কালীর পূর্বাভাস।। ১
ঋকবেদের রাত্রিসূক্তকে শিরোধার্য করেই পরবর্তীকালে কালী নামে এক দেবীর প্রসিদ্ধি– অনেকের এমনই ধারণা। রমেশচন্দ্র দত্ত অনূদিত ‘ঋগ্বেদ-সংহিতা’ থেকে ১০ম মন্ডলের ১২৭ সূক্তের ১ থেকে ৮ সংখ্যক শ্লোক উদ্ধৃত করে বিষয়টি দেখছি।
১। রাত্রিদেবী আগমনপূর্বক চতুর্দিকে বিস্তীর্ণ হইয়াছেন। তিনি নক্ষত্রসমূহের দ্বারা অশেষ প্রকার শোভা সম্পাদন করিয়াছেন।
২। দেবরূপিণী রাত্রিদেবী অতি বিস্তার লাভ করিয়াছেন, যাঁহারা নীচে থাকেন, কি যাহার ঊদ্ধে থাকেন, সকলকেই তিনি আচ্ছন্ন করিলেন । তিনি আলোকের দ্বারা অন্ধকারকে নষ্ট করিয়াছেন।
৩। রাত্রিদেবী আসিয়া উষাকে আপন ভগিনীর ন্যায় পরিগ্রহ করিলেন, তিনি অন্ধকার দূরীভূত করিলেন।
৪। পক্ষীরা যেমন বৃক্ষে বাস গ্রহণ করে, তদ্রুপ যাহার আগমনে আমরা শয়ন করিয়াছি, সেই রাত্রি আমাদিগের শুভকরী হউন।
৫। গ্রামসমূহ নিস্তব্ধ হইয়াছে; পাদচারীরা, পক্ষীরা, শীঘ্রগামী শ্যেনগণ, সকলেই নিস্তব্ধ হইয়া শয়ন করিয়াছে।
৬। হে রাত্রি! বৃকী ও বৃককে আমাদিগের নিকট হইতে দূরে লইয়া যাও; চৌরকে দূরে লইয়া যাও।
আমাদিগের পক্ষে বিশিষ্টরূপে শুভকরী হও।
৭। কৃষ্ণবর্ণ অন্ধকার স্পষ্ট লক্ষ্য হইয়া দেখা দিয়াছে, আমার নিকট পর্যন্ত আচ্ছন্ন করিয়াছে। হে উষাদেবি! আমার ঋণকে যেমন পরিশোধ পূৰ্ব্বক নষ্ট কর, তদ্রুপ অন্ধকারকে নষ্ট কর।
৮। হে আকাশের কন্যা রাত্রি! তুমি যাইতেছ, তোমাকে গাভীর ন্যায় এই সমস্ত স্তব অর্পণ করিলাম, তুমি গ্রহণ কর।
এই শ্লোক প্রসঙ্গে শশিভূষণ দাশগুপ্ত বলছেন, ‘বেদের রাত্রিসূক্তকে অবলম্বন করিয়া পরবর্তী কালে যে এক রাত্রিদেবীর ধারণা গড়িয়া উঠিয়াছে, কাঁহারও কাঁহারও বিশ্বাস সেই রাত্রিদেবীই পরবর্তী কালে কালিকা রূপ ধারণ করিয়াছেন’।
রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিউট অব কালচার, গোলপার্ক থেকে ১৩৭৩ সনে উপেন্দ্রকুমার দাস প্রণীত ‘শাস্ত্রমূলক ভারতীয় শক্তিসাধনা’ (প্রথম খণ্ড) প্রকাশিত হয়। এই বইয়ের দাবি ‘রাত্রিদেবীই কালী’। এখানে বলা হয়েছে— ‘স্বামী অভেদানন্দ বলেছেন: এই রাত্রিদেবীই পরে কালী নামে প্রসিদ্ধা হইয়াছেন’। শশিভূষণ দাশগুপ্ত বলছেন, “আমাদের এই কৃষ্ণা-ভয়ঙ্করী দেবীর প্রসঙ্গে বৈদিক কৃষ্ণা-ভয়ঙ্করী নির্ঋতি দেবীর কথাও কেহ কেহ স্মরণ করাইয়া দিয়াছেন। ‘শতপথ ব্রাহ্মণ’ এবং ‘ঐতরেয় ব্রাহ্মণে’ নির্ঋতি দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়”।
‘শতপথ ব্রাহ্মণে’ এই দেবীকে কৃষ্ণা (৭। ২। ৭) এবং ঘোরা (৭ । ২। ১১) বলা হয়েছে। ‘ঐতরেয় ব্রাহ্মণে’ নির্ঋতি দেবীকে পাশহস্তা বলা হয়েছে। দেবীর হাতের এই পাশ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য প্রার্থনাও জানানো হয়েছে (৪। ১৭)।
এই যে দুটি উল্লেখ দেখা গেল, এই প্রসঙ্গে শশিভূষণ দাশগুপ্তের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য—
এই নির্ঋতি দেবীর পরবর্তী কালে আর কোনও ইতিহাস দেখি না। সুতরাং বর্ণনার সামান্য একটু কোথাও মিল দেখিয়াই কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত মনে হয় না।