কালীর পূর্বাভাস।। ৪
রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিউট অব কালচার, গোলপার্ক থেকে প্রকাশিত, উপেন্দ্রকুমার দাস প্রণীত ‘শাস্ত্রমূলক ভারতীয় শক্তিসাধনা’ নামে দুই খণ্ডের একটা বই আছে। সেই বইয়ের প্রথম খণ্ডে বলা হয়েছে রাত্রিদেবীই কালী যা আমরা ইতিপূর্বেই জেনেছি। উপেন্দ্রকুমার এখানে উল্লেখ করেছেন, স্কন্দপুরাণ প্রভৃতি পুরাণে বর্ণিত আছে যে, রাত্রিদেবী ব্রহ্মার অনুরোধে মেনকার গর্ভে প্রবেশ করে উমার গাত্রবর্ণ ঢেকে দিয়ে তাঁকে কৃষ্ণবর্ণা করেছেন। এ থেকেই রামকৃষ্ণ মিশনের এই বইয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত করা হয়েছে, ‘বৈদিক দেবী রাত্রিই পৌরাণিক পার্বতীরূপে পূজিতা হয়ে আসছেন’। আবার ঋকবেদে অদিতির যে রূপ ব্যক্ত হয়েছে, তার উল্লেখ করে এই বইয়ের প্রথম খণ্ডে লেখা হয়েছে অদিতির এই রূপ আসলে ‘কাল তথা কালীর আদি রূপ’। এই প্রসঙ্গেই বলা হয়েছে, ঋকবেদে অদিতির যে-কাজের বিবরণ দেওয়া হয়েছে মহাভারতে দেখা যায় কালেরও সেই কাজ। মহাভারতে আছে— কাল সব প্রাণীর সৃষ্টি করেন, আবার কালই তাদের সংহার করেন। প্রাণীদের সংহারকারী কালকে আবার কালই দমন করেন। জগতে শুভাশুভ যত ভাব আছে, সব কালেরই সৃষ্টি। প্রলয়কালে কালই সমস্ত সংহরণ করেন এবং আবার সৃষ্টিমুখে কালই সমস্ত সৃজন করেন। এই বইয়ে মহাভারতের এই বর্ণনাকেই ‘কালীর আদি রূপ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
যাস্ক বলেছেন, অগ্নিকেও অদিতি বলা হয়। বৈদিক যুগে যজ্ঞবেদীকে দক্ষতনা বা দক্ষতনয়া বলা হত। উপেন্দ্রকুমারের বইয়ে অদিতি প্রসঙ্গে দক্ষতনয়ার উল্লেখ আছে। এই দক্ষতনার উপর ‘জ্যোতিষ্মতি অগ্নি’ বা ‘হব্যবাহনী অগ্নি’ স্থাপন করা হত। ঋগ্বেদে হব্যবাহিনী অগ্নিশিখা বা হব্যবাহন অগ্নির কথা আছে। আবার রাত্রিকেও হব্যবাহিনী বলা হয়েছে। অতএব, দেখা যাচ্ছে যে, অগ্নি ও রাত্রিদেবী এক হয়ে গেছেন। রামকৃষ্ণ মিশনের বইয়ের মত, ‘আর রাত্রিদেবীকেই কালীর আদিরূপ বলে অনুমান করা হয়, তা-ও লক্ষ্য করা গেছে’। কাজেই বলা যায়, অগ্নিই মহাদেবীর দুর্গা ও কালী রূপের অন্যতম উপাদান হয়েছে।
বৈদিক ঋষিরা এবং যজমানেরা চোখের ওপর দেখতে পেতেন লেলিহান অগ্নিশিখা আহুতি-প্রদত্ত মাংসাদি গ্রাস করছে; শ্মশানে শব সৎকার করতে গিয়ে দেখতে পেতেন আগুন লকলকে জিভ বের করে নাচতে নাচতে শবদেহটিকে আত্মসাৎ করছে। অগ্নির এই রূপ শ্মশানচারিণী, লোলজিহ্বা, নৃত্যপরা, কালী বা আমমাংস-ভক্ষণকারিণী চামুণ্ডার রূপ কল্পনার আদি উৎস মনে হয়। এই মনে হওয়ার কথা উপেন্দ্রকুমারের বইয়ে আছে। তিনি বলছেন, অগ্নিই যে মহাদেবীর কালী রূপের অন্যতম মূল উপাদান তার সুস্পষ্ট নিদর্শন মুণ্ডকোপনিষদে আছে। সম্ভবত দেবীর কালী নামের উদ্ভব এখান থেকেই হয়েছে। একথা জানিয়ে তিনি বলছেন, ‘বেদপন্থীদের বাড়িতে থাকত স্থায়ী অগ্নিশালা। তাতে থাকত চারকোণা বেদী। সেই বেদীর তিনদিকে তিন অগ্নির স্থান— পশ্চিমে গার্হপত্য, পূর্বে আহবনীয় আর দক্ষিণে দক্ষিণাগ্নি। আহবনীয় অগ্নিতেই দেবতার উদ্দেশে আহুতি দেওয়া হত। দক্ষিণাগ্নিতে আহুতি দেওয়া হত পিতৃগণের উদ্দেশে। দক্ষিণদিকের অধিপতি যম। যম মৃত্যুর দেবতা। …মৃত্যু অন্ধকার, কালো। কাজেই দেখা যায় দক্ষিণাগ্নির সঙ্গে কালো এবং মৃত্যু বা কালের একটা যোগ রয়েছে। …মনে হয়, এই দক্ষিণাগ্নিই কালভয়নিবারিণী দক্ষিণাকালীর রূপকল্পনার মূল’।