কালীর পূর্বাভাস।। ৩
কালিদাসের পরে সংস্কৃত সাহিত্যে অনেক জায়গায় রক্তলোলুপা ভয়ঙ্করী এক দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। যে নামেই সেই দেবীকে পাই না কেন, শশিভূষণের মত, ‘মনে হয় এই-সকল দেবী তখন পর্যন্ত ব্রাহ্মণ্য ধর্মে স্থান করিয়া লইতে পারেন নাই’।
‘খিল হরিবংশ’-এ মদ্যমাংসপ্রিয়া এক দেবীকে দেখা যায় শবর, বর্বর, পুলিন্দগণের পুজো পেতে। ষষ্ঠ বা সপ্তম শতকের প্রথমে সুবন্ধুর ‘বাসবদত্তা’য় কুসুমপুরের গঙ্গাতীরে ভগবতী বা কাত্যায়নীর বসবাস করার কথা আমরা জানতে পারি। এই দেবী ‘শুম্ভ-নিশুম্ভ-মহাবন-দাবজ্বালা’, ‘মহিষাসুর-গিরিবজ্রসারধারা’ এবং ‘প্রণয়প্রণতগঙ্গাধরজটাজূট-স্খলিত-জাহ্নবী-জলধারাশ্বেতপাদপদ্মা’ রূপে চিত্রিত। আবার বাণভট্টের ‘কাদম্বরী’তে দেখা যায় বনমধ্যে রুধিরের প্লাবন দিয়ে শবরগণের চণ্ডীর পূজার বিবরণ। শবরপূজিতা রক্তলোলুপা ভয়ঙ্করী চণ্ডীর প্রতি বাণভট্টের অশ্রদ্ধার প্রকাশ সেই বর্ণনায় ধরা আছে। ভবভূতি তাঁর ‘মালতীমাধব’ নাটকে নরবলির কথা উল্লেখ করেছেন। সেখানে নরমাংস বলিদানে পূজিতা ভয়ঙ্করী ‘করালা’ দেবীর বর্ণনা আছে। এই দেবী ভয়ঙ্করী চামুণ্ডা। শ্মশানঘাটে দেবীর মন্দির। তিনি কৃষ্ণবর্ণা দেবী এবং উগ্রা।
ভয়ঙ্করী চামুণ্ডা পরবর্তীকালে কালী বা কালিকা দেবীর সঙ্গে অভিন্না হয়ে গেছেন। এই কৃষ্ণবর্ণা ভয়ঙ্করী কালিকা এবং চামুণ্ডা দেবী আবার পরমেশ্বরী মহাদেবীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছেন। মার্কণ্ডেয় চণ্ডীতে এই মিলনের পৌরাণিক ব্যাখ্যা আছে। পুরাণকারগণ বিভিন্ন গল্পের মাধ্যমে এই মিলনের বা সমন্বয়ের কাহিনি ব্যাখ্যা সমেত হাজির করেছেন। চণ্ডীতেই আছে শুম্ভ-নিশুম্ভ বধের জন্য দেবতারা হিমালয়ে দেবীর কাছে দরবার করেছেন। তাতে দেবীর শরীরকোষ থেকে আরেক দেবীর উৎপত্তি হয়েছে এবং নতুন এই দেবী যেহেতু পার্বতীর শরীরকোষ থেকে নিঃসৃতা হয়েছেন, সেইজন্য এই দেবীর নাম কৌশিকী বলে পরিগণিত হয়েছে। কৌশিকী পার্বতীর দেহ থেকে বেরিয়ে গেলে, পার্বতী নিজেই কৃষ্ণবর্ণা হয়ে যান। এই জন্য তিনি হিমাচলবাসিনী কালিকা নামে বিখ্যাত হন—
তস্যাং বিনির্গতায়ান্তু কৃষ্ণাভূৎ সাপি পার্বতী’।
কালিকেতি সমাখ্যাতা হিমাচলাকৃতাশ্রয়া।।
শশিভূষণ দাশগুপ্তের মত, ‘মনে হয় এই যুগে কালিকা- দেবী কিঞ্চিৎ প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন এবং ব্রাহ্মণ্য ধর্মেও খানিকটা গৃহীতা হইয়াছিলেন, সেইজন্য হিমাচলবাসিনী দেবীর সহিত এইভাবে তাঁহাকে মিলাইয়া লওয়া হইল’। যে কৌশিকী দেবীর কথা বলা হয়েছে তিনি অতিশয় সুন্দরী ছিলেন। এই দেবী কুশিক জাতির আরাধ্যা ছিলেন। অনেকে মনে করেন, কুশিক জাতির এই দেবীই কি কৌশিকী দেবী হয়ে, শুম্ভ-নিশুম্ভকে বধ করে পৌরাণিক উপাখ্যানের দৌলতে হিমালয়বাসিনী পার্বতীর মধ্যে বিলীন হয়ে, তাঁকেই শুম্ভ-নিশুম্ভঘাতিনী করে তুলেছিলেন? শিবপুরাণে কৌশিকীর শুম্ভ-নিশুম্ভ হননের বর্ণনা আছে। মার্কণ্ডেয় চণ্ডীতে কৌশিকীকে পাওয়া গেছে গৌরবর্ণা অনিন্দ্যসুন্দরী দেবীরূপে। কিন্তু পদ্মপুরাণে, পার্বতীর দেহ থেকে কৃষ্ণবর্ণা যে দেবী বেরিয়ে এলেন, তিনিই কৌশিকী এবং ব্রহ্মা বিন্ধ্যাচলে তাঁকে প্রতিষ্ঠিতা করলেন। কালিকাপুরাণেও দেখা যায়, কৌশিকী রূপে পার্বতীর দেহ থেকে নিঃসৃতা দেবীই কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে কালিকারূপ গ্রহণ করলেন। পরস্পরবিরোধী এই উপাখ্যানগুলো সম্পর্কে শশিভূষণ দাশগুপ্তের অভিমত, ‘বেশ বোঝা যায় কৌশিকি নামে যে পৃথক দেবী ছিলেন তাঁহাকে মহাদেবীর সহিত মিশাইয়া লইবার এই-সব পৌরাণিক চেষ্টা’।