কালীর পূর্বাভাস।। ২
ত্রয়োদশ শতকের প্রথম ভাগে সঙ্কলিত ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’ নামে যে সংগ্রহগ্রন্থের সঙ্গে আমাদের পরিচয় রয়েছে, সেখানে কবি ভাসোকের নামে উদ্ধৃত একটি শ্লোকে কালীর বর্ণনায় বলা হয়েছে, ‘ক্ষুৎক্ষামঽকাণ্ডচণ্ডী চিরমবতুতরাং ভৈরবী কালরাত্রিঃ।।’ বৈদিক সাহিত্যে ‘কালী’ নামটি আমরা প্রথম দেখতে পাই ‘মুণ্ডক উপনিষদে’। কালী সেখানে যজ্ঞাগ্নির সপ্ত জিহ্বার একটি জিহ্বা। প্রসঙ্গত, পঞ্চেন্দ্রিয়, বুদ্ধি ও মন এই সাতটিকে অগ্নির সপ্ত জিহ্বা বলে উল্লেখ করা হয়। উপনিষদের শ্লোকটিতে বলা হয়েছে—
কালী করালী চ মনোজবা চ
সুলোহিতা যা চ সুধূম্রবর্ণা।
স্ফুলিঙ্গিনী বিশ্বরুচী চ দেবী
লেলায়মানা ইতি সপ্তজিহ্বাঃ।।
কালী এখানে আহুতি গ্রহণকারিণী অগ্নিজিহ্বা মাত্র। তাঁর মাতৃদেবীত্বের কোনও আভাস নেই এখানে। শশিভূষণের এই মত। তিনি বলেছেন, ‘শুধু বিশ্বরুচীর ক্ষেত্রে দীপ্যমানা অর্থে দেবী কথাটির ব্যবহার দেখিতে পাই’। তিনি মনে করিয়েছেন মহাভারতের আদিকাণ্ডেও যজ্ঞাগ্নির এই সপ্তজিহ্বার উল্লেখ রয়েছে।
মহাভারতের অনেক জায়গায়ই কালীর উল্লেখ পাওয়া যায়। সৌপ্তিক পর্বে দ্রোণাচার্যের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র অশ্বত্থামা পাণ্ডব শিবিরে গভীর রাতে লুকিয়ে প্রবেশ করে ঘুমন্ত যোদ্ধাদের হত্যা করছিলেন যখন, তখন সেই হন্যমান যোদ্ধাগণ কালীদেবীকে দেখতে পেয়েছিলেন। সেই কালীদেবী রক্তাস্যনয়না, রক্তমাল্যানুলেপনা, পাশহস্তা এবং ভয়ঙ্করী। কালীর এই ভীষণ মূর্তি সংহারের প্রতীক। কালরাত্রিরূপিণী সেই দেবী সাক্ষাৎ সংহার। এমনই তিনি বিগ্রহবতী।
মহাভারতের এই কালীদেবীর উল্লেখ প্রসঙ্গে শশিভূষণ দাশগুপ্তের বক্তব্য, এটা ‘পরবর্তী কালের যোজনা হইতে পারে’। তিনি বলছেন, ‘এইসব বর্ণনায় কালীর কোনও দেবীত্বের আভাস নাই; কালী এখানে অত্যন্ত ভীত মনের একটা ভয়ঙ্করী ছায়ামূর্তি দর্শনের ন্যায়’।
কালিদাসের সময়েও কালী কোনও উল্লেখযোগ্য দেবী হিসেবে গৃহীত হয়নি। ‘কুমারসম্ভবে’ উমার সঙ্গে মহাদেবের বিবাহ প্রসঙ্গে বরযাত্রার যে বর্ণনা রয়েছে, তাতে দেখা যায় কৈলাস পর্বতের মাতৃকাগণ বরযাত্রায় মহাদেবের অনুগমন করেছিলেন—
তাসাঞ্চ পশ্চাৎ কনকপ্রভাণাং
কালী কপালাভরণা চকাশে
বলাকিনী নীলপয়োদরাজী
দূরং পুরঃক্ষিপ্তশতহ্রদেব।।
(৭। ৩৯)
অর্থাৎ, কনকপ্রভা সেই মাতৃকাগণের পশ্চাতে কপালাভরণা কালী অগ্রে বিদ্যুৎপ্রসারকারিণী বলাকাসমন্বিতা নীলমেঘরাজির ন্যায় শোভা পাইতেছিলেন। ‘মাতৃকাগণের পশ্চাদ্গামিনী এই কালীদেবী কালিদাসের যুগেও একজন অপ্রধানা দেবী বলিয়া মনে হয়’। মত শশিভূষণের।
কালিদাসের রঘুবংশেও একটি উপমাতে কালী বা কালিকাদেবীর উল্লেখ আছে। রাম-লক্ষ্মণের জ্যা-নিঃস্বন শুনে ভয়ংকরি তাড়কা রাক্ষসী আত্মপ্রকাশ করলে সেই ঘনকৃষ্ণবর্ণা তাড়কাকে চঞ্চলকপালকুণ্ডলা বলাকাযুক্তা কালীর মতো মনে হচ্ছিল—
জ্যানিনাদমথ গৃহ্নতী তয়োঃ
প্রাদুরাস বহুলক্ষপাচ্ছবিঃ।
তাড়কা চলকপালকুণ্ডলা
কালিকেব নিবিড়া বলাকিনী।।
(১১। ১৫)
এই শ্লোকের ব্যাখ্যায় মল্লিনাথ কালিকা শব্দের অর্থে দেবী কালিকার উল্লেখ করেননি। কালিকা শব্দের এক অর্থ ‘ঘনাবলী’। সেই অর্থ ধরে এবং ‘বলাকিনী’ কথার সঙ্গে যুক্ত করে ‘ঘনাবলী’ অর্থ গ্রহণ করেছেন তিনি। কিন্তু ‘চলকপালকুণ্ডলা’ কথাটা তাড়কা সম্বন্ধে প্রযুক্ত হলেও এটা কালিকা দেবীর কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। এখানে আরও একটা বিষয় লক্ষণীয়। ‘রাক্ষসী’কে দেখে কৃষ্ণবর্ণা কালিকার কথা মনে হচ্ছিল। এই রাক্ষসী কিন্তু কোনও বৈদিক দেবী নন।