কালীর পূর্বাভাস।। ৫
অর্জুন কৃষ্ণের আদেশে কৌরব সৈন্যদের মুখোমুখি হয়ে, রথ থেকে নেমে দুর্গার স্তব করেন, তাতে আমরা কালীর উল্লেখ দেখতে পাই। তবে, এই স্তবটি প্রক্ষিপ্ত বলে অনেকে মনে করেন।
বাণ ঊষাসহ অনিরুদ্ধকে বন্দী করলে আত্মরক্ষার জন্য তিনি দেবী কোটবতীর শরণ নেন। আর শরণ মানেই তো স্তব। সেই স্তবেও কালীর দেখা মিলেছে। হরিবংশের বিষ্ণুপর্বে এই স্তব আছে।
অশ্বঘোষের বুদ্ধচরিতে একজন ‘মেঘকালী’র উল্লেখ আছে। সেই স্ত্রীলোকটি বুদ্ধের চিত্তমোহ জন্মাবার জন্য তাঁর পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এই মেঘকালী আদতে দেবী কালী কিনা তা নিয়ে অনেক মত আছে।
‘রঘুবংশ’- এর মধ্যে একটা উপমাতে কৃষ্ণবর্ণা তাড়কা রাক্ষসী কে দেবী কালীর মতো মনে হচ্ছে বলে আমরা উল্লেখ পেয়েছিলাম। আবার এখন দেখলাম, অশ্ব ঘোষ একজন প্রলুব্ধকারিণী স্ত্রীলোক হিসেবে বুদ্ধের তপস্যা ভঙ্গ করতে কালীর উল্লেখ করেছেন। মহাকালের শক্তি কালীর কিনা কত রকমফের। কালী দেখছি সর্বত্রই বিরাজিত।
খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের শেষ ভাগে অথবা অষ্টম শতকের গোড়ায় কাশ্মীরের প্রাচীনতম অদ্বৈত মত ক্রম-মত বা ক্রমদর্শনের উদ্ভব হয়। এই মতের আদিগুরু শিবানন্দনাথ ওরফে অবতারকনাথ। ক্রম-মত সম্পর্কে আচার্য অভিনব গুপ্তের মত, কুলমতে ক্রম-মতের আরম্ভ আবার কুলমতেই সমাপ্তি। কুল-মতের সঙ্গে এই মতের অনেক মিলও আছে। এই জন্য একে কুল-মতের ‘সোদর মত’ মনে করা হয়। ক্রম-মতকে কোনও কোনও তন্ত্রে কৌলিক বিদ্যা বলা হয়েছে। কালী বামেশ্বরী রূপে এই বিদ্যা কলন করেন। ক্রম শব্দের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এইমতে বিকল্পের সংস্কারের দ্বারা নির্বিকল্প স্বরূপে অনুপ্রবেশ হয় বলে একে ক্রমনয় বা ক্রম-মত বলা হয়। তন্ত্রালোকের চতুর্থ আহ্নিকে পাওয়া যায় এর ব্যাখ্যা – সংস্কার বলতে বোঝায় পুনঃ পুনঃ শ্রুতচিন্তনাদিবশত অস্ফুটত্বাদি থেকে ক্রমে স্ফুটতমত্ব–আদি পর্যন্ত গুণান্তর-আধান। ক্রমটি এইরকম – অস্ফুটত্ব-স্ফুটনযোগ্যত্ব-উদগচ্ছৎস্ফুটত্ব-সিদ্ধস্ফুটত্ব-স্ফুটতরত্ব-স্ফুটতমত্ব। এই হল ক্রম-মতের ক্রম। এই মতকে কালীনয়ও বলা হয়। কারণ এইমতে পরমেশ্বরী পরা সংবিৎ দেবী কালী। কালী, এই মতে ক্ষেপ, জ্ঞান, সংখ্যান, গতি এবং নাদ এই পঞ্চবিধ কলন করেন।
ক্রমমতে দুটি ধারা বা সম্প্রদায় লক্ষণীয়। এক সম্প্রদায় মনে করেন, শিব পরমেশ্বর। তিনিই পরম সত্ত্বা। ব্যোমবামেশ্বরী তাঁরই বিভিন্ন রূপ। আরেক সম্প্রদায় মনে করেন, কালী বা কালসংকর্ষিণীই পরমেশ্বরী। তিনিই পরম সত্ত্বা। ব্যোমবামেশ্বরী প্রভৃতি তাঁরই রূপ। এই সম্প্রদায়ের লোকেরাও কিন্তু নিজেদের শৈবই বলতেন। ক্রম-মতে কালীকে যেমন পরম সত্ত্বা পরমেশ্বরী মনে করা হয়, তেমনই এই মতের গুহ্য সাধনায় পঞ্চমকার বিহিত। শৈব ভাবের মধ্যে এ হল শাক্ত মতের ভাব এবং ক্রম–মতে এই সাধনায় পঞ্চমকার ব্যবহার সম্বন্ধে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছে তা এই – লোকে পঞ্চমকারকে জুগুপ্সিত, গর্হিত, অশুদ্ধ মনে করেন কিন্তু বস্তুমাত্রই পরমার্থত পরা সংবিৎ। কাজেই পঞ্চমকার পরমার্থত পরা সংবিৎ। অতএব, জুগুপ্সিত বা নিন্দনীয় হতে পারে না। এই ক্রম-মতে কালী পরা সংবিৎ। পরম সত্ত্বা। পরমেশ্বরী। এই মতে তিনি মাতৃসদ্ভাব, ব্যোমবামেশ্বরী এবং কালসংকর্ষিণী এই তিন নামে প্রচলিত।