কালীর পূর্বাভাস।। ৬
অভিনব গুপ্ত দ্বাদশ কালীর নাম বলেছেন। এই ১২ জনের নাম—সৃষ্টিকালী। রক্তকালী। স্থিতিনাশকালী। যমকালী। সংসারকালী। মৃত্যুকালী। রুদ্রকালী বা ভদ্রকালী। মার্তণ্ডকালী। পরমার্ককালী। কালাগ্নিরুদ্রকালী। মহাকালকালী এবং মহাভৈরবচণ্ডোগ্রঘোরকালী বা মহাভৈরবকালী। কেন এই দ্বাদশ কালী?
কালীকে মাতৃসদ্ভাব বলা হয় যে তা আমরা জেনেছি। কালী পরা সংবিৎ স্বতন্ত্র। স্বপ্রকাশ। তিনি প্রমাতার সংবিত্তিতে ক্রমে ক্রমে দ্বাদশ কালীরূপে প্রকাশিত হন। এর ফলে সাধকের দ্বাদশ কালীর রূপের উপলব্ধি হলে, সহজ হয়ে যায় তার মুক্তি লাভ।
এই যে দ্বাদশ কালীর নাম অভিনব গুপ্ত বলেছেন, এই কালী কেমন?
তাঁর প্রমেয়গত সৃষ্টিস্বরূপ হল সৃষ্টিকালী।
তাঁর প্রমেয়গত স্থিতিস্বরূপ হল রক্তকালী।
তাঁর প্রমেয়গত সংহারস্বরূপ হল স্থিতিনাশকালী।
তাঁর প্রমেয়গত অনাখ্যস্বরূপ হল যমকালী।
এই চার কালী প্রমেয়াংশগ্রাসরসিক। তন্ত্রালোকে একথা বলা হয়েছে। এরপর রয়েছে কালীর বাকি অষ্টরূপ। তা এই রকম—
তাঁর প্রমাণগত সৃষ্টিস্বরূপ সংহারকালী।
স্থিতিনাশকালী আর সংহারকালীর মধ্যে পার্থক্য এই যে, স্থিতিনাশকালীতে প্রমাতৃত্ব ও প্রমেয়ত্ব ভিন্ন। কিন্তু সংহারকালীতে উভয় অভিন্ন।
তাঁর প্রমাণগত স্থিতিস্বরূপ হল মৃত্যুকালী।
তাঁর প্রমাণগত সংহাররূপ হল রুদ্রকালী বা ভদ্রকালী।
তাঁর প্রমাণগত অনাখ্যস্বরূপ হল মার্তণ্ডকালী।
সংহারকালী থেকে মার্তণ্ডকালী পর্যন্ত এই চার কালী প্রমাণাংশভক্ষণপ্রবণ।
এরপর রয়েছে বাকি কালীচতুষ্টয়।
তাঁর প্রমাতৃগত সৃষ্টিস্বরূপকে বলা হয়েছে পরমার্ককালী।
তাঁর প্রমাতৃগত স্থিতিস্বরূপ হল কালাগ্নিরুদ্রকালী।
তাঁর প্রমাতৃগত সংহারস্বরূপ হল মহাকালকালী।
প্রমাতাকে বলা হয় ভৈরব।
প্রমেয়কে বলা হয় চণ্ড।
প্রমাকে বলা হয় উগ্র এবং
প্রমাণকে বলা হয় ঘোর। পরা সংবিৎ এই চারের কলন করে, তাই তিনি মহাভৈরবচণ্ডোগ্রঘোরকালী। এটি দেবীর প্রমাতৃগত অনাখ্যরূপ। এবং কালীকে যে পরা বলা হয়, তার কারণ এই দ্বাদশ দেবীই তাঁর রূপভেদ। ফলে, এই ১২ কালীর প্রত্যেকেই দ্বাদশাত্মিকা। অর্থাৎ, প্রত্যেকের মধ্যেই অন্য একাদশ কালীর অবস্থান। তন্ত্রালোকে এই কারণেই সাধনার সময় মোট ১৪৪ কালীর পুজোর নির্দেশ আছে।
এসবই কালীর মাতৃসদ্ভাব-এর অন্তর্গত। ক্রম-মতে কালীর বাকি দুই নাম হল, ব্যোমবামেশ্বরী এবং কালসংকর্ষিণী। এই নামের কারণ কী?
ক্রম-মত পঞ্চ-নির্ভর। এই মতের প্রখ্যাপনে বিভিন্ন পঞ্চ স্বীকৃত। যেমন, পঞ্চবাহ। পঞ্চশক্তি। পঞ্চবাক। পঞ্চধ্যেয়। বেদকাত্ম পঞ্চশক্তি। এই যে সব পঞ্চকের উল্লেখ পাওয়া যায়, কালী সেসব স্ফুরিত করেন বলে তাঁকে ব্যোমবামেশ্বরী বলে। বোম বলতে এইসব পঞ্চক। তাদের বাম বা বমন অর্থাৎ স্ফুরণ করেন তিনি, তাই ব্যোমবামেশ্বরী।
কালী কালসংকর্ষিণী। এই নামের কারণ তিনি কালের দ্বারা অবিচ্ছিন্না নন। বরং কাল ব্যবচ্ছেদকারী।
আগেই দেখেছি, ক্রম-মতে পঞ্চশক্তি স্বীকৃত। এই পঞ্চশক্তির পঞ্চম শক্তি ভাসা। ভাসাকে প্রতিভা বলাও হয়। এই শক্তি সর্বগর্ভিণী। স্বাতন্ত্র্যরূপা। চিৎ-শক্তি। এই ভাসা শক্তি কালের দ্বারা অকলিত। এই জন্যই এই শক্তি আর কালসংকর্ষিণী অভিন্ন।