| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কালিকা (কালী দ্য মাদার) : লিখেছেন সিস্টার নিবেদিতা, আলোচনা করেছেন লেখক শশিভূষণ মুখোপাধ্যায়

Reporter
সিস্টার নিবেদিতা / ১৫৫৩ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২১

[নিবেদিতা প্রধানতঃ ইংরেজিতে লিখতেন বলে বাংলা পত্রপত্রিকায় তাঁর গ্রন্থের উপরে বেশী আলোচনা হয়নি, অন্তত আমাদের চোখে পড়েনি। সুখের বিষয় ‘কালী দ্য মাদার’ বইটি অবলম্বন করে বিস্তৃত একটি লেখা বেরিয়েছিল ‘সাহিত্য’ পত্রিকায়, কার্তিক, ১৩১৯ সংখ্যায়। লেখক শশিভূষণ মুখোপাধ্যায়। ইনি সেকালেসুপরিচিত গ্রন্থকার। তত্ত্বভূয়িষ্ঠ রচনায় এঁর খ্যাতি ছিল।]

হিন্দুবিশ্বের বীজস্বরূপিণী অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড ভাণ্ডোদরী মহামায়া পরমাপ্রকৃতির প্রতীক পূজা করিয়া থাকেন। মৃত্তিকা, শিলা, ধাতু, দারু, প্রভৃতিতে যে মূর্তি রচিত হইয়া থাকে, সেই মূর্তিরূপ যন্ত্রের সাহায্যে পুজাসাধনের নামই প্রতীক-পূজা। ইহা ভিন্ন ঘটে ও পটে প্রতীক-পূজা হইয়া থাকে। এখন সমাজের এতই অবনতি ঘটিয়াছে যে, হিন্দুর সন্তান প্রতীক-পূজার ও পুত্তলী পূজার তফাৎ করিতে অসমর্থ। মায়ার বৃতিতে আবদ্ধ, সংস্কারের সঙ্কীর্ণতায় সসীম মানবের মানসমুকুরে যে ভূমার প্রতিবিম্ব প্রতিফলিত হইতে পারে,—ক্ষদ্রবুদ্ধি মানব তাহাঅনেক সময় বুঝিতে পারে না। সান্ত অনন্তের প্রতিবিম্ব ধারণে অসমর্থ। তাই মানব সকল বিষয়েই প্রতীকোপাসক। মানবের মনে, ভাবে, ভাষায়, কল্পনায়, ধ্যানে, ধারণায় সান্তের প্রতিমা বা প্রতিবিম্বই প্রতিফলিত হইয়া থাকে;—ক্ষুদ্র মুকুরে বৃহতের পূর্ণ প্রতিবিম্ব পড়ে না,—পড়িতে পারে না, বৃহৎ বিপ্রকৃষ্ট থাকিলে ক্ষুদ্র হইয়াই ক্ষুদ্র মুকুরে প্রতিবিম্বিত হইয়া থাকে;—সন্নিকৃষ্ট হইলে উহার ক্ষুদ্র অংশই ক্ষুদ্র মুকুরে দেখা যায়। কিন্তু অনন্তের অংশও অনন্ত, সুতরাং সান্ত জীবাত্মার মানস-মুকুরে তাহা প্রতিবিম্বিত হয় না—হইতেই পারে। সেই জন্য সাধকের হিতার্থ অনন্ত ব্রহ্মের সান্ত মূর্তি কল্পিত হইয়াছে।

মূর্তি বা প্রতিমায় অনন্তের বিভূতি কল্পিত ও ব্যক্ত করিতে হয়। মূর্তি-কল্পনার ইহাই প্রকৃত রহস্য। প্রকৃতির প্রতীকপূজা এই নিয়মেই সংসাধিত হইয়া আসিতেছে। প্রতীক পূজার এই যে রহস্য, ভগ্নী নিবেদিতা তাঁহার Kali the Mother নামক পুস্তিকায় তাহা অতি সুন্দরভাবে বিবৃত করিয়াছেন। বিস্ময়ের বিষয়, অনেক হিন্দুর সন্তান এখন যে-তথ্য বুঝিতে পারেন না,—সম্পূর্ণ ভিন্নদেশে জমিয়া, প্রতিকূল প্রতিবেশ অবস্থার মধ্যে লালিতা হইয়া মনস্বিনী নিবেদিতা জন্মান্তরের সুকৃতিবলে তাহা বুঝিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। তাঁহার ভাষায় পাশ্চাত্ত্য চিন্তার, পাশ্চাত্ত্য ভাবের প্রতিবিম্ব পড়িয়াছে সত্য, কিন্তু তিনি প্রাচ্য প্রতীকপূজার রহস্যে অনেকটা প্রবেশ করিতে পারিয়াছিলেন, তাহাতে আর সন্দেহ নাই।

মূর্তিপূজা

ভগ্নী নিবেদিতা তাঁহার গ্রন্থের প্রথমেই প্রতীকের আলোচনা করিয়াছেন। মানবজীবনের দৈনন্দিন ব্যাপার হইতেই ভগবানের মূর্তি আত্মপ্রকাশ করিয়া থাকে। দুইটি স্বতন্ত্র মূর্তি একই ধারণা বা একই ভাব যথাযথভাবে প্রকাশ করে না। ভাষা, ভাবের প্রতিমা বা প্রতীকমাত্র। ধরাবাসী সমগ্র মানবের দৈনন্দিন জীবনের অবশ্য-আবশ্যক বস্তু একই। সেই জন্য বিদেশের ভাষা শিক্ষাকালে আমরা বৈদেশিক শব্দ সন্ধানে ব্যস্ত হই।‘তৃষ্ণা’বলিলে আমার যে বেদনা বা অনুভূতি বুঝায়, ‘thirst’বলিলে ইংরাজের সেই বেদনা বা অনুভূতিই বুঝাইয়া থাকে। তৃষ্ণা শব্দ বাগালীর রচিত যে বেদনা বা অনুভূতির শাব্দিকা মূর্তিthirst শব্দ ইংরাজের রচিত সেই অনুভূতিরই শাব্দিকা মূর্তি। মূর্তিকে চিনিলেই আমরা ভাবকে চিনিতে ও চিনাইতে পারি। ভাবের অর্চিঃ ভাবেরই প্রতিমা শব্দে বর্তে, তাই শব্দ দেখিয়া ভাবের পরিচয় মিলে। সেইজন্য যেখানে ভাবসাম্য, সেখানে কেবল প্রতিমার পরিচয় পাইলেই ভাবের পরিচয়লাভ সম্ভব। কিন্তু অনুভূত বস্তু ও অনুভাবকের বিপর্যয় বশে অনুভূতিরও বিপর্যয় হইয়া থাকে। অনুভূতির স্বাতন্ত্রফলে অনুভূতির মূর্তি-শব্দেরও অর্থস্বাতন্ত্র্য ঘটিয়া থাকে। সেইজন্য ভিন্ন জাতির ও ভিন্ন ভাষার শব্দ স্থূলতঃ একই ভাবের প্রতিমা বা মূর্তি হইলেও, উহাদের মধ্যে অর্চিঃ বৈষম্য অবশ্যম্ভাবী। ইংরাজীতে ‘twilight’বলিলে যাহা বুঝায় বাংলায় সন্ধ্যা বলিলে ঠিক তাহা বুঝায় না। মেরুসন্নিহিত দেশসমূহে দিনের আলোক নিশার অন্ধকারে সম্পূর্ণরূপে মিশিয়া যাইবার পূর্বে আলোকে ও আঁধারে একটা বহুক্ষণব্যাপী মেশামিশি হইয়া থাকে। পলে পলে আলোকের পরিবর্তন যে গম্ভীরতা আনিয়া দেয়, না দেখিলে তাহার অনুভূতি অসম্ভব। আর সেই সময়ের সহিত দৈনন্দিন ব্যাপারের কত স্মৃতি, কত ভাব, কত অভিজ্ঞতা জড়াইয়া একটি ভাবের সষ্টি করে। সে ভাব twilight শব্দেই ব্যক্ত হয়। twilight শব্দ সেইভাবেরই পূর্ণ প্রতিমা। আমাদের সন্ধ্যা শব্দ সে ভাবের পূর্ণপ্রতিমা নহে। এদেশে সন্ধ্যা বলিলে twilight এর প্রতিমা পূর্ণমাত্রায় মনোমধ্যে জাগিয়া ওঠে না। এদেশে দিনের আলোক নিশার আঁধারে ত্বরিতে মিশিয়া যায়। সুতরাং ইংরেজিtwilight শব্দ আর বাংলা ‘সন্ধ্যা’শব্দ ঠিক একই ভাবের দ্যোতনা করে না। উভয় দেশের শাব্দিক প্রতিমা স্বতন্ত্র। প্রদোষ শব্দও ঠিক ঐ ভাব প্রকাশ করে না। রজনীপ্রভাতা হইলেও উভয় অঞ্চলে twilight হয়। আলোক ও অন্ধকারে ঐরপ দ্বন্দ্বযুদ্ধ চলিতে থাকে। এদেশের ঊষায় ঠিক সেরূপ হয় না। এদেশে দেখিতে দেখিতে ঊষার আলোক বালভানুকিরণে পরিণত হয়। এদেশে twilight নাই, সুতরাং বাঙালী সে ভাবের প্রতিমা গড়ে নাই। সেইজন্য বাংলায় twilight শব্দের প্রতিশব্দও নাই।

ইংরেজি gloaming শব্দ বাঙ্গালীর গোধূলি শব্দেরই অনুরূপ। প্রদোষের অন্ধকার ক্রমশঃ ঘনীভূত হইয়া আসিতেছে, উৎসুকা নাগরী দিবাশ্রমশান্ত নাগরের গৃহাগমন প্রতীক্ষায় গবাক্ষের ভিতর দিয়া পথপানে চাহিতেছে—‘ঐ এলো, ঐ এলো’ভাব শব্দটির সহিত যেন জড়াইয়া আঁকড়াইয়া ধরিয়া আছে;—প্রত্যাশিতের আগমনে পরিবারের মধ্যে যেন কেমন একটা কোমলভাবের প্রবাহ ছুটিতেছে, নিদ্রিত শিশুর অধরে কোমল হাস্য ফুটিতেছে। এই সমস্ত ভাব gloaming শব্দপ্রতিমায় অনুস্যূত রহিয়াছে। বাংলা ‘গোধূলি’শব্দ ঠিক ঐ সময়কে বুঝায় সত্য, কিন্তু ঐ শব্দের সহিত বঙ্গীয় পল্লীজীবনের চিত্র ফুটিয়া উঠে। তপন প্রতীচ্য দিক্‌চক্রবালপ্রান্ত আশ্রয় করিয়াছেন। নিশসমাগম-শঙ্কিত রাখাল গো-পাল লইয়া পল্লীর অভিমুখে ফিরিতেছে; প্রত্যাবর্তনশীল গো-পালের ক্ষুরোত্থিত ধূলিপটলে দিঙ্মণ্ডল আচ্ছন্ন হইয়া যাইতেছে; দূরে গ্রামপ্রান্তস্থ শ্যামল শষ্পসমাচ্ছন্ন প্রান্তর-প্রান্তে রাখাল ও গো-পালের এই চিত্র গোধুলিশব্দের সহিত বিজড়িত। আর দেখিতে দেখিতে গাভীগণের ক্ষুরোৎক্ষিপ্ত ধূলিরাশিকে আশ্রয় করিয়াই নৈশ অন্ধকার যেন সমস্ত দৃশ্যকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিতেছে। বাঙালীর পল্লীজীবন এই ধারণার সষ্টি করে,—‘গোধুলি’ শব্দ এই ধারণারই শব্দময় চিত্র। ‘গোধুলি’ বলিলে এই সমস্ত দৃশ্যপট যেন মানস চক্ষুর সম্মুখে উদ্ভাসিত হয়। ইংরাজী gloaming ও বাংলা গোধুলি একই কালের দ্যোতনা করে সত্য—কিন্তু উভয়ের প্রতিমা বা মূর্তি স্বতন্ত্র। এক কথায় দেশের নৈসর্গিক অবস্থা, জাতির প্রকৃতি ও ব্যক্তির বিশেষত্ব অনুসারে শব্দের ব্যঞ্জনা ও ভাষার বিকাশ নিয়ন্ত্রিত হইয়া থাকে।

ধর্মসম্পকিত ভাব ও তাহার প্রতীক ঠিক এইরূপভবেই উদ্ভূত হইয়া থকে। অনন্তঃজ্যোতিঃ আমাদের ধারণার মধ্যে আইসে না, উহা আমাদের চিন্তাশক্তির ভিতর দিয়াই মানস মুকুরে প্রতিবিম্বিত হইয়া থাকে। ব্যক্তিভেদে ও জাতিভেদে চিন্তার ধারা স্বতন্ত্র হয়; সুতরাং ধর্ম-সম্পর্কিত ধারণা ও তাহার মূর্তি স্বতন্ত্র হইয়া পড়ে। দুই জাতির বা দুই ব্যক্তির চিন্তাশক্তি ও ধারণা সম্পূর্ণ একরূপ হয় না;—ফলে, তাহাদের মানস-প্রতিমা স্বতন্ত্রই হইয়া থাকে। আরব জাতির সমাজে পিতাই শ্রেষ্ঠ। আরবের মরুপ্রান্তরে সর্বশ্রেষ্ঠ বর্ষীয়ান পুরুষই সমাজের গোপ্তা ও পরিচালক। তাঁহারই ইঙ্গিতে শত শত যুবক সমরক্ষেত্রে প্রাণদানে প্রস্তুত। সকলে তাঁহারই আজ্ঞাধীন। সমাজে তাঁহার অখণ্ড প্রতাপ ও অপ্রতিহত প্রভাব। পিতৃশাসিত, সেমেটিক জাতির মনে সেইজন্য শক্তিমানের কল্পনায় পিতৃপ্রতিমাই সমুদ্ভাসিত হইয়া উঠে। তাহারা সর্বশক্তিমানকে পিতা বলিয়াই ডাকিয়া থাকে। পক্ষান্তরে, আর্যজাতির সমাজে রমণীই প্রধানা। প্রতীচ্যখণ্ডে ভার্যাই সর্বেসর্বা, ভার্যা স্বামীর সম্রাজ্ঞী। প্রাচ্যখণ্ডে জননীই সন্তানের প্রত্যক্ষ দেবীমূর্তি, সংসারের পবিত্রতা বিধায়িনী ও শান্তিপ্রদায়িণী। মা মা বলিয়া ডাকিলে এই অঞ্চলেরলোক যত তৃপ্তি, যত শান্তি পায়, বুঝি আর কিছুতেই তেমন তৃপ্তি পায় না। মা মা বলিয়া ডাকিলে হৃদয়ের অন্তঃস্তল ভেদ করিয়া যে ভক্তির মন্দাকিনী প্রবাহ প্রবল বেগে প্রবাহিত হয়, এমন বোধ হয় আর কিছুতেই হয় না। তাই বোধ হয় ক্যাথলিক খ্রীষ্টান, শিশু, খ্রীষ্ট কোলে কুমারী মেরীর পূজা করিয়া থাকেন। মা শব্দের মত সর্বসন্তাপহারক শব্দ জগতে আর নাই। সাধকের আত্মা ইষ্টদেবের নিকট ক্রোড়স্থ শিশুর ন্যায় হইয়া পড়ে। ভারতীয় বর্ণাশ্রমিগণ মাতৃত্বের পূর্ণভাবের ধারণা করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। তাই ভারতে মাতৃমূর্তির পূর্ণ প্রতিমা গঠিত ও প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। সেইজন্যই কালীমূর্তি শ্রীমূর্তি—মাতৃমূর্তি। ভক্ত হিন্দুকালীকে মা বলিয়া সম্বোধন করিয়া থাকেন। কিন্তু এই মাতৃপ্রতিমা অতি অদ্ভুত। প্রতীচ্যখণ্ডে রমণী-প্রতিমার সহিত কাব্যকলার সমস্ত কোমল ও কান্তভাব বিজড়িত করিয়া দেওয়া হইয়াছে। ভারতেও যে ঐরূপ মাতৃমূর্তি নাই, তাহা নহে। নিবেদিতা সে মূর্তির উল্লেখ করেন নাই, সম্ভবতঃ তিনি উহার উল্লেখ করা আবশ্যক মনে করেন নাই। কালিকা মূর্তিই তাঁহার আলোচ্য বিষয়। এই মূর্তি দেখিয়া য়ুরোপীয়েরা শিহরিয়া উঠেন। এই মূর্তি বিবসনা লোলরসনা, বিকট দশনা,—এলোকেশী ও চতুর্ভূজা; মূর্তির এক হস্তে কৃপাণ, অন্য হস্তে সদ্যশ্ছিন্ন নরশির। আবার অন্য দুই হস্তে বর ও অভয়। মূর্তির গলে দোদুল্যমান নরশিরের মালা, মূর্তি বিভূতি-ভূষিতাঙ্গ, পদতলে লুণ্ঠিত শিবের উপর নৃত্যশীলা। মূর্তি বিভীষণা ও অসাধারণী। যাহারা মায়ের কেবল মূর্তির ঐটুকুমাত্র লক্ষ্য করে,—তাহারা মূর্তির অন্তরে প্রবেশ করিতে পারে না। মায়ের স্নেহমাখা স্বর তাহাদের কর্ণে পশে না। হিন্দু, এই মূর্তিরই পূজা করিয়া প্রীতি অনুভব করে।

শিব

প্রকৃতি অনন্তসৌন্দর্যশালিনী। সুজলা, সুফলা শস্যশ্যামলা ফুল্লকুসুমিত দ্রুমদলশোভিনী, সুহাসিনী প্রকৃতির বৈচিত্র্যের মধ্যে শান্ত, শুভ্র নির্বিকার ও নির্মল সত্তা মধ্যে মধ্যে প্রকাশ পাইয়া থাকে। যেন প্রকৃতির অন্তরালে নির্বিকার, নিরঞ্জন, মূক ও অনন্ত শুন্যতার মধ্যে কে অবস্থিতি করিতেছে বলিয়া বোধহয়। পার্থিব সৌন্দর্যের মধ্যে যেন কেমন এক দ্বৈতভাব লুকাইয়া রহিয়াছে। হিন্দু, যে-দিকেই দৃষ্টিপাত করে, সেই দিকেই এই দ্বৈতভাব দেখিতে পায়। আলোকের সহিত অন্ধকার, আকর্ষণের সহিত বিপ্রয়োগ, সৃষ্টির সহিত লয়, কারণের সহিত কার্য ওতপ্রোতভাবে বিজড়িত রহিয়াছে। মানবজীবনের দিকে দৃষ্টিপাত করিলেও স্ত্রী ও পুরুষ, দেহ ও আত্মা—এই দ্বৈতভাব পরিলক্ষিত হয়। সৃষ্টিরহস্য-উদ্ভেদের ইঙ্গিত এইখানেই পরিলক্ষিত হইয়া থাকে। স্ত্রী ও পুরুষ লইয়াই যেমন মানবতা, প্রকৃতি ও পুরুষ লইয়াই তেমনি বিশ্ব। প্রকৃতির সহিত পুরুষের বিরোধ বা বিবাদ নাই। স্ত্রী ও পুরুষের সমবায়ে যেমন মানবতা পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়,—প্রকৃতি ও পুরুষের সংযোগে সেইরূপ বিশ্বও পূর্ণতা প্রাপ্ত হইয়াছে। প্রকৃতির সহিত পরমাত্মার বিরোধ নাই। অতি প্রাচীনকাল হইতেই হিন্দু বলিয়া আসিতেছে,—পুরুষ ও প্রকৃতি, আত্মা ও শক্তি অভিন্ন। মানবের কল্পিত মূর্তি মানবত্ব-জড়িতই হইবে। লোককোলাহলশূন্য নির্জন দেশে বিশাল পর্বতের বিপুল ছায়া মানবেরমনে ভূমার গুণবিশেষ উদ্রিক্ত করিতে পারে, কিন্তু তাহাকে বিশ্বেশ্বর বলিয়া ভ্রম জন্মাইতে পারে না। বাহ্য আকৃতিকে ব্রহ্ম বলিয়া মনে করা সম্ভব নহে। নিবেদিতা বলিয়াছেন,—

‘Hinduism has avoided this danger of fixedness in a curious way. Of all the peoples of the earth it night be claimed that Hindus are apparently the most, and at heart, the least idolatrous.’

ইহার মর্মার্থ এই, ‘হিন্দু, অতি চমৎকার উপায়ে বদ্ধভাব পরিহার করিতে সমর্থ হইয়াছে। জগতে যত জাতি আছে, তন্মধ্যে হিন্দুরাই আপাতদৃষ্টিতে সর্বাপেক্ষা অধিক পৌত্তলিক,—কিন্তু অন্তরের দিকে দৃষ্টিপাত করিলে উপলব্ধ হয় যে, অন্য কোনও জাতি তাহাদের ন্যায় পৌত্তলিকতাকে পরিহার করিতে সমর্থ হয় নাই’।মনস্বিনী ভগিনী নিবেদিতা বাস্তবিকই হিন্দুর মর্মকথা বুঝিতে সমর্থ হইয়াছেন,—হিন্দুধর্মের প্রকৃত রহস্যের উদ্ভেদ করিতে পারিয়াছেন। বাহ্য আকৃতি লইয়াই হিন্দু, ব্যস্ত নহে,—ভাবের পথ ধরিয়া হিন্দু বিশ্বপ্রহেলিকার সমাধানে ব্যগ্র। বাহ্য আকৃতি বা প্রতিমা সেই ভাবেরই প্রকাশকমাত্র। বাহ্যবস্তু অবলম্বন করিয়া ভাবরাজ্যে প্রবেশ করিতে হয়, হিন্দু, তাহা বুঝে; সেইজন্যই হিন্দু, প্রতীকোপাসক। বিশাল হিমালয়ের বক্ষে নিত্য শুভ্র হিমানীর উপর কৌমুদীরাশি ছড়াইয়া পড়িয়াছে,—চন্দ্রিকাসমদ্ভাসিত হিমানী দিগ্‌দিগন্ত পরিব্যাপ্ত করিয়া অনন্তকাল নিঃস্পন্দভাবে পড়িয়া রহিয়াছে,—আর তাহারই উপরে শশিকলাকে ভালে লইয়া নিবিড় নীলিমাময় অনন্ত আকাশ প্রকৃতির নগ্নমূর্তি রূপে নৃত্য করিতেছে,—এই দৃশ্য দেখিয়া মুগ্ধ হিন্দুর মনে যদি প্রকৃতিপুরষের লীলা-কথা উদিত হয়,—যদি সে মনে করে, এই বৈচিত্র্যময়ী প্রকৃতির মূলে নিত্য, শুদ্ধ, নিরঞ্জন ও নির্বিকার আত্মাঅবস্থিতি করিতেছে; হিমাদ্রিশিখরশায়ী হিমরাশির ন্যায় উহা দুরধিগম্য, কিন্তু উহারই বক্ষের উপর নৃত্যশীলা নগ্না প্রকৃতির প্রত্যেক লীলারই প্রতিবিম্ব পতিত হইতেছে,—তাহা হইলে সে ভাব হৃদয়ে পুনর্বার জাগাইবার জন্য সেই ভাবমূলক প্রতীক রচনা করিবার প্রবৃত্তি হিন্দুর মনে স্বতঃই জাগিয়া উঠে। সে প্রতীকপূজা পুত্তলিকার পূজা নহে, ভাবেরই পূজা। হিন্দু, যেখানে সেইভাব প্রতিফলিত দেখে, সেইখানেই প্রকৃতি পুরুষের মূর্তি দেখিতে পায়। হ্রদের জল নিথর নিঃস্পন্দ লহরীশূন্য। কৌমুদীরাশি তাহারই উপর ছড়াইয়া তাহাকে শুভ্র করিয়া তুলিয়াছে। আর সেই শুভ্র সলিলরাশির উপর তীরস্থ তরুলতা, পত্রপুষ্প প্রভৃতির প্রতিবিম্ব পড়িয়াছে। আর সেই সকল প্রতিবিম্বমধ্যে চন্দ্রকলার প্রতিবিম্ব পর্ণ ভাস্বরতায় সকলকেই পরাজিত করিয়াছে।—এ দৃশ্য হিন্দুর মনে প্রকৃতিপুরষের সম্বন্ধ সম্পর্কিত সমস্যার সমাধান করিয়া দেয়,—তাই হিন্দু, ইহারও প্রতীকপূজক। তাই বুঝি বিসর্জনের সময় দর্পণে বা পাত্রস্থজলে মায়ের পাদপদ্মের প্রতিবিম্ব দেখিতে হয়। হিন্দুর এই প্রতীক উপাসনাকে পৌত্তলিকতা বলা বিষম ভ্রম।

প্রকৃতি ও পুরুষের, শিবের ও শক্তির সম্বন্ধ কি? য়ুরোপীয়দিগকে বুঝাইয়া দিবার জন্য য়ুরোপীয়ভাবে মনস্বিনী নিবেদিতা তাহার ব্যাখ্যা করিয়াছেন। প্রকৃতি ক্রিয়াশীলা সত্য, কিন্তু তাহাকে ক্রিয়া করাইবার জন্য পুরুষের প্রয়োজন। আত্মার সহিত অভিজ্ঞতার যে সম্বন্ধ, ডায়নামোর (dynamo) সহিত বিদ্যুতিক শক্তিরযে সম্বন্ধ, প্রকৃতির সহিত পুরুষের সেই সম্বন্ধ। একের সহিত অন্যের সংযোগের ফলে শক্তি ও কার্যকারিতা উভূত হয়, বিশ্বব্যাপারে ইহা নিত্য পরিদৃশ্যমান। শিষ্য শ্মশানে নিশীথে শবের উপর আসীন। অকস্মাৎ গুরুর মাভৈঃ মাভৈঃ শব্দ শিষ্যের কর্ণে পশিল। শিষ্য নির্ভয়ে শবসাধনায় ব্রতী হইল। সাধনবলে শবে জীবনীশক্তির সঞ্চার হইল। সেইরূপ পুরুষের অশরীরিণী শক্তির সঞ্চারে প্রকৃতি ক্রিয়াশীলা। শিব ও শক্তি পৃথক নহে। নিবেদিতা এই তথ্যই বুঝাইবার প্রয়াস পাইয়াছেন। জীবমাত্রেই শিব। মানবাত্মা শিবরূপে প্রকৃতির লীলা দেখিতেছে।

ভগবানের সাযুজ্য লাভ করিতে হইলে পার্থিব সকল সম্পদই পরিত্যাগ করিতে হয়। এমন কি, সুখ, দুঃখ উভয় ভাবেরই পরিহার আবশ্যক হইয়া উঠে। সেইজন্য শঙ্কর ভিখারী,—আপনার যজ্ঞকুণ্ডের ভস্মে আপনি আবৃত। মহাযোগে নিমগ্ন। তাঁহার নয়নদ্বয় অর্ধনিমীলিত। পার্থিব কোন ব্যাপারই তিনি লক্ষ্য করেন না। জগৎ তাঁহার দৃষ্টিতে মায়াকল্পিত স্বপ্নরাজ্য। তাঁহার প্রজ্ঞাই কেবল ক্রিয়াশীল। সেইজন্য আদর্শ মানবরূপী শিবের ললাটে প্রজ্ঞাচক্ষু, উন্মীলিত। তাই শিব বিরূপক্ষ। তিনি সর্বজীবের আশ্রয়। বিষধর ভুজঙ্গও তাঁহার গলদেশে উপবীতরূপে আশ্রয় লইয়া রহিয়াছে। তিনি বিশ্বপ্রেমে বিভোর। ভূত, প্রেত, পিশাচও তাঁহার প্রেমের পাত্র। সংসারের সকল দুঃখ-জ্বালা তিনিই গ্রহণ করিয়াছেন। তাই তিনি বিষপানে নীলকণ্ঠ। তাঁহার কিছুই নাই। বৃদ্ধ বৃষই তাঁহার বাহন, যোগের ব্যাঘ্রচর্মই তাঁহার আসন। তিনি আশুতোষ; বিল্বদল ও গঙ্গাজলেই তিনি তুষ্ট। তিনি সুন্দরের মধ্যে সুন্দরতম, ভীষণের মধ্যে ভীষণতম, বীরেশ্বর ও বিরূপাক্ষ। ভগ্নী নিবেদিতা এই ভাবেই জীবরূপী শিবের সহিত প্রকৃতির সম্বন্ধের ব্যাখ্যা করিয়াছেন।

জীবাত্মা বা পুরুষ মায়া বা প্রকৃতির অর্ধাঙ্গ। মায়া নশ্বর ইন্দ্রিয়-বৈচিত্র্যজ্ঞান। জীবাত্মা শবরপে পতিত। নিষ্ক্রিয় ও বাহ্য ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন। কালী বা প্রকৃতি ভীষণামূর্তিতে সংহারকার্যে নিযুক্তা। চারিদিকেই সংহারের ভীষণ দৃশ্য। তাঁহার গলায় মুণ্ডমালা, হস্তে সদ্যশ্ছিন্ন নরশির ও উদ্যত কৃপাণ, অকস্মাৎ তাঁহার পদ তাঁহার ভর্তার বক্ষ স্পর্শ করিল। শিব ঊর্ধ্বে চাহিলেন; জীবাত্মার প্রজ্ঞা চক্ষু, মায়ার চক্ষুর সহিত সম্মিলিত হইল। মায়া লজ্জায় দশনে রসনা কাটিলেন। শিব সেই মহা মেঘপ্রভা সাক্ষাৎ সংহারিণী মূর্তিধারিণী মায়াকে পরমা সুন্দরী দেখিলেন। তখন সেই নগ্না, ভীষণা, সংহারিণী প্রকৃতি সংহার-জন্য বেদনায় ব্যথিতা নহেন, বরং প্রফুল্লা। পিশাচগণ তাঁহারই প্রদত্ত পিশিতে পরিপুষ্ট। এ হেন প্রকৃতির উপর যোগী জীবাত্মার প্রজ্ঞাদৃষ্টি পতিত হইল। তখন প্রকৃতি তাহাকে বরাভয় কর উদ্যত করিয়া আশীর্বাদ করিলেন। প্রজ্ঞাচক্ষুশালী জীবাত্মা তৎক্ষণাৎ মহাশক্তিকে চিনিলেন। তিনি শক্তিকেই মাতৃসম্বোধন করিলেন। প্রকৃতির রহস্য উদ্ভিন্ন হইল। মায়াবদ্ধ শিব জীবাত্মার সহিত পরমাত্মা পরমা-প্রকৃতির মিলন হইল। যোগীর যোগ সাফল্য লাভ করিল।

কিরূপে সাধকের এই আত্ম-সাক্ষাৎকার ঘটিয়া থাকে? কিরূপে সাধক ‘মা’-কে চিনিতে ও জানিতে পারে? প্রকৃতি অনন্ত সৌন্দর্যশালিনী ও বৈচিত্র্যময়ী। কিন্তু তাঁহার সেই সৌন্দর্যময়ী যবনিকার অন্তরালে বিভীষিকাময় মশানের দৃশ্য লুকাইয়ারহিয়াছে। সে দৃশ্য সর্বজ্ঞের সর্বতোবিসারিণী দৃষ্টি অতিক্রান্ত করিতে পারে না। প্রকৃতির অঙ্কে জীব জীবের প্রাণসংহার করিতেছে। স্রোতস্বতী ভূধরকে ভাঙ্গিয়া চর্ণ করিয়া দিতেছে, ধূমকেতু পৃথিবীকে চূর্ণ করিয়া দিবার জন্যই যেন মধ্যগগনে খর করপালতুল্য পুচ্ছ উদ্যত করিয়া উদিত হইতেছে। জীবের হাহাকার, ব্যথিতের আর্তনাদ, পিপাসিতের মর্মোচ্ছ্বাস, ভয়চকিতের আতঙ্কধ্বনি প্রভৃতিতেই প্রকৃতির ক্রোড় প্রতিধ্বনিত হইতেছে। কিন্তু সেই ব্যথিতের বেদনার প্রতি তাঁহার একেবারেই দৃকপাত নাই,—উপেক্ষার অট্টহাস্যে তিনি সেই বেদনাধ্বনির প্রতিধ্বনি করিতেছেন। হিন্দু, প্রকৃতির এই দৃশ্যে অন্ধ নহে। হিন্দুহৃদয়ের মর্মতল ভেদ করিয়া বলিতে পারে‘মাগো, তুমি বিশ্ব-সংহারিণী সত্য কিন্তু তথাপি আমি তোমারই শরণাগত’। ‘মশানের মধ্যেই মায়ের করুণার কমল প্রফুল্ল রহিয়াছে’।নিবেদিতা দার্শনিকদিগের দৃষ্টিতে মায়ের মূর্তিকে চিনিয়াছেন। সাংখ্য মতে পুরুষে অনেক; প্রকৃতিই এক। নিবেদিতা বলেন, পুরুষ সাধক, প্রকৃতি বিশ্বাত্মার মূর্ত প্রতিমা—মায়া। পরমাত্মা, মায়া কর্তৃক উপহত হইয়া, পদতলে মথিত হইয়া জীবাত্মারূপে শবের ন্যায় পতিত রহিয়াছেন। ইহা বেদান্তের সিদ্ধান্ত। সাধনায় জীবাত্মার প্রজ্ঞাচক্ষু, উন্মীলিত হইলে জীবাত্মার সহিত পরমাত্মার মিলন হয়। তান্ত্রিকগণ সকলে কালীমূর্তির এই ব্যাখ্যা করেন না। তাঁহারা বলেন, শিবই পরমাত্মা, কালী পরমাপ্রকৃতি। ঐশী শক্তি মায়ারূপে সৃষ্টিস্থিতি সংহার করিতেছেন, ঈশ, শুভ্র, শান্ত, নির্বিকল্প ও নিরঞ্জন অবস্থায় পতিত রহিয়াছেন। নিবেদিতা এ ব্যাখ্যাও গ্রহণ করিয়াছেন। মূলে সকল ব্যাখ্যাই এক। নিবেদিতা য়ুরোপীয়দিগকে বুঝাইবার জন্য গ্রন্থ লিখিয়াছেন। তাঁহার গ্রন্থে সাধক রামপ্রসাদ ও পরমহংস রামকৃষ্ণদেব এই দুইজন মায়ের ভক্ত সাধকের সাধনপদ্ধতি সুন্দরভাবে বিবৃত হইয়াছে। ইংরাজী শিক্ষানবীশদিগের এইগ্রন্থ অবশ্য পাঠ্য।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev