেকে বিরাটে উত্তরণ। জীবে-শিবে-শক্তিতে একই অবস্থান। নরেন্দ্রনাথ কালী ‘মেনেছে’— এই উদ্বেলিত আনন্দে শ্রীরামকৃষ্ণ হাততালি দিয়ে সকলকে তা জানিয়েছেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছিল দক্ষিণেশ্বরে ১৮৮৪-র একটি বর্ষণমুখরিত দিনে।
প্রসঙ্গত, আমরা চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করব। ক) ১৮৯৮-এর ১১ মে সতীর্থদের সঙ্গে সন্ন্যাসীশিষ্য-সহ ওলিবুল, জোসেফিন ম্যাকলাউড, নিবেদিতাকে নিয়ে হিমালয় পরিক্রমায় বেরিয়ে আলমোড়া-নৈনিতাল হয়ে কাশ্মীর-অমরনাথের পথে ২৬ জুন ক্ষীরভবানীদেবীর মন্দির দর্শনে যাবার আগে প্রবল অলোড়নের সূত্রে লিখলেন বিবেকানন্দ সেই প্রখ্যাত কবিতা ‘Kali the Mother’—এই প্রথম সরাসরি মা কালিকাকে নিয়ে কবিতা।—সাক্ষী নিবেদিতা। নিবেদিতা তাঁর ‘The Master as I saw Him’ (স্বামী মাধবানন্দ কর্তৃক অনুবাদে বাংলাভাষায় প্রকাশিত। ‘স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়াছি’)… এই সময়ের কথা নৈপুণ্যের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। দুঃখ-মৃত্যু-ভয়ংকরের মিলিত প্রকাশ বিবেকানন্দের হৃদয়ে প্রবল হয়ে উঠেছিল সেই সময়ে। ‘Kali the Mother’ কবিতাটির রচনা সম্পূর্ণ করে তীব্র আবেগের অবসানে বিবেকানন্দ অবসন্ন দেহে মন্দিরের মধ্যে লুটিয়ে পড়েছেন। রুদ্র ও ভয়ানক রসের সম্মিলনের এমন কবিতা নিঃসন্দেহে বিরল। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত পরবর্তীকালে ‘মৃত্যুরূপা মাতা’ শিরোনামে সংশ্লিষ্ট কবিতাটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন। কবিতাটি শুরু হয়েছে শাশ্বত অন্ধকারের বর্ণনার মধ্য দিয়ে যা বিবেকানন্দের অত্যন্ত প্রিয়।

‘The star are blotted out,/ The clouds are covering clouds,/ It is darkness, vibrant, sonant’— ‘নিঃশেষে নিভিছে তারাদল/ মেঘ এসে আবরিছে মেঘ/ স্পন্দিত ধ্বনিত অন্ধকার গরজিছে ঘূৰ্ণ্য বায়ুবেগে।’
প্রলয় ঝড়ের এবং প্রগাঢ় তমিস্রার এই ভীষণ সুন্দর রূপ আমাদের মনে করিয়ে দেয় ‘তমঃ আসীৎ তমস্য গূঢ়মগ্রে’এবং তন্ত্রে‘মহামেঘং প্রভাং শ্যামাং’—এই দুটি মন্ত্রকে। প্রকৃতির উদার প্রেক্ষিতে মহাকালীর প্রলয়নৃত্যের রূপ প্রকাশিত হয়েছে ‘In the roaring, whirling wind/ Are the souls of a million lunatics/ Just loose from the prison house.’— ঘূর্ণায়মান বায়ুমণ্ডলে লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত প্রাণের তীব্র আত্মঘোষণা—‘মহাবৃক্ষ সমূলে উপাড়ি ফুৎকারে উড়ায়ে চলে পথে’।
বিবেকানন্দ লিখছেন—
‘Thousand, thousand shades/ of Death begrimed and black—/ scattering plagues and sorrows,/ Dancing madwith joy/ come, Mother come!’
স্বামী বিবেকানন্দ উপলব্ধি করেছেন, যিনি ভূমি ও ভূমার অধীশ্বরী, আছেন ভিতরে-বাহিরে তাঁর এই কালনৃত্য অধিগত করা বড়ো সহজ নয়। এই নৃত্যছন্দ যিনি আয়ত্ত করতে পারেন মাতৃরূপা শক্তি তাঁর কাছেই ধরা দেন, প্রভাসিত হয়। পরমা প্রকৃতির রহস্য তিনিই উদ্ধার করতে পারেন।
খ) ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে ‘উদ্বোধন’ পত্রিকার দ্বিতীয় বর্ষের (মাঘ, ১৩০৬) প্রথম সংখ্যায় বিবেকানন্দ লিখলেন ‘Kali the Mother’-এর সম্পূরক ‘নাচুক তাহাতে শ্যামা’। দীর্ঘ এই কবিতাটিতে শক্তিদেবী কালীর আর এক রূপ‘শ্যামা’-র বন্দনা। এখানেও তিনি ভীষণকে ভীষণ করেই দেখতে চেয়েছেন। ভয়ংকরের সাধনা তিনি বীর্যবত্তার সঙ্গেই করতে চেয়েছেন। বিবেকানন্দের কালিকা-ভাবনার এ এক পরম প্রকাশ।
অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর বিপর্যস্ত আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবেশে বনমালী, অর্থাৎ কৃষ্ণের মধুর ভাবসাধনার পরিবর্তে শক্তির উপাসনা প্রাধান্য লাভ করেছিল। অন্ধকার থেকে আলোর পথে উত্তরণে নিরত নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামে যাঁদের জীবন বলিপ্রদত্ত তাঁরাই শক্তিদেবীর প্রিয়, আর শক্তিদেবীও সেই মানুষগুলির কাছে শ্রেয়, প্রেয় দুই-ই। বিবেকানন্দের লেখায় এই ভাবটি ধরা দিয়েছে অপূর্ব বিন্যাসে—
‘রুদ্রমুখে সবাই ডরায়, কেহ নাহি চায়, মৃত্যুরূপা এলোকেশী।
উষ্ণধারা রুধির উদ্গার, ভীম তরবারি খসাইয়া দেয় বাঁশী।।
সত্য তুমি, মৃত্যুরূপা কালী, সুখ বনমালী তোমার মায়ার ছায়া।
করালিনী, কর মর্মচ্ছেদ, হোক মায়াভেদ, সুখ স্বপ্ন দেহে দয়া’।।
গ) ১৯০১-এ বেলুড় মঠে প্রতিমায় শক্তিপূজা অর্থাৎ দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন বিবেকানন্দ। মহাসমাধির দিন যতই এগিয়ে এসেছে ততই যেন তিনি উপলব্ধি করেছেন শক্তি তথা মহাকালীর স্বরূপ-স্বভাব- স্বগুণকে। তিনি বারংবার বলেছেন, শক্তির জাগরণ, কৃপা ছাড়া কিছুই হবার নয়। বেলুড়মঠে নবমীর দিন দুর্গা প্রতিমার পাশে শ্রীমা সারদাকে বসিয়ে তাঁর পায়ে পুষ্পাঞ্জলি দিয়েছেন। দক্ষিণেশ্বরের শ্রীমা সারদাদেবী যখন প্রথম আসেন তখন ফলহারিণী কালীপূজার দিন কালীরই ভিন্ন রূপ ষোড়শীরূপে তাঁকে পুজো করেন শ্রীরামকৃষ্ণ। মা ঠাকুরানি অর্থাৎ বিবেকানন্দের গুরুপত্নী শ্রীমা সারদাদেবী নাছোড় ভক্তের সুতীব্রকৌতূহল মেটাতে নিজের স্বরূপ প্রসঙ্গে বলেছিলেন—‘লোকে বলে কালী।’ বিবেকানন্দ সেই শক্তির, কালীর প্রভাসিত রূপ দেখেছেন শ্রীমায়ের মধ্যে। তাঁর কাছে বিবেকানন্দের বারবার যাওয়া-আসা-যাওয়া।
ঘ) ১৯০১-এ কলকাতার সিমলে পাড়ায় নিজেদের বাড়িতে মা ভুবনেশ্বরী দেবীর উপস্থিতিতে জগদ্ধাত্রীর পুজো করেন। বিবেকানন্দ। যিনি অদ্বৈতবাদী তিনি কেন পৃথকভাবে শক্তি আরাধনায় রত? উত্তর একটিই, যা বলেছিলেন তাঁর গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ, আসলে ব্রহ্মই কালী—কালীই ব্রহ্ম। বিবেকানন্দ কালী বিষয়ক কোনও প্রবন্ধ নিবন্ধ লেখেননি। তাঁর অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করেছেন তাঁরই মানসকন্যা নিবেদিতা। তাঁর কালী বিষয়ক একাধিক বক্তৃতা ও লেখালেখিতে বিবেকানন্দের মনোভাবনার গভীর প্রকাশ প্রত্যক্ষ করা যায়।