কালীর পূর্বাভাস।। ৭
কালী উপাসকদের মতে দেবী পরব্রহ্মস্বরূপিণী। তিনিই আদ্যাশক্তি। নির্বাণতন্ত্রে বলা হয়েছে, আদ্যাশক্তি মহাকালী দেবতাদের সৃষ্টিকারিণী। শক্তিসঙ্গমতন্ত্র মতে আদ্যা নির্গুণা কালী। তিনি বাক্যের অতীতা, তিনি পরাৎপরা। কর্পূরাদিস্তোত্রে বলা হয়েছে, কালী হরি, হর, বিরিঞ্চি প্রভৃতি দেবতার আরাধ্যা।
কালীর বীজমন্ত্র ক্রীং। স্বামী নিগমানন্দ যোগী গুরু গ্রন্থে লিখেছেন, দেবদেবীর বীজমন্ত্রে তাঁহাদের সূক্ষ্ম শক্তি নিহিত থাকে; শুনিতে সামান্য বর্ণমাত্র কিন্তু ক্রিয়া দ্বারা তাহার শক্তি জাগাইয়া দিলে যে দেবতার বীজ সেই দেবতাশক্তির কার্য করিবে।
দশমহাবিদ্যার মধ্যে কালী শুদ্ধসত্ত্বগুণপ্রধানা নির্বিকারা। সাক্ষাৎ কৈবল্যদায়িনী।
কালীর ভৈরব মহাকাল। কালী আদ্যা মহাবিদ্যা। শক্তিসাধনা বলতে সাধারণত লোকে কালীসাধনাই বোঝেন। বিশেষ করে বাংলাদেশে।
মহানির্বাণতন্ত্রে দেখা যায় সদাশিব দেবীকে বলছেন, জগৎসংহারকারী মহাকাল তোমার রূপবিশেষ। মহাসংহারকালে কাল সমস্ত বিশ্ব গ্রাস করবেন। সর্বভূতকে কলন অর্থাৎ গ্রাস করার জন্য তাঁকে মহাকাল বলে। আর মহাকালকেও গ্রাস কর বলে তুমি আদ্যা কালিকা। কালকে গ্রাস কর বলে তুমি কালী। তুমি সমগ্র বিশ্বের আদিরূপিণী। কারণস্বরূপা। সৃষ্টিকালে সমগ্র বিশ্বের তুমিই আদিরূপিণী এবং সংহারকালে সমগ্র বিশ্ব তুমিই কলন কর। এই জন্যই তুমি আদ্যা কালী।
পুরাণে কালীর আবির্ভাব সাধারণের জন্য লিপিবদ্ধ আছে। নারদপঞ্চরাত্রে কালী কাহিনি আছে। মার্কণ্ডেয়পুরাণে আছে। দুর্গাসপ্তসতীতে আছে।
কালীর স্বরূপ বিধৃত আছে তন্ত্রাদিতে। কালীই ব্রহ্ম। এই মতের স্বপক্ষে নানা তন্ত্রে অনেক বচন রয়েছে।
কালী নির্গুণা এবং স্বগুণা, দুইই। কালী নিরাকারা এবং সাকারা। পরব্রহ্মস্বরূপিণী কালীই সকলের আদি। এবং একমাত্র কারণ। মহাকালসংহিতায় একথা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। এই তন্ত্রে বলা হয়েছে, ব্রক্ষ্মা, বিষ্ণু, শিব, পঞ্চভূত কিছুই ছিল না যখন তখন পরব্রহ্মস্বরূপিণী একমাত্র কালীই সকলের কারণরূপে বিরাজমানা ছিলেন।
কালীকুলের শাস্ত্রমতে কলিযুগে একমাত্র কালীই ভক্তিমুক্তিপ্রদায়িনী। কালী সব দেবতার উপাস্য। কালীর প্রসাদেই ভুক্তিমুক্তি করতলগত হয়। কালী জগতের মাতা। শোকদুঃখবিনাশিনী। কলিযুগে তিনি মহাপাতকহারিণী। শক্তিসঙ্গমতন্ত্রে বলা হয়েছে, কলিযুগে যিনি কালীকে পরিত্যাগ করে সিদ্ধকামী হতে চান, তিনি চক্ষু ছাড়াই দর্পণে রূপ দেখতে চান।
কলিযুগে কালী জেগে আছেন। তাঁকে বাদ দিয়ে যিনি মোক্ষকামী হন, তিনি ভোজন ছাড়াই ক্ষুণ্ণিবৃত্তি করতে চান।
তন্ত্রে কালীমন্ত্রের বিষয়ে বলা হয়েছে, এই সব পরমা বিদ্যা অদেয়া। কলিযুগে পূর্ণফলপ্রদা। মোক্ষদা। শীঘ্রফলপ্রদা। এই সব বিদ্যার জ্ঞানমাত্র মানুষ জীবন্মুক্ত হয়।
এযুগে শিবকতৃক আরাধিতা হয়ে কালী প্রত্যক্ষ হন।